📘 শিরক কি ও কেন > 📄 দেব-দেবীদের ধরন ও প্রকৃতি

📄 দেব-দেবীদের ধরন ও প্রকৃতি


মুশরিকরা যে সব সৎমানুষের মূর্তি, ফেরেস্তা, জিন, গাছ ও পাথরের দেব-দেবীদেরকে আল্লাহ তা'আলার রুবুবিয়‍্যাত অথবা উলুহিয়্যাতের বৈশিষ্ট্যের অধিকারী বানিয়ে নিয়ে সে সবের উপাসনা করতো, সেগুলোর প্রকৃতি বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন:

إِنَّ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ عِبَادٌ أَمْثَالُكُمْ فَادْعُوهُمْ فَلْيَسْتَجِيبُوا لَكُمْ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ ﴾ [الاعراف: ١٩٤]

"আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমরা যাদেরকে আহ্বান করো, তারা সবাই তোমাদের মতই (আমার) বান্দা। (তারা তোমাদের উপকার ও অপকার করতে পারে, এ মর্মে) তাদের ব্যাপারে তোমরা যে ধারণা করেছো, তাতে যদি তোমরা সত্যবাদী হও, তা হলে তোমরা তাদের আহ্বান করো, তারাও তোমাদের আহ্বানে সাড়া দিক।”

এখানে তাদের দেবতা ও দেবীদেরকে 'ইবাদ' তথা 'বান্দা' বলার কয়েকটি কারণ থাকতে পারে:

১. তারা পাথরের যে সব প্রতিমা ও মূর্তির পূজা করতো, সে-গুলো তাদের মতই আল্লাহর মালিকানাধীন। আর যারা আল্লাহর মালিকানায় রয়েছে, তারা সবাই তাঁর বান্দা।
২. এ-পাথরের প্রতিমা ও মূর্তিগুলো তাদের মতই আল্লাহর সৃষ্টি। আর সকল সৃষ্টিই আল্লাহর বান্দা।
৩. পাথরও তাদের ন্যায় আল্লাহর হুকুম ও আদেশের আওতাধীন।
৪. তারা ওয়াদ, সুয়া, য়াগুছ, য়া'উক ও নসর নামের যে- সব সৎমানুষ এবং যে সব ফেরেস্তাদের পূজা করতো, তারাও তাদের মতই আল্লাহর সৃষ্টি, তাঁর মালিকানাধীন ও তাঁর আদেশ ও নিষেধের আওতাধীন।

উপর্যুক্ত এ কারণসমূহের মধ্য থেকে যে কারণেই তাদেরকে 'ইবাদ' বলা হোক না কেন, এগুলো সর্বাবস্থায় তাদের মতই আল্লাহর বান্দা হওয়ায় কোনো অবস্থাতেই এরা আল্লাহর রুবুবিয়‍্যাতের কোনো বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়ে তাদের কোনো উপকার বা অপকার করতে পারে না। ইমাম কুরতুবী সৎমানুষ ও ফেরেস্তাদের সাথে সম্পর্কহীন পাথরের মূর্তিসমূহকেই এ আয়াতের উদ্দেশ্য বলে নির্ধারণ করেছেন। তবে আমার মতে এ আয়াত দ্বারা শুধুমাত্র পাথরের মূর্তিসমূহকেই উদ্দেশ্য করা হয় নি, বরং এর দ্বারা পাথরের মূর্তিসহ অন্যান্য যাবতীয় মূর্তি ও প্রতিমাসমূহকেও উদ্দেশ্য করা হয়েছে, যেগুলোকে তারা সৎমানুষ ও ফেরেস্তাদেরকে কেন্দ্র করেও তেরী করেছিল।

টিকাঃ
১. আল-কুরআন, সূরা আ'রাফ: ১৯৪।
২. কুরতুবী, প্রাগুক্ত; ৭/৩৪২।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 মুশরকিরা পাথরের মূর্তি ছাড়াও ফেরেশতা, মানুষ ও জিনদের উপাসনা করতো?

