📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 ব্যক্তিজীবনে শিরকের ক্ষতিকর প্রভাব

📄 ব্যক্তিজীবনে শিরকের ক্ষতিকর প্রভাব


শিক্কের কারণে ব্যক্তিজীবনে যে কুফল দেখা দেয় এবং লক্ষ্য বাস্তবায়নে যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তা সংক্ষেপে নিম্নে আলোচনা করা হল:
১. শির্ক মানুষকে বিশ্বাসী হতে বাধা দেয়: মানুষের ব্যক্তিজীবনে শিরকের সবচেয়ে বড় কুফল, মানুষকে একমাত্র আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী ও নির্ভরশীল হতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। আল্লাহ তা'আলার সাথে শির্ক করার কারণে কেউ মুসলিম থাকতে পারে না। সম্পূর্ণ শিকমুক্ত হয়েই একজন মানুষকে কালিমার ঘোষণা দিতে হয়। এ ঘোষণাই তাকে মুমিন হিসেবে গণ্য করে। তাই প্রত্যেক মুসলিমকে তার চিন্তা ও কর্মের সকল পর্যায়ে শিকমুক্ত হওয়া অপরিহার্য।
২. ব্যক্তির স্বকীয়তা বিনষ্ট করে:
শিক্ক করার কারণে মানুষের স্বকীয়তা বিনষ্ট হয়। এর অভাবে মানুষ স্বনির্ভর হওয়ার ক্ষমতা হারায়, হয়ে ওঠে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। অথচ সৃষ্টিগতভাবেই মানুষের মধ্যে যে স্বাধীনচেতা মনোভাব বিদ্যমান, আজকের পীর ও খানকা ব্যবস্থা তা বিলুপ্ত করে। অন্ধ আনুগত্য প্রাপ্তির প্রত্যাশায় মুরীদদের সেভাবে তালিম দিয়ে থাকে। এ ব্যাবস্থার মাধ্যমে সমাজে অতিভক্তি ও অন্ধ আনুগত্যের প্রসার ঘটে। এ ভ্রান্ত ধারণা থেকেই বর্তমান মুসলিম সমাজে 'তবারুক'-এর নামে মাযার, পুকুরের মাছ, পানি, জীব-জানোয়ার ইত্যাদিকে ভক্তি করে। সেখানকার মাটি, পানি, ময়লা ইত্যাদি সংগ্রহ করা ও পবিত্র মনে করা, এগুলোতে রোগ-ব্যাধি ভাল হবে ইত্যাদি বিশ্বাস করা হচ্ছে। আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে এ জাতীয় বিশ্বাস পোষণকারী সামাজিক জীবনে স্থবির প্রকৃতির হয়ে থাকে। পরিবার ও সমাজে তারা দায়িত্বহীন জীবন-যাপন করে।
৩. ব্যক্তির বিকাশ ও সৃজনশীলতা বিনষ্ট করে:
ব্যক্তিত্ববোধ ও সৃজনশীলতা একজন মানুষের অন্যতম সম্পদ। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ব অনেকাংশে এর উপর নির্ভরশীল। পরিবার ও সমাজে ব্যক্তিত্বের কারণেই মানুষের কথা ও কাজের গ্রহণযোগ্যতার হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে থাকে এবং এর অভাবে মানুষ মূল্যহীন হয়ে পড়ে। আর সৃজনশীলতা মানুষের অন্যতম মহৎ গুণ। যোগ্যতার কারণে পৃথিবীর সকল বৈষয়িক উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে। একজন মানুষ শিরকে লিপ্ত হওয়ার ফলে সর্বপ্রথম তার এ গুণ বিনষ্ট হয়ে যায়। সে আল্লাহ ছাড়া সৃষ্ট যেকোন সৃষ্টিকেই উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করতে দ্বিধাবোধ করে না। আর মুক্ত চিন্তা করার অভ্যাস বিনষ্টের কারণে সৃজনশীল চিন্তা-চেতনা ও ক্ষমতা এক পর্যায়ে তাদের থেকে একেবারেই লোপ পায়।
৪. ব্যক্তির মানসিক স্থিতি ও দৃঢ়তা বিনষ্ট করে:
শির্কের কারণে মানুষের মানসিক সুস্থ্যতা ও দৃঢ়তা অর্জন করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। একজন মুশরিককে অনেকের সন্তুষ্টি বিধান করে মুক্তির নিশ্চয়তা লাভ করতে সর্বদা উৎকণ্ঠার মধ্যে কাটাতে হয়। আর মানুষের সামর্থের সীমাবদ্ধতার কারণে এটা তার জন্য অসম্ভব হয়ে যায়। এমতাবস্থায় তার পক্ষে মানসিক স্থিতি ও দৃঢ়তা অর্জন সম্ভব হয়ে ওঠে না।
৫. ব্যক্তির অন্ধত্ব ও গোঁড়ামী বৃদ্ধি করে:
শিরক মানুষের জীবনে অন্ধত্ব ও গোঁড়ামী বৃদ্ধি করে। বিবেকবান মানুষ হিসেবে সত্য গ্রহণের যে উদারতা থাকা অপরিহার্য তা ক্রমান্বয়ে লোপ পেতে থাকে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে অনুসারীদেরকে আনুগত্যের নামে বিভ্রান্ত করে পীর বা কর্তৃপক্ষের গোলামে পরিণত করা হয়। আল্লাহ তা'আলার আনুগত্যের মতোই তাঁদের আনুগত্য করার নির্দেশ দেয়া হয়। 'নিজ পীর ব্যতীত কাউকে শ্রেষ্ঠ মনে না করা, তা নিয়ে চিন্তা করা পর্যন্ত 'নিষিদ্ধ করা' হচ্ছে অধিকাংশ পীর ও খানকার অন্যতম প্রথম সবক। এ ছাড়া 'পীরের সন্তুষ্টিই আল্লাহর সন্তুষ্টি' তালিম বলে দেয়া হয়। পীর সাহেব সকল সমালোচনা উর্দ্ধে। তাঁর কোন ভুল দেখলেও তা বলা যাবে না, তা আদবের খেলাফ। দরবারে বিনা অনুমতিতে কথা বলা বা কোন কাজ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এমনকি নফল ইবাদাতও পীরের অনুমতি ছাড়া করা যাবে না শিখানো হয়।
৬. নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় সৃষ্টি করে: শিরকের কারণে মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় বৃদ্ধি পায়। ইসলামের নামে, ধর্মের নামে এ অবক্ষয় চলতে থাকে। এক সময় আমাদের সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্ব-কর্তব্যের যথাযথ তালিম বিদ্যমান ছিল। কিন্তু ধর্মীয় ক্ষেত্রে শির্ক ও বিদ'আতের অনুপ্রবেশের কারণে উক্ত বিষয় শিক্ষা বন্ধ হয়ে গেছে।
৭. মানুষকে সৎ আমল বিমুখ করে: শিরকের কারণে মানুষের মাঝে সৎ কাজ করার মানসিকতা লোপ পায়। কেননা, মানুষ সৎ কাজ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পারলৌকিক মুক্তি প্রত্যাশায়। কিন্তু মানুষ যখন সামান্য ক'টাকার ফুল-ফল, চাল-ডাল, গরু-ছাগল ইত্যাদি হাদিয়া-তোহফা বা নযল-নিয়ায দ্বারা কোন বিকল্প সত্তাকে সন্তুষ্ট করার মাধ্যমে মুক্তির নিশ্চয়তা পায়, তখন সৎ কাজ করার কষ্ট স্বীকার করে না। এটাকে তারা বিশেষ সুযোগ চিন্তা করে একদিকে পাপকাজ অব্যাহত রেখে ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়; অন্যদিকে অর্থ-সম্পদ পীর-মুর্শীদ ও মাযার-খানকায় অকাতরে দান করে মুক্তির নিশ্চয়তা লাভ করে। ফলে তারা ব্যক্তিগত আমল ছেড়ে পীর-মুর্শীদ ও কবরের খিদমতে লেগে যায়।
৮. দ্বীনি জ্ঞান চর্চার মানসিকতা বিনষ্ট করে: শির্ক মানুষের মাঝে অন্ধ আনুগত্যের প্রবণতা সৃষ্টি করে, পীরের মুরীদদের মধ্যে এ আনুগত্যবোধ সবচেয়ে বেশি। তারা কেবল লক্ষ্য করে কথা বা নির্দেশটি পীর সাহেব দিয়েছেন কি-না? এ কথা কুরআন ও সহীহ হাদীস সমর্থিত কি-না তাদের কাছে এ প্রশ্ন ভয়ানক বেয়াদবীর শামিল। উল্লেখ্য যে, আমাদের দেশের ৯৯% খানকায় জ্ঞান চর্চার কোন ব্যবস্থা নেই, নেই কোন নির্দেশনা; আছে কেবল কিছু অজিফা ও যিকির আজকারের তালিম এবং নির্দেশনা। আর মাযারে এর কোনটিই নেই। ফলে মানুষের দ্বীন চর্চার মানসিকতা বিনষ্ট হয়ে যায়।
