📄 গায়রুল্লাহের নামে পশু যবাই করা
আমরা ইতোপূর্বে আলোচনা করে এসেছি যে, পশু যবাই তা কোনো মানতের হোক আর না হোক সর্বাবস্থায় তা যবাই করার সময় 'বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার' বলে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে তা যবাই করা হচ্ছে তাঁর একটি বিশেষ উপাসনা। এতে যেমন আল্লাহর তাওহীদ ঘোষিত হয় তেমনি এর দ্বারা তাঁর মর্যাদা সমুন্নত হয়। কিন্তু এক্ষেত্রেও আমাদের দেশে ব্যতিক্রম হয়ে থাকে। বিভিন্ন কবরে যারা মানত বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে পশু নিয়ে যায়, সেখানে তা যবাই করার সময় অনেকে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করার বদলে পীর বা পীরের দরগার নাম উচ্চারণ করে থাকে। একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা মতে ফরিদপুর জেলার বিশ্ব জাকের মঞ্জিলে এমনি ধরনের কর্ম হয়ে থাকে। সেখানে গরু যবাই করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণের পরিবর্তে ‘জয় বিশ্ব জাকের মঞ্জিল’ বলে তা যবাই করা হয়। অথচ এ ধরনের যবাই যে কুরআনে বর্ণিত (وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ) “আর যা গায়রুল্লাহের নামে উৎসর্গকৃত হয়” এ আয়াতের মর্মানুযায়ী গায়রুল্লাহের নামে উৎসর্গ করা হয়ে থাকে এবং সে অনুযায়ী এ ধরনের যবাইকৃত গরুর মাংস খাওয়া সন্দেহাতীতভাবে হারাম হয়ে যায়।
টিকাঃ
117. আল-কুরআন; সূরা আল-মায়িদাহ : ৩।
📄 আল্লাহর ভালবাসার ন্যায় নিজের পীরকে ভালবাসা
আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ভালবাসার অর্থ হচ্ছে- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক বর্ণিত ও প্রদর্শিত আল্লাহ তা'আলার শরী'আতকে আন্তরিকতা ও আগ্রহের সাথে সাধ্যানুযায়ী পালন করা। শরী'আতের আদেশ ও নিষেধসমূহকে নিজের পছন্দ ও অপছন্দের উপরে স্থান দেয়া। আল্লাহর হুকুম পালন করে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য প্রয়োজনে নির্দ্বিধায় নিজের প্রাণ বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত থাকা। শরী'আতের এ-জাতীয় নিঃশর্ত অনুসরণ ও আনুগত্য করাকেই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসা বলা হয়।
এ জাতীয় ভালবাসা আল্লাহর এক ধরনের উপাসনা। যা তিনি ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতায় অন্য কারো আদেশ বা নিষেধ পালনের ক্ষেত্রে প্রকাশ করা শির্ক। আমাদের দেশে পীর ও কবর ভক্ত এমন অনেক মানুষ রয়েছে যাদেরকে শরী'আত বিহীন তরীকত ও মা'রিফাত নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। তারা তাদের পীরের নির্দেশে শরী'আতের বিধি-বিধান পালন করা থেকে বিরত থাকে এবং পীরের নির্দেশকে শরী'আতের নির্দেশের উপরে ভালবেসে থাকে। আমার জানা মতে সমাজে এমন লোকও রয়েছে যারা নিজের পীরের ভালবাসার আতিশয্যে পীরের হাতে অন্যায়ভাবে নিজের জীবনটুকুও বিলিয়ে দিয়েছে। শরী'আতের বিধি-বিধান পালন না করে এভাবে তাদের পীর বা কোনো কবরের ওলিকে ভালবাসার মাধ্যমে যারা আখেরাতে নাজাত পেতে চায়, তারা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের চেয়ে তাদের পীর বা ওলিকেই অধিক ভালবেসে থাকে। আর এভাবেই তারা আল্লাহর নিঃশর্ত ভালবাসার ক্ষেত্রে নিজেরদের পীর বা ওলিকে শরীক করে থাকে। এদের ব্যাপারেই মহান আল্লাহ বলেছেনঃ
﴿ وَمِنَ النَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ اللَّهِ أَندَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ ﴾ [البقرة: [١٦٥]
“মানুষের মাঝে এমনও কিছু লোক রয়েছে যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে (তাঁর উলুহিয়্যাতের ক্ষেত্রে) অসংখ্য সমকক্ষ নির্ধারণ করে, তাদেরকে আল্লাহর ন্যায় ভালবাসে।”
