📄 মানুষের নখদর্পণ, মিশেই হয় চোর কর্ডন
খোয়া যাওয়া কোন জিনিসের সন্ধান করতে বিশেষভাবে কার্যকর একটি পদ্ধতির প্রচলন রয়েছে। গ্রামে-গঞ্জে, এমনকি অনেক শহরে প্রচলিত এ পদ্ধতির নাম নখদর্পণ। দুটি শব্দের মিলিত এ শব্দখানি। নখ এবং দর্পণ। নখ হল হাতের আঙুলের অগ্রভাগে মসৃণ শক্ত অংশ। আর দর্পণ অর্থ হল আয়না। নখে তেল লাগিয়ে চকচকে করে চোখের সামনে মেলে ধরা হয়। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলে নখে ছবি বা চলচ্চিত্রের মতো চোর বা চুরিকৃত জিনিসের ছবি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এ পদ্ধতির হোতা যারা তারা এমনই বলেন। অর্থাৎ কিনা, নখের আয়নায় চোর ধরা।
আমাদের সমাজের গরীব, নিরক্ষর, সরল মানুষের মধ্যে পুরনো ভাঁওতাপূর্ণ অনেক ভ্রান্ত পদ্ধতি চালু রয়েছে। প্রকৃত শিক্ষা ও জ্ঞানের অভাবে এগুলো মানুষের বিশ্বাসের মধ্যে বসবাস করছে। বর্তমানে শিক্ষাদীক্ষা ও সচেতনতা কিছুটা বাড়তে থাকার ফলে এগুলোর প্রতি জনসাধারণের আস্থা কমে এসেছে সত্যি। কিন্তু একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়নি। অসহায় দরিদ্র মানুষেরা আর কোন পথ না পেয়ে আশ্রয় নেন এ সকল উদ্ভট অযৌক্তিক পদ্ধতির। নখদর্পণের মতো আরও যে পদ্ধতিগুলো সচল রয়েছে, সেগুলো হচ্ছে- হাত চালান, বাটি চালান, কুলো চালান, নল চালান, চাল পড়া, আয়না পড়া ইত্যাদি বহু রকমের তুকতাক।
নখদর্পণের কলাকৌশলটা কেমন তা একটু দেখা যাক। কোন বাড়িতে হয়ত দরকারী জিনিস চুরি হয়ে গেল। গৃহকর্তা অনেক খোঁজাখুঁজি করে চুরি যাওয়া জিনিসটি উদ্ধার করতে পারলেন না। শেষে আর কোন উপায়ান্তর না দেখে তিনি ডেকে আনলেন ঝাড়ফুঁক (!) করা ওঝা/কবিরাজ/গণককে। ঘটনা শুনে গণক নখদর্পণ করার আয়োজন করলেন। বেছে নিলেন তিনি বাড়ির প্রায়-অবুঝ সাত/আট বছরের একটি বালককে। বালকের ডান হাতের বুড়ো আঙুলের নখে লাগিয়ে দিলেন সর্ষের তেল। তারপর একটানা কয়েক মিনিট বিড়বিড় করে তন্ত্রমন্ত্র উচ্চারণ করলেন। বালকটিকে তিনি একজনের নখের দিকে তাকিয়ে থাকতে বললেন। বালকটি তাকিয়ে আছে তো আছেই। চারিদিকে চুপচাপ। হয়ত মাঝেমাঝে ফিসফাস আওয়াজ। কৌতূহলী লোকের ভীড়। সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। এই তো এলো, এই যে এসেই গেল। কী এলো! না, ছবি এলো! ছবি এলো। নখে চোরের ছবি ফুটে উঠল। গণক কিন্তু ওদিকে বালকটিকে কী যেন জিজ্ঞাসা করেই চলেছে। বালকটি অস্ফুটে হ্যাঁ-না উত্তর দিচ্ছে। বালকটির ঠিক পেছনে হাঁটু গেড়ে বসে গণক মন্ত্র আওড়াচ্ছেন। কখনো থেমে প্রশ্ন করছেন বালককে। একসময় হয়ত বালকটি সায় দিয়ে জানাল যে, সে নখে ছবি দেখতে পাচ্ছে। হ্যাঁ, খুব স্পষ্ট না হলেও অস্পষ্ট ছবি বা মানুষ নড়াচড়া করতে দেখতে পাচ্ছে।
বালকটি নখে দেখতে পাচ্ছে গৃহকর্তার অগোচরে চোর ব্যাটা ঘরে ঢুকে তাকের ওপর থেকে টাকা-পয়সা ও গয়নাগাটি যা ছিল সব নিয়ে কোঁচড়ে পুরে সটকে পড়ল। সে আরও জানাল যে, চোর হিসেবে যাকে সন্দেহ করা হয়েছিল, সে লোকটিকেই সে জিনিসপত্র চুরি করতে দেখল। লোকটি চুরির সময় যেভাবে, যে ভঙ্গিতে চুরি হয়েছিল, ঠিক ঠিক সে অবস্থায়ই তাকে নখে চলমান দেখতে পেয়েছে। চোরের চেহারা, গায়ের রং, পরনের কাপড়, লুকিয়ে ঘরে ঢোকা, জিনিস নিয়ে কোঁচরবন্দি করা এবং সকলের অজান্তে কেটে পড়া। এত সবকিছু বালকটি তেল চকচকে নখের পর্দায় সিনেমার মতো কয়েক মুহূর্তের মধ্যে দেখে নিয়েছে।
আসলে ব্যাপারটি কী? পুরো ঘটনাটাই আসলে ধাপ্পা। কী রকম ধাপ্পা বলি তাহলে।
ওঝা/কবিরাজ/গণক ব্যাটা নখদর্পণ করতে এসে চুরির বিষয়টি শুনে জিজ্ঞেস করে, গৃহকর্তা কাউকে চোর হিসেবে সন্দেহ করেন কিনা! কর্তা হ্যা-সূচক উত্তর দিয়ে তার সন্দেহভাজন লোকের কথা বলেন। এর কথা বালকটিও শুনে ফেলে। নখদর্পণ প্রক্রিয়া শুরুর আগে বালককে আবারো তার কথা মনে করিয়ে দেয়া হয় কানের কাছে মুখ নিয়ে, ফিসফিস করে। তারপর বারবার সেই লোকের কথাই জিজ্ঞাসা করতে থাকে। এতে বালকটির মনে নখদর্পণের অন্ধবিশ্বাসের ভিত তৈরি হয়ে যায়। যেহেতু সে এ সম্পর্কে ইতো পূর্বেই শুনে এসেছে এবং শুনছে বারবার। এর সাথে যোগ হয়েছে ওঝা/কবিরাজ/গণকের সম্মোহনী শক্তি। দুই-এ মিলেই বালকটির মনে মতিভ্রমের সৃষ্টি হয়। বাস্তব জ্ঞান ও সত্যাসত্য নির্ণয়ের ক্ষমতা রহিত হয়ে যায় তার। অবস্থাটি তার হয় আত্মসম্মোহিত। একমনে একদৃষ্টিতে থাকলে এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক। অপ্রাপ্তবয়স্ক বালকের কচিমন খুব তাড়াতাড়ি আত্মসম্মোহিত হয়। দিব্যজ্ঞান রহিত- এ অবস্থায় ওঝা/কবিরাজ/গণক পুরুষটি বালককে প্রভাবিত ক'রে যা চাইবে, যা দেখাবে বা যা বলাবে নির্বোধ বালকটি তাই দেখবে এবং গড়গড় করে বলবে। এ কারণে সে সন্দেহের লোককে চুরি করতে ও নিরাপদে পালাতে দেখে।
অনেক সময়ই এমন হয় যে, সন্দেহভাজন লোকটিই আসলে চোর। বালকের মুখে তার নাম উচ্চারিত হলে আসন্ন শাস্তির ভয়ে লোকটি জড়োসড়ো হয়ে যায়। তারপর সকলে তাকে ঘিরে ধরলে বা দু'চার ঘা মারধোরে সে সব কথা স্বীকার করে। অতি শীঘ্রই সে বের করে দেয় চোরাই মালামাল। এরপর নখদর্পণ ও ওঝা/কবিরাজ/পীর/গণকের কেরামতি বেড়ে যায় কয়েকগুণ। কিছুমাত্রও যাদের এ পদ্ধতিতে সংশয় থাকে তাদের আস্থা দৃঢ় হয়। নখদর্পণের জন্য কিন্তু যে কাউকে নির্বাচন করা হয় না। বাড়ির বাচ্চা ছেলেমেয়ে অথবা মহিলাদের বেছে নেয়া হয় এ জন্য। এর কারণ হল, বাচ্চা ও মহিলারা মানসিকভাবে দুর্বল, অনেকটা অপরিণত এবং বেশ কল্পনাপ্রবণ। এদের মনের ওপর প্রভাব বিস্তার করা সহজতর। বাচ্চাদের তো সমাধান বের করে সবাইকে তাক লাগিয়ে হিরো হবার বাসনা সুপ্তভাবে থাকেই। এ ব্যাপারগুলোকে কাজে লাগিয়ে নখের আয়নায় চোর ধরার প্রক্রিয়া চলে। তা ছাড়া, তেল চর্চিত নখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলে নিজের, গণকের এবং আশেপাশের কৌতূহলী মানুষের মুখ দেখা যাবে। কাছেপিঠের জিনিসপত্র, বাড়িঘর এবং গাছপালার ছবিও ফুটে ওঠে। অনেক সময় সামনে ধরে নখের দিকে তাকিয়ে থাকলে স্বাভাবিকভাবে দৃষ্টিবিভ্রম শুরু হয়। ফলে, এ মুখগুলোকেই চোর বা দৃশ্যগুলোকে চুরি যাওয়া বাড়ির পরিবেশ বলে সে মনে করতে থাকে।
এ ব্যাপারগুলোকেই কাজে লাগিয়ে নখদর্পণের স্রেফ ভাঁওতাপূর্ণ প্রক্রিয়াটি চালু রয়েছে আমাদের সমাজ জীবনে। অন্য অনেক কুসংস্কার বা অন্ধবিশ্বাসের মতো শিক্বী যাদুমন্ত্র কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষের মাঝে সচল রয়েছে। দু'-একটি ক্ষেত্রে আকস্মিক সাফল্যের সুবাদে এর হোতারা মানুষকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে। নির্দোষ লোককে দোষী প্রতিপন্ন করার ফলে অনেক সময় সামাজিক সম্পর্কে ফাটল ধরে, বিবাদ-বিসম্বাত সৃষ্টি করে। শিরক-কুফরযুক্ত এবং বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ও যুক্তিহীন নখদর্পণ প্রক্রিয়াটি নিতান্তই একটা কুসংস্কার বৈ কিছু নয়।
📄 ঝাড়ু-টোনায় বাস, কেড়ে নেয় প্রাণ
বাণ মারা কথাটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত। আমাদের গ্রামীণ ও শহুরে জীবনে এ নিয়ে অনেক কথা-কাহিনী চলে আসছে। এগুলো সবই ভীতি ও রীতিমত রোমাঞ্চকর। কারণ, এ পদ্ধতিটি কেবল মানুষের ক্ষতি ও ক্ষয় করার উদ্দেশ্যেই প্রয়োগ করা হয়। মানুষকে বেকায়দায় ফেলার জন্য, অসুবিধা সৃষ্টির জন্য, ক্ষতি সাধনের জন্য বাণ মারার কৌশল ব্যবহার হয়ে আসছে দীর্ঘকাল ধরে।
