📄 অন্তরের উপর ফরযকৃত গোপন উপাসনাসমূহ
প্রতিটি মানুষের অন্তরের প্রাথমিক গোপন কাজ হচ্ছে সে অন্তর দিয়ে আল্লাহ তা'আলার বর্তমান থাকা এবং তাঁকে এককভাবে সকল সৃষ্টির প্রতিপালক ও উপাস্য হিসেবে দ্বিধাহীন চিত্তে বিশ্বাস করবে। অন্তরের এ ধরনের বিশ্বাস হচ্ছে অন্তরের উপাসনা। কোনো মানুষই এ বিশ্বাস ব্যতীত মু'মিন হতে পারে না বিধায়, এ বিষয়টি প্রমাণের জন্য প্রমাণ উপস্থাপনের প্রয়োজন পড়ে না। এবার যদি কেউ আল্লাহ তা'আলাকে অস্বীকার করে অথবা নিজ বিশ্বাস, কর্ম বা কথার দ্বারা আল্লাহর রুবুবিয়্যাতের আওতাধীন কোনো বিষয়ে বা তাঁর কোনো উপাসনায় অপর কোনো সৃষ্টিকে জেনে বা না জেনে শরীক রয়েছে বলে বিশ্বাস করে, তা হলে সে ব্যক্তি তার অজান্তেই মুশরিক হয়ে যাবে।
আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি মহব্বত:
আল্লাহ তা'আলা ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি মানুষের ভালোবাসারস্বরূপ হচ্ছে সে ভালোবাসা তাদের নিজেদের সত্তা, নিজ সন্তানাদি, পিতা-মাতা ও অন্যান্য সব কিছুর চেয়ে অধিক হবে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَ وَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ»
“আমি যতক্ষণ তোমাদের কারো নিকট তার পিতা, সন্তান ও সকল মানুষের চেয়ে অধিক ভালোবাসার পাত্র না হবো, ততক্ষণ সে প্রকৃত মু'মিন হতে পারবে না।”
একদা 'উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেছিলেন: “হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি আমার নিকট আমার নিজ সত্তা ব্যতীত অন্য সব কিছুর চেয়ে অধিক প্রিয়। তাঁর কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْكَ مِنْ نَفْسِكَ»
"শপথ সেই সত্তার যাঁর হাতে আমার আত্মা! যতক্ষণ আমি তোমার নিকট তোমার নিজ সত্তার চেয়েও অধিক প্রিয় না হবো, ততক্ষণ তুমি পূর্ণাঙ্গ মু'মিন হতে পারবে না।”
কেউ যদি বলে: আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালবাসি, তা হলে জীবনের সকল ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুসরণ করার মধ্য দিয়েই তাকে তার এ দাবীর সত্যতা প্রমাণ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন:
﴿قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ﴾ [آل عمران: ৩১]
“আপনি তাদেরকে বলুন! তোমরা যদি সত্যিকার অর্থে আল্লাহ তা'আলাকে ভালবেসে থাক, তা হলে তোমরা আমার অনুসরণ কর, এতে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধসমূহ মার্জনা করবেন।”
একজন রাসূল মহব্বতকারীর পরিচয় হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণ যদি তার প্রাণ, তার স্ত্রী, পুত্র-কন্যা ও সম্পদ ইত্যাদিকে বিসর্জন দেয়ার দাবী করে, তা হলে সে নির্দ্বিধায় তা বিসর্জন দিতে প্রস্তুত হয়ে যাবে। কেননা; তা একটি বিশেষ ধরনের ভালোবাসা, যাকে আল্লাহর দাসত্ব প্রকাশের ভালোবাসা বলা হয়। এ জন্য প্রয়োজন আল্লাহর বিধানের সামনে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ। আল্লাহর অবাধ্যতায় অন্য কারো ভালোবাসা প্রকাশের জন্য এ ধরনের কোনো বিসর্জন দেয়া যেতে পারে না। এখন যদি কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদেশ বা নিষেধ পালনের পরিবর্তে অপর কোনো ধর্মীয় গুরু বা রাজনৈতিক নেতার আদেশ বা নিষেধ পালনের জন্য নিজের সব কিছু বিসর্জন দেয়, তা হলে বুঝতে হবে যে, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসার উপর তাদের ভালোবাসাকে প্রাধান্য দিয়েছে এবং এভাবে সে গায়রুল্লাহর ভালোবাসাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিশেষ ভালোবাসার সমকক্ষ বানিয়ে নিয়েছে। এ জাতীয় ভালোবাসার লোকদের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন :
﴾ وَمِنَ النَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ اللَّهِ أَندَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِ اللَّهِ وَالَّذِينَ ءَامَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ ﴿ [البقرة: ১৬৫]
"মানুষের মাঝে এমনও কিছু লোক রয়েছে যারা আল্লাহর একাধিক সমকক্ষ নির্ধারণ করে, তাদেরকে আল্লাহর ভালোবাসার ন্যায় ভালবাসে। বস্তুত যারা ঈমান এনেছে তারা আল্লাহ তা'আলাকেই সব চেয়ে অধিক ভালবাসে।”
আরবের মুশরিকরা তাদের দেবতাদের এ ধরনের ভালবাসতো বিধায়, আল্লাহ এ আয়াতে তাদের এ জাতীয় ভালোবাসার সমালোচনা করেছেন। মুসলিমদের মাঝে যারা আল্লাহর অবাধ্যতায় তাদের নেতৃবৃন্দের আদেশ ও নিষেধকে ভালোবাসা ও আন্তরিকতার সাথে গ্রহণ করবে, তাদের অবস্থাও আরবের মুশরিকদের মতই হবে।
ভালোবাসার প্রকারভেদ (أنواع المحبة) :
এখানে উল্লেখ্য যে, ভালোবাসা মূলত দু'প্রকার :
এক. বিশেষ ধরনের ভালোবাসা, যাকে আমরা 'আল্লাহর সত্তাগত ভালোবাসা' বলতে পারি। যে ভালোবাসা নিয়ে আমরা উপরে আলোচনা করেছি। এ জাতীয় ভালোবাসা কেবল আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অন্য কারো জন্যে হতে পারে না। রাসূল- সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসাও আল্লাহর ভালোবাসার কারণে হতে হবে, রাসূলের সত্তাগত কোনো ভালোবাসা নয়। রাসূল আমাদেরকে আল্লাহর পক্ষ থেকে হেদায়াতের বাণী পৌঁছিয়েছেন, আমাদেরকে দ্বীনের দিশা দিয়েছেন, আমাদেরকে তিনি পথভ্রষ্টতা থেকে বাঁচাতে সারাজীবন সংগ্রাম করে গেছেন সেজন্যই তাঁকে ভালোবাসতে হবে। কেবল রাসূলের ব্যক্তিসত্ত্বার জন্য এ জাতীয় ভালোবাসা হতে পারবে না। হ্যাঁ, রাসূলের জন্য অন্যান্য ভালোবাসা যোগ হতে পারে, যার আলোচনা সামনে আসছে।
