📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 কবচ-মাদুলি-তাবিজ, হতাশ হয় হাফিজ!

📄 কবচ-মাদুলি-তাবিজ, হতাশ হয় হাফিজ!


পাতলা ফিনফিনে কাগজ। সাদা রং। দুই বা তিন রঙ্গে লেখা। আরবী হরফ। বৃত্তাকার লেখা কোনটি। কোনটি আয়তাকার বর্গক্ষেত্রের মতো। ত্রিকোণাকার লেখাও রয়েছে। কাগজের ছোট ছোট টুকরো। সব মিলিয়ে বৈচিত্রের একটা আয়োজন আছে বৈকি! এমনই প্রকৃতির এক একটি কাগজ এক মুখবন্ধ তামার নলে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। ঢোকানোর পর অন্যমুখে মোম লাগিয়ে সেদিকটাও বন্ধ করা হয়। এবার এটা হয়ে যায় নানা ধরনের অসুখ-বিসুখ থেকে শুরু করে মানবজীবনের যত বালা-মুসীবত আছে সব আসান করে দেবার মহৌষধ।
কোথায় মেলে এ মহৌষধ? রাস্তার ফুটপাত ঘেঁষে তিনদিক এক হাত উঁচু লালসালু দিয়ে ঘেরা। সামনের দিকে দু'দিক থেকে কিছুটা কাপড় এসে থেমে গেছে। একটুখানি জায়গা একটা গেইটের মতো রেখে ঘেরাও সম্পন্ন হয়েছে। এর মাঝে একজন সফেদ পোশাক-আশাক পরা, নাদুস-নুদুস শরীরের এক বা একাধিক মানুষ। এক ধরনের গাম্ভীর্য তাদের চোখে-মুখে। মুখের অনেকটাই দাড়িতে ঢাকা বলে পুরো মুখ দেখার উপায় নেই। আগত মানুষজনদের নিকট সমস্যার বিবরণ শুনে নেন। তারপর এক মহৌষধ যা তাবিজ বা মাদুলি নামে পরিচিত তার একটা করে টুকরো হাতে ধরিয়ে দেন। এটা দেবার সময় ক্ষণকালের জন্য চোখ জোড়া মুদে বিড়বিড় করে কী উচ্চারণ ক'রে তারপর তুলে দেন হাতে। সে সঙ্গে বলে দেন, কালো সুতায় পরিয়ে মাদুলিটি কোথায়, কতদিন বেঁধে রাখতে হবে। কারো হাতে, কারো গলায়, আবার কারো কোমড়ে। গ্রহীতা তখন পরম বিশ্বাসে মাদুলিদাতার চাহিদা মিটিয়ে দিয়ে মাদুলিখানা নিয়ে নির্দেশ মতো ব্যবহার করতে শুরু করে। কেবল যে ফুটপাথ তা তো নয়। বিভিন্ন জায়গায় আমাদের পীর, হুজুর, সূফী ও দরবেশ বাবারা তাবিজ ও মাদুলি দিয়ে মানুষের মহাউপকার (!) করার আখড়া গেড়ে বসেছে। তাছাড়া, ট্রেন, বাস, স্টিমারেও মাদুলি বিক্রেতা নজরে পড়ে হরহামেশাই। প্রথমে নানাভাবে লোকজন আকর্ষণ করে গোলাকার বৃত্ত তৈরি করা হয়। এরপর মাদুলির কার্যকারিতা বয়ান করা হয় কিছুটা সময় নিয়ে। তারপর বিক্রির পালা। অবশ্য এটা বিক্রির সময় কেনাবেচা বা দাম বলতে নারাজ তারা!? স্রষ্টার নামে, স্রষ্টার কালামে সমস্যার সমাধান এবং এ জন্য দাম নয় হাদিয়া গ্রহণ করেন বলে জানান তারা।
মফিজ মিয়া এক হাটবারে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটার ফাঁকে তাবিজওয়ালার নাগালে আসে। সে দাঁড়িয়ে তার কথা শোনে ভীষণ আগ্রহ নিয়ে। শুনতে শুনতে সে উপলব্ধি করে, যেসব সমস্যার কথা বলা হচ্ছে সেগুলো তো তারও রয়েছে। যেমন তার রয়েছে দীর্ঘদিনের বাতের বেদনা। তার বউয়ের রয়েছে নারীরোগ। আর সাড়ে চার বছরের মেয়েটি প্রতিদিন বিছানা ভিজিয়ে সপসপ করে প্রস্রাব করে দেয়। এ তিন সমস্যার নাকি সমাধান দেবে মাদুলি। সুতরাং না নিয়ে উপায় কী? হাদিয়া পরিশোধ করে তিনটি মাদুলি গ্রহণ করে সে। দোকান থেকে কালো সুতা কিনে নেয় দরকার মতো। তিনজন ভিন্ন ভিন্ন তিনটি স্থানে বেঁধে রাখে। মেয়াদ পূর্ণও হয়। এক মাস। কারোরই কোন উপকারের আলামত দেখা যায় না। আরো এক মাস। এভাবে তিন মাস বেঁধে রাখার পরও কারো কিছু হল না। বরং ওদের স্বামী-স্ত্রীর রোগটা আরো বেড়েছে বলেই মনে হয়। এরপর আরো মাস খানেক রেখেও কোন ফল না পেয়ে খুলে ফেলেছে ধাতব মাদুলিগুলো সবার শরীর থেকেই। বিরক্ত ও অবিশ্বাস জন্মে গেছে ততদিন মফিজ মিয়ার।
ব্যাপারটা কিন্তু অবিশ্বাসেরই। কেন? তামার মুখ আঁটা নলের মধ্যে আরবী অক্ষরে লেখা কিছু শব্দ পুরে দেয়া হয়। এর কি কোন ওষুধী গুণ আছে? না, নেই। তাহলে রোগ নিরাময় হবে কীভাবে? একই আয়াতে শরীরের সব রোগ-শোক দূর করা যদি যেত, তাহলে কী আর এ নশ্বর পৃথিবীতে ডাক্তার, ওষুধ, হাসপাতাল- এগুলোর দরকার পড়ত! এগুলোর পেছনে যে এত এত কাড়িকাড়ি টাকা ব্যয় করা হয় সেগুলো তো তাহলে অর্থহীন বলে মনে করা যেত। অর্থহীন নয় বলেই তো স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার জন্য মানুষের এত আয়োজন, এত শ্রম, এত অর্থ বিনিয়োগ। আসলে এ সব শব্দ, কাগজ, তাবিজ, তোকমা ও মাদুলির কোন গুণ নেই। যদি কিছুটা থাকে তা ওই ধাতুটির। তামার। যা দিয়ে মাদুলি বানানো হয়েছে। কোন কোন ধাতু শরীরের সংস্পর্শে এসে শরীরে কিছু ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। তবে কোন রোগের জন্য কোন ধাতু উপকার করে এবং তার প্রয়োজনীয় পরিমাণই বা কতটুকু তা ওই মাদুলিওয়ালা কখনো নির্ণয় করেন না। তিনি একই আয়তনের মাদুলির মধ্যে একই কাগজ এবং একই শব্দ লেখা কাগজ ঠেসে দেন। সব রোগ বা সমস্যার জন্য একই মাদুলিই তুলে দেন কাঙ্ক্ষিত হাদিয়া নিয়ে।