📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 যারা বলে দাঁতের পোকা, আসলে তারা বানায় বোকা

📄 যারা বলে দাঁতের পোকা, আসলে তারা বানায় বোকা


শহরের রাস্তাঘাটে, বাস, ট্রেন, লঞ্চে বা গ্রামের হাট-বাজারে দাঁতের মাজন বিক্রেতাদের দেখা যায়। 'পোকালাগা' দাঁতের ফুটো থেকে তারা 'পোকা' বের করে আনে। পোকা বের করা ও দাঁত ভাল রাখার জন্য তাদের মাজন অব্যর্থ বলে দাবী করে। বিক্রির সময় গোল হয়ে দাঁড়ানো লোকজনের মুখে মাজন লাগিয়ে কিছু পরে তারা পোকা বের করে এনে দেখায়। এ তো গেল মাজনওয়ালার কথা। এ ছাড়া, আমাদের সমাজে আর এক শ্রেণীর মানুষ আছে যাদের পেশা দাঁতের পোকা তোলা। গাছের ডাল বা শেকড় দিয়ে কিভাবে জানি দাঁত থেকে পোকা বের করে আনে। এ মানুষদের চেনেন অনেকে। নৌকার বহর সাজিয়ে নদীতে ভাসমান জীবন যাপন করেন এরা। ভাসতে ভাসতে কোন চর বা ভাললাগা গ্রামে গিয়ে নৌকার সারি ভেড়ায়। কিছুদিন এ তীর ঘিরেই এদের জীবন শুরু হয়। বেদে বলে পরিচিত এ মানুষদের অনেকে দাঁতের পোকা বাছা, দাঁতের অসুখ সারানো- এগুলো কাজ করেন। ঝোলা কাঁধে ফেলে গ্রামের পথ-ঘাটে হেঁটে-হেঁকে বেড়ায়, 'দাঁ-তের পোকা বাছা, পোকা তোলা।'
দাঁতের পোকা বের করার যে দু'শ্রেণীর লোকের কথা বললাম, এরা লেখাপড়া না-জানা অসচেতন মানুষ। কেউ মাজন দিয়ে আর কেউ গাছ-গাছড়ার সাহায্যে পোকা তোলেন। কিন্তু আধুনিক দাঁতের ডাক্তাররা কখনোই পোকার কথা বলেন না। পোকা বের করার কথাও তারা বলেন না কখনো। আসলে পোকা আছে বলেই তারা স্বীকার করেন না। দাঁতে যে কখনো পোকা হতে পারে, এটা তারা বিশ্বাসই করতে চান না। তাহলে কি দাঁতের পোকা বলে কিছু নেই! পোকা নিয়ে যে এত কাণ্ড তার সবই কি তবে মিথ্যা, বানানো কথা এগুলো!
আসলে কিন্তু তাই। দাঁতের পোকা নিয়ে যত কথা তার সবই বানানো। মিথ্যা কল্পকাহিনী। এর মধ্যে একবিন্দুও সত্য নেই। দাঁতে কখনো পোকা হয় না। তবে হ্যাঁ, আস্ত দাঁতে গর্ত হয় ঠিকই। এ গর্তের মধ্যে ব্যথা হয়। কখনো কখনো এ ব্যথা এত বেশি হয় যে, একে বলা হয় দাঁতে পোকা লেগে কামড় দিচ্ছে। তো এই গর্ত ও যন্ত্রণা হওয়া- এ সব কিন্তু পোকার কাজ নয়। এর কারণ ভিন্ন। এর কারণ হল এসিড বা অম্ল। বিভিন্ন কারণে দাঁতে এসিড হলে ধীরে ধীরে গর্ত হয়। গর্ত থেকে পরে ব্যথার সৃষ্টি হয়।
আমরা যতক্ষণ জেগে থাকি এর মধ্যে অনেকবারই ভাতসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার খাই। খাওয়ার পর খাবারের ছোট ছোট টুকরো বা কণা দাঁতের ফাঁকে বা আশপাশে লেগে থাকে। খাওয়ার পর ভালভাবে মুখ পরিষ্কার না করার জন্য এগুলো থেকে যায়। আমাদের মুখের ভেতরে আছে জীবাণু। দাঁতের ক্ষতি করে এই এসিড। দাঁতের ওপরের দিকে যে ঝকমকে সাদা অংশ থাকে তার নাম এনামেল। ভেতরের নরম অংশকে পাতলা পর্দার এনামেল রক্ষা করে। শক্ত জিনিস খাওয়ার শক্তিও যোগায় এনামেল। এসিড দাঁতের জন্য খুব অপকারী। এই এনামেল নষ্ট করে ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো করে এসিড। ফলে দাঁতের শক্তি কমে যায়। ঝকঝকে ভাবটা দূর করে দেয়। এতে দাঁতে ক্ষয় ধরে। ক্ষয় হতে হতে একসময় দাঁতে ফুটো তৈরি হয়ে যায়। দাঁতে যদি এনামেলের ওপর নোংড়া লাল বা হলুদ পর্দা জমে, তবে এসিড তৈরি হয় খুব তাড়াতাড়ি। প্রথমে কিন্তু এ সবের কিছুই টের পাওয়া যায় না। পরে যখন ক্ষয়টা বেশি হয়ে দাঁত ফুটো হয় তখন বোঝা যায়। কারণ, তখন ব্যথা শুরু হয়ে যায়। খাবারের কণা বা পান-সিগারেটের যে নোংড়া দাগ তা এসিডকে টেনে ধরে রাখে।
চিনি জাতীয় খাবার, চকলেট, আইসক্রীম এগুলো যেহেতু আঠালো জিনিস তাই এতে এসিড হয় বেশি। এখন এ জাতীয় খাবার আমরা হরহামেশা খাই বলে দাঁতের ক্ষয়ও হয় বেশি। আগে এ ধরনের খাবারের চল তেমন ছিল না বলে দাঁতের ক্ষয় বা রোগও তেমন বেশি হয়নি।
দাঁতের এ ক্ষয়রোগ থেকে মুক্ত থেকে দাঁতকে শক্ত ও সতেজ রাখার উপায় কি? প্রাথমিকভাবে উপায় দুটো:
১. প্রতিদিন খাবারের পর খুব ভালো করে দাঁত-মুখ পরিষ্কার করতে হবে, যাতে খাদ্যকণা কোনভাবেই দাঁতে লেগে থাকতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রেখে পরিষ্কার করা দরকার।
২. যে খাবারগুলো আঠালো এবং ওপরে লেগে গিয়ে দাঁতকে ময়লা নোংড়া করে, এমন খাবার কম খাওয়া। মিষ্টি বা চিনি দিয়ে বানানো খাবার, পান, সিগারেট, তামাক ইত্যাদি এর মধ্যে পড়ে। এ ছাড়া, কোথাও কোথাও পানিতে আয়রন (লোহা) ও লবণের ভাগ বেশি থাকে। এমন পানিও দাঁতের ক্ষতি করে। খাবার পানি সবসময় আগুনে ফুটিয়ে খেলে দাঁতের তেমন ক্ষতি হয় না।
ওপরের আলোচনা থেকে আমরা বুঝলাম, দাঁতের পোকা বলে কিছু নেই। দাঁতে কখনো পোকা হয় না। দাঁতে যে গর্ত বা ব্যথা হয় সেজন্য পোকা দায়ী নয়। আসলে আমরা দাঁত সম্পর্কে খুব কম জানি বা খোঁজখবর কম রাখি। এ না-জানার সুযোগ নিয়ে সমাজের এক শ্রেণীর মানুষ দিব্যি ঠকিয়ে চলেছে আমাদের। আমাদের অজ্ঞানতা, অসচেতনতা ও কুসংস্কারের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা ঠকিয়ে উপার্জন করছে।
অনেক সময়ই দেখা যায়, ওই মাজনওয়ালা বা বেদেরা মানুষকে ধরে তার মুখ থেকে পোকা বের করে। এ পোকা কোথেকে আসে এ প্রশ্ন হয়তো অনেকের। এটা আসলে হাতসাফাই বা ম্যাজিক। জাদুকররা হাতসাফাই করে খালি হাতে কত কি-ই না দেখান! খালি কলসী নিমেষে পানিতে ভরে ফেলেন। খালি পকেটে টাকা ভরিয়ে দেখান। এগুলো যদি সম্ভব হয় তবে দু'চারটে পোকা হাতের তালুতে এনে দেখানো খুব কঠিন কি! পুরনো চাল, পচা ফল বা গোবরের তাল থেকে পোকা সংগ্রহ করে এনে আগেভাগেই তারা আঙ্গুলের ফাঁকে লুকিয়ে রাখেন। আর এ পোকাগুলো মুখ থেকে বের করে আনার ভান করে দাঁতে লবঙ্গের তেল লাগিয়ে দেন। লবঙ্গের তেল কিছু সময়ের জন্য ব্যথা দূর করে। এক একজন একেকভাবে এ প্রতারণার খেলা দেখিয়ে মানুষকে বোকা বানান।
প্রতারণার আরেকটা পদ্ধতিও আছে। কুমড়োর শক্ত বিচির ওপরের পর্দা ব্লেড দিয়ে কেটে ফেলা হয়। বিচির ভেতরের নরম শাঁসটাকে চিকন করে কুচি কুচি করে টুকরো করা হয়। টুকরোগুলো রোদে শুকিয়ে দাঁতের মাজনের শিশির মধ্যে মিশিয়ে রাস্তায়-বাজারে মাজন বিক্রি করতে লেগে যায় মাজনওয়ালা। দাঁতের ব্যথায় ভুগছে এমন লোকজন ধরে মাজন লাগাতে দিয়ে দেয় শিশি থেকে। দু'পাঁচ মিনিট পর থুথু ফেলতে বলেন। সাথে সাথে বলে, 'এবার দেখুন, আমার মাজন কিভাবে পোকা ধরে বের করে আনছে।' কুমড়ো বিচির টুকরাগুলো থুথুর সাথে বের হয়ে এলে এগুলোই পোকা বলে সবাইকে ধোঁকা দেন। বিচির টুকরোগুলো মুখের মধ্যে থেকে রসালো হওয়াতে একটু ফুলে ওঠে। থুথুর মধ্যে এগুলো ফুলতে থাকে বলে মনে হয় যে, নড়াচড়া করছে। ব্যস, এগুলো আর দাঁতের পোকা না হয় কি করে!
