📄 শনির দশা, ধোঁকা খাসা
আমাদের সমাজে শনি বলে একটি শব্দ বেশ প্রচলিত। শব্দটির ব্যবহার হয় এভাবে- শনির দশা, শনির দৃষ্টি, শনির শুভ দৃষ্টি, শনির অশুভ দৃষ্টি, শনির ভর ইত্যাদি। আবার যারা জ্যোতিষী, হাতের রেখা দেখে ভাগ্য গণনা করেন অথবা রাশিফল বলে দেন; তারা বলেন, 'শনির প্রভাব, শনির কুদৃষ্টি ও শনির বলয়।' দিনকাল খারাপ যাচ্ছে- শনির আছর। অসুখ-বিসুখ লেগে আছে, শনির নজর পড়েছে। আয়- উন্নতি হচ্ছে না- শনি ভর করেছে। অর্থাৎ শনি যত নষ্টের মূল। খারাপ, অনিষ্ট ও অকল্যাণের প্রতীক হল এ শনি। শনির নজরে পড়লে আর কারো রক্ষা নেই; ক্ষতি মেনে নিতেই হবে। সমাজের বেশিরভাগ মানুষের ধারণা এ রকমই। আর এটা চলে আসছে যুগ যুগ ধরে।
সকল অনিষ্টের হোতা এ শনিটি আসলে কী কিংবা শনি সম্পর্কে এমন ধারণা কিভাবে গড়ে উঠল, সে সম্পর্কে আমরা একটু খোঁজ-খবর করতে পারি।
হিন্দু ধর্মের পুরনো কাহিনীতে এক দেবতার নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি হলেন শনি দেবতা। সূর্যদেবের স্ত্রী ছায়ারাণীর গর্ভে জন্ম নিয়েছিল দুই পুত্র সন্তান। এদের একজন মনু ও অন্যজন শনি। শনিদেবের স্ত্রীর নাম পার্বতী। তিনি চিত্ররথের কন্যা। শনিদেব ছিলেন অত্যন্ত দুরাচারী। সকলের ক্ষতি ও অকল্যাণ কামনা করাই ছিল তার প্রধান কাজ। চিত্ররথ একদিন দক্ষযজ্ঞের অনুষ্ঠানের মধ্যে কন্যার সামনে শনির নিন্দা করেন। এতে পার্বতী লজ্জায় ক্ষোভে মৃত্যু আলিঙ্গন করে এবং পরে পুনরায় জন্ম নেন। এবার তার জন্ম হয় হিমালয়ের স্ত্রী মেনকার গর্ভে। বিয়ে হয় মহাদেবের সাথে। বিয়ের পর অনেক সাধ্য সাধনা করে অবশেষে সন্তান হয় পার্বতীর। দেবতারা একে একে নবজাতককে দেখে আশীর্বাদ করলেন। আশীর্বাদ করলেন শনিদেবও। সকলে চোখ মেলে দেখে ধন্য ধন্য করলেও শনিদেব কিন্তু নবজাতকের দিকে দৃষ্টি দিলেন না। পার্বতী খুব রেগেমেগে এর কারণ জানতে চাইলেন। শনি বললেন, "চিত্ররথের কন্যা পার্বতী ছিল আমার স্ত্রী। আমি তার প্রতি অবিচার করেছি। নির্যাতন করেছি। একদিন তার অতি সামান্য ইচ্ছাকেও অপূর্ণ রেখেছি। এ জন্য সে আমাকে অভিশাপ দিয়ে বলে, 'তুমি একবার আমার দিকে চেয়ে দেখারও প্রয়োজন বোধ করলে না। আমার আবদার না হয় না-ই রাখলে! ঠিক আছে, এখন থেকে তুমি যার দিকে তাকাবে, তার তৎক্ষণাৎ ধ্বংস অনিবার্য।' সেই থেকে আমি মাটির দিকে চোখ রেখে মাথা নিচু করে থাকি।"
পার্বতী কিন্তু শনিদেবের এ কথা বিশ্বাস করতে পারে না। সে বলে, 'আপনার এ কথা কিছুতেই সত্য হতে পারে না। আপনি আমার সাথে ছলনা করছেন। আমার ছেলেকে দেখে আশীর্বাদ করতে চাইছেন না বলে এ কথা বলছেন। ছেলে দেখে আশীর্বাদ না করা পর্যন্ত ছাড়ছি না আপনাকে।' শনিদেব মহা ফাঁপড়ে পড়ে গেলেন। তিনি অন্য কোন উপায় না দেখে অবশেষে পার্বতীর পুত্র গণেশের দিকে দৃষ্টি দিলেন। আর যায় কোথা! সঙ্গে সঙ্গে ঘটে গেল ঘটনা। ধড় থেকে গণেশের মুণ্ডু খসে পড়ে গেল মাটিতে। নিজ পুত্রের এ অবস্থায় পার্বতী তো অগ্নিশর্মা। অগ্নিদৃষ্টিতে তিনি আরও একবার অভিশাপ দিলেন শনিকে- 'আমার সন্তানের এ অবস্থার জন্য আপনি বাকী জীবন খোঁড়া হয়ে থাকবেন।' একদিকে মন্দ দৃষ্টি এবং সে সঙ্গে খোঁড়া হয়ে পরবর্তী বছরগুলো পাড়ি দিয়েছিলেন বেচারা শনিদেব।