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, মাদুলিতে অসুখও সারে না, সমস্যাও দূর হয় না। সাধারণ এবং অন্ধ-অচেতন মানুষ কেন তবে মাদুলি ব্যবহার করে? এর নিশ্চয়ই কিছু কার্যকারণ আছে। মানুষ যখন অসুখ-বিসুখে কাতর হয়ে ডাক্তার-ওষুধ হাতের নাগালে পায়নি তখন একশ্রেণীর অসাধু লোক ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে মাদুলি ব্যবসাটা ফেঁদে বসে। এটাই চলছে যুগ যুগ ধরে। এ ছাড়া, এ ধরনের অসাধু ব্যবসায়ীরা লালসালু, পাতলা কাগজ, রঙচঙে বিভিন্ন আকার-আকৃতিতে ছাপা ইত্যাদি প্রদর্শন এবং মুখ ভঙ্গিমায় কৃত্রিম গাম্ভীর্য উপস্থাপন করে একটা ঐন্দ্রজালিক আবহ তৈরি করেন। এতে সরল-সাধারণ মানুষ তো বটেই, সেখানে চেতনাহীন আধুনিক মানুষও মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ে। এ সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে আয়-উপার্জনের পথ করে নেন মাদুলি ব্যবসায়ীরা। আমাদের আসলে কোন কিছুকে অন্ধভাবে গ্রহণও নয়, বর্জনও করা উচিত নয়। ওহীর জ্ঞান তথা কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে গ্রহণ-বর্জন করতে শেখা দরকার। সে জন্য নিজের ভেতর সত্যসন্ধানী, অনুসন্ধিৎসু মন গড়ে তুলতে হবে। সত্য খুঁজতে শিখলে অন্ধধারণা দূর করা যাবে। অকারণে মোহাবিষ্টও হতে হবে না তখন।
প্রকৃতপক্ষে, সকল প্রকার সৌভাগ্য ও দুভার্গ্যের নিয়ন্ত্রক এবং নির্ধারকও একমাত্র আল্লাহ্। তবুও যুগে যুগে মানুষের মনে এ প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে যে, কাঙ্ক্ষিত সুসময় বা অনাকাঙ্ক্ষিত মন্দসময় আসার পূর্বেই কি মানুষ তা কোন উপায় অবলম্বনের মাধ্যমে জানতে পারে? কারণ, এটা যদি সম্ভব হতো, তাহলে দুর্ভাগ্যকে এড়িয়ে সাফল্য নিশ্চিত করা যেত। অতি প্রাচীনকাল থেকেই কিছু কিছু মানুষ এ অদৃশ্য জ্ঞানের অধিকারী বলে দাবী করেছে। ফলে অজ্ঞ ব্যক্তিরা অনেক অর্থকড়ি খরচের মাধ্যমে তাদের জন্য নির্ধারিত ভাগ্যের লিখনের অদৃশ্য তথা সংঘটিতব্য বিষয়াবলী জানতে তথাকথিত ভবিষ্যদ্বক্তার পিছনে ঘুরঘুর করেছে। তাই সৌভাগ্য আনয়নে বিভিন্ন প্রকার তা'বিজ, কবজের ছড়াছড়ি অধিকাংশ সমাজে প্রায়ই দৃষ্টমান হয়। কিছু কল্পিত গোপনীয় পথ ও পদ্ধতি রয়েছে যেগুলোকে সাধারণত বিশেষ জ্ঞান বলে গণ্য করা হয়; ফলে বিভিন্ন প্রকার শুভ-অশুভ আলামত ও এগুলোর ব্যাখ্যা বিভিন্ন সভ্যতায় বিদ্যমান রয়েছে। এ সব জ্ঞানের যৎসামান্য গোপন অংশটি অবশ্য যাদুমন্ত্র ও ভাগ্যগণনার বিভিন্ন প্রকার জ্যোতিষশাস্ত্র রূপে বংশ পরস্পরায় হস্তান্তরিত হয়েছে।
মানব সমাজে এ সব চর্চা করার ব্যাপক প্রবণতা লক্ষ্য করার কারণে এ সম্পর্কে ইসলামের সুস্পষ্ট বক্তব্যকে প্রকাশ করা অতি জরুরী বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল, এ সম্পর্কে স্পষ্ট জ্ঞান না থাকলে, ঐসব চর্চার অভ্যন্তরে বিদ্যমান শিরকে যেকোন মুসলিম খুব সহজেই লিপ্ত হতে পারে। ঐ সব কথিত দাবী যা আল্লাহ্র একক গুণাবলীর (সিফাত) বিরুদ্ধে সর্বদা ক্রিয়াশীল এবং সৃষ্টির উপাসনার ('ইবাদাত) ক্ষেত্র প্রস্তুত করে কিংবা সৃষ্টির উপাসনার দিকে মানুষকে তাড়িত করে- এর সাথে ইসলামের সম্পর্ক কতটুকু তা এখানে আলোচনা করা হবে। কুরআন ও রাসূলের বিশুদ্ধ সুন্নাহর আলোকে প্রতিটি দাবী বিশ্লেষণ করা হবে এবং প্রতিটি দাবী সম্পর্কে তাঁদের জন্য নির্দেশনা আকারে ইসলামি বিধানাবলী জানানো হবে যাঁরা আন্তরিকভাবে প্রকৃত তাওহীদের বাস্তবতাকে খুঁজছেন।