আমাদের সমাজে এভাবে ভেল্কি দেখিয়ে, হাতসাফাই করে মানুষকে বোকা বানিয়ে কতই না লোক বেশ রুজি রোজগার করছে! এ জন্য দায়ী আমাদের অশিক্ষা, কুশিক্ষা আর অন্ধবিশ্বাস।
আর প্রতারণার কথা বলতে গেলে নির্দ্বিধায় বলা যায়, কত রকমের প্রতারণাই না ছড়িয়ে আছে আমাদের সমাজে, আমাদের জীবনে। গেঁথে আছে এগুলো আমাদের বোধে, বিশ্বাসে, চিন্তায়। মানুষের বিচার-বুদ্ধি পেছন অতীতে খুব কম ছিল। সবকিছু যাচাই-বাছাই করে তখন মানুষ দেখতে-বুঝতে শেখেনি। সে সময় সমাজের একশ্রেণীর স্বার্থপর মানুষ এগুলোর প্রচলন করেছে। নিজেদের স্বার্থ প্রতিষ্ঠা ও বহাল রাখার কারণে প্রতারণার দুষ্টবুদ্ধির আশ্রয় নিয়েছে। এর অনেক ধারণাই তারা ধর্মের সাথে সংযুক্ত করে পরিবেশন করেছে মনুষ্য সমাজে। এভাবে অনেক প্রতারণাপূর্ণ ধ্যান-ধারণা ধর্মীয় নীতি-নৈতিকতার সাথে মিলেমিশে যুগযুগ ধরে সচল রয়েছে আমাদের সমাজে।

📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 এক নজরে আমাদের সমাজে প্রচলিত শিরক

📄 এক নজরে আমাদের সমাজে প্রচলিত শিরক


আমাদের বাংলাদেশের গ্রাম ও শহর তথা সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়েছে শির্ক, বিদ'আত ও নানাবিধ কুসংস্কার। কুসংস্কারজনিত এমন শির্ক রয়েছে যা এ সব দেশের লোকজন ধর্মীয় বিধান বা নিয়ম মনে করেই পালন করে থাকে, সে সম্পর্কে নিম্নে বর্ণনা করা হল:
১. আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো গায়েবী ক্ষমতায় বিশ্বাস: আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোর অতি প্রাকৃতিক জগতের উপর কর্তৃত্ব রয়েছে এবং অতিপ্রকৃতি-অবস্তুগত কিংবা অলৌকিকভাবে কাউকে সাহায্য করতে বা বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারে বলে বিশ্বাস করা। যদি কেউ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সম্পর্কে বিশ্বাস পোষণ করে যে, সে অলৌকিক শক্তির অধিকারী এবং অলৌকিকভাবেই কোন ঘটনা সংঘটিত করতে, বিপদগ্রস্থকে সাহায্য, রোজগারহীনকে রোজগার, সন্তানহীনকে সন্তান দিতে পারে, তাহলে সে মুশরিক বলে গণ্য হবে।
২. জ্যোতির্বিদ্যা: জ্যোতির্বিদ্যা হল সৌরজগতের বিভিন্ন অবস্থা পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর ঘটনা সংঘটিত হওয়ার কারণ বর্ণনা করা। জ্যোতির্বিদরা বলে থাকে যে, অমুক নক্ষত্রের অমুক স্থানে অবস্থানের সময়ে যে ব্যক্তি বিবাহ করবে তার অমুক অমুক জিনিস অর্জিত হবে। যে ব্যক্তি অমুক নক্ষত্রের অমুক জায়গায় অবস্থানের ক্ষণে সফরে থাকবে সে ভাগ্যবান কিংবা এ ধরনের ভাগ্যহীন হবে। যেমন- বর্তমানে বিভিন্ন নিম্নশ্রেণীর পত্র-পত্রিকায় এ ধরনের অর্থহীন-আজগুবি খবরাখবর পরিবেশন করা হয়, আর এগুলোর আশে-পাশে বিক্ষিপ্ত তারকারাজি সরলরেখা, বক্ররেখা ইত্যাদি ধরনের আঁকা-বাঁকা রেখা অংকিত থাকে। কিছু সংখ্যক মূর্খ ও নিম্ন শ্রেণীর ঈমানদার ব্যক্তিও বিভিন্ন সময় জ্যোতিষদের নিকট গমন করে থাকে এবং তাদেরকে স্বীয় ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এবং ভবিষ্যতে ঘটিতব্য বিষয় সম্পর্কে, বিবাহ-শাদী ইত্যাদি সম্পর্কেও প্রশ্ন করে থাকে।
৩. ভবিষ্যদ্বাণী করা: জ্যোতির্বিদ্যার মাধ্যমে, ক্রিস্টাল বল থিওরির মাধ্যমে, কম্পিউটার প্রোগ্র্যামের মাধ্যমে বিভিন্ন হিসাব-নিকাশ করে আগামী দিনের বিভিন্ন ঘটনা-দুর্ঘটনা সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা এবং এ-সব ভবিষ্যদ্বাণী বিশ্বাস করা।
৪. রোগ নিরাময়ের উদ্দেশ্যে ধাতব দ্রব্য দ্বারা নির্মিত আংটি বা বালা পরিধান করা: আমাদের দেশের রাজধানী সহ বিভিন্ন শহরের ফুটপাতে এবং বড় বড় পাইকারী বাজারে এমন কিছু ব্যবসায়ের দোকান পাওয়া যায়, যারা ধাতব নির্মিত (যেমন, অষ্ট ধাতুর) আংটি বা বালা বিক্রি করে থাকে। অনেক লোকদেরকে তা বাত রোগ নিরাময়, যেকোন উদ্দেশ্য সফল হওয়া, শনি ও মঙ্গল গ্রহের কুদৃষ্টি থেকে আত্মরক্ষা ইত্যাদির জন্য বিশেষ উপকারী বিশ্বাস করে আংগুলে ও হাতে ব্যবহার করতে দেখা যায়। আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কোন বস্তুই নিজস্ব গুণে কোন রোগের ক্ষেত্রে উপকারী বা অপকারী হতে পারে না। এতে রোগীর অন্তরে ধাতব বস্তুর প্রতি উপকারী হওয়ার ধারণার সৃষ্টি হয় এবং রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে আল্লাহর পরিবর্তে বস্তুর উপর ভরসা করা হয়। তাই কোন বস্তুকে কোন ক্ষেত্রে উপকারী বা অপকারী বলা বা এ ধারণা করে তা ব্যবহার করা।
৫. জ্বিন বা অপর কোন রোগের অনিষ্ট থেকে আত্মরক্ষার জন্য শরীরে তা'বীজ ব্যবহার করা: জ্বিনের অশুভ দৃষ্টি এবং বিভিন্ন রোগের অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য সাধারণ মুসলিমদের মাঝে তা'বীজ ব্যবহার একটা সাধারণ রীতিতে পরিণত হয়েছে। অথচ সকল ধরনের তা'বীজ ব্যবহার করা শির্ক।
৬. আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ব্যতীত কোন মানুষের মত ও পথের অন্ধ আনুগত্য ও অনুসরণ করা: সাধারণ মানুষের মতো অনেক জ্ঞানী লোকেরাও নিজেদের অজান্তেই অথবা জেনেশুনে অনুসরণের বৈধ সীমারেখা লঙ্ঘন করে চলেছেন। সাধারণ লোকজন অন্ধভাবে তাদের পীর-ফকীরদের এবং ধর্মীয় ক্ষেত্রে অধিকাংশ আলেম নিজ মাযহাবের নিঃশর্ত ও নির্বিচার অনুসরণ করেন। এমনকি কোন বিষয়ে নিজের পীর, ইমাম বা মাযহাবে প্রচলিত আমলের ত্রুটি কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হলেও বিভিন্ন অনর্থক যুক্তি-তর্ক দাঁড় করিয়ে তারা স্বীয় পীর, ইমামের মত বা মাযহাবের অনুসরণ করেন। এ ধরনের আচরণ মূলত আনুগত্যের ক্ষেত্রে শিকের অন্তর্ভূক্ত।
৭. মাযার স্পর্শ করা, শরীর মাসেহ করা বা চুমু খাওয়া, কবরের মাটি বরকতের নিয়তে নিয়ে তাবীজে ভরে গলায় বাঁধা, গায়ে মালিশ করা, রওজা শরীফ, মাজার বা কবর ইত্যাদির ছবি বরকতের জন্যে রাখা, চুমু খাওয়া, তা'জীম করা: বিপদাপদ, বালা-মুসীবাত থেকে বাঁচার জন্যে ঘর-বাড়িতে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে বরকতের জন্যে দোকান, অফিস, হোটেলে ছবি রেখে আদবের সাথে দাঁড়িয়ে এগুলো করা।
৮. কবর ধোয়া পানি: মাযারকে মাঝে মাঝে মহা ধুমধামের সাথে গোসল করানো হয়। আর এ কবর ধোয়া পানি লোকেরা শিশিতে বা বোতলে যে যেভাবে পারে নিয়ে যাওয়া এবং নেক মাকসূদ পূরণের উদ্দেশ্যে পান করা।
৯. মাযারের গিলাফের তা'জীম: বিভিন্ন পীর, ওলী-আওলিয়া, বুযুর্গানে দ্বীনের মাযারে বা কবরের ওপরে আজকাল গিলাফ পড়ানো হয়। নির্দিষ্ট সময় পরপর এ গilaফ পরিবর্তন করে আবার নতুন গিলাফ পরানো হয়। পুরানো গিলাফ অতি যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করা হয়। অজ্ঞ, অশিক্ষিত মানুষ অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষিত মানুষ এ সব গিলাফে চুমু খায়, গিলাফ ধরে ফরিয়াদ জানায়, আদবের সাথে মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, এ গিলাফের সুতা তাবীজে ভরে গলায় বাঁধে। এমনকি অনেকেই আরো একধাপ এগিয়ে গিলাফের কাছেই দু'আ চেয়ে বসে।
১০. খাজা বাবার ডেগ: একদল লোক বিশেষত যুবকেরা রজব মাস এলেই পথে-ঘাটে, বাজারে যেখানেই সুযোগ পায় সেখানেই একটা ডেগ বা বড় হাড়ি বসায়। লালসালু কাপড় বিছিয়ে, বাঁশ দিয়ে ছাউনি দিয়ে, বিজলী বাতি জ্বালিয়ে, চকমকি কাগজ এবং বিভিন্ন ধরনের রং লাগিয়ে ঘর সাজিয়ে তার মধ্যে স্থাপন করে ডেগ। তারা একে বলে 'খাজা বাবার ডেগ'।
১১. কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর: শুধু কবর বা মাযার যিয়ারতের উদ্দেশ্যে 'শারঈ সফর' করা। এমনকি শুধু রাসূলে রওজা যিয়ারতের উদ্দেশ্যেও সফর করা।
১২. প্রাণীর ছবি, চিত্র, প্রতিকৃতি, মূর্তি, ভাস্কর্য ইত্যাদির হুকুম: কোন নেতা, লিডার বা স্মরণীয়-বরণীয় ব্যক্তিবর্গের ছবি, চিত্র, প্রতিকৃতি, মূর্তি ভাস্কর্য ইত্যাদি তৈরি করা, মাঠে-ঘাটে, অফিস-আদালতে ও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এগুলো স্থাপন করা, এগুলোকে সম্মান করা, এগুলোর উদ্দেশ্যে পুষ্পস্তবক অর্পণ ইত্যাদি করা।
১৩. তাসাওউফের শায়েখ বা পীরের কল্পনা: তাসাওউফের শায়খ বা পীরের চেহারা, আকৃতি ইত্যাদি কল্পনা করে মোরাকাবা, ধ্যান, জিকির বা অন্য যেকোন 'ইবাদাত করা।
১৪. পীরকে নাযাতদাতা মনে করা: অনেকের ধারণা পীর তাকে জান্নাত পাইয়ে দিবে।
