📘 শিরক কি ও কেন > 📄 জাহেলী যুগের শির্কের কেন্দ্রসমূহের সাথে এ-সবের তুলনা

📄 জাহেলী যুগের শির্কের কেন্দ্রসমূহের সাথে এ-সবের তুলনা


আমরা প্রথম অধ্যায়ে জাহেলী যুগের শির্কের কেন্দ্রসমূহের ধরণ ও প্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এখানে আমরা এ বিষয়টি খতিয়ে দেখবো যে, বাংলাদেশে অবস্থিত শির্কের কেন্দ্রসমূহের সাথে সে যুগের কেন্দ্রসমূহের কতটুকু সাদৃশ্য বা বৈসাদৃশ্য রয়েছে। এ ক্ষেত্রে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, ইসলাম পরবর্তী যুগে বিভিন্ন মুসলিম বা অমুসলিম দেশে বিশেষ করে আমাদের দেশে ওলীদের কবর বা তাঁদের নিদর্শনের উপর যে সব কেন্দ্র তৈরী করা হয়েছে, সেগুলোর বিশেষ ধরনের মিল রয়েছে নূহ 'আলাইহিস সালাম-এর জাতির মধ্যকার ওয়াদ্দ, সুয়া', ইয়াগুস, ইয়া'উক ও নসর নামের ওলিদের কবরে নির্মিত কেন্দ্রসমূহের সাথে; কেননা, তাঁদের নামে পৃথক পৃথক মূর্তি তৈরী করার পূর্বে তাঁদের ভক্তরা তাঁদের কবরগুলোর সাথে ঠিক সেরকমই আচরণ করেছিল যেরূপ আচরণ অধিকাংশ সাধারণ মুসলিমরা আজ তাদের ওলীদের কবরসমূহের সাথে করে থাকে।
সে সময় থেকে আরম্ভ করে সর্বশেষ নবী ও সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগমনের পূর্ব পর্যন্ত লোকেরা তাদের আউলিয়া ও নবীদের সম্মান ও তা'জিম করতে গিয়ে এবং তাঁদেরকে সাধারণ মানুষের জীবনের কল্যাণার্জন এবং অকল্যাণ দূরীকরণের ক্ষেত্রে শাফা'আতকারী মনে করার কারণেই তাঁদের কবরগুলোকে শির্কের কেন্দ্র বানিয়ে নিয়েছিল। ধীরে ধীরে মুসলিমরাও তাদের ওলীদের সম্মান ও তা'জিম করতে গিয়ে এবং দুনিয়া-আখেরাতের কল্যাণার্জন ও অকল্যাণ দূরীকরণের ক্ষেত্রে তাঁদেরকে আল্লাহ ও তাদের মাঝে মধ্যস্থতাকারী ও শাফা'আতকারী হওয়ার ধারণা করার ফলে তাঁদের কবর ও কবরগুলোকে ঠিক একই কায়দায় শির্কের কেন্দ্র বানিয়ে নিয়েছে।
পাগলদের কবরসমূহে নির্মিত কেন্দ্রসমূহ বা তথাকথিত বেলায়েতের দাবীদাররা নিজেদের জন্য যে সব কেন্দ্র নির্মাণ করেছে, সেগুলোরও ওলীদের কবরে নির্মিত কেন্দ্রের সাথে সম্পর্ক রয়েছে। এরা যদিও ওলীদের অন্তর্ভুক্ত নয়, তথাপি লোকেরা তাদেরকে অজ্ঞতাবশত ওলীদের মাঝে গণ্য করে নিয়েছে। এ ছাড়াও সে কালের গণকদের সাথে এদের বিশেষ রকমের মিল রয়েছে; কেননা, সে কালের গণকদের সাথে শয়তান জিনের সম্পর্ক ছিল, বর্তমান কালের বেলায়াতের দাবীদারদের সাথেও শয়তান জিনের গোপন সম্পর্ক রয়েছে। এ জিনদের সহযোগিতাতেই যেমন গণকরা জনগণের উপকার করতো, তেমনি এরাও জিনদের সহযোগিতায় জনগণের উপকার করে থাকে। তাই সাধারণ লোকদের দৃষ্টিতে এরা আল্লাহর ওলি হয়ে থাকলেও মূলত তারা শয়তানের ওলি ও বন্ধু। সে জন্যেই তারা নিজেদের বেলায়াত লাভের বিষয় গোপন না রেখে পত্রিকান্তরে প্রকাশ করে। সাধারণত কা'বা শরীফ ও মসজিদে নববী যিয়ারতের বদলে তারা আজমীর ও বাগদাদে যায়। নিজ নিজ খানকাতে ওরস পালনের নামে জাহেলী যুগের মুশরিকদের ন্যায় ঈদ পালন করে।
অবশিষ্ট বিভিন্ন গাছপালা, পুকুর, কূপ ও জীব জন্তুকে কেন্দ্র করে যে সকল শির্কের কেন্দ্র নির্মিত হয়েছে, সেগুলোর মিল রয়েছে আরবের মুশরিকদের 'লাত' 'উয্যা' 'মানাত' ও 'যাতে আনওয়াত' নামের পাথর ও গাছকে কেন্দ্র করে নির্মিত শির্কের কেন্দ্রসমূহের সাথে; কেননা সেগুলোও গাছ ও পাথরকে কেন্দ্র করেই নির্মাণ করা হয়েছিল।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 বাংলাদেশের মুসলিমদের মাঝে প্রচলিত শির্কের সাথে জাহেলী যুগের শির্কের তুলনামূলক আলোচনা

📄 বাংলাদেশের মুসলিমদের মাঝে প্রচলিত শির্কের সাথে জাহেলী যুগের শির্কের তুলনামূলক আলোচনা


তৃতীয় অধ্যায়ে আমাদের দেশের অসংখ্য মুসলিমদের বিশ্বাস, কর্ম ও অভ্যাসের মাঝে প্রচলিত যে সব শির্কী কর্মকাণ্ডের কথা আলোচিত হয়েছে, আশা করি এর দ্বারা চিন্তাশীল পাঠক মহলের নিকট এর সাথে জাহেলী যুগের মানুষের বিশ্বাস, কর্ম ও অভ্যাসের কী পরিমাণ মিল বা অমিল রয়েছে, তা অনেকটা পরিষ্কার হয়ে গেছে। এর পরেও বিষয়টি যাতে সর্ব সাধারণের নিকট সম্পূর্ণভাবে পরিষ্কার হয়ে যায় সে জন্যে নিম্নে উভয় সময়ের শির্কী কর্মকাণ্ডের একটি তুলনামূলক বর্ণনা ছক আকারে প্রদান করা হলো :
জাহেলী যুগের বিশ্বাস, কর্ম ও অভ্যাস বাংলাদেশের মুসলিমদের বিশ্বাস, কর্ম ও অভ্যাস অধিকাংশ
গণক ও কাহিনদের গণক, টিয়া পাখি ও বানরের ভবিষ্যদ্বাণীতে বিশ্বাস মাধ্যমে ভাগ্য জানার চেষ্টা করা
আররাফদের গায়েব জিন সাধকদের গায়েব সম্পর্কীয় কথায় বিশ্বাস সম্পর্কীয় কথায় বিশ্বাস
জ্যোতিষদের ভাগ্য প্রফেসর হাওলাদার ও অন্যান্য সম্পর্কীয় কথায় বিশ্বাস জ্যোতিষদের ভাগ্য সম্পর্কীয় কথায় বিশ্বাস
আমাদের নাবী ও ওলিগণ গায়েব জানেন
