📄 হাতের রেখায় ভাগ্য, দেখতে চায় অজ্ঞ
আমাদের দু'খানি হাত দিয়ে আমরা প্রতিদিন কত রকম কাজই না করি। আমাদের হাত দু'টোর তালু মেলে ধরলে দেখা যাবে তালুতে অনেকগুলো রেখা বা টান। টানগুলো কিন্তু একেবারে সোজা নয় কোনটাই। এঁকেবেঁকে, একটার ওপর দিয়ে আরেকটা বা জড়াজড়ি করে রেখাগুলো এগিয়েছে। সবগুলো যে তালুর প্রান্ত ছুঁয়েছে তাও নয়। সামান্য কিছুটা বা মাঝামাঝি গিয়ে শেষ হয়েছে। ছোট, বড় বা মাঝারি সাইজের কত রেখা রয়েছে! কোনটা মোটা বা কোনটা সরু। এভাবে জাল ফেলে যেন অসংখ্য রেখার সমাহার ঘটেছে আমাদের হাতের তালুতে। হাতের তালুর এ রেখাকে বলা হয় হস্তরেখা।
হাতের রেখাকে দু'ভাগে ভাগ করা হয়েছে। মোটা রেখাকে বলা হয় ভাঁজ। যার মধ্যে রয়েছে কর রেখা, হৃদয় রেখা, শির রেখা ও আয়ু রেখা। ভাঁজ বাদে বাকী সব রেখাকে বলা হয় সূক্ষ্ম রেখা। এ পৃথিবীতে হাতের রেখা দেখে ভাগ্য বলে দেয়ার প্রচলন রয়েছে। রেখা দেখে ভাগ্য গোণে বা গণনা করেন যারা তাদের বলা হয় গণক বা হস্তরেখাবিদ।
উপরোক্ত দু'ধরনের রেখা তৈরি হয় একইভাবে। এগুলো মূলত দেহ গঠনিক খাঁজ ছাড়া আর কিছুই না। মায়ের গর্ভে শিশুর ভ্রুণ তৈরি হলে হাতের হাড়গুলোর সন্ধিস্থলে তালু ও আঙুলের চামড়ায় ভাঁজ থাকে। অনেকদিন এভাবে থাকাতে একসময় ভাঁজ পড়ে যায়। পরে তা স্থায়ী হয়ে যায়। শিশু মায়ের গর্ভে তার হাত দুটো মুঠো করে রাখে। ভাঁজের রেখা তৈরি হয় এতেই। হাত মুঠো করে থাকার কারণ হিসেবে আন্দাজ-অনুমান ও প্রমাণহীনভাবে অনেকে অনেক কথা বলেন। কেউ বলেন, 'আমাদের পূর্বপুরুষরা আগে থাকত গাছে, গাছের ডাল ধরার অভ্যাস থেকে মুঠো করার ব্যাপারটা এসেছে। আবার কেউ কেউ বলেন, 'মানুষ কোনকিছু আশ্রয় করে বাঁচতে চায়। গর্ভের শিশু কিছু ধরে বা ধরতে চেয়ে হাতের মুঠ ভাঁজ করে রাখে। এ ভাঁজগুলো ধীরে ধীরে দাগ বা রেখায় পরিণত হয়।'
সুতরাং হাতের রেখার সাথে আমাদের জীবনের সুখ-দুঃখ, ভালমন্দ, আয়ু কমবেশি হওয়া বা কোন ঘটনা-দুর্ঘটনা জড়িত নেই। কোন কোন আঙুল থাকা-না-থাকার ওপর কোন রেখা থাকা-না-থাকা নির্ভর করে। যেমন, জন্ম থেকে যদি বুড়ো আঙুল না থাকে তাহলে আয়ু রেখাও থাকবে না। তার মানে, যে বুড়ো আঙুল ছাড়া জন্ম নিল, সে কি একদিনও বাঁচবে না!? আর রেখাগুলো যে বাড়ে-কমে বা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় তারও কিন্তু কারণ আছে। হাতের তালুর ভেতরে যে মাংসপেশী আছে তা নড়াচড়ার ওপর রেখা বড় হওয়া বা মিশে যাওয়া নির্ভর করে। পরিশ্রমের কাজ করলে তাতে বেশি নড়াচড়া হয়। এতে রেখা তাড়াতাড়ি বাড়ে বা মিশে যায়।
একটি গল্প বলে নেই শেষে। এ গল্প থেকেও হস্তরেখার ভাগ্য গণনার অসারতা বোঝা যাবে। আমাদের এ পৃথিবীতে সংঘটিত হওয়া গল্প এটি। আগে রাজা-বাদশাহরা রাজপ্রাসাদে জ্যোতিষী রেখে দিতেন। এদের বলা হতো রাজ-জ্যোতিষী। জ্যোতিষীরা রাজা বা রাজ্যের ভূত-ভবিষ্যত আগাম বলে দিতেন। রাজা মশাই সেভাবে আগেভাগে ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন। একজন রাজার ছিল এমন একজন রাজ-জ্যোতিষী। তার গণনায় প্রায়ই ভুলভাল হতো বা ফলতো না তার কথা। একদিন রাজা বিরক্ত হয়ে জ্যোতিষীকে বললেন, বলুন তো আপনার আয়ু আর কতদিন! জ্যোতিষী উত্তর দিলেন, আরও বছর বিশেক তো বটেই। রাজা তখুনি কোতোয়ালকে ডেকে আদেশ দিলেন, জ্যোতিষীর গর্দান কাটতে। আদেশ পালনও করা হল। রাজা জ্যোতিষীর গণনা মিথ্যা প্রমাণ করলেন। আর জ্যোতিষের গণনায় যেকোনই সত্যতা নেই তা জ্যোতিষী মহাশয় নিজের জীবন দিয়েই প্রমাণ করলেন।
📄 রাশি চক্র, হাসি বক্র
দৈনিক পত্রিকার এক কলামে একটা বিষয় লেখা থাকে। লেখার শিরোনাম দেয়া থাকে আজকের দিনটি কেমন যাবে, আজকের রাশি বিচার বা রাশিচক্র ইত্যাদি। এক একটি দৈনিকে এক একটি নাম। দু'-একটা সাপ্তাহিক বা মাসিক পত্রিকায়ই এ বিষয়টি দেখা যায়। রাশিচক্রের রাশি গণনা হচ্ছে এ কলামের বিষয়বস্তু। এগুলো যারা লেখেন তারা লেখক নন। লেখেন নামকরা সব জ্যোতিষ বা জ্যোতিষ শাস্ত্রবিদরা। যাদের জ্যোতিষ শাস্ত্রের ওপর রয়েছে বড় বড় ডিগ্রী (!)। নামের সাথে ঐ ডিগ্রী, পুরস্কার ইত্যাদি সব লেখা থাকে। স্বর্ণ বা রৌপ্য পদকপ্রাপ্ত- লেখা থাকে সে কথাও। একটা পদবীও তারা লাগিয়ে নেন নিজের নামের সাথে। সে যাক। দৈনিক পত্রিকার পাঠক-পাঠিকাগণ সকালে কাগজ খুলে প্রতিদিনের খবরাখবর পড়েন। একই সাথে রাশিফলেও একবার নজর বুলিয়ে নেন। তিনি হয়ত ভাবেন, দিনের ঘটনাগুলোর কিছু যদি আগাম জেনে নেয়া যায়, সে অনুযায়ী কাজকর্ম ঠিক করা যাবে। আসলে দেখা গেছে, এমন মানুষরা হতাশাগ্রস্ত, জীবন যুদ্ধে ক্লান্ত, ভাগ্যের ওপর জীবনের হাল ছেড়ে দেয়া মানুষ।
অথবা এদের মন দুর্বল, শিক্ষাদীক্ষা কুসংস্কারে ঠাসা। এমন মানুষরাই রাশিফলে বিশ্বাস রাখেন বা ভরসা করেন। রাশিফলের কী আল্লাহ প্রেরিত ওহী কুরআন ও সহীহ হাদীস সম্মত কোন ভিত্তি আছে? অথবা এটার পিছনে কি কোন প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সত্য ও যুক্তি কার্যকর রয়েছে? গ্রহ-নক্ষত্র-চক্র কি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ওপর সত্যিসত্যিই কোন প্রভাব ফেলে? আমাদের সমাজে পুরনো একটি প্রবাদ আছে- 'বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর'। সুতরাং 'বিশ্বাস আনুন, ফল পাবেন'- এই হল জ্যোতিষীদের প্রধান পুঁজি।
