📘 শিরক কি ও কেন > 📄 আরব জনপদে উল্লেখযোগ্য মূর্তিসমূহ

📄 আরব জনপদে উল্লেখযোগ্য মূর্তিসমূহ


আরবের লোকেরা ছোট এবং বড় বিভিন্ন রকমের মূর্তিদেরকে আল্লাহ তা'আলার রুবুবিয়্যাত ও উলুহিয়্যাতের বৈশিষ্ট্যে সমকক্ষ বানিয়ে নিয়েছিল। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি মূর্তি নিম্নরূপ :

লাত : এটি 'ত্বায়েফ' নামক স্থানের 'ছক্কীফ' গোত্রের প্রসিদ্ধ এক দেবী মূর্তির নাম। এর মাধ্যমে তারা কুরায়েশ গোত্রের উপর গর্ব করতো। ইমাম ইবনে কাছীর এর বর্ণনা মতে এটি ছিল একটি সাদা পাথরের মূর্তি। এর মধ্যে একটি ঘরের চিত্র অংকিত ছিল। কা'বা ঘরের ন্যায় এটিকে তারা পর্দা দ্বারা আবৃত করে রেখেছিল। অনুরূপভাবে তারা কা'বা শরীফের প্রাঙ্গণের ন্যায় এর প্রাঙ্গণকেও পবিত্র জ্ঞান করতো। ছক্কীফ গোত্র থেকেই এর খাদেম নিয়োগ করা হতো। ইমাম ইবনে জারীর এর বর্ণনা মতে তারা 'আল্লাহ' শব্দের স্ত্রী লিঙ্গ হিসেবে এর নাম 'লাত' রেখেছিল। ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, সেখানে সুদূর অতীতে একটি চারকোণা বিশিষ্ট পাথরে বসে একজন ইয়াহুদী ব্যক্তি হাজীদের জন্য 'সাতু' তৈরী করে খেতে দিত। লোকটি সেখানে মৃত্যুবরণ করলে তার সততা ও ভাল কর্মের জন্য লোকেরা এ-পাথরকে সম্মান করে এর পার্শ্বে অবস্থান গ্রহণ করতে আরম্ভ করে। কুরায়েশ এবং সমগ্র আরব গোত্রের লোকেরাও একে পূজা ও সম্মান করতো।

উয্যা : 'উয্যা' নামের এ দেবীটি মক্কার নিকটবর্তী 'নাখলাহ' নামক স্থানে স্থাপিত ছিল। এটা কুরায়েশ গোত্রের দেবতাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়মাপের দেবতা ছিল। কুরায়েশরা কা'বা শরীফের হরমের ন্যায় এর জন্যও একটি হরম (পবিত্র এলাকা) নির্ধারণ করেছিল। সম্ভবত এটি ছিল কুরায়েশদের যুদ্ধের দেবী। তাদের সাথে কারো যুদ্ধ হলে তারা এ দেবীর কাছে যুদ্ধে জয় কামনা করতো। সে জন্যই উহুদ যুদ্ধের সময় আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহু মুসলিমদের লক্ষ্য করে বলেছিলেন : “আমাদের উয্যা দেবতা আছে, তোমাদের কোনো উয্যা নেই।” মূলত এ দেবতাটি ছিল বত্নে নাখলাহ নামক স্থানের তিনটি ছোট বাবলা গাছের সমষ্টি। এ গাছগুলোতে একটি মহিলা জিন থাকতো। এর উপাসকরা তা বুঝতে না পারলেও এ জিনই এর উপাসকদেরকে এ গাছের মধ্য থেকে অলৌকিকভাবে শব্দ শুনাতো। মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খালিদ ইবন আল-ওয়ালীদ রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে তা ধ্বংস করার জন্য প্রেরণ করেছিলেন। তিনি পর পর তৃতীয় গাছটি কাটতে উদ্যত হলে আকস্মিকভাবে সে জিনটি ঘাড়ে হাত রেখে, দাঁত কটমট করে, এলোমেলো কেশে কুৎসিত হাবশী মহিলার আকৃতিতে আত্ম প্রকাশ করে। খালেদ রাদিয়াল্লাহু আনহু তরবারী দিয়ে তার ঘাড়ে আঘাত করলে তা দ্বিখণ্ডিত হয়ে হঠাৎ একটি কবুতরে রূপান্তরিত হয়ে মরে যায়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ফিরে এসে সর্বশেষ গাছ কাটতে গিয়ে তিনি যা দেখলেন তা তাঁকে জানালেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-তা শুনে বললেন :
«تِلْكَ الْعُزَّى وَلَا عُزَّى بَعْدَهَا لِلْعَرَبِ»
“এ হাবশী মহিলাই মূলত ‘উয্যা’ ছিল, আরবদের জন্য এরপর আর কোন উয্যা থাকবে না।” অপর এক বর্ণনামতে উয্যা নামের এ দেবীটি একটি সাদা পাথর ছিল।