পাখি উড়িয়ে ভাগ্যের মঙ্গল টিয়া পাখি ও বানরের সাহায্যে ও অমঙ্গল জানার চেষ্টা ভাগ্য জানার চেষ্টা করা করা
ওয়াদ, সুআ', য়াগুছ আউলিয়াগণ বিভিন্ন প্রয়োজন ইত্যাদি ওলিদের নামে পূরণ করতে পারেন বলে বিশ্বাস নির্মিত মূর্তিসমূহ প্রয়োজন করা পূরণ করতে পারে বলে বিশ্বাস করা
খতমে নারী পড়ার মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাম নিলেই তাঁর নামের বদৌলতে যাবতীয় সমস্যার সমাধান হয়ে যায় বলে বিশ্বাস করা
খ্রিস্টান ও হিন্দুদের ন্যায় অবতারবাদে বিশ্বাস করা আল্লাহ নিজেই রাসূল হয়ে আগমন করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা
আহমদ আর আহাদ এর মধ্যে কেবল 'মীম' অক্ষরের পাথ্যর্ক বলে বিশ্বাস করা
আরশে যিনি আল্লাহ ছিলেন মদীনায় তিনিই রাসূল হয়ে আগমন করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা
দেবতারা ইহকালীন ওলীদের মধ্যকার গাউছ ও কল্যাণার্জন ও অকল্যাণ কুতুবগণ দুনিয়া পরিচালনা দূর করতে পারে বলে করেন এবং মানুষের কল্যাণ ও বিশ্বাস করা অকল্যাণ করতে পারেন বলে বিশ্বাস করা
ওলি ও ফেরেস্তাদের নামে আউলিয়াগণ নিজস্ব মর্যাদা বলে নির্মিত মূর্তি ও দেবতাসমূহ আল্লাহর কোনো পূর্বানুমতি আল্লাহর কাছে মানুষের ব্যতীত তাঁদের ভক্তদের জন্য জন্য শাফা'আত করতে শাফা'আত করে তাদেরকে মুক্তি পারেন বলে বিশ্বাস করা দিতে পারবেন বলে বিশ্বাস করা
ফেরেস্তা ও ওলিদের নামে মৃত ওলীদেরকে আল্লাহর নির্মিত দেবতাদেরকে নিকটতম করে দেয়ার মাধ্যম সাধারণ মানুষদের জন্য হিসেবে মনে করা আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়ার মাধ্যম হিসেবে মনে করা
মৃত ওলিগণ ভক্তদের সমস্যা সমাধানে হস্তক্ষেপ করতে পারেন বলে বিশ্বাস করা
ওলিগণ সাগরকে তার ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বারণ করতে পারেন বলে বিশ্বাস করা
উয্যা ও যাতে আনওয়াত ওলীদের কবরের উপর অথবা নামের গাছ সর্বস্ব দেবতা পার্শবর্তী স্থানে উৎপন্ন বা যুদ্ধে বরকত ও বিজয় লাগানো গাছের শিকড়, ফল ও এনে দিতো বলে বিশ্বাস পাতার মাধ্যমে বরকত ও বিবিধ করা কল্যাণ লাভ করা যায় বলে মনে করা
কবরের পুকুর ও কূপের পানি পান ক'রে এবং মাছ, কচ্ছপ ও কুমীরকে খাবার দিয়ে রোগ মুক্তি ও বরকত কামনা করা
'মানাত' নামের পাথর আজানগাছী পীরের দরবারে নিকট রক্ষিত কথিত আবু জেহেলের সর্বস্ব দেবতার প্রয়োজন পূরণের জন্য হাতের পাথর দিয়ে রোগ মুক্তি কামনা করা কামনা করা
নারায়ণগঞ্জের কদমরসূল দরবারে রক্ষিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথিত কদম মুবারকের ছাপ বিশিষ্ট পাথর দ্বারা রোগ মুক্তি ও কল্যাণ কামনা করা
উপত্যকার জিন সরদারের কাঠ ও মধু সংগ্রহকারীদের দ্বারা নিকট আশ্রয় কামনা করা জঙ্গলের জিন ও হিংস্র প্রাণীর অনিষ্ট থেকে রক্ষার জন্য জঙ্গলের জিন সরদারিনীর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা
বিল ও জলাশয়ের মাছ ধরার জন্য পানি সেচের পূর্বে 'কাল' নামক জিনকে শিরনী দিয়ে সন্তুষ্ট করা
পৃথিবীর ঘটনা প্রবাহের মানুষের ভাগ্যের উপর গ্রহ ও উপর তারকা ও নক্ষত্রের তারকার প্রভাবে বিশ্বাস করা প্রভাবে বিশ্বাস করা
তারকার সুদৃষ্টিতে জমিতে স্বর্ণ জন্মে বলে বিশ্বাস করা
গোত্রীয় নেতাদের প্রবৃত্তি মানব রচিত বিধানের আলোকে অনুযায়ী গোত্র শাসন করা দেশ শাসন করা
আল্লাহর পরিবর্তে দেশের জনগণকে ক্ষমতায় বসানোর সর্বময় ক্ষমতার মালিক মনে করা
দাদ ও প্লেগ রোগকে নিজ কলেরা, বসন্ত, দাদ, এজিমা, থেকে সংক্রামক রোগ বলে যক্ষ্ণা, প্লেগ ও এইড'স রোগকে বিশ্বাস করা নিজ থেকে সংক্রামক রোগ বলে মনে করা
দো'আ গৃহীত হওয়ার জন্য দেবতাদের দিকে মুখ করে মুরশিদ, পীর ও ওলিদের দো'আ করা কবরের দিকে মুখ করে দো'আ করা
দেবতারা ছোট ছোট মৃত ওলিগণ সাহায্য করতে ব্যাপারে সাহায্য করতে পারেন, এ বিশ্বাসের ভিত্তিতে পারে এ বিশ্বাসের ভিত্তিতে তাঁদের নিকট সাহায্য চাওয়া তাদের নিকট তা কামনা করা
ঝড়-তুফানের সময় আল্লাহর বদলে পাঁচ পীর, খওয়াজ খিজির ও বদর পীরকে সাহায্যের জন্য আহ্বান করা
ওলিদের মূর্তির সামনে বিনয়ের সাথে দাঁড়ানো ওলিদের কবর ও পীরের সামনে বিনয়ের সাথে দাঁড়ানো
ভাল-মন্দ সর্বাবস্থায় মূর্তির নিকট সাহায্য চাওয়া ওলিদের নিকট সাহায্য কামনা করা
ওয়াদ, সুয়া’ ইত্যাদি অলিগণের প্রথম কবর করে তাঁদের বাতেনী ফয়েজ এবং পরে তাঁদের মূর্তির সামনে অবস্থান গ্রহণ করে আল্লাহর নিকটবর্তী হতে চাওয়া ওলিদের কবরে অবস্থান গ্রহণ করে তাঁদের বাতেনী ফয়েজ হাসিল করা এবং তাঁদের মাধ্যমে আল্লাহর নিকটবর্তী হতে চাওয়া আল্লাহর উপাসনায় মনোযোগ ও তাঁর নিকটবর্তী হতে চাওয়া
চাঁদ ও সূর্যকে সেজদা করা ওলিদের কবরে সেজদা করা
