📄 হাঁচি-টিকটিকি-কাঁদা, কিছু নয় কাঁদা
একটি স্কুল। স্কুলটির চতুর্থ শ্রেণীতে একদিন পঞ্চম ঘন্টায় সাধারণ জ্ঞানের ক্লাস চলছিল। পুস্তকের পাঠ্যসূচীর ফাঁকে শিক্ষক পাঠ্যবহির্ভূত আরো কিছু কথা ছাত্র-ছাত্রীদের জানানোর প্রয়াস পাচ্ছিলেন। কিছু কথাকে সাধারণ জ্ঞানের আওতাভুক্ত করে উপস্থাপন করছিলেন তিনি। এগুলোকে ব্যবহারিক জীবনে মেনে চলার পরামর্শও যথারীতি দান করছিলেন। বলছিলেন, ভাত খেতে খেতে হাঁচি উঠলে মনে করতে হবে দূর থেকে কেউ মনে করছে। অথবা খেতে খেতে বা কথা বলার সময় জিভে কামড় খেলে ধরে নিতে হয় কেউ বকাবকি করছে। আবার বলছিলেন, বামচোখের পাতা কাঁপলে অমঙ্গল এবং ডানচোখের পাতা কাঁপলে মঙ্গল বয়ে আনে।
এ সব কথা বলার সময় ক্লাসের ফার্স্ট বয় পাপ্পু বাম হাতের নখ দিয়ে ডান হাতের তালু চুলকাচ্ছিল। ও সামনের বেঞ্চিতে বসেছিল। বরাবর তাই বসে। জাদীদার হাত চুলকানোর ব্যাপারটা শিক্ষকের নজর এড়ায়নি। জিজ্ঞেস করলেন তিনি পাপ্পুকে- -পাপ্পু দাড়াও। তুমি তোমার হাত চুলকাচ্ছিলে না!
-জ্বী স্যার। হঠাৎ ডান হাতটায় সুড়সুড়ি এল। না চুলকে পারলাম না। স্যারের দাঁড়াতে বলা এবং ওই বেমক্কা প্রশ্নে পাপ্পু ধরে নিয়েছে যে, সে মস্ত এক অপরাধ করে ফেলেছে। ভয়ে ভয়ে নিজের কৃত অপরাধের পক্ষে সাফাই গাইতে চাইল।
-না, হাত চুলকে তুমি কোন অন্যায় করনি। চুলকানি লাগলে তুমি কী আর করবে! তবে কথা হচ্ছে, এ ডান হাত চুলকানোর একটা মানে আছে। সেটাই এখন বলছি শোনো। শিক্ষক এবার পাপ্পুর ওপর থেকে চোখ সরিয়ে ক্লাসের সবার দিকে তাকালেন। বললেন তিনি আবার, কখনো কারো ডানহাতের তালু চুলকালে মনে করতে হয় তার ভাগ্য ভাল। শিল্পির তার ভাগ্যে টাক-পয়সা জুটবে। বুঝেছ তোমরা! সবাই সমস্বরে জবাব দেয়, জ্বী স্যার। ক্লাসের দুষ্টোমিতে ওস্তাদ মেয়েটির নাম জাদীদা। সবাই যখন জ্বী স্যার বলছিল ও তখন চুপচাপ। হয়ত ওর মাথায় তখন অন্যকিছু খেলছিল। হয়ত ফন্দিই আঁটছিল সে। আচমকা বলে বসল জাদীদা- -স্যার, আমার হাত না পায়ের তালু চুলকাচ্ছে। এর কোন অর্থ আছে নাকি স্যার! থাকলে বলেন না স্যার।
জাদীদার দুষ্টোমিটা স্যার হজম করলেন নীরবে, নিছক এটা যে জাদীদার পাকামী তা বুঝেও। তিনি এবার বললেন, জাদীদা আরেকটা পয়েন্ট ধরিয়ে দিয়েছ। হ্যাঁ, পায়ের তালু চুলকানোরও একটা মানে আছে বৈকি! সেটা হল কারো কখনো পায়ের তালু চুলকালে ধরে নিতে হবে তার সামনে বিভিন্ন জায়গা ঘুরে বেড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। ভাগ্য ভাল হলে বিদেশে বেড়ানোও হতে পারে। ছাত্র-ছাত্রীদের এ সব জ্ঞানের কথাগুলো বলে শিক্ষক একটু থামলেন। তারপর আবার বললেন, বুঝলে তো সবাই এতক্ষণ ধরে যা বলছিলাম আমি! এগুলো সাধারণ জ্ঞানের কথা। এগুলো সবাই মনে রাখবে এবং মেনে চলবে।
চতুর্থ শ্রেণীর ক্লাসে শিক্ষক সাধারণ জ্ঞান বলে যে জ্ঞানদান করলেন তা কী আদৌ জ্ঞানের কিংবা সাধারণ জ্ঞানের কথা! তবে বলা যায়, এগুলো আসলে ধারণার কথা। সমাজে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা মত বা ধারণা। এগুলোর কোন ভিত্তিও নেই, সত্যতাও নেই। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রাপ্ত নয় এগুলো। যার ভিত্তি নেই, সত্যতা নেই এবং পরীক্ষিত নয় তা জ্ঞান হয় কী করে! আদৌ জ্ঞানই নয় এগুলো আসলে। তবে যে শিক্ষক এগুলো উল্লেখ করলেন তার কারণ হল, উনিও ওভাবে জেনেছেন। তার কথিত জ্ঞানগুলো তো আর তিনি যাচাই করতে যাননি। এগুলো যে যাচাই করা দরকার, তাই তো কখনো মনে করেননি তিনি। সেটাই বস্তুত তার জন্য স্বাভাবিক। শুধু তার জন্য কেন, এদেশের অধিকাংশ শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের জন্য স্বাভাবিক। যাচাই বা পরীক্ষার ব্যাপারটা এ বিষয়ে খুব প্রয়োজনীয় একটা প্রশ্ন। যেটা ছাড়া কোন ধারণাই জ্ঞান নয়। কোন মতই সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত মত নয়।
শিক্ষকের কথিত এ ধারণাগুলো আমরা প্রাথমিকভাবে একটু যুক্তির নিরিখে বিচার করতে পারি। যেমন, হাঁচি উঠলে ভাবা হয় কেউ মনে করছে দূর থেকে। হাঁচির সাথে মনে করার কী সম্পর্ক থাকতে পারে! তাড়াহুড়ো বা অমনোযোগিতায় খেলে খাদ্য প্রবাহের শিরায় খাবার আটকে গিয়ে কিছুটা পেছন দিকে ফিরে আসে। এতে হাঁচি ওঠে। সুতরাং হাঁচির কারণটি হল শারীরিক। অন্য কিছু নয়। মনে টনে করা তো দূরে থাক। ঘুম কম হলে বা চোখে কোন অসুখ দেখা দিলে চোখের পাতা কাঁপতে থাকে। কাঁপাকাঁপির সঙ্গে মঙ্গল-অমঙ্গলের কী সম্পর্ক। তেমনি ডান-বাম অথবা হাত-পা চুলকানোর সঙ্গেও ভ্রমণ এবং অর্থপ্রাপ্তির কোনই সম্পর্ক থাকতে পারে না। এগুলো সবই শারীরিক ব্যাপার। শরীরের ভেতরের কোন কারণ থেকে এগুলো হয়। এর সঙ্গে অন্য কারণ যোগ করা একেবারেই অর্থহীন।
