📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 চিকিৎসার ভাষায় তারা, যারা করে তারা শয়তানের চেলা

📄 চিকিৎসার ভাষায় তারা, যারা করে তারা শয়তানের চেলা


শরীরে বাত ও অন্যান্য ব্যাথা-বেদনার জন্য অনেককে হাতে তামার বালা পরতে দেখা যায়। তামার বালায় যেকোন ব্যাথা সারে, এমন বিশ্বাস চালু রয়েছে আমাদের সমাজে। তাই ব্যাথায় কাতর রোগী ওষুধপত্র না খেয়ে হাতে বালা পরেন। যারা এটা বিক্রি করেন, তারা রোগীকে পুরোপুরি নিশ্চয়তা দিয়ে বালা ধরিয়ে দেন। তামার বালা যারা বিক্রি করেন তারা বলেন, 'উচ্চ বিদ্যুৎ প্রবাহ দিয়ে বালা তৈরি করা হয়েছে। তাই এ উচ্চ বিদ্যুৎ প্রবাহের বালা হাতে পরলে তা শরীরের ছোঁয়াতে যে ক্রিয়া করে তাতে বাত সেরে যায়।' আরও বলা হয়, 'ধাতু হিসেবে তামার কিছু নিজস্ব গুণাগুণ আছে। তামার এ নিজস্ব গুণও বাত সারাতে কাজে লাগে।' এখন কথা হচ্ছে, তামার তারে খুব তাড়াতাড়ি বিদ্যুৎ চলাচল করে সেটা সত্যি। কিন্তু তারটি থেকে বিদ্যুৎ প্রবাহ সরিয়ে নেয়ার পর কি এতে বিদ্যুৎ থাকে? নিশ্চয়ই থাকে না। তারে উচ্চ বা নিচ যেমন বিদ্যুতের প্রবাহই দেয়া হোক, পরে তো আর তাতে বিদ্যুতের ছিটেফোটাও থাকে না। এ অবস্থায় তারটি শরীরের মধ্যে কী কাজ করবে! তামার যে গুণ আছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু বাত-বেদনার ব্যাপারে তামার সেই গুণটি কাজে লাগে কিনা তাও কেউ হলফ করে বলতে পারেননি। অর্থাৎ বাত-ব্যাথা বিরোধী গুণ তামার মধ্যে আছে কিনা তা নিশ্চিত করে কেউ জানে না।
তারপরেও একটি প্রশ্ন থাকে। রোগীর শরীরে কী পরিমাণ বাত, ব্যাথা কতটা বেশি বা কম এবং সে অনুসারে কি পরিমাণ তামা দরকার, সেটা কি ঠিক করা হয়! এক এক রকম বাতে এক এক রকম তামা দরকার। সব বাতে নিশ্চয়ই একই বালা ব্যবহার করলে চলবে না। অথচ তামার বালা যারা বিক্রি করেন তাদের সবগুলো বালা একই ওজনের এবং একই মাপের। কোন হেরফের নাই একটির থেকে আরেকটির।
সুতরাং এ থেকে বোঝা যায়, বাত-ব্যাথায় তামার বালা ব্যবহারের কোন মানে নেই। বালায় বাত রোগী সারবেই এমন কথার অর্থ মানুষকে ঠকানো। অনেকদিন ধরে চলে আসা একটা অন্ধবিশ্বাস থেকে তামার বালা ব্যবহার হচ্ছে। মানুষ বাত ব্যাথা-বেদনার যন্ত্রণা সইতে না পেরে অন্ধবিশ্বাসে বালা গ্রহণ করছে। আর এর সাথে বালাওয়ালারা অবৈধ রুজি কামিয়ে নিচ্ছে এবং এ উভয়পক্ষই জাহান্নামে তাদের শক্ত অবস্থান গড়ে নিচ্ছে, এই আর কি।

📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 অষ্ট ধাতুর আংটি-টুইট, ভণ্ডতাবাজীর জাদুকরি

📄 অষ্ট ধাতুর আংটি-টুইট, ভণ্ডতাবাজীর জাদুকরি


গ্রামের হাট-ঘাট-বাজার কিংবা রাজধানী ঢাকাসহ কোন কোন শহরের ফুটপাত অথবা রেল, লঞ্চ বা বাসে এক ধরনের ফেরিওয়ালা দেখা যায়। বগলে ব্যাগ একখানা। ব্যাগ থেকে হঠাৎ বের করে ধরে পোড়া লাল রঙের চওড়া চুড়ি। আঙুলের আংটিও কখনো সখনো। চুড়ি ও আংটি দুইই ধাতুর তৈরি। চওড়া চুড়ি বা বালা তৈরি হয় একটি ধাতু দিয়ে। নাম তার তামা। তবে আংটির মধ্যে রয়েছে অষ্টধাতু। অর্থাৎ আট রকম ভিন্ন ভিন্ন ধাতু দিয়ে গড়া ওই আংটি। বালা এবং আংটি ফেরি করে বিক্রি করা হয় পথ-ঘাটে। সরাসরি মুখে মুখে বা টেপরেকর্ডারের মাধ্যমে বলা হয়, 'অষ্টধাতুর আংটিতে এ রোগ, সে রোগ সারবে। অনেক রোগ-বালাই দূর হবে চিরতরে। বাসা বাঁধবে না সেগুলো শরীরে আর কখনো। যেকোন রোগ সারানোর উদ্দেশ্যে [নিয়তে] ব্যবহার করা যাবে এ বালা।' আট-আটটি ধাতুর মিশ্রণ! কম তো নয়!