১৫. পীরকে দূর হতে ডাকা: অনেকে স্বীয় পীর বা কোন বুজুর্গ ব্যক্তিকে বহুদূর হতে ডাকে এবং মনে করে যে, তিনি এটা জানতে ও শুনতে পারছেন। অনেক সময় 'ইয়া গাওসুল আযম', 'ইয়া খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতী' ইত্যাদি বলে ডাকতে থাকে এবং নিজেদের ফরিয়াদ ও আরজি পেশ করতে থাকে।
১৬. পীরের জন্য ঘর সাজিয়ে রাখা: কিছু সংখ্যক পীরের অনুসারীদের মধ্যে দেখা যায়, তারা তাদের বাড়ির মধ্যে একটি ঘর পীরের জন্য সারা বছর সাজিয়ে গুছিয়ে রাখে। একটা বড় খাটের ওপর চাদর বিছিয়ে বড় বড় কয়েকটা কোল বালিশ সেট করে 'বিশেষ আসন' তৈরি করা হয়। পীরের ছবিকে মালা পরিয়ে সযত্নে ঐ ঘরে টাঙ্গিয়ে রাখা হয়। ফুল ও জরি দিয়ে ঘরটি সুন্দর করে সাজানো হয়। সারা বছর ঐ ঘরে কাউকে ঢুকতে দেয়া হয় না। মাঝে মাঝে মুরিদরা ঐ ঘরে ঢুকে ছবি ও আসনের সামনে আদবের সাথে চুপ করে বসে থাকে।
১৭. পীরের বাড়ির বা আস্তানার খাদেম, গরু, কুকুর, বিড়াল, মাছ ও কচ্ছপ ইত্যাদির প্রতি অন্ধ সম্মান: অনেককে দেখা যায়, পীরের বা মাযারের খাদেম, গরু, কুকুর, বিড়াল ইত্যাদিকে দেখামাত্র দাঁড়িয়ে যায়। এগুলোর সামনে মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকে। অনেকে অবার এ সব গরু, কুকুর, বিড়ালের পা ধরে বসে থাকে নেক মাকসূদ পূরণের জন্য।
১৮. পীর, ওলী-আওলিয়াদের কবরের মাটি ও সেখানে জ্বালানো মোম বিভিন্ন রোগের জন্য উপকারী মনে করা: এ ধরনের কর্ম আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে অহরহ পরিলক্ষিত হয়। তারা বিভিন্ন রোগের ক্ষেত্রে আউলিয়াদের কবরের মাটি ও সেখানে জ্বালানো মোমবাতি অনেক উপকারী মহৌষধ মনে করে অত্যন্ত যত্নের সাথে বাড়িতে নিয়ে যেয়ে তা ব্যবহার করে থাকেন এবং এর দ্বারা কোন রোগ মুক্তি হলে তা কবরস্থ ব্যক্তির দান বা তাঁর ফয়েয বলে মনে করে থাকেন, অথচ এমন মাটি ও মোমকে উপকারী মনে করা।
১৯. গায়রুল্লাহর নামে জিকির বা অযীফা: আল্লাহর জিকিরের ন্যায় কোন নবী বা রাসূল, পীর, ওলী-আওলিয়া, বুযুর্গ, আলিমের নাম জপ করা, বিপদের পড়লে তাদের নামের অযীফা পড়া। যেমন- 'ইয়া রাহমাতুল্লিল আলামীন', 'ইয়া রাসূলুল্লাহ', 'নূরে রাসূল নূরে খোদা', 'হক বাবা হক বাবা' ইত্যাদি।
২০. খালি পায়ে মাযারে বা পীরের বাড়িতে: কারো কারো ধারণা মাযারে বা পীরের গ্রামে যা পীরের বাড়ির সীমানার মধ্যে জুতো ছাড়া খালি পায়ে হাটা।
২১. কামেল পীরের গোনাহ নেই: 'খোদা পাক, কামেল পীরও পাক। তাদের কোন গোনাহ নেই। তারা নিষ্পাপ।'- এ ধরনের কথা বলা।
২২. পীরের পায়ে সিজদা করা বা পীরের পা চাটা: সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে পীরের পায়ে সিজদা করা বা নেক মাকসূদ পুরণের জন্যে, রোগমুক্তির নিয়তে পীরের পা চাটা, পায়ে চুমু খাওয়া, গাড়ি চাটা, গাড়িতে চুমু খাওয়া, ব্যবহার্য থালাবাটি বা অন্য কোন বস্তু চাটা বা চুমু খাওয়া, মাযার চাটা বা চুমু খাওয়া।
২৩. আল্লাহ্র যাতের সাথে মিশে যাওয়া: অনেকের ধারণা মুরিদ যখন 'ফানাফিল্লাহ' পর্যায়ে পৌঁছে, তখন সে আল্লাহ্ যাতের সাথে মিশে বিলীন হয়ে যায় এবং তাঁর পৃথক কোন অস্তিত্ব থাকে না। খাওয়া, ঘুম, স্ত্রী সহবাস সহ যাবতীয় কাজকর্ম তখন আর নিজস্ব থাকে না। এগুলো সব আল্লাহর হয়ে যায় অর্থাৎ এ সব কাজ তার রূপে আল্লাহ নিজেই করেন। (নাউযুবিল্লাহ)
২৪. আল্লাহ যা করান, তাই করি: একদল ফকীর বলে, 'আল্লাহ যা করান, তা-ই করি। আল্লাহ সলাত আদায় করান না, তাই আদায় করি না, আল্লাহ গাঁজা টানাচ্ছে, তাই টানি। তাকদীরে সলাত থাকলে তো আদায় করব।'
২৫. দিলে দিলে নামাজ পড়ি: অনেক পীর সাহেবানরা সলাত, সাওমের ধার ধারে না; কিন্তু খুব সাধনা করে! দু'-তিন দিন পর পর একটু খায়। কম কথা বলে। লোকজনের সাথে কম মিশে। দিনের বেশিরভাগ সময় চুপ করে ধ্যান মগ্ন অবস্থায় বসে থাকে। এরা বলে বেড়ায়, 'আমরা দিলে দিলে নাজাজ পড়ি। তোমরা মাত্র ৫ ওয়াক্ত পড়, আর আমরা সারা দিন-রাতই নামাজ পড়ি।'
২৬. সীনায় সীনায় মারফতী: পীর বা দরবেশ দাবীদার একদল বলে থাকে, 'কুরআন শরীফ মোট ৪০ পারা। ৩০ পারায় জাহেরী ইলমের বিষয় আছে। বাকি ১০ পারা মারফতী বিদ্যায় ভরা রয়েছে। এ ১০ পারা আমরা সীনায় সীনায় পেয়েছি। শরীয়তের আলেমরা এগুলোর খবরও রাখে না।'
২৭. শরীয়তের ইত্তেবা সর্বাবস্থায় ফরয নয়: অনেকের ধারণা, মুরীদ যখন মারেফাতের উচ্চ শিখরে পৌঁছে যায়, তখন তার জন্য শরীয়তের হুকুম-আহকাম, সলাত, সাওম ইত্যাদি মাফ হয়ে যায়।
২৮. শিকের গন্ধযুক্ত নাম বা সম্বোধন: যে সকল নাম বা সম্বোধনে শিকের সংস্পর্শ পাওয়া যায়, সেগুলোকে ইসলাম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। জাহিলিয়াতের যুগে মানুষ নিজের সন্তান-সন্ততির নাম সূর্য, চন্দ্র ইত্যাদির নামের সাথে সম্পৃক্ত করে রাখত। যেমন- আবদে শামস্ বা সূর্যের গোলাম, আবদে মানাফ বা মানাফের গোলাম ইত্যাদি। রাসূলুল্লাহ () এ ধরনের নাম রাখতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।
২৯. শিকের গন্ধযুক্ত উপাধী: পীর বা ওলীকে এমন কোন উপাধীতে সম্বোধন করা উচিত নয় যা অর্থগত দিক দিয়ে আল্লাহ তা'আলার জন্য প্রযোজ্য। যেমন- গাউসূল 'আযম (সর্বশ্রেষ্ঠ সাহায্যকারী), গরীবে নেওয়াজ (গরীবরা যার মুখাপেক্ষী), মুশকিল কোশা (যার মাধ্যমে বিপদাপদ দূর হয়), কাইয়ূমে জামান (যামানা কায়েম করেছেন যিনি) ইত্যাদি।
৩০. সন্তানের নামকরণে নবী ও পীর-আওলিয়ার সাথে সম্পর্ক স্থাপন: গোলাম মোস্তফা (মোস্তফার গোলাম), আব্দুন্নবী (নবীর দাস), আব্দুর রাসূল, আলী বখস্ (আলী-এর দান), হোসেন বখস্ (হুসাইন-এর দান), পীর বখস্ (পীরের দান), মাদার বখস্ (মাদারের দান), গোলাম মহিউদ্দীন (পীর মহিউদ্দীনের গোলাম), আব্দুল হাসান (হাসানের গোলাম), আব্দুল হুসাইন (হুসাইনের গোলাম), গোলাম রাসূল (রাসূলের গোলাম), গোলাম সাকলায়েন ইত্যাদি নাম রাখা।
৩১. বিপদে পড়লে জ্বিন, ফেরেশতা, পীর, ওলী-আওলিয়াদের ডাকা বা আহ্বান করা: দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ মূর্খ, পীর ও মাযার পূজারী অনেক লোককে দেখা যায় বিপদে-আপদে, রোগে-শোকে আল্লাহ তা'আলাকে বাদ দিয়ে পীর, ওলী, জ্বিন ও ফেরেশতাদের আহ্বান করতে থাকে। যেমন- 'ইয়া গাওসূল 'আযম বড় পীর আব্দুল কাদের জীলানী', 'ইয়া খাজা বাবা', 'ইয়া সুলতানুল আওলিয়া', 'হে পীর কেবলাজান', 'হে জ্বিন',... আমাকে রক্ষা করুন, আমাকে বিপদ হতে বাঁচান, আমার মাকসূদ পুরা করুন, সন্তান দিন ইত্যাদি। কোন কোন মূর্খলোক বালা মুসীবাতের সময় বুযুর্গ লোকদের উদ্দেশ্যে দু'আ করে, ফরিয়াদ জানায়। এভাবে গাইরুল্লাহকে ডাকা এবং তাদের কাছে নিজের ফরিয়াদ ও আরজি পেশ করা, তা কাছ থেকে হোক আর দূর থেকেই হোক।
৩২. কোন সমস্যায় জ্বিনকে ডাকা: কোন সমস্যায় জ্বিনকে ডাকানো, জ্বিনের কাছে সাহায্য চাওয়া ইত্যাদি।
৩৩. পীর, ওলী-আওলিয়াদের স্মৃতিচিহ্নের তা'যীম করা এবং এদের কাছে গায়েবী সাহায্য চাওয়া: অনেকে পীর, ওলী-আওলিয়াদের স্মৃতি চিহ্নকে এমন তা'যীম করে যে তা শিক্কের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। পীর হয়তো কোন গাছের নীচে বসতেন, বিশ্রাম করতেন বা তায়াম্মুমের জন্য কোন পাথর ব্যবহার করতেন। পীরের মৃত্যুর পর মুরীদরা ঐ গাছ বা পাথরের গোড়ায় আগরবাতি, মোমবাতি, ধূপ ইত্যাদি জ্বালায়, মিলাদ পড়ায়, বিপদ মুক্তির জন্য ফরিয়াদ জানায়। খানজাহান আলীর মাযারের পুকুরে কুমীর আছে, চট্টগ্রামে কথিত বায়েজীদ বোস্তামীর মাযারে কচ্ছপ আছে। আবার কোন কোন জায়গায় গজার মাছ, জালালী কবুতর ইত্যাদি পীর-ওলীদের স্মৃতি বহন করছে বলে মানুষের বিশ্বাস। অজ্ঞ অশিক্ষিত মানুষেরা মাযারের ব্যবসাদার খাদেমদের খপ্পরে পড়ে এ সব কচ্ছপ, গজার মাছ, কুমীর, জালালী কবুতর ইত্যাদিকে অলৌকিক ক্ষমতাসম্মন্ন মনে ক'রে এদের জন্য বিভিন্ন খাদ্যবস্তু পূজাস্বরূপ নিয়ে যায় এবং এদের কাছে সাহায্যের জন্য প্রার্থনা জানায়।
৩৪. বাচ্চা কখন নেবেন?: আমাদের দেশে শিক্ষিত সমাজে প্রায়ই এরূপ কথাবার্তা শুনতে পাওয়া যায়- 'বাচ্চা কখন নেবেন? বিয়ের পর পর বাচ্চা নিলে জীবনটা উপভোগ (Enjoy) করা যায় না, তাই কমপক্ষে বিয়ের ৪/৫ বছর পর বাচ্চা নেয়া উচিত। আর দ্বিতীয় বাচ্চা ৫/৭ বছরের ব্যবধানে নেয়া উচিত। আমরা দু'টার বেশি বাচ্চা নেব না।'... ইত্যাদি। এ ধরনের কথাবার্তা শুনলে মনে হয় যেন বাচ্চা নিজের ইচ্ছামতো বা খেয়াল-খুশীমতো আগে-পরে যখন-তখন নেয়া যায়, নিজের ইচ্ছেমতো ১/২/৩ টা এরূপ সংখ্যাও নির্ধারণ করা যায়; এ ক্ষেত্রে আল্লাহর যেন কোন ক্ষমতাই নেই!