এগুলো সবই আসলে কুসংস্কার। অতীত কালের এমনই সব হাজারো রকমের ধ্যান-ধারণা, মতামত, মূল্যবোধ প্রচলিত আছে আমাদের সমাজে। অশিক্ষা, অজ্ঞতা ও অসচেতনতার কারণে এ অন্ধধারণাগুলো চালু হয়েছে এবং এখনো টিকে আছে বহাল তবিয়তে। যে ধারণা বা মতগুলোর কোন ভিত্তি নেই, যুক্তিও নেই সেগুলোই হল অন্ধধারণা। কুসংস্কার বলা হয় সেগুলোকেই। এ সব কুসংস্কার, অর্থহীন কারণ বা ব্যাখ্যা ও ভ্রান্তিতা দূর করার জন্য প্রকৃত জ্ঞান আমাদের আয়ত্ব করতে হবে। সে জন্য সত্য খোঁজার তাড়না থাকতে হবে। সত্যটা মিলবে ওহীর কাছ থেকে। ওহীর জ্ঞানই আমাদের ভুল ধারণাগুলো দূর করে সত্য ও যুক্তিসম্মত ধারণার নিকট পৌঁছাতে সহায়তা করে। তাওহীদের জ্ঞান দিয়ে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সবকিছুকে যাচাই করতে হবে। যাচাই-এর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তবেই তা গ্রহণ করা যাবে। বাদবাকি মত-পথকে বর্জন বা প্রত্যাখ্যান করতে পারলে, করতে শিখলে তবেই আমরা সামনে এগুবো। আমাদের এগুনো মানে সমাজটারও এগুনো। দেশটারও।
অতএব, আসুন ওহীর পথ বেয়ে কুরআন ও সহীহ হাদীসের চর্চা করে ভুলগুলোকে ভুল বলি আর সত্যকে আলিঙ্গন করে প্রতিষ্ঠিত করি আমাদের সকলের জীবনে।
টিকাঃ
১. ভাগ্য সংক্রান্ত বিষয়ে কপাল শব্দটি মূলত হিন্দু সংস্কৃতি থেকে আমাদের মুসলিমদের বিশ্বাসে অনুপ্রবেশ করেছে। হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থানুযায়ী, কোন সন্তান জন্মের ৬ষ্ঠ দিনে ভাগ্যের দেবতা এসে এ শিশুটির জীবনে সংঘটিতব্য ঘটনাসমূহ অর্থাৎ হায়াত, মৃত্যু, রিযিক, ধন-দৌলত ইত্যাদি তার [শিশুটির] কপালে লিখে যায়। আর এ বিশ্বাস থেকেই প্রচলিত হয়েছে- 'কপালের লিখন না যায় খণ্ডণ।' কিন্তু আমরা মুসলিম হিসেবে এ ধরনের আক্বীদা-বিশ্বাস পোষণ করি না। আমরা বিশ্বাস করি যে, আমাদের ভাগ্য লিখে রাখা হয়েছে লাওহে মাহফুজে, যা সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহই ওয়াকিবহাল। তাই আমরা বলি, 'ভাগ্যের লিখন না যায় খণ্ডণ।' অতএব, প্রতিটি মুসলিমের উচিত ভাগ্য সম্পর্কিত ব্যাপারে আলোচনায় 'কপাল' শব্দটির ব্যবহার করা থেকে সাবধানতা অবলম্বন করা। কারণ, সামান্য একটি মাত্র শব্দই আমাদের বিশুদ্ধ ঈমান-আক্বীদায় আঘাত করতে যথেষ্ট।
📄 হাতের রেখায় ভাগ্য, দেখতে চায় অজ্ঞ
আমাদের দু'খানি হাত দিয়ে আমরা প্রতিদিন কত রকম কাজই না করি। আমাদের হাত দু'টোর তালু মেলে ধরলে দেখা যাবে তালুতে অনেকগুলো রেখা বা টান। টানগুলো কিন্তু একেবারে সোজা নয় কোনটাই। এঁকেবেঁকে, একটার ওপর দিয়ে আরেকটা বা জড়াজড়ি করে রেখাগুলো এগিয়েছে। সবগুলো যে তালুর প্রান্ত ছুঁয়েছে তাও নয়। সামান্য কিছুটা বা মাঝামাঝি গিয়ে শেষ হয়েছে। ছোট, বড় বা মাঝারি সাইজের কত রেখা রয়েছে! কোনটা মোটা বা কোনটা সরু। এভাবে জাল ফেলে যেন অসংখ্য রেখার সমাহার ঘটেছে আমাদের হাতের তালুতে। হাতের তালুর এ রেখাকে বলা হয় হস্তরেখা।
হাতের রেখাকে দু'ভাগে ভাগ করা হয়েছে। মোটা রেখাকে বলা হয় ভাঁজ। যার মধ্যে রয়েছে কর রেখা, হৃদয় রেখা, শির রেখা ও আয়ু রেখা। ভাঁজ বাদে বাকী সব রেখাকে বলা হয় সূক্ষ্ম রেখা। এ পৃথিবীতে হাতের রেখা দেখে ভাগ্য বলে দেয়ার প্রচলন রয়েছে। রেখা দেখে ভাগ্য গোণে বা গণনা করেন যারা তাদের বলা হয় গণক বা হস্তরেখাবিদ।
উপরোক্ত দু'ধরনের রেখা তৈরি হয় একইভাবে। এগুলো মূলত দেহ গঠনিক খাঁজ ছাড়া আর কিছুই না। মায়ের গর্ভে শিশুর ভ্রুণ তৈরি হলে হাতের হাড়গুলোর সন্ধিস্থলে তালু ও আঙুলের চামড়ায় ভাঁজ থাকে। অনেকদিন এভাবে থাকাতে একসময় ভাঁজ পড়ে যায়। পরে তা স্থায়ী হয়ে যায়। শিশু মায়ের গর্ভে তার হাত দুটো মুঠো করে রাখে। ভাঁজের রেখা তৈরি হয় এতেই। হাত মুঠো করে থাকার কারণ হিসেবে আন্দাজ-অনুমান ও প্রমাণহীনভাবে অনেকে অনেক কথা বলেন। কেউ বলেন, 'আমাদের পূর্বপুরুষরা আগে থাকত গাছে, গাছের ডাল ধরার অভ্যাস থেকে মুঠো করার ব্যাপারটা এসেছে। আবার কেউ কেউ বলেন, 'মানুষ কোনকিছু আশ্রয় করে বাঁচতে চায়। গর্ভের শিশু কিছু ধরে বা ধরতে চেয়ে হাতের মুঠ ভাঁজ করে রাখে। এ ভাঁজগুলো ধীরে ধীরে দাগ বা রেখায় পরিণত হয়।'
সুতরাং হাতের রেখার সাথে আমাদের জীবনের সুখ-দুঃখ, ভালমন্দ, আয়ু কমবেশি হওয়া বা কোন ঘটনা-দুর্ঘটনা জড়িত নেই। কোন কোন আঙুল থাকা-না-থাকার ওপর কোন রেখা থাকা-না-থাকা নির্ভর করে। যেমন, জন্ম থেকে যদি বুড়ো আঙুল না থাকে তাহলে আয়ু রেখাও থাকবে না। তার মানে, যে বুড়ো আঙুল ছাড়া জন্ম নিল, সে কি একদিনও বাঁচবে না!? আর রেখাগুলো যে বাড়ে-কমে বা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় তারও কিন্তু কারণ আছে। হাতের তালুর ভেতরে যে মাংসপেশী আছে তা নড়াচড়ার ওপর রেখা বড় হওয়া বা মিশে যাওয়া নির্ভর করে। পরিশ্রমের কাজ করলে তাতে বেশি নড়াচড়া হয়। এতে রেখা তাড়াতাড়ি বাড়ে বা মিশে যায়।
