📄 আল্লাহ তা'আলার নামের জিকরের সাথে বা এককভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামের জিকর করা
আমরা প্রথম অধ্যায়ে এ-কথা আলোচনা করে দেখিয়েছি যে, আরবের মুশরিকরা মহান আল্লাহকে এ মহাজগতের সৃষ্টিকর্তা, জীবিকা দানকারী, জীবন ও মৃত্যুদাতা এবং পরিচালক বলে স্বীকৃতি দিত। এ স্বীকৃতির পাশাপাশি তারা বিভিন্নভাবে আল্লাহর উপাসনাও করতো। সে-জন্য তারা নিজেদেরকে দ্বীনে ইব্রাহীমের অনুসারী বলেও দাবী করতো। তবে সৃষ্টি, রেযেক, জীবন ও মৃত্যুর ব্যাপারে তারা যেভাবে আল্লাহর তাওহীদে বিশ্বাসী ছিল, উপাসনার ক্ষেত্রে তারা সেরকম বিশ্বাসী ছিল না। তারা বাহ্যিক কিছু উপাসনাদি বিশেষভাবে আল্লাহর জন্যে করলেও শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে অন্তরের সাথে সম্পর্কিত আল্লাহর উপাসনাদিতে আল্লাহর সাথে অতীতের কিছু ওলিদের নামে নির্মিত মূর্তি এবং ফেরেশতাদের উদ্দেশ্য করে নির্মিত কিছু গাছ ও পাথরের প্রতিমা ও দেবীদেরকে শরীক করে নিয়েছিল। আমাদের দেশের মুসলিমদের আউলিয়া কেন্দ্রিক যে বিশ্বাস ও তাঁদের কবর কেন্দ্রিক যে সব কর্ম রয়েছে, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, তাদের অনেকেই আল্লাহর উপাসনায় ওলিগণ কে শরীক করে নিয়েছেন। এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে তারা আরবের মুশরিকদেরকেও অতিক্রম করে গেছেন। নিম্নে তাদের কতিপয় শির্কী কর্মের উদাহরণ বর্ণিত হলো:
1. আল্লাহ তা'আলার নামের যিকরের সাথে বা এককভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামের যিকর করা :
এ কথা সর্বজন বিদিত যে, ইয়া আল্লাহ, ইয়া রহমানু ইত্যাদি বলে মুখে জপ করাকে আল্লাহর যিকির ও তাঁর উপাসনা বলা হয়। এ জাতীয় যিকির কেবল তাঁর নাম ও গুণাবলী ব্যতীত অপর কারো নাম নিয়ে করা শির্কের অন্তর্গত। কিন্তু আমাদের দেশের অনেক যিকিরকারীকে 'ইয়া আল্লাহু' বলে যিকির করার পাশাপাশি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ভালবাসার আতিশয্যে 'ইয়া রাহমাতুল্লিল আলামীন' বলে তাঁর নামেও যিকির করতে দেখা যায়। অনেককে আবার 'ইয়া রাসূলাল্লাহ' বা 'নূরে রাসূল নূরে খোদা' বলেও যিকির করতে দেখা যায়। এ জাতীয় যিকির করার প্রচলন কুমিল্লা জেলার কোতয়ালী উপজেলার মুহাম্মদ আলী দরবেশের ভক্তদের মধ্যে রয়েছে। অনুরূপভাবে 'হক বাবা হক বাবা' বলেও কোনো কোনো কবরের ভক্তদেরকে তাদের পীর সাহেবের নামে জিকির করার প্রচলন রয়েছে।
টিকাঃ
105. যদিও শুধু আল্লাহ বা শুধু রাহমান অথবা শুধু রাহীম নামের যিকির কুরআন ও হাদীস দ্বারা সমর্থিত নয়। অবশ্যই সাথে থাকতে হবে কি জন্য তাঁকে ডাকা হচ্ছে সেটার উল্লেখ। [সম্পাদক]
📄 কবরমুখী হয়ে বা কবরের পার্শ্বে নামায আদায় করা
আল্লাহর উপাসনাকে শির্কমুক্ত রাখার জন্য কবরমুখী হয়ে বা কবরের পার্শ্বে নামায আদায় করা থেকে নিষেধ করে দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
لَا تُصَلُّوا إِلَى الْقُبُورِ»
“তোমরা কবরের দিকে মুখ করে সালাত আদায় করবে না।”
