📄 রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অদৃশ্য জ্ঞান
গায়েব সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা ব্যতীত অপর কেউ কিছুই জানে না, সে সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿ قُل لَّا يَعْلَمُ مَن فِي السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ وَمَا يَشْعُرُونَ أَيَّانَ يُبْعَثُونَ ﴾ [النمل: ৬৫]
"আপনি বলুন: আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যারা রয়েছে আল্লাহ ব্যতীত তাদের কেউই গায়েব জানে না, আর তারা কখন পুনরুত্থিত হবে তাও তারা জানে না।"
এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, গায়েব সম্পর্কে অবগত হওয়া কেবল আল্লাহ তা'আলারই বৈশিষ্ট্য। এ ক্ষেত্রে তাঁর সৃষ্টির মধ্যকার কারো কোনো অংশীদারিত্ব নেই। পুনরুত্থানের বিষয়টি গায়েবের অন্তর্গত একটি বিষয়। নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ের সত্যতা সম্পর্কে জনগণকে সংবাদ দিয়ে থাকলেও এটি কখন সংঘটিত হবে, সে সম্পর্কে তিনিও কোনো সুনির্দিষ্ট জ্ঞান রাখেন না। তিনি তাঁর এই অজ্ঞতাকে জনগণের সম্মুখে পরিষ্কার ভাষায় বলে দেয়ার জন্যে আল্লাহ বলেন:
﴿يَسْتَلُونَكَ عَنِ السَّاعَةِ أَيَّانَ مُرْسَهَا قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِندَ رَبِّي لَا يُجَلِّيهَا لِوَقْتِهَا إِلَّا هُوَ﴾ [الআরাফ: ১৮৭]
"আপনাকে তারা কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, আপনি তাদের বলুন: এর জ্ঞান রয়েছে কেবল আমার প্রতিপালকের নিকট, তিনি ব্যতীত এর সময় কেউই বলতে পারে না।”
এ ছাড়াও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনে এমন সব বাস্তব অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে যা পরিষ্কারভাবে এ কথাই প্রমাণ করে যে, তিনি গায়েব সম্পর্কে আদৌ কিছুই জানতেন না। তাঁর জীবনের বিবিধ ঘটনাপঞ্জীর মধ্য থেকে নিম্নে চারটি উদাহরণ পাঠকগণের বুঝার সুবিধার্থে তুলে ধরা হলো :
অপবাদের ঘটনা : قصة الإفك
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সহধর্মিনী উম্মুল মু'মিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু 'আনহার উপর 'বনু মুসতালিক' যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করার পথে মুনাফিকরা একজন নিরপরাধ সাহাবীর সাথে ব্যভিচারের মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করেছিল। সাধারণ জনগণের মাঝে এ নিয়ে অনেক তোলপাড় শুরু হয়েছিল। এমনকি এ নিয়ে কিছু সাধারণ মুসলিমরাও কথা বলাবলি শুরু করেছিল। ঘটনার সত্য-মিথ্যা না জানার ফলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে ব্যাপারে অনেকটা সন্দিহান হয়ে পড়েছিলেন। অবস্থা বেগতিক দেখে তিনি শেষ অবধি আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু-এবং যায়দ ইবনে হারিছাহ্ এর সাথে এ নিয়ে পরামর্শও করেছিলেন। প্রায় তিন সপ্তাহেরও বেশী সময় এ ভাবে অতিবাহিত হওয়ার পর অবশেষে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে এ মর্মে আয়াত নাযিল হয় :
﴿إِنَّ الَّذِينَ جَاءُو بِالْإِفْكِ عُصْبَةٌ مِّنكُمْ ﴾ [النور: ১১]
"যারা অপবাদ রটনা করেছে তারা তোমাদেরই মধ্যকার একটি দল...।"
এ আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত ঘটনার বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে অবহিত হন। এতে প্রমাণিত হয় যে, তিনি যদি বাস্তবে গায়েব সম্পর্কে কিছু জ্ঞান রাখতেন, তা হলে জনগণের মধ্যে এ বিষয়টি ছড়া-ছড়ি হওয়ার পূর্বেই তিনি এর ভিত্তিহীনতার কথা ঘোষণা করে দিতেন। ঘটনার সত্য-মিথ্যা জানার জন্য তাঁকে দীর্ঘদিন যাবৎ অহীর জন্য অপেক্ষা করতে হতো না।
দ্বিতীয় উদাহরণ:
উম্মুল মু'মিনীন আয়শা রাদিয়াল্লাহু আনহা ও হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহা এ মর্মে ঐকমত্য পোষণ করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মুল মু'মিনীন যয়নব বিনতে জাহাস রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর গৃহ থেকে আমাদের দু'জনের মধ্যে যার গৃহেই প্রথমে প্রবেশ করবেন সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলবে- 'আমি আপনার মুখে মাগাফীর। এর দুর্গন্ধ পাচ্ছি'। তাঁদের এ ঐকমত্যে পৌঁছার মূল উদ্দেশ্য ছিল এ কথা বলার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যয়নব রাদিয়াল্লাহু আনহার গৃহে অধিকহারে যাওয়া থেকে বিরত রাখা। যথারীতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- যয়নব রাদিয়াল্লাহু আনহার গৃহ থেকে বের হয়ে হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহার গৃহে প্রবেশ করলে তিনি বললেন-'আমি আপনার মুখে মাগাফিরের দুর্গন্ধ পাচ্ছি'। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জন্যে মধু পান করা হারাম করে দিলেন। তিনি আদৌ বুঝতেও পারেন নি যে, এটি ছিল যয়নব রাদিয়াল্লাহু আনহার গৃহে অধিকহারে যাওয়া থেকে তাঁকে বারণ করার জন্য তাঁদের দু'জনের একটি ফন্দি বিশেষ। সূরা তাহরীমের মধ্যে এ ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ আসার পরই তিনি তাঁদের ফন্দির ব্যাপারে অবহিত হন।
তৃতীয় উদাহরণ :
কাফের ও মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রূহের প্রকৃতি, গুহাবাসী (أصحاب الكهف) ও জুলকারনাইন বাদশার ইতিহাস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিল। এ তিন বিষয়ে তাঁর স্বচ্ছ কোনো জ্ঞান না থাকায় তিনি তাদেরকে এ-সবের তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দিতে না পেরে ইন-শাআল্লাহ না বলে পরবর্তী দিনে এর জবাব দেয়ার ব্যপারে প্রতিশ্রুতি দান করেন। তাঁর এ দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, প্রতিশ্রুত সময়ের মধ্যেই মহান আল্লাহ তাঁকে এ তিনটি প্রশ্নের সঠিক জবাব সম্পর্কে অবহিত করবেন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি দেয়ার সময় ইন-শাআল্লাহ না বলার ফলে প্রতিশ্রুত সময়ের মধ্যে এর জবাবে তাঁর নিকট কোনো অহী আসে নি। পরবর্তীতে পনের দিন পর এ সব প্রশ্নের জবাবে অহী অবতীর্ণ হয় এবং প্রতিশ্রুতি প্রদানের সময় ইন-শাআল্লাহ না বলার কারণে তাঁকে হালকা ভাষায় কিছুটা ভৎর্সনা করা হয়।
যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ ﴿ وَلَا تَقُولَنَّ لِشَيْءٍ إِنِّى فَاعِلٌ ذَلِكَ غَدًا * إِلَّا أَن يَشَاءَ اللَّهُ ﴾ [الكهف: ২৩, ২৪]
"যে কাজ তুমি আগামীকাল করবে সে ক্ষেত্রে ইন-শাআল্লাহ না বলে কোনো কথা বলো না।"
চতুর্থ উদাহরণ :
মহা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৎকালীন আরবের 'নজদ' এলাকায় তাঁর কতিপয় সাহাবীকে দ্বীনের তাবলীগ করার উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেছিলেন কিন্তু; পথিমধ্যে তাঁরা শত্রুদের ষড়যন্ত্রের শিকার হন, তাঁদের মধ্যকার কেবল একজন সাহাবী ব্যতীত বাকী সকলেই শাহাদাত বরণ করেছিলেন। যদি এ অকল্পনীয় দুঃখের কথা তিনি ঘুণাক্ষরেও জানতেন, তবে তাঁর এতোগুলো সাহাবীকে এ ভাবে প্রেরণ করতেন না।
উপরে যে চারটি উদাহরণ পেশ করা হলো তাতে জ্ঞানীদের জন্যে এ-কথার প্রমাণ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্মগতভাবে বা নবুওত লাভের পরে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁকে দেয়া তাঁর এমন কোনো যোগ্যতা ছিল না, যার মাধ্যমে তিনি তাঁর অসাক্ষাতে সংঘটিত বিষয়াদি জানতে সক্ষম হতেন। যদি জানতেন তা হলে উক্ত এ চারটি বিষয়ের বাস্তব অবস্থা তিনি যথা সময়ে অবগত হতে পারতেন। এ ভাবে অহী অথবা অন্য কোনো উপায়ে তা জানার জন্য তাঁকে অপেক্ষা করতে হতো না।
