📘 শিরক কি ও কেন > 📄 অন্তরে পীর ও ওলিদের অনিষ্টের গোপন ভয় করা

📄 অন্তরে পীর ও ওলিদের অনিষ্টের গোপন ভয় করা


শত্রুর ষড়যন্ত্র, সাপের দংশন ও হিংস্র জীব-জন্তু ইত্যাদির আক্রমণের ভয় করাকে মানুষের স্বভাবসুলভ ভয় বলা হয়। এ জাতীয় ভয় থেকে সাধারণ মানুষ কেন স্বয়ং নবীগণও মুক্ত থাকতে পারেন না।
তাই শর'য়ী দৃষ্টিতে এমন ভয় কোনো দূষণীয় ব্যাপার নয়। তবে কোনো মানুষের প্রতি তিনি শত্রু আর মিত্র যা-ই হোন না কেন এমন ভয় করা যাবে না যে, তিনি বাস্তব কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা ছাড়াই কারো অনিষ্টের ইচ্ছা করলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অনিষ্ট করতে পারেন; কেননা আমাদের অন্তরে এ জাতীয় ভয় কেবল আল্লাহ ব্যতীত আর কারো জন্যে থাকতে পারে না।
কিন্তু আমাদের দেশে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন যারা ওলীদের ব্যাপারে এমন গোপন ভয় করে থাকেন। যেমন সিলেট জেলায় অবস্থিত শাহ পরান ওলির ব্যাপারে সাধারণ জনমনে এমন ধারণা রয়েছে যে, তিনি খুবই গরম, তাঁর কবরে কেউ বেআ'দবী করলে তিনি সে ব্যক্তির যে কোনো অনিষ্ট করতে পারেন। অনুরূপভাবে দিনাজপুর জেলার 'চেহেলগাজী' কবরের ব্যাপারে সে এলাকায় এমন ধারণা রয়েছে যে, সেখানে কেউ বেআদবী করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যে কোনো মুহূর্তে কোনো দুর্ঘটনায় পতিত হতে পারে।
বেআদবী হলে বিপদের আশংঙ্কায় সাধারণ যিয়ারতকারীরা সেখানে যিয়ারত শেষে মুখ সামনে রেখে পিছু হেঁটে বের হয়। গাড়ী চালকেরা দুর্ঘটনার হাত থেকে বাঁচার জন্য কবরের নিকটে গাড়ী নিয়ে আসলে গাড়ীর গতি কমিয়ে নেয়। এ ছাড়াও অনেকে কোনো কবরে গেলে কবরের নিকটস্থ গাছের ডাল ও পাতা কাটতে ও ছিঁড়তে অন্তরে গোপন একটি ভয় অনুভব করে। এ জাতীয় ভয় করা শির্ক। আরবের মুশরিকদের মধ্যে তাদের দেবতাদের ব্যাপারে এ জাতীয় গোপন ভয় বিদ্যমান ছিল। সে জন্য তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাদের দেবতাদের অনিষ্টের গোপন ভয় প্রদর্শন করতো। যার প্রমাণ প্রথম অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে।

টিকাঃ
119. গোলাম ছাকলায়েন, প্রাগুক্ত; পৃ.৪৮।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 আল্লাহ ব্যতীত অন্যের উপর ভরসা করা

📄 আল্লাহ ব্যতীত অন্যের উপর ভরসা করা


ইহ-পরকালীন যে কোনো বিষয় অর্জিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত কর্ম করার পর তা অর্জিত হওয়ার জন্য আল্লাহর উপর ভরসা করা হচ্ছে অন্তরের একটি অন্যতম উপাসনা। কোনো কর্ম করা বা উদ্দেশ্য অর্জিত হওয়ার ক্ষেত্রে মানুষ মানুষের সাহায্যকারী হতে পারে। তবে কোনো অবস্থাতেই কেউ কারো ভরসা হতে পারে না, কেননা কোনো কাজ আরম্ভ করা এবং সফলভাবে তা সম্পন্ন করা সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। কোনো মানুষ কাউকে সাহায্যের জন্য ইচ্ছা করলে তার ইচ্ছা ও কর্ম বাস্তবে কেবল তখনই রূপ নিতে পারে যখন এর সাথে আল্লাহর ইচ্ছার সংমিশ্রণ ঘটে, অন্যথায় নয়। তাই আল্লাহই হলেন আমাদের যাবতীয় কর্মের একক ভরসা। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোনো কোন কর্মের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষদের মুখে এমন কথা বলতে শুনা যায় যে, 'একাজে আপনিই আমার একমাত্র ভরসা', 'আপনার উপর আমি ভরসা করেছি', আবার অনেককে আখেরাতে মুক্তির জন্য সঠিক ঈমান ও সৎকর্ম করে আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা না করে ওলি ও পীরদের শাফা'আতের উপর ভরসা করতে দেখা যায়।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 আল্লাহ ও রাসূল ব্যতীত কোনো মানুষের মত ও পথের নিঃশর্ত আনুগত্য ও অনুসরণ করা