শয়তান তাড়িয়ে সৌভাগ্য আনয়ন করতে কঙ্কন/বালা, চুড়ি, পুঁতির মালা, ঝিনুক ইত্যাদি কবচ হিসেবে পরার রেওয়াজ রাসূল মুহাম্মাদ -এর সমকালীন আরবের জনগণের মধ্যে প্রচলিত ছিল। এছাড়া সৌভাগ্য বহনকারী বিভিন্ন প্রকার তাবিজ ও মন্ত্রপূত কবচ পৃথিবীর প্রায় সব এলাকায় পাওয়া যেত। মূলত যাদু, মন্ত্রপূত কবচ ও তাবিজের মত সৃষ্ট বস্তুকে শয়তান দূরীকরণ ও সৌভাগ্য আনয়নকারী হিসেবে বিশ্বাস করা মানে আল্লাহ্র উপর সত্যিকারের বিশ্বাসের বিরোধিতা করা। শেষ নাবী মুহাম্মাদ -এর সময়ে বিদ্যমান এ সকল বিশ্বাসের বিরোধিতায় ইসলাম এ কারণে সদা সক্রিয় ছিল যাতে এমন একটা শক্ত ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব হয় যাতে যখনই বা যেখানেই অনুরূপ বিশ্বাসের আত্মপ্রকাশ লাভ করুক না কেন তৎক্ষণাৎই যেন তা বাতিল ও নিষিদ্ধ করা যায়। এ ধরনের বিশ্বাস মূলত মূর্তিপূজকদের সমাজে পৌত্তলিকতার ভিত্তি দৃঢ়তর করে তোলে এবং যাদুমন্ত্র স্বয়ং মূর্তিপূজারই একটি অংশ ব্যতীত আর কিছুই নয়। এ সকল বিশ্বাসের সাথে খ্রিস্টানদের ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের বিশ্বাসের একটি যোগসূত্র লক্ষ্য করা যায়; কারণ নাবী যিশুকে [ঈসা (আ:)] এরা শুধু প্রভুত্বের আসনেই উন্নীত করেনি, বরং তাঁর মাতা মেরিসহ (মারইয়াম) বিভিন্ন সাধুদের উপাসনা করে। অধিকন্তু তারা সৌভাগ্য আনয়নের উদ্দেশ্যে তাঁদের কল্পিত আকৃতি সম্বলিত ছবি, মূর্তি ও পদককে সংরক্ষণ এবং ব্যবহার করে।
নাবী-এর সময় নবদীক্ষিত মুসলমানগণ প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত যাদুমন্ত্রে বিশ্বাস করত যা আরবীতে তামা'ইম (একবচনে 'তামীমাহ') বলা হয়। এর ফলে, রাসূল-এর অনেক হাদীস রয়েছে যেখানে তিনি জোরালোভাবে এ ধরনের সকল চর্চাকে নিষিদ্ধ করেছেন। নিম্নে কিছু উদাহরণ পেশ করা হল:
'ইমরান ইবনে হুসাইন বর্ণনা করেন, 'একটি লোকের হাতের বাহুতে বালা দেখে রাসূল লোকটিকে বললেন, লা'নত পড়ুক তোমার উপর! এটা কী? লোকটি উত্তর দিল যে, আল-ওয়াহিনাহ নামক এক রোগ হতে রক্ষা পেতে এটি ব্যবহার করছি। তারপর রাসূল বলেন: এটাকে পরিত্যাগ কর, নিশ্চয়ই এটা শুধু তোমার অসুস্থতা বৃদ্ধি করবে। আর তুমি যদি এটা পরা অবস্থায় মারা যাও, তবে তুমি কখনই সফলকাম হবে না।'
সুতরাং পিতল, তামা ও দস্তার সংমিশ্রণে প্রস্তুত ধাতু বা লোহা বা তামার তৈরি বালা, চুড়ি ও আংটি যদি কোন অসুস্থ বা স্বাস্থ্যবান লোক পরে এই বিশ্বাসে যে, এগুলোর মাধ্যমে অসুস্থতা থেকে রক্ষা পাওয়া যায় বা রোগের উপশম হয়, তাহলে এটা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কারণ, এ বিষয়টি 'হারাম (নিষিদ্ধ) দ্রব্যের দ্বারা চিকিৎসা নিষিদ্ধ' নামক বিধানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়; এ ব্যাপারে রাসূল বলেন, 'তোমরা একে অপরের অসুস্থতার চিকিৎসা কর, তবে নিষিদ্ধ দ্রব্য দ্বারা চিকিৎসা করো না।'
আবু ওয়াকিদ আল-লাইছি বর্ণনা করেন, "আল্লাহর রাসূল যখন হুনাইয়ানের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে 'যা-তু আনওয়াত নামক এক বৃক্ষ অতিক্রম করলেন। সৌভাগ্য লাভের আশায় এ গাছের ডালে ডালে মূর্তিপূজারীরা তাদের অস্ত্রশস্ত্র ঝুলিয়ে রাখত। ইসলামে নবদীক্ষিত কয়েকজন সাহাবী রাসূল-কে ঐ বৃক্ষটির মতো অন্য একটা বৃক্ষকে তাদের জন্য নির্দিষ্ট করে দিতে বলল। রাসূল বললেন, সুবহানাল্লাহ! এ বিষয়টি তো ঠিক সেই রকম যা মূসা (আ:)-কে লোকজন বলেছিল:
'...আমাদের জন্যও 'কোন দেবতা বানিয়ে দাও যেমন তাদের দেবতা আছে...।' [সূরা আল-আ'রাফ (৭): ১৩৮]
যাঁর হাতে আমার এ প্রাণ তাঁর শপথ করে বলছি, তোমরা সবাই তোমাদের পূর্ববর্তীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে।"
এ হাদীছে রাসূল শুধু সৌভাগ্যের আলামত ও বস্তুগুলোর ধারণাকেই নাকচ করেন নি; বরং ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে মুসলিমরা খ্রিস্টান ও ইহুদীদেরকে অনুকরণ করবে। যিক্র করার জন্য মুসলিমদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত তথাকথিত তসবীহ নামক গুটিকার মালা মূলত ক্যথলিক খ্রিস্টানদের জপমালার অনুকরণ, বড়দিনের অনুকরণে মিলাদ (রাসূলের জন্মদিন পালন) এবং পীর, বুযুর্গ, দরবেশ, ওলী বা আওলিয়াদেরকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিশ্বাস করার সাথে খ্রিস্টানদের যাজক, পাদ্রী ও ধর্মীয় পণ্ডিত এবং মক্কার তৎকালীন মুশরিকদের মূর্তিকে মধ্যস্থতাকারী বলে গ্রহণ করার মধ্যে কোনই পার্থক্য নেই। রাসূলের ভবিষ্যদ্বাণী ইতোমধ্যেই সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে!