ফেরি করে. যে বালাটা বিক্রি হয়, বলা হয় তা তামার বালা। তামার বালায়ও এটা সেটা নানা রোগ দূর হয়। হাতে পরে নিলে ওই বালা, আর রোগ ঢুকবে না কখনো শরীরে। বিশেষ কয়েকটি রোগ। এমনই বলা হয়। আমাদের শরীরের জটিল কয়েকটি রোগব্যাধি সারাবার দাওয়াই হিসেবে বালা বা আংটি বিক্রি করা হয়। অনেকের ধারণা ধাতু আমাদের শরীরে নানা রোগের উপকার করে। তাই তারা ধাতব আংটি বা চেইন ব্যবহার করে। অনেকে বাত রোগ থেকে রেহাই পাবার জন্য তামার আংটি ব্যবহার করে থাকেন। আবার এগুলো বিক্রির সময় এমনও বলা হয় যে, এক সপ্তাহ, পনর দিন, একুশ দিন, এক মাসের মধ্যে ফল পাওয়া যাবে। উপকার হবেই। বিফলে মূল্য ফেরত। সুতরাং লোকসান নেই।
অষ্টধাতুর ব্যাপারটি একটু খতিয়ে দেখা যাক।
আটটি ধাতু একত্র করে মিশিয়ে যে নতুন একটি ধাতু বানানো হয় তা-ই হল অষ্টধাতু। ধাতু আটটি হচ্ছে- তামা, সোনা, লোহা, রূপা, দস্তা, সীসা, পারদ ও পিতল।
এখানে যে আটটি ধাতুর কথা বলা হল, এগুলোর সাথে রোগের বা ভাগ্যের কোন সম্পর্ক আছে কি? কোন সম্পর্কই থাকতে পারে না। দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করার জন্যও এর কিছুই করার নেই। উপরন্তু, বাস, ট্রেন, বিমান বা নৌযান দুর্ঘটনার শিকার হয়ে এ সব ধাতুর সমন্বয়ে গড়া যানের যন্ত্রাংশের আঘাতেই মানুষের প্রাণহানি ঘটে। আর অসুখ-বিসুখ! ডাক্তারের পরামর্শ মতো ওষুধ খেলেই আল্লাহর ইচ্ছাতে রোগ সারে। অন্য কিছুতে নয়। অষ্টধাতুতে তো নয়ই।
মানব শরীরের উপর এ সব ধাতুর কোন প্রভাব নেই। এটা মূলত একটা অলীক ধারণা। ধাতব পদার্থের তৈরি আংটি কখনও মানব শরীরের ভিতরে যায় না। অষ্টধাতুকে শরীর শুষে দিতে পারে না। অতএব ধাতুর দ্বারা কোন উপকার হয় না। আবার অনেকে বাণ মারার থেকে হেফাজত করার জন্য কোমরে তামার পয়সা, লোহা- সিসা প্রভৃতি ধাতু বাহুতে বা গলায় পরে থাকেন। আসলে, এ সব ধাতুর কার্যকারিতা ধোঁকাবাজী ছাড়া আর কিছুই না।

📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 অসুস্থ হলে হলে কবজ, নয় জীবনের রক্ষাকবচ

📄 অসুস্থ হলে হলে কবজ, নয় জীবনের রক্ষাকবচ


ইতিহাস পড়ুয়া ব্যক্তিমাত্রই জানে যে, ইতিহাসের একটা বড় জায়গা জুড়ে কয়েকটি চরিত্রের ভূমিকা রয়েছে খুব বেশি। এ চরিত্রগুলো হচ্ছে- ধর্মযাজক, পুরোহিত, যাদুকর, ওঝা, দরবেশ, ডাইনি, জ্যোতিষী ও পীর-ফক্বীর। এদের সকলের কর্মপদ্ধতি ও ধরন প্রায় একরকম। লোক ঠকানো, ধোঁকা দেয়া, বিচিত্র কথা বলে তাক লাগিয়ে দেয়া বা মোহাচ্ছন্ন করে ফেলা- এগুলোই হচ্ছে ইতিহাসের এ চরিত্রদের কর্মকুশলতা। এ সকল হাতিয়ার প্রয়োগ করে এরা অতীতে যেমন আয়-উপার্জন করেছে, তেমনি করছে বর্তমানেও। শহর ও গ্রামে ওঝা, দরবেশ, পীর, ফক্বীর, কবিরাজ, গণক, যাদুকর ও জ্যোতিষীরা এখন খুব জনপ্রিয়।
এক সময় ওঝা, দরবেশ, পীর, ফক্বীর, যাদুকর ও জ্যোতিষীদের সম্পর্কে মানুষের যে ভয়-ভীতি ছিল এখনো তা বহাল তবিয়তে বর্তমান রয়েছে, এতে কোন ভাটা পড়েনি আজও। পুরনো দিনে তন্ত্র-মন্ত্র, ভেলকিবাজী ও যাদুর কলাকৌশল দেখিয়ে মানুষকে প্রতারণা করা হতো। ঠকিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিত। এখন কিন্তু যাদু একটা শিল্প হিসেবে সম্মানিত মর্যাদা পেয়েছে। যাদু আর ভীতিকর কিছু নয়। বরং আনন্দদায়ক বিনোদনের অন্যতম এক মাধ্যম (!?) কেবল বিনোদনই-বা বলি কেন, শিক্ষামূলক মাধ্যমও বটে (!?) আনন্দ লাভের পাশাপাশি শেখা-জানাও যায় অনেক কিছু! যেমন, আমাদের দেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন যাদুকর জুয়েল আইচের কথাই ধরা যাক। জুয়েল আইচের মোহনীয় হাসির পাশাপাশি তাঁর যাদুগুলো কত আনন্দেরই না