দুই. সাধারণ ভালোবাসা। এটি আবার তিন প্রকার:
১. প্রকৃতিগত ভালোবাসা, যেমন- কোনো বিশেষ প্রকারের মাছ, মাংস বা মিষ্টি খাওয়ার প্রতি অন্তরের আকর্ষণ। অনুরূপভাবে ক্ষুধার্ত মানুষের আহার ও তৃষ্ণার্ত মানুষের পানির প্রতি আকর্ষণ, এ সব একই পর্যায়ের ভালোবাসা। এ সব বস্তুর প্রতি অন্তরের ভালোবাসা যেমন সম্মান মিশ্রিত নয়, তেমনি এ ভালোবাসার সাথে সম্মান প্রদর্শনেরও কোনো সম্পর্ক নেই। সুতরাং এ জাতীয় ভালোবাসার সাথে শির্কেরও কোন সম্পর্ক নেই।
২. একত্রে বসবাস ও সহাবস্থানগত ভালোবাসা। যেমন- কোন শিল্প কারখানার কর্মচারীদের পারস্পরিক ভালোবাসা। স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের পারস্পরিক ভালোবাসা। ভ্রমণ বা ব্যবসার সঙ্গীদের পারস্পরিক ভালোবাসা। ভিন্ন দেশে অবস্থানকারী একদেশী মানুষের পারস্পরিক ভালোবাসা। একইভাবে স্বামী-স্ত্রী ও বন্ধু-বান্ধবদের পারস্পরিক ভালোবাসা ইত্যাদি। এ জাতীয় ভালোবাসাতেও উপাসনাগত সম্মান প্রদর্শনের কোনো সম্পর্ক না থাকায় এর সাথেও শির্কের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
৩. দয়া ও অনুগ্রহপ্রসূত ভালোবাসা। যেমন- সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার এবং পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা। এ জাতীয় ভালোবাসার সাথেও উপাসনাগত সম্মান প্রদর্শনের কোনো যোগসূত্র নেই বলে এতেও আপত্তির কিছু নেই।
উপর্যুক্ত এ তিন প্রকারের ভালোবাসা দ্বারা পরস্পরের প্রতি অস্বাভাবিক ধরনের কোনো বিনয় ও সম্মান প্রদর্শিত বা প্রমাণিত হয় না বিধায়, এ সবের সাথে শির্কের কোনো সম্পর্ক নেই।
গোপন ভয়ের উপাসনা )عبادة خوف السر( :
একজন মু'মিন আল্লাহর ব্যাপারে তার অন্তর দিয়ে গোপনে এ-ভয় পোষণ করবে যে, আল্লাহর কাছে প্রকাশ্য আর অপ্রকাশ্য বলতে কিছুই নেই। মানুষ প্রকাশ্যে বা গোপনে যা-ই করে না কেন, তিনি তা সবিশেষ অবহিত আছেন। আমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য অথবা আমাদের অন্যায় ও অপরাধজনিত কারণে তিনি ইচ্ছা করলে হঠাৎ করে যে কোনো সময় আমাদের যে কোনো অনিষ্ট হতে দিতে পারেন। আমাদের অন্যায় ও অপরাধের শাস্তি তিনি আমাদেরকে এ দুনিয়াতে না দিলেও আখেরাতে দিতে পারেন। সে জন্য তিনি আমাদেরকে সর্বদা তাঁর শাস্তির ভয় ও রহমতের আশায় থেকেই তাঁকে আহ্বান করতে নির্দেশ করে বলেছেন:
﴿وَادْعُوهُ خَوْفًا وَطَمَعًا﴾ [الأعراف: ৫৬]
“আর তোমরা তাঁকে (আল্লাহ তা'আলাকে) ভয় ও আশার মধ্যে থেকেই আহ্বান করো।”
ভয় ও আশার মধ্যে থেকে আল্লাহ তা'আলাকে আহ্বান করার প্রতি আমাদেরকে আদেশ করার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, অন্তরে এ ধরনের ভয় ও আশা নিয়ে তাঁকে আহ্বান করা হচ্ছে অন্তরের একটি বিশেষ ধরনের ইবাদাত বা উপাসনা। কোনো মানুষের ব্যাপারে কারো অন্তরে এ ধরনের ভয় ও আশার সৃষ্টি হতে পারে না, কেননা; আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে এমন কোনো মানুষ ও জিন নেই, যারা আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত স্রেফ তাদের নিজস্ব ইচ্ছানুযায়ী কারো কোনো অনিষ্ট সাধন করতে পারে। কারো দ্বারা কারো ইষ্ট বা অনিষ্ট হওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভর করে বিধায়, আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে কেবল তাঁকেই ভয় করতে আদেশ করে বলেছেন:
﴿فَلَا تَخْشَوُا النَّاسَ وَاخْشَوْنِ﴾ [المائدة: ৪৪]
"সুতরাং তোমরা মানুষের কোনো অনিষ্টের ভয় করো না, ভয় কেবল আমাকেই কর।” কাফিররা তাদের দেবতাদের ব্যাপারে অনুরূপ গোপন ভয় পোষণ করতো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দেবতাদের সমালোচনা করেন বলে তাঁকেও তারা তাদের দেবতাদের দ্বারা হঠাৎকরে যে কোনো অনিষ্টের শিকার হওয়ার ব্যাপারে ভয় প্রদর্শন করতো। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿أَلَيْسَ اللَّهُ بِكَافٍ عَبْدَةٌ، وَيُخَوِّفُونَكَ بِالَّذِينَ مِن دُونِهِ ﴾ [الزمر: ৩৬]
"আল্লাহ কি তাঁর বান্দার জন্য যথেষ্ট নয়? অথচ তারা (মুশরিকরা) তোমাকে আল্লাহর পরিবর্তে অন্যান্য উপাস্যদের ভয় প্রদর্শন করে।”
যেহেতু মহান আল্লাহর অনুমোদন ব্যতীত কেউ কারো কোনো ক্ষতি বা অনিষ্ট করতে পারে না, সেহেতু কোনো জিন- পরী, বা জীবিত বা মৃত কোনো অলি বা দরবেশ, অথবা মাযারস্থ কোনো বৃক্ষ বা অন্য কিছুর দ্বারা কোনো কারণবশত কারো কোনো অনিষ্ট হতে পারে- এমন ধারণা ও ভয় করাও আল্লাহর গোপন ভয়ের উপাসনায় শির্ক করার শামিল।
ভয়ের প্রকারভেদ )أنواع الخوف :
ভয় মূলত চার প্রকার:
প্রথম প্রকার: গোপন ভয়। যা নিয়ে উপরে আলোচনা করা হয়েছে। এমন ভয় আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অপর কারো জন্যে করা শির্ক।