'বাণ' শব্দটি বাংলাদেশে খুব পরিচিত হলেও শব্দটি কিন্তু বাংলা নয়। এটা সংস্কৃত শব্দ। এর অর্থ হল যাদু বা তন্ত্র-মন্ত্রের মাধ্যমে গড়া শর বা তীর। অর্থাৎ যাদুমন্ত্র পড়ে ক্ষতিকারক হিসেবে বানানো হয়েছে এমন তীর। মানুষকে বিদ্ধ করে ঘায়েল করার জন্যই সাধারণত তীর ব্যবহার করা হয়। বাণ মারা এখানে প্রতীকি অর্থে এসেছে। যেহেতু মানুষকে বিপন্ন বা বিপদগ্রস্ত করার জন্য কৌশলটির ব্যবহার তাই 'বাণ মারা'।
'বাণ মারার ব্যবহারের অন্ত নেই। কত ব্যাপারে যে 'বাণ মারা' প্রক্রিয়া চলে, গ্রামে বাস করেন যারা তারা প্রায় সকলেই তা জানেন। অসুখ ভাল না হতে দেয়া, রোগ জটিল করা, অসুখ সৃষ্টি করা, নারীকে গর্ভধারণ করতে বা সন্তান প্রসব করতে না দেয়া, কারো বিয়ে হতে না দেয়া ইত্যাদি উদ্দেশ্যে মানুষ বা বাড়িঘরের ওপর 'বাণ মারা' হয়। 'বাণ মারা' হয় ফসলে। ফসল নষ্ট করে দেয়া বা ফসল কম হবার জন্য জমিকে বাণবিদ্ধ করা হয়। ফল গাছে বাণ মেরে ফল নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়। পিঠা বানানোর সময় বাণ মেরে পিঠা সিদ্ধ হতে বা সুস্বাদু হতে না দেয়ার প্রচেষ্টা চালানো হয়। কোন সময় কোথাও যাত্রাকালেও বাণ মেরে যাত্রা-নাস্তি করার চেষ্টা করা হয়। অথবা যাত্রার উদ্দেশ্য যাতে সফল না হয় সেজন্য 'বাণ মারা' হয়। এভাবে কত শত যে বাণ মারার পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।
এবার আমরা বাণ মারার কিছু পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হতে পারি। শারীরিকভাবে ক্ষতির জন্য বাণের পদ্ধতি হল এ রকম- ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত (কৃষ্ণপক্ষের রাত) ১২টায় শ্মশান বা কবরস্থানে 'বাণ মারা'র ওস্তাদ বা গুরু যাবেন। সঙ্গে একদল শিষ্য। সকলেই উলঙ্গ। গুরু মাঝখানে বসলে শিষ্যরা তাকে ঘিরে গোল হয়ে বসবে। গুরুর সামনে একটি মাটির পাত্র রাখা হয়। কাঁচা হলুদ বা গুঁড়া হলুদ পানিতে গুলে তা দিয়ে পাত্রটির ওপরে একটি চারকোণী ঘর আঁকা হয়। এর চার কোণায় আঁকা হয় চারটি বৃত্ত। এখন ঘরের কেন্দ্রস্থলে রাখা হয় একটি পুতুল (মাটির বা প্লাস্তিকের যা-ই হোক)। পুতুলের পা উঁচিয়ে গুরুর দিকে ধরে তার ওপর ছিটানো হয় হলুদের গুঁড়ো। শরীরের সব জায়গায় গুঁড়ো ছিটানো হলে একটা সুঁচ দিয়ে ফল বা শস্যের বীজ গেঁথে নিয়ে পুতুলের গায়ে ঠেসে ধরা হয়। নির্দিষ্ট লোকটির শরীরের যে অংশে ক্ষতি করার কথা মনে করা হচ্ছে, পুতুলেরও ঠিক সেই জায়গাটায় বীজবিদ্ধ সুঁচ ঠেসে ধরা হয়। এরপর গুরু ও শিষ্যদের একটানা মন্ত্রপাঠ চলতে থাকে।
পুতুল ছাড়া আরো কিছু পদ্ধতি আছে, যেমন- যে ব্যক্তির ক্ষতি করার চেষ্টা করা হবে, গোপনে তার চুল, আঙুলের নখ, রক্ত বা থুথু যোগাড় করে তার ওপর যাদুমন্ত্র পড়া হয়। মানুষের পেছন পেছন হেঁটে তার ছায়ার ওপর যাদুমন্ত্র পড়ে বাণ মারা হয়। ব্যবহারের কাপড়-চোপড় বা অন্যান্য সামগ্রীর ওপরও যাদুমন্ত্র পড়ে বাণ মারা হয়। নারীকে গর্ভধারণ করতে, প্রসব করতে না দেয়া এবং প্রসবে জ্বালা-যন্ত্রণা সৃষ্টির জন্য গোপনে সেই নারীর কাপড় সংগ্রহ করে যাদুমন্ত্র পড়া হয়। কিংবা তার খাদ্যে মন্ত্রপড়া পানি মিশিয়ে দেয়া হয়। সামান্য একটুখানি গরুর দুধ যোগাড় করে তাতে মন্ত্র পড়ে নাকি দুধ শুকিয়ে দেয়া হয় গাভির স্তন থেকে। পিঠা রান্নার চুলায়, গাছের ফল পেড়ে বা জমির ফসল সংগ্রহ করে তাতে 'বাণ মারার মন্ত্র পড়া হয়। যাত্রার রাস্তায় কাঠি পুঁতে তাতে বাণ মেরে নাকি যাত্রানাস্তি বা যাত্রার উদ্দেশ্য ব্যর্থ করে দেয়া হয়।