তারা যে তাদের পীর বা ওলিকে আল্লাহর চেয়ে অধিক ভালবাসে এর জ্বলন্ত প্রমাণ হলো- যে সেজদার মাধ্যমে আল্লাহর ভালবাসা ও তাঁর সম্মান প্রদর্শিত হয়, তারা তা আল্লাহকে না করে তাদের পীর ও ওলিদেরকে করে থাকে।
টিকাঃ
118. আল-কুরআন, সূরা বাক্বারাহ : ১৬৫।
📄 অন্তরে পীর ও ওলিদের অনিষ্টের গোপন ভয় করা
শত্রুর ষড়যন্ত্র, সাপের দংশন ও হিংস্র জীব-জন্তু ইত্যাদির আক্রমণের ভয় করাকে মানুষের স্বভাবসুলভ ভয় বলা হয়। এ জাতীয় ভয় থেকে সাধারণ মানুষ কেন স্বয়ং নবীগণও মুক্ত থাকতে পারেন না।
তাই শর'য়ী দৃষ্টিতে এমন ভয় কোনো দূষণীয় ব্যাপার নয়। তবে কোনো মানুষের প্রতি তিনি শত্রু আর মিত্র যা-ই হোন না কেন এমন ভয় করা যাবে না যে, তিনি বাস্তব কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা ছাড়াই কারো অনিষ্টের ইচ্ছা করলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অনিষ্ট করতে পারেন; কেননা আমাদের অন্তরে এ জাতীয় ভয় কেবল আল্লাহ ব্যতীত আর কারো জন্যে থাকতে পারে না।
কিন্তু আমাদের দেশে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন যারা ওলীদের ব্যাপারে এমন গোপন ভয় করে থাকেন। যেমন সিলেট জেলায় অবস্থিত শাহ পরান ওলির ব্যাপারে সাধারণ জনমনে এমন ধারণা রয়েছে যে, তিনি খুবই গরম, তাঁর কবরে কেউ বেআ'দবী করলে তিনি সে ব্যক্তির যে কোনো অনিষ্ট করতে পারেন। অনুরূপভাবে দিনাজপুর জেলার 'চেহেলগাজী' কবরের ব্যাপারে সে এলাকায় এমন ধারণা রয়েছে যে, সেখানে কেউ বেআদবী করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যে কোনো মুহূর্তে কোনো দুর্ঘটনায় পতিত হতে পারে।
বেআদবী হলে বিপদের আশংঙ্কায় সাধারণ যিয়ারতকারীরা সেখানে যিয়ারত শেষে মুখ সামনে রেখে পিছু হেঁটে বের হয়। গাড়ী চালকেরা দুর্ঘটনার হাত থেকে বাঁচার জন্য কবরের নিকটে গাড়ী নিয়ে আসলে গাড়ীর গতি কমিয়ে নেয়। এ ছাড়াও অনেকে কোনো কবরে গেলে কবরের নিকটস্থ গাছের ডাল ও পাতা কাটতে ও ছিঁড়তে অন্তরে গোপন একটি ভয় অনুভব করে। এ জাতীয় ভয় করা শির্ক। আরবের মুশরিকদের মধ্যে তাদের দেবতাদের ব্যাপারে এ জাতীয় গোপন ভয় বিদ্যমান ছিল। সে জন্য তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তাদের দেবতাদের অনিষ্টের গোপন ভয় প্রদর্শন করতো। যার প্রমাণ প্রথম অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে।
টিকাঃ
119. গোলাম ছাকলায়েন, প্রাগুক্ত; পৃ.৪৮।
📄 আল্লাহ ব্যতীত অন্যের উপর ভরসা করা
ইহ-পরকালীন যে কোনো বিষয় অর্জিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত কর্ম করার পর তা অর্জিত হওয়ার জন্য আল্লাহর উপর ভরসা করা হচ্ছে অন্তরের একটি অন্যতম উপাসনা। কোনো কর্ম করা বা উদ্দেশ্য অর্জিত হওয়ার ক্ষেত্রে মানুষ মানুষের সাহায্যকারী হতে পারে। তবে কোনো অবস্থাতেই কেউ কারো ভরসা হতে পারে না, কেননা কোনো কাজ আরম্ভ করা এবং সফলভাবে তা সম্পন্ন করা সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। কোনো মানুষ কাউকে সাহায্যের জন্য ইচ্ছা করলে তার ইচ্ছা ও কর্ম বাস্তবে কেবল তখনই রূপ নিতে পারে যখন এর সাথে আল্লাহর ইচ্ছার সংমিশ্রণ ঘটে, অন্যথায় নয়। তাই আল্লাহই হলেন আমাদের যাবতীয় কর্মের একক ভরসা। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোনো কোন কর্মের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষদের মুখে এমন কথা বলতে শুনা যায় যে, 'একাজে আপনিই আমার একমাত্র ভরসা', 'আপনার উপর আমি ভরসা করেছি', আবার অনেককে আখেরাতে মুক্তির জন্য সঠিক ঈমান ও সৎকর্ম করে আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা না করে ওলি ও পীরদের শাফা'আতের উপর ভরসা করতে দেখা যায়।