📄 কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক শিক্ষা, সালাফীনের থেকেই নিতে হবে দীক্ষা
পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সাথে একসঙ্গে খাবার খাওয়ার সময় কথা বলার মধ্যে একবার বেদম বিষম খেলো শামীম। নাকে-মুখে একাকার অবস্থা। সামাল দেয়ার জন্য যখন সে প্রাণান্ত প্রয়াসে রত, তখন শামীমের মা বললেন, 'কীরে তোকে বুঝি কেউ মনে করছে। তোর কথা বলছে।' তখনও সামলে উঠতে পারেনি সে। খাবারের এক পর্যায়ে ওর দুলাভাইকে দেখে সালাম দিল। এবার বোনের ধমক, 'খেতে খেতে সালাম দিতে নেই, সেটাও কী শহরে গিয়ে ভুলে গেছিস?' দুলাভাই তাকে 'ঠিক আছে আগে খেয়ে নাও পরে কথা হবে' বলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সচেষ্ট হলেন।
এরপর সবাই আবার খাবারে মনোনিবেশ করল। জাদীদা খাচ্ছিল চুপচাপ। ওদের সঙ্গে মামাও খাচ্ছিল। হঠাৎ ওর প্লেটের দিকে নজর পড়ল মামার। দেখে যে, প্লেটের একদিকে সামান্য একটুখানি ভাঙা। পুরনো প্লেট। জাদীদাকে উদ্দেশ্য করে বাবা বলল, 'কীরে জাদীদা বেছে বেছে তুই ভাঙা প্লেটে খাস কেন!? তোর কপালে কি ভালোটি জোটে না? ভাঙা প্লেটে খেলে যে তোর কপালটাও ভাঙাই হবে। কপালে জোড়া লাগবে না।' জাদীদা অবশ্য এটা কখনো খেয়াল করেনি বা এভাবে ভেবেও দেখেনি। সে হ্যাঁ- না কিছু না বলে ফ্যালফ্যাল করে কেবল চেয়ে রইল। মামা বলল, 'দেখছিস কী আজ ওতেই সেরে ফেলো। কিন্তু কথাটা মনে রাখিস বলে দিলাম।' নিরীহ ভঙ্গীতে মাথা নেড়ে জাদীদা পুনরায় খাদ্য গিলতে নিয়োজিত হল। ওর খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। বাকিটুকু শেষ করে উঠে পড়ল। প্লেট হাতে নিয়ে সামনে এগুতেই একটা পাতিলের সঙ্গে ওর পা ঠুকে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে পাতিলে হাত ছুঁয়ে তিনবার সালাম করল। বসা থেকে মামা এটা দেখে বলে, 'করিস কী, করিস কী! ধাতুর প্রাণহীন পাতিলটি কী তোর সালাম নিল, না বুঝল! তোর পা না মাথা ওটিকে ছুঁয়েছে তাও কি ওটা বুঝেছে?' জাদীদা এ সব কিছুই বুঝল না। ছোটবেলা থেকে তো এ রকমই দেখে আসছে। দেখে যা শিখেছে তাই তো পালনীয়! এতে কি দোষ করল তা ওর মাথায় ঢুকল না।
খাবার নিয়ে এতক্ষণ যেসব নিয়মের কথা জানলাম, এগুলো দীর্ঘকাল ধরে যে এ পরিবারকে শাসন করছে তা তো নয়। আমাদের সমাজের বেশিরভাগ বাড়ির বেশিরভাগ লোকজনকেই নির্বিচারে শাসন করে চলেছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মামাদেরও বাগে রেখেছে। নির্বিচারে পালনীয় এ সব আচারের সঙ্গে যুক্ত আছে কুসংস্কার এবং অজ্ঞানতা। হ্যাঁ, শাসন একটা মানা দরকার। সেটা হবে কোন শাসন? সেটা হবে আল্লাহর শাসন। আল্লাহ্র বিধান কুরআন ও সহীহ হাদীসের শাসন।
উপরোক্ত নিয়মগুলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, খেতে বসে মুখে খাবার রেখে কথা বললে বা তাড়াহুড়ো করে খেলে গলনালীতে খাবার আটকে যায়। তারপর গতি বাধাপ্রাপ্ত হয়ে খাবার পাকস্থলী অভিমুখে না এগিয়ে উল্টোদিকে মানে মুখের দিকে আসতে থাকে। বিষমটা তখনই লেগে যায়। সুতরাং বিষম খাওয়ার সঙ্গে কারো মনে করার কোন সম্পর্ক নেই। থাকতেও পারে না। গরীব-দুঃখী পরিবারের লোকজন ভাঙা থালায় খায় বলে এতে আবার কিসের দৈন্যের ছাপ থাকতে পারে? খাবার রান্নাবান্না করতে হাঁড়ি-পাতিলের ওপরই নির্ভর করতে হয়, এ পর্যন্তই। তাই বলে নিষ্প্রাণ পাতিলে পা লাগলে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে সালাম করার কোনই অর্থ নেই।
অন্যদিকে, কাককে সাধারণত অশুভ বলে মনে করা হয়। এ বিশ্বাসটি মূলত বাইবেল থেকে উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়। কারণ বাইবেলের বর্ণনানুযায়ী, পাখিদের মধ্যে শুধুমাত্র কাকই নূহ (আঃ)-এর নৌকায় আরোহণ করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছিল। কালো রঙ মানেই ভয়ার্ত, বিপজ্জনক বা অমঙ্গল! কাক যেহেতু কালো, কুৎসিত তাই এ প্রাণীটির সবকিছুই কুৎসিত; ভাল, আনন্দ বা মঙ্গলের যোগ নেই। এমনি ধারণা থেকেই তো কাকের ডাকের সঙ্গে অমঙ্গল বা অশুভ ভাবনা যুক্ত হয়ে গিয়েছে। অথচ, চীনে কাককে সৌভাগ্যের প্রতীক রূপে গণ্য করা হয় বলে কাক হত্যা করা নিষিদ্ধ।
বিড়াল একটি আদুরে ও নিরীহ প্রাণী। মিউ মিউ করে আর এর ওর কাছে ঘুর ঘুর করে আদর পেতে চাইবে। এ প্রাণীর পা বা পেট চাটাচাটিতে কী আসে যায়, অবুঝ প্রাণী অতিথির খবর পাবে কোত্থেকে? এগুলো সবই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রচলিত হাজারো অন্ধ সংস্কারের দু-চারটা নমুনা। যুক্তিহীন সংস্কার মেনে চলায় গৌরব নেই, উন্নতিও নেই। উন্নতি কিছু আসবে এগুলো না-মানাতেই। কুরআন-সহীহ হাদীস-যুক্তি-বুদ্ধিতে পরখ করে মানামানিটা ঠিক করে নিতে পারলে নিজের এবং দেশের উন্নতি হবেই।
ইংল্যান্ডের লোকজন বিশ্বাস করে যে, কালো বিড়াল হচ্ছে সৌভাগ্য আনয়নকারী। বিশেষ করে যদি কালো বিড়াল কারো চলার পথকে অতিক্রম করে যায়। অর্থাৎ সামনে দিয়ে কোন কালো বিড়াল অতিক্রম করাকে দুর্ভাগ্য আগমনের পূর্বআলামত হিসেবে গণ্য করে থাকে। এ বিশ্বাসটির উৎপত্তি হয় মধ্যযুগে। তখনকার যুগে কালো বিড়ালকে লোকজন ডাইনীদের প্রাণী বলে বিশ্বাস করত। তারা মনে করত যে, কালো বিড়ালের মাথার মগজের সঙ্গে ব্যাঙ, সাপ এবং পোকামাকড়ের শরীরের অংশের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে ডাইনীরা যাদুর পাঁচন তৈরি করে। যাদুর পাঁচনের সংস্পর্শ ব্যতীত কোন বিড়াল সাত বছর বেঁচে থাকলে কালো বিড়ালটি ডাইনীতে রূপান্তরিত হতো বলে ধারণা করত। বিপরীত দিকে, আমেরিকাসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোতে কালো বিড়ালকে অশুভ বলে গণ্য করা হয়। আমেরিকাতে সাদা রঙের বিড়ালকে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। আবার এই সাদা বিড়ালই ইংল্যান্ডে অশুভ বা দুর্ভাগ্যের প্রতীক।
কোন ব্যক্তি কোন কিছুর প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে যখন সে চায় যে তার সৌভাগ্য যেন পরিবর্তন না হয়, তখন সে বলে 'কাঠে টোকা দাও' এবং এ সময় সে তার চতুর্দিকে খুঁজে দেখে কোন কাঠ পাওয়া যায় কি না যেখানে সে টোকা দিতে পারে। এ বিশ্বাসের উৎস বের করতে হলে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে সুদূর অতীতে, যখন ইউরোপের জনগণ বিশ্বাস করত যে, দেবতারা সাধারণত গাছের মধ্যে বাস করে। গাছে বসবাসকারী দেবতার নিকট থেকে কোন অনুগ্রহ লাভ করতে তারা গাছ স্পর্শ করত। তাদের এ প্রার্থনা যদি গৃহীত হতো, তাহলে দেবতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে তারা পুনরায় গাছ স্পর্শ করত।