এভাবেই গ্রাম-গঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন পদ্ধতিতে 'বাণ মারা' হয়। খোঁজ করে জানা গেছে, ৬৪ ধরনের 'বাণ মারার জন্য ৬৪ রকমের বিশেষ পদ্ধতি প্রচলিত আছে। এ জন্য রয়েছে বহু ধরনের যাদুমন্ত্রও। এ যাদুমন্ত্রগুলো যেমন বিচিত্র তেমনি হাসি উদ্রেককারী ও শিক্ক-কুফর যুক্ত। একটি মন্ত্রের কথা এখানে উল্লেখ করি। পিঠা নষ্ট করার জন্য এ মন্ত্রটি নাকি পাঠ করা হয়।
আলো ধানের কালো পিঠা, তিন গাইনে বাণে আঁটা। একটা ধানে দুইটা তুষ, পিঠা তলায় ভূষাভুষ।
রান্নার পিঠা সত্যি সত্যি ভাল না হলে তখন 'বাণ মারার কথা মনে করা হয়। বাণে বিশ্বাস ক'রে তখন গৃহকর্ত্রী পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। চুলার পোড়া মাটি পিঠা বানানোর হাঁড়ির শরীরে লেপে দিয়ে সে সাথে আরও দু'একটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিলে দেখা যায় পিঠা ঠিকঠাক মতো হতে শুরু করেছে। এটা আসলে 'বাণ মারা' কিছু নয়। হাঁড়ির কোন জায়গায় ছিদ্র থাকাতে সেদিক দিয়ে তাপ বেরিয়ে যাচ্ছিল। তাই লেপে দেয়ার পর তাপ বেরোতে না পেরে সুস্বাদু পিঠা রান্না করা যায়। ফল গাছের গোড়ায় বা ফসলের ক্ষেতে ক্ষার বা চুন জাতীয় রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে দিলে গাছ মরে যায় বা ফল নষ্ট হয়ে যায়। গ্রামের গরীব সন্তানবতী মহিলারা বেশিরভাগই অপুষ্টিতে ভোগেন। এতে রিকেট নামে এক প্রকার রোগ হয়। ফলে কোমরের হাড়ের গঠন ঠিকমতো না হলে সন্তান প্রসবে কষ্ট হয়। আর তখন বাণ মারার কথা ভাবা হয়।
টিকাঃ
১. এক প্রকার তান্ত্রিক মন্ত্রযুক্ত মারণাস্ত্র।
২. শুধু বাংলাদেশে নয় বরং 'বাণ মারা'র এ বিষয়টি সারা বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে নানা নামে প্রচলিত রয়েছে। 'বাণ মারা' শব্দটি বাংলাদেশ ও ভারতে ব্যাপকভাবে প্রচলিত।
৩. বশীকরণের মন্ত্র, তন্ত্রমন্ত্র, বশীকরণের প্রকরণ, কুনজর বা কুদৃষ্টি।
📄 পীরের দুয়ারে কঁদে রোজআজ এমন জন, পীরের কথা মেনে নিতে ছিল বিষাদত্ব
এ কাহিনীটি কল্পনার আশ্রয়ে বানানো কোন গল্প নয়, অসত্যও নয়। জলজ্যান্ত বাস্তব ঘটনা। প্রাত্যহিক জীবন থেকে তুলে নেয়া একটা আটপৌরে অথচ নিদারুণ মর্মস্পর্শী একটি ঘটনা। কাহিনী বিবৃত করেছেন যিনি তিনি পেশায় একজন চক্ষু চিকিৎসক।
রেফাজুদ্দীন নামের সবে কৈশোর পেরোনো চওড়াঙ্গী এক তরুণ একদা এসেছিল তাঁর নিকটে। তার এক ভাই ছিল সঙ্গে। যন্ত্রণা-কাতর মুখ। চোখের কোণে কালি। চোখ দুটো প্রায়-নির্মিলিত। মুখের ভাষায় উচ্চারিত কেবল হতাশা। চিকিৎসক পরীক্ষা করে জানালেন, 'না, সব শেষ। পৃথিবীর রঙ-রূপ ধরা দেবে না তার কোনদিনও এ দৃষ্টিতে।' আমৃত্যু অন্ধ হয়ে বেঁচে থাকতে হবে রেফাজুদ্দীনকে। এক রাত্রিতে শুঞ্জলিত হয়ে, কুসংস্কার কবলিত হয়ে চিরতরে চোখ হারিয়ে জীবনের সব আশা ও স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়েছে তার। অন্যের প্রশ্রয়ে নয়, অন্যের ঔদাসীন্যে বিপন্ন জীবনযাপন করে বেঁচে থাকতে হবে রেফাজুদ্দীনকে।
কী হয়েছিল রেফাজুদ্দীনের? যৌবন বহ্ণিময় তরুণ রেফাজুদ্দীন বরাবর মেধাবী ছাত্র। প্রতি ক্লাসে প্রথম হয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। তার এবং স্কুলের শিক্ষকদের ধারণা এস.এস.সি.-তে প্রথম বিভাগে ভাল ফলাফল লাভ করবে। একদিন ক্লাসে এক শিক্ষককে সে জিজ্ঞেস করে : 'স্যার আপনি তো এস.এস.সি.-তে অনেক ভাল ফলাফল করেছিলেন। আপনি কিভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন স্যার?'