মানাত : এটি প্রাচীন দেব-দেবীদের মাঝে অন্যতম একটি দেবীর নাম। সম্ভবত এটি ছিল কুরবানীর দেবী। এর নামে পশুর রক্ত প্রবাহিত করা হতো। এটাকে ভাগ্যদাতা ও মৃত্যুদানকারী বলে মনে করা হতো। মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী ‘কুদায়েদ’ নামক স্থানে এটি স্থাপিত ছিল। হজ্জ উপলক্ষে ‘ইয়াসরিব’ তথা মদিনার আওস এবং খযরজ গোত্রদ্বয়ের লোকেরা এসে এর চার পার্শ্বে ত্বওয়াফ করতো। এতে (শয়তানের পক্ষ থেকে নিযুক্ত) একটি মহিলা জিন থাকতো এবং এ জিনই এর পূজারীদেরকে নানা রকম অলৌকিক কর্মকাণ্ড করে দেখাতো। মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশে সা'য়ীদ ইবন যায়দ আল-আশহালী রাদিয়াল্লাহু আনহু এ মূর্তিটি ধ্বংস করতে যান। এ সময় সে জিনটি কালো বর্ণের একটি মহিলা আকৃতিতে উলঙ্গ অবস্থায় এলোমেলো কেশে আত্মপ্রকাশ করে নিজের জন্য ধ্বংসের আহ্বান করে বুক চাপড়াতে ছিল। সা'য়ীদ রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে এ অবস্থাতেই হত্যা করেন।

টিকাঃ
২৯১. ইবনে কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল 'আযীম; ৪/২৫।
২৯২. তদেব।
২৯৩. ইবনে কাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ, এগাছাতুল লহফান; ২/১৬৮; ইবনে জারীর আত-ত্ববারী, প্রাগুক্ত; ২৭/৫৯।
২৯৪. ইবনে হিশাম, প্রাগুক্ত; ১/৮৪; ড. ফারুক হামাদাহ, আল-ওয়াসিয়্যাতুন নববীয়্যাহ; (আল-মাগরিব : দারুছ ছেক্কাফাহ, ১ম সংস্করণ, ১৯৮৩ খ্রি.), পৃ. ১৬।
২৯৫. মাওলানা সয়ৈদ সুলায়মান নদভী, প্রাগুক্ত; পৃ. ৪১৮।
২৯৬. ড. হাসান ইব্রাহীম হাসান, তারীখুল ইসলাম; (কায়রো: মাকতাবাতুন নাহদাতিল মিশরিয়‍্যাঃ, ১৪ সংস্করণ, ১৯৯৬ খিষ্টাব্দ.), পৃ. ৬১; মাওলানা সৈযদ সুলায়মান নদভী, তারীখু আরদিল কুরআন; (করাচী: দারুল এশা'আত, ১ম সংস্করণ, তারিখ বিহীন), পৃ. ৪২০; ইবনে জারীর আত-ত্ববারী, প্রাগুক্ত; ২৭/৫৯।
২৯৭. ইবনুল জাওযী, প্রাগুক্ত; পৃ. ৬৮।
২৯৮. ইবনে কাইয়্যিম আল-জাওযিয়‍্যাহ, এগাছাতুল লহফান; ২/১৬৮-১৬৯; আল- মুবারক পূরী, প্রাগুক্ত; পৃ. ৪০৯-৪১০।
২৯৯. وقال آخرون كانت العزى حجرا أبيض وقال آخرون كان بيتا بالطائف تعبده ثقیف -দেখুন: ইবনে জারীর আত-ত্ববারী, প্রাগুক্ত; ২৭/৫৯।
৩০০. মাওলানা সৈয়দ সুলায়মান নদভী, তারীখু আরদিল কুরআন; (করাচী : দারুল এশা'আত, সংস্করণ বিহীন, তারিখ বিহীন), পৃ. ৪১৮।
৩০১. তদেব।
৩০২. তদেব।
৩০৩. সফিয়্যুর রহমান মুবারকপুরী, প্রাগুক্ত; পৃ. ৪১০; -আত-ত্ববারী, আবু জা'ফর মুহাম্মদ ইবনে জারীর, প্রাগুক্ত; ২৭/৫৯।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 লাত, উয্যা ও মানাতকে নারীর নামে নামকরণ করার কারণ

📄 লাত, উয্যা ও মানাতকে নারীর নামে নামকরণ করার কারণ


লাত, উয্যা ও মানাত এগুলো তিনটি নারী দেবীর নাম। এগুলো মুশরিকদের কল্যাণ ও অকল্যাণ করতে পারে এ ধারণার ভিত্তিতে তারা এদেরকে সব সময় কল্যাণার্জন এবং অকল্যাণ দূরীকরণের জন্য আহ্বান করতো। তাদের এ আহ্বান সম্পর্কে আল্লাহ বলেন :
﴿ إِن يَدْعُونَ مِن دُونِهِ إِلَّا إِنَٰثًا وَإِن يَدْعُونَ إِلَّا شَيْطَانًا مَّرِيدًا ﴾ [النساء: ১১৭]
“তারাতো আল্লাহকে ব্যতীত শুধু নারীদের আহ্বান করে, আসলে তারা কেবল অবাধ্য শয়তানকেই আহ্বান করে”।