লবণ পড়ে গেলে বেশিরভাগ মানুষ ভাবে যে তাদের জন্য দুর্ভাগ্যের বা অশুভ কিছুর আগমন অবশ্যম্ভাবী। তাই তারা সেই পড়ে যাওয়া লবণকে বাম কাঁধের উপরে নিক্ষেপ করে দুর্ভাগ্যকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে। লবণ যেহেতু কোন কিছুকে তাজা রাখতে পারে, অনুরূপভাবে এটি দুর্ভাগ্য প্রতিহত করে তাদেরকে রক্ষা করবে বলে ধারণা করা হয়। লবণের আল্লাহ্ প্রদত্ত স্বাভাবিক কার্যকারিতা শক্তির কারণে প্রাচীনকালের মানুষেরা এ বিশ্বাস করত। এভাবে লবন পড়ে যাওয়াকে কোন অশুভ আলামতের অশনি সংকেত হিসেবে ধরা হয়। আবার যেহেতু তারা এটাও বিশ্বাস করত যে, শয়তানী আত্মা বা অশুভ শক্তি মানুষের বামপার্শ্বে অবস্থান করে; তাই পড়ে যাওয়া লবণ বাম কাঁধে নিক্ষেপ করার মাধ্যমে অশুভ শক্তিকে সন্তুষ্ট করা হয়। লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি কর্তৃক আঁকা বাইবেলে বর্ণিত শেষ নৈশ ভোজের ছবিতে দেখা যায় যে, লবনের তাকে যিশুর বিশ্বাসঘাতক জুডাস আঘাত করছিল।
অনেক মানুষ বিশ্বাস করে যে, হঠাৎ করে একটি আয়না ভেঙ্গে যাওয়া বা ফেঁটে যাওয়া বা ভাঙ্গা আয়না সাত বছরের জন্য দুর্ভাগ্য আগমনের আলামত। প্রাচীনকালের মানুষেরা মনে করত যে, পানির উপরে কোন ব্যক্তির আত্মার প্রতিবিম্বের সৃষ্টি হয়। ফলে, কেউ পানিতে ঢিল ছুঁড়লে বা অন্য কোনভাবে যদি তাদের আত্মার প্রতিবিম্ব চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়, তাহলে আত্মাও চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে। আর আয়না আবিষ্কারের পর থেকে এ বিশ্বাস আয়নাতে স্থানান্তরিত হয়। ধারণা করা হয়, এ বিশ্বাসটি একটি প্রাচীন বিশ্বাস থেকে উৎপত্তি হয়েছে। এ প্রাচীন বিশ্বাস অনুযায়ী, মানুষের বা কারও বা কোন প্রাণীর প্রতিবিম্ব বা প্রতিফলন বা ছায়া মূলত তার আত্মার প্রতিচ্ছবি ব্যতীত আর কিছুই না। অতএব যা কারো প্রতিবিম্ব বা ছায়াকে পরিবর্তন করে তা দুর্ভাগ্য বয়ে আনতে পারে। এ দুভাগ্যের সময়কালের ধারণা রোমানদের নিকট থেকে আগত বলে মনে করা হয়। রোমানদের ধারণা হচ্ছে, মানুষের জীবন প্রতি সাত বছর অন্তর নূতন রূপ পরিগ্রহ করে।
কোন দেয়ালের সাথে হেলান দেয়া মই ত্রিভুজের সৃষ্টি করে। কেউ কেউ বিশ্বাস করে যে, এ মইয়ের নিচ দিয়ে হাঁটা অসম্মানজনক, অমঙ্গলজনক, অকল্যাণকর; এক কথায় অশুভ। এর কারণ হিসেবে বলা হয়, ত্রিভুজ মূলত পবিত্র ত্রিত্ববাদকেই প্রতীকায়িত করে। এ অবস্থায় রাখা মইয়ের নিচে অবস্থান করার সময় কোন বিষয়ে বাঞ্ছা করা বা আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা অথবা হাত বা পায়ের আঙুল অতিক্রম করিয়ে অশুভ বা দুর্ভাগ্য থেকে আত্মরক্ষা করা যায়।
ডিম ও আলু মানে তো সহজে বোঝায় যায় গোল্লা, মানে শূন্য! আর কলা! কলা দেখা মানে বা দেখানো মানে তো জানই। সেটাও এক শূন্যেরই ব্যাপার। কোন পরীক্ষার আগে ডিম, কলা, আলু খাওয়া মানেই হল পরীক্ষায় গোল্লা পাওয়া! আবার কেউ সাঁতার না শিখলেও তার ব্যবস্থাপত্র আমাদের সমাজের এখানে-সেখানে সর্বত্রই পাওয়া যায়। ছোট পিঁপড়া কোনভাবে খেতে পারলে অবশ্যই সাঁতার শিখতে বেগ পেতে হবে না। তাছাড়া, পচা বা পোক ধরা ফল খেলেও তাড়াতাড়ি সাঁতার শেখা যায়।
এগুলো নিয়ম বলে চলে আসলেও বস্তুত অনিয়ম বৈ কিছু নয়। এ সব নিয়মের অসারতা একটু পরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণ করলে সহজেই ধরা পড়ে। পিঁপড়ে ভালো সাঁতারু বলে তা খেয়ে সাঁতার শেখা যাবে এমন কথা নেই। কারণ মানুষ তো কত পাখি খায় তার জীবনে, কিন্তু কেউ কি আকাশে ওড়া শিখেছে? পচা ফল বা পোকা-ফল খেলে সাঁতার শেখা যাবে এমন কোন কথা নেই। ডিম ও আলুর আকৃতি শূন্যের মতো বলে ফলাফল শূন্য জুটবে, তা কী কোন কথা হল? কলার সঙ্গে শূন্য লাভের কী সম্পর্ক!
মূলত এ সব যুক্তি-বুদ্ধি-জ্ঞানহীন অন্ধ-অসার ধারণা বা বিশ্বাস। পুরোনো আমলের ভ্রান্ত ধারণা। এমনই অনেক অচল ধারণা সচল রয়েছে আমাদের সমাজে কেবল ওহীর সত্য জ্ঞানের অভাবে। এ ধরনের সচল নিয়মগুলো অচল করা শুধু নয়, বাতিলই করতে হবে আজ, এখনই। সে জন্য আমাদের সকলকে ওহীর অমোঘ বিধানের নিকট আত্মসমর্পণ করতে হবে। কুরআন ও সহীহ হাদীসের পাঠ নিতে হবে। চেতনাটা সহীহ আক্বীদার কষ্টি পাথরে যাচাই-বাছাই করতে হবে।
টিকাঃ
১. ভাগ্য সংক্রান্ত বিষয়ে কপাল শব্দটি মূলত হিন্দু সংস্কৃতি থেকে আমাদের মুসলিমদের বিশ্বাসে অনুপ্রবেশ করেছে। হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থানুযায়ী, কোন সন্তান জন্মের ৬ষ্ঠ দিনে ভাগ্যের দেবতা এসে এ শিশুটির জীবনে সংঘটিতব্য ঘটনাসমূহ অর্থাৎ হায়াত, মৃত্যু, রিযিক, ধন-দৌলত ইত্যাদি তার [শিশুটির] কপালে লিখে যায়। আর এ বিশ্বাস থেকেই প্রচলিত হয়েছে- 'কপালের লিখন না যায় খণ্ডণ।' কিন্তু আমরা মুসলিম হিসেবে এ ধরনের আক্বীদা-বিশ্বাস পোষণ করি না। আমরা বিশ্বাস করি যে, আমাদের ভাগ্য লিখে রাখা হয়েছে লাওহে মাহফুজে, যা সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহই ওয়াকিবহাল। তাই আমরা বলি, 'ভাগ্যের লিখন না যায় খণ্ডণ।' অতএব, প্রতিটি মুসলিমের উচিত ভাগ্য সম্পর্কিত ব্যাপারে আলোচনায় 'কপাল' শব্দটির ব্যবহার করা থেকে সাবধানতা অবলম্বন করা। কারণ, সামান্য একটি মাত্র শব্দই আমাদের বিশুদ্ধ ঈমান-আক্বীদায় আঘাত করতে যথেষ্ট।
📄 লটারী-জুয়া-হাউজি, সবই হল হারাম পুঁজি
লেগে যাবার সম্ভাবনার কথা শুনি আমরা। ভাগ্য ভাল হলে অথবা ভাগ্যে থাকলে না লেগে যাবে কোথায়? বলা হয় এ রকমও, 'কপাল যদি না হয় ফাঁকা, ঘুরতে পারে ভাগ্যের চাকা।' চাকা থাকলে তো ঘুরবেই। যদি তাকে আটকে না রাখা হয়। আর যদি কপাল বলে কিছু থাকে এবং তারও যদি চাকা থাকে তাহলে তার না ঘুরে উপায় কী! কপাল যে কারো ফাঁকা- এ অপবাদ তো কেউ মাথা পেতে নিতে চাইবেন না। কপাল ফাঁকা, মাথা ফাঁকা- এগুলো মানব জীবনের জন্য খুব খারাপ ব্যাপার বলে মনে করা হয়। সুতরাং কপাল ফাঁকা অর্থাৎ ভাগ্যহীন অলক্ষ্মী (!?) বলে পরিচিত হতে চাইবেন না কেউ। কপাল পরিপূর্ণ না হোক ফাঁকা নয় কারো। এম কপালে ভাগ্যের চাকা ঘুরতে পারে বৈকি!
কপাল ফাঁকা না হলে, ভাগ্য সহায় হলে লটারি কুপনের ক্রেতা রাতারাতি বড়লোক হয়ে যেতে পারেন। পেয়ে যেতে পারেন তিনি কয়েক লক্ষ টাকার পুরস্কার।
আমরা জুয়া খেলার কথা জানি। খেলাটা দেখেছিও অনেকে, গোল রঙচঙে বোর্ড। তার পুরোটা জুড়ে আঁকা থাকে বিভিন্ন জিনিসের ছবি। ঠিক মাঝ বরাবর থাকে চারদিকে ঘুরতে থাকা একটা তীর। তীরটিকে ঘুরিয়ে দেয়া হয়। কোন জুয়াড়ীর ধরা নম্বরে তীর আটকালে সে হয় বিজয়ী। দেখা যায়, একটি জুয়ার বোর্ডে ৩০ থেকে ৪০টি ঘর থাকে। এক একটি ঘরে এক একটি ছবি বা নম্বর আঁকা থাকে। একজন যখন জুয়ার বোর্ডে বাজী ধরে তখন তার বাজীতে জেতার সম্ভাবনা থাকে ৪০ ভাগের এক ভাগ। অর্থাৎ নিতান্তই সামান্য।
লটারিতে পুরস্কার জেতার ব্যাপারটিও অনেকটা একই রকম। কী রকম! ব্যাপারটি খতিয়ে দেখলে লটারিকে জুয়া খেলা বলে সবাই মেনে নিতে কোনই দ্বিধা করবেন না। জুয়া খেলার তো বোর্ডে ঘর থাকে ৪০টি। আর লটারির কুপন ছাড়া হয় কয়েক কোটি। হয়তো প্রথম পুরস্কার ৫০ লক্ষ, দ্বিতীয় ৪০ লক্ষ, তৃতীয় ৩০ লক্ষ টাকা এবং সবগুলো মিলে হয়তো আরো ৫০ লক্ষ টাকার পুরস্কার। সব মিলিয়ে হয়তো ২ কোটি টাকার পুরস্কার। এছাড়া কুপন ছাপা, প্রচার চালানো ও অন্যান্য খাতে খরচ করে ১০ লক্ষ টাকা। এই মাত্র দুই, আড়াই বা তিন কোটি টাকা খরচ হয় একেকটি লটারি পরিচালনায়। লটারি যারা করে সেই সংস্থা তো খরচ বাদ দিয়ে কিছু লাভ করবেই। সেই হিসেবে হয়তো পাঁচ কোটি টাকার কুপন বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। একটি কুপনের দাম যদি ১০ টাকা হয়, তাহলে মোট কুপন ছাড়া হয় হয়তো ৫০ লক্ষ। তাহলে এখন দেখা যাচ্ছে, একজন একটি কুপন কিনলে তার পুরস্কার পাবার সম্ভাবনা হয় ৫০ লক্ষের এক ভাগ। দুটো কিনলে ৫০ লক্ষের দুই ভাগ। এভাবে ১০টি কুপনে সম্ভাবনা ৫০ লক্ষের ১০ ভাগ।
এখন দেখা যাক, লটারির কুপন কেনে কারা। সচরাচর যারা নিজের অবস্থা রদলাতে চান কিন্তু কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছেন না। যারা উচ্চাশা পোষণকারী, যেকোনভাবে রাতারাতি অবস্থা বদলে ফেলতে চান- তারাই কেনেন লটারির কুপন। অর্থাৎ গরিব অথবা স্বল্পআয়ের লোকজনই কুপনের অধিক ক্রেতা। নিজেদের জীবনে উন্নতি ঘটানোর জন্য লটারির আশ্রয় নেন তারা। লটারির প্রচারে যে ভাষায় লোভ দেখানো হয়, তাতে তারা বশীভূত হন। আর এরা যদি একবার সামান্য টাকার পুরস্কার পেয়েও যান তাহলে তো কথাই নেই। লোভে লোভে বার বার কুপন কেনার প্রতিযোগিতা চালাবেন। অনেক মানুষকে দেখা যায়, মাস শেষে বেতন হাতে পেয়ে প্রথমেই দু'-পাঁচটি লটারির কুপন কিনে ফেলেন। ভাগ্যের ফের ফেরাতে সহজ-সরল, সাধারণ মানুষ লটারির কুপন কিনে এভাবে প্রতারিত হয়েই চলেছেন।
📄 যারা বলে দাঁতের পোকা, আসলে তারা বানায় বোকা
শহরের রাস্তাঘাটে, বাস, ট্রেন, লঞ্চে বা গ্রামের হাট-বাজারে দাঁতের মাজন বিক্রেতাদের দেখা যায়। 'পোকালাগা' দাঁতের ফুটো থেকে তারা 'পোকা' বের করে আনে। পোকা বের করা ও দাঁত ভাল রাখার জন্য তাদের মাজন অব্যর্থ বলে দাবী করে। বিক্রির সময় গোল হয়ে দাঁড়ানো লোকজনের মুখে মাজন লাগিয়ে কিছু পরে তারা পোকা বের করে এনে দেখায়। এ তো গেল মাজনওয়ালার কথা। এ ছাড়া, আমাদের সমাজে আর এক শ্রেণীর মানুষ আছে যাদের পেশা দাঁতের পোকা তোলা। গাছের ডাল বা শেকড় দিয়ে কিভাবে জানি দাঁত থেকে পোকা বের করে আনে। এ মানুষদের চেনেন অনেকে। নৌকার বহর সাজিয়ে নদীতে ভাসমান জীবন যাপন করেন এরা। ভাসতে ভাসতে কোন চর বা ভাললাগা গ্রামে গিয়ে নৌকার সারি ভেড়ায়। কিছুদিন এ তীর ঘিরেই এদের জীবন শুরু হয়। বেদে বলে পরিচিত এ মানুষদের অনেকে দাঁতের পোকা বাছা, দাঁতের অসুখ সারানো- এগুলো কাজ করেন। ঝোলা কাঁধে ফেলে গ্রামের পথ-ঘাটে হেঁটে-হেঁকে বেড়ায়, 'দাঁ-তের পোকা বাছা, পোকা তোলা।'
দাঁতের পোকা বের করার যে দু'শ্রেণীর লোকের কথা বললাম, এরা লেখাপড়া না-জানা অসচেতন মানুষ। কেউ মাজন দিয়ে আর কেউ গাছ-গাছড়ার সাহায্যে পোকা তোলেন। কিন্তু আধুনিক দাঁতের ডাক্তাররা কখনোই পোকার কথা বলেন না। পোকা বের করার কথাও তারা বলেন না কখনো। আসলে পোকা আছে বলেই তারা স্বীকার করেন না। দাঁতে যে কখনো পোকা হতে পারে, এটা তারা বিশ্বাসই করতে চান না। তাহলে কি দাঁতের পোকা বলে কিছু নেই! পোকা নিয়ে যে এত কাণ্ড তার সবই কি তবে মিথ্যা, বানানো কথা এগুলো!
আসলে কিন্তু তাই। দাঁতের পোকা নিয়ে যত কথা তার সবই বানানো। মিথ্যা কল্পকাহিনী। এর মধ্যে একবিন্দুও সত্য নেই। দাঁতে কখনো পোকা হয় না। তবে হ্যাঁ, আস্ত দাঁতে গর্ত হয় ঠিকই। এ গর্তের মধ্যে ব্যথা হয়। কখনো কখনো এ ব্যথা এত বেশি হয় যে, একে বলা হয় দাঁতে পোকা লেগে কামড় দিচ্ছে। তো এই গর্ত ও যন্ত্রণা হওয়া- এ সব কিন্তু পোকার কাজ নয়। এর কারণ ভিন্ন। এর কারণ হল এসিড বা অম্ল। বিভিন্ন কারণে দাঁতে এসিড হলে ধীরে ধীরে গর্ত হয়। গর্ত থেকে পরে ব্যথার সৃষ্টি হয়।
আমরা যতক্ষণ জেগে থাকি এর মধ্যে অনেকবারই ভাতসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার খাই। খাওয়ার পর খাবারের ছোট ছোট টুকরো বা কণা দাঁতের ফাঁকে বা আশপাশে লেগে থাকে। খাওয়ার পর ভালভাবে মুখ পরিষ্কার না করার জন্য এগুলো থেকে যায়। আমাদের মুখের ভেতরে আছে জীবাণু। দাঁতের ক্ষতি করে এই এসিড। দাঁতের ওপরের দিকে যে ঝকমকে সাদা অংশ থাকে তার নাম এনামেল। ভেতরের নরম অংশকে পাতলা পর্দার এনামেল রক্ষা করে। শক্ত জিনিস খাওয়ার শক্তিও যোগায় এনামেল। এসিড দাঁতের জন্য খুব অপকারী। এই এনামেল নষ্ট করে ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো করে এসিড। ফলে দাঁতের শক্তি কমে যায়। ঝকঝকে ভাবটা দূর করে দেয়। এতে দাঁতে ক্ষয় ধরে। ক্ষয় হতে হতে একসময় দাঁতে ফুটো তৈরি হয়ে যায়। দাঁতে যদি এনামেলের ওপর নোংড়া লাল বা হলুদ পর্দা জমে, তবে এসিড তৈরি হয় খুব তাড়াতাড়ি। প্রথমে কিন্তু এ সবের কিছুই টের পাওয়া যায় না। পরে যখন ক্ষয়টা বেশি হয়ে দাঁত ফুটো হয় তখন বোঝা যায়। কারণ, তখন ব্যথা শুরু হয়ে যায়। খাবারের কণা বা পান-সিগারেটের যে নোংড়া দাগ তা এসিডকে টেনে ধরে রাখে।
চিনি জাতীয় খাবার, চকলেট, আইসক্রীম এগুলো যেহেতু আঠালো জিনিস তাই এতে এসিড হয় বেশি। এখন এ জাতীয় খাবার আমরা হরহামেশা খাই বলে দাঁতের ক্ষয়ও হয় বেশি। আগে এ ধরনের খাবারের চল তেমন ছিল না বলে দাঁতের ক্ষয় বা রোগও তেমন বেশি হয়নি।
দাঁতের এ ক্ষয়রোগ থেকে মুক্ত থেকে দাঁতকে শক্ত ও সতেজ রাখার উপায় কি? প্রাথমিকভাবে উপায় দুটো:
১. প্রতিদিন খাবারের পর খুব ভালো করে দাঁত-মুখ পরিষ্কার করতে হবে, যাতে খাদ্যকণা কোনভাবেই দাঁতে লেগে থাকতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রেখে পরিষ্কার করা দরকার।
২. যে খাবারগুলো আঠালো এবং ওপরে লেগে গিয়ে দাঁতকে ময়লা নোংড়া করে, এমন খাবার কম খাওয়া। মিষ্টি বা চিনি দিয়ে বানানো খাবার, পান, সিগারেট, তামাক ইত্যাদি এর মধ্যে পড়ে। এ ছাড়া, কোথাও কোথাও পানিতে আয়রন (লোহা) ও লবণের ভাগ বেশি থাকে। এমন পানিও দাঁতের ক্ষতি করে। খাবার পানি সবসময় আগুনে ফুটিয়ে খেলে দাঁতের তেমন ক্ষতি হয় না।
ওপরের আলোচনা থেকে আমরা বুঝলাম, দাঁতের পোকা বলে কিছু নেই। দাঁতে কখনো পোকা হয় না। দাঁতে যে গর্ত বা ব্যথা হয় সেজন্য পোকা দায়ী নয়। আসলে আমরা দাঁত সম্পর্কে খুব কম জানি বা খোঁজখবর কম রাখি। এ না-জানার সুযোগ নিয়ে সমাজের এক শ্রেণীর মানুষ দিব্যি ঠকিয়ে চলেছে আমাদের। আমাদের অজ্ঞানতা, অসচেতনতা ও কুসংস্কারের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা ঠকিয়ে উপার্জন করছে।
অনেক সময়ই দেখা যায়, ওই মাজনওয়ালা বা বেদেরা মানুষকে ধরে তার মুখ থেকে পোকা বের করে। এ পোকা কোথেকে আসে এ প্রশ্ন হয়তো অনেকের। এটা আসলে হাতসাফাই বা ম্যাজিক। জাদুকররা হাতসাফাই করে খালি হাতে কত কি-ই না দেখান! খালি কলসী নিমেষে পানিতে ভরে ফেলেন। খালি পকেটে টাকা ভরিয়ে দেখান। এগুলো যদি সম্ভব হয় তবে দু'চারটে পোকা হাতের তালুতে এনে দেখানো খুব কঠিন কি! পুরনো চাল, পচা ফল বা গোবরের তাল থেকে পোকা সংগ্রহ করে এনে আগেভাগেই তারা আঙ্গুলের ফাঁকে লুকিয়ে রাখেন। আর এ পোকাগুলো মুখ থেকে বের করে আনার ভান করে দাঁতে লবঙ্গের তেল লাগিয়ে দেন। লবঙ্গের তেল কিছু সময়ের জন্য ব্যথা দূর করে। এক একজন একেকভাবে এ প্রতারণার খেলা দেখিয়ে মানুষকে বোকা বানান।
প্রতারণার আরেকটা পদ্ধতিও আছে। কুমড়োর শক্ত বিচির ওপরের পর্দা ব্লেড দিয়ে কেটে ফেলা হয়। বিচির ভেতরের নরম শাঁসটাকে চিকন করে কুচি কুচি করে টুকরো করা হয়। টুকরোগুলো রোদে শুকিয়ে দাঁতের মাজনের শিশির মধ্যে মিশিয়ে রাস্তায়-বাজারে মাজন বিক্রি করতে লেগে যায় মাজনওয়ালা। দাঁতের ব্যথায় ভুগছে এমন লোকজন ধরে মাজন লাগাতে দিয়ে দেয় শিশি থেকে। দু'পাঁচ মিনিট পর থুথু ফেলতে বলেন। সাথে সাথে বলে, 'এবার দেখুন, আমার মাজন কিভাবে পোকা ধরে বের করে আনছে।' কুমড়ো বিচির টুকরাগুলো থুথুর সাথে বের হয়ে এলে এগুলোই পোকা বলে সবাইকে ধোঁকা দেন। বিচির টুকরোগুলো মুখের মধ্যে থেকে রসালো হওয়াতে একটু ফুলে ওঠে। থুথুর মধ্যে এগুলো ফুলতে থাকে বলে মনে হয় যে, নড়াচড়া করছে। ব্যস, এগুলো আর দাঁতের পোকা না হয় কি করে!