৩৫. কোন জীবিত বা মৃত ব্যক্তির নিকট গায়েবী সাহায্য পাওয়া: আল্লাহ ব্যতীত কোন সৃষ্টির নিকটে রোগ, বিপদমুক্তি, রিযিক, সন্তান, সম্পদ ইত্যাদি চাওয়া।
৩৬. মন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তন: সিলভা, কোয়ান্টাম বা অন্য কোন মেথডের (পদ্ধতি) দ্বারা মন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানো এবং সকল সমস্যার সমাধান লাভ করার মাধ্যমে জীবনে সফলতা অর্জন করার কথা বলা।
৩৭. কপালে টাকা স্পর্শ করে তা সম্মান করা: টাকা-পয়সা মানুষের সম্পদ। তা মানুষের জীবনের প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। সে হিসেবে টাকা-পয়সা মানুষের খাদিম। মানুষ টাকার খাদিম বা গোলাম নয়। সম্পদের সম্মান হচ্ছে তাকে সংরক্ষণ করা, তাকে অবজ্ঞা ও তুচ্ছ জ্ঞান না করা। পায়ের নিচে ফেলে এটাকে দলিত-মথিত না করা। মাথা ও কপাল ঠেকিয়ে আল্লাহ্ ইবাদত করা হয় এবং তাঁকে সম্মান জানানো হয়। তাই কপালে টাকা স্পর্শ করে টাকাকে সম্মান করা বা 'Money is the Second God' বলা টাকাকে পূজা করারই শামিল। এ কাজটি অনেক মুসলিম ব্যবসায়ীদের মাঝে পরিলক্ষিত হয়। দোকান খোলার পর প্রথম বিক্রি হলেই তারা এ কাজটি করে থাকে।
৩৮. গ্রহ নক্ষত্রের তা'ছীর (প্রভাব): অনেকের ধারণা মানুষের ভাল-মন্দ, বিপদ- আপদ, উন্নতি-অবনতি ইত্যাদি গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাবে হয়। কেউ বিপদে পড়লে বলা হয়, 'এ ব্যক্তির ওপর শনি গ্রহের প্রভাব পড়েছে'। কারো আনন্দের খবর শুনলে বলা হয়ে থাকে, 'এ ব্যক্তি মঙ্গল গ্রহের নজরে সু নজরে আছে'।
৩৯. চন্দ্র ও সূর্য গ্রহণের প্রভাব: অনেকের ধারণা চন্দ্র ও সূর্য গ্রহণ মানুষের ভাল- মন্দ, জন্ম-মৃত্যু, বিপদ-আপদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে।
৪০. নব জাতকের জন্য: নব জাতকের হাতে চামড়ার চিকন তার বা তাগা বা গাছ বা এ ধরনের অন্য কোন কিছু চুড়ির মতো করে বেঁধে দেয়া হয় যাতে কোন অশুভ রোগ-বালাই বা বদ জ্বিন-ভূত স্পর্শ করতে না পারে। আবার নবজাত শিশুকে জ্বিনের অশুভ দৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য বাচ্চার কানে ছিদ্র করা, বাচ্চার বালিশের নিচে জুতার টুকরা রাখা অথবা শিশুর মাথার চুল না কাটা। চোখের দৃষ্টি বা চোখ লাগা থেকে শিশুসন্তানকে রক্ষার জন্য সন্তানের গলায় মাছের হাড়, শামুক ইত্যাদি ঝুলিয়ে রাখা, কপালে কালো টিপ বা দাগ দেয়া।
৪১. গায়রুল্লাহ্র নামে কসম করা: আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 'যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহর নামে কসম করল, সে কুফরী করল অথবা শির্ক করল।' মূলত, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন নামে কসম করলে কসম হয় না। কসম করার ক্ষেত্রে আমাদের কিছু কুসংস্কার রয়েছে। যেমন কসম করার জন্য আমরা বলি- আমার বাপ-মায়ের কিরা (শপথ), আমার পুত্রের কসম, খাজা বাবার কসম, বদর পীরের দোহাই, ল্যাংটার দোহাই, এই তোর মাথায় হাত দিয়ে বললাম, বিদ্যা ছুঁয়ে বললাম, তিন সত্যি করলাম, রাসূলুল্লাহ্ র কসম, কা'বা শরীফের কসম, নিজ চোখের কসম, নিজ যৌবনের কসম, নিজ হাত-পা'র কসম, আগুনের কসম, রক্তের কসম, খাদ্যদ্রব্যের কসম, নিজের বাপের কসম, নিজের মায়ের কসম, নিজের সন্তানের কসম, নিজ প্রিয়জনের কসম, তোমার মায়ের কসম, তোমার কসম, নিজের বিদ্যার কসম, পশ্চিম দিকে মুখ করে বলছি, বই মাথায় নিয়ে বা বিদ্যার উপর হাত দিয়ে বলছি, তোমার গা, মাথা বা হাত ছুঁয়ে বলছি ইত্যাদি। ইত্যাদি। এ ধরনের কসমের কোনটাই ঠিক নয়, এগুলো শিকযুক্ত কুসংস্কার।
৪২. উকীল, মধ্যস্থতাকারী, শাফা'আতকারী, সুপারিশকারী: যারা কোন জীবিত বা মৃত আলিম, পীর, ওলী, বুযুর্গের কাছে গায়েবী সাহায্য চায়, তারা এভাবে ওযর পেশ করে- 'আমরা পাপী, পাপীর দু'আ আল্লাহ কবুল করেন না। তাই এ সকল বুযুর্গ ব্যক্তিরা আমাদের জন্য আল্লাহ্র কাছে সুপারিশ করবেন।'
৪৩. আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য পীর, ওলী বা বুযুর্গ ব্যক্তির অসীলা গ্রহণ: আল্লাহকে পাওয়ার জন্যে, তাঁর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে, ক্ষমা ও সাহায্য পাওয়ার আমার কোন জীবিত বা মৃত পীর, ওলী বা বুযুর্গ ব্যক্তিকে অসীলা বা মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা।
আরও কিছু প্রচলিত শির্ক:
১. শরী'আত প্রবর্তন ও হালাল-হারাম সাব্যস্ত করার ক্ষমতা আল্লাহ ছাড়া অন্যের আছে বলা।
২. 'আল্লাহ আর এই পোষা কুকুরটি না হলে আজ রাতে আমার বাড়িতে চুরি হয়ে যেত।', 'আল্লাহ এবং আপনি না হলে আজকে মহা অঘটন ঘটে যেত।'- এ ধরনের কথা বলা।
৩. আল্লাহ তা'আলাকে ভালবাসার ন্যায় পীর, ওলী-আওলিয়াদেরকে ভালবাসা।
৪. ওলিগণকে আল্লাহ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী ও শাফা'আতকারী হিসেবে মনে করা।
৫. বিভিন্ন তন্ত্র-মন্ত্রের মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক করা, যেমন- সুলায়মানী নকশা, ইয়াহুদীদের নিকট থেকে প্রাপ্ত বিদ্যা তথা কুরআনের আয়াতসমূহ সংখ্যায় লিপিবদ্ধ করা, বিভিন্ন নবী, ফেরেশতা, ওলী, জ্বিন ইত্যাদির নাম দ্বারা তাবীয-কবচ তৈরি করা বা ব্যবহার করা।
৬. আওলিয়াদের কবর থেকে বরকত লাভ ও রোগ মুক্তির জন্য সন্তানদেরকে সেখানে নিয়ে যাওয়া এবং তাদের গায়ে মাযারের পানি ছিটানো ও পান করানো।
৭. মৃত্যুর পর ওলিগণ রূহানী শক্তিবলে অনেক কিছু করতে পারেন বলে বিশ্বাস করা।
৮. দু'আ গৃহীত হওয়ার জন্য মুরশিদ, পীর ও ওলিদের মাযারের দিকে মুখ করে দু'আ করা।
৯. আওলিয়াদের মাযারে অবস্থান করে তাঁদের বাতেনী ফয়েয হাসিল করা এবং তাঁদের মাধ্যমে আল্লাহর নিকটবর্তী হতে চাওয়া।
১০. আওলিয়াদের কবরের উপর অথবা পার্শ্ববর্তী স্থানে উৎপন্ন বা লাগানো গাছের শিকড়, ফল ও পাতার মাধ্যমে বরকত ও বিবিধ কল্যাণ লাভ করা যায় বলে মনে করা।
১১. আওলিয়াগণ নিজস্ব মর্যাদা বলে আল্লাহর কোন পূর্বানুমতি ব্যতীত তাঁদের ভক্তদের জন্য শাফা'আত করে তাদেরকে মুক্তি দিতে পারবেন বলে বিশ্বাস করা।
১২. ওলিগণের মধ্যে যারা গাউছ ও কুতুব তারা পৃথিবী পরিচালনা করেন বলে বিশ্বাস করা।
১৩. আওলিয়াদের কবরের পার্শ্বে দাঁড়িয়ে বিনয় প্রকাশ করা।
১৪. কবরের পার্শ্বে প্রদক্ষিণ করা।
১৫. রাসূল (ﷺ)-এর অতিভক্তি করতে যেয়ে তাঁর প্রশংসা ও স্তুতি বর্ণনা করে এমন সব কথা-বার্তা বলা, যা তাঁকে আল্লাহ ও প্রতিপালকের মর্যাদায় উন্নীত করে।
১৬. কোন ভাস্কর্য বা স্মৃতিসৌধকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য নিরবে দাঁড়িয়ে থাকা।
১৭. মাযারের পুকুর, দিঘি ও কূপের পানি পান করে এবং মাছ, কচ্ছপ ও কুমীরকে খাবার দিয়ে রোগ মুক্তি ও বরকত কামনা করা।
১৮. দুধের গাভী ও নতুন বাচ্চার গলায় তা'বীজ, জুতা ও জালের টুকরা ঝুলানো।
১৯. স্বামীকে বাধ্য করার জন্য গোপনে ঘরের চুলা, বিছানা, বালিশ বা অন্য কোথাও তা'বীজ রাখা।
২০. পত্র লেখার সময় আল্লাহ্র রহমত ও পত্র প্রাপকের দু'আকে সম-মর্যাদাবান করে এমনটি বলা যে, 'আমি আল্লাহর রহমতে ও আপনার দু'আয় ভাল আছি।'
২১. চোখের কুদৃষ্টি থেকে ক্ষেতের ফসল রক্ষার জন্য মাটির পাত্রের পিঠে চুনা লেপ দিয়ে তা ক্ষেতে রেখে দেয়া।
২২. কারো নামে ছেলের নাক-কান ছিদ্র, আংটি পরানো, চুল রাখা, টিকি রাখা ইত্যাদি।
২৩. কোন দিকে যাত্রা করার সময় ঘরের দুয়ারে 'মা খাকি' বলে বিদায় গ্রহণ করা।
২৪. কোন জিনিসের রোগ বা পীড়ার ছুত লাগে বলে বিশ্বাস করা।
২৫. কলেরা, দাদ, একজিমা, এইডস, প্লেগ ও যক্ষা ইত্যাদি রোগকে 'আল্লাহ্ ইচ্ছায় সংক্রামক রোগ' হতে পারে এমনটি না বলে কথায় ও লেখনিতে এগুলোকে শুধু সংক্রামক রোগ বলা।
২৬. কোন বস্তুকে আল্লাহর ইচ্ছা ও তাঁর রহমতে কোন রোগের ক্ষেত্রে উপকারী বা অপকারী এমনটি না বলে সরাসরি সে বস্তুকেই উপকারী বা অপকারী বলা। যেমন, 'নাপা ট্যাবলেট জ্বর সারানোর জন্য উপকারী' বা 'অমুক ঔষধ এ রোগ সারানোতে উপকারী'-এ ধরনের কথা বলা।
২৭. কোন ঔষধ খেয়ে আল্লাহ্র রহমতে রোগ সেরেছে এমনটি না বলে অমুক ঔষধ খেয়ে আমার রোগ সেরেছে এমনটি বলা। যেমন, এ রকম কথা বলা যে, 'নাপা খেয়ে আমার জ্বর সেরেছে।'
২৮. তেমাথা পথে ভেট দেয়া, পূজা উপলক্ষে কাজ-কর্ম বন্ধ রাখা, দোল পূজায় আবির মাখানো, বিষকর্ম পূজায় ছাতু খাওয়া, পৌষ মাস সংক্রান্তিতে গরু দৌড়ানো, ঘোড়া দৌড়ানো, আশ্বিন মাস সংক্রান্তিতে গাশ্চি, গোফাগুনে পূজা উপলক্ষে আমোদ উৎসব, নতুন কাপড় ক্রয়, পার্বনী দেয়া, মনসা পূজা উপলক্ষে নৌকা দৌড়ানো, হিন্দুদের আড়ঙ্গে, মিছিলে, উৎসবে যাওয়া।