📄 আল্লাহ ও রাসূল ব্যতীত কোনো মানুষের মত ও পথের নিঃশর্ত আনুগত্য ও অনুসরণ করা


কুরআন ও সহীহ হাদীসে বর্ণিত যাবতীয় বিধানের যথাসাধ্য অনুসরণ ও আনুগত্য করা হচ্ছে আল্লাহর বিধানের আনুগত্যের উপাসনা। এ উপাসনার প্রতি নির্দেশ করে মহান আল্লাহ বলেছেন: اتَّبِعُوا مَا أُنزِلَ إِلَيْكُم مِّن رَّبِّكُمْ وَلَا تَتَّبِعُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاءَ ۚ [الاعراف: [٣]
"তোমাদের প্রতি তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, তোমরা তা অনুসরণ কর এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো অভিভাবকদের অনুসরণ করো না।"
আল্লাহর বিধানের অনুসরণ ও আনুগত্যের এ উপাসনা মানুষের যাবতীয় চিন্তা, চেতনা, কাজ-কর্ম ও কথার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হবে। আর সে-জন্যে জ্ঞানী ও সাধারণ মানুষ নির্বিশেষে সবাইকে তাকলীদ বা অনুসরণের যে সঠিক পদ্ধতির কথা প্রথম অধ্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে তা অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, এক্ষেত্রেও দেশের সাধারণ লোকদের মত অনেক জ্ঞানী লোকেরাও অনেকটা নিজেদের অজান্তেই অনুসরণের বৈধ নীতিমালা লঙ্ঘন করে চলেছেন। সাধারণ লোকজন অন্ধভাবে তাদের পীরদের আনুগত্য ও অনুসরণ করে থাকেন। কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা তাদের কোনো কর্মের ত্রুটি প্রমাণ করে দিলেও তারা তাদের পীর সাহেবের নির্দেশ ব্যতীত তা পরিত্যাগ করেন না।
ধর্মীয় ক্ষেত্রে জ্ঞানী অধিকাংশ আলেমগণ নিজ মাযহাবের নিঃশর্ত ও নির্বিচারে অনুসরণ করেন। কোনো বিষয়ে নিজের ইমাম বা মাযহাবে প্রচলিত আমলের বিপরীতে সহীহ হাদীসের সন্ধান পেলেও বিভিন্ন অনর্থক যুক্তি ও তর্ক দাঁড় করিয়ে তারা নিজের ইমামের মত বা মাযহাবের অনুসরণ করেন এবং সহীহ হাদীসকে আমলের অযোগ্য বা তা শাফিঈ মাযহাবের অনুসারীদের জন্য প্রযোজ্য বলে পরিত্যাগ করেন। এভাবে তারা নিজ মাযহাবে প্রচলিত যাবতীয় আমলকেই নির্বিচারে ও অন্ধভাবে অনুসরণ করে থাকেন। যদিও মাযহাবের কিতাবাদির ব্যাখ্যা গ্রন্থে বা টীকা-টিপ্পনীতে অনেক সত্যানুরাগী আলেমগণ নিজ মাযহাবে প্রচলিত কিছু কিছু আমলের বিপরীতে অবস্থিত সহীহ হাদীসসমূহের উপর আমল করাকেই সঠিক বলে মত প্রকাশ করেছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লামা সুন'উল্লাহিল হালাবী আল-হানাফী (মৃত ১০৫০হিঃ) তাঁর 'আল-কাউলুস সদীদ ফী মাসাইলিত তাকলীদ' নামক রিসালায় বলেন:
"لا علينا أن لا نأخذ بما ظهر لنا صواب خلافه إذ أنعم الله علينا بحصول ضرب من النظر ، يمكن الوقوف به على الصواب ، هذا ونحن مع ذلك لا نخرج عن درجة التقليد لإمامنا الأعظم أبي حنيفة المقدم"
“নিজ ইমামের মতের বিপরীত কোনো সঠিক বিষয় আমাদের নিকট প্রমাণিত হলে তা গ্রহণ করাতে আমাদের কোনো দোষ নেই কারণ, আল্লাহ আমাদেরকে কিছু চিন্তা-ভাবনা করার নেয়ামত দান করেছেন, যদদ্বারা আমাদের পক্ষেও সত্য উপলব্ধি করা সম্ভব। ইমামের মতের বিপরীতে সঠিক কথা গ্রহণ করলেও এতে আমরা আমাদের অগ্রবর্তী ইমামে আ'যম আবু হানীফা (রহ.)-এর তাকলীদ করা থেকে মুক্ত হবো না।”
এমনকি তাঁরা সে সব হাদীসের উপর মাযহাবের অতীতের বহু মীষীগণের আমল থাকার কথাও অকপটে স্বীকার করেছেন। সহীহ হাদীস নিজ ইমামের ফতোয়ার বিপরীতে পাওয়া গেলে তা পরিত্যাগ করে হাদীসের উপর আমল না করলে নিজ ইমামকে নিজের প্রতিপালক বানিয়ে নেয়া হবে বলেও ক্বাযী মাওলানা সানাউল্লাহ পানিপথী হানাফী নিজ মাযহাবের অনুসারীদের সতর্ক করেছেন। নির্দিষ্ট কোনো এক মাযহাবের অন্ধ তাকলীদ ও একচ্ছত্র অনুসরণ করা জরুরী বলে কেউ কেউ মত পোষণ করে থাকলেও আসলে যাঁরা তা জরুরী নয় বলে মত দিয়েছেন, তাঁদের কথাই অধিক সঠিক।” হানাফী মাযহাবের উসূলে ফিকহের গ্রন্থ 'আত-তাহরীর' এর ব্যাখ্যা 'আত-তায়সীর' নামক গ্রন্থে বলা হয়েছে: "কেউ কেউ বলেছেন: সকল বিষয়ে নির্দিষ্ট এক মাযহাব অনুসরণ করা জরুরী নয়। তাঁদের কথাই অধিক সঠিক; কেননা, আল্লাহ তা'আলা যা ওয়াজিব করেছেন তা ব্যতীত ওয়াজিব বলতে আর কিছু নেই।” যারা নির্দিষ্ট মাযহাবের নির্বিচারে অনুসরণ করার কথা বলেন এবং কেউ নিজ ইমামের মাযহাব ত্যাগ করলে তাকে শাস্তি দেয়ার কথা বলেন, তাদের ব্যাপারে মাওলানা আব্দুল হাই লক্ষ্ণৌভী হানাফী বলেন:
"والحق أنه تعصب لا دليل عليه أصلا . وإنما هو تشريع من عند نفسه"
"সঠিক কথা হচ্ছে- নির্দিষ্ট কোনো মাযহাবের অনুসরণ করা একটি গোঁড়ামি বিশেষ। প্রকৃতপক্ষে এর যথার্থতার কোনো দলীল নেই। এটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বানানো শরী'আত বৈ আর কিছুই নয়।”

