📘 শিরক কি ও কেন > 📄 আল্লাহর এবাদতের জন্য কবরের পার্শ্বে ই'তিকাফ বা অবস্থান করা

📄 আল্লাহর এবাদতের জন্য কবরের পার্শ্বে ই'তিকাফ বা অবস্থান করা


ই'তিকাফ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে কোনো উদ্দেশ্যে কোথাও অবস্থান গ্রহণ করা। শর'য়ী পরিভাষায় আল্লাহর উপাসনার উদ্দেশ্যে দশ দিন বা এর কম-বেশী সময়ের জন্য কোনো মসজিদে অবস্থান গ্রহণ করাকে ই'তিকাফ বলা হয়। এটি আল্লাহর একটি বিশেষ ধরনের উপাসনা। যা মসজিদেই কেবল করা সম্ভব। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন:
﴿ وَطَهِّرْ بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْقَابِمِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ ﴾ [الحج: ٢٦]
"তুমি আমার গৃহ (মাসজিদুল হারাম)-কে ত্বাওয়াফকারী, অবস্থান তথা ই'তিকাফকারী, রূকু' ও সেজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখ।"
কোনো কবর বা দরবার যেহেতু মসজিদ নয়, সুতরাং আল্লাহর উপাসনার জন্য সেখানে অবস্থান গ্রহণ করা জায়েয নয়। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে এমনটি করলে তা বেদ'আতী কর্ম হিসেবে গণ্য হবে। কেউ যদি কোনো কবরে অবস্থানের দ্বারা কবরস্থ ওলির দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাঁর মাধ্যমে আল্লাহর নিকটবর্তী হতে চায়, তা হলে তার এ অবস্থান শির্কী কর্ম হিসেবে গণ্য হবে; কেননা যুগে যুগে মুশরিকরা তাদের দেবতাদের পার্শ্বে এ জাতীয় উদ্দেশ্যেই অবস্থান গ্রহণ করতো। এর প্রমাণ আমরা প্রথম অধ্যায়ে দিয়ে এসেছি। তাওহীদকে যথাযথভাবে অনুধাবন করে থাকলে কোনো মু'মিনের পক্ষে এ ধরনের কর্ম করা কখনও সম্ভব হতে পারে না। তবে আমাদের দেশের অনেক মুসলিমকে এ-ধরনের কর্ম করতে দেখা যায়। শাহজালাল (রহ.) বা হাইকোর্টে অবস্থিত শরফুদ্দিন চিন্তি বেহেশতী (রহ.)-এর কবরে গেলে অসংখ্য লোককে এ জাতীয় কর্ম করতে দেখা যায়। এমনকি কোনো কোনো কবরে যিয়ারতের সময় কিভাবে, কতদূরে বসতে হবে, তাও বোর্ডে লিখিত দেখতে পাওয়া যায়।

টিকাঃ
113. আল-কুরআন, সূরা বাক্বারাহ: ১২৫।
114. ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম তাঁর জাতির মুশরিকদের লক্ষ্য করে বলেন, ﴿مَا هَذِهِ التَّمَاثِيلُ الَّتِي أَنتُمْ لَهَا عَاكِفُونَ ﴾ [الانبياء: ٥২] "এ মূর্তিগুলো কি যে তোমরা এর পার্শ্বে অবস্থান গ্রহণ করছো।" সূরা ত্বা-হা: ৯১। মুসা আলাইহিস সালাম-এর জাতির মুশরিকরা গরু পূজা করা উপলক্ষ্যে বলেছিল: ﴿قَالُوا لَن تَبْرَحَ عَلَيْهِ عَكِفِينَ حَتَّى يَرْجِعَ إِلَيْنَا مُوسَى ﴾ [طه: ۹১] "মুসা আলাইহিস সালাম ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা এর পার্শ্বে অবস্থান করেই যাব।” সূরা আম্বিয়া: ৫২।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 কবরের চার পার্শ্বে প্রদক্ষিণ বা ত্বওয়াফ করা