২৯. পহেলা বৈশাখে হিন্দুদের অনুসরণে সিঁদুর, তিলক, হলুদ শাড়ী, ধূতি পড়ে 'এসো হে বৈশাখ' গান গেয়ে মঙ্গল প্রদীপ জ্বেলে, পান্তা-ইলিশ খেয়ে হিন্দুদের দেবদেবীর প্রতিমূর্তি নিয়ে মিছিল করে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান করা।
৩০. কাউকে 'পরম পূজনীয়' সম্বোধন করে লেখা, 'কষ্ট না করলে কেষ্ট পাওয়া যায় না' বলা, 'জয়কালী নেগাহবান' ইত্যাদি বলা।
৩১. আল্লাহর হুকুম ছেড়ে অন্য কারো আদেশ বা সামাজিক প্রথা পালন করা।
৩২. কোন কাজ সমাধা করার জন্য অনেকে আল্লাহর প্রতি পরোয়া বা ভরসা না করে নেতৃবৃন্দ, ধনাঢ্য ব্যক্তি, রাজ কর্মচারী ইত্যাদি উচ্চপদস্থ ব্যক্তির নিকট ধর্ণা দিয়ে বলে, 'এ কাজে আপনি আমার একমাত্র ভরসা', 'আপনি বাঁচাতে পারেন, মারতে পারেন', 'আপনার হিল্লাতেই টিকে আছি', 'আপনি ছাড়া তো উপায় নেই', 'পৃথিবীতে আপনি ছাড়া আমাকে দেখবার আর কেউ নেই', 'আপনার সুদৃষ্টি ছাড়া চলার কি পথ আছে', 'উপরে আল্লাহ নীচে আপনি' ইত্যাদি যাবতীয় বক্তব্য এবং সেই সঙ্গে তাদের নিকট আকুতি-মিনতি, অনুনয়-বিনয় করা, কুর্ণিশ করা, করজোড় করা, ফুলের মালা দেয়া, অভিনন্দন ও প্রশংসা করার মাধ্যমে এবং নত মস্তকে চোখের পানির দ্বারা স্বীয় স্বার্থ উদ্ধারের জন্য আল্লাহ হতেও অধিক ভক্তি শ্রদ্ধা দেখানো ইত্যাদি।
৩৩. আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উদ্দেশ্যে সলাত আদায় করা, সাওম পালন করা, দান করা, যাকাত দেয়া ইত্যাদি।
৩৪. ধন, বিদ্যা, সুখ-সম্পদ, আপদ-বিপদ, যুগ, কাল ইত্যাদি কোন দেবদেবী যথা লক্ষ্মী, সরস্বতী, কালী, কলি ইত্যাদির প্রতি আরোপ করা।
৩৫. দেবদেবীর সাথে কাউকে তুলনা করা, যেমন- লক্ষ্মী ছেলে, লক্ষ্মী মেয়ে, লক্ষ্মী বউ, লক্ষ্মী মা, লক্ষ্মী বাবা, ঘরের লক্ষ্মী, মণির দশা, কলিকাল, মহাদেবের দোহাই, দেখতে একটা দেবতার বা দেবীর মতো, ঠিক দেবীর মতোই সুন্দরী প্রভৃতি বলা।
৩৬. কাউকে জ্বিন, ভূত, প্রেত ধরেছে সন্দেহে ঐগুলো দূর করার জন্য গরু, মুরগী, হাঁস, বকরী ইত্যাদি ভেট (ভোগ) দেয়া।
৩৭. হিন্দুদের উৎসব বা পূজার দিনকে সম্মান করা, হিন্দুর কালীবাড়ীর মেলার দিনের বা মেলার সম্মানার্থে বা মেলার সৌন্দর্য বৃদ্ধিকল্পে যোগদান করা অথবা তাদের অনুসরণে কিছু করা। অনুরূপভাবে, খৃষ্টানদের উৎসব ও ধর্মীয় দিন, যেমন- ক্রিস্টমাস ডে (বড়দিন), ভ্যালেন্টাইন ডে (ভালবাসা দিবস), থার্টি ফাস্ট নাইট ইত্যাদি উদ্যাপনের জন্য তাদের সাথে যোগদান করা, আনন্দ করা, সহযোগিতা কল্পে, সম্মানার্থে বা সৌন্দর্য বৃদ্ধি কল্পে কাজ করা।
৩৮. 'অমুক আমাকে বাঁচাল' বা 'অমুক আমার/আমাদের সর্বনাশ করল' এরূপ বলা।
৩৯. যদি কেউ উঠতে-বসতে মনে করে যে, 'অমুক পীর বা নবী আমার সব অবস্থা দেখছে, শুনছে ও জানতে পারছে; আমার কোন বিষয়ই তার নিকট গোপন থাকে না।'
৪০. পীর, অলী, আলেম, নবীকে ডাকার সময় 'হে মা'বুদ (হে একমাত্র ইবাদাতের যোগ্য), বেপরওয়া খোদাওন্দ (পরম প্রভু), মালিকুল মুলক শাহানশাহ- এ ধরনের আল্লাহ তা'আলার গুণ প্রকাশক শব্দ ব্যবহার করা।
৪১. কেউ যদি বলে অমুক লোক অমুক পীর/ওলীর ক্রোধে পড়ে পাগল হয়েছে, অমুক ওলী/দরবেশকে অসন্তুষ্ট করেছিল বলেই অমুকের এত দুর্দশা হয়েছিল, অমুকে দয়াতে অমুকে জিতেছে, ঐ কাজটা অমুক দিন অমুক সময়ে আরম্ভ করা হয়েছিল বলেই ভাল হয়েছে বা বিগড়ে গিয়েছে।
৪২. আল্লাহ তা'আলা অধিকাংশ জনগণের রায়ের মাধ্যমে ক্ষমতা দান ও তা ছিনিয়ে নেয়ার মালিক হওয়া সত্ত্বেও কথায় ও লেখনিতে 'দেশের জনগণকে ক্ষমতার মালিক' ও 'জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস' এরূপ মনে করা।
৪৩. রিয়া বা লোক দেখানো ইবাদত।
৪৪. কার্যকারণের সহায়তা গ্রহণ করা ও এর দ্বারাই কাজ সম্পাদনের বিশ্বাস।
৪৫. পাশা, তীর, টিয়াপাখি ইত্যাদির সাহায্যে ভাগ্য জানতে চাওয়া। ফালনামা, খাবনামা, তালেনামা, কুরআন থেকে ফাল নেয়া।
৪৬. হস্তরেখা গণনা, যাদুবিদ্যা, রাশিচক্র, ১০০% গ্যারান্টিতে রোগমুক্তির কথা বলা।
৪৭. চেহারা দেখেই অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের কথা বলে দেয়া।
৪৮. আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে সিজদা করা, কবর-মাযার সিজদা করা।
৪৯. সালাম দেয়ার সময় ঝুঁকা (এমনকি সামান্য মাথা ঝুঁকানোও) অথবা কারো সম্মানার্থে মাথা নত, সিজদা ও কদমবুসী করা।
৫০. কারো সামনে মূর্তিবৎ হাতজোড় করে দাঁড়ানো ও বসে থাকা।
৫১. পীর/ওলীর নামে গাড়ি, বাড়ি, দোকানের নাম রাখা, মাল উঠাতে 'ইয়া আলী', 'ইয়া নবী', 'ইয়া রাসূল' ইত্যাদি বলা।
৫২. আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নিকট দু'আ বা প্রার্থনা জ্ঞাপন করা।
৫৩. নিজ ইচ্ছায় ছেলে-মেয়ে জন্ম, হুজুর/পীর/ওলী/দরবেশের দু'আয় সন্তান লাভ বলা।
৫৪. গায়রুল্লাহর নামে মানত করা (যেমন- কবর, মাযার, দরবার ও মুকামে মানত করা), আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে পশুপালন।
৫৫. আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে জবেহ বা কুরবানী করা।
৫৬. শির্ক-কুফর যুক্ত ঝাড়ফুঁক, তা'বীয-তুমার ও কবচ বাঁধা।
৫৭. আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ওপর নির্ভর করা।
৫৮. আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ভয় করা বা অন্য কারো কাছে আশা করা।
৫৯. যিকিরের সময় পীর/ওলী/নবী/রাসূলের কলবের অসীলা গ্রহণ।
৬০. আল্লাহর ইচ্ছা বা অভিপ্রায়ে অংশীদার স্থাপন করা।
৬১. রূহানী শক্তিবলে মুশকিল আসান, খাজা বাবার দু'আর কথা বলা।
৬২. নিজের বা অপরের ভাল বা মন্দ করার ক্ষমতা থাকার কথা বলা।
৬৩. রত্ন-পাথরের মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তন, পীরের অন্ধ আনুগত্য করা।
৬৪. কবর ও মাযার পূজা, মাযারে ফুল (পুষ্পস্তবক) অর্পণ, গিলাফ জড়ানো ও বাতি জ্বালানো।
৬৫. কবরে আযান দেয়া, কবরে পীরের শাজরা, জামা, পাগড়ী বা অন্য বস্তু রাখা।
৬৬. চাল পড়া, আয়না পড়া, কুরআন ঘোরানো, তুলা রাশির মাধ্যমে চোর ধরা।
৬৭. গ্যারান্টি দিয়ে কলব জারী, আল্লাহ শুধু বাতেনী অবস্থা দেখবেন।
৬৮. কবরকে সামনে রেখে সলাত, কবরকে তাওয়াফ, কবরে মশারী টাঙানো।
৬৯. মাযারো টাকা দেয়া, পীর/ওলী/নবী/রাসূলকে হাযির-নাযির জানা।

টিকাঃ
১. আহমাদ ও আত্ব-ত্বাবারানী কর্তৃক সংগৃহীত।

📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 শিরক থেকে পরিত্রাণের উপায়

📄 শিরক থেকে পরিত্রাণের উপায়


আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন,
﴿الر كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِ رَبِّهِمْ إِلَى صِرَاطِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ﴾ (سورة إبراهيم: 1) 'এ কিতাব যা তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি যাতে তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের নির্দেশে অন্ধকার থেকে নিয়ে আসতে পার আলোর দিকে।' [সূরা ইব্রাহীম (১৪):১]
১. ইসলামের মৌলিক জ্ঞান প্রদানের ব্যবস্থা করা: আমাদের দেশে যারা শির্ক, বিদআত ও কুসংস্কার চর্চাকারী, যেমন মাযার ও অবৈধ খানকাহ সেবী এবং সেখানে গমনকারীদের মধ্যে শতকরা ৯৯ জনের রয়েছে জ্ঞানগত সমস্যা। তাদের বিভ্রান্তির এটা অন্যতম প্রধান কারণ। এ জন্য দেশের মাদরাসাগুলোতে বিশুদ্ধ ইসলামী আক্বীদা বিষয়ক শিক্ষা বেশি করে দিতে হবে।
২. শির্ক চিহ্নিত করা: এ সমাজের অধিকাংশ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ইসলামী দিক নির্দেশনার জ্ঞান এবং আক্বীদা বিষয়ক ন্যূনতম জ্ঞানের অভাবে প্রায় ৯৫% জন শিরকে লিপ্ত। তারা জানে না যে, চিন্তা ও কর্মের কোনটি শিরকের অন্তর্ভুক্ত। তাই সমাজ হতে শির্ক মূলোৎপাটনের জন্য প্রয়োজন তা চিহ্নিত করা।