যোগান দেয়! আবার তার সাথে শিক্ষণীয়ও কত ব্যাপার থাকে! সুতরাং যাদু বা যাদুকরদের নাম শুনলে আগেকার মতো আঁতকে ওঠার দরকার হয় না। তবে অশিক্ষিত, কুসংস্কারাচ্ছন্ন গ্রামীণ সমাজে এখনও অনেক ভণ্ড যাদুকর রয়েছে। যারা যাদুর ভেল্কিবাজীতে শিকার খুঁজে বেড়ায়। মানুষের মন ও চোখ দুটোকে ধোঁকা দিয়ে টাকা-পয়সা আত্মসাৎ করে। হয়ত দেখা গেল, একজন তাবিজ বা কবচ বিক্রি করছে। সে এমন সব কাণ্ড ক'রে তার তাবিজের মাহাত্ম্য দেখিয়ে দিল যে, সাধারণ অশিক্ষিত মানুষের তাতে বশীভূত না হয়ে বা ঠকে উপায় থাকে না।
এ বিষয়ে একটা গল্প বলে নিই। একবার আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে এক সাধু বাবাজীর আবির্ভাব ঘটেছিল। তিনি নাকি অনেক আশ্চর্য কাণ্ডের সঙ্গে এক আশ্চর্য কবচও বিক্রি করছিলেন। সারা ভারত জুড়ে তার নামধাম ছড়িয়ে পড়েছে। কলকাতার একজন সাংবাদিক এটা জানতে পেরে এ বিষয়ে বেশ কৌতূহলী হয়ে তিনি আন্দামান গিয়ে পৌঁছান। নাজমুল নামে এই সাংবাদিক ভদ্রলোক নির্ধারিত স্থানে গিয়ে দেখেন প্রচণ্ড ভীড়। উপচেপড়া ভীড়। ভীড় ঠেলে অবশেষে তিনি সাধু বাবাজীর কাছাকাছি পৌঁছলেন। সেখানে দেখতে পেলেন, সাধু আগ্রহী মানুষের হাতে একটি করে কবচ ধরিয়ে দিচ্ছেন। কিছু সময় পর কবচগুলো এত গরম হয়ে উঠছিল যে, তা আর হাতে ধরে রাখা যাচ্ছে না। সবাই কবচ মাটিতে ফেলে দিচ্ছিল। গরম হওয়াটাই নাকি কবচের তেজের প্রমাণ। সাধু তাই জানালেন। এর কিছু সময় পর কবচ থেকে 'বিভূতি' বা 'পবিত্র ছাই' (!?) বেরোতে লাগল। আর অমনি সেই বিভূতি নেবার জন্য মানুষের হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। এ ছাই তো জবরদস্ত ছাই না হয়েই পারে না।
ইসলামের বিশুদ্ধ আক্বীদা, কুরআন, হাদীস ও বিজ্ঞান সম্পর্কে ধারণা রাখা নাজমুল সাহেবও প্রথমে কবচের গরম হওয়া দেখে ভড়কে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার চমক কেটে যায় সেই বিভূতি দেখে। কারণ, এ বিভূতিটা তার পূর্ব পরিচিত। অ্যালুমিনিয়াম বা অ্যালুমিনিয়াম মেশানো যেকোন ধাতু মারকিউরাস ক্লোরাইডের সংস্পর্শে এলে প্রথমে খুব গরম হয় এবং পুড়ে হয় ছাই। ঠিক এখানেই সাধুর ভেল্কিবাজী। সাধু বাবাজী অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি কবচ মানুষের হাতে তুলে দেবার আগে মারকিউরাস ক্লোরাইডে মাখিয়ে নিয়েছেন। এতে তাপ ও ছাই দুইই সৃষ্টি হয়েছে।
আর, এভাবেই অনেক ঠগ, প্রতারক বিভিন্ন আশ্চর্য কলাকৌশল দেখিয়ে মানুষকে প্রতারণা করে। পথে-ঘাটে চলতে ফিরতে এমন অনেক ঘটনাই আমাদের নজরে পড়ে। আপাতদৃষ্টিতে ঘটনাগুলো অসম্ভব বা অলৌকিক মনে হলেও আসলে সেগুলো যাদু ভিন্ন আর কিছুই নয়। মানুষের মনে সর্বদাই দুর্বল একটা কোণ থাকেই। আর সাধারণ, অসচেতন ও প্রকৃত ঈমানের স্বাদবঞ্ছিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষের তো কথাই নেই। তাদের মন সর্বদাই দুর্বল। এ মানসিক দুর্বলতার সুযোগে তথাকথিত ওঝা, দরবেশ, পীর, ফক্বীর, কবিরাজ, গণক, যাদুকর ও জ্যোতিষীরা নিজেদেরকে অলৌকিক ক্ষমতার (কারামত) অধিকারী বলে ঘোষণা করে। যা খুব চরম গর্হিত অন্যায় বলেই প্রতীয়মান হয়।

টিকাঃ
১. যে পত্রে বা কাগজে মাদুলি ইত্যাদির মন্ত্র লেখা হয় তা হচ্ছে কবজ বা কবচ। রক্ষাকবচ হচ্ছে বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ধারণীয় মন্ত্রপূত কবচ। কবচকালী হচ্ছে রোগ, মহামারী প্রভৃতি থেকে পরিত্রাণকারী হিন্দু দেবী। কবচমন্ত্র হচ্ছে যে মন্ত্র জপ করলে বিপদ স্পর্শ করে না বা বিপদ ত্রাণকারী মন্ত্র।

📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 কবচ-মাদুলি-তাবিজ, হতাশ হয় হাফিজ!

📄 কবচ-মাদুলি-তাবিজ, হতাশ হয় হাফিজ!


পাতলা ফিনফিনে কাগজ। সাদা রং। দুই বা তিন রঙ্গে লেখা। আরবী হরফ। বৃত্তাকার লেখা কোনটি। কোনটি আয়তাকার বর্গক্ষেত্রের মতো। ত্রিকোণাকার লেখাও রয়েছে। কাগজের ছোট ছোট টুকরো। সব মিলিয়ে বৈচিত্রের একটা আয়োজন আছে বৈকি! এমনই প্রকৃতির এক একটি কাগজ এক মুখবন্ধ তামার নলে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। ঢোকানোর পর অন্যমুখে মোম লাগিয়ে সেদিকটাও বন্ধ করা হয়। এবার এটা হয়ে যায় নানা ধরনের অসুখ-বিসুখ থেকে শুরু করে মানবজীবনের যত বালা-মুসীবত আছে সব আসান করে দেবার মহৌষধ।
কোথায় মেলে এ মহৌষধ? রাস্তার ফুটপাত ঘেঁষে তিনদিক এক হাত উঁচু লালসালু দিয়ে ঘেরা। সামনের দিকে দু'দিক থেকে কিছুটা কাপড় এসে থেমে গেছে। একটুখানি জায়গা একটা গেইটের মতো রেখে ঘেরাও সম্পন্ন হয়েছে। এর মাঝে একজন সফেদ পোশাক-আশাক পরা, নাদুস-নুদুস শরীরের এক বা একাধিক মানুষ। এক ধরনের গাম্ভীর্য তাদের চোখে-মুখে। মুখের অনেকটাই দাড়িতে ঢাকা বলে পুরো মুখ দেখার উপায় নেই। আগত মানুষজনদের নিকট সমস্যার বিবরণ শুনে নেন। তারপর এক মহৌষধ যা তাবিজ বা মাদুলি নামে পরিচিত তার একটা করে টুকরো হাতে ধরিয়ে দেন। এটা দেবার সময় ক্ষণকালের জন্য চোখ জোড়া মুদে বিড়বিড় করে কী উচ্চারণ ক'রে তারপর তুলে দেন হাতে। সে সঙ্গে বলে দেন, কালো সুতায় পরিয়ে মাদুলিটি কোথায়, কতদিন বেঁধে রাখতে হবে। কারো হাতে, কারো গলায়, আবার কারো কোমড়ে। গ্রহীতা তখন পরম বিশ্বাসে মাদুলিদাতার চাহিদা মিটিয়ে দিয়ে মাদুলিখানা নিয়ে নির্দেশ মতো ব্যবহার করতে শুরু করে। কেবল যে ফুটপাথ তা তো নয়। বিভিন্ন জায়গায় আমাদের পীর, হুজুর, সূফী ও দরবেশ বাবারা তাবিজ ও মাদুলি দিয়ে মানুষের মহাউপকার (!) করার আখড়া গেড়ে বসেছে। তাছাড়া, ট্রেন, বাস, স্টিমারেও মাদুলি বিক্রেতা নজরে পড়ে হরহামেশাই। প্রথমে নানাভাবে লোকজন আকর্ষণ করে গোলাকার বৃত্ত তৈরি করা হয়। এরপর মাদুলির কার্যকারিতা বয়ান করা হয় কিছুটা সময় নিয়ে। তারপর বিক্রির পালা। অবশ্য এটা বিক্রির সময় কেনাবেচা বা দাম বলতে নারাজ তারা!? স্রষ্টার নামে, স্রষ্টার কালামে সমস্যার সমাধান এবং এ জন্য দাম নয় হাদিয়া গ্রহণ করেন বলে জানান তারা।
মফিজ মিয়া এক হাটবারে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটার ফাঁকে তাবিজওয়ালার নাগালে আসে। সে দাঁড়িয়ে তার কথা শোনে ভীষণ আগ্রহ নিয়ে। শুনতে শুনতে সে উপলব্ধি করে, যেসব সমস্যার কথা বলা হচ্ছে সেগুলো তো তারও রয়েছে। যেমন তার রয়েছে দীর্ঘদিনের বাতের বেদনা। তার বউয়ের রয়েছে নারীরোগ। আর সাড়ে চার বছরের মেয়েটি প্রতিদিন বিছানা ভিজিয়ে সপসপ করে প্রস্রাব করে দেয়। এ তিন সমস্যার নাকি সমাধান দেবে মাদুলি। সুতরাং না নিয়ে উপায় কী? হাদিয়া পরিশোধ করে তিনটি মাদুলি গ্রহণ করে সে। দোকান থেকে কালো সুতা কিনে নেয় দরকার মতো। তিনজন ভিন্ন ভিন্ন তিনটি স্থানে বেঁধে রাখে। মেয়াদ পূর্ণও হয়। এক মাস। কারোরই কোন উপকারের আলামত দেখা যায় না। আরো এক মাস। এভাবে তিন মাস বেঁধে রাখার পরও কারো কিছু হল না। বরং ওদের স্বামী-স্ত্রীর রোগটা আরো বেড়েছে বলেই মনে হয়। এরপর আরো মাস খানেক রেখেও কোন ফল না পেয়ে খুলে ফেলেছে ধাতব মাদুলিগুলো সবার শরীর থেকেই। বিরক্ত ও অবিশ্বাস জন্মে গেছে ততদিন মফিজ মিয়ার।