'দশ থেকে বার ঘণ্টা পড়াশোনা নিয়ে থেকেছি। এ সময়টায় বই ছাড়া অন্য কোনদিকে মনোযোগ দিই নি। চেষ্টাটাই আসল। চেষ্টা ও সাধনা করার ফল আমি পেয়েছি। পড়াশোনার সঙ্গে আরেকটি কাজও আমি করেছিলাম।' -এটুকু বলে থেমে যান শিক্ষক।
'সেটা কী স্যার?' উৎসুক হয়ে জানতে চায় রেফাজ। 'এক পীর সাহেবের দোয়া নিয়েছিলাম। আমাদের গ্রামের পাশের গ্রামে এক পীর আছেন। সবাই তাকে বলে কড়াপীর। পরীক্ষার আগে আমি সেই কড়াপীরের দোয়া এনেছিলাম কয়েকবার। ইচ্ছে করলে তোমার আব্বাকে নিয়ে একবার কড়াপীরের কাছে যেতে পার।'
কড়াপীরের ঠিকানা বলে দেন স্যার। কোনদিন কিভাবে যেতে হবে বলে দেন তাও।
সরলমতি রেফাজুদ্দীন বিষয়টা গিয়ে বলে তার আব্বাকে। সামান্য শিক্ষিত রেফাজের বাবা তৎক্ষণাৎ সায় দেন এবং পীর সাহেবের কাছে যাবার দিনক্ষণ ঠিক করে। করে ফেলেন। নির্ধারিত দিনে কয়েক কিলোমিটার পথ হেঁটে পিতা-পুত্র হাজির হয় কড়াপীরের আস্তানায়। বারান্দায় বসা মাঝবয়সী, দীর্ঘকায় সুপুরুষ পীর চোখ বুজে আধশোয়া হয়ে আছে মাটিতে। পাশে গামছা, লুঙ্গি, বদনা, মেছওয়াক, পানপাত্র ও পিকদান রাখা। কয়েকজন লোকও ঘিরে বসে আছে তাকে। লোকগুলো সবাই আনত ভঙ্গিতে বসা। তাদেরও চোখ বোঁজা। দু'জন যুবকের একজন পায়ের নিকট ও অন্যজন মাথার কাছে বসে আছে। একজন পীরের পা দুটো টিপে চলেছে একাধারে। আরেকজন মাথার পাকা চুল তুলে দিচ্ছে। সমগ্র পরিবেশের মধ্যে আলুথালু ও অরুচিকর অবস্থা বিরাজ করছে। এ অবস্থায় রেফাজ দারুণ অস্বস্তি অনুভব করে। বিরক্ত ধরে যায় তার। সে শ্রদ্ধাপুত মন নিয়ে পীর বাড়িতে গিয়েছিল। কিন্তু চারদিকে নোংরা, অস্বাস্থ্যকর ও রুচিহীন অবস্থা থেকে তার ভক্তি-শ্রদ্ধা তো টুটে যায়ই, উপরন্ত বিরক্তিতে ছেয়ে যার তার মন।
রেফাজ ও তার বাবা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। একসময় যুবকদ্বয়ের একজন আঙুল ও চোখের ভাষায় কথা বলতে ও শব্দ করতে বারণ করে। একজন উঠে এসে রেফাজের বাবাকে খানিক দূরে নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে জানতে চায় কেন এসেছে তারা। এরপর সে চোখের ইশারায় ডেকে রেফাজকে পীর সাহেবের মাথার কাছে বসায়। পায়ের শব্দে পীর সাহেব একবারের জন্য চোখ দুটো একটু খুলেই আবার বন্ধ করে। যুবকের নির্দেশে রেফাজ পীরের পাকা চুল তুলতে থাকে। কয়েক মিনিট নিঃশব্দ এভাবে চলতে থাকে। এক সময় আকস্মিকভাবেই দ্রুতলয়ে পীর সাহেব উঠে বসে। কাউকে কোনরকম বোঝার সুযোগ না দিয়ে রেফাজের গালে সজোরে এক বেমক্কা চড় হাঁকিয়ে দিল। রেফাজ তো হতবাক! কি অপরাধে তাকে চড় খেতে হল কিছু বুঝে উঠতে পারে না। ফ্যাল ফ্যাল করে কেবল পীরের দিকে তাকিয়ে থাকে। এত লোকজনের মধ্যে অকারণে চড় খেয়ে অপমানিত বোধ করে। একজন যুবক বারান্দার এক কোণে ডেকে নিয়ে রেফাজকে বলে, 'হুজুরের গোস্বা অইছে। ক্যান অইছে কইবার পারমু না। তয় মনে অয়, তুমি খালি আতে আইছো, এইডা বোঝবার পাইরা ক্ষেইপ্যা গেছে। হুজুরের লগে দেখা করতে অইলে ছদগা নিয়া আইতে হয়।'
