📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 গলায় তাবলে অবস্থান হয়, এ বিশ্বাসেও ক্ষতি অতিশয়

📄 গলায় তাবলে অবস্থান হয়, এ বিশ্বাসেও ক্ষতি অতিশয়


প্যাঁচা ডাকলে অমঙ্গল হয় এ বিশ্বাসেও ক্ষতি অতিশয়
দেখতে ছোটখাট। ড্যাবডেবে চোখ দুটো রাতে জ্বলজ্বল করে জ্বলে। হালকা ছাই রঙের পালক গায়ে। দেখলে একটু ভয়ভয়ই লাগে। এমন একটি পাখির নাম প্যাঁচা। আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান তথা ভারতীয় উপমহাদেশসহ এ পৃথিবীর অনেক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমন বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে যে, প্যাঁচা ডাকলে অমঙ্গল হয়। অর্থাৎ যে গাছে বসে প্যাঁচা ডাকবে তার আশেপাশের বাড়ির লোকজনের ক্ষয়ক্ষতি রয়েছে সামনে। শুধু প্যাঁচাই কিন্তু নয়, আরও অনেক প্রাণীর ব্যাপারেও এ রকম ধারণা চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। যেমন- কাকের ডাক, কুকুর বা বিড়ালের কান্না ইত্যাদি।
এ বিষয়টি একটু তলিয়ে দেখা যাক:
সাধারণভাবে একটা জিনিস বোঝা যায় যে, যার গলা খনখনে, কণ্ঠ কর্কশ তাকেই আমরা অশুভ বলে ধরে নেই। যে সকল প্রাণীর ডাক শুনতে ভাল লাগে না, বিরক্তি সৃষ্টি করে সেগুলোকে অমঙ্গলজনক [অকল্যাণকর] ডাক বলে ধরে নিই। আর, এ ডাক-হাঁক যদি গভীর ও নিস্তব্ধ রাতে শোনা যায় তা আরও ভয়াবহ বলে মনে হয়। নিরিবিলি ঘুমেরও ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। আসলে কর্কশ কণ্ঠে ভয়ভয় ভাব জাগানো এবং ঘুম ভাঙানো- এ দুই কারণে প্যাঁচার ডাককে অকল্যাণকর বা অশুভ বলা হয়। এ পাখিটি কিন্তু দিনে বেরোয় না। বেরোয় রাতে। তাই এর দিনে ডাকার প্রশ্নই ওঠে না। বেরোয়, বেড়ায় এবং ডাকেও রাতে। এমন একটি প্রাণী খুঁজে পাওয়া যাবে না যার ডাক সুন্দর, আকর্ষণীয় কিন্তু মঙ্গলজনক [কল্যাণকর] বা শুভ। কোকিলের কথাই ধরা যায়। কোকিল পাখি দেখতে খুব সুন্দর নয়, রঙ কালো। কিন্তু ডাকটি বড়ই মধুর। তাই বলে ওর ডাক কোন শুভ বা কল্যাণের বার্তা বয়ে আনে, এমন কথা কেউই বলবেন না।
প্যাঁচা রাতে হঠাৎ করে ডেকে উঠে সুখের ঘুম নষ্ট করে এটুকুই ওর দোষ। কিন্তু ওর ডাকে কোন অশুভ বা অকল্যাণকর কিছু নেই। একটা ব্যাপারে প্যাঁচা কিন্তু আমাদের উপকারই করে। ধান পাকলে ধান ক্ষেতে বা বাড়িতে কত দুষ্ট প্রাণীর উপদ্রব শুরু হয়। মেঠো ইঁদুর, নেংটি ইঁদুর, চড়ুই পাখি, চামচিকা ইত্যাদি প্রাণীর উৎপাতে কৃষককে দিশেহারা হতে হয়। এগুলো ধান বা অন্যান্য ফসলের খুব ক্ষতি করে। ওদিকে প্যাঁচার প্রিয় খাবার হল ইঁদুর, চড়ুই ও চামচিকা। রাত জেগে প্যাঁচা ক্ষেতে বা বাড়িতে চরে বেড়িয়ে ইঁদুর ধরে ধরে খায়। ফসলকে বলা হয় বরকতময়। প্যাঁচা যেহেতু এ ফসলের সংরক্ষণে সহায়তা করে, তাই প্যাঁচা তো আসলে কৃষকের বন্ধু।

📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 সাত-তেইশ-তেরো, লাগায় শুধু গেরো

📄 সাত-তেইশ-তেরো, লাগায় শুধু গেরো


Unlucky 13 বলে একটি কথা ভদ্র এবং শিক্ষিত সমাজে খুব চলে। কথাটির বাংলা হয় দুর্ভাগ্যের ১৩ অথবা ১৩-এর দুর্গতি। যেকোন জিনিস গণনায় ১৩-তে পৌঁছলে আর রক্ষা নেই। গোলমাল লেগে যাবার সম্ভাবনা সামনে। হতে পারে ভণ্ডুলও। ১৩-তে সব ভেস্তে যাবার পূর্বাভাস রয়েছে। কারণ তেরো মানেই হল অপয়া, অমঙ্গলজনক, অকল্যাণকর, অশুভ। তাই Unlucky 13। এ রকম ধারণা আমাদের দেশে অনেক দিন ধরেই চলে আসছে। তবে এ ধারণার উৎপত্তি কিন্তু আমাদের দেশে নয়। সেটা চালু হয়েছে দু'-একশ' বছরে নয়, কয়েকশ' বছর আগে। পশ্চিমের দেশ থেকে ব্যবহারিক জীবনের অনেক উপাদান এসেছে আমাদের দেশে। আমাদের দেশ তো এক সময় ব্রিটিশ বা ইংরেজরা শাসন করেছে। শাসনের মাধ্যমে ওরা চালিয়েছে শোষণ-লুণ্ঠন। এ দেশের সরল মানুষকে বোকা বানিয়ে ধোঁকা অশিক্ষা-কুশিক্ষা ছড়িয়ে দিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেছে। এ জন্যই ওরা ওদের সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস বয়ে এনে আমাদের সমাজে চালু করেছে। মানুষ যাতে এসবে ডুবে থেকে সুশিক্ষিত ও সচেতন হতে না পারে। Unlucky 13 হয়ত এ পথ ধরেই সচল হয়েছে আমাদের মধ্যে।
আসল কথা হচ্ছে, কোন সংখ্যাই Lucky (সৌভাগ্যের) নয়। আবার Unlucky (দুর্ভাগ্যের)-ও নয় কোন সংখ্যাই। সংখ্যার আবার Lucky-Unlucky কী? সংখ্যার কোন শক্তি নেই। কোন ক্ষমতাও নেই সংখ্যার। কেবল পরিমাণ বা আয়তন জানার জন্য সংখ্যার দরকার হয়। অংকের সংখ্যাগুলো সে ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়। কিন্তু এগুলো সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যের কারণ হবে- এ ধারণা কিন্তু নেহায়েতই ভুল। এর কোন মানে নেই, ভিত্তিও নেই। তাহলে Unlucky 13-এর এ ধারণাটি এলো কোথেকে? হ্যাঁ, অন্য অনেক কুসংস্কারের মতো Unlucky 13-এর এ ধারণাটিও এসেছে এক ভ্রান্ত ধর্মশাস্ত্র থেকে। বাইবেল নামক খ্রিস্টানদের যে তথাকথিত ধর্মগ্রন্থ রয়েছে, সেই বিকৃত বাইবেলেই এর কথা রয়েছে। বাইবেলে এক কাহিনীর বর্ণনা রয়েছে। কাহিনীটি 'Last Supper' বা 'শেষ নৈশভোজ' নামে পরিচিত। মূলত বিকৃত বাইবেলে বর্ণিত যিশুর 'শেষ নৈশভোজ'-এর ঘটনা থেকেই এ বিশ্বাসের উৎপত্তি ঘটেছে। এ নিয়ে সারা পৃথিবীতে অনেক লেখালেখি হয়েছে, ছবি আঁকা হয়েছে, গানও গাওয়া হয়েছে। সুতরাং খুবই বিখ্যাত 'শেষ নৈশভোজ' নামক সেই গল্পটি। তো গল্পটি এ রকম- 'শেষ ওই ভোজসভায় যীশুখ্রীষ্ট উপস্থিত ছিলেন। সঙ্গে ছিল তার বারোজন অনুগামী/সহচর বা শিষ্য। অর্থাৎ যীশুকে নিয়ে মোট তেরো জন। ভোজসভার ওই আসরে শেষ যে ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত হন তিনি হলেন জুডাস।' এই জুডাস নামক এ ব্যক্তিটি যীশুর সাথে প্রতারণা করেছিল বলে ধারণা করা হয়। এই জুডাসের কারণেই নাকি যীশুখ্রীষ্টের মৃত্যু হয়। আর এ ঘটনার পর থেকে যীশুর ভক্তকুল ১৩-কে অকল্যাণ ও বিপদের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। যা যুগ যুগ ধরে চলে এসে আজও ব্যাপকভাবে প্রচলিত।
দুর্ভাগ্যের প্রতীক ১৩-সংখ্যাটি সম্পর্কে এ ধরনের বিশ্বাসটি অনেক প্রাচীন। রোমানরা বিশ্বাস করত যে, ১৩ সংখ্যাটি মৃত্যু ও ধ্বংসের প্রতীক। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার (নরওয়েরর) প্রাচীন অধিবাসীদের পৌরাণিক কাহিনীগুলোতে দাবী করা হয় যে, কোথাও ১৩ জনের অতিথি সমৃদ্ধ কোন ভোজসভা হচ্ছে মূলত শয়তানের আত্মার সম্মিলন। আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করে যে, ১৩ জন ব্যক্তি যেখানে কোন ভোজসভা করছে, সেখান থেকে যে ব্যক্তি প্রথমে উঠে যাবে সে ওই বছরের মধ্যেই মারা যাবে।
বাড়ি করতে ১৩ সংখ্যা পরিহার করে বারো বা চৌদ্দ তলা করা হয়। হোটেলে কামরার নম্বর তেরোর (১৩) বদলে হয় ১২ক। তেরো তারিখে দূরের যাত্রা স্থগিত রাখা হয়। সহজে তেরো নম্বর জার্সি পরা খেলোয়াড়কে মাঠে নামানো হয় না। কোন ব্যাপারেই সহজে কেউ ১৩ সংখ্যার ধারকাছ মাড়াতে চান না। খুব শিক্ষিত লোকও সন্তর্পণে এড়িয়ে চলেন তেরকে।
প্যারিসে ১৩ তলা কোন বিল্ডিং নেই। জাতীয় পর্যায়ের লটারি থেকে ইতালি সম্পূর্ণরূপে ১৩ সংখ্যাটিকে বাদ দিয়ে থাকে। আমেরিকার লোকজন সংখ্যা ১৩-কে অশুভ বলে মনে করে। আর এ কারণেই অধিকাংশ বহুতল বিল্ডিংয়ের ১৩ তলাকে ১৪ তলা বলা হয়। কোন শুক্রবার ১৩ তারিখ হলে এ দিনটিকে যেহেতু বিশেষভাবে অশুভ মনে করা হয়, তাই অধিকাংশ লোক এই শুক্রবারে কোথাও ভ্রমণ করা বা কারো সাথে সাক্ষাত করা থেকে বিরত থাকে। আবার এই শুক্রবারে ক্ষতিকর কোনকিছু ঘটলে তৎক্ষণাৎ তারা শুধু এ দিনটিকেই দায়ী করে থাকে। যদি কেউ মনে করে যে, এ কুসংস্কারটি শুধু সাধারণ জনগণের মধ্যেই প্রচলিত তাহলে সে ভুল করবে। কারণ, উদাহরণস্বরূপ বলা যায়-