যারা মন্ত্রপূত কবচ ব্যবহার করে তাদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত বর্ষিত হওয়ার কথা বলে রাসূল তা'বিজ ও কবচ ব্যবহারের ভয়াবহতা সম্পর্কে আমাদেরকে আরো জোরালোভাবে সতর্ক করেছেন। 'উকুবাহ ইবনে 'আমির বর্ণনা করেন যে একদা রাসূল বলেন, 'আল্লাহ্ তা'আলা যেন তাকে ব্যর্থতা ও অস্থিরতার মধ্যে অনুপ্রবেশ করান, যে নিজে মন্ত্রপূত তা'বিজ-কবচ পরে ও অন্যকে পরায়।'
সাহাবীগণ যাদুমন্ত্র ও তা'বিজ-কবচ সম্পর্কে রাসূলের বিধান কঠোরভাবে অনুসরণ করেছেন। ফলে এমন অনেক ঘটনা হাদীস ও ইসলামী ইতিহাসের বিভিন্ন গ্রন্থে লিখিত রয়েছে যার মাধ্যমে এ কথা দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, সাহাবীরা তাঁদের সমাজের পাশাপাশি নিজেদের পরিবারের মধ্যে যখনই এ ধরনের কোন কিছুর চর্চা করার প্রবণতা লক্ষ্য করেছেন তখনই তাঁরা এ ব্যাপারে সরাসরি বিরোধিতা করেছেন। 'উরাহ বর্ণনা করেন যে, সাহাবী হুযাইফা একটি অসুস্থ লোককে দেখতে গিয়ে ঐ লোকটির বাহুতে একটি রশি দেখতে পান। তিনি রশিটি কেটে দেন বা টেনে ছিঁড়ে ফেলে এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন:
'অধিকাংশ মানুষ আল্লাহতে বিশ্বাস করে, কিন্তু সাথে সাথে শিকও করে।' [সূরা ইউসুফ (১২) : ১০৬]
অন্য সময়, তিনি অসুস্থ লোকটির বাহুতে একটি খিয়াত নামক বালার সন্ধান পেয়ে সে সম্পর্কে লোকটিকে জিজ্ঞাসা করলেন। লোকটি উত্তর দিল, বিশেষ করে আমার নিজের জন্য মন্ত্রপূত বস্তু। তৎক্ষণাৎ লোকটার বাহু থেকে সেই বস্তুটি ছিঁড়ে ফেলে হুযাইফা বললেন, তুমি যদি এটা তোমার সঙ্গে থাকাবস্থায় মারা যেতে, তাহলে আমি কখনোই তোমার জন্য জানাযা সলাত আদায় করতাম না।
তা'বীজ-কবচ সম্পর্কে ইসলামের বিধান পূর্বে উল্লেখিত রাসূল কর্তৃক মন্ত্র, তা'বিজ-কবচ, সূতা, তাগা, অবৈধ ঝাড়-ফুঁক ও যাদুর নিষেধাজ্ঞা আরোপ শুধু আরব দেশেই সীমাবদ্ধ নয়। কোথাও যদি কোন বস্তুকে ঐ একই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তবে সেখানেই এ নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে। তথ্য-প্রযুক্তিগত উন্নতি ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি সত্ত্বেও সমগ্র বিশ্বের প্রায় প্রতিটি সমাজে এখনও বিভিন্ন প্রকারের জাদুমন্ত্রের ছড়াছড়ি প্রত্যক্ষ করা যায়। অনেক তা'বিজ-কবচ, সূতা, তাগা মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সাথে এমন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছে যে কেউ এ সম্পর্কে ভাবার অবকাশ পায় না। কিন্তু এ সব তা'বিজ-কবচের উৎস দেখিয়ে দিলে, এগুলোর মূলে শিরকের শক্ত অবস্থান দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

টিকাঃ
১. আভিধানিক অর্থে অসুস্থতা। সম্ভবত গেঁটে বাতকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে।
২. আহমাদ, ইবনে মাজাহ ও ইবনে হিব্বান কর্তৃক সংগৃহীত।
৩. আবু দাউদ কর্তৃক সংগৃহীত, সুনান আবি দাউদ, খণ্ড ৩, পৃ. ১০৮৭।
৪. আভিধানিক অর্থে, 'এমন ধরণের বস্তু যার উপর কিছু ঝুলছে'।
৫. এর অর্থ 'আল্লাহ্ তা'আলা মহা পবিত্র'।
৬. তিরমিযি, নাসাঈ ও আহমাদ কর্তৃক সংগৃহীত। শায়খ আল-আলবানী এ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন; সহীহ সুনান তিরমিযি, (বৈরুত: আল-মাকতাব আল-ইসলামি, ১ম সংস্করণ, ১৯৮৮), খণ্ড ২, পৃ. ২৩৫, হাদীস নং ১৭৭১।
৭. বস্তুত কারো জন্ম বা মৃত্যুদিন পালন করার বিষয়টি আরবের মানুষের কাছে একেবারেই অজ্ঞাত ছিল। জন্মদিন পালন মূলত অমুসলিম সংস্কৃতির অংশ। প্রথম যুগের মুসলিমগণ তা জানতেন না। পারস্যের মাজুস (অগ্নি উপাসক) ও বাইযান্টাইন খ্রিস্টানদের ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল জন্মদিন, মৃত্যুদিন ইত্যাদি পালন করা। তবে প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দীতে পারস্য, সিরিয়া, মিসর ও এশিয়া মাইনরের যে সকল মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আসেন তাঁরা নিজেদের দেশজ বা পূর্বধর্মের রীতিনীতি ত্যাগ করে জীবনের সকল ক্ষেত্রে সাহাবীদের অনুসরণ-অনুকরণ করতেন এবং তাঁদের মুসলিম সাম্রাজ্যে অনারব, পারসিক ও তুর্কী মুসলিমদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে মুসলিম সাম্রাজ্যে বিভিন্ন নতুন নতুন সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতির প্রচলন ঘটে, যার মধ্যে পবিত্র! ঈদে মিলাদুন্নবী অন্যতম। (বিস্তারিত দেখুন: এহইয়াউস সুনান, পৃ. ৫২৩)
৮. আহমাদ ও আল-হাকীম কর্তৃক সংগৃহীত।
৯. আহমাদ ও আল-হাকীম কর্তৃক সংগৃহীত। ইবনু কাসীর, তাফসীর, ২/৪৯৫।
১০. ইবনে আবী হাতীম কর্তৃক সংগৃহীত। আরো বিস্তারিত জানতে দেখুন, এ বইয়ের ৫৫ পৃষ্ঠা।
১১. তা'বীজ-কবচ সম্পর্কে ইসলামের বিধান সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন, ড. মুয্যাম্মিল আলী কর্তৃক রচিত, শির্ক কী ও কেন, পৃষ্ঠা ৩৪৩-৩৪৮।

📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 হাত চালা, বাড়ায় জ্বালা

📄 হাত চালা, বাড়ায় জ্বালা