বিপদাপদ দূর করার জন্য বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ওলীদের কবরের দেবতাদের উদ্দেশ্যে নযর- মানত করা। নিয়াজ ও মানত করা
দেবতাদেরকে আল্লাহর আল্লাহর হুকুমের উপরে পীরের চেয়ে অধিক ভালবাসা হুকুমকে প্রাধান্য দেয়া
দেবতারা মানুষের ক্ষতি ওলীদের কবরকে ভয় করা সাধন করতে পারে বলে মনে করা
দেবতাদের নিকট প্রয়োজন ওলীদের নিকট প্রয়োজন পূর্ণ পেশ করা করে দেয়ার জন্য আবেদন করা
উদ্দেশ্য পূরণের জন্য উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ওলিদের দেবতাদের উপর ভরসা উপর ভরসা করা করা
প্রয়োজন নিয়ে দেবতাদের প্রয়োজন নিয়ে ওলিদের শরণাপন্ন হওয়া স্মরণাপন্ন হওয়া এবং তাঁদের নিকট ক্ষমা ভিক্ষা করা
ধর্ম যাজকদেরকে হারাম ও হালাল নির্ধারণকারী বানিয়ে নেওয়া শরী'আত পালনের ক্ষেত্রে সহীহ হাদীসের উপর পীর ও মাযহাবের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা পীরের নাম জপ করা
দেবতাদের সাথে সম্পর্কিত কথিত বরকতপূর্ণ স্থান সমূহ যিয়ারত করতে যাওয়া ওলীদের কবর ও তাঁদের সাথে সম্পর্কিত স্থানসমূহ দূর-দূরান্ত থেকে যিয়ারত করতে যাওয়া
মৃত্যুর পর ওলিগণ রূহানী শক্তি বলে অনেক কিছু করতে পারেন বলে বিশ্বাস করা
দেবতাদের গায়ে হাত বুলিয়ে বরকত হাসিল করা ওলীদের কবর, কবরের দেয়াল, গিলাফ ও তাঁদের স্মৃতিসমূহ স্পর্শ করে বরকত হাসিল করা
দেবতা ও বাপ-দাদার নামে শপথ গ্রহণ করা আগুন, পানি ও মাটি ইত্যাদির নামে শপথ করা
দেবতাদের নামের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি মিলিয়ে সন্তানাদির নাম রাখা, বিশেষ করে তাদের দাস- আবদ, গোলাম ইত্যাদি বলা ওয়াসাল্লাম ও কোনো ওলীর নামের সাথে মিলিয়ে সন্তানাদির নাম রাখা, বিশেষ করে তাদের দাস- আবদ, গোলাম ইত্যাদি বলা
বরকত হাসিলের জন্য সন্তানদেরকে দেবতাদের কাছে নিয়ে যাওয়া ওলীদের কবর থেকে বরকত লাভ ও রোগ মুক্তির জন্য সন্তানদেরকে সেখানে নিয়ে যাওয়া এবং তাদের গায়ে কবরের কূপের পানি ছিটানো ও পান করানো
শির্কী পন্থায় অসুখ বিভিন্ন তন্ত্র-মন্ত্রের মাধ্যমে নিবারণের জন্য চেষ্টা করা ঝাড়ফুঁক করা
চোখের কুদৃষ্টি থেকে কারো চোখ লাগা থেকে শিশুদের শিশুদের রক্ষার জন্য গলায় রক্ষার জন্য তাদের গলায় মাছের ঝিনুক থেকে আহরিত হাড়, শামুক ইত্যাদি ঝুলিয়ে মুক্তার মালা পরানো। রাখা।
উপর্যুক্ত তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে এ কথা পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হচ্ছে যে, আমাদের দেশের অনেক মুসলিমদের বিশ্বাস, কর্ম ও অভ্যাসের সাথে জাহেলী যুগের মুশরিকদের বিশ্বাস, কর্ম ও অভ্যাসের যথেষ্ট মিল রয়েছে। তাদের মধ্যে এমনও অনেক শির্কী কর্ম রয়েছে যা জাহেলী যুগের মুশরিকদের মধ্যে ছিল না। বিশেষ করে নৌকা যোগে কোথাও যাওয়ার বিষয়টির কথা বলা যায়। জাহেলী যুগের লোকেরা কখনও নৌকা যোগে কোথাও যাওয়ার প্রাক্কালে ঝড় ও তুফানের কবলে পতিত হলে তারা বিপদ থেকে মুক্তির জন্য একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকেই স্মরণ করে তাঁকে আহ্বান করতো বলে কুরআনুল কারীমে বর্ণিত হয়েছে। অথচ দেখা যায়, অনেক মুসলিমরা অনুরূপ বিপদে পতিত হলে সাহায্যের জন্য একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ তা'আলাকে আহ্বান না করে ওলিদেরকে সাহায্যের জন্য আহ্বান করে থাবেন। এতে প্রমাণিত হয় যে, জাহেলী যুগের মানুষেরা যতুটুকু শয়তানের শিকারে পরিণত হয়েছিল আমাদের দেশের অনেক মুসলিমরা এর চেয়েও অধিক শিকারে পরিণত হয়েছে।

টিকাঃ
180. এ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন: "তিনিই তোমাদের স্থলে ও সমুদ্রে ভ্রমণ করান। এমনকি যখন তোমরা নৌকাসমূহে আরোহণ করো এবং অনূকুল হাওয়ায় তা তাদেরকে বয়ে নিয়ে চলে, এতে তারা আনন্দ হয়, ঠিক এমন সময় নৌকাগুলোর উপর তীব্র বাতাস এসে আঘাত হানে, আর সর্বদিক থেকে সেগুলোর উপর ঢেউ আসতে লাগে, তারা বুঝতে পারে যে, তারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে, তখন তারা আল্লাহকে একনিষ্ঠভাবে আহবান করতে লাগে এই বলে যে, যদি তুমি আমাদেরকে এ বিপদ থেকে উদ্ধার কর, তাহলে নিঃসন্দেহে আমরা কৃতজ্ঞ থকবো।" দেখুন: আলকুরআন, সূরা ইউনুস: ২২। এ সম্পর্কে আরো দেখা যেতে পারে সূরা আন'আম : ৬৩; সূরা: আনকাবূত : ৬৫, সূরা ইসরা: ৬৭।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 অধিকাংশ মুসলিমদের শির্কে পতিত হওয়ার কারণ

📄 অধিকাংশ মুসলিমদের শির্কে পতিত হওয়ার কারণ


প্রথম পরিচ্ছেদ : অধিকাংশ মুসলিমদের শির্কে পতিত হওয়ার পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ কারণ।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ : ওলিগণ কি মানুষ ও আল্লাহর মাঝে ওসীলা বা মধ্যস্থতাকারী?
