📄 বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপর ফরযকৃত উপাসনাদি
শরীরের বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপর ফরযকৃত উপাসনাদির মধ্যে এমন কিছু উপাসনা রয়েছে যা বিশেষ করে মুখ ও জিহবার সাথে সম্পর্কযুক্ত। যেমন- আনন্দ বা খুশীর সংবাদ শ্রবণ করলে মুখ দিয়ে 'আলহামদুলিল্লাহ' বলা। বিপদের কথা শুনলে... 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' পাঠ করা। সর্বদা মুখে আল্লাহর যিকর ও তাঁর নিকট ইস্তেগফার করা, বিপদে ও ভাল অবস্থায় তাঁরই নিকট সাহায্য কামনা করা, মানব ও জিনের যাবতীয় অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য মুখ দিয়ে তাঁরই নিকট আশ্রয় কামনা করা ইত্যাদি।
এ সকল উপাসনাসমূহ মুখের উপর নির্ধারণ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে। মানুষের মুখে তাদের সুখ ও দুঃখে, আনন্দ ও বিষাদে এবং ভাল ও মন্দ সর্বাবস্থায় যেন কেবল আল্লাহ তা'আলার স্মরণই চলতে থাকে। তাঁর কাছেই যেন তারা তাদের অপরাধের জন্য মার্জনা চায়, বিপদে পতিত হলে যেন কেবল তাঁর কাছেই সাহায্য চায়, তাঁর নিকট সাহায্য কামনা করতে যেন তাঁর উত্তম নামাবলীর মাধ্যমেই তাঁকে আহ্বান করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা অপর কোনো অলির নামের মাধ্যমে যেন তাঁকে আহ্বান না করে। কেউ যদি তা না করে বিপদের সময় বা স্বাভাবিক অবস্থায় মুখে, ইয়া গাউছ অথবা ইয়া খাজা বলে 'আব্দুল কাদির জীলানী (রহ.) বা মঈনুদ্দিন চিন্তী (রহ.)-কে স্মরণ করে, তাঁদেরকে সাহায্যের জন্য আহ্বান করে, তা হলে সে ব্যক্তি তার মুখের উপাসনায় তাঁদেরকে আল্লাহর সাথে শরীক করে নেবে।
📄 দু'আ ও এর প্রকার
দু'আ বা আহ্বান দু'প্রকার:
এক. কিছু চাওয়ার দু'আ (دعاء مسألة) : যে সব বস্তু জীবিত মানুষদের স্বাভাবিক শক্তি ও সামর্থ্যের মধ্যে রয়েছে, ইচ্ছা করলে তারা তা অপরকে দিতে পারে, বা দেওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে, এমন বস্তু কোনো মানুষের কাছে চাওয়া যেতে পারে। তবে যা দান করা বা দানের ক্ষেত্রে সাহায্য করা মানুষের সাধ্যের বাইরে, তা আল্লাহর কাছেই চাইতে হবে। এ জাতীয় বস্তু আল্লাহর কাছে চাওয়াকেই ‘দোয়া-উ মাসআলা’ বা ‘যাঞ্চা জাতীয় প্রার্থনা’ বলা হয়।
দুই. দোয়া-উ ইবাদাত : অপারগতা, দুর্বলতা ও বিনয় প্রকাশের জন্য যে দোয়া করা হয়, তাকে দোয়ায়ে ইবাদাত বলা হয়।
দোয়া আল্লাহ তাআলার ইবাদত : উপযুক্ত উভয় প্রকার দোয়া আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত কোনো মানুষের নিকট চাওয়া যায় না। কেননা, তা আল্লাহর ইবাদত-উপাসনার অন্তর্গত বিষয়। সে জন্য তিনি তা কেবল তাঁর কাছেই চাওয়ার নির্দেশ করে বলেন,
﴿وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ﴾ [غافر:৬০]
“আর তোমাদের প্রতিপালক বলেছেনঃ তোমরা আমাকে আহ্বান কর, আমি তোমাদের আহ্বানে সাড়া দেবো।”
আবার দু'আ যে বিনয়ের সাথে করতে হবে, সে সম্পর্কে বলেছেন,
﴿ادْعُوا رَبَّكُمْ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ ﴾ [الاعراف: ৫৫]
"তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে বিনয় ও চুপিসারে আহ্বান কর, নিশ্চয় তিনি সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না”।
উক্ত আয়াত দু'টি দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আমাদের জীবনের যে সব কল্যাণ দান বা অকল্যাণ দূরীকরণ কোনো মানুষ করতে পারে না তা বিনয়ের সাথে কেবল আল্লাহ তা'আলার নিকটেই চাইতে হবে। এ জন্য কর্মের প্রয়োজন হলে কর্মের তৌফিকও তাঁর নিকটেই কামনা করতে হবে। তা না করে আমরা যদি জীবিত বা মৃত কোনো পীর বা অলির নিকটে তা কামনা করি, অথবা মৃত কোনো অলিকে এ জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করতে বলি, তা হলে এতে আল্লাহর রুবুবিয়্যাত ও উলুহিয়্যাতে শির্ক হবে। রুবুবিয়্যাতে শির্ক হবে এ জন্যে যে, আমরা আল্লাহর রুবুবিয়্যাতের আওতাধীন বিষয়কে তাঁদের নিকটে আছে বলে বিশ্বাস করছি। আর উলুহিয়্যাতে শির্ক হবে এ জন্যে যে, আমরা শুধু আল্লাহ তা'আলাকে আহ্বান করার স্থানে অন্যকে আহ্বান করছি।
যারা আল্লাহ তা'আলাকে ব্যতীত অপর কাউকে আহ্বান করে, অপরের নিকট অনুশোচনা ও বিনয় প্রকাশ করে, তারা আল্লাহকে ব্যতীত অপরকেই তাদের ইলাহ বানিয়ে নেয়। এমন লোকদের পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
﴿ وَمَن يَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَهَا ءَاخَرَ لَا بُرْهَانَ لَهُ بِهِ، فَإِنَّمَا حِسَابُهُ عِندَ رَبِّهِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْكَافِرُونَ ﴾ [المؤمنون: ১১৭]
"যে আল্লাহর সাথে অপর কোনো ইলাহকে আহ্বান করে যে আহ্বানের বৈধতার পিছনে তার নিকট কোন দলীল প্রমাণ নেই, তার এ-আহ্বানের হিসাব রয়েছে তার প্রতিপালকের নিকট, বস্তুত কাফিরগণ কোন অবস্থাতেই কৃতকার্য হতে পারে না।”
টিকাঃ
১৪৮. আল-কুরআন, সূরা মু’মিন : ৬০।
১৪৯. আল-কুরআন, সূরা আ'রাফ: ৫৫।
১৫০. আল-কুরআন, সূরা গাফির: ৪০।
📄 শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপাসনা
মুখের উপাসনা ছাড়াও আরো এমন কিছু উপাসনা রয়েছে যার সম্পর্ক রয়েছে পূর্ণ শরীরের সাথে। যেমন:
দাঁড়িয়ে বিনয় ও আনুগত্য প্রকাশ করা:
আল্লাহর সম্মুখে বিনয় ও তাঁর আনুগত্য প্রকাশের জন্য তিনি মানুষের শরীরের উপর যে সব উপাসনা ধার্য করে দিয়েছেন তন্মধ্যে অন্যমত একটি উপাসনা হচ্ছে- দাঁড়িয়ে বা প্রয়োজনে বসে সালাত কায়েম করা। এ সালাত সঠিক এবং আল্লাহর নিকট তা গৃহীত হওয়ার জন্য রয়েছে তিনটি পূর্বশর্ত:
এক. আল্লাহর একান্ত ভালোবাসার আকর্ষণেই তা কায়েম করতে হবে।
দুই. অত্যন্ত আন্তরিকতা ও একাগ্রতার সাথে তা সম্পাদিত হতে হবে।
তিন. আল্লাহর আনুগত্য তাঁর সম্মুখে বিনয় প্রকাশ ও তাঁর উলুহিয়্যাতের স্বীকৃতি দানের উদ্দেশ্যেই তা কায়েম করতে হবে। যার সালাতে এ তিনটি শর্ত পাওয়া যাবে না, তার সালাত বাহ্যিক দৃষ্টিতে সালাত হিসেবে গণ্য হলেও তা আল্লাহর নিকটে গ্রাহ্য হবে না।
কেউ কাউকে অন্তর দ্বারা ভালবাসতে পারে, মনের মানুষের আগমনের সংবাদ শুনলে তাকে সাদর সম্ভাষণ জানানোর জন্যে ব্যতিব্যস্তও হতে পারে, কিন্তু তাকে ভালোবাসার আতিশয্যে তার সামনে দাঁড়িয়ে এমন কোনো বিনয়ভাব প্রকাশ বা এমন কোনো কর্ম করা যাবে না, যা বাহ্যত তার উপাসনার শামিল হয়। কেননা, এ ধরনের বিনয় ও আনুগত্য প্রকাশ আল্লাহ্ তা'আলার জন্যেই নির্ধারিত। সেজন্য মহান আল্লাহ তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আমাদেরকে বিনয় ও আনুগত্য প্রকাশের নির্দেশ করে বলেছেন,
﴿وَقُوْمُوْا لِلهِ قٰنِتِیْنَ﴾ [البقرة : ২৩৮]
“তোমরা আল্লাহর জন্য বিনয় প্রকাশের উদ্দেশ্যে দাঁড়াও।”
আল্লাহর সামনে বিনয় ও আনুগত্য প্রকাশকে শির্ক মুক্ত রাখার জন্য তিনি তা এমন স্থানে প্রদর্শন করতে নির্দেশ করেছেন যেখানে শির্ক সংঘটিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো কবরকে মসজিদ বানাতে নিষেধ করেছেন। অনুরূপভাবে কোনো কবরমুখী হয়ে বা কবরের সন্নিকটে সালাত আদায় করতেও নিষেধ করেছেন; কেননা, এতে আল্লাহর প্রতি বিনয় ও আনুগত্য প্রকাশের পাশাপাশি কবরবাসী নবী বা অলিও প্রতি আনুগত্য প্রকাশিত হতে পারে। যেহেতু দাঁড়িয়ে বিনয় ও আনুগত্য প্রকাশ আল্লাহর উপাসনা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে নির্ধারিত, সেহেতু কোনো পীর-মাশায়েখ, বা কোনো অলি বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সামনে বা তাদের ছবি, প্রতিকৃতি, কবর, ভাষ্কর্য বা স্মৃতিসৌধের পার্শ্বে তাঁদের সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে নীরবে দাঁড়ানো যাবে না; কেননা, এতে আল্লাহ তা'আলার সামনে বিনয় প্রকাশের পদ্ধতিতে তাঁদের সামনে বিনয় ও আনুগত্য প্রকাশিত হয়।
সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে রুকূ' ও সেজদা করা:
আল্লাহর মহববত তাঁর সম্মান ও আনুগত্য প্রকাশার্থে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে সালাত কায়েম করা যেমন আল্লাহর উপাসনা, তেমনি একই উদ্দেশ্যে আল্লাহর সামনে নত হয়ে রুকু' ও সেজদা করাও তাঁর উপাসনা। সে জন্য তিনি এর নির্দেশ করে বলেন,
﴿يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا أَرْكَعُوا وَاسْجُدُوا وَاعْبُدُوا رَبَّكُمْ﴾ [الحج: ৭৭]
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে রুকু', সেজদা ও ইবাদত কর।"
আল্লাহর সামনে রুকু' ও সেজদা করা তাঁর উপাসনা হওয়ার কারণে কোনো পীর, মাশায়েখ ও অলির সম্মানার্থে তাদের সামনে বা কবরে রুকু' ও সেজদা করা তাদের উপাসনার শামিল।
কারো সম্মানার্থে মাথা নত ও কদমবুসী করা:
কাউকে অভিবাদন জ্ঞাপন করার জন্য মাথা নত করা এবং মাতা-পিতা, অলি ও দরবেশদের সম্মান প্রদর্শনের জন্য কদমবুসী করা যদি ও শির্কের পর্যায়ভুক্ত নয়, তথাপি তা করা ইসলামের অনুসৃত রীতিরও অন্তর্ভুক্ত নয়; বরং তা মুসলিম সমাজে প্রচলিত পশ্চিমা ও হিন্দুয়ানী সংস্কৃতিরই অন্তর্ভুক্ত বিষয়। কাজেই তা বর্জনীয়।
সম্মান প্রদর্শনের জন্য সেজদা করা (السجدة للتعظيم):
সেজদার মাধ্যমে কাউকে সম্মান প্রদর্শন করা অতীতের শরী'আতে বৈধ ছিল। ফেরেশতাদের কর্তৃক আদম আলাইহিস সালাম-কে এবং ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর ভাইদের কর্তৃক তাঁকে সেজদা করা এ সম্মান প্রদর্শনেরই অন্তর্গত। তবে কোনো সৃষ্টিকে এ ধরনের সম্মান প্রদর্শনের রীতি সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রবর্তিত শরী'আত দ্বারা সম্পূর্ণরূপে রহিত হয়ে গেছে এবং সর্বশেষ শরী'আতে তা শুধুমাত্র আল্লাহ তা'আলার জন্যেই নির্দিষ্ট হয়ে গেছে। শর'য়ী নিয়ম মতে জ্ঞানী, গুণী ও সৎ মানুষদের সম্মান প্রদর্শনের পথ হচ্ছে- তাঁদের আগমনের সংবাদ শুনলে আমরা আনন্দের সাথে এগিয়ে গিয়ে তাঁদেরকে সাদর সম্ভাষণ জানাবো, অতিথি হিসেবে তাঁদের একরাম করবো, তাঁদের সাথে সালাম, মুসাফাহা ও আলিঙ্গন করবো, তাঁদেরকে আদর ও আপ্যায়ন করবো, তাঁদের আহ্বানে সাড়া দেব, তাঁদের উপদেশ গ্রহণ করবো, বিদায়ের সময় তাঁদেরকে কিছুদূর এগিয়ে নিয়ে সম্মানের সাথে বিদায় করে দেব।
সম্মানের জন্য কাউকে সেজদা করা যদি বৈধ হতো তা হলে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলের সাহাবীদেরকে এ মর্মে নির্দেশ প্রদান করতেন যে, তোমরা নবীকে সেজদা করার মাধ্যমে তাঁর সম্মান প্রদর্শন করো; কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলের সাহাবীদেরকে এমন কোনো নির্দেশ না দিয়ে মানুষকে সম্মান প্রদর্শনের যে পদ্ধতির কথা উপরে বর্ণিত হয়েছে, তাঁকে সেভাবেই সম্মান প্রদর্শনের জন্য নির্দেশ করেছেন।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿إِنَّا أَرْسَلْنَكَ شَهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا * لِتُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ، وَتُعَزِّرُوهُ وَتُوَقِّرُوهُ وَتُسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا ﴾ [الفتح: ৮, ৯]
"আমি আপনাকে সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদানকারী ও ভয় প্রদর্শনকারী স্বরূপ প্রেরণ করেছি; যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর এবং তাঁকে (রাসূলকে) সম্মান ও মর্যাদা দান কর, আর সকাল ও সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা কর।”
একটি উট রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সম্মান প্রদর্শন পূর্বক সেজদা করলে উপস্থিত সাহাবীগণ তা দেখে তাঁকে সম্মানের উদ্দেশ্যে সেজদা করতে চাইলে তিনি তাঁদেরকে তা করতে নিষেধ করে বলেন,
«اعْبُدُوا رَبَّكُمْ، وَأَكْرِمُوا أَخَاكُمْ»
“তোমরা তোমাদের রবের দাসত্ব কর এবং তোমাদের ভাইকে একরাম তথা সম্মান কর।”
এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কাউকে সেজদা করা তার উপাসনারই শামিল। আর উপাসনা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো করা যায়না বিধায়, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে সেজদা করা যাবে না। এমন কি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যেও তা করার কোনো বৈধতা নেই। অপর হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ لَأَمَرْتُ المَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا» "আমি যদি কাউকে সেজদা করার নির্দেশ করতাম, তাহলে স্ত্রীর প্রতি তার স্বামীকে সেজদা করার নির্দেশ করতাম।”
এ হাদীস দ্বারাও প্রমাণিত হয় যে, ইসলামী শরী'আতে সেজদা হচ্ছে একমাত্র আল্লাহ তা'আলার সম্মান ও উপাসনা প্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট একটি মাধ্যম। কেউ কারো জন্যে- তিনি যেই হোন না কেন- সেজদা করা হারাম। যে আল্লাহ তা'আলাকে ব্যতীত অন্য কাউকে সেজদা করলো, প্রকৃতপক্ষে সে গায়রুল্লাহকেই তার উপাস্য বানিয়ে নিল। আল্লাহর উপাসনার ক্ষেত্রে সে অপরকে শরীক করে নিল।
লোক দেখানো সালাত :
সালাত হচ্ছে এমন একটি উপাসনা যা আল্লাহর সম্মুখে বিনয় প্রকাশ, তাঁর সম্মান প্রদর্শন ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি বিশেষ উপায়। সালাতকে শির্কমুক্ত করে এটাকে যথার্থ উপাসনায় পরিণত করতে হলে তা যে কোনো ধরনের লোক দেখানো ভাব থেকে মুক্ত রাখা আবশ্যক। যদি কেউ তাতে কোনো লোক দেখানোর ভাব করে, তা হলে আল্লাহর দৃষ্টিতে সে তার এ উপাসনায় অপরকে শরীক করে নিল। এ জাতীয় উপাসনা প্রসঙ্গে হাদীসে কুদসিতে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
«أَنَا أَغْنَى الشُّرَكَاءِ عَنِ الشِّرْكِ مَنْ عَمِلَ عَمَلاً أَشْرَكَ مَعِي فِيْهِ غَيْرِي تَرَكْتُهُ وشركه»
"আমি সকল শরীকানদের শরীকানা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। যে ব্যক্তি কোনো কাজে আমার সাথে কাউকে শরীক করে নিল, আমি তাকে ও তার শির্কযুক্ত কাজকে ছেড়ে দেই।”
এ জাতীয় সালাত আদায়কারীদের জন্য যে ধ্বংস অপেক্ষা করছে সে সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, ﴿فَوَيْلٌ لِلْمُصَلِّينَ الَّذِينَ هُمْ عَن صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ * الَّذِينَ هُمْ يُرَاءُونَ﴾ [الماعون: ৪, ৬]
"অতএব, ধ্বংস সেই সব সালাত আদায়কারীদের জন্য যারা তাদের সালাত সম্পর্কে বে খবর, যারা তা লোক দেখানোর জন্যে করে।”
যাকাত আদায় করা:
আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ পালন এবং তাঁরই সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে যাকাত প্রদান করা একটি আর্থিক ও শারীরিক ইবাদত। সালাতের ন্যায় কেউ যদি তা লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে আদায় করে, তবে তাও উপর্যুক্ত হাদীস অনুযায়ী শির্কী কর্মের অন্তর্গত হবে।
কা'বা গৃহের হজ্জ (الحج):
কা'বা গৃহ আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনাদির মধ্যকার একটি অন্যতম নিদর্শন। এ গৃহ যিয়ারতের উদ্দেশ্যে মক্কা শরীফে গমন করা মুসলিমদের মধ্যকার সুস্থ ও সম্পদশালীদের জন্য একটি ফরয ইবাদত; তারা জগতের যেখানেই বসবাস করুক না কেন-জীবনে অন্তত একবার এ ইবাদত পালনের উদ্দেশ্যে সেখানে আগমন করা অপরিহার্য।
কা'বা শরীফ নির্মাণ ও এর হজ্জ করার নির্দেশের উদ্দেশ্য:
ইসলাম একটি বিশ্বজনীন দ্বীন। এ দ্বীনের অনুসারীরা সকলেই এক আল্লাহর বান্দা ও পরস্পরের ভাই ভাই। সে কারণে তিনি চান তাঁর বান্দারা এক ও অভিন্ন নিয়মে এবং একই কিবলা বা দিকে তাদের মুখ ফিরিয়ে তাঁর উপাসনা করুক। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি পৃথিবীর মধ্যবর্তী স্থানে তাদের জন্য কা'বা গৃহ তথা কিবলা নির্মাণের ব্যবস্থা করেন। তারা যে পরস্পরের ভাই ভাই তা বাস্তবে প্রমাণ করে দেখানোর লক্ষ্যে তাদের মধ্যকার সুস্থ ও সম্পদশালীদের উপর সারা জীবনে অন্তত একবার সে গৃহ যিয়ারতের উদ্দেশ্যে গমন করার বিধান জারী করেন। তাঁর বান্দারা যাতে সে উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে পৃথিবীর সর্বত্র থেকে তা যিয়ারতে আগমন করে, সে-জন্য তিনি ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের মাধ্যমে তাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন:
﴿وَأَذَن فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوكَ رِجَالًا وَعَلَى كُلِّ ضَامِرٍ يَأْتِينَ مِن كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٍ ﴾ [الحج: ২৭]
"আর তুমি মানুষের মধ্যে (এ গৃহের হজ্জের) ঘোষণা প্রচার কর, তারা যেন পায়ে হেটে এবং কৃষ্ণকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দুর-দুরান্ত থেকে তোমার কাছে (মক্কায়) আসে।” এ-গৃহের চার পার্শে ত্বাওয়াফ করার প্রতি নির্দেশ দিয়ে বলেছেন:
﴿وَلْيَطَّوَّفُوا بِالْبَيْتِ الْعَتِيقِ ﴾ [الحج: ২৯]
"আর তারা যেন প্রাচীন পবিত্র গৃহের ত্বওয়াফ করে।”
এ গৃহ বরকতময় হওয়ার কারণে সম্ভব হলে ত্বওয়াফ করার সময় বরকত হাসিলের জন্য এ-গৃহের ডান পার্শ্ব হাত দিয়ে স্পর্শ করে অন্যথায় সে দিকে হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে সম্মান প্রদর্শণের অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। এর বাম কোণে যে কৃষ্ণকায় পাথর (الحجر الأسود) রয়েছে, এর সাথে মানুষের লাভ ও ক্ষতি কোনো সম্পর্ক না থাকলেও। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাত হিসেবে সে পাথারকেও যথাসম্ভব চুম্বন বা স্পর্শ করার অনুমতি রয়েছে। কা'বা গৃহের দরজা ও মুলতাযামকে (দরজার চৌকাঠের নিচের পাকা স্থান) হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে তাঁর নিকট আকুতি ও মিনতি করে প্রার্থনা করারও অনুমতি প্রদান করা হয়েছে।
এ গৃহের নিকটে ও দুরে অবস্থিত মাকামে ইব্রাহীম, সাফা ও মারওয়াহ পাহাড়দ্বয়, মিনা, মুযদালিফাহ ও আরাফাতের ময়দানকে তাঁর নিদর্শন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেছেন, ﴿إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِن شَعَابِرِ اللَّهِ ﴾ [البقرة: ১৫৮] "নিশ্চয় সাফা ও মারওয়াঃ পর্বতদ্বয় আল্লাহর নিদর্শনাদির অন্তর্গত।"
এ-সব স্থানের সম্মান করাকে অন্তরে তাকওয়ার পরিচায়ক হিসেবে গণ্য করে বলেছেন:
﴿ ذَلِكَ وَمَن يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِن تَقْوَى الْقُلُوبِ ﴾ [الحج: ৩২]
"এটা, আর যে কেউ আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনসমূহের সম্মান করে, তা তো তার অন্তরের তাকওয়ারই পরিচায়ক হয়ে থাকে।”
এ-সব নিদর্শনাদির যথাযথ মর্যাদা দান বিশেষ করে আরাফাতে অবস্থান করাকে 'হজ্জ' এর পরিপূর্ণতার অন্তর্গত বলে গণ্য করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«الحَجُّ عَرَفَةُ»
"আরাফার ময়দানে অবস্থান গ্রহণ করাই হচ্ছে হজ্জ।”
তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মিনা ও মুযদালিফায় অবস্থান করে রাত্রি যাপন করাকেও হজ্জের পূর্ণতার অংশ হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। হজ্জ আদায়কারীদের সাথে নিজ নিজ বাড়ী বা এলাকা থেকে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করার জন্য সাথে পশু নিয়ে যাওয়াকেও তাঁর নিদর্শনাদির মধ্যে গণ্য করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন,
﴿وَالْبُدْنَ جَعَلْنَهَا لَكُم مِّن شَعَيرِ اللَّهِ لَكُمْ فِيهَا خَيْرٌ ﴾ [الحج: ৩৬]
“কা’বা গৃহের উদ্দেশ্যে সাথে উট নিয়ে যাওয়াকে তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শনের মধ্যে গণ্য করলাম, এতে রয়েছে তোমাদের জন্য কল্যাণ।”
কা’বা গৃহ, মিনা, মুযদালিফা ও আরাফাতে যা করা ইবাদাত তা অন্যত্র করা শির্ক:
মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য কা’বা গৃহ, সাফা ও মারওয়াহ, মিনা, মুযদালিফাহ ও আরাফার ময়দানকে কেন্দ্র করে উপর্যুক্ত ধরনের উপাসনাদির অনুমতি দিলেও এ-জাতীয় উপাসনাদি তাঁর ভালোবাসা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে অন্যত্র কোথাও করার কোনো বৈধতা দান করেন নি। বিষয়টি এমন যে, উপর্যুক্ত উপাসনাদি শুধুমাত্র বর্ণিত স্থানসমূহে করলেই তা তাঁর উপাসনা হিসেবে গণ্য হবে। আর অন্য কোথাও করলে তা তাঁর উপাসনা না হয়ে বেদ’আতী ও শির্কী কর্ম হিসেবে গণ্য হবে। কাজেই কা’বা শরীফ ব্যতীত অপর কোনো মাযার বা পবিত্র স্থানকে ত্বওয়াফ করা যাবে না। বরকত ও পূণ্য লাভের আশায় কা’বা গৃহ ব্যতীত অন্য কোনো গৃহ, মাযার, কবর, কবরের বেষ্টনী, পাথর ও গিলাফ ইত্যাদি স্পর্শ ও চুম্বন করা যাবে না। দু’আ কবুল হওয়া ও বরকত হাসিলের জন্য কা'বা গৃহ ব্যতীত অপর কোনো গৃহের বা কবর ও মাযারের দরজা বা অন্য কিছু হাত দিয়ে স্পর্শ করা যাবে না। উপর্যুক্ত স্থানসমূহ এবং মসজিদ ও যে সকল স্থান বরকতময় বলে সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, কেবল সে সব স্থান ব্যতীত অন্য কোনো কবর ও মাযারে বরকত হাসিলের উদ্দেশ্যে যাওয়া যাবে না। সাফা ও মারওয়াহ ব্যতীত অপর কোনো স্থানে পুণ্যের উদ্দেশ্যে দৌড়াদৌড়ি করা যাবে না। কা'বা গৃহ ব্যতীত অপর কোনো পবিত্র স্থান বা কোনো মাযারের উদ্দেশ্যে কুরবাণী ও মানত এর পশু নিয়ে যাওয়া যাবে না। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সকল স্থানকে পবিত্র বলে আখ্যায়িত করেছেন, সে সব স্থান ব্যতীত অন্য কোনো স্থানকে পবিত্র গণ্য করা যাবে না। যমযমের পানি আর হরম শরীফের গাছ-পালা, মাটি, পাথর, ঘাস ও জীব-জন্তু ব্যতীত অপর কোনো কূপের পানি, মাযারের গাছ, মাটি, ঘাস, পুড়ানো মোম ও জীব- জন্তুকে পবিত্র গণ্য করা যাবে না। কা'ba গৃহের সম্মানার্থে কেবল তা ব্যতীত অন্য কোনো কবর বা মাযার বা গৃহকে কাপড় দ্বারা ঢেকে রাখা যাবে না। কা'বা গৃহ, মসজিদে নববী ও বায়তুল মাকদিস ব্যতীত অন্য কোনো দূরবর্তী মাসজিদ বা মাযার পুণ্য হাসিলের উদ্দেশ্যে যিয়ারতে যাওয়া যাবে না।
এ জাতীয় যিয়ারত নিষেধ করে দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «لَا تُشَدُّ الرِّجَالُ إِلَّا إِلَى ثَلَاثَةِ مَسَاجِدَ: مَسْجِدِ الْحَرَامِ، وَمَسْجِدِي، وَمَسْجِدِ الْأَقْصَى»
"মসজিদুল হারাম, আমার এই মসজিদ ও বায়তুল মাকদিস ব্যতীত অন্য কোথাও পুণ্যার্জন ও আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সফর করা যাবে না।”
তবে যারা মসজিদে নববী যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সেখানে যাবে, তারা অবশ্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কবর যিয়ারত করতে পারবে। এতে শর'য়ী কোনো বিধি নিষেধ নেই। থাকতেও পারে না কারণ; তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কবর যিয়ারত সাধারণ নিয়মের আওতায় পড়ে। এমতাবস্থায় কেউ তাঁর কবর যিয়ারত না করে সেখান থেকে চলে আসতে পারে না। উল্লেখ্য যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কবর যিয়ারতের জন্য দূর-দূরান্ত থেকে শুধুমাত্র তাঁর কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করার বৈধতা প্রমাণিত হয় নি।
পশু যবাই ও উৎসর্গ করা:
পশু যবাই করা মূলত দু'প্রকার:
এক. স্বাভাবিক অবস্থায় যবাই, যার দ্বারা আল্লাহ বা অপর কারো সন্তুষ্টি উদ্দেশ করা হয় না। মাংস বিক্রি করা বা তা ভাগাভাগি করে নেয়ার উদ্দেশ্যে যে সব পশু যবাই করা হয়, তা এ প্রকারের আওতায় পড়ে।
দুই. অস্বাভাবিক অবস্থায় যবাই, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি ও বিপদাপদ দূরীকরণার্থে মানত পূর্ণ করাস্বরূপ হয়ে থাকে।
যবাই সঠিক হওয়ার শর্ত: পশু যবাই যে প্রকারেরই হোক, তা সঠিক হওয়ার জন্য দু'টি শর্ত রয়েছে:
এক, যবাই করার সময় আল্লাহ তা'আলার বড়ত্ব ও মহত্ব প্রকাশের জন্য 'বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার' বলে আল্লাহর নাম নিয়ে তা যবাই করতে হবে।
দুই. যবাই করার স্থানটি মুশরিকদের যে কোনো ধরনের প্রতিমা, মূর্তি ও মেলা (ওরস) বসানোর স্থান হওয়া থেকে পবিত্র হতে হবে; কারণ, যে স্থানে কোনো প্রতিমা বা মূর্তির সম্মান করা হয় অথবা যেখানে মুশরিকদের মেলা (ওরস) বসে, সে স্থানটি আল্লাহ তা'আলার নামে যবাই করার জন্য উপযুক্ত স্থান নয়।