৯. পারিবারিক জীবনকে হুমকির সম্মুখীন করে: এ সকল শিরকের উৎসমূলক প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতকারী অধিকাংশ মানুষের পারিবারিক জীবন সুন্দর হয় না, নানা সমস্যায় মোহাবিষ্ট হয়ে তারা ঠিকমতো পারিবারিক দায়িত্ব পালন করতে পারে না। এ কারণে তাদের পরিবার ও কর্মস্থলে বিশৃংখলা দেখা দেয়। এমনকি পারিবারিক জীবনে অনেকের চূড়ান্ত বিচ্ছেদ পর্যন্ত ঘটে যায়।
১০. ভোগের মোহ বাড়িয়ে দেয়: অবৈধ অর্থবিত্ত মানুষকে দিকভ্রষ্ট করে, পথচ্যুত করে, সুস্থ্য চিন্তা ও কর্মের দ্বার করে চির রুদ্ধ। মানুষ সৃজনশীলতা হারিয়ে গতিহীন নদীর মতো হয়ে পড়ে। আমাদের দেশের বর্তমান মাযার ও খানকা কর্তৃপক্ষ অনাশ্রমলব্ধ অর্থ-সম্পদ দ্বারা খুব কম সময়েই বিত্তের পাহাড় গড়ে তোলে। অবৈধ সমৃদ্ধির ফলে কর্তৃপক্ষ বিলাসিতায় গা ভাসিয়ে দেয়। অনেক সময়ই তারা শরীয়ত পরিপন্থী কাজে লিপ্ত হয়। ঐ পীরের আওলাদদের মধ্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের চেয়ে পাশ্চাত্যের জীবন ও সংস্কৃতির আনুগত্য ও মুহাব্বত বেশি থাকলেও 'তিনি মুর্শীদ ও পীর বাবার আওলাদ' এ হিসেবেই তিনি নিরংকুশ ভালবাসার পাত্র হয়ে যান।

📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে শিরকের ক্ষতিকর প্রভাব

📄 ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে শিরকের ক্ষতিকর প্রভাব


মানুষের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের আচরিত কর্মকাণ্ডকে ঘিরেই আমাদের সামাজিক জীবন পরিচালিত হয়। মানুষের ব্যক্তিগত জীবন যখন শিরকের কারণে কলুষিত হয়ে ওঠে, তখন তার ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনেও নানা কুফল প্রকাশ পাওয়া অনিবার্য হয়ে পড়ে। এ বিষয়ে নিম্নে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল:
১. মানুষের সামাজিক জীবন বহুধাবিভক্ত হয়ে পড়ে: শিকী বিশ্বাস ও কর্ম মানুষের জন্য কখনোই কল্যাণ বয়ে আনে না। এর অন্যতম একটি হল, সমাজের মানুষের চিন্তা ও কর্মে অনৈক্য সৃষ্টি করে তাদেরকে বহুদলে বিভক্ত করে। আমাদের সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এ বিষয়টি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাযার আমাদের সামাজিক কাঠামোকে বহুধাবিভক্ত করেছে।
২. সামাজিক শৃংখলা বিনষ্ট করে: আমাদের দেশের মানুষ সরলমনা ও ধর্মপ্রাণ। তারা শির্কী চিন্তার দ্বারা প্রভাবিত নয়। বরং সমাজ ব্যবস্থা আংশিক হলেও মসজিদকেন্দ্রীক। এ দেশের প্রতিটি জনপদেই আযানের ধ্বনি পৌঁছে প্রতিনিয়ত। তাওহীদের সাথে সমাজের মানুষের পরিচয় অনেক পুরনো। বর্তমান সময়ে দ্বীন পালনে গাফলতি বা উদাসীনতা অনেক মুসলিমের মধ্যেই রয়েছে। এমতাবস্থায় মাযার খানকার ভ্রান্ত আক্বীদা-বিশ্বাসের দিকে নানা কৌশলে মানুষকে প্রলুব্ধ করার ফলে দেশের প্রায় প্রতিটি সমাজে বিশৃংখলার সূত্রপাত হয়েছে, যা সামাজিক জীবনকে দুর্বিসহ করে তুলছে, বিনষ্ট করছে সামাজিক বন্ধন।