ব্যাপারটা কিন্তু অবিশ্বাসেরই। কেন? তামার মুখ আঁটা নলের মধ্যে আরবী অক্ষরে লেখা কিছু শব্দ পুরে দেয়া হয়। এর কি কোন ওষুধী গুণ আছে? না, নেই। তাহলে রোগ নিরাময় হবে কীভাবে? একই আয়াতে শরীরের সব রোগ-শোক দূর করা যদি যেত, তাহলে কী আর এ নশ্বর পৃথিবীতে ডাক্তার, ওষুধ, হাসপাতাল- এগুলোর দরকার পড়ত! এগুলোর পেছনে যে এত এত কাড়িকাড়ি টাকা ব্যয় করা হয় সেগুলো তো তাহলে অর্থহীন বলে মনে করা যেত। অর্থহীন নয় বলেই তো স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার জন্য মানুষের এত আয়োজন, এত শ্রম, এত অর্থ বিনিয়োগ। আসলে এ সব শব্দ, কাগজ, তাবিজ, তোকমা ও মাদুলির কোন গুণ নেই। যদি কিছুটা থাকে তা ওই ধাতুটির। তামার। যা দিয়ে মাদুলি বানানো হয়েছে। কোন কোন ধাতু শরীরের সংস্পর্শে এসে শরীরে কিছু ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। তবে কোন রোগের জন্য কোন ধাতু উপকার করে এবং তার প্রয়োজনীয় পরিমাণই বা কতটুকু তা ওই মাদুলিওয়ালা কখনো নির্ণয় করেন না। তিনি একই আয়তনের মাদুলির মধ্যে একই কাগজ এবং একই শব্দ লেখা কাগজ ঠেসে দেন। সব রোগ বা সমস্যার জন্য একই মাদুলিই তুলে দেন কাঙ্ক্ষিত হাদিয়া নিয়ে।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, মাদুলিতে অসুখও সারে না, সমস্যাও দূর হয় না। সাধারণ এবং অন্ধ-অচেতন মানুষ কেন তবে মাদুলি ব্যবহার করে? এর নিশ্চয়ই কিছু কার্যকারণ আছে। মানুষ যখন অসুখ-বিসুখে কাতর হয়ে ডাক্তার-ওষুধ হাতের নাগালে পায়নি তখন একশ্রেণীর অসাধু লোক ধর্মীয় অনুভূতিকে পুঁজি করে মাদুলি ব্যবসাটা ফেঁদে বসে। এটাই চলছে যুগ যুগ ধরে। এ ছাড়া, এ ধরনের অসাধু ব্যবসায়ীরা লালসালু, পাতলা কাগজ, রঙচঙে বিভিন্ন আকার-আকৃতিতে ছাপা ইত্যাদি প্রদর্শন এবং মুখ ভঙ্গিমায় কৃত্রিম গাম্ভীর্য উপস্থাপন করে একটা ঐন্দ্রজালিক আবহ তৈরি করেন। এতে সরল-সাধারণ মানুষ তো বটেই, সেখানে চেতনাহীন আধুনিক মানুষও মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ে। এ সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে আয়-উপার্জনের পথ করে নেন মাদুলি ব্যবসায়ীরা। আমাদের আসলে কোন কিছুকে অন্ধভাবে গ্রহণও নয়, বর্জনও করা উচিত নয়। ওহীর জ্ঞান তথা কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে গ্রহণ-বর্জন করতে শেখা দরকার। সে জন্য নিজের ভেতর সত্যসন্ধানী, অনুসন্ধিৎসু মন গড়ে তুলতে হবে। সত্য খুঁজতে শিখলে অন্ধধারণা দূর করা যাবে। অকারণে মোহাবিষ্টও হতে হবে না তখন।