সেখানে যবাই করার সময় আল্লাহর নাম হাজার বার নিলেও তা আল্লাহর জন্য না হয়ে গায়রুল্লাহর জন্যেই হবে এবং যবাইকারী ও সেখানে যবাই এর জন্য পশু উৎসর্গকারী উভয়েই মুশরিক হিসেবে গণ্য হবে। কারণ, এ স্থানে যবাইকারী ও পশুদানকারী প্রকৃতপক্ষে এ স্থানে অবস্থিত প্রতিমার সম্মানের জন্যই অথবা সেখানে অনুষ্ঠিত বার্ষিক মেলার কারণেই এখানে যবাই বা দান করেছে। দ্বিতীয় শর্তটির প্রমাণে সাবিত ইবন দাহহাক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন:
«نَذَرَ رَجُلٌ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَنْحَرَ إِبِلًا بِبْوَانَةَ (وَهِيَ مَوْضِعُ فِي أَسْفَلِ مَكَّةَ دُونَ يَلَمْلَمْ) فَسَأَلُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: إِنِّي نَذَرْتُ أَنْ أَنْحَرَ إِبِلًا بِبُوَانَةَ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: هَلْ كَانَ فِيهَا وَثَنٌ مِنْ أَوْثَانِ الْجَاهِلِيَّةِ يُعْبَدُ ؟ قَالُوا: لَا ، قَالَ: «هَلْ كَانَ فِيهَا عِيدٌ مِنْ أَعْيَادِهِمْ؟»، قَالُوا: لَا ، قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَوْفِ بِنَذْرِكَ، فَإِنَّهُ لَا وَفَاءَ لِنَذْرِ فِي مَعْصِيَةِ اللَّهِ، وَلَا فِيمَا لَا يَمْلِكُ ابْنُ آدَمَ»
"এক ব্যক্তি (ইয়ালামলাম পাহাড়ের পাদদেশে মক্কার নিম্নভূমিতে অবস্থিত) 'বাওয়ানা' নামক স্থানে একটি উট উৎসর্গ করার জন্য মানত করেছিল। সে তার মানত পূর্ণ করার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: যে স্থানের উদ্দেশ্যে মানত করেছো সেখানে জাহেলী যুগে কোন প্রতিমা ছিল কি না? তারা বললেন: না, তা ছিল না। তিনি আবার বললেন: সেখানে মুশরিকদের বার্ষিক কোন মেলা (ওরস) বসতো কি না? তারা বললেন: না, তাও হত না। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তোমার মানত (সেখানে) পূর্ণ করতে পার, তবে জেনে রেখো! আল্লাহর অবাধ্যতায় কোনো মানত পূর্ণ করতে নাই।” এখানে দেখা যাচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে ব্যক্তিকে উক্ত স্থানে তার মানত পূর্ণ করার জন্য ঠিক তখনই অনুমতি দিলেন যখন সে স্থানটি জাহেলী যুগে মুশরিকদের কোনো প্রতিমা বা ঈদ থেকে মুক্ত হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হলেন। সাথে সাথে সর্বশেষ বাক্যটির দ্বারা আরো বলে দিলেন যে, যে স্থানে কোনো প্রতিমা থাকে বা যেখানে মুশরিকদের বার্ষিক মেলা তথা ওরস বসে, সে স্থান কোন প্রকার মানত পূর্ণ করার জন্য উপযোগী নয়। কেউ করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। তার কর্মের সাথে মুশরিকদের কর্মের সাদৃশ্য হবে। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُم»
"যে ব্যক্তি তার কাজে ও কর্মে অপর কোনো জাতির সাথে সাদৃশ্য প্রকাশ করবে সে তাদেরই একজন বলে গণ্য হবে।”
কোন মাজারে মানত পূর্ণ করা শির্ক :
উপরে বর্ণিত দাহহাক রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কোনো অলির মাযার অথবা যে সব স্থানে শির্কী কর্মকাণ্ড হয় অথবা যে মাযার বা কবরকে কেন্দ্র করে ইসালে সওয়াবের নামে বার্ষিক কোনো অনুষ্ঠান বা ওরস পালিত হয়, সে সব স্থানের উদ্দেশ্যে কোনো মানত করা বৈধ নয়। কেউ করে থাকলেও সেখানে তা পূর্ণ করা জায়েয নয়। যারা তা করবে তারা দ্বিতীয় হাদীসের মর্মানুযায়ী মুশরিকদের মধ্যেই গণ্য হবে। কোনো মাযারকে কেন্দ্র করে এর পার্শ্বে ইসালে সওয়াবের নামে কোনো অনুষ্ঠান হলে তাও জাহেলী যুগের মেলারই ধারাবাহিকতা হিসেবে গণ্য হবে। এ জন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কবরকে এ জাতীয় ইসালে সওয়াবের অনুষ্ঠান থেকে মুক্ত রাখার জন্য তাঁর সাহাবীদেরকে তাঁর জীবনের অন্তিম সময়ে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন,
«لَا تَجْعَلُوْا قَبْرِي عِيداً»
"তোমরা আমার কবরকে ঈদ তথা উৎসবের স্থানে পরিণত করো না।”
কবর কিভাবে মেলার স্থান ও প্রতিমায় পরিণত হয়:
একটি কবর বা একটি স্থানের ব্যাপারে যদি জনমনে এ ধারণার সৃষ্টি হয় যে, এখানে গেলে বরকত বা ফয়েয হাসিল হয় এবং সেখানে গেলে লোকজনের বিভিন্ন রকমের মনস্কামনা পূর্ণ হয় এবং লোকজন সুযোগমত সেখানে দূর-দূরান্ত থেকে বরকত ও ফয়েয হাসিল এবং মনস্কামনা পূর্ণ করার জন্য প্রতি দিন, সপ্তাহে, মাসে, ছয়মাসে বা বছরের নির্দিষ্ট কোন দিনে সমবেত হয় এবং সে কবর বা স্থানের উদ্দেশ্যে টাকা-পয়সা মানত করে, গরু, ছাগল ও মুরগী ইত্যাদি নিয়ে এসে সেখানে উৎসর্গ করে, তা হলে এতে সে কবর বা সে স্থান মেলার স্থান ও প্রতিমায় পরিণত হবে কেননা; এ জাতীয় কর্মসমূহ জাহেলী যুগের মানুষেরা বিভিন্ন অলিদের নামে নির্মিত দেবতা ও প্রতিমাদের উদ্দেশ্যেকৃত কর্মেরই ধারাবাহিকতা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কবরকে যাতে কেউ এ রকম মেলার স্থান ও প্রতিমায় পরিণত না করে সে জন্য তিনি আমাদেরকে তা করতে নিষেধ করেছেন। যা আমরা একটু আগেই অবগত হয়েছি।
ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ (৬৬১-৭২৮হিঃ) ঈদ (عید) শব্দের অর্থ বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন: "ঈদ হলো সে সব সাধারণ সমাবেশের নাম যা প্রথা ও রেওয়াযানুযায়ী বছর, সপ্তাহ বা মাস ইত্যাদি ঘুরে আসলে ঘুরে আসে। ঈদ কয়েকটি বিষয়ের সমষ্টির নাম:
এক. তা এমন এক দিনে হয় যা ঘুরে আসে। যেমন- ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা ও জুমু'আর দিন।
দুই. সে দিনে সমবেত হওয়া।
তিন. সে দিনে সমবেত হয়ে উপাসনা ও প্রথাগত কিছু কর্ম করা।
ঈদ কখনও নির্দিষ্ট কোনো স্থানে হয়, কখনও তা অনির্দিষ্ট থাকে। উপরে বর্ণিত এ তিনটি বিষয়ের প্রতিটি বিষয়কেও ঈদ নামকরণ করা যেতে পারে। সে অনুযায়ী একটি সময়কেও ঈদ বলা যেতে পারে। যেমন- জুমু'আর দিনের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«إِنَّ هَذَا يَوْمٌ قَدْ جَعَلَهُ اللَّهُ لِلْمُسْلِمِينَ عِيداً»
“জুমু'আর দিনটি এমন একটি দিন যাকে আল্লাহ তা'আলা মুসলিমদের জন্য ঈদ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।”
অনুরূপভাবে কোন স্থানকেও ঈদ বলা যেতে পারে। যেমন- রাসূলুল্লাহ -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-বলেছেন: «لَا تَجْعَلُوا قَبْرِي عِيداً» "তোমরা আমার কবরকে ঈদগাহে পরিণত করোনা।"
কখনও একটি দিন এবং সে দিনে যে অনুষ্ঠান করা হয়, এ দু'য়ের সমষ্টির নামও ঈদ হয়ে থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঈদ শব্দ দ্বারা এটাই বুঝানোর উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। যেমন- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে ঈদের দিনে ঢোল বাজিয়ে আনন্দ প্রকাশ করা প্রসঙ্গে বলেন: «إِنَّ لِكُلِّ قَوْمٍ عِيداً وَهَذَا عِيْدُنَا» "হে আবু বকর! প্রত্যেক জাতির জন্য ঈদ রয়েছে, আর এটি হলো আমাদের ঈদ।”
মেলা প্রসঙ্গে ইমাম ইবনু কাইয়্যিম (৬৯১-৭৫১হি:) বলেন:
"যা প্রথাগতভাবে ঘুরে আসে এবং যে সময় আগমনের অপেক্ষা করা হয় এবং যে স্থানে গমনের ইচছা করা হয়, তাকে ঈদ বলা হয়। ঈদ (عید) শব্দটিকে معاودة ফিরে আসা ও (اعتیاد) 'প্রথা স্বরূপ গ্রহণ করা' শব্দমূল থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। ঈদ যখন কোনো স্থান কেন্দ্রিক হবে তখন এর দ্বারা সে স্থানই বুঝতে হবে যে স্থানকে সমবেত হওয়া ও উপাসনার জন্য উদ্দেশ্য করা হয়। যেমন- আল্লাহ তা'আলা মসজিদুল হারাম (কা'বা শরীফ), মিনা, মুযদালিফাঃ, আরাফাঃ ও নিদর্শনের স্থানসমূহকে তাওহীদপন্থীদের জন্য ঈদ ও পুণ্যার্জনের স্থান হিসেবে গণ্য করেছেন। অতীতে মুশরিকদের সময় ও স্থান কেন্দ্রিক অনেক ঈদ ছিল। ইসলাম আগমন করে তাদের সময় কেন্দ্রিক ঈদসমূহ বাতিল ঘোষণা করে এর পরিবর্তে মুসলিমদের জন্য ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা এবং মিনা এর দিনসমূহকে ঈদ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অনুরূপভাবে মুশরিকদের ঈদের স্থানসমূহের পরিবর্তে কা'বা শরীফ, মিনা, মুযদালিফা, আরাফা ও নিদর্শনের স্থানসমূহকে ঈদ পালনের স্থান হিসেবে নির্ধারণ করেছে।"
উপর্যুক্ত এ আলোচনার দ্বারা বুঝা গেল যে, ইসলাম সাধারণ মুসলিমদের জন্য সময় কেন্দ্রিক যে সব ঈদ নির্ধারণ করেছে তা হলো: জুমু'আর দিন, ঈদুলফিতর ও ঈদুলআযহা এবং আইয়্যামে তাশরীকের চার দিন। এ-দিনসমূহ ব্যতীত সপ্তাহান্তে ও বছরান্তে সমবেত হওয়ার জন্য মুসলিমদের সময় কেন্দ্রিক আর কোনো ঈদ নেই। এ সব দিনসমূহ হচ্ছে তাদের জন্য ঈদ পালনের দ্বীন নির্দেশিত দিবস। এ সকল দিবস ব্যতীত অপর কোনো দিবসকে কারো জন্ম দিবস হিসেবে আনন্দ প্রকাশের জন্য বা কারো মৃত্যু দিবস হিসেবে দুঃখ প্রকাশের জন্য ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ঈদ নামকরণ করা যাবে না এবং এটাকে কোনো ধর্মীয় কাজ মনে করে তাতে সমবেত হওয়াও যাবে না। যদিও সে দিবসটি আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্ম দিবসও হয়ে থাকতে পারে।
অনুরূপভাবে আমরা আরো অবগত হলাম যে, মুসলিমদের জন্য কা'বা শরীফ, মিনা, মুযদালিফাঃ ও এর আশেপাশের নিদর্শনের (مشاعر) স্থানসমূহ ও ঈদের মাঠ ব্যতীত দ্বীন নির্দেশিত স্থান কেন্দ্রিক অপর কোনো ঈদ পালনের স্থান নেই। এ সকল স্থানের মধ্যে কা'বা শরীফে আমরা সকলেই সব সময় পুণ্যার্জনের জন্য সমবেত হতে পারবো। অবশিষ্ট স্থানসমূহে হাজীগণ কেবল হজ্জের সময়ে পুণ্যার্জনের উদ্দেশ্যে দূর ও নিকট থেকে সমবেত হতে পারবেন।
কা'বা শরীফের পাদদেশে আমরা বছরের প্রত্যেক দিনে এবং হাজীগণ আরাফার ময়দানে জিলহজ্জ মাসের নবম দিনে, মুযদালিফায় জিলহজ্জ মাসের নবম দিনের দিবাগত রাতে, মিনায় জিলহজ্জ মাসের অষ্টম, দশম, এগারো, বারো ও তেরো তারিখসমূহে এবং মাশায়ের (مشاعر) অর্থাৎ যে সকল নিদর্শনের স্থানসমূহে হাজীগণ হজ্জের বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি পালনার্থে অবস্থান গ্রহণ করেন, সেখানেও হজ্জের সময় তারা ধর্মীয় কাজ হিসেবে পুণ্যার্জনের উদ্দেশ্যে সমবেত হতে পারবেন।
হজ্জের সময় ব্যতীত একমাত্র কা'বা শরীফ ছাড়া উপর্যুক্ত এ সব স্থানসমূহে পুণ্যার্জনের উদ্দেশ্যে আগমনের ধর্মীয় কোনো গুরুত্ব নেই। অবশ্য আমরা ইতোপূর্বে বর্ণনা করে এসেছি যে, কা'বা শরীফসহ মসজিদে নববী এবং বায়তুল মাকদিস এ তিনটি মসজিদে পুণ্যার্জনের উদ্দেশ্যে দূর-দূরান্ত থেকে আগমন করার ব্যাপারে শরী'আতের অনুমোদন রয়েছে। সুতরাং এ তিন মসজিদেই কেবল আমরা দূর-দূরান্ত থেকে পুণ্যার্জনের উদ্দেশ্যে সফর করে এসে সমবেত হতে পারবো। অন্য কোনো মসজিদ বা স্থানে নয়। এবার যদি আমরা উপর্যুক্ত সময় ও স্থানসমূহের সাথে অপর কোনো সময় ও স্থানকে সংযোজন করি, তবে তা যেমন দ্বীনীভাবে কোনো ছাড়পত্র পাবে না, তেমনি তা কোন পুণ্যার্জনের কাজ বলেও বিবেচ্য হবে না।
বরং দ্বীনী দৃষ্টিকোণ থেকে তা একেকটি বেদ'আতী কর্ম হিসেবে স্বীকৃতি পাবে কেননা; উপযুক্ত সময় ও স্থান ব্যতীত মুসলিমদের জন্য দ্বীন নির্দেশিত অপর কোনো ঈদ পালন ও সফর করার স্থান নেই। কেউ যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা অপর কোনো অলি বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মাযারে তাঁদের জন্ম বা মৃত্যু দিবসে সমবেত হয়ে সেখানে আনন্দ প্রকাশ করে, বা ওরস পালন করে, তা হলে এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও তাঁদের জন্ম দিবসকে ঈদের দিন এবং তাঁর ও তাঁদের কবরকে ঈদ পালনের স্থানে পরিণত করার শামিল হবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁদের জন্ম দিবস আমাদের জন্য আনন্দের দিবস হয়ে থাকলেও তাঁদের জন্ম দিনকে ঈদের দিন বলে নামকরণ করে সেদিনে তাঁদের কবরে বা অন্যত্র কোথাও ঈদ পালন করার কোনো বৈধতা শরী'আতে স্বীকৃত নয় কেননা; এমনটি করা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর দৃষ্টিতে জাহেলী যুগের মুশরিকদের সে সব ঈদ পালনেরই ধারাবাহিকতা যা তারা তাদের দেব-দেবীদেরকে কেন্দ্র করে পালন করতো।