৩. মানব সমাজে যুলুম বৃদ্ধি করে: শিককে আল্লাহ তা’আলা সবচেয়ে বড় যুলুম বলে অভিহিত করেছেন। তাই স্থান-কাল-পাত্র ভেদে শির্ক কখনোই মানুষের কোন কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না, পারেনি। কুরআনের এ ঘোষণাকে মানব সভ্যতার ইতিহাস অস্বীকার করতে পারেনি; বরং এটাই প্রত্যক্ষ করেছে যে, যখন যে সমাজে এ ঘৃণ্য আক্বীদা-বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, তখন সে সমাজে মানবতা সবচেয়ে দুর্দিন প্রলক্ষিত হয়েছে। এ বিশ্বাস গুটিকয়েক মানুষকে একদিকে যেমন মানুষের প্রভুর আসনে বসিয়ে অমার্জনীয় অপরাধ করার পথ সুগম করেছে, অন্যদিকে সমাজের অধিকাংশ মানুষকে মানুষের দাসানুদাসে পরিণত করছে। শির্ক বরাবরই মানুষের সকল মর্যাদাকে করেছে ভুলুণ্ঠিত। এর ফলে সমাজে দেখা দিয়েছে শ্রেণী বিদ্বেষ, শ্রেণী সংগ্রাম এবং মানুষে মানুষে পাহাড়সম ব্যবধান। সর্বোপরি রচনা করেছে, শোষণ ও বঞ্চনার করুণ অধ্যায়। ফিরআউনের উলুহিয়্যাতের দাবী এবং কিবতী ও বনী ইসরাঈলেরা তাকে ইলাহ হিসেবে আনুগত্য ও বিরোধিতার ইতিহাস সকলের জানা। এটাই শিক্কের সামাজিক ক্ষতির সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
৪. সমাজে প্রতারক শ্রেণীর জন্ম দেয়: আমাদের দেশের মাযার-খানকা প্রতারক শ্রেণীর দখলে। তারা দীর্ঘদিন যাবৎ হীনস্বার্থ সিদ্ধির জন্য এ স্থানগুলোতে অবস্থান নিয়েছে এবং তা দৃঢ়তর করতে নানা কৌশল অবলম্বন করছে। এখান থেকেই তারা রাজকীয় জীবন-যাপনসহ অর্থবিত্তের পাহাড় গড়ার সকল প্রয়াস অব্যাহত রেখেছে। সে ক্ষেত্রে তারা যথেষ্ট সবলও হয়েছে। দেশের ধর্মপ্রাণ ও সহজ-সরল মানুষকে ধোঁকাদানসহ দুনিয়া ও আখিরাতের মুক্তির ও কল্যাণের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে টাকা-পয়সা, মানত, দান-সদকা নিজেরা আত্মসাৎ করে; এর পরিমাণ হাজার টাকা থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত। এমন মাযার আছে যেখানে বার্ষিক উরসের সময় আয় হয় কয়েক কোটি টাকা ও তার সমমূল্যের সম্পদ। অথচ কুরআনুল কারীমে এ প্রসঙ্গে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে এভাবে-
﴿يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ فَلَا تَغُرَّنَّكُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا وَلَا يَغُرَّنَّكُم بِاللهِ الْغَرُورُ (سورة فاطر : ٥) ‘হে মানুষ! নিশ্চয়ই আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য; সুতরাং পার্থিব জীবন যেন তোমাদেরকে কিছুতেই প্রতারিত না করে এবং সেই প্রবঞ্চক যেন কিছুতেই আল্লাহ সম্পর্কে তোমাদেরকে প্রবঞ্চিত না করে।’ [সূরা ফাত্বির (৩৫): ৫]
৫. সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়: শিরকের কারণে সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কারণ, এ সকল স্থানে আক্বীদা-বিশ্বাস ও কর্মের মাধ্যমে যেসব শিক সংগঠিত হয়, তন্মধ্যে মানত, হাদিয়া, তোহফা, নযর-নিয়াত অন্যতম। দেশের অবৈধ খানকা ও মাযারগুলোতে লক্ষ-কোটি টাকা নগদ অথবা হাদিয়া-তোহফার নামে প্রতিনিয়ত লেন-দেন হচ্ছে। এগুলো কুক্ষিগত করছে এক শ্রেণীর সুবিধাভোগী মানুষ। এর অধিকাংশ দানকারী অবৈধ পয়সার মালিক এবং জনগোষ্ঠী। নানা প্রয়োজনে ও বিপদাপদ থেকে মুক্তির প্রত্যাশায় এক শ্রেণীর মানুষ অকাতরে মাযার ও খানকায় দান করে এবং তার পৃষ্ঠপোষকদের দারস্থ হয়। অপরদিকে সুবিধাবঞ্চিত নিরীহ মুসলিমরা একই প্রত্যাশায় তাদের শরণাপন্ন হয়। এভাবে সমাজে অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে আসে।