১৯৭০ সালে এ্যাপোলো চন্দ্র অভিযান দুর্ঘটনায় পতিত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। ওই মহাকাশযানটিতে একটি বিস্ফোরণ ঘটে এবং অক্সিজেন বের হয়ে যেতে থাকে। পৃথিবীতে অবতরণের পর নভোযানটির ফ্লাইট কমান্ডার বলেন, তাঁর এ বিষয়টি জানা ছিল যে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। তাঁকে এর কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তর দেন যে, এপ্রিলের ১৩ তারিখ শুক্রবার ১৩.১৩ ঘটিকায় (অর্থাৎ ১:১৩ টায়) আকাশে উড্ডয়ন করা হয়েছিল এবং ফ্লাইট নম্বরও ছিল এ্যাপোলো ১৩।
১৯২৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর শুক্রবার দিন আমেরিকার ফ্লোরিডা স্টেইটের Puerto Rico এলাকায় প্রলংকারী এক হারিকেনে ২০০০ লোকের প্রাণহানি ঘটে।
প্রতি মাসের ১৩ তারিখ সকল প্রকার ব্যবসায়িক লেনদেন এবং ট্রেন ও বিমান চলাচল বন্ধ রেখে আমেরিকা প্রতি বছর প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি গুণছে।
১৩ তারিখের শুক্রবারকে অশুভ মনে করার পিছনে কমের পক্ষে দু'টি কারণ রয়েছে। প্রথমত, যিশুকে ক্রশবিদ্ধ করে হত্যা করার কথা ছিল এ শুক্রবারেই। দ্বিতীয়ত, মধ্যযুগীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ডাইনিরা সাধারণত শুক্রবারে তাদের আলোচনা সভায় মিলিত হতো।
এ ১৩-সংখ্যাটিই আবার অনেকের জন্য সৌভাগ্যের প্রতীকও বটে! যেমন- কেন্দ্রীয় আমেরিকার অ্যাজটেক ও মায়িআ জাতির লোকদের নিকট ১৩ সংখ্যাটি একটি পবিত্র সংখ্যা হিসেবে গণ্য।
ঐতিহ্যগতভাবে চীনে ১৩ সংখ্যাটি একটি সৌভাগ্য আনয়নকারী সংখ্যা।
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ১৩ সংখ্যাটিকে শ্রদ্ধা, সম্মান ও আনুষ্ঠানিকভাবে আনুগত্য প্রদর্শন করে থাকে।
গোঁড়া ইয়াহুদীদের ধর্মগ্রন্থ ১৩ টি মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ১৩-কে নিয়ে এ ধরনের আশঙ্কা ও বিভ্রান্তির কোন কারণই নেই, থাকতে পারে না। অন্য সকল সংখ্যার মতো তেরোও একটা নিরীহ সংখ্যা। এর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপন্ন হবার ভয় অমূলক, অযৌক্তিক, বিজ্ঞান ও আল্লাহ্র বিধান বিরোধী। নানা কুসংস্কারের অন্যতম একটি কুসংস্কার। মানুষই এ কুসংস্কার তৈরি করে তার বিপদ বহন করছে। আর ১৩-এর মতো কুসংস্কার থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকে বিপদ মুক্ত করতে হবে তাওহীদ ও শির্ক সম্পর্কে সচেতন মানুষকেই।

টিকাঃ
১. World of Facts, p. 165
২. স্পেন কর্তৃক মেক্সিকো জয়ের (১৫১৯ খ্রি.) আগে যে জাতি সেখানে সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল, সেই জাতির লোকজন।
৩. পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত গুয়াটেমালা এবং মেক্সিকোতে বসবাসকারী রেড ইন্ডিয়ান জাতির মানুষ।

📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 হাঁচি-টিকটিকি-কাঁদা, কিছু নয় কাঁদা