তৃতীয় পরিচ্ছেদ : পার্থিব ও পরকালীন বিষয়ে অলিগণের শাফা'আত
চতুর্থ পরিচ্ছেদ : সাধারণ মুসলিমদেরকে শির্কে পতিত করার ক্ষেত্রে শয়তানের বিভিন্ন অপকৌশল

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 উপসংহার

📄 উপসংহার


দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে মানুষ তাদের চিরশত্রু শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে যে-সব অপরাধে লিপ্ত হয় তন্মধ্যে মারাত্মক অপরাধ হচ্ছে শির্ক। এর ফলে একজন মুসলিম তার অজান্তেই ইসলাম থেকে বেরিয়ে যায়। আল্লাহ তা'আলার কাছে তার নামায, রোযা, হজ্জ ও যাকাতসহ অন্যান্য কোনো সৎকর্মেরই কোনো মূল্য থাকে না। আখেরাতে সে তার সাহায্যকারী ও শাফা'আতকারী বলতেও কাউকে পাবেনা। আল্লাহ তা'আলার প্রতি বিশ্বাসীদেরকে শির্কের এ-ভয়াবহ পরিণতির কথা বুঝানোর জন্যে মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলকে লক্ষ্য করে বলেছেন:
﴿لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ﴾
"তুমি যদি শির্ক কর, তা হলে তোমার 'আমল নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং তুমি ক্ষতিগ্রস্থদের অমত্মর্ভুক্ত হয়ে যাবে"।৩৯৫ রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-থেকে কোনো শির্ক সংঘটিত না হওয়া সত্ত্বেও এবং তিনি আল্লাহর সর্বাধিক প্রিয়ভাজন বান্দা হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে এ-ভাবে অনেকটা ধমকের সুরে সম্বোধন করে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এ-কথা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে- তাঁর উম্মতদেরকে এ-কথা সুস্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেয়া যে, এ-অপরাধ যার দ্বারাই সংঘটিত হবে, সে ব্যক্তি বাহ্যত তার নিজের ও আমাদের ধারণায় যত উঁচু দরেরই মু'মিন বলে গণ্য হয়ে থাকুন না কেন-আখেরাতে আল্লাহ তা'আলা তার যাবতীয় সৎকর্ম নিষ্ফল করে দেবেন এবং সে ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্থদের অমত্মর্ভুক্ত হয়ে যাবে।
এ-আয়াত দ্বারা এ-কথা সহজেই অনুমিত হয় যে, বিশুদ্ধ ঈমান তথা শির্কমুক্ত 'আক্বীদা ও বিশ্বাসই হচ্ছে আখেরাতে সৎ কর্মের প্রতিদান প্রাপ্তির পূর্বশর্ত। সে-জন্য কুরআনুল কারীমে শির্কমুক্ত বিশুদ্ধ ঈমানকে এমন একটি গাছের সাথে তুলনা করা হয়েছে যার শিকড় প্রোথিত রয়েছে মাটির অনেক গভীরে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এর কোনো ক্ষতি করতে পারে না বলে সর্বদা যেমনি তা পত্র-পল্লব আর ফুলে-ফলে সুশোভিত থাকে, শির্কমুক্ত বিশুদ্ধ ঈমানের অধিকারীর ঈমানও তেমনি আখেরাতে 'আমলের পত্র-পল্লব ও ফুলে-ফলে সুশোভিত থাকবে।৩৯৬ কোনো মুশরিকের নয়।
তবে দুঃখ জনক হলেও সত্য যে, এ শির্কের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হওয়া সত্ত্বেও মানব জাতির ইতিহাস এ অপরাধের দ্বারা পরিপূর্ণ।
শির্ক কি ও কেন? এ সম্পর্কে সুদীর্ঘ গবেষণা ও পর্যালোচনা করে কুরআন, হাদীস ও মুসলিম মনীষীদের মতামত যাচাই ও পর্যালোচনার করে আমি যে-সব তথ্যে উপনীত হয়েছি, সংক্ষেপে এর সারকথা নিম্নরূপ:
□ আল্লাহ তা'আলার অনেক সুন্দর নামাবলী ও সুমহান গুণাবলী রয়েছে। যেমনিভাবে তাঁর সৃষ্টির মধ্যকার কেউ তাঁর সত্তার সমকক্ষ হতে পারে না, ঠিক তেমনিভাবে তাঁর সে-সব নামাবলী ও গুণাবলীর যে বৈশিষ্ট্য রয়েছে, তাতেও তাঁর সৃষ্টির মধ্যকার কেউ তাঁর সমকক্ষ হতে পারে না। তিনি তাঁর সে-সব নামাবলী ও গুণাবলীর কারণেই আমাদের ও সমগ্র জাহানের একক রব বা প্রতিপালক। তিনি সবকিছুর প্রতিপালক হওয়ার কারণে সবকিছুর উপাস্যও এককভাবে তিনিই। কেননা, যিনি প্রতিপালক হবেন তিনি ব্যতীত আর কেউ উপাস্য হতে পারে না। আর আল্লাহই যখন আমাদের প্রতিপালক, তাই তিনি ব্যতীত আমাদের অপর কোনো উপাস্য বা ইলাহ নেই। তাঁর রুবুবিয়্যাতে যেমন কেউ তাঁর শরীক হতে পারে না, তেমনি তাঁর উলুহিয়্যাতেও কেউ তাঁর শরীক হতে পারে না।
আল্লাহ তা'আলার উপাসনা করতে হয় তাঁর সম্মান ও তা'যীম করার মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যে। সে-জন্যে তিনি আমাদের দেহ, অন্তর ও সম্পদের উপর নির্দিষ্ট প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য কিছু উপাসনা ধার্য করে দিয়েছেন। এ-গুলো নিবেদিত হবে কেবল তাঁকেই কেন্দ্র করেই। কোনো নবী-রাসূল, সৎ মানুষ ও অন্যান্য কোনো বস্তুর সম্মান, তা'যীম ও সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যে তা প্রযোজ্য হতে পারেনা।
আমাদের উপর আল্লাহ তা'আলার পরে নবী-রাসূল ও সৎ মানুষদের সম্মান পাওয়ার বৈধ অধিকার রয়েছে। তবে আল্লাহর সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্য তাঁর উপাসনা হওয়ায় এবং তাঁদের সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্য তাঁদের একরাম করা হওয়ায় উভয়ের সম্মান প্রদর্শিত হওয়ার ধরন ও পদ্ধতি সম্পূর্ণ পৃথক। যুগে যুগে মানুষেরা নবী-রাসূল ও সৎ মানুষদের সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে অতিরঞ্জিত করার কারণেই তাঁদের একরাম করতে গিয়ে তারা তাঁদের উপাসনায় লিপ্ত হয়ে আল্লাহর উলুহিয়্যাতে শির্কে লিপ্ত হয়েছে।