এ হল শনির উৎস-কাহিনী। জানা যায়, হিন্দুশাস্ত্রের এ কাহিনীর ওপর ভর করে পুরনো আমলের চতুর জ্যোতিষীরা শনি-ভীতি ছড়িয়ে দেন মনুষ্য সমাজে। সেই থেকে আরো কয়েকগুণ ভয়াল-দর্শন করে তোলা হয়েছে শনিকে, শুধুমাত্র নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য। জ্যোতিষ মানেই সমাজের পরগাছা, অলস, প্রতারক একদল চতুর মানুষ। শনিকে এরা প্রতারণার অন্যতম বাহন হিসেবে ব্যবহার করে এসেছেন। আসলে শনি মানেই অনিষ্ট- এ ভাবনা ভাবাটাই হল একটা বড় অনিষ্ট। শনির কোন দশাও নেই, দৃষ্টিও নেই। এর কোন সত্যতা নেই কিছুমাত্র। এ সব গল্প ফেঁদে সরল, ধর্মভীরু, অন্ধবিশ্বাসী, অশিক্ষিত মানুষকে বোকা বানিয়ে স্বার্থোদ্ধার করা হয় মাত্র। যুগ পরম্পরায় চলে আসা এ সকল কাল্পনিক, অসত্য কাহিনীতে মানুষ অজান্তেই বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং করছে প্রতিনিয়ত। কারণ প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে এগুলো শুনতে শুনতে প্রথমে বিশ্বাস ও পরে দৃঢ় বিশ্বাসে পরিণত হয়ে গেছে। অনেকে জ্যোতিষের কথায় গলে গিয়ে শনির দশা এড়াতে নগদ মূল্যে ক্রয় করেন নীলা (নীলকান্তমনি) পাথর। জ্যোতিষীরা বলেন, 'নীলা পাথরের আংটি পরলে শরীরের রং উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। শনির দৃষ্টি খুঁচিয়ে দিয়ে দুঃখ, অভাব, রোগ, ব্যাধি ও কষ্ট দূর করে দেয়।' এ সকল দাবীকে সত্য প্রমাণ করার জন্য জ্যোতিষীরা কোন প্রকার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হাজির করেননি। বরং বলা যায়, জ্যোতিষদের এ সব কথা একেবারে মিথ্যা, অবৈজ্ঞানিক ও প্রতারণাপূর্ণ। সুতরাং শনির দশা-দৃষ্টিও বলে যেমন কিছু নেই, তেমনি এর প্রভাব প্রতিরোধে রত্ন-পাথর ধারণ করারও কোন যুক্তি নেই। পুরো ব্যাপারটিই আসলে অসত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
এতক্ষণ তো আমরা কল্প শনির কাহিনী বললাম। এবার আসল শনির কাহিনী না বললে তো খুব অন্যায় হবে। আসল শনি হল শনিগ্রহ। অনেক অজানা, অনেক রহস্যময়তায় ঢাকা এ শনিগ্রহ। পৃথিবীর অনেক কিছুই তো অজ্ঞাত রয়েছে আমাদের। অর্থাৎ আমরা যেখানে এখনও পৌঁছাতে পারিনি, ভেতরের সত্যকে উদ্ঘাটন করতে পারিনি; সেটাই হল রহস্য। এ রহস্যগুলো নিয়ে নানা কল্পকথা তৈরি হয়। সে যাক, আমরা এখন আসল শনি অর্থাৎ শনিগ্রহ সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নিই।
সূর্য থেকে শনিগ্রহের দূরত্ব গড়ে ৮৮ হাজার ৬৭ লক্ষ মাইল। এ অকল্পনীয় দূরত্ব পেরিয়ে শনিগ্রহে সূর্যের আলো পৌঁছাতে সময় লাগে ৭৯ মিনিট। শনি সূর্যের চারদিকে প্রদক্ষিণ করে। এতে সময় লাগে প্রায় ৩০ বছর। শনির পরিমণ্ডলে নানা প্রকার গ্যাস আছে। এর মধ্যে রয়েছে- হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, মিথেন, অ্যামোনিয়া, পানি, ইথেন, অ্যাসিটিলিন, ফসফিন, কার্বন-মনোক্সাইড, হাইড্রোজেন সায়ানাইড ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড। সূর্যের আলো শনিগ্রহে পৌঁছায় সবচেয়ে কম। শনির বলয় মানুষের নিকট এক পরম বিস্ময়। গ্যালিলিও প্রথম তার দূরবীন দিয়ে শনির বলয় আবিষ্কার করেন। কিন্তু তিনি এর প্রকৃত রূপ ভালোভাবে বুঝতে সক্ষম হননি। পরে হেউগেন্স শনির বলয় আবিষ্কার করেন। এখন ৩টি মহাকাশযান পাঠিয়ে মানুষ শনিসহ অন্যান্য গ্রহ সম্পর্কে অনেক তথ্য জেনেছে। ভয়েজার ১, ২ ও ৩ নামক নভোযান এ তথ্যগুলো আমাদের অবহিত করেছে। শেষ কথা হল, শনি সম্পর্কে এত তথ্য জানতে গিয়ে মহাকাশযানগুলোকে কিন্তু একবারও শনির দশায় পতিত হতে হয়নি।
📄 জয়-জীতি ও জর্জিসের ডাইল, দূর করে না রোগ-বালা
রোগ হলে গলায় মালা পরিয়ে দেয়া হয়। সুতা ও শেকড়ের তৈরি মালা। কেবল সুতা নয়। সুতার এক বা দেড় ইঞ্চি তফাতে গাছের কয়েকটি শেকড় বা চিকন ডাল গোছা করে বাঁধা থাকে। রোগীর গলায় পরিয়ে দেবার পর মালাটি বড় হতে থাকে। বড় হতে হতে এক সময় বেশ বড় হয়। তারপর এক শুভদিনে রোগটিও সেরে যায়! এ রোগের নাম সকলের জানা। এ রোগ আমাদের কাছে খুবই পরিচিত। জণ্ডিস। আজকাল এ রোগের প্রকোপ বেশি। কেউ কেউ এটাকে 'হলদে পালং' বলে থাকে। জণ্ডিস হলে চোখ, হাত প্রভৃতি হলদে বর্ণ হয়ে যায় বলে এ নামকরণ। অনেকের ধারণা হলদে পাখি জণ্ডিস রোগীকে খাওয়ালে এ রোগের উপশম হয়। বলা হয়, পাখির হলুদ বর্ণ দেহের মধ্যে রোগের কারণে সৃষ্ট হলুদ বর্ণকে নষ্ট করে দেয়। আবার অনেকে জণ্ডিস রোগীকে হলুদ কম খেতে দেয়। কারণ তাতে নাকি হলদে পালং বেড়ে যায়। জন্ডিস নামের এ রোগ হলে চোখের কর্ণিয়া হলুদ হয়ে যায়। প্রায় সময় শরীরে একটু করে জ্বর থাকে। খাবারে রুচি থাকে না। শরীর বেশ দুর্বল হয়ে পড়ে।
জণ্ডিস রোগের উৎপত্তি কিভাবে হয় বা কেন মানবদেহের রং হলদে হয়ে যায় তার ব্যাপারে চিকিৎসা বিজ্ঞানের মত হল- বিলিরুবিন নামক একটি রঞ্জক পদার্থের কারণে শরীরে হলুদ রং দেখা দেয়। কোন কারণে বিলিরুবিনের পরিমাণ বেড়ে গেলে তা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং রোগীর দেহকে বিশেষ করে, চোখের সাদা অংশ, জিহ্বা, হাতের তালু প্রভৃতি হলুদ রঙের হয়ে যায়। তবে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যকৃত বা লিভারের গোলমাল থেকে জন্ডিস রোগের সৃষ্টি হয়। আর হেপাটাইটিস নামের এক প্রকার ভাইরাস এ গোলযোগের মূল হোতা। শরীরের যে পদার্থগুলো যকৃতের মধ্য দিয়ে অন্য অংশে যাতায়াত করে, যকৃতের গোলমালের দরুন তা পারে না। যকৃতে গিয়ে সেগুলো জমে যায়। এতেই হয় জন্ডিস। বারবার বদহজম, পেটের বিভিন্ন অসুখ, ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস এবং নানা ওষুধের প্রতিক্রিয়া- এগুলো থেকেই লিভারের ক্ষতি