📄 ভাগ্যগণনা-যাদুশস্ত্র ও অলৌকিকত্বের প্রভাব, সবই জ্বিন-শয়তানের স্বভাব
জ্বিনের ক্ষমতা সম্পর্কে কুরআন ও সহীহ হাদীছে বর্ণিত মৌলিক বিষয়সমূহ স্মরণ রাখলে ভাগ্য গণনাসহ সকল প্রকার অতিপ্রাকৃতিক তথা অলৌকিক ও যাদুসংক্রান্ত ঘটনাগুলো যে ধোঁকা বা ভেলকিবাজি নয় তা খুব সহজেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
১. ভাগ্য গণনায় জ্বিন-শয়তানের প্রভাব: মানুষের মধ্যে যেসব লোক অদৃশ্য ও ভবিষ্যত সম্বন্ধে জ্ঞানের অধিকারী বলে দাবী করে তারা বিভিন্ন নামে পরিচিত, যেমন- গণক, ভবিষ্যৎ-বক্তা, যাদুকর, ভবিষ্যৎদ্রষ্টা ব্যক্তি, জ্যোতিষী, হস্তরেখা বিশারদ প্রভৃতি। এ সব ভবিষ্যৎ-বক্তারা নানা পদ্ধতি ও মাধ্যম ব্যবহার করে তথ্যাবলী উপস্থাপন করার দাবী করে থাকে সে সব পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে: চায়ের পাতা পড়া, নানা প্রকার রেখা বা নকশা আঁকা, সংখ্যা লেখা, হাতের তালুর রেখা পড়া, রাশিচক্র খুঁটিয়ে দেখা, স্ফটিক বলের প্রতি স্থির দৃষ্টিপাত করা, হাড় দিয়ে খটর খটর বা ঝনঝন করানো, লাঠি ছোঁড়া ইত্যাদি। এখানে ভাগ্য গণনার নানাবিধ কলা-কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হবে। অদৃশ্য প্রকাশে ও ভবিষ্যদ্বাণী করতে সক্ষম হওয়ার দাবীদার জ্যোতিষীদেরকে প্রধানত দু’ভাগে বিভক্ত করা যায়:
১. সে সব জ্যোতিষী প্রথম শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত, প্রকৃতপক্ষে যাদের কোন সত্য জ্ঞান বা গুপ্ত রহস্য জানা নেই; বরং তারা তাদের খরিদ্দারদেরকে তাই বলে যা সাধারণত অধিকাংশ লোকের ক্ষেত্রে সচরাচর ঘটে থাকে। তারা প্রায় সময়ই অর্থহীন কিছু ধর্মীয় কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করার মাধ্যমে পূর্বপরিকল্পিত সাধারণ অনুমান প্রকাশ করে থাকে। কখনো কখনো তাদের কিছু অনুমান অতি সাধারণতার জন্য সত্য হয়ে যায়। অতিসামান্য যে কয়েকটি ভবিষ্যদ্বাণী সত্য বলে আত্মপ্রকাশ লাভ করে, অধিকাংশ মানুষের মধ্যে সেগুলো মনে রাখার প্রবণতা দেখা যায়; কিন্তু যেগুলো আদৌ সত্য বলে প্রকাশিত হয় না, তার বেশিরভাগই মানুষ খুব দ্রুত ভুলে যায়। আসলে প্রকৃত সত্য কথা হচ্ছে, কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যদি পুনরায় মনে না পড়ে, তাহলে কিছু দিন পরে সকল ভবