📄 শিরক থেকে পরিত্রাণের উপায়
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,
﴿الر كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِ رَبِّهِمْ إِلَى صِرَاطِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ﴾ (سورة إبراهيم: 1) 'এ কিতাব যা তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি যাতে তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের নির্দেশে অন্ধকার থেকে নিয়ে আসতে পার আলোর দিকে।' [সূরা ইব্রাহীম (১৪):১]
১. ইসলামের মৌলিক জ্ঞান প্রদানের ব্যবস্থা করা: আমাদের দেশে যারা শির্ক, বিদআত ও কুসংস্কার চর্চাকারী, যেমন মাযার ও অবৈধ খানকাহ সেবী এবং সেখানে গমনকারীদের মধ্যে শতকরা ৯৯ জনের রয়েছে জ্ঞানগত সমস্যা। তাদের বিভ্রান্তির এটা অন্যতম প্রধান কারণ। এ জন্য দেশের মাদরাসাগুলোতে বিশুদ্ধ ইসলামী আক্বীদা বিষয়ক শিক্ষা বেশি করে দিতে হবে।
২. শির্ক চিহ্নিত করা: এ সমাজের অধিকাংশ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ইসলামী দিক নির্দেশনার জ্ঞান এবং আক্বীদা বিষয়ক ন্যূনতম জ্ঞানের অভাবে প্রায় ৯৫% জন শিরকে লিপ্ত। তারা জানে না যে, চিন্তা ও কর্মের কোনটি শিরকের অন্তর্ভুক্ত। তাই সমাজ হতে শির্ক মূলোৎপাটনের জন্য প্রয়োজন তা চিহ্নিত করা।
৩. শিকের ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষতির দিক তুলে ধরা: সমাজ থেকে শির্ক মূলোৎপাটনের অন্যতম প্রক্রিয়া হল মানুষের নিকট শিরকের ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষতির দিক সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা। তাদের ধর্মীয় জ্ঞান স্বল্পতার সুযোগকে পুঁজি করে ধর্মের ছদ্মাবরণে প্রতারক শ্রেণী তাদেরকে শিরকে লিপ্ত করে এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই, এ শ্রেণীর মানুষের কাছে ধর্মীয় ও আর্থ-সামাজিক দিকে থেকে শিরকের ক্ষতির বিষয়টি বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব হলে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে বলে মনে হয়। কেননা, সাধারণ মানুষ সব সময়ই শান্তিপ্রিয় হয়ে থাকে। তারা সামর্থের মধ্যে সমাজ থেকে শোষণ দূর করে শান্তি- সমৃদ্ধি আনয়নের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে থাকে। তাই মানুষকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে চরিত্রবান হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। সুতরাং শিকের অসারতা প্রমাণ করা এবং মানুষকে ধর্মীয় ও আর্থ-সামাজিক বিষয়ে সচেতন করা, আজ বড়ই প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে লুথার কিং-এর কথাটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন,
'বিপুল সম্মান ও মনোরম প্রাসাদের মধ্যে কোন দেশের উন্নতি নিহিত থাকে না; বরং তা নির্ভর করে শিক্ষা-দীক্ষায় উন্নত চরিত্রবান অধিবাসীদের ওপর।'
৪. সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা: সমাজ থেকে শির্ক উৎখাত করার জন্য সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা সময়ের দাবী। অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে শায়খ সুলায়মান আত্-তামীমী (রাহি.) মুসলিম সমাজ হতে শির্ক উৎখাত করার প্রবল আন্দোলন শুরু করেন। আরবের বাইরেও এ আন্দোলন বিস্তার লাভ করে। ফলে ১৮০২-১৮০৬ ঈসায়ী সালের মধ্যে কারবালা, মক্কা, মদীনা প্রভৃতি স্থান থেকে অনেক তথাকথিত পবিত্র স্থান ও মাযার ধংসের মাধ্যমে শিক্কের মূলোৎপাটিত হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের ইতিহাসে সৈয়দ আহমদ শহীদ ও তাঁর অনুসারী শাহ ইসমাঈল শহীদ এবং শারাফত আলী প্রমূখ বিজ্ঞ আলিমগণ অশেষ সংস্কার সাধন করেন। হাজী শরীয়তুল্লাহ ১৮০৪ ঈসায়ী সালে এক সংস্কার আন্দোলন শুরু করেন। তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র দুদু মিয়া সেই আন্দোলন চালিয়ে যান। আজও সে আন্দোলনের প্রভাব আমরা প্রত্যক্ষ করছি। সে ধারাবাহিকতায় আজও সরকার, উলামায়ে কিরাম ও সমাজের সর্বস্তরের মুসলিম জনসাধারণ সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।