হাত, বাটি বা বদনা চালানোর একটি কথা শোনা যায় গ্রাম, শহর সব জায়গায়। দামি জিনিসপত্র হারিয়ে গেলে এ সব পদ্ধতির আশ্রয় নেয়া হয়। হাতের আংটি, গলার মালা, পকেটের মানিব্যাগ, হাতের ঘড়ি কোথাও পড়ে গেল অথবা যেখানে থাকার কথা সেখানে নেই। অনেক অনুসন্ধান চলল। সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজা হল। না, কোথাও নেই। হয়রান হয়ে অবশেষে ডেকে আনা হল পাড়ার পুরনো ওঝাকে। হাত চালান দিয়ে হারানো বস্তুটিকে খুঁজে বের করবেন তিনি। হয়ত বেশ নাম-যশ আছে তার এ ব্যাপারে। এ জন্য তার ওপর আস্থা জন্মাতেই পারে।
নির্দিষ্ট বাড়িতে ওঝা এসে হাত চালানোর জন্য একজন লোক ঠিক করেন। সবাইকে দিয়ে হাত চালানো হয় না। দরকার হয় একজন হাত-চলা লোক। রাশি-গ্রহ- নক্ষত্র মিলিয়ে হাত-চলা লোক নির্বাচন করা হয়। হাত-চলা লোকটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের নাগালের মধ্যে নিয়ে মাটির ওপর বসিয়ে দেন ওঝা। ডান হাতটা তার সামনে বাড়িয়ে মাটি ছুঁয়ে থাকবে। হাতটা এমনভাবে মাটি স্পর্শ করে থাকবে যাতে শরীরের পুরো ভর থাকবে হাতের ওপর। এরপর ওঝা তাকে চোখ বন্ধ করে বা একদৃষ্টে সামনে তাকিয়ে থাকতে বলে তিনি মন্ত্র পড়া শুরু করেন। কিছুক্ষণ একটানা মন্ত্র পড়ার পর হাতের ওপর থাপ্পর কষে দিলে হাত-চলা লোকটির হাত চলতে শুরু করবে। হাত-চলা মানে তার শরীরও চলতে থাকা। হ্যাঁ, চলমান হাতটাই হারানো জিনিসটির সন্ধানে তখন ছুটতে থাকে। ছুটতে ছুটতে এক জায়গায় গিয়ে হয়ত থেমে গেল হাতখানি। অমনি সবাই দুদ্দাড় খুঁজতে লেগে যায় হারানো জিনিসটি, থেমে যাওয়া স্থানে। কখনো কদাচিৎ পাওয়া যায় হয়ত জিনিসটি। বেশিরভাগ সময়েই কিন্তু তা মেলে না। তখন ওঝা বাবাজী অসহায় অবস্থায় পড়ে যান। তবে না, তার উত্তরও তৈরি থাকে। চালাচালি করে জিনিস না পাওয়া গেলে তিনি বলেন, ধরা-ছোঁয়ার বাইরে গেছে ওটি। হাত এভাবে চলতেই থাকবে। সামনের দিকে এগোতেই থাকবে। মাটিতে হাত ঘষে কতক্ষণ আর চলবে! তবে যেদিক পানে এগোচ্ছে হাত, সেদিকেই রয়েছে জিনিসখানি। এমন অবস্থায় ওঝা দিক নির্দেশনা বাতলে হাত চালানো পর্ব স্থগিত করে দেন। অনেক সময় অন্য কথাও বলেন তিনি। একে দিয়ে হবে না। এর রাশি বা গ্রহ-নক্ষত্রে গোলমাল আছে। অথবা বলেন, আদৌ কিছু হারানো যায়নি। এ বাড়িতেই আছে ওটি। তাই হাত আর সামনে এগোতে চাইছে না। ইত্যাদি, ইত্যাদি...
আসল ঘটনা কিন্তু ভিন্ন। হাত চালানো ব্যাপারটিই একটি অন্ধবিশ্বাসজনিত পদ্ধতি। কুসংস্কারের গোঁড়ামী থেকে এর উৎপত্তি ও বহাল থাকা। ব্যাপারটি এ রকম- হাত চলা লোকটিকে যেভাবে বসানো হয় তাতে শরীরের পুরো ভার থাকে হাতের ওপর। এতে হাতের সামনে এগিয়ে যাবার জন্য সুবিধাজনক অবস্থা তৈরি হয়। এর ওপর ওঝা যখন হাতে থাপ্পর হাঁকিয়ে দেন তখন হাতটা একটু নড়ে যায়। আর এতে মাটিতে ঘষা খেয়ে হাতের তালুতে একটু সুড়সুড়ি লাগে। সুড়সুড়ি লাগা হাত স্বভাবতই সামনে এগোতে থাকবে। লোকটিই সুড়সুড়ি থামানোর জন্য সামনে এগিয়ে দেবে হাতখানি। এরপর যোগ হয় ওই লোকটির অন্ধবিশ্বাসের অনুভূতি। কুসংস্কারাচ্ছন্ন অন্ধবিশ্বাসী লোকটি তার মানসিক দুর্বলতায় হাত সামনে এগিয়ে নিতেই থাকে। আপনা থেকেই সামনে ঠেলে নিয়ে যায় তার হাত দুখানি। তখন তার ভেতর কাজ করতে থাকে ভিন্ন এক আবেগতাড়িত মোহাচ্ছন্নতা। অন্ধ দুর্বলতায় কোনদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে ক্রমাগত চলতেই থাকে। যেন আপনা থেকে নিজ মনে চলছে তো, চলছেই। ওদিকে কিন্তু হাত দুটোর দফা-রফা হয়ে যায়।
দীর্ঘকাল ধরে কুসংস্কারাচ্ছন্ন অসচেতন সমাজে হাত চালানোর এ ধাপ্পাবাজী চলে আসছে। ধাপ্পাবাজ ওঝারা মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে এটা চালু রেখেছেন: ১. হাত চালানোর জন্য রাশি-নক্ষত্র মিলিয়ে লোক নির্বাচন। ২. শরীরে ভার মাটির ওপর রেখে বসার ভঙ্গী, এবং ৩. অন্ধবিশ্বাসপূর্ণ দুর্বল মন।
এ তিনটি উপাদান একত্রে যুক্ত হয়ে হাত চালানোর ক্রিয়া-প্রক্রিয়া চলছে।

📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 বাটি চালা, নাটক হয় খেলা

📄 বাটি চালা, নাটক হয় খেলা


চোর ধরা বা চোরাই মালামাল উদ্ধারের জন্য গ্রামাঞ্চল ও কিছু কিছু শহরে চালু রয়েছে বাটি বা বদনা চালা। চুরি হবার পর চোর ধরার এটা একটা বড় উপায় বলে চলে আসছে অনেকদিন ধরে। প্রকৃত শিক্ষা না থাকলে কুশিক্ষায় আচ্ছন্ন থাকবে মানুষ। আর কুশিক্ষা মানে হল অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার, গোঁড়ামী ইত্যাদি। বাটি বা বদনা চালা হচ্ছে তেমনি এক কুসংস্কার।
বাটি বা বদনা চালার চালাচালি এবার দেখা যাক।
খবর পেয়ে চুরি যাওয়া বাড়িতে ওঝা বাবাজী উপস্থিত হয়ে ধূপ, ধুনা বা আগরবাতি জ্বালান। তারপর খোঁজ করেন একজন বাটি চালা লোক তথা তুলা রাশির জাতককে। তেমন খুঁজে বের করা গেলে তাকে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে সামনে রাখে একখানি বাটি বা বদনা। এরপর শুরু হয় একাধারে যাদুমন্ত্র পড়া। ইতোমধ্যে বাটি বা বদনা চালা লোকটির দু'হাতে বাটি বা বদনা ধরতে দেয়া হয়। চারদিকে উৎসুক লোকের ভীড়। মন্ত্রপাঠের এক পর্যায়ে হয়ত বাটি একটু নড়ে উঠল। সবাই হৈ হৈ করে উঠল। বাটি নড়েছে, বাটি নড়েছে! ওদিকে তন্ত্র-মন্ত্রপাঠ চলছেই। কিন্তু আর বাটির নড়ন-চড়ন নেই। বিরক্ত মুখে ওঝা বাবাজী ঘোষণা করলেন, 'না, এর হাতে বাটি চলবে না।' সবার হাতে যে বাটি চলে না!
