📘 শিরক কি ও কেন > 📄 জিন বা অপর কোনো রোগের অনিষ্ট থেকে আত্মরক্ষার জন্য শরীরে তা'বীজ ব্যবহার করা

📄 জিন বা অপর কোনো রোগের অনিষ্ট থেকে আত্মরক্ষার জন্য শরীরে তা'বীজ ব্যবহার করা


জিন বা অপর কোনো রোগের অনিষ্ট থেকে আত্মরক্ষার জন্য শরীরে তা'বীজ ব্যবহার করা:
জিন বা অপর কোনো রোগের অনিষ্ট থেকে আত্মরক্ষার জন্য শরীরে তা'বীজ ব্যবহার করা শির্কের অন্তর্ভুক্ত। এই বিশ্বাসটি ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম, কারণ অনিষ্ট থেকে রক্ষা করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহরই। কোনো তা'বীজ বা জড়বস্তুর অলৌকিক ক্ষমতা নেই যে, তারা মানুষকে অনিষ্ট থেকে রক্ষা করতে পারে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«مَنْ عَلَّقَ تَمِيمَةً فَقَدْ أَشْرَكَ»
"যে তা'বীজ ঝুলালো সে শির্ক করলো।"

তিনি আরো বলেন:

﴿إِنَّ الرُّقَى وَالثَّمَائِمَ وَالتَّوْلَةَ شِرْكٌ﴾
"(শির্ক যুক্ত) ঝাড়ফুঁক, তা'বীজ ও জাদু শির্ক।"

এই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, জিন বা অপর কোনো রোগের অনিষ্ট থেকে আত্মরক্ষার জন্য শরীরে তা'বীজ ব্যবহার করা শির্কের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, এতে আল্লাহর পাশাপাশি অন্য কারো ক্ষমতাকে বিশ্বাস করা হয় এবং জড়বস্তুর অলৌকিক ক্ষমতাকে বিশ্বাস করা হয়।

মানুষের উচিত একমাত্র আল্লাহর কাছেই অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দু'আ করা এবং তাঁর উপর ভরসা করা। কোনো তা'বীজ বা জড়বস্তুর উপর ভরসা করা শির্কের অন্তর্ভুক্ত।

সুতরাং, জিন বা অপর কোনো রোগের অনিষ্ট থেকে আত্মরক্ষার জন্য শরীরে তা'বীজ ব্যবহার করা শির্কের অন্তর্ভুক্ত এবং তা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম।