৫. কুরআন ও হাদীস থেকে সরাসরি জ্ঞান অর্জনের অভ্যাস গড়ে তোলা: আমাদের দেশের শিক্ষিত বা অশিক্ষিত মানুষ নির্বিশেষে পড়ার অভ্যাস খুবই কম। তারা প্রায় সকলেই লোক মুখে দ্বীন জানতে চেষ্টা করে থাকে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী জানা যায়, কুরআন শুধু পড়তে জানেন এমন মুসলিমের সংখ্যা শতকরা ৪০জন। তাদের মধ্যে নিয়মিত তিলাওয়াতকারীর সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকজন। তারপরও দ্বীনী বিষয় অধ্যয়নের অভ্যাস একেবারেই কম। এমনকি আলিমদের মধ্যেও এ অভ্যাস অত্যন্ত কম। অবশ্য এ পেছনে কিছু ঐতিহাসিক কারণও জড়িত। তা হল, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ন্যায় এ দেশে ইসলাম এসেছিল মুসলিম আরব বণিক ও কিছু দাঈ তথা মুহাদ্দিছ ওলামায়ে দ্বীনের মাধ্যমে। পরবর্তীতে দরবেশ শ্রেণীর মাধ্যমে। তাঁরা নসিহাত ও ব্যক্তি জীবনে আচরিত আমল দ্বারা মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করেছেন এবং মানুষেরা তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইসলাম কবুল করেছেন। ফলে, ইসলাম গ্রহণের পূর্বেও তারা যেমন কুরআন-হাদীস পাঠ করার সুযোগ পায়নি এবং ইসলাম গ্রহণের পরেও তাদের মধ্যে কুরআন-হাদীস অধ্যয়নের অভ্যাস গড়ে ওঠেনি। এ কথা বলা যেতে পারে যে, এ দেশে ইসলামের আগমন কিতাবের মাধ্যমে নয়, বরং ব্যক্তি মানুষের আচরিত কাজ-কর্মের ও মুখের মাধ্যমে। যে কারণে এ দেশের মানুষ কুরআন-হাদীসের সাথে সরাসরি পরিচিত হয়নি। একই কারণে আক্বীদা বিষয়ক ত্রুটি বিচ্যুতিও তাদের মাঝে বেশি পরিমাণে লক্ষ্য করা যায়। বর্তমান সময়ে উপরোক্ত ত্রুটি ও ভ্রান্তিতা মুক্তির জন্য প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব প্রত্যহ যত বেশি সম্ভব কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদীস অধ্যয়ন করা। আরবীর সাথে এর অর্থ ও বিশুদ্ধ তাফসীর অধ্যয়ন করা। এ অধ্যয়ন আমাদেরকে সমাজের অগণিত খেলাফে' সুন্নাত জানার সুযোগ সৃষ্টি করে দেবে। হৃদয়ে রাসূল () এবং তাঁর সাহাবীদের প্রতি ভালবাসা সুদৃঢ় করবে।
৬. সুন্নাতের যথাযথ অনুসারী হওয়া:
এক কথায় আমাদের হৃদয় ও জ্ঞান জগৎ সর্বদা ব্যস্ত থাকবে রাসূল ()-এর প্রকৃত তথা বিশুদ্ধ সুন্নাত জানার চেষ্টায়, আর আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যস্ত থাকবে তাঁর সুন্নাতের অনুসরণ ও অনুকরণের চেষ্টায়। এভাবেই আমরা সাহাবীদের অনুরূপ অনুসরণ ও অনুকরণ প্রিয়তা কিছুটা হলেও অর্জন করতে পারব। এর মধ্যেই দ্বীনের বিশুদ্ধতা রক্ষা করা সম্ভব। দ্বীনের মধ্যে অনুপ্রবিষ্ট সকল শির্ক ও বিদআত দূরীকরণ কেবলমাত্র এর মাধ্যমেই সম্ভব। মুসলিমরা যতদিন সুন্নাতের অনুসারী ছিল, ততদিন তাদের মধ্যে বিশুদ্ধ দ্বীন বর্তমান ছিল। এর মহব্বত কমতে থাকার ফলে শিক্ক বিদআত আমাদের প্রিয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এটাকেই আমরা দ্বীন হিসেবে মনে করছি। প্রকৃত কথা হচ্ছে মুসলিম সমাজে শির্ক-বিদআত জন্ম নিয়ে একটি করে ইবাদতের পদ্ধতি ও সুন্নাত দূরীভূত হয়। শির্ক সকল গোমরাহীর মূল। তাই শিক্ক মূল্যেৎপাটনের জন্য আমাদেরকে সুন্নাতের যথাযথ অনুসরণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, দুনিয়ার কোন পীর-বুযুর্গ-মুরব্বী নয়, কোন ক্ষমতাশালী পণ্ডিত নয়; কেবলমাত্র আল্লাহর রাসূল () এবং তাঁর সাহবীগণ আমাদেরকে যা নির্দেশ করেছেন, তার বাইরে কোন কাজ করা তো দূরের কথা, চিন্তাও আমরা করব না। তবেই আমাদের চিন্তা ও কর্মকে শির্ক মুক্ত রাখতে সক্ষম হব।
শিকের মূলোৎপাটন প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের রূপরেখা
