📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 পীরের দুয়ারে কঁদে রোজআজ এমন জন, পীরের কথা মেনে নিতে ছিল বিষাদত্ব

📄 পীরের দুয়ারে কঁদে রোজআজ এমন জন, পীরের কথা মেনে নিতে ছিল বিষাদত্ব


এ কাহিনীটি কল্পনার আশ্রয়ে বানানো কোন গল্প নয়, অসত্যও নয়। জলজ্যান্ত বাস্তব ঘটনা। প্রাত্যহিক জীবন থেকে তুলে নেয়া একটা আটপৌরে অথচ নিদারুণ মর্মস্পর্শী একটি ঘটনা। কাহিনী বিবৃত করেছেন যিনি তিনি পেশায় একজন চক্ষু চিকিৎসক।
রেফাজুদ্দীন নামের সবে কৈশোর পেরোনো চওড়াঙ্গী এক তরুণ একদা এসেছিল তাঁর নিকটে। তার এক ভাই ছিল সঙ্গে। যন্ত্রণা-কাতর মুখ। চোখের কোণে কালি। চোখ দুটো প্রায়-নির্মিলিত। মুখের ভাষায় উচ্চারিত কেবল হতাশা। চিকিৎসক পরীক্ষা করে জানালেন, 'না, সব শেষ। পৃথিবীর রঙ-রূপ ধরা দেবে না তার কোনদিনও এ দৃষ্টিতে।' আমৃত্যু অন্ধ হয়ে বেঁচে থাকতে হবে রেফাজুদ্দীনকে। এক রাত্রিতে শুঞ্জলিত হয়ে, কুসংস্কার কবলিত হয়ে চিরতরে চোখ হারিয়ে জীবনের সব আশা ও স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়েছে তার। অন্যের প্রশ্রয়ে নয়, অন্যের ঔদাসীন্যে বিপন্ন জীবনযাপন করে বেঁচে থাকতে হবে রেফাজুদ্দীনকে।
কী হয়েছিল রেফাজুদ্দীনের? যৌবন বহ্ণিময় তরুণ রেফাজুদ্দীন বরাবর মেধাবী ছাত্র। প্রতি ক্লাসে প্রথম হয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। তার এবং স্কুলের শিক্ষকদের ধারণা এস.এস.সি.-তে প্রথম বিভাগে ভাল ফলাফল লাভ করবে। একদিন ক্লাসে এক শিক্ষককে সে জিজ্ঞেস করে : 'স্যার আপনি তো এস.এস.সি.-তে অনেক ভাল ফলাফল করেছিলেন। আপনি কিভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন স্যার?'
'দশ থেকে বার ঘণ্টা পড়াশোনা নিয়ে থেকেছি। এ সময়টায় বই ছাড়া অন্য কোনদিকে মনোযোগ দিই নি। চেষ্টাটাই আসল। চেষ্টা ও সাধনা করার ফল আমি পেয়েছি। পড়াশোনার সঙ্গে আরেকটি কাজও আমি করেছিলাম।' -এটুকু বলে থেমে যান শিক্ষক।
'সেটা কী স্যার?' উৎসুক হয়ে জানতে চায় রেফাজ। 'এক পীর সাহেবের দোয়া নিয়েছিলাম। আমাদের গ্রামের পাশের গ্রামে এক পীর আছেন। সবাই তাকে বলে কড়াপীর। পরীক্ষার আগে আমি সেই কড়াপীরের দোয়া এনেছিলাম কয়েকবার। ইচ্ছে করলে তোমার আব্বাকে নিয়ে একবার কড়াপীরের কাছে যেতে পার।'
কড়াপীরের ঠিকানা বলে দেন স্যার। কোনদিন কিভাবে যেতে হবে বলে দেন তাও।
সরলমতি রেফাজুদ্দীন বিষয়টা গিয়ে বলে তার আব্বাকে। সামান্য শিক্ষিত রেফাজের বাবা তৎক্ষণাৎ সায় দেন এবং পীর সাহেবের কাছে যাবার দিনক্ষণ ঠিক করে। করে ফেলেন। নির্ধারিত দিনে কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে পিতা-পুত্র হাজির হয় কড়াপীরের আস্তানায়। বারান্দায় বসা মাঝবয়সী, দীর্ঘকায় সুপুরুষ পীর চোখ বুজে আধশোয়া হয়ে আছে মাটিতে। পাশে গামছা, লুঙ্গি, বদনা, মেছওয়াক, পানপাত্র ও পিকদান রাখা। কয়েকজন লোকও ঘিরে বসে আছে তাকে। লোকগুলো সবাই আনত ভঙ্গিতে বসা। তাদেরও চোখ বোঁজা। দু'জন যুবকের একজন পায়ের নিকট ও অন্যজন মাথার কাছে বসে আছে। একজন পীরের পা দুটো টিপে চলেছে একাধারে। আরেকজন মাথার পাকা চুল তুলে দিচ্ছে। সমগ্র পরিবেশের মধ্যে আলুথালু ও অরুচিকর অবস্থা বিরাজ করছে। এ অবস্থায় রেফাজ দারুণ অস্বস্তি অনুভব করে। বিরক্ত ধরে যায় তার। সে শ্রদ্ধাপুত মন নিয়ে পীর বাড়িতে গিয়েছিল। কিন্তু চারদিকে নোংরা, অস্বাস্থ্যকর ও রুচিহীন অবস্থা থেকে তার ভক্তি-শ্রদ্ধা তো টুটে যায়ই, উপরন্ত বিরক্তিতে ছেয়ে যার তার মন।
রেফাজ ও তার বাবা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। একসময় যুবকদ্বয়ের একজন আঙুল ও চোখের ভাষায় কথা বলতে ও শব্দ করতে বারণ করে। একজন উঠে এসে রেফাজের বাবাকে খানিক দূরে নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে জানতে চায় কেন এসেছে তারা। এরপর সে চোখের ইশারায় ডেকে রেফাজকে পীর সাহেবের মাথার কাছে বসায়। পায়ের শব্দে পীর সাহেব একবারের জন্য চোখ দুটো একটু খুলেই আবার বন্ধ করে। যুবকের নির্দেশে রেফাজ পীরের পাকা চুল তুলতে থাকে। কয়েক মিনিট নিঃশব্দ এভাবে চলতে থাকে। এক সময় আকস্মিকভাবেই দ্রুতলয়ে পীর সাহেব উঠে বসে। কাউকে কোনরকম বোঝার সুযোগ না দিয়ে রেফাজের গালে সজোরে এক বেমক্কা চড় হাঁকিয়ে দিল। রেফাজ তো হতবাক! কি অপরাধে তাকে চড় খেতে হল কিছু বুঝে উঠতে পারে না। ফ্যাল ফ্যাল করে কেবল পীরের দিকে তাকিয়ে থাকে। এত লোকজনের মধ্যে অকারণে চড় খেয়ে অপমানিত বোধ করে। একজন যুবক বারান্দার এক কোণে ডেকে নিয়ে রেফাজকে বলে, 'হুজুরের গোস্বা অইছে। ক্যান অইছে কইবার পারমু না। তয় মনে অয়, তুমি খালি আতে আইছো, এইডা বোঝবার পাইরা ক্ষেইপ্যা গেছে। হুজুরের লগে দেখা করতে অইলে ছদগা নিয়া আইতে হয়।'
রেফাজ ভয়ে নিজের মধ্যে সিঁটিয়ে গেছে। হুজুর যদি রেগে গিয়ে তাকে বদ্‌দোয়া দেয় তাহলে যেসব যাবে। সে তার বাবাকে নিয়ে সবার সঙ্গে পরামর্শ ক'রে ঠিক করে, দু'দিন পর ছদকা নিয়ে আবার আসবে। আবার যায় তারা কথানুযায়ী। এবার সঙ্গে নেয়া ছদকা হুজুরের পায়ের নিকট সবিনয়ে জোড়হাতে রেখে দেয়। এবার হুজুর সস্নেহে রেফাজের মাথায় হাত বুলিয়ে ওদেরকে শরবত পান করায়। তারপর ওর বাবাকে কাছে ডেকে বলে, 'পোলার ওপর জ্বিন আছর করছে। দু'জ্বীনে ওর চোখ দু'ডায় বাসা বানছে। এগুলারে তাড়াইতে না পারলে পোলা পরীক্ষায় সফলকাম অইতে পারবো না। দাঁড়াও জ্বিন খেদাইন্যা অষুদ দিয়া দিতেছি।' একজনকে ইশারা করতেই ঔষুধের উপকরণগুলো এসে গেল। রেফাজ বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখল উপকরণের মধ্যে রয়েছে গরুর শুকনো গোবর, উঠোনের ভেজা মাটি, শুকনো মরিচের গুঁড়ো, সরিষার তেল ইত্যাদি। এগুলো সে একটা মাটির বাটিতে একত্র করে একটা পেস্ট তৈরি করল। তারপর কয়েকজনকে নির্দেশ দিল রেফাজকে হাত-পা দড়ি দিয়ে বেঁধে শুইয়ে দিতে। রেফাজের ওপর হামলে পড়ে দু'আঙুলে বানানো পেস্ট নিয়ে দু'চোখে সজোরে ডলে দিল। রেফাজ অসহ্য যন্ত্রণায় কাটা গরুর মতো অসহায়ভাবে ছটফট করতে লাগল। বিকট চিৎকারে কাঁপিয়ে তুলল চারদিক। কিন্তু কেউ কাছে যেতে সাহস পেল না। হুজুর দু'চোখ চেপে ধরে রাখে আট-দশ মিনিট। তারপর হাহ্ হাহ্ হাহ্ করে হাসতে হাসতে বলে, 'হ এবার সরছে। সইরা পড়ছে জ্বিনগুলো, না পলাইয়া যাইবো কই! যা পরীক্ষায় তুই কামিয়াব হবি।'
রেফাজকে তারপর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হল। চোখের যন্ত্রণায় কাতর হয়ে সে ক্রমে নিঃসাড় হয়ে পড়ছে। পরদিন দেখা গেল তার চোখের অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গীন। চোখ মেলতেও পারছে না, কিছু দেখতেও পারছে না। দৃষ্টি হারানোর উৎকণ্ঠায় সে মিইয়ে গেছে। তাওহীদপন্থী পাড়া-প্রতিবেশী ওর বাবাকে পরামর্শ দেয় শহরে নিয়ে গিয়ে ডাক্তার দেখাতে এবং প্রয়োজনে এ বিষয়ে থানায় অবগত করতে। কিন্তু ওর বাবার ভয় তাতে যদি ক্ষতি হয়! হুজুর যদি জানতে পেরে অভিশাপ দেয়। এভাবে দু'দিন যাবার পর অবস্থা আরও শোচনীয় হলে কলেজ পড়ুয়া গ্রামের দু'তরুণ জোর করে রেফাজকে শহরে নিয়ে যায়। পরিচিত একজনের সহায়তায় তারা বিশিষ্ট চক্ষু ডাক্তারের নিকট হাজির করে। এ বিষয়ে আগেই বলা হয়েছে, ডাক্তার সাহেব পরীক্ষা করে চোখ নিরাময়ের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন।
আমাদের গ্রামীণ সমাজে শুধু নয়, শহরেও তথাকথিত পীর সাহেবদের জোরালো দাপট লক্ষ্য করা যায়। তাওহীদ (আল্লাহ্র একত্ব) সম্পর্কে অসচেতন, ঈমান দুর্বল ও ভীরু লোকদের ওপর কলাকৌশলে প্রভাব বিস্তার করে এমন অনেক কড়াপীর বহাল তবিয়তে আয়েশী জীবনযাপনের বন্দোবস্ত করে রেখেছে। নানারকম ফাঁদ পেতে, ধর্মের দোহাই পেড়ে, ক্ষয়ক্ষতির ভয় দেখিয়ে, বিষয়-সম্পত্তির লোভ দেখিয়ে আকৃষ্ট করে নিজেদের দিকে। এক ধরনের কৃত্রিম ঐন্দ্রজালিক বা কুহকময় পরিবেশ বানিয়ে সম্মোহন সৃষ্টি করে নানাভাবে প্রতারণা করে মানুষকে। পীরালী-প্রতারণার নজির বাংলাদেশসহ এ উপমহাদেশের দু-একটি দেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও কিন্তু নেই। এদের বর্জন না করলে, উচ্ছেদ না করলে রেফাজুদ্দীনের মতো অনেক মেধাবী সম্ভাবনাময় তরুণের স্বপ্ন টুটে যায়। জীবন সংকটাপন্ন হয়। প্রতারণার চাতুর্যে অর্থবিত্ত খুইয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যায়।

📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 যুক্তিবাদের ঘূর্ণিপাক, শুভ পীর নিপাত যাক

📄 যুক্তিবাদের ঘূর্ণিপাক, শুভ পীর নিপাত যাক


এই তো সেদিনের ঘটনা। সত্তর-ঊর্ধ্ব এক মাকে ঘিরে এ কাহিনী। এমনিতে মা। এমন বার্ধক্য বেলাও চোখে-মুখে প্রবল ব্যক্তিত্বের ছাপ, আভিজাত্যেরও হয়ত। সংস্পর্শে গেলে, দেখে, কথা বলে শ্রদ্ধায় বুক ভরে যায়। রুচি, চলা, বসা সব কিছুতেই একটা পরিচ্ছন্নতা লক্ষ্য করার মতো। বয়সের ভারে ন্যুজ হলেও ক্লান্তি তাকে আচ্ছন্ন করেনি কখনো। অপার মাতৃস্নেহের ছায়ায় উদার ঠাঁই দিতে সদাসর্বদাই আগ বাড়িয়ে থাকতেন। এমন প্রবীণা ক্লান্তিহীন মা-টি শেষ জীবনে আক্রান্ত হলেন মরণব্যাধি ক্যন্সারে। বলা হয়, ক্যান্সার রোগে ভুগে ভুগে, ক্ষয় হতে হতে এক সময় প্রায় নির্বাপিত হয়ে যায় প্রাণবায়ু। তবু চেষ্টা চলে ফেরানোর সাধ্যমতো। যতো প্রকার প্রতিকার আছে, সব এক এক করে পরখ করে দেখা। এ ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম হয়নি। এক সন্তান তার বর্তমানে হোমিও চিকিৎসক। নাম-যশ করে ফেলেছেন ইতোমধ্যে বেশ। সে সময় ছিলেন তিনি হোমিও চিকিৎসাশাস্ত্রের ছাত্র। তার শিক্ষকসহ পরিচিত যত নামী হোমিও চিকিৎসক ছিলেন সবাইকে দেখিয়েছেন, পরামর্শ নিয়েছেন। কিন্তু কাজ হয়নি কিছুই। বরং অবস্থা ক্রমান্বয়ে খারাপের দিকেই এগুতে থাকে। অগত্যা উপায়ান্তর না দেখে, সবার পরামর্শে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হল মাকে। হাসপাতালের চিকিৎসকরা রোগিনীকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানিয়ে দিলেন, না ফেরানোর আর পথ নেই। সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় পৌঁছে গেছে। এখন যে ক'দিন ঠেকা দিয়ে রাখা যায়। মাতৃ-অন্তপ্রাণ সন্তান দিশেহারা হয়েও শেষ চেষ্টার আশা বুকে নিয়ে এখানে-ওখানে ধর্ণা দেন। অপরিসীম ধৈর্য-স্থৈর্যের অধিকারী তার এ ছেলে। মাতৃস্নেহে সজাগ থেকে মার সেবা করেন হাসপাতালে তার অত্যন্ত ধীর, স্থির স্বভাবের সন্তান।
একদিন পরিচিত কেউ একজনের পরামর্শে তিনি গেলেন এক পীর সাহেবের আস্ত ানায়। হাসপাতালের কাছাকাছিই বখশিবাজার এলাকায়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পীর সাহেব দেখা দিলেন, শুনলেন তার কথা, ক্রমাগত পান চিবানোর ফাঁকে ফাঁকে। চেহারায় নূরানী ভাব জ্বল জ্বল করে (!?) কথা বলেন খুব কম এবং খুব মাপজোঁক করে। তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসেন। বেশ আয়েশী ভঙ্গিতে দু'জন খাদেম দু'দিকে পানের পিকদানি হাতে ধরে বসে আছে। পীর সাহেব মুখ এগিয়ে ধরলেই সঙ্গে সঙ্গে পিকদানি বাড়িয়ে ধরে খাদেম যুগল। ওপরে ঝালর বাতি আলো ছড়ায়। অধিকাংশ সময়ই চোখ দুটো মুদে থাকেন। খুললে সোজা নিচ বরাবর তাকান। ব্যাকুল পুত্র তার মায়ের অবস্থা বর্ণনা করেন খুব ধীরলয়ে। যেন প্রতিটি বাক্য অনুধাবন করার সুযোগ পান পীর সাহেব। আদ্যপ্রান্ত শুনে অনুধাবন করে কিছুক্ষণ চুপচাপ। নিস্তব্ধ গুমোট পরিবেশ বিরাজ করছে। ভক্তি-শ্রদ্ধায় সবার দৃষ্টি আনত। কেবল দিশেহারা পুত্র তাকিয়ে আছেন সরাসরি পীর সাহেবের মুখের দিকে। তার তর সইছে না। কিছু বলুক, প্রতিকার বাতলে দিক দ্রুত।
বেশকিছু সময় নিয়ে চোখ খুললেন তিনি। একটু নড়েচড়েও বসলেন। দু'খিলি পান মুখে গুঁজে দিয়ে, কিছুক্ষণ জাবর কেটে একমুখ পরিমাণ পিক নির্গত করলেন পিকদানিতে। অতঃপর মুখ খুললেন। প্রথমে অভয়বাণী, 'না, ঘাবড়াবার কিছু নেই। আল্লাহ মাফ করবেন। আল্লাহ মাফি দেবেন। তবে একটা কাজ করতে হবে। খুব গোপনে, কাউকে না জানিয়ে কাজটি করতে হবে। শনিবার বা মঙ্গলবার রাত যখন কাঁটায় কাঁটায় ১২টা তখন বুড়িগঙ্গা নদীর মাঝ বরাবর গিয়ে পৌঁছাতে হবে। সঙ্গে নিতে হবে মুখে পাটের দড়ি বাঁধা একটি বোতল। নদীর পানিতে যেখানে ঘূর্ণিপাক হচ্ছে ঠিক সেখানটায় বোতল ছুঁড়ে ফেলে এক নিঃশ্বাস সমান সময় পরে একটানে টেনে উঠাতে হবে। ওই অবস্থায় বোতলে যেটুকু পানি উঠবে, সেই পানি সকালে খালি পেটে তিন ফোঁটা করে এক হপ্তা খাওয়াতে হবে। এতে ইনশাল্লাহ নিরাময় হবে।'
একটা যেন দিশা খুঁজে পেলেন পুত্র। উৎসাহ ও রোমাঞ্চে তাড়িত হয়ে তিনি রাতের এক প্রহরে গিয়ে হাজির হলেন বুড়িগঙ্গার তীরে। এক নৌকার মাঝি চাঁদের আলোয় উন্মুক্ত বাতাসে শরীর এলিয়ে দিয়ে ঘুমোচ্ছিল নৌকার পাটাতনে। তাকে ডেকে ডেকে তুলে তিনগুণ ভাড়া সাব্যস্ত করে মধ্য বুড়িগঙ্গায় যাত্রা এবং রোমাঞ্চের পরিসমাপ্তি। মাঝি অবশ্য এ রকম ঘটনার সঙ্গে পূর্ব পরিচিত। আরো কয়েকজন যাত্রী একই উদ্দেশ্যে চেপেছিল তার জলযানটিতে ইতোপূর্বে।
বোতলে গঙ্গাজল যেটুকু পাওয়া গিয়েছিল, তা যথারীতি সেবন করানো হল। মাকে ঘটনা খুলে বলা হয়েছিল সেবনের আগে। তাতে তিনি উৎসাহিত হয়ে উঠেছিলেন। চার-পাঁচ দিন অবস্থা কিছুটা ভালোর দিকে বলে মনে হল। কিন্তু সেটা টিকল না বেশিদিন। দশদিন পর থেকে অবস্থা তার আবার খারাপের দিকে এগুতে লাগল। খারাপ হতে হতে বাইশ দিনের মাথায় শেষ খারাপটিও গ্রাস করল তাঁকে।
আমাদের দেশে এমনই হাজারো পীর, ফক্বীর, দরবেশ বাবাজীরা লোক ভোলানো ছলছুতো বিছিয়ে ধর্মের দোহাই দিয়ে বহাল তবিয়তে আছেন। এরা মানুষের অসহায়তা ও বিপন্নাবস্থাকে পুঁজি করে প্রতারণার জাল বিস্তার করেন। দুর্বল ঈমানের অধিকারী মনের ওপর সদম্ভে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। কৌশল হিসেবে রাতের প্রথম/শেষ প্রহর, নদীর মাঝখান, নদীর মোহনা, ঘূর্ণিপাক, পাটের দড়ি, ফাঁসির দড়ি, কাঁচের বোতল, একটানে তোলা, শনিবার/মঙ্গলবার, তেমাথা, চৌরাস্তা ইত্যাকার ফন্দিফিকির জুড়ে দিয়ে এক ধরনের সম্মোহন সৃষ্টি করেন। এ সম্মোহনে একটা কাজ অবশ্য হয়। তাৎক্ষণিক কিছুটা শক্তি বা আত্মবিশ্বাসেরও সৃষ্টি হয়। যেমনটি হয়েছিল এই মার। যাতে তিনি প্রথমদিকে কিছুটা ভাল অনুভব করেছিলেন।
আমাদের সমাজের প্রবল ধন্বন্তরী, প্রভাবশালী পীর সাহেবদের দাপটের শেকড় কিন্তু খুব আলগা নয়। অনেকখানি গভীরেই প্রোথিত। কিন্তু আসলে এরা পরগাছা, পরজীবী এবং ঠকজীবীও। পরগাছাদের নির্মূল করতে চেতনা ও তাওহীদভিত্তিক প্রকৃত ইসলামী জ্ঞানের ব্যাপক চর্চা দরকার।

📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 আঠারোশ যত পীর, ঈমান ধ্বংসের পথগামী তাঁর

📄 আঠারোশ যত পীর, ঈমান ধ্বংসের পথগামী তাঁর


পীর শব্দটি ফার্সী শব্দ। এটা আরবী শব্দ নয়। কুরআন-হাদীসের পরিভাষার অন্ত র্ভূক্ত কোন শব্দও নয়। ব্যবহারিকভাবে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা পুংলিঙ্গ বা স্ত্রীলিঙ্গ উভয়কেই পীর বলা হয়। পারস্যের অগ্নিপূজারীদের পুরোহিতকে বলা হয় পীরে মুগাঁ। মুগ-এর বহুবচন মুগাঁ, যার অর্থ হচ্ছে অগ্নিপূজারীগণ। পীরে মুগাঁ মানে অগ্নিপূজারীদের পীর। ফার্সী অভিধানে পীরে মুগাঁর অর্থ করা হয়েছে 'আতাশ পোরম্ভকা মুরশেদ' অর্থাৎ অগ্নিপূজারীদের পীর। তবে মুগাঁরা যখন তাদের পীরকে ডাকে তখন পীরে মুগাঁ বলে ডাকে না, পীর বলেই ডাকে।
অন্যদিকে পানশালার মদ বিক্রেতাকেও 'পীরে মুগাঁ' বলা হয়। কারণ সুফীবাদীরা আধ্যাত্মিক প্রেমকে রূপকভাবে মদ রূপে অভিহিত করে, উক্ত প্রেমরস-পরিবেশককে পীর বা 'গুড়ী মশাই' নামে অভিহিত করে থাকে।
তবে, মুসলিম দীক্ষাগুরু বোঝাতে অনেকেই পীর শব্দটি ব্যবহার করে থাকে। মুরীদ একটি আরবী শব্দ, যার অর্থ শিষ্য সাধক বা পীরের শিষ্য। মুরশিদ একটি আরবী শব্দ যার অর্থ 'আধ্যাত্মিক গুরু' বা 'ধর্মে সঠিক পথ প্রদর্শক'। ফার্সী 'পীর' এবং আরবী 'মুরশিদ' শব্দ দু'টির অর্থ একই। তবে আমাদের দেশে মুরশিদের পরিবর্তে পীর শব্দটিই বেশি প্রচলিত। পীরের শিষ্য বোঝাতে আরবী 'মুরীদ' শব্দটিই গ্রহণ করা হয়েছে। সম্ভবত মুর্শীদ-মুরীদ বলার চেয়ে পীর-মুরীদ বলা বেশি সাবলীল বলেই এমনটা হয়েছে। এ দেশে পীরের সাথে আরেকটি শব্দ প্রচলিত আছে সেটা হল 'ফকীর' অর্থাৎ পীর-ফকীর; এখানে ফকীর কিন্তু আরবী শব্দ। ফকীর হল মরমী সাধক বা সাধু। আবার পীর-মুর্শীদ কথাটিও চালু আছে এ দেশে।