যদি কেউ তা করে তবে তার এ সালাত দ্বারা আল্লাহর তা'যীম আদায় না হয়ে কবরবাসীরই তা'যীম প্রকাশিত হয়ে থাকবে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোনো কোনো কবরের ভক্তদের মধ্যে এমনটি করার প্রচলন রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ শরীয়তপুর জেলার 'শুরেশ্বর' কবরের ভক্তদের কথাই বলা যায়। তাদের অনেকেই তাদের পীরের কবরকে ক্বিবলার মত গণ্য করে সে দিকে মুখ করে সালাত আদায় করে থাকে। কবরের পার্শ্বে কবরের তা'যীম করার উদ্দেশ্য ছাড়া সালাত আদায় করা হারাম, শির্ক নয়। তবে কেউ যদি কবরের তা'যীম করার উদ্দেশ্যে এর পার্শ্বে সালাত আদায় করে, তা হলে শির্ক হিসাবে গণ্য হবে। মুল্লা আলী ক্বারী হানাফী উপর্যুক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন:
ولو كان هذا التعظيم حقيقة للقبر و لصاحبه لكفر المعظم
"এ তা'যীম যদি কবর ও কবরস্থ ব্যক্তির জন্যে হয়ে থাকে, তা হলে তা'যীমকারী কাফের হয়ে যাবে।"
টিকাঃ
106. মুসলিম, প্রাগুক্ত; কিতাবুল জানাইয, ২/৬৬৮; নাসাঈ, প্রাগুক্ত; ২/৬২; আহমদ, প্রাগুক্ত; ৪/১৩৫।
107. মুল্লা আলী ক্বারী আল-হানাফী, আল-মিরক্কাত ফী শরহিল মিশকাত; ২/৩৭২।
📄 দ্রুত দো'আ কবুল হওয়ার আশায় মুরশিদ বা পীরের বৈঠকখানার দিকে মুখ করে দো'আ করা
মহান আল্লাহ বলেন:
﴿ فَأَيْنَمَا تُوَلُّوا فَثَمَّ وَجْهُ اللَّهِ ﴾ [البقرة: ١١٥]
"তোমরা যেদিকেই মুখ ফিরাওনা কেন সে দিকেই আল্লাহর দিক রয়েছে”
এ আয়াতের ভিত্তিতে যে কোনো দিকে মুখ করে আল্লাহকে ডাকা যেতে পারে। কিন্তু কেউ যদি আল্লাহর দিকে মুখ না করে দ্রুত দো'আ কবুলের জন্য তার মুরশিদ বা পীরের বৈঠকখানার দিকে মুখ করে, তা হলে এ উপাসনা আল্লাহর জন্য না হয়ে তার মুরশিদ বা পীরের জন্যেই হবে। এ জাতীয় কর্মের প্রচলন ফরিদপুর জেলার আটরশির বিশ্বজাকির মঞ্জিলের ভক্তদের মাঝে রয়েছে। অথচ আল্লাহর নিকট কিছু চাইতে হলে সরাসরি তা তাঁরই কাছে চাওয়ার নির্দেশ করে তিনি বলেছেন:
﴿ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ ﴾ [غافر: ٦٠]
"তোমরা আমাকে আহ্বান কর, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব"। আমরা যদি আল্লাহ- মুখী হয়ে তাঁর কাছে সরাসরি না চেয়ে অপর কোনো মৃত মানুষের মাধ্যমে তাঁর কাছে কিছু চাই, তা হলে এ চাওয়া আল্লাহর কাছে না হয়ে মধ্যস্থ সে ব্যক্তির কাছেই চাওয়া হিসেবে গণ্য হবে। কেননা; এ জাতীয় চাওয়া আল্লাহর নিকট সরাসরি চাওয়ার উপাসনায় তাঁর সাথে মধ্যস্থ ব্যক্তিকে শরীক করে নেয়া হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। আর এ জাতীয় উপাসনার ব্যাপারে হাদীসে কুদসীতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :
مَنْ عَمِلَ عَمَلاً وَأَشْرَكَ فِيهِ مَعِي غَيْرِي تَرَكْتُهُ وَ شِرْكَهُ وَجَعَلْتُ الْعَمَلَ لِلَّذِي أَشْرَكَهُ
“যে ব্যক্তি কোনো কাজে আমার সাথে অপর কাউকে শরীক করে, আমি তাকে ও তার কর্মকে ছেড়ে দেই এবং এ কাজে যাকে সে শরীক করেছে, তাকেই সে কাজটি দিয়ে দেই।”
টিকাঃ
108. আল-কুরআন, সূরা বাক্বারাঃ :১১৫।
109. আল-কুরআন, সূরা গাফির: ৬০।
110. মুসলিম, প্রাগুক্ত; কিতাবুয যুহদ, বাব নং: ৫, হাদীস নং ২৯৮৫; ৪/২২৮৯; আহমদ, প্রাগুক্ত; ২/২০১।
📄 ওলীদের নিকট কিছু কামনা করা
মানুষের জীবনে এমন অনেক প্রয়োজন রয়েছে যা একমাত্র আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অপর কেউ পূরণ করতে পারে না। সে সব প্রয়োজনের মধ্যে রয়েছে : সন্তান দান, রোগ মুক্তি, ব্যবসায় উন্নতি ইত্যাদি। এ জাতীয় বিষয় প্রাপ্তির জন্য প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত কর্ম ক'রে তা আল্লাহ তা'আলার কাছেই কামনা করতে হয়। কিন্তু অনেক কবর যিয়ারতকারী এ জাতীয় বিষয়াদিও অলিগণের নিকট কামনা করে থাকেন, যা সুস্পষ্ট শির্ক।