📄 মুশরকিরা পাথরের মূর্তি ছাড়াও ফেরেশতা, মানুষ ও জিনদের উপাসনা করতো?


আমাদের মাঝে মুশরিকদের ব্যাপারে একটি সাধারণ ধারণা রয়েছে যে, তাদের বানানো মূর্তিগুলোর সাথে কোন সৎ মানুষ অথবা আল্লাহর নিকটতম কোনো জীবের সম্পর্ক নেই। তারা মিছেমিছি জড়পদার্থ তথা গাছ ও পাথরের মূর্তি বানিয়ে সেগুলোর পূজা করতো বলেই আল্লাহ তাদেরকে মুশরিক বলে অভিহিত করেছেন।

তবে কাফিরদের মূর্তিসমূহের ব্যাপারে কুরআনুল কারীমের বিভিন্ন স্থানে যে সব আয়াত বর্ণিত হয়েছে, তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে এ কথা প্রমাণিত হয় যে, তাদের প্রতিমা ও মূর্তিসমূহের ব্যাপারে আমাদের উক্ত ধারণা কোনো কোনো মূর্তির বেলায় সঠিক হলেও সকল প্রতিমা ও মূর্তির ক্ষেত্রে সঠিক নয়।

আমরা একটু আগেই অবহিত হয়েছি যে, মুশরিকরা যাদেরকে আহ্বান করতো সেগুলোকে আল্লাহ তাঁর বান্দা বলে অভিহিত করেছেন। এগুলোকে বান্দা বলার কারণ সম্পর্কে আমরা আরো জেনেছি যে, তারা ফেরেস্তা ও জিনদের উপাসনা করার কারণে এগুলোকে বান্দা বলা হয়ে থাকতে পারে। এতে প্রমাণিত হয় যে, মুশরিকদের যাবতীয় প্রতিমা ও মূর্তিসমূহ মিছেমিছি পাথর সর্বস্বই ছিল না। বরং এগুলোর কোনো কোনোটি সুদূর অতীতে কোনো সৎমানুষ ও ফেরেস্তাদেরকে কেন্দ্র করেই নির্মাণ করা হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ ওয়াদ্দ, সুয়া', ইয়াগুছ, ইয়া'উক ও নসর নামের মূর্তিসমূহের কথা বলা যায়। আমরা ইতোপূর্বে অবগত হয়েছি যে, এ মূর্তিগুলো পাঁচজন অলির নামে নূহ আলাইহিস সালাম এরও পূর্ব যুগে নির্মিত হয়েছিল। এগুলো ছাড়াও ইয়াসাফ ও না-ইলাহ নামের প্রতিমাদ্বয়ও মূলত দু'জন মানুষ কেন্দ্রিক ছিল। আখেরাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেস্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ থেকেও প্রমাণিত হয় যে, মুশরিকরা তাঁদেরও পূজা করতো। সূরায়ে বনী ইসরাঈলের ৫৭ নং আয়াত দ্বারা জিনদের উপাসনা করার কথাও প্রমাণিত হয়। সর্বোপরি নিম্নে বর্ণিত আয়াতদ্বয় দ্বারাও এ সত্যই প্রমাণিত হয়। মহান আল্লাহ বলেন:

﴿ وَإِذَا رَمَا الَّذِينَ أَشْرَكُوا شُرَكَاءَهُمْ قَالُوا رَبَّنَا هَؤُلَاءِ شُرَكَاؤُنَا الَّذِينَ كُنَّا نَدْعُوا مِن دُونِكَ فَأَلْقَوْا إِلَيْهِمُ الْقَوْلَ إِنَّكُمْ لَكَاذِبُونَ ﴾ [النحل: ٨٦]