দান ও সদক্কা: দান ও সদকা মানুষের দুনিয়া-আখেরাতের কল্যাণার্জন ও অকল্যাণ দূরীকরণের ক্ষেত্রে একটি উপকারী মাধ্যম। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ জন্য উৎসাহ প্রদান করে বলেছেন:
«اِتَّقُوا النَّارَ وَ لَوْ بِشِقِّ تَمْرَةٍ» "তোমরা খেজুরের অর্ধেক দান করে হলেও আগুন থেকে বাঁচ।"
তিনি আরো বলেছেন: «عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ صَدَقَةٌ» "প্রত্যেক মুসলিমের উপর সদকা করা একান্ত জরুরী।”
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদকার ফযীলত বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন: তা বিপদ দূরীকরণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী সহায়ক ভূমিকা পালন করে। যেমন তিনি বলেছেন:
«لَمَّا خَلَقَ اللهُ الأَرْضَ جَعَلَتْ تَمِيدُ، فَخَلَقَ الجِبَالَ، فَقَالَ بِهَا عَلَيْهَا فَاسْتَقَرَّتْ، فَعَجِبَتِ المَلَائِكَةُ مِنْ شِدَّةِ الجِبَالِ. قَالُوا: يَا رَبِّ هَلْ مِنْ خَلْقِكَ شَيْءٌ أَشَدُّ مِنَ الجِبَالِ؟ قَالَ: نَعَمُ الحَدِيدُ. قَالُوا : يَا رَبِّ فَهَلْ مِنْ خَلْقِكَ شَيْءٌ أَشَدُّ مِنَ الحَدِيدِ؟ قَالَ: نَعَمُ النَّارُ. فَقَالُوا : يَا رَبِّ فَهَلْ مِنْ خَلْقِكَ شَيْءٌ أَشَدُّ مِنَ النَّارِ؟ قَالَ: نَعَمُ المَاءُ. قَالُوا : يَا رَبِّ فَهَلْ مِنْ خَلْقِكَ شَيْءٌ أَشَدُّ مِنَ المَاءِ؟ قَالَ: نَعَمُ الرِّيحُ قَالُوا : يَا رَبَّ فَهَلْ مِنْ خَلْقِكَ شَيْءٌ أَشَدُّ مِنَ الرِّيحِ؟ قَالَ: نَعَمُ ابْنُ آدَمَ، تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ بِيَمِينِهِ يُخْفِيهَا مِنْ شِمَالِهِ»
"আল্লাহ তা'আলা যখন পৃথিবী সৃষ্টি করেন তখন তা দুলতে থাকে। অতঃপর আল্লাহ তাতে পর্বত সৃষ্টি করলে তা স্থির হয়ে যায়। তা দেখে ফেরেশতাগণ আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললেন : প্রভু হে! পর্বতের চেয়ে শক্তিশালী তোমার অপর কোন সৃষ্টি আছে কি? আল্লাহ বললেন: 'হ্যাঁ, এর চেয়ে শক্তিশালী হলো লোহা।' তারা বললেন: প্রভু হে! লোহার চেয়ে শক্তিশালী আর কিছু আছে কি? আল্লাহ বললেন: “হ্যাঁ, তা হলো আগুন।" তারা বললো : প্রভু হে! আগুনের চেয়ে শক্তিশালী কিছু আছে কি? আল্লাহ বললেন: 'হ্যাঁ, আগুনের চেয়ে শক্তিশালী হলো বাতাস। তারা আবার বললো : প্রভু হে! বাতাসের চেয়ে শক্তিশালী কিছু আছে কি? আল্লাহ বললেন : 'হ্যাঁ, আদম সন্তান উদার চিত্তে যে দান করে তা (বিপদ দূরীকরণের ক্ষেত্রে) বাতাসের চেয়েও অধিক শক্তিশালী।”
সদকা সঠিক হওয়ার শর্ত:
সদকা করার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অপরিসীম, এতে কারো দ্বি-মত নেই। কিন্তু এ সদকা সঠিক হওয়া ও এটিকে উপাসনায় পরিণত করার জন্য যে দু'টি পূর্ব শর্ত রয়েছে, সে সম্পর্কে অনেকেরই জ্ঞানের অভাব রয়েছে।
সদকা সঠিক হওয়ার প্রথম শর্ত: সদকা স্বাভাবিক আর অস্বাভাবিক যে অবস্থায়ই করা হোক না কেন তা কেবল আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যেই হতে হবে। কোনো প্রকার লোক দেখানো ভাব থেকে তা মুক্ত হতে হবে।
দ্বিতীয় শর্ত:
উপরে বর্ণিত দাহহাক রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসের মর্মানুযায়ী যে স্থানের নামে সদকা করা হয়েছে সে স্থানটি শির্ক সংঘটিত হওয়ার সম্ভাব্য স্থান হওয়া থেকে মুক্ত হতে হবে।
এ দু'টি শর্তের আলোকে বলা যায়, কেউ যদি সদকা করার সময় আল্লাহর সন্তুষ্টির পাশাপাশি সামান্যতম লোক দেখানোরও উদ্দেশ্য করে, তবে এতে সে ব্যক্তি শির্কে আসগরে নিমজ্জিত হবে। আর কবর ও মাযার যেহেতু শির্ক সংঘটিত হওয়ার সম্ভাব্য স্থান, সেহেতু সেখানে সদকা করার কোনো বৈধতা নেই। যেহেতু শরী'আতে মাযার নির্মাণ অবৈধ এবং মাযারে দান করাও অবৈধ, তাই মাযারের অবৈধ টাকায় সেখানে কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলাও অবৈধ। মাযারে টাকা দান করা যেহেতু হারাম, সুতরাং সেখানে কোনো ফকীর, মিসকীন ও ভবঘুরে লোকদেরও ভিড় জমাবার কোনো আবশ্যকতা নেই। সাধারণত মাযারে যারা দান করে তারা এ দানের মাধ্যমে মাযারস্থ অলির সন্তুষ্টি লাভ করে তাঁর নিকট থেকে বা তাঁর মাধ্যম্যে আল্লাহর নিকট থেকে তাদের দুনিয়া-আখেরাতের কল্যাণ সাধনের জন্যেই তা দান করে। এ জাতীয় দান ও কামনা শির্কে আকবারের অন্তর্গত। কাজেই সাদকা দানের ক্ষেত্রে শির্ক থেকে বাঁচতে হলে যে সমস্ত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান অলিদের মাযার কেন্দ্রিক নয়, কেবল সেখানেই সাদকা করতে হবে।
মানত:
বিপদ দেখলে মানুষ মানত করে। ধারণা করে হয়তো বা এতে তার বিপদ কেটে যাবে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মানত মানুষের কর্মের কোনো পরিবর্তন এনে দিতে পারে না। সে জন্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানত করতে নিরুৎসাহিত করেছেন। এ প্রসঙ্গে আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«لا يَأْتِي ابْنَ آدَمَ النَّذْرُ بِشَيْءٍ لَمْ يَكُنْ قُدْرَ لَهُ، وَلَكِنْ يُلْقِيهِ النَّذْرُ إِلَى القَدَرِ قَدْ قُدِّرَ لَهُ، فَيَسْتَخْرِجُ اللَّهُ بِهِ مِنَ البَخِيلِ، فَيُؤْتِي عَلَيْهِ مَا لَمْ يَكُنْ يُؤْتِي عَلَيْهِ مِنْ قَبْلُ»
"মানত বনী আদমের জন্য এমন কিছু বয়ে আনতে পারে না যা আমি তার তাকদীরে রাখি নি, বরং মানত তাকে তার জন্য তাকদীরে যা নির্ধারণ করা আছে সেটার উপর নিয়ে রাখে। ফলে এর দ্বারা আল্লাহ কেবল কৃপণের কিছু সম্পদ তার হাত ছাড়া করেন। তখন তার কাছে এমন কিছু আসে যা পূর্বে আসত না”।
ইমাম তিরমিযীর বর্ণনায় রয়েছে: "তোমরা মানত করো না কেননা; তা তাকদীরের কোনো পরিবর্তন করতে পারে না...।"
এ জন্যেই মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে মানত করার জন্য কোনো নির্দেশ ও উৎসাহ প্রদান করেন নি। তবে যেহেতু মানতের মাধ্যমে সম্মানের বহিঃপ্রকাশ ঘটে এবং তা এমন কারো নামে করতে হয় যিনি মানুষের বিপদাপদ দূরীকরণের মালিক। এ দু'টি বিষয় বিবেচনায় আনলে মানতকে আল্লাহর উপাসনায় পরিণত করার জন্য তাতে মোট দু'টি শর্ত পূর্ণ হতে হবেঃ
এক. তা কেবল আল্লাহ তা'আলার সম্মানার্থে কেবল তাঁরই নামে এবং কেবল তাঁরই সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করতে হবে।
দুই. পূর্বে বর্ণিত যাহহাক রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসের মর্মানুযায়ী তা জাহেল লোকদের ওরস ও শির্ক সংঘটিত হওয়ার সম্ভাব্য স্থান মাযার ও মুকাম থেকে মুক্ত হতে হবে।
যারা মানত সঠিক হওয়ার জন্য এ দু'টি শর্তের কথা বিবেচনায় না এনে বিভিন্ন মাযার ও কবরে মানত করে, তারা মানতটি পূর্ণ করার সময় আল্লাহর নাম নিয়ে থাকলেও মূলত তাদের মানতের দ্বারা মাযার ও কবরস্থ সে অলি ও দরবেশের সম্মানই প্রদর্শিত হয়ে থাকে এবং মাযার ও কবরস্থ অলির নিকটেই তারা বিপদ দূরীকরণের জন্য তাদের আবদার করে থাকে। তারা যদি প্রকৃতপক্ষে তাদের বিপদ দূরীকরণের কথা আল্লাহর নিকটেই চেয়ে থাকতো, তা হলে কোনো অবস্থাতেই তারা কোনো মাযার বা কবরে মানত করতো না।
মানত আল্লাহর পছন্দনীয় কোনো উপাসনার মাধ্যম না হয়ে থাকলেও যেহেতু এর দ্বারা আল্লাহর সম্মান প্রদর্শিত হয়, সে জন্য মানতের শর্তানুযায়ী কেউ তা করলে সে মানত পূর্ণ করা তার উপর ওয়াজিব হয়ে দাঁড়ায় এবং এ জাতীয় মানত পূর্ণ করা আল্লাহ তা'আলার দৃষ্টিতে মু'মিনদের বৈশিষ্ট্যের অন্তর্গত হয়ে থাকে। সে জন্য আল্লাহ তা'আলা মু'মিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন:
﴿يُوفُونَ بِالنَّذْرِ﴾ [الانسان: ৭]
"তারা (মু'মিনগণ) মানত পূর্ণ করে।”
টিকাঃ
১৫১. আল-কুরআন, সূরা বাকারা : ২৩৮।
১৫২. আল-কুরআন, সূরা হজ্জ: ৭৭।
১৫৩. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ত্বা-ইফ থেকে ফেরার পথে তাঁর শত্রু উতবাহ ও শায়বাহ এর একটি আংগুরের বাগানে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। সে সময় তাদের দাস আদ্দাস নামের জনৈক খ্রিষ্টান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পায়ে চুম্বন করেছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। দেখুন: আল-মুবারক পুরী, পৃ. ১২৬। অনুরূপভাবে অপর একজন গ্রাম্য সাহাবী দ্বারাও এ ধরনের কদমবুসী করার প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অভিবাদন, সম্মান ও ভালবাসা প্রদর্শনের জন্য তাঁর কোন অনুমোদিত পন্থা ছিল না। এ জন্য তাঁর অন্যান্য সাহাবীগণ এভাবে কোন দিন তাঁকে অভিবাদন জ্ঞাপন করেন নি। এতে প্রমাণিত হয় যে, কদমবুসীর বৈধতার ব্যাপারে যে দু'একটি ঐতিহাসিক বর্ণনা পাওয়া যায় তা একেকটি ঘটনা বিশেষ, যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথেই সীমাবদ্ধ, এর দ্বারা কোন অবস্থাতেই কদমবুসী বা পা চুম্বনের অনুমোদন প্রমাণিত হয়না।- লেখক
১৫৪. কিন্তু সেই সেজদার আকার-আকৃতি, ধরণ ও পদ্ধতি সম্পর্কে আমরা সম্পূর্ণ অজ্ঞ। আসলেই কি তা মাথা মাটিতে রেখে করা হতো কি না তা জানার কোনো উপায় নেই। কারণ; সেজদা শব্দটি সম্মান ও আনুগত্য প্রকাশের অর্থেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সুতরাং সেটা অনেকটা অস্পষ্ট বা মুতাশাবিহ। সেটার উপর ভিত্তি করে কুরআন ও হাদীসের স্পষ্ট বাণী বা মুহকামের আমল বাদ দেয়া যাবে না। সুতরাং কোনোভাবেই আমরা আল্লাহ ব্যতীত কারও জন্য সেজদা করাকে অনুমতিপ্রাপ্ত মনে করতে পারি না। [সম্পাদক]
১৫৫. আল-কুরআন, সূরা ফাতহ : ৯।
১৫৬. উম্মুল মু'মিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূল কতিপয় মুহাজির ও আনসারদের মাঝে ছিলেন, এমন সময় একটি উট এসে তাঁকে সেজদা করলো। সাহাবীগণ তা দেখে বললেন: হে রাসুল! চতুষ্পদ জন্তু আপনাকে সেজদা করে, অথচ আমরা এর অধিক হকদার, তখন তিনি বললেন: তোমরা তোমাদের রবের ইবাদাত কর এবং তোমাদের ভাই অর্থাৎ আমাকে সম্মান কর।" আহমদ, প্রাগুক্ত; ৩/৩২। [(তবে এর সনদ দুর্বল), সম্পাদক]
১৫৭. মুহাম্মদ ইবন ইয়াযীদ ইবন মা-জাঃ, প্রাগুক্ত; কিতাবুন নিকাহ, বাব: হক্কুষ যাওজি 'আলাল মারআতি (স্ত্রীর উপর স্বামীর অধিকার); ১/৫৯৫।
১৫৮. মুসলিম, প্রাগুক্ত; কিতাবুয যুহদ, বাব নং ৮৯, হাদীস নং ২৯৮৫;৪/২২৮৯; আহমদ, প্রাগুক্ত; ২/২০১।
১৫৯. আল-কুরআন, সূরা মাউন : ৫,৬।
১৬০. কা'বা গৃহটি পৃথিবীর মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত হওয়ার প্রমাণে ইবন 'আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত একটি মাওকুফ হাদীস উপস্থাপন করা যায়। তাতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- বলেন: আল্লাহ তা'আলা পৃথিবী সৃষ্টির দু'হাজার বছর পূর্বে পানিতে চারটি স্তম্ভের উপর কা'বা গৃহ স্থাপন করেন। অতঃপর এ-গৃহের নিচ থেকেই পৃথিবীর সম্প্রসারণ শুরু হয়”। দেখুন: তাফছীরুল কুরআনিল 'আযীম; ১/১৮৪। পৃথিবীর মানচিত্রের প্রতি লক্ষ্য করলে বাস্তবেই প্রমাণিত হয় যে, আরব উপ-দ্বীপটি পৃথিবীর মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। লেখক
১৬১. আল-কুরআন, সূরা হজ্জ : ২৭।
১৬২. আল-কুরআন, সূরা হজ্জ : ২৯।
১৬৩. ইবন 'উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: যে দিন রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- কে এ দু'পার্শ্ব (অর্থাৎ- কা'বা গৃহের ডান পার্শ্ব ও বাম পার্শ্ব যেখানে হাজারে আসওয়াদ অবস্থিত) স্পর্শ করতে দেখেছি সে দিন থেকেই আমি এ দু'পার্শ্ব কষ্টে হোক আর বিনা কষ্টে হোক কোনো অবস্থাতেই তা স্পর্শ করা পরিত্যাগ করি নি”। দেখুন: বুখারী, প্রাগুক্ত; কিতাবুল মানাসিক, বাব নং: ৫৬, তাকবীলুল হাজার, হাদীস নং ১৫২৯; ২/৫৮২; নাসাই, প্রাগুক্ত; ৪/৫/১৮৫।
১৬৪. 'উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু এ কৃষ্ণ পাথরকে চুম্বন করার সময় বলেছিলেন, «عَلِمْتُ أَنَّكَ حَجَرٌ لَا تَضُرُّ وَلَا تَنْفَعُ، وَلَوْ لَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهَ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَبَّلَكَ مَا قَبَّلْتُكَ» "আমি জানি যে তুমি একটি পাথর, তুমি কোন লাভ ও ক্ষতি করতে পার না, রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- তোমাকে চুম্বন করতে না দেখলে আমি তোমাকে চুম্বন করতাম না"। দেখুন:বুখারী, প্রাগুক্ত, কিতাবুল মানাসিক, বাব নং: ৫৬, হাদীস নং: ১৫২৮, ২/৫৮২; সুলাইমান ইবন আশআছ, সুনানে আবী দাউদ; কিতাবুল মানাকিব, বাব: ফী তাক্ববীলিল হাজারি; (সিরিয়া: দারুল হিমস, ১ম সংস্করণ, ১৯৭০ খ্রি.), ২/৪৩৯।
