📄 অন্তরের উপাসনার ক্ষেত্রে তাদের শির্ক
দেবতাদের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা : তারা তাদের দেবতাদেরকে আল্লাহর ন্যায় ভালবাসতো। আল্লাহকে ভালবেসে যেমন আল্লাহর উপাসনা করতো, তেমনি দেবতাদের ভালবেসে তাদেরও উপাসনা করতো। তাদের এমন ভালোবাসার প্রতি ইঙ্গিত করেই মহান আল্লাহ বলেন,
﴿ وَمِنَ النَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ اللَّهِ أَندَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ ﴾ [البقرة:
[١٦٥
"মানুষের মাঝে এমনও কিছু লোক রয়েছে যারা আল্লাহর অনেক সমকক্ষ নির্ধারণ করে, তাদেরকে আল্লাহর ভালোবাসার মতই ভালবাসে।"
দেবতাদের অনিষ্টের গোপন ভয় করা :
তারা মনে করতো যে, তাদের দেবতাদের কেউ বেয়াদবী করলে বা তাদের সমালোচনা করলে দেবতারা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির যে কোন অনিষ্ট সাধন করতে সক্ষম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দেবতা ও মূর্তিসমূহের সমালোচনা করার ফলে তাঁকেও তারা তাদের দেবতাদের অনিষ্টের গোপন ভয় দেখাতো। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন,
﴿ وَيُخَوِّفُونَكَ بِالَّذِينَ مِن دُونِهِ ﴾ [الزمر: ٣٦]
"আল্লাহ ব্যতীত তাদের যে সব দেবতা রয়েছে, তারা তোমাকে সে সবের অনিষ্টের ভয় প্রদর্শন করে।"
বিপদে দেবতাদের শরণাপন্ন হওয়া:
ইহকালীন প্রয়োজন বা বিপদাপদ দূরীকরণের জন্য তারা তাদের দেবতাদের শরণাপন্ন হতো। আল্লাহর কল্যাণ তাঁর নিকট সরাসরি না চেয়ে নিজেদের অক্ষমতা দেবতাদের কাছে পেশ করে, তাদের নিকট অনুনয় বিনয় করে তাদের মাধ্যমে আল্লাহর অনুকম্পা ও কল্যাণ লাভ করতে চাইতো। আল্লাহর দয়া ও অনুকম্পা লাভের জন্য এ পদ্ধতি পরিহার করে সরাসরি আল্লাহর নিকটে তাঁর দয়া কামনা প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,
﴿وَأَنِيبُوا إِلَى رَبِّكُمْ وَأَسْلِمُوا لَهُ ﴾ [الزمر: ٥٤]
"তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের দিকে প্রত্যাবর্তিত হও এবং তাঁরই নিকট আত্মসমর্পণ কর।"
বিপদে দেবতাদেরকে আশ্রয়স্থল হিসাবে মনে করা:
কোন বিপদ হলে বা কোন অকল্যাণ পেয়ে বসলে তারা তাদের দেবতাদের শরণাপন্ন হতো, তাদেরকে তাদের আশ্রয় স্থল হিসেবে মনে করতো। আল্লাহর এ জগতে তিনি ব্যতীত মানুষের জন্য অপর কোন আশ্রয় স্থল নেই; সে জন্য তিনি তাঁর রাসূলকে দিয়ে এ ঘোষণা দিতে বলেন:
قُلْ إِنِّي لَن يُجِيرَنِي مِنَ اللَّهِ أَحَدٌ وَلَنْ أَجِدَ مِن دُونِهِ مُلْتَحَدًا ﴾ [الجن: [٢٢
"আপনি তাদের বলুন: আল্লাহ তা'আলার পাকড়াও থেকে আমাকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না এবং তিনি ব্যতীত আমি অপর কোন আশ্রয়স্থলও পাব না।"
দেবতাদের উপর ভরসা করা:
তারা বিভিন্ন প্রয়োজন পূরণে তাদের দেবতাদের উপর ভরসা করতো। তাই মহান আল্লাহ বলেন : وَعَلَى اللَّهِ فَتَوَكَّلُوا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ ﴾ [المائدة: ٢٣] "যদি তোমরা মু'মিন হয়ে থাকো, তা হলে একমাত্র আল্লাহর উপরেই ভরসা করো।"