কথা এখানেই শেষ নয়, মহান আল্লাহ যে গায়েব বা অদৃশ্যের একক জ্ঞানী, সে-কথা শুধু তাঁর নবীকে জানিয়ে দিয়েই তিনি ক্ষান্ত হয়ে যান নি, বরং তাঁর নবীর মান ও মর্যাদার দিক বিবেচনা করে কেউ যাতে তাঁর ব্যাপারে গায়েব জানার ধারণা করে না বসে, সে জন্য তিনি তাঁর নবীর প্রতি এ নির্দেশও প্রদান করেছেন যে, তিনি যেন গায়েব বা অদৃশ্য সম্পর্কে তাঁর অজ্ঞতার বিষয়টি জনসাধারণের নিকট পরিষ্কারভাবে ব্যক্ত করে দেন। সে জন্যে তাঁকে জনগণের মাঝে এ ঘোষণা দিতে বলেন:
﴿قُل لَّا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعًا وَلَا ضَرًّا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ وَلَوْ كُنتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَاسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ وَمَا مَسَّنِيَ السُّوءُ إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ وَبَشِيرٌ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ﴾ [الاعراف: ১৮৮]
আপনি বলুন: কেবল আল্লাহ যা চান তা ব্যতীত আমি আমার নিজের কোন কল্যাণার্জন বা অকল্যাণ দূরীকরণের অধিকার রাখি না। আমি যদি গাযেব জানতাম, তা হলে আমি অনেক কল্যাণ অর্জন করতে সক্ষম হতাম, আর আমাকে কোনো অকল্যাণই স্পর্শ করতে পারতো না। আমিতো কেবল একজন সুসংবাদদাতা ও ভয়প্রদর্শনকারী মাত্র, সেই সকল মানুষের জন্যে যারা বিশ্বাসী।”
এ ঘোষণার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনগণকে এ কথা জানিয়ে দিলেন যে, গায়েব সম্পর্কে অবগত হওয়া আমার কাজ নয়। আমার কাজ হচ্ছে বিশ্বাসীদেরকে বেহেশতের সুসংবাদ দান করা আর জাহান্নাম সম্পর্কে ভয় প্রদর্শন করা। আমি আসলে গায়েব সম্পর্কে যদি কিছু অবগত হতে পারতাম, তা হলে আমার জীবনে শুধু কল্যাণেরই ফল্গুধারা বয়ে যেতো, কখনও আমার কোনো অকল্যাণ হতো না; অথচ আমার জীবন এ-কথার সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, আমি বহু অকল্যাণের শিকার হয়েছি। এতে প্রমাণিত হয় যে, আমি গায়েব সম্পর্কে আদৌ কোনো জ্ঞান রাখি না। আখেরাত, হিসাব-নিকাশ, জান্নাত ও জাহান্নাম ইত্যাদি গায়েব সম্পর্কিত বিষয়ে আমি যা কিছু বলছি তা আমার নিজ থেকে তৈরী কোনো উদ্ভট কথা নয়, আল্লাহ আমাকে এ সম্পর্কে জ্ঞান দান করেছেন বলেই আমি তা বলছি।
গায়েব বা অদৃশ্য সম্পর্কে অবহিত না থাকার ফলেই তো তাঁকে জাদু স্পর্শ করেছিল; এ কারণেই তো তায়েফের মুশরিকদের লেলিয়ে দেয়া শিশু ও দাসদের প্রস্তরের আঘাতে তাঁর গোটা শরীর জর্জরিত হয়েছিল; উহুদের যুদ্ধে তাঁর দাঁত মুবারক পড়ে গিয়েছিল, সত্তর জন সাহাবী শহীদ হয়েছিল ও অসংখ্য সাহাবী আহত হয়েছিল; খয়বরের যুদ্ধের সময় জনৈকা ইয়াহুদী মহিলা কর্তৃক বিষ মাখা খাদ্য খেয়ে মৃত্যু পর্যন্ত তাঁকে এর ব্যথা অনুভব করতে হয়েছিল।
বাস্তবেই তিনি যদি গায়েব সম্পর্কে কিছু জানতেন, তবে তাঁর জীবনে তিনি এ সব বিড়ম্বনার শিকার হতেন না। যদি বলা হয় যে, তিনি এ সব বিপদের কথা জেনেও তায়েফ ও উহুদের ময়দানে গেছেন, তা হলে বলতে হবে যে, বিপদের কথা জেনেও তিনি নিজেকে ও তাঁর সাথীদেরকে আত্মহননের দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন!! অথচ এ জাতীয় চিন্তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি কোনোভাবে করা যায় না; কেননা তিনি কোনো ভাবেই নিম্নোক্ত আয়াতের বিপরীত কাজ করতে পারেন না:
﴿وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ﴾ [البقرة: ১৯৫]
"তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিওনা” এ- আয়াতের নির্দেশের বিপরীত কাজ করতে পারেন না।
টিকাঃ
