📄 ওলীদের কবর ও কবরের মাটি, গাছ, নিকটস্থ কূপের পানি ও জীব-জন্তুর দ্বারা উপকারে বিশ্বাস করা
মহান আল্লাহর ইচ্ছায় এ পৃথিবীর অনেক কিছুই মানুষের অনেক অসুখ-বিসুখের ক্ষেত্রে উপকারী হয়ে থাকে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে কোনো ওলির কবর বা কবরের মাটি, এর নিকটস্থ গাছ, পুকুরের মাছ, কচ্ছপ ও কুমির ইত্যাদির প্রতি তা সে ওলির সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়ার কারণে উপকারী হওয়ার ধারণা করা শির্কের অন্তর্গত। কিন্তু তা সত্ত্বেও অনেক মুসলিমদের মনে এ সব উপকারী হওয়ার দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে। সে কারণে তাদেরকে অলিগণের কবরের মাটি, কবর বা কবরের উপর পুড়ানো মোম সংগ্রহ করতে দেখা যায়। কূপ ও পুকুরের পানি ময়লা হলেও তা যমযমের পানির মত আগ্রহের সাথে পান করতে ও তা ক্রয় করতে দেখা যায়। এমনকি শাহ জালাল (রহ.)-এর কূপের সাথে যমযম কূপের গোপন সম্পর্ক রয়েছে বলেও ধারণা করতে দেখা যায়। কবরের কবুতর, পুকুরের মাছ, কচ্ছপ ও কুমিরকে যত্নের সাথে খাবার দিতে দেখা যায়। অনিষ্টের ভয়ে কবুতর ও মাছ খাওয়া থেকে বিরত থাকতে দেখা যায়। বিভিন্ন রোগ মুক্তি ও সন্তান লাভের আশায় কোনো কোনো কবর বা কবরের নিকটস্থ গাছে তারকাঁটা মারতে ও লাল সুতা বেঁধে রাখতে দেখা যায়। এ জাতীয় গাছ শির্ক চর্চার কেন্দ্র হওয়াতে তা স্বমূলে উৎপাটন করা প্রসঙ্গে মালিকী মাযহাবের একজন প্রসিদ্ধ আলেম ইমাম ত্বরতুশী বলেন:
"فانظروا رحمكم الله : أينما وجدتم سدرة أو شجرة يقصدها الناس و يعظمونها ويرجون منه البرء الشفاء من قبلها ويضربون بها المسامير و الخرق فهي ذات أنواط ، فاقطعوها."
“ওহে মুসলিম জনতা লক্ষ্য কর! আল্লাহ আপনাদের উপর রহম করুণ! যেখানেই তোমরা এমন কোনো কুল গাছ বা অন্য কোনো গাছ পাবে, যার নিকটে লোকেরা (দূর-দূরান্ত থেকে) উদ্দেশ্য করে আগমন করে, এর সম্মান করে ও তাথেকে রোগ মুক্তি কামনা করে, তাতে তারকাঁটা মারে ও কাপড়ের টুকরা ঝুলিয়ে রাখে, তা হলে তোমরা বুঝে নিবে যে, এটি (কাফিরদের) সেই যাতে আনওয়াত (এরই অনুরূপ গাছ, যাকে কাফিররা দূর-দূরান্ত থেকে উদ্দেশ্য করে আসতো)। সুতরাং তোমরা তা কেটে ফেলো।”
আল্লামা আহমদ রুমী কবর ও কবরের নিকটতম গাছের কাছে লোকেরা যা করে সে সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন: “কবরের কাছে যিয়ারতকারীদের নামায পড়া, কবরের হজ্জ করার সময় বিভিন্ন নিয়ম-কানুন মেনে চলা, এর পার্শ্বে পশু যবাই ও কান্নাকাটি করা, প্রয়োজনের কথা কবরবাসীকে জানানো, তাদের নিকট কষ্ট, অভাব ও বিপদ থেকে মুক্তি ইত্যাদি কামনা করে যিয়ারতকারীরা যে সব কর্ম করে, এর কোনটিই আল্লাহর জন্য নয়, বরং তা শয়তানের জন্যেই করে থাকে।