হিন্দুধর্মে যারা সন্ন্যাসী বা সাধু আমাদের মুসলিমদের মাঝে তারাই ফকীর নামে পরিচিত। হিন্দুরা বলে সন্ন্যাসী-বাবা বা সাধু-বাবা। মুসলিমরাও বলে পীর-বাবা বা ফকির-বাবা। 'বাবা' একটি তুর্কী শব্দ। হিন্দুরা পিতাকে বলে বাবা। কারো কারো মতে সংস্কৃত শব্দ 'বপ্র' থেকে 'বাবা' শব্দের উৎপত্তি। আসলে এ ধারণা ঠিক নয়। 'বপ্র' থেকে 'বাপু' হয়েছে, যার অর্থ 'পিতা'। 'বাবা' থেকে 'বাবু' হয়েছে। 'বাবু' শব্দটি ফার্সী। কারো কারো মতে 'বাবু' একটি বাংলা শব্দ কিন্তু সেটাও একটি ভুল ধারণা। যাহোক, হিন্দু সাধু বা সন্ন্যাসীর জন্য তুর্কী শব্দ বাবা এবং হিন্দু ভদ্রলোকের নামের শেষে ফার্সী বাবু শব্দের ব্যবহার হয়। ভারতবর্ষে কে প্রথম 'বাবা' শব্দটির প্রচলন করেছে, সে ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। সেটা কি প্রথম মুসলিমদের দ্বারা (পীর-বাবা বুঝাতে) নাকি হিন্দুদের দ্বারা (সাধু-বাবা বুঝাতে) প্রচলিত হয়েছে, এ বিষয়ে নিশ্চিত রূপে কোন তথ্যসূত্র পাওয়া যায়নি। আবার এ ব্যাপারটিও সন্দেহজনক যে, 'পীর-বাবা' কথাটি ফার্সী ভাষাভাষীদের মধ্যে প্রচলিত আছে কি-না। যদি সংস্কৃত শব্দ ‘অঙ্গ’ থেকে ‘বাপু’, ‘বাপু’ থেকে ‘বাবু’ এবং ‘বাবু’ থেকে ‘বাবা’ শব্দটির উৎপত্তি হয়ে থাকে, তাহলে নিশ্চিত করে বলা যায় যে, ভারতীয় হিন্দুরাই প্রথম ‘সন্ন্যাসী-বাবা’ কথাটির প্রচলন ঘটায় এবং তাঁদের দেখাদেখি মুসলিমরা ‘ফকীর-বাবা’ বা ‘পীর-বাবা’ কথার উৎপত্তি ঘটায়। আর ফার্সী ভাষাবাদীদের মধ্যে ‘পীর-বাবা’ কথাটির প্রচলন না থাকলে, এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, হিন্দুদের দেখাদেখি মুসলিমরাই ‘সাধু-বাবা’ বা ‘সন্ন্যাসী বাবা’র পরিবর্তে নিজেদের ‘পীর-বাবা’ বা ‘ফকীর-বাবা’ কথার সৃষ্টি করে।
অতীতের যারা শাহ্, খাজা, খান ইত্যাদি মুসলিম উপাধি নিয়ে এদেশের মুসলিম জনসাধারণ কর্তৃক প্রতিষ্ঠা ও স্বীকৃতি পেয়েছেন, আজকের পীর-ফকীরের তাদের ন্যায় নাম ধারণ করে পীর-ফকীর সাজেন এবং মিথ্যা মায়ার সৃষ্টিকালে ঐসব উপাধির কোন কোনটি অলীক পীরের নামে বা ফকীরের নামের সাথে যোগ করে দেন। মিথ্যা ও শুভ্র পীরে এ দেশটা আজ ভরে গেছে। এদেরকে পীরাল হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। অবশ্য হিন্দুদের অধিকারে একটি শব্দ ঠাঁই পেয়েছে, তা হল পীরালী। তারা ঐ সকল ব্রাহ্মণকে পীরালী বলে, যে মুসলিমদের সংস্পর্শে এসেছে। তাদের মতে, এ ব্রাহ্মণ নষ্ট হয়ে গেছে। তাই তারা এমন বিদঘুটে নাম দিয়েছে যা মুসলিমদের ‘পীর’ শব্দের সাথে জড়িত। এ হিন্দুরাই আবার মুসলিমদের জন্য একজন দেবতা সৃষ্টি করেছে, যার নাম দিয়েছে মানিকপীর। তাদের মতে, মুসলমানের গরু, ছাগল, ভেড়া, উট, মহিষ ইত্যাদি পশুর দেবতা হল মানিকপীর। কারণ, এ সবই উৎসর্গ করা হয় পীরের নামে।

টিকাঃ
১. ‘উৎসর্গ’ সংস্কৃত ভাষার একটি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ ‘অর্পণ’। এ অর্পণ স্বতঃত্যাগ করে অর্পণ। এ অর্পণ দেবতাকে অর্পণ। উৎসর্গ যখন জীবন দানের ক্ষেত্রে প্রয়োগ হয়, তখনও এ উৎসর্গ দেবতার দ্বারা থাকে, সমাজে থাকে। ধন-দৌলত উৎসর্গের প্রেক্ষাপটও তাই। সংস্কৃত ভাষায় এমন কতিপয় শব্দ আছে, যেগুলো শুধু ধর্মীয় কারণে ব্যবহার হয়, উৎসর্গ তন্মধ্যে একটি। কিন্তু ধর্মে আছে, মানুষের অন্তরে নারায়ণের আসন। এ জন্যা তাদের শাস্তির প্রতিষ্ঠার অভিমত হচ্ছে, নারায়ণ-প্রেম অন্তরে নিয়ে কোন মানুষকে কিছু দান করলেও তা ‘উৎসর্গ’ হয়ে যায়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে এ শাস্তির বিধান সীমাবদ্ধ থাকার কথা। অনেক ইসলামী চিন্তাবিদ এবং ইসলামী সংস্কৃতি-সচেতন ব্যক্তিও হিন্দুদের শাস্তির নারায়ণ-দর্শনের বেখেয়াল ও অসচেতন অনুসরণ করতে গিয়ে নিজেদের ব্যক্তি বা শ্রেষ্ঠাজন স্বজনকে ‘উৎসর্গ’ করে থাকেন। খুব ভালো কথা, সে শ্রদ্ধা ও ভালবাসা দেখাতে পারেন, কিন্তু ‘উৎসর্গ’ শব্দ ব্যবহার করে কেন তা করা হয়? এ শব্দ ব্যবহারে সবাই যে বরবাদ হয়ে যায়। দেবতার জন্য যে শব্দটি নির্ধারিত, তাতে মুসলিমরা কেন হাত বাড়ান? দেবতাতত্ত্বীরা তো মুসলিমদের থেকে কিছু নেয় না, মুসলিমদের শব্দ ভাণ্ডার থেকে তারা পারতপক্ষে কোন শব্দ আহরণ করে না। মুসলিমরা হিন্দু ধর্মের শব্দ ভাণ্ডার থেকে উৎসর্গের মতো শব্দ গ্রহণ ও ব্যবহার করেন কেন, তা বোঝা যায় না। মুসলিমদের শব্দ ভাণ্ডারে শব্দের কি এতই আকাল চলছে যে, ‘উৎসর্গ’ শব্দের কোন বিকল্প বা প্রতিশব্দ নেই? যদি না থাকে তাহলে ভিন্ন কথা আর যদি থাকে তাহলে তিন ভিক্ষুকের মতো তা হাত বাড়িয়ে অপরের থেকে গ্রহণ করেন? ইসলাম ধর্মসহ বিশেষ প্রধান কয়েকটি ধর্মের নিজস্ব পরিভাষা আছে। হিন্দু ধর্মেরও নিজস্ব পরিভাষা আছে, ‘উৎসর্গ’ ও তেমনি একটি শব্দ। মুসলিমদের জন্য ‘উৎসর্গ’ শব্দটি অপসংস্কৃতিমূলক শব্দ। ‘উৎসর্গ’ শব্দটি শুধু ঈমান-আকিদা বিরোধীই নয়, এ শব্দকে স্বীকার করে নেয়া মানে সেই শব্দ-সংস্কৃতির জাত-গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাওয়া। ফলে, সাধারণ অর্থে এ শব্দের ব্যবহার শুধু আপত্তিকর নয়, কবীরা গুনাহও বটে; এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে শিরর্কের পর্যায়ভুক্ত। 'উৎসর্গ' শব্দের পরিবর্তে আমাদের শব্দ ভাণ্ডারে অনেক শব্দ আছে। আমরা 'নজরানা' শব্দ ব্যবহার করতে পারি। 'নজরানা' আরবী শব্দ। এর ইংরেজি অর্থ হচ্ছে 'A present to a superiors'। আমরা ব্যবহার করতে পারি তোহফা ও হাদিয়া শব্দ। ত্যাগের ক্ষেত্রে যখন 'উৎসর্গ' শব্দটি ব্যবহারের আবেগ আসবে, তখন আমরা কুরবান বা কুরবানী শব্দ ব্যবহার করতে পারি। তবে, জীবন উৎসর্গ করা আর জীবন কুরবান করা মোটেই এক অর্থবোধক নয়। দেবতার উদ্দেশ্যে জীবন উৎসর্গ করা মানে 'বলি' হওয়া, আর আল্লাহর রাহে জীবন কুরবান করা মানে শহীদ হওয়া। মৃত্যু তো উভয় ক্ষেত্রে অবধারিত, কিন্তু মর্যাদার দিক থেকে আসমান-জমিন ও সত্য-মিথ্যার মতোই পার্থক্য। অতএব, 'উৎসর্গ' শব্দ ব্যবহারে এখন থেকে আমরা যেন সতর্ক হই।

📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 বিশিষ্ট সব ব্যক্তিত্বের মাযার, শুনুন কিছু মজার সমাচার

📄 বিশিষ্ট সব ব্যক্তিত্বের মাযার, শুনুন কিছু মজার সমাচার


যে স্থানে মুসলিমদের মৃতদেহ দাফন করা হয়, তা আমরা কবর বলি। আবার এ কবরই অনেক ক্ষেত্রে মাযার হিসেবে পরিচিত। মাযার একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ হল দর্শনীয় স্থান। আজকাল আমরা মাযার নিয়ে যা শুরু করেছি তাতে শুধু শিকের বেসাতি ছড়াচ্ছে। ফলে তা আজ শির্ক প্রদর্শনীর স্থান হিসেবে রূপ পরিগ্রহ করেছে। হিন্দুদের যেমন তীর্থযাত্রা মুসলিমদের তেমন মাযার যাত্রা। হিন্দুরা তীর্থ মন্দিরে দেব- দেবীর পূজা করে আর মুসলিমরা মাযারে গিয়ে মাযার বা পীরপূজা করে।
অধুনা প্রচুর কবর কিংবা ভুয়া কবর মাযার পরিচিতি পেয়ে গেছে। অবশ্যই প্রতিটি মাযার এক একটি কবর কিন্তু প্রতিটি কবর অবশ্যই এক একটি মাযার নয়। কবর বা ভুয়া কবর মাযার পরিচিতি পেয়েছে। কারণ, মাযার আজকাল একটি চমৎকার ব্যবসার হাতিয়ার। তাই, মাযার বলতেই এখন চোখের পর্দায় ভেসে ওঠে একটি আজব প্রতিষ্ঠানের ছবি। কবরস্থান এবং প্রতিষ্ঠান এক বিষয় নয়। কবরস্থানের কোন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেই। কিন্তু মাযারের তা আছে। মাযারে আছে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি, সৌধ, অফিস, খাদেম জাতীয় নানা কর্মচারী, দান বাক্স, আবাসস্থান, মসজিদ, খানকা, এতিমখানা, মাদ্রাসা, দোকানপাট, পুকুর, প্রস্রাবখানা, পায়খানা প্রভৃতি নানা কিছু। অর্থাৎ রীতিমতো একটি কমপ্লেক্স। পক্ষান্তরে, কবরস্থানের এত কিছু নেই। সেখানে শুধুই কবর, চতুর্দিকে বেড়াজাতীয় কিছু একটা সীমানা বা প্রাচীর এবং প্রাচীরগাত্রে কবরবাসীর নাম-পরিচিতি অথবা প্রাচীরের ওপর কবরবাসীর নাম-পরিচিতি যুক্ত সাইনবোর্ড। আর এ কারণেই কবরে কোন কমপ্লেক্স বা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে না।
কবর ও মাযারপূজার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ
মাযারে আর কবরে পার্থক্য থাকবে কেবল নামের মধ্যে এবং কবরবাসীর মর্যাদার কারণেই সেই পার্থক্য। বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুকরণের কারণেই এটা হয়েছে। মধ্যযুগে মুসলিমদের দ্বারা যে কবর পূজা তা খ্রিষ্টান বা ইয়াহুদীদের থেকে সে কালের মুসলিমদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে।
ইসলামের বিরুদ্ধে বিশেষকরে আল্লাহ্র একত্বের চেতনাকে বিনষ্ট করার চক্রান্ত একদিনের জন্যও থেমে ছিল না। ইবলিশ শয়তানের কারসাজিতে একদল লোক সর্বদাই এ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। যখনই মুসলিমদের মধ্যে অজ্ঞতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ঈমানের মধ্যে দুর্বলতা দেখা দিয়েছে তখনই শয়ত্বান ও তার দোসররা তাদের ওপর চড়াও হয়েছে এবং বিভিন্ন সংশয় ও সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। ইসলামের মধ্যে সর্বপ্রথম যে বিভেদ ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছিল সে ছিল ইয়াহুদী আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা। সে মুসলিম ছদ্মাবরণে ইসলামে প্রবেশ করে এবং সর্বপ্রথম 'সাবাইয়া' নামে একটি ফিরকার সৃষ্টি করে। তাদের ষড়যন্ত্রের কারণেই ইসলামের তৃতীয় খলীফা উসমান বিদ্রোহীদের হাতে শহীদ হন। এরাই আলী ও মুয়াবিয়া-এর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। আর এদের মধ্যে থেকেই শিয়াদের বিভিন্ন উপদল যেমন, খারেজী, রাফেজী ইত্যাদির উদ্ভব হয়েছে। এ দলগুলোই বংশানুক্রমে বিভিন্ন সময়ে ইসলামের মধ্যে নতুন নতুন আচার-অনুষ্ঠানের জন্ম দিতে থাকে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, এ আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার বংশধরেরাই ৪০০ হিজরী সনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়। তারা 'ফাতেমী' নাম ধারণ করে, যাতে সাধারণ মানুষ তাদেরকে ফাতেমা-এর বংশধর বা উত্তরাধিকারী মনে করে। প্রকৃতপক্ষে এরা নাবী তনয়া ফাতিমা তথা আহলে বাইতের উত্তরাধিকারী তো ছিলই না বরং এরা ছিল ইয়াহুদী আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার অবৈধ বংশধর। বিশ্ববিখ্যাত তাফসীরকারক ইবনু কাসীর তাদের সম্পর্কে বলেন, 'কাফির, ফাসিকু, পাপিষ্ঠ, ধর্মত্যাগী, যিন্দিক, মুনাফিক, আল্লাহ তা'আলার সিফাত অস্বীকারকারী এবং ইসলাম অস্বীকারকারী অগ্নিপূজকদের মতো তারা ছিল কাফির। তারা সালাত আদায়ও করত না এবং হজ্জও করত না। এরা ক্ষমতা গ্রহণের পর দেখতে পেল যে, মুসলিমরা ইবাদতের ব্যাপারে অত্যন্ত নিষ্ঠাবান এবং মসজিদগুলো কানায় কানায় মুসল্লীতে ভরপুর। এরা তখন প্রমাদ শুনল। তারা তখন মুসলিমদেরকে মসজিদ হতে বিমুখ করার বিকল্প পন্থা খুঁজতে লাগল। তারা জানত যে, মানুষকে সরাসরি ইবাদাত থেকে ফিরানো যাবে না। তাই, ইবাদতের 'খোলস' ঠিক রেখেই তাদেরকে গোমরাহীতে নিক্ষিপ্ত করতে হবে। তারা এটাও জানত যে, মুসলিমদেরকে সরাসরি মূর্তিপূজায়ও লিপ্ত করানো যাবে না। তাই ইবাদতের নামে তাদেরকে এমন কাজের দিকে নিয়ে যেতে হবে যাতে পরিণতির দিক দিয়ে তাদের মধ্যে এবং মূর্তিপূজকদের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য না থাকে।
প্রথমে এরা বিভিন্ন স্থানে সুপরিকল্পিতভাবে মাযার ও কোব্বা বানাতে শুরু করে। এরপর লোকদের মধ্যে প্রচারণা চালাতে থাকে যে, এটা হোসাইন-এর মাযার, এটা যয়নব-এর মাযার ইত্যাদি। সঙ্গে সঙ্গে এ সব মাযারে বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে। মানুষের মাঝে এ ধারণাও দিতে থাকে যে, এ সব কবর যিয়ারত করা, তাতে মান্নত করা ইত্যাদি বড়ই বরকত ও সওয়াবের কাজ। সময়টা ছিল ইসলামের খুবই কঠিন ও পতনের যুগ। মানুষের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে দ্বিধা, সংশয়, সন্দেহ ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর চতুর্মুখী ষড়যন্ত্র তখন সক্রিয় ছিল। আর সরকার বা রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা এ কাজকে আরও বেগবান করে যাচ্ছিল। অনেক লোক তাদের কথায় আকৃষ্ট হতে লাগল। ফলে তারা নিয়মিতভাবে মাযার যিয়ারতের কাজকে ইবাদত বানিয়ে নিল। আল্লাহর রাসূল (স) যে কাজকে সম্পূর্ণ উৎখাত করে গিয়েছিলেন তা-ই পুনরায় চালু হয়ে গেল।
সুফীবাদ ও সুফীদের উত্থানে এ কবর বা মাযার পূজা হালে জল পেয়ে গেল এবং তা দ্রুত সম্প্রসারিত হয়ে সারা মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। বিভিন্ন স্থানে সাহাবীদের এবং পূর্ববর্তী পূণ্যবান লোকদের কবরগুলোকে চিহ্নিত করা শুরু হল। সেগুলোকে পাকা করা, উঁচু করা থেকে শুরু করে সেখানে কবরের ওপর গম্বুজ নির্মাণ করা হতে লাগল। কবরের চারপাশে দেয়াল ঘিরে তার মধ্যে অতি আকর্ষণীয় মিনার তৈরি হতে লাগল। কোন সুফী বা তার পীর মারা গেলে তাকে কবরস্থ করার পরপরই তা পাকা মাযারে পরিণত করা হতো। এভাবে প্রতিটি এলাকায় নতুন নতুন মাযারের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে লাগল। এক পর্যায়ে মাযারের সংখ্যা মসজিদের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যেতে লাগল। কোন কোন স্থানে মসজিদ এবং মাযারকে সমান্তরালভাবে পাশাপাশি স্থাপন করা হতো, যাতে মানুষ দুটোকেই ইবাদতের স্থান মনে করতে পারে। এমনকি সাজসজ্জা ও আকর্ষণীয়তার দিক থেকে মসজিদের চেয়ে মাযারের চাকচিক্য অনেক বেশি প্রাধান্য পেল।
মসজিদগুলো যখন আলোর অভাবে অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকত, মাযারগুলোর আলোতে তখন চারিদিকে আলোকিত হয়ে যেত। তৎকালীন সুফী-দরবেশরা এ মাযারগুলোকে কেন্দ্র করে চিল্লাকাশী করত। এটা মানুষের মন-মগজে বিরাট প্রভাব বিস্তার করল। এবার মানুষ মসজিদে এবং মাযারে যাওয়ার মধ্যে তেমন পার্থক্য মনে করত না। তাই তারা মসজিদে যেমন সালাতের জন্য যেত তেমনি মাযারেও যিয়ারতের জন্য যেত, মসজিদে গিয়ে যেমন আল্লাহর কাছে চাইত তেমনি মাযারে গিয়ে কবরস্থ ব্যক্তির নিকট চাইত, মসজিদে গিয়ে যেমন আল্লাহ্র সন্তুষ্টি কামনা করত তেমনি মাযারে গিয়ে কবরস্থ ব্যক্তির সান্নিধ্য কামনা করত, আল্লাহ্র নামে যেমন যবেহ বা কুরবানী করত তেমনি মাযারের বা পীরের নামেও মান্নত করে তা যবেহ করত। এক কথায় আল্লাহ তা'আলা ও কবরস্থ ব্যক্তির মধ্যে তেমন একটা পার্থক্য বজায় রইল না। মূর্তিপূজার পরিবর্তে শুরু হয়ে গেল কবর পূজা। এ কবরপূজা হল মূর্তিপূজার নব্য সংস্করণ। পার্থক্য শুধু হচ্ছে- আগেরদিনে নেককার বান্দাদের মূর্তি তৈরি করে তার উপাসনা করা হতো। তাদের কাছে সাহায্য চাওয়া হতো, তাদের নামে মান্নত মানা হতো। আর বর্তমানে ঐ নেককার ব্যক্তিদের 'মরদেহ'-এর উপাসনা করা হচ্ছে। তাদের নামে মান্নত মানা হচ্ছে, তাদের কাছে কাংখিত বস্তু চাওয়া হচ্ছে এই আর কি।
এ কবরভিত্তিক ইবাদত তথা কবরপূজার অভিশাপ সুফীদের আশির্বাদে সারা মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল। এমনকি মক্কা, মদীনা, হেজায ও নজদ এলাকাও এর থেকে বাদ পড়েনি। এর ব্যাপকতা যে কত ভয়াবহ ছিল তা বর্ণনাতীত। মূলত তখনকার আরব জাহানের বিভিন্ন এলাকা অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর ন্যায় আক্বীদাগত অধঃপতন ও ভ্রান্তির সাগরে নিমজ্জিত ছিল এবং যা বিভিন্ন তরীক্বাপন্থী পীর-মাশায়েখ ও স্বার্থান্বেষী মহল দ্বারা পরিচালিত হতো। ইরাকের বাগদাদ, নজফ ও কারবালা ছিল মাযারপূজার তীর্থভূমি। এরপর ভারতবর্ষ (বর্তমান ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ) হল এ কবর বা মাযারপূজার সবচেয়ে উর্বরভূমি। অধিকাংশ আলেম-উলামা সুফীবাদে প্রভাবিত হওয়ার কারণে এ তিনটি দেশে মাযার ও কবরভিত্তিক উপাসনালয়গুলো প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে এবং আজ অবধি তা অব্যাহত গতিতেই বেড়েই চলেছে। মূলত ইবলিশ শয়তানের প্ররোচনায়, ইসলাম বিরোধী অপশক্তির সহযোগিতায় এবং পীরতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতায় সমাজে চালু রয়েছে মূর্তিপূজার নব-সংস্করণ কবর পূজা, মাযার পূজা। প্রকৃতপক্ষে, পীরতন্ত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপহার হিসেবে এ কবর পূজার সৃষ্টি হয়েছে।