একটি গল্প বলে নেই শেষে। এ গল্প থেকেও হস্তরেখার ভাগ্য গণনার অসারতা বোঝা যাবে। আমাদের এ পৃথিবীতে সংঘটিত হওয়া গল্প এটি। আগে রাজা-বাদশাহরা রাজপ্রাসাদে জ্যোতিষী রেখে দিতেন। এদের বলা হতো রাজ-জ্যোতিষী। জ্যোতিষীরা রাজা বা রাজ্যের ভূত-ভবিষ্যত আগাম বলে দিতেন। রাজা মশাই সেভাবে আগেভাগে ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন। একজন রাজার ছিল এমন একজন রাজ-জ্যোতিষী। তার গণনায় প্রায়ই ভুলভাল হতো বা ফলতো না তার কথা। একদিন রাজা বিরক্ত হয়ে জ্যোতিষীকে বললেন, বলুন তো আপনার আয়ু আর কতদিন! জ্যোতিষী উত্তর দিলেন, আরও বছর বিশেক তো বটেই। রাজা তখুনি কোতোয়ালকে ডেকে আদেশ দিলেন, জ্যোতিষীর গর্দান কাটতে। আদেশ পালনও করা হল। রাজা জ্যোতিষীর গণনা মিথ্যা প্রমাণ করলেন। আর জ্যোতিষের গণনায় যেকোনই সত্যতা নেই তা জ্যোতিষী মহাশয় নিজের জীবন দিয়েই প্রমাণ করলেন।
📄 রাশি চক্র, হাসি বক্র
দৈনিক পত্রিকার এক কলামে একটা বিষয় লেখা থাকে। লেখার শিরোনাম দেয়া থাকে আজকের দিনটি কেমন যাবে, আজকের রাশি বিচার বা রাশিচক্র ইত্যাদি। এক একটি দৈনিকে এক একটি নাম। দু'-একটা সাপ্তাহিক বা মাসিক পত্রিকায়ই এ বিষয়টি দেখা যায়। রাশিচক্রের রাশি গণনা হচ্ছে এ কলামের বিষয়বস্তু। এগুলো যারা লেখেন তারা লেখক নন। লেখেন নামকরা সব জ্যোতিষ বা জ্যোতিষ শাস্ত্রবিদরা। যাদের জ্যোতিষ শাস্ত্রের ওপর রয়েছে বড় বড় ডিগ্রী (!)। নামের সাথে ঐ ডিগ্রী, পুরস্কার ইত্যাদি সব লেখা থাকে। স্বর্ণ বা রৌপ্য পদকপ্রাপ্ত- লেখা থাকে সে কথাও। একটা পদবীও তারা লাগিয়ে নেন নিজের নামের সাথে। সে যাক। দৈনিক পত্রিকার পাঠক-পাঠিকাগণ সকালে কাগজ খুলে প্রতিদিনের খবরাখবর পড়েন। একই সাথে রাশিফলেও একবার নজর বুলিয়ে নেন। তিনি হয়ত ভাবেন, দিনের ঘটনাগুলোর কিছু যদি আগাম জেনে নেয়া যায়, সে অনুযায়ী কাজকর্ম ঠিক করা যাবে। আসলে দেখা গেছে, এমন মানুষরা হতাশাগ্রস্ত, জীবন যুদ্ধে ক্লান্ত, ভাগ্যের ওপর জীবনের হাল ছেড়ে দেয়া মানুষ।
অথবা এদের মন দুর্বল, শিক্ষাদীক্ষা কুসংস্কারে ঠাসা। এমন মানুষরাই রাশিফলে বিশ্বাস রাখেন বা ভরসা করেন। রাশিফলের কী আল্লাহ প্রেরিত ওহী কুরআন ও সহীহ হাদীস সম্মত কোন ভিত্তি আছে? অথবা এটার পিছনে কি কোন প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সত্য ও যুক্তি কার্যকর রয়েছে? গ্রহ-নক্ষত্র-চক্র কি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ওপর সত্যিসত্যিই কোন প্রভাব ফেলে? আমাদের সমাজে পুরনো একটি প্রবাদ আছে- 'বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর'। সুতরাং 'বিশ্বাস আনুন, ফল পাবেন'- এই হল জ্যোতিষীদের প্রধান পুঁজি।
আমরা কুরআন, সহীহ হাদীস, বৈজ্ঞানিক সত্যাসত্য বা যুক্তি-তর্কে বহুদূর না গিয়েও একটি সাধারণ পদ্ধতিতে রাশিচক্রের সত্যতা যাচাই করতে পারি। এ ক্ষেত্রে একটি কথা মনে রাখা দরকার। সেটা হল- বলা হয়, জ্যোতিষ শাস্ত্রের মাধ্যমে রাশিফল গণনা করা হয়। অর্থাৎ একই শাস্ত্রের দ্বারা বিভিন্ন জ্যোতিষীরা দৈনিক বা সাপ্তাহিক বা মাসিক পত্রিকায় রাশিফল গণনা করেন। কিন্তু বিভিন্ন দৈনিক বা সাপ্তাহিক মাসিক পত্রিকায় প্রকাশিত ভিন্ন ভিন্ন রাশির যে ফলাফল বলা হয় তা কি এক রকম হয় কখনো? হয় না। যাচাই করলে দেখা যাবে একটি পত্রিকার সাথে আরেকটি পত্রিকার একই রাশির ফলাফল একরকম নয়। সবগুলোই আলাদা আলাদা। যেমন, একটি পত্রিকার মেষ রাশিতে যে কথা বলা হয়েছে আরেকটি পত্রিকায় এই মেষ রাশির গণনা কিন্তু মেলে না। হয়ত একটায় বলা হয়েছে- 'আজ আপনার শরীর ও মন ভাল যাবে। হঠাৎ করে অর্থ পাবার সম্ভাবনা আছে। কর্মক্ষেত্রেও উন্নতি যোগ আছে। কোন সুসংবাদ আপনাকে আনন্দ দেবে।' অন্য এক পত্রিকায় মেষ রাশিতে লেখা হয়েছে- 'আপনি আজ দুঃশ্চিন্তায় ভুগবেন। আর্থিক দিক থেকে ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। চাকরিতে কৌশলী না হলে বিপদ হতে পারে। আচমকা কোন দুঃসংবাদে আপনি মুষড়ে পড়তে পারেন। ইত্যাদি।'
একদিন বা এক সপ্তাহের বা এক মাসের কয়েকটি পত্রিকা মিলিয়ে পরীক্ষা করলেই বিষয়টি পরিস্কার হয়ে যাবে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, অধিকাংশই অমিলে ভরা। তবে ১০টির মধ্যে একটি-দু'টি হয়ত কাকতালীয়ভাবে মিলে যায়। এ পর্যন্তই। যেগুলো মিলে যায় সেগুলো সাধারণ কিছু বক্তব্য। যার বেশিরভাগই অসার, ভিত্তিহীন মন্তব্য এবং নির্দিষ্ট করে না বলা বাণী। যেমন, মানসিক দুঃশ্চিন্তা আছে। ব্যবসা-বাণিজ্য মোটামুটি চলবে। শারীরিক অবস্থা এক রকম থাকবে। অবিবাহিতদের বিবাহের সম্ভাবনা রয়েছে। চাকরিতে কৌশল অবলম্বন করুন। রাস্তা চলাচলে সতর্ক না হলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। বাকীতে ব্যবসা বিপজ্জনক হতে পারে। ভবিষ্যতের ভাবনায় চিন্তিত হবেন। শরীর-স্বাস্থ্যের প্রতি উদাসীন হলে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। সামান্য ব্যাপারে ঝগড়া এড়িয়ে চললে ভাল করবেন। দিনটি মোটামুটি ভালই যাবে। মনটিকে সারাদিন প্রফুল্ল রাখার চেষ্টা করুন। এই সব আর কি!
