📘 শিরক কি ও কেন > 📄 আল্লাহ তা'আলার উপাসনার মাধ্যম

📄 আল্লাহ তা'আলার উপাসনার মাধ্যম


মানুষ যাতে আল্লাহ তা'আলার রুবুবিয়্যাত ও উলুহিয়্যাতে কাউকে শরীক না করে, সে জন্য তিনি মানুষের তাঁর উপাসনাদিকে দু'ভাগে বিভক্ত করেছেন,
এক. বাহ্যিক উপাসনাদি যা তাঁর উলুহিয়্যাতের ক্ষেত্রে শির্ক না করার জন্য মানুষের শরীরের বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপর ফরয করে দিয়েছেন।
দুই. গোপন উপাসনাদি, যা তাঁর রুবুবিয়্যাতের ক্ষেত্রে শির্ক না করার জন্য মানুষের শরীরের গোপন অঙ্গ অন্তরের উপর ফরয করেছেন।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপর ফরযকৃত উপাসনাদি

📄 বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপর ফরযকৃত উপাসনাদি


শরীরের বাহ্যিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপর ফরযকৃত উপাসনাদির মধ্যে এমন কিছু উপাসনা রয়েছে যা বিশেষ করে মুখ ও জিহবার সাথে সম্পর্কযুক্ত। যেমন- আনন্দ বা খুশীর সংবাদ শ্রবণ করলে মুখ দিয়ে 'আলহামদুলিল্লাহ' বলা। বিপদের কথা শুনলে... 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' পাঠ করা। সর্বদা মুখে আল্লাহর যিকর ও তাঁর নিকট ইস্তেগফার করা, বিপদে ও ভাল অবস্থায় তাঁরই নিকট সাহায্য কামনা করা, মানব ও জিনের যাবতীয় অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য মুখ দিয়ে তাঁরই নিকট আশ্রয় কামনা করা ইত্যাদি।

এ সকল উপাসনাসমূহ মুখের উপর নির্ধারণ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে। মানুষের মুখে তাদের সুখ ও দুঃখে, আনন্দ ও বিষাদে এবং ভাল ও মন্দ সর্বাবস্থায় যেন কেবল আল্লাহ তা'আলার স্মরণই চলতে থাকে। তাঁর কাছেই যেন তারা তাদের অপরাধের জন্য মার্জনা চায়, বিপদে পতিত হলে যেন কেবল তাঁর কাছেই সাহায্য চায়, তাঁর নিকট সাহায্য কামনা করতে যেন তাঁর উত্তম নামাবলীর মাধ্যমেই তাঁকে আহ্বান করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা অপর কোনো অলির নামের মাধ্যমে যেন তাঁকে আহ্বান না করে। কেউ যদি তা না করে বিপদের সময় বা স্বাভাবিক অবস্থায় মুখে, ইয়া গাউছ অথবা ইয়া খাজা বলে 'আব্দুল কাদির জীলানী (রহ.) বা মঈনুদ্দিন চিন্তী (রহ.)-কে স্মরণ করে, তাঁদেরকে সাহায্যের জন্য আহ্বান করে, তা হলে সে ব্যক্তি তার মুখের উপাসনায় তাঁদেরকে আল্লাহর সাথে শরীক করে নেবে।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 দু'আ ও এর প্রকার

📄 দু'আ ও এর প্রকার


দু'আ বা আহ্বান দু'প্রকার:
এক. কিছু চাওয়ার দু'আ (دعاء مسألة) : যে সব বস্তু জীবিত মানুষদের স্বাভাবিক শক্তি ও সামর্থ্যের মধ্যে রয়েছে, ইচ্ছা করলে তারা তা অপরকে দিতে পারে, বা দেওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে, এমন বস্তু কোনো মানুষের কাছে চাওয়া যেতে পারে। তবে যা দান করা বা দানের ক্ষেত্রে সাহায্য করা মানুষের সাধ্যের বাইরে, তা আল্লাহর কাছেই চাইতে হবে। এ জাতীয় বস্তু আল্লাহর কাছে চাওয়াকেই ‘দোয়া-উ মাসআলা’ বা ‘যাঞ্চা জাতীয় প্রার্থনা’ বলা হয়।

দুই. দোয়া-উ ইবাদাত : অপারগতা, দুর্বলতা ও বিনয় প্রকাশের জন্য যে দোয়া করা হয়, তাকে দোয়ায়ে ইবাদাত বলা হয়।

দোয়া আল্লাহ তাআলার ইবাদত : উপযুক্ত উভয় প্রকার দোয়া আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত কোনো মানুষের নিকট চাওয়া যায় না। কেননা, তা আল্লাহর ইবাদত-উপাসনার অন্তর্গত বিষয়। সে জন্য তিনি তা কেবল তাঁর কাছেই চাওয়ার নির্দেশ করে বলেন,
﴿وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ﴾ [غافر:৬০]
“আর তোমাদের প্রতিপালক বলেছেনঃ তোমরা আমাকে আহ্বান কর, আমি তোমাদের আহ্বানে সাড়া দেবো।”

আবার দু'আ যে বিনয়ের সাথে করতে হবে, সে সম্পর্কে বলেছেন,
﴿ادْعُوا رَبَّكُمْ تَضَرُّعًا وَخُفْيَةً إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ ﴾ [الاعراف: ৫৫]
"তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে বিনয় ও চুপিসারে আহ্বান কর, নিশ্চয় তিনি সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না”।

উক্ত আয়াত দু'টি দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আমাদের জীবনের যে সব কল্যাণ দান বা অকল্যাণ দূরীকরণ কোনো মানুষ করতে পারে না তা বিনয়ের সাথে কেবল আল্লাহ তা'আলার নিকটেই চাইতে হবে। এ জন্য কর্মের প্রয়োজন হলে কর্মের তৌফিকও তাঁর নিকটেই কামনা করতে হবে। তা না করে আমরা যদি জীবিত বা মৃত কোনো পীর বা অলির নিকটে তা কামনা করি, অথবা মৃত কোনো অলিকে এ জন্য আল্লাহর কাছে সুপারিশ করতে বলি, তা হলে এতে আল্লাহর রুবুবিয়‍্যাত ও উলুহিয়‍্যাতে শির্ক হবে। রুবুবিয়‍্যাতে শির্ক হবে এ জন্যে যে, আমরা আল্লাহর রুবুবিয়্যাতের আওতাধীন বিষয়কে তাঁদের নিকটে আছে বলে বিশ্বাস করছি। আর উলুহিয়্যাতে শির্ক হবে এ জন্যে যে, আমরা শুধু আল্লাহ তা'আলাকে আহ্বান করার স্থানে অন্যকে আহ্বান করছি।

যারা আল্লাহ তা'আলাকে ব্যতীত অপর কাউকে আহ্বান করে, অপরের নিকট অনুশোচনা ও বিনয় প্রকাশ করে, তারা আল্লাহকে ব্যতীত অপরকেই তাদের ইলাহ বানিয়ে নেয়। এমন লোকদের পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
﴿ وَمَن يَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَهَا ءَاخَرَ لَا بُرْهَانَ لَهُ بِهِ، فَإِنَّمَا حِسَابُهُ عِندَ رَبِّهِ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْكَافِرُونَ ﴾ [المؤمنون: ১১৭]
"যে আল্লাহর সাথে অপর কোনো ইলাহকে আহ্বান করে যে আহ্বানের বৈধতার পিছনে তার নিকট কোন দলীল প্রমাণ নেই, তার এ-আহ্বানের হিসাব রয়েছে তার প্রতিপালকের নিকট, বস্তুত কাফিরগণ কোন অবস্থাতেই কৃতকার্য হতে পারে না।”

টিকাঃ
১৪৮. আল-কুরআন, সূরা মু’মিন : ৬০।
১৪৯. আল-কুরআন, সূরা আ'রাফ: ৫৫।
১৫০. আল-কুরআন, সূরা গাফির: ৪০।

📘 শিরক কি ও কেন > 📄 শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপাসনা

📄 শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপাসনা


মুখের উপাসনা ছাড়াও আরো এমন কিছু উপাসনা রয়েছে যার সম্পর্ক রয়েছে পূর্ণ শরীরের সাথে। যেমন:

দাঁড়িয়ে বিনয় ও আনুগত্য প্রকাশ করা:
আল্লাহর সম্মুখে বিনয় ও তাঁর আনুগত্য প্রকাশের জন্য তিনি মানুষের শরীরের উপর যে সব উপাসনা ধার্য করে দিয়েছেন তন্মধ্যে অন্যমত একটি উপাসনা হচ্ছে- দাঁড়িয়ে বা প্রয়োজনে বসে সালাত কায়েম করা। এ সালাত সঠিক এবং আল্লাহর নিকট তা গৃহীত হওয়ার জন্য রয়েছে তিনটি পূর্বশর্ত:
এক. আল্লাহর একান্ত ভালোবাসার আকর্ষণেই তা কায়েম করতে হবে।
দুই. অত্যন্ত আন্তরিকতা ও একাগ্রতার সাথে তা সম্পাদিত হতে হবে।
তিন. আল্লাহর আনুগত্য তাঁর সম্মুখে বিনয় প্রকাশ ও তাঁর উলুহিয়‍্যাতের স্বীকৃতি দানের উদ্দেশ্যেই তা কায়েম করতে হবে। যার সালাতে এ তিনটি শর্ত পাওয়া যাবে না, তার সালাত বাহ্যিক দৃষ্টিতে সালাত হিসেবে গণ্য হলেও তা আল্লাহর নিকটে গ্রাহ্য হবে না।