দ্বিতীয় প্রকার: কোনো মানুষ বা ফিৎনার ভয়ে কোনো সৎকর্মের আদেশ এবং অসৎকর্ম হতে বারণ করা থেকে বিরত থাকা। এ ধরনের ভয় শির্ক না হলেও তা হারাম। কারণ, কুরআনুল কারীমে এ ধরনের ভয় করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। মু'মিনদের পরিচয় দান প্রসঙ্গে বলা হয়েছে: ﴿يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لَائِمٍ﴾ [المائدة: ৫৪] "তারা আল্লাহ তা'আলার পথে জিহাদ করে এবং কোনো নিন্দুকের নিন্দার ভয় করবে না।”
হাদীস শরীফে এ ধরনের ভয়কারীদের ব্যাপারে আখেরাতে ভৎর্সনা ও জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে। হাদীসে কুদসীতে বর্ণিত হয়েছে:
«إِنَّ اللَّهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى يَقُولُ لِلْعَبْدِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ : مَا مَنَعَكَ إِذَا رَأَيْتَ الْمُنْكَرَ أَنْ لَا تُغَيَّرَهُ ؟ فَيَقُولُ يَا رَبِّ : خَشِيتُ النَّاسَ فَيَقُولُ : إِيَّايَ كُنْتُ أَحَقَّ أَنْ تَخْشَى»
"কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ বান্দাকে বলবেন: অন্যায় কর্ম দেখার পর কোন বস্তু তোমাকে তা পরিবর্তন করতে বাধা দিল? তখন বান্দা বলবে: হে প্রভু! পাছে লোকে কী বলে, এ ভয়ে আমি তা নিষেধ করতে পারি নি। আল্লাহ বলবেন: মানুষের চেয়ে আমিইতো ভয়ের অধিকতর হকদার ছিলাম।”
তৃতীয় প্রকার: আল্লাহর শাস্তির ভয়, যে শাস্তির ব্যাপারে তিনি তাঁর অবাধ্য ও অপরাধী বান্দাদের ভয় প্রদর্শন করেছেন। এ জাতীয় ভয় মু'মিনদের অন্তরে থাকা প্রশংসনীয়। যারা এ গুণে গুণান্বিত হবে, তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর নিকট আকর্ষণীয় পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি। যেমন- মহান আল্লাহ বলেন : ﴿ ذَلِكَ لِمَنْ خَافَ مَقَامِي وَخَافَ وَعِيدِ ﴾ [ابراهيم: ১৪]
"এ-পুরস্কার তাদের জন্যেই যারা হিসেবের জন্য আমার সম্মুখে দণ্ডায়মান হওয়াকে এবং আমার শাস্তিকে ভয় করে।"
চতুর্থ প্রকার: প্রকৃতিগত ভয়, যেমন- ওৎ পেতে থাকা শত্রু বা হিংস্র জীব-জন্তু, বিষধর সাপ, পানিতে ডুবে ও আগুনে পুড়ে মরে যাওয়া ইত্যাদির ভয়। এ জাতীয় ভয় কোনো নিন্দনীয় বা দূষণীয় নয় কারণ; এ জাতীয় ভয় সম্মান মিশ্রিত হয় না। মূসা আলাইহিস সালাম-এর অন্তরে ফের'আউন ও তার সৈন্যদের ব্যাপারে এ জাতীয় ভয় ছিল। এ কারনেই তিনি মিসর ছেড়ে পালিয়ে যান। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন :
﴿فَخَرَجَ مِنْهَا خَائِفًا يَتَرَقَّبُ ﴾ [القصص: ২১]
“অতঃপর তিনি (মূসা) শত্রু আগমনের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে সেখান থেকে ভীত অবস্থায় বের হয়ে পড়েন।”
কামনার উপাসনা )عبادة الرجاء( :
'রাজা-উন' শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে : মনের কামনা পূর্ণ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। মানুষের মনের কামনা মূলত দু'প্রকারের হয়ে থাকে :
এক. এমন সব চাহিদা যা পূর্ণ হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যে কর্ম করতে হয়, তা ব্যক্তির নিজের বা অপর যে কোনো মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে থাকে। এ জাতীয় চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে অন্য জীবিত উপস্থিত মানুষের নিকট সাহায্য চাওয়া যেতে পারে। তবে কোনো মৃত বা অনুপস্থিত কোনো মানুষের কাছে এ জন্য সাহায্যের আহ্বান করলে তা শির্কে আকবার এর অন্তর্গত হবে।
দুই. এমন সব কামনা যা পূর্ণ করে দেয়া আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অপর কারো সামর্থ্যের মধ্যে নেই। যেমন: সন্তান দান করা, ব্যবসায় উন্নতি প্রদান করা, রোগ-ব্যাধি নিরাময় করা, সমুদ্র বা নদীতে ঝড় ও তুফানের হাত থেকে রক্ষা করা, জঙ্গলের হিংস্র জীব-জন্তুর হাত থেকে রক্ষা করা... ইত্যাদি। মানুষের এ জাতীয় চাহিদা পূরণ করা একমাত্র আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অপর কারো সামর্থ্যের মধ্যে নেই। তাই এ জাতীয় কল্যাণার্জন ও অকল্যাণ দূরীকরণের জন্য কোনো অলি বা দরবেশের নিকট সাহায্য কামনা করা শির্কে আকবারের পর্যায়ভুক্ত; কেননা, এতে করে তাঁদেরকে আল্লাহর রুবুবিয়্যাতের বৈশিষ্ট্যের অধিকারীর মর্যাদায় উন্নীত করা হয় এবং তাঁদের কাছে কামনা-বাসনা করা হয়।
ভরসার উপাসনা )عبادة التوكل( :
একজন মু'মিনের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে তার করণীয় হচ্ছে, উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য যে কর্ম করা প্রয়োজন, তা নিজের সাধ্যের মধ্যে থাকলে তা নিজে করা বা অপর জীবিত ও উপস্থিত কারো সাধ্যের মধ্যে থাকলে প্রয়োজনে তাদের সহযোগিতায় তা সম্পাদন করা এবং কর্মের ফলাফল প্রাপ্তির জন্য আল্লাহ তা'আলার কাছে দু'আ করা এবং তাঁরই উপর ভরসা করা। কর্ম যদি কারো সাধ্যের মধ্যে না থাকে, তবে নিজে বা অপর জীবিত উপস্থিত মানুষের দু'আর মাধ্যমে আল্লাহর নিকট তা কামনা করা এবং তা অর্জিত হওয়ার জন্য একমাত্র আল্লাহর উপরেই ভরসা করা। কোনো অবস্থাতেই নিজের বা অপর কারো উপর ভরসা না কর। কেননা, প্রকৃত মু'মিনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সকল ব্যাপারে আল্লাহর উপর ভরসা করা। সে-জন্য আল্লাহ বলেন,