১৬৫. 'আব্দুর রহমান ইবন সাফওয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: (মক্কা বিজয়ের বছর) আমি রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- কে তাঁর সাথীদের সহ কা'বা গৃহ থেকে বের হতে দেখলাম, তখন তাঁরা কা'বা গৃহের দরজা থেকে হাতীম পর্যন্ত হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে ছিলেন এবং তাদের গণ্ডদেশ দেয়ালের সাথে লাগিয়ে রেখেছিলেন, রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-তখন তাঁদের মাঝে ছিলেন”। দেখুন: আবু দাউদ, প্রাগুক্ত; ২/৪৫১। [তবে এর সনদ দুর্বল। সম্পাদক]
১৬৬. আল-কুরআন, সূরা বাক্বারাঃ :১৫৮।
১৬৭. আল-কুরআন, সূরা হজ্জ: ৩২।
১৬৮. আবু দাউদ, প্রাগুক্ত; ২/৪৮৬; ইবনে মা-জাহ, প্রাগুক্ত; ১/১০০৩।
১৬৯. আল-কুরআন, সূরা হজ্জ: ৩২।
১৭০. মসজিদ নির্মাণ এবং মসজিদে অবস্থান গ্রহণ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন: ﴿فِي بُيُوتٍ أَذِنَ اللَّهُ أَن تُرْفَعَ وَيُذْكَرَ فِيهَا اسْمُهُ يُسَبِّحُ لَهُ فِيهَا بِالْغُدُوِّ وَالْآصَالِ ﴾ [النور: ৩৬] "আল্লাহর পছন্দনীয় বান্দাদের সে সব গৃহেই পাওয়া যায় যেগুলোকে তিনি উন্নত করার ও সেখানে তাঁর নাম নেয়ার জন্য নির্দেশ করেছেন, সেখানে সকাল ও সন্ধ্যায় তারা তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে"। আল-কুরআন, সূরা নূর: ৩৬।
১৭১. ইয়ামন ও সিরিয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বরকতের দু'আ করায় মক্কা ও মদীনার পর অন্যান্য দেশের চেয়ে ইয়ামন ও সিরিয়ায় বসবাস করাকে উত্তম বিবেচনা করে সেখানে বসবাস করা যেতে পারে। ইবন 'উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي شَامِنَا ، اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي يَمَنِنَا» ইমাম তিরমিযী বলেন: হাদীসটি হাসান সহীহ। দেখুন: তিরমিযী, প্রাগুক্ত; কিতাবুল মানাক্বিব, বাব: নং ৭৫, সিরিয়া ও ইয়ামনের ফযীলতের বর্ণনা; ৪/৭৩৩। তাছাড়া যায়েদ ইবন ছাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত অপর হাদীসে রয়েছে, «طُوبَى لِلشَّام، فَقُلْنَا لأَيَّ ذَلِكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ؟ قَالَ: لأَنَّ مَلَائِكَةَ الرَّحْمَنِ بَاسِطَةٌ أَجْنِحَتَهَا عَلَيْهَا» "সিরিয়ার খুশ নসীব। যায়েদ ইবন ছাবিত বলেন: আমরা বললাম: ইহা কি কারণে হে রাসূল? তিনি বললেন: কারণ রাহমানের ফেরেশতা সিরিয়ার উপর তাঁদের ডানা প্রসারিত করে রয়েছেন। তদেব। [তিরমিযী, ৩৯৫৪]
১৭২. মুসলিম, প্রাগুক্ত; কিতাবুল হজ্জ, বাব: হজ্জ ও অন্যান্য উদ্দেশ্যে মুহরিমসহ মহিলাদের সফর করা; ২/৯৬৭; ইমাম আহমদ, প্রাগুক্ত; ২/১৩৪।
১৭৩. আবু দাউদ, প্রাগুক্ত; কিতাবুল আইমানি ওয়ান নুযুর, বাব: মা ইউমারু বিহী মিনাল ওয়াফা-ই বিন নাযরি; ৩/৬০৭; হাদীস নং ৩৩১৩।
১৭৪. প্রাগুক্ত; কিতাবুল লেবাছ, বাব নং- (৫), ৪/৩১৪।
১৭৫. প্রাগুক্ত; কিতাবুল মানাসিক, বাব নং ৯৮ (যিয়ারাতুল কুবুর), হাদীস নং ২০৪২; ২/৫৩৪; 'আযীমআবাদী, শামসুল হক, প্রাগুক্ত; ৬/২২; ইবনে কাছীর, তাফছীরুল কুরআনিল 'আযীম; ৩/৫১৬; ইমাম আহমদ, প্রাগুক্ত; ২/৩৬৭; ইবনে আবী শায়বাঃ, প্রাগুক্ত; ২/১৫০।
১৭৬. ইবন মা-জাঃ, প্রাগুক্ত; কিতাবুল একামাহ, বাব: মা জা-আ ফী ইয়াওমিল জুমু'আহ; ১/৩৪৯।
১৭৭. টীকা নং ১৬৪ দ্রষ্টাব্য।
১৭৮. ইবন মাজাহ, প্রাগুক্ত; কিতাবুন নিকাহ, বাব: আল-গেনা-ই ওয়াদ দফফি; ১/৬১২; ইবন তাইমিয়্যাহ, আহমদ, একতিদাউস সিরাতিল মুস্তাক্বীম, তাহকীক : হামিদ আল-ফকী, (বৈরুত: দারুল মা'রিফাহ, সংস্করণ বিহীন, তারিখ বিহীন), পৃ. ১৮৯-১৯০।
১৭৯. শেখ আব্দুর রহমান ইবন হাসান আ-লুশ শায়খ, ফাতহুল মাজীদ বি শারহি কিতাবিত তাওহীদ; (লাহুর : আনসারুস সুন্নাতিল মুহাম্মদিয়্যাঃ, সংস্করণ বিহীন, তারিখ বিহীন), পৃ. ২৫৭।
১৮০. বুখারী, প্রাগুক্ত; কিতাবুষ যাকাত, বাব: খেজুরের অর্ধেকাংশ দান করে হলেও আগুন থেকে বাঁচ, ১/২/২৩৪; মুসলিম, প্রাগুক্ত; ২/৭০৩, ৭০৪।
১৮১. মুসলিম, প্রাগুক্ত; কিতাবুজ যাকাত, বাব নং ১৬, হাদীস নং ১০০৮; ২/৬৯৯; ইমাম আহমদ, প্রাগুক্ত; ৪/৩৯৫।
১৮২. ইমাম আহমদ, প্রাগুক্ত; ৩/১২৪; ইবনু কাইয়্যিম আল-জাউযিয়্যাহ, মিফতাহু দারিস সা'আদাঃ, (বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, সংস্করণ বিহীন, তারিখ বিহীন), পৃ. ২১৮। [হাদীসটি তিরমিযীতেও এসেছে, নং ৩৩৬৯; তবে হাদীসটি দুর্বল। সম্পাদক]
১৮৩. বুখারী, প্রাগুক্ত; কিতাবুল আইমান ওয়ান নুজুর, বাব: মানত পূর্ণ করা; ৪/৮/২৫৩; মুসলিম, প্রাগুক্ত; ভাগ্য অধ্যায়, পরিচ্ছেদ নং- (২), ৩/১২৬১।
১৮৪. ইমাম তিরমিযী, প্রাগুক্ত; ৪/১১২; নাসাই, প্রাগুক্ত; শপথ ও মানত অধ্যায় পরিচ্ছেদ: মানতের দ্বারা কৃপনের সম্পদ বের করে নেওয়া হয়; ৪/৭/১৬।
১৮৫. আল-কুরআন, সূরা দহর: ৭।
📄 অন্তরের উপর ফরযকৃত গোপন উপাসনাসমূহ
প্রতিটি মানুষের অন্তরের প্রাথমিক গোপন কাজ হচ্ছে সে অন্তর দিয়ে আল্লাহ তা'আলার বর্তমান থাকা এবং তাঁকে এককভাবে সকল সৃষ্টির প্রতিপালক ও উপাস্য হিসেবে দ্বিধাহীন চিত্তে বিশ্বাস করবে। অন্তরের এ ধরনের বিশ্বাস হচ্ছে অন্তরের উপাসনা। কোনো মানুষই এ বিশ্বাস ব্যতীত মু'মিন হতে পারে না বিধায়, এ বিষয়টি প্রমাণের জন্য প্রমাণ উপস্থাপনের প্রয়োজন পড়ে না। এবার যদি কেউ আল্লাহ তা'আলাকে অস্বীকার করে অথবা নিজ বিশ্বাস, কর্ম বা কথার দ্বারা আল্লাহর রুবুবিয়্যাতের আওতাধীন কোনো বিষয়ে বা তাঁর কোনো উপাসনায় অপর কোনো সৃষ্টিকে জেনে বা না জেনে শরীক রয়েছে বলে বিশ্বাস করে, তা হলে সে ব্যক্তি তার অজান্তেই মুশরিক হয়ে যাবে।
আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি মহব্বত:
আল্লাহ তা'আলা ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি মানুষের ভালোবাসারস্বরূপ হচ্ছে সে ভালোবাসা তাদের নিজেদের সত্তা, নিজ সন্তানাদি, পিতা-মাতা ও অন্যান্য সব কিছুর চেয়ে অধিক হবে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَ وَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ»
“আমি যতক্ষণ তোমাদের কারো নিকট তার পিতা, সন্তান ও সকল মানুষের চেয়ে অধিক ভালোবাসার পাত্র না হবো, ততক্ষণ সে প্রকৃত মু'মিন হতে পারবে না।”
একদা 'উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেছিলেন: “হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনি আমার নিকট আমার নিজ সত্তা ব্যতীত অন্য সব কিছুর চেয়ে অধিক প্রিয়। তাঁর কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْكَ مِنْ نَفْسِكَ»
"শপথ সেই সত্তার যাঁর হাতে আমার আত্মা! যতক্ষণ আমি তোমার নিকট তোমার নিজ সত্তার চেয়েও অধিক প্রিয় না হবো, ততক্ষণ তুমি পূর্ণাঙ্গ মু'মিন হতে পারবে না।”
কেউ যদি বলে: আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালবাসি, তা হলে জীবনের সকল ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুসরণ করার মধ্য দিয়েই তাকে তার এ দাবীর সত্যতা প্রমাণ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন:
﴿قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ﴾ [آل عمران: ৩১]
“আপনি তাদেরকে বলুন! তোমরা যদি সত্যিকার অর্থে আল্লাহ তা'আলাকে ভালবেসে থাক, তা হলে তোমরা আমার অনুসরণ কর, এতে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধসমূহ মার্জনা করবেন।”
একজন রাসূল মহব্বতকারীর পরিচয় হচ্ছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণ যদি তার প্রাণ, তার স্ত্রী, পুত্র-কন্যা ও সম্পদ ইত্যাদিকে বিসর্জন দেয়ার দাবী করে, তা হলে সে নির্দ্বিধায় তা বিসর্জন দিতে প্রস্তুত হয়ে যাবে। কেননা; তা একটি বিশেষ ধরনের ভালোবাসা, যাকে আল্লাহর দাসত্ব প্রকাশের ভালোবাসা বলা হয়। এ জন্য প্রয়োজন আল্লাহর বিধানের সামনে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ। আল্লাহর অবাধ্যতায় অন্য কারো ভালোবাসা প্রকাশের জন্য এ ধরনের কোনো বিসর্জন দেয়া যেতে পারে না। এখন যদি কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদেশ বা নিষেধ পালনের পরিবর্তে অপর কোনো ধর্মীয় গুরু বা রাজনৈতিক নেতার আদেশ বা নিষেধ পালনের জন্য নিজের সব কিছু বিসর্জন দেয়, তা হলে বুঝতে হবে যে, সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসার উপর তাদের ভালোবাসাকে প্রাধান্য দিয়েছে এবং এভাবে সে গায়রুল্লাহর ভালোবাসাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিশেষ ভালোবাসার সমকক্ষ বানিয়ে নিয়েছে। এ জাতীয় ভালোবাসার লোকদের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন :
﴾ وَمِنَ النَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ اللَّهِ أَندَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِ اللَّهِ وَالَّذِينَ ءَامَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ ﴿ [البقرة: ১৬৫]
"মানুষের মাঝে এমনও কিছু লোক রয়েছে যারা আল্লাহর একাধিক সমকক্ষ নির্ধারণ করে, তাদেরকে আল্লাহর ভালোবাসার ন্যায় ভালবাসে। বস্তুত যারা ঈমান এনেছে তারা আল্লাহ তা'আলাকেই সব চেয়ে অধিক ভালবাসে।”
আরবের মুশরিকরা তাদের দেবতাদের এ ধরনের ভালবাসতো বিধায়, আল্লাহ এ আয়াতে তাদের এ জাতীয় ভালোবাসার সমালোচনা করেছেন। মুসলিমদের মাঝে যারা আল্লাহর অবাধ্যতায় তাদের নেতৃবৃন্দের আদেশ ও নিষেধকে ভালোবাসা ও আন্তরিকতার সাথে গ্রহণ করবে, তাদের অবস্থাও আরবের মুশরিকদের মতই হবে।
ভালোবাসার প্রকারভেদ (أنواع المحبة) :
এখানে উল্লেখ্য যে, ভালোবাসা মূলত দু'প্রকার :
এক. বিশেষ ধরনের ভালোবাসা, যাকে আমরা 'আল্লাহর সত্তাগত ভালোবাসা' বলতে পারি। যে ভালোবাসা নিয়ে আমরা উপরে আলোচনা করেছি। এ জাতীয় ভালোবাসা কেবল আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অন্য কারো জন্যে হতে পারে না। রাসূল- সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালোবাসাও আল্লাহর ভালোবাসার কারণে হতে হবে, রাসূলের সত্তাগত কোনো ভালোবাসা নয়। রাসূল আমাদেরকে আল্লাহর পক্ষ থেকে হেদায়াতের বাণী পৌঁছিয়েছেন, আমাদেরকে দ্বীনের দিশা দিয়েছেন, আমাদেরকে তিনি পথভ্রষ্টতা থেকে বাঁচাতে সারাজীবন সংগ্রাম করে গেছেন সেজন্যই তাঁকে ভালোবাসতে হবে। কেবল রাসূলের ব্যক্তিসত্ত্বার জন্য এ জাতীয় ভালোবাসা হতে পারবে না। হ্যাঁ, রাসূলের জন্য অন্যান্য ভালোবাসা যোগ হতে পারে, যার আলোচনা সামনে আসছে।
দুই. সাধারণ ভালোবাসা। এটি আবার তিন প্রকার:
১. প্রকৃতিগত ভালোবাসা, যেমন- কোনো বিশেষ প্রকারের মাছ, মাংস বা মিষ্টি খাওয়ার প্রতি অন্তরের আকর্ষণ। অনুরূপভাবে ক্ষুধার্ত মানুষের আহার ও তৃষ্ণার্ত মানুষের পানির প্রতি আকর্ষণ, এ সব একই পর্যায়ের ভালোবাসা। এ সব বস্তুর প্রতি অন্তরের ভালোবাসা যেমন সম্মান মিশ্রিত নয়, তেমনি এ ভালোবাসার সাথে সম্মান প্রদর্শনেরও কোনো সম্পর্ক নেই। সুতরাং এ জাতীয় ভালোবাসার সাথে শির্কেরও কোন সম্পর্ক নেই।
২. একত্রে বসবাস ও সহাবস্থানগত ভালোবাসা। যেমন- কোন শিল্প কারখানার কর্মচারীদের পারস্পরিক ভালোবাসা। স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের পারস্পরিক ভালোবাসা। ভ্রমণ বা ব্যবসার সঙ্গীদের পারস্পরিক ভালোবাসা। ভিন্ন দেশে অবস্থানকারী একদেশী মানুষের পারস্পরিক ভালোবাসা। একইভাবে স্বামী-স্ত্রী ও বন্ধু-বান্ধবদের পারস্পরিক ভালোবাসা ইত্যাদি। এ জাতীয় ভালোবাসাতেও উপাসনাগত সম্মান প্রদর্শনের কোনো সম্পর্ক না থাকায় এর সাথেও শির্কের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
৩. দয়া ও অনুগ্রহপ্রসূত ভালোবাসা। যেমন- সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার এবং পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা। এ জাতীয় ভালোবাসার সাথেও উপাসনাগত সম্মান প্রদর্শনের কোনো যোগসূত্র নেই বলে এতেও আপত্তির কিছু নেই।