জিনের অশুভ দৃষ্টি এবং বিভিন্ন রোগের অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য আমাদের দেশের সাধারণ মুসলিমদের মাঝে তা'বীজ ব্যবহার করা একটি সাধারণ রীতিতে পরিণত হয়েছে। তারা এ-সব তা'বীজ কোনো জিন সাধক বা পেশাদার কোনো পীর-ফকীর বা কবিরাজ, উলঙ্গ ও মাথায় জটধারী পাগল বা পাগলের ভানকারী লোকদের নিকট থেকে তাদেরকে ওলি বা দরবেশ জ্ঞান করে। নিয়ে থাকেন। এদের চটকদার কোনো কোন কথাকে তারা তাদের কারামত মনে করে ধোকায় পড়ে যান। অথচ তারা জানেন না যে, এ-জাতীয় তা'বীজদানকারী জিন সাধক, কবিরাজ ও পাগলেরা আসলে শয়তান। এভাবে যারা প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ সম্পদ উপার্জন করতে চায় এদের সাথে যে শয়তানের গোপন সখ্যতা গড়ে উঠে, সে সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন:
﴿هَلْ أُنَبِّئُكُمْ عَلَى مَن تَنَزَّلُ الشَّيَاطِينُ تَنَزَّلُ عَلَى كُلِّ أَفَاكٍ أَثِيمٍ ﴾ [الشعراء: ٢٢١، ٢٢٢]
“কাদের উপর শয়তান অবতীর্ণ হয়, সে সম্পর্কে আমি কি তোমাকে সংবাদ দেব? শয়তানতো প্রত্যেক মিথ্যুক ও পাপিষ্ঠ ব্যক্তির উপরেই অবতীর্ণ হয়ে থাকে”।
তা'বীজ ব্যবসায় কোনো কোনো মসজিদের ইমাম ও মাদরাসার কোনো কোনো শিক্ষকগণও পিছিয়ে নেই। তারা কুরআনের আয়াত অথবা তা'বীজের কিতাব থেকে তা'বীজ দিয়ে একদিকে কুরআনের আয়াত বিক্রি করে দুনিয়া হাসিল করছেন, অপরদিকে এর মাধ্যমে তারা জনগণকে শির্কে আসগারে নিমজ্জিত করছেন। অথচ আল্লাহ তা'আলা তাঁর আয়াতসমূহ বিক্রি করতে নিষেধ করে বলেছেন:
﴿ وَعَامِنُوا بِمَا أَنزَلْتُ مُصَدِّقًا لِمَّا مَعَكُمْ وَلَا تَكُونُوا أَوَّلَ كَافِرٍ بِهِ، وَلَا تَشْتَرُوا بِنَايَتِي ثَمَنًا قَلِيلًا وَإِييَ فَاتَّقُونِ ﴾ [البقرة: ٤١]
"তোমরা আল্লাহর আয়াতের বিনিময়ে অল্পমূল্য অর্থাৎ দুনিয়া হাসিল করোনা"।
বাজারে তা'বীজ দানের সহায়ক কিতাব অনেক রয়েছে। তন্মধ্যে নকশে সুলায়মানী ও চরমোনাই এর পীর মাওলানা সৈয়দ মোহাম্মদ এছহাক এর তা'বীজের কিতাব উল্লেখযোগ্য। মানুষের জীবনের বিবিধ রোগ-ব্যাধি নিবারণের জন্য তাতে অনেক ধরনের পথ্য দেয়া রয়েছে। যার কোনোটি কুরআনের আয়াতের, কোনোটি ফেরেশতাদের নামের, কোনোটি আসহাবে কাহাফের নামের, কোনোটি খুলাফায়ে রাশেদার নামের, কোনোটি ফেরাউন, হামান, শয়তান ও ইবলিসের নামের। নিম্নে সর্বশেষটির চিত্র তুলে ধরা হলো:
فرعون شیطان هامان إبليس
هامان إبليس فرعون شیطان
إبليس هامان شیطان فرعون
شیطان فرعون إبليس هامان
কুরআন ও হাদীস থেকে তা'বীজ দিলে বা ব্যবহার করলে তা জায়েয বা না জায়েয, এ নিয়ে কিছু কথা থাকলেও উপরে চিত্রসহ যে তা'বীজের বর্ণনা দেয়া হলো, তা মুসলিম মনীষীদের সর্ব সম্মতিক্রমে অবৈধ। কেননা, এমন তা'বীজ গ্রহণ করার অর্থ হচ্ছে- গায়রুল্লাহের নিকট রোগ নিরাময়ের জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করা যা প্রকাশ্য শির্ক। এ-ছাড়া এতে তা'বীজ ব্যবহারকারীর ভরসা আল্লাহর উপর থাকার বদলে তার মনের অজান্তেই তা'বীজের উপর নেমে আসে। সে-জন্য রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- বলেছেন:
مَنْ تَعَلَّقَ شَيْئًا وُكَّلَ إِلَيْهِ»
“যে ব্যক্তি কোনো কিছুকে (তা'বীজ হিসেবে) শরীরে ঝুলালো, তার রক্ষণাবেক্ষণের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব তাকেই বুঝিয়ে দেয়া হয়”। এমতাবস্থায় সে আল্লাহর হেফাজতে না থেকে নিজের হেফাজতে চলে আসে। অপর হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ - সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- বলেন:
«مَنْ عَلَّقَ تَمِيمَةً فَقَدْ أَشْرَكَ»
"যে ব্যক্তি তা'বীজ ঝুলালো সে শির্ক করলো"।

টিকাঃ
169. আল-কুরআন, সূরা শুআরা: ২২২।
170. আল-কুরআন, সূরা বাক্বারাঃ ৪১।
171. সৈয়দ মোহাম্মদ এছহাক, তাবিজের কিতাব; (ঢাকা: আল-এছহাক প্রকাশনী, সংশোধিত সংস্করণ, ১৩৯৭ বাংলা), ৭ নং তদবীর, পৃ. ৩৮।
172. তিরমিযী, প্রাগুক্ত; কিতাব নং-২৯, বাবনং-২৪, হাদীসনং ২০৭২, ৩/৪০৩; বায়হাক্বী. প্রাগুক্ত; ২/৩০৭; হাকিম, প্রাগুক্ত;৪/৪৪১।
173. আহমদ, প্রাগুক্ত;৪/১৫৬; আল-হাইছামী, মাজমাউয যাওয়াইদ; ৫/১০৩।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 তা'বীজের প্রকারভেদ