এখানে ‘ইনাসান’ বলে লাত, উয্যা, মানাত ও অন্যান্য নারী নামের সকল দেবীদেরকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে। এগুলোকে ‘ইনাস’ বলার পিছনে মোট তিনটি কারণ থাকতে পারে:
এক. ‘ইনাসান’ শব্দটি ‘উন্সা’ শব্দের বহুবচন। এর অর্থ নারী। লাত, উয্যা ও মানাত এ তিনটিকে নারীর নামে নামকরণ করার কারণে এদেরকে ‘ইনাসান’ বলা হয়ে থাকতে পারে। মূলত কোনো নারীদের সাথে এদের ঐতিহাসিক কোনো সম্পর্ক থাকার কারণে নয়।
দুই. আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার মতে ‘ইনাস’ অর্থ ‘আওছান’ তথা প্রতিমাসমূহ। ‘আওছান’ শব্দটি ‘ওয়াসান’ শব্দের বহুবচন। আরবীতে বহুবচন জাতীয় শব্দগুলো স্ত্রীলিঙ্গ হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। যেহেতু মুশরিকরা একাধিক 'ওয়াছান' তথা প্রতিমাকে আহবান করতো, সে জন্য এগুলোকে 'ইনাছান' বলা হয়েছে।
তিন. মুশরিকরা ফেরেস্তাদেরকে আল্লাহর মেয়ে মনে করে এদের মাধ্যমে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার জন্য এদের উপাসনা করতো। তারা এগুলোর নারী আকৃতির মূর্তি তৈরী করে এদের পূজা-অর্চনার জন্য কিছু নিয়ম নীতি তৈরী করেছিল, এদের গলায় অলংকার ঝুলিয়ে দিয়ে বলেছিল: এরা আল্লাহর মেয়ে যাদের আমরা উপাসনা করি। বিশিষ্ট তাবেঈ দাহহাক (রহ.) থেকে এ ব্যাখ্যাটি বর্ণিত হয়েছে। 'তারা এ সব মূর্তিকে আহ্বান করে মূলত অবাধ্য শয়তানকেই সাহায্যের জন্য আহ্বান করতো' উক্ত আয়াতে এ কথা বলার কারণ হলো: শয়তানই মূলত তাদেরকে এ সবের আহ্বান করতে প্ররোচিত করতো। উবাই ইবনে কা'ব রাদিয়াল্লাহু আনহু এর বর্ণনা মতে এ সব মূর্তির সাথে একটি করে মহিলা জিন থাকতো। আর এ জিনরাই অদৃশ্যে থেকে তাদের আহ্বানকারীদের উপকার করে দিত। ফলে মুশরিকরা এ উপকারকে এ সব মূর্তির কাজ বলেই মনে করতো। তাদের ধারণা মতে ফেরেস্তারা আল্লাহর মেয়ে হওয়ার কারণে তারা আল্লাহর অতীব নিকটতম ও প্রিয়ভাজন। তাদের সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারলে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া সম্ভব। সে জন্যেই তারা তাদের উপাসনা করতো এবং বলতো: "তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে, এ উদ্দেশ্যেই আমরা তাদের উপাসনা করছি"। আরো বলতো : “এরা আল্লাহর কাছে আমাদের জন্য শাফা'আতকারী।"

লাত, উয্যা ও মানাত এ তিনটি দেবীকে নারীর নামে নামকরণ করার কারণ হিসেবে যে তিনটি কারণ বর্ণনা করা হয়েছে, এর যে কোনটির কারণে এগুলোর উপর্যুক্ত নামকরণ হয়ে থাকতে পারে। তৃতীয় সম্ভাবনাটির কথা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত না হলেও মুশরিকরা যে ফেরেস্তাদেরকে আল্লাহর মেয়ে মনে করতো এবং ফেরেস্তাদেরকে উদ্দেশ্য করেই যে তারা এ তিনটি দেবীকে উপর্যুক্ত নামে নামকরণ করেছিল, তা স্বয়ং কুরআন দ্বারাই প্রমাণিত। তারা যে ফেরেস্তাদেরকে নারী মনে করতো সে সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿وَجَعَلُوا الْمَلَائِكَةَ الَّذِينَ هُمْ عِبَادُ الرَّحْمَنِ إِنَّنا﴾ [الزخرف: ১৯]
"তারা ফেরেস্তাদেরকে, যারা আল্লাহর বান্দা, তাদেরকে নারী বলে স্থির করেছে”। আবার ফেরেস্তাদেরকে যে তারা আল্লাহর মেয়ে মনে করতো, সে সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿أَفَرَوَيْتُمُ اللَّتَ وَالْعُزَّى وَمَنَوةَ الثَّالِثَةَ الْأُخْرَى * أَلَكُمُ الذَّكَرُ وَلَهُ الْأُنثَى تِلْكَ إِذَا قِسْمَةٌ ضِيرَى إِنْ هِيَ إِلَّا أَسْمَاءٌ سَمَّيْتُمُوهَا أَنتُمْ وَءَابَاؤُكُم مَّا أَنزَلَ اللَّهُ بِهَا مِن سُلْطَانٍ﴾ [النجم: ১৯, ২৩]
"তোমরা কি ভেবে দেখেছ লাত, উয্যা ও তৃতীয় আরেকটি মানাত সম্পর্কে? পুত্র-সন্তান কি তোমাদের জন্যে আর কন্যা-সন্তান আল্লাহর জন্যে। এটা হবে খুব অন্যায় বন্টন। এগুলো কতকগুলো নাম বৈ আর কিছুই নয়, যা তোমরা ও তোমাদের পূর্বপুরুষেরা রেখেছো, এসবের কোনো প্রমাণ আল্লাহ অবতীর্ণ করেন নি।”