কেউ কাউকে অন্তর দ্বারা ভালবাসতে পারে, মনের মানুষের আগমনের সংবাদ শুনলে তাকে সাদর সম্ভাষণ জানানোর জন্যে ব্যতিব্যস্তও হতে পারে, কিন্তু তাকে ভালোবাসার আতিশয্যে তার সামনে দাঁড়িয়ে এমন কোনো বিনয়ভাব প্রকাশ বা এমন কোনো কর্ম করা যাবে না, যা বাহ্যত তার উপাসনার শামিল হয়। কেননা, এ ধরনের বিনয় ও আনুগত্য প্রকাশ আল্লাহ্ তা'আলার জন্যেই নির্ধারিত। সেজন্য মহান আল্লাহ তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আমাদেরকে বিনয় ও আনুগত্য প্রকাশের নির্দেশ করে বলেছেন,
﴿وَقُوْمُوْا لِلهِ قٰنِتِیْنَ﴾ [البقرة : ২৩৮]
“তোমরা আল্লাহর জন্য বিনয় প্রকাশের উদ্দেশ্যে দাঁড়াও।”

আল্লাহর সামনে বিনয় ও আনুগত্য প্রকাশকে শির্ক মুক্ত রাখার জন্য তিনি তা এমন স্থানে প্রদর্শন করতে নির্দেশ করেছেন যেখানে শির্ক সংঘটিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো কবরকে মসজিদ বানাতে নিষেধ করেছেন। অনুরূপভাবে কোনো কবরমুখী হয়ে বা কবরের সন্নিকটে সালাত আদায় করতেও নিষেধ করেছেন; কেননা, এতে আল্লাহর প্রতি বিনয় ও আনুগত্য প্রকাশের পাশাপাশি কবরবাসী নবী বা অলিও প্রতি আনুগত্য প্রকাশিত হতে পারে। যেহেতু দাঁড়িয়ে বিনয় ও আনুগত্য প্রকাশ আল্লাহর উপাসনা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে নির্ধারিত, সেহেতু কোনো পীর-মাশায়েখ, বা কোনো অলি বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সামনে বা তাদের ছবি, প্রতিকৃতি, কবর, ভাষ্কর্য বা স্মৃতিসৌধের পার্শ্বে তাঁদের সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে নীরবে দাঁড়ানো যাবে না; কেননা, এতে আল্লাহ তা'আলার সামনে বিনয় প্রকাশের পদ্ধতিতে তাঁদের সামনে বিনয় ও আনুগত্য প্রকাশিত হয়।

সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে রুকূ' ও সেজদা করা:
আল্লাহর মহববত তাঁর সম্মান ও আনুগত্য প্রকাশার্থে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে সালাত কায়েম করা যেমন আল্লাহর উপাসনা, তেমনি একই উদ্দেশ্যে আল্লাহর সামনে নত হয়ে রুকু' ও সেজদা করাও তাঁর উপাসনা। সে জন্য তিনি এর নির্দেশ করে বলেন,
﴿يَأَيُّهَا الَّذِينَ ءَامَنُوا أَرْكَعُوا وَاسْجُدُوا وَاعْبُدُوا رَبَّكُمْ﴾ [الحج: ৭৭]
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে রুকু', সেজদা ও ইবাদত কর।"

আল্লাহর সামনে রুকু' ও সেজদা করা তাঁর উপাসনা হওয়ার কারণে কোনো পীর, মাশায়েখ ও অলির সম্মানার্থে তাদের সামনে বা কবরে রুকু' ও সেজদা করা তাদের উপাসনার শামিল।

কারো সম্মানার্থে মাথা নত ও কদমবুসী করা:
কাউকে অভিবাদন জ্ঞাপন করার জন্য মাথা নত করা এবং মাতা-পিতা, অলি ও দরবেশদের সম্মান প্রদর্শনের জন্য কদমবুসী করা যদি ও শির্কের পর্যায়ভুক্ত নয়, তথাপি তা করা ইসলামের অনুসৃত রীতিরও অন্তর্ভুক্ত নয়; বরং তা মুসলিম সমাজে প্রচলিত পশ্চিমা ও হিন্দুয়ানী সংস্কৃতিরই অন্তর্ভুক্ত বিষয়। কাজেই তা বর্জনীয়।

সম্মান প্রদর্শনের জন্য সেজদা করা (السجدة للتعظيم):
সেজদার মাধ্যমে কাউকে সম্মান প্রদর্শন করা অতীতের শরী'আতে বৈধ ছিল। ফেরেশতাদের কর্তৃক আদম আলাইহিস সালাম-কে এবং ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর ভাইদের কর্তৃক তাঁকে সেজদা করা এ সম্মান প্রদর্শনেরই অন্তর্গত। তবে কোনো সৃষ্টিকে এ ধরনের সম্মান প্রদর্শনের রীতি সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রবর্তিত শরী'আত দ্বারা সম্পূর্ণরূপে রহিত হয়ে গেছে এবং সর্বশেষ শরী'আতে তা শুধুমাত্র আল্লাহ তা'আলার জন্যেই নির্দিষ্ট হয়ে গেছে। শর'য়ী নিয়ম মতে জ্ঞানী, গুণী ও সৎ মানুষদের সম্মান প্রদর্শনের পথ হচ্ছে- তাঁদের আগমনের সংবাদ শুনলে আমরা আনন্দের সাথে এগিয়ে গিয়ে তাঁদেরকে সাদর সম্ভাষণ জানাবো, অতিথি হিসেবে তাঁদের একরাম করবো, তাঁদের সাথে সালাম, মুসাফাহা ও আলিঙ্গন করবো, তাঁদেরকে আদর ও আপ্যায়ন করবো, তাঁদের আহ্বানে সাড়া দেব, তাঁদের উপদেশ গ্রহণ করবো, বিদায়ের সময় তাঁদেরকে কিছুদূর এগিয়ে নিয়ে সম্মানের সাথে বিদায় করে দেব।

সম্মানের জন্য কাউকে সেজদা করা যদি বৈধ হতো তা হলে আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলের সাহাবীদেরকে এ মর্মে নির্দেশ প্রদান করতেন যে, তোমরা নবীকে সেজদা করার মাধ্যমে তাঁর সম্মান প্রদর্শন করো; কিন্তু আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলের সাহাবীদেরকে এমন কোনো নির্দেশ না দিয়ে মানুষকে সম্মান প্রদর্শনের যে পদ্ধতির কথা উপরে বর্ণিত হয়েছে, তাঁকে সেভাবেই সম্মান প্রদর্শনের জন্য নির্দেশ করেছেন।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿إِنَّا أَرْسَلْنَكَ شَهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا * لِتُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ، وَتُعَزِّرُوهُ وَتُوَقِّرُوهُ وَتُسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا ﴾ [الفتح: ৮, ৯]
"আমি আপনাকে সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদানকারী ও ভয় প্রদর্শনকারী স্বরূপ প্রেরণ করেছি; যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর এবং তাঁকে (রাসূলকে) সম্মান ও মর্যাদা দান কর, আর সকাল ও সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা কর।”

একটি উট রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সম্মান প্রদর্শন পূর্বক সেজদা করলে উপস্থিত সাহাবীগণ তা দেখে তাঁকে সম্মানের উদ্দেশ্যে সেজদা করতে চাইলে তিনি তাঁদেরকে তা করতে নিষেধ করে বলেন,
«اعْبُدُوا رَبَّكُمْ، وَأَكْرِمُوا أَخَاكُمْ»
“তোমরা তোমাদের রবের দাসত্ব কর এবং তোমাদের ভাইকে একরাম তথা সম্মান কর।”

এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কাউকে সেজদা করা তার উপাসনারই শামিল। আর উপাসনা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো করা যায়না বিধায়, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে সেজদা করা যাবে না। এমন কি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যেও তা করার কোনো বৈধতা নেই। অপর হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِأَحَدٍ لَأَمَرْتُ المَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا» "আমি যদি কাউকে সেজদা করার নির্দেশ করতাম, তাহলে স্ত্রীর প্রতি তার স্বামীকে সেজদা করার নির্দেশ করতাম।”

এ হাদীস দ্বারাও প্রমাণিত হয় যে, ইসলামী শরী'আতে সেজদা হচ্ছে একমাত্র আল্লাহ তা'আলার সম্মান ও উপাসনা প্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট একটি মাধ্যম। কেউ কারো জন্যে- তিনি যেই হোন না কেন- সেজদা করা হারাম। যে আল্লাহ তা'আলাকে ব্যতীত অন্য কাউকে সেজদা করলো, প্রকৃতপক্ষে সে গায়রুল্লাহকেই তার উপাস্য বানিয়ে নিল। আল্লাহর উপাসনার ক্ষেত্রে সে অপরকে শরীক করে নিল।