﴿ وَعَلَى اللَّهِ فَتَوَكَّلُوا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ ﴾ [المائدة: ২৩]
“তোমরা যদি সত্যিকার অর্থে মু'মিন হয়ে থাকো, তাহলে একমাত্র আল্লাহর উপরেই ভরসা কর।” এতে প্রমাণিত হয় যে, প্রকৃত মু'মিন হতে হলে সর্বাবস্থায় আল্লাহর উপরেই ভরসা করতে হবে। তা না করে যারা আল্লাহর পাশাপাশি নিজের বা অন্যের কর্মের উপর ভরসা করবে, তারা শির্কে আসগারে পতিত হবে। আর যা কারো সাধ্যের মধ্যে নেই, তা প্রাপ্তির জন্য যারা কোনো অলি বা দরবেশের উপরে ভরসা করবে, তারা শির্কে আকবারে পতিত হবে।
এখানে উল্লেখ্য যে, মানুষের সামর্থ্যের মধ্যকার কর্মের ক্ষেত্রেও কর্ম আরম্ভ করে তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহর উপরেই ভরসা করতে হবে, এ কারণে যে, কর্ম করার জন্য যে শক্তি ও সামর্থ্যের প্রয়োজন, সে সবের মালিক হলেন আল্লাহ। তিনি তৌফিক দিলেই কেবল আমরা কোনো কর্ম শুরু ও তা শেষ করতে পারি। অন্যথায় হাজারো ইচ্ছা ও চেষ্টা করেও আমরা তা করতে পারবো না।
কর্ম না করে আল্লাহর উপর ভরসা করা অবৈধ: এখানে আরো উল্লেখ্য যে, কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য প্রয়োজনীয় কর্ম না করে তা হাসিলের জন্য আল্লাহর উপর ভরসা করাকে শর'য়ী দৃষ্টিতে 'তাওয়াককুল' বলা হয় না। এ ধরনের ভরসা শর'য়ী দৃষ্টিতে বৈধ নয়। কেউ যদি খাওয়া-দাওয়া না করে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য আল্লাহর উপর ভরসা করে এবং এভাবে থেকে শেষ পর্যন্ত মারা যায়, তবে শর'য়ী দৃষ্টিতে এমন ব্যক্তি আত্মহত্যাকারী হিসেবে গণ্য হবে।
আনুগত্য ও অনুসরণের উপাসনা (عبادة الطاعة والاتباع) :
একজন মু'মিনের যাবতীয় আনুগত্য ও অনুসরণ নিঃশর্তভাবে নিবেদিত হবে কেবলমাত্র আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্যে। রাজনৈতিক বা ধর্মীয় নেতাদের যে আদেশ বা নিষেধ পালন করলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য ও অনুসরণ হবে, কেবল সে ক্ষেত্রেই একজন মুসলিম তাঁদের আনুগত্য ও অনুসরণ করবে। আর যে ক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতা হবে, সে ক্ষেত্রে কোনো কারণবশত বাহ্যত তাঁদের আনুগত্য ও অনুসরণ করলেও খুশী মনে অন্তর দিয়ে তাঁদের আনুগত্য করবে না। আনুগত্যের এ বিধান বর্ণনা প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন,
﴿يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُوْلِي الْأَمْرِ مِنكُمْ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا ﴾ [النساء: ৫৯]
তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তোমাদের মধ্যকার দায়িত্বপ্রাপ্তদের আনুগত্য কর। অতঃপর কোনো বিষয়ে সে দায়িত্বশীলদের সাথে তোমরা মতবিরোধ করলে সত্যিকারার্থে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান এনে থাকলে বিরোধপূর্ণ সে বিষয়টিকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও, এটা তোমাদের জন্য উত্তম এবং পরিণতির দিক থেকে তা খুবই ভাল।”
এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কোনো বিষয়ে মতবিরোধ হলে বিনা দলীলে কেউ কারো কোনো কথা মানতে পারবে না; বরং সে ক্ষেত্রে সাধারণ ও ক্ষমতাশীন নির্বিশেষে সকলকেই আল্লাহ্ তা'আলার কিতাব ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহীহ সুন্নাতের দিকে ফিরে আসতে হবে; কেননা, এ দু'টিই হচ্ছে যে কোনো বিবাদ মীমাংসার ফয়সালাদায়ক ও যে কোনো বিধান রচনা করার মূল উৎস। ধর্মীয় বা পার্থিব কোনো ক্ষেত্রেই ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ বা জাতীয় সংসদের দ্বারা গৃহীত কোনো আইন বা সিদ্ধান্তই- তা বাহ্যত যতই কল্যাণকর হোক না কেন- কুরআন ও সহীহ হাদীসে বর্ণিত বিধান বা তাতে বর্ণিত মৌলিক নীতিমালার আওতাধীন হওয়ার ছাড়পত্র ব্যতীত বৈধ হতে পারে না। এর কারণ হচ্ছে-মানুষ একমাত্র আল্লাহরই সৃষ্টি, তাই তাদের সার্বিক জীবন পরিচালিত হবে তাঁরই দেওয়া হেদায়াত ও বিধানানুযায়ী। এ হেদায়াত ও বিধানই যে তাদের দুনিয়া-আখেরাতের যাবতীয় সুখ, শান্তি ও কল্যাণের নিয়ামক, সে সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
﴿فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدًى فَمَن تَبِعَ هُدَايَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ وَالَّذِينَ كَفَرُوا وَكَذَّبُوا بِنَايَاتِنَا أُوْلَبِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ ﴾ [البقرة: ৩৮, ৩৯]
“অতঃপর যদি তোমাদের নিকট আমার পক্ষ থেকে কোন হেদায়াত আসে, তাহলে যারা আমার সে হেদায়াত অনুসরণ করবে, তাদের উপর না কোন ভয় আসবে, না তারা চিন্তাগ্রস্ত হবে। আর যারা তা অস্বীকার করবে এবং আমার নিদর্শনগুলোকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে, তারাই হবে জাহান্নামবাসী, সেখানে তারা অনন্তকাল থাকবে।”
আল্লাহ যে মানুষের সার্বিক জীবন পরিচালনার একক বিধান দাতা, সে সম্পর্কে তিনি বলেন:
﴿إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ ﴾ [يوسف: ৪০]
“হুকুম হবে একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই, তিনি তোমাদেরকে একমাত্র তাঁরই উপাসনা করতে নির্দেশ করেছেন।”