প্রকৃতপক্ষে, সকল প্রকার সৌভাগ্য ও দুভার্গ্যের নিয়ন্ত্রক এবং নির্ধারকও একমাত্র আল্লাহ্। তবুও যুগে যুগে মানুষের মনে এ প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে যে, কাঙ্ক্ষিত সুসময় বা অনাকাঙ্ক্ষিত মন্দসময় আসার পূর্বেই কি মানুষ তা কোন উপায় অবলম্বনের মাধ্যমে জানতে পারে? কারণ, এটা যদি সম্ভব হতো, তাহলে দুর্ভাগ্যকে এড়িয়ে সাফল্য নিশ্চিত করা যেত। অতি প্রাচীনকাল থেকেই কিছু কিছু মানুষ এ অদৃশ্য জ্ঞানের অধিকারী বলে দাবী করেছে। ফলে অজ্ঞ ব্যক্তিরা অনেক অর্থকড়ি খরচের মাধ্যমে তাদের জন্য নির্ধারিত ভাগ্যের লিখনের অদৃশ্য তথা সংঘটিতব্য বিষয়াবলী জানতে তথাকথিত ভবিষ্যদ্বক্তার পিছনে ঘুরঘুর করেছে। তাই সৌভাগ্য আনয়নে বিভিন্ন প্রকার তা'বিজ, কবজের ছড়াছড়ি অধিকাংশ সমাজে প্রায়ই দৃষ্টমান হয়। কিছু কল্পিত গোপনীয় পথ ও পদ্ধতি রয়েছে যেগুলোকে সাধারণত বিশেষ জ্ঞান বলে গণ্য করা হয়; ফলে বিভিন্ন প্রকার শুভ-অশুভ আলামত ও এগুলোর ব্যাখ্যা বিভিন্ন সভ্যতায় বিদ্যমান রয়েছে। এ সব জ্ঞানের যৎসামান্য গোপন অংশটি অবশ্য যাদুমন্ত্র ও ভাগ্যগণনার বিভিন্ন প্রকার জ্যোতিষশাস্ত্র রূপে বংশ পরস্পরায় হস্তান্তরিত হয়েছে।
মানব সমাজে এ সব চর্চা করার ব্যাপক প্রবণতা লক্ষ্য করার কারণে এ সম্পর্কে ইসলামের সুস্পষ্ট বক্তব্যকে প্রকাশ করা অতি জরুরী বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল, এ সম্পর্কে স্পষ্ট জ্ঞান না থাকলে, ঐসব চর্চার অভ্যন্তরে বিদ্যমান শিরকে যেকোন মুসলিম খুব সহজেই লিপ্ত হতে পারে। ঐ সব কথিত দাবী যা আল্লাহ্র একক গুণাবলীর (সিফাত) বিরুদ্ধে সর্বদা ক্রিয়াশীল এবং সৃষ্টির উপাসনার ('ইবাদাত) ক্ষেত্র প্রস্তুত করে কিংবা সৃষ্টির উপাসনার দিকে মানুষকে তাড়িত করে- এর সাথে ইসলামের সম্পর্ক কতটুকু তা এখানে আলোচনা করা হবে। কুরআন ও রাসূলের বিশুদ্ধ সুন্নাহর আলোকে প্রতিটি দাবী বিশ্লেষণ করা হবে এবং প্রতিটি দাবী সম্পর্কে তাঁদের জন্য নির্দেশনা আকারে ইসলামি বিধানাবলী জানানো হবে যাঁরা আন্তরিকভাবে প্রকৃত তাওহীদের বাস্তবতাকে খুঁজছেন।
শয়তান তাড়িয়ে সৌভাগ্য আনয়ন করতে কঙ্কন/বালা, চুড়ি, পুঁতির মালা, ঝিনুক ইত্যাদি কবচ হিসেবে পরার রেওয়াজ রাসূল মুহাম্মাদ -এর সমকালীন আরবের জনগণের মধ্যে প্রচলিত ছিল। এছাড়া সৌভাগ্য বহনকারী বিভিন্ন প্রকার তাবিজ ও মন্ত্রপূত কবচ পৃথিবীর প্রায় সব এলাকায় পাওয়া যেত। মূলত যাদু, মন্ত্রপূত কবচ ও তাবিজের মত সৃষ্ট বস্তুকে শয়তান দূরীকরণ ও সৌভাগ্য আনয়নকারী হিসেবে বিশ্বাস করা মানে আল্লাহ্র উপর সত্যিকারের বিশ্বাসের বিরোধিতা করা। শেষ নাবী মুহাম্মাদ -এর সময়ে বিদ্যমান এ সকল বিশ্বাসের বিরোধিতায় ইসলাম এ কারণে সদা সক্রিয় ছিল যাতে এমন একটা শক্ত ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব হয় যাতে যখনই বা যেখানেই অনুরূপ বিশ্বাসের আত্মপ্রকাশ লাভ করুক না কেন তৎক্ষণাৎই যেন তা বাতিল ও নিষিদ্ধ করা যায়। এ ধরনের বিশ্বাস মূলত মূর্তিপূজকদের সমাজে পৌত্তলিকতার ভিত্তি দৃঢ়তর করে তোলে এবং যাদুমন্ত্র স্বয়ং মূর্তিপূজারই একটি অংশ ব্যতীত আর কিছুই নয়। এ সকল বিশ্বাসের সাথে খ্রিস্টানদের ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের বিশ্বাসের একটি যোগসূত্র লক্ষ্য করা যায়; কারণ নাবী যিশুকে [ঈসা (আ:)] এরা শুধু প্রভুত্বের আসনেই উন্নীত করেনি, বরং তাঁর মাতা মেরিসহ (মারইয়াম) বিভিন্ন সাধুদের উপাসনা করে। অধিকন্তু তারা সৌভাগ্য আনয়নের উদ্দেশ্যে তাঁদের কল্পিত আকৃতি সম্বলিত ছবি, মূর্তি ও পদককে সংরক্ষণ এবং ব্যবহার করে।