৯৭. আল-কুরআন, সূরা আন-নামল: ৬৫।
৯৮. আল-কুরআন, সূরা আল-আ'রাফ: ১৮৭।
৯৯. আল-কুরআন, সূরা আন-নূর: ১১।
১০০. মুস্তফা ও গং, আল-মু'জামুল ওয়াসীত; (তেহরান : আল-মাকতাবাতুল ইলমিয়্যাহ, সংস্করণ বিহীন, তারিখ বিহীন), ১/৬৬৩।
১০১. হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহার উক্ত কথার পরিপ্রেক্ষিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের উপর মধু পান করা হারাম করেছিলেন, না তাঁর স্ত্রীদের সাথে সহবাস না করার ব্যাপারে শপথ করেছিলেন, এ নিয়ে বিভিন্ন বর্ণনা থাকলেও বিশেষজ্ঞদের মতে মধু পান হারাম করার বিষয়টিই সঠিক। দেখুন:ইবনে কাছীর, তাফছীরুল কুরআনিল 'আযীম; (বৈরুত : দ্বারুল মা'রিফাহ, ১ম সংস্করণ, ১৯৮৭ খ্রি.) ৪/৪১৩।
১০২. আল-কুরআন, সূরা আল-কাহফ: ২৩। কাফেরদের আগমন ও এ তিনটি প্রশ্ন সম্পর্কে বিষদভাবে জানার জন্য দেখুন: ইবনে হিশাম, আস্ সীরাতুন নববিয়্যাহ; সম্পাদনা : মুস্তফা আস-সাক্কা ও গং, (মিশর : তুরাছুল ইসলাম, সংস্করণ বিহীন, তারিখ বিহীন), ১/৩০১-৩০৩।
১০৩. বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: আল-মুবারকপুরী, সফিয়্যুর রহমান, আর- রাহীকুল মাখতুম; (রিয়াদ: দারুস সালাম, সংস্করণ বিহীন, ১৯৯৪ খ্রি.,), প্র. ২৩৯।
১০৪. আল-কুরআন, সূরা আল-আ'রাফ: ১৮৮।
📄 রাসূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ন্যায় অপর কেউই অদৃশ্য সম্পর্কে অবগত নয়
গায়েব সম্পর্কে জানার ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল, তাঁর খলীল ও হাবীবের অবস্থা যদি এই হয়, তিনি যদি আল্লাহর জানানোর বাইরে তাঁর চোখের আড়ালে ও পিঠের পিছনে সংঘটিত বিষয়াদি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকেন, তা হলে তাঁর উম্মতের মধ্যকার অলি, দরবেশ ও অন্যান্যদের অবস্থা যে কী হবে তা সহজেই অনুমেয়। তিনি যেমন তাঁর জীবদ্দশায় নিজ থেকে কোনো অদৃশ্য সম্পর্কে অবগত হতে পারেন নি, তেমনি তাঁর তিরোধানের পরেও তাঁর পক্ষে তা অবগত হওয়া সম্ভব নয়। সে কারণেই তাঁর তিরোধানের পর যখন খেলাফতের বিষয় নিয়ে সাহাবীদের মাঝে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়েছিল, তখন তাঁর পক্ষে যেমন তা নিজ থেকে অবগত হওয়া সম্ভব হয় নি, তেমনি অপর কোনোভাবে জেনে তাঁদেরকে সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনা প্রদান করাও তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় নি। তিনি নিজ থেকে পৃথিবীর ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে আগাম কিছু অবহিত হতে পারেন না বলেই তাঁর আদরের নাতি হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে কারবালার প্রান্তরে মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার জন্যে রূহানী শক্তি বলে তাঁকে সেখানে যাওয়া থেকে বারণ করতে পারেন নি। তিনি আল্লাহর রাসূল হয়েও যদি তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর রূহানী শক্তি বলে নিজ আত্মীয় ও উম্মতদের বিপদের কথা জানতে না পারেন এবং তাদের কোনো উপকার করতে না পারেন, তবে তাঁর উম্মতের মধ্যে এমন রূহানী শক্তিসম্পন্ন কে থাকতে পারে, যিনি মৃত্যুর পর এমন যোগ্যতা অর্জন করতে পারেন যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষে অর্জন করা সম্ভব হয় নি? যদি কেউ এমন দাবী করে তবে সে হবে একজন মস্ত বড় মিথ্যুক ও প্রতারক।
টিকাঃ
১০৫. আল-কুরআন, সূরা আল-বাক্বারাহ: ১৯৫।
📄 ইলমে গায়েব সম্পর্কিত সংশয় নিরসন
কারো অন্তরে এমন সন্দেহের উদ্রেক হতে পারে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গায়েব সম্পর্কে কেমন করে জ্ঞাত হবেন না, অথচ তিনি আমাদেরকে পার্থিব ও পরকালীন অসংখ্য গায়েব সম্পর্কিত বিষয়ের সংবাদ দান করেছেন? এ জাতীয় সংশয় নিরসনের জবাব রয়েছে কুরআনুল কারীমের নিম্নোক্ত আয়াতে। মহান আল্লাহ বলেন:
﴿عَالِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَى غَيْبِهِ أَحَدًا إِلَّا مَنِ ارْتَضَى مِن رَّسُولٍ﴾ [الجن: ২৬, ২৭]
“তিনি গায়েবের জ্ঞানী, তাঁর মনোনীত রাসূল ব্যতীত অপর কারো কাছে তাঁর গায়েবকে প্রকাশ করেন না।”
এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তা'আলাই হলেন অদৃশ্যের একক জ্ঞানী। তিনি শুধুমাত্র তাঁর মনোনীত রাসূলদেরকে তাঁদের প্রতি অর্পিত রেসালতের দায়িত্ব আদায়ের প্রয়োজনে যতটুকু অদৃশ্য সম্পর্কে তাঁদেরকে অবহিত করা প্রয়োজনবোধ করেন, ঠিক ততটুকুই তাঁদেরকে অবহিত করেন। আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মনোনীত রাসূল ছিলেন বিধায়, তাঁকেও রিসালতের প্রয়োজনে কিছু গায়েবের সংবাদ দিয়েছিলেন। এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইচ্ছাধীন কোনো বিষয় ছিল না যে, যখন ইচ্ছা তিনি তখনই তা জানতে পারতেন এবং জনগণকে তা বলে বেড়াতে পারতেন।
প্রকৃতকথা হলো, রিসালত আদায়ের স্বার্থে এবং জনগণের মাঝে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর প্রয়োজনে তাঁকে গায়েবের সাথে সম্পৃক্ত যা কিছু জানানো আল্লাহ তা'আলা জরুরী মনে করেছিলেন, তাঁকে ঠিক সেটুকুই জানিয়েছিলেন। এর বাইরে গায়েবের সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয়াদি জানার তাঁর নিজস্ব বা আল্লাহ প্রদত্ত স্থায়ী কোনো যোগ্যতা ছিল না।
সাধারণ জনগণের মাঝে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে আল্লাহ্ তা'আলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অসাক্ষাতে সংঘটিত হওয়া কিছু বিষয়াদির সংবাদ দিয়েছিলেন। উদাহরণস্বরূপ নিম্নে এমনি ধরনের দু'টি গায়েবের উদ্ধৃতি প্রদান করা হলো:
এক. বদর যুদ্ধের পর 'উমায়ের ইবন ওয়াহাব ও সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যাহ এ মর্মে একমত পোষণ করেছিলেন যে, 'উমায়ের তার ছেলেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে মদীনায় যেয়ে সুযোগমত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হত্যা করবে, এতে 'উমায়েরের জীবন নাশ হলে সাফওয়ান তার যাবতীয় দেনা শোধ এবং আজীবন তার পরিবারের সদস্যদের ব্যয়ভার গ্রহণ করবে। এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে যখন 'উমায়ের মদীনায় গমন করে এবং কোষবদ্ধ তরবারী নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে উপস্থিত হয়, তখন তিনি তাকে তাদের সে ষড়যন্ত্রের কথা ফাঁস করে দেন।
ঘটনার বিবরণে যদিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কিভাবে তা জানলেন এর কোনো বর্ণনা নেই, তথাপি এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মহান আল্লাহই তাঁকে তা জানিয়েছিলেন। ঘটনার সাক্ষী 'উমায়ের এর মুখেও আমরা এ কথারই স্বীকৃতি দেখতে পাই। 'উমায়ের নিজেই তাদের ষড়যন্ত্রের কথা ফাঁস হয়ে যাওয়া দেখে সাথে সাথে বলে উঠে যে, এটি এমন একটি ঘটনা যা আমি এবং সাফওয়ান ব্যতীত অপর কেউ জানে না। আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি! আমি নিশ্চিত করে বলছি, এ সংবাদ আপনাকে আল্লাহ ব্যতীত আর কেউ দেয় নি। এ কথা বলেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।