লোক দেখানো সালাত :
সালাত হচ্ছে এমন একটি উপাসনা যা আল্লাহর সম্মুখে বিনয় প্রকাশ, তাঁর সম্মান প্রদর্শন ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি বিশেষ উপায়। সালাতকে শির্কমুক্ত করে এটাকে যথার্থ উপাসনায় পরিণত করতে হলে তা যে কোনো ধরনের লোক দেখানো ভাব থেকে মুক্ত রাখা আবশ্যক। যদি কেউ তাতে কোনো লোক দেখানোর ভাব করে, তা হলে আল্লাহর দৃষ্টিতে সে তার এ উপাসনায় অপরকে শরীক করে নিল। এ জাতীয় উপাসনা প্রসঙ্গে হাদীসে কুদসিতে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
«أَنَا أَغْنَى الشُّرَكَاءِ عَنِ الشِّرْكِ مَنْ عَمِلَ عَمَلاً أَشْرَكَ مَعِي فِيْهِ غَيْرِي تَرَكْتُهُ وشركه»
"আমি সকল শরীকানদের শরীকানা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। যে ব্যক্তি কোনো কাজে আমার সাথে কাউকে শরীক করে নিল, আমি তাকে ও তার শির্কযুক্ত কাজকে ছেড়ে দেই।”

এ জাতীয় সালাত আদায়কারীদের জন্য যে ধ্বংস অপেক্ষা করছে সে সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন, ﴿فَوَيْلٌ لِلْمُصَلِّينَ الَّذِينَ هُمْ عَن صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ * الَّذِينَ هُمْ يُرَاءُونَ﴾ [الماعون: ৪, ৬]
"অতএব, ধ্বংস সেই সব সালাত আদায়কারীদের জন্য যারা তাদের সালাত সম্পর্কে বে খবর, যারা তা লোক দেখানোর জন্যে করে।”

যাকাত আদায় করা:
আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ পালন এবং তাঁরই সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে যাকাত প্রদান করা একটি আর্থিক ও শারীরিক ইবাদত। সালাতের ন্যায় কেউ যদি তা লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে আদায় করে, তবে তাও উপর্যুক্ত হাদীস অনুযায়ী শির্কী কর্মের অন্তর্গত হবে।

কা'বা গৃহের হজ্জ (الحج):
কা'বা গৃহ আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনাদির মধ্যকার একটি অন্যতম নিদর্শন। এ গৃহ যিয়ারতের উদ্দেশ্যে মক্কা শরীফে গমন করা মুসলিমদের মধ্যকার সুস্থ ও সম্পদশালীদের জন্য একটি ফরয ইবাদত; তারা জগতের যেখানেই বসবাস করুক না কেন-জীবনে অন্তত একবার এ ইবাদত পালনের উদ্দেশ্যে সেখানে আগমন করা অপরিহার্য।

কা'বা শরীফ নির্মাণ ও এর হজ্জ করার নির্দেশের উদ্দেশ্য:
ইসলাম একটি বিশ্বজনীন দ্বীন। এ দ্বীনের অনুসারীরা সকলেই এক আল্লাহর বান্দা ও পরস্পরের ভাই ভাই। সে কারণে তিনি চান তাঁর বান্দারা এক ও অভিন্ন নিয়মে এবং একই কিবলা বা দিকে তাদের মুখ ফিরিয়ে তাঁর উপাসনা করুক। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি পৃথিবীর মধ্যবর্তী স্থানে তাদের জন্য কা'বা গৃহ তথা কিবলা নির্মাণের ব্যবস্থা করেন। তারা যে পরস্পরের ভাই ভাই তা বাস্তবে প্রমাণ করে দেখানোর লক্ষ্যে তাদের মধ্যকার সুস্থ ও সম্পদশালীদের উপর সারা জীবনে অন্তত একবার সে গৃহ যিয়ারতের উদ্দেশ্যে গমন করার বিধান জারী করেন। তাঁর বান্দারা যাতে সে উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে পৃথিবীর সর্বত্র থেকে তা যিয়ারতে আগমন করে, সে-জন্য তিনি ইব্রাহীম আলাইহিস সালামের মাধ্যমে তাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন:
﴿وَأَذَن فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوكَ رِجَالًا وَعَلَى كُلِّ ضَامِرٍ يَأْتِينَ مِن كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٍ ﴾ [الحج: ২৭]
"আর তুমি মানুষের মধ্যে (এ গৃহের হজ্জের) ঘোষণা প্রচার কর, তারা যেন পায়ে হেটে এবং কৃষ্ণকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দুর-দুরান্ত থেকে তোমার কাছে (মক্কায়) আসে।” এ-গৃহের চার পার্শে ত্বাওয়াফ করার প্রতি নির্দেশ দিয়ে বলেছেন:
﴿وَلْيَطَّوَّفُوا بِالْبَيْتِ الْعَتِيقِ ﴾ [الحج: ২৯]
"আর তারা যেন প্রাচীন পবিত্র গৃহের ত্বওয়াফ করে।”

এ গৃহ বরকতময় হওয়ার কারণে সম্ভব হলে ত্বওয়াফ করার সময় বরকত হাসিলের জন্য এ-গৃহের ডান পার্শ্ব হাত দিয়ে স্পর্শ করে অন্যথায় সে দিকে হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে সম্মান প্রদর্শণের অনুমতি প্রদান করা হয়েছে। এর বাম কোণে যে কৃষ্ণকায় পাথর (الحجر الأسود) রয়েছে, এর সাথে মানুষের লাভ ও ক্ষতি কোনো সম্পর্ক না থাকলেও। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাত হিসেবে সে পাথারকেও যথাসম্ভব চুম্বন বা স্পর্শ করার অনুমতি রয়েছে। কা'বা গৃহের দরজা ও মুলতাযামকে (দরজার চৌকাঠের নিচের পাকা স্থান) হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে তাঁর নিকট আকুতি ও মিনতি করে প্রার্থনা করারও অনুমতি প্রদান করা হয়েছে।

এ গৃহের নিকটে ও দুরে অবস্থিত মাকামে ইব্রাহীম, সাফা ও মারওয়াহ পাহাড়দ্বয়, মিনা, মুযদালিফাহ ও আরাফাতের ময়দানকে তাঁর নিদর্শন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেছেন, ﴿إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِن شَعَابِرِ اللَّهِ ﴾ [البقرة: ১৫৮] "নিশ্চয় সাফা ও মারওয়াঃ পর্বতদ্বয় আল্লাহর নিদর্শনাদির অন্তর্গত।"

এ-সব স্থানের সম্মান করাকে অন্তরে তাকওয়ার পরিচায়ক হিসেবে গণ্য করে বলেছেন:
﴿ ذَلِكَ وَمَن يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِن تَقْوَى الْقُلُوبِ ﴾ [الحج: ৩২]
"এটা, আর যে কেউ আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনসমূহের সম্মান করে, তা তো তার অন্তরের তাকওয়ারই পরিচায়ক হয়ে থাকে।”

এ-সব নিদর্শনাদির যথাযথ মর্যাদা দান বিশেষ করে আরাফাতে অবস্থান করাকে 'হজ্জ' এর পরিপূর্ণতার অন্তর্গত বলে গণ্য করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«الحَجُّ عَرَفَةُ»
"আরাফার ময়দানে অবস্থান গ্রহণ করাই হচ্ছে হজ্জ।”

তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মিনা ও মুযদালিফায় অবস্থান করে রাত্রি যাপন করাকেও হজ্জের পূর্ণতার অংশ হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। হজ্জ আদায়কারীদের সাথে নিজ নিজ বাড়ী বা এলাকা থেকে আল্লাহর নামে উৎসর্গ করার জন্য সাথে পশু নিয়ে যাওয়াকেও তাঁর নিদর্শনাদির মধ্যে গণ্য করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন,
﴿وَالْبُدْنَ جَعَلْنَهَا لَكُم مِّن شَعَيرِ اللَّهِ لَكُمْ فِيهَا خَيْرٌ ﴾ [الحج: ৩৬]
“কা’বা গৃহের উদ্দেশ্যে সাথে উট নিয়ে যাওয়াকে তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শনের মধ্যে গণ্য করলাম, এতে রয়েছে তোমাদের জন্য কল্যাণ।”