এ আয়াতের মর্ম হচ্ছে- তিনি মানুষের ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে কুরআনুল কারীম ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহীহ হাদীসে প্রকাশ্যভাবে বা ইশারা ও ইঙ্গিতে যে সব বিস্তারিত বিধান ও মৌলিক নীতিমালা দিয়েছেন, সাধ্যানুযায়ী তা পালন করার মধ্য দিয়েই জীবনের সার্বিক ক্ষেত্রে তাঁর আনুগত্যের উপাসনার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে তিনি আমাদের নির্দেশ করেছেন। এতে প্রমাণিত হয় যে, আমাদের জীবনকে শাসন করার জন্য কুরআনুল কারীম ও সহীহ হাদীসের দিকে প্রত্যাবর্তন না করে নিজ থেকে কোনো বিধান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার কোনো বৈধ অধিকার আমাদের নেই। কোনো ক্ষেত্রে কুরআনুল কারীম বা সহীহ হাদীসে সুস্পষ্ট বিধান থাকা সত্ত্বেও বা সে বিষয়ে তাতে বিধান রচনার জন্য কোনো মৌলিক নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও সে সুস্পষ্ট বিধান বা নীতিমালা পরিহার করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যদি জনগণের জন্য নিজ থেকে কোনো বিধান রচনা করেন, তা হলে আল্লাহর দৃষ্টিতে তারা নিজেদের প্রবৃত্তিকেই নিজেদের ইলাহ বানিয়ে থাকবেন। এ জাতীয় লোকদের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন :
﴿ أَفَرَعَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَئَهُ ﴾ [الجاثية: ২৩]
"আপনি কি সে ব্যক্তিকে দেখেছেন যে তার প্রবৃত্তিকে নিজের ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে।”
এ জাতীয় লোকদের ব্যাপারে আল্লাহর বক্তব্য হচ্ছে:
﴿وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَلَهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللَّهِ ﴾ [القصص: ৫০]
“আল্লাহর হেদায়াত ব্যতীত যারা নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তাদের চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে।”
সাধারণ জনগণ যদি সে ধরনের কোনো বিধান বিনা প্রতিবাদে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেন, তা হলে তাদের অবস্থা ইয়াহূদী ও খ্রিষ্টানদের মতই হবে, যারা তাদের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের এ জাতীয় কর্মকে সন্তুষ্ট চিত্তে গ্রহণ করার ফলে তাদেরকে রব বানিয়ে নিয়েছিল। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ ﴾ [التوبة: ৩১]
"ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা তাদের পাদরী ও ধর্মযাজকদের আল্লাহর বদলে বহু রব বানিয়ে নিয়েছিল।”
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় 'আদী ইবন হাতিম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। উক্ত হাদীস শ্রবণ করার পর তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেন: “হে রাসূল! আমরাতো তাদেরকে রব বানিয়ে নেই নি? জবাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: তারা কোনো বস্তু হালাল বা হারাম বলে দিলে তোমরা কি তা গ্রহণ করো না? জবাবে আদী বলেন- হ্যাঁ, তা করি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : এটিই হচ্ছে তাদেরকে রব বানানোর শামিল।”
উপর্যুক্ত আয়াত ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, যারা কোনো রাজনৈতিক নেতা বা ধর্মীয় কোনো ইমাম বা কোনো মাযহাবের নিঃশর্ত আনুগত্য ও অন্ধ অনুসরণ করবে, তাঁদের গৃহীত বিধান বা মতামতের ভুল-শুদ্ধ বিচার না করে এর বিপরীতে কুরআনুল কারীম ও সহীহ হাদীস পাওয়া সত্ত্বেও চোখ বন্ধ করে অন্ধভাবে তাঁদের আনুগত্য ও অনুসরণ করবে, আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূলের দৃষ্টিতে তাদের পরিণতি ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের মতই হবে। বিশেষ করে ধর্মীয় ক্ষেত্রে এ ধরনের অনুসরণ করার ব্যাপারে শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (মৃত ১১৭৬ হি.) স্বীয় গ্রন্থ 'হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ'তে এবং ক্বাযী সানাউল্লাহ পানিপথী (১১৮৩-১২২৫ হি.) তাঁর তাফসীরে মাযহারীতে মুসলিমদের জন্য সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। অন্ধ তাকলীদ হারাম হওয়া প্রসঙ্গে শাহ ওয়ালী উল্লাহ (রহ.) যা বলেছেন, তা সংক্ষেপে নিম্নে বর্ণিত হলো:
“যিনি কোনো একটি বিষয়েও ইজতেহাদ করার মত যোগ্যতা অর্জন করবেন, তার পক্ষে সে বিষয়ে অপরের অন্ধ তাকলীদ করা হারাম।
অনুরূপভাবে যার নিকট এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো একটি আদেশ বা নিষেধ করেছেন এবং সে আদেশ বা নিষেধের ব্যাপারে বর্ণিত অন্যান্য সকল হাদীস অনুসন্ধান করে এবং এর পক্ষে বা বিপক্ষে যারা রয়েছেন, তাদের কথা-বার্তা অনুসন্ধান করে সে ব্যক্তি যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সে আদেশ বা নিষেধের কোনো মনসুখ বা রহিতকারী দলীল খুঁজে না পায়, অথবা বিষয়টি যদি এমন হয় যে, অধিকাংশ ইসলামী বিশেষজ্ঞগণ রাসূলের আদেশ বা নিষেধ সম্বলিত কোনো হাদীস গ্রহণ করে থাকেন, অথচ দেখা যায় যিনি তা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিরোধিতা করছেন, তিনি কেবল কোনো ক্বিয়াস (রায়) অথবা ইজতেহাদ বা অনুরূপ কিছুর দ্বারা এর বিরোধিতা করছেন, এমতাবস্থায় সে যদি (তা অনুধাবন করার পরেও নিজের ইমাম বা মাযহাবের মতামত পালন করার জন্য) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সে হাদীসের বিরোধিতা করে, তখন বুঝতে হবে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীসের বিরোধিতার পিছনে তার অন্তরে গোপন নেফাকী বা প্রকাশ্য আহমকী ব্যতীত আর কোনো কারণ নেই।”