৬. অসামাজিক কর্মকাণ্ড ও অপরাধ বৃদ্ধি পায়: মাযার ও অবৈধ খানকাসমূহে অবস্থানকারীদের অনেকেই স্বাভাবিক জীবন-যাপন করে না। তাদের কেউ স্বপরিবারে আবার অনেকে বৈবাহিক সম্পর্ক ছাড়াই নারী-পুরুষ একত্রে বসবাস করে থাকে। মদ, গাঁজা, ভাং, ফেনসিডিল, হেরোইন ও তাড়িসহ সব ধরনের নেশা জাতীয় দ্রব্য সেবন করে থাকে। দেশের বড় বড় মাযারগুলোকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর উরস বা বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে ভারত, শ্রীলংকা, মায়ানমার, নেপাল, ভুটান ইত্যাদি দেশ থেকে অনেক সাধারণ ভক্তকূল ও জটাধারী সাধু-সন্ন্যাসী আর দেশের প্রায় সকল অঞ্চল থেকে আসে হাজার হাজার ফকীর, বাউল। এ সব উরস ও উৎসবকালে গাঁজার ধোঁয়ায় মাযার এলাকা ছেঁয়ে যায়। খানকা ও মাযারকে কেন্দ্র করে এর রমরমা ব্যবসা চলে। সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের অভাবে এবং সমাজের শান্তিপ্রিয় মানুষের অসংগঠিত অবস্থানের কারণে কাজগুলো বাধাহীনভাবেই চলছে। আর সমাজকে একটু একটু করে গ্রাস করছে। কিন্তু এর প্রতিকার নিয়ে ভাবার অবসর যেন কারো নেই।
৭. আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি হয়: মাযারে নিয়মিতভাবে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা একেবারেই কম নয়। এরা জটাধারী ও নানা পোশাক পরিধানকারী হয়ে থাকে। কেউ উলঙ্গ এবং সামান্য কাপড় ও চট পরিধান করে। তাদের ব্যাপারে সাধারণ মানুষ মনে করে তাদের মধ্যে বিশেষ ক্ষমতা আছে। তারা মানুষের ভাল-মন্দ করার ক্ষমতা রাখে। তাদের অসন্তুষ্টি ক্ষতিকর এবং তাদেরকে খুশী করা জরুরী। তাদেরকে পাগল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। সুতরাং তাদের প্রতি সন্দেহ পোষণ করা বা শাসনের দৃষ্টি নিক্ষেপ করা যাবে না। এ দুর্বলতার সুযোগে অনেক দাগী সন্ত্রাসী ও অপরাধীরা নির্বিঘ্নে অবস্থান ও আত্মগোপনের সুযোগ পায়। এমনিভাবে এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানের কারণে দেশের আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়ে থাকে।
৮. যুব সমাজ বিপথগামী হয়: মাযার-খানকা কেন্দ্রীক নানা অপকর্ম অব্যাহত থাকায় যুব সমাজ সেদিকে আকৃষ্ট হয়। তারা নিয়মিত নেশা জাতীয় দ্রব্যাদি সেবনের জন্য উক্ত স্থানকে নিরাপদ মনে করে। নেশা ছাড়াও সব ধরনের অসামাজিক কাজ সেখানে বিনা বাধায় চলতে থাকে। দেশ ও জাতীয় ভবিষ্যৎ যে যুব সমাজ, তারা অকালে এ সমস্ত প্রতিষ্ঠানের অভিশাপ হিসেবে নিজেদের ধ্বংসের পথে চালিত করে জীবনকে নিঃশেষ করে দেয়। তাছাড়া অনেকেই এ সমস্ত স্থান থেকে খারাপ অভ্যাসের দ্বারা সংক্রমিত হয়ে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনকে দুর্বিসহ করে তোলে। নিজেরা জীবনের অবশিষ্ট সময় ধুকে ধুকে শেষ করে। তাদের পরিবার ও সমাজ এর দ্বারা প্রভাবিত হয়। বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে এ সমস্যা ক্রমেই প্রকট আকার ধারণ করছে। এ থেকে বাঁচতে হলে এখনই যথাযথ ভূমিকা গ্রহণ করা অপরিহার্য।