আমাদের সমাজে এভাবে ভেল্কি দেখিয়ে, হাতসাফাই করে মানুষকে বোকা বানিয়ে কতই না লোক বেশ রুজি রোজগার করছে! এ জন্য দায়ী আমাদের অশিক্ষা, কুশিক্ষা আর অন্ধবিশ্বাস।
আর প্রতারণার কথা বলতে গেলে নির্দ্বিধায় বলা যায়, কত রকমের প্রতারণাই না ছড়িয়ে আছে আমাদের সমাজে, আমাদের জীবনে। গেঁথে আছে এগুলো আমাদের বোধে, বিশ্বাসে, চিন্তায়। মানুষের বিচার-বুদ্ধি পেছন অতীতে খুব কম ছিল। সবকিছু যাচাই-বাছাই করে তখন মানুষ দেখতে-বুঝতে শেখেনি। সে সময় সমাজের একশ্রেণীর স্বার্থপর মানুষ এগুলোর প্রচলন করেছে। নিজেদের স্বার্থ প্রতিষ্ঠা ও বহাল রাখার কারণে প্রতারণার দুষ্টবুদ্ধির আশ্রয় নিয়েছে। এর অনেক ধারণাই তারা ধর্মের সাথে সংযুক্ত করে পরিবেশন করেছে মনুষ্য সমাজে। এভাবে অনেক প্রতারণাপূর্ণ ধ্যান-ধারণা ধর্মীয় নীতি-নৈতিকতার সাথে মিলেমিশে যুগযুগ ধরে সচল রয়েছে আমাদের সমাজে।
📄 এক নজরে আমাদের সমাজে প্রচলিত শিরক
আমাদের বাংলাদেশের গ্রাম ও শহর তথা সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়েছে শির্ক, বিদ'আত ও নানাবিধ কুসংস্কার। কুসংস্কারজনিত এমন শির্ক রয়েছে যা এ সব দেশের লোকজন ধর্মীয় বিধান বা নিয়ম মনে করেই পালন করে থাকে, সে সম্পর্কে নিম্নে বর্ণনা করা হল:
১. আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো গায়েবী ক্ষমতায় বিশ্বাস: আল্লাহ ছাড়া অন্য কারোর অতি প্রাকৃতিক জগতের উপর কর্তৃত্ব রয়েছে এবং অতিপ্রকৃতি-অবস্তুগত কিংবা অলৌকিকভাবে কাউকে সাহায্য করতে বা বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারে বলে বিশ্বাস করা। যদি কেউ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সম্পর্কে বিশ্বাস পোষণ করে যে, সে অলৌকিক শক্তির অধিকারী এবং অলৌকিকভাবেই কোন ঘটনা সংঘটিত করতে, বিপদগ্রস্থকে সাহায্য, রোজগারহীনকে রোজগার, সন্তানহীনকে সন্তান দিতে পারে, তাহলে সে মুশরিক বলে গণ্য হবে।
২. জ্যোতির্বিদ্যা: জ্যোতির্বিদ্যা হল সৌরজগতের বিভিন্ন অবস্থা পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর ঘটনা সংঘটিত হওয়ার কারণ বর্ণনা করা। জ্যোতির্বিদরা বলে থাকে যে, অমুক নক্ষত্রের অমুক স্থানে অবস্থানের সময়ে যে ব্যক্তি বিবাহ করবে তার অমুক অমুক জিনিস অর্জিত হবে। যে ব্যক্তি অমুক নক্ষত্রের অমুক জায়গায় অবস্থানের ক্ষণে সফরে থাকবে সে ভাগ্যবান কিংবা এ ধরনের ভাগ্যহীন হবে। যেমন- বর্তমানে বিভিন্ন নিম্নশ্রেণীর পত্র-পত্রিকায় এ ধরনের অর্থহীন-আজগুবি খবরাখবর পরিবেশন করা হয়, আর এগুলোর আশে-পাশে বিক্ষিপ্ত তারকারাজি সরলরেখা, বক্ররেখা ইত্যাদি ধরনের আঁকা-বাঁকা রেখা অংকিত থাকে। কিছু সংখ্যক মূর্খ ও নিম্ন শ্রেণীর ঈমানদার ব্যক্তিও বিভিন্ন সময় জ্যোতিষদের নিকট গমন করে থাকে এবং তাদেরকে স্বীয় ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এবং ভবিষ্যতে ঘটিতব্য বিষয় সম্পর্কে, বিবাহ-শাদী ইত্যাদি সম্পর্কেও প্রশ্ন করে থাকে।
৩. ভবিষ্যদ্বাণী করা: জ্যোতির্বিদ্যার মাধ্যমে, ক্রিস্টাল বল থিওরির মাধ্যমে, কম্পিউটার প্রোগ্র্যামের মাধ্যমে বিভিন্ন হিসাব-নিকাশ করে আগামী দিনের বিভিন্ন ঘটনা-দুর্ঘটনা সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা এবং এ-সব ভবিষ্যদ্বাণী বিশ্বাস করা।
৪. রোগ নিরাময়ের উদ্দেশ্যে ধাতব দ্রব্য দ্বারা নির্মিত আংটি বা বালা পরিধান করা: আমাদের দেশের রাজধানী সহ বিভিন্ন শহরের ফুটপাতে এবং বড় বড় পাইকারী বাজারে এমন কিছু ব্যবসায়ের দোকান পাওয়া যায়, যারা ধাতব নির্মিত (যেমন, অষ্ট ধাতুর) আংটি বা বালা বিক্রি করে থাকে। অনেক লোকদেরকে তা বাত রোগ নিরাময়, যেকোন উদ্দেশ্য সফল হওয়া, শনি ও মঙ্গল গ্রহের কুদৃষ্টি থেকে আত্মরক্ষা ইত্যাদির জন্য বিশেষ উপকারী বিশ্বাস করে আংগুলে ও হাতে ব্যবহার করতে দেখা যায়। আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে কোন বস্তুই নিজস্ব গুণে কোন রোগের ক্ষেত্রে উপকারী বা অপকারী হতে পারে না। এতে রোগীর অন্তরে ধাতব বস্তুর প্রতি উপকারী হওয়ার ধারণার সৃষ্টি হয় এবং রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে আল্লাহর পরিবর্তে বস্তুর উপর ভরসা করা হয়। তাই কোন বস্তুকে কোন ক্ষেত্রে উপকারী বা অপকারী বলা বা এ ধারণা করে তা ব্যবহার করা।
৫. জ্বিন বা অপর কোন রোগের অনিষ্ট থেকে আত্মরক্ষার জন্য শরীরে তা'বীজ ব্যবহার করা: জ্বিনের অশুভ দৃষ্টি এবং বিভিন্ন রোগের অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য সাধারণ মুসলিমদের মাঝে তা'বীজ ব্যবহার একটা সাধারণ রীতিতে পরিণত হয়েছে। অথচ সকল ধরনের তা'বীজ ব্যবহার করা শির্ক।
৬. আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ব্যতীত কোন মানুষের মত ও পথের অন্ধ আনুগত্য ও অনুসরণ করা: সাধারণ মানুষের মতো অনেক জ্ঞানী লোকেরাও নিজেদের অজান্তেই অথবা জেনেশুনে অনুসরণের বৈধ সীমারেখা লঙ্ঘন করে চলেছেন। সাধারণ লোকজন অন্ধভাবে তাদের পীর-ফকীরদের এবং ধর্মীয় ক্ষেত্রে অধিকাংশ আলেম নিজ মাযহাবের নিঃশর্ত ও নির্বিচার অনুসরণ করেন। এমনকি কোন বিষয়ে নিজের পীর, ইমাম বা মাযহাবে প্রচলিত আমলের ত্রুটি কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হলেও বিভিন্ন অনর্থক যুক্তি-তর্ক দাঁড় করিয়ে তারা স্বীয় পীর, ইমামের মত বা মাযহাবের অনুসরণ করেন। এ ধরনের আচরণ মূলত আনুগত্যের ক্ষেত্রে শিকের অন্তর্ভূক্ত।