টিকাঃ
১. আল-কুরআন, সূরা আন'আম : ২৭।
২. আল-কুরআন, সূরা যুমার: ৩৬।
৩. আল-কুরআন, সূরা যুমার: ৫৪।
৪. আল-কুরআন, সূরা জিন: ২২, ২৩।
৫. আল-কুরআন, সূরা মায়েদাহ্: ২৩।
📄 আরব জনপদে প্রচলিত অভ্যাসগত শির্ক
দেব-দেবীদের নামে শপথ করা:
কোন কোন দেব-দেবীদের নামকে তারা বরকতময় ও সম্মানিত মনে করতো। তাদের নামে মিথ্যা শপথ করলে শপথকারীর পরিবার ও সহায় সম্পদে ক্ষতি হবার সমূহ আশঙ্কা করতো। যার ফলে তাদের নামে কেউ মিথ্যা শপথ করতে রাজি হতো না। গায়রুল্লাহের নামে শপথ করলে এতে গায়রুল্লাহর সম্মান করা হয় বিধায়, তা শির্কের অন্তর্গত হওয়ার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
مَنْ حَلَفَ بِغَيْرِ اللَّهِ فَقَدْ أَشْرَكَ»
"যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহর নামে শপথ করলো, সে শির্ক করলো।"
দেব-দেবীদের নামে সন্তানাদির নাম রাখা: তারা দেব-দেবীদের বরকত প্রাপ্তির জন্য সন্তানাদির নাম 'আব্দুল উজ্জা, 'আব্দে শামস ইত্যাদি রাখতো।
দেব-দেবীদের নিকট সন্তানের জন্য কল্যাণ কামনা করা: নবজাত শিশুদের নিয়ে দেব-দেবীদের কাছে গমন করে শিশুর জন্য তাদের নিকট থেকে কল্যাণ কামনা করতো। তাদের এ-কর্মের সমালোচনা প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন:
هُوَ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا فَلَمَّا تَغَشَّهَا حَمَلَتْ حَمْلًا خَفِيفًا فَمَرَّتْ بِهِ، فَلَمَّا أَثْقَلَت دَعَوَا اللَّهَ رَبَّهُمَا لَبِنْ ءَاتَيْتَنَا صَالِحًا لَّنَكُونَنَّ مِنَ الشَّاكِرِينَ فَلَمَّا ءَاتَهُمَا صَالِحًا جَعَلَا لَهُ شُرَكَاءَ فِيمَا ءَاتَنَهُمَا فَتَعَالَى اللَّهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ ﴾ [الاعراف: ۱۸۹، ১৯০]
"তিনিই সেই সত্তা যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন একটিমাত্র সত্তা থেকে; আর তাথেকেই তৈরী করেছেন তার জোড়া, যাতে তার কাছে স্বস্তি পেতে পারে। অতঃপর পুরুষ যখন নারীকে আবৃত করলো (নারী পুরুষ উভয়ে দৈহিকভাবে মিলিত হল) তখন সে গর্ভবতী হলো অতি হালকা গর্ভে। সে তা নিয়ে চলাফেরা করতে লাগলো। এরপর যখন বোঝা হয়ে গেল তখন তারা উভয়েই তাদের প্রতিপালক আল্লাহকে ডাকলো এই বলে যে, তুমি যদি আমাদেরকে সুস্থ সন্তান দান করো, তবে আমরা তোমার শুকরিয়া জ্ঞাপন করবো। অতঃপর যখন তিনি তাদেরকে সুস্থ সন্তান দান করলেন, তখন দানকৃত সে সন্তানে তারা তাঁর অংশীদার তৈরী করতে লাগলো। বস্তুত আল্লাহ তাদের শরীক সাব্যস্ত করা থেকে বহু উর্ধ্বে।"
আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে কোন বস্তু হালাল বা হারাম করা:
আল্লাহর হালালকৃত কোন কোন বস্তুকে তারা নিজ থেকে কারো জন্যে হালাল ও কারো জন্যে হারাম করে নিতো এবং বলতো যে, এ হালাল বা হারাম আল্লাহই করেছেন। যেমন তারা একটি উট একাধারে দশটি মাদী বাচ্চা জন্ম দিলে এ উটটিকে তারা দেবতাদের জন্য মুক্তভাবে ছেড়ে দিত, কেউ এর পিঠে আরোহণ করতো না, এর গায়ের পশমও নিত না, মেহমান ছাড়া অন্য কারো জন্যে এর দুগ্ধ পান করাকে বৈধ মনে করতো না। এ ধরনের উটকে তারা 'সা-ইবাহ' বলে নামকরণ করতো। এ 'সা-ইবাহ' উটটি পরবর্তীতে আরো একটি মাদী বাচ্চা জন্ম দিলে এ বাচ্চাটিকে 'বহীরাহ' নামকরণ করে এর কান ছিদ্র করে দিয়ে এটাকে তার মায়ের সাথে ছেড়ে দিত এবং এর সাথে তার মায়ের মতই আচরণ করতো।