রেফাজ ভয়ে নিজের মধ্যে সিঁটিয়ে গেছে। হুজুর যদি রেগে গিয়ে তাকে বদ্দোয়া দেয় তাহলে যেসব যাবে। সে তার বাবাকে নিয়ে সবার সঙ্গে পরামর্শ ক'রে ঠিক করে, দু'দিন পর ছদকা নিয়ে আবার আসবে। আবার যায় তারা কথানুযায়ী। এবার সঙ্গে নেয়া ছদকা হুজুরের পায়ের নিকট সবিনয়ে জোড়হাতে রেখে দেয়। এবার হুজুর সস্নেহে রেফাজের মাথায় হাত বুলিয়ে ওদেরকে শরবত পান করায়। তারপর ওর বাবাকে কাছে ডেকে বলে, 'পোলার ওপর জ্বিন আছর করছে। দু'জ্বীনে ওর চোখ দু'ডায় বাসা বানছে। এগুলারে তাড়াইতে না পারলে পোলা পরীক্ষায় সফলকাম অইতে পারবো না। দাঁড়াও জ্বিন খেদাইন্যা অষুদ দিয়া দিতেছি।' একজনকে ইশারা করতেই ঔষুধের উপকরণগুলো এসে গেল। রেফাজ বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখল উপকরণের মধ্যে রয়েছে গরুর শুকনো গোবর, উঠোনের ভেজা মাটি, শুকনো মরিচের গুঁড়ো, সরিষার তেল ইত্যাদি। এগুলো সে একটা মাটির বাটিতে একত্র করে একটা পেস্ট তৈরি করল। তারপর কয়েকজনকে নির্দেশ দিল রেফাজকে হাত-পা দড়ি দিয়ে বেঁধে শুইয়ে দিতে। রেফাজের ওপর হামলে পড়ে দু'আঙুলে বানানো পেস্ট নিয়ে দু'চোখে সজোরে ডলে দিল। রেফাজ অসহ্য যন্ত্রণায় কাটা গরুর মতো অসহায়ভাবে ছটফট করতে লাগল। বিকট চিৎকারে কাঁপিয়ে তুলল চারদিক। কিন্তু কেউ কাছে যেতে সাহস পেল না। হুজুর দু'চোখ চেপে ধরে রাখে আট-দশ মিনিট। তারপর হাহ্ হাহ্ হাহ্ করে হাসতে হাসতে বলে, 'হ এবার সরছে। সইরা পড়ছে জ্বিনগুলো, না পলাইয়া যাইবো কই! যা পরীক্ষায় তুই কামিয়াব হবি।'
রেফাজকে তারপর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হল। চোখের যন্ত্রণায় কাতর হয়ে সে ক্রমে নিঃসাড় হয়ে পড়ছে। পরদিন দেখা গেল তার চোখের অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গীন। চোখ মেলতেও পারছে না, কিছু দেখতেও পারছে না। দৃষ্টি হারানোর উৎকণ্ঠায় সে মিইয়ে গেছে। তাওহীদপন্থী পাড়া-প্রতিবেশী ওর বাবাকে পরামর্শ দেয় শহরে নিয়ে গিয়ে ডাক্তার দেখাতে এবং প্রয়োজনে এ বিষয়ে থানায় অবগত করতে। কিন্তু ওর বাবার ভয় তাতে যদি ক্ষতি হয়! হুজুর যদি জানতে পেরে অভিশাপ দেয়। এভাবে দু'দিন যাবার পর অবস্থা আরও শোচনীয় হলে কলেজ পড়ুয়া গ্রামের দু'তরুণ জোর করে রেফাজকে শহরে নিয়ে যায়। পরিচিত একজনের সহায়তায় তারা বিশিষ্ট চক্ষু ডাক্তারের নিকট হাজির করে। এ বিষয়ে আগেই বলা হয়েছে, ডাক্তার সাহেব পরীক্ষা করে চোখ নিরাময়ের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন।
আমাদের গ্রামীণ সমাজে শুধু নয়, শহরেও তথাকথিত পীর সাহেবদের জোরালো দাপট লক্ষ্য করা যায়। তাওহীদ (আল্লাহ্র একত্ব) সম্পর্কে অসচেতন, ঈমান দুর্বল ও ভীরু লোকদের ওপর কলাকৌশলে প্রভাব বিস্তার করে এমন অনেক কড়াপীর বহাল তবিয়তে আয়েশী জীবনযাপনের বন্দোবস্ত করে রেখেছে। নানারকম ফাঁদ পেতে, ধর্মের দোহাই পেড়ে, ক্ষয়ক্ষতির ভয় দেখিয়ে, বিষয়-সম্পত্তির লোভ দেখিয়ে আকৃষ্ট করে নিজেদের দিকে। এক ধরনের কৃত্রিম ঐন্দ্রজালিক বা কুহকময় পরিবেশ বানিয়ে সম্মোহন সৃষ্টি করে নানাভাবে প্রতারণা করে মানুষকে। পীরালী-প্রতারণার নজির বাংলাদেশসহ এ উপমহাদেশের দু-একটি দেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও কিন্তু নেই। এদের বর্জন না করলে, উচ্ছেদ না করলে রেফাজুদ্দীনের মতো অনেক মেধাবী সম্ভাবনাময় তরুণের স্বপ্ন টুটে যায়। জীবন সংকটাপন্ন হয়। প্রতারণার চাতুর্যে অর্থবিত্ত খুইয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যায়।