আমরা কুরআন, সহীহ হাদীস, বৈজ্ঞানিক সত্যাসত্য বা যুক্তি-তর্কে বহুদূর না গিয়েও একটি সাধারণ পদ্ধতিতে রাশিচক্রের সত্যতা যাচাই করতে পারি। এ ক্ষেত্রে একটি কথা মনে রাখা দরকার। সেটা হল- বলা হয়, জ্যোতিষ শাস্ত্রের মাধ্যমে রাশিফল গণনা করা হয়। অর্থাৎ একই শাস্ত্রের দ্বারা বিভিন্ন জ্যোতিষীরা দৈনিক বা সাপ্তাহিক বা মাসিক পত্রিকায় রাশিফল গণনা করেন। কিন্তু বিভিন্ন দৈনিক বা সাপ্তাহিক মাসিক পত্রিকায় প্রকাশিত ভিন্ন ভিন্ন রাশির যে ফলাফল বলা হয় তা কি এক রকম হয় কখনো? হয় না। যাচাই করলে দেখা যাবে একটি পত্রিকার সাথে আরেকটি পত্রিকার একই রাশির ফলাফল একরকম নয়। সবগুলোই আলাদা আলাদা। যেমন, একটি পত্রিকার মেষ রাশিতে যে কথা বলা হয়েছে আরেকটি পত্রিকায় এই মেষ রাশির গণনা কিন্তু মেলে না। হয়ত একটায় বলা হয়েছে- 'আজ আপনার শরীর ও মন ভাল যাবে। হঠাৎ করে অর্থ পাবার সম্ভাবনা আছে। কর্মক্ষেত্রেও উন্নতি যোগ আছে। কোন সুসংবাদ আপনাকে আনন্দ দেবে।' অন্য এক পত্রিকায় মেষ রাশিতে লেখা হয়েছে- 'আপনি আজ দুঃশ্চিন্তায় ভুগবেন। আর্থিক দিক থেকে ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। চাকরিতে কৌশলী না হলে বিপদ হতে পারে। আচমকা কোন দুঃসংবাদে আপনি মুষড়ে পড়তে পারেন। ইত্যাদি।'
একদিন বা এক সপ্তাহের বা এক মাসের কয়েকটি পত্রিকা মিলিয়ে পরীক্ষা করলেই বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যাবে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, অধিকাংশই অমিলে ভরা। তবে ১০টির মধ্যে একটি-দু'টি হয়ত কাকতালীয়ভাবে মিলে যায়। এ পর্যন্তই। যেগুলো মিলে যায় সেগুলো সাধারণ কিছু বক্তব্য। যার বেশিরভাগই অসার, ভিত্তিহীন মন্তব্য এবং নির্দিষ্ট করে না বলা বাণী। যেমন, মানসিক দুঃশ্চিন্তা আছে। ব্যবসা-বাণিজ্য মোটামুটি চলবে। শারীরিক অবস্থা এক রকম থাকবে। অবিবাহিতদের বিবাহের সম্ভাবনা রয়েছে। চাকরিতে কৌশল অবলম্বন করুন। রাস্তা চলাচলে সতর্ক না হলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। বাকীতে ব্যবসা বিপজ্জনক হতে পারে। ভবিষ্যতের ভাবনায় চিন্তিত হবেন। শরীর-স্বাস্থ্যের প্রতি উদাসীন হলে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। সামান্য ব্যাপারে ঝগড়া এড়িয়ে চললে ভাল করবেন। দিনটি মোটামুটি ভালই যাবে। মনটিকে সারাদিন প্রফুল্ল রাখার চেষ্টা করুন। এই সব আর কি!
অনুমানে এ সকল অতি সাধারণ উপদেশ বা ভবিষ্যদ্বাণী জ্যোতিষ কেন, যে কেউই দিতে পারেন। এর জন্য পদবী-পদকধারী জ্যোতিষীর বালখিল্য বাণীর প্রয়োজন কী?
নিম্নে একই দিনের ৩টি পত্রিকায় প্রকাশিত রাশিফল দেয়া হল:
| রাশি | প্রথম আলো | ইত্তেফাক | জনকণ্ঠ |
|---|---|---|---|
| মেষ (Aries) | অংশীদারী কাজে কুশলী হোন। অধীনস্থদের ওপর নির্ভর করবেন না। কোন আত্মীয় উপকারে আসবে। | দূরত্ব বজায় রেখে বন্ধুত্ব করুন। ব্যবসায় বিনিয়োগ সুবিধা বাড়তে পারে। রোমান্স ও বিনোদন শুভ। | ঝুঁকির কাজ পরিত্যাগ করুন। সম্পত্তি বিষয়ক ও চাকরি ক্ষেত্রে শুভ ফল পাবেন। গুরুজনের ভ্রমণযোগ আছে। ব্যবসা ক্ষেত্র শুভ নয়। |
| বৃষ (Taurus) | অধীনস্থদের জন্য ঝামেলা বাড়বে। প্রিয়জন বা সন্তানের কোন বিষয় চিন্তার কারণ হতে পারে। পারিবারিক কাজে বয়স্ক কারো সহায়তা পাবেন। | পারিবারিক ঝামেলা বেড়ে যেতে পারে। সতর্ক হোন। ব্যবসায় চুক্তি সম্পাদন শুভ। যাত্রা শুভ। | গৃহ, সম্পত্তি ও ব্যক্তিগত শুভ ফল। গুরুজনের কারণে দুঃশ্চিন্তা। যোগাযোগ, চুক্তি ও প্রণয় শুভ। উপার্জন বৃদ্ধি। |
| মিথুন (Gemini) | পদস্থদের মন রক্ষা করে চলুন। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ভুল হতে পারে। দূর থেকে কোন অনুকূল তথ্য পেতে পারেন। যানবাহনে সতর্ক থাকুন। | সৃজনশীল কাজ শুভ। ব্যবসায় চুক্তি সম্পাদন শুভ। দূরের যাত্রা শুভ। | ব্যবসা যোগাযোগ শুভ। আর্থিক ও পারিবারিক কারণে দুঃশ্চিন্তা। বিদ্যাগত শুভ ফল। ভ্রমণে সাবধান। প্রণয় শুভ নয়। মেহমান আসতে পারে। |
পদস্থ প্রভাবশালীদের মন রক্ষা করে চলুন। সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হবেন না। কোন আত্মীয় মানসিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে। যানবাহনে সতর্ক থাকুন।
দূরের যাত্রা স্থগিত রাখাই ভাল। ব্যবসায় নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। যোগাযোগ শুভ।
পারিবারিক ও ব্যবসায়িক সমস্যা বাড়বে। স্বামী-স্ত্রীর শরীর ভাল যাবে না। ভ্রমণ, পরিবর্তন, গৃহ-সম্পতি ও যানবাহন বিষয়ক শুভ ফল।
যোগাযোগ ও প্রচারমূলক কাজে সহযোগিতা পাবেন। আর্থিক লেনদেন ও কেনাকাটায় সতর্ক থাকুন। অধীনস্থদের কাজে লাগানো সহজ হবে। কোন বন্ধু উপকারে আসবে।
মানসিক অস্থিরতা কাজের ক্ষতি সাধন করতে পারে। সতর্ক হোন। কেনাকাটায় লাভবান হতে পারেন। যাত্রা শুভ।
শরীরের যত্ন নিন, অংশীদারী কাজে ঝামেলা। ব্যবসায়ী বিনিয়োগে সাবধান। দাম্পত্য বিরোধ এড়িয়ে চলুন। অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তি হতে পারে। স্থান পরিবর্তন অশুভ।
ব্যস্ততা বাড়বে। যৌথ ও অংশীদারী কাজে মতবিরোধ বাড়তে পারে। যানবাহন ও যন্ত্রপাতি ব্যবহারে সতর্ক থাকুন। কোন আত্মীয় অস্থিরতার কারণ হতে পারে। দূর থেকে কোন অনুকূল তথ্য পাবেন। রোমান্স শুভ।
গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হতে পারে। ব্যবসায় চুক্তি সম্পাদন শুভ। রোমান্স ও বিনোদন শুভ।
ঝুঁকির কাজে সাবধান। অভিসারে সতর্ক থাকুন। সন্তান নিয়ে সমস্যা থাকবে। বর্ণচোরা বন্ধুদের থেকে সজাগ থাকুন। দূর থেকে শুভ ফল লাভে বাধা।
ব্যস্ততা বাড়বে। প্রয়োজনে পরিকল্পনা পরিবর্তন করুন। কোন ঘটনা আপনাকে আবেগপ্রবণ করে তুলতে পারে। কোন প্রভাবশালী বন্ধু আপনার উপকারে আসবে। অসুস্থদের স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে। রোমান্স শুভ।
পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সিন্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হতে পারেন। রোমান্স ও বিনোদন শুভ। যাত্রা শুভ।