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহচরগণ তাঁর নিকট মুশরিকদের 'যাতে আনওয়াত' নামের কুল গাছের অনুরূপ একটি গাছ নির্ধারণ করে দেয়ার আবেদনের হাদীসটি বর্ণনা পূর্বক তিনি বলেন: "লক্ষ্য করুন! যখন (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবীদের পক্ষ থেকে) কোনো প্রকার এবাদত বা এর নিকট কোনো প্রয়োজন পূরণের কথা জানানো ছাড়াই, শুধুমাত্র এতে অস্ত্রশস্ত্র ঝুলিয়ে রাখা এবং এর পার্শ্বে অবস্থান গ্রহণ করার উদ্দেশ্যে এ ধরনের গাছকে নির্ধারণ করে দেয়ার আবদার করা-ই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দৃষ্টিতে এ গাছকে ইলাহ বা উপাস্যে পরিণত করার নামান্তর হয়ে গেল, তখন সেই সমস্ত লোকদের ব্যাপারে আমরা কী ধারণা করতে পারি, যারা কোনো কবর, গাছ ও পাথরের কাছে আগমন করে এটাকে সম্মান করে, এর দ্বারা রোগমুক্তি কামনা করে, এর উদ্দেশ্যে মানত করে, এ ধারণার বশবর্তী হয়ে যে, এটি তাদের মানত গ্রহণ করে। এটিকে তারা হাত দিয়ে স্পর্শ করে, মুখ দ্বারা চুম্বন করে, অথচ আল্লাহ তা'আলা 'মাকামে ইব্রাহীমকে' নামাযের স্থান হিসেবে নির্ধারণের জন্য আমাদেরকে নির্দেশ প্রদান করা সত্ত্বেও সলফগণ তা হাত দ্বারা স্পর্শ করতে নিষেধ করেছেন। যেমন আযরক্বী ইমাম কাতাদাহ (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি وَاتَّخِذُوا مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلَّى ﴾ [البقرة: ١٢٥] এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন:
(إن الله أمر الناس بالصلاة في هذا المكان ولم يأمرهم بلمسه)
"আল্লাহ তা'আলা জনগণকে এ স্থানে নামায পড়তে আদেশ করেছেন, তাদেরকে তা স্পর্শ করতে আদেশ করেন নি।"
বাস্তবিক অর্থে যারা কোনো কবর, কবর, গাছ, পাথর, মাটি, কূপ ও পুকুর এবং ওলীদের নিদর্শনাদিকে বিভিন্ন রোগমুক্তির হাসপাতাল ও বিপদের আশ্রয়স্থল বানিয়ে নিয়েছে, সন্তান লাভ ও বিভিন্ন মনস্কামনা পূরণের স্থান বানিয়ে নিয়েছে, তারা যেন ওলীদের কবর ও কবরসমূহকে মুশরিকদের 'হুবল' ও 'মানাত' দেবতার স্থানে বসিয়েছে এবং গাছ, কূপ, পুকুর ও ওলীদের নিদর্শনাদিকে মুশরিকদের 'যাতে আনওয়াত', 'উয্যা' ও 'লাত' নামের দেবীতে পরিণত করেছে। এসবকে কেন্দ্র করে তারা যা কিছু করে এর দ্বারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সে ভবিষ্যদ্বাণীরই সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে, তিনি বলেছিলেন:
"তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্বেকার জাতির (মুশরিকদের) রীতিনীতির অনুসরণ করবে।”
টিকাঃ
90. সৈয়দ মোস্তফা কামাল, শাহ জালাল ও তাঁর কারামত; (সিলেট: নিউ এমদাদিয়া লাইব্রেরী, ১০ম ষংস্করণ, ১৯৯৬ খ্রি.), পৃ. ২২১।
91. মুহাম্মদ আব্দুর রহীম, ফাতাওয়া রহীমিয়্যাহ; (গুজরাট : মকতবা-ই- রহীমিয়্যাহ, সংস্করণ বিহীন, তারিখ বিহীন), ১/২০৩-২০৪।
92. আহমদ রূমী, প্রাগুক্ত; পৃ. ১৫৯।
93. হাদীসটি নিম্নরূপ: আবু ওয়াক্বিদ আল-লায়ছী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন খয়বর অভিযানের বের হলেন, তখন মুশরিকদের একটি গাছের পার্শ্ব দিয়ে অতিক্রম করেন, যাকে 'যাতে আনওয়াত' বলা হতো, এর উপর তারা তাদের অস্ত্রশস্ত্র ঝুলিয়ে রাখতো। সাহাবীগণ বললেন- হে রাসূল! ওদের ন্যায় আমাদের জন্যেও একটি 'যাতে আনওয়াত' নির্ধারণ করে দিন। সাহাবীদের এ আবেদন শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: সুবহানাল্লাহ! তোমাদের এ কথাটি মূসা (আ.) এর জাতির কথার মতই হয়ে গেল, তারা বলেছিল- মুশরিকদের ইলাহের ন্যায় আমাদের জন্যে একটি ইলাহ বানিয়ে দিন। যার হাতের মধ্যে আমার আত্মা তাঁর শপথ করে বলছি- তোমরা অবশ্যই তোমাদের অতীতের লোকদের রীতিনীতি অনুসরণ করবে।" দেখুন: আবু ঈসা আত- তিরমিযী, প্রাগুক্ত; ৪/৪৭৫। কোনো কোনো বর্ণনায় খয়বার যুদ্ধের পরিবর্তে হুনায়ন যুদ্ধের কথা বর্ণিত হয়েছে।
94. অনুবাদ: "তোমরা মাকামে ইব্রাহীমকে নামাযের স্থান বানাও।” আল- কুরআন, সূরা: বাক্বারাহ: ১২৫।
95. আহমদ রুমী, প্রাগুক্ত; পৃ.১৬১।
96. দেখুন: তিরমিযী, প্রাগুক্ত; কিতাবুল কদর, বাব নং ১৮, হাদীস নং ২১৮০; ৪/৪৭৫; ইবনে মাজাহ, প্রাগুক্ত; ২/১৩২২; ইবনে আবী শায়বাহ, ৭/৪৭৯।
📄 মানব রচিত বিধান ও আইন দ্বারা দেশ শাসন ও বিচার কার্য্য পরিচালনা করা
এ পৃথিবীতে মানুষ যদি নিজ থেকে আপনা-আপনি সৃষ্টি হয়ে থাকতো, তা হলে তারা যেমন খুশী চলতে পারতো। তাদের জীবনের যাবতীয় দিক ও বিভাগ শাসন ও পরিচালনা করার জন্য নিজেরাই স্বাধীনভাবে আইন ও বিধান রচনা করতে পারতো।
কিন্তু মানুষ আল্লাহর সৃষ্ট জীব হওয়ায় তাদের এ স্বাধীনতা নেই; কেননা, তিনি নিজেই তাদের এ প্রয়োজন পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। এ জন্য দিয়েছেন সর্বকাল ও সর্বস্থানে প্রয়োগের উপযোগী সর্বশেষ অহীর বিধান আল-কুরআন ও তাঁর শেষ নবীর সহীহ সুন্নাহ। এ দু'য়ের মাঝে বর্ণিত যাবতীয় বিধি-বিধান মানুষের ব্যক্তি, পরিবার, ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে বাস্তবায়ন করা বা না করার ব্যাপারে আল্লাহ তাদেরকে সৃষ্টিগত স্বাধীনতা দিয়ে থাকলেও শরী'আতগত দিক থেকে তা পালন করা বা না করার ব্যাপারে তিনি তাদেরকে কোনো স্বাধীনতা দান করেন নি। বরং এ কথা বলে দিয়েছেন যে, যারা স্বেচ্ছায় তা তাদের জীবনে বাস্তবায়ন করবে বা এ জন্য চেষ্টা করবে, তারা আল্লাহর আইনের কাছে আত্মসমর্পনকারী ও তাঁর দাস হিসেবে গণ্য হবে। তারা আল্লাহকেই তাদের জীবনের পরিচালনাকারী ও রব হিসেবে স্বীকৃতি দানকারী হবে। আর যারা তা করবে না, তারা আল্লাহর অবাধ্য হয়ে তাঁর দাসত্বকে অস্বীকারকারী হয়ে নিজেদেরকে নিজেদের ইলাহ ও রব হিসেবে স্বীকৃতি দানকারী হবে। কুরআন ও হাদীসের দ্বারা এ বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কার থাকা সত্ত্বেও দেখা যায়- আমাদের দেশে যারা নিজেদেরকে মুসলিম বলে দাবী করেন, তাদের অধিকাংশই তাদের জীবনের সকল ক্ষেত্রে সে ওহীর বিধান বাস্তবায়ন করতে রাজি নন। তারা এটাকে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ বলে আখ্যায়িত করেন। দেশের অধিকাংশ জনগণ ইসলামী রাজনীতির পরিবর্তে পাশ্চাত্য রাজনীতির অনুসরণ ও অনুকরণ করার ফলে দেশে যেমন ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম হচ্ছে না, তেমনি শুধুমাত্র বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার ও পারিবারিক আইন ব্যতীত মানব জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে অহীর যে সব বিধান রয়েছে, তা রাষ্ট্রীয়ভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না।
কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ যেখানে যাবতীয় আইনের মূল উৎস হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার কথা, সেখানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নিজেই আইনের উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশ পরিচালনার জন্য সংবিধান রচনা করে আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছি যে, এ সংবিধানে বর্ণিত বিধানের সাথে অপর কোনো বিধানের বিরোধিতা করার কোনো আইনগত অধিকার নেই এবং করলে তা অপনিতেই বাতিল বলে গণ্য হবে। যেমন সংবিধানের ৭ম ধারার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে আমরা এ সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছি যে,
“This Constitution is, as the solemn expresson of the will of the people, the supreme law of the Republic, and if any other law is inconsistent with this Constitution that other law shall, to the extent of the inconsistency, be void."
এ সিদ্ধান্তের দ্বারা আমরা নিজেদের রচিত সংবিধানের আইন ও বিধানকে কুরআন ও সুন্নাহের আইন ও বিধানের উপর মর্যাদা দান করেছি। বিচার কার্য অহীর বিধানানুযায়ী পরিচালিত না করে তা পাশ্চাত্য বা নিজেদের রচিত বিধানানুযায়ী করছি। এভাবে আমরা সৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও নিজেদেরকে স্রষ্টার আসনে বসিয়ে দিয়েছি এবং এ জাতীয় কর্ম করে নিজেদের অজান্তেই নিজেদেরকে আল্লাহর রুবুবিয়্যাতে শরীক করে নিয়েছি। এ হেন অভিযোগ থেকে কেবল তারাই মুক্তি পেতে পারেন যারা আল্লাহর আইন ও বিধানকে কোনো প্রকার অবজ্ঞা না করে সর্বকালে তা বাস্তবায়নের যোগ্য বলে মনে করেন, ক্ষমতায় যেতে না পারলে ইসলাম বিরোধী দেশীয় ও আন্তর্জাতিক যাবতীয় ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে কোনো প্রকার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ছাড়াই শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতায় যেয়ে তা বাস্তবায়নের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা ও তদবীর করেন। কিন্তু যারা শুধু সেমিনার, সেম্মোজিয়াম ও বক্তৃতায় দাঁড়িয়ে ইসলামী বিধানের মৌখিকভাবে প্রশংসা করেন এবং শুধুমাত্র সমস্যাদির কথা ভেবে তা বাস্তবায়ন করার জন্য কোনো প্রকার বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকেন, তারা আল্লাহর রুবুবিয়্যাতে শির্ক করা থেকে বাঁচতে পারলেও কোনো অবস্থাতেই তারা কবীরা গুনাহ থেকে মুক্ত হতে পারবেন না। কেননা, একজন মুসলিম বা একটি মুসলিম রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ও অনুসারীদের ঈমানী দায়িত্ব হচ্ছে- ক্ষমতায় গিয়ে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী দেশ ও বিচার কার্য পরিচালনার জন্য সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করা, যারা তা চায় তাদের সহযোগিতা গ্রহণ করা। নিজে চাইবো না বা যারা তা চায় তাদের সহযোগিতাও করবো না, এমন মুনাফিকী চরিত্র নিজের আখেরাত সম্পর্কে সচেতন কোনো মুসলিমের কশ্মিনকালেও হতে পারে না।