📄 হাঁচি-টিকটিকি-কাঁদা, কিছু নয় কাঁদা


একটি স্কুল। স্কুলটির চতুর্থ শ্রেণীতে একদিন পঞ্চম ঘন্টায় সাধারণ জ্ঞানের ক্লাস চলছিল। পুস্তকের পাঠ্যসূচীর ফাঁকে শিক্ষক পাঠ্যবহির্ভূত আরো কিছু কথা ছাত্র-ছাত্রীদের জানানোর প্রয়াস পাচ্ছিলেন। কিছু কথাকে সাধারণ জ্ঞানের আওতাভুক্ত করে উপস্থাপন করছিলেন তিনি। এগুলোকে ব্যবহারিক জীবনে মেনে চলার পরামর্শও যথারীতি দান করছিলেন। বলছিলেন, ভাত খেতে খেতে হাঁচি উঠলে মনে করতে হবে দূর থেকে কেউ মনে করছে। অথবা খেতে খেতে বা কথা বলার সময় জিভে কামড় খেলে ধরে নিতে হয় কেউ বকাবকি করছে। আবার বলছিলেন, বামচোখের পাতা কাঁপলে অমঙ্গল এবং ডানচোখের পাতা কাঁপলে মঙ্গল বয়ে আনে।
এ সব কথা বলার সময় ক্লাসের ফার্স্ট বয় পাপ্পু বাম হাতের নখ দিয়ে ডান হাতের তালু চুলকাচ্ছিল। ও সামনের বেঞ্চিতে বসেছিল। বরাবর তাই বসে। জাদীদার হাত চুলকানোর ব্যাপারটা শিক্ষকের নজর এড়ায়নি। জিজ্ঞেস করলেন তিনি পাপ্পুকে- -পাপ্পু দাড়াও। তুমি তোমার হাত চুলকাচ্ছিলে না!
-জ্বী স্যার। হঠাৎ ডান হাতটায় সুড়সুড়ি এল। না চুলকে পারলাম না। স্যারের দাঁড়াতে বলা এবং ওই বেমক্কা প্রশ্নে পাপ্পু ধরে নিয়েছে যে, সে মস্ত এক অপরাধ করে ফেলেছে। ভয়ে ভয়ে নিজের কৃত অপরাধের পক্ষে সাফাই গাইতে চাইল।
-না, হাত চুলকে তুমি কোন অন্যায় করনি। চুলকানি লাগলে তুমি কী আর করবে! তবে কথা হচ্ছে, এ ডান হাত চুলকানোর একটা মানে আছে। সেটাই এখন বলছি শোনো। শিক্ষক এবার পাপ্পুর ওপর থেকে চোখ সরিয়ে ক্লাসের সবার দিকে তাকালেন। বললেন তিনি আবার, কখনো কারো ডানহাতের তালু চুলকালে মনে করতে হয় তার ভাগ্য ভাল। শিল্পির তার ভাগ্যে টাক-পয়সা জুটবে। বুঝেছ তোমরা! সবাই সমস্বরে জবাব দেয়, জ্বী স্যার। ক্লাসের দুষ্টোমিতে ওস্তাদ মেয়েটির নাম জাদীদা। সবাই যখন জ্বী স্যার বলছিল ও তখন চুপচাপ। হয়ত ওর মাথায় তখন অন্যকিছু খেলছিল। হয়ত ফন্দিই আঁটছিল সে। আচমকা বলে বসল জাদীদা- -স্যার, আমার হাত না পায়ের তালু চুলকাচ্ছে। এর কোন অর্থ আছে নাকি স্যার! থাকলে বলেন না স্যার।
জাদীদার দুষ্টোমিটা স্যার হজম করলেন নীরবে, নিছক এটা যে জাদীদার পাকামী তা বুঝেও। তিনি এবার বললেন, জাদীদা আরেকটা পয়েন্ট ধরিয়ে দিয়েছ। হ্যাঁ, পায়ের তালু চুলকানোরও একটা মানে আছে বৈকি! সেটা হল কারো কখনো পায়ের তালু চুলকালে ধরে নিতে হবে তার সামনে বিভিন্ন জায়গা ঘুরে বেড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। ভাগ্য ভাল হলে বিদেশে বেড়ানোও হতে পারে। ছাত্র-ছাত্রীদের এ সব জ্ঞানের কথাগুলো বলে শিক্ষক একটু থামলেন। তারপর আবার বললেন, বুঝলে তো সবাই এতক্ষণ ধরে যা বলছিলাম আমি! এগুলো সাধারণ জ্ঞানের কথা। এগুলো সবাই মনে রাখবে এবং মেনে চলবে।