আবার লোক নির্বাচনের পালা শুরু হল। কেউ সাহস করে এগিয়ে আসে না। না জানি কী হয়ে যায়! ভীড়ের মধ্যে থেকে ওঝা বাবাজী একজনকে হয়ত ডেকে নিয়ে বললেন, 'তুমি বাটি ধরো। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে, তোমার হাতে বাটি চলবে।' ওঝার নির্বাচিত লোক বাটি ধরল। কিছুক্ষণ তন্ত্র-মন্ত্রের পর বাটি নড়ে উঠতে শুরু করল। কয়েকশ' গজ এগিয়েও গেল। একটা বাড়ির দোরগোড়ায় গিয়ে বাটির চলা বন্ধ হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে বাটির গতিপথ গেল বদলে। ঠিক যে পথ ধরে ওটি এগিয়েছিল আবার একই পথ বেয়ে পূর্বের জায়গাতেই এসে বাটি থামল। আর কোন নড়াচড়া নেই। ওঝা আবার অন্য কাউকে আহ্বান জানালেন বাটি ধরতে। না, এবার আর লোক পাওয়া গেল না। দু'-একজন ভদ্র বেশভূষার যুবক এগিয়ে গেলেও ওঝা তাদের নাকচ করে দেন। তোমার রাশিতে মিলবে না। সবাইকে দিয়ে কী আর সব কাজ হয়!
অবশেষে ক্লান্ত ওঝা ঘোষণা করলেন, 'ঠিক আছে কাউকে যখন তেমন পাওয়া যাচ্ছে না, তবে এবার আমিই তাহলে বাটি ধরছি।' চারদিকে সোৎসাহ ধ্বনি। এবার চোর ধরা না পড়ে যাবে কোথায়? সবার চকচকে কৌতূহলী চোখ ওঝার প্রতি মনোযোগী হয়। মন্ত্র জপের পর বাটিটি গতিপ্রাপ্ত হল। আরেক দফা সকলে বাহ্বা ধ্বনি। প্রচণ্ড আনন্দ ও চিৎকারে মুখরিত হয়ে উঠল পরিবেশ। ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে বাটি। সে সাথে এগিয়ে চলেছেন ওঝা বাবাজী। মাঝে মধ্যে দু'-একটি কথা বলছেন জোরে। বলছেন, বাটি তার হাত এবং তাবৎ শরীর প্রচণ্ড আকর্ষণে টেনে নিয়ে চলেছে। ওটি যে এখন কী দুর্ণিবার শক্তির অধিকারী তা তিনি এটা সেটা বলে বোঝাতে চাইছেন উপস্থিত জনতাকে। প্রথমে আস্তে আস্তে চললেন। পরে, ক্রমান্বয়ে বেশ গতিতে এগোতে শুরু করেছে বাটিটি। ঝোপ-ঝাড়, বন-বাদাড়, রাস্তা-ঘাট মাড়িয়ে এগোচ্ছে তো এগোচ্ছেই। হঠাৎ একটা গর্তে এসে স্থির হল। ওঝার ফরমায়েশ মোতাবেক গর্তটি আরো খুঁড়ে বড় গর্ত বানিয়ে ফেলা হল। না কিছু নেই। আবার বাটি চলতে লাগল। এর মধ্যে ওঝার সমস্ত শরীর ঘেমে নেয়ে একাকার। মুখখানিও লাল রঙ ধারণ করেছে। এবার বললেন তিনি, 'বাটি যে পথ ধরে এগোচ্ছে, চোরও মালামাল নিয়ে সটকে পড়েছে সেই পথ ধরে। কারণ মালামাল চলে গেছে বহু দূরে। আর চুরি যাবার সঙ্গে সঙ্গে দু'-একদিনের মধ্যে না হলে বাটি চোর বা লোকের নাগাল পায় না।'
এভাবে হয়ত দু'তিন ঘন্টা চলার পর বাটিটি এমন এক রাস্তার মোড়ে এসে থামল, যার আশেপাশে তিন-চারটি বাড়ি রয়েছে। ওঝা তখন বলল, 'এ বাড়িগুলোতে আজ তল্লাশী চালিয়ে দেখুন। না পেলে আবার কাল এবং এখানেই যবনিকাপাত।'
যে ঘটনাটি এখানে বলা হল, এর রহস্য কী!? বিষয়টা ভেঙ্গে বললে বাটি বা বদনা চালার রহস্য কারো বুঝতে বাকী থাকবে না। প্রথমত লোক নির্বাচন। রাশি টাশি বলে একটা ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করা হয়। সবার দ্বারা হয় না, সবার এটা সয় না (অর্থাৎ ক্ষতি হয়) ইত্যাদি বলে প্রচলিত আতঙ্ককে আরো জোরদার করা হয়। ফলে সহসা কেউ বাটি ধরায় রাজী হয় না। আর উপস্থিত লোকদের মধ্য থেকে সুবেশধারী তথা প্রকৃত তাওহীদের শিক্ষায় শিক্ষিত যুবক কেউ এগিয়ে এলে তাকে না করে দেয়া হয়। কারণ তাতে গুমোর ফাঁক হয়ে যাবে। কেউ যখন রাজী হয় না তখন এ সুযোগে তার নিজের একজন লোককে লাগিয়ে দেয়া হয়। তাকে দিয়ে একটু খেলিয়ে টেলিয়ে অবশেষে ওঝা নিজেই বাটি ধারণ করেন। তিনি খুব গুরুগম্ভীর ভঙ্গীতে বাটি চালা তথা বাটি খেল পর্বটি এগিয়ে নিতে থাকেন। তাই সন্দেহজনক দু'-একটা বাড়ি বা গর্ত-টর্তর নিকট গিয়ে থামিয়ে দেন বাটিখানাকে। খোঁজাখুঁজি চলে কিছুক্ষণ ধরে। পাওয়া গেলে (অনেক সময় কাকতালীয়ভাবে জিনিসপত্র পাওয়া যায় বৈকি! তখন তো স্বাভাবিকভাবেই কেরামতি বাড়ে ওঝা বাবাজীর!) ভাল আর না পাওয়া গেলে অনেক দূরে চলে গেছে জিনিসপত্র এবং শেষাবধি কয়েকটি বাড়ির গোলক ধাঁধার মধ্যে নিয়ে গিয়ে বাটি চালা শেষ করেন।