📄 কবরের চার পার্শ্বে প্রদক্ষিণ বা ত্বওয়াফ করা


আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে হজ্জ এবং 'উমরা পালনের সময় ছাড়াও বছরের অন্যান্য সময়েও কেবলমাত্র মসজিদুল হারামের চার পার্শ্বে ত্বওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করার অনুমতি দিয়েছেন। এ কাজটি তাঁর সম্মান ও তা'যীম প্রকাশের একটি বিশেষ মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে বলেছেন:
﴿وَلْيَطَّوَّفُوا بِالْبَيْتِ الْعَتِيقِ﴾ [الحج: ٢٩]
"তোমরা সম্মানিত গৃহ অর্থাৎ কা'বা শরীফের চার পার্শ্বে ত্বওয়াফ কর।"
ত্বওয়াফের এ উপাসনাটি কা'বা শরীফের সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়ার ফলে তা কোনো কবরে করা বৈধ হওয়া তো দূরের কথা, অপর কোনো মসজিদের চার পাশে করারও কোনো অনুমতি নেই। কেউ যদি আল্লাহর উপাসনার উদ্দেশ্যে তা কোনো মসজিদে করে তবে তা বেদ'আত হিসেবে গণ্য হবে। আর যদি কোনো ওলির কবরে করে, তবে তা শির্কী কর্ম হিসেবে গণ্য হবে। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষদেরকে বিভিন্ন সময়ে ওলীদের কবরে এ ধরনের কর্ম করতে দেখা যায়। বিশেষ করে তথাকথিত শবে বরাতের সময় হাইকোর্ট কবরে এ ধরনের কর্ম অত্যন্ত বেশী হয়ে থাকে।

টিকাঃ
115. আল-কুরআন, সূরা হজ্জ: ২৯।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 কবরকে সামনে রেখে রুকু' ও সেজদা করা

📄 কবরকে সামনে রেখে রুকু' ও সেজদা করা


রূকু' ও সেজদার মাধ্যমে আমাদের ভক্তি ও সম্মান লাভের একক অধিকারী হলেন মহান আল্লাহ। মানুষ কোনো মানুষকে এভাবে সম্মান করলে এটি একটি প্রত্যক্ষ শির্কী কর্ম হিসেবে গণ্য হবে। অনুসরণীয় ব্যক্তিবর্গের সম্মানের শর'য়ী পন্থা হচ্ছে-তাঁদের আগমনের সংবাদ পেলে তাঁদেরকে এগিয়ে নিয়ে আসা, বা আসতে দেখলে এগিয়ে যেয়ে সালাম, মুসাফাহা ও আলিঙ্গন করা, কপালে ও হাতে চুমু দেওয়া। সাধ্যানুযায়ী আদর ও আপ্যায়ন করা। তাঁদের বিদায়ের সময় তাঁদেরকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ও সম্মানের সাথে বিদায় করা। কিন্তু ওলি ও পীরদের ভক্তগণ মানুষকে সম্মান প্রদর্শনের এ বৈধ পন্থা অতিক্রম করে অলিগণের কবরে সেজদা করে থাকেন এবং পীরদের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য তাদের পায়ে পড়ে সেজদা করে থাকেন; কেননা তাদের দৃষ্টিতে ওলি ও পীরদের মন জয় করাই হলো প্রকৃত কাজ। তা করতে পারলেই সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে! এ উদ্দেশ্যেই দেওয়ানবাগের পীরকে তার ভক্তরা সেজদা করে থাকে।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 কবর, কবর, দরবার ও মুকামে মানত করা