চতুর্থ শ্রেণীর ক্লাসে শিক্ষক সাধারণ জ্ঞান বলে যে জ্ঞানদান করলেন তা কী আদৌ জ্ঞানের কিংবা সাধারণ জ্ঞানের কথা! তবে বলা যায়, এগুলো আসলে ধারণার কথা। সমাজে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা মত বা ধারণা। এগুলোর কোন ভিত্তিও নেই, সত্যতাও নেই। পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রাপ্ত নয় এগুলো। যার ভিত্তি নেই, সত্যতা নেই এবং পরীক্ষিত নয় তা জ্ঞান হয় কী করে! আদৌ জ্ঞানই নয় এগুলো আসলে। তবে যে শিক্ষক এগুলো উল্লেখ করলেন তার কারণ হল, উনিও ওভাবে জেনেছেন। তার কথিত জ্ঞানগুলো তো আর তিনি যাচাই করতে যাননি। এগুলো যে যাচাই করা দরকার, তাই তো কখনো মনে করেননি তিনি। সেটাই বস্তুত তার জন্য স্বাভাবিক। শুধু তার জন্য কেন, এদেশের অধিকাংশ শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের জন্য স্বাভাবিক। যাচাই বা পরীক্ষার ব্যাপারটা এ বিষয়ে খুব প্রয়োজনীয় একটা প্রশ্ন। যেটা ছাড়া কোন ধারণাই জ্ঞান নয়। কোন মতই সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত মত নয়।
শিক্ষকের কথিত এ ধারণাগুলো আমরা প্রাথমিকভাবে একটু যুক্তির নিরিখে বিচার করতে পারি। যেমন, হাঁচি উঠলে ভাবা হয় কেউ মনে করছে দূর থেকে। হাঁচির সাথে মনে করার কী সম্পর্ক থাকতে পারে! তাড়াহুড়ো বা অমনোযোগিতায় খেলে খাদ্য প্রবাহের শিরায় খাবার আটকে গিয়ে কিছুটা পেছন দিকে ফিরে আসে। এতে হাঁচি ওঠে। সুতরাং হাঁচির কারণটি হল শারীরিক। অন্য কিছু নয়। মনে টনে করা তো দূরে থাক। ঘুম কম হলে বা চোখে কোন অসুখ দেখা দিলে চোখের পাতা কাঁপতে থাকে। কাঁপাকাঁপির সঙ্গে মঙ্গল-অমঙ্গলের কী সম্পর্ক। তেমনি ডান-বাম অথবা হাত-পা চুলকানোর সঙ্গেও ভ্রমণ এবং অর্থপ্রাপ্তির কোনই সম্পর্ক থাকতে পারে না। এগুলো সবই শারীরিক ব্যাপার। শরীরের ভেতরের কোন কারণ থেকে এগুলো হয়। এর সঙ্গে অন্য কারণ যোগ করা একেবারেই অর্থহীন।
এগুলো সবই আসলে কুসংস্কার। অতীত কালের এমনই সব হাজারো রকমের ধ্যান-ধারণা, মতামত, মূল্যবোধ প্রচলিত আছে আমাদের সমাজে। অশিক্ষা, অজ্ঞতা ও অসচেতনতার কারণে এ অন্ধধারণাগুলো চালু হয়েছে এবং এখনো টিকে আছে বহাল তবিয়তে। যে ধারণা বা মতগুলোর কোন ভিত্তি নেই, যুক্তিও নেই সেগুলোই হল অন্ধধারণা। কুসংস্কার বলা হয় সেগুলোকেই। এ সব কুসংস্কার, অর্থহীন কারণ বা ব্যাখ্যা ও ভ্রান্তিতা দূর করার জন্য প্রকৃত জ্ঞান আমাদের আয়ত্ব করতে হবে। সে জন্য সত্য খোঁজার তাড়না থাকতে হবে। সত্যটা মিলবে ওহীর কাছ থেকে। ওহীর জ্ঞানই আমাদের ভুল ধারণাগুলো দূর করে সত্য