অনুরূপভাবে একটি বকরী পরপর পাঁচ বারে দশটি মাদী বাচ্চা প্রসব করলে এবং এদের সাথে কোন নর বাচ্চা না থাকলে মহিলাদের জন্য তারা সে বকরীর মাংস ভক্ষণ করা হারাম বলে গণ্য করতো। এ বকরীটি মরে গেলে তা আবার মহিলাদের পক্ষেও ভক্ষণ করা হালাল বলে মনে করতো। এ ধরনের বকরীকে 'ওয়াসীলাহ' বলে নামকরণ করতো।
অনুরূপভাবে একটি পুরুষ উট অপর মাদী উটের সাথে রমন ক্রিয়া সম্পাদন করার ফলে কোন নর সন্তান ছাড়াই একাধারে দশটি মাদী সন্তান প্রসব করলে এ পুরুষ উটের উপর আরোহণ করা ও এর পশম আহরণ করাকে হারাম বলে গণ্য করতো। এ ধরনের উটকে তারা 'হামী' বলে নামকরণ করতো।
আল্লাহ তা'আলা তাদের এ জাতীয় খারাপ কাজ ও কুপ্রথা বা অভ্যাস সম্পর্কে বলেন: مَا جَعَلَ اللَّهُ مِنْ بَحِيرَةٍ وَلَا سَابِبَةٍ وَلَا وَصِيلَةٍ وَلَا حَامٍ وَلَكِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا يَفْتَرُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ وَأَكْثَرُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ ﴾ [المائدة: ١٠٣]
"মহান আল্লাহ 'বহীরাহ, সা-ইবাহ, ওয়াসীলাহ এবং হামীকে শরী'আত সিদ্ধ করেন নি। কিন্তু যারা কাফের তারা আল্লাহর উপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে। তাদের অধিকাংশেরই বিবেক বুদ্ধি নেই।"
তারা আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করে এ সব কর্মকে ধর্মীয় আইনের মর্যাদা দান করেছিল।
শির্কযুক্ত কথার মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক দেয়া :
তারা শির্কযুক্ত কথা-বার্তা (মন্ত্রের ন্যায়) পাঠ করে রোগীদের ঝাড়ফুঁক করতো।
'আউফ ইবন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: كُنَّا نَرْقَى فِي الْجَاهِلِيَّةِ ، فَقُلْنَا لِرَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم كَيْفَ تَرَى ذلِكَ؟ فَقَالَ : أَعْرِضُوا عَلَيَّ رُقَاكُمْ. لَا بَأْسَ بِالرُّقَ مَالَمْ يَكُنْ فِيْهِ شِرْكٌ
"আমরা জাহেলী যুগে ঝাড়ফুঁক দান করতাম। আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম: আপনি এগুলো কী মনে করেন? তিনি বলেন: "তোমরা যা বলে ঝাড়ফুঁক দিয়ে থাকো তা আমাকে পড়ে শুনাও, ঝাড়ফুঁকে কোন দোষ নেই, যদি তা শির্ক মুক্ত হয়।" এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তারা শির্কযুক্ত কথা-বার্তা মন্ত্রের ন্যায় পাঠ করে বিভিন্ন রোগ ব্যাধিতে ঝাড়ফুঁক দান করতো।
শিশুদের তা'বীজ পরানো:
চোখের অশুভ দৃষ্টি (নজর লাগা) থেকে শিশুদের রক্ষা করার জন্য তারা বাচ্চাদের গায়ে তা'বীজ ব্যবহার করতো। একই উদ্দেশ্যে তারা উটের গলায় ধাতু নির্মিত তারের মালা ঝুলিয়ে রাখতো। তা'বীজ বা ধাতু নির্মিত তারের মালা আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুল বিনষ্টকারী হওয়ায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«مَنْ عَلَّقَ تَمِيمَةً فَقَدْ أَشْرَكَ»
"যে তা'বীজ ঝুলালো সে শির্ক করলো।"
কোনো উটের গলায় তার বা হার ঝুলানো দেখলে তা কেটে দেয়ার নির্দেশ দিয়ে তিনি আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেছিলেন:
لاَ يَبْقَيَنَّ فِي رَقَبَةِ بَعِيرٍ قِلادَةٌ مِنْ وَتَرٍ، وَلَا قِلَادَةً إِلَّا قُطِعَتْ
"কোনো উটের গলায় ধাতব দ্রব্য দ্বারা নির্মিত তারের হার অবশিষ্ট রাখবে না, গলায় ঝুলানো হার পেলেই তা কেটে দিবে।"
তিনি আরো বলেন:
﴿إِنَّ الرُّقَى وَالثَّمَائِمَ وَالتَّوْلَةَ شِرْكٌ﴾ "(শির্ক যুক্ত) ঝাড়ফুঁক, তা'বীজ ও জাদু শির্ক।"
শিশুদের গলায় ঝিনুকের মুক্তা ঝুলিয়ে রাখা : শিশুরা যাতে অশুভ দৃষ্টির হাত থেকে মুক্ত হয়ে শান্ত-শিষ্ট হয়, সে-জন্য তাদের গলায় ঝিনুক থেকে আহরিত মুক্তা ঝুলিয়ে রাখতো। যারা উক্ত উদ্দেশ্যে তা ঝুলায় তাদের জন্য বদ দু'আ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«مَنْ عَلَّقَ وَدَعَةٌ فَلَا وَدَعَ اللَّهُ لَهُ» "যে (কোন কিছুর অশুভ দৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য) ঝিনুক থেকে আহরিত মুক্তা শরীরে ঝুলায় আল্লাহ যেন তার সে অকল্যাণ দূর না করেন।"
রোগ নিরাময়ের জন্য ধাতব দ্রব্য নির্মিত বালা ব্যবহার করা: তারা বাত রোগ নিরাময়ের জন্য খণিজ (ধাতব) দ্রব্য দ্বারা নির্মিত বালা হাতে পরিধান করতো। ইমরান ইবন হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে হাতে স্বর্ণের বালা পরিধান করা অবস্থায় দেখতে পেয়ে বললেন: "ওটা কী? লোকটি বললো: 'ওয়াহিনা' নামক রোগ থেকে (যা স্কন্ধ বা হাতের শিরায় হয়ে থাকে) আরোগ্য লাভের জন্য এটি পরেছি। রাসূহুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন:
أَنْزِعْهَا فَإِنَّهَا لا تَزِيدُكَ إِلَّا وَهْناً، فَإِنَّكَ لَوْ مِتَّ وَهِيَ عَلَيْكَ مَا أَفْلَحْتَ أَبَداً
"তুমি এটি খুলে ফেল, কারণ এটি তোমার রোগ বৃদ্ধি ছাড়া কোন উপকার করবে না, তুমি যদি এটি হাতে পরিধান করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করো, তা হলে কস্মিনকালেও তুমি সফল হতে পারবে না, অর্থাৎ জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে না।"
মূর্তি ও প্রতিমার স্থলে মেলা বসানো : তারা তাদের মূর্তি ও প্রতিমাসমূহের স্থলে বার্ষিক মেলা বসাতো। এ উপলক্ষে লোকেরা দূর-দূরান্ত থেকে নিজেদের নানাবিধ প্রয়োজন দেব-দেবীদের কাছে উপস্থাপন করার জন্য আগমন করতো। তাদের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য নানা রকম নজর, নিয়াজ ও হাদিয়া তুহফা দান করতো। আমাদের রাসূল বা অপর কারো কবর, কিংবা কোন স্থান ও সময়কে কেন্দ্র করে মুসলিমদের মাঝে যাতে এমন কোনো মেলার প্রচলন না হয়, সে জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :
«لَا تَجْعَلُوا قَبْرِي عِيداً»