৭. মাযার স্পর্শ করা, শরীর মাসেহ করা বা চুমু খাওয়া, কবরের মাটি বরকতের নিয়তে নিয়ে তাবীজে ভরে গলায় বাঁধা, গায়ে মালিশ করা, রওজা শরীফ, মাজার বা কবর ইত্যাদির ছবি বরকতের জন্যে রাখা, চুমু খাওয়া, তা'জীম করা: বিপদাপদ, বালা-মুসীবাত থেকে বাঁচার জন্যে ঘর-বাড়িতে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে বরকতের জন্যে দোকান, অফিস, হোটেলে ছবি রেখে আদবের সাথে দাঁড়িয়ে এগুলো করা।
৮. কবর ধোয়া পানি: মাযারকে মাঝে মাঝে মহা ধুমধামের সাথে গোসল করানো হয়। আর এ কবর ধোয়া পানি লোকেরা শিশিতে বা বোতলে যে যেভাবে পারে নিয়ে যাওয়া এবং নেক মাকসূদ পূরণের উদ্দেশ্যে পান করা।
৯. মাযারের গিলাফের তা'জীম: বিভিন্ন পীর, ওলী-আওলিয়া, বুযুর্গানে দ্বীনের মাযারে বা কবরের ওপরে আজকাল গিলাফ পড়ানো হয়। নির্দিষ্ট সময় পরপর এ গilaফ পরিবর্তন করে আবার নতুন গিলাফ পরানো হয়। পুরানো গিলাফ অতি যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করা হয়। অজ্ঞ, অশিক্ষিত মানুষ অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষিত মানুষ এ সব গিলাফে চুমু খায়, গিলাফ ধরে ফরিয়াদ জানায়, আদবের সাথে মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, এ গিলাফের সুতা তাবীজে ভরে গলায় বাঁধে। এমনকি অনেকেই আরো একধাপ এগিয়ে গিলাফের কাছেই দু'আ চেয়ে বসে।
১০. খাজা বাবার ডেগ: একদল লোক বিশেষত যুবকেরা রজব মাস এলেই পথে-ঘাটে, বাজারে যেখানেই সুযোগ পায় সেখানেই একটা ডেগ বা বড় হাড়ি বসায়। লালসালু কাপড় বিছিয়ে, বাঁশ দিয়ে ছাউনি দিয়ে, বিজলী বাতি জ্বালিয়ে, চকমকি কাগজ এবং বিভিন্ন ধরনের রং লাগিয়ে ঘর সাজিয়ে তার মধ্যে স্থাপন করে ডেগ। তারা একে বলে 'খাজা বাবার ডেগ'।
১১. কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর: শুধু কবর বা মাযার যিয়ারতের উদ্দেশ্যে 'শারঈ সফর' করা। এমনকি শুধু রাসূলে রওজা যিয়ারতের উদ্দেশ্যেও সফর করা।
১২. প্রাণীর ছবি, চিত্র, প্রতিকৃতি, মূর্তি, ভাস্কর্য ইত্যাদির হুকুম: কোন নেতা, লিডার বা স্মরণীয়-বরণীয় ব্যক্তিবর্গের ছবি, চিত্র, প্রতিকৃতি, মূর্তি ভাস্কর্য ইত্যাদি তৈরি করা, মাঠে-ঘাটে, অফিস-আদালতে ও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এগুলো স্থাপন করা, এগুলোকে সম্মান করা, এগুলোর উদ্দেশ্যে পুষ্পস্তবক অর্পণ ইত্যাদি করা।
১৩. তাসাওউফের শায়েখ বা পীরের কল্পনা: তাসাওউফের শায়খ বা পীরের চেহারা, আকৃতি ইত্যাদি কল্পনা করে মোরাকাবা, ধ্যান, জিকির বা অন্য যেকোন 'ইবাদাত করা।
১৪. পীরকে নাযাতদাতা মনে করা: অনেকের ধারণা পীর তাকে জান্নাত পাইয়ে দিবে।
১৫. পীরকে দূর হতে ডাকা: অনেকে স্বীয় পীর বা কোন বুজুর্গ ব্যক্তিকে বহুদূর হতে ডাকে এবং মনে করে যে, তিনি এটা জানতে ও শুনতে পারছেন। অনেক সময় 'ইয়া গাওসুল আযম', 'ইয়া খাজা মুঈনুদ্দীন চিশতী' ইত্যাদি বলে ডাকতে থাকে এবং নিজেদের ফরিয়াদ ও আরজি পেশ করতে থাকে।
১৬. পীরের জন্য ঘর সাজিয়ে রাখা: কিছু সংখ্যক পীরের অনুসারীদের মধ্যে দেখা যায়, তারা তাদের বাড়ির মধ্যে একটি ঘর পীরের জন্য সারা বছর সাজিয়ে গুছিয়ে রাখে। একটা বড় খাটের ওপর চাদর বিছিয়ে বড় বড় কয়েকটা কোল বালিশ সেট করে 'বিশেষ আসন' তৈরি করা হয়। পীরের ছবিকে মালা পরিয়ে সযত্নে ঐ ঘরে টাঙ্গিয়ে রাখা হয়। ফুল ও জরি দিয়ে ঘরটি সুন্দর করে সাজানো হয়। সারা বছর ঐ ঘরে কাউকে ঢুকতে দেয়া হয় না। মাঝে মাঝে মুরিদরা ঐ ঘরে ঢুকে ছবি ও আসনের সামনে আদবের সাথে চুপ করে বসে থাকে।
১৭. পীরের বাড়ির বা আস্তানার খাদেম, গরু, কুকুর, বিড়াল, মাছ ও কচ্ছপ ইত্যাদির প্রতি অন্ধ সম্মান: অনেককে দেখা যায়, পীরের বা মাযারের খাদেম, গরু, কুকুর, বিড়াল ইত্যাদিকে দেখামাত্র দাঁড়িয়ে যায়। এগুলোর সামনে মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকে। অনেকে অবার এ সব গরু, কুকুর, বিড়ালের পা ধরে বসে থাকে নেক মাকসূদ পূরণের জন্য।
১৮. পীর, ওলী-আওলিয়াদের কবরের মাটি ও সেখানে জ্বালানো মোম বিভিন্ন রোগের জন্য উপকারী মনে করা: এ ধরনের কর্ম আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে অহরহ পরিলক্ষিত হয়। তারা বিভিন্ন রোগের ক্ষেত্রে আউলিয়াদের কবরের মাটি ও সেখানে জ্বালানো মোমবাতি অনেক উপকারী মহৌষধ মনে করে অত্যন্ত যত্নের সাথে বাড়িতে নিয়ে যেয়ে তা ব্যবহার করে থাকেন এবং এর দ্বারা কোন রোগ মুক্তি হলে তা কবরস্থ ব্যক্তির দান বা তাঁর ফয়েয বলে মনে করে থাকেন, অথচ এমন মাটি ও মোমকে উপকারী মনে করা।
১৯. গায়রুল্লাহর নামে জিকির বা অযীফা: আল্লাহর জিকিরের ন্যায় কোন নবী বা রাসূল, পীর, ওলী-আওলিয়া, বুযুর্গ, আলিমের নাম জপ করা, বিপদের পড়লে তাদের নামের অযীফা পড়া। যেমন- 'ইয়া রাহমাতুল্লিল আলামীন', 'ইয়া রাসূলুল্লাহ', 'নূরে রাসূল নূরে খোদা', 'হক বাবা হক বাবা' ইত্যাদি।
২০. খালি পায়ে মাযারে বা পীরের বাড়িতে: কারো কারো ধারণা মাযারে বা পীরের গ্রামে যা পীরের বাড়ির সীমানার মধ্যে জুতো ছাড়া খালি পায়ে হাটা।
২১. কামেল পীরের গোনাহ নেই: 'খোদা পাক, কামেল পীরও পাক। তাদের কোন গোনাহ নেই। তারা নিষ্পাপ।'- এ ধরনের কথা বলা।
২২. পীরের পায়ে সিজদা করা বা পীরের পা চাটা: সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে পীরের পায়ে সিজদা করা বা নেক মাকসূদ পুরণের জন্যে, রোগমুক্তির নিয়তে পীরের পা চাটা, পায়ে চুমু খাওয়া, গাড়ি চাটা, গাড়িতে চুমু খাওয়া, ব্যবহার্য থালাবাটি বা অন্য কোন বস্তু চাটা বা চুমু খাওয়া, মাযার চাটা বা চুমু খাওয়া।