আমাদের দেশের দেশের মাজার, খানকাহ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মুসলিমদের চিন্তা ও কর্ম হতে শির্ক মূলোৎপাটনের জন্য নিম্নলিখিত উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে:
প্রথমত, উলামা-ই-কিরামগণের সম্ভাব্য ভূমিকা: পীর-মাশায়েখ ও উলামা-ই-কিরামগণ সমাজ বিচ্ছিন্ন কোন জীব নয়, নয় নিছক পরকালীন ভাবনায় নিয়োজিত কোন দূর জগতের বাসিন্দা। সমাজের আর দশ জন মানুষের সাথেই তাঁরা বসবাস করেন। দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি তাঁদের দায়িত্ব রয়েছে। তাঁরাই আমাদের সমাজের দ্বীনী বিষয়ে নেতৃত্ব প্রদান করে থাকেন। মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও অনুষ্ঠানসমূহের পরিচালক হিসেবে এখনও তাঁরাই দায়িত্ব পালন করেন। মানুষ ইসলাম সম্পর্কে জানার জন্য তাঁদের শরণাপন্ন হয়ে থাকে- এ দিক হতে তাঁরা অঘোষিত পরিচালক। এমনকি জাতীয় প্রচার মাধ্যমে ও পত্র-পত্রিকায় ধর্মীয় বিষয়গুলো অনেক সময় তাঁদের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়ে থাকে। মোটকথা, এ দেশের মানুষ ইসলাম সম্পর্কে তাঁদের নিকট থেকে সঠিক দিক-নির্দেশনা পেয়েছে; আবার মানুষের বিভ্রান্তিতে নিপতিত হওয়ার অন্যতম কারণও পীর-মাশায়েখ, আলম-উলামা, ইসলামী পণ্ডিত নামের কতিপয় ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর অপতৎপরতা। আমরা লক্ষ্য করেছি, ইতোপূর্বে মুসলিম উম্মাহ্র রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের মধ্যকার দ্বন্দ্ব মুসলিমদের শক্তি, সামাজিক কাঠামো, চিন্তাধারা এবং প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে ধ্বংসের সূচনা করে। কালক্রমে ইসলাম তার প্রাণশক্তি আর ধরে রাখতে পারেনি। ফলে, ইসলামের বাদবাকী অংশটুকু শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক শিক্ষা হিসেবে শতাব্দীর পর শতাব্দি ধরে টিকে আছে। এ তিক্ত ফাটল মুসলিম উম্মাহ্র মাঝে সব ধরনের ব্যবহারিক এবং সামাজিক দায়িত্ব থেকে ধর্মীয় নেতৃবৃন্দকে দূরে সরিয়ে রাখে। এক পর্যায়ে মুসলিমদের মন আবদ্ধ হয়ে যায় কেবল মসজিদের সীমাবদ্ধ গণ্ডিতে। চলতে থাকে কুরআন-হাদীসের শাব্দিক বিশ্লেষণ ও তরজমা। এটা মূলত দেশের শাসকমণ্ডলীর চরিত্র নষ্ট হওয়ার কারণেই নিরীহ সাধারণ জনগণের চরিত্রের অবনতি হয়ে থাকে। আর শাসকগোষ্ঠীর চরিত্র কলুষিত হওয়ার একটিমাত্র কারণ দেশের আলিম সমাজের চরিত্রহীনতা, অর্থলিপ্সা এবং নাম-যশের প্রতি অসাধারণ লোভ-লালসা। আসলে, কুরআন ও সহীহ হাদীসের ভিত্তিতে আলিম সমাজ নিজেদের মধ্যে অনৈক্য দূর করে শির্ক মূলোৎপাটনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে সময়োপযুগী ভূমিকা পালন করা তাঁদের ঈমানী দায়িত্ব। এ পর্যায়ে আমাদের দেশে শির্ক মূলোৎপাটনে উলামা-ই-কিরামগণের সম্ভাব্য ভূমিকা নিম্নে আলোচনা করা হল:
১. মসজিদ কেন্দ্রীক সংস্কারমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা: মসজিদ থেকে সর্বপ্রথম এ ব্যাপারে সংস্কারমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে মসজিদে নিয়মিত মুসল্লী ও তার প্রতিবেশীদের ব্যক্তিগঠন ও বিকাশের জন্য ইসলামী আদর্শকে মডেল হিসেবে সামনে রাখতে হবে। ইসলামের সঠিক আক্বীদা ও বিশ্বাসের যথাযথ তালিম মসজিদ থেকেই প্রদান করতে হবে। সমাজে বসবাসরত সকল প্রাপ্ত বয়স্ক মুসলিমকে প্রত্যহ পাঁচবার নিয়মিত মসজিদমুখী করার মধ্যেই সংস্কার কাজের সফলতা নির্ভর করছে। কারণ, নিশ্চয়ই সালাত অশ্লীল ও মন্দকাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখে। আর তাওহীদের সাক্ষ্য প্রদানের অন্যতম মাধ্যম হল সালাত। তাই সমাজকে শির্ক ও বিদআতমুক্ত করতে সালাত তথা মসজিদ কেন্দ্রীক উদ্যোগ সফলতা বয়ে আনতে পারে। রাসূল () ও সাহাবীগণের জীবনী পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পারি, তাঁরা তাওহীদের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্য মসজিদকেই বেছে নিয়েছিলেন। মুসলিমরা যেখানেই গিয়েছে সেখানেই সর্বপ্রথম মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছে। এ মসজিদকে ঘিরেই সেই এলাকার মানুষকে দিয়েছে দ্বীনী তালিম, দূর করেছে শির্ক ও বিদ'আতের নানা কলুষতা। সমাজের মানুষের নৈতিক উন্নয়ন সাধনের জন্য ইসলামী নৈতিকতার তালিম দিতে হবে।
