📘 শিরক কি ও কেন > 📄 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পেটে বাধা পাথরের দ্বারা উপকারে বিশ্বাস

📄 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পেটে বাধা পাথরের দ্বারা উপকারে বিশ্বাস


হাদীস এবং ইতিহাস দ্বারা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের সময় ক্ষুধা নিবারণের জন্য পেটে পাথর বেধেছিলেন। প্রয়োজন শেষে এ পাথর দু'টিকে তিনি কোথায় ফেলে দিয়েছিলেন, তাঁর কোনো সাহাবী তা সংরক্ষণ করেছিলেন কি না, এ সবের কোনো বর্ণনা কোনো হাদীস অথবা ইতিহাস কিংবা কোনো সীরাত গ্রন্থেও পাওয়া যায় না। অনুরূপভাবে আবু জেহেল একটি বড় পাথর দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাথায় আঘাত করে তাঁকে হত্যা করতে চেয়েছিল বলেও ইতিহাসের কিতাবাদিতে প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে আবু জেহেলের হাতে এ পাথর তখন কালিমা পাঠ করেছিল কি না এবং আবু জেহেল তা ফেলে দেয়ার পর কেউ তা সংরক্ষণ করেছিল কি না, এ সবেরও কোনো বর্ণনা কোনো কিতাবে পাওয়া যায় না। কেউ তা সংরক্ষণ করে থাকলেও যে পাথরটি আবু জেহেল একটি ঘৃণিত উদ্দেশ্যে তার হাতে নিয়েছিল, সে পাথর কোনো অবস্থাতেই কোনো মুবারক পাথর হতে পারে না। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে হক্কানী আঞ্জুমান নামে আজানগাছী পীরের একটি দরবার রয়েছে। সে দরবারে রয়েছে দু'টি পাথর। কুষ্টিয়া জেলার রাজারহাট বাজারের পশ্চিম পার্শ্বে এ দরবারের অনুসারীদের একটি মসজিদ রয়েছে। সে মসজিদের দেয়ালে উক্ত দরবারের একটি প্রচারপত্র ঝুলানো রয়েছে। তাতে এ পাথর দু'টির পরিচয় সম্পর্কে বলা হয়েছে:
'এ পাথর দু'টির একটি হচ্ছে আবু জেহেলের হাতে কালিমা পাঠকারী পাথর। আর অপরটি হচ্ছে সেই পাথর যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্ষুধার তাড়নায় তাঁর পেট মোবারকে বেঁধেছিলেন। এ পাথর দু'টি পীর পরম্পরায় মক্কা শরীফের দ্বীন মুহাম্মদ নামের এক মুআল্লিমের কাছে সংরক্ষিত ছিল। তিনি স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে তা আজানগাছী পীরকে দান করেছিলেন।'
আমাদের দেশেও এ পীরের ভক্তবৃন্দ রয়েছেন। তারা ঢাকাস্থ হাইকোর্টের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত শাহবাগ শাহী মসজিদে এবং বায়তুল মুকাররম মসজিদে প্রতি সপ্তাহের মঙ্গলবারে একত্রিত হন বলে এ প্রচার পত্রে লিখিত রয়েছে। এ পাথর দু'টি সংরক্ষিত হওয়ার ঐতিহাসিক কোনো ভিত্তি না থাকা সত্ত্বেও আজানগাছী পীর সাহেব এদু'টি পাথরকে সে মু'আল্লিমের হাত থেকে মহা মূল্যবান পাথর হিসেবে গ্রহণ করেন এবং কলিকাতার হক্কানী আঞ্জুমানে রেখে এর জন্য যিয়ারতের একটি বেদ'আত জারী করেন।
তিনি এ দু'টি পাথরকে বিভিন্ন মারাত্মক রোগ থেকে মুক্তি, বিপদাপদ দূরীকরণ ও রূহানী শক্তি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে মহা উপকারী বলে ঘোষণা দেন। বাজার থেকে লবঙ্গ ক্রয় করে এ পাথর দু'টির সাথে মিলিয়ে রাখলে এ লবঙ্গের মধ্যে পাথর দু'টি অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করে বলে তিনি ও তার ভক্তরা বিশ্বাস করতেন এবং এখনও এ বিশ্বাস করা হয়।
বিভিন্ন উদ্দেশ্যে আল্লাহর নাম নিয়ে এ লবঙ্গে ঘ্রাণ নিলে উপকার পাওয়া যায় বলেও তারা বিশ্বাস করেন। এভাবে তিনি ও তার ভক্তরা এ পাথর দু'টিকে আরবের মুশরিকদের 'যাতে আনওয়াতের' সমতুল্য করে নিয়েছেন। লবঙ্গে ঘ্রাণ নেওয়ার সময় আল্লাহর নাম নিয়ে থাকলেও পাথর দু'টির ব্যাপারে তা অলৌকিকভাবে উপকারী হওয়া এবং লবঙ্গে অস্বাভাবিকভাবে এর প্রভাব বিস্তার করার ধারণা পোষণ করার ফলে তারা শির্কে আকবার বা শির্কে আসগারে পতিত হচ্ছেন; কেননা, কোনো বস্তুর ব্যাপারে এ ধরনের উপকারী প্রভাব বিস্তারকারী হওয়ার ধারণা করা আল্লাহর রুবুবিয়‍্যাতে শির্ক করার শামিল।