ও যুক্তিসম্মত ধারণার নিকট পৌঁছাতে সহায়তা করে। তাওহীদের জ্ঞান দিয়ে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সবকিছুকে যাচাই করতে হবে। যাচাই-এর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তবেই তা গ্রহণ করা যাবে। বাদবাকি মত-পথকে বর্জন বা প্রত্যাখ্যান করতে পারলে, করতে শিখলে তবেই আমরা সামনে এগুবো। আমাদের এগুনো মানে সমাজটারও এগুনো। দেশটারও।
অতএব, আসুন ওহীর পথ বেয়ে কুরআন ও সহীহ হাদীসের চর্চা করে ভুলগুলোকে ভুল বলি আর সত্যকে আলিঙ্গন করে প্রতিষ্ঠিত করি আমাদের সকলের জীবনে।

টিকাঃ
১. ভাগ্য সংক্রান্ত বিষয়ে কপাল শব্দটি মূলত হিন্দু সংস্কৃতি থেকে আমাদের মুসলিমদের বিশ্বাসে অনুপ্রবেশ করেছে। হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থানুযায়ী, কোন সন্তান জন্মের ৬ষ্ঠ দিনে ভাগ্যের দেবতা এসে এ শিশুটির জীবনে সংঘটিতব্য ঘটনাসমূহ অর্থাৎ হায়াত, মৃত্যু, রিযিক, ধন-দৌলত ইত্যাদি তার [শিশুটির] কপালে লিখে যায়। আর এ বিশ্বাস থেকেই প্রচলিত হয়েছে- 'কপালের লিখন না যায় খণ্ডণ।' কিন্তু আমরা মুসলিম হিসেবে এ ধরনের আক্বীদা-বিশ্বাস পোষণ করি না। আমরা বিশ্বাস করি যে, আমাদের ভাগ্য লিখে রাখা হয়েছে লাওহে মাহফুজে, যা সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহই ওয়াকিবহাল। তাই আমরা বলি, 'ভাগ্যের লিখন না যায় খণ্ডণ।' অতএব, প্রতিটি মুসলিমের উচিত ভাগ্য সম্পর্কিত ব্যাপারে আলোচনায় 'কপাল' শব্দটির ব্যবহার করা থেকে সাবধানতা অবলম্বন করা। কারণ, সামান্য একটি মাত্র শব্দই আমাদের বিশুদ্ধ ঈমান-আক্বীদায় আঘাত করতে যথেষ্ট।

📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 হাতের রেখায় ভাগ্য, দেখতে চায় অজ্ঞ

📄 হাতের রেখায় ভাগ্য, দেখতে চায় অজ্ঞ


আমাদের দু'খানি হাত দিয়ে আমরা প্রতিদিন কত রকম কাজই না করি। আমাদের হাত দু'টোর তালু মেলে ধরলে দেখা যাবে তালুতে অনেকগুলো রেখা বা টান। টানগুলো কিন্তু একেবারে সোজা নয় কোনটাই। এঁকেবেঁকে, একটার ওপর দিয়ে আরেকটা বা জড়াজড়ি করে রেখাগুলো এগিয়েছে। সবগুলো যে তালুর প্রান্ত ছুঁয়েছে তাও নয়। সামান্য কিছুটা বা মাঝামাঝি গিয়ে শেষ হয়েছে। ছোট, বড় বা মাঝারি সাইজের কত রেখা রয়েছে! কোনটা মোটা বা কোনটা সরু। এভাবে জাল ফেলে যেন অসংখ্য রেখার সমাহার ঘটেছে আমাদের হাতের তালুতে। হাতের তালুর এ রেখাকে বলা হয় হস্তরেখা।
হাতের রেখাকে দু'ভাগে ভাগ করা হয়েছে। মোটা রেখাকে বলা হয় ভাঁজ। যার মধ্যে রয়েছে কর রেখা, হৃদয় রেখা, শির রেখা ও আয়ু রেখা। ভাঁজ বাদে বাকী সব রেখাকে বলা হয় সূক্ষ্ম রেখা। এ পৃথিবীতে হাতের রেখা দেখে ভাগ্য বলে দেয়ার প্রচলন রয়েছে। রেখা দেখে ভাগ্য গোণে বা গণনা করেন যারা তাদের বলা হয় গণক বা হস্তরেখাবিদ।