অনুমানে এ সকল অতি সাধারণ উপদেশ বা ভবিষ্যদ্বাণী জ্যোতিষ কেন, যে কেউই দিতে পারেন। এর জন্য পদবী-পদকধারী জ্যোতিষীর বালখিল্য বাণীর প্রয়োজন কী?
নিম্নে একই দিনের ৩টি পত্রিকায় প্রকাশিত রাশিফল দেয়া হল:
| রাশি | প্রথম আলো | ইত্তেফাক | জনকণ্ঠ |
|---|---|---|---|
| মেষ (Aries) | অংশীদারী কাজে কুশলী হোন। অধীনস্থদের ওপর নির্ভর করবেন না। কোন আত্মীয় উপকারে আসবে। | দূরত্ব বজায় রেখে বন্ধুত্ব করুন। ব্যবসায় বিনিয়োগ সুবিধা বাড়তে পারে। রোমান্স ও বিনোদন শুভ। | ঝুঁকির কাজ পরিত্যাগ করুন। সম্পত্তি বিষয়ক ও চাকরি ক্ষেত্রে শুভ ফল পাবেন। গুরুজনের ভ্রমণযোগ আছে। ব্যবসা ক্ষেত্র শুভ নয়। |
| বৃষ (Taurus) | অধীনস্থদের জন্য ঝামেলা বাড়বে। প্রিয়জন বা সন্তানের কোন বিষয় চিন্তার কারণ হতে পারে। পারিবারিক কাজে বয়স্ক কারো সহায়তা পাবেন। | পারিবারিক ঝামেলা বেড়ে যেতে পারে। সতর্ক হোন। ব্যবসায় চুক্তি সম্পাদন শুভ। যাত্রা শুভ। | গৃহ, সম্পত্তি ও ব্যক্তিগত শুভ ফল। গুরুজনের কারণে দুঃশ্চিন্তা। যোগাযোগ, চুক্তি ও প্রণয় শুভ। উপার্জন বৃদ্ধি। |
| মিথুন (Gemini) | পদস্থদের মন রক্ষা করে চলুন। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ভুল হতে পারে। দূর থেকে কোন অনুকূল তথ্য পেতে পারেন। যানবাহনে সতর্ক থাকুন। | সৃজনশীল কাজ শুভ। ব্যবসায় চুক্তি সম্পাদন শুভ। দূরের যাত্রা শুভ। | ব্যবসা যোগাযোগ শুভ। আর্থিক ও পারিবারিক কারণে দুঃশ্চিন্তা। বিদ্যাগত শুভ ফল। ভ্রমণে সাবধান। প্রণয় শুভ নয়। মেহমান আসতে পারে। |
পদস্থ প্রভাবশালীদের মন রক্ষা করে চলুন। সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হবেন না। কোন আত্মীয় মানসিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে। যানবাহনে সতর্ক থাকুন।
দূরের যাত্রা স্থগিত রাখাই ভাল। ব্যবসায় নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। যোগাযোগ শুভ।
পারিবারিক ও ব্যবসায়িক সমস্যা বাড়বে। স্বামী-স্ত্রীর শরীর ভাল যাবে না। ভ্রমণ, পরিবর্তন, গৃহ-সম্পতি ও যানবাহন বিষয়ক শুভ ফল।
যোগাযোগ ও প্রচারমূলক কাজে সহযোগিতা পাবেন। আর্থিক লেনদেন ও কেনাকাটায় সতর্ক থাকুন। অধীনস্থদের কাজে লাগানো সহজ হবে। কোন বন্ধু উপকারে আসবে।
মানসিক অস্থিরতা কাজের ক্ষতি সাধন করতে পারে। সতর্ক হোন। কেনাকাটায় লাভবান হতে পারেন। যাত্রা শুভ।
শরীরের যত্ন নিন, অংশীদারী কাজে ঝামেলা। ব্যবসায়ী বিনিয়োগে সাবধান। দাম্পত্য বিরোধ এড়িয়ে চলুন। অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তি হতে পারে। স্থান পরিবর্তন অশুভ।
ব্যস্ততা বাড়বে। যৌথ ও অংশীদারী কাজে মতবিরোধ বাড়তে পারে। যানবাহন ও যন্ত্রপাতি ব্যবহারে সতর্ক থাকুন। কোন আত্মীয় অস্থিরতার কারণ হতে পারে। দূর থেকে কোন অনুকূল তথ্য পাবেন। রোমান্স শুভ।
গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হতে পারে। ব্যবসায় চুক্তি সম্পাদন শুভ। রোমান্স ও বিনোদন শুভ।
ঝুঁকির কাজে সাবধান। অভিসারে সতর্ক থাকুন। সন্তান নিয়ে সমস্যা থাকবে। বর্ণচোরা বন্ধুদের থেকে সজাগ থাকুন। দূর থেকে শুভ ফল লাভে বাধা।
ব্যস্ততা বাড়বে। প্রয়োজনে পরিকল্পনা পরিবর্তন করুন। কোন ঘটনা আপনাকে আবেগপ্রবণ করে তুলতে পারে। কোন প্রভাবশালী বন্ধু আপনার উপকারে আসবে। অসুস্থদের স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে। রোমান্স শুভ।
পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সিন্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হতে পারেন। রোমান্স ও বিনোদন শুভ। যাত্রা শুভ।
গৃহসম্পত্তি ও জন্মস্থান বিষয়ক কাজে সফল হবেন। সন্তানের কারণে দূর্ভাবনা বাড়বে। প্রতিপক্ষ সক্রিয়। ঝুঁকির কাজ শুভ নয়। ব্যবসায়ে সুনাম বৃদ্ধি।
পুরনো কোন সমস্যা মানসিক অস্থিরতার কারণ হবে। কোন আত্মীয় আপনার উপকারে আসবে। যানবাহন ও যন্ত্রপাতি ব্যবহারে সতর্ক থাকুন। অন্যের জন্য ব্যয় বাড়বে।
বন্ধুর পরামর্শ কাজে আসতে পারে। দূরের যাত্রায় সাফল্য শুভ। যোগাযোগ শুভ।
পেশাগত যোগাযোগ শুভ। গুরুজন ও গৃহসম্পত্তি বিষয়ক দূর্ভাবনা বাড়বে। অপ্রত্যাশিত প্রাপ্তিযোগ। প্রণয় শুভ। ব্যবসা মন্দা।
অধীনস্থদের ওপর কোন পারিবারিক কাজে সিদ্ধান্ত গুরুজন দ্বারা উপকৃত দায়িত্ব দিয়ে নির্ভর করবেন গ্রহণে অগ্রগতি হতে পারে। হবেন। ব্যয় বাড়বে না। কোন আত্মীয় মানসিক ব্যবসায় চুক্তি সম্পাদন শুভ। যোগাযোগ ও ভ্রমণ শুভ অস্থিরতার কারণ হতে পারে। যাত্রা শুভ। নয়। ব্যবসায় মুনাফা নতুন তথ্য সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাড়বে। ঝুঁকির কাজে সহায়ক হবে। জুয়া ও ঝুঁকিপূর্ণ সাবধান। কাজে অর্থ নাশ হতে পারে। রোমান্স শুভ।