কা’বা গৃহ, মিনা, মুযদালিফা ও আরাফাতে যা করা ইবাদাত তা অন্যত্র করা শির্ক:
মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য কা’বা গৃহ, সাফা ও মারওয়াহ, মিনা, মুযদালিফাহ ও আরাফার ময়দানকে কেন্দ্র করে উপর্যুক্ত ধরনের উপাসনাদির অনুমতি দিলেও এ-জাতীয় উপাসনাদি তাঁর ভালোবাসা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে অন্যত্র কোথাও করার কোনো বৈধতা দান করেন নি। বিষয়টি এমন যে, উপর্যুক্ত উপাসনাদি শুধুমাত্র বর্ণিত স্থানসমূহে করলেই তা তাঁর উপাসনা হিসেবে গণ্য হবে। আর অন্য কোথাও করলে তা তাঁর উপাসনা না হয়ে বেদ’আতী ও শির্কী কর্ম হিসেবে গণ্য হবে। কাজেই কা’বা শরীফ ব্যতীত অপর কোনো মাযার বা পবিত্র স্থানকে ত্বওয়াফ করা যাবে না। বরকত ও পূণ্য লাভের আশায় কা’বা গৃহ ব্যতীত অন্য কোনো গৃহ, মাযার, কবর, কবরের বেষ্টনী, পাথর ও গিলাফ ইত্যাদি স্পর্শ ও চুম্বন করা যাবে না। দু’আ কবুল হওয়া ও বরকত হাসিলের জন্য কা'বা গৃহ ব্যতীত অপর কোনো গৃহের বা কবর ও মাযারের দরজা বা অন্য কিছু হাত দিয়ে স্পর্শ করা যাবে না। উপর্যুক্ত স্থানসমূহ এবং মসজিদ ও যে সকল স্থান বরকতময় বলে সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, কেবল সে সব স্থান ব্যতীত অন্য কোনো কবর ও মাযারে বরকত হাসিলের উদ্দেশ্যে যাওয়া যাবে না। সাফা ও মারওয়াহ ব্যতীত অপর কোনো স্থানে পুণ্যের উদ্দেশ্যে দৌড়াদৌড়ি করা যাবে না। কা'বা গৃহ ব্যতীত অপর কোনো পবিত্র স্থান বা কোনো মাযারের উদ্দেশ্যে কুরবাণী ও মানত এর পশু নিয়ে যাওয়া যাবে না। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে সকল স্থানকে পবিত্র বলে আখ্যায়িত করেছেন, সে সব স্থান ব্যতীত অন্য কোনো স্থানকে পবিত্র গণ্য করা যাবে না। যমযমের পানি আর হরম শরীফের গাছ-পালা, মাটি, পাথর, ঘাস ও জীব-জন্তু ব্যতীত অপর কোনো কূপের পানি, মাযারের গাছ, মাটি, ঘাস, পুড়ানো মোম ও জীব- জন্তুকে পবিত্র গণ্য করা যাবে না। কা'ba গৃহের সম্মানার্থে কেবল তা ব্যতীত অন্য কোনো কবর বা মাযার বা গৃহকে কাপড় দ্বারা ঢেকে রাখা যাবে না। কা'বা গৃহ, মসজিদে নববী ও বায়তুল মাকদিস ব্যতীত অন্য কোনো দূরবর্তী মাসজিদ বা মাযার পুণ্য হাসিলের উদ্দেশ্যে যিয়ারতে যাওয়া যাবে না।

এ জাতীয় যিয়ারত নিষেধ করে দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «لَا تُشَدُّ الرِّجَالُ إِلَّا إِلَى ثَلَاثَةِ مَسَاجِدَ: مَسْجِدِ الْحَرَامِ، وَمَسْجِدِي، وَمَسْجِدِ الْأَقْصَى»
"মসজিদুল হারাম, আমার এই মসজিদ ও বায়তুল মাকদিস ব্যতীত অন্য কোথাও পুণ্যার্জন ও আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সফর করা যাবে না।”

তবে যারা মসজিদে নববী যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সেখানে যাবে, তারা অবশ্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কবর যিয়ারত করতে পারবে। এতে শর'য়ী কোনো বিধি নিষেধ নেই। থাকতেও পারে না কারণ; তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কবর যিয়ারত সাধারণ নিয়মের আওতায় পড়ে। এমতাবস্থায় কেউ তাঁর কবর যিয়ারত না করে সেখান থেকে চলে আসতে পারে না। উল্লেখ্য যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কবর যিয়ারতের জন্য দূর-দূরান্ত থেকে শুধুমাত্র তাঁর কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করার বৈধতা প্রমাণিত হয় নি।

পশু যবাই ও উৎসর্গ করা:
পশু যবাই করা মূলত দু'প্রকার:
এক. স্বাভাবিক অবস্থায় যবাই, যার দ্বারা আল্লাহ বা অপর কারো সন্তুষ্টি উদ্দেশ করা হয় না। মাংস বিক্রি করা বা তা ভাগাভাগি করে নেয়ার উদ্দেশ্যে যে সব পশু যবাই করা হয়, তা এ প্রকারের আওতায় পড়ে।
দুই. অস্বাভাবিক অবস্থায় যবাই, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি ও বিপদাপদ দূরীকরণার্থে মানত পূর্ণ করাস্বরূপ হয়ে থাকে।

যবাই সঠিক হওয়ার শর্ত: পশু যবাই যে প্রকারেরই হোক, তা সঠিক হওয়ার জন্য দু'টি শর্ত রয়েছে:
এক, যবাই করার সময় আল্লাহ তা'আলার বড়ত্ব ও মহত্ব প্রকাশের জন্য 'বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার' বলে আল্লাহর নাম নিয়ে তা যবাই করতে হবে।
দুই. যবাই করার স্থানটি মুশরিকদের যে কোনো ধরনের প্রতিমা, মূর্তি ও মেলা (ওরস) বসানোর স্থান হওয়া থেকে পবিত্র হতে হবে; কারণ, যে স্থানে কোনো প্রতিমা বা মূর্তির সম্মান করা হয় অথবা যেখানে মুশরিকদের মেলা (ওরস) বসে, সে স্থানটি আল্লাহ তা'আলার নামে যবাই করার জন্য উপযুক্ত স্থান নয়।

সেখানে যবাই করার সময় আল্লাহর নাম হাজার বার নিলেও তা আল্লাহর জন্য না হয়ে গায়রুল্লাহর জন্যেই হবে এবং যবাইকারী ও সেখানে যবাই এর জন্য পশু উৎসর্গকারী উভয়েই মুশরিক হিসেবে গণ্য হবে। কারণ, এ স্থানে যবাইকারী ও পশুদানকারী প্রকৃতপক্ষে এ স্থানে অবস্থিত প্রতিমার সম্মানের জন্যই অথবা সেখানে অনুষ্ঠিত বার্ষিক মেলার কারণেই এখানে যবাই বা দান করেছে। দ্বিতীয় শর্তটির প্রমাণে সাবিত ইবন দাহহাক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন:
«نَذَرَ رَجُلٌ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَنْحَرَ إِبِلًا بِبْوَانَةَ (وَهِيَ مَوْضِعُ فِي أَسْفَلِ مَكَّةَ دُونَ يَلَمْلَمْ) فَسَأَلُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: إِنِّي نَذَرْتُ أَنْ أَنْحَرَ إِبِلًا بِبُوَانَةَ، فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: هَلْ كَانَ فِيهَا وَثَنٌ مِنْ أَوْثَانِ الْجَاهِلِيَّةِ يُعْبَدُ ؟ قَالُوا: لَا ، قَالَ: «هَلْ كَانَ فِيهَا عِيدٌ مِنْ أَعْيَادِهِمْ؟»، قَالُوا: لَا ، قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «أَوْفِ بِنَذْرِكَ، فَإِنَّهُ لَا وَفَاءَ لِنَذْرِ فِي مَعْصِيَةِ اللَّهِ، وَلَا فِيمَا لَا يَمْلِكُ ابْنُ آدَمَ»
"এক ব্যক্তি (ইয়ালামলাম পাহাড়ের পাদদেশে মক্কার নিম্নভূমিতে অবস্থিত) 'বাওয়ানা' নামক স্থানে একটি উট উৎসর্গ করার জন্য মানত করেছিল। সে তার মানত পূর্ণ করার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: যে স্থানের উদ্দেশ্যে মানত করেছো সেখানে জাহেলী যুগে কোন প্রতিমা ছিল কি না? তারা বললেন: না, তা ছিল না। তিনি আবার বললেন: সেখানে মুশরিকদের বার্ষিক কোন মেলা (ওরস) বসতো কি না? তারা বললেন: না, তাও হত না। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তোমার মানত (সেখানে) পূর্ণ করতে পার, তবে জেনে রেখো! আল্লাহর অবাধ্যতায় কোনো মানত পূর্ণ করতে নাই।” এখানে দেখা যাচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে ব্যক্তিকে উক্ত স্থানে তার মানত পূর্ণ করার জন্য ঠিক তখনই অনুমতি দিলেন যখন সে স্থানটি জাহেলী যুগে মুশরিকদের কোনো প্রতিমা বা ঈদ থেকে মুক্ত হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হলেন। সাথে সাথে সর্বশেষ বাক্যটির দ্বারা আরো বলে দিলেন যে, যে স্থানে কোনো প্রতিমা থাকে বা যেখানে মুশরিকদের বার্ষিক মেলা তথা ওরস বসে, সে স্থান কোন প্রকার মানত পূর্ণ করার জন্য উপযোগী নয়। কেউ করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। তার কর্মের সাথে মুশরিকদের কর্মের সাদৃশ্য হবে। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُم»
"যে ব্যক্তি তার কাজে ও কর্মে অপর কোনো জাতির সাথে সাদৃশ্য প্রকাশ করবে সে তাদেরই একজন বলে গণ্য হবে।”

কোন মাজারে মানত পূর্ণ করা শির্ক :
উপরে বর্ণিত দাহহাক রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কোনো অলির মাযার অথবা যে সব স্থানে শির্কী কর্মকাণ্ড হয় অথবা যে মাযার বা কবরকে কেন্দ্র করে ইসালে সওয়াবের নামে বার্ষিক কোনো অনুষ্ঠান বা ওরস পালিত হয়, সে সব স্থানের উদ্দেশ্যে কোনো মানত করা বৈধ নয়। কেউ করে থাকলেও সেখানে তা পূর্ণ করা জায়েয নয়। যারা তা করবে তারা দ্বিতীয় হাদীসের মর্মানুযায়ী মুশরিকদের মধ্যেই গণ্য হবে। কোনো মাযারকে কেন্দ্র করে এর পার্শ্বে ইসালে সওয়াবের নামে কোনো অনুষ্ঠান হলে তাও জাহেলী যুগের মেলারই ধারাবাহিকতা হিসেবে গণ্য হবে। এ জন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কবরকে এ জাতীয় ইসালে সওয়াবের অনুষ্ঠান থেকে মুক্ত রাখার জন্য তাঁর সাহাবীদেরকে তাঁর জীবনের অন্তিম সময়ে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন,
«لَا تَجْعَلُوْا قَبْرِي عِيداً»
"তোমরা আমার কবরকে ঈদ তথা উৎসবের স্থানে পরিণত করো না।”