আল্লাহকে আমার রব বলে স্বীকৃতি দেয়ার অর্থ হচ্ছে:তাঁকে নিজের জীবন, জীবিকা, ভাগ্যের ভাল-মন্দ, যাবতীয় কল্যাণ ও অকল্যাণের একচ্ছত্র মালিক ও পরিচালক বলে বিশ্বাস করা। এ-সব ক্ষেত্রে তাঁর কোনো শরীক বা সাহায্যকারী থাকার চিন্তা করাতো দূরের কথা, তা পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো বস্তুর প্রভাব বা নবী বা অলিগণের সুপারিশকারী থাকার চিন্তা করাও উপর্যুক্ত বিশ্বাসের পরিপন্থী। যুগে যুগে মানুষের অন্তরে এ-জাতীয় বিশ্বাস লালিত হওয়ার কারণেই তারা তাঁর রুবুবিয়‍্যাতে শির্কে লিপ্ত হয়েছে।
আদম (আ.) কে সৃষ্টির পর এক হাজার বছর পর্যন্ত তাঁর সন্তানেরা তাওহীদের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। অতঃপর তারা আদম (আ.) এর কবরকে সম্মান করার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করতে যেতে সর্বপ্রথম আল্লাহর উলুহিয়্যাতে শির্কে লিপ্ত হয়। এরপর আদম সন্তানদের মধ্যকার পাঁচজন সৎ মানুষকে কেন্দ্র করে তাঁদের অনুসারীরা আল্লাহর উলুহিয়্যাত ও রুবুবিয়‍্যাতে শির্কে লিপ্ত হয়।
আল্লাহর রুবুবিয়্যাত ও উলুহিয়‍্যাতে গায়রুল্লাহের সমকক্ষতা বা শির্ক মানুষের বিশ্বাস, কর্ম ও অভ্যাসের মধ্য দিয়ে হয়ে থাকে। মানুষের বিশ্বাসের মধ্যে যে-সব শির্ক হয়, তা আল্লাহর রুবুবিয়‍্যাতের সাথে সম্পর্কিত। আর কর্মের মধ্যে যে-সব শির্ক হয়, তা আল্লাহর উলুহিয়্যাতের সাথে সম্পর্কিত। আর অভ্যাস যেহেতু সাধারণত বিশ্বাসগত কারণেই গড়ে উঠে, সেহেতু অভ্যাসগত কর্মের দ্বারা যে-সব শির্ক হয়, তাও আল্লাহর রুবুবিয়‍্যাতের সাথে সম্পর্কিত।
শির্কের দু'টি প্রকার রয়েছে। একটি 'আকবার' আর অপরটি 'আসগার'। শির্কে আকবার আবার চার প্রকার। জ্ঞানগত শির্ক, পরিচালনাগত শির্ক, অভ্যাসগত শির্ক ও উপাসনাগত শির্ক। যারা প্রথম তিন প্রকারের শির্ক করে, তারা আল্লাহর রুবুবিয়‍্যাতে শির্ক করে। আর যারা শেষ প্রকারের শির্ক করে তারা আল্লাহর উলুহিয়্যাতে শির্ক করে।
কেউ যদি অজ্ঞতাবশত একটি শির্কে আকবার করে এবং মুত্যুর পূর্বে তাথেকে তাওবা করে মরতে না পারে, তা হলে মুশরিক হিসেবেই তার হাশর হবে। আর কারো দ্বারা যদি 'শির্ক আসগার' সংঘটিত হয়, তা হলে সে মুশরিক বলে বিবেচিত হবে না;তবে তার প্রতিটি 'শির্কে আসগার' একেকটি কবীরা গোনাহ হিসেবে বিবেচিত হবে। এথেকে তাওবা করে মরতে না পারলে আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছা করলে তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শাফা'আতের মাধ্যমে ক্ষমা করতে পারেন, নতুবা সাময়িক শাসিত্মতে নিমজ্জিত করবেন।
আল্লাহর উলুহিয়্যাত ও রুবুবিয়‍্যাতে শির্ক সংঘটিত হওয়ার জন্য মানুষের অজ্ঞতা ও শয়তানের বহুমুখী ষড়যন্ত্রই মৌলিকভাবে দায়ী।
ধর্মপ্রাণ ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদেরকে তাদের অজ্ঞতার সুযোগে বিভিন্ন নবী ও সৎ মানুষদের মর্যাদা দানের ক্ষেত্রে অতিরঞ্জিত করানোর মাধ্যমে শয়তান তাদের কবরসমূহকে উপাসনালয়ে রূপামত্মরিত করেছিল। তাঁদের সম্মানার্থে তাঁদের মূর্তি বানিয়ে তাদেরকে সে-সব মূর্তির উপাসনা করতে লিপ্ত করেছিল। যা বর্তমানেও তাদের মাঝে যথারীতি প্রচলিত রয়েছে।
শয়তান নূহ আলাইহিস সালামের জাতির লোকদেরকে যে-সব শির্কী ধারণার ভিত্তিতে শির্কী কর্মে অভ্যস্থ করেছিল, ঠিক সে-রকমের শির্কী ধারণার ভিত্তিতেই আরবের দ্বীনে ইব্রাহীমের অনুসারী বলে দাবীদারদেরকেও সে পাঁচজন ওলির মূর্তিসহ আরো বিভিন্ন মূর্তির উপাসনা করতে অভ্যস্ত করেছিল। ফেরেস্তাদেরকে আল্লাহর মেয়ে হওয়ার ভ্রামত্ম ধারণা দিয়ে তাদের নামে লাত, উয্যা ও মানাত নামের দেবী বানিয়ে সে-গুলোকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়ার মাধ্যম ও তাঁর নিকট সুপারিশকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ করেছিল। সে মূর্তিগুলোকে তাদের জীবনের বিবিধ কল্যাণ ও অকল্যাণ করার সামর্থ্যবান বলেও ধারণা দিয়েছিল। আল্লাহর নিকট থেকে পার্থিব কল্যাণ প্রাপ্তি ও অকল্যাণ দূরীকরণের জন্য দেব-দেবীদের মধ্যস্থতা ও সুপারিশ পাওয়ার আশায় তাদেরকে সে-গুলোর উদ্দেশ্যে মানত করা, এদের পার্শ্বে অবস্থান করা এবং বিপদে এদের আহ্বান করা সহ মৌখিক, শারীরিক ও আমত্মরিক বিভিন্ন উপাসনায় লিপ্ত করেছিল। এ-ছাড়া তাদের অভ্যাসের মাঝেও নানা রকমের শির্কী কর্মকাণ্ডের বিস্তৃতি ঘটিয়েছিল।