দুই. আত্তাব ইবন উসায়েদ, আবু সুফিয়ান ও হারিছ ইবন হিশাম এ তিন ব্যক্তি মক্কা বিজয়ের দিনে কা'বা শরীফের সামনে দাঁড়িয়ে মক্কার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে পরস্পর মত বিনিময় করছিল। এ সময় আত্তাব বলেছিল: 'আল্লাহ উসায়েদকে বড় সম্মান দিয়েছেন যে, মক্কার উপর মুহাম্মদ এর বিজয়ী হওয়ার সংবাদ তাকে শ্রবণ করান নি। বেঁচে থাকলে হয়তো মুহাম্মদ থেকে এমন কোনো কথা তাকে শুনতে হতো, যা তাকে রাগান্বিত করতো'। আত্তাবের এ কথা শুনার পর এবার হারিছ বললো: 'আল্লাহর শপথ! আমি কোনো প্রকার মন্তব্য করবো না, কারণ; আমি যদি কোনো কথা বলি তাহলে আমার পক্ষ থেকে এ পাথরকণাও মুহাম্মদকে আমার কথার সংবাদ প্রদান করবে'। তাদের এ কথোপকথনের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কা'বা শরীফের ভিতর থেকে বের হয়ে তাদের তিন জনকে লক্ষ্য করে বললেন:
«قَدْ عَلِمْتُ الَّذِي قُلْتُم»
"তোমরা পরস্পর যা বলাবলি করেছিলে আমি তা অবগত হতে পেরেছি।” এই বলে তিনি তাদের এ আলোচনার কথা বলে দিলে সাথে সাথেই আত্তাব ও হারিছ এই বলে ইসলাম গ্রহণ করেন:
«نَشْهَدُ أَنَّكَ رَسُولُ اللهِ وَاللهِ مَا اطَّلَعَ عَلَى هُذَا أَحَدٌ كَانَ مَعَنَا فَنَقُوْلُ : أَخْبَرَكَ»
"আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি আল্লাহর রাসূল। আল্লাহর শপথ! আমাদের সাথের কেউই তো এ কথাগুলো শ্রবণ করতে পারে নি, যার ফলে আমরা এ কথা বলতে পারতাম যে, হয়তোবা কেউ আপনাকে এ সবের সংবাদ দিয়েছে। "
এ দু'টি ঘটনার ন্যায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনের যত ঘটনাই আমাদের সম্মুখে আসবে আমাদেরকে বুঝতে হবে যে, এ সব গায়েবী বিষয়াদি তিনি নিজের যোগ্যতা বলে জানতে পারেন নি, মহান আল্লাহ তাঁকে তা জানিয়েছিলেন। পরকালীন গায়েবী বিষয়াদি সম্পর্কে আল্লাহই তাঁকে যা অবগত করিয়েছিলেন, তা-ই তিনি বলেছেন, আবার তাও চুলচেরা বিশ্লেষণ করে তাঁকে জানান নি। আখেরাতে তাঁর মর্যাদাপূর্ণ অবস্থার কথা তিনি আমাদের বলে থাকলেও তাঁর মর্যাদার সঠিক ধরন ও প্রকৃতি কেমন হবে, সে সম্পর্কেও তিনি বিস্তারিতভাবে কিছুই জানতেন না। এ প্রসঙ্গে কুরআনুল কারীমে আল্লাহ বলেন :
﴿قُلْ مَا كُنتُ بِدْعَا مِنَ الرُّسُلِ وَمَا أَدْرِى مَا يُفْعَلُ بِي وَلَا بِكُمْ إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَى إِلَى﴾ [الاحقاف: ৯]
"বলুন: আমি নতুন কোন রাসূল নয়, আমার ও তোমাদের সাথে (আখেরাতে) কেমন আচরণ করা হবে তা আমি (বিস্তারিতভাবে) জানি না, আমিতো কেবল তা-ই অনুসরণ করে থাকি যা আমার নিকট প্রত্যাদেশ করা হয়।”
উম্মুল 'আলা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এরশাদ করেন :
«وَاللَّهِ مَا أَدْرِي، وَأَنَا رَسُولُ اللَّهِ، مَا يُفْعَلُ بِي وَلَا بِكُمْ»
"আল্লাহ শপথ! আমি আল্লাহর রাসূল হয়েও আমার ও তোমাদের সাথে আখেরাতে কেমন আচরণ করা হবে তা আমি জানি না।”
উক্ত আয়াত ও হাদীস দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয় যে, আখেরাতের সাথে সম্পর্কিত গায়েব সম্পর্কে তিনি জনগণকে যা কিছু বলেছেন, তা কোন নতুন কথা নয়, বরং এ জাতীয় কথা অতীতের বহু নবী ও রাসূলগণ বলে গেছেন। তা ছাড়া আখেরাতের সাথে সম্পর্কিত গায়েব সম্পর্কে অবগত হওয়া তাঁর নিজস্ব কোন কৃতিত্ব নয়, বরং এ সম্পর্কে তিনি যা কিছু বলেছেন, তা অহীর মাধ্যমে অবগত হয়েই বলেছেন। আবার আল্লাহ তাঁকে যে বিষয়ে যতটুকু জানিয়েছেন সে বিষয়ে তাঁর পক্ষে এর বাইরে বিস্তারিত করে আরো কিছু বলারও তাঁর নিজস্ব কোন সূত্র ছিল না।
টিকাঃ
১০৬. আল-কুরআন, সূরা আল-জিন : ২৬, ২৭।
১০৭. বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: ইবনে হিশাম, প্রাগুক্ত; ১/৬৬২।
১০৮. তদেব।
১০৯. বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন: আল-মুবারকপুরী, সফিউর রহমান, প্রাগুক্ত; পৃ. ৪০৫।
১১০. আল-কুরআন, সূরা আল-আহক্বাফ : ৯।
১১১. বুখারী, হাদীস নং ৭০১৮; ইমাম আহমদ, প্রাগুক্ত; ২/২৩৫; আত-তাবরিযী, ওয়ালী উদ্দীন আল-খতীব, মিশকাতুল মাসাবীহ; (মাকতাবা রশীদিয়্যাহ, সংস্করণ বিহীন, তারিখ বিহীন, পৃ. ৪৫৬)