কবর কিভাবে মেলার স্থান ও প্রতিমায় পরিণত হয়:
একটি কবর বা একটি স্থানের ব্যাপারে যদি জনমনে এ ধারণার সৃষ্টি হয় যে, এখানে গেলে বরকত বা ফয়েয হাসিল হয় এবং সেখানে গেলে লোকজনের বিভিন্ন রকমের মনস্কামনা পূর্ণ হয় এবং লোকজন সুযোগমত সেখানে দূর-দূরান্ত থেকে বরকত ও ফয়েয হাসিল এবং মনস্কামনা পূর্ণ করার জন্য প্রতি দিন, সপ্তাহে, মাসে, ছয়মাসে বা বছরের নির্দিষ্ট কোন দিনে সমবেত হয় এবং সে কবর বা স্থানের উদ্দেশ্যে টাকা-পয়সা মানত করে, গরু, ছাগল ও মুরগী ইত্যাদি নিয়ে এসে সেখানে উৎসর্গ করে, তা হলে এতে সে কবর বা সে স্থান মেলার স্থান ও প্রতিমায় পরিণত হবে কেননা; এ জাতীয় কর্মসমূহ জাহেলী যুগের মানুষেরা বিভিন্ন অলিদের নামে নির্মিত দেবতা ও প্রতিমাদের উদ্দেশ্যেকৃত কর্মেরই ধারাবাহিকতা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কবরকে যাতে কেউ এ রকম মেলার স্থান ও প্রতিমায় পরিণত না করে সে জন্য তিনি আমাদেরকে তা করতে নিষেধ করেছেন। যা আমরা একটু আগেই অবগত হয়েছি।

ইমাম ইবন তাইমিয়‍্যাহ (৬৬১-৭২৮হিঃ) ঈদ (عید) শব্দের অর্থ বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন: "ঈদ হলো সে সব সাধারণ সমাবেশের নাম যা প্রথা ও রেওয়াযানুযায়ী বছর, সপ্তাহ বা মাস ইত্যাদি ঘুরে আসলে ঘুরে আসে। ঈদ কয়েকটি বিষয়ের সমষ্টির নাম:
এক. তা এমন এক দিনে হয় যা ঘুরে আসে। যেমন- ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা ও জুমু'আর দিন।
দুই. সে দিনে সমবেত হওয়া।
তিন. সে দিনে সমবেত হয়ে উপাসনা ও প্রথাগত কিছু কর্ম করা।

ঈদ কখনও নির্দিষ্ট কোনো স্থানে হয়, কখনও তা অনির্দিষ্ট থাকে। উপরে বর্ণিত এ তিনটি বিষয়ের প্রতিটি বিষয়কেও ঈদ নামকরণ করা যেতে পারে। সে অনুযায়ী একটি সময়কেও ঈদ বলা যেতে পারে। যেমন- জুমু'আর দিনের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«إِنَّ هَذَا يَوْمٌ قَدْ جَعَلَهُ اللَّهُ لِلْمُسْلِمِينَ عِيداً»
“জুমু'আর দিনটি এমন একটি দিন যাকে আল্লাহ তা'আলা মুসলিমদের জন্য ঈদ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।”

অনুরূপভাবে কোন স্থানকেও ঈদ বলা যেতে পারে। যেমন- রাসূলুল্লাহ -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-বলেছেন: «لَا تَجْعَلُوا قَبْرِي عِيداً» "তোমরা আমার কবরকে ঈদগাহে পরিণত করোনা।"

কখনও একটি দিন এবং সে দিনে যে অনুষ্ঠান করা হয়, এ দু'য়ের সমষ্টির নামও ঈদ হয়ে থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঈদ শব্দ দ্বারা এটাই বুঝানোর উদ্দেশ্য হয়ে থাকে। যেমন- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে ঈদের দিনে ঢোল বাজিয়ে আনন্দ প্রকাশ করা প্রসঙ্গে বলেন: «إِنَّ لِكُلِّ قَوْمٍ عِيداً وَهَذَا عِيْدُنَا» "হে আবু বকর! প্রত্যেক জাতির জন্য ঈদ রয়েছে, আর এটি হলো আমাদের ঈদ।”

মেলা প্রসঙ্গে ইমাম ইবনু কাইয়্যিম (৬৯১-৭৫১হি:) বলেন:
"যা প্রথাগতভাবে ঘুরে আসে এবং যে সময় আগমনের অপেক্ষা করা হয় এবং যে স্থানে গমনের ইচছা করা হয়, তাকে ঈদ বলা হয়। ঈদ (عید) শব্দটিকে معاودة ফিরে আসা ও (اعتیاد) 'প্রথা স্বরূপ গ্রহণ করা' শব্দমূল থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। ঈদ যখন কোনো স্থান কেন্দ্রিক হবে তখন এর দ্বারা সে স্থানই বুঝতে হবে যে স্থানকে সমবেত হওয়া ও উপাসনার জন্য উদ্দেশ্য করা হয়। যেমন- আল্লাহ তা'আলা মসজিদুল হারাম (কা'বা শরীফ), মিনা, মুযদালিফাঃ, আরাফাঃ ও নিদর্শনের স্থানসমূহকে তাওহীদপন্থীদের জন্য ঈদ ও পুণ্যার্জনের স্থান হিসেবে গণ্য করেছেন। অতীতে মুশরিকদের সময় ও স্থান কেন্দ্রিক অনেক ঈদ ছিল। ইসলাম আগমন করে তাদের সময় কেন্দ্রিক ঈদসমূহ বাতিল ঘোষণা করে এর পরিবর্তে মুসলিমদের জন্য ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা এবং মিনা এর দিনসমূহকে ঈদ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অনুরূপভাবে মুশরিকদের ঈদের স্থানসমূহের পরিবর্তে কা'বা শরীফ, মিনা, মুযদালিফা, আরাফা ও নিদর্শনের স্থানসমূহকে ঈদ পালনের স্থান হিসেবে নির্ধারণ করেছে।"

উপর্যুক্ত এ আলোচনার দ্বারা বুঝা গেল যে, ইসলাম সাধারণ মুসলিমদের জন্য সময় কেন্দ্রিক যে সব ঈদ নির্ধারণ করেছে তা হলো: জুমু'আর দিন, ঈদুলফিতর ও ঈদুলআযহা এবং আইয়‍্যামে তাশরীকের চার দিন। এ-দিনসমূহ ব্যতীত সপ্তাহান্তে ও বছরান্তে সমবেত হওয়ার জন্য মুসলিমদের সময় কেন্দ্রিক আর কোনো ঈদ নেই। এ সব দিনসমূহ হচ্ছে তাদের জন্য ঈদ পালনের দ্বীন নির্দেশিত দিবস। এ সকল দিবস ব্যতীত অপর কোনো দিবসকে কারো জন্ম দিবস হিসেবে আনন্দ প্রকাশের জন্য বা কারো মৃত্যু দিবস হিসেবে দুঃখ প্রকাশের জন্য ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ঈদ নামকরণ করা যাবে না এবং এটাকে কোনো ধর্মীয় কাজ মনে করে তাতে সমবেত হওয়াও যাবে না। যদিও সে দিবসটি আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্ম দিবসও হয়ে থাকতে পারে।

অনুরূপভাবে আমরা আরো অবগত হলাম যে, মুসলিমদের জন্য কা'বা শরীফ, মিনা, মুযদালিফাঃ ও এর আশেপাশের নিদর্শনের (مشاعر) স্থানসমূহ ও ঈদের মাঠ ব্যতীত দ্বীন নির্দেশিত স্থান কেন্দ্রিক অপর কোনো ঈদ পালনের স্থান নেই। এ সকল স্থানের মধ্যে কা'বা শরীফে আমরা সকলেই সব সময় পুণ্যার্জনের জন্য সমবেত হতে পারবো। অবশিষ্ট স্থানসমূহে হাজীগণ কেবল হজ্জের সময়ে পুণ্যার্জনের উদ্দেশ্যে দূর ও নিকট থেকে সমবেত হতে পারবেন।

কা'বা শরীফের পাদদেশে আমরা বছরের প্রত্যেক দিনে এবং হাজীগণ আরাফার ময়দানে জিলহজ্জ মাসের নবম দিনে, মুযদালিফায় জিলহজ্জ মাসের নবম দিনের দিবাগত রাতে, মিনায় জিলহজ্জ মাসের অষ্টম, দশম, এগারো, বারো ও তেরো তারিখসমূহে এবং মাশায়ের (مشاعر) অর্থাৎ যে সকল নিদর্শনের স্থানসমূহে হাজীগণ হজ্জের বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি পালনার্থে অবস্থান গ্রহণ করেন, সেখানেও হজ্জের সময় তারা ধর্মীয় কাজ হিসেবে পুণ্যার্জনের উদ্দেশ্যে সমবেত হতে পারবেন।