২৩. আল্লাহ্র যাতের সাথে মিশে যাওয়া: অনেকের ধারণা মুরিদ যখন 'ফানাফিল্লাহ' পর্যায়ে পৌঁছে, তখন সে আল্লাহ্ যাতের সাথে মিশে বিলীন হয়ে যায় এবং তাঁর পৃথক কোন অস্তিত্ব থাকে না। খাওয়া, ঘুম, স্ত্রী সহবাস সহ যাবতীয় কাজকর্ম তখন আর নিজস্ব থাকে না। এগুলো সব আল্লাহর হয়ে যায় অর্থাৎ এ সব কাজ তার রূপে আল্লাহ নিজেই করেন। (নাউযুবিল্লাহ)
২৪. আল্লাহ যা করান, তাই করি: একদল ফকীর বলে, 'আল্লাহ যা করান, তা-ই করি। আল্লাহ সলাত আদায় করান না, তাই আদায় করি না, আল্লাহ গাঁজা টানাচ্ছে, তাই টানি। তাকদীরে সলাত থাকলে তো আদায় করব।'
২৫. দিলে দিলে নামাজ পড়ি: অনেক পীর সাহেবানরা সলাত, সাওমের ধার ধারে না; কিন্তু খুব সাধনা করে! দু'-তিন দিন পর পর একটু খায়। কম কথা বলে। লোকজনের সাথে কম মিশে। দিনের বেশিরভাগ সময় চুপ করে ধ্যান মগ্ন অবস্থায় বসে থাকে। এরা বলে বেড়ায়, 'আমরা দিলে দিলে নাজাজ পড়ি। তোমরা মাত্র ৫ ওয়াক্ত পড়, আর আমরা সারা দিন-রাতই নামাজ পড়ি।'
২৬. সীনায় সীনায় মারফতী: পীর বা দরবেশ দাবীদার একদল বলে থাকে, 'কুরআন শরীফ মোট ৪০ পারা। ৩০ পারায় জাহেরী ইলমের বিষয় আছে। বাকি ১০ পারা মারফতী বিদ্যায় ভরা রয়েছে। এ ১০ পারা আমরা সীনায় সীনায় পেয়েছি। শরীয়তের আলেমরা এগুলোর খবরও রাখে না।'
২৭. শরীয়তের ইত্তেবা সর্বাবস্থায় ফরয নয়: অনেকের ধারণা, মুরীদ যখন মারেফাতের উচ্চ শিখরে পৌঁছে যায়, তখন তার জন্য শরীয়তের হুকুম-আহকাম, সলাত, সাওম ইত্যাদি মাফ হয়ে যায়।
২৮. শিকের গন্ধযুক্ত নাম বা সম্বোধন: যে সকল নাম বা সম্বোধনে শিকের সংস্পর্শ পাওয়া যায়, সেগুলোকে ইসলাম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। জাহিলিয়াতের যুগে মানুষ নিজের সন্তান-সন্ততির নাম সূর্য, চন্দ্র ইত্যাদির নামের সাথে সম্পৃক্ত করে রাখত। যেমন- আবদে শামস্ বা সূর্যের গোলাম, আবদে মানাফ বা মানাফের গোলাম ইত্যাদি। রাসূলুল্লাহ () এ ধরনের নাম রাখতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।
২৯. শিকের গন্ধযুক্ত উপাধী: পীর বা ওলীকে এমন কোন উপাধীতে সম্বোধন করা উচিত নয় যা অর্থগত দিক দিয়ে আল্লাহ তা'আলার জন্য প্রযোজ্য। যেমন- গাউসূল 'আযম (সর্বশ্রেষ্ঠ সাহায্যকারী), গরীবে নেওয়াজ (গরীবরা যার মুখাপেক্ষী), মুশকিল কোশা (যার মাধ্যমে বিপদাপদ দূর হয়), কাইয়ূমে জামান (যামানা কায়েম করেছেন যিনি) ইত্যাদি।
৩০. সন্তানের নামকরণে নবী ও পীর-আওলিয়ার সাথে সম্পর্ক স্থাপন: গোলাম মোস্তফা (মোস্তফার গোলাম), আব্দুন্নবী (নবীর দাস), আব্দুর রাসূল, আলী বখস্ (আলী-এর দান), হোসেন বখস্ (হুসাইন-এর দান), পীর বখস্ (পীরের দান), মাদার বখস্ (মাদারের দান), গোলাম মহিউদ্দীন (পীর মহিউদ্দীনের গোলাম), আব্দুল হাসান (হাসানের গোলাম), আব্দুল হুসাইন (হুসাইনের গোলাম), গোলাম রাসূল (রাসূলের গোলাম), গোলাম সাকলায়েন ইত্যাদি নাম রাখা।
৩১. বিপদে পড়লে জ্বিন, ফেরেশতা, পীর, ওলী-আওলিয়াদের ডাকা বা আহ্বান করা: দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ মূর্খ, পীর ও মাযার পূজারী অনেক লোককে দেখা যায় বিপদে-আপদে, রোগে-শোকে আল্লাহ তা'আলাকে বাদ দিয়ে পীর, ওলী, জ্বিন ও ফেরেশতাদের আহ্বান করতে থাকে। যেমন- 'ইয়া গাওসূল 'আযম বড় পীর আব্দুল কাদের জীলানী', 'ইয়া খাজা বাবা', 'ইয়া সুলতানুল আওলিয়া', 'হে পীর কেবলাজান', 'হে জ্বিন',... আমাকে রক্ষা করুন, আমাকে বিপদ হতে বাঁচান, আমার মাকসূদ পুরা করুন, সন্তান দিন ইত্যাদি। কোন কোন মূর্খলোক বালা মুসীবাতের সময় বুযুর্গ লোকদের উদ্দেশ্যে দু'আ করে, ফরিয়াদ জানায়। এভাবে গাইরুল্লাহকে ডাকা এবং তাদের কাছে নিজের ফরিয়াদ ও আরজি পেশ করা, তা কাছ থেকে হোক আর দূর থেকেই হোক।
৩২. কোন সমস্যায় জ্বিনকে ডাকা: কোন সমস্যায় জ্বিনকে ডাকানো, জ্বিনের কাছে সাহায্য চাওয়া ইত্যাদি।
৩৩. পীর, ওলী-আওলিয়াদের স্মৃতিচিহ্নের তা'যীম করা এবং এদের কাছে গায়েবী সাহায্য চাওয়া: অনেকে পীর, ওলী-আওলিয়াদের স্মৃতি চিহ্নকে এমন তা'যীম করে যে তা শিক্কের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। পীর হয়তো কোন গাছের নীচে বসতেন, বিশ্রাম করতেন বা তায়াম্মুমের জন্য কোন পাথর ব্যবহার করতেন। পীরের মৃত্যুর পর মুরীদরা ঐ গাছ বা পাথরের গোড়ায় আগরবাতি, মোমবাতি, ধূপ ইত্যাদি জ্বালায়, মিলাদ পড়ায়, বিপদ মুক্তির জন্য ফরিয়াদ জানায়। খানজাহান আলীর মাযারের পুকুরে কুমীর আছে, চট্টগ্রামে কথিত বায়েজীদ বোস্তামীর মাযারে কচ্ছপ আছে। আবার কোন কোন জায়গায় গজার মাছ, জালালী কবুতর ইত্যাদি পীর-ওলীদের স্মৃতি বহন করছে বলে মানুষের বিশ্বাস। অজ্ঞ অশিক্ষিত মানুষেরা মাযারের ব্যবসাদার খাদেমদের খপ্পরে পড়ে এ সব কচ্ছপ, গজার মাছ, কুমীর, জালালী কবুতর ইত্যাদিকে অলৌকিক ক্ষমতাসম্মন্ন মনে ক'রে এদের জন্য বিভিন্ন খাদ্যবস্তু পূজাস্বরূপ নিয়ে যায় এবং এদের কাছে সাহায্যের জন্য প্রার্থনা জানায়।
৩৪. বাচ্চা কখন নেবেন?: আমাদের দেশে শিক্ষিত সমাজে প্রায়ই এরূপ কথাবার্তা শুনতে পাওয়া যায়- 'বাচ্চা কখন নেবেন? বিয়ের পর পর বাচ্চা নিলে জীবনটা উপভোগ (Enjoy) করা যায় না, তাই কমপক্ষে বিয়ের ৪/৫ বছর পর বাচ্চা নেয়া উচিত। আর দ্বিতীয় বাচ্চা ৫/৭ বছরের ব্যবধানে নেয়া উচিত। আমরা দু'টার বেশি বাচ্চা নেব না।'... ইত্যাদি। এ ধরনের কথাবার্তা শুনলে মনে হয় যেন বাচ্চা নিজের ইচ্ছামতো বা খেয়াল-খুশীমতো আগে-পরে যখন-তখন নেয়া যায়, নিজের ইচ্ছেমতো ১/২/৩ টা এরূপ সংখ্যাও নির্ধারণ করা যায়; এ ক্ষেত্রে আল্লাহর যেন কোন ক্ষমতাই নেই!