উপর্যুক্ত এ তিন প্রকারের ভালোবাসা দ্বারা পরস্পরের প্রতি অস্বাভাবিক ধরনের কোনো বিনয় ও সম্মান প্রদর্শিত বা প্রমাণিত হয় না বিধায়, এ সবের সাথে শির্কের কোনো সম্পর্ক নেই।
গোপন ভয়ের উপাসনা )عبادة خوف السر( :
একজন মু'মিন আল্লাহর ব্যাপারে তার অন্তর দিয়ে গোপনে এ-ভয় পোষণ করবে যে, আল্লাহর কাছে প্রকাশ্য আর অপ্রকাশ্য বলতে কিছুই নেই। মানুষ প্রকাশ্যে বা গোপনে যা-ই করে না কেন, তিনি তা সবিশেষ অবহিত আছেন। আমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য অথবা আমাদের অন্যায় ও অপরাধজনিত কারণে তিনি ইচ্ছা করলে হঠাৎ করে যে কোনো সময় আমাদের যে কোনো অনিষ্ট হতে দিতে পারেন। আমাদের অন্যায় ও অপরাধের শাস্তি তিনি আমাদেরকে এ দুনিয়াতে না দিলেও আখেরাতে দিতে পারেন। সে জন্য তিনি আমাদেরকে সর্বদা তাঁর শাস্তির ভয় ও রহমতের আশায় থেকেই তাঁকে আহ্বান করতে নির্দেশ করে বলেছেন:
﴿وَادْعُوهُ خَوْفًا وَطَمَعًا﴾ [الأعراف: ৫৬]
“আর তোমরা তাঁকে (আল্লাহ তা'আলাকে) ভয় ও আশার মধ্যে থেকেই আহ্বান করো।”
ভয় ও আশার মধ্যে থেকে আল্লাহ তা'আলাকে আহ্বান করার প্রতি আমাদেরকে আদেশ করার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, অন্তরে এ ধরনের ভয় ও আশা নিয়ে তাঁকে আহ্বান করা হচ্ছে অন্তরের একটি বিশেষ ধরনের ইবাদাত বা উপাসনা। কোনো মানুষের ব্যাপারে কারো অন্তরে এ ধরনের ভয় ও আশার সৃষ্টি হতে পারে না, কেননা; আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে এমন কোনো মানুষ ও জিন নেই, যারা আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত স্রেফ তাদের নিজস্ব ইচ্ছানুযায়ী কারো কোনো অনিষ্ট সাধন করতে পারে। কারো দ্বারা কারো ইষ্ট বা অনিষ্ট হওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভর করে বিধায়, আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে কেবল তাঁকেই ভয় করতে আদেশ করে বলেছেন:
﴿فَلَا تَخْشَوُا النَّاسَ وَاخْشَوْنِ﴾ [المائدة: ৪৪]
"সুতরাং তোমরা মানুষের কোনো অনিষ্টের ভয় করো না, ভয় কেবল আমাকেই কর।” কাফিররা তাদের দেবতাদের ব্যাপারে অনুরূপ গোপন ভয় পোষণ করতো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দেবতাদের সমালোচনা করেন বলে তাঁকেও তারা তাদের দেবতাদের দ্বারা হঠাৎকরে যে কোনো অনিষ্টের শিকার হওয়ার ব্যাপারে ভয় প্রদর্শন করতো। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿أَلَيْسَ اللَّهُ بِكَافٍ عَبْدَةٌ، وَيُخَوِّفُونَكَ بِالَّذِينَ مِن دُونِهِ ﴾ [الزمر: ৩৬]
"আল্লাহ কি তাঁর বান্দার জন্য যথেষ্ট নয়? অথচ তারা (মুশরিকরা) তোমাকে আল্লাহর পরিবর্তে অন্যান্য উপাস্যদের ভয় প্রদর্শন করে।”
যেহেতু মহান আল্লাহর অনুমোদন ব্যতীত কেউ কারো কোনো ক্ষতি বা অনিষ্ট করতে পারে না, সেহেতু কোনো জিন- পরী, বা জীবিত বা মৃত কোনো অলি বা দরবেশ, অথবা মাযারস্থ কোনো বৃক্ষ বা অন্য কিছুর দ্বারা কোনো কারণবশত কারো কোনো অনিষ্ট হতে পারে- এমন ধারণা ও ভয় করাও আল্লাহর গোপন ভয়ের উপাসনায় শির্ক করার শামিল।
ভয়ের প্রকারভেদ )أنواع الخوف :
ভয় মূলত চার প্রকার:
প্রথম প্রকার: গোপন ভয়। যা নিয়ে উপরে আলোচনা করা হয়েছে। এমন ভয় আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অপর কারো জন্যে করা শির্ক।
দ্বিতীয় প্রকার: কোনো মানুষ বা ফিৎনার ভয়ে কোনো সৎকর্মের আদেশ এবং অসৎকর্ম হতে বারণ করা থেকে বিরত থাকা। এ ধরনের ভয় শির্ক না হলেও তা হারাম। কারণ, কুরআনুল কারীমে এ ধরনের ভয় করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। মু'মিনদের পরিচয় দান প্রসঙ্গে বলা হয়েছে: ﴿يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لَائِمٍ﴾ [المائدة: ৫৪] "তারা আল্লাহ তা'আলার পথে জিহাদ করে এবং কোনো নিন্দুকের নিন্দার ভয় করবে না।”
হাদীস শরীফে এ ধরনের ভয়কারীদের ব্যাপারে আখেরাতে ভৎর্সনা ও জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে। হাদীসে কুদসীতে বর্ণিত হয়েছে:
«إِنَّ اللَّهَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى يَقُولُ لِلْعَبْدِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ : مَا مَنَعَكَ إِذَا رَأَيْتَ الْمُنْكَرَ أَنْ لَا تُغَيَّرَهُ ؟ فَيَقُولُ يَا رَبِّ : خَشِيتُ النَّاسَ فَيَقُولُ : إِيَّايَ كُنْتُ أَحَقَّ أَنْ تَخْشَى»
"কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ বান্দাকে বলবেন: অন্যায় কর্ম দেখার পর কোন বস্তু তোমাকে তা পরিবর্তন করতে বাধা দিল? তখন বান্দা বলবে: হে প্রভু! পাছে লোকে কী বলে, এ ভয়ে আমি তা নিষেধ করতে পারি নি। আল্লাহ বলবেন: মানুষের চেয়ে আমিইতো ভয়ের অধিকতর হকদার ছিলাম।”
তৃতীয় প্রকার: আল্লাহর শাস্তির ভয়, যে শাস্তির ব্যাপারে তিনি তাঁর অবাধ্য ও অপরাধী বান্দাদের ভয় প্রদর্শন করেছেন। এ জাতীয় ভয় মু'মিনদের অন্তরে থাকা প্রশংসনীয়। যারা এ গুণে গুণান্বিত হবে, তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর নিকট আকর্ষণীয় পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি। যেমন- মহান আল্লাহ বলেন : ﴿ ذَلِكَ لِمَنْ خَافَ مَقَامِي وَخَافَ وَعِيدِ ﴾ [ابراهيم: ১৪]
"এ-পুরস্কার তাদের জন্যেই যারা হিসেবের জন্য আমার সম্মুখে দণ্ডায়মান হওয়াকে এবং আমার শাস্তিকে ভয় করে।"
চতুর্থ প্রকার: প্রকৃতিগত ভয়, যেমন- ওৎ পেতে থাকা শত্রু বা হিংস্র জীব-জন্তু, বিষধর সাপ, পানিতে ডুবে ও আগুনে পুড়ে মরে যাওয়া ইত্যাদির ভয়। এ জাতীয় ভয় কোনো নিন্দনীয় বা দূষণীয় নয় কারণ; এ জাতীয় ভয় সম্মান মিশ্রিত হয় না। মূসা আলাইহিস সালাম-এর অন্তরে ফের'আউন ও তার সৈন্যদের ব্যাপারে এ জাতীয় ভয় ছিল। এ কারনেই তিনি মিসর ছেড়ে পালিয়ে যান। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন :
﴿فَخَرَجَ مِنْهَا خَائِفًا يَتَرَقَّبُ ﴾ [القصص: ২১]
“অতঃপর তিনি (মূসা) শত্রু আগমনের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে সেখান থেকে ভীত অবস্থায় বের হয়ে পড়েন।”
কামনার উপাসনা )عبادة الرجاء( :
'রাজা-উন' শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে : মনের কামনা পূর্ণ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। মানুষের মনের কামনা মূলত দু'প্রকারের হয়ে থাকে :
এক. এমন সব চাহিদা যা পূর্ণ হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যে কর্ম করতে হয়, তা ব্যক্তির নিজের বা অপর যে কোনো মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে থাকে। এ জাতীয় চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে অন্য জীবিত উপস্থিত মানুষের নিকট সাহায্য চাওয়া যেতে পারে। তবে কোনো মৃত বা অনুপস্থিত কোনো মানুষের কাছে এ জন্য সাহায্যের আহ্বান করলে তা শির্কে আকবার এর অন্তর্গত হবে।
দুই. এমন সব কামনা যা পূর্ণ করে দেয়া আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অপর কারো সামর্থ্যের মধ্যে নেই। যেমন: সন্তান দান করা, ব্যবসায় উন্নতি প্রদান করা, রোগ-ব্যাধি নিরাময় করা, সমুদ্র বা নদীতে ঝড় ও তুফানের হাত থেকে রক্ষা করা, জঙ্গলের হিংস্র জীব-জন্তুর হাত থেকে রক্ষা করা... ইত্যাদি। মানুষের এ জাতীয় চাহিদা পূরণ করা একমাত্র আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অপর কারো সামর্থ্যের মধ্যে নেই। তাই এ জাতীয় কল্যাণার্জন ও অকল্যাণ দূরীকরণের জন্য কোনো অলি বা দরবেশের নিকট সাহায্য কামনা করা শির্কে আকবারের পর্যায়ভুক্ত; কেননা, এতে করে তাঁদেরকে আল্লাহর রুবুবিয়্যাতের বৈশিষ্ট্যের অধিকারীর মর্যাদায় উন্নীত করা হয় এবং তাঁদের কাছে কামনা-বাসনা করা হয়।
ভরসার উপাসনা )عبادة التوكل( :
একজন মু'মিনের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে তার করণীয় হচ্ছে, উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য যে কর্ম করা প্রয়োজন, তা নিজের সাধ্যের মধ্যে থাকলে তা নিজে করা বা অপর জীবিত ও উপস্থিত কারো সাধ্যের মধ্যে থাকলে প্রয়োজনে তাদের সহযোগিতায় তা সম্পাদন করা এবং কর্মের ফলাফল প্রাপ্তির জন্য আল্লাহ তা'আলার কাছে দু'আ করা এবং তাঁরই উপর ভরসা করা। কর্ম যদি কারো সাধ্যের মধ্যে না থাকে, তবে নিজে বা অপর জীবিত উপস্থিত মানুষের দু'আর মাধ্যমে আল্লাহর নিকট তা কামনা করা এবং তা অর্জিত হওয়ার জন্য একমাত্র আল্লাহর উপরেই ভরসা করা। কোনো অবস্থাতেই নিজের বা অপর কারো উপর ভরসা না কর। কেননা, প্রকৃত মু'মিনের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সকল ব্যাপারে আল্লাহর উপর ভরসা করা। সে-জন্য আল্লাহ বলেন,
﴿ وَعَلَى اللَّهِ فَتَوَكَّلُوا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ ﴾ [المائدة: ২৩]
“তোমরা যদি সত্যিকার অর্থে মু'মিন হয়ে থাকো, তাহলে একমাত্র আল্লাহর উপরেই ভরসা কর।” এতে প্রমাণিত হয় যে, প্রকৃত মু'মিন হতে হলে সর্বাবস্থায় আল্লাহর উপরেই ভরসা করতে হবে। তা না করে যারা আল্লাহর পাশাপাশি নিজের বা অন্যের কর্মের উপর ভরসা করবে, তারা শির্কে আসগারে পতিত হবে। আর যা কারো সাধ্যের মধ্যে নেই, তা প্রাপ্তির জন্য যারা কোনো অলি বা দরবেশের উপরে ভরসা করবে, তারা শির্কে আকবারে পতিত হবে।
এখানে উল্লেখ্য যে, মানুষের সামর্থ্যের মধ্যকার কর্মের ক্ষেত্রেও কর্ম আরম্ভ করে তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহর উপরেই ভরসা করতে হবে, এ কারণে যে, কর্ম করার জন্য যে শক্তি ও সামর্থ্যের প্রয়োজন, সে সবের মালিক হলেন আল্লাহ। তিনি তৌফিক দিলেই কেবল আমরা কোনো কর্ম শুরু ও তা শেষ করতে পারি। অন্যথায় হাজারো ইচ্ছা ও চেষ্টা করেও আমরা তা করতে পারবো না।
কর্ম না করে আল্লাহর উপর ভরসা করা অবৈধ: এখানে আরো উল্লেখ্য যে, কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য প্রয়োজনীয় কর্ম না করে তা হাসিলের জন্য আল্লাহর উপর ভরসা করাকে শর'য়ী দৃষ্টিতে 'তাওয়াককুল' বলা হয় না। এ ধরনের ভরসা শর'য়ী দৃষ্টিতে বৈধ নয়। কেউ যদি খাওয়া-দাওয়া না করে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য আল্লাহর উপর ভরসা করে এবং এভাবে থেকে শেষ পর্যন্ত মারা যায়, তবে শর'য়ী দৃষ্টিতে এমন ব্যক্তি আত্মহত্যাকারী হিসেবে গণ্য হবে।
আনুগত্য ও অনুসরণের উপাসনা (عبادة الطاعة والاتباع) :
একজন মু'মিনের যাবতীয় আনুগত্য ও অনুসরণ নিঃশর্তভাবে নিবেদিত হবে কেবলমাত্র আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্যে। রাজনৈতিক বা ধর্মীয় নেতাদের যে আদেশ বা নিষেধ পালন করলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য ও অনুসরণ হবে, কেবল সে ক্ষেত্রেই একজন মুসলিম তাঁদের আনুগত্য ও অনুসরণ করবে। আর যে ক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অবাধ্যতা হবে, সে ক্ষেত্রে কোনো কারণবশত বাহ্যত তাঁদের আনুগত্য ও অনুসরণ করলেও খুশী মনে অন্তর দিয়ে তাঁদের আনুগত্য করবে না। আনুগত্যের এ বিধান বর্ণনা প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন,
﴿يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُوْلِي الْأَمْرِ مِنكُمْ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا ﴾ [النساء: ৫৯]
তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তোমাদের মধ্যকার দায়িত্বপ্রাপ্তদের আনুগত্য কর। অতঃপর কোনো বিষয়ে সে দায়িত্বশীলদের সাথে তোমরা মতবিরোধ করলে সত্যিকারার্থে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান এনে থাকলে বিরোধপূর্ণ সে বিষয়টিকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও, এটা তোমাদের জন্য উত্তম এবং পরিণতির দিক থেকে তা খুবই ভাল।”
এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কোনো বিষয়ে মতবিরোধ হলে বিনা দলীলে কেউ কারো কোনো কথা মানতে পারবে না; বরং সে ক্ষেত্রে সাধারণ ও ক্ষমতাশীন নির্বিশেষে সকলকেই আল্লাহ্ তা'আলার কিতাব ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহীহ সুন্নাতের দিকে ফিরে আসতে হবে; কেননা, এ দু'টিই হচ্ছে যে কোনো বিবাদ মীমাংসার ফয়সালাদায়ক ও যে কোনো বিধান রচনা করার মূল উৎস। ধর্মীয় বা পার্থিব কোনো ক্ষেত্রেই ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ বা জাতীয় সংসদের দ্বারা গৃহীত কোনো আইন বা সিদ্ধান্তই- তা বাহ্যত যতই কল্যাণকর হোক না কেন- কুরআন ও সহীহ হাদীসে বর্ণিত বিধান বা তাতে বর্ণিত মৌলিক নীতিমালার আওতাধীন হওয়ার ছাড়পত্র ব্যতীত বৈধ হতে পারে না। এর কারণ হচ্ছে-মানুষ একমাত্র আল্লাহরই সৃষ্টি, তাই তাদের সার্বিক জীবন পরিচালিত হবে তাঁরই দেওয়া হেদায়াত ও বিধানানুযায়ী। এ হেদায়াত ও বিধানই যে তাদের দুনিয়া-আখেরাতের যাবতীয় সুখ, শান্তি ও কল্যাণের নিয়ামক, সে সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
﴿فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدًى فَمَن تَبِعَ هُدَايَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ وَالَّذِينَ كَفَرُوا وَكَذَّبُوا بِنَايَاتِنَا أُوْلَبِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ ﴾ [البقرة: ৩৮, ৩৯]
“অতঃপর যদি তোমাদের নিকট আমার পক্ষ থেকে কোন হেদায়াত আসে, তাহলে যারা আমার সে হেদায়াত অনুসরণ করবে, তাদের উপর না কোন ভয় আসবে, না তারা চিন্তাগ্রস্ত হবে। আর যারা তা অস্বীকার করবে এবং আমার নিদর্শনগুলোকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে, তারাই হবে জাহান্নামবাসী, সেখানে তারা অনন্তকাল থাকবে।”
আল্লাহ যে মানুষের সার্বিক জীবন পরিচালনার একক বিধান দাতা, সে সম্পর্কে তিনি বলেন:
﴿إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ ﴾ [يوسف: ৪০]
“হুকুম হবে একমাত্র আল্লাহ তা'আলারই, তিনি তোমাদেরকে একমাত্র তাঁরই উপাসনা করতে নির্দেশ করেছেন।”
এ আয়াতের মর্ম হচ্ছে- তিনি মানুষের ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে কুরআনুল কারীম ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহীহ হাদীসে প্রকাশ্যভাবে বা ইশারা ও ইঙ্গিতে যে সব বিস্তারিত বিধান ও মৌলিক নীতিমালা দিয়েছেন, সাধ্যানুযায়ী তা পালন করার মধ্য দিয়েই জীবনের সার্বিক ক্ষেত্রে তাঁর আনুগত্যের উপাসনার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে তিনি আমাদের নির্দেশ করেছেন। এতে প্রমাণিত হয় যে, আমাদের জীবনকে শাসন করার জন্য কুরআনুল কারীম ও সহীহ হাদীসের দিকে প্রত্যাবর্তন না করে নিজ থেকে কোনো বিধান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার কোনো বৈধ অধিকার আমাদের নেই। কোনো ক্ষেত্রে কুরআনুল কারীম বা সহীহ হাদীসে সুস্পষ্ট বিধান থাকা সত্ত্বেও বা সে বিষয়ে তাতে বিধান রচনার জন্য কোনো মৌলিক নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও সে সুস্পষ্ট বিধান বা নীতিমালা পরিহার করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ যদি জনগণের জন্য নিজ থেকে কোনো বিধান রচনা করেন, তা হলে আল্লাহর দৃষ্টিতে তারা নিজেদের প্রবৃত্তিকেই নিজেদের ইলাহ বানিয়ে থাকবেন। এ জাতীয় লোকদের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন :
﴿ أَفَرَعَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَئَهُ ﴾ [الجاثية: ২৩]
"আপনি কি সে ব্যক্তিকে দেখেছেন যে তার প্রবৃত্তিকে নিজের ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে।”
এ জাতীয় লোকদের ব্যাপারে আল্লাহর বক্তব্য হচ্ছে:
﴿وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَلَهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللَّهِ ﴾ [القصص: ৫০]
“আল্লাহর হেদায়াত ব্যতীত যারা নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, তাদের চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে।”
সাধারণ জনগণ যদি সে ধরনের কোনো বিধান বিনা প্রতিবাদে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেন, তা হলে তাদের অবস্থা ইয়াহূদী ও খ্রিষ্টানদের মতই হবে, যারা তাদের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের এ জাতীয় কর্মকে সন্তুষ্ট চিত্তে গ্রহণ করার ফলে তাদেরকে রব বানিয়ে নিয়েছিল। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ ﴾ [التوبة: ৩১]
"ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানরা তাদের পাদরী ও ধর্মযাজকদের আল্লাহর বদলে বহু রব বানিয়ে নিয়েছিল।”
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় 'আদী ইবন হাতিম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। উক্ত হাদীস শ্রবণ করার পর তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেন: “হে রাসূল! আমরাতো তাদেরকে রব বানিয়ে নেই নি? জবাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: তারা কোনো বস্তু হালাল বা হারাম বলে দিলে তোমরা কি তা গ্রহণ করো না? জবাবে আদী বলেন- হ্যাঁ, তা করি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : এটিই হচ্ছে তাদেরকে রব বানানোর শামিল।”
উপর্যুক্ত আয়াত ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, যারা কোনো রাজনৈতিক নেতা বা ধর্মীয় কোনো ইমাম বা কোনো মাযহাবের নিঃশর্ত আনুগত্য ও অন্ধ অনুসরণ করবে, তাঁদের গৃহীত বিধান বা মতামতের ভুল-শুদ্ধ বিচার না করে এর বিপরীতে কুরআনুল কারীম ও সহীহ হাদীস পাওয়া সত্ত্বেও চোখ বন্ধ করে অন্ধভাবে তাঁদের আনুগত্য ও অনুসরণ করবে, আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূলের দৃষ্টিতে তাদের পরিণতি ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের মতই হবে। বিশেষ করে ধর্মীয় ক্ষেত্রে এ ধরনের অনুসরণ করার ব্যাপারে শাহ ওয়ালি উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (মৃত ১১৭৬ হি.) স্বীয় গ্রন্থ 'হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ'তে এবং ক্বাযী সানাউল্লাহ পানিপথী (১১৮৩-১২২৫ হি.) তাঁর তাফসীরে মাযহারীতে মুসলিমদের জন্য সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। অন্ধ তাকলীদ হারাম হওয়া প্রসঙ্গে শাহ ওয়ালী উল্লাহ (রহ.) যা বলেছেন, তা সংক্ষেপে নিম্নে বর্ণিত হলো:
“যিনি কোনো একটি বিষয়েও ইজতেহাদ করার মত যোগ্যতা অর্জন করবেন, তার পক্ষে সে বিষয়ে অপরের অন্ধ তাকলীদ করা হারাম।
অনুরূপভাবে যার নিকট এ কথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো একটি আদেশ বা নিষেধ করেছেন এবং সে আদেশ বা নিষেধের ব্যাপারে বর্ণিত অন্যান্য সকল হাদীস অনুসন্ধান করে এবং এর পক্ষে বা বিপক্ষে যারা রয়েছেন, তাদের কথা-বার্তা অনুসন্ধান করে সে ব্যক্তি যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সে আদেশ বা নিষেধের কোনো মনসুখ বা রহিতকারী দলীল খুঁজে না পায়, অথবা বিষয়টি যদি এমন হয় যে, অধিকাংশ ইসলামী বিশেষজ্ঞগণ রাসূলের আদেশ বা নিষেধ সম্বলিত কোনো হাদীস গ্রহণ করে থাকেন, অথচ দেখা যায় যিনি তা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিরোধিতা করছেন, তিনি কেবল কোনো ক্বিয়াস (রায়) অথবা ইজতেহাদ বা অনুরূপ কিছুর দ্বারা এর বিরোধিতা করছেন, এমতাবস্থায় সে যদি (তা অনুধাবন করার পরেও নিজের ইমাম বা মাযহাবের মতামত পালন করার জন্য) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সে হাদীসের বিরোধিতা করে, তখন বুঝতে হবে যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীসের বিরোধিতার পিছনে তার অন্তরে গোপন নেফাকী বা প্রকাশ্য আহমকী ব্যতীত আর কোনো কারণ নেই।”
মাওলানা সানাউল্লাহ পানিপথী (১১b৩-১১২৫ হি.) কুরআনুল কারীমে বর্ণিত:
﴿وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ ﴾ [آل عمران: ৬৪]
"আমরা যেন পরস্পরকে রব হিসেবে গ্রহণ না করি।”
এ আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেন: "এখান থেকে বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো হাদীস যদি কারো নিকট কোনো প্রকার বিরোধ থেকে মুক্ত অবশ্যই সহীহভাবে প্রমাণিত হয় এবং এর কোনো রহিতকারীও তার নিকট প্রমাণিত না হয়, এমতাবস্থায় উদাহরণস্বরূপ ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর কোনো ফতোয়াও যদি এর বিপরীতে হয়, আর চার ইমামের কোনো ইমাম এ হাদীসের উপর 'আমল করে থাকেন, তা হলে সে ব্যক্তির পক্ষে উক্ত হাদীসের উপর 'আমল করা ওয়াজিব হয়ে যাবে। (এমতাবস্থায়) কঠিনভাবে তার মাযহাবকে আঁকড়ে ধরে থাকা যেন তাকে সে হাদীসের উপর 'আমল করা থেকে বিরত না রাখে। কেননা, এমনটি করলে এতে আল্লাহকে ব্যতীত পরস্পরকে অসংখ্য রব বানানোর শামিল হবে।”
তাকলীদ করার সরল ও সঠিক পন্থা:
আমরা যারা সাধারণভাবে কুরআন ও হাদীস অল্প-বিস্তর জানি অথবা যারা জানি না, আমরা সকলে অবশ্যই কারো না কারো অনুসরণ বা তাকলীদ করবো।
তবে এ ক্ষেত্রে ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের অনুরূপ হওয়ার অভিযোগ থেকে বাঁচতে হলে আমরা কোনো মাযহাব বা কোনো মনীষীর তাকলীদ করার ক্ষেত্রে এ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করবো যে, যখনই কোনো বিষয়ে আমরা অনুসরণীয় মাযহাব বা মনীষীর কোনো মতামত কুরআন ও সহীহ হাদীসের বিপরীতে রয়েছে বলে নিজস্ব পড়া-শুনা অথবা কারো মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে অবগত হতে পারবো, তখনই সে বিষয়ে সে মাযহাব বা সে মনীষীর মতামতের উপর 'আমল করা পরিহার করে কুরআন ও সহীহ হাদীসের দ্বারা যা করা সঠিক বলে প্রমাণিত হয়, তা-ই করবো।
অনুরূপভাবে যখনই আমাদের নিকট নিজ মাযহাবে প্রচলিত কোনো 'আমলের বিপরীতে অপর কোনো মাযহাবের 'আমল এক বা একাধিক অপেক্ষাকৃত বিশুদ্ধ হাদীস ও যুক্তির আলোকে 'আমলের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবার যোগ্য বলে প্রতীয়মান হবে, তখনই আমরা যাবতীয় ধরনের গোঁড়ামি পরিহার করে নিজ মাযহাবের 'আমল পরিত্যাগ করে সে মাযহাবের আমলকে গ্রহণ করবো।
আশা করি, এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কারো বা কোনো মাযহাবের অনুসরণ করলে এতে আমরা ইয়াহুদী ও খ্রিষ্টানদের অনুরূপ হওয়া থেকে বাঁচতে পারবো। সাধারণ লোকেরা যে এ ধরনের সরল ও সোজা দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কারো না কারো তাকলীদ করবে এ প্রসঙ্গে শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) বলেন:
"যে ব্যক্তি কারো তাকলীদ করে এ মানসিকতা নিয়ে যে, সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত অপর কারো কথা মানতে রাজি নয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হালাল বা হারাম করেছেন সে কেবল তাই হালাল বা হারাম বলে বিশ্বাস করে। কিন্তু, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী বলেছেন, তা তার জানা নেই, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বক্তব্যসমূহের মাঝে মতবিরোধপূর্ণ কথাগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের বা তাঁর কথা থেকে অনুসন্ধান করে মাসআলা বের করার পন্থা সম্পর্কেও তার কোনো জ্ঞান নেই, এমতাবস্থায় সে যদি কোনো হেদায়াত প্রাপ্ত আলিমের অনুসরণ করে এ ধারণার ভিত্তিতে যে, তিনি যা বলেন তা সঠিক, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথার বাহ্যিক অর্থ গ্রহণ করেই ফতোয়া দেন এবং তাঁর সুন্নাতের অনুসরণ করেন, তবে তিনি (অনুসরণীয় ব্যক্তি) যদি কখনও তার উক্ত ধারণার বিপরীত কিছু করেন বলে তার নিকট প্রমাণিত হয়, তা হলে সে কোনো প্রকার বিতর্ক অথবা জিদ না করে তাৎক্ষণিকভাবেই সে আলিমের অনুসরণ করা পরিত্যাগ করবে। তা হলে এমন তাকলীদকে কেউ কিভাবে অস্বীকার করতে পারে ?...তিনি অতঃপর বলেন: যে নিষ্পাপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণ আল্লাহ তা'আলা আমাদের উপর ফরয করে দিয়েছেন, সে রাসূলের কোনো হাদীস যদি বিশুদ্ধ সনদে আমাদের নিকট পৌঁছায়, আর তা যদি নিজ ইমামের মাযহাবের বিপরীত কিছু প্রমাণ করে, এমতাবস্থায় আমরা যদি তাঁর হাদীসকে পরিত্যাগ করে মুজতাহিদের হাদীস বিরোধী ইজতেহাদকে গ্রহণ করি, তা হলে আমাদের চেয়ে অধিক জালিম আর কে হতে পারে? কেয়ামতের দিন রব্বুল আলামীনের নিকট আমাদের কী জবাব হবে?”