"যখন মুশরিকরা তাদের শরীকদের (আখেরাতে) দেখবে, তখন বলবে: প্রভু হে! এরাই হচ্ছে আমাদের ঐসব শরীক যাদেরকে আমরা তোমার পরিবর্তে আহ্বান করতাম। শরীকগণ তাদের এ কথার প্রতিবাদ করে বলবে: তোমরা মিথ্যাবাদী।"

এ আয়াত দ্বারা 'শুরাকা' বলতে যেমন চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, তারকা, আগুন ও পাথর ইত্যাদির কথা বুঝার সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি এর দ্বারা ফেরেস্তাদেরকে বুঝারও সম্ভাবনা রয়েছে। ইমাম কুরতুবী স্বীয় তাফসীরে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় উভয় সম্ভাবনার কথাই বর্ণনা করেছেন। ফেরেস্তা ব্যতীত অন্যান্য উপাস্যদের আখেরাতে মুশরিকদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দানের জন্য হাজির করা আল্লাহর পক্ষে কোনো কঠিন কাজ নয়। তাই এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আখেরাতে যেমন সকল উপাস্যদের হাজির করা হবে, তেমনি সে দিন ফেরেস্তাদেরকেও হাজির করা হবে এবং মুশরিকরা তাদেরকে দেখে উক্ত ধরনের কথা বলবে। এতে প্রমাণিত হয় যে, মুশরিকরা শুধু জড়পদার্থ বা চন্দ্র ও সূর্যেরই উপাসনা করে নি, তারা কোনো কোনো মূর্তিকে ফেরেশতাদের মূর্তি মনে করে তাদেরও উপাসনা করতো।

অপর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন:

﴿وَيَوْمَ يَحْشُرُهُمْ وَمَا يَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ فَيَقُولُ أَنتُمْ أَضْلَلْتُمْ عِبَادِي هَؤُلَاءِ أَمْ هُمْ ضَلُّواْ السَّبِيلَ قَالُوا سُبْحَانَكَ مَا كَانَ يَنْبَغِي لَنَا أَن نَّتَّخِذَ مِن دُونِكَ مِنْ أَوْلِيَاءَ وَلَكِن مَّتَعْتَهُمْ وَءَابَاءَهُمْ حَتَّى نَسُوا الذِّكْرَ وَكَانُوا قَوْمًا بُورًا ﴾ [الفرقان: ۱۷، ۱۸]

"সে দিন আল্লাহ একত্রিত করবেন তাদেরকে এবং তারা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইবাদাত করতো তাদেরকে, সে দিন তিনি উপাস্যদেরকে বলবেন: তোমরাই কি আমার এই বান্দাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিলে, না তারা নিজেরাই পথভ্রষ্ট হয়েছিল? তারা বলবে: আপনি পবিত্র, আমাদের পক্ষে আপনার পরিবর্তে অন্যকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করা কোনভাবেই সম্ভবপর ছিল না; তবে তাদের পথভ্রষ্ট হওয়ার কারণ হলো: আপনিই তো তাদেরকে এবং তাদের পিতৃপুরুষদেরকে ভোগসম্ভার দিয়েছিলেন, ফলে তারা আপনার স্মৃতি বিস্মৃত হয়েছিল এবং তারা ছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতি।"

এ আয়াত দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, সে সময়ের মুশরিকরা শুধু জড়পদার্থের মূর্তি বানিয়েই সেগুলোর পূজা করতো না। বরং তাদের অনেক মূর্তির পিছনে অতীতের জানা বা অজানা কোনো মানুষ ও ফেরেস্তার সম্পর্ক ছিল। সে জন্যই ইমাম ইবনে জারীর ত্ববারী এ আয়াতের অর্থ বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন:

يقول تعالى ذكره ويوم نحشر هؤلاء المكذبين بالساعة العابدين الأوثان وما يعبدون من دون الله من الملائكة والإنس والجن