টিকাঃ
120. আল-কুরআন, সূরা আ'রাফ: ৩।
121. দেখুন: মাওলানা আবুল হাসানাত আব্দুল হাই হানাফী, ফাতাওয়া আব্দুল হাই; (মাকতাবাহ থানবী: দেওবন্দ, ১ম সংস্করণ, ১৯৮৯ খ্রি.), পৃ. ১৫৭।
122. তিনি তাঁর তাফছীরে মাযহারী গ্রন্থে وَ لَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِّنْ دُوْنِ الله "আমরা আল্লাহকে ব্যতীত পরস্পরকে অসংখ্য রব বানিয়ে না নেই” এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন:
ومن هنا يظهر أنه إذا صح عند أحد حديث مرفوع من النبي صلى الله علية وسلم سالما من المعارضة، ولم يظهر له ناسخ و كان فتوى أبي حنيفة رحمه الله مثلا خلافه، وقد ذهب على وفق الحديث أحد من الأئمة الأربعة، يجب عليه اتباع الحديث الثابت، ولا يمنعه الجمود على مذهبه من ذلك ، لئلا يلزم اتخاذ بعضنا بعضا أربابا من دون الله অর্থাৎ এ আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, যখন কারো নিকট কোনো প্রকার বিরোধ ছাড়াই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এমন কোনো মারফু' হাদীস প্রমাণিত হয়, যা মানসূখ হয়ে গেছে বলে তার নিকট কোনো প্রমাণ থাকে না থাকে, কিন্তু ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর কোনো ফতোয়া উদাহরণত সে হাদীসের বিপরীত প্রমাণিত হয়, আর চার ইমামের কোনো ইমাম এ হাদীসটি গ্রহণ করে থাকেন। তবে উক্ত প্রমাণিত হাদীসের অনুসরণ করা সে ব্যক্তির উপর ওয়াজিব হয়ে যাবে। তার মাযহাবকে কঠিনভাবে অনুসরণ করা যেন তাকে এ হাদীসের উপর আমল করা থেকে বিরত না রাখে। কেননা; এতে পরস্পরকে অসংখ্য রব বানানোর শামিল হবে।” দেখুন: মাওলানা সানাউল্লাহ পানিপতী, তাফসীরে মাযহারী; (এদারাতু এশা'আতিল ইসলাম : দিল্লী, সংস্করণ ও সন বিহীন), ২/৬৩-৬৪।
123. যেমন ইবনে আবিদীন তাঁর হাশিয়াতু রদ্দিল মুহতার গ্রন্থে বলেছেন :
أنه لو التزم مذهبا معينا كأبي حنيفة والشافعي، فقيل: يلزمه، وقيل : لا، وهو الأصح. "কেউ যদি ইমাম আবু হানীফা অথবা ইমাম শাফি'ঈ এর মাযহাব অনুসরণ করে, তা হলে সে ব্যক্তির উপর সকল ক্ষেত্রে সে মাযহাবই অনুসরণ করা কি জরুরী হয়ে যাবে? কারো কারো মতে তা জরুরী হয়ে যাবে, আবার কারো কারো মতে তা জরুরী হবে না এবং জরুরী না হওয়ার মতই অধিক সঠিক।” তদেব; পৃ.১৪৪; অন্ধ তাকলিদের সমালোচনা করতে গিয়ে শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী বলেন :
وفيمن لا يجوز أن يستفتي الحنفي مثلا فقيها شافعيا و بالعكس، ولا يجوز أن يقتدي الحنفي بإمام شافعي مثلا فإن هذا قد خالف إجماع القرون الأولى و ناقض الصحابة والتابعين .
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যিনি কোনো হানাফী ব্যক্তিকে কোনো শাফিঈ ফকীহ এর নিকট এবং কোন শাফিঈ ব্যাক্তিকে কোনো হানাফী ফকীহ এর নিকট ফতোয়া জিজ্ঞাসা করাকে জায়েয মনে না করেন, কোনো হানাফীকে কোনো শাফিঈ মাযহাবের অনুসারী ইমামের পিছনে নামায পড়াকে জায়েয মনে না করেন, তিনি উম্মতের প্রথম যুগে অনুষ্ঠিত ইজমা' এর বিরুদ্ধাচরণ করে থাকবেন এবং সাহাবা ও তাবেঈনদের অনুসৃত রীতির বিরোধিতা করবেন। দেখুন: শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ; ১/১৫৪-১৫৬।
124. আবুল হাসানাত আব্দুল হাই আল-লক্ষ্ণৌভী আল-হানাফী, প্রাগুক্ত; পৃ. ১৫০।
125. আবুল হাসানাত আব্দুল হাই লক্ষ্ণৌভী আল-হানাফী, প্রাগুক্ত; পৃ. ১৫০।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 নির্দিষ্ট করে এক মাযহাব অনুসরণের সম্ভাব্য স্থান