২. শিকের ভয়াবহতা তুলে ধরা: এ দেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে তাদের একটা অন্ধ আবেগ কাজ করে থাকে। ইবাদত সম্পর্কে তাদের সুস্পষ্ট ধারণা না থাকার ফলে ইসলামের নামে প্রচলিত যেকোন কাজকেই ইবাদত মনে করে। শরীআতের বিধি-নিষেধ পালন না করেই আধ্যাত্মিক উন্নতির আশায় বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বনের চেষ্টা করে। এর বিভিন্ন স্তর সম্পর্কে নানামুখী ধারণা তারা লাভ করে। এ বিষয়ে সঠিক ধারণা দেয়া অত্যন্ত জরুরী। দীর্ঘকাল ধরে আমাদের দেশে ইসলামের প্রচার-প্রসারের জন্য ওয়াজ-মাহফীল, ধর্মসভা ইত্যাদি নামে নানা অনুষ্ঠান পালিত হয়ে আসছে। অধিকাংশ সময়ই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর উদ্যোগে এ জাতীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। এ সকল অনুষ্ঠান সমাজের মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। উলামায়ে কিরাম সেখানে সম্মানিত অতিথি এবং আলোচক হিসেবে হাজির হন। উপস্থিত মুসলিম ও আয়োজকরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে তাঁদের কথা ও দিক-নির্দেশনা শোনার জন্য। এখন প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ নিয়ে আমাদের সমাজ দেহে সংক্রমিত শিরক, বিদআত ও কুসংস্কারগত রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
৩. জনমত গঠন করা: আজকের সমাজ ব্যবস্থায় মানুষ অতীতের যেকোন সময়ের তুলনায় সচেতন। সমাজে বসবাসকারী মানুষের অন্ধ আনুগত্যের চেয়ে ক্রমান্বয়ে যাচাই-বাছাইয়ের পরেই অনুকরণ করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারের সাথে সাথে পরিবার ও সমাজে মানুষের আন্তরিক সম্পর্কেরও পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। এমতাবস্থায় শিককে পর্যায়ক্রমিক মূলোৎপাটনের জন্য সচেতন মুসলিমদের সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। এক পর্যায়ে তা আন্দোলনের রূপ নিলেই সফলতার মুখ দেখতে পারবে।
৪. দ্বীন প্রচারে সাবধানতা অবলম্বন করা: শির্ক ও বিদআতের সাথে দূরতম সম্পর্ক আছে বা এর পথ সুগম করতে পারে এমন সকল কার্যাদি সতর্কতামূলকভাবে পরিত্যাগ করা এবং এমন কাজও পরিহার করা পরবর্তী পর্যায়ে যা থেকে শির্ক সংক্রমিত হতে পারে। কেননা, মানুষের চিন্তা ও কর্মে একবার কোন কাজের সূচনা হলে তা দূর করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে ঐ কাজ মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। কাজটি অসত্য ও যুক্তিহীন হলেও এক পর্যায়ে তা প্রতিষ্ঠা পায় এবং বড় হতে থাকে। তাই উলামায়ে কিরামকে এ ব্যাপারে অত্যন্ত সাবধানতার সাথে অগ্রসর হওয়া একান্ত আবশ্যক।
৫. বিশুদ্ধ আক্বীদা বিষয়ক জ্ঞান দান করা: ইসলামী আক্বীদা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও বিশুদ্ধ ধারণা থাকা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অপরিহার্য। তাদের ঈমানী দৃঢ়তা ও তার দাবী পূরণে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞানের বিকল্প নেই। প্রতিটি মুসলিমের দ্বীনি দায়িত্ব কর্তব্য পালনের গ্রহণযোগ্যতা এবং তার পারলৌকিক প্রাপ্তিও এর ওপর নির্ভরশীল। আমাদের দেশের মুসলিমদের দ্বীনী ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দৈন্যতা আক্বীদার বিষয়ে। তাই আলিম সমাজের দায়িত্ব সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশুদ্ধ আক্বীদা বিষয়ক জ্ঞানের প্রসার ঘটানোর জন্য কার্যকরী পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র ও সরকারের সম্ভাব্য ভূমিকা: আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা সমাজ ও নাগরিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এর জন্য রয়েছে আইন ও শাসনের রশি। তাই সমাজ থেকে শির্ক মূলোৎপাটনে রাষ্ট্র ও সরকার উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।