টিকাঃ
100. আবু তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহ থেকে বর্ণিত, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ক্ষুধার কথা জানালাম। আমরা পেটের কাপড় সরিয়ে একটি করে পাথর দেখালাম। তখন তিনি কাপড় সরিয়ে দু'টি পাথর দেখালেন। দেখুন: সফিয়্যুর রহমান আল-মুবারকপুরী, প্রাগুক্ত; পৃ.৩০৪; ওয়ালী উদ্দিন, আল-খতীব, প্রাগুক্ত; ২/৪৪৮।
101. সফিয়্যুর রহমান আল-মুবারকপুরী, প্রাগুক্ত; পৃ. ৯৯।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 নিম্নজগতের উপর উর্ধ্বজগতের তারকারাজির প্রভাবে বিশ্বাস করা

📄 নিম্নজগতের উপর উর্ধ্বজগতের তারকারাজির প্রভাবে বিশ্বাস করা


তারকারাজি সৃষ্টির পিছনে মহান আল্লাহর কী উদ্দেশ্য রয়েছে, প্রথম অধ্যায়ে জ্ঞানগত শির্কের আলোচনা প্রসঙ্গে আমরা তা আলোচনা করেছি। এখানে যে কথাটি বলতে চাই তা হলো- নিম্ন জগতের উপর উর্ধ্বজগতের তারকা ও গ্রহের প্রভাবের এ ধরনের বিশ্বাস যে শুধু জ্যোতির্বিদ ও সাধারণ মানুষের মধ্যেই রয়েছে তা নয়, অনেক পীর ও দরবেশগণের মাঝেও এ-জাতীয় বিশ্বাস রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ চরমোনাই এর প্রথম পীর জনাব সৈয়দ মোহাম্মদ এছহাক (রহ.)-এর কথাই বলা যায়। তিনি মুরীদের প্রতি পীরের দৃষ্টির প্রভাবের কথা প্রমাণ করা প্রসঙ্গে বলেন:
“প্রত্যেকটি জমীনের ক্ষমতা আছে স্বর্ণ পয়দা করার, কিন্তু ঐ জমীনেই স্বর্ণ পয়দা হইবে যেই জমীনের প্রতি ঐ তারকার দৃষ্টি পড়িয়াছে, যেই তারকার দৃষ্টিতে স্বর্ণ পয়দা হয়।”
পীর সাহেবের উক্ত কথার দ্বারা সহজেই প্রমাণিত হয় যে, কোনো একটি তারকার প্রভাবে জমীনে স্বর্ণ সৃষ্টি হয় বলে তিনি বিশ্বাস করেন। অথচ এ বিষয়টি কোনোভাবেই শরী'আত স্বীকৃত নয়। যার প্রমাণ আমরা জ্ঞানগত শির্কের আলোচনা প্রসঙ্গে ইতোপূর্বে দিয়ে এসেছি। যারা এ জাতীয় বিশ্বাস পোষণ করে, তাদের ব্যাপারে ড. বরীকান বলেন:
“কেউ যদি মনে করে যে তারকা নিজেই কিছু পরিবর্তন করে বা নিজেই কোনো কিছুর উপরে প্রভাব বিস্তার করে অথবা মনে করে যে, তা আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে কোনো কিছুতে প্রভাব বিস্তার করে, তা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মুশরিক হয়ে যাবে এবং তার এ জাতীয় ধারণা শির্কে আকবার হিসেবে গণ্য হবে। আর যদি মনে করে যে, তারকার উদয় বা অস্ত ইত্যাদির সাথে পৃথিবীতে বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহ হয়ে থাকে, তা হলে তার এ শির্কটি শির্কে আসগার হিসেবে গণ্য হবে, যা পূর্ণ তাওহীদের পরিপন্থী। শির্কে আসগর হিসেবে গণ্য হবে এ কারণে যে, তারকারাজি যে নিম্ন জগতের উপর প্রভাব বিস্তার করে, এ-কথাটি শরী'আত দ্বারা স্বীকৃত নয়। অতএব তারকার ব্যাপারে এ ধরনের কথা বলা আল্লাহর উপর না জেনে কথা বলার শামিল।”