"তোমরা আমার কবরকে ঈদ তথা মেলার স্থানে পরিণত করো না।"
নবী ও অলিদের কবরে মসজিদ নির্মাণ করা :
ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা তাদের নবী ও অলিদের মর্যাদা প্রদানের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করেছিল। তাঁদের কবরের উপর মসজিদ নির্মাণ করেছিল। সে জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের উপর অভিসম্পাত করে বলেন :
«لَعَنَ اللهُ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى اتَّخَذُوا قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِد»
"আল্লাহ তা'আলা ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের উপর অভিসম্পাত করেছেন, তারা তাদের নবীদের কবরগুলোকে মসজিদে রূপান্তরিত করেছে।"
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা এ হাদীসটি বর্ণনা করার পর বলেন:
«فَلَوْ لَا ذَلِكَ لأَبْرَزَ قَبْرَهُ غَيْرَ أَنَّهُ خَشِيَ أَنْ يَتَّخَذَ مَسْجِداً» "লোকেরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কবরকে ভবিষ্যতে মসজিদ বানানোর ভয় না থাকলে তাঁর কবর ঘরের বাইরে প্রকাশ্য স্থানেই প্রদান করা হতো।"
পাখি উড়িয়ে ভাগ্য পরীক্ষা করা: তারা পশু ও পাখিকে নিজ স্থান থেকে ধমক দিয়ে সরিয়ে বা উড়িয়ে ভাগ্য পরীক্ষা করতো। পশু বা পাখি ডান দিকে উড়ে গেলে এটাকে শুভ লক্ষণ হিসেবে গণ্য করতো। আর বাম দিকে গেলে এটাকে অশুভ লক্ষণ বলে মনে করতো। এ জাতীয় কর্ম শির্কের অন্তর্গত হওয়ায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«الطَّيَرَةُ شِرْكٌ الطَّيَرَةُ شِرْكٌ ثَلاَثاً» "পাখি উড়িয়ে দেয়া থেকে ভাগ্যের শুভ বা অশুভ নির্ধারণ করা শির্ক। (এ কর্মটি যে শির্ক তা গুরুত্বের সাথে বুঝাবার জন্য) এ কথাটি তিনি তিন বার বলেন।"
অশুভ ধারণা :
তারা কোনো কোনো দিবস, মাস, কোনো পশু-পাখি, গৃহ ও মহিলাদেরকে অশুভ ও মন্দ বলে ধারণা করতো।
উপত্যকার জিনের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা:
সফরে গিয়ে কোনো উপত্যকায় অবতরণ করলে সে উপত্যকার জিন সরদারের নিকট তারা আশ্রয় প্রার্থনা করে বলতো :
«أَعُوذُ بِسَيْدِ هَذَا الْوَادِي مِنْ شَرِّ سُفَهَاءِ قَوْمِهِ»
"এই উপত্যকার সরদারের নিকট তার জাতির দুষ্টদের অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করছি।" কুরআনুল কারীমে তাদের এ জাতীয় প্রার্থনা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
﴿ وَأَنَّهُ كَانَ رِجَالٌ مِّنَ الْإِنسِ يَعُوذُونَ بِرِجَالٍ مِّنَ الْجِنِّ فَزَادُوهُمْ رَهَقًا ﴾ [الجن: ٦]
"মানুষের মধ্যকার কিছু লোকেরা জিনদের মধ্যকার কিছু জিনের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করতো, ফলে আশ্রিত জিনেরা তাদের নিকট আশ্রয় প্রার্থনাকারীদের ভয় আরো বাড়িয়ে দিতো।"
বরই গাছ দ্বারা বরকত গ্রহণ করা :
তারা ‘যাতে আনওয়াত্ব’ নামের একটি বরই গাছ দ্বারা বরকত অর্জন করতো। এ গাছে তারা তাদের অস্ত্র ও মালপত্র ইত্যাদি বেধে ঝুলিয়ে রাখতো। এ গাছের সম্মান করতো, এর উদ্দেশ্যে মানত করতো ও এর নিচে অবস্থান গ্রহণ করতো।