যৌথ ও অংশীদারী কাজে কুশলী পুরনো বন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ শরীরের যত্ন নিন। হোন। পদস্থদের মন রক্ষা করে হতে পারে। ব্যবসায় চুক্তি পারিবারিক ও আর্থিক চলুন। কোন আত্মীয় আপনার সম্পাদন শুভ। রোমান্স শুভ। কাজে সঙ্কট! স্বামী-স্ত্রীর উপকারে আসতে পারে। স্বাস্থ্যের স্বাস্থ্যগত দুঃশ্চিন্তা প্রতি নজর রাখুন। অন্যের জন্য বাড়বে। ব্যবসায়ী কাজে ব্যয় বাড়বে। রোমান্স ও বিনোদন উপার্জন বাড়বে। শুভ।
যৌথ ও অংশীদারী কাজে দূর থেকে নতুন কোন শুভ ব্যবসায়ী বিনিয়োগে বয়স্ক কারো সহযোগিতা তথ্য পেতে পারেন। ব্যবসায়ে সাবধান। শরীরের যত্ন পাবেন। আর্থিক লেনদেনে ঝুঁকি নিতে হতে পারে। নিন। চাকরিজীবীদের কোন প্রকার ঝুঁকি নেবেন না। রোমান্স শুভ। দিনটি শুভ। অফিস থেকে যানবাহনে সতর্ক থাকুন। ছুটি নিতে হতে পারে। রোমান্স, বিনোদন ও সৃজনশীল কাজ শুভ।
ব্যস্ততা বাড়বে। প্রয়োজনে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী শরীরের যত্ন নিন। পরিকল্পনা পরিবর্তন করুন। সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হতে ঋণবিষয়ক দুর্ভাবনা বৃদ্ধি। বয়স্ক কেউ মানসিক অস্থিরতার পারেন। কেনাকাটা শুভ। সন্তানের কারণে শান্তি কারণ হতে পারে। পদস্থদের যোগাযোগ শুভ। বিঘ্নিত। প্রণয় শুভ। কাজে লাগানো সহজ হবে। প্রতিপক্ষীয় ঝামেলা স্বাস্থ্যের প্রতি নজর রাখুন। বাড়বে।
রাশি বলা হয় সৌরজগতের কতকগুলো গ্রহ নক্ষত্রের প্রতীককে। কল্পিত এরূপ বারটি রাশি কল্পনা করা হয়। এগুলোকে বিভিন্ন গ্রহ নক্ষত্রের প্রতীক সাব্যস্ত করা হয়েছে। জ্যোতিষশাস্ত্র (অর্থাৎ, ফলিত জ্যোতিষ বা Astrology)-এর ধারণা অনুযায়ী সব গ্রহ-নক্ষত্রের গতি, স্থিতি ও সঞ্চারের প্রভাবে ভবিষ্যৎ শুভ-অশুভ সংঘটিত হয়ে থাকে। Numerology বা সংখ্যা জ্যোতিষের ওপর ভিত্তি করে এ শুভ-অশুভ নির্ণয় তথা ভাগ্য বিচার করা হয়।
এ শাস্ত্রের সবকিছুই যে কাল্পনিক, যুক্তি বা বিজ্ঞান নির্ভর নয়, বরং দলীল প্রমাণ বিহীন; তার কিছুটা ব্যাখ্যা নিম্নে করা হল:
প্রথমত, ধরা যাক রাশির কথা। জ্যোতিষশাস্ত্র মতে, রাশি হল বারটি, যথা- মেশ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ, কন্যা, তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীন। সূর্য বার মাসে বারটা রাশিতে অবস্থান করে বিধায় রাশির সংখ্যা বারটা। আর সূর্যের যে রাশিতে অবস্থানকালে কারও জন্ম হয় তাকে সেই রাশির জাতক/জাতিকা বলা হয়। কিন্তু রাশি সূর্যের অবস্থানের প্রেক্ষিতে কেন হবে, চন্দ্র বা অন্য কোন গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থানের প্রেক্ষিতে কেন হবে না, তার কোন বৈজ্ঞানিক বা দলীল সাপেক্ষ ব্যাখ্যা নেই। রাশির এ নামগুলো পুরোটাই কাল্পনিক, এ সব রাশির যে প্রতীক সাব্যস্ত করা হয়েছে তাও কাল্পনিক। এক এক রাশির নম্বর এবং তার যে মূল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ধরে নেয়া হয়েছে তাও কাল্পনিক। এ সব সম্পর্কে কুরআন-হাদীসে কোন দলীল তো নেই-ই, কোন ল্যাবরেটরিতে বৈজ্ঞানিকভাবেও এগুলো প্রমাণিত নয়।
দ্বিতীয়ত, ধরা যাক, সংখ্যা তত্ত্বের কথা। জ্যোতিষীগণ নিউমারোলজি বা সংখ্যা তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যত শুভ-অশুভ নির্ণয় তথা ভাগ্য বিচার করে থাকেন। সংখ্যা জ্যোতিষের মূল কথা হল, ১ থেকে ৯-এই নয়টি সংখ্যাই হল মৌলিক এবং এক এক সংখ্যার এক এক ধরনের প্রভাব রয়েছে। সে অনুযায়ী প্রত্যেক মানুষ এ নয় সংখ্যার যেকোন এক সংখ্যার জাতক/জাতিকা হবে এবং যিনি যে সংখ্যার জাতক/জাতিকা হবে তার জীবনে ঐ সংখ্যার প্রভাব এবং ঐ সংখ্যার চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকবে। যেমন, বলা হয়, ১ সংখ্যার জাতক/জাতিকারা অগ্রপথিক এবং অভিযাত্রিক হবে, তাদের মধ্যে একটা সহজাত সৃজনশীলতা প্রচ্ছন্ন থাকবে ইত্যাদি। ২ সংখ্যার জাতক/জাতিকারা ভদ্র ও বিনয়ী, তারা কল্পনা প্রবণ, রোমান্টিক ও শিল্পানুরাগী হবে ইত্যাদি। এখন কথা হল, এক এক সংখ্যার যে এক এক ধরনের বৈশিষ্ট্য সাব্যস্ত করা হল, তা কাল্পনিক ছাড়া আর কি? আর মানুষের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যকে এই নয়-এর গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ করার কোন যুক্তি বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে কি শুধু কল্পনার অন্ধ অনুসরণ ছাড়া?