"মহান আল্লাহ বলেন: যেদিন আমি আখেরাতে অবিশ্বাসী প্রতিমা পূজকদের এবং আল্লাহকে ব্যতীত তারা যে সব ফেরেস্তা, মানুষ ও জিনদের উপাসনা করতো তাদেরকে একত্রিত করবো...।" এ ছাড়াও উপরে বর্ণিত আখেরাতে আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেস্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ সংক্রান্ত আয়াত থেকেও এ-কথা সুস্পষ্টভাবেই প্রমাণিত হয় যে, কিছু লোকেরা ফেরেস্তাদেরও উপাসনা করতো। আর সে কারণেই আল্লাহ ফেরেস্তাদেরকে সে লোকদের দ্বারা তাদের উপাসনা করার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন।

উল্লেখ্য যে, আখেরাতে জিজ্ঞাসাবাদ সংক্রান্ত এ সব আয়াত দ্বারা যাদের উদ্দেশ্য করা হয়েছে তারা যেমন আরবের মুশরিকরা হতে পারে, তেমনি এ সবের উদ্দেশ্য সে সময়ের আরবের খ্রিষ্টান ও ইয়াহুদীরাও হতে পারে; কেননা, সে সময়ের অনেক খ্রিষ্টান ঈসা আলাইহিস সালাম-কে আল্লাহর পুত্র মনে করে তাঁর মূতি বানিয়ে পূজা করতো। তাদের মধ্যকার সৎমানুষদের কবরে গির্জা ও মূর্তি বানিয়ে সেখানে তাদের আরাধনা করতো। অনুরূপভাবে ইয়াহুদীরাও 'উযায়ের আলাইহিস সালাম-কে আল্লাহর পুত্র মনে করে তাঁর উপাসনা করতো।

টিকাঃ
১. আল-কুরআন, সূরা নাহাল: ৮৬।
২. ইমাম কুরতুবী উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: قوله تعالى وإذا رأى الذين أشركوا شركاءهم أي أصنامهم وأوثانهم التي عبدوها وذلك أن الله يبعث معبوديهم فيتبعونهم حتى يوردوهم الناروفي صحيح مسلم من كان يعبد شيئا فليتبعه فيتبع من كان يعبد الشمس الشمس ويتبع من كان يعبد القمر القمر ويتبع من كان يعبد الطواغيت الطواغيت الحديث خرجه من حديث أنس والترمذي من حديث أبي هريرة وفيه فيمثل لصاحب الصليب صليبه ولصاحب التصاوير تصاويره ولصاحب النار ناره فيتبعون ما كانوا يعبدون وذكر الحديث قالوا ربنا هؤلاء شركاؤنا الذين كنا ندعو من دونك أي الذين جعلناهم لك شركاء فألقوا إليهم القول إنكم لكاذبون أي ألقت إليهم الآلهة القول أي نطقت بتكذيب من عبدها بأنها لم تكن آلهة ولا أمرتهم بعبادتها فينطق الله الأصنام حتى تظهر ثم ذلك فضيحة الكفار وقيل المراد بذلك الملائكة الذين عبدوهم
আল-কুরতুবী, আবু অব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবন আহমদ, প্রাগুক্ত; ১০/১৬৩।
৩. আল-কুরআন, সূরা ফুরকান: ১৬-১৭।
৪. ইবনে জারীর আত্ ত্বাবারী, প্রাগুক্ত; ১৮/১৮৯।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 কুরায়শ ও আরবদের দাবী