📄 তা'বীজের প্রকারভেদ


তা'বীজের প্রকারভেদ:
তা'বীজ মূলত দুই প্রকারের হতে পারে:

১. শির্কী তা'বীজ: যে তা'বীজে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নাম, জিনের নাম, শয়তানের নাম, বা শির্কী কোনো কথা লেখা থাকে, অথবা যা কোনো বিশেষ পাথর, ধাতু বা জড়বস্তু দিয়ে তৈরি করা হয় এবং বিশ্বাস করা হয় যে, এর অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে। এই ধরনের তা'বীজ ব্যবহার করা শির্কের অন্তর্ভুক্ত এবং ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«مَنْ عَلَّقَ تَمِيمَةً فَقَدْ أَشْرَكَ»
"যে তা'বীজ ঝুলালো সে শির্ক করলো।"

২. শর'য়ী তা'বীজ: যে তা'বীজে কুরআনুল কারীমের আয়াত, আল্লাহর নাম, বা সহীহ হাদীসে বর্ণিত দু'আ লেখা থাকে এবং বিশ্বাস করা হয় যে, এর কোনো নিজস্ব ক্ষমতা নেই, বরং আল্লাহই রক্ষা করেন। এই ধরনের তা'বীজ ব্যবহার করা সম্পর্কে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কিছু আলেম এটিকে জায়েয বলেছেন, তবে শর্ত হলো:
ক. তা কুরআন বা সহীহ হাদীসের আয়াত বা দু'আ হতে হবে।
খ. তা আরবি ভাষায় হতে হবে, যাতে এর অর্থ বোঝা যায়।
গ. বিশ্বাস করতে হবে যে, তা'বীজের কোনো নিজস্ব ক্ষমতা নেই, বরং আল্লাহই রক্ষা করেন।
ঘ. তা'বীজকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না, বরং সরাসরি আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইতে হবে।

তবে, অধিকাংশ আলেম এই ধরনের তা'বীজ ব্যবহার করাকেও মাকরুহ বা অনুচিত মনে করেন, কারণ এটি শির্কের দিকে ধাবিত করতে পারে এবং জাহেলী যুগের কুসংস্কারের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা'বীজ ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন এবং এটি শির্কের অন্তর্ভুক্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন।

সুতরাং, শির্কী তা'বীজ ব্যবহার করা সম্পূর্ণ হারাম। শর'য়ী তা'বীজ ব্যবহার করা সম্পর্কে আলেমদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও, অধিকাংশ আলেম এটিকে মাকরুহ বা অনুচিত মনে করেন, কারণ এটি শির্কের দিকে ধাবিত করতে পারে।