উক্ত আয়াত দু'টির দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তারা ফেরেস্তাদেরকে আল্লাহর মেয়ে মনে করেই তাদের উপাসনার মাধ্যমে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার উদ্দেশ্যে লাত, উয্যা ও মানাত নামের এ তিনটি দেবীকে নারীর নামে নামকরণ করেছিল। সে জন্যে ইমাম ইবনে কাছীরও তাঁর তাফসীরে দাহহাক কর্তৃক বর্ণিত أَفَرَأَيْتُمُ اللات... الآية এর সাথে সামঞ্জস্যশীল বলে মন্তব্য করেছেন।

টিকাঃ
৩০৪. আল-কুরআন, সূরা নিসা: ১১৭।
৩০৫. আল-কুরতুবী, আবু ‘আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবন আহমদ আল-আনসারী, আহকামুল কুরআন; (মিশর: আল-হাইআতুল মিশরিয়্যাতু লিল কুত্তাব, ৩য় সংস্করণ, ১৯৮৭ খ্রি.), ১০/৭৮।
৩০৬. তদেব।
৩০৭. ইবনে কাছীর, তাফছীরুল কুরআনিল 'আযীম; ১/৫৬৮।
৩০৮. ইবনে জারীর ত্ববারী দাহহাক থেকে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: قال جرير عن الضحاك في الآية : قال المشركون للملائكة بنات الله وإنما نعبدهم ليقربونا إلى الله زلفى . قال فاتخذوهن أربابا وصوروهن جواري ، فحكموا وقلدوا وقالوا هؤلاء بنات الله الذي نعبده يعنون الملائكة . قال ابن كثير : هذا التفسير شبيه بقول الله تعالى : [ أفرأيتم اللات والعزى ] الآيات . দেখুন: ইবনে কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল 'আযীম; ১/৫৬৮।
৩০৯. তদেব।
৩১০. আল-কুরআন, সূরা যুমার : ৩।
৩১১. আল-কুরআন, সূরা ইউনুস : ১৮।
৩১২. আল-কুরআন, সূরা যুখরুফ: ১৯।
৩১৩. আল-কুরআন, সূরা নাজম: ১৯।
৩১৪. ইবনে কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল 'আযীম; ১/৫৬৮।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 ফেরেশতাদের উপাসনা

📄 ফেরেশতাদের উপাসনা


মুশরিকরা লাত, উয্যা ও মানাতের নামে কোনো নারী আকৃতির মূর্তি তৈরী না করলেও তারা যে ফেরেস্তাদেরকে উদ্দেশ্যে করেই এ সব নাম রেখে এগুলোর উপাসনা করতো, তা নিম্নোক্ত আয়াত দ্বারাও প্রমাণিত হয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿وَيَوْمَ يَحْشُرُهُمْ جَمِيعًا ثُمَّ يَقُولُ لِلْمَلَائِكَةِ أَهَؤُلَاءِ إِيَّاكُمْ كَانُوا يَعْبُدُونَ * قَالُوا سُبْحَانَكَ أَنتَ وَلِيُّنَا مِن دُونِهِمْ بَلْ كَانُوا يَعْبُدُونَ الْجِنَّ أَكْثَرُهُم بِهِم مُّؤْمِنُونَ ﴾ [سبا: ৪০, ৪১]
"আর যেদিন তিনি সবাইকে একত্রিত করবেন, অতঃপর ফেরেস্তাদের বলবেন: এরা কি তোমাদেরই উপাসনা করতো? তারা বলবে: আপনি পবিত্র, আপনিই আমাদের অভিভাবক, ওরা নয়; বরং তারা জিনেরই উপাসনা করতো এবং তাদের অধিকাংশরাই এদের উপর ঈমান আনয়ন করতো।"

এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মুশরিকরা কোনো কোনো ফেরেস্তাদের উপাসনা করতো। আর এ দেবীগুলোর নাম নারীর নামে রাখাতে মনে হয় যেন তারা তিনজন ফেরেস্তাকে উদ্দেশ্য করেই এ তিনটি দেবীর নাম এভাবে রেখেছিল। যদিও সে সব দেবীর স্থানে নারীর আকৃতির কোনো মূর্তি ছিল বলে কোন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না। তা পাওয়া না গেলেও তৎকালীন সময়ে আরব উপদ্বীপের বনী ইসমাঈল এবং অন্যান্য ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা ফেরেস্তা ও নবীদেরকে ইলাহ ও রবের আসনে সমাসীন করেছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।

আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿ وَلَا يَأْمُرَكُمْ أَن تَتَّخِذُوا الْمَلَائِكَةَ وَالنَّبِيِّنَ أَرْبَابًا ﴾ [ال عمران: ৮০]
"কোন নবী তোমাদেরকে এ নির্দেশ দিতে পারেন না যে, তোমরা ফেরেস্তা ও নবীদেরকে অসংখ্য রব হিসেবে গ্রহণ করবে।”

এ আয়াত দ্বারাও এ কথা প্রমাণিত হয় যে, কুরাইশরা কোনো কোনো ফেরেস্তাকে আল্লাহ্ রুবুবিয়্যাতের বৈশিষ্ট্যের অধিকারী বানিয়ে নিয়েছিল এবং সে ধারণার ভিত্তিতে তারা তাদের নিকট নিজেদের জীবনের কল্যাণ কামনা করতো ও অকল্যাণ দূরীকরণের জন্য তাদেরকে আহ্বান করতো। লাত, উয্যা ও মানাত নামের দেবীগুলোকে নারীর নামে নামকরণ করাতে বুঝা যায় যে, তারা তিনজন ফেরেশতাদের উদ্দেশ্য করেই এ তিনটি দেবীর নামকরণ করেছিল; কারণ, তারা ফেরেস্তাদেরকে আল্লাহর মেয়ে মনে করতো। والله أعلم بالصواب

টিকাঃ
৩১৫. আল-কুরআন, সূরা সাবা: ৪১।
৩১৬. আল-কুরআন, সূরা আলে ইমরান: ৮০।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 জিনের উপাসনা

📄 জিনের উপাসনা


য়াসাফ ও না-য়েলাহ: ঐতিহাসিক বর্ণনামতে এ দেবতা দু'টি মূলত 'জুরহাম' গোত্রের দু'জন মানুষ ছিল। য়াসাফ না-য়েলাহকে ভালবাসতো। একদা কা'বা শরীফের অভ্যন্তরে তারা অবৈধভাবে যৌনকর্মে লিপ্ত হলে আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে তাৎক্ষণিক শাস্তিস্বরূপ দু'টি পাথরে রূপান্তরিত করেন। সাধারণ লোকেরা যাতে এদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে সে জন্য লোকেরা এ পাথর দু'টির একটিকে কা'ba শরীফের পার্শ্বে এবং অপরটিতে যমযম কূপের পার্শ্বে স্থাপন করেছিল। দীর্ঘদিন যাবত এ পাথর দু'টি এভাবেই ছিল। যুগের পরিক্রমায় এ পাথর দু'টির বাস্তব ইতিহাসও পরবর্তী লোকেরা ভুলে যায়। এরই মধ্যে তাদের মাঝে মূর্তি পূজার প্রচলন হয়। তখন অন্যান্য মূর্তির সাথে এ-গুলোকেও তারা পূজা করতে থাকে। কুরায়েশরা পরবর্তিতে কা'বা শরীফের পাশেরটিকে অপরটির নিকটে স্থানান্তরিত করেছিল এবং এ দু'টির নিকট তারা পশু যবাই ও কুরবানী করতো।