📄 যুক্তিবাদের ঘূর্ণিপাক, শুভ পীর নিপাত যাক
এই তো সেদিনের ঘটনা। সত্তর-ঊর্ধ্ব এক মাকে ঘিরে এ কাহিনী। এমনিতে মা। এমন বার্ধক্য বেলাও চোখে-মুখে প্রবল ব্যক্তিত্বের ছাপ, আভিজাত্যেরও হয়ত। সংস্পর্শে গেলে, দেখে, কথা বলে শ্রদ্ধায় বুক ভরে যায়। রুচি, চলা, বসা সব কিছুতেই একটা পরিচ্ছন্নতা লক্ষ্য করার মতো। বয়সের ভারে ন্যুজ হলেও ক্লান্তি তাকে আচ্ছন্ন করেনি কখনো। অপার মাতৃস্নেহের ছায়ায় উদার ঠাঁই দিতে সদাসর্বদাই আগ বাড়িয়ে থাকতেন। এমন প্রবীণা ক্লান্তিহীন মা-টি শেষ জীবনে আক্রান্ত হলেন মরণব্যাধি ক্যন্সারে। বলা হয়, ক্যান্সার রোগে ভুগে ভুগে, ক্ষয় হতে হতে এক সময় প্রায় নির্বাপিত হয়ে যায় প্রাণবায়ু। তবু চেষ্টা চলে ফেরানোর সাধ্যমতো। যতো প্রকার প্রতিকার আছে, সব এক এক করে পরখ করে দেখা। এ ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম হয়নি। এক সন্তান তার বর্তমানে হোমিও চিকিৎসক। নাম-যশ করে ফেলেছেন ইতোমধ্যে বেশ। সে সময় ছিলেন তিনি হোমিও চিকিৎসাশাস্ত্রের ছাত্র। তার শিক্ষকসহ পরিচিত যত নামী হোমিও চিকিৎসক ছিলেন সবাইকে দেখিয়েছেন, পরামর্শ নিয়েছেন। কিন্তু কাজ হয়নি কিছুই। বরং অবস্থা ক্রমান্বয়ে খারাপের দিকেই এগুতে থাকে। অগত্যা উপায়ান্তর না দেখে, সবার পরামর্শে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হল মাকে। হাসপাতালের চিকিৎসকরা রোগিনীকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানিয়ে দিলেন, না ফেরানোর আর পথ নেই। সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় পৌঁছে গেছে। এখন যে ক'দিন ঠেকা দিয়ে রাখা যায়। মাতৃ-অন্তপ্রাণ সন্তান দিশেহারা হয়েও শেষ চেষ্টার আশা বুকে নিয়ে এখানে-ওখানে ধর্ণা দেন। অপরিসীম ধৈর্য-স্থৈর্যের অধিকারী তার এ ছেলে। মাতৃস্নেহে সজাগ থেকে মার সেবা করেন হাসপাতালে তার অত্যন্ত ধীর, স্থির স্বভাবের সন্তান।
একদিন পরিচিত কেউ একজনের পরামর্শে তিনি গেলেন এক পীর সাহেবের আস্ত ানায়। হাসপাতালের কাছাকাছিই বখশিবাজার এলাকায়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পীর সাহেব দেখা দিলেন, শুনলেন তার কথা, ক্রমাগত পান চিবানোর ফাঁকে ফাঁকে। চেহারায় নূরানী ভাব জ্বল জ্বল করে (!?) কথা বলেন খুব কম এবং খুব মাপজোঁক করে। তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসেন। বেশ আয়েশী ভঙ্গিতে দু'জন খাদেম দু'দিকে পানের পিকদানি হাতে ধরে বসে আছে। পীর সাহেব মুখ এগিয়ে ধরলেই সঙ্গে সঙ্গে পিকদানি বাড়িয়ে ধরে খাদেম যুগল। ওপরে ঝালর বাতি আলো ছড়ায়। অধিকাংশ সময়ই চোখ দুটো মুদে থাকেন। খুললে সোজা নিচ বরাবর তাকান। ব্যাকুল পুত্র তার মায়ের অবস্থা বর্ণনা করেন খুব ধীরলয়ে। যেন প্রতিটি বাক্য অনুধাবন করার সুযোগ পান পীর সাহেব। আদ্যপ্রান্ত শুনে অনুধাবন করে কিছুক্ষণ চুপচাপ। নিস্তব্ধ গুমোট পরিবেশ বিরাজ করছে। ভক্তি-শ্রদ্ধায় সবার দৃষ্টি আনত। কেবল দিশেহারা পুত্র তাকিয়ে আছেন সরাসরি পীর সাহেবের মুখের দিকে। তার তর সইছে না। কিছু বলুক, প্রতিকার বাতলে দিক দ্রুত।