হজ্জের সময় ব্যতীত একমাত্র কা'বা শরীফ ছাড়া উপর্যুক্ত এ সব স্থানসমূহে পুণ্যার্জনের উদ্দেশ্যে আগমনের ধর্মীয় কোনো গুরুত্ব নেই। অবশ্য আমরা ইতোপূর্বে বর্ণনা করে এসেছি যে, কা'বা শরীফসহ মসজিদে নববী এবং বায়তুল মাকদিস এ তিনটি মসজিদে পুণ্যার্জনের উদ্দেশ্যে দূর-দূরান্ত থেকে আগমন করার ব্যাপারে শরী'আতের অনুমোদন রয়েছে। সুতরাং এ তিন মসজিদেই কেবল আমরা দূর-দূরান্ত থেকে পুণ্যার্জনের উদ্দেশ্যে সফর করে এসে সমবেত হতে পারবো। অন্য কোনো মসজিদ বা স্থানে নয়। এবার যদি আমরা উপর্যুক্ত সময় ও স্থানসমূহের সাথে অপর কোনো সময় ও স্থানকে সংযোজন করি, তবে তা যেমন দ্বীনীভাবে কোনো ছাড়পত্র পাবে না, তেমনি তা কোন পুণ্যার্জনের কাজ বলেও বিবেচ্য হবে না।

বরং দ্বীনী দৃষ্টিকোণ থেকে তা একেকটি বেদ'আতী কর্ম হিসেবে স্বীকৃতি পাবে কেননা; উপযুক্ত সময় ও স্থান ব্যতীত মুসলিমদের জন্য দ্বীন নির্দেশিত অপর কোনো ঈদ পালন ও সফর করার স্থান নেই। কেউ যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা অপর কোনো অলি বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মাযারে তাঁদের জন্ম বা মৃত্যু দিবসে সমবেত হয়ে সেখানে আনন্দ প্রকাশ করে, বা ওরস পালন করে, তা হলে এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও তাঁদের জন্ম দিবসকে ঈদের দিন এবং তাঁর ও তাঁদের কবরকে ঈদ পালনের স্থানে পরিণত করার শামিল হবে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁদের জন্ম দিবস আমাদের জন্য আনন্দের দিবস হয়ে থাকলেও তাঁদের জন্ম দিনকে ঈদের দিন বলে নামকরণ করে সেদিনে তাঁদের কবরে বা অন্যত্র কোথাও ঈদ পালন করার কোনো বৈধতা শরী'আতে স্বীকৃত নয় কেননা; এমনটি করা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর দৃষ্টিতে জাহেলী যুগের মুশরিকদের সে সব ঈদ পালনেরই ধারাবাহিকতা যা তারা তাদের দেব-দেবীদেরকে কেন্দ্র করে পালন করতো।

দান ও সদক্কা: দান ও সদকা মানুষের দুনিয়া-আখেরাতের কল্যাণার্জন ও অকল্যাণ দূরীকরণের ক্ষেত্রে একটি উপকারী মাধ্যম। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ জন্য উৎসাহ প্রদান করে বলেছেন:
«اِتَّقُوا النَّارَ وَ لَوْ بِشِقِّ تَمْرَةٍ» "তোমরা খেজুরের অর্ধেক দান করে হলেও আগুন থেকে বাঁচ।"

তিনি আরো বলেছেন: «عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ صَدَقَةٌ» "প্রত্যেক মুসলিমের উপর সদকা করা একান্ত জরুরী।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদকার ফযীলত বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন: তা বিপদ দূরীকরণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী সহায়ক ভূমিকা পালন করে। যেমন তিনি বলেছেন:
«لَمَّا خَلَقَ اللهُ الأَرْضَ جَعَلَتْ تَمِيدُ، فَخَلَقَ الجِبَالَ، فَقَالَ بِهَا عَلَيْهَا فَاسْتَقَرَّتْ، فَعَجِبَتِ المَلَائِكَةُ مِنْ شِدَّةِ الجِبَالِ. قَالُوا: يَا رَبِّ هَلْ مِنْ خَلْقِكَ شَيْءٌ أَشَدُّ مِنَ الجِبَالِ؟ قَالَ: نَعَمُ الحَدِيدُ. قَالُوا : يَا رَبِّ فَهَلْ مِنْ خَلْقِكَ شَيْءٌ أَشَدُّ مِنَ الحَدِيدِ؟ قَالَ: نَعَمُ النَّارُ. فَقَالُوا : يَا رَبِّ فَهَلْ مِنْ خَلْقِكَ شَيْءٌ أَشَدُّ مِنَ النَّارِ؟ قَالَ: نَعَمُ المَاءُ. قَالُوا : يَا رَبِّ فَهَلْ مِنْ خَلْقِكَ شَيْءٌ أَشَدُّ مِنَ المَاءِ؟ قَالَ: نَعَمُ الرِّيحُ قَالُوا : يَا رَبَّ فَهَلْ مِنْ خَلْقِكَ شَيْءٌ أَشَدُّ مِنَ الرِّيحِ؟ قَالَ: نَعَمُ ابْنُ آدَمَ، تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ بِيَمِينِهِ يُخْفِيهَا مِنْ شِمَالِهِ»
"আল্লাহ তা'আলা যখন পৃথিবী সৃষ্টি করেন তখন তা দুলতে থাকে। অতঃপর আল্লাহ তাতে পর্বত সৃষ্টি করলে তা স্থির হয়ে যায়। তা দেখে ফেরেশতাগণ আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললেন : প্রভু হে! পর্বতের চেয়ে শক্তিশালী তোমার অপর কোন সৃষ্টি আছে কি? আল্লাহ বললেন: 'হ্যাঁ, এর চেয়ে শক্তিশালী হলো লোহা।' তারা বললেন: প্রভু হে! লোহার চেয়ে শক্তিশালী আর কিছু আছে কি? আল্লাহ বললেন: “হ্যাঁ, তা হলো আগুন।" তারা বললো : প্রভু হে! আগুনের চেয়ে শক্তিশালী কিছু আছে কি? আল্লাহ বললেন: 'হ্যাঁ, আগুনের চেয়ে শক্তিশালী হলো বাতাস। তারা আবার বললো : প্রভু হে! বাতাসের চেয়ে শক্তিশালী কিছু আছে কি? আল্লাহ বললেন : 'হ্যাঁ, আদম সন্তান উদার চিত্তে যে দান করে তা (বিপদ দূরীকরণের ক্ষেত্রে) বাতাসের চেয়েও অধিক শক্তিশালী।”

সদকা সঠিক হওয়ার শর্ত:
সদকা করার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অপরিসীম, এতে কারো দ্বি-মত নেই। কিন্তু এ সদকা সঠিক হওয়া ও এটিকে উপাসনায় পরিণত করার জন্য যে দু'টি পূর্ব শর্ত রয়েছে, সে সম্পর্কে অনেকেরই জ্ঞানের অভাব রয়েছে।

সদকা সঠিক হওয়ার প্রথম শর্ত: সদকা স্বাভাবিক আর অস্বাভাবিক যে অবস্থায়ই করা হোক না কেন তা কেবল আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যেই হতে হবে। কোনো প্রকার লোক দেখানো ভাব থেকে তা মুক্ত হতে হবে।

দ্বিতীয় শর্ত:
উপরে বর্ণিত দাহহাক রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসের মর্মানুযায়ী যে স্থানের নামে সদকা করা হয়েছে সে স্থানটি শির্ক সংঘটিত হওয়ার সম্ভাব্য স্থান হওয়া থেকে মুক্ত হতে হবে।

এ দু'টি শর্তের আলোকে বলা যায়, কেউ যদি সদকা করার সময় আল্লাহর সন্তুষ্টির পাশাপাশি সামান্যতম লোক দেখানোরও উদ্দেশ্য করে, তবে এতে সে ব্যক্তি শির্কে আসগরে নিমজ্জিত হবে। আর কবর ও মাযার যেহেতু শির্ক সংঘটিত হওয়ার সম্ভাব্য স্থান, সেহেতু সেখানে সদকা করার কোনো বৈধতা নেই। যেহেতু শরী'আতে মাযার নির্মাণ অবৈধ এবং মাযারে দান করাও অবৈধ, তাই মাযারের অবৈধ টাকায় সেখানে কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলাও অবৈধ। মাযারে টাকা দান করা যেহেতু হারাম, সুতরাং সেখানে কোনো ফকীর, মিসকীন ও ভবঘুরে লোকদেরও ভিড় জমাবার কোনো আবশ্যকতা নেই। সাধারণত মাযারে যারা দান করে তারা এ দানের মাধ্যমে মাযারস্থ অলির সন্তুষ্টি লাভ করে তাঁর নিকট থেকে বা তাঁর মাধ্যম্যে আল্লাহর নিকট থেকে তাদের দুনিয়া-আখেরাতের কল্যাণ সাধনের জন্যেই তা দান করে। এ জাতীয় দান ও কামনা শির্কে আকবারের অন্তর্গত। কাজেই সাদকা দানের ক্ষেত্রে শির্ক থেকে বাঁচতে হলে যে সমস্ত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান অলিদের মাযার কেন্দ্রিক নয়, কেবল সেখানেই সাদকা করতে হবে।