সাধিত হয়। আর লিভারের গোলযোগ থেকেই হয় জন্ডিস। জন্ডিস ভালো করতে হলে নিয়ম করে ৩টি কাজ করতে হয়। কোনপ্রকার পরিশ্রম না করে কেবলই বিশ্রাম নিতে হবে। প্রচুর বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। পানির সাথে গ্লুকোজ মিশিয়ে পান করলে খুব ভাল হয়। কারণ, এ রোগে শরীরে অনেক গ্লুকোজ দরকার হয়। এ ছাড়া ডাব বা আখের রস খেলেও উপকার হয়। আর ঠিক ঠিক মতো খেতে হবে পথ্য। তেল-চর্বি জাতীয় খাবার সম্পূর্ণ বাদ দিতে হবে। কড়া ঝাল বা জ্বালের খাবারও খাওয়া অনুচিত। এটুকু একটানা কয়েকদিন মেনে চলতে পারলেই আল্লাহর ইচ্ছায় জন্ডিস সেরে যায়। কারণ, এতে স্বাভাবিক নিয়মেই দেহে এন্টিবডি তৈরি হয়ে যায় এবং লিভার ফাংশনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনে। এ জন্য তেমন ওষুধ কিংবা মালা নেয়ার দরকার নেই।
কিছু ভণ্ড কবিরাজ জণ্ডিসের চিকিৎসার নামে নানা কায়দায় এ হলুদ রংটাকে ব্যবহার করছে। স্বাভাবিক বিষয়টাকেই তারা অস্বাভাবিক করে তোলে। ওঝা বা কবিরাজ মশাইরা চালাকির আশ্রয় নেয়। আমগাছের ছাল বাটা রস এ কাজে ব্যবহার করে। আমগাছের এ রস তারা রোগীর হাতে মেখে দেয়, তারপর চুনগোলা পানিতে সেই রস মাখা হাত চুবাতে বলে। মুহূর্তে চুন মেশানো পানি হলুদ হয়ে যায়। আমগাছের রস চুনগোলা পানিতে মেশালেই সেই পানি হলুদ হয়ে যায়। আবার কখনো কখনো কবিরাজ মশাই তার নিজ হাতে আমের রস মেখে নেয়। তারপর সেই হাত রোগীর গায়ে বুলিয়ে চুন মেশানো পানিতে চুবিয়ে নেয় আর তাতে পানির রং হলুদ হয়ে যায়।
এভাবে তারা রোগীকে বুঝিয়ে দেন যে, তার শরীর থেকে সকল হলুদ রং বের হয়েছে এবং সে এখন সুস্থ হয়ে গেছে। আসলে এর দ্বারা রোগের কিছুই হয় না।
আমাদের গ্রাম বা প্রায় শহর এলাকায় কারো জন্ডিস হলেই একমাত্র চিকিৎসা হিসেবে গলায় মালা পরানো হয়। অধিকাংশ কবিরাজ মালা পরানোর মাধ্যমে জণ্ডিসের চিকিৎসা করে থাকে। এটা অনেকদিন ধরেই চলে আসছে। এ ক্ষেত্রে তারা এমন কিছু গাছের ডাল ব্যবহার করে যার মধ্যখানে মূলত ফাঁকা থাকে অর্থাৎ ডালের ভিতরে সার পদার্থ থাকে না। এরই সূত্র ধরে সাধারণত বামনহাটি, আপাং ও ভৃঙ্গরাজের চিকন ডাল দিয়ে মালা বানানো হয়। এর মধ্যে বামনহাটিই বেশি ব্যবহার হয়। এ গাছগুলোর ডাল পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এতে যকৃতের রোগ কমে না। বামনহাটির শেকড়ে (ডাল নয়) জ্বর, কাশি, হাঁপানি ও গলগণ্ড রোগ সারে। জন্ডিস সারার কোন কারণ দেখা যায়নি। কবিরাজি চিকিৎসায় পিত্ত ঠাণ্ডা করে এমন গাছের পাতা বা ডালের রস খেতে বলা হয়। এর মধ্যে রয়েছে তুলসি, কাঁচা হলুদ, হরিতকি, কালোমেঘ ইত্যাদি। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, বামনহাটি, আপাং বা ভৃঙ্গরাজের ডালে জন্ডিস সারতে পারে না। আর এ ডাল তো মালায় গাঁথা অবস্থায় শরীরের বাইরে থাকে। শরীরের ভেতরে গিয়ে সরাসরি কাজ করবার সুযোগ পায় না। তাই মালা ব্যবহারে রোগ সারবে কেন?