৯. ধর্মীয় জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে: আমাদের সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বিদআত অনেকটাই মাযার ও খানকাহ কেন্দ্রিক আবর্তিত হয়। এ সংক্রামণ সমাজ দেহে ছড়িয়ে পড়ছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, বিশুদ্ধ তাওহীদী আক্বীদ-বিশ্বাসের অনুপস্থিতিতে কোন সমাজেই নিরংকুশ শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। সে সমাজে চতুর্দিক থেকে নানা বিপর্যয় নেমে আসে। তেমনি মুসলিমদের ধর্মীয় জীবনেও নেমে আসে নানা বিপর্যয়। আমাদের বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ মুসলিমদের আক্বীদা-বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত করছে। সমাজে শির্ক ও বিদআত প্রচলনে, কুফর-নিফাক বিস্তারে এবং বিশুদ্ধ আক্বীদা-বিশ্বাস প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। মানুষ পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে অর্থহীন নানা কাজে জড়িয়ে পড়ছে।
১০. সমাজে কল্যাণধর্মী কাজ ব্যাহত হয়: শিরকের মাধ্যমে সমাজে কল্যাণধর্মী কাজ সংকুচিত হয়। কারণ, মুসলিম মাত্রই কিছু কিছু কল্যাণ চিন্তা করে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশের খানকাহ হতে বলা হয়, প্রত্যেক মুরীদকে তার নিজ পীরের খানকা ও মাযার কেন্দ্রিক হতে হবে। অনুসারীরা তাদের দানসমূহ যথাযথভাবে কবুলের জন্য সে নির্দেশ মেনে চলে। এমনকি তাদের কুরবানী পর্যন্ত পীরের খানকায় এবং পীরের নামে দেয়া হয়ে থাকে। ফলে দান কারীর গরীব আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও প্রকৃত হকদাররা বঞ্চিত হয়। সারাদেশ থেকে টাকা-পয়সা মাযার কেন্দ্রীক জমা হওয়ার ফলে সমাজে কল্যাণ ও ধর্মীয় কাজ ব্যাহত হয়।
১১. অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়: শিরকের ফলে আমাদের সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। কারণ, মাযার কেন্দ্রিক অপরাধীরা আল্লাহকে খুবই ক্ষমাশীল এবং জীবিত এবং মৃত পীর-মাশায়েখদেরকে সকল গুনাহ মাফকারী ও মুশকিল কোশা হিসেবে বিশ্বাস করে।

📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 রাজনৈতিক ক্ষেত্রে শিরকের ক্ষতিকর প্রভাব

📄 রাজনৈতিক ক্ষেত্রে শিরকের ক্ষতিকর প্রভাব


১. জাতীয় উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়: শির্ক মানব সমাজের সব ধরনের অকল্যাণ নিশ্চিত করে। ব্যক্তি মানুষের স্বকীয়তা বিনষ্ট করে তার সৃজনশীল মনন ও চিন্তাশক্তিকে এবং বাক স্বাধীনতা চিরতরে নিঃশেষ করে দেয়। একদিকে জীবনকে জটিল করার কারণে মানুষকে সে সম্পর্কে নৈরাশ্যে নিপতিত করে। ফলে সে কর্মবিমুখ ও নির্লিপ্ত হয়ে যায়। অন্যদিকে মানুষ আখিরাতের জবাবদিহিতাকে উপেক্ষা করে এবং পরকালে মুক্তির মিথ্যা প্রলোভনে পড়ে ইবাদাত ও সৎ আমল বিমুখ হয়ে দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে গা ভাসিয়ে দেয়। ফলে মানুষের মধ্য হতে উৎপাদনমূলক কাজের আগ্রহ লোপ পায়। এভাবে শির্ক দেশের জাতীয় উৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করে।