এভাবে কত রকমের চালাচালি, পড়াপড়ি ক'রে আমাদের গ্রাম-গঞ্জের ওঝা, গুণীন, গণক ও কবিরাজরা মানুষ ঠকাচ্ছে! প্রতারণা করে পয়সা কামাচ্ছে সহজ-সরল, অশিক্ষিত মানুষদের ভাঁওতা দিয়ে। চাল পড়া তেমনি এক প্রতারণা। ওঝা ডেকে এনে চাল ভেজে সন্দেহজনক মানুষদের খাওয়ানো হয়। ভাজা চাল খাওয়াবার আগে তাতে ফু-ফা দিয়ে দেয়া হয়। চোর বা অপরাধী যদি চাল খায় তাহলে তার মুখের চেহারাই যাবে বদলে। ধরা পড়ার আতঙ্কে সে তখন তটস্থ। ওঝা ওই আতঙ্কিত মুখ দেখে গৃহকর্তার কানে কানে চোরের সন্ধান বলে দেন।
মূলকথা হল শিক্ষা। সুশিক্ষা তথা ওহীর (কুরআন ও সহীহ হাদীস) আলোয় আলোকিত না হলে মানুষ তো কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের অন্ধকারেই নিমজ্জিত থাকবে। ওঝারাও আঁধারের পথ বেয়ে ঠকিয়ে যাবে চিরঠকা মানুষদের।

📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 মানুষের নখদর্পণ, মিশেই হয় চোর কর্ডন

📄 মানুষের নখদর্পণ, মিশেই হয় চোর কর্ডন


খোয়া যাওয়া কোন জিনিসের সন্ধান করতে বিশেষভাবে কার্যকর একটি পদ্ধতির প্রচলন রয়েছে। গ্রামে-গঞ্জে, এমনকি অনেক শহরে প্রচলিত এ পদ্ধতির নাম নখদর্পণ। দুটি শব্দের মিলিত এ শব্দখানি। নখ এবং দর্পণ। নখ হল হাতের আঙুলের অগ্রভাগে মসৃণ শক্ত অংশ। আর দর্পণ অর্থ হল আয়না। নখে তেল লাগিয়ে চকচকে করে চোখের সামনে মেলে ধরা হয়। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলে নখে ছবি বা চলচ্চিত্রের মতো চোর বা চুরিকৃত জিনিসের ছবি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এ পদ্ধতির হোতা যারা তারা এমনই বলেন। অর্থাৎ কিনা, নখের আয়নায় চোর ধরা।
আমাদের সমাজের গরীব, নিরক্ষর, সরল মানুষের মধ্যে পুরনো ভাঁওতাপূর্ণ অনেক ভ্রান্ত পদ্ধতি চালু রয়েছে। প্রকৃত শিক্ষা ও জ্ঞানের অভাবে এগুলো মানুষের বিশ্বাসের মধ্যে বসবাস করছে। বর্তমানে শিক্ষাদীক্ষা ও সচেতনতা কিছুটা বাড়তে থাকার ফলে এগুলোর প্রতি জনসাধারণের আস্থা কমে এসেছে সত্যি। কিন্তু একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়নি। অসহায় দরিদ্র মানুষেরা আর কোন পথ না পেয়ে আশ্রয় নেন এ সকল উদ্ভট অযৌক্তিক পদ্ধতির। নখদর্পণের মতো আরও যে পদ্ধতিগুলো সচল রয়েছে, সেগুলো হচ্ছে- হাত চালান, বাটি চালান, কুলো চালান, নল চালান, চাল পড়া, আয়না পড়া ইত্যাদি বহু রকমের তুকতাক।
নখদর্পণের কলাকৌশলটা কেমন তা একটু দেখা যাক। কোন বাড়িতে হয়ত দরকারী জিনিস চুরি হয়ে গেল। গৃহকর্তা অনেক খোঁজাখুঁজি করে চুরি যাওয়া জিনিসটি উদ্ধার করতে পারলেন না। শেষে আর কোন উপায়ান্তর না দেখে তিনি ডেকে আনলেন ঝাড়ফুঁক (!) করা ওঝা/কবিরাজ/গণককে। ঘটনা শুনে গণক নখদর্পণ করার আয়োজন করলেন। বেছে নিলেন তিনি বাড়ির প্রায়-অবুঝ সাত/আট বছরের একটি বালককে। বালকের ডান হাতের বুড়ো আঙুলের নখে লাগিয়ে দিলেন সর্ষের তেল। তারপর একটানা কয়েক মিনিট বিড়বিড় করে তন্ত্রমন্ত্র উচ্চারণ করলেন। বালকটিকে তিনি একজনের নখের দিকে তাকিয়ে থাকতে বললেন। বালকটি তাকিয়ে আছে তো আছেই। চারিদিকে চুপচাপ। হয়ত মাঝেমাঝে ফিসফাস আওয়াজ। কৌতূহলী লোকের ভীড়। সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। এই তো এলো, এই যে এসেই গেল। কী এলো! না, ছবি এলো! ছবি এলো। নখে চোরের ছবি ফুটে উঠল। গণক কিন্তু ওদিকে বালকটিকে কী যেন জিজ্ঞাসা করেই চলেছে। বালকটি অস্ফুটে হ্যাঁ-না উত্তর দিচ্ছে। বালকটির ঠিক পেছনে হাঁটু গেড়ে বসে গণক মন্ত্র আওড়াচ্ছেন। কখনো থেমে প্রশ্ন করছেন বালককে। একসময় হয়ত বালকটি সায় দিয়ে জানাল যে, সে নখে ছবি দেখতে পাচ্ছে। হ্যাঁ, খুব স্পষ্ট না হলেও অস্পষ্ট ছবি বা মানুষ নড়াচড়া করতে দেখতে পাচ্ছে।