নূহ আলাইহিস সালামের জাতি থেকে আরম্ভ করে শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ের মানুষদেরকে পথভ্রষ্ট করার ক্ষেত্রে শয়তান যে ধরনের কলা-কৌশল অবলম্বন করেছিল, সে রকমের কলা- কৌশল অবলম্বন করেই সে সাধারণ মুসলিমদেরকেও পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা চালিয়েছে। এ-চেষ্টার ফলেই সে তাদেরকে জ্ঞানগত, পরিচালনাগত, অভ্যাসগত ও উপাসনাগত বিভিন্ন রকম শির্কী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত করতে সক্ষম হয়েছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- ও ওলিগণ সর্বত্র হাজির ও নাজির হতে পারেন, তাঁরা গায়েব সম্পর্কে শুনতে ও জানতে পারেন এবং মৃত্যুর পরেও মানুষের উপকার করতে পারেন... ইত্যাদি মর্মে যে-সব ধ্যান-ধারণা সাধারণ মুসলিমদের মাঝে প্রচলিত রয়েছে, তা শয়তানের দেয়া শির্কী ধারণা বৈ আর কিছুই নয়। এর মাধ্যমে সে রাসূল- সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- ও ওলিগণ কে আল্লাহর রুবুবিয়্যাতের বৈশিষ্ট্যের অধিকারীর পর্যায়ে উন্নীত করেছে।
আরবের মুশরিকদের মাঝে নূহ (আ.)-এর সময়কার পাঁচজন ওলি ও তিনজন ফেরেস্তার নামে নির্মিত মূর্তি ও দেবীসমূহকে সাধারণ মানুষ ও আল্লাহর মাঝে মধ্যস্থতা ও সুপারিশকারী হওয়ার যে ধারণা দিয়েছিল, মুসলিমদের মাঝেও তাদের ওলিদের ব্যাপারে হুবহু সেই ধারণার জন্ম দিতে সক্ষম হয়েছে।
□ ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য সরাসরি আল্লাহর কাছে আবেদন- নিবেদন না করে আরবের মুশরিকদের ন্যায় তা মৃত অলিগণের ওসীলা ও সুপারিশের মাধ্যমে চাইতে অভ্যস্ত করেছে।
□ অলিগণের মধ্যস্থতা ও সুপারিশ প্রাপ্তির মাধ্যমে পার্থিব কল্যাণার্জন ও অকল্যাণ দূরীকরণের আশায় তাদেরকে মুশরিকদের ন্যায় অলিগণের কবর ও কবরসমূহে মানত দান, সেখানে অবস্থান করা, রোগমুক্তি কামনা এবং বিপদে সাহায্যের জন্য আহ্বান করাসহ বিভিন্ন রকমের মৌখিক, শারীরিক ও আমত্মরিক উপাসনায় লিপ্ত করেছে।
□ ভাগ্যের ভাল ও মন্দের প্রতি যথার্থ ঈমান না এনে সুস্থ জীবন ও উত্তম জীবিকা লাভের জন্য শরী'আত নির্দেশিত বৈধ পন্থায় তদবীর ও কর্ম না করে নানা রকম শির্কী পন্থায় তদবীর ও কর্ম করতে তাদেরকে অভ্যস্ত করে তুলেছে।
□ নবী, ওলি ও সাধারণ মানুষ নির্বিশেষে সকল কবরবাসীকে সালাম দিলে আল্লাহর বিশেষ ব্যবস্থাপনায় তারা তা শুনতে পান ও সালামের জবাব দেন। তাদের মাগফিরাতের জন্য দো'আ করলে এবং ছওয়াব রেছানী করলে এতে তাদের রুহ আনন্দিত হয়। তারা আমাদের জন্য নেক দো'আও করেন। এ-ক্ষেত্রে ওলি আর সাধারণ মানুষ বলে কোনো পার্থক্য নেই। তবে তাদের সে দো'আ আমাদের কোনো উপকারে আসেনা। কেননা, বিশুদ্ধ হাদীস মতে মানুষ মৃত্যুর পর মানুষের উপকারযোগ্য তাদের যাবতীয় 'আমল বন্ধ হয়ে যায়। তা ছাড়া বরযখী জীবন কোনো উপকারযোগ্য কর্মের জীবন নয়। কিন্তু শয়তান সাধারণ মানুষদের নিকট অলিগণের বিষয়টি এ সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম বলে ধারণা দিয়েছে। তাঁরা মরে যাওয়ার পরেও জীবিত থাকার ন্যায় আমাদের উপকার করতে পারেন বলে ধারণা দিয়েছে। তাঁদের আহ্বান করলে তাঁরা শুনতে পারেন বলেও ধারণা দিয়েছে। অথচ তাঁদের ব্যাপারে এমন ধারণা করা তাঁদেরকে আল্লাহর রুবুবিয়্যাতের বৈশিষ্ট্যে শরীক করার শামিল।
শয়তান মুশরিকদের বিশ্বাস, কর্ম ও অভ্যাসের সাথে সাধারণ মুসলিমদের অনেক বিশ্বাস, কর্ম ও অভ্যাসের বহুলাংশে সংযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। ক্ষেত্র বিশেষে বরং তাদেরকে মুশরিকদেরও অগ্রগামী করতে সামর্থ্য হয়েছে। আরবের মুশরিকরা যেখানে সমুদ্রে মারাত্মক ঝড় ও তুফানের কবলে পতিত হলে বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য তাদের দেবতাদের কথা ভুলে যেয়ে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকেই সাহায্যের জন্য আহ্বান করতো; সেখানে অনেক মুসলমাদেরকে অনুরূপ বিপদে আল্লাহর পরিবর্তে সাহায্যের জন্য বদর পীর, বড়পীর আব্দুল কাদির জীলানী ও মঈনুদ্দিন চিন্তীকে আহ্বান করতে শিখিয়েছে।
আল্লাহ তা'আলার রুবুবিয়্যাতে শির্ক করা থেকে বাঁচতে হলে জানতে হবে যে, যে-সব নামাবলী ও বৈশিষ্ট্যের কারণে আল্লাহ আমাদের রব, সে-সব বৈশিষ্ট্যের সামান্যতম কোনো বৈশিষ্ট্যেও তিনি কাউকে তাঁর শরীক করেন না। কেউ নিজ চেষ্টায়ও তাতে তাঁর শরীক হতে পারেনা।
মানুষের ভাগ্যের যাবতীয় কল্যাণ ও অকল্যাণের বিষয়টি আল্লাহর রুবুবিয়্যাতের আওতাধীন বিষয়। কোনো মানুষ বা কোনো বস্তুর পক্ষে কারো কোনো উপকার বা অপকার করার নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই। আল্লাহর ইচ্ছা হলেই কেবল কোনো মানুষ বা কোনো বস্তু কারো উপকার বা অপকারের ওসীলা বা মাধ্যম হতে পারে। তাই কোনো মানুষ বা কোনো বস্তুর দ্বারা উপকৃত হলে বলতে হবে: আল্লাহর রহমতে অমুক মানুষ বা অমুক বস্তুর মাধ্যমে উপকৃত হয়েছি। কোনো ঔষধ পান করলে বলতে হবে: অমুক ঔষধ পান করার মাধ্যমে আল্লাহর রহমতে উপকার পেয়েছি। এক কথায় যাবতীয় উপকার ও অপকারের বিষয়কে কোনো মানুষ বা বস্তুর সাথে সম্পর্কিত না করে কেবল আল্লাহ তা'আলার সাথেই সম্পর্কযুক্ত করতে হবে।
একমাত্র যমযমের পানি ব্যতীত অন্য কোনো ওলি বা পীর ফকিরের সাথে সংশিলষ্ট কোনো কূপ বা পুকুরের পানি, কবরের পুড়ানো মোম, মাটি ও গাছ ইত্যাদি মানুষের কোনো কল্যাণ করতে পারে বলে বিশ্বাস করা আল্লাহ রুবুবিয়‍্যাতে শির্কের শামিল।