টিকাঃ
97. এর বঙ্গানুবাদ হচ্ছে : জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোন আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে। দেখুন : গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান; (ডেপুটি কন্ট্রোলার, গভর্ণমেন্ট প্রিন্টিং প্রেস, তেজগাঁও, ঢাকা কর্তৃক মুদ্রিত, ১৯৯১ খ্রি.), পৃ. ৬।
📄 জিনের অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য জিনকে শিরনী দান
জিন-পরী ও দেও-দানবসহ যাবতীয় অনিষ্টকারীদের অনিষ্টের হাত থেকে বাঁচার জন্য একজন মু'মিনের করণীয় হচ্ছে পারতপক্ষে সর্বদা পবিত্র থাকার চেষ্টা করা এবং জিনের আশ্রয় কামনা করার বদলে বিভিন্ন দো'আ-কালাম পাঠ করে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া; কেননা যে কোনো বিপদ থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা হচ্ছে তাঁর একটি বিশেষ ধরনের উপাসনা।
কিন্তু দেশের গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মুসলিমদের দেখা যায়, মাছ ধরার জন্য কোনো পুকুর বা বিল সেচ করলে তারা সেচ কাজ আরম্ভ করার পূর্বে দুষ্ট জিন যাতে মাছ অন্যত্র সরিয়ে না নেয়, সে জন্য পুকুর বা বিলের পারে শিরনী তৈরী করে নিকটস্থ কোনো গাছের নিচে এর কিছু অংশ রেখে দেন এবং এর মাধ্যমে পুকুর বা বিলের পার্শ্ববর্তী জিনের সন্তুষ্টি কামনা করেন ও তার অনিষ্ট হতে বাঁচার জন্য তার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করেন।
এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে মুকাম নামে পরিচিত এমন কিছু পুরাতন গাছপালাবিশিষ্ট স্থানও রয়েছে যেখানে জিনের অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য লোকেরা সেখানকার কোনো বড় গাছের নিচে হালুয়া ও শিরনী দিয়ে থাকে। এ জাতীয় কর্মের প্রচলন সিলেট জেলার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে অধিকহারে রয়েছে। লোকেরা যেন এ কর্মের দ্বারা জিনের অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার বদলে জিনের কাছেই আশ্রয় কামনা করে থাকে।
এ জাতীয় কর্মকে হিন্দু ধর্মের অনুসারীদের মনসা পূজার সাথে তুলনা করা যায়, যা তারা মনসা দেবী নামে এক কাল্পনিক দেবীর সন্তুষ্টির জন্য উপাসনালয়ের গাছতলায় খাবার রাখার মাধ্যমে করে থাকে।
📄 ভাগ্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে পাথরের প্রভাবে বিশ্বাস করা
আমাদের দেশে গণক ও হস্তরেখাবিদ নামে কিছু পেশাজীবী লোক রয়েছেন যারা মানুষের চেহারা বা হাত দেখে তাদের ভাগ্যের ভাল-মন্দ বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করে থাকেন। যারা তাদের শিকার হয় তাদেরকে ভাগ্য বিড়ম্বনার হাত থেকে বাঁচানোর জন্যে তারা তাদেরকে বিভিন্ন রকমের পাথর দ্বারা নির্মিত আংটি ব্যবহারের জন্য দিয়ে থাকে। পাথর দাতা ও গ্রহীতা সকলেই এ সব পাথরের অলৌকিক প্রভাবে বিশ্বাস করে, যা শর’য়ী দৃষ্টিতে আল্লাহর রুবুবিয়্যাতে শির্কের শামিল। উল্লেখ্য যে, মানুষের ভাগ্যে মহান আল্লাহ দু'টি কারণে বিড়ম্বনা বা দুঃখ দিয়ে থাকেন:
এক. কোনো দুঃখ দুর্দশা দিয়ে তিনি তাদের ঈমান ও ধৈর্যের পরীক্ষা করতে চান। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেছেন:
﴿وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّبِرِينَ ﴾ [البقرة: ١٥৫]
"আমি অবশ্যই ভয়-ভীতি, ক্ষুধা, জান ও ফসলের ক্ষতি সাধনের মাধ্যমে তোমাদের পরীক্ষা করবো।"
দুই, কোনো মানুষকে তার কর্মদোষের ফলেই তিনি তার ভাগ্যে দুর্দশা নামিয়ে দেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেছেন:
وَمَا أَصَبَكُم مِّن مُّصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُوا عَن كَثِيرٍ ﴾ [الشورا: ٣٠]
"তোমাদের উপর যে বিপদ পতিত হয়েছে তা তোমাদের কর্মদোষের ফলেই হয়েছে।"
উপর্যুক্ত দু'টি কারণে ভাগ্যের যে কোনো বিড়ম্বনা আল্লাহর ইচ্ছায়ই হয়ে থাকে। এটি কোনো রোগ-ব্যাধি নয় যে কোনো ঔষধ সেবন বা কোনো পাথর ব্যবহারের মাধ্যমে তা ভাল করা যাবে। তা ভাল করার একমাত্র পথ হচ্ছে এ দিক সে দিক মুখ না করে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করা এবং ধৈর্যের সাথে ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য বৈধ উপায়ে কর্ম করা। কোনো গণক বা হস্তরেখাবিদের কথা যদি কারো ভাগ্যের অতীত অবস্থার সাথে মিলেও যায়, তবুও এর দ্বারা কারো আশ্চর্যান্বিত ও প্রতারিত হলে চলবে না; কারণ গণকরা অনেক সময় জিনের সহযোগিতায় মানুষের ভাগ্যের অতীত সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে কথা বলে।
আবার অনেক সময় এরা ও হস্তরেখাবিদরা অভিজ্ঞতার আলোকে কথা বলে, যার অনেকটা অনেকের ভাগ্যের বাস্তবতার সাথে মিলে যায়। এদের বক্তব্যের অবস্থা যা-ই হোক না কেন, কারো ভাগ্য পরিবর্তনে তাদের দেয়া পাথরের কোনই প্রভাব নেই; কেননা তা সম্পূর্ণভাবেই আল্লাহ তা'আলার নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাপার। তা পরিবর্তন করতে হলে যে বৈধ পন্থা অবলম্বন করলে তা পরিবর্তন হতে পারে তা ক'রে পরিবর্তনের জন্য আল্লাহর কাছে চাইতে হবে।
হিকমতের ভিত্তিতে তিনি যাকে ইচ্ছা তা দ্রুত পরিবর্তন করে দেন, আবার যাকে ইচ্ছা বিলম্বে দেন। যারা ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য অন্যের কাছে চায় বা মৃত ওলিদের শাফা'আতের মাধ্যমে তাদের ভাগ্য বদলাতে চায়, তাদের ভাগ্যও তিনিই তাঁর হিকমতের ভিত্তিতে পরিবর্তন করেন। এক্ষেত্রে অন্যের বা মধ্যস্থতাকারী মৃত ওলির কোনই হাত নেই। তবে যারা তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য আল্লাহর নিকট সরাসরি চায়, তারা হবে তাঁর উপাসনাকারী ও তাঁর রুবুবিয়্যাতকে সম্পূর্ণভাবে স্বীকৃতিদানকারী। আর যারা অপর কারো কাছে চায় বা কোনো মৃত ওলিদের মধ্যস্থতা অবলম্বন করে, তারা হলো অন্যের উপাসনাকারী ও অন্যের রুবুবিয়্যাতের স্বীকৃতিদানকারী।
টিকাঃ
98. আল-কুলআন, সূরা বাক্বারাহ: ১৫৫।
99. আল-কুরআন, সূরা শূরা: ৩০।