এ কালের মুসলিমদের মধ্যে বিশেষত এ উপমহাদেশীয় মুসলিমদের মধ্যে কবর পূজা, পীর পূজা প্রভৃতি শিক্ জাতীয় অনাচার-কুসংস্কারের অনুপ্রবেশ ঘটেছে সেই মধ্যযুগীয় ধ্যান-ধারণা ও ভারতীয় হিন্দু সংস্কৃতি থেকে। মূলত আজকের সংস্কৃতির পুরোটাই হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাবে সৃষ্টি হয়েছে। হিন্দুদের মন্দিরের গতি-প্রকৃতি এবং মঠ-শ্মশানের প্রতি দৃষ্টিপাত করলই তা সহজে আঁচ করা যায়। হিন্দুদের তীর্থ মন্দিরে রয়েছে সেবাদাসী, সন্ন্যাসী, সৌধ, দান ব্যবস্থা, সংস্কৃত ভাষা ও ধর্মশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, আবাসস্থল, পূজা মন্দির, সেনিটেশন ব্যবস্থা, রন্ধনশালা, সেবায়েতরূপী কর্মচারী, অফিস, উদ্যান প্রভৃতি নানা কিছু।
আদি ভারতীয়দের মধ্যে সেকালে গাছ পূজা, পাথর পূজা, সূর্য পূজা, অগ্নি পূজা ইত্যাদি প্রচলিত ছিল। কালে কালে সেসব রূপান্তরিত হয়েছে। হিন্দু মুনি-ঋষিগণ জনমানবহীন স্থানে গাছতলায় বসে ধ্যান-সাধনা করতেন। সেই গাছতলা দিনে দিনে ধর্মতলা হয়ে উঠত। মুনি-ঋষিগণের আশ্রম তৈরি হতো সেখানে। মন্দির তৈরি হতো এবং পূজা চলত। এভাবেই সেই স্থান হয়ে উঠত থান (আশ্রম) বা তীর্থস্থান। জনমানবহীন প্রান্তর বা বন-বাদাড় এভাবেই হয়ে ওঠে লোকালয়। মুনি-ঋষিদের আস্তানায় জুটে সাধু, সন্ন্যাসী, সেবায়েত-সেবাদাসী ইত্যাদি। সাধু বা সন্ন্যাসী বাবারাই হয়ে ওঠেন মন্দিরের পুরোহিত। তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে মন্দিরের পূজা হতে শুরু করে তীর্থ কমপ্লেক্সের যাবতীয় বিষয়াদি চলে।
মুনি-ঋষিদের অনুকরণে লোকালয়েও পূজাস্থান তৈরি হয়। বাড়ির আঙ্গিনায় তুলসী, শেওড়া প্রভৃতি পূজা চলতে থাকে। কখনো বাড়ির সদরে একটা উঁচু ভিটায় কখনো-বা পুকুর পাড়ে আবার বাড়ির বাইরে অশ্বত্থ গাছতলায় পূজাবেদী নির্মাণ ক'রে তৈরি হয় দেব-দেবীর প্রতিমা। তীর্থস্থানের তীর্থ-মন্দিরেও এ দেব-দেবীর প্রতিমাই মুখ্য। এদের ঘিরেই তীর্থস্থান। এখানে যেসব মুনি-ঋষি, সাধু ইত্যাদি রয়েছে তারা সবাই উঁচুবর্গের হিন্দু তথা ব্রাহ্মণ। এ ব্রাহ্মণ সাধু পুরোহিতরা ক্ষত্রিয় রাজাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ব্রাহ্মণ পুরোহিতের লালন-পালনের জন্য এবং আশ্রমের জন্য ক্ষত্রিয় রাজা ভূ-সম্পত্তি দান করে। দেবালয় তথা তীর্থমন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রচার-প্রসার এ সব সম্পত্তির আয় থেকেই হয়। আর এ সম্পত্তি দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়।
বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতোই প্রাচীন ভারতের লোকজনেরা প্রাকৃতিক শক্তি নিচয়ের পূজা করত। এ সবের হাত থেকে নিজেদের বাঁচানোর জন্যই তারা এ পূজা দিত। কালক্রমে যখন হিন্দুধর্মের নানা দেব-দেবীর পূজা শুরু হয়, তখন নানা কুসংস্কারাচ্ছন্ন লোকাচারের সৃষ্টি হয়। রোগ-শোক, দ্বন্দ্ব-সমস্যা, বিবাহ, শস্য ও ধন- সম্পদের হেফাজত, অভাব-অনটন থেকে রেহাই, পুত্রলাভ, কন্যাদায় মুক্তি, চাকরি প্রাপ্তি, পরীক্ষা পাস, মামলায় জয় লাভ ইত্যাদি নানা খেয়ালে মানুষ দেবতার আশীর্বাদ পেয়ে ধন্য হবার জন্য এ দেব মন্দিরে এসে পূজা দিতে থাকে। তাদের এ নিয়াত- মানত পূরণের জন্য তারা দেবতার ভোগ নিয়ে আসত। তারা চাল-ডাল, হাঁস-মুরগি, পাঁঠা, শস্য-ফলাদি, দুধ, অর্থকড়ি নানা কিছু দেবতার ভোগ হিসেবে নিয়ে আসত। আর দেব মন্দিরের পুরোহিতরা জনগণকে এ সব আনার জন্য উদ্বুদ্ধ করত। তারা বলত, 'এ সব লাভ করতে হলে শিব বা দুর্গার পূজা দিতে হবে, দেবতার ভোগ দিতে হবে, তারপরই আশীর্বাদ পেয়ে ধন্য হবে, নানা সমস্যা মুক্তি ঘটবে, স্বর্গবাসের ব্যবস্থা হবে, নরকমুক্তি হবে, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে সুখ-সম্পদ-শান্তি আসবে।' অজ্ঞ-মূর্খ হিন্দুরা কুটবুদ্ধির ব্রাহ্মণের কথায় ভুলে গিয়ে দেব-দেবীর বর বা আশীর্বাদ লাভে ধন্য হতে নিজের সর্বস্ব নিয়ে দেবালয়ে বা মন্দিরে হাজির হতো। আর এ সব দেবতার ভোগ মন্দিরের পুরোহিত, সাধু, সন্ন্যাসী, সেবাদাস, সেবাদাসী ইত্যাদি সকলে মিলে ভোগ করত। সেই ধারা আজও অব্যাহত রয়েছে।
মুসলিমদের মাঝে কোন কালেই বৃক্ষপূজা বা প্রতিমা পূজা ছিল না। আজকের বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার হয়েছে নানা ইসলাম প্রচারকের মাধ্যমে। প্রাথমিকভাবে উঁচু বর্ণের হিন্দুদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ নিম্নশ্রেণীর হিন্দুরা ও অন্যান্যরা সেসব ইসলাম প্রচারকদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম হয় এবং তাঁদের স্থায়ীভাবে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। এভাবেই তাঁদের পক্ষে স্থায়ীভাবে আস্তানা গেড়ে ইসলাম প্রচার করা সম্ভব হয়। ধর্মচর্চা ও প্রচারের জন্য তাঁদের আস্তানায় খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন তাঁরা। তাঁদের মৃত্যুর পর এখানেই তাঁদের দাফন-কাফন করা হতো। আর এ মানুষদের কবরসমূহ দরগা বা মাযার রূপে মানুষের কাছে পরিচিতি পায়।
ঐসব বিশিষ্ট ইসলাম প্রচারকগণ মারা যাবার পর তাঁদের ভক্তকূল সেই আস্তানা ছাড়ল না। তারা সেখানে পড়ে রইল। সেসব কবরসমূহ (মাযার) যিয়ারত করতে তাঁদের ভক্তগণ দূর-দূরান্ত থেকে আসতে লাগল। আর এ ভক্তদেরকে মাযারে আসতে উদ্বুদ্ধ করল সেসব তথাকথিত খাদেম বা খাদেম-পীরগণ। তারা যেন উত্তরাধিকারসূত্রে তাঁদের (কবরস্থ ব্যক্তিদের) স্থান দখল করে বসল। মাযারে দান-খয়রাত করতে ভক্ত-অনুরক্তদেরকে উৎসাহিত করতে লাগল। আর অজ্ঞ মুসলমানরা নানা নিয়াত-মানত করে দরগা বা মাযারে টাকা-কড়ি, শিরনী, মোমবাতি, চাল-ডাল, লাউ, কুমড়া, গরু, মহিষ, উট, দুম্বা, খাসি, দুধ, মুরগী, ডিম, ভাত, নারিকেল, কলা ইত্যাদি নানা কিছু মাযারের উদ্দেশ্যে দান করতে লাগল। আর হিন্দু পুরোহিত ও অন্যান্যদের মতো মাযারের খাদেম-পীরেরা তা ভোগ করতে লাগল। উভয় পক্ষই তথাকথিত পীর-ওলি-আওলিয়া ও দেবতার নামে অজ্ঞ-নিরীহ ও সহজ-সরল মানুষের অর্থ-সম্পদ সবকিছু ভোগ করছে। এ হচ্ছে জনগণের মাল-কড়ি ছিনতাইয়ের সবচেয়ে মোলায়েম কৌশল।
হিন্দুদের মুনি-ঋষিদের গড়া পূজা মন্দির যেমন এককালে তীর্থস্থানের মর্যাদা পেল এবং রাজা, জমিদারদের দান-অনুদানে পুষ্ট হতে লাগল, তেমনি তথাকথিত ওলি-আওলিয়াদের মাযারও সাধারণ মানুষ ও আমীর-সুলতানগণের অর্থাৎ মুসলিম শাসনামলে রাজকীয় বা সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় ফুলে ফেঁপে উঠতে লাগল। জনকল্যাণের একটা অঙ্গ মনে করেই মুসলিম শাসকগণ ও ধনবান ব্যক্তিগণ দরগার জন্য প্রচুর ভূ-সম্পত্তি লাখেরাজ সম্পত্তিরূপে বরাদ্দ করেন। প্রথমদিকে দরগার খাদেমগণ কর্তৃক মাযার রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যার জন্য ঐ সম্পত্তি তাদের দ্বারাই ভোগ-দখল হতো। পরবর্তীতে মাযার পরিচালনা বা ম্যানেজিং কমিটি তৈরি করে তার অধীনে সেসব সম্পত্তি ন্যস্ত করা হয় এবং উক্ত সম্পত্তি ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে দেশ ও দশের সম্পত্তিরূপে পরিগণিত হয়। প্রথমদিকে কেবল দরগায় বাতি দেয়ার জন্য দরগার পরিচর্যাকারী খাদেমকে যে নিষ্করভূমি দেয়া হতো তাকে বলা হতো চেরাগী বা চেরাগী মহল। আজকাল বিদেশী এনজিও নামের প্রতিষ্ঠানগুলোর যাত্রা যেভাবে শুরু হয়েছে, খাদেম ও মাযারের যাত্রাও সেভাবেই শুরু হয়েছে। শুধু কি দরগায় বাতি দেয়া? সেখানে এখন হরেক রকম এতিমখানা, মাদ্রাসা, মক্তব, পুকুর, দিঘী, মসজিদ, মাযার, সৌধ প্রভৃতি রয়েছে। অর্থাৎ মাযার কমপ্লেক্স। ওলি-আওলিয়া-দরবেশের মৃত্যু দিবসে ও অন্যান্য সময়ে এখানে হালকা জিকির ও দু’আর আয়োজন হয়। ওলিগণের মৃত্যু দিবসে উরস হয়, দু'আ-জিকির এবং ওয়াজ মাহফিল হয়। এভাবে ইসলামী জলসা ও উরসের মাধ্যমে দিনে দিনে মাযারের প্রধান খাদেম হয়ে ওঠেন মাননীয় পীর খাদেম এবং এক পর্যায়ে কেবলই পীর। খাদেম আর থাকেন না। তখন খাদেম হয়ে ওঠে অন্যান্য নিচু স্তরের সেবায়েতরা। ওদের কেউ একজন হয় প্রধান খাদেম, তারপর এক সময় সেও হয়ে যায় পীর। এ রকম করেই চলতে থাকে বংশধারার মতো। বিভিন্ন দেশ থেকে আগত পূর্বকালের ওলি-দরবেশগণ ছাড়া এদেশে যেসব পীর-ফকির রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে খাদেম কখনও পীর হয় না। এ সব ক্ষেত্রে পীর হয় পীরের ছেলে (বা ছোট ভাই) এবং পীরের বংশ সৃষ্টি হয়। তবে এ সব মাযারে সরকার প্রদত্ত কোন সম্পত্তি নেই। এলাকার ব্যক্তি বিশেষের দানকৃত সম্পত্তি বা মুরীদানদের নজরানা, ভেট প্রভৃতির আয় দ্বারা খরিদকৃত সম্পত্তিই এ সব মাযারের সম্পত্তি। মুরীদগণের থেকে প্রাপ্ত অর্থের দ্বারাই এ সব মাযার কমপ্লেক্স গড়ে ওঠে।