তা'বীজ দু'প্রকার:
এক.এমন সব তা'বীজ যা কুরআন শরীফের আয়াত বা দো'আয়ে মা'ছুরা ব্যতীত অন্য কিছু দ্বারা প্রদান করা হয়। শর'য়ী দৃষ্টিতে এ-জাতীয় তা'বীজ প্রদান করা ও ব্যবহার করা উভয়টাই হারাম। এ-জাতীয় তা'বীজ দানকারী বা ব্যবহারকারী যদি এ মনে করে যে, রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে এ-তা'বীজ নিজেই কাজ করে এবং নিজেই রোগকে প্রভাবিত করে, তা হলে তা শির্কে আকবার হিসেবে গণ্য হবে। আর যদি অনুরূপ ধারণা না করে আল্লাহর অনুগ্রহে উপকারী হয়ে থাকে এ-কথা অন্তরে রেখে মুখের দ্বারা শুধু তা'বীজকে উপকারী বলে বা তা'বীজের দ্বারা রোগের উপকার হয়েছে এমনটি বলে, তা হলে তা শির্কে আসগার হিসেবে গণ্য হবে।
এ-জাতীয় তা'বীজ হারাম হওয়ার কারণ:
এতে গায়রুল্লাহের সাথে অন্তরের সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। আল্লাহর উপর ভরসা না থেকে গায়রুল্লাহের উপর ভরসা হয়। যাবতীয় উপকারের মালিক আল্লাহ হওয়া সত্ত্বেও এতে গায়রুল্লাহকে উপকারের মালিক বানিয়ে নেয়া হয়। আর যে বস্তু আল্লাহর উপর থেকে মানুষের ভরসাকে নষ্ট করে এবং গায়রুল্লাহকে উপকারী নির্দিষ্ট করে, তা শির্ক। এ-জন্যেই এ-জাতীয় তা'বীজ ব্যবহার করা হারাম। এতে উপকার থাকলেও শর'য়ী দৃষ্টিতে সে উপকার গ্রহণযোগ্য নয়। যেমন জাদু আল্লাহর ইচ্ছায় উপকারী হলেও সে উপকার গ্রহণ করা হারাম ও শির্ক।
দুই. এমন সব তা'বীজ যা কুরআনুল কারীমের আয়াত দ্বারা প্রদান করা হয়। এ-জাতীয় তা'বীজের ব্যাপারে মুসলিম মনীষীদের মাঝে দু'টি মত পরিলক্ষিত হয়। কেউ এটাকে জায়েয বলেন, আবার কেউ এটাকে না জায়েয ও হারাম বলেন। আমার মতে যারা এ-জাতীয় তা'বীজকেও হারাম বলে মনে করেন, সত্য তাঁদের কথার মধ্যেই নিহিত রয়েছে। দলীল ও যুক্তি তাঁদের মতকেই সঠিক বলে প্রমাণ করে। কেননা;
ক) তা'বীজ ব্যবহার করা শির্ক সম্বলিত যে সব হাদীস রয়েছে তা সাধারণভাবে বর্ণিত হয়েছে। তাতে কুরআন আর অ-কুরআনের তা'বীজ বলে কোনো পার্থক্য করা হয় নি।
খ) এতে তা'বীজ ব্যবহারকারীর ভরসা আল্লাহর উপর না থেকে তা'বীজের উপরে নেমে যায়। তা'বীজই তাকে বিপদ থেকে রক্ষা করবে-এ ধরনের একটি ভাবধারা ব্যবহারকারীর অন্তরে তার অজান্তেই সৃষ্টি হয়ে যায়, যা সুস্পষ্ট শির্ক।
গ) তা'বীজ ব্যবহার করে উপকার পেলে আল্লাহর পরিবর্তে তা'বীজকেই উপকারী বলে মনে করা হয়। অথচ কোনো বস্তুর প্রতি অনুরূপ ধারণা করা শির্ক।
ঘ) এ ছাড়া কুরআনের আয়াত দ্বারা তা'বীজ দেয়া জায়েয হলে অবৈধ তা'বীজ ব্যবসায়ীরা এর দ্বারা আসকারা পাবে।
ঙ) অনুরূপভাবে এর দ্বারা অবৈধ তা'বীজ ব্যবহারকারীরা বিভ্রান্তির শিকার হবে। তারা এটাকে অবৈধ তা'বীজের মতই মনে করবে। এটাকে ফকীর ও কবিরাজদের দেয়া তা'বীজই মনে করবে।
চ) এছাড়া এতে কুরআনের অবমাননা করা হয়। কুরআন বিক্রি করে দুনিয়া উপার্জনের একটি হীন পন্থা উন্মোচিত হয়।
ছ) সর্বোপরি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী অনুযায়ী এতে মানুষের উপর আল্লাহর কোনো রক্ষণাবেক্ষণ থাকে না।
জ) তা'বীজ ব্যবহারকারীর প্রতি রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বদ দো'আ থাকায় তা'বীজের দ্বারা মূলত কোনো উপকার পাবার কথা নয়। তা'বীজ ব্যবহার করার পর আল্লাহর ইচ্ছায় কোনো উপকার হয়ে থাকলেও এর মধ্যে তা'বীজ ব্যবহারকারী ব্যক্তির ঈমানী পরীক্ষা নিহিত থাকবে। সুতরাং যা ব্যবহার করলে শির্ক সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তা ব্যবহার না করাই শ্রেয়।