তৃতীয়ত, জাতক/জাতিকা নির্ধারণের পদ্ধতি প্রসঙ্গে বিশ্লেষণ করা যাক। জ্যোতিষশাস্ত্র মতে, কে কোন সংখ্যার জাতক/জাতিকা তা নির্ধারণ করা হয় তার জন্ম তারিখ (ইংরেজি তারিখ) দেখে। জন্ম তারিখ ১ থেকে ৯ পর্যন্ত যেটা হবে সেটাই হল তার জন্ম সংখ্যা। আর ৯-এর উপরের যৌগিক সংখ্যা হলে সেই যৌগিক সংখ্যাকে পারষ্পরিক যোগ দিতে দিতে যে মৌলিক সংখ্যা বের হবে সেটাই হবে তার জন্মসংখ্যা এবং সে হবে ঐ সংখ্যার জাতক/জাতিকা। যেমন, ১৮ তারিখে কারও জন্ম হলে সে হবে (১+৮=৯) ৯ সংখ্যার জাতক/জাতিকা। ২১ তারিখে জন্ম হলে সে হবে (২+১=৩) ৩ সংখ্যার জাতক/জাতিকা। ২৯ তারিখে জন্ম হলে সে হবে (২+৯=১১- ১+১=২)২ সংখ্যার জাতক/জাতিকা।
জ্যোতিষশাস্ত্র মতে, জাতক/জাতিকাদের আরও দু'ধরনের সংখ্যা আছে। তা হচ্ছে কর্ম সংখ্যা ও নাম সংখ্যা। জন্ম সংখ্যা হচ্ছে জন্ম তারিখ/তারিখের যোগফল, আর কর্ম সংখ্যা হচ্ছে জন্ম বছর, জন্ম মাস ও জন্ম তারিখ-এ সব কয়টার যোগফল। যেমন, কেউ জন্ম গ্রহণ করল ১লা নভেম্বর ১৯৪৮ সালে, তাহলে নভেম্বর যেহেতু ১১তম মাস তাই কর্মসংখ্যা বের হবে এভাবে ১+১+১+১+৯+৪+৮=২৫ আবার ২+৫=৭, অতএব ১-১১-১৯৪৮ সালে জন্মগ্রহণকারীর জন্মসংখ্যা ১ আর কর্মসংখ্যা হল ৭।
এখন, জ্যোতিষীদের ধারণা হল জন্মসংখ্যা নির্দেশ করে জাতক/জাতিকার সহজাত চরিত্র-বৈশিষ্ট্য। আর কর্মসংখ্যা থেকে জানা যায়, জাতক/জাতিকার জীবনে কোন্ কর্মপন্থা অবলম্বন করা উচিত, কোন পেশায় তার অগ্রগতি নিহিত। কোন্ পথে অগ্রসর হয়ে সে সাফল্য লাভ করতে পারবে ইত্যাদি। জন্মসংখ্যার কর্মসংখ্যাও ১ থেকে ৯ পর্যন্ত মোট ৯টি।
এখন কথা হল, জন্মসংখ্যা দ্বারা যে জাতক/জাতিকা নির্ধারণ হবে তার কি প্রমাণ? আর কর্মসংখ্যার জন্য জন্মের তারিখ, মাস ও সন সবটা যোগ করতে হবে এবং জন্মসংখ্যার জন্য শুধু জন্মের তারিখ দেখা হবে সন-মাস যোগ করা হবে না- এ সবের ভিত্তি কি? প্রকৃতপক্ষে এখানে কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি থাকা সম্ভব নয়। কারণ, এটা কোন পদার্থগত বিষয় নয়। থাকলে কোন ইলাহী দলীল থাকতে পারত, তাও অনুপস্থিত। তাহলে, কল্পনা ব্যতীত আর কি ভিত্তি রয়ে গেল? আর একটা কথা চিন্তা করা যায়। তা হল, জন্মসংখ্যা ও কর্মসংখ্যা- এ সবই বের করা হয় ইংরেজী তারিখ ও ইংরেজী সন ও মাস থেকে। ইংরেজী সন গণনা করা হয় ঈসা (আঃ)-এর জন্ম থেকে। তাহলে ঈসা (আঃ)-এর জন্মের ভিত্তিতে শুরু করা হিসাবের সাথে পুরো পৃথিবীর মানুষের জন্মসংখ্যা, কর্মসংখ্যা তথা চরিত্র ভাগ্য সবকিছুর সম্পর্ক, এরই বা কি প্রমাণ?
জ্যোতিষীদের ধারণা মতে, জন্মসংখ্যা ও কর্মসংখ্যার মতো মানুষের রয়েছে একটি নামসংখ্যা। প্রত্যেকের নামের ইংরেজি অক্ষরগুলোর মান (সংখ্যা) থেকে বের করা হয় নামসংখ্যা। ইংরেজীতে হরফের মানসংখ্যা নিম্নরূপ:
1 2 3 4 5 6 7 8
A B C D E U O F
I K L M H V Z P
J R S T M N W
Q G X
Y
জ্যোতিষীদের ধারণা হচ্ছে প্রত্যেকের নামের মধ্যে তার জীবনের লক্ষ্য ও মিশন সম্পর্কে নির্দেশনা লুকিয়ে থাকে। কি কি গুণাবলী অর্জন করতে হবে, কি কি বর্জন করতে হবে, কোন্ কোন্ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে নামের সংখ্যার মধ্যে এ সব কিছুরই দিক নির্দেশনা থাকে। এ ক্ষেত্রেও জ্যোতিষীগণ ১ থেকে ৯ মোট ৯টি সংখ্যা নির্ধারণ করে প্রত্যেক সংখ্যার জন্য এক এক ধরনের দিক নির্দেশনা করে রেখেছেন।
আসলে, জ্যোতিষীগণ কি এর কোন জবাব দিতে পারবেন যে, ইংরেজী এক এক অক্ষরের এক এক মান দেয়া হয়েছে, এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কি? কিংবা এর স্বপক্ষে কোন ইলাহী প্রমাণ আছে কি? আর নামসংখ্যার মধ্যে যদি কোন জীবনের দিক নির্দেশনা লুকিয়ে থাকেও তবে তা বের করতে ইংরেজী অক্ষরের আশ্রয় নেয়া হবে কেন? অন্য কোন ভাষার অক্ষর গ্রহণ করা যাবে না তার কি প্রমাণ? অন্য ভাষার অক্ষরে গেলে যে নামসংখ্যায় পার্থক্য দেখা দেবে তার সমাধান কি?