গৃহসম্পত্তি ও জন্মস্থান বিষয়ক কাজে সফল হবেন। সন্তানের কারণে দূর্ভাবনা বাড়বে। প্রতিপক্ষ সক্রিয়। ঝুঁকির কাজ শুভ নয়। ব্যবসায়ে সুনাম বৃদ্ধি।
পুরনো কোন সমস্যা মানসিক অস্থিরতার কারণ হবে। কোন আত্মীয় আপনার উপকারে আসবে। যানবাহন ও যন্ত্রপাতি ব্যবহারে সতর্ক থাকুন। অন্যের জন্য ব্যয় বাড়বে।
বন্ধুর পরামর্শ কাজে আসতে পারে। দূরের যাত্রায় সাফল্য শুভ। যোগাযোগ শুভ।
পেশাগত যোগাযোগ শুভ। গুরুজন ও গৃহসম্পত্তি বিষয়ক দূর্ভাবনা বাড়বে। অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তিযোগ। প্রণয় শুভ। ব্যবসা মন্দা।
অধীনস্থদের ওপর কোন পারিবারিক কাজে সিদ্ধান্ত গুরুজন দ্বারা উপকৃত দায়িত্ব দিয়ে নির্ভর করবেন গ্রহণে অগ্রগতি হতে পারে। হবেন। ব্যয় বাড়বে না। কোন আত্মীয় মানসিক ব্যবসায় চুক্তি সম্পাদন শুভ। যোগাযোগ ও ভ্রমণ শুভ অস্থিরতার কারণ হতে পারে। যাত্রা শুভ। নয়। ব্যবসায় মুনাফা নতুন তথ্য সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাড়বে। ঝুঁকির কাজে সহায়ক হবে। জুয়া ও ঝুঁকিপূর্ণ সাবধান। কাজে অর্থ নাশ হতে পারে। রোমান্স শুভ।
যৌথ ও অংশীদারী কাজে কুশলী পুরনো বন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ শরীরের যত্ন নিন। হোন। পদস্থদের মন রক্ষা করে হতে পারে। ব্যবসায় চুক্তি পারিবারিক ও আর্থিক চলুন। কোন আত্মীয় আপনার সম্পাদন শুভ। রোমান্স শুভ। কাজে সঙ্কট! স্বামী-স্ত্রীর উপকারে আসতে পারে। স্বাস্থ্যের স্বাস্থ্যগত দুঃশ্চিন্তা প্রতি নজর রাখুন। অন্যের জন্য বাড়বে। ব্যবসায়ী কাজে ব্যয় বাড়বে। রোমান্স ও বিনোদন উপার্জন বাড়বে। শুভ।
যৌথ ও অংশীদারী কাজে দূর থেকে নতুন কোন শুভ ব্যবসায়ী বিনিয়োগে বয়স্ক কারো সহযোগিতা তথ্য পেতে পারেন। ব্যবসায়ে সাবধান। শরীরের যত্ন পাবেন। আর্থিক লেনদেনে ঝুঁকি নিতে হতে পারে। নিন। চাকরিজীবীদের কোন প্রকার ঝুঁকি নেবেন না। রোমান্স শুভ। দিনটি শুভ। অফিস থেকে যানবাহনে সতর্ক থাকুন। ছুটি নিতে হতে পারে। রোমান্স, বিনোদন ও সৃজনশীল কাজ শুভ।
ব্যস্ততা বাড়বে। প্রয়োজনে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী শরীরের যত্ন নিন। পরিকল্পনা পরিবর্তন করুন। সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হতে ঋণবিষয়ক দুর্ভাবনা বৃদ্ধি। বয়স্ক কেউ মানসিক অস্থিরতার পারেন। কেনাকাটা শুভ। সন্তানের কারণে শান্তি কারণ হতে পারে। পদস্থদের যোগাযোগ শুভ। বিঘ্নিত। প্রণয় শুভ। কাজে লাগানো সহজ হবে। প্রতিপক্ষীয় ঝামেলা স্বাস্থ্যের প্রতি নজর রাখুন। বাড়বে।
রাশি বলা হয় সৌরজগতের কতকগুলো গ্রহ নক্ষত্রের প্রতীককে। কল্পিত এরূপ বারটি রাশি কল্পনা করা হয়। এগুলোকে বিভিন্ন গ্রহ নক্ষত্রের প্রতীক সাব্যস্ত করা হয়েছে। জ্যোতিষশাস্ত্র (অর্থাৎ, ফলিত জ্যোতিষ বা Astrology)-এর ধারণা অনুযায়ী সব গ্রহ-নক্ষত্রের গতি, স্থিতি ও সঞ্চারের প্রভাবে ভবিষ্যৎ শুভ-অশুভ সংঘটিত হয়ে থাকে। Numerology বা সংখ্যা জ্যোতিষের ওপর ভিত্তি করে এ শুভ-অশুভ নির্ণয় তথা ভাগ্য বিচার করা হয়।
এ শাস্ত্রের সবকিছুই যে কাল্পনিক, যুক্তি বা বিজ্ঞান নির্ভর নয়, বরং দলীল প্রমাণ বিহীন; তার কিছুটা ব্যাখ্যা নিম্নে করা হল:
প্রথমত, ধরা যাক রাশির কথা। জ্যোতিষশাস্ত্র মতে, রাশি হল বারটি, যথা- মেশ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ, কন্যা, তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীন। সূর্য বার মাসে বারটা রাশিতে অবস্থান করে বিধায় রাশির সংখ্যা বারটা। আর সূর্যের যে রাশিতে অবস্থানকালে কারও জন্ম হয় তাকে সেই রাশির জাতক/জাতিকা বলা হয়। কিন্তু রাশি সূর্যের অবস্থানের প্রেক্ষিতে কেন হবে, চন্দ্র বা অন্য কোন গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থানের প্রেক্ষিতে কেন হবে না, তার কোন বৈজ্ঞানিক বা দলীল সাপেক্ষ ব্যাখ্যা নেই। রাশির এ নামগুলো পুরোটাই কাল্পনিক, এ সব রাশির যে প্রতীক সাব্যস্ত করা হয়েছে তাও কাল্পনিক। এক এক রাশির নম্বর এবং তার যে মূল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ধরে নেয়া হয়েছে তাও কাল্পনিক। এ সব সম্পর্কে কুরআন-হাদীসে কোন দলীল তো নেই-ই, কোন ল্যাবরেটরিতে বৈজ্ঞানিকভাবেও এগুলো প্রমাণিত নয়।
দ্বিতীয়ত, ধরা যাক, সংখ্যা তত্ত্বের কথা। জ্যোতিষীগণ নিউমারোলজি বা সংখ্যা তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যত শুভ-অশুভ নির্ণয় তথা ভাগ্য বিচার করে থাকেন। সংখ্যা জ্যোতিষের মূল কথা হল, ১ থেকে ৯-এই নয়টি সংখ্যাই হল মৌলিক এবং এক এক সংখ্যার এক এক ধরনের প্রভাব রয়েছে। সে অনুযায়ী প্রত্যেক মানুষ এ নয় সংখ্যার যেকোন এক সংখ্যার জাতক/জাতিকা হবে এবং যিনি যে সংখ্যার জাতক/জাতিকা হবে তার জীবনে ঐ সংখ্যার প্রভাব এবং ঐ সংখ্যার চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকবে। যেমন, বলা হয়, ১ সংখ্যার জাতক/জাতিকারা অগ্রপথিক এবং অভিযাত্রিক হবে, তাদের মধ্যে একটা সহজাত সৃজনশীলতা প্রচ্ছন্ন থাকবে ইত্যাদি। ২ সংখ্যার জাতক/জাতিকারা ভদ্র ও বিনয়ী, তারা কল্পনা প্রবণ, রোমান্টিক ও শিল্পানুরাগী হবে ইত্যাদি। এখন কথা হল, এক এক সংখ্যার যে এক এক ধরনের বৈশিষ্ট্য সাব্যস্ত করা হল, তা কাল্পনিক ছাড়া আর কি? আর মানুষের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যকে এই নয়-এর গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ করার কোন যুক্তি বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে কি শুধু কল্পনার অন্ধ অনুসরণ ছাড়া?