৩৫. কোন জীবিত বা মৃত ব্যক্তির নিকট গায়েবী সাহায্য পাওয়া: আল্লাহ ব্যতীত কোন সৃষ্টির নিকটে রোগ, বিপদমুক্তি, রিযিক, সন্তান, সম্পদ ইত্যাদি চাওয়া।
৩৬. মন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তন: সিলভা, কোয়ান্টাম বা অন্য কোন মেথডের (পদ্ধতি) দ্বারা মন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানো এবং সকল সমস্যার সমাধান লাভ করার মাধ্যমে জীবনে সফলতা অর্জন করার কথা বলা।
৩৭. কপালে টাকা স্পর্শ করে তা সম্মান করা: টাকা-পয়সা মানুষের সম্পদ। তা মানুষের জীবনের প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। সে হিসেবে টাকা-পয়সা মানুষের খাদিম। মানুষ টাকার খাদিম বা গোলাম নয়। সম্পদের সম্মান হচ্ছে তাকে সংরক্ষণ করা, তাকে অবজ্ঞা ও তুচ্ছ জ্ঞান না করা। পায়ের নিচে ফেলে এটাকে দলিত-মথিত না করা। মাথা ও কপাল ঠেকিয়ে আল্লাহ্ ইবাদত করা হয় এবং তাঁকে সম্মান জানানো হয়। তাই কপালে টাকা স্পর্শ করে টাকাকে সম্মান করা বা 'Money is the Second God' বলা টাকাকে পূজা করারই শামিল। এ কাজটি অনেক মুসলিম ব্যবসায়ীদের মাঝে পরিলক্ষিত হয়। দোকান খোলার পর প্রথম বিক্রি হলেই তারা এ কাজটি করে থাকে।
৩৮. গ্রহ নক্ষত্রের তা'ছীর (প্রভাব): অনেকের ধারণা মানুষের ভাল-মন্দ, বিপদ- আপদ, উন্নতি-অবনতি ইত্যাদি গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাবে হয়। কেউ বিপদে পড়লে বলা হয়, 'এ ব্যক্তির ওপর শনি গ্রহের প্রভাব পড়েছে'। কারো আনন্দের খবর শুনলে বলা হয়ে থাকে, 'এ ব্যক্তি মঙ্গল গ্রহের নজরে সু নজরে আছে'।
৩৯. চন্দ্র ও সূর্য গ্রহণের প্রভাব: অনেকের ধারণা চন্দ্র ও সূর্য গ্রহণ মানুষের ভাল- মন্দ, জন্ম-মৃত্যু, বিপদ-আপদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে।
৪০. নব জাতকের জন্য: নব জাতকের হাতে চামড়ার চিকন তার বা তাগা বা গাছ বা এ ধরনের অন্য কোন কিছু চুড়ির মতো করে বেঁধে দেয়া হয় যাতে কোন অশুভ রোগ-বালাই বা বদ জ্বিন-ভূত স্পর্শ করতে না পারে। আবার নবজাত শিশুকে জ্বিনের অশুভ দৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য বাচ্চার কানে ছিদ্র করা, বাচ্চার বালিশের নিচে জুতার টুকরা রাখা অথবা শিশুর মাথার চুল না কাটা। চোখের দৃষ্টি বা চোখ লাগা থেকে শিশুসন্তানকে রক্ষার জন্য সন্তানের গলায় মাছের হাড়, শামুক ইত্যাদি ঝুলিয়ে রাখা, কপালে কালো টিপ বা দাগ দেয়া।
৪১. গায়রুল্লাহ্র নামে কসম করা: আব্দুল্লাহ ইবনু উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 'যে ব্যক্তি গায়রুল্লাহর নামে কসম করল, সে কুফরী করল অথবা শির্ক করল।' মূলত, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন নামে কসম করলে কসম হয় না। কসম করার ক্ষেত্রে আমাদের কিছু কুসংস্কার রয়েছে। যেমন কসম করার জন্য আমরা বলি- আমার বাপ-মায়ের কিরা (শপথ), আমার পুত্রের কসম, খাজা বাবার কসম, বদর পীরের দোহাই, ল্যাংটার দোহাই, এই তোর মাথায় হাত দিয়ে বললাম, বিদ্যা ছুঁয়ে বললাম, তিন সত্যি করলাম, রাসূলুল্লাহ্ র কসম, কা'বা শরীফের কসম, নিজ চোখের কসম, নিজ যৌবনের কসম, নিজ হাত-পা'র কসম, আগুনের কসম, রক্তের কসম, খাদ্যদ্রব্যের কসম, নিজের বাপের কসম, নিজের মায়ের কসম, নিজের সন্তানের কসম, নিজ প্রিয়জনের কসম, তোমার মায়ের কসম, তোমার কসম, নিজের বিদ্যার কসম, পশ্চিম দিকে মুখ করে বলছি, বই মাথায় নিয়ে বা বিদ্যার উপর হাত দিয়ে বলছি, তোমার গা, মাথা বা হাত ছুঁয়ে বলছি ইত্যাদি। ইত্যাদি। এ ধরনের কসমের কোনটাই ঠিক নয়, এগুলো শিকযুক্ত কুসংস্কার।
৪২. উকীল, মধ্যস্থতাকারী, শাফা'আতকারী, সুপারিশকারী: যারা কোন জীবিত বা মৃত আলিম, পীর, ওলী, বুযুর্গের কাছে গায়েবী সাহায্য চায়, তারা এভাবে ওযর পেশ করে- 'আমরা পাপী, পাপীর দু'আ আল্লাহ কবুল করেন না। তাই এ সকল বুযুর্গ ব্যক্তিরা আমাদের জন্য আল্লাহ্র কাছে সুপারিশ করবেন।'
৪৩. আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য পীর, ওলী বা বুযুর্গ ব্যক্তির অসীলা গ্রহণ: আল্লাহকে পাওয়ার জন্যে, তাঁর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের লক্ষ্যে, ক্ষমা ও সাহায্য পাওয়ার আমার কোন জীবিত বা মৃত পীর, ওলী বা বুযুর্গ ব্যক্তিকে অসীলা বা মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা।
আরও কিছু প্রচলিত শির্ক:
১. শরী'আত প্রবর্তন ও হালাল-হারাম সাব্যস্ত করার ক্ষমতা আল্লাহ ছাড়া অন্যের আছে বলা।
২. 'আল্লাহ আর এই পোষা কুকুরটি না হলে আজ রাতে আমার বাড়িতে চুরি হয়ে যেত।', 'আল্লাহ এবং আপনি না হলে আজকে মহা অঘটন ঘটে যেত।'- এ ধরনের কথা বলা।
৩. আল্লাহ তা'আলাকে ভালবাসার ন্যায় পীর, ওলী-আওলিয়াদেরকে ভালবাসা।
৪. ওলিগণকে আল্লাহ ও সাধারণ মানুষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী ও শাফা'আতকারী হিসেবে মনে করা।
৫. বিভিন্ন তন্ত্র-মন্ত্রের মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক করা, যেমন- সুলায়মানী নকশা, ইয়াহুদীদের নিকট থেকে প্রাপ্ত বিদ্যা তথা কুরআনের আয়াতসমূহ সংখ্যায় লিপিবদ্ধ করা, বিভিন্ন নবী, ফেরেশতা, ওলী, জ্বিন ইত্যাদির নাম দ্বারা তাবীয-কবচ তৈরি করা বা ব্যবহার করা।
৬. আওলিয়াদের কবর থেকে বরকত লাভ ও রোগ মুক্তির জন্য সন্তানদেরকে সেখানে নিয়ে যাওয়া এবং তাদের গায়ে মাযারের পানি ছিটানো ও পান করানো।
৭. মৃত্যুর পর ওলিগণ রূহানী শক্তিবলে অনেক কিছু করতে পারেন বলে বিশ্বাস করা।
৮. দু'আ গৃহীত হওয়ার জন্য মুরশিদ, পীর ও ওলিদের মাযারের দিকে মুখ করে দু'আ করা।
৯. আওলিয়াদের মাযারে অবস্থান করে তাঁদের বাতেনী ফয়েয হাসিল করা এবং তাঁদের মাধ্যমে আল্লাহর নিকটবর্তী হতে চাওয়া।
১০. আওলিয়াদের কবরের উপর অথবা পার্শ্ববর্তী স্থানে উৎপন্ন বা লাগানো গাছের শিকড়, ফল ও পাতার মাধ্যমে বরকত ও বিবিধ কল্যাণ লাভ করা যায় বলে মনে করা।
১১. আওলিয়াগণ নিজস্ব মর্যাদা বলে আল্লাহর কোন পূর্বানুমতি ব্যতীত তাঁদের ভক্তদের জন্য শাফা'আত করে তাদেরকে মুক্তি দিতে পারবেন বলে বিশ্বাস করা।
১২. ওলিগণের মধ্যে যারা গাউছ ও কুতুব তারা পৃথিবী পরিচালনা করেন বলে বিশ্বাস করা।
১৩. আওলিয়াদের কবরের পার্শ্বে দাঁড়িয়ে বিনয় প্রকাশ করা।
১৪. কবরের পার্শ্বে প্রদক্ষিণ করা।
১৫. রাসূল (ﷺ)-এর অতিভক্তি করতে যেয়ে তাঁর প্রশংসা ও স্তুতি বর্ণনা করে এমন সব কথা-বার্তা বলা, যা তাঁকে আল্লাহ ও প্রতিপালকের মর্যাদায় উন্নীত করে।
১৬. কোন ভাস্কর্য বা স্মৃতিসৌধকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য নিরবে দাঁড়িয়ে থাকা।
১৭. মাযারের পুকুর, দিঘি ও কূপের পানি পান করে এবং মাছ, কচ্ছপ ও কুমীরকে খাবার দিয়ে রোগ মুক্তি ও বরকত কামনা করা।
১৮. দুধের গাভী ও নতুন বাচ্চার গলায় তা'বীজ, জুতা ও জালের টুকরা ঝুলানো।
১৯. স্বামীকে বাধ্য করার জন্য গোপনে ঘরের চুলা, বিছানা, বালিশ বা অন্য কোথাও তা'বীজ রাখা।
২০. পত্র লেখার সময় আল্লাহ্র রহমত ও পত্র প্রাপকের দু'আকে সম-মর্যাদাবান করে এমনটি বলা যে, 'আমি আল্লাহর রহমতে ও আপনার দু'আয় ভাল আছি।'
২১. চোখের কুদৃষ্টি থেকে ক্ষেতের ফসল রক্ষার জন্য মাটির পাত্রের পিঠে চুনা লেপ দিয়ে তা ক্ষেতে রেখে দেয়া।
২২. কারো নামে ছেলের নাক-কান ছিদ্র, আংটি পরানো, চুল রাখা, টিকি রাখা ইত্যাদি।
২৩. কোন দিকে যাত্রা করার সময় ঘরের দুয়ারে 'মা খাকি' বলে বিদায় গ্রহণ করা।