১১২. ইমাম ত্বীবী বলেন: আখেরাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তাঁর উম্মতের সাথে কেমন আচরণ করা হবে তা তাঁর না জানা বলতে তা বিস্তারিতভাবে না জানার কথাই বুঝানো হয়েছে। তিনি যে এ-সব বিষয় মোটামুটিভাবে জানতেন সে জানাটুকুকে এর দ্বারা অস্বীকার করা হয় নি। দেখুন: মিশকাত; টীকা নং- ৬, পৃ. ৪৫৬।
📄 আল্লাহর অলিগণ গায়েব সম্পর্কে কিছুই জানেন না
গায়েবের জ্ঞান সম্পর্কিত উপর্যুক্ত আলোচনার মাধ্যমে যখন আমরা এ কথা অবগত হতে পারলাম যে, গায়েব সম্পর্কে অবহিত হওয়ার বিষয়টি আল্লাহর রুবুবিয়্যাতের বৈশিষ্ট্যের অন্তর্গত বিষয়। তিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্যকার কাউকে এ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী করেন না। অনুগ্রহপূর্বক যদি তিনি কাউকে এ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী করতেন, তবে তাঁর প্রিয়ভাজন শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এর অধিকারী করতেন। কিন্তু আমরা উপরের আলোচনায় দেখতে পেলাম যে, তাঁকেও তিনি এ গুণের অধিকারী করেন নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- নিজ থেকেও এ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন না। আল্লাহ তা'আলা নিজ অনুগ্রহে তাঁকে দুনিয়া-আখেরাতের গায়েব সম্পর্কিত যা কিছু অবহিত করেছিলেন তাও কেবল তাঁর রেসালত ও এর সাথে সম্পর্কিত বিষয় এবং জনগণের নিকট তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যের সাথে সম্পর্কিত ছিল। আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হয়ে তিনি যদি অদৃশ্য সম্পর্কে নিজ থেকে কিছুই জানতে না পারেন, তবে তাঁর উম্মতের মধ্যে এমন কোন্ অলি, গউছ ও কুতুব থাকতে পারেন, যারা নিজ থেকে গায়েব সম্পর্কে কিছু জানতে পারেন। মানুষ আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হয়ে যদি গায়েব সম্পর্কে কিছুই জানতে না পারে, তবে আল্লাহর অন্যান্য সৃষ্টির মধ্যকার কেউ যে নিজ থেকে এ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে পারবে না, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। গায়েব সম্পর্কিত জ্ঞানের বিষয়টি যখন সম্পূর্ণরূপে আল্লাহ তা'আলার রুবুবিয়্যাতের আওতাভুক্ত বিষয়, তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ব্যাপারে কস্মিনকালেও এ ধারণা পোষণ করা যাবে না যে, তাঁর সত্তার মধ্যে জন্মগতভাবে এমন কোনো যোগ্যতা ছিল যার দ্বারা তিনি অদৃশ্য সম্পর্কে জ্ঞাত হতেন, অথবা জন্মগত না হোক নবুওত পরবর্তী সময়ে আল্লাহ তা'আলা তাঁর মধ্যে গায়েব সম্পর্কে অবহিত হওয়ার বৈশিষ্ট্য দান করেছিলেন, যার ফলে তিনি যখন ইচ্ছা গায়েব সম্পর্কে অবহিত হতে পারতেন! একইভাবে আল্লাহর অলিদের ব্যাপারেও এমন ধারণা কোনো অবস্থাতেই পোষণ করা যাবে না। আল্লাহর অন্যান্য সৃষ্টির বেলায় তো তা কল্পনাই করা যায় না। কেউ যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, কোনো অলি, দরবেশ ও ফকীর অথবা কোনো পশু ও পাখির মধ্যে এমন বৈশিষ্ট্য রয়েছে বলে মনে করে, তা হলে বুঝতে হবে যে, সে শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে পথভ্রষ্টতার মধ্যে পড়ে রয়েছে। আল্লাহ তা'আলার দৃষ্টিতে সে মুশরিকদের দলভুক্ত হয়ে গেছে। এমন ধারণা পোষণকারীর জানা আবশ্যক যে, এ জাতীয় শির্কী ধারণা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবী হয়ে প্রেরিত হওয়ার প্রাক্কালে সমগ্র আরব জাহানব্যাপী প্রচলিত ছিল। মুশরিকরা তাদের দেবতাদের ব্যাপারে অনুরূপ ধারণা পোষণ করতো। এ ধারণার বশবর্তী হয়েই তারা তাদের 'হুবল' দেবতার নিকটে গিয়ে তীর দ্বারা ভাগ্য যাচাই করতো। কুরআনুল কারীমে তাদের এ জাতীয় কর্মকে শয়তানের অপবিত্র কর্ম বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ ছাড়াও তাদের মাঝে এ বিশ্বাসও ছিল যে, কাহিন ও গণকরা গায়েব বা অদৃশ্য সম্পর্কে জ্ঞান রাখে, সে জন্যেই তারা তাদের বিবিধ রকমের বিষয়াদির ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ জানার জন্য গণকদের কাছে যেতো। আরব সমাজের প্রচলিত শির্ক সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে ইন-শাআল্লাহ আমরা কুরআন ও হাদীস দ্বারা তা প্রমাণের প্রয়াস পাব।