তৃতীয়ত, জাতক/জাতিকা নির্ধারণের পদ্ধতি প্রসঙ্গে বিশ্লেষণ করা যাক। জ্যোতিষশাস্ত্র মতে, কে কোন সংখ্যার জাতক/জাতিকা তা নির্ধারণ করা হয় তার জন্ম তারিখ (ইংরেজি তারিখ) দেখে। জন্ম তারিখ ১ থেকে ৯ পর্যন্ত যেটা হবে সেটাই হল তার জন্ম সংখ্যা। আর ৯-এর উপরের যৌগিক সংখ্যা হলে সেই যৌগিক সংখ্যাকে পারষ্পরিক যোগ দিতে দিতে যে মৌলিক সংখ্যা বের হবে সেটাই হবে তার জন্মসংখ্যা এবং সে হবে ঐ সংখ্যার জাতক/জাতিকা। যেমন, ১৮ তারিখে কারও জন্ম হলে সে হবে (১+৮=৯) ৯ সংখ্যার জাতক/জাতিকা। ২১ তারিখে জন্ম হলে সে হবে (২+১=৩) ৩ সংখ্যার জাতক/জাতিকা। ২৯ তারিখে জন্ম হলে সে হবে (২+৯=১১- ১+১=২)২ সংখ্যার জাতক/জাতিকা।
জ্যোতিষশাস্ত্র মতে, জাতক/জাতিকাদের আরও দু'ধরনের সংখ্যা আছে। তা হচ্ছে কর্ম সংখ্যা ও নাম সংখ্যা। জন্ম সংখ্যা হচ্ছে জন্ম তারিখ/তারিখের যোগফল, আর কর্ম সংখ্যা হচ্ছে জন্ম বছর, জন্ম মাস ও জন্ম তারিখ-এ সব কয়টার যোগফল। যেমন, কেউ জন্ম গ্রহণ করল ১লা নভেম্বর ১৯৪৮ সালে, তাহলে নভেম্বর যেহেতু ১১তম মাস তাই কর্মসংখ্যা বের হবে এভাবে ১+১+১+১+৯+৪+৮=২৫ আবার ২+৫=৭, অতএব ১-১১-১৯৪৮ সালে জন্মগ্রহণকারীর জন্মসংখ্যা ১ আর কর্মসংখ্যা হল ৭।
এখন, জ্যোতিষীদের ধারণা হল জন্মসংখ্যা নির্দেশ করে জাতক/জাতিকার সহজাত চরিত্র-বৈশিষ্ট্য। আর কর্মসংখ্যা থেকে জানা যায়, জাতক/জাতিকার জীবনে কোন্ কর্মপন্থা অবলম্বন করা উচিত, কোন পেশায় তার অগ্রগতি নিহিত। কোন্ পথে অগ্রসর হয়ে সে সাফল্য লাভ করতে পারবে ইত্যাদি। জন্মসংখ্যার কর্মসংখ্যাও ১ থেকে ৯ পর্যন্ত মোট ৯টি।
এখন কথা হল, জন্মসংখ্যা দ্বারা যে জাতক/জাতিকা নির্ধারণ হবে তার কি প্রমাণ? আর কর্মসংখ্যার জন্য জন্মের তারিখ, মাস ও সন সবটা যোগ করতে হবে এবং জন্মসংখ্যার জন্য শুধু জন্মের তারিখ দেখা হবে সন-মাস যোগ করা হবে না- এ সবের ভিত্তি কি? প্রকৃতপক্ষে এখানে কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি থাকা সম্ভব নয়। কারণ, এটা কোন পদার্থগত বিষয় নয়। থাকলে কোন ইলাহী দলীল থাকতে পারত, তাও অনুপস্থিত। তাহলে, কল্পনা ব্যতীত আর কি ভিত্তি রয়ে গেল? আর একটা কথা চিন্তা করা যায়। তা হল, জন্মসংখ্যা ও কর্মসংখ্যা- এ সবই বের করা হয় ইংরেজী তারিখ ও ইংরেজী সন ও মাস থেকে। ইংরেজী সন গণনা করা হয় ঈসা (আঃ)-এর জন্ম থেকে। তাহলে ঈসা (আঃ)-এর জন্মের ভিত্তিতে শুরু করা হিসাবের সাথে পুরো পৃথিবীর মানুষের জন্মসংখ্যা, কর্মসংখ্যা তথা চরিত্র ভাগ্য সবকিছুর সম্পর্ক, এরই বা কি প্রমাণ?
জ্যোতিষীদের ধারণা মতে, জন্মসংখ্যা ও কর্মসংখ্যার মতো মানুষের রয়েছে একটি নামসংখ্যা। প্রত্যেকের নামের ইংরেজি অক্ষরগুলোর মান (সংখ্যা) থেকে বের করা হয় নামসংখ্যা। ইংরেজীতে হরফের মানসংখ্যা নিম্নরূপ:
1 2 3 4 5 6 7 8
A B C D E U O F
I K L M H V Z P
J R S T M N W
Q G X
Y
জ্যোতিষীদের ধারণা হচ্ছে প্রত্যেকের নামের মধ্যে তার জীবনের লক্ষ্য ও মিশন সম্পর্কে নির্দেশনা লুকিয়ে থাকে। কি কি গুণাবলী অর্জন করতে হবে, কি কি বর্জন করতে হবে, কোন্ কোন্ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে নামের সংখ্যার মধ্যে এ সব কিছুরই দিক নির্দেশনা থাকে। এ ক্ষেত্রেও জ্যোতিষীগণ ১ থেকে ৯ মোট ৯টি সংখ্যা নির্ধারণ করে প্রত্যেক সংখ্যার জন্য এক এক ধরনের দিক নির্দেশনা করে রেখেছেন।
আসলে, জ্যোতিষীগণ কি এর কোন জবাব দিতে পারবেন যে, ইংরেজী এক এক অক্ষরের এক এক মান দেয়া হয়েছে, এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কি? কিংবা এর স্বপক্ষে কোন ইলাহী প্রমাণ আছে কি? আর নামসংখ্যার মধ্যে যদি কোন জীবনের দিক নির্দেশনা লুকিয়ে থাকেও তবে তা বের করতে ইংরেজী অক্ষরের আশ্রয় নেয়া হবে কেন? অন্য কোন ভাষার অক্ষর গ্রহণ করা যাবে না তার কি প্রমাণ? অন্য ভাষার অক্ষরে গেলে যে নামসংখ্যায় পার্থক্য দেখা দেবে তার সমাধান কি?