২৪. কোন জিনিসের রোগ বা পীড়ার ছুত লাগে বলে বিশ্বাস করা।
২৫. কলেরা, দাদ, একজিমা, এইডস, প্লেগ ও যক্ষা ইত্যাদি রোগকে 'আল্লাহ্ ইচ্ছায় সংক্রামক রোগ' হতে পারে এমনটি না বলে কথায় ও লেখনিতে এগুলোকে শুধু সংক্রামক রোগ বলা।
২৬. কোন বস্তুকে আল্লাহর ইচ্ছা ও তাঁর রহমতে কোন রোগের ক্ষেত্রে উপকারী বা অপকারী এমনটি না বলে সরাসরি সে বস্তুকেই উপকারী বা অপকারী বলা। যেমন, 'নাপা ট্যাবলেট জ্বর সারানোর জন্য উপকারী' বা 'অমুক ঔষধ এ রোগ সারানোতে উপকারী'-এ ধরনের কথা বলা।
২৭. কোন ঔষধ খেয়ে আল্লাহ্র রহমতে রোগ সেরেছে এমনটি না বলে অমুক ঔষধ খেয়ে আমার রোগ সেরেছে এমনটি বলা। যেমন, এ রকম কথা বলা যে, 'নাপা খেয়ে আমার জ্বর সেরেছে।'
২৮. তেমাথা পথে ভেট দেয়া, পূজা উপলক্ষে কাজ-কর্ম বন্ধ রাখা, দোল পূজায় আবির মাখানো, বিষকর্ম পূজায় ছাতু খাওয়া, পৌষ মাস সংক্রান্তিতে গরু দৌড়ানো, ঘোড়া দৌড়ানো, আশ্বিন মাস সংক্রান্তিতে গাশ্চি, গোফাগুনে পূজা উপলক্ষে আমোদ উৎসব, নতুন কাপড় ক্রয়, পার্বনী দেয়া, মনসা পূজা উপলক্ষে নৌকা দৌড়ানো, হিন্দুদের আড়ঙ্গে, মিছিলে, উৎসবে যাওয়া।
২৯. পহেলা বৈশাখে হিন্দুদের অনুসরণে সিঁদুর, তিলক, হলুদ শাড়ী, ধূতি পড়ে 'এসো হে বৈশাখ' গান গেয়ে মঙ্গল প্রদীপ জ্বেলে, পান্তা-ইলিশ খেয়ে হিন্দুদের দেবদেবীর প্রতিমূর্তি নিয়ে মিছিল করে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান করা।
৩০. কাউকে 'পরম পূজনীয়' সম্বোধন করে লেখা, 'কষ্ট না করলে কেষ্ট পাওয়া যায় না' বলা, 'জয়কালী নেগাহবান' ইত্যাদি বলা।
৩১. আল্লাহর হুকুম ছেড়ে অন্য কারো আদেশ বা সামাজিক প্রথা পালন করা।
৩২. কোন কাজ সমাধা করার জন্য অনেকে আল্লাহর প্রতি পরোয়া বা ভরসা না করে নেতৃবৃন্দ, ধনাঢ্য ব্যক্তি, রাজ কর্মচারী ইত্যাদি উচ্চপদস্থ ব্যক্তির নিকট ধর্ণা দিয়ে বলে, 'এ কাজে আপনি আমার একমাত্র ভরসা', 'আপনি বাঁচাতে পারেন, মারতে পারেন', 'আপনার হিল্লাতেই টিকে আছি', 'আপনি ছাড়া তো উপায় নেই', 'পৃথিবীতে আপনি ছাড়া আমাকে দেখবার আর কেউ নেই', 'আপনার সুদৃষ্টি ছাড়া চলার কি পথ আছে', 'উপরে আল্লাহ নীচে আপনি' ইত্যাদি যাবতীয় বক্তব্য এবং সেই সঙ্গে তাদের নিকট আকুতি-মিনতি, অনুনয়-বিনয় করা, কুর্ণিশ করা, করজোড় করা, ফুলের মালা দেয়া, অভিনন্দন ও প্রশংসা করার মাধ্যমে এবং নত মস্তকে চোখের পানির দ্বারা স্বীয় স্বার্থ উদ্ধারের জন্য আল্লাহ হতেও অধিক ভক্তি শ্রদ্ধা দেখানো ইত্যাদি।
৩৩. আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উদ্দেশ্যে সলাত আদায় করা, সাওম পালন করা, দান করা, যাকাত দেয়া ইত্যাদি।
৩৪. ধন, বিদ্যা, সুখ-সম্পদ, আপদ-বিপদ, যুগ, কাল ইত্যাদি কোন দেবদেবী যথা লক্ষ্মী, সরস্বতী, কালী, কলি ইত্যাদির প্রতি আরোপ করা।
৩৫. দেবদেবীর সাথে কাউকে তুলনা করা, যেমন- লক্ষ্মী ছেলে, লক্ষ্মী মেয়ে, লক্ষ্মী বউ, লক্ষ্মী মা, লক্ষ্মী বাবা, ঘরের লক্ষ্মী, মণির দশা, কলিকাল, মহাদেবের দোহাই, দেখতে একটা দেবতার বা দেবীর মতো, ঠিক দেবীর মতোই সুন্দরী প্রভৃতি বলা।
৩৬. কাউকে জ্বিন, ভূত, প্রেত ধরেছে সন্দেহে ঐগুলো দূর করার জন্য গরু, মুরগী, হাঁস, বকরী ইত্যাদি ভেট (ভোগ) দেয়া।
৩৭. হিন্দুদের উৎসব বা পূজার দিনকে সম্মান করা, হিন্দুর কালীবাড়ীর মেলার দিনের বা মেলার সম্মানার্থে বা মেলার সৌন্দর্য বৃদ্ধিকল্পে যোগদান করা অথবা তাদের অনুসরণে কিছু করা। অনুরূপভাবে, খৃষ্টানদের উৎসব ও ধর্মীয় দিন, যেমন- ক্রিস্টমাস ডে (বড়দিন), ভ্যালেন্টাইন ডে (ভালবাসা দিবস), থার্টি ফাস্ট নাইট ইত্যাদি উদ্যাপনের জন্য তাদের সাথে যোগদান করা, আনন্দ করা, সহযোগিতা কল্পে, সম্মানার্থে বা সৌন্দর্য বৃদ্ধি কল্পে কাজ করা।
৩৮. 'অমুক আমাকে বাঁচাল' বা 'অমুক আমার/আমাদের সর্বনাশ করল' এরূপ বলা।
৩৯. যদি কেউ উঠতে-বসতে মনে করে যে, 'অমুক পীর বা নবী আমার সব অবস্থা দেখছে, শুনছে ও জানতে পারছে; আমার কোন বিষয়ই তার নিকট গোপন থাকে না।'
৪০. পীর, অলী, আলেম, নবীকে ডাকার সময় 'হে মা'বুদ (হে একমাত্র ইবাদাতের যোগ্য), বেপরওয়া খোদাওন্দ (পরম প্রভু), মালিকুল মুলক শাহানশাহ- এ ধরনের আল্লাহ তা'আলার গুণ প্রকাশক শব্দ ব্যবহার করা।
৪১. কেউ যদি বলে অমুক লোক অমুক পীর/ওলীর ক্রোধে পড়ে পাগল হয়েছে, অমুক ওলী/দরবেশকে অসন্তুষ্ট করেছিল বলেই অমুকের এত দুর্দশা হয়েছিল, অমুকে দয়াতে অমুকে জিতেছে, ঐ কাজটা অমুক দিন অমুক সময়ে আরম্ভ করা হয়েছিল বলেই ভাল হয়েছে বা বিগড়ে গিয়েছে।
৪২. আল্লাহ তা'আলা অধিকাংশ জনগণের রায়ের মাধ্যমে ক্ষমতা দান ও তা ছিনিয়ে নেয়ার মালিক হওয়া সত্ত্বেও কথায় ও লেখনিতে 'দেশের জনগণকে ক্ষমতার মালিক' ও 'জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস' এরূপ মনে করা।
৪৩. রিয়া বা লোক দেখানো ইবাদত।
৪৪. কার্যকারণের সহায়তা গ্রহণ করা ও এর দ্বারাই কাজ সম্পাদনের বিশ্বাস।
৪৫. পাশা, তীর, টিয়াপাখি ইত্যাদির সাহায্যে ভাগ্য জানতে চাওয়া। ফালনামা, খাবনামা, তালেনামা, কুরআন থেকে ফাল নেয়া।
৪৬. হস্তরেখা গণনা, যাদুবিদ্যা, রাশিচক্র, ১০০% গ্যারান্টিতে রোগমুক্তির কথা বলা।
৪৭. চেহারা দেখেই অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের কথা বলে দেয়া।
৪৮. আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে সিজদা করা, কবর-মাযার সিজদা করা।
৪৯. সালাম দেয়ার সময় ঝুঁকা (এমনকি সামান্য মাথা ঝুঁকানোও) অথবা কারো সম্মানার্থে মাথা নত, সিজদা ও কদমবুসী করা।
৫০. কারো সামনে মূর্তিবৎ হাতজোড় করে দাঁড়ানো ও বসে থাকা।
৫১. পীর/ওলীর নামে গাড়ি, বাড়ি, দোকানের নাম রাখা, মাল উঠাতে 'ইয়া আলী', 'ইয়া নবী', 'ইয়া রাসূল' ইত্যাদি বলা।
৫২. আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নিকট দু'আ বা প্রার্থনা জ্ঞাপন করা।
৫৩. নিজ ইচ্ছায় ছেলে-মেয়ে জন্ম, হুজুর/পীর/ওলী/দরবেশের দু'আয় সন্তান লাভ বলা।
৫৪. গায়রুল্লাহর নামে মানত করা (যেমন- কবর, মাযার, দরবার ও মুকামে মানত করা), আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে পশুপালন।
৫৫. আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে জবেহ বা কুরবানী করা।
৫৬. শির্ক-কুফর যুক্ত ঝাড়ফুঁক, তা'বীয-তুমার ও কবচ বাঁধা।
৫৭. আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ওপর নির্ভর করা।
৫৮. আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ভয় করা বা অন্য কারো কাছে আশা করা।
৫৯. যিকিরের সময় পীর/ওলী/নবী/রাসূলের কলবের অসীলা গ্রহণ।
৬০. আল্লাহর ইচ্ছা বা অভিপ্রায়ে অংশীদার স্থাপন করা।
৬১. রূহানী শক্তিবলে মুশকিল আসান, খাজা বাবার দু'আর কথা বলা।
৬২. নিজের বা অপরের ভাল বা মন্দ করার ক্ষমতা থাকার কথা বলা।
৬৩. রত্ন-পাথরের মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তন, পীরের অন্ধ আনুগত্য করা।
৬৪. কবর ও মাযার পূজা, মাযারে ফুল (পুষ্পস্তবক) অর্পণ, গিলাফ জড়ানো ও বাতি জ্বালানো।
৬৫. কবরে আযান দেয়া, কবরে পীরের শাজরা, জামা, পাগড়ী বা অন্য বস্তু রাখা।
৬৬. চাল পড়া, আয়না পড়া, কুরআন ঘোরানো, তুলা রাশির মাধ্যমে চোর ধরা।
৬৭. গ্যারান্টি দিয়ে কলব জারী, আল্লাহ শুধু বাতেনী অবস্থা দেখবেন।
৬৮. কবরকে সামনে রেখে সলাত, কবরকে তাওয়াফ, কবরে মশারী টাঙানো।
৬৯. মাযারো টাকা দেয়া, পীর/ওলী/নবী/রাসূলকে হাযির-নাযির জানা।
টিকাঃ
১. আহমাদ ও আত্ব-ত্বাবারানী কর্তৃক সংগৃহীত।