📄 কুরায়শ ও আরবদের দাবী


কুরায়শ ও আরব জনগণের ধর্মীয় অজ্ঞতার সুযোগে শয়তান তাদের বিশ্বাস, কর্ম ও অভ্যাসের ক্ষেত্রে বিভিন্ন শির্ক প্রবেশ করিয়ে দিয়ে থাকলেও তারা নিজেদেরকে দ্বীনে ইব্রাহীমের যথার্থ অনুসারী বলে দাবী করতো। কার্যত তাদের মাঝে দ্বীনে ইব্রাহীমের কিছু উপাসনা ও আচার-অনুষ্ঠান যেমন: কা'বা শরীফের সম্মান করা, এর ত্বওয়াফ করা, হজ্জ ও 'উমরা করা, আরাফা, মিনা ও মুযদালিফায় অবস্থান করা এবং সেখানে উট উৎসর্গ করা ইত্যাদি ব্যতীত আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। এ সব অনুষ্ঠান সম্পাদনের ক্ষেত্রেও তারা নিজেদের পক্ষ থেকে কিছু বেদ'আতী কর্মকাণ্ডও সংযোজন করেছিল। সে সকল বেদ'আতের মধ্যকার একটি বেদ'আত এমন ছিল যে, কুরায়শগণ মনে করতো অন্যান্য লোকদের চেয়ে তাদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে, আরবের অপর কোনো গোত্রই তাদের সাথে সে বৈশিষ্ট্যে শরীক হতে পারে না। এ বৈশিষ্ট্যের কথা ভেবে তারা অন্যান্য মানুষের সাথে আরাফায় অবস্থান করা থেকে বিরত থাকতো। এর বদলে তারা মুযদালিফায় অবস্থান গ্রহণ করতো এবং সেখান থেকেই মক্কায় ফিরে আসতো। আল্লাহ তা'আলা তাদের এ কর্মকে অপছন্দ করেন এবং কাফির ও মুসলিম নির্বিশেষে সকলকে সাধারণ মানুষদের ন্যায় আরাফা থেকে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করার নির্দেশ দান করে বলেন:

(ثُمَّ أَفِيضُوا مِنْ حَيْثُ أَفَاضَ النَّاسُ) [البقرة: ١٩٩] "অতঃপর তোমরা (মক্কায়) ফিরে এসো যেখান থেকে (সাধারণ) লোকেরা ফিরে আসে।"

তাদের অপর একটি বেদ'আত ছিল যে, তারা বলতো হরমের বাইরের লোকজন হজ্জ বা 'উমরা পালনার্থে হরমে আগমন করলে তারা তাদের সাথে নিয়ে আসা খাবার হরমের মধ্যে খেতে পারবে না।

তাদের অপর একটি বেদ'আত এমন ছিল যে, তারা হারামের বাইরের জনগণের প্রতি এ নির্দেশ জারী করেছিল যে, তারা হরমে আসলে বিশেষ ধরনের বস্ত্র ছাড়া কা'বা শরীফের প্রথম ত্বওয়াফ করতে পারবে না। সে কারণে উক্ত বস্ত্র কেউ সংগ্রহ করতে অপারগ হলে উলঙ্গ অবস্থায়ই তাকে ত্বওয়াফ করতে হতো। মহিলারা সে কাপড় সংগ্রহ করতে না পারলে বুক খোলা রেখে ত্বওয়াফ করতো এবং বলতো:

"আজ শরীরের পূর্ণ বা অংশবিশেষ অনাবৃত থেকে যাচ্ছে, যা অনাবৃত থেকে যাচ্ছে তা অনাবৃত রাখাকে আমি হালাল মনে করি না।"

তাদেরকে এভাবে উলঙ্গ অবস্থায় কা'বা শরীফের ত্বওয়াফ করা থেকে বারণ করার জন্য আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿يَبَنِي ءَادَمَ خُذُوا زِينَتَكُمْ عِندَ كُلِّ مَسْجِدٍ﴾ [الاعراف: ٣١] "হে আদম সন্তানরা! মসজিদে আগমনের সময় তোমরা পোশাকাদি পরিধান করে সৌন্দর্য গ্রহণ করো।"

অনুরূপভাবে তারা ইহরাম পরিহিত অবস্থায় তাদের বাসগৃহের দরজা দিয়ে প্রবেশ করাকে জায়েয মনে করতো না। তাই গৃহে প্রবেশের জন্য তারা ঘরের পিছনের দেওয়ালে একটি ছিদ্র করে তা দিয়ে প্রবেশ করতো এবং এ কাজকে তারা একটি পুণ্যের কাজ হিসেবে মনে করতো। তাদের এ কর্মের সমালোচনা করে আল্লাহ তা'আলা বলেন,