📄 কবর, কবর, দরবার ও মুকামে মানত করা


অসুখ-বিসুখ নিবারণ, কিছু প্রাপ্তি বা পার্থিব যে কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য আল্লাহর নামে কিছু প্রদান করার নিয়ত করাকে মানত বলা হয়। এর দ্বারা আল্লাহর সম্মান প্রদর্শিত হয় বিধায়, তা আল্লাহর একটি বিশেষ উপাসনা। মানতের মাধ্যমে মূলত নির্দিষ্ট কোনো ব্যাপারে তড়িৎ গতিতে আল্লাহর রহমত ও করুণা প্রাপ্তির আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। সে জন্য তা একনিষ্টভাবে আল্লাহর উদ্দেশ্যে হওয়ার জন্য পূর্বশর্ত হচ্ছে- যে স্থানে তা প্রদান করা হবে সে স্থানটি অবশ্যই যাবতীয় ধরনের শির্কী কর্মকাণ্ড থেকে এবং তা মুশরিকদের বার্ষিক মেলা, ঈদ বা ওরস পালন করা থেকে পবিত্র হতে হবে।
মানত দেওয়ার উপযুক্ত স্থান হচ্ছে- মসজিদ, মাদ্রাসা, অসহায় এতীম, বিধবা, ফকীর, মিসকীন, অভাবী ও সমাজ কল্যাণমূলক খেদমতের স্থানসমূহ। ওলিদের কবরে তিনটি কারণে কোনো মানত দেয়া বৈধ নয়:
প্রথমত:
মানতের উদ্দেশ্য হচ্ছে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দ্রুত আল্লাহর রহমত কামনা করা। মানতের উদ্দেশ্য যদি তা-ই হয়, তা হলে তা যেমন হতে হবে সরাসরি আল্লাহর কাছে, তেমনি তা হতে হবে এমন এক স্থানে যেখানে কেবল আল্লাহ ব্যতীত তাঁর কোনো সৃষ্টির কাছে কিছু কামনা করা হয় না। যারা ওলিদের কবরে মানত করে তারা সংশ্লিষ্ট উদ্দেশ্যটি হয় সরাসরি ওলিদের নিকটেই কামনা করে অথবা তাঁদের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে কামনা করে। যদি তাঁদের কাছে চেয়ে থাকে তা হলে তারা প্রকাশ্যই শির্ক করে। আর যদি তাঁদের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে চেয়ে থাকে, তা হলে তারা আল্লাহকে এই বলে অভিযুক্ত করে যে, তিনি তাঁর সাধারণ বান্দাদের অভাব ও অভিযোগের কথা অপর কোনো মাধ্যম ব্যতীত গ্রহণ করতে চান না। অথচ আল্লাহ তা'আলা এ-জাতীয় অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। পাপী-তাপী নির্বিশেষে সকলের জন্যেই তাঁর দরজা উন্মুক্ত। কোনো মৃত ওলি ও দরবেশদেরকে তাঁর এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে মধ্যস্থতা করার জন্য তিনি নিযুক্ত করেন নি। এটি মূর্খ ও ভণ্ডপীর এবং সাধারণ মানুষদের একটি সাজানো কল্পকথা বৈ আর কিছুই নয়। ওলিদের কবরে মানত করলে যেখানে এতো কথা রয়েছে, সেখানে মানত করা কি করে বৈধ হতে পারে।
দ্বিতীয়ত:
কবর বা কবরে মানতকারীর উদ্দেশ্য যদি সঠিকও হয়, তিনি যদি তার উদ্দেশ্যের কথা সরাসরি আল্লাহর কাছেই আবদার করে থাকেন, তবুও কোনো কবর বা কবরে মানত করা বৈধ নয়; কেননা, কবর বা কবরে মানতকারী সাধারণ ও মূর্খ লোকেরা উপর্যুক্ত এ অভিযোগদ্বয় থেকে মুক্ত নয়। আর যাহ্হাক রহ. এর হাদীস অনুযায়ী যেখানে শির্ক হয় সেখানে কোনো মানত করা বা করে থাকলেও সেখানে তা পূর্ণ করা বৈধ নয়।
তৃতীয়ত:
ওলিদের কবরে বার্ষিক যে ওরস পালিত হয়, তা আরবের মুশরিকদের বার্ষিক সে ঈদেরই সমতুল্য, যা তারা বছরান্তে পালন করতো। এ জাতীয় ঈদ পালন শরী'আতে নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কবরকে এ জাতীয় ঈদ পালনের স্থান বানাতে তাঁর সাহাবীদের তথা আমাদের নিষেধ করেছেন, যার প্রমাণ প্রথম অধ্যায়ে প্রদত্ত হয়েছে। এমতাবস্থায় কোনো ওলির কবরে মানত দেয়া কোনো অবস্থাতেই বৈধ নয়। দিলেও তা সেখানে পূর্ণ করা জায়েয নয়। তা সত্ত্বেও দেশের সাধারণ মুসলিমরা ওলিদের কবর এমনকি তাঁদের স্মৃতি বিজড়িত কবর ও মুকাম তথা অবস্থানসমূহে মানত দিয়ে থাকে। সরাসরি আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে তা পাওয়া যায় কি না, এ সন্দেহে তারা যে-সব স্থানে মানত দেয়া বৈধ, সেখানে মানত না দিয়ে ওলিদের কাছে অথবা তাঁদের মধ্যস্থতায় চাওয়ার জন্য তাঁদের কবরে মানত দিয়ে থাকে। معاذ الله

টিকাঃ
116. এ সম্পর্কে দাহ্হাক রহ. থেকে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে, যা প্রথম অধ্যায়ে মানত সম্পর্কিত আলোচনায় বর্ণিত হয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00