এ সব গাছের ডাল ছোট ছোট টুকরা করে তা সুতায় বেঁধে মালা তৈরি করে রোগীর মাথায় বেঁধে দেয়া হয় এবং বলা হয় যে, গলায় পরার পর মালাটি ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে এবং রোগ শুষে নেয়। তাছাড়া, কথা থাকে যে, এ মালা মাথা থেকে যখন গলায় পড়ে যাবে তখন বুঝতে হবে যে, রোগ ভাল হয়ে গেছে। এ ব্যাপারে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, মানুষের মাথায় বা গলায় না পরিয়ে এমনি যেকোন জায়গায় রাখলেও মালাটি বড় হয়েছে। অতএব জন্ডিস রোগ সারার জন্য যে মালা দেয়া হয় তা বাড়ে আপনাতেই। মালা বড় হয় রোগের জন্য নয়, অন্য কারণে। বামনহাটি, আপাং বা ভৃঙ্গরাজের ডাল কেটে ছোট ছোট টুকরো করা হয়। কয়েকটি টুকরো একসাথে কিছু দূর দূর গিট দিয়ে বাঁধা হয়। কাঁচা ডালগুলো টান টান সুতার বেড় দিয়ে বেঁধে মালা বানানো হয়। প্রথমে কাঁচা অবস্থায় ডালগুলো গায়ে গায়ে লেগে থাকে। কিন্তু যত দিন যায়, ততোই ডালগুলো শুকোতে থাকে আর সুতার গিরাগুলো আলগা হতে থাকে। এটা তো হবেই। শুকানোর সাথে সাথে সুতার পাক ঢিল হয়ে ডালের মধ্যে ফাঁক বাড়তে থাকে। এতে মালাও লম্বা হতে থাকে। এভাবে প্রথম দেয়া মালাখানি কয়েকদিন পর দেখা যায় বেশ বড় হয়ে গেছে।
জন্ডিসের মালার এটাই হল রহস্য। মানুষ বা জন্ডিস ছাড়াই গরু, ছাগল, ভেড়া, কুকুরের গলায় বা এমনকি টেবিলে ফেলে রাখলেও মালা বাড়বেই। দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখলেও মালা বড় হতেই থাকবে। মালা বাড়ার চমকে গ্রামের সহজ-সরল মানুষ আকৃষ্ট হন অতি সহজে। এ সুযোগটাই নেয় প্রতারক কবিরাজরা। মালা দেয়া ও মালা পরানোর পর অনেক রোগী ভালও হয়ে যায়- এর কারণ কি!? কারণ হল, এ সব ভণ্ড, ধোঁকাবাজ ও প্রতারক ওঝা-কবিরাজরা মালা দেবার সময় তারা রোগীকে পূর্বোক্ত পথ্যসমূহ খেতে দেয়। যেমন- রোগীকে বলা হয়, কোন কাজকর্ম না করে বিশ্রামে থাকতে। যথাসম্ভব বেশি বেশি ডাবের পানি খেতে বলা হয়। আবার, দুয়েক দিন গোসল করতেও নিষেধ করা হয়। কয়েকদিন কাজ ও নড়াচড়া না করে বিশ্রাম নিলে তো এমনিই জন্ডিস সেরে যায়। আর এর সাথে মনের জোরও কাজ করে। মালা পরানোর পর স্বাভাবিকভাবে রোগীর মনের জোর বেড়ে যায় কয়েক গুণ। তাতেও কাজ হয়। মালা কিন্তু সত্যিকারভাবে কোনই কাজে আসে না।
জণ্ডিস রোগের চিকিৎসায় 'কলা পড়া' প্রথাও চালু রয়েছে আমাদের সমাজে। যে ওঝা বা কবিরাজ সাহেব কলা পড়া দিয়ে থাকে, তার কাছে ৭টি কলা নিয়ে যেতে হয়, তিনি ৩টি রেখে বাকি ৪টি কলা পড়ে দেয় রোগীর জন্য। আর, এ কলা পড়ায় রোগীর কোন লাভ হয় না। তবে, লাভ হয় একটি বিষয়ে, তা হচ্ছে, এ সুযোগে রোগী ও ওঝা বা কবিরাজ সাহেব এক সাথে কয়েকটি কলা পেট পুরে খেতে পারে।