মাওলানা সানাউল্লাহ পানিপথী (১১b৩-১১২৫ হি.) কুরআনুল কারীমে বর্ণিত:
﴿وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ ﴾ [آل عمران: ৬৪]
"আমরা যেন পরস্পরকে রব হিসেবে গ্রহণ না করি।”
এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেন: "এখান থেকে বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো হাদীস যদি কারো নিকট কোনো প্রকার বিরোধ থেকে মুক্ত অবশ্যই সহীহভাবে প্রমাণিত হয় এবং এর কোনো রহিতকারীও তার নিকট প্রমাণিত না হয়, এমতাবস্থায় উদাহরণস্বরূপ ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর কোনো ফতোয়াও যদি এর বিপরীতে হয়, আর চার ইমামের কোনো ইমাম এ হাদীসের উপর 'আমল করে থাকেন, তা হলে সে ব্যক্তির পক্ষে উক্ত হাদীসের উপর 'আমল করা ওয়াজিব হয়ে যাবে। (এমতাবস্থায়) কঠিনভাবে তার মাযহাবকে আঁকড়ে ধরে থাকা যেন তাকে সে হাদীসের উপর 'আমল করা থেকে বিরত না রাখে। কেননা, এমনটি করলে এতে আল্লাহকে ব্যতীত পরস্পরকে অসংখ্য রব বানানোর শামিল হবে।”
তাকলীদ করার সরল ও সঠিক পন্থা:
আমরা যারা সাধারণভাবে কুরআন ও হাদীস অল্প-বিস্তর জানি অথবা যারা জানি না, আমরা সকলে অবশ্যই কারো না কারো অনুসরণ বা তাকলীদ করবো।
তবে এ ক্ষেত্রে ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের অনুরূপ হওয়ার অভিযোগ থেকে বাঁচতে হলে আমরা কোনো মাযহাব বা কোনো মনীষীর তাকলীদ করার ক্ষেত্রে এ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করবো যে, যখনই কোনো বিষয়ে আমরা অনুসরণীয় মাযহাব বা মনীষীর কোনো মতামত কুরআন ও সহীহ হাদীসের বিপরীতে রয়েছে বলে নিজস্ব পড়া-শুনা অথবা কারো মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে অবগত হতে পারবো, তখনই সে বিষয়ে সে মাযহাব বা সে মনীষীর মতামতের উপর 'আমল করা পরিহার করে কুরআন ও সহীহ হাদীসের দ্বারা যা করা সঠিক বলে প্রমাণিত হয়, তা-ই করবো।
অনুরূপভাবে যখনই আমাদের নিকট নিজ মাযহাবে প্রচলিত কোনো 'আমলের বিপরীতে অপর কোনো মাযহাবের 'আমল এক বা একাধিক অপেক্ষাকৃত বিশুদ্ধ হাদীস ও যুক্তির আলোকে 'আমলের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবার যোগ্য বলে প্রতীয়মান হবে, তখনই আমরা যাবতীয় ধরনের গোঁড়ামি পরিহার করে নিজ মাযহাবের 'আমল পরিত্যাগ করে সে মাযহাবের আমলকে গ্রহণ করবো।
আশা করি, এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কারো বা কোনো মাযহাবের অনুসরণ করলে এতে আমরা ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের অনুরূপ হওয়া থেকে বাঁচতে পারবো। সাধারণ লোকেরা যে এ ধরনের সরল ও সোজা দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কারো না কারো তাকলীদ করবে এ প্রসঙ্গে শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) বলেন:
"যে ব্যক্তি কারো তাকলীদ করে এ মানসিকতা নিয়ে যে, সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত অপর কারো কথা মানতে রাজি নয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হালাল বা হারাম করেছেন সে কেবল তাই হালাল বা হারাম বলে বিশ্বাস করে। কিন্তু, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী বলেছেন, তা তার জানা নেই, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বক্তব্যসমূহের মাঝে মতবিরোধপূর্ণ কথাগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের বা তাঁর কথা থেকে অনুসন্ধান করে মাসআলা বের করার পন্থা সম্পর্কেও তার কোনো জ্ঞান নেই, এমতাবস্থায় সে যদি কোনো হেদায়াত প্রাপ্ত আলিমের অনুসরণ করে এ ধারণার ভিত্তিতে যে, তিনি যা বলেন তা সঠিক, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথার বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করেই ফতোয়া দেন এবং তাঁর সুন্নাতের অনুসরণ করেন, তবে তিনি (অনুসরণীয় ব্যক্তি) যদি কখনও তার উক্ত ধারণার বিপরীত কিছু করেন বলে তার নিকট প্রমাণিত হয়, তা হলে সে কোনো প্রকার বিতর্ক অথবা জিদ না করে তাৎক্ষণিকভাবেই সে আলিমের অনুসরণ করা পরিত্যাগ করবে। তা হলে এমন তাকলীদকে কেউ কিভাবে অস্বীকার করতে পারে ?...তিনি অতঃপর বলেন: যে নিষ্পাপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণ আল্লাহ তা'আলা আমাদের উপর ফরয করে দিয়েছেন, সে রাসূলের কোনো হাদীস যদি বিশুদ্ধ সনদে আমাদের নিকট পৌঁছায়, আর তা যদি নিজ ইমামের মাযহাবের বিপরীত কিছু প্রমাণ করে, এমতাবস্থায় আমরা যদি তাঁর হাদীসকে পরিত্যাগ করে মুজতাহিদের হাদীস বিরোধী ইজতেহাদকে গ্রহণ করি, তা হলে আমাদের চেয়ে অধিক জালিম আর কে হতে পারে? কেয়ামতের দিন রব্বুল আলামীনের নিকট আমাদের কী জবাব হবে?”