টিকাঃ
১৮৬. বুখারী, প্রাগুক্ত; কিতাবুল ঈমান, বাব: রাসূলের ভালবাসা ঈমানের অন্তর্গত; ১/১/১৭; মুসলিম, প্রাগুক্ত; কিতাবুল ঈমান, বাব: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভালবাসা অপরিহার্য; ১/৬৭। হাদীসটি আনাস রাদিয়াল্লাহু 'আনহু থেকে বর্ণিত।
১৮৭. বুখারী, প্রাগুক্ত; কিতাবুল আইমান ওয়ান নুজুর, বাব: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শপথ কেমন ছিল?; ৪/৬/২৩১-২৩২।
১৮৮. আল-কুরআন, সূরা আলে ইমরান: ৩১।
১৮৯. আল-কুরআন, সূরা বাক্বারাহ: ১৬৫।
১৯০. মনে রাখতে হবে যে, রাসূলের প্রতি আমাদের ভালোবাসাও এ পর্যায়ের। তাঁর প্রতি আমাদের ভালোবাসার কারণ হচ্ছে, • তাঁকে ভালোবাসতে আল্লাহ্ নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং তাঁর ভালোবাসার মাধ্যমে আল্লাহর নির্দেশকে আমরা বাস্তবায়ণ করি। • তিনি আমাদেরকে সঠিক পথের দিশা দিয়েছেন, সুতরাং তাঁর অনুগ্রহ আমাদের উপর অনেক। তাই তাঁকে ভালোবাসতে হবে। • তিনি আমাদেরকে ভালোবাসতেন, তাই তাঁর ভালোবাসার প্রতিদানস্বরূপ আমরাও তাঁকে ভালোবাসব। • তাঁর আনুগত্যের নির্দেশ আল্লাহ তা'আলা দিয়েছেন। সে নির্দেশ বাস্তবায়ণ করতে হলে ভালোবাসার কোনো বিকল্প নেই। রাসূলের প্রতি আমাদের ভালোবাসা কখনই সত্তাগত নয়, বরং গুণগত। এ বিশ্বাস প্রতিটি মুমিনের রাখা উচিত। [সম্পাদক]
১৯১. এটাই হচ্ছে অনুমোদিত ভালোবাসা ও নিষিদ্ধ ভালোবাসার সীমারেখা। কোনোক্রমেই এ সব ভালোবাসায় অস্বাভাবিক ধরনের কোনো বিনয় ও সম্মান প্রদর্শিত বা প্রমাণিত হতে পারবে না। যদি কোনোভাবে এগুলোতে এ জাতীয় কিছু পরিলক্ষিত হয়, তবে সেটাও শির্কী ভালোবাসায় পরিণত হবে। যদি কেউ রাসূল, স্ত্রী, পণ্য, সন্তান-সন্তানাদি, অথবা দুনিয়ার যে কোনো বস্তু বা বিষয়ের প্রতি পরিপূর্ণ বিনয় ও অস্বাভাবিক ভালোবাসা দেখায় তবে সেটাও মা'বুদে পরিণত হবে এবং যে এ ধরনের ভালোবাসবে সে মুশরিক হয়ে যাবে। [সম্পাদক]
১৯২. শেখ সুলাইমান ইবন আব্দুল্লাহ, প্রাগুক্ত; পৃ. ৪৬৮। (সংক্ষিপ্ত) তবে এটাও উপরোক্ত শর্ত দ্বারা শর্তযুক্ত। [সম্পাদক]
১৯৩. ইবনে কাছীর, প্রাগুক্ত; ২/২৩১। ইমাম ইবন কাছীর সূরা আ'রাফের )وَادْعُوْهُ خَوْفاً وَ طَمَعَاً( এ আয়াতে ব্যাখ্যায় বলেন: أي خوفا مما عنده من وبيل العقاب وطمعا فيما عنده من جزيل الثواب
১৯৪. আল-কুরআন, সূরা আ'রাফ: ৫৬।
১৯৫. আল-কুরআন, সূরা মায়েদাহ: ৪৮।
১৯৬. আল-কুরআন, সুরা যুমার: ৩৬।
১৯৭. আল-কুরআন, সূরা মায়েদাহ: ৫৪।
১৯৮. ইবন মাজাহ, প্রাগুক্ত; কিতাবুল ফিতন, বাব নং (২০); ২/১৩২৮। (তবে হাদীসটির সনদ দুর্বল [সম্পাদক])
১৯৯. আল-কুরআন, সূরা ইব্রাহীম: ১৫।
২০০. আল-কুরআন, সূরা ক্বাসাস : ২১।
২০১. মনে রাখা জরূরী যে, কামনা-বাসনার মাধ্যমে শির্ক হওয়ার জন্য এটা জরুরী নয় যে, কেউ মনে করবে যে যাদের কাছে সে কামনা-বাসনা করছে, তাদের নিকট রুবুবিয়্যাতের কোনো বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। কারণ, যদি এরকম কোনো বিশ্বাস থাকে, তবে তা হবে, দু'দিক থেকে শির্ক। প্রথমত, রুবুবিয়্যাতে শির্ক, তারপর তার কাছে কামনা-বাসনার কারণে সে আল্লাহর উলুহিয়্যাতেও শির্ক করল। সুতরাং কেউ যদি কারও ব্যাপারে রুবুবিয়্যাতের কোনো বৈশিষ্ট্য নেই মনে করেও তার কাছে এমন কোনো কিছু পাওয়ার কামনা-বাসনা করে, যা একমাত্র আল্লাহর কাছেই থাকতে পারে, তাতেও সে আল্লাহর উলুহিয়্যাত তথা ইবাদাতে শির্ক করেছে বলে গণ্য হবে। [সম্পাদক]
২০২. আল-কুরআন, সূরা মায়েদাহ্: ২৩।
২০৩. আল-কুরআন, সূরা নিসা: ৫৯।
২০৪. আল-কুরআন, সূরা বাক্বারাহ : ৩৮, ৩৯।
২০৫. আল-কুরআন, সূরা আন'আম : ৫৭।
২০৬. আল-কুরআন, সূরা জাছিয়াহ: ২৩।
২০৭. আল-কুরআন, সূরা ক্বাসাস : ৫০।
২০৮. আল-কুরআন, সুরা তাওবাহ: ৩১।
২০৯. তিরমিযী, প্রাগুক্ত; কিতাবুত তাফসীর, বাব: নং- ৯।
২১০. এ প্রসঙ্গে তিনি যা বলেছেন তা নিম্নরূপ: إنما يتم أي تحريم التقليد فيمن له ضرب من الاجتهاد ولو في مسألة واحدة. و فيمن ظهر عليه ظهورا بينا أن النبي صلى الله عليه وسلم أمر بكذا و نهى عن كذا ، و أنه ليس بمنسوخ ، إما بأن يتتبع الأحاديث و أقوال المخالف و الموافق في المسألة فلا يجد لها نسخا أو بأن يرى جما غفير من المتبحرين في العلم يذهبون إليه ، ويرى المخالف له لا يحتج إلا بقياس أو استنباط أو نحو ذلك ، فحينئذ لا سبب لمخالفة حديث النبي صلى الله عليه وسلم إلا نفاق خفي أو حمق جلي. দেখুন: আদ-দেহলভী, শাহ ওয়ালী উল্লাহ, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ; (বৈরুত : দ্বারুল মা'রিফাহ, সংস্করণ বিহীন, সন বিহীন), পৃ. ১৫৪-১৫৬।
২১১. আল-কুলআন, সূরা আলে ইমরান: ৬৪।
২১২. এ প্রসঙ্গে তিনি যা বলেছেন এর আরবী ভাষান্তর নিম্নরূপ: ومن ههنا يظهر أنه إذا صح عند أحد حديث مرفوع من النبي صلى الله عليه وسلم سالما من المعارضة ، ولم يظهر له ناسخ ، وكان فتوى أبي حنيفة رحمه الله مثلا خلافه ، وقد ذهب على وفق الحديث أحد من الأئمة الأربعة، يجب عليه اتباع الحديث الثابت ، ولا يمنعه الجمود على مذهبه من ذلك ، لئلا يلزم اتخاذ بعضنا بعضا أربابا من دون الله. দেখুন: পানিপতী, ক্বাযী সানাউল্লাহ, আত-তাফসীরুল মাজহারী, (দেহলী : এদারাতু এশাআতিল উলুম, সংস্করণ বিহীন, সন বিহীন), ২/৬৩-৬৪।
২১৩. তিনি বলেন: وليس محله (أي محل تحريم التقليد فيمن لا يدين إلا بقول النبي صلى الله عليه وسلم و لا يعتقد حلا إلا ما أحله الله و رسوله ، و لا حراما إلا ما حرم الله و رسوله لكن لم يكن له علم بما قال النبي صلى الله عليه و سلم و لا بطريق الجمع بين المختلفات من كلامه ، و لا بطريق الاستنباط من كلامه اتبع عالما راشدا على أنه مصيب فيما يقول ، و يفتي ظاهرا ، متبع سنة رسول الله صلى الله عليه و سلم ، فإن خالف ما يظنه أقلع من ساعته من غير جدال و لا أصرار، فهذا كيف ينكره أحد ... ثم قال : فإن بلغنا حديث من الرسول المعصوم الذي فرض الله علينا طاعته بسند صالح يدل على خلاف مذهبه وتركنا حديثه واتبعنا ذلك التخمين أي قياس المجتهد واستنباطه، فمن أظلم منا وما عذرنا يوم يقوم الناس لرب العالمين. দেখুন: শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ; পৃ. ১৫৬।
২১৪. আল-কুরআন, সূরা যুমার: ৫৪।
২১৫. আল-কুরআন, সূরা ফাত্বির: ১৫।
২১৬. আল-কুরআন, সূরা গাফির: ৬০।
২১৭. হাদীসটি নিম্নরূপ : ...إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ দেখুন: মুসলিম, প্রাগুক্ত; কিতাবুল ওয়াসিয়্যাহ, বাব নং ৩, ৩/১২৫৫; তিরমিযী, প্রাগুক্ত; কিতাবুল আহকাম, বাব নং ৩৬, হাদীস নং: ১৩৭৬; ৩/৬৬০; ইমাম আহমদ, প্রাগুক্ত; ২/৩৭২।
২১৮. আল-কুরআন, সূরা আন'আম : ১৬২।
২১৯. ভালো করে লক্ষ্য করলে বুঝতে পারবেন যে, আগত অভ্যাসগত শির্ক বলে লেখকের পক্ষ থেকে যা বলা হয়েছে, তা আলাদা কোনো শির্ক নয়। এগুলো হয় আল্লাহর রবুবিয়াতে শির্ক, নতুবা আল্লাহর উলুহিয়াত তথা ইবাদাতে শির্ক। অথবা তাঁর নাম ও গুণে শির্ক। এর বাইরে কোনো শির্ক নেই ও হতে পারে না। [সম্পাদক]
২২০. ইমাম আহমদ, প্রাগুক্ত; ১/২১৪।
২২১. আবু দাউদ, প্রাগুক্ত; কিতাবুস সুন্নাহ, বাব নং- ১৮; ৫/৯৫। (তবে হাদীসটির সনদ দুর্বল। [সম্পাদক])
২২২. আমরা আগেই বলেছি, লেখক এখানে অভ্যাসগত যে সকল শির্কের উদাহরণ দিয়েছেন তা হয় রুবুবিয়্যাত, নতুবা উলুহিয়্যাতের সাথে সম্পৃক্ত। সেটাকে শুধু রুবুবিয়্যাতের সাথে সম্পৃক্ত বলার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। [সম্পাদক]
২২৩. এখানেও বিশুদ্ধ মতটি আমরা লেখকের কথার বাইরে দেখতে পাই। কারণ, অন্তরের উপাসনার বিষয়টিও উলুহিয়্যাতের সাথেই সম্পৃক্ত। তবে কোনো কোনো সময় সেটা রুবুবিয়্যাতে শির্ক করা পর্যন্ত গড়ায়। [সম্পাদক]