জণ্ডিস রোগে আরেকটি চিকিৎসা পদ্ধতি দেখা যায় কিছু এলাকাতে। এ পদ্ধতিতে রোগীর মাথার তালু থেকে চুল সরিয়ে লতা-পাতা বাটা সেখানে লাগিয়ে দিয়ে তার ওপর পদ্ম পাতা বা অন্য কোন পাতা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। এতে রোগীর উপকার তো হয়ই না, বরং কিছু ক্ষতি ও কষ্ট বাড়ে।
অন্যদিকে হাম, বসন্ত ইত্যাদির হাত থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্য হিন্দুরা শীতলা দেবীর পূজা করে আর মুসলমানরা হিন্দুদের সাথে সেসব বিশ্বাস করে। হিন্দু সাধুরা কুলা নিয়ে বের হলে মুসলিমরা তাতে দান-খয়রাত করে এবং ঠাকুরের কাছ থেকে পানি পড়া, ডাব পড়া ইত্যাদি নেয়। হাম চিকিৎসা আরেক অদ্ভুত ব্যাপার। কোন কোন এলাকায় হাম রোগটি লতি বা লুনতি নামে পরিচিত। হয়ত এ দেশের গোটা এলাকাতেই হামের এ বন্য পরিচিতি থাকতে পারে। হাম দেখা দিলে মানুষ পানি পড়া, ডোর পড়া, নানা রকম ঝাড়-ফুঁক ইত্যাদির সাথে সাথে আরেকটি অদ্ভুত চিকিৎসা শুরু করে দেয়। তারা নানারকম পাতা যেমন- নিমপাতা, আমপাতা প্রভৃতি এবং বিভিন্ন রকম দুর্বা পানিতে ভিজিয়ে রোগীকে সেবন করায়। সোনা-রূপার অলংকার ওই পানিতে ভিজিয়ে রোগীকে সেবন করায় এবং রোগীর দেহে ওই পানির ছিঁটা দেয়। রোগীকে বেশিরভাগ সময়ে বদ্ধ ঘরে রাখা হয়। মাছ, গোস্ত ইত্যাদি জাতীয় পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার রোগীকে খেতে দেয়া হয় না। তদুপরি, পলি মাছ ধোয়া পানিতে রোগীকে সপ্তাহান্তে গোছল করানো হয়। এতে রোগমুক্তি না ঘটে রোগীর নানা বিপত্তি ঘটতে থাকে। অনেক সময় নানা রকম লতা-পাতা বেটে রোগীর শরীরে মেখে দেয়া হয়। আবার অনেক কবিরাজ রোগীকে কলা পাতায় বসিয়ে বাসী মুখে রোগীর পিঠে ঝাড়া হয়। ঝাড়া শেষে দেখা যায় কলা পাতার ওপর সরিষার দানার মতো অসংখ্য আমলকি বর্ণের বিন্দু বিন্দু দানা জমা হয়ে যায়। এ সব দানা দেখে সবাই ভাবে যে, লুতির (হাম রোগের) সমস্ত পোকা বের হয়ে গেছে। আসলে এ সব ক্রিয়াকাণ্ড পুরোটাই মস্তবড় ভাঁওতাবাজি। কারণ, সজিনা পাতার অপর পিঠে ঐ ছোট ছোট দানাগুলো থাকে আর পিঠে ঝাড়ার সময় দানাগুলো পাতা থেকে ঝড়ে পড়ে যায়।
কলেরা একটি মারাত্মক রোগ। মানুষের ধারণা ওলাউঠা বা গলাকাটাভূত এ রোগ গভীররাতে ছড়িয়ে যায়। ওলা বিবি হল সাদা বা কালো কাপড় পরা কাল্পনিক ছায়ামূর্তি। এ ওলাবিবি বা ওলাইচণ্ডী মূলত হিন্দু সমাজে পূজ্য পিসূচিকা রোগের দেবী। সাধারণ শ্রেণীর মুসলিমরা ওলাইচণ্ডীকে ওলাবিবি বলে থাকে। তারা তাকে খুব ভয় পায়, কেননা তাদের বিশ্বাস ঐ দেবীর মাধ্যমেই কলেরা (এ কালে ডায়রিয়াও) রোগ ছড়িয়ে পড়ে। কলেরার জীবাণুকে খালি চোখে দেখতে পায় না বলেই হয়ত তাদের এ ধারণা।