টিকাঃ
102. সৈয়দ মোহাম্মদ এছহাক, ভেদে মা'রেফত; (ঢাকা : আল-এছহাক প্রকাশনী, সংশোধিত সংস্করণ, ১৪০২ বাংলা), পৃ. ৪৪।
103. ড. ইব্রাহীম আল-বরীকান, প্রাগুক্ত; পৃ. ১৪৬।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 মানুষের উপর কোনো গ্রহের প্রভাব থাকা মিথ্যা হওয়ার বাস্তব প্রমাণ

📄 মানুষের উপর কোনো গ্রহের প্রভাব থাকা মিথ্যা হওয়ার বাস্তব প্রমাণ


২০০৪ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন তিনজন। তন্মধ্যে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় জর্জ ডব্লিউ বুশ আর চ্যালেঞ্জার জন কেরির মধ্যে। সকল মানুষেরই ধারণা ছিল এ নির্বাচনে জন কেরিই জয়ী হবেন। এ অবস্থা দৃশ্যে ভারতীয় জ্যোতিষীরাও বিশ্বজনমতের সাথে সুর মিলিয়ে এ কথাই বলেছিলেন। এ প্রসঙ্গে দিল্লীর এস্ট্রোলজি ষ্টাডি এণ্ড রিসার্চ ইন্সটিটিউটের প্রধান জ্যোতিষী শাস্ত্র লেখক লক্ষণ দাস মদন জানান:
"মাস খানেক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মতামত জরিপে প্রেসিডেন্ট বুশ ও তার প্রতিদ্বন্দ্বী জন কেরির পক্ষে সমর্থন প্রায় কাঁধে কাঁধ সমান রেখে চলছে। কিন্তু গ্রহরাশির পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে, বুশ পুনরায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ফিরে আসতে পারবেন না। অন্যদিকে জন কেরির রাশিফল বিশ্লেষণে দেখা যায় যে শনি গ্রহ বর্তমানে চাঁদ থেকে সরে তৃতীয় কক্ষে অবস্থান করছে যা তার জন্য সর্বাধিক অনুকূলে। তিনি আরো বলেন, কেরির উপর প্রভাব বিস্তারকারী বুধ ও মঙ্গলগ্রহ যথাক্রমে পঞ্চম এবং তৃতীয় অক্ষ থেকে সাফল্যজনকভাবে পারস্পরিক অবস্থান পরিবর্তন করেছে। এটা মার্কিন নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রতি ইঙ্গিতবহ। এতে উপলব্ধি হচ্ছে জন কেরি হবেন আগামী মার্কিন প্রেসিডেন্ট।"
এই হচ্ছে একজন বিশিষ্ট জ্যোতিষীর মার্কিন নির্বাচন সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল তার এ ভবিষ্যদ্বাণী সম্পূর্ণ মিথ্যা। নির্বাচনে জন কেরির পরিবর্তে বুশই পুনরায় বিপুল ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত হলেন। এতে প্রমাণিত হয়ে গেল যে, মানুষের উপর গ্রহের প্রভাব থাকার ব্যাপারে জ্যোতিষীরা আবহমান কাল থেকে যা বলে আসছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।

টিকাঃ
104. দেখুন: দৈনিক ইনকিলাব, ৩০ অক্টোবর, শনিবার, ২০০৪ খ্রি., পৃ.৬।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00