বালকটি নখে দেখতে পাচ্ছে গৃহকর্তার অগোচরে চোর ব্যাটা ঘরে ঢুকে তাকের ওপর থেকে টাকা-পয়সা ও গয়নাগাটি যা ছিল সব নিয়ে কোঁচড়ে পুরে সটকে পড়ল। সে আরও জানাল যে, চোর হিসেবে যাকে সন্দেহ করা হয়েছিল, সে লোকটিকেই সে জিনিসপত্র চুরি করতে দেখল। লোকটি চুরির সময় যেভাবে, যে ভঙ্গিতে চুরি হয়েছিল, ঠিক ঠিক সে অবস্থায়ই তাকে নখে চলমান দেখতে পেয়েছে। চোরের চেহারা, গায়ের রং, পরনের কাপড়, লুকিয়ে ঘরে ঢোকা, জিনিস নিয়ে কোঁচরবন্দি করা এবং সকলের অজান্তে কেটে পড়া। এত সবকিছু বালকটি তেল চকচকে নখের পর্দায় সিনেমার মতো কয়েক মুহূর্তের মধ্যে দেখে নিয়েছে।
আসলে ব্যাপারটি কী? পুরো ঘটনাটাই আসলে ধাপ্পা। কী রকম ধাপ্পা বলি তাহলে।
ওঝা/কবিরাজ/গণক ব্যাটা নখদর্পণ করতে এসে চুরির বিষয়টি শুনে জিজ্ঞেস করে, গৃহকর্তা কাউকে চোর হিসেবে সন্দেহ করেন কিনা! কর্তা হ্যা-সূচক উত্তর দিয়ে তার সন্দেহভাজন লোকের কথা বলেন। এর কথা বালকটিও শুনে ফেলে। নখদর্পণ প্রক্রিয়া শুরুর আগে বালককে আবারো তার কথা মনে করিয়ে দেয়া হয় কানের কাছে মুখ নিয়ে, ফিসফিস করে। তারপর বারবার সেই লোকের কথাই জিজ্ঞাসা করতে থাকে। এতে বালকটির মনে নখদর্পণের অন্ধবিশ্বাসের ভিত তৈরি হয়ে যায়। যেহেতু সে এ সম্পর্কে ইতো পূর্বেই শুনে এসেছে এবং শুনছে বারবার। এর সাথে যোগ হয়েছে ওঝা/কবিরাজ/গণকের সম্মোহনী শক্তি। দুই-এ মিলেই বালকটির মনে মতিভ্রমের সৃষ্টি হয়। বাস্তব জ্ঞান ও সত্যাসত্য নির্ণয়ের ক্ষমতা রহিত হয়ে যায় তার। অবস্থাটি তার হয় আত্মসম্মোহিত। একমনে একদৃষ্টিতে থাকলে এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক। অপ্রাপ্তবয়স্ক বালকের কচিমন খুব তাড়াতাড়ি আত্মসম্মোহিত হয়। দিব্যজ্ঞান রহিত- এ অবস্থায় ওঝা/কবিরাজ/গণক পুরুষটি বালককে প্রভাবিত ক'রে যা চাইবে, যা দেখাবে বা যা বলাবে নির্বোধ বালকটি তাই দেখবে এবং গড়গড় করে বলবে। এ কারণে সে সন্দেহের লোককে চুরি করতে ও নিরাপদে পালাতে দেখে।
অনেক সময়ই এমন হয় যে, সন্দেহভাজন লোকটিই আসলে চোর। বালকের মুখে তার নাম উচ্চারিত হলে আসন্ন শাস্তির ভয়ে লোকটি জড়োসড়ো হয়ে যায়। তারপর সকলে তাকে ঘিরে ধরলে বা দু'চার ঘা মারধোরে সে সব কথা স্বীকার করে। অতি শীঘ্রই সে বের করে দেয় চোরাই মালামাল। এরপর নখদর্পণ ও ওঝা/কবিরাজ/পীর/গণকের কেরামতি বেড়ে যায় কয়েকগুণ। কিছুমাত্রও যাদের এ পদ্ধতিতে সংশয় থাকে তাদের আস্থা দৃঢ় হয়। নখদর্পণের জন্য কিন্তু যে কাউকে নির্বাচন করা হয় না। বাড়ির বাচ্চা ছেলেমেয়ে অথবা মহিলাদের বেছে নেয়া হয় এ জন্য। এর কারণ হল, বাচ্চা ও মহিলারা মানসিকভাবে দুর্বল, অনেকটা অপরিণত এবং বেশ কল্পনাপ্রবণ। এদের মনের ওপর প্রভাব বিস্তার করা সহজতর। বাচ্চাদের তো সমাধান বের করে সবাইকে তাক লাগিয়ে হিরো হবার বাসনা সুপ্তভাবে থাকেই। এ ব্যাপারগুলোকে কাজে লাগিয়ে নখের আয়নায় চোর ধরার প্রক্রিয়া চলে। তা ছাড়া, তেল চর্চিত নখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকলে নিজের, গণকের এবং আশেপাশের কৌতূহলী মানুষের মুখ দেখা যাবে। কাছেপিঠের জিনিসপত্র, বাড়িঘর এবং গাছপালার ছবিও ফুটে ওঠে। অনেক সময় সামনে ধরে নখের দিকে তাকিয়ে থাকলে স্বাভাবিকভাবে দৃষ্টিবিভ্রম শুরু হয়। ফলে, এ মুখগুলোকেই চোর বা দৃশ্যগুলোকে চুরি যাওয়া বাড়ির পরিবেশ বলে সে মনে করতে থাকে।
এ ব্যাপারগুলোকেই কাজে লাগিয়ে নখদর্পণের স্রেফ ভাঁওতাপূর্ণ প্রক্রিয়াটি চালু রয়েছে আমাদের সমাজ জীবনে। অন্য অনেক কুসংস্কার বা অন্ধবিশ্বাসের মতো শিক্বী যাদুমন্ত্র কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষের মাঝে সচল রয়েছে। দু'-একটি ক্ষেত্রে আকস্মিক সাফল্যের সুবাদে এর হোতারা মানুষকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে। নির্দোষ লোককে দোষী প্রতিপন্ন করার ফলে অনেক সময় সামাজিক সম্পর্কে ফাটল ধরে, বিবাদ-বিসম্বাত সৃষ্টি করে। শিরক-কুফরযুক্ত এবং বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ও যুক্তিহীন নখদর্পণ প্রক্রিয়াটি নিতান্তই একটা কুসংস্কার বৈ কিছু নয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00