আর এভাবে আমরা দেখি যে, নানা রোগের নানা রকম উদ্ভট, অবৈজ্ঞানিক ও শিরক ও কুফরযুক্ত কষ্টকর চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে। কুসংস্কারাচ্ছন্ন লোকেরা এ সব করে। অধিকাংশ সময়ই রোগের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান না করে অর্থহীন চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়া হয়।
📄 চিকিৎসার ভাষায় তারা, যারা করে তারা শয়তানের চেলা
শরীরে বাত ও অন্যান্য ব্যাথা-বেদনার জন্য অনেককে হাতে তামার বালা পরতে দেখা যায়। তামার বালায় যেকোন ব্যাথা সারে, এমন বিশ্বাস চালু রয়েছে আমাদের সমাজে। তাই ব্যাথায় কাতর রোগী ওষুধপত্র না খেয়ে হাতে বালা পরেন। যারা এটা বিক্রি করেন, তারা রোগীকে পুরোপুরি নিশ্চয়তা দিয়ে বালা ধরিয়ে দেন। তামার বালা যারা বিক্রি করেন তারা বলেন, 'উচ্চ বিদ্যুৎ প্রবাহ দিয়ে বালা তৈরি করা হয়েছে। তাই এ উচ্চ বিদ্যুৎ প্রবাহের বালা হাতে পরলে তা শরীরের ছোঁয়াতে যে ক্রিয়া করে তাতে বাত সেরে যায়।' আরও বলা হয়, 'ধাতু হিসেবে তামার কিছু নিজস্ব গুণাগুণ আছে। তামার এ নিজস্ব গুণও বাত সারাতে কাজে লাগে।' এখন কথা হচ্ছে, তামার তারে খুব তাড়াতাড়ি বিদ্যুৎ চলাচল করে সেটা সত্যি। কিন্তু তারটি থেকে বিদ্যুৎ প্রবাহ সরিয়ে নেয়ার পর কি এতে বিদ্যুৎ থাকে? নিশ্চয়ই থাকে না। তারে উচ্চ বা নিচ যেমন বিদ্যুতের প্রবাহই দেয়া হোক, পরে তো আর তাতে বিদ্যুতের ছিটেফোটাও থাকে না। এ অবস্থায় তারটি শরীরের মধ্যে কী কাজ করবে! তামার যে গুণ আছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু বাত-বেদনার ব্যাপারে তামার সেই গুণটি কাজে লাগে কিনা তাও কেউ হলফ করে বলতে পারেননি। অর্থাৎ বাত-ব্যাথা বিরোধী গুণ তামার মধ্যে আছে কিনা তা নিশ্চিত করে কেউ জানে না।
তারপরেও একটি প্রশ্ন থাকে। রোগীর শরীরে কী পরিমাণ বাত, ব্যাথা কতটা বেশি বা কম এবং সে অনুসারে কি পরিমাণ তামা দরকার, সেটা কি ঠিক করা হয়! এক এক রকম বাতে এক এক রকম তামা দরকার। সব বাতে নিশ্চয়ই একই বালা ব্যবহার করলে চলবে না। অথচ তামার বালা যারা বিক্রি করেন তাদের সবগুলো বালা একই ওজনের এবং একই মাপের। কোন হেরফের নাই একটির থেকে আরেকটির।
সুতরাং এ থেকে বোঝা যায়, বাত-ব্যাথায় তামার বালা ব্যবহারের কোন মানে নেই। বালায় বাত রোগী সারবেই এমন কথার অর্থ মানুষকে ঠকানো। অনেকদিন ধরে চলে আসা একটা অন্ধবিশ্বাস থেকে তামার বালা ব্যবহার হচ্ছে। মানুষ বাত ব্যাথা-বেদনার যন্ত্রণা সইতে না পেরে অন্ধবিশ্বাসে বালা গ্রহণ করছে। আর এর সাথে বালাওয়ালারা অবৈধ রুজি কামিয়ে নিচ্ছে এবং এ উভয়পক্ষই জাহান্নামে তাদের শক্ত অবস্থান গড়ে নিচ্ছে, এই আর কি।
📄 অষ্ট ধাতুর আংটি-টুইট, ভণ্ডতাবাজীর জাদুকরি