১. উলামায়ে-কিরামের সমন্বয়ে জাতীয় বোর্ড গঠন করা: বর্তমান সময়ে ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করার ভার এমন সব লোকের ওপর পড়েছে, যাদের অধিকাংশই ইসলাম সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান রাখেন না। ইসলামের আধুনিক অভিভাবকগণ নিজেদেরকে জ্ঞানী মনে করেন। কিন্তু বাস্তবতার মুখোমুখি হতে আগ্রহী নয়। আর ঘটনাচক্রে মুখোমুখি হলেও তার উপযুক্ত সমাধান দিতে পারেন না। তাঁরা ইসলামের প্রয়োগমুখী ব্যবহার সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিফহাল নন। তাই সমাজ সংস্কারের লক্ষ্যে দেশের বরেণ্য উলামায়ে-কিরামের সমন্বয়ে একটি বোর্ড গঠনমূলক জাতীয়ভাবে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন।
২. পাঠ্যক্রমে আক্বীদা বিষয়ক সিলেবাস অন্তর্ভুক্ত করা: দেশের শিক্ষা পাঠ্যক্রমের সকল পর্যায়ে আক্বীদা বিষয়ক জ্ঞান দানের লক্ষ্যে মৌলিক বিষয়সমূহ অন্তর্ভুক্ত করা। আক্বীদা বিষয়টির ত্রুটিপূর্ণ ও সীমিত চর্চার কারণে মুসলিমদের আক্বীদা বিশ্বাসে রয়েছে ঈমান বিধ্বংসী মারাত্মক ত্রুটি। বিশ্বাসের মধ্যে ত্রুটি থেকে গেলে যাবতীয় কাজের মধ্যে তার ক্ষতিকর প্রভাব প্রতিফলিত হতে বাধ্য। এ কারণেই এখানকার মুসলিমদের মধ্যে কবর পূজা, পীরপূজা, মাযার পূজার এবং শির্ক-বিদআতের মহামারী ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোকের বিশ্বাস হচ্ছে, কোন ব্যক্তিবিশেষকে উসীলা (মাধ্যম) না বানালে ঈমান ঠিক হবে না, আখিরাতে পার পাওয়া যাবে না এবং জান্নাতে প্রবেশ অসম্ভব হয়ে পড়বে। অথচ এ মধ্যস্বত্বভোগীদের উৎখাতের জন্যই ইসলামের আগমন। অথচ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসাসমূহের পাঠ্যপুস্তকে এ সংক্রান্ত আলোচনা নেই বললেই বলে। অতএব স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার পাঠ্য বইয়ে আক্বীদা বিষয়ক সিলেবাস অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে সরকারের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরী।
৩. প্রচার মাধমে জনসচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করা: ইংরেজীতে বলা হয়, 'Information is power' অর্থাৎ 'তথ্যই শক্তি'। মানুষের আক্বীদা পরিবর্তনে প্রচার মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই সরকার প্রচার মাধ্যমের দ্বারা শির্ক মূলোৎপাটনে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারে।
৪. মাযার ও খানকাসহ কবরপূজার অবৈধ স্থাপনা ধ্বংস করা: বর্তমান সময়ে মাযার ও খানকাহসমূহে শরীয়াত বিরোধী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অশিক্ষিত এবং অল্প শিক্ষিত মানুষদের ধোঁকা দিয়ে মাযার ও খানকায় ধর্ম ব্যবসা শুরু হয়েছে। তাই সরকারী হস্তক্ষেপে মাযার, খানকা, মূর্তি, ভাস্কর্য, স্মৃতিসৌধ ও কবরপূজার সকল উৎসমূলসহ শির্কের ভিত্তিকে ধ্বংস করতে হবে।
৫. রাষ্ট্রীয় বিশেষ নির্দেশ জারি করা: বর্তমান সময়ে মানুষ রাষ্ট্রীয় বিশেষ নির্দেশের প্রতি মর্যাদাশীল। তাই শির্ক মূলোৎপাটনের জন্য রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করা জরুরী।
তৃতীয়ত, যুব সমাজের ভূমিকা: সব যুগে সব সমাজেই যুব সমাজ চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে থাকে। তারা সমাজের ভাঙ্গা গড়ার নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। সমাজের ভাল ও মন্দ অনেকাংশে তাদের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের যুব সমাজের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ইসলামী জীবনাদর্শে বিশ্বাসী। আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনের যুগেও তারা এ দেশে আসমানী কিতাবের অনুসরণে ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্নে বিভোর। তাই তারা সমাজ থেকে শির্ক মূলোৎপাটনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।