টিকাঃ
174. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
مَنْ عَلَّقَ تَمِيمَهُ فَلَا أَتَمَّ اللَّهُ لَهُ
"যে তা'বীজ ব্যবহার করে আল্লাহ যেন তার উদ্দেশ্য পূর্ণ না করেন"। ইবনে হিববান, প্রাগুক্ত; ১৩/৪৫০; বায়হাক্বী, প্রাগুক্ত; ৯/৩৫০।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 এ জাতীয় তা'বীজ হারাম হওয়ার কারণ

📄 এ জাতীয় তা'বীজ হারাম হওয়ার কারণ


এ জাতীয় তা'বীজ হারাম হওয়ার কারণ:
তা'বীজ হারাম হওয়ার প্রধান কারণ হলো, এটি শির্কের দিকে ধাবিত করে এবং আল্লাহর উপর ভরসা বিনষ্ট করে। ইসলামে সকল কল্যাণ ও অকল্যাণের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা'আলা। কোনো তা'বীজ বা জড়বস্তুর অলৌকিক ক্ষমতা নেই যে, তারা মানুষকে অনিষ্ট থেকে রক্ষা করতে পারে বা তাদের কোনো উপকার করতে পারে।

১. শির্কের কারণ: তা'বীজ ব্যবহারকারীরা সাধারণত বিশ্বাস করে যে, তা'বীজের নিজস্ব ক্ষমতা রয়েছে যা তাদের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করতে পারে। এই বিশ্বাসটি আল্লাহর একত্ববাদের পরিপন্থী এবং এটি আল্লাহর পাশাপাশি অন্যকে ক্ষমতাশীল মনে করার শামিল, যা শির্কের অন্তর্ভুক্ত।

২. আল্লাহর উপর ভরসা বিনষ্ট: তা'বীজ ব্যবহার করলে আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা থাকে না। মানুষ তা'বীজের উপর নির্ভর করে এবং আল্লাহর উপর ভরসা করা ছেড়ে দেয়। ইসলামে আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা করা ঈমানের অংশ।

৩. জাহেলী যুগের কুসংস্কার: তা'বীজ ব্যবহার জাহেলী যুগের কুসংস্কারের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। জাহেলী যুগে আরবের মুশরিকরা বিভিন্ন ধরনের তাবিজ-কবজ ব্যবহার করত এবং বিশ্বাস করত যে, এর অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে। ইসলাম এই ধরনের কুসংস্কারকে বাতিল করেছে।

৪. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিষেধাজ্ঞা: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাবে তা'বীজ ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন এবং এটিকে শির্কের অন্তর্ভুক্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন:

«مَنْ عَلَّقَ تَمِيمَةً فَقَدْ أَشْرَكَ»
"যে তা'বীজ ঝুলালো সে শির্ক করলো।"

তিনি আরো বলেন:

﴿إِنَّ الرُّقَى وَالثَّمَائِمَ وَالتَّوْلَةَ شِرْكٌ﴾
"(শির্ক যুক্ত) ঝাড়ফুঁক, তা'বীজ ও জাদু শির্ক।"

৫. বিপদ বৃদ্ধি: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, তা'বীজ রোগ বৃদ্ধি ছাড়া কোনো উপকার করবে না। এটি মানুষের বিপদ আরও বাড়াতে পারে, কারণ মানুষ আল্লাহর উপর ভরসা করা ছেড়ে দেয়।

সুতরাং, তা'বীজ হারাম হওয়ার প্রধান কারণ হলো এটি শির্কের দিকে ধাবিত করে, আল্লাহর উপর ভরসা বিনষ্ট করে, জাহেলী যুগের কুসংস্কারের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাবে তা নিষেধ করেছেন।

এতে গায়রুল্লাহের সাথে অন্তরের সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। আল্লাহর উপর ভরসা না থেকে গায়রুল্লাহের উপর ভরসা হয়। যাবতীয় উপকারের মালিক আল্লাহ হওয়া সত্ত্বেও এতে গায়রুল্লাহকে উপকারের মালিক বানিয়ে নেয়া হয়। আর যে বস্তু আল্লাহর উপর থেকে মানুষের ভরসাকে নষ্ট করে এবং গায়রুল্লাহকে উপকারী নির্দিষ্ট করে, তা শির্ক। এ-জন্যেই এ-জাতীয় তা'বীজ ব্যবহার করা হারাম। এতে উপকার থাকলেও শর'য়ী দৃষ্টিতে সে উপকার গ্রহণযোগ্য নয়। যেমন জাদু আল্লাহর ইচ্ছায় উপকারী হলেও সে উপকার গ্রহণ করা হারাম ও শির্ক।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 দুধের গাভী ও নতুন বাচ্চার গলায় তা'বীজ, জুতা ও জালের টুকরা ঝুলানো