মানত:
বিপদ দেখলে মানুষ মানত করে। ধারণা করে হয়তো বা এতে তার বিপদ কেটে যাবে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মানত মানুষের কর্মের কোনো পরিবর্তন এনে দিতে পারে না। সে জন্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানত করতে নিরুৎসাহিত করেছেন। এ প্রসঙ্গে আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«لا يَأْتِي ابْنَ آدَمَ النَّذْرُ بِشَيْءٍ لَمْ يَكُنْ قُدْرَ لَهُ، وَلَكِنْ يُلْقِيهِ النَّذْرُ إِلَى القَدَرِ قَدْ قُدِّرَ لَهُ، فَيَسْتَخْرِجُ اللَّهُ بِهِ مِنَ البَخِيلِ، فَيُؤْتِي عَلَيْهِ مَا لَمْ يَكُنْ يُؤْتِي عَلَيْهِ مِنْ قَبْلُ»
"মানত বনী আদমের জন্য এমন কিছু বয়ে আনতে পারে না যা আমি তার তাকদীরে রাখি নি, বরং মানত তাকে তার জন্য তাকদীরে যা নির্ধারণ করা আছে সেটার উপর নিয়ে রাখে। ফলে এর দ্বারা আল্লাহ কেবল কৃপণের কিছু সম্পদ তার হাত ছাড়া করেন। তখন তার কাছে এমন কিছু আসে যা পূর্বে আসত না”।

ইমাম তিরমিযীর বর্ণনায় রয়েছে: "তোমরা মানত করো না কেননা; তা তাকদীরের কোনো পরিবর্তন করতে পারে না...।"

এ জন্যেই মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে মানত করার জন্য কোনো নির্দেশ ও উৎসাহ প্রদান করেন নি। তবে যেহেতু মানতের মাধ্যমে সম্মানের বহিঃপ্রকাশ ঘটে এবং তা এমন কারো নামে করতে হয় যিনি মানুষের বিপদাপদ দূরীকরণের মালিক। এ দু'টি বিষয় বিবেচনায় আনলে মানতকে আল্লাহর উপাসনায় পরিণত করার জন্য তাতে মোট দু'টি শর্ত পূর্ণ হতে হবেঃ
এক. তা কেবল আল্লাহ তা'আলার সম্মানার্থে কেবল তাঁরই নামে এবং কেবল তাঁরই সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করতে হবে।
দুই. পূর্বে বর্ণিত যাহহাক রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসের মর্মানুযায়ী তা জাহেল লোকদের ওরস ও শির্ক সংঘটিত হওয়ার সম্ভাব্য স্থান মাযার ও মুকাম থেকে মুক্ত হতে হবে।

যারা মানত সঠিক হওয়ার জন্য এ দু'টি শর্তের কথা বিবেচনায় না এনে বিভিন্ন মাযার ও কবরে মানত করে, তারা মানতটি পূর্ণ করার সময় আল্লাহর নাম নিয়ে থাকলেও মূলত তাদের মানতের দ্বারা মাযার ও কবরস্থ সে অলি ও দরবেশের সম্মানই প্রদর্শিত হয়ে থাকে এবং মাযার ও কবরস্থ অলির নিকটেই তারা বিপদ দূরীকরণের জন্য তাদের আবদার করে থাকে। তারা যদি প্রকৃতপক্ষে তাদের বিপদ দূরীকরণের কথা আল্লাহর নিকটেই চেয়ে থাকতো, তা হলে কোনো অবস্থাতেই তারা কোনো মাযার বা কবরে মানত করতো না।

মানত আল্লাহর পছন্দনীয় কোনো উপাসনার মাধ্যম না হয়ে থাকলেও যেহেতু এর দ্বারা আল্লাহর সম্মান প্রদর্শিত হয়, সে জন্য মানতের শর্তানুযায়ী কেউ তা করলে সে মানত পূর্ণ করা তার উপর ওয়াজিব হয়ে দাঁড়ায় এবং এ জাতীয় মানত পূর্ণ করা আল্লাহ তা'আলার দৃষ্টিতে মু'মিনদের বৈশিষ্ট্যের অন্তর্গত হয়ে থাকে। সে জন্য আল্লাহ তা'আলা মু'মিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন:
﴿يُوفُونَ بِالنَّذْرِ﴾ [الانسان: ৭]
"তারা (মু'মিনগণ) মানত পূর্ণ করে।”