গ্রামের হাট-ঘাট-বাজার কিংবা রাজধানী ঢাকাসহ কোন কোন শহরের ফুটপাত অথবা রেল, লঞ্চ বা বাসে এক ধরনের ফেরিওয়ালা দেখা যায়। বগলে ব্যাগ একখানা। ব্যাগ থেকে হঠাৎ বের করে ধরে পোড়া লাল রঙের চওড়া চুড়ি। আঙুলের আংটিও কখনো সখনো। চুড়ি ও আংটি দুইই ধাতুর তৈরি। চওড়া চুড়ি বা বালা তৈরি হয় একটি ধাতু দিয়ে। নাম তার তামা। তবে আংটির মধ্যে রয়েছে অষ্টধাতু। অর্থাৎ আট রকম ভিন্ন ভিন্ন ধাতু দিয়ে গড়া ওই আংটি। বালা এবং আংটি ফেরি করে বিক্রি করা হয় পথ-ঘাটে। সরাসরি মুখে মুখে বা টেপরেকর্ডারের মাধ্যমে বলা হয়, 'অষ্টধাতুর আংটিতে এ রোগ, সে রোগ সারবে। অনেক রোগ-বালাই দূর হবে চিরতরে। বাসা বাঁধবে না সেগুলো শরীরে আর কখনো। যেকোন রোগ সারানোর উদ্দেশ্যে [নিয়তে] ব্যবহার করা যাবে এ বালা।' আট-আটটি ধাতুর মিশ্রণ! কম তো নয়!
ফেরি করে. যে বালাটা বিক্রি হয়, বলা হয় তা তামার বালা। তামার বালায়ও এটা সেটা নানা রোগ দূর হয়। হাতে পরে নিলে ওই বালা, আর রোগ ঢুকবে না কখনো শরীরে। বিশেষ কয়েকটি রোগ। এমনই বলা হয়। আমাদের শরীরের জটিল কয়েকটি রোগব্যাধি সারাবার দাওয়াই হিসেবে বালা বা আংটি বিক্রি করা হয়। অনেকের ধারণা ধাতু আমাদের শরীরে নানা রোগের উপকার করে। তাই তারা ধাতব আংটি বা চেইন ব্যবহার করে। অনেকে বাত রোগ থেকে রেহাই পাবার জন্য তামার আংটি ব্যবহার করে থাকেন। আবার এগুলো বিক্রির সময় এমনও বলা হয় যে, এক সপ্তাহ, পনর দিন, একুশ দিন, এক মাসের মধ্যে ফল পাওয়া যাবে। উপকার হবেই। বিফলে মূল্য ফেরত। সুতরাং লোকসান নেই।
অষ্টধাতুর ব্যাপারটি একটু খতিয়ে দেখা যাক।
আটটি ধাতু একত্র করে মিশিয়ে যে নতুন একটি ধাতু বানানো হয় তা-ই হল অষ্টধাতু। ধাতু আটটি হচ্ছে- তামা, সোনা, লোহা, রূপা, দস্তা, সীসা, পারদ ও পিতল।
এখানে যে আটটি ধাতুর কথা বলা হল, এগুলোর সাথে রোগের বা ভাগ্যের কোন সম্পর্ক আছে কি? কোন সম্পর্কই থাকতে পারে না। দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করার জন্যও এর কিছুই করার নেই। উপরন্তু, বাস, ট্রেন, বিমান বা নৌযান দুর্ঘটনার শিকার হয়ে এ সব ধাতুর সমন্বয়ে গড়া যানের যন্ত্রাংশের আঘাতেই মানুষের প্রাণহানি ঘটে। আর অসুখ-বিসুখ! ডাক্তারের পরামর্শ মতো ওষুধ খেলেই আল্লাহর ইচ্ছাতে রোগ সারে। অন্য কিছুতে নয়। অষ্টধাতুতে তো নয়ই।
মানব শরীরের উপর এ সব ধাতুর কোন প্রভাব নেই। এটা মূলত একটা অলীক ধারণা। ধাতব পদার্থের তৈরি আংটি কখনও মানব শরীরের ভিতরে যায় না। অষ্টধাতুকে শরীর শুষে দিতে পারে না। অতএব ধাতুর দ্বারা কোন উপকার হয় না। আবার অনেকে বাণ মারার থেকে হেফাজত করার জন্য কোমরে তামার পয়সা, লোহা- সিসা প্রভৃতি ধাতু বাহুতে বা গলায় পরে থাকেন। আসলে, এ সব ধাতুর কার্যকারিতা ধোঁকাবাজী ছাড়া আর কিছুই না।