চতুর্থত, সাধারণ মুসলিমদের ভূমিকা: ১. আক্বীদা বিষয়ক জ্ঞান আহরণ করা: সাধারণ মুসলিমরা আক্বীদা বিষয়ক জ্ঞান আহরণের মাধ্যমে শির্ক মূলোৎপাটনে ভূমিকা রাখতে পারে। ২. সরকার ও উলামায়ে-কিরামকে সাহায্য করা: শির্ক উৎখাতের জন্য সাধারণ মুসলিমগণ সরকার ও উলামাগণকে সহযোগিতা করতে পারে।
৩. সামাজিক সংস্কার আন্দোলন গড়ে তোলা: আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি থেকে শিক উৎখাতের জন্য সামাজিক সংস্কার আন্দোলন গড়ে তোলা আবশ্যক।
পঞ্চমত, শিক্ষিত মুসলিমদের ভূমিকা: দেশের শিক্ষিত মুসলিমদের দায়িত্ব সব সময়ই বেশি হয়। সাধারণ মানুষেরা তাদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। তাই শিক মূলোৎপাটনে শিক্ষিত মুসলিমগণ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।
ষষ্ঠত, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সংগঠনসমূহের ভূমিকা শিক্ একটি মারাত্মক ব্যাধি। তাই সমাজ থেকে শিক্ উৎখাতের জন্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সংগঠনসমূহকে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে।
প্রস্তাবনা: ১. ইমামগণ মুসলিমদেরকে মসজিদকেন্দ্রীক করা, শিরকের দুনিয়া ও আখিরাতের কুফল বর্ণনা করা, মানুষকে শির্ক বর্জন করার জন্য উদ্বুদ্ধকরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারেন। ২. ইসলামী শরীয়াহ অসমর্থিত মাযারকেন্দ্রীক গড়ে ওঠা সকল স্থাপনা ভেঙ্গে দিতে হবে। ৩. আক্বীদা বিষয়ে জাতীয় প্রচার মাধ্যমগুলোতে প্রচারের ব্যবস্থা করা। ৪. সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও আলোচনা সভার আয়োজন করে শিরকের কুফল তুলে ধরা। ৫. মানুষের চিন্তা ও কর্মে বিদ্যমান শিকগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে এবং এর উৎসগুলো বন্ধ করতে হবে। ৬. মুসলিমদের মাঝ থেকে বিশুদ্ধ আক্বীদা বিষয়ক জ্ঞানের অভাব দূর করতে হবে।
টিকাঃ
১. বিস্তারিত দেখুন, শিরক কী ও কেন?, পৃষ্ঠা ২২৯-২৬৫।
📄 উপসংহার
খালেস ঈমান তথা সঠিক আক্বীদা মুসলিম জীবনের মূল বুনিয়াদ। এ বুনিয়াদের উপকরণে কলুষ, কালিমা ও ভেজালের অনুপ্রবেশ ঘটলে সমস্ত 'আমল বরবাদ ও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য। অন্যভাবে বলতে গেলে, মূলোৎপাটিত বৃক্ষের মাথায় পানি দিলে যেমন কোন ফল লাভ হয় না, ঠিক তেমনি আক্বীদা বিশুদ্ধ না হলে ব্যক্তি হয়ে যাবে 'আমল শূন্য। তাই আক্বীদার সংশোধনই হওয়া উচিত সর্বপ্রথম। তাছাড়া, জান্নাতে যাওয়া ও না যাওয়া নির্ভর করে মূলত আক্বীদা বিশুদ্ধ হওয়ার উপর। যদি আক্বীদা বিশুদ্ধ হয় তবে জান্নাতে যাওয়া সম্ভব, আর যদি আক্বীদা অশুদ্ধ হয় তবে জান্নাতে যাওয়ার প্রবেশাধিকার পাওয়া অসম্ভব।
তাই, একজন মুসলিমের জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন তার আক্বীদা বিশুদ্ধ হওয়া এবং বিশুদ্ধ আক্বীদা পোষণের মাধ্যমেই কেবল সে দ্বীনের ক্ষেত্রে সফলতা লাভ করতে পারে। ঈমান ও আক্বীদা সংক্রান্ত বিষয়সমূহ কুরআনে এবং এর ব্যাখ্যাস্বরূপ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সহীহ হাদীছে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীকালে পৃথিবীতে প্রচলিত বাতিল ধর্মমত এবং বিশেষত গ্রীক দর্শনের কুপ্রভাবে মুসলিমদের ঈমান ও আক্বীদায় বিভ্রান্তির মায়াজাল ছড়িয়ে পড়ে। তারই ফলশ্রুতিতে, অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় হলেও, মুসলিম সমাজে অন্যান্য বিষয়ের ন্যায় ঈমানীয়তের মূল 'আক্বীদা' সংক্রান্ত ব্যাপারেও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয় এবং নানা ভ্রান্ত মতবাদের উদ্ভব ঘটে। এভাবে অখণ্ড মুসলিম সমাজে পরস্পর বিরোধী মতবাদের টানাপোড়নে সংশয় ও সংঘাত দেখা দেয়। আক্বীদায় সীমালংঘন ও বাড়াবাড়ী প্রশ্রয় প্রাপ্ত হয়। এ সকল সংশয় ও সংঘাত নিরসন এবং সীমালংঘন ও বাড়াবাড়ির প্রতিরোধ করার মাধ্যমে মুসলিমদের আক্বীদাকে সঠিক ও কলুষমুক্ত রাখার জন্য ইসলামের অবিমিশ্র মত ও সঠিক পথের অনুসারী আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের প্রকৃত বিদ্বানগণ সময়ের প্রয়োজনে আবির্ভূত হন এবং আক্বীদার ব্যাপারে সৃষ্ট সমূদয় ধূম্রজাল ছিন্ন করে কুরআন ও সহীহ হাদীছের আলোকে সঠিক ও নির্ভেজাল বহু গ্রন্থ রচনা করেন।