উপরোক্ত দু'ধরনের রেখা তৈরি হয় একইভাবে। এগুলো মূলত দেহ গঠনিক খাঁজ ছাড়া আর কিছুই না। মায়ের গর্ভে শিশুর ভ্রুণ তৈরি হলে হাতের হাড়গুলোর সন্ধিস্থলে তালু ও আঙুলের চামড়ায় ভাঁজ থাকে। অনেকদিন এভাবে থাকাতে একসময় ভাঁজ পড়ে যায়। পরে তা স্থায়ী হয়ে যায়। শিশু মায়ের গর্ভে তার হাত দুটো মুঠো করে রাখে। ভাঁজের রেখা তৈরি হয় এতেই। হাত মুঠো করে থাকার কারণ হিসেবে আন্দাজ-অনুমান ও প্রমাণহীনভাবে অনেকে অনেক কথা বলেন। কেউ বলেন, 'আমাদের পূর্বপুরুষরা আগে থাকত গাছে, গাছের ডাল ধরার অভ্যাস থেকে মুঠো করার ব্যাপারটা এসেছে। আবার কেউ কেউ বলেন, 'মানুষ কোনকিছু আশ্রয় করে বাঁচতে চায়। গর্ভের শিশু কিছু ধরে বা ধরতে চেয়ে হাতের মুঠ ভাঁজ করে রাখে। এ ভাঁজগুলো ধীরে ধীরে দাগ বা রেখায় পরিণত হয়।'
সুতরাং হাতের রেখার সাথে আমাদের জীবনের সুখ-দুঃখ, ভালমন্দ, আয়ু কমবেশি হওয়া বা কোন ঘটনা-দুর্ঘটনা জড়িত নেই। কোন কোন আঙুল থাকা-না-থাকার ওপর কোন রেখা থাকা-না-থাকা নির্ভর করে। যেমন, জন্ম থেকে যদি বুড়ো আঙুল না থাকে তাহলে আয়ু রেখাও থাকবে না। তার মানে, যে বুড়ো আঙুল ছাড়া জন্ম নিল, সে কি একদিনও বাঁচবে না!? আর রেখাগুলো যে বাড়ে-কমে বা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় তারও কিন্তু কারণ আছে। হাতের তালুর ভেতরে যে মাংসপেশী আছে তা নড়াচড়ার ওপর রেখা বড় হওয়া বা মিশে যাওয়া নির্ভর করে। পরিশ্রমের কাজ করলে তাতে বেশি নড়াচড়া হয়। এতে রেখা তাড়াতাড়ি বাড়ে বা মিশে যায়।
একটি গল্প বলে নেই শেষে। এ গল্প থেকেও হস্তরেখার ভাগ্য গণনার অসারতা বোঝা যাবে। আমাদের এ পৃথিবীতে সংঘটিত হওয়া গল্প এটি। আগে রাজা-বাদশাহরা রাজপ্রাসাদে জ্যোতিষী রেখে দিতেন। এদের বলা হতো রাজ-জ্যোতিষী। জ্যোতিষীরা রাজা বা রাজ্যের ভূত-ভবিষ্যত আগাম বলে দিতেন। রাজা মশাই সেভাবে আগেভাগে ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন। একজন রাজার ছিল এমন একজন রাজ-জ্যোতিষী। তার গণনায় প্রায়ই ভুলভাল হতো বা ফলতো না তার কথা। একদিন রাজা বিরক্ত হয়ে জ্যোতিষীকে বললেন, বলুন তো আপনার আয়ু আর কতদিন! জ্যোতিষী উত্তর দিলেন, আরও বছর বিশেক তো বটেই। রাজা তখুনি কোতোয়ালকে ডেকে আদেশ দিলেন, জ্যোতিষীর গর্দান কাটতে। আদেশ পালনও করা হল। রাজা জ্যোতিষীর গণনা মিথ্যা প্রমাণ করলেন। আর জ্যোতিষের গণনায় যেকোনই সত্যতা নেই তা জ্যোতিষী মহাশয় নিজের জীবন দিয়েই প্রমাণ করলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00