📄 নির্দিষ্ট করে এক মাযহাব অনুসরণের সম্ভাব্য স্থান


কোথাও যদি এমন কোনো স্থান পাওয়া যায় যেখানে একটি মাত্র মাযহাবের প্রচলন থাকে, আর অপর মাযহাবসমূহে কী রয়েছে তা অবগত হওয়ার ব্যাপারে সেখানকার আলেম বা সাধারণ মানুষদের কোনো সুযোগ না থাকে, তা হলে সে স্থানের লোকদের উপর নিজ এলাকায় প্রচলিত মাযহাবের অনুসরণ করাই জরুরী হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু সেখানে যদি অন্য মাযহাবের প্রচলন কমবেশী থাকে, বা অন্য মাযহাব সম্পর্কে জানার সুযোগ থাকে, তা হলে তা জরুরী হবে না। এ-সম্পর্কে শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী বলেন:
"একজন মানুষ যদি ভারত অথবা ফুরাত নদীর ওপারের (মধ্য এশিয়ার) দেশসমূহে বসবাস করে, সেখানে কোনো শাফিঈ, মালিকী ও হাম্বলী মাযহাবের কোনো অনুসারী না থাকে, এ সব মাযহাবের কোনো কিতাবাদিও সেখানে না থাকে, তা হলে সে লোকের উপর ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মাযহাব অনুসরণ করা ওয়াজিব হবে এবং ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মাযহাব থেকে তার বের হওয়া হারাম হবে; পক্ষান্তরে সে লোকটি যদি মক্কা ও মদিনার দেশে থাকে তা হলে তার উপর ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মাযহাবের তাকলীদ করা ওয়াজিব হবে না। কেননা, সেখানে সকল মাযহাব সম্পর্কে অবহিত হওয়া সহজ।"
শাহ ওয়ালী উল্লাহ (রহ.) যে সময়ে এ কথাগুলো বলেছেন তখন উপর্যুক্ত অঞ্চলের অবস্থা এরকমই ছিল। এখানে যেমন হানাফী মাযহাব ব্যতীত অপর কোনো মাযহাবের প্রচলন ছিল না, তেমনি সেখানে থেকে মাযহাব সম্পর্কে জানারও কোনো সুযোগ ছিল না। তাই তখনকার মানুষের জন্য এককভাবে হানাফী মাযহাব অনুসরণ করা ছাড়া কোনো উপায়ান্তর ছিল না। তবে আল্লাহর রহমতে বর্তমানে অবস্থার যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে ইন্টারনেট সুবিধার মাধ্যমে বিশ্ব এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। হাদীস ও অন্যান্য মাযহাব সম্পর্কে জানার কোনো সুযোগই এখন আর আমাদের নাগালের বাইরে নয়। ইচ্ছা করলেই যেমন আমরা পবিত্র মক্কা ও মদীনায় যেতে পারি, তেমনি দেশে বসেই ইন্টারনেটের মাধ্যমে হাদীসের গ্রন্থ সমূহ এবং অন্য মাযহাবের কিতাবাদির কোথায় কী আছে তাও দেখে নিতে পারছি। এ-ছাড়া হাদীসের গ্রন্থসমূহ এবং অন্য মাযহাবের কিতাবাদি বর্তমানে আমাদের দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে বিদ্যমান থাকায় প্রয়োজনে আমরা যখন ইচ্ছা তা দেখে নিতে পারি। এক কথায় মতবিরোধপূর্ণ বিষয়াদিতে কার দলীল অধিক সঠিক ও যুক্তিযুক্ত তা বিচার বিশ্লেষণ করে দেখে নেয়া এখন খুবই সহজ। ইচ্ছা করলেই তা করা যায়। তাই আমাদের দেশের আলেমগণের পূর্বের ন্যায় নিজ মাযহাবের যাবতীয় বিষয়াদি অন্ধভাবে মেনে চলার কোনই সুযোগ নেই; কেননা, এমনটি করা চোখ থাকতে অন্ধ হওয়ার শামিল।

টিকাঃ
126. এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন: " فإذا كان إنسان جاهل في بلاد الهند و ما وراء النهر و ليس هناك عالم شافعي ولا مالكي و لا حنبلي ولا كتاب من كتب هذه المذاهب وجب عليه أن يقلد بمذهب أبي حنيفة ويحرم عليه أن يخرج من مذهبه.... بخلاف ما إذا كان في الحرمين فإنه يتيسر له هناك معرفة جميع المذاهب."
দেখুন: শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী, আল-ইনসাফ ফী মাসাইলিল খিলাফ; (দিল্লী: মাত্ববা' মুজতবাঈ, ১৯৩৫ইং), পৃ. ৭০; মাওলানা আবুল হাসানাত আব্দুল হাই, প্রাগুক্ত; পৃ. ১৫১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00