হিন্দুদের দেবমন্দির বা দেবালয়ের পুরোহিত আর মুসলিমদের মাযারের পীর-খাদেমদের চরিত্র একই প্রকৃতির। উভয়ই শোষক ও প্রতারক। সহজ-সরল ধর্মপ্রাণ (অথচ ধর্মে অজ্ঞ) মানুষকে ঠকানোই এদের লক্ষ্য। পুরোহিত বা সন্ন্যাসীবাবা নেমেছেন কাদা-মাটি আর খড়-কুটোর তৈরি কল্পিত প্রতিমা নিয়ে আর পীর-খাদেমরা নেমেছেন মৃত পীর-ফকীর-ওলী-আওলিয়া ইত্যাদি নিয়ে। হিন্দু সাধু-সন্ন্যাসীরা মক্কেল আকৃষ্ট করার জন্য অর্থাৎ বিশেষ বিশেষ দেব-দেবীর ভক্ত সংখ্যা বাড়ানোর জন্য তাদের গুণকীর্তন করে থাকে। তাদের ওপর নানা অলৌকিক ক্ষমতা আরোপ করে থাকে। তারা এক এক দেব-দেবীর এক এক রকম অলৌকিক ক্ষমতার কিচ্ছা-কাহিনী বলে বেড়ায়। মাঝে-মধ্যে কিছু উদ্ভট প্রচারও করে থাকে। একইভাবে মুসলিমদের মাযারের পীর-খাদেমরাও নানা অপপ্রচার করে থাকে। মুসলিমদের মৃত পীরেরা মৃত হলেও তারা অদৃশ্যে থেকে মানুষের তথা মুরীদের উপকার করতে পারে, জীবিত অবস্থায় তারা নানা অলৌকিক কাজ করেছেন বলে প্রচার করা হয়। মূলত মাযার ব্যবসাকে রমরমা ও জমজমাট করে তোলার জন্য এ দেশে নানা মাযারের নানা পীর-ফকিরকে নিয়ে ভণ্ড-প্রতারকের দল নানা কিস্সা-কাহিনীর জন্ম দিয়েছে এবং দিয়ে চলেছে। এটা তো হল ধর্মীয় আবরণে মাযার সৃষ্টি ও মাযার ব্যবসা। এ দেশে রাজনৈতিক মাযারও আছে।
অর্থাৎ 'মাযার' এখন ব্যাপক অর্থে ব্যবহার হয়। আজকাল আর ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সম্মানিত ব্যক্তি হতে হয় না। কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মারা গেলে তার কবরকে 'মাযার' খেতাব দেয়া হয়। এটা করা হয় রাজনীতি ব্যবসাকে চাঙ্গা করে তোলার জন্য। এ জাতীয় খেয়ালেই এখানে গড়ে উঠেছে বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের মাযার। এ সব রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের মাযারে কেবল সেই বিশেষ রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরাই আসা-যাওয়া করে থাকেন। অন্যরা এ সব মাযারে যেতে তেমন একটা আগ্রহী হন না। লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হল, এ সব মাযারে আর্থিক ব্যবসার কোন চিন্তা-চেতনা নেই। এখানে আছে রাজনৈতিক ব্যবসার চিন্তা-ভাবনা। পীর-আওলিয়ার মাযারে যেমন তাদের দোহাই দিয়ে খাদেম-পীরেরা অর্থ হাতিয়ে নেয়, তেমনি রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের মাযারে সেই বিশেষ ব্যক্তির দোহাই দিয়ে ভোট আদায়ের প্রচেষ্টা নেয়া হয়। ভক্ত-সমর্থকদের জন্য এরা হলেন রাজনৈতিক পীর।
সুদীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে অসংখ্য মাযার গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে কিছু মাযার সত্যিকার অর্থে কবরের উপরে নির্মিত মাযার, আর বাকিগুলো মিথ্যা মাযার। এখানে বেশকিছু কাল্পনিক মাযার দেখতে পাওয়া যায়। এগুলো পরিচিত-অপরিচিত নানা নামে গড়ে তোলা হয়েছে। পরিচিত নামের মাযারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বায়েজিদ বোস্তামীর মাযার, বার আওলিয়ার মাযার ইত্যাদি। মাযার নামক এ দুটি প্রতিষ্ঠানে বার আওলিয়া বা বায়েজিদ বোস্তামী কারুরই কোন কবর নেই। এগুলো হল কবরহীন মাযার বা সেসব ব্যক্তিবর্গের নামে এবং স্মরণে গড়ে তোলা হয়েছে।
আবার এ দেশে বেশকিছু মাযার নানা অপরিচিত নামে গড়ে উঠেছে এবং উঠছে এখনও, ভবিষ্যতেও গড়ে উঠবে। এ সব মাযার যেসব নামে গড়ে তোলা হয় সেসব নামের আগে বা পরে 'শাহ' শব্দটি জুড়ে দেয়া হয়। অনেক কৃর্তিমান ইসলাম প্রচারক ছিলেন যাঁদের নামের আগে বা পরে 'শাহ' শব্দটি ছিল। এ কারণেই যারা ভুয়া বা কাল্পনিক মাযার গড়ে তুলতে আগ্রহী হয়, তারা জনগণকে আকৃষ্ট করার জন্য এবং মাযারটিকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য কল্পিত নামের আগে বা পরে 'শাহ' শব্দটি জুড়ে দিয়ে বিভিন্ন নাম তৈরি করে সাইনবোর্ড লাগিয়ে, গেইট দিয়ে, দান বাক্স বসিয়ে, কবর নামক ভুয়া স্থানটি পাকা করে, ইমারত গড়ে, খাদেমের থাকার ঘর বানিয়ে, মজলিসের জায়গা (খানকাহ) তৈরি করে রীতিমতো একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। যেখানে কোন কবর ছিল না, জঙ্গল ভরা ছিল, মানুষ গরু-ছাগল চরাত অথবা কোন কারণে উঁচু ভিটা হয়ে গেছে। সাধারণত সে রকম স্থানে মাযার তৈরি হয়। রাস্তার পার্শ্বে যেখানে লোক চলাচল বেশি হয়, বেশিরভাগ সময়ে সেসব স্থানে মাযার গড়ে ওঠে। বলা নেই, কওয়া নেই হঠাৎ হয়ত দেখা গেল কেউ একজন রাতের আঁধারে লোকচক্ষুর অগোচরে কাউকে ওলি বানিয়ে তার নামে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছে। এর ব্যবস্থাপক, উদ্ভাবক ও তার অনুচরবৃন্দ এখন নানা স্থানে মানুষের কাছে আজগুবি কাহিনী বলে বেড়াচ্ছে সেই কাল্পনিক ওলি বা পীর সম্পর্কে। আর ধীরে ধীরে সেখানে বাতি দেয়া হতে শুরু করে ওরশ পর্যন্ত হতে থাকে।
এমন একটি ঘটনার কথা শুনুন (মিথ্যা পীরের সত্য কাহিনী): দেখুন! মানুষের বিবেক নিয়ে শয়তান কিভাবে খেলা করে। এমনকি আসমান-যমীনের স্রষ্টার ইবাদত থেকে মানুষের ইবাদত, মৃতের তা'যীম... বরং প্রাণী এবং জড়জন্তুর তা'যীমের দিকে আহ্বান করে।
কখনো একটি মিথ্যা কবর প্রতিষ্ঠা করে তার প্রচার করা হয়। মানুষের কাছে তার কারামতের কথা নানাভাবে উল্লেখ করা হয়। যাতে করে এ দ্বারা নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা লাভবান হতে পারে। শেষ পর্যন্ত মানুষ তা বাস্তব মনে করে। অতঃপর শুরু হয় শির্কের খেলা। তাওয়াফ হয়, দু'আ চাওয়া হয়, নযর-মানত হয়... অন্যান্য কবরে যা হয় এখানেও তাই। চাই উক্ত কবর যার নামে প্রচার করা হয় তা সত্য হোক বা মিথ্যা। জনৈক ব্যক্তি শায়খ বরকতের এ রকমই একটি কিচ্ছা উল্লেখ করেছে। ঘটনাটির সূচনা হয় দু'জন যুবকের দ্বারা।
বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আদেল ও সাঈদ। পড়াশোনা শেষ করে একটি গ্রামে তারা স্কুলের শিক্ষকতা কর্মে নিয়োজিত। গ্রামটিতে কবর ও মাযার খুব বেশি। মানুষ ওগুলোর তা'যীম করে, নযর-নিয়ায পেশ করে, উরস করে...।
স্কুলে যেতে হয় বাসে চড়ে। একদিন বাসে চড়ে যাওয়ার সময় আদেল ও সাঈদ পারস্পরিক কথাবার্তায় লিপ্ত। এমন সময় জনৈক বৃদ্ধ বাসে উঠে ভিক্ষা চাইতে লাগল। গায়ে তার হাজার তালি লাগানো পোষাক। তাও ময়লা মাখা। বয়সের ভারে কাঁপছে। দেখে মনে হচ্ছে অর্ধপাগল, মুখের লালা বারবার মুছে ফেলছে হাতের আস্তিনে। গাড়িতে চড়ে সে যাত্রীদের নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করছে, তাদেরকে ভয় দেখাচ্ছে, দাবী করছে তার দু'আ সর্বদা কবুল হয়ে থাকে, সে যদি বদ্‌দু'আ করে তবে বাস উল্টে যেতে পারে...।
সাঈদ এমন পরিবারে প্রতিপালিত হয়েছে যারা ওলী-আউলিয়া, তথাকথিত পীর-ফকীর, দরবেশ, কুতুব, আবদাল... দ্বারা প্রভাবিত। সে ভীত ও পেরেশান হয়ে সাথী আদেলকে অনুরোধ জানায়, ভাই কিছু দিয়ে দাও। কেননা, এ দরবেশ খুব বরকতময় লোক। সর্বদা তার দু'আ কবুল হয়। হতে পারে বাস্তবিকই তার বদ্‌দু'আয় বাস উল্টে যাবে।
আদেল তার কথায় খুবই আশ্চর্য হল। বলল, হ্যাঁ, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের লোকেরা কারামতে বিশ্বাস করে; কিন্তু নেককার ও পরহেজগার লোকদের কারামত। যারা লোক দেখানোর জন্য আমল করে না। আল্লাহর সন্তুষ্টি কামানার্থে গোপনে সৎআমল করে। এ সমস্ত ভণ্ড ও ভবঘুরে লোকদের কারামত নয়। যারা নিজেদের দ্বীন বেচে অর্থ উপার্জন করে।
সাঈদ চিৎকার করে উঠল। কি তুমি আজেবাজে কথা বলছ! এই দরবেশের কারামতের কথা ছোট-বড় সব লোকেরই জানা! একটু পরেই দেখবে তিনি এখন বাস থেকে নেমে যাবেন। আর আমরা গ্রামে পৌঁছার আগেই তিনি হেঁটেই আমাদের আগে পৌঁছে যাবেন। এটা তাঁর কারামত। তুমি কি ওলীদের কারামতকে অস্বীকার কর?