📄 দুধের গাভী ও নতুন বাচ্চার গলায় তা'বীজ, জুতা ও জালের টুকরা ঝুলানো


দুধের গাভী ও নতুন বাচ্চার গলায় তা'বীজ, জুতা ও জালের টুকরা ঝুলানো:
দুধের গাভী ও নতুন বাচ্চার গলায় তা'বীজ, জুতা ও জালের টুকরা ঝুলানো শির্কের অন্তর্ভুক্ত। এই বিশ্বাসটি ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম, কারণ অনিষ্ট থেকে রক্ষা করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহরই। কোনো তা'বীজ, জুতা বা জালের টুকরার অলৌকিক ক্ষমতা নেই যে, তারা প্রাণী বা বাচ্চাকে অনিষ্ট থেকে রক্ষা করতে পারে বা তাদের কোনো উপকার করতে পারে।

জাহেলী যুগে আরবের মুশরিকরা শিশুদের গায়ে তা'বীজ ব্যবহার করত এবং উটের গলায় ধাতু নির্মিত তারের মালা ঝুলিয়ে রাখত। তা'বীজ বা ধাতু নির্মিত তারের মালা আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুল বিনষ্টকারী হওয়ায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«مَنْ عَلَّقَ تَمِيمَةً فَقَدْ أَشْرَكَ»
"যে তা'বীজ ঝুলালো সে শির্ক করলো।"

কোনো উটের গলায় তার বা হার ঝুলানো দেখলে তা কেটে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে তিনি আলী (রা) কে বলেছিলেন:

«لاَ يَبْقَيَنَّ فِي رَقَبَةِ بَعِيرٍ قِلادَةٌ مِنْ وَتَرٍ، وَلَا قِلَادَةً إِلَّا قُطِعَتْ»
"কোনো উটের গলায় ধাতব দ্রব্য দ্বারা নির্মিত তারের হার অবশিষ্ট রাখবে না, গলায় ঝুলানো হার পেলেই তা কেটে দিবে।"

এই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, প্রাণী বা বাচ্চার গলায় তা'বীজ, জুতা বা জালের টুকরা ঝুলানো শির্কের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, এতে আল্লাহর পাশাপাশি অন্য কারো ক্ষমতাকে বিশ্বাস করা হয় এবং জড়বস্তুর অলৌকিক ক্ষমতাকে বিশ্বাস করা হয়।

মানুষের উচিত একমাত্র আল্লাহর কাছেই অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দু'আ করা এবং তাঁর উপর ভরসা করা। কোনো তা'বীজ, জুতা বা জালের টুকরার উপর ভরসা করা শির্কের অন্তর্ভুক্ত।

সুতরাং, দুধের গাভী ও নতুন বাচ্চার গলায় তা'বীজ, জুতা ও জালের টুকরা ঝুলানো শির্কের অন্তর্ভুক্ত এবং তা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম।

দেশের কৃষকগণ মানুষের চোখের অশুভ দৃষ্টি থেকে দুধের গাভী ও তার নবজাত বাচ্চাকে রক্ষা করার জন্য গাভী ও বাচ্চার গলায় তা'বীজ ঝুলিয়ে রাখেন। অনেক সময় উক্ত উদ্দেশ্যে গলায় প্লাষ্টিকের সেন্ডেল ও জালের টুকরাও ঝুলিয়ে রাখেন। আরব সমাজে এ-জাতীয় উদ্দেশ্যে উটের গলায় তারের মালা ঝুলিয়ে রাখার প্রচলন ছিল। এতে ভরসাগত উপাসনায় শির্ক হয় বিধায়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- তা কেটে দিতে নির্দেশ করেছিলেন।

টিকাঃ
175. আবু দাউদ, প্রাগুক্ত; ৩/৫২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00