আবার কেউ কেউ কুরআন-হাদীসের ভাষা আরবী অক্ষরের মান থেকে মানসংখ্যা বের করে থাকে। কিন্তু মনে রাখা দরকার যে, আরবী অক্ষরের যে মান ধরা হয়, তাও কুরআন-হাদীস বা বৈজ্ঞানিক তথ্য দ্বারা প্রমাণিত নয়, তাছাড়া আরবী অক্ষর অনুযায়ী নামসংখ্যা বের করার পর ঐ সংখ্যার যে প্রভাব বা দিক নির্দেশনা সাব্যস্ত করা হচ্ছে, তা তো জ্যোতিষীদেরই সাব্যস্ত করা কাল্পনিক ব্যাপার।
প্রকৃতপক্ষে, জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রত্যেকটা উপাত্ত সম্পর্কে সামান্য চিন্তা করলেই প্রতিভাত হবে যে, তা একান্তই কল্পনা প্রসূত এবং দলীলবিহীন আন্দাজ মাত্র।
অধুনা জ্যোতিষশাস্ত্রের চর্চা বেশ ব্যাপকতা লাভ করেছে। ভাগ্য বিড়ম্বিত মানুষ সর্বশেষ পন্থা হিসেবে জ্যোতিষীদের দারস্থ হচ্ছেন এবং তাদের দেয়া পাথর বা অন্য কোন পরামর্শকে ভাগ্য ফেরানোর নিয়ামক ভেবে শেষ রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। অনেকে বিবাহ-শাদি, ব্যবসা-বাণিজ্য, লেখা-পড়া, বিদেশ গমন, ঘর-বাড়ি নির্মাণ ইত্যাদি জীবনের অনেক ক্ষেত্রের ভবিষ্যৎ শুভ-অশুভ জানার জন্য জ্যোতিষীদের আগাম ব্যবস্থাপত্র গ্রহণ করে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিচ্ছেন এবং সাফল্য লাভ করবেন বলে আত্মস্থ থাকছেন। এভাবে জ্যোতিষীদের ভবিষ্যদ্বাণীকে তারা জীবন পরিচালনার গাইড বানিয়ে চলছেন। জ্যোতিষীদের ব্যবসাও ভাল চলছে। জ্যোতিষশাস্ত্র চর্চার ব্যবসা ভাল দেখে এ বিদ্যা শিক্ষার হারও তাই বেড়ে চলেছে। কিন্তু এ শাস্ত্রের হিসাব-নিকাশ ও তার ভবিষ্যদ্বাণীতে বিশ্বাস স্থাপন বা এ শাস্ত্র চর্চা ইসলামে কতটুকু অনুমোদিত তা ঈমান-আক্বীদা সংরক্ষণে প্রয়াসী এবং জীবনের প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে ইসলামের অনুশাসন মেনে চলতে আগ্রহী একজন সচেতন মুসলিমকে অবশ্যই জানতে হবে।
বর্তমানে আমাদের দেশে অনেক জ্যোতির্বিদ রয়েছেন যারা তারকার গতিবিধি লক্ষ্য করে এর ফলাফল দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকায় প্রকাশ করে থাকেন। এর দ্বারা তারা জনগণকে তাদের ভাগ্য সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করে আগাম সতর্ক করেন। রাশিফলের এ জাতীয় প্রচারণা আমাদের দেশে এখন একটি সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। রাজধানী ঢাকাতে তাদের অনেকের চেম্বার রয়েছে। সাধারণ লোকেরা তাদের নিকট নিজ নিজ ভাগ্যে ভাল বা মন্দ কী অপেক্ষা করছে, তা আগাম জানার জন্য গমন করে। যারা ভাগ্য বিড়ম্বনার শিকার হয়েছে, তারা ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য পরামর্শ নেয়ার উদ্দেশ্যে তাদের নিকট গমন করে। অথচ তারা জানে না যে, ইসলাম জ্যোতির্বিদদের মানুষের ভাগ্য সম্পর্কিত ভবিষ্যদ্বাণীকে স্বীকার করে না এবং নিম্ন জগতের প্রাণীর ভাগ্যে উর্ধ্ব জগতের গ্রহ, নক্ষত্র ও তারকার প্রভাব আছে বলে দীর্ঘকাল থেকে মানুষের মাঝে যে বিশ্বাস গড়ে উঠেছে, সেটাকে ইসলাম শির্কী চিন্তাধারা হিসেবে গণ্য করে; কেননা, বিশ্বজগত এককভাবে মহান আল্লাহ্র নির্দেশ ও তাঁর পরিকল্পনানুযায়ী পরিচালিত হয়ে থাকে। আমাদের ন্যায় সকল গ্রহ, নক্ষত্র ও তারকারাজী আল্লাহ্রই সৃষ্টি। এগুলোকে আমাদের ভাগ্যের ভাল বা মন্দের উপর প্রভাব বিস্তার করার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। এ সব একান্তই আবহমান কালের মানুষের কল্পনা ও ধারণাপ্রসূত কথা বৈ আর কিছুই নয়। এ সব বিশ্বাসের ফলেই একদা মানুষ তারকার কাল্পনিক মূর্তি বানিয়ে এর পূজা করতে অভ্যস্ত হয়েছিল।
📄 শনির দশা, ধোঁকা খাসা
আমাদের সমাজে শনি বলে একটি শব্দ বেশ প্রচলিত। শব্দটির ব্যবহার হয় এভাবে- শনির দশা, শনির দৃষ্টি, শনির শুভ দৃষ্টি, শনির অশুভ দৃষ্টি, শনির ভর ইত্যাদি। আবার যারা জ্যোতিষী, হাতের রেখা দেখে ভাগ্য গণনা করেন অথবা রাশিফল বলে দেন; তারা বলেন, 'শনির প্রভাব, শনির কুদৃষ্টি ও শনির বলয়।' দিনকাল খারাপ যাচ্ছে- শনির আছর। অসুখ-বিসুখ লেগে আছে, শনির নজর পড়েছে। আয়- উন্নতি হচ্ছে না- শনি ভর করেছে। অর্থাৎ শনি যত নষ্টের মূল। খারাপ, অনিষ্ট ও অকল্যাণের প্রতীক হল এ শনি। শনির নজরে পড়লে আর কারো রক্ষা নেই; ক্ষতি মেনে নিতেই হবে। সমাজের বেশিরভাগ মানুষের ধারণা এ রকমই। আর এটা চলে আসছে যুগ যুগ ধরে।
সকল অনিষ্টের হোতা এ শনিটি আসলে কী কিংবা শনি সম্পর্কে এমন ধারণা কিভাবে গড়ে উঠল, সে সম্পর্কে আমরা একটু খোঁজ-খবর করতে পারি।