টিকাঃ
১৫১. আল-কুরআন, সূরা বাকারা : ২৩৮।
১৫২. আল-কুরআন, সূরা হজ্জ: ৭৭।
১৫৩. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ত্বা-ইফ থেকে ফেরার পথে তাঁর শত্রু উতবাহ ও শায়বাহ এর একটি আংগুরের বাগানে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। সে সময় তাদের দাস আদ্দাস নামের জনৈক খ্রিষ্টান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পায়ে চুম্বন করেছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। দেখুন: আল-মুবারক পুরী, পৃ. ১২৬। অনুরূপভাবে অপর একজন গ্রাম্য সাহাবী দ্বারাও এ ধরনের কদমবুসী করার প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অভিবাদন, সম্মান ও ভালবাসা প্রদর্শনের জন্য তাঁর কোন অনুমোদিত পন্থা ছিল না। এ জন্য তাঁর অন্যান্য সাহাবীগণ এভাবে কোন দিন তাঁকে অভিবাদন জ্ঞাপন করেন নি। এতে প্রমাণিত হয় যে, কদমবুসীর বৈধতার ব্যাপারে যে দু'একটি ঐতিহাসিক বর্ণনা পাওয়া যায় তা একেকটি ঘটনা বিশেষ, যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথেই সীমাবদ্ধ, এর দ্বারা কোন অবস্থাতেই কদমবুসী বা পা চুম্বনের অনুমোদন প্রমাণিত হয়না।- লেখক
১৫৪. কিন্তু সেই সেজদার আকার-আকৃতি, ধরণ ও পদ্ধতি সম্পর্কে আমরা সম্পূর্ণ অজ্ঞ। আসলেই কি তা মাথা মাটিতে রেখে করা হতো কি না তা জানার কোনো উপায় নেই। কারণ; সেজদা শব্দটি সম্মান ও আনুগত্য প্রকাশের অর্থেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সুতরাং সেটা অনেকটা অস্পষ্ট বা মুতাশাবিহ। সেটার উপর ভিত্তি করে কুরআন ও হাদীসের স্পষ্ট বাণী বা মুহকামের আমল বাদ দেয়া যাবে না। সুতরাং কোনোভাবেই আমরা আল্লাহ ব্যতীত কারও জন্য সেজদা করাকে অনুমতিপ্রাপ্ত মনে করতে পারি না। [সম্পাদক]
১৫৫. আল-কুরআন, সূরা ফাতহ : ৯।
১৫৬. উম্মুল মু'মিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূল কতিপয় মুহাজির ও আনসারদের মাঝে ছিলেন, এমন সময় একটি উট এসে তাঁকে সেজদা করলো। সাহাবীগণ তা দেখে বললেন: হে রাসুল! চতুষ্পদ জন্তু আপনাকে সেজদা করে, অথচ আমরা এর অধিক হকদার, তখন তিনি বললেন: তোমরা তোমাদের রবের ইবাদাত কর এবং তোমাদের ভাই অর্থাৎ আমাকে সম্মান কর।" আহমদ, প্রাগুক্ত; ৩/৩২। [(তবে এর সনদ দুর্বল), সম্পাদক]
১৫৭. মুহাম্মদ ইবন ইয়াযীদ ইবন মা-জাঃ, প্রাগুক্ত; কিতাবুন নিকাহ, বাব: হক্কুষ যাওজি 'আলাল মারআতি (স্ত্রীর উপর স্বামীর অধিকার); ১/৫৯৫।
১৫৮. মুসলিম, প্রাগুক্ত; কিতাবুয যুহদ, বাব নং ৮৯, হাদীস নং ২৯৮৫;৪/২২৮৯; আহমদ, প্রাগুক্ত; ২/২০১।
১৫৯. আল-কুরআন, সূরা মাউন : ৫,৬।
১৬০. কা'বা গৃহটি পৃথিবীর মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত হওয়ার প্রমাণে ইবন 'আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত একটি মাওকুফ হাদীস উপস্থাপন করা যায়। তাতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- বলেন: আল্লাহ তা'আলা পৃথিবী সৃষ্টির দু'হাজার বছর পূর্বে পানিতে চারটি স্তম্ভের উপর কা'বা গৃহ স্থাপন করেন। অতঃপর এ-গৃহের নিচ থেকেই পৃথিবীর সম্প্রসারণ শুরু হয়”। দেখুন: তাফছীরুল কুরআনিল 'আযীম; ১/১৮৪। পৃথিবীর মানচিত্রের প্রতি লক্ষ্য করলে বাস্তবেই প্রমাণিত হয় যে, আরব উপ-দ্বীপটি পৃথিবীর মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। লেখক
১৬১. আল-কুরআন, সূরা হজ্জ : ২৭।
১৬২. আল-কুরআন, সূরা হজ্জ : ২৯।
১৬৩. ইবন 'উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: যে দিন রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- কে এ দু'পার্শ্ব (অর্থাৎ- কা'বা গৃহের ডান পার্শ্ব ও বাম পার্শ্ব যেখানে হাজারে আসওয়াদ অবস্থিত) স্পর্শ করতে দেখেছি সে দিন থেকেই আমি এ দু'পার্শ্ব কষ্টে হোক আর বিনা কষ্টে হোক কোনো অবস্থাতেই তা স্পর্শ করা পরিত্যাগ করি নি”। দেখুন: বুখারী, প্রাগুক্ত; কিতাবুল মানাসিক, বাব নং: ৫৬, তাকবীলুল হাজার, হাদীস নং ১৫২৯; ২/৫৮২; নাসাই, প্রাগুক্ত; ৪/৫/১৮৫।
১৬৪. 'উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু এ কৃষ্ণ পাথরকে চুম্বন করার সময় বলেছিলেন, «عَلِمْتُ أَنَّكَ حَجَرٌ لَا تَضُرُّ وَلَا تَنْفَعُ، وَلَوْ لَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهَ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَبَّلَكَ مَا قَبَّلْتُكَ» "আমি জানি যে তুমি একটি পাথর, তুমি কোন লাভ ও ক্ষতি করতে পার না, রাসূল-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- তোমাকে চুম্বন করতে না দেখলে আমি তোমাকে চুম্বন করতাম না"। দেখুন:বুখারী, প্রাগুক্ত, কিতাবুল মানাসিক, বাব নং: ৫৬, হাদীস নং: ১৫২৮, ২/৫৮২; সুলাইমান ইবন আশআছ, সুনানে আবী দাউদ; কিতাবুল মানাকিব, বাব: ফী তাক্ববীলিল হাজারি; (সিরিয়া: দারুল হিমস, ১ম সংস্করণ, ১৯৭০ খ্রি.), ২/৪৩৯।
১৬৫. 'আব্দুর রহমান ইবন সাফওয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: (মক্কা বিজয়ের বছর) আমি রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- কে তাঁর সাথীদের সহ কা'বা গৃহ থেকে বের হতে দেখলাম, তখন তাঁরা কা'বা গৃহের দরজা থেকে হাতীম পর্যন্ত হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে ছিলেন এবং তাদের গণ্ডদেশ দেয়ালের সাথে লাগিয়ে রেখেছিলেন, রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-তখন তাঁদের মাঝে ছিলেন”। দেখুন: আবু দাউদ, প্রাগুক্ত; ২/৪৫১। [তবে এর সনদ দুর্বল। সম্পাদক]
১৬৬. আল-কুরআন, সূরা বাক্বারাঃ :১৫৮।
১৬৭. আল-কুরআন, সূরা হজ্জ: ৩২।
১৬৮. আবু দাউদ, প্রাগুক্ত; ২/৪৮৬; ইবনে মা-জাহ, প্রাগুক্ত; ১/১০০৩।
১৬৯. আল-কুরআন, সূরা হজ্জ: ৩২।
১৭০. মসজিদ নির্মাণ এবং মসজিদে অবস্থান গ্রহণ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন: ﴿فِي بُيُوتٍ أَذِنَ اللَّهُ أَن تُرْفَعَ وَيُذْكَرَ فِيهَا اسْمُهُ يُسَبِّحُ لَهُ فِيهَا بِالْغُدُوِّ وَالْآصَالِ ﴾ [النور: ৩৬] "আল্লাহর পছন্দনীয় বান্দাদের সে সব গৃহেই পাওয়া যায় যেগুলোকে তিনি উন্নত করার ও সেখানে তাঁর নাম নেয়ার জন্য নির্দেশ করেছেন, সেখানে সকাল ও সন্ধ্যায় তারা তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে"। আল-কুরআন, সূরা নূর: ৩৬।
১৭১. ইয়ামন ও সিরিয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বরকতের দু'আ করায় মক্কা ও মদীনার পর অন্যান্য দেশের চেয়ে ইয়ামন ও সিরিয়ায় বসবাস করাকে উত্তম বিবেচনা করে সেখানে বসবাস করা যেতে পারে। ইবন 'উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي شَامِنَا ، اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي يَمَنِنَا» ইমাম তিরমিযী বলেন: হাদীসটি হাসান সহীহ। দেখুন: তিরমিযী, প্রাগুক্ত; কিতাবুল মানাক্বিব, বাব: নং ৭৫, সিরিয়া ও ইয়ামনের ফযীলতের বর্ণনা; ৪/৭৩৩। তাছাড়া যায়েদ ইবন ছাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত অপর হাদীসে রয়েছে, «طُوبَى لِلشَّام، فَقُلْنَا لأَيَّ ذَلِكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ؟ قَالَ: لأَنَّ مَلَائِكَةَ الرَّحْمَنِ بَاسِطَةٌ أَجْنِحَتَهَا عَلَيْهَا» "সিরিয়ার খুশ নসীব। যায়েদ ইবন ছাবিত বলেন: আমরা বললাম: ইহা কি কারণে হে রাসূল? তিনি বললেন: কারণ রাহমানের ফেরেশতা সিরিয়ার উপর তাঁদের ডানা প্রসারিত করে রয়েছেন। তদেব। [তিরমিযী, ৩৯৫৪]
১৭২. মুসলিম, প্রাগুক্ত; কিতাবুল হজ্জ, বাব: হজ্জ ও অন্যান্য উদ্দেশ্যে মুহরিমসহ মহিলাদের সফর করা; ২/৯৬৭; ইমাম আহমদ, প্রাগুক্ত; ২/১৩৪।
১৭৩. আবু দাউদ, প্রাগুক্ত; কিতাবুল আইমানি ওয়ান নুযুর, বাব: মা ইউমারু বিহী মিনাল ওয়াফা-ই বিন নাযরি; ৩/৬০৭; হাদীস নং ৩৩১৩।
১৭৪. প্রাগুক্ত; কিতাবুল লেবাছ, বাব নং- (৫), ৪/৩১৪।
১৭৫. প্রাগুক্ত; কিতাবুল মানাসিক, বাব নং ৯৮ (যিয়ারাতুল কুবুর), হাদীস নং ২০৪২; ২/৫৩৪; 'আযীমআবাদী, শামসুল হক, প্রাগুক্ত; ৬/২২; ইবনে কাছীর, তাফছীরুল কুরআনিল 'আযীম; ৩/৫১৬; ইমাম আহমদ, প্রাগুক্ত; ২/৩৬৭; ইবনে আবী শায়বাঃ, প্রাগুক্ত; ২/১৫০।
১৭৬. ইবন মা-জাঃ, প্রাগুক্ত; কিতাবুল একামাহ, বাব: মা জা-আ ফী ইয়াওমিল জুমু'আহ; ১/৩৪৯।
১৭৭. টীকা নং ১৬৪ দ্রষ্টাব্য।
১৭৮. ইবন মাজাহ, প্রাগুক্ত; কিতাবুন নিকাহ, বাব: আল-গেনা-ই ওয়াদ দফফি; ১/৬১২; ইবন তাইমিয়্যাহ, আহমদ, একতিদাউস সিরাতিল মুস্তাক্বীম, তাহকীক : হামিদ আল-ফকী, (বৈরুত: দারুল মা'রিফাহ, সংস্করণ বিহীন, তারিখ বিহীন), পৃ. ১৮৯-১৯০।
১৭৯. শেখ আব্দুর রহমান ইবন হাসান আ-লুশ শায়খ, ফাতহুল মাজীদ বি শারহি কিতাবিত তাওহীদ; (লাহুর : আনসারুস সুন্নাতিল মুহাম্মদিয়্যাঃ, সংস্করণ বিহীন, তারিখ বিহীন), পৃ. ২৫৭।
১৮০. বুখারী, প্রাগুক্ত; কিতাবুষ যাকাত, বাব: খেজুরের অর্ধেকাংশ দান করে হলেও আগুন থেকে বাঁচ, ১/২/২৩৪; মুসলিম, প্রাগুক্ত; ২/৭০৩, ৭০৪।
১৮১. মুসলিম, প্রাগুক্ত; কিতাবুজ যাকাত, বাব নং ১৬, হাদীস নং ১০০৮; ২/৬৯৯; ইমাম আহমদ, প্রাগুক্ত; ৪/৩৯৫।
১৮২. ইমাম আহমদ, প্রাগুক্ত; ৩/১২৪; ইবনু কাইয়্যিম আল-জাউযিয়্যাহ, মিফতাহু দারিস সা'আদাঃ, (বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, সংস্করণ বিহীন, তারিখ বিহীন), পৃ. ২১৮। [হাদীসটি তিরমিযীতেও এসেছে, নং ৩৩৬৯; তবে হাদীসটি দুর্বল। সম্পাদক]
১৮৩. বুখারী, প্রাগুক্ত; কিতাবুল আইমান ওয়ান নুজুর, বাব: মানত পূর্ণ করা; ৪/৮/২৫৩; মুসলিম, প্রাগুক্ত; ভাগ্য অধ্যায়, পরিচ্ছেদ নং- (২), ৩/১২৬১।
১৮৪. ইমাম তিরমিযী, প্রাগুক্ত; ৪/১১২; নাসাই, প্রাগুক্ত; শপথ ও মানত অধ্যায় পরিচ্ছেদ: মানতের দ্বারা কৃপনের সম্পদ বের করে নেওয়া হয়; ৪/৭/১৬।
১৮৫. আল-কুরআন, সূরা দহর: ৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00