আবার কেউ কেউ কুরআন-হাদীসের ভাষা আরবী অক্ষরের মান থেকে মানসংখ্যা বের করে থাকে। কিন্তু মনে রাখা দরকার যে, আরবী অক্ষরের যে মান ধরা হয়, তাও কুরআন-হাদীস বা বৈজ্ঞানিক তথ্য দ্বারা প্রমাণিত নয়, তাছাড়া আরবী অক্ষর অনুযায়ী নামসংখ্যা বের করার পর ঐ সংখ্যার যে প্রভাব বা দিক নির্দেশনা সাব্যস্ত করা হচ্ছে, তা তো জ্যোতিষীদেরই সাব্যস্ত করা কাল্পনিক ব্যাপার।
প্রকৃতপক্ষে, জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রত্যেকটা উপাত্ত সম্পর্কে সামান্য চিন্তা করলেই প্রতিভাত হবে যে, তা একান্তই কল্পনা প্রসূত এবং দলীলবিহীন আন্দাজ মাত্র।
অধুনা জ্যোতিষশাস্ত্রের চর্চা বেশ ব্যাপকতা লাভ করেছে। ভাগ্য বিড়ম্বিত মানুষ সর্বশেষ পন্থা হিসেবে জ্যোতিষীদের দারস্থ হচ্ছেন এবং তাদের দেয়া পাথর বা অন্য কোন পরামর্শকে ভাগ্য ফেরানোর নিয়ামক ভেবে শেষ রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। অনেকে বিবাহ-শাদি, ব্যবসা-বাণিজ্য, লেখা-পড়া, বিদেশ গমন, ঘর-বাড়ি নির্মাণ ইত্যাদি জীবনের অনেক ক্ষেত্রের ভবিষ্যৎ শুভ-অশুভ জানার জন্য জ্যোতিষীদের আগাম ব্যবস্থাপত্র গ্রহণ করে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিচ্ছেন এবং সাফল্য লাভ করবেন বলে আত্মস্থ থাকছেন। এভাবে জ্যোতিষীদের ভবিষ্যদ্বাণীকে তারা জীবন পরিচালনার গাইড বানিয়ে চলছেন। জ্যোতিষীদের ব্যবসাও ভাল চলছে। জ্যোতিষশাস্ত্র চর্চার ব্যবসা ভাল দেখে এ বিদ্যা শিক্ষার হারও তাই বেড়ে চলেছে। কিন্তু এ শাস্ত্রের হিসাব-নিকাশ ও তার ভবিষ্যদ্বাণীতে বিশ্বাস স্থাপন বা এ শাস্ত্র চর্চা ইসলামে কতটুকু অনুমোদিত তা ঈমান-আক্বীদা সংরক্ষণে প্রয়াসী এবং জীবনের প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে ইসলামের অনুশাসন মেনে চলতে আগ্রহী একজন সচেতন মুসলিমকে অবশ্যই জানতে হবে।
বর্তমানে আমাদের দেশে অনেক জ্যোতির্বিদ রয়েছেন যারা তারকার গতিবিধি লক্ষ্য করে এর ফলাফল দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকায় প্রকাশ করে থাকেন। এর দ্বারা তারা জনগণকে তাদের ভাগ্য সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করে আগাম সতর্ক করেন। রাশিফলের এ জাতীয় প্রচারণা আমাদের দেশে এখন একটি সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। রাজধানী ঢাকাতে তাদের অনেকের চেম্বার রয়েছে। সাধারণ লোকেরা তাদের নিকট নিজ নিজ ভাগ্যে ভাল বা মন্দ কী অপেক্ষা করছে, তা আগাম জানার জন্য গমন করে। যারা ভাগ্য বিড়ম্বনার শিকার হয়েছে, তারা ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য পরামর্শ নেয়ার উদ্দেশ্যে তাদের নিকট গমন করে। অথচ তারা জানে না যে, ইসলাম জ্যোতির্বিদদের মানুষের ভাগ্য সম্পর্কিত ভবিষ্যদ্বাণীকে স্বীকার করে না এবং নিম্ন জগতের প্রাণীর ভাগ্যে উর্ধ্ব জগতের গ্রহ, নক্ষত্র ও তারকার প্রভাব আছে বলে দীর্ঘকাল থেকে মানুষের মাঝে যে বিশ্বাস গড়ে উঠেছে, সেটাকে ইসলাম শির্কী চিন্তাধারা হিসেবে গণ্য করে; কেননা, বিশ্বজগত এককভাবে মহান আল্লাহ্র নির্দেশ ও তাঁর পরিকল্পনানুযায়ী পরিচালিত হয়ে থাকে। আমাদের ন্যায় সকল গ্রহ, নক্ষত্র ও তারকারাজী আল্লাহ্রই সৃষ্টি। এগুলোকে আমাদের ভাগ্যের ভাল বা মন্দের উপর প্রভাব বিস্তার করার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। এ সব একান্তই আবহমান কালের মানুষের কল্পনা ও ধারণাপ্রসূত কথা বৈ আর কিছুই নয়। এ সব বিশ্বাসের ফলেই একদা মানুষ তারকার কাল্পনিক মূর্তি বানিয়ে এর পূজা করতে অভ্যস্ত হয়েছিল।
📄 শনির দশা, ধোঁকা খাসা
আমাদের সমাজে শনি বলে একটি শব্দ বেশ প্রচলিত। শব্দটির ব্যবহার হয় এভাবে- শনির দশা, শনির দৃষ্টি, শনির শুভ দৃষ্টি, শনির অশুভ দৃষ্টি, শনির ভর ইত্যাদি। আবার যারা জ্যোতিষী, হাতের রেখা দেখে ভাগ্য গণনা করেন অথবা রাশিফল বলে দেন; তারা বলেন, 'শনির প্রভাব, শনির কুদৃষ্টি ও শনির বলয়।' দিনকাল খারাপ যাচ্ছে- শনির আছর। অসুখ-বিসুখ লেগে আছে, শনির নজর পড়েছে। আয়- উন্নতি হচ্ছে না- শনি ভর করেছে। অর্থাৎ শনি যত নষ্টের মূল। খারাপ, অনিষ্ট ও অকল্যাণের প্রতীক হল এ শনি। শনির নজরে পড়লে আর কারো রক্ষা নেই; ক্ষতি মেনে নিতেই হবে। সমাজের বেশিরভাগ মানুষের ধারণা এ রকমই। আর এটা চলে আসছে যুগ যুগ ধরে।
সকল অনিষ্টের হোতা এ শনিটি আসলে কী কিংবা শনি সম্পর্কে এমন ধারণা কিভাবে গড়ে উঠল, সে সম্পর্কে আমরা একটু খোঁজ-খবর করতে পারি।