৩. শিকের ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষতির দিক তুলে ধরা: সমাজ থেকে শির্ক মূলোৎপাটনের অন্যতম প্রক্রিয়া হল মানুষের নিকট শিরকের ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষতির দিক সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা। তাদের ধর্মীয় জ্ঞান স্বল্পতার সুযোগকে পুঁজি করে ধর্মের ছদ্মাবরণে প্রতারক শ্রেণী তাদেরকে শিরকে লিপ্ত করে এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই, এ শ্রেণীর মানুষের কাছে ধর্মীয় ও আর্থ-সামাজিক দিকে থেকে শিরকের ক্ষতির বিষয়টি বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব হলে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে বলে মনে হয়। কেননা, সাধারণ মানুষ সব সময়ই শান্তিপ্রিয় হয়ে থাকে। তারা সামর্থের মধ্যে সমাজ থেকে শোষণ দূর করে শান্তি- সমৃদ্ধি আনয়নের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে থাকে। তাই মানুষকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত করে চরিত্রবান হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। সুতরাং শিকের অসারতা প্রমাণ করা এবং মানুষকে ধর্মীয় ও আর্থ-সামাজিক বিষয়ে সচেতন করা, আজ বড়ই প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে লুথার কিং-এর কথাটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন,
'বিপুল সম্মান ও মনোরম প্রাসাদের মধ্যে কোন দেশের উন্নতি নিহিত থাকে না; বরং তা নির্ভর করে শিক্ষা-দীক্ষায় উন্নত চরিত্রবান অধিবাসীদের ওপর।'
৪. সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা: সমাজ থেকে শির্ক উৎখাত করার জন্য সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা সময়ের দাবী। অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে শায়খ সুলায়মান আত্-তামীমী (রাহি.) মুসলিম সমাজ হতে শির্ক উৎখাত করার প্রবল আন্দোলন শুরু করেন। আরবের বাইরেও এ আন্দোলন বিস্তার লাভ করে। ফলে ১৮০২-১৮০৬ ঈসায়ী সালের মধ্যে কারবালা, মক্কা, মদীনা প্রভৃতি স্থান থেকে অনেক তথাকথিত পবিত্র স্থান ও মাযার ধংসের মাধ্যমে শিক্কের মূলোৎপাটিত হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের ইতিহাসে সৈয়দ আহমদ শহীদ ও তাঁর অনুসারী শাহ ইসমাঈল শহীদ এবং শারাফত আলী প্রমূখ বিজ্ঞ আলিমগণ অশেষ সংস্কার সাধন করেন। হাজী শরীয়তুল্লাহ ১৮০৪ ঈসায়ী সালে এক সংস্কার আন্দোলন শুরু করেন। তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র দুদু মিয়া সেই আন্দোলন চালিয়ে যান। আজও সে আন্দোলনের প্রভাব আমরা প্রত্যক্ষ করছি। সে ধারাবাহিকতায় আজও সরকার, উলামায়ে কিরাম ও সমাজের সর্বস্তরের মুসলিম জনসাধারণ সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।
৫. কুরআন ও হাদীস থেকে সরাসরি জ্ঞান অর্জনের অভ্যাস গড়ে তোলা: আমাদের দেশের শিক্ষিত বা অশিক্ষিত মানুষ নির্বিশেষে পড়ার অভ্যাস খুবই কম। তারা প্রায় সকলেই লোক মুখে দ্বীন জানতে চেষ্টা করে থাকে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী জানা যায়, কুরআন শুধু পড়তে জানেন এমন মুসলিমের সংখ্যা শতকরা ৪০জন। তাদের মধ্যে নিয়মিত তিলাওয়াতকারীর সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকজন। তারপরও দ্বীনী বিষয় অধ্যয়নের অভ্যাস একেবারেই কম। এমনকি আলিমদের মধ্যেও এ অভ্যাস অত্যন্ত কম। অবশ্য এ পেছনে কিছু ঐতিহাসিক কারণও জড়িত। তা হল, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ন্যায় এ দেশে ইসলাম এসেছিল মুসলিম আরব বণিক ও কিছু দাঈ তথা মুহাদ্দিছ ওলামায়ে দ্বীনের মাধ্যমে। পরবর্তীতে দরবেশ শ্রেণীর মাধ্যমে। তাঁরা নসিহাত ও ব্যক্তি জীবনে আচরিত আমল দ্বারা মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করেছেন এবং মানুষেরা তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইসলাম কবুল করেছেন। ফলে, ইসলাম গ্রহণের পূর্বেও তারা যেমন কুরআন-হাদীস পাঠ করার সুযোগ পায়নি এবং ইসলাম গ্রহণের পরেও তাদের মধ্যে কুরআন-হাদীস অধ্যয়নের অভ্যাস গড়ে ওঠেনি। এ কথা বলা যেতে পারে যে, এ দেশে ইসলামের আগমন কিতাবের মাধ্যমে নয়, বরং ব্যক্তি মানুষের আচরিত কাজ-কর্মের ও মুখের মাধ্যমে। যে কারণে এ দেশের মানুষ কুরআন-হাদীসের সাথে সরাসরি পরিচিত হয়নি। একই কারণে আক্বীদা বিষয়ক ত্রুটি বিচ্যুতিও তাদের মাঝে বেশি পরিমাণে লক্ষ্য করা যায়। বর্তমান সময়ে উপরোক্ত ত্রুটি ও ভ্রান্তিতা মুক্তির জন্য প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব প্রত্যহ যত বেশি সম্ভব কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদীস অধ্যয়ন করা। আরবীর সাথে এর অর্থ ও বিশুদ্ধ তাফসীর অধ্যয়ন করা। এ অধ্যয়ন আমাদেরকে সমাজের অগণিত খেলাফে' সুন্নাত জানার সুযোগ সৃষ্টি করে দেবে। হৃদয়ে রাসূল () এবং তাঁর সাহাবীদের প্রতি ভালবাসা সুদৃঢ় করবে।
৬. সুন্নাতের যথাযথ অনুসারী হওয়া:
এক কথায় আমাদের হৃদয় ও জ্ঞান জগৎ সর্বদা ব্যস্ত থাকবে রাসূল ()-এর প্রকৃত তথা বিশুদ্ধ সুন্নাত জানার চেষ্টায়, আর আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যস্ত থাকবে তাঁর সুন্নাতের অনুসরণ ও অনুকরণের চেষ্টায়। এভাবেই আমরা সাহাবীদের অনুরূপ অনুসরণ ও অনুকরণ প্রিয়তা কিছুটা হলেও অর্জন করতে পারব। এর মধ্যেই দ্বীনের বিশুদ্ধতা রক্ষা করা সম্ভব। দ্বীনের মধ্যে অনুপ্রবিষ্ট সকল শির্ক ও বিদআত দূরীকরণ কেবলমাত্র এর মাধ্যমেই সম্ভব। মুসলিমরা যতদিন সুন্নাতের অনুসারী ছিল, ততদিন তাদের মধ্যে বিশুদ্ধ দ্বীন বর্তমান ছিল। এর মহব্বত কমতে থাকার ফলে শিক্ক বিদআত আমাদের প্রিয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এটাকেই আমরা দ্বীন হিসেবে মনে করছি। প্রকৃত কথা হচ্ছে মুসলিম সমাজে শির্ক-বিদআত জন্ম নিয়ে একটি করে ইবাদতের পদ্ধতি ও সুন্নাত দূরীভূত হয়। শির্ক সকল গোমরাহীর মূল। তাই শিক্ক মূল্যেৎপাটনের জন্য আমাদেরকে সুন্নাতের যথাযথ অনুসরণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, দুনিয়ার কোন পীর-বুযুর্গ-মুরব্বী নয়, কোন ক্ষমতাশালী পণ্ডিত নয়; কেবলমাত্র আল্লাহর রাসূল () এবং তাঁর সাহবীগণ আমাদেরকে যা নির্দেশ করেছেন, তার বাইরে কোন কাজ করা তো দূরের কথা, চিন্তাও আমরা করব না। তবেই আমাদের চিন্তা ও কর্মকে শির্ক মুক্ত রাখতে সক্ষম হব।
শিকের মূলোৎপাটন প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের রূপরেখা
আমাদের দেশের দেশের মাজার, খানকাহ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মুসলিমদের চিন্তা ও কর্ম হতে শির্ক মূলোৎপাটনের জন্য নিম্নলিখিত উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে:
প্রথমত, উলামা-ই-কিরামগণের সম্ভাব্য ভূমিকা: পীর-মাশায়েখ ও উলামা-ই-কিরামগণ সমাজ বিচ্ছিন্ন কোন জীব নয়, নয় নিছক পরকালীন ভাবনায় নিয়োজিত কোন দূর জগতের বাসিন্দা। সমাজের আর দশ জন মানুষের সাথেই তাঁরা বসবাস করেন। দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি তাঁদের দায়িত্ব রয়েছে। তাঁরাই আমাদের সমাজের দ্বীনী বিষয়ে নেতৃত্ব প্রদান করে থাকেন। মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও অনুষ্ঠানসমূহের পরিচালক হিসেবে এখনও তাঁরাই দায়িত্ব পালন করেন। মানুষ ইসলাম সম্পর্কে জানার জন্য তাঁদের শরণাপন্ন হয়ে থাকে- এ দিক হতে তাঁরা অঘোষিত পরিচালক। এমনকি জাতীয় প্রচার মাধ্যমে ও পত্র-পত্রিকায় ধর্মীয় বিষয়গুলো অনেক সময় তাঁদের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়ে থাকে। মোটকথা, এ দেশের মানুষ ইসলাম সম্পর্কে তাঁদের নিকট থেকে সঠিক দিক-নির্দেশনা পেয়েছে; আবার মানুষের বিভ্রান্তিতে নিপতিত হওয়ার অন্যতম কারণও পীর-মাশায়েখ, আলম-উলামা, ইসলামী পণ্ডিত নামের কতিপয় ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর অপতৎপরতা। আমরা লক্ষ্য করেছি, ইতোপূর্বে মুসলিম উম্মাহ্র রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের মধ্যকার দ্বন্দ্ব মুসলিমদের শক্তি, সামাজিক কাঠামো, চিন্তাধারা এবং প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে ধ্বংসের সূচনা করে। কালক্রমে ইসলাম তার প্রাণশক্তি আর ধরে রাখতে পারেনি। ফলে, ইসলামের বাদবাকী অংশটুকু শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক শিক্ষা হিসেবে শতাব্দীর পর শতাব্দি ধরে টিকে আছে। এ তিক্ত ফাটল মুসলিম উম্মাহ্র মাঝে সব ধরনের ব্যবহারিক এবং সামাজিক দায়িত্ব থেকে ধর্মীয় নেতৃবৃন্দকে দূরে সরিয়ে রাখে। এক পর্যায়ে মুসলিমদের মন আবদ্ধ হয়ে যায় কেবল মসজিদের সীমাবদ্ধ গণ্ডিতে। চলতে থাকে কুরআন-হাদীসের শাব্দিক বিশ্লেষণ ও তরজমা। এটা মূলত দেশের শাসকমণ্ডলীর চরিত্র নষ্ট হওয়ার কারণেই নিরীহ সাধারণ জনগণের চরিত্রের অবনতি হয়ে থাকে। আর শাসকগোষ্ঠীর চরিত্র কলুষিত হওয়ার একটিমাত্র কারণ দেশের আলিম সমাজের চরিত্রহীনতা, অর্থলিপ্সা এবং নাম-যশের প্রতি অসাধারণ লোভ-লালসা। আসলে, কুরআন ও সহীহ হাদীসের ভিত্তিতে আলিম সমাজ নিজেদের মধ্যে অনৈক্য দূর করে শির্ক মূলোৎপাটনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে সময়োপযুগী ভূমিকা পালন করা তাঁদের ঈমানী দায়িত্ব। এ পর্যায়ে আমাদের দেশে শির্ক মূলোৎপাটনে উলামা-ই-কিরামগণের সম্ভাব্য ভূমিকা নিম্নে আলোচনা করা হল:
১. মসজিদ কেন্দ্রীক সংস্কারমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা: মসজিদ থেকে সর্বপ্রথম এ ব্যাপারে সংস্কারমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে মসজিদে নিয়মিত মুসল্লী ও তার প্রতিবেশীদের ব্যক্তিগঠন ও বিকাশের জন্য ইসলামী আদর্শকে মডেল হিসেবে সামনে রাখতে হবে। ইসলামের সঠিক আক্বীদা ও বিশ্বাসের যথাযথ তালিম মসজিদ থেকেই প্রদান করতে হবে। সমাজে বসবাসরত সকল প্রাপ্ত বয়স্ক মুসলিমকে প্রত্যহ পাঁচবার নিয়মিত মসজিদমুখী করার মধ্যেই সংস্কার কাজের সফলতা নির্ভর করছে। কারণ, নিশ্চয়ই সালাত অশ্লীল ও মন্দকাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখে। আর তাওহীদের সাক্ষ্য প্রদানের অন্যতম মাধ্যম হল সালাত। তাই সমাজকে শির্ক ও বিদআতমুক্ত করতে সালাত তথা মসজিদ কেন্দ্রীক উদ্যোগ সফলতা বয়ে আনতে পারে। রাসূল () ও সাহাবীগণের জীবনী পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পারি, তাঁরা তাওহীদের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্য মসজিদকেই বেছে নিয়েছিলেন। মুসলিমরা যেখানেই গিয়েছে সেখানেই সর্বপ্রথম মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছে। এ মসজিদকে ঘিরেই সেই এলাকার মানুষকে দিয়েছে দ্বীনী তালিম, দূর করেছে শির্ক ও বিদ'আতের নানা কলুষতা। সমাজের মানুষের নৈতিক উন্নয়ন সাধনের জন্য ইসলামী নৈতিকতার তালিম দিতে হবে।
২. শিকের ভয়াবহতা তুলে ধরা: এ দেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে তাদের একটা অন্ধ আবেগ কাজ করে থাকে। ইবাদত সম্পর্কে তাদের সুস্পষ্ট ধারণা না থাকার ফলে ইসলামের নামে প্রচলিত যেকোন কাজকেই ইবাদত মনে করে। শরীআতের বিধি-নিষেধ পালন না করেই আধ্যাত্মিক উন্নতির আশায় বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বনের চেষ্টা করে। এর বিভিন্ন স্তর সম্পর্কে নানামুখী ধারণা তারা লাভ করে। এ বিষয়ে সঠিক ধারণা দেয়া অত্যন্ত জরুরী। দীর্ঘকাল ধরে আমাদের দেশে ইসলামের প্রচার-প্রসারের জন্য ওয়াজ-মাহফীল, ধর্মসভা ইত্যাদি নামে নানা অনুষ্ঠান পালিত হয়ে আসছে। অধিকাংশ সময়ই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর উদ্যোগে এ জাতীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। এ সকল অনুষ্ঠান সমাজের মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। উলামায়ে কিরাম সেখানে সম্মানিত অতিথি এবং আলোচক হিসেবে হাজির হন। উপস্থিত মুসলিম ও আয়োজকরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে তাঁদের কথা ও দিক-নির্দেশনা শোনার জন্য। এখন প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ নিয়ে আমাদের সমাজ দেহে সংক্রমিত শিরক, বিদআত ও কুসংস্কারগত রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
৩. জনমত গঠন করা: আজকের সমাজ ব্যবস্থায় মানুষ অতীতের যেকোন সময়ের তুলনায় সচেতন। সমাজে বসবাসকারী মানুষের অন্ধ আনুগত্যের চেয়ে ক্রমান্বয়ে যাচাই-বাছাইয়ের পরেই অনুকরণ করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারের সাথে সাথে পরিবার ও সমাজে মানুষের আন্তরিক সম্পর্কেরও পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। এমতাবস্থায় শিককে পর্যায়ক্রমিক মূলোৎপাটনের জন্য সচেতন মুসলিমদের সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। এক পর্যায়ে তা আন্দোলনের রূপ নিলেই সফলতার মুখ দেখতে পারবে।
৪. দ্বীন প্রচারে সাবধানতা অবলম্বন করা: শির্ক ও বিদআতের সাথে দূরতম সম্পর্ক আছে বা এর পথ সুগম করতে পারে এমন সকল কার্যাদি সতর্কতামূলকভাবে পরিত্যাগ করা এবং এমন কাজও পরিহার করা পরবর্তী পর্যায়ে যা থেকে শির্ক সংক্রমিত হতে পারে। কেননা, মানুষের চিন্তা ও কর্মে একবার কোন কাজের সূচনা হলে তা দূর করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে ঐ কাজ মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। কাজটি অসত্য ও যুক্তিহীন হলেও এক পর্যায়ে তা প্রতিষ্ঠা পায় এবং বড় হতে থাকে। তাই উলামায়ে কিরামকে এ ব্যাপারে অত্যন্ত সাবধানতার সাথে অগ্রসর হওয়া একান্ত আবশ্যক।
৫. বিশুদ্ধ আক্বীদা বিষয়ক জ্ঞান দান করা: ইসলামী আক্বীদা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও বিশুদ্ধ ধারণা থাকা প্রতিটি মুসলিমের জন্য অপরিহার্য। তাদের ঈমানী দৃঢ়তা ও তার দাবী পূরণে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞানের বিকল্প নেই। প্রতিটি মুসলিমের দ্বীনি দায়িত্ব কর্তব্য পালনের গ্রহণযোগ্যতা এবং তার পারলৌকিক প্রাপ্তিও এর ওপর নির্ভরশীল। আমাদের দেশের মুসলিমদের দ্বীনী ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দৈন্যতা আক্বীদার বিষয়ে। তাই আলিম সমাজের দায়িত্ব সাধারণ মানুষের মধ্যে বিশুদ্ধ আক্বীদা বিষয়ক জ্ঞানের প্রসার ঘটানোর জন্য কার্যকরী পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র ও সরকারের সম্ভাব্য ভূমিকা: আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা সমাজ ও নাগরিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এর জন্য রয়েছে আইন ও শাসনের রশি। তাই সমাজ থেকে শির্ক মূলোৎপাটনে রাষ্ট্র ও সরকার উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।
১. উলামায়ে-কিরামের সমন্বয়ে জাতীয় বোর্ড গঠন করা: বর্তমান সময়ে ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করার ভার এমন সব লোকের ওপর পড়েছে, যাদের অধিকাংশই ইসলাম সম্পর্কে সুস্পষ্ট জ্ঞান রাখেন না। ইসলামের আধুনিক অভিভাবকগণ নিজেদেরকে জ্ঞানী মনে করেন। কিন্তু বাস্তবতার মুখোমুখি হতে আগ্রহী নয়। আর ঘটনাচক্রে মুখোমুখি হলেও তার উপযুক্ত সমাধান দিতে পারেন না। তাঁরা ইসলামের প্রয়োগমুখী ব্যবহার সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিফহাল নন। তাই সমাজ সংস্কারের লক্ষ্যে দেশের বরেণ্য উলামায়ে-কিরামের সমন্বয়ে একটি বোর্ড গঠনমূলক জাতীয়ভাবে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন।
২. পাঠ্যক্রমে আক্বীদা বিষয়ক সিলেবাস অন্তর্ভুক্ত করা: দেশের শিক্ষা পাঠ্যক্রমের সকল পর্যায়ে আক্বীদা বিষয়ক জ্ঞান দানের লক্ষ্যে মৌলিক বিষয়সমূহ অন্তর্ভুক্ত করা। আক্বীদা বিষয়টির ত্রুটিপূর্ণ ও সীমিত চর্চার কারণে মুসলিমদের আক্বীদা বিশ্বাসে রয়েছে ঈমান বিধ্বংসী মারাত্মক ত্রুটি। বিশ্বাসের মধ্যে ত্রুটি থেকে গেলে যাবতীয় কাজের মধ্যে তার ক্ষতিকর প্রভাব প্রতিফলিত হতে বাধ্য। এ কারণেই এখানকার মুসলিমদের মধ্যে কবর পূজা, পীরপূজা, মাযার পূজার এবং শির্ক-বিদআতের মহামারী ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোকের বিশ্বাস হচ্ছে, কোন ব্যক্তিবিশেষকে উসীলা (মাধ্যম) না বানালে ঈমান ঠিক হবে না, আখিরাতে পার পাওয়া যাবে না এবং জান্নাতে প্রবেশ অসম্ভব হয়ে পড়বে। অথচ এ মধ্যস্বত্বভোগীদের উৎখাতের জন্যই ইসলামের আগমন। অথচ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসাসমূহের পাঠ্যপুস্তকে এ সংক্রান্ত আলোচনা নেই বললেই বলে। অতএব স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার পাঠ্য বইয়ে আক্বীদা বিষয়ক সিলেবাস অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে সরকারের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরী।
৩. প্রচার মাধমে জনসচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করা: ইংরেজীতে বলা হয়, 'Information is power' অর্থাৎ 'তথ্যই শক্তি'। মানুষের আক্বীদা পরিবর্তনে প্রচার মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই সরকার প্রচার মাধ্যমের দ্বারা শির্ক মূলোৎপাটনে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারে।
৪. মাযার ও খানকাসহ কবরপূজার অবৈধ স্থাপনা ধ্বংস করা: বর্তমান সময়ে মাযার ও খানকাহসমূহে শরীয়াত বিরোধী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অশিক্ষিত এবং অল্প শিক্ষিত মানুষদের ধোঁকা দিয়ে মাযার ও খানকায় ধর্ম ব্যবসা শুরু হয়েছে। তাই সরকারী হস্তক্ষেপে মাযার, খানকা, মূর্তি, ভাস্কর্য, স্মৃতিসৌধ ও কবরপূজার সকল উৎসমূলসহ শির্কের ভিত্তিকে ধ্বংস করতে হবে।