নাবী-এর সময় নবদীক্ষিত মুসলমানগণ প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত যাদুমন্ত্রে বিশ্বাস করত যা আরবীতে তামা'ইম (একবচনে 'তামীমাহ') বলা হয়। এর ফলে, রাসূল-এর অনেক হাদীস রয়েছে যেখানে তিনি জোরালোভাবে এ ধরনের সকল চর্চাকে নিষিদ্ধ করেছেন। নিম্নে কিছু উদাহরণ পেশ করা হল:
'ইমরান ইবনে হুসাইন বর্ণনা করেন, 'একটি লোকের হাতের বাহুতে বালা দেখে রাসূল লোকটিকে বললেন, লা'নত পড়ুক তোমার উপর! এটা কী? লোকটি উত্তর দিল যে, আল-ওয়াহিনাহ নামক এক রোগ হতে রক্ষা পেতে এটি ব্যবহার করছি। তারপর রাসূল বলেন: এটাকে পরিত্যাগ কর, নিশ্চয়ই এটা শুধু তোমার অসুস্থতা বৃদ্ধি করবে। আর তুমি যদি এটা পরা অবস্থায় মারা যাও, তবে তুমি কখনই সফলকাম হবে না।'
সুতরাং পিতল, তামা ও দস্তার সংমিশ্রণে প্রস্তুত ধাতু বা লোহা বা তামার তৈরি বালা, চুড়ি ও আংটি যদি কোন অসুস্থ বা স্বাস্থ্যবান লোক পরে এই বিশ্বাসে যে, এগুলোর মাধ্যমে অসুস্থতা থেকে রক্ষা পাওয়া যায় বা রোগের উপশম হয়, তাহলে এটা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কারণ, এ বিষয়টি 'হারাম (নিষিদ্ধ) দ্রব্যের দ্বারা চিকিৎসা নিষিদ্ধ' নামক বিধানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়; এ ব্যাপারে রাসূল বলেন, 'তোমরা একে অপরের অসুস্থতার চিকিৎসা কর, তবে নিষিদ্ধ দ্রব্য দ্বারা চিকিৎসা করো না।'
আবু ওয়াকিদ আল-লাইছি বর্ণনা করেন, "আল্লাহর রাসূল যখন হুনাইয়ানের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে 'যা-তু আনওয়াত নামক এক বৃক্ষ অতিক্রম করলেন। সৌভাগ্য লাভের আশায় এ গাছের ডালে ডালে মূর্তিপূজারীরা তাদের অস্ত্রশস্ত্র ঝুলিয়ে রাখত। ইসলামে নবদীক্ষিত কয়েকজন সাহাবী রাসূল-কে ঐ বৃক্ষটির মতো অন্য একটা বৃক্ষকে তাদের জন্য নির্দিষ্ট করে দিতে বলল। রাসূল বললেন, সুবহানাল্লাহ! এ বিষয়টি তো ঠিক সেই রকম যা মূসা (আ:)-কে লোকজন বলেছিল:
'...আমাদের জন্যও 'কোন দেবতা বানিয়ে দাও যেমন তাদের দেবতা আছে...।' [সূরা আল-আ'রাফ (৭): ১৩৮]
যাঁর হাতে আমার এ প্রাণ তাঁর শপথ করে বলছি, তোমরা সবাই তোমাদের পূর্ববর্তীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে।"
এ হাদীছে রাসূল শুধু সৌভাগ্যের আলামত ও বস্তুগুলোর ধারণাকেই নাকচ করেন নি; বরং ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে মুসলিমরা খ্রিস্টান ও ইহুদীদেরকে অনুকরণ করবে। যিক্র করার জন্য মুসলিমদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত তথাকথিত তসবীহ নামক গুটিকার মালা মূলত ক্যথলিক খ্রিস্টানদের জপমালার অনুকরণ, বড়দিনের অনুকরণে মিলাদ (রাসূলের জন্মদিন পালন) এবং পীর, বুযুর্গ, দরবেশ, ওলী বা আওলিয়াদেরকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিশ্বাস করার সাথে খ্রিস্টানদের যাজক, পাদ্রী ও ধর্মীয় পণ্ডিত এবং মক্কার তৎকালীন মুশরিকদের মূর্তিকে মধ্যস্থতাকারী বলে গ্রহণ করার মধ্যে কোনই পার্থক্য নেই। রাসূলের ভবিষ্যদ্বাণী ইতোমধ্যেই সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে!