হিন্দু ধর্মের পুরনো কাহিনীতে এক দেবতার নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি হলেন শনি দেবতা। সূর্যদেবের স্ত্রী ছায়ারাণীর গর্ভে জন্ম নিয়েছিল দুই পুত্র সন্তান। এদের একজন মনু ও অন্যজন শনি। শনিদেবের স্ত্রীর নাম পার্বতী। তিনি চিত্ররথের কন্যা। শনিদেব ছিলেন অত্যন্ত দুরাচারী। সকলের ক্ষতি ও অকল্যাণ কামনা করাই ছিল তার প্রধান কাজ। চিত্ররথ একদিন দক্ষযজ্ঞের অনুষ্ঠানের মধ্যে কন্যার সামনে শনির নিন্দা করেন। এতে পার্বতী লজ্জায় ক্ষোভে মৃত্যু আলিঙ্গন করে এবং পরে পুনরায় জন্ম নেন। এবার তার জন্ম হয় হিমালয়ের স্ত্রী মেনকার গর্ভে। বিয়ে হয় মহাদেবের সাথে। বিয়ের পর অনেক সাধ্য সাধনা করে অবশেষে সন্তান হয় পার্বতীর। দেবতারা একে একে নবজাতককে দেখে আশীর্বাদ করলেন। আশীর্বাদ করলেন শনিদেবও। সকলে চোখ মেলে দেখে ধন্য ধন্য করলেও শনিদেব কিন্তু নবজাতকের দিকে দৃষ্টি দিলেন না। পার্বতী খুব রেগেমেগে এর কারণ জানতে চাইলেন। শনি বললেন, "চিত্ররথের কন্যা পার্বতী ছিল আমার স্ত্রী। আমি তার প্রতি অবিচার করেছি। নির্যাতন করেছি। একদিন তার অতি সামান্য ইচ্ছাকেও অপূর্ণ রেখেছি। এ জন্য সে আমাকে অভিশাপ দিয়ে বলে, 'তুমি একবার আমার দিকে চেয়ে দেখারও প্রয়োজন বোধ করলে না। আমার আবদার না হয় না-ই রাখলে! ঠিক আছে, এখন থেকে তুমি যার দিকে তাকাবে, তার তৎক্ষণাৎ ধ্বংস অনিবার্য।' সেই থেকে আমি মাটির দিকে চোখ রেখে মাথা নিচু করে থাকি।"
পার্বতী কিন্তু শনিদেবের এ কথা বিশ্বাস করতে পারে না। সে বলে, 'আপনার এ কথা কিছুতেই সত্য হতে পারে না। আপনি আমার সাথে ছলনা করছেন। আমার ছেলেকে দেখে আশীর্বাদ করতে চাইছেন না বলে এ কথা বলছেন। ছেলে দেখে আশীর্বাদ না করা পর্যন্ত ছাড়ছি না আপনাকে।' শনিদেব মহা ফাঁপড়ে পড়ে গেলেন। তিনি অন্য কোন উপায় না দেখে অবশেষে পার্বতীর পুত্র গণেশের দিকে দৃষ্টি দিলেন। আর যায় কোথা! সঙ্গে সঙ্গে ঘটে গেল ঘটনা। ধড় থেকে গণেশের মুণ্ডু খসে পড়ে গেল মাটিতে। নিজ পুত্রের এ অবস্থায় পার্বতী তো অগ্নিশর্মা। অগ্নিদৃষ্টিতে তিনি আরও একবার অভিশাপ দিলেন শনিকে- 'আমার সন্তানের এ অবস্থার জন্য আপনি বাকী জীবন খোঁড়া হয়ে থাকবেন।' একদিকে মন্দ দৃষ্টি এবং সে সঙ্গে খোঁড়া হয়ে পরবর্তী বছরগুলো পাড়ি দিয়েছিলেন বেচারা শনিদেব।
এ হল শনির উৎস-কাহিনী। জানা যায়, হিন্দুশাস্ত্রের এ কাহিনীর ওপর ভর করে পুরনো আমলের চতুর জ্যোতিষীরা শনি-ভীতি ছড়িয়ে দেন মনুষ্য সমাজে। সেই থেকে আরো কয়েকগুণ ভয়াল-দর্শন করে তোলা হয়েছে শনিকে, শুধুমাত্র নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য। জ্যোতিষ মানেই সমাজের পরগাছা, অলস, প্রতারক একদল চতুর মানুষ। শনিকে এরা প্রতারণার অন্যতম বাহন হিসেবে ব্যবহার করে এসেছেন। আসলে শনি মানেই অনিষ্ট- এ ভাবনা ভাবাটাই হল একটা বড় অনিষ্ট। শনির কোন দশাও নেই, দৃষ্টিও নেই। এর কোন সত্যতা নেই কিছুমাত্র। এ সব গল্প ফেঁদে সরল, ধর্মভীরু, অন্ধবিশ্বাসী, অশিক্ষিত মানুষকে বোকা বানিয়ে স্বার্থোদ্ধার করা হয় মাত্র। যুগ পরম্পরায় চলে আসা এ সকল কাল্পনিক, অসত্য কাহিনীতে মানুষ অজান্তেই বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং করছে প্রতিনিয়ত। কারণ প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে এগুলো শুনতে শুনতে প্রথমে বিশ্বাস ও পরে দৃঢ় বিশ্বাসে পরিণত হয়ে গেছে। অনেকে জ্যোতিষের কথায় গলে গিয়ে শনির দশা এড়াতে নগদ মূল্যে ক্রয় করেন নীলা (নীলকান্তমনি) পাথর। জ্যোতিষীরা বলেন, 'নীলা পাথরের আংটি পরলে শরীরের রং উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। শনির দৃষ্টি খুঁচিয়ে দিয়ে দুঃখ, অভাব, রোগ, ব্যাধি ও কষ্ট দূর করে দেয়।' এ সকল দাবীকে সত্য প্রমাণ করার জন্য জ্যোতিষীরা কোন প্রকার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হাজির করেননি। বরং বলা যায়, জ্যোতিষদের এ সব কথা একেবারে মিথ্যা, অবৈজ্ঞানিক ও প্রতারণাপূর্ণ। সুতরাং শনির দশা-দৃষ্টিও বলে যেমন কিছু নেই, তেমনি এর প্রভাব প্রতিরোধে রত্ন-পাথর ধারণ করারও কোন যুক্তি নেই। পুরো ব্যাপারটিই আসলে অসত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
এতক্ষণ তো আমরা কল্প শনির কাহিনী বললাম। এবার আসল শনির কাহিনী না বললে তো খুব অন্যায় হবে। আসল শনি হল শনিগ্রহ। অনেক অজানা, অনেক রহস্যময়তায় ঢাকা এ শনিগ্রহ। পৃথিবীর অনেক কিছুই তো অজ্ঞাত রয়েছে আমাদের। অর্থাৎ আমরা যেখানে এখনও পৌঁছাতে পারিনি, ভেতরের সত্যকে উদ্ঘাটন করতে পারিনি; সেটাই হল রহস্য। এ রহস্যগুলো নিয়ে নানা কল্পকথা তৈরি হয়। সে যাক, আমরা এখন আসল শনি অর্থাৎ শনিগ্রহ সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নিই।
সূর্য থেকে শনিগ্রহের দূরত্ব গড়ে ৮৮ হাজার ৬৭ লক্ষ মাইল। এ অকল্পনীয় দূরত্ব পেরিয়ে শনিগ্রহে সূর্যের আলো পৌঁছাতে সময় লাগে ৭৯ মিনিট। শনি সূর্যের চারদিকে প্রদক্ষিণ করে। এতে সময় লাগে প্রায় ৩০ বছর। শনির পরিমণ্ডলে নানা প্রকার গ্যাস আছে। এর মধ্যে রয়েছে- হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, মিথেন, অ্যামোনিয়া, পানি, ইথেন, অ্যাসিটিলিন, ফসফিন, কার্বন-মনোক্সাইড, হাইড্রোজেন সায়ানাইড ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড। সূর্যের আলো শনিগ্রহে পৌঁছায় সবচেয়ে কম। শনির বলয় মানুষের নিকট এক পরম বিস্ময়। গ্যালিলিও প্রথম তার দূরবীন দিয়ে শনির বলয় আবিষ্কার করেন। কিন্তু তিনি এর প্রকৃত রূপ ভালোভাবে বুঝতে সক্ষম হননি। পরে হেউগেন্স শনির বলয় আবিষ্কার করেন। এখন ৩টি মহাকাশযান পাঠিয়ে মানুষ শনিসহ অন্যান্য গ্রহ সম্পর্কে অনেক তথ্য জেনেছে। ভয়েজার ১, ২ ও ৩ নামক নভোযান এ তথ্যগুলো আমাদের অবহিত করেছে। শেষ কথা হল, শনি সম্পর্কে এত তথ্য জানতে গিয়ে মহাকাশযানগুলোকে কিন্তু একবারও শনির দশায় পতিত হতে হয়নি।