বেশকিছু সময় নিয়ে চোখ খুললেন তিনি। একটু নড়েচড়েও বসলেন। দু'খিলি পান মুখে গুঁজে দিয়ে, কিছুক্ষণ জাবর কেটে একমুখ পরিমাণ পিক নির্গত করলেন পিকদানিতে। অতঃপর মুখ খুললেন। প্রথমে অভয়বাণী, 'না, ঘাবড়াবার কিছু নেই। আল্লাহ মাফ করবেন। আল্লাহ মাফি দেবেন। তবে একটা কাজ করতে হবে। খুব গোপনে, কাউকে না জানিয়ে কাজটি করতে হবে। শনিবার বা মঙ্গলবার রাত যখন কাঁটায় কাঁটায় ১২টা তখন বুড়িগঙ্গা নদীর মাঝ বরাবর গিয়ে পৌঁছাতে হবে। সঙ্গে নিতে হবে মুখে পাটের দড়ি বাঁধা একটি বোতল। নদীর পানিতে যেখানে ঘূর্ণিপাক হচ্ছে ঠিক সেখানটায় বোতল ছুঁড়ে ফেলে এক নিঃশ্বাস সমান সময় পরে একটানে টেনে উঠাতে হবে। ওই অবস্থায় বোতলে যেটুকু পানি উঠবে, সেই পানি সকালে খালি পেটে তিন ফোঁটা করে এক হপ্তা খাওয়াতে হবে। এতে ইনশাল্লাহ নিরাময় হবে।'
একটা যেন দিশা খুঁজে পেলেন পুত্র। উৎসাহ ও রোমাঞ্চে তাড়িত হয়ে তিনি রাতের এক প্রহরে গিয়ে হাজির হলেন বুড়িগঙ্গার তীরে। এক নৌকার মাঝি চাঁদের আলোয় উন্মুক্ত বাতাসে শরীর এলিয়ে দিয়ে ঘুমোচ্ছিল নৌকার পাটাতনে। তাকে ডেকে ডেকে তুলে তিনগুণ ভাড়া সাব্যস্ত করে মধ্য বুড়িগঙ্গায় যাত্রা এবং রোমাঞ্চের পরিসমাপ্তি। মাঝি অবশ্য এ রকম ঘটনার সঙ্গে পূর্ব পরিচিত। আরো কয়েকজন যাত্রী একই উদ্দেশ্যে চেপেছিল তার জলযানটিতে ইতোপূর্বে।
বোতলে গঙ্গাজল যেটুকু পাওয়া গিয়েছিল, তা যথারীতি সেবন করানো হল। মাকে ঘটনা খুলে বলা হয়েছিল সেবনের আগে। তাতে তিনি উৎসাহিত হয়ে উঠেছিলেন। চার-পাঁচ দিন অবস্থা কিছুটা ভালোর দিকে বলে মনে হল। কিন্তু সেটা টিকল না বেশিদিন। দশদিন পর থেকে অবস্থা তার আবার খারাপের দিকে এগুতে লাগল। খারাপ হতে হতে বাইশ দিনের মাথায় শেষ খারাপটিও গ্রাস করল তাঁকে।
আমাদের দেশে এমনই হাজারো পীর, ফক্বীর, দরবেশ বাবাজীরা লোক ভোলানো ছলছুতো বিছিয়ে ধর্মের দোহাই দিয়ে বহাল তবিয়তে আছেন। এরা মানুষের অসহায়তা ও বিপন্নাবস্থাকে পুঁজি করে প্রতারণার জাল বিস্তার করেন। দুর্বল ঈমানের অধিকারী মনের ওপর সদম্ভে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। কৌশল হিসেবে রাতের প্রথম/শেষ প্রহর, নদীর মাঝখান, নদীর মোহনা, ঘূর্ণিপাক, পাটের দড়ি, ফাঁসির দড়ি, কাঁচের বোতল, একটানে তোলা, শনিবার/মঙ্গলবার, তেমাথা, চৌরাস্তা ইত্যাকার ফন্দিফিকির জুড়ে দিয়ে এক ধরনের সম্মোহন সৃষ্টি করেন। এ সম্মোহনে একটা কাজ অবশ্য হয়। তাৎক্ষণিক কিছুটা শক্তি বা আত্মবিশ্বাসেরও সৃষ্টি হয়। যেমনটি হয়েছিল এই মার। যাতে তিনি প্রথমদিকে কিছুটা ভাল অনুভব করেছিলেন।
আমাদের সমাজের প্রবল ধন্বন্তরী, প্রভাবশালী পীর সাহেবদের দাপটের শেকড় কিন্তু খুব আলগা নয়। অনেকখানি গভীরেই প্রোথিত। কিন্তু আসলে এরা পরগাছা, পরজীবী এবং ঠকজীবীও। পরগাছাদের নির্মূল করতে চেতনা ও তাওহীদভিত্তিক প্রকৃত ইসলামী জ্ঞানের ব্যাপক চর্চা দরকার।