২. জাতীয়ভাবে অপচয় বৃদ্ধি পায়: ইসলামী জীবনব্যবস্থায় অপব্যয়কে সর্বাবস্থায় পরিহার করে মিতব্যয়িতা অবলম্বন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কবরে বাতি জ্বালানো, কবরের ওপর মসজিদ নির্মাণ করা, কবরের ওপর ঘর তৈরি করা, কবরের ওপর লেখা ও চুনকাম করা ইসলামে নিষিদ্ধ। এ নিষিদ্ধতা সবার জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। তা সত্ত্বেও বিভিন্ন কারণ, ব্যাখ্যা, বিভিন্ন আয়াত বা হাদীসের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত ও সম্ভাবনা দেখিয়ে এ সকল নিষিদ্ধ কাজ আমাদের সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে ছড়িয়ে পড়েছে। আজকের মুসলিম সমাজে এমন শত শত কাজ ধর্মের অংশ হয়ে পড়েছে। যেমন আমাদের দেশেরে মাযার-খানকাগুলোতে গেলাফের নামে, সজ্জিতকরণের নামে মূল্যবান ঝাড়বাতি, আলোকসজ্জা, মার্বেল পাথরের নানা কারুকার্য, নানা আকৃতির গেইট, কবরকে আকর্ষণীয় করতে বিভিন্ন কারুকার্য আমরা প্রত্যক্ষ করে থাকি। এগুলো ইসলামের দৃষ্টিতে একেবারেই অর্থহীন। কারণ, ইসলামে যেখানে কোন কবরকে বাঁধাই করতেই নিষেধ করেছে, সেখানে এত আড়ম্বর সাজসজ্জা, ডেকোরেশন বাহুল্য ব্যয় ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। বছরে কয়েকবার কবরের গেলাফ পরিবর্তনের মধ্যে দ্বীনি দায়িত্ব পালন এবং পুরনো গেলাফকে বরকতময় মনে করাকে ইসলাম মোটেই সমর্থন করে না; বরং কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। কারণ এ সবের মাধ্যমেই সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে শির্ক ছড়িয়ে পড়ে, আল্লাহর অধিকার হয় ভূলুণ্ঠিত। আমাদের সমাজে খানকা ও মাযার কেন্দ্রিক এ কাজগুলোই ঘটা করে পালিত হচ্ছে। তাছাড়া উরস ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সময় প্রচুর টাকা-পয়সা ব্যয়ে জাঁকজমকপূর্ণ গেইট তৈরি করা হয়। উল্লেখ্য যে, দেশের কোন এক খানকার বার্ষিক উরস উপলক্ষ্যে একবার সারাদেশে প্রায় সাড়ে তিনশ’ তোরণ নির্মাণ করা হয়। এগুলো সবই আশেকান, মুরীদান বা ভক্তবৃন্দ সাওয়াবের আশায় করে থাকে। আর অসংখ্য মাইকের মাধ্যমে প্রচার, পত্রপত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশ, ক্রোড়পত্র প্রকাশ, ব্যানার, ফেস্টুন, পোষ্টার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল বিতরণের জন্য যে খরচ হয় তার হিসাব করা কঠিন। এ সবের ব্যবস্থা যেভাবেই হোক না কেন, সবই দেশের মানুষের অর্থ-সম্পদ ব্যয় করেই করা হয়। আরো লক্ষণীয় যে, পীর নেই অথচ তাঁর হুক্কায় আজও জীবিত মানুষের ন্যায় নিয়মিত আগুনসহ যথারীতি তামাক সেজে দেয়া হয়। বিশ্বাস এরূপ যে, আল্লাহর ওলীরা কখনও মৃত্যুবরণ করেন না; বরং তাঁরা সর্বদা জীবিত। মৃত্যুর আগে তিনি যা কিছু পছন্দ করতেন এবং তাঁর প্রয়োজন ছিল, তা আজও তার প্রয়োজন। এভাবে তারা বিভিন্ন উপকরণে অর্থ ব্যয় করে থাকে। এ পথে ব্যয়িত বিপুল পরিমাণ অর্থ অভাবী ও গরীব মানুষদের মধ্যে ব্যয় করা হলে, দেশের চিত্র আজ ভিন্ন হতো। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ইসলামের নামে এ সকল কার্যক্রমের মাধ্যমে জাতীয়ভাবে বিপুল অর্থ ব্যয় করা ছাড়া এর মধ্যে আর কোন কল্যাণ আছে বলে মনে করা যায় না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00