আজ ভ্রান্ত আক্বীদা পোষণকারীদের অপপ্রচারে এ দেশে শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে বৃহত্তর মুসলিম সমাজ ব্যাপক আকারে বিভ্রান্তির শিকারে পতিত হয়েছে। গোটা বাংলাদেশের মুসলিমরা দিবানিশি শির্ক ও কুফরীযুক্ত শত-সহস্র কুসংস্কার ঘেরা এক স্বপ্নিল জীবন-যাপন করে। কাজেই অজ্ঞ ও শিক্ষিত সকলেই যে কুসংস্কারে থাকবে সর্ববিষয়ে তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। শির্ক ও কুসংস্কারের প্রতি এ মোহমুক্তি না ঘটলে মুসলিমরা কখনোই স্ব-ধর্মের আলোকোজ্জ্বল পথ তথা কুরআন ও সহীহ হাদীসের পথের সন্ধান পাবে না। শির্ক, বিদআত ও কুসংস্কারের চর্চা গোমরাহী ছাড়া আর কিছুই না।
অথচ, শির্ক সবচেয়ে বড় অপরাধ। আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণার বিষয়। অন্যান্য গুনাহ তিনি ইচ্ছা করলে ক্ষমা করে দিবেন, কিন্তু শির্কের অপরাধ তিনি ক্ষমা করবেন না। এর মূল কারণ হল, শির্ক হচ্ছে মূলত আল্লাহর সাথে কাউকে অংশীদারিত্বের আক্বীদা পোষণ করা। শির্কের মাধ্যমে আল্লাহর নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হয়। এ কারণেই শির্ক জঘন্যমত অপরাধ। অন্যান্য কবীরা গুনাহে আল্লাহর একক প্রভুত্ব ও নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হয় না। সেখানে হয় আদেশ লংঘন। কিন্তু শির্কে আল্লাহর একক প্রভুত্ব ও নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হয়। শির্ক ও অন্যান্য গুনাহের মধ্যে এটাই হচ্ছে মৌলিক পার্থক্য।
আরেকটি পার্থক্য হল, অপরাপর কবীরা গুনাহে গুনাহগারের মনে অপরাধবোধ কাজ করে। এ অপরাধবোধ এক সময় তাকে অনুতপ্ত করে তোলে, ফলে সে তওবা করে। সকল ধরনের কবীরা গুনাহের ক্ষেত্রেই এ সম্ভাবনা আছে। কিন্তু শিরকের ক্ষেত্রে এ সম্ভাবনা নেই। যে শির্ক করে তার মধ্যে অপরাধবোধ সৃষ্টি হওয়ার কোন সুযোগ থাকে না। সে তো তা করে থাকে নেকবোধ নিয়েই। তার বিশ্বাস, সে যা করছে তাতে তার দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ হবে। সে যা করছে, তা যে অপরাধ, এ বোধ তার মধ্যে কখনো সৃষ্টি হয় না। যে মদ পান করে, সে জানে যে, সে মদ পান করে। যে ব্যভিচার করে, সে জানে যে, সে ব্যভিচার করছে। যে মিথ্যা বলছে, সে জানে যে, সে মিথ্যা বলছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, যে শির্ক করছে সে জানে না যে, সে শির্ক করছে। ফলে তার মধ্যে কখনো পাপবোধ সৃষ্টি হয় না। কখনো সে মনে করে না যে, সে এমন একটি কাজ করে যাচ্ছে যাতে আল্লাহ অসন্তুষ্ট। তার ধারণা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তাই সে কখনো তাওবা করার সুযোগ পায় না। আর এ অবস্থায় তার জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।
অতএব, তাওহীদী আক্বীদাকে সকল প্রকার কুফরী, শির্ক্বী ও বিদআতী আক্বীদা হতে পরিচ্ছন্ন করা ব্যতীত সত্যিকারের মুমিন হওয়ার কোন পথ নেই। দেহের জন্য যেমন বিষাক্ত খাবার ক্ষতিকর রূহের জন্য তেমনি ঐসব বিষাক্ত আক্বীদা অত্যন্ত ক্ষতিকর যার চূড়ান্ত পরিণাম জাহান্নাম।
📄 সহায়ক গ্রন্থপুঞ্জী
১. অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, তাফসীর তাইসীরুল কুরআন, (ঢাকা: তাওহীদ পাবলিকেশন্স, প্রকাশকাল: ২০০৭ ঈসায়ী)।
২. ইমাম বুখারী, সহীহুল বুখারী (১-৬), (ঢাকা: তাওহীদ পাবলিকেশন্স, প্রকাশকাল: ২০০৭ ঈসায়ী)।
৩. Tafsir Ibn Kathir (1-10), (Darussalam Publication, Riyad, Saudi Arabia)।