টিকাঃ
১৮৬. বুখারী, প্রাগুক্ত; কিতাবুল ঈমান, বাব: রাসূলের ভালবাসা ঈমানের অন্তর্গত; ১/১/১৭; মুসলিম, প্রাগুক্ত; কিতাবুল ঈমান, বাব: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভালবাসা অপরিহার্য; ১/৬৭। হাদীসটি আনাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত।
১৮৭. বুখারী, প্রাগুক্ত; কিতাবুল আইমান ওয়ান নুজুর, বাব: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শপথ কেমন ছিল?; ৪/৬/২৩১-২৩২।
১৮৮. আল-কুরআন, সূরা আলে ইমরান: ৩১।
১৮৯. আল-কুরআন, সূরা বাক্বারাহ: ১৬৫।
১৯০. মনে রাখতে হবে যে, রাসূলের প্রতি আমাদের ভালোবাসাও এ পর্যায়ের। তাঁর প্রতি আমাদের ভালোবাসার কারণ হচ্ছে, • তাঁকে ভালোবাসতে আল্লাহ্ নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং তাঁর ভালোবাসার মাধ্যমে আল্লাহর নির্দেশকে আমরা বাস্তবায়ণ করি। • তিনি আমাদেরকে সঠিক পথের দিশা দিয়েছেন, সুতরাং তাঁর অনুগ্রহ আমাদের উপর অনেক। তাই তাঁকে ভালোবাসতে হবে। • তিনি আমাদেরকে ভালোবাসতেন, তাই তাঁর ভালোবাসার প্রতিদানস্বরূপ আমরাও তাঁকে ভালোবাসব। • তাঁর আনুগত্যের নির্দেশ আল্লাহ তা'আলা দিয়েছেন। সে নির্দেশ বাস্তবায়ণ করতে হলে ভালোবাসার কোনো বিকল্প নেই। রাসূলের প্রতি আমাদের ভালোবাসা কখনই সত্তাগত নয়, বরং গুণগত। এ বিশ্বাস প্রতিটি মুমিনের রাখা উচিত। [সম্পাদক]
১৯১. এটাই হচ্ছে অনুমোদিত ভালোবাসা ও নিষিদ্ধ ভালোবাসার সীমারেখা। কোনোক্রমেই এ সব ভালোবাসায় অস্বাভাবিক ধরনের কোনো বিনয় ও সম্মান প্রদর্শিত বা প্রমাণিত হতে পারবে না। যদি কোনোভাবে এগুলোতে এ জাতীয় কিছু পরিলক্ষিত হয়, তবে সেটাও শির্কী ভালোবাসায় পরিণত হবে। যদি কেউ রাসূল, স্ত্রী, পণ্য, সন্তান-সন্তানাদি, অথবা দুনিয়ার যে কোনো বস্তু বা বিষয়ের প্রতি পরিপূর্ণ বিনয় ও অস্বাভাবিক ভালোবাসা দেখায় তবে সেটাও মা'বুদে পরিণত হবে এবং যে এ ধরনের ভালোবাসবে সে মুশরিক হয়ে যাবে। [সম্পাদক]
১৯২. শেখ সুলাইমান ইবন আব্দুল্লাহ, প্রাগুক্ত; পৃ. ৪৬৮। (সংক্ষিপ্ত) তবে এটাও উপরোক্ত শর্ত দ্বারা শর্তযুক্ত। [সম্পাদক]
১৯৩. ইবনে কাছীর, প্রাগুক্ত; ২/২৩১। ইমাম ইবন কাছীর সূরা আ'রাফের )وَادْعُوْهُ خَوْفاً وَ طَمَعَاً( এ আয়াতে ব্যাখ্যায় বলেন: أي خوفا مما عنده من وبيل العقاب وطمعا فيما عنده من جزيل الثواب
১৯৪. আল-কুরআন, সূরা আ'রাফ: ৫৬।
১৯৫. আল-কুরআন, সূরা মায়েদাহ: ৪৮।
১৯৬. আল-কুরআন, সুরা যুমার: ৩৬।
১৯৭. আল-কুরআন, সূরা মায়েদাহ: ৫৪।
১৯৮. ইবন মাজাহ, প্রাগুক্ত; কিতাবুল ফিতন, বাব নং (২০); ২/১৩২৮। (তবে হাদীসটির সনদ দুর্বল [সম্পাদক])
১৯৯. আল-কুরআন, সূরা ইব্রাহীম: ১৫।
২০০. আল-কুরআন, সূরা ক্বাসাস : ২১।
২০১. মনে রাখা জরূরী যে, কামনা-বাসনার মাধ্যমে শির্ক হওয়ার জন্য এটা জরুরী নয় যে, কেউ মনে করবে যে যাদের কাছে সে কামনা-বাসনা করছে, তাদের নিকট রুবুবিয়্যাতের কোনো বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। কারণ, যদি এরকম কোনো বিশ্বাস থাকে, তবে তা হবে, দু'দিক থেকে শির্ক। প্রথমত, রুবুবিয়্যাতে শির্ক, তারপর তার কাছে কামনা-বাসনার কারণে সে আল্লাহর উলুহিয়্যাতেও শির্ক করল। সুতরাং কেউ যদি কারও ব্যাপারে রুবুবিয়্যাতের কোনো বৈশিষ্ট্য নেই মনে করেও তার কাছে এমন কোনো কিছু পাওয়ার কামনা-বাসনা করে, যা একমাত্র আল্লাহর কাছেই থাকতে পারে, তাতেও সে আল্লাহর উলুহিয়্যাত তথা ইবাদাতে শির্ক করেছে বলে গণ্য হবে। [সম্পাদক]
২০২. আল-কুরআন, সূরা মায়েদাহ্: ২৩।
২০৩. আল-কুরআন, সূরা নিসা: ৫৯।
২০৪. আল-কুরআন, সূরা বাক্বারাহ : ৩৮, ৩৯।
২০৫. আল-কুরআন, সূরা আন'আম : ৫৭।
২০৬. আল-কুরআন, সূরা জাছিয়াহ: ২৩।
২০৭. আল-কুরআন, সূরা ক্বাসাস : ৫০।
২০৮. আল-কুরআন, সুরা তাওবাহ: ৩১।
২০৯. তিরমিযী, প্রাগুক্ত; কিতাবুত তাফসীর, বাব: নং- ৯।