📄 জয়-জীতি ও জর্জিসের ডাইল, দূর করে না রোগ-বালা
রোগ হলে গলায় মালা পরিয়ে দেয়া হয়। সুতা ও শেকড়ের তৈরি মালা। কেবল সুতা নয়। সুতার এক বা দেড় ইঞ্চি তফাতে গাছের কয়েকটি শেকড় বা চিকন ডাল গোছা করে বাঁধা থাকে। রোগীর গলায় পরিয়ে দেবার পর মালাটি বড় হতে থাকে। বড় হতে হতে এক সময় বেশ বড় হয়। তারপর এক শুভদিনে রোগটিও সেরে যায়! এ রোগের নাম সকলের জানা। এ রোগ আমাদের কাছে খুবই পরিচিত। জণ্ডিস। আজকাল এ রোগের প্রকোপ বেশি। কেউ কেউ এটাকে 'হলদে পালং' বলে থাকে। জণ্ডিস হলে চোখ, হাত প্রভৃতি হলদে বর্ণ হয়ে যায় বলে এ নামকরণ। অনেকের ধারণা হলদে পাখি জণ্ডিস রোগীকে খাওয়ালে এ রোগের উপশম হয়। বলা হয়, পাখির হলুদ বর্ণ দেহের মধ্যে রোগের কারণে সৃষ্ট হলুদ বর্ণকে নষ্ট করে দেয়। আবার অনেকে জণ্ডিস রোগীকে হলুদ কম খেতে দেয়। কারণ তাতে নাকি হলদে পালং বেড়ে যায়। জন্ডিস নামের এ রোগ হলে চোখের কর্ণিয়া হলুদ হয়ে যায়। প্রায় সময় শরীরে একটু করে জ্বর থাকে। খাবারে রুচি থাকে না। শরীর বেশ দুর্বল হয়ে পড়ে।
জণ্ডিস রোগের উৎপত্তি কিভাবে হয় বা কেন মানবদেহের রং হলদে হয়ে যায় তার ব্যাপারে চিকিৎসা বিজ্ঞানের মত হল- বিলিরুবিন নামক একটি রঞ্জক পদার্থের কারণে শরীরে হলুদ রং দেখা দেয়। কোন কারণে বিলিরুবিনের পরিমাণ বেড়ে গেলে তা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং রোগীর দেহকে বিশেষ করে, চোখের সাদা অংশ, জিহ্বা, হাতের তালু প্রভৃতি হলুদ রঙের হয়ে যায়। তবে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যকৃত বা লিভারের গোলমাল থেকে জন্ডিস রোগের সৃষ্টি হয়। আর হেপাটাইটিস নামের এক প্রকার ভাইরাস এ গোলযোগের মূল হোতা। শরীরের যে পদার্থগুলো যকৃতের মধ্য দিয়ে অন্য অংশে যাতায়াত করে, যকৃতের গোলমালের দরুন তা পারে না। যকৃতে গিয়ে সেগুলো জমে যায়। এতেই হয় জন্ডিস। বারবার বদহজম, পেটের বিভিন্ন অসুখ, ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস এবং নানা ওষুধের প্রতিক্রিয়া- এগুলো থেকেই লিভারের ক্ষতি সাধিত হয়। আর লিভারের গোলযোগ থেকেই হয় জন্ডিস। জন্ডিস ভালো করতে হলে নিয়ম করে ৩টি কাজ করতে হয়। কোনপ্রকার পরিশ্রম না করে কেবলই বিশ্রাম নিতে হবে। প্রচুর বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। পানির সাথে গ্লুকোজ মিশিয়ে পান করলে খুব ভাল হয়। কারণ, এ রোগে শরীরে অনেক গ্লুকোজ দরকার হয়। এ ছাড়া ডাব বা আখের রস খেলেও উপকার হয়। আর ঠিক ঠিক মতো খেতে হবে পথ্য। তেল-চর্বি জাতীয় খাবার সম্পূর্ণ বাদ দিতে হবে। কড়া ঝাল বা জ্বালের খাবারও খাওয়া অনুচিত। এটুকু একটানা কয়েকদিন মেনে চলতে পারলেই আল্লাহর ইচ্ছায় জন্ডিস সেরে যায়। কারণ, এতে স্বাভাবিক নিয়মেই দেহে এন্টিবডি তৈরি হয়ে যায় এবং লিভার ফাংশনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনে। এ জন্য তেমন ওষুধ কিংবা মালা নেয়ার দরকার নেই।
কিছু ভণ্ড কবিরাজ জণ্ডিসের চিকিৎসার নামে নানা কায়দায় এ হলুদ রংটাকে ব্যবহার করছে। স্বাভাবিক বিষয়টাকেই তারা অস্বাভাবিক করে তোলে। ওঝা বা কবিরাজ মশাইরা চালাকির আশ্রয় নেয়। আমগাছের ছাল বাটা রস এ কাজে ব্যবহার করে। আমগাছের এ রস তারা রোগীর হাতে মেখে দেয়, তারপর চুনগোলা পানিতে সেই রস মাখা হাত চুবাতে বলে। মুহূর্তে চুন মেশানো পানি হলুদ হয়ে যায়। আমগাছের রস চুনগোলা পানিতে মেশালেই সেই পানি হলুদ হয়ে যায়। আবার কখনো কখনো কবিরাজ মশাই তার নিজ হাতে আমের রস মেখে নেয়। তারপর সেই হাত রোগীর গায়ে বুলিয়ে চুন মেশানো পানিতে চুবিয়ে নেয় আর তাতে পানির রং হলুদ হয়ে যায়।
এভাবে তারা রোগীকে বুঝিয়ে দেন যে, তার শরীর থেকে সকল হলুদ রং বের হয়েছে এবং সে এখন সুস্থ হয়ে গেছে। আসলে এর দ্বারা রোগের কিছুই হয় না।
আমাদের গ্রাম বা প্রায় শহর এলাকায় কারো জন্ডিস হলেই একমাত্র চিকিৎসা হিসেবে গলায় মালা পরানো হয়। অধিকাংশ কবিরাজ মালা পরানোর মাধ্যমে জণ্ডিসের চিকিৎসা করে থাকে। এটা অনেকদিন ধরেই চলে আসছে। এ ক্ষেত্রে তারা এমন কিছু গাছের ডাল ব্যবহার করে যার মধ্যখানে মূলত ফাঁকা থাকে অর্থাৎ ডালের ভিতরে সার পদার্থ থাকে না। এরই সূত্র ধরে সাধারণত বামনহাটি, আপাং ও ভৃঙ্গরাজের চিকন ডাল দিয়ে মালা বানানো হয়। এর মধ্যে বামনহাটিই বেশি ব্যবহার হয়। এ গাছগুলোর ডাল পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এতে যকৃতের রোগ কমে না। বামনহাটির শেকড়ে (ডাল নয়) জ্বর, কাশি, হাঁপানি ও গলগণ্ড রোগ সারে। জন্ডিস সারার কোন কারণ দেখা যায়নি। কবিরাজি চিকিৎসায় পিত্ত ঠাণ্ডা করে এমন গাছের পাতা বা ডালের রস খেতে বলা হয়। এর মধ্যে রয়েছে তুলসি, কাঁচা হলুদ, হরিতকি, কালোমেঘ ইত্যাদি। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, বামনহাটি, আপাং বা ভৃঙ্গরাজের ডালে জন্ডিস সারতে পারে না। আর এ ডাল তো মালায় গাঁথা অবস্থায় শরীরের বাইরে থাকে। শরীরের ভেতরে গিয়ে সরাসরি কাজ করবার সুযোগ পায় না। তাই মালা ব্যবহারে রোগ সারবে কেন?