৪. ড. আবু আমীনাহ বিলাল ফিলিন্স, তাওহীদের মূল নীতিমালা, (ভাষান্তর: ইঞ্জি. মুহাম্মাদ হাছান; ঢাকা: তাওহীদ পাবলিকেশন্স; প্রকাশকাল: ২০০৮ ঈসায়ী)।
৫. সালিহ আল-উছায়মীন, ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম, (তাওহীদ পাবলিকেশন্স, ঢাকা, বাংলাদেশ; প্রকাশকাল, ২০০৭ ঈসায়ী)।
৬. মুহাম্মাদ বিন জামীল যাইনু, মুক্তিপ্রাপ্ত দলের পথ নির্দেশিকা, (তাওহীদ পাবলিশেন্স, ঢাকা, বাংলাদেশ।)।
৭. আবু তাহের বর্ধমানী, পীরতন্ত্রের আজবলীলা, (তাওহীদ পাবলিশেন্স, ঢাকা, বাংলাদেশ।)।
৮. শফীউর রহমান মুবারাকপুরী, আর-রাহিকুল মাখতুম, (তাওহীদ পাবলিকেশন্স, ঢাকা, প্রকাশকাল ২০০৯ ঈসায়ী)।
৯. ড. মুহাম্মাদ মুয্যাম্মিল আলী, শিরক কী ও কেন, (তাওহীদ পাবলিকেশন্স, ঢাকা; প্রকাশকাল: ২০০৭ ঈসায়ী)।
১০. ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, ইসলামী আক্বীদা, (আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স, ঝিনাইদহ।)।
১১. ঐ, এহইয়াউস সুনান।
১২. ড. মুহাম্মাদ বিন আব্দুর রহমান আল-উরাইফী, তাওহীদের কিশতী, (ঢাকা: আন্-নূর ইসলামিক লাইব্রেরী, প্রকাশকাল: ২০০৮ ঈসায়ী)।
১৩. মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল ওয়াহ্হাব, কিতাবুত তাওহীদ ও এর ব্যাখ্যা, (ঢাকা: আন্-নূর ইসলামিক লাইব্রেরী, প্রকাশকাল: ২০০৯ ঈসায়ী)।
১৪. ওয়ামী, সাহিত্য-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে শিরকের প্রভাব, (ওয়ামী বুক সিরিজ-২৫; প্রকাশকাল: জানুয়ারী ২০০৭)।
১৫. হাফেজ মাহমুদুল হাসান, কবর ও মাযার কেন্দ্রিক শিরক, বিদআত ও কুসংস্কার, (ওয়ামী বুক সিরিজ-৬, প্রথম প্রকাশ: মে-২০০৪)।
১৬. মাওলানা আব্দুর রহীম, আল-কুরআনের আলোকে শির্ক ও তাওহীদ, (ঢাকা: খায়রুন প্রকাশনী, ৩য় প্রকাশ ১৯৯৯)।
১৭. মাওলানা রফিকুল ইসলাম, তাসাউফের মর্মকথা, (ইমাম ফাউন্ডেশন, ৫০ বাংলাবাজার, ঢাকা)।
১৮. অধ্যাপক এ. এফ. ছাদুল হক ফারুক, পীরবাদের বেড়াজালে ইসলাম, (আল-ফুরকান পাবলিকেশন, ৪৯১ বড় মগবাজার, ঢাকা)।
১৯. মুহাম্মাদ আব্দুল মজীদ, শিরক ও বিদআত, ঐ।
২০. জহুরী, অপসংস্কৃতির বিভীষিকা (১-৩), (তাসনিয়া বই বিতান, ৪৯১/১ বড় মগবাজার, ঢাকা)।
২১. ঐ, শব্দ সংস্কৃতির ছোবল।
২২. মাওলানা মুহা: হেমায়েত উদ্দীন, ইসলামী আক্বীদা ও ভ্রান্ত মতবাদ, (থানভী লাইব্রেরী, ৫০ বাংলাবাজার, ঢাকা)।
২৩. আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ আল-হুয়াইল, সহজ তাওহীদ, (আল মুনীর পাবলিকেশন্স, ৫৫ পুরানা পল্টন, ঢাকা)।
২৪. মমতাজ দৌলতানা, মাযার জিয়ারত, (জ্ঞানকোষ প্রকাশনী, ৩৮/২-ক, বাংলাবাজার, ঢাকা)।
২৫. আইয়ুব হোসেন, সংস্কার নয়, কুসংস্কার, (সুবর্ণ, ১৫০ বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম, ঢাকা)।
২৬. ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রাহি.), মহা উপদেশ, (সালাফী রিসার্চ ফাউন্ডেশন, ধারাবারিষা বাজার, গুরুদাসপুর, নাটোর)।
২৭. আ.ন.ম. রশীদ আহমাদ, প্রশ্নোত্তরে ইসলামী আক্বীদাহ।
২৮. মুহাম্মাদ বিন সুলায়মান আত-তামীমী (রাহি.), ইসলাম ও জাহেলিয়াতের দ্বন্দ্ব।
২৯. ইসলামী বিশ্বকোষ, (ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)।
৩০. সীরাত বিশ্বকোষ, ঐ, ১ম ও ২য় খণ্ড।
৩১. বাংলা পিডিয়া, (বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, প্রথম প্রকাশ: চৈত্র ১৪০৯/মার্চ ২০০৩)।
৩২. বিজ্ঞান জ্যোতিষ সমাজ, বিজ্ঞান-অবিজ্ঞান-অপবিজ্ঞান, (উৎস মানুষ সংকলন)।
৩৩. এটা কি ওটা কেন, (উৎস মানুষ সংকলন)।
৩৪. বিজ্ঞান-অবিজ্ঞান-অপবিজ্ঞান, ঐ।
৩৫. ভবানী প্রসাদ সাহু, সংস্কার-কুসংস্কার।
৩৬. মাসিক আত-তাহরীক, (হাদীস ফাউন্ডেশন, কাজলা, রাজশাহী)।
৩৭. দৈনিক সংগ্রাম, ২৭ অগাস্ট, ১৯৯৭ খ্রি.।
৩৮. দৈনিক ইনকিলাব, ৩ জুলাই, ২০০০ খ্রি.।
৩৯. সাপ্তাহিক মুসলিম জাহান, ১৮-২৪ ডিসেম্বর, ২০০২ খ্রি.।
৪০. দৈনিক আমার দেশ, ১ নভেম্বর, ২০০৮ খ্রি.।