২১০. এ প্রসঙ্গে তিনি যা বলেছেন তা নিম্নরূপ: إنما يتم أي تحريم التقليد فيمن له ضرب من الاجتهاد ولو في مسألة واحدة. و فيمن ظهر عليه ظهورا بينا أن النبي صلى الله عليه وسلم أمر بكذا و نهى عن كذا ، و أنه ليس بمنسوخ ، إما بأن يتتبع الأحاديث و أقوال المخالف و الموافق في المسألة فلا يجد لها نسخا أو بأن يرى جما غفير من المتبحرين في العلم يذهبون إليه ، ويرى المخالف له لا يحتج إلا بقياس أو استنباط أو نحو ذلك ، فحينئذ لا سبب لمخالفة حديث النبي صلى الله عليه وسلم إلا نفاق خفي أو حمق جلي. দেখুন: আদ-দেহলভী, শাহ ওয়ালী উল্লাহ, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ; (বৈরুত : দ্বারুল মা'রিফাহ, সংস্করণ বিহীন, সন বিহীন), পৃ. ১৫৪-১৫৬।
২১১. আল-কুলআন, সূরা আলে ইমরান: ৬৪।
২১২. এ প্রসঙ্গে তিনি যা বলেছেন এর আরবী ভাষান্তর নিম্নরূপ: ومن ههنا يظهر أنه إذا صح عند أحد حديث مرفوع من النبي صلى الله عليه وسلم سالما من المعارضة ، ولم يظهر له ناسخ ، وكان فتوى أبي حنيفة رحمه الله مثلا خلافه ، وقد ذهب على وفق الحديث أحد من الأئمة الأربعة، يجب عليه اتباع الحديث الثابت ، ولا يمنعه الجمود على مذهبه من ذلك ، لئلا يلزم اتخاذ بعضنا بعضا أربابا من دون الله. দেখুন: পানিপতী, ক্বাযী সানাউল্লাহ, আত-তাফসীরুল মাজহারী, (দেহলী : এদারাতু এশাআতিল উলুম, সংস্করণ বিহীন, সন বিহীন), ২/৬৩-৬৪।
২১৩. তিনি বলেন: وليس محله (أي محل تحريم التقليد فيمن لا يدين إلا بقول النبي صلى الله عليه وسلم و لا يعتقد حلا إلا ما أحله الله و رسوله ، و لا حراما إلا ما حرم الله و رسوله لكن لم يكن له علم بما قال النبي صلى الله عليه و سلم و لا بطريق الجمع بين المختلفات من كلامه ، و لا بطريق الاستنباط من كلامه اتبع عالما راشدا على أنه مصيب فيما يقول ، و يفتي ظاهرا ، متبع سنة رسول الله صلى الله عليه و سلم ، فإن خالف ما يظنه أقلع من ساعته من غير جدال و لا أصرار، فهذا كيف ينكره أحد ... ثم قال : فإن بلغنا حديث من الرسول المعصوم الذي فرض الله علينا طاعته بسند صالح يدل على خلاف مذهبه وتركنا حديثه واتبعنا ذلك التخمين أي قياس المجتهد واستنباطه، فمن أظلم منا وما عذرنا يوم يقوم الناس لرب العالمين. দেখুন: শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ; পৃ. ১৫৬।
২১৪. আল-কুরআন, সূরা যুমার: ৫৪।
২১৫. আল-কুরআন, সূরা ফাত্বির: ১৫।
২১৬. আল-কুরআন, সূরা গাফির: ৬০।
২১৭. হাদীসটি নিম্নরূপ : ...إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ দেখুন: মুসলিম, প্রাগুক্ত; কিতাবুল ওয়াসিয়্যাহ, বাব নং ৩, ৩/১২৫৫; তিরমিযী, প্রাগুক্ত; কিতাবুল আহকাম, বাব নং ৩৬, হাদীস নং: ১৩৭৬; ৩/৬৬০; ইমাম আহমদ, প্রাগুক্ত; ২/৩৭২।
২১৮. আল-কুরআন, সূরা আন'আম : ১৬২।
২১৯. ভালো করে লক্ষ্য করলে বুঝতে পারবেন যে, আগত অভ্যাসগত শির্ক বলে লেখকের পক্ষ থেকে যা বলা হয়েছে, তা আলাদা কোনো শির্ক নয়। এগুলো হয় আল্লাহর রবুবিয়াতে শির্ক, নতুবা আল্লাহর উলুহিয়াত তথা ইবাদাতে শির্ক। অথবা তাঁর নাম ও গুণে শির্ক। এর বাইরে কোনো শির্ক নেই ও হতে পারে না। [সম্পাদক]
২২০. ইমাম আহমদ, প্রাগুক্ত; ১/২১৪।
২২১. আবু দাউদ, প্রাগুক্ত; কিতাবুস সুন্নাহ, বাব নং- ১৮; ৫/৯৫। (তবে হাদীসটির সনদ দুর্বল। [সম্পাদক])
২২২. আমরা আগেই বলেছি, লেখক এখানে অভ্যাসগত যে সকল শির্কের উদাহরণ দিয়েছেন তা হয় রুবুবিয়্যাত, নতুবা উলুহিয়্যাতের সাথে সম্পৃক্ত। সেটাকে শুধু রুবুবিয়্যাতের সাথে সম্পৃক্ত বলার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। [সম্পাদক]
২২৩. এখানেও বিশুদ্ধ মতটি আমরা লেখকের কথার বাইরে দেখতে পাই। কারণ, অন্তরের উপাসনার বিষয়টিও উলুহিয়্যাতের সাথেই সম্পৃক্ত। তবে কোনো কোনো সময় সেটা রুবুবিয়্যাতে শির্ক করা পর্যন্ত গড়ায়। [সম্পাদক]