জুল খালাসাহ : এটি ছিল একটি সাদা রঙ্গের পাথর। এর মাথায় ছিল একটি টুপির নকশা। মক্কা ও ইয়ামনের মধ্যবর্তী স্থানে এর জন্য একটি গৃহ ছিল। খাছ'আম, বুজায়লা ও অন্যান্য নিকটতম স্থানের লোকেরা এটাকে সম্মান করতো এবং তাদের মনোবাঞ্ছনা পূরণের জন্য এর উদ্দেশ্যে অর্থ সম্পদ প্রেরণ করতো। এটি ধ্বংস করার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জারীর ইবন 'আব্দুল্লাহ আল-বাজালী রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে একদল অশ্বারোহী বাহিনী দিয়ে প্রেরণ করেছিলেন।

জুল কাফীল : এ দেবতাটি ছিল 'দাওস' নামক গোত্রের নিকট পূজনীয়। 'আরব জনপদে এভাবে যখন মূর্তি পূজার হিড়িক পড়ে যায়, তখন মক্কা ও এর বাইরের সকল জনগণই নিজ নিজ গৃহে উপাসনার জন্য পৃথক পৃথক মূর্তি গ্রহণ করেছিল। যখন তাদের কেউ কোথাও ভ্রমণে যাওয়ার জন্য তৈরী হতো, তখন সে ব্যক্তির গৃহের সর্বশেষ কাজ হতো এ মূর্তির গায়ে হাত বুলানো এবং ভ্রমণ থেকে ফিরে আসলেও গৃহে প্রবেশ করলে তাদের প্রথম কাজই হতো সম্মানের উদ্দেশ্যে এ মূর্তির গায়ে হাত বুলানো।

মুশরিকরা সাধারণত উপর্যুক্ত জড়পদার্থের মূর্তি এবং মানুষ ও ফেরেস্তাদের নামে নির্মিত মূর্তিসমূহের প্রতি এরা তাদের লাভ ও ক্ষতি করতে পারে- এ ধারণার ভিত্তিতে এদেরকে সাহায্যের জন্য যেমন আহ্বান করতো, তেমনি কোনো কোনো এলাকার লোকেরা জিনের ব্যাপারেও উপর্যুক্ত ধারণা পোষণ করে জিনদেরকেও সাহায্যের জন্য আহ্বান করতো। যেমন আল্লাহ বলেন:
﴿أُوْلَبِكَ الَّذِينَ يَدْعُونَ يَبْتَغُونَ إِلَى رَبِّهِمُ الْوَسِيلَةَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ وَيَرْجُونَ رَحْمَتَهُ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ ﴾ [الاسراء: ৫৭]
“যাদেরকে তারা আহ্বান করে তারা নিজেরাই তো তাদের রবের অধিক নিকটবর্তী হওয়ার ব্যাপারে প্রতিযোগিতা করে, তারা তাঁর রহমতের আশা করে এবং তাঁর শাস্তিকে ভয় করে।”

এ আয়াতের তাফসীরে ইবন মাস'উদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে:
[قَالَ كَانَ نَفَرٌ مِنَ الجِنَّ أَسْلَمُوا وَكَانُوا يُعْبَدُوْنَ فَبَقِيَ الَّذِينَ كَانُوا يَعْبُدُوْنَ عَلَى عِبَادَتِهِمْ وَقَدْ أَسْلَمَ النَّفَرُ مِنَ الْجِنِّ]
"একদল জিন ইসলাম গ্রহণ করেছিল যাদের উপাসনা করা হতো; তাদের ইসলাম গ্রহণ করা সত্ত্বেও যারা তাদের উপাসনা করতো তারা যথারীতি তাদের উপাসনায় থেকে যায়।”