যারা মন্ত্রপূত কবচ ব্যবহার করে তাদের উপর আল্লাহর অভিসম্পাত বর্ষিত হওয়ার কথা বলে রাসূল তা'বিজ ও কবচ ব্যবহারের ভয়াবহতা সম্পর্কে আমাদেরকে আরো জোরালোভাবে সতর্ক করেছেন। 'উকুবাহ ইবনে 'আমির বর্ণনা করেন যে একদা রাসূল বলেন, 'আল্লাহ্ তা'আলা যেন তাকে ব্যর্থতা ও অস্থিরতার মধ্যে অনুপ্রবেশ করান, যে নিজে মন্ত্রপূত তা'বিজ-কবচ পরে ও অন্যকে পরায়।'
সাহাবীগণ যাদুমন্ত্র ও তা'বিজ-কবচ সম্পর্কে রাসূলের বিধান কঠোরভাবে অনুসরণ করেছেন। ফলে এমন অনেক ঘটনা হাদীস ও ইসলামী ইতিহাসের বিভিন্ন গ্রন্থে লিখিত রয়েছে যার মাধ্যমে এ কথা দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, সাহাবীরা তাঁদের সমাজের পাশাপাশি নিজেদের পরিবারের মধ্যে যখনই এ ধরনের কোন কিছুর চর্চা করার প্রবণতা লক্ষ্য করেছেন তখনই তাঁরা এ ব্যাপারে সরাসরি বিরোধিতা করেছেন। 'উরাহ বর্ণনা করেন যে, সাহাবী হুযাইফা একটি অসুস্থ লোককে দেখতে গিয়ে ঐ লোকটির বাহুতে একটি রশি দেখতে পান। তিনি রশিটি কেটে দেন বা টেনে ছিঁড়ে ফেলে এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন:
'অধিকাংশ মানুষ আল্লাহতে বিশ্বাস করে, কিন্তু সাথে সাথে শিকও করে।' [সূরা ইউসুফ (১২) : ১০৬]
অন্য সময়, তিনি অসুস্থ লোকটির বাহুতে একটি খিয়াত নামক বালার সন্ধান পেয়ে সে সম্পর্কে লোকটিকে জিজ্ঞাসা করলেন। লোকটি উত্তর দিল, বিশেষ করে আমার নিজের জন্য মন্ত্রপূত বস্তু। তৎক্ষণাৎ লোকটার বাহু থেকে সেই বস্তুটি ছিঁড়ে ফেলে হুযাইফা বললেন, তুমি যদি এটা তোমার সঙ্গে থাকাবস্থায় মারা যেতে, তাহলে আমি কখনোই তোমার জন্য জানাযা সলাত আদায় করতাম না।
তা'বীজ-কবচ সম্পর্কে ইসলামের বিধান পূর্বে উল্লেখিত রাসূল কর্তৃক মন্ত্র, তা'বিজ-কবচ, সূতা, তাগা, অবৈধ ঝাড়-ফুঁক ও যাদুর নিষেধাজ্ঞা আরোপ শুধু আরব দেশেই সীমাবদ্ধ নয়। কোথাও যদি কোন বস্তুকে ঐ একই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তবে সেখানেই এ নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে। তথ্য-প্রযুক্তিগত উন্নতি ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি সত্ত্বেও সমগ্র বিশ্বের প্রায় প্রতিটি সমাজে এখনও বিভিন্ন প্রকারের জাদুমন্ত্রের ছড়াছড়ি প্রত্যক্ষ করা যায়। অনেক তা'বিজ-কবচ, সূতা, তাগা মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সাথে এমন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গেছে যে কেউ এ সম্পর্কে ভাবার অবকাশ পায় না। কিন্তু এ সব তা'বিজ-কবচের উৎস দেখিয়ে দিলে, এগুলোর মূলে শিরকের শক্ত অবস্থান দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।

টিকাঃ
১. আভিধানিক অর্থে অসুস্থতা। সম্ভবত গেঁটে বাতকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে।
২. আহমাদ, ইবনে মাজাহ ও ইবনে হিব্বান কর্তৃক সংগৃহীত।
৩. আবু দাউদ কর্তৃক সংগৃহীত, সুনান আবি দাউদ, খণ্ড ৩, পৃ. ১০৮৭।
৪. আভিধানিক অর্থে, 'এমন ধরণের বস্তু যার উপর কিছু ঝুলছে'।
৫. এর অর্থ 'আল্লাহ্ তা'আলা মহা পবিত্র'।
৬. তিরমিযি, নাসাঈ ও আহমাদ কর্তৃক সংগৃহীত। শায়খ আল-আলবানী এ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন; সহীহ সুনান তিরমিযি, (বৈরুত: আল-মাকতাব আল-ইসলামি, ১ম সংস্করণ, ১৯৮৮), খণ্ড ২, পৃ. ২৩৫, হাদীস নং ১৭৭১।
৭. বস্তুত কারো জন্ম বা মৃত্যুদিন পালন করার বিষয়টি আরবের মানুষের কাছে একেবারেই অজ্ঞাত ছিল। জন্মদিন পালন মূলত অমুসলিম সংস্কৃতির অংশ। প্রথম যুগের মুসলিমগণ তা জানতেন না। পারস্যের মাজুস (অগ্নি উপাসক) ও বাইযান্টাইন খ্রিস্টানদের ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল জন্মদিন, মৃত্যুদিন ইত্যাদি পালন করা। তবে প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দীতে পারস্য, সিরিয়া, মিসর ও এশিয়া মাইনরের যে সকল মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আসেন তাঁরা নিজেদের দেশজ বা পূর্বধর্মের রীতিনীতি ত্যাগ করে জীবনের সকল ক্ষেত্রে সাহাবীদের অনুসরণ-অনুকরণ করতেন এবং তাঁদের মুসলিম সাম্রাজ্যে অনারব, পারসিক ও তুর্কী মুসলিমদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে মুসলিম সাম্রাজ্যে বিভিন্ন নতুন নতুন সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতির প্রচলন ঘটে, যার মধ্যে পবিত্র! ঈদে মিলাদুন্নবী অন্যতম। (বিস্তারিত দেখুন: এহইয়াউস সুনান, পৃ. ৫২৩)
৮. আহমাদ ও আল-হাকীম কর্তৃক সংগৃহীত।
৯. আহমাদ ও আল-হাকীম কর্তৃক সংগৃহীত। ইবনু কাসীর, তাফসীর, ২/৪৯৫।
১০. ইবনে আবী হাতীম কর্তৃক সংগৃহীত। আরো বিস্তারিত জানতে দেখুন, এ বইয়ের ৫৫ পৃষ্ঠা।
১১. তা'বীজ-কবচ সম্পর্কে ইসলামের বিধান সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন, ড. মুয্যাম্মিল আলী কর্তৃক রচিত, শির্ক কী ও কেন, পৃষ্ঠা ৩৪৩-৩৪৮।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00