আদেল: আমি কখনই কারামতের অস্বীকার করি না। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে থেকে যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করতে পারেন। কিন্তু এটা হতে পারে না যে, এই কারামতের দরজা দিয়ে আমাদের মধ্যে শির্ক প্রবেশ করবে- আমরা এ সমস্ত মানুষকে, মৃত ওলীদেরকে আল্লাহর সাথে অংশীদার মনে করব? সৃষ্টি, নির্দেশ, জগতের পরিবর্তন ইত্যাদি ক্ষমতা আল্লাহ তাদেরকে দিয়েছেন- এ বিশ্বাস করব? আর তাদেরকে আমরা ভয় করব, তাদের ক্রোধ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করব? এটা সম্ভব নয়।
সাঈদ: তুমি কি বিশ্বাস করা না যে, শায়খ 'আহমদ আবূ সারুদ' হজ্জে এসে আরাফাতের দিন (তুরস্কের) ইস্তাম্বুল গিয়ে নিজ পরিবারের সাথে খাদ্য খেয়ে আবার আরাফাতে ফিরে এসেছেন?
আদেল: সাঈদ! আল্লাহ তোমার বিবেকে বরকত দিন! তুমি কি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ কথাই শিখেছ?
সাঈদ: মনে হয় আমরা হাঁসি-ঠাট্টা শুরু করেছি।
আদেল: আমি তোমার সাথে ঠাট্টা করছি না। কিন্তু সাধারণ মানুষের অবান্তর কথা আর তাদের কুসংস্কারের কোন প্রতিবাদ করা যাবে না, এমন তো নয়।
সাঈদ: কিন্তু এ সমস্ত কারামতের কথা শুধু সাধারণ মানুষের মুখেই শোনা যায় না; বড় বড় আলেম ওলামগাণও এ সমস্ত মাযার ও দরবারের অলৌকিক ঘটনাবলী বর্ণনা করে থাকেন। বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে এ সমস্ত বিষয়ে ব্যাপকহারে আলোচনা হয়।
আদেল: ঠিক আছে সাঈদ, তোমার কি মত আমি যদি বাস্তবে প্রমাণ করে দিতে পারি যে, এ সমস্ত মাযার ও দরবারের অধিকাংশই মিথ্যা ও কাল্পনিক? এ সব মাযারের অধিকাংশের হাক্বীকত নেই- কবর নেই, লাশ নেই, কোন ওলী নেই। কিছু মিথ্যাচার ও অপপ্রচারের কারণে মানুষের কাছে তা সত্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
এ কথা শুনে সাঈদ ক্রোধে ফুঁসে উঠল এবং বলতে লাগল, নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ! উভয়ে কিছুক্ষণ নীরব থাকল। বাস তাদেরকে নিয়ে গ্রামে প্রবেশের আগে চৌরাস্তার মোড়ে যখন পৌঁছল তখন আদেল সাঈদকে লক্ষ্য করে বলল, সাঈদ! রাস্তার এ মোড়ে কি কোন ওলীর কবর বা দরবার বা মাযার আছে?
সাঈদ: না, এটা বোন যুক্তিসংগত কথা হল না কি, একজন ওলীকে চৌরাস্তায় বা রাস্তার মোড়ে দাফন করা হবে?
আদেল: তাহলে তোমার কি মত, যদি আমরা গ্রামে প্রচার করে দেই যে, এই চৌরাস্তার জনৈক নেক ব্যক্তির পুরাতন কবর আছে, যার চিহ্ন আজ মিটে গেছে এবং নষ্ট হয়ে গেছে? এরপর আমরা তার কারামতির কিছু ঘটনা, তার কাছে দু'আ কবুল হওয়ার কিছু গল্প মানুষের সামনে পেশ করব। দেখি মানুষ বিশ্বাস করে কি না? আমি দৃঢ় বিশ্বাস রাখি মানুষ এ ব্যাপারটিকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করবে; বরং হতে পারে পরবর্তী বছর তার এখানে একটি বিরাট মাযার বা দরবার প্রতিষ্ঠা করে ফেলবে। এরপর শুরু হবে সেখানে শির্ক। অথচ এখানে শুধু মাটিই মাটি; যদি ওরা যমীনের পাতাল পর্যন্ত খনন করে তো কিছুই পাবে না।
সাঈদ: কি সব আজেবাজে কথা বলছ? তুমি কি মনে করছ মানুষ এতই বোকা ও নির্বোধ?
আদেল: ঠিক আছে, তুমি যদি আমাকে এ ব্যাপারে সহযোগিতা কর এবং মত দাও তাতে তো তোমার কোন ক্ষতি নেই? নাকি তুমি ফলাফলের ব্যাপারে আশংকা করছ?
সাঈদ: না, ভয় করি না। তবে বিষয়টিতে আমি তেমন সন্তুষ্ট নই।
আদেল: বুঝা গেল তোমার মত আছে। তুমি কি মনে কর যদি আমরা প্রস্তাবিত ওলীর নাম রাখি 'শায়খ বরকত'?
সাঈদ: ঠিক আছে, তুমি যা চাও।
এরপর দু'বন্ধু বিষয়টি খুব ধীরে প্রচার করার সিদ্ধান্ত নিল। এ ক্ষেত্রে তারা প্রথমে চায়ের স্টল সেলুন প্রভৃতি দোকান থেকে শুরু করবে। কেননা, এ সব স্থান থেকেই যেকোন সংবাদ দ্রুত প্রসার হয়। তারা গ্রামে পৌঁছে সলিমের সেলুনে গেল। তার সামনে ওলী-আউলিয়াদের কথা আলোচনা করার পর বলল, জনৈক নেক ওলী অনেক বছর থেকে সমাধিস্থ আছেন। অথচ আল্লাহর দরবারে তাঁর মর্যাদা অনেক বেশি; কিন্তু তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করার লোকের সংখ্যা খুব কম।
সেলুনের নাপিত জিজ্ঞেস করল, কোথায় সে কবরটি? তারা বলল, গ্রামে প্রবেশের আগে যে চৌরাস্তা রয়েছে তার মোড়ে!
নাপিত: আল্লহামদুলিল্লাহ। আল্লাহর সব তা'রীফ, তিনি আমাদের গ্রামে একজন ওলী দিয়ে আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন। আমি বহুকাল থেকে এ রকম একটা আশা করছিলাম। এটা কি কোন যুক্তিসংগত কথা হতে পারে যে, পার্শ্ববর্তী 'নতুন গ্রামে', 'নারায়নপুর' গ্রামে দশ জনের বেশি ওলী-আউলিয়া আছেন, আর আমাদের গ্রামে একজনও থাকবে না?
আদেল: সলিম ভাই! 'শায়খ বরকত' খুব বড় মাপের ওলী ছিলেন। আল্লাহর দরবারে তাঁর খুব মান-মর্যাদা ছিল।
নাপিত চিৎকার করে উঠে বলল, শায়খ বরকত (ক্বাদ্দাসাল্লাহু) সম্পর্কে আপনি এত কিছু জানেন, তারপরও চুপ রয়েছেন?
এরপর শায়খ বরকতের খবর শুষ্ক ঘাসে আগুন দেয়ার মত গ্রামের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ল। মানুষের মুখে মুখে সে কথা আলোচনা হতে লাগল। এমনকি মানুষ স্বপ্নেও তা দেখতে লাগল।
বিভিন্ন চায়ের দোকানে, মজলিসে, বাজারে, মসজিদে... 'শায়খ বরকতের' নানা বরকতের কথা, তার মাথার চুল কত দীর্ঘ ছিল, পাগড়ী কত লম্বা ছিল, অসংখ্য-অগণিত কারামতির কথা- আযানের সময় হওয়ার সাথে সাথে মিনার নীচে নেমে আসত... ইত্যাদি... ইত্যাদি।
স্কুলের শিক্ষকদের মাঝেও বিষয়টি বাদ-প্রতিবাদের সাথে আলোচিত হতে লাগল। যখন সীমা ছাড়িয়ে গেল, তখন শিক্ষক সাঈদ ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে চিৎকার করে বলে উঠল, 'ওহে বিবেকবানের দল! আপানারা ছাড়ুন এ সমস্ত কুসংস্কার ও অমূলক বিশ্বাসের কথা!' শিক্ষকগণ সমস্বরে বলে উঠল, 'কুসংস্কার... তুমি বলতে চাও এখানে শায়খ বরকত নেই?'