উপর্যুক্ত ধারণা পোষণকারীর আরো জানা আবশ্যক যে, তার এ জাতীয় চিন্তা 'আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামা'আত' এর ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত মূলনীতি বহির্ভূত চিন্তা। এ কারণেই ইসলামী বিশেষজ্ঞগণ এ মর্মে ফতোয়া প্রদান করেছেন যে, যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে 'ইয়া রাসূলাল্লাহ' বলে এ বিশ্বাসের ভিত্তিতে আহ্বান করবে যে, তিনি অদৃশ্য বা গায়েব সম্পর্কে জ্ঞাত থাকার ফলে দূর থেকে তার আহ্বানকে শ্রবণ করে থাকবেন, সে ব্যক্তি কাফির হয়ে যাবে।
অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি কোনো অলিকে এ বিশ্বাসের ভিত্তিতে আহ্বান করবে সেও কাফির হয়ে যাবে।
অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি এ ধারণা পোষণ করবে যে, আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গায়েবী বা অদৃশ্য জ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য এতটুকু যে, আল্লাহ তা'আলার গায়েবী বা অদৃশ্য জ্ঞান হলো তাঁর সত্তাগত (যাতী) জ্ঞান, আর রাসূলুল্লাহ-সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গায়েবী বা অদৃশ্য জ্ঞান হলো আল্লাহ তা'আলার দান, অর্থাৎ- আল্লাহ তা'আলা তাঁকে গায়েবী অদৃশ্য জ্ঞানের যোগ্যতা দান করেছেন, তাই তিনি সে যোগ্যতা বলে গায়েবী বা অদৃশ্য সম্পর্কে অবগত হতেন, তা হলে সে ব্যক্তিও নিঃসন্দেহে কাফের ও মুশরিক হয়ে যাবে। কারণ; গায়েব সম্পর্কে অবগত হওয়ার একচ্ছত্র অধিকার হচ্ছে আল্লাহ তা'আলার। তাঁর অহী অথবা ইলহাম ছাড়া জাগ্রত অবস্থায় তাঁর বান্দাদের পক্ষে তা অবগত হওয়ার বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই।
টিকাঃ
১১৩. যদিও সঠিক কথা হচ্ছে যে, গাউস ও কুতুব বলে কেউ নেই। এসবই মিথ্যা ও মনগড়া কথা [সম্পাদক]
১১৪. বস্তুত এ ধরণের ধারনা পোষণ করা সরাসরি শির্ক। [সম্পাদক]
১১৫. মাওলানা মুহাম্মদ 'আরিফ সম্বহলী, ব্রেলভী ফিৎনা কী নয়া রূপ; (উর্দু ভাষায়), (লাহুর: আশ্রাফ ব্রাদার্স, ২য় সংস্করণ, ১৯৭৮ খ্রি.), পৃ. ৮৬।
১১৬. ইবনু কাইয়্যিম আল-জাউযিয়্যাহ, এগাছাতুল লাহফান; (কায়রো: দারুত তুরাছিল 'আরাবী, ২য় সংস্করণ, ১৯৮৩ খ্রি.), পৃ.১৬৯।
১১৭. বলা হয়েছে : ﴿إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ ﴾ [المائدة: ৯০] "নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমা ও ভাগ্য নির্ধারক তীরসমূহ শয়তানের অপবিত্র কর্ম বৈ আর কিছুই নয়, সুতরাং তোমরা এগুলো থেকে বিরত থাকো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার"। আল-কুরআন, সূরা আল-মায়েদাহ : ৯০।
১১৮. আবু বকর জাবির আল-জাযাইরী, ওয়া জাউ ইয়ারকুদুন!!! মাহলান ইয়া দু'আতাত দালালাঃ; (وجاءوا يركضون !!! مهلا يا دعاة الضلالة( )স্থান বিহীন: মিন ওয়াছাইলিদ দাওয়াঃ, ১৪০৬ হিজরী), পৃ. ৪৫; ক্বাযী ছানাউল্লাহ পানিপতী, ইরশাদুত ত্বালিবীন; ৩/১৯; মুল্লা 'আলী আল- ক্বারী আল- হানাফী, শরহু কিতাবিল ফিকহিল আকবার; পৃ. ২২৫।
১১৯. ক্বাযী ছানাউল্লাহ পানিপথি, প্রাগুক্ত; ৩/৬-৮।
১২০. মাওলানা মুহাম্মদ নূর কেলীম, ব্রেলভী মাযহাব আওর ইসলাম; (ফয়সল আবাদ: মাকতাবাতু দ্বারুল 'উলুম ফয়দে মুহাম্মদী, সংস্করণ বিহীন, সন বিহীন), পৃ. ৭৬।
১২১. তদেব।