৫. রাষ্ট্রীয় বিশেষ নির্দেশ জারি করা: বর্তমান সময়ে মানুষ রাষ্ট্রীয় বিশেষ নির্দেশের প্রতি মর্যাদাশীল। তাই শির্ক মূলোৎপাটনের জন্য রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি করা জরুরী।
তৃতীয়ত, যুব সমাজের ভূমিকা: সব যুগে সব সমাজেই যুব সমাজ চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে থাকে। তারা সমাজের ভাঙ্গা গড়ার নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। সমাজের ভাল ও মন্দ অনেকাংশে তাদের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের যুব সমাজের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ইসলামী জীবনাদর্শে বিশ্বাসী। আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনের যুগেও তারা এ দেশে আসমানী কিতাবের অনুসরণে ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্নে বিভোর। তাই তারা সমাজ থেকে শির্ক মূলোৎপাটনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে।
চতুর্থত, সাধারণ মুসলিমদের ভূমিকা: ১. আক্বীদা বিষয়ক জ্ঞান আহরণ করা: সাধারণ মুসলিমরা আক্বীদা বিষয়ক জ্ঞান আহরণের মাধ্যমে শির্ক মূলোৎপাটনে ভূমিকা রাখতে পারে। ২. সরকার ও উলামায়ে-কিরামকে সাহায্য করা: শির্ক উৎখাতের জন্য সাধারণ মুসলিমগণ সরকার ও উলামাগণকে সহযোগিতা করতে পারে।
৩. সামাজিক সংস্কার আন্দোলন গড়ে তোলা: আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি থেকে শিক উৎখাতের জন্য সামাজিক সংস্কার আন্দোলন গড়ে তোলা আবশ্যক।
পঞ্চমত, শিক্ষিত মুসলিমদের ভূমিকা: দেশের শিক্ষিত মুসলিমদের দায়িত্ব সব সময়ই বেশি হয়। সাধারণ মানুষেরা তাদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। তাই শিক মূলোৎপাটনে শিক্ষিত মুসলিমগণ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।
ষষ্ঠত, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সংগঠনসমূহের ভূমিকা শিক্ একটি মারাত্মক ব্যাধি। তাই সমাজ থেকে শিক্ উৎখাতের জন্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সংগঠনসমূহকে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে।
প্রস্তাবনা: ১. ইমামগণ মুসলিমদেরকে মসজিদকেন্দ্রীক করা, শিরকের দুনিয়া ও আখিরাতের কুফল বর্ণনা করা, মানুষকে শির্ক বর্জন করার জন্য উদ্বুদ্ধকরণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারেন। ২. ইসলামী শরীয়াহ অসমর্থিত মাযারকেন্দ্রীক গড়ে ওঠা সকল স্থাপনা ভেঙ্গে দিতে হবে। ৩. আক্বীদা বিষয়ে জাতীয় প্রচার মাধ্যমগুলোতে প্রচারের ব্যবস্থা করা। ৪. সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও আলোচনা সভার আয়োজন করে শিরকের কুফল তুলে ধরা। ৫. মানুষের চিন্তা ও কর্মে বিদ্যমান শিকগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে এবং এর উৎসগুলো বন্ধ করতে হবে। ৬. মুসলিমদের মাঝ থেকে বিশুদ্ধ আক্বীদা বিষয়ক জ্ঞানের অভাব দূর করতে হবে।

টিকাঃ
১. বিস্তারিত দেখুন, শিরক কী ও কেন?, পৃষ্ঠা ২২৯-২৬৫।

📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 উপসংহার

📄 উপসংহার


খালেস ঈমান তথা সঠিক আক্বীদা মুসলিম জীবনের মূল বুনিয়াদ। এ বুনিয়াদের উপকরণে কলুষ, কালিমা ও ভেজালের অনুপ্রবেশ ঘটলে সমস্ত 'আমল বরবাদ ও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য। অন্যভাবে বলতে গেলে, মূলোৎপাটিত বৃক্ষের মাথায় পানি দিলে যেমন কোন ফল লাভ হয় না, ঠিক তেমনি আক্বীদা বিশুদ্ধ না হলে ব্যক্তি হয়ে যাবে 'আমল শূন্য। তাই আক্বীদার সংশোধনই হওয়া উচিত সর্বপ্রথম। তাছাড়া, জান্নাতে যাওয়া ও না যাওয়া নির্ভর করে মূলত আক্বীদা বিশুদ্ধ হওয়ার উপর। যদি আক্বীদা বিশুদ্ধ হয় তবে জান্নাতে যাওয়া সম্ভব, আর যদি আক্বীদা অশুদ্ধ হয় তবে জান্নাতে যাওয়ার প্রবেশাধিকার পাওয়া অসম্ভব।
তাই, একজন মুসলিমের জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন তার আক্বীদা বিশুদ্ধ হওয়া এবং বিশুদ্ধ আক্বীদা পোষণের মাধ্যমেই কেবল সে দ্বীনের ক্ষেত্রে সফলতা লাভ করতে পারে। ঈমান ও আক্বীদা সংক্রান্ত বিষয়সমূহ কুরআনে এবং এর ব্যাখ্যাস্বরূপ রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সহীহ হাদীছে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীকালে পৃথিবীতে প্রচলিত বাতিল ধর্মমত এবং বিশেষত গ্রীক দর্শনের কুপ্রভাবে মুসলিমদের ঈমান ও আক্বীদায় বিভ্রান্তির মায়াজাল ছড়িয়ে পড়ে। তারই ফলশ্রুতিতে, অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় হলেও, মুসলিম সমাজে অন্যান্য বিষয়ের ন্যায় ঈমানীয়তের মূল 'আক্বীদা' সংক্রান্ত ব্যাপারেও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয় এবং নানা ভ্রান্ত মতবাদের উদ্ভব ঘটে। এভাবে অখণ্ড মুসলিম সমাজে পরস্পর বিরোধী মতবাদের টানাপোড়নে সংশয় ও সংঘাত দেখা দেয়। আক্বীদায় সীমালংঘন ও বাড়াবাড়ী প্রশ্রয় প্রাপ্ত হয়। এ সকল সংশয় ও সংঘাত নিরসন এবং সীমালংঘন ও বাড়াবাড়ির প্রতিরোধ করার মাধ্যমে মুসলিমদের আক্বীদাকে সঠিক ও কলুষমুক্ত রাখার জন্য ইসলামের অবিমিশ্র মত ও সঠিক পথের অনুসারী আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের প্রকৃত বিদ্বানগণ সময়ের প্রয়োজনে আবির্ভূত হন এবং আক্বীদার ব্যাপারে সৃষ্ট সমূদয় ধূম্রজাল ছিন্ন করে কুরআন ও সহীহ হাদীছের আলোকে সঠিক ও নির্ভেজাল বহু গ্রন্থ রচনা করেন।
আজ ভ্রান্ত আক্বীদা পোষণকারীদের অপপ্রচারে এ দেশে শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে বৃহত্তর মুসলিম সমাজ ব্যাপক আকারে বিভ্রান্তির শিকারে পতিত হয়েছে। গোটা বাংলাদেশের মুসলিমরা দিবানিশি শির্ক ও কুফরীযুক্ত শত-সহস্র কুসংস্কার ঘেরা এক স্বপ্নিল জীবন-যাপন করে। কাজেই অজ্ঞ ও শিক্ষিত সকলেই যে কুসংস্কারে থাকবে সর্ববিষয়ে তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। শির্ক ও কুসংস্কারের প্রতি এ মোহমুক্তি না ঘটলে মুসলিমরা কখনোই স্ব-ধর্মের আলোকোজ্জ্বল পথ তথা কুরআন ও সহীহ হাদীসের পথের সন্ধান পাবে না। শির্ক, বিদআত ও কুসংস্কারের চর্চা গোমরাহী ছাড়া আর কিছুই না।
অথচ, শির্ক সবচেয়ে বড় অপরাধ। আল্লাহর কাছে সবচেয়ে ঘৃণার বিষয়। অন্যান্য গুনাহ তিনি ইচ্ছা করলে ক্ষমা করে দিবেন, কিন্তু শির্কের অপরাধ তিনি ক্ষমা করবেন না। এর মূল কারণ হল, শির্ক হচ্ছে মূলত আল্লাহর সাথে কাউকে অংশীদারিত্বের আক্বীদা পোষণ করা। শির্কের মাধ্যমে আল্লাহর নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হয়। এ কারণেই শির্ক জঘন্যমত অপরাধ। অন্যান্য কবীরা গুনাহে আল্লাহর একক প্রভুত্ব ও নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হয় না। সেখানে হয় আদেশ লংঘন। কিন্তু শির্কে আল্লাহর একক প্রভুত্ব ও নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হয়। শির্ক ও অন্যান্য গুনাহের মধ্যে এটাই হচ্ছে মৌলিক পার্থক্য।
আরেকটি পার্থক্য হল, অপরাপর কবীরা গুনাহে গুনাহগারের মনে অপরাধবোধ কাজ করে। এ অপরাধবোধ এক সময় তাকে অনুতপ্ত করে তোলে, ফলে সে তওবা করে। সকল ধরনের কবীরা গুনাহের ক্ষেত্রেই এ সম্ভাবনা আছে। কিন্তু শিরকের ক্ষেত্রে এ সম্ভাবনা নেই। যে শির্ক করে তার মধ্যে অপরাধবোধ সৃষ্টি হওয়ার কোন সুযোগ থাকে না। সে তো তা করে থাকে নেকবোধ নিয়েই। তার বিশ্বাস, সে যা করছে তাতে তার দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ হবে। সে যা করছে, তা যে অপরাধ, এ বোধ তার মধ্যে কখনো সৃষ্টি হয় না। যে মদ পান করে, সে জানে যে, সে মদ পান করে। যে ব্যভিচার করে, সে জানে যে, সে ব্যভিচার করছে। যে মিথ্যা বলছে, সে জানে যে, সে মিথ্যা বলছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, যে শির্ক করছে সে জানে না যে, সে শির্ক করছে। ফলে তার মধ্যে কখনো পাপবোধ সৃষ্টি হয় না। কখনো সে মনে করে না যে, সে এমন একটি কাজ করে যাচ্ছে যাতে আল্লাহ অসন্তুষ্ট। তার ধারণা এর সম্পূর্ণ বিপরীত। তাই সে কখনো তাওবা করার সুযোগ পায় না। আর এ অবস্থায় তার জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে।
অতএব, তাওহীদী আক্বীদাকে সকল প্রকার কুফরী, শির্ক্বী ও বিদআতী আক্বীদা হতে পরিচ্ছন্ন করা ব্যতীত সত্যিকারের মুমিন হওয়ার কোন পথ নেই। দেহের জন্য যেমন বিষাক্ত খাবার ক্ষতিকর রূহের জন্য তেমনি ঐসব বিষাক্ত আক্বীদা অত্যন্ত ক্ষতিকর যার চূড়ান্ত পরিণাম জাহান্নাম।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00