﴿وَلَيْسَ الْبِرُّ بِأَن تَأْتُوا الْبُيُوتَ مِن ظُهُورِهَا وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنِ اتَّقَى وَأْتُوا الْبُيُوتَ مِنْ أَبْوَابِهَا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ ﴾ [البقرة: ١٨٩]

"ঘরের পিছন দিয়ে গৃহে প্রবেশ করা কোনো কল্যাণের কাজ নয়, কল্যাণের কাজতো তা-ই যে তাকওয়া অর্জন করলো। কাজেই তোমরা দরজা দিয়েই ঘরে প্রবেশ করো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা নিজেদের বাসনায় কৃতকার্য হতে পার।"

মোদ্দাকথা:
উপরে মূর্তি, প্রতিমা পূজা এবং শির্ক ও কুসংস্কারে পরিপূর্ণ যে ধর্মের কথা আলোচিত হলো তা ছিল প্রায় সকল আরবদেরই ধর্ম। এ আলোচনার মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে, কুরায়শ ও আরবগণ ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম-এর ধর্মের ক্ষেত্রে যে বিকৃতি আনয়ন করেছিল, তা শির্কের সকল প্রকারকেই শামিল করেছিল। অনুরূপভাবে তারা আল্লাহর উপাসনার ক্ষেত্রেও বিকৃতি সাধন করেছিল, যা তাদের নিকট উত্তম বেদ'আত হিসেবে গণ্য ছিল।

তাদের যাবতীয় শির্কী ও বেদ'আতী বিশ্বাস ও কর্মই তাদেরকে ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম-এর দ্বীন থেকে সম্পূর্ণভাবে বের করে দিয়েছিল। আল্লাহ তা'আলাকে একক সৃষ্টিকর্তা হিসেবে স্বীকৃতি দান এবং দ্বীনে ইব্রাহীমের কিছু কর্ম করে এর অনুসারী বলে তাদের শত দাবী থাকা সত্ত্বেও মহান আল্লাহ তাদেরকে কাফির ও মুশরিক বলে আখ্যায়িত করেন। আল্লাহর স্বীকৃতি, কা'বা শরীফের ত্বওয়াফ ও সম্মান প্রদর্শন ইত্যাদি ভাল কর্ম করা সত্ত্বেও মহান আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দৃষ্টিতে তারা মুসলিম থাকতে পারে নি। এতে প্রমাণিত হয় যে, যুগে যুগে দ্বীনে মুহাম্মদীর অনুসারীদের মধ্যে যারা কুরায়শ ও আরব জনগণের অনুরূপ হবে, তারাও দ্বীনে মুহাম্মদীর অনুসারী হওয়ার শত দাবী করে থাকলেও আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দৃষ্টিতে তারা মুসলিম থাকতে পারবে না।

টিকাঃ
১. বুখারী, প্রাগুক্ত; কিতাবুত তাফসীর, বাব নং ৩৭, হাদীস নং ৪২৪৮, ৪/১৬৪৩; ইবনে হিশাম, প্রাগুক্ত; ১/১১৯।
২. আল-কুরআন, সূরা বাক্বারাহ: ১৯৯।
৩. সফিয়্যুর রহমান মুবারকপুরী, প্রাগুক্ত; পৃ. ৩৯।
৪. তারা বলতো : "اليوم يبدو بعضه أو كله ** و ما بدا منه فلا أحله" দেখুন: ইবনে হিশাম, প্রাগুক্ত; ১/২০২, ২০৩; মুসলিম, প্রাগুক্ত; কিতাবুত তাফসীর, বাব নং ১, হাদীস নং ৩০২৮, ৪/২৩২০।
৫. আল-কুরআন, সূরা আ'রাফ: ৩১।
৬. আল-কুরআন, সূরা বাক্বারাহ: ১৮৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00