হিন্দু ধর্মের পুরনো কাহিনীতে এক দেবতার নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি হলেন শনি দেবতা। সূর্যদেবের স্ত্রী ছায়ারাণীর গর্ভে জন্ম নিয়েছিল দুই পুত্র সন্তান। এদের একজন মনু ও অন্যজন শনি। শনিদেবের স্ত্রীর নাম পার্বতী। তিনি চিত্ররথের কন্যা। শনিদেব ছিলেন অত্যন্ত দুরাচারী। সকলের ক্ষতি ও অকল্যাণ কামনা করাই ছিল তার প্রধান কাজ। চিত্ররথ একদিন দক্ষযজ্ঞের অনুষ্ঠানের মধ্যে কন্যার সামনে শনির নিন্দা করেন। এতে পার্বতী লজ্জায় ক্ষোভে মৃত্যু আলিঙ্গন করে এবং পরে পুনরায় জন্ম নেন। এবার তার জন্ম হয় হিমালয়ের স্ত্রী মেনকার গর্ভে। বিয়ে হয় মহাদেবের সাথে। বিয়ের পর অনেক সাধ্য সাধনা করে অবশেষে সন্তান হয় পার্বতীর। দেবতারা একে একে নবজাতককে দেখে আশীর্বাদ করলেন। আশীর্বাদ করলেন শনিদেবও। সকলে চোখ মেলে দেখে ধন্য ধন্য করলেও শনিদেব কিন্তু নবজাতকের দিকে দৃষ্টি দিলেন না। পার্বতী খুব রেগেমেগে এর কারণ জানতে চাইলেন। শনি বললেন, "চিত্ররথের কন্যা পার্বতী ছিল আমার স্ত্রী। আমি তার প্রতি অবিচার করেছি। নির্যাতন করেছি। একদিন তার অতি সামান্য ইচ্ছাকেও অপূর্ণ রেখেছি। এ জন্য সে আমাকে অভিশাপ দিয়ে বলে, 'তুমি একবার আমার দিকে চেয়ে দেখারও প্রয়োজন বোধ করলে না। আমার আবদার না হয় না-ই রাখলে! ঠিক আছে, এখন থেকে তুমি যার দিকে তাকাবে, তার তৎক্ষণাৎ ধ্বংস অনিবার্য।' সেই থেকে আমি মাটির দিকে চোখ রেখে মাথা নিচু করে থাকি।"
পার্বতী কিন্তু শনিদেবের এ কথা বিশ্বাস করতে পারে না। সে বলে, 'আপনার এ কথা কিছুতেই সত্য হতে পারে না। আপনি আমার সাথে ছলনা করছেন। আমার ছেলেকে দেখে আশীর্বাদ করতে চাইছেন না বলে এ কথা বলছেন। ছেলে দেখে আশীর্বাদ না করা পর্যন্ত ছাড়ছি না আপনাকে।' শনিদেব মহা ফাঁপড়ে পড়ে গেলেন। তিনি অন্য কোন উপায় না দেখে অবশেষে পার্বতীর পুত্র গণেশের দিকে দৃষ্টি দিলেন। আর যায় কোথা! সঙ্গে সঙ্গে ঘটে গেল ঘটনা। ধড় থেকে গণেশের মুণ্ডু খসে পড়ে গেল মাটিতে। নিজ পুত্রের এ অবস্থায় পার্বতী তো অগ্নিশর্মা। অগ্নিদৃষ্টিতে তিনি আরও একবার অভিশাপ দিলেন শনিকে- 'আমার সন্তানের এ অবস্থার জন্য আপনি বাকী জীবন খোঁড়া হয়ে থাকবেন।' একদিকে মন্দ দৃষ্টি এবং সে সঙ্গে খোঁড়া হয়ে পরবর্তী বছরগুলো পাড়ি দিয়েছিলেন বেচারা শনিদেব।
এ হল শনির উৎস-কাহিনী। জানা যায়, হিন্দুশাস্ত্রের এ কাহিনীর ওপর ভর করে পুরনো আমলের চতুর জ্যোতিষীরা শনি-ভীতি ছড়িয়ে দেন মনুষ্য সমাজে। সেই থেকে আরো কয়েকগুণ ভয়াল-দর্শন করে তোলা হয়েছে শনিকে, শুধুমাত্র নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য। জ্যোতিষ মানেই সমাজের পরগাছা, অলস, প্রতারক একদল চতুর মানুষ। শনিকে এরা প্রতারণার অন্যতম বাহন হিসেবে ব্যবহার করে এসেছেন। আসলে শনি মানেই অনিষ্ট- এ ভাবনা ভাবাটাই হল একটা বড় অনিষ্ট। শনির কোন দশাও নেই, দৃষ্টিও নেই। এর কোন সত্যতা নেই কিছুমাত্র। এ সব গল্প ফেঁদে সরল, ধর্মভীরু, অন্ধবিশ্বাসী, অশিক্ষিত মানুষকে বোকা বানিয়ে স্বার্থোদ্ধার করা হয় মাত্র। যুগ পরম্পরায় চলে আসা এ সকল কাল্পনিক, অসত্য কাহিনীতে মানুষ অজান্তেই বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং করছে প্রতিনিয়ত। কারণ প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে এগুলো শুনতে শুনতে প্রথমে বিশ্বাস ও পরে দৃঢ় বিশ্বাসে পরিণত হয়ে গেছে। অনেকে জ্যোতিষের কথায় গলে গিয়ে শনির দশা এড়াতে নগদ মূল্যে ক্রয় করেন নীলা (নীলকান্তমনি) পাথর। জ্যোতিষীরা বলেন, 'নীলা পাথরের আংটি পরলে শরীরের রং উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। শনির দৃষ্টি খুঁচিয়ে দিয়ে দুঃখ, অভাব, রোগ, ব্যাধি ও কষ্ট দূর করে দেয়।' এ সকল দাবীকে সত্য প্রমাণ করার জন্য জ্যোতিষীরা কোন প্রকার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হাজির করেননি। বরং বলা যায়, জ্যোতিষদের এ সব কথা একেবারে মিথ্যা, অবৈজ্ঞানিক ও প্রতারণাপূর্ণ। সুতরাং শনির দশা-দৃষ্টিও বলে যেমন কিছু নেই, তেমনি এর প্রভাব প্রতিরোধে রত্ন-পাথর ধারণ করারও কোন যুক্তি নেই। পুরো ব্যাপারটিই আসলে অসত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
এতক্ষণ তো আমরা কল্প শনির কাহিনী বললাম। এবার আসল শনির কাহিনী না বললে তো খুব অন্যায় হবে। আসল শনি হল শনিগ্রহ। অনেক অজানা, অনেক রহস্যময়তায় ঢাকা এ শনিগ্রহ। পৃথিবীর অনেক কিছুই তো অজ্ঞাত রয়েছে আমাদের। অর্থাৎ আমরা যেখানে এখনও পৌঁছাতে পারিনি, ভেতরের সত্যকে উদ্ঘাটন করতে পারিনি; সেটাই হল রহস্য। এ রহস্যগুলো নিয়ে নানা কল্পকথা তৈরি হয়। সে যাক, আমরা এখন আসল শনি অর্থাৎ শনিগ্রহ সম্পর্কে কিছু তথ্য জেনে নিই।
সূর্য থেকে শনিগ্রহের দূরত্ব গড়ে ৮৮ হাজার ৬৭ লক্ষ মাইল। এ অকল্পনীয় দূরত্ব পেরিয়ে শনিগ্রহে সূর্যের আলো পৌঁছাতে সময় লাগে ৭৯ মিনিট। শনি সূর্যের চারদিকে প্রদক্ষিণ করে। এতে সময় লাগে প্রায় ৩০ বছর। শনির পরিমণ্ডলে নানা প্রকার গ্যাস আছে। এর মধ্যে রয়েছে- হাইড্রোজেন, হিলিয়াম, মিথেন, অ্যামোনিয়া, পানি, ইথেন, অ্যাসিটিলিন, ফসফিন, কার্বন-মনোক্সাইড, হাইড্রোজেন সায়ানাইড ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড। সূর্যের আলো শনিগ্রহে পৌঁছায় সবচেয়ে কম। শনির বলয় মানুষের নিকট এক পরম বিস্ময়। গ্যালিলিও প্রথম তার দূরবীন দিয়ে শনির বলয় আবিষ্কার করেন। কিন্তু তিনি এর প্রকৃত রূপ ভালোভাবে বুঝতে সক্ষম হননি। পরে হেউগেন্স শনির বলয় আবিষ্কার করেন। এখন ৩টি মহাকাশযান পাঠিয়ে মানুষ শনিসহ অন্যান্য গ্রহ সম্পর্কে অনেক তথ্য জেনেছে। ভয়েজার ১, ২ ও ৩ নামক নভোযান এ তথ্যগুলো আমাদের অবহিত করেছে। শেষ কথা হল, শনি সম্পর্কে এত তথ্য জানতে গিয়ে মহাকাশযানগুলোকে কিন্তু একবারও শনির দশায় পতিত হতে হয়নি।