সাঈদ: অবশ্যই নেই। এ ধরনের কোন কবর এখানে নেই। এটি একটি অপপ্রচার। চৌরাস্তার মোড়ে শুধু মাটি আর মাটি। না কোন শায়খ বা ওলী বা দরবার ছিল বা না আদৌ আছে।
শিক্ষকগণ যেন কেঁপে উঠলেন। একযোগে বললেন, 'কি বল তুমি? 'শায়খ বরকত' সম্পর্কে এমন কথা বলার স্পর্ধা তোমার হল কিভাবে? 'শায়ক বরকতের' বরকতে গ্রামের পশ্চিমের নদীটি ভরাট হয়েছে। তিনি...।'
তাদের চেঁচামেচীতে সাঈদ পেরেশান হয়ে উঠল। তারপরও সে তাদেরকে লক্ষ্য করে বলল, আপনারা নিজের বিবেক বিক্রয় করে দিবেন না। আপনারা শিক্ষিত ও বিবেকবান মানুষ। কোন কবর বা মাযার সম্পর্কে একজন এসে কিছু বলল বা স্বপ্নে শয়তান কিছু দেখাল আর তাই বিশ্বাস করে দিবেন?
এতক্ষণ স্কুলের প্রধান শিক্ষক নীরব ছিলেন। তিনি আলোচনায় যোগ দিলেন। বললেন, 'শায়খ বরকতের গুণাগুণ আছে এবং তা নিশ্চিত। তুমি কি গতকালের পত্রিকা পড়নি?' সাঈদ আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'পত্রিকাতেও! কি লেখা হয়েছে তাতে?'
প্রধান শিক্ষক পত্রিকা বের করে সকলের সামনে পাঠ করেছেন। পত্রিকার সবচেয়ে বড় শিরনাম হচ্ছে, 'শায়খ বরকতের দরবার আবিস্কার'। লেখা হয়েছে: 'শায়খ বরকত (দামাত বারাকাতুহু) ১১০০ হি. সনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি খালেদ বিন ওয়ালীদের ৩৩তম অধঃস্তন সন্তান। অনেক উলামায়ে কেরামের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। যেমন উমুক... উমুক... উমুক...। তিনি তুর্কী সৈন্য বাহিনীর সাথে খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শরীক হয়েছেন। যুদ্ধ যখন ভীষণ আকার ধারণ করে, তিনি খৃষ্টান বাহিনী লক্ষ্য করে একটি ফুঁ মারেন। সাথে সাথে ঘূর্ণিঝড় খৃষ্টান বাহিনীর উপর প্রচণ্ড আঘাত হানে। ঝড় তাদেরকে উড়িয়ে নিয়ে একশ মিটার দূরে নিক্ষেপ করে। সবাই আর্তচিৎকার করতে করতে রক্তাক্ত অবস্থায় ধূলায় লুটিয়ে পড়ে...।'
সাঈদ: মাশাআল্লাহ! শায়খ বারকত সম্পর্কে সাংবাদিক সাহেব এত সূক্ষ্ম বিবরণ পেলেন কোথায়?
প্রধান শিক্ষক: এগুলো সত্য কথা। তুমি কি মনে কর এ সব কথা তার বাপের বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছে? এগুলো ইতিহাস...।
সাঈদ: কিন্তু এ সব দাবীর পক্ষে দলীল থাকা জরুরী। যেকোন দাবী এলেই তার বিশুদ্ধতা যাচাই করা আপনার উপর আবশ্যক। অন্যথা যে কেউ যা ইচ্ছা দাবী করতে পারে... কবর... ওলী-আউলিয়া, কারামাত...।
তারপর সাঈদ চিৎকার করে বলে উঠল, 'আপনারা আমার সুস্পষ্ট কথা শুনুন, শায়খ বরকত নামের এ দরবার বা মাযার একটি মিথ্যা ও অপপ্রচার মাত্র। আমি এবং স্যার আদেল মিলে এটি উদ্ভাবন করেছি। প্রকৃতপক্ষে এখানে কিছুই নেই। আমাদের উদ্দেশ্য হল, মানুষের মূর্খতা এবং ভ্রষ্টতা যাচাই করে দেখা। স্যার আদেল আপনাদের সামনে আছেন তাকে জিজ্ঞেস করে দেখুন!'
শিক্ষকগণ আদেলের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বললেন, এ লোকও তো তোমার মতো বিতর্ক পছন্দ করে। সব বিষয়ে দলীল চায়। সে তো ওলী-আউলিয়ার দুশমন। তুমি আর আদেল যা-ই বল না কেন, আমরা বিশ্বাস করি শায়খ বরকত (দামাত বারাকাতুহু) যুগ যুগ ধরে এখানে রয়েছেন। দুনিয়ার কোন স্থান ওলী-আউলিয়া, পীর-দরবেশ, গাউস-কুতুব থেকে খালি নয়। তোমার বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা থেকে আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় কামনা করি।
সাঈদ ও আদেল নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। ক্লাশের বেল বেজে উঠল। সবাই নিজ নিজ শ্রেণী কক্ষে চলে গেলেন।
শিক্ষক সাঈদ যা দেখছেন এবং শুনছেন তাতে অস্থির হয়ে উঠলেন। চিন্তা করছেন শায়খ বরকত... কারামতী... সম্ভব... অসম্ভব? এটা কি সম্ভব এত লোক সবাই ভুলের মধ্যে রয়েছে? পত্রিকার রিপোর্ট মিথ্যা?
আশ্চর্যের বিষয়, এলাকার বুযুর্গ, আলেম-ওলামাগণ তো কিছু দিন আগে চৌরাস্তার মোড়ে শায়খ বরকতের নামে উরস মোবারকও উদ্যাপন করলেন? কিন্তু শায়খ বরকত তো শিক্ষক আদেলের পক্ষ থেকে বানোয়াট একটি নাম... কিন্তু এটা কি করে সম্ভব যে, এত লোক সবাই প্রলাপ বকছে? অসম্ভব... আসম্ভব...।
ধীরে ধীরে সাঈদের মগজে নতুন চিন্তা প্রবেশ করতে লাগল। হয়তো শায়খ বরকত আছেনই। ওস্তাদ আদেল হয়তো আগে থেকেই ব্যাপারটা জানতেন। কিন্তু মানুষকে সন্দেহে ফেলার জন্য এখন হয়ত বলছেন, 'আমি নিজে 'শায়খ বরকত' নামে নতুন কিছু উদ্ভাবন করেছি।'
সাঈদ স্যার বিষয়টি নিয়ে খুব চিন্তা-গবেষণা করলেন। এ থেকে বের হওয়ার জন্য শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলেন। কিন্তু কোন কাজ হল না। তার মগজে বিষয়টি যেন ভালবাবেই স্থান পেয়েছে।
পরবর্তী দিন... পরের দিন... বিষয়টি নিয়ে স্কুলে আলোচনা-পর্যালোচনা হতে থাকল। তখন ছিল শিক্ষা বর্ষের শেষের দিক। বাৎসরিক ছুটি হল। শিক্ষকগণ নিজ নিজ এলাকায় ছুটি কাটাতে চলে গেলেন।
নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হল। শিক্ষকগণ দীর্ঘ ছুটি কাটিয়ে কর্মস্থলে ফিরে এসেছেন। আদেল ও সাঈদ আগের মত বাসে চড়ে গ্রামের স্কুলে যাচ্ছেন। আদেল স্যার 'শায়খ বরকতের' বিষয়টি বেমালুম ভুলেই গিয়েছেন। অথচ তিনিই এ ঘটনার জন্মদাতা।
কিন্তু বাস যখন গ্রামের প্রবেশ পথে সেই চৌরাস্তায় পৌঁছেছে, তখন আদেল লক্ষ্য করলেন, শিক্ষক সাঈদ যেন গুণগুণ করে কি কি দু'আ যিকির পাঠ করছেন।
ওদিকে স্যার আদেল বিস্ময়ে হা হয়ে গেলেন। তিনি একি দেখছেন? চৌরাস্তার মোড়ে কত সুন্দর মাযার বানানো হয়েছে। মাযারের উপর আকাশচুম্বী বিশাল গম্বুজ ঝলমল করছে। পাশে তুর্কী স্টাইলে বানানো সুবিশাল মসজিদ।
আদেল মুচকি হেঁসে মনে মনে বলল, মানুষ কত নির্বোধ! শয়তান তাদেরকে শিকে লিপ্ত করার ক্ষেত্রে কতই না কামিয়াব হয়েছে! তিনি স্যার সাঈদকে হাসিতে শরীক করার উদ্দেশ্যে তার দিকে নজর দিলেন, কিন্তু একি তিনি তো দু'আর জগতে ডুবে আছেন...। এক সময় তিনি চিৎকার করে বাস চালককে অনুরোধ করছেন, এখানে একটু থাম। তারপর তিনি দু'হাত উঠিয়ে শায়খ বরকতের রূহের উপর ফাতিহাখানি পাঠ করলেন...।

টিকাঃ
১. 'তীর্থযাত্রী', 'তীর্থযাত্রা' এ শব্দগুলো মুসলিমদের শব্দ নয়, মুসলিম সংস্কৃতির-কৃষ্টির কোন পরিভাষাও নয়। প্রকৃতপক্ষেই এ সংস্কৃত শব্দ 'তীর্থ' মুসলিম পরিভাষায় নেই। 'তীর্থ' যে ভাষার শব্দ সে ভাষার অভিধানে 'তীর্থ' শব্দের যে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে, তার বাংলা করলে দাঁড়ায়, 'তীর্থ' মানে পূণ্যস্থান (মিলন তীর্থ), হিন্দু দেবতা বা মহাপুরুষদের লীলা ক্ষেত্র বা অধিষ্ঠানভূমি বা বাস ভূমি, পাপ মোচনের স্থান (A place for Pilgrimage)। 'তীর্থ' অর্থ গুরু, পণ্ডিত ইত্যাদি। ব্যাকরণ তীর্থ ও কাব্য তীর্থ প্রভৃতি শব্দ গুরু বা পণ্ডিত অর্থযুক্ত। ড. অ্যান্নাডেল তাঁর Concise English Dictionary-তে তীর্থযাত্রীর সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, 'একজন ভ্রমণকারী, যে তার দেশ থেকে দূরে অবস্থিত কোন মন্দির, গীর্জা বা পবিত্র স্থান পরিদর্শন করতে আসে অথবা কবরস্থ কোন বিশেষ ব্যক্তিত্বের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা জানাতে আসে, এ সংজ্ঞাগুলোর কোন একটিও মুসলিমদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এদিকে বাংলা একাডেমী 'তীর্থ'-এর অর্থ লিখতে গিয়ে তীর্থ শব্দকে খতনা করে মুসলিম করেছেন, কিন্তু কালিমা পড়াননি। বাংলা একাডেমী 'তীর্থ' শব্দের অর্থ লিখেছে 'পাপ মোচন' আর ব্রাকেটে লিখেছেন (মক্কা তীর্থ)। নকল করতেও দক্ষতা লাগে, সে দক্ষতাও বাংলা একাডেমী দেখাতে পারেনি। মক্কায় মুসলিমরা তীর্থ করতে যান না, যান হজ্জ বা ওমরা করতে। মুসলিমদের অভিধানে তীর্থ শব্দই নেই, কোন মুসলিম যদি মক্কা তীর্থ, মদীনা তীর্থ বা হৃদয় তীর্থ লেখেন, তাতে কোন সন্দেহ নেই। মক্কা, মদীনা ও হৃদয়কে তীর্থ অভিধায় অভিহিত করে অজ্ঞাতে একটা গুনাহের কাজ করা হয়। আবার, 'তীর্থের কাক'ও পরিত্যাজ্য। তীর্থকেই যখন স্বীকার করি না, তখন তীর্থের কাক আর চিলকে তো গ্রহণ করতে পারি না। যাহোক, 'তীর্থ' যাদের সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাদের জন্য যথার্থ শব্দই 'তীর্থ', আমাদের জন্য নয়।
২. হিন্দু বর্ণাশ্রম প্রথা অনুযায়ী চতুর্বর্ণের দ্বিতীয় বর্ণ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00