বিপদে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা আল্লাহর উপাসনা হওয়া সত্ত্বেও কোনো কোনো লোকেরা যে জিনদের উপাসনা করতো, তা জিনদের স্বীকারোক্তির দ্বারাও প্রমাণিত হয়। যেমন জিনরা বলেছিল :
﴿ كَانَ رِجَالٌ مِّنَ الْإِنسِ يَعُوذُونَ بِرِجَالٍ مِّنَ الْجِنِّ فَزَادُوهُمْ رَهَقًا ﴾ [الجن: ৬]
“মানুষের মধ্যকার কিছু লোকেরা জিনদের মধ্যকার কিছু জিনের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করতো, ফলে তারা জিনদের আত্মম্ভরিতা বাড়িয়ে দিত।”

এ ছাড়াও আল্লাহর অবাধ্যতায় মুশরিকরা শয়তানের নির্দেশের আনুগত্য করে মূর্তি পূজা করার কারণে তারা আল্লাহর আনুগত্যের ক্ষেত্রে শয়তানকে শরীক করে নিয়েছিল। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿ وَجَعَلُوا لِلَّهِ شُرَكَاءَ الْجِنَّ وَخَلَقَهُمْ ﴾ [الانعام: ১০০]
'আর মুশরিকরা শয়তানকে আল্লাহর শরীক করে নিয়েছে, অথচ তিনি তাদের সৃষ্টি করেছেন।”

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে কাছীর বলেন: “যারা আল্লাহর উপাসনায় জিন তথা শয়তানকে শরীক করে নিয়েছিল উক্ত আয়াতে তাদের সে উপাসনার প্রতিবাদ করা হয়েছে। তারা শয়তানের নির্দেশের আনুগত্য করার কারণেই মূর্তি পূজা করেছিল বিধায়, প্রকৃতপক্ষে তারা শয়তানেরই আনুগত্য করেছে এবং তার কাছেই সাহায্য চেয়েছে ও তারই সুপারিশ কামনা করেছে।”

টিকাঃ
৩১৭. তদেব; ২/১৭০।
৩১৮. ইবনে হাজার আসকালানী, ফতহুল বারী বিশরহিল বুখারী;, বৈরুত: দ্বারুল মা'রিফাহ, সংস্করণ বিহীন, সন বিহীন, ৮/৭১।
৩১৯. ইবন হিশাম, প্রাগুক্ত; ১/৮৩; ইবনে কাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ, এগাছাতুল লহফান; ২/১৭১; ইবনে কাছীর, আল-বেদায়াতু ওয়ান নেহায়াহ; ১/১৯১- ১৯২।
৩২০. আল-কুরআন, সূরা বনী ইসরাঈল: ৫৭।
৩২১. বুখারী, প্রাগুক্ত; বাব নং ২০৬, হাদীস নং ৪৪৩৮; ৪/১৭৪৮; মুসলিম, প্রাগুক্ত; কিতাবুত তাফসীর, বাব নং ৩, হাদীস নং ৩০৩০, ৪/২৩২১; কুরতুবী, প্রাগুক্ত; ১০/২৭৯।
৩২২. আল-কুরআন, সূরা জিন: ৬।
৩২৩. আল-কুরআন, সূরা আন'আম : ১০০।
৩২৪. তিনি বলেন: هذا رد على المشركين الذين عبدوا مع الله غيره وأشركوا به في عبادته أن عبدوا الجن فجعلوهم شركاء له في العبادة تعالى الله عن شركهم وكفرهم فإن قيل فكيف عبدت الجن مع أنهم إنما كانوا يعبدون الأصنام فالجواب أنهم ما عبدوها إلا عن طاعة الجن وأمرهم إياهم بذلك كقوله إن يدعون من دونه إلا إناثا وإن يعبدون إلا شيطانا مريدا দেখুন: ইবনে কাছীর, তাফসীরুল কুরআনিল 'আযীম; ২/১৬৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00