একটি গাছকে কেন্দ্র করে এ ধরনের কাজ করা শির্ক, এ বিষয়টি না জানার কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণ সে গাছটি দেখে তাঁকে বলেছিলেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের জন্য অনুরূপ একটি গাছ নির্বাচন করে দিন। তখন তিনি তাদেরকে এই বলে ধমক দিয়েছিলেন :
﴿إِنَّكُمْ طَلَبْتُمْ مِثْل مَا طَلَبَ بَنُوا إِسْرَائِيلُ مِنْ مُوسَى اجْعَلْ لَنَا إِلَهَا كَمَا لَهُمْ آلِهَةٌ﴾
"তোমরা ঠিক সে রকমই আবেদন করেছো যেমন বনী ইস্রাঈলরা মূসা আলাইহিস সালাম-এর নিকট তাদের শত্রুদের দেবতাদের অনুরূপ একটি দেবতা নির্ধারণ করে দেয়ার জন্য আবেদন করেছিল।"
টিকাঃ
১. তিরমিযী, প্রাগুক্ত; কিতাবুল আইমান ওয়ান নুজুর, বাব: গায়রুল্লাহের নামে শপথ করা মকরূহ; ৪/১১০; আবু দাউদ, প্রাগুক্ত; কিতাবুল আইমান ওয়ান নুজুর, বাব নং ৪, হাদীস নং ৩২৫১; ৩/২২৩; ইমাম আহমদ, প্রাগুক্ত; ১/৪৭।
২. আল-কুরআন, সূরা আ'রাফ: ১৮৯-১৯০।
৩. সফিয়্যুর রহমান মুবারকপুরী, প্রাগুক্ত; পৃ. ৩৬।
৪. তদেব।
৫. তদেব।
৬. আল-কুরআন, সূরা মায়েদাহ্: ১০৩।
৭. মুফতী মুহাম্মদ শফী', মা'আরেফুল কুরআন; অনুবাদ ও সম্পাদনা: মাওলানা মহিউদ্দীন খান, (মদিনা : সৌদি আরব, সংস্করণ বিহীন, সন বিহীন), পৃ.৪১৬।
৮. মুসলিম, প্রাগুক্ত; কিতাবুস সালাম, বাব নং ২২ (শির্কমুক্ত ঝাড়ফুক বৈধ হওয়ার বর্ণনা) হাদীস নং ২২০০; ৪/১৭২৬; আবু দাউদ, প্রাগুক্ত; কিতাবুত ত্বিব, বাব: মা জা-আ ফির রুক্কা; ৪/২১৪; আবু জা'ফর ত্বহাবী, আহমদ ইবন মুহাম্মদ, শরহে মা'আনী আল-আ-ছার; সম্পাদনা: মুহাম্মদ যুহরী আন-নাজ্জার, (বৈরুত : দ্বারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১ম সংস্করণ, ১৩৯৯হি.), ৪/৩২৮।
৯. ইমাম আহমদ, প্রাগুক্ত; ৪/১৫৬।
১০. বুখারী, প্রাগুক্ত; কিতাবুল জিহাদ, বাব নং ১৩৯; ২/৪/১৪৩; আবু দাউদ, প্রাগুক্ত; ৩/৫২।
১১. আবু দাউদ, প্রাগুক্ত; কিতাবুত ত্বিব, বাব নং ১৭, (তা'লীকিত তামাইম), হাদীস নং ৩৮৮৩; ৪/৯; বায়হাক্বী, প্রাগুক্ত; ৯/৩৫০।
১২. ইমাম আহমদ, প্রাগুক্ত; ৪/১৫৪।
১৩. ইবন মাজাহ; কিতাবুত ত্বিব, বাব: যিয়ারতিল কবরি; ২/৫৩৪।
১৪. মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব, প্রাগুক্ত; পৃ. ১২৩।
১৫. টীকা নং ১৬২ দ্রষ্টাব্য।
১৬. বুখারী, প্রাগুক্ত; কিতাবুল জানাইয, বাব: বয়ান কারাহাতি ইত্তেখাজিল মাসাজিদি 'আalal কাবরি; ১/৩/১৮৮; মুসলিম, প্রাগুক্ত; কিতাবুল মসজিদ, বাব নং ৩; ১/৩৭৭।
১৭. তদেব।
১৮. সফিয়্যুর রহমান মুবারকপুরী, প্রাগুক্ত; পৃ. ৩৮।
১৯. আবু দাউদ, প্রাগুক্ত; কিতাব নং ২৩ (কিতাবুন রাআহু), বাব নং ২৪, হাদীস নং ৩৯১০, ৪/১৭।
২০. সফিয়্যুর রহমান মুবারকপুরী, প্রাগুক্ত; পৃ. ৩৮; ইবনে হাজার, ফাতহুলবারী; ৬/৬১।
২১. ইকনে কাছীর, তাফছীরুল কুরআনিল 'আযীম; ২/১২৮ ও ৪/৪৫৭।
২২. আল-কুরআন, সূরা জিন: ৬।
২৩. তিরমিযী, প্রাগুক্ত; কিতাবুল ফিতন..., বাব নং ১৮, হাদীস নং ২১৮০; ৪/৪৭৫।