ভাগ্য পরিবর্তন বা রোগ ব্যাধি নিবারণের জন্যে জ্যোতিষ, গণক, জিন সাধক, ফকির ও কবিরাজদের নিকট এরা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনেক কিছু জানে এমন ধারণা নিয়ে যাওয়া এবং তাদের দেয়া পাথরের আংটি, বালা ও তা'বীজ ব্যবহার করা ব্যবহারকারীর মনের অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে শির্কে আকবার বা আসগার হতে পারে।
সৎ ও অসৎ মানুষ নির্বিশেষে সকলের জন্যেই আল্লাহর রহমতের দরজা সর্বদা উন্মুক্ত রয়েছে। মানুষ গায়েব সম্পর্কে জানতে পারেনা বলে কাউকে কোনো সংবাদ দিতে হলে প্রয়োজনে অন্যের ওসীলা গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু মহান আল্লাহ যাবতীয় গায়েব সম্পর্কে জানেন বলে তাঁর কাছে আমাদের যে কোনো সমস্যার কথা জানাতে হলে এ- জন্যে কোনো নবী, ওলি ও বুজুর্গদের নামের ওসীলা গ্রহণের কোনো বৈধতা স্বীকৃত নয়। কেননা, আমাদের প্রয়োজনের কথা কোনো ওসীলা ছাড়াই সরাসরি তাঁকে জানানো যায়। তবে ওসীলা গ্রহণ করলে তাঁর সুন্দর নামাবলী, ঈমানের রুকুনসমূহের প্রতি ঈমান, যে কোনো সৎকর্ম, জীবিত মানুষের দো'আ, নিজের অপরাধের স্বীকৃতি ও অসহায়তা বর্ণনার ওসীলা গ্রহণ করতে হবে। কোনো নবী বা ওলির নামের ওসীলায় নয়। কেননা, মানুষেরা পরস্পরের দ্বারা প্রভাবিত হয় বলে এমন ওসীলা মানুষের মধ্যে চলতে পারে। কিন্তু মহান আল্লাহ কারো নাম শুনে প্রভাবিত হন না। তাই কারো নামের ওসীলায় তাঁর নিকট কিছু আবেদন করা যেতে পারেনা। কোনো কোন হাদীস দ্বারা বাহ্যত এমন ওসীলা গ্রহণের বৈধতা প্রমাণিত হয় বলে কারো মনে হলেও বাস্তবে সে-সব হাদীস দ্বারা তা প্রমাণিত হয়না। কেননা, সে-সব হাদীস দ্বারাও প্রকৃতপক্ষে সংশ্লিষ্ট সাহাবীদের দো'আর ওসীলা গ্রহণই মূলত উদ্দেশ্য। তাঁদের নাম ও মর্যাদার ওসীলা গ্রহণ করা সে-সবের উদ্দেশ্য নয়।
যে-সব বিষয় আল্লাহ ব্যতীত অপর কেউ দিতে পারেনা, তা আল্লাহ ব্যতীত অপর কারো নিকট চাওয়া যায়না। রাসূল -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- বা ওলিগণ মৃত্যুবরণ করেছেন বলে তাঁরা দুনিয়ার মানুষের ছোট বা বড় কোনো উপকারই করতে পারেন না। তাই তাঁদের নিকট কিছু চাওয়া যায়না। কেউ তাদের কাছে কিছু আবদার করলেও কুরআনের শিক্ষানুযায়ী তাঁরা সে আবদার শুনতে পারেন না। শুনতে পারলেও তাঁরা এর কোনো জবাব দেবেন না। তাঁদের কাছে কিছু আবদার করা শির্ক হওয়ার কারণে সূরায়ে মরয়ামের ৮২ নং আয়াতের বর্ণানুযায়ী কেয়ামতের দিন তাঁরা তাঁদের আহ্বানকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন।
কোন জীবিত মানুষের দ্বারা কোনো অলৌকিক কর্ম সংঘটিত হলে তিনি যদি শরী'আতের যথার্থ অনুসারী হন, তা হলে তা তার কারামত হিসেবে গণ্য হতে পারে। তবে এটি তাঁকে বিভ্রান্ত করার জন্য তাঁর অজান্তে তাঁর মাধ্যমে প্রকাশিত শয়তানের কোনো তেলেশমাতিও হতে পারে। আর যদি তিনি শরী'আতের অনুসারী না হন, তা হলে তা নিঃসন্দেহে শয়তানের তেলেশমাতি হয়ে থাকবে। বিষয়টি তাঁর কারামত হোক আর না-ই হোক, এ-কারণে তাঁর ব্যাপারে অতিরঞ্জিত চিন্তা করে তাঁকে আল্লাহর রুবুবিয়্যাতের কোনো কোন বৈশিষ্ট্যের অধিকারীর মর্যাদায় উন্নীত করা যাবেনা। কেননা, ওলিদের ব্যাপারে অতিরঞ্জিত চিন্তা করেই যুগে যুগে সাধারণ মানুষেরা শির্কে নিমজ্জিত হয়েছে।
আল্লাহ তা'আলার উলুহিয়্যাতে শির্ক করা থেকে বাঁচতে হলে বুঝতে হবে যে, যে বস্তু দান করা শয়তানের সামর্থ্যের মধ্যে রয়েছে, তা কোনো মৃত ওলির কবর ও কবরে আবেদনের পর অলৌকিক উপায়ে কেউ পেয়ে থাকলে এটাকে সম্পূর্ণরূপে শয়তানের তেলেশমাতি বলেই বিশ্বাস করতে হবে। কেননা, কবরে আবেদনকারী ও অন্যান্য সাধারণ মানুষদেরকে বিভ্রামত্ম করার জন্য শয়তান অদৃশ্যে থেকে সে নিজেই বা তার অনুসারীদের মাধ্যমে এমন আহ্বানকারীদের প্রয়োজন পূর্ণ করে দেয়। আবেদন পূর্ণ করা যদি শয়তানের সামর্থ্যের মধ্যে না থাকে, তা হলে বুঝতে হবে যে, আল্লাহই নিজ অনুগ্রহে আবেদনকারীর প্রয়োজনের দিক বিবেচনা করে তা পূর্ণ করে দিয়েছেন। তাতে কবরস্থ ওলির আদৌ কোনো কেরামতি নেই। কেননা, আমরা জানি যে, আরবের মুশরিকরা তাদের ওলি ও ফেরেস্তাদের নামে নির্মিত দেবতাদের কাছে বৃষ্টি চাইলে বৃষ্টি হতো। তারা এটিকে তাদের দেবতাদের ওসীলায় পেয়েছে বলেও বিশ্বাস করতো। অথচ এ বৃষ্টি আল্লাহর রহমতেই বর্ষিত হতো। এর পিছনে যেমনি তাদের দেব- দেবীদের আদৌ কোনো হাত ছিল না, তেমনি কবরে আবেদনকারীদের প্রয়োজন পূরণের পিছনেও কবরস্থ ওলির আদৌ কোনো হাত নেই।