এ সব গাছের ডাল ছোট ছোট টুকরা করে তা সুতায় বেঁধে মালা তৈরি করে রোগীর মাথায় বেঁধে দেয়া হয় এবং বলা হয় যে, গলায় পরার পর মালাটি ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে এবং রোগ শুষে নেয়। তাছাড়া, কথা থাকে যে, এ মালা মাথা থেকে যখন গলায় পড়ে যাবে তখন বুঝতে হবে যে, রোগ ভাল হয়ে গেছে। এ ব্যাপারে পরীক্ষা করে দেখা গেছে, মানুষের মাথায় বা গলায় না পরিয়ে এমনি যেকোন জায়গায় রাখলেও মালাটি বড় হয়েছে। অতএব জন্ডিস রোগ সারার জন্য যে মালা দেয়া হয় তা বাড়ে আপনাতেই। মালা বড় হয় রোগের জন্য নয়, অন্য কারণে। বামনহাটি, আপাং বা ভৃঙ্গরাজের ডাল কেটে ছোট ছোট টুকরো করা হয়। কয়েকটি টুকরো একসাথে কিছু দূর দূর গিট দিয়ে বাঁধা হয়। কাঁচা ডালগুলো টান টান সুতার বেড় দিয়ে বেঁধে মালা বানানো হয়। প্রথমে কাঁচা অবস্থায় ডালগুলো গায়ে গায়ে লেগে থাকে। কিন্তু যত দিন যায়, ততোই ডালগুলো শুকোতে থাকে আর সুতার গিরাগুলো আলগা হতে থাকে। এটা তো হবেই। শুকানোর সাথে সাথে সুতার পাক ঢিল হয়ে ডালের মধ্যে ফাঁক বাড়তে থাকে। এতে মালাও লম্বা হতে থাকে। এভাবে প্রথম দেয়া মালাখানি কয়েকদিন পর দেখা যায় বেশ বড় হয়ে গেছে।
জন্ডিসের মালার এটাই হল রহস্য। মানুষ বা জন্ডিস ছাড়াই গরু, ছাগল, ভেড়া, কুকুরের গলায় বা এমনকি টেবিলে ফেলে রাখলেও মালা বাড়বেই। দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখলেও মালা বড় হতেই থাকবে। মালা বাড়ার চমকে গ্রামের সহজ-সরল মানুষ আকৃষ্ট হন অতি সহজে। এ সুযোগটাই নেয় প্রতারক কবিরাজরা। মালা দেয়া ও মালা পরানোর পর অনেক রোগী ভালও হয়ে যায়- এর কারণ কি!? কারণ হল, এ সব ভণ্ড, ধোঁকাবাজ ও প্রতারক ওঝা-কবিরাজরা মালা দেবার সময় তারা রোগীকে পূর্বোক্ত পথ্যসমূহ খেতে দেয়। যেমন- রোগীকে বলা হয়, কোন কাজকর্ম না করে বিশ্রামে থাকতে। যথাসম্ভব বেশি বেশি ডাবের পানি খেতে বলা হয়। আবার, দুয়েক দিন গোসল করতেও নিষেধ করা হয়। কয়েকদিন কাজ ও নড়াচড়া না করে বিশ্রাম নিলে তো এমনিই জন্ডিস সেরে যায়। আর এর সাথে মনের জোরও কাজ করে। মালা পরানোর পর স্বাভাবিকভাবে রোগীর মনের জোর বেড়ে যায় কয়েক গুণ। তাতেও কাজ হয়। মালা কিন্তু সত্যিকারভাবে কোনই কাজে আসে না।
জণ্ডিস রোগের চিকিৎসায় 'কলা পড়া' প্রথাও চালু রয়েছে আমাদের সমাজে। যে ওঝা বা কবিরাজ সাহেব কলা পড়া দিয়ে থাকে, তার কাছে ৭টি কলা নিয়ে যেতে হয়, তিনি ৩টি রেখে বাকি ৪টি কলা পড়ে দেয় রোগীর জন্য। আর, এ কলা পড়ায় রোগীর কোন লাভ হয় না। তবে, লাভ হয় একটি বিষয়ে, তা হচ্ছে, এ সুযোগে রোগী ও ওঝা বা কবিরাজ সাহেব এক সাথে কয়েকটি কলা পেট পুরে খেতে পারে।
জণ্ডিস রোগে আরেকটি চিকিৎসা পদ্ধতি দেখা যায় কিছু এলাকাতে। এ পদ্ধতিতে রোগীর মাথার তালু থেকে চুল সরিয়ে লতা-পাতা বাটা সেখানে লাগিয়ে দিয়ে তার ওপর পদ্ম পাতা বা অন্য কোন পাতা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। এতে রোগীর উপকার তো হয়ই না, বরং কিছু ক্ষতি ও কষ্ট বাড়ে।
অন্যদিকে হাম, বসন্ত ইত্যাদির হাত থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্য হিন্দুরা শীতলা দেবীর পূজা করে আর মুসলমানরা হিন্দুদের সাথে সেসব বিশ্বাস করে। হিন্দু সাধুরা কুলা নিয়ে বের হলে মুসলিমরা তাতে দান-খয়রাত করে এবং ঠাকুরের কাছ থেকে পানি পড়া, ডাব পড়া ইত্যাদি নেয়। হাম চিকিৎসা আরেক অদ্ভুত ব্যাপার। কোন কোন এলাকায় হাম রোগটি লতি বা লুনতি নামে পরিচিত। হয়ত এ দেশের গোটা এলাকাতেই হামের এ বন্য পরিচিতি থাকতে পারে। হাম দেখা দিলে মানুষ পানি পড়া, ডোর পড়া, নানা রকম ঝাড়-ফুঁক ইত্যাদির সাথে সাথে আরেকটি অদ্ভুত চিকিৎসা শুরু করে দেয়। তারা নানারকম পাতা যেমন- নিমপাতা, আমপাতা প্রভৃতি এবং বিভিন্ন রকম দুর্বা পানিতে ভিজিয়ে রোগীকে সেবন করায়। সোনা-রূপার অলংকার ওই পানিতে ভিজিয়ে রোগীকে সেবন করায় এবং রোগীর দেহে ওই পানির ছিঁটা দেয়। রোগীকে বেশিরভাগ সময়ে বদ্ধ ঘরে রাখা হয়। মাছ, গোস্ত ইত্যাদি জাতীয় পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার রোগীকে খেতে দেয়া হয় না। তদুপরি, পলি মাছ ধোয়া পানিতে রোগীকে সপ্তাহান্তে গোছল করানো হয়। এতে রোগমুক্তি না ঘটে রোগীর নানা বিপত্তি ঘটতে থাকে। অনেক সময় নানা রকম লতা-পাতা বেটে রোগীর শরীরে মেখে দেয়া হয়। আবার অনেক কবিরাজ রোগীকে কলা পাতায় বসিয়ে বাসী মুখে রোগীর পিঠে ঝাড়া হয়। ঝাড়া শেষে দেখা যায় কলা পাতার ওপর সরিষার দানার মতো অসংখ্য আমলকি বর্ণের বিন্দু বিন্দু দানা জমা হয়ে যায়। এ সব দানা দেখে সবাই ভাবে যে, লুতির (হাম রোগের) সমস্ত পোকা বের হয়ে গেছে। আসলে এ সব ক্রিয়াকাণ্ড পুরোটাই মস্তবড় ভাঁওতাবাজি। কারণ, সজিনা পাতার অপর পিঠে ঐ ছোট ছোট দানাগুলো থাকে আর পিঠে ঝাড়ার সময় দানাগুলো পাতা থেকে ঝড়ে পড়ে যায়।
কলেরা একটি মারাত্মক রোগ। মানুষের ধারণা ওলাউঠা বা গলাকাটাভূত এ রোগ গভীররাতে ছড়িয়ে যায়। ওলা বিবি হল সাদা বা কালো কাপড় পরা কাল্পনিক ছায়ামূর্তি। এ ওলাবিবি বা ওলাইচণ্ডী মূলত হিন্দু সমাজে পূজ্য পিসূচিকা রোগের দেবী। সাধারণ শ্রেণীর মুসলিমরা ওলাইচণ্ডীকে ওলাবিবি বলে থাকে। তারা তাকে খুব ভয় পায়, কেননা তাদের বিশ্বাস ঐ দেবীর মাধ্যমেই কলেরা (এ কালে ডায়রিয়াও) রোগ ছড়িয়ে পড়ে। কলেরার জীবাণুকে খালি চোখে দেখতে পায় না বলেই হয়ত তাদের এ ধারণা।
আর এভাবে আমরা দেখি যে, নানা রোগের নানা রকম উদ্ভট, অবৈজ্ঞানিক ও শিরক ও কুফরযুক্ত কষ্টকর চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে। কুসংস্কারাচ্ছন্ন লোকেরা এ সব করে। অধিকাংশ সময়ই রোগের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান না করে অর্থহীন চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়া হয়।