মানুষের ঈমান ও ধৈর্যের পরীক্ষা গ্রহণের জন্য আল্লাহ তাদের ভাগ্যে কল্যাণ ও অকল্যাণ দিয়ে দীর্ঘ বা স্বল্প মেয়াদী পরীক্ষা গ্রহণ করে থাকেন। পরীক্ষা শেষে ইচ্ছা হলে তিনিই তা পরিবর্তন করেন। তাই কোনো কল্যাণার্জন বা অকল্যাণ দূরীকরণের জন্য প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত বৈধ পন্থা অবলম্বন করতে হবে। ওসীলার নামে এদিক-সেদিক মুখ না ফিরিয়ে ভয় ও আকাঙ্ক্ষার সাথে কেবল আল্লাহকেই বিনয়ের সাথে স্মরণ ও আহ্বান করতে হবে। উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য গৃহীত পন্থার উপর নির্ভরশীল না হয়ে তা প্রাপ্তির জন্য বিষয়টিকে আল্লাহর ইচ্ছার উপরে ছেড়ে দিয়ে ধৈর্যের সাথে কেবল তাঁর উপরেই ভরসা করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, কোনো কবর বা কবরের পাশে অবস্থান করা, জীবনের যে কোনো কল্যাণার্জন ও অকল্যাণ দূরীকরণের জন্যে কোনো মৃত ওলির শরণাপন্ন হওয়া, তাঁদের সাহায্যের আশাবাদী হয়ে তাঁদেরকে আহ্বান করা ও তাঁদের উপর ভরসা করা প্রকাশ্য শির্ক। আখেরাতে মানুষের মুক্তির সোপান হচ্ছে বিশুদ্ধ ঈমান ও সঠিক 'আমল। যারা এ দু'টি বৈশিষ্ট্যে বলীয়ান হবে, কেবল তারাই এ দু'য়ের ওসীলায় আল্লাহর রহমতে মুক্তি লাভে ধন্য হবে।
যারা বিশুদ্ধ ঈমান ও সঠিক 'আমল ব্যতীত মৃত ওলিদের শাফা'আতের মাধ্যমে আখেরাতের মহাসমুদ্র নিরাপদে পাড়ি দেয়ার চিমত্মা করে, তাদের সে চিমত্মা মাকড়সার জালের ন্যায়ই দুর্বল, ৩৯৭ মৃদু বাতাসে যে জাল ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যায়, সে জালকে মাকড়সার পক্ষে যেমন নিরাপদে বসবাসের জন্যে আশ্রয় স্থল হিসেবে ধারণা করা ঠিক নয়, তেমনি কারো পক্ষে আখেরাতের ভয়াবহ দিনে ওলিগণ কে মুক্তির নিরাপদ আশ্রয় স্থল হিসেবে ধারণা করাও ঠিক নয়।
অলিগণের সুপারিশ লাভে আখেরাতে ধন্য হওয়ার আশায় যারা তাঁদের কবর ও কবরে সময় অতিবাহিত করছে, তারা প্রকৃতপক্ষে মারাত্মক ভুলের মধ্যে নিমজ্জিত রয়েছে। কেননা, আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে তাঁর প্রিয়ভাজন বলতে এমন কেউ নেই- যিনি তাঁর পূর্ব অনুমতি ব্যতীত স্বীয় মর্যাদার ওসীলায় আখেরাতে তাঁর কাছে কারো জন্যে শাফা'আত করতে পারেন। বরং সাধারণ মানুষেরা আজ যাদেরকে আখেরাতে তাদের বিপদকালীন সময়ে সুপারিশ করতে পারবেন বলে সাব্যস্ত করে নিয়েছে, আল্লাহ সেদিন তাদের বলবেন: "তোমরা যাদেরকে আমার শরীক বলে মনে করতে, তাদেরকে ডাকো, তখন তারা তাদেরগকে ডাকবে। কিন্তু তাঁরা তাদের ডাকে সাড়া দেবেন না। উপরন্তু আল্লাহ তাদের মাঝে একটি অমত্মরায় সৃষ্টি করে দেবেন"।" ৩৯৮ ফলে তাদের সকল আশা ও ভরসা চিরতরে ব্যর্থতায় পরিণত হবে।
আখেরাতে রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ব্যতীত অন্যান্য নবী-রাসূলসহ সকল মু'মিন ও ওলিগণ নিজের চিমত্মায় উদ্বিগ্ন থাকবেন। হাশরের ময়দানে হিসাব-নিকাশ চলাকালীন সময়ে একমাত্র সর্ব শেষ নবী ও রাসূল মুহাম্মদ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত সাধারণভাবে কারো জন্যে কারো কোনো সুপারিশের অস্তিত্ব কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা স্বীকৃত নয়। হ্যাঁ, সাধারণভাবে তাঁদের সুপারিশ স্বীকৃত হয়েছে কেবল জাহান্নামী মু'মিনদের জাহান্নামে যাওয়ার পর তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আনার ক্ষেত্রে। আল-কুরআনে আখেরাতে শাফা'আতের বিষয়টি শুধুমাত্র কাফির ও মুশরিকদের বেলায়ই অস্বীকার করা হয়নি, বরং মু'মিন মুশরিকদের বেলায়ও তা অস্বীকার করা হয়েছে।
অতএব, যে-সব মুসলিম ভাই ও বোনেরা আখেরাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি পেয়ে ধন্য হয়ে মুহূর্তের জন্যেও জাহান্নামে না যেয়ে প্রথমেই জান্নাতে যেতে আগ্রহী, তাদেরকে এখন থেকেই যাবতীয় জ্ঞানগত, পরিচালনাগত, উপাসনাগত ও অভ্যাসগত শির্ক হতে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হতে হবে। নিজ বিশ্বাস, কর্ম ও অভ্যাস থেকে যাবতীয় শির্কী কর্মকাণ্ডকে সম্পূর্ণরূপে পরিহার করে নিতে হবে। নিজের অজান্তে যত ছোট বা বড় শির্ক হয়ে গেছে সে সবের জন্যে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইতে হবে। মনে রাখতে হবে, এর মধ্যেই রয়েছে আমাদের সকলের পরিত্রাণ।
تمت بالخير والله الحمد والمنة. وما علينا إلا البلاغ . و آخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين . و صلى الله وسلم على النبي الأمين وعلى آله وصحبه وسلم، ومن سار على نهجه و تبع هدايته إلى يوم الدين .

টিকাঃ
৩৯৫. আল-কুরআন, সূরা যুমার: ৬৫।
৩৯৬. আয়াতটি নিম্নরূপ: ﴿ مَثَلًا كَلِمَةً طَيِّبَةً كَشَجَرَةٍ طَيِّبَةٍ أَصْلُهَا ثَابِتٌ وَفَرْعُهَا فِي السَّمَاءِ ) [ابراهيم: ٢٤] আল-কুরআন, সূরা ইবরাহীম: ২৪।
৩৯৭. আয়াতটি নিম্নরূপ: مَثَلُ الَّذِينَ اتَّخَذُوا مِن دُونِ اللَّهِ أَوْلِيَاءَ كَمَثَلِ الْعَنكَبُوتِ اتَّخَذَتْ بَيْتًا وَإِنَّ أَوْهَنَ الْبُيُوتِ لَبَيْتُ الْعَنكَبُوتِ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ ﴾ [العنكبوت: ٤١] আল-কুরআন, সূরা আনকাবূত: ৪১।
৩৯৮. আয়াতটি নিম্নরূপ: وَيَوْمَ يَقُولُ نَادُوا شُرَكَاءى الَّذِينَ زَعَمْتُمْ فَدَعَوْهُمْ فَلَمْ يَسْتَجِيبُوا لَهُمْ وَجَعَلْنَا بَيْنَهُم مَّوْبِقًا [الكهف: ٥٢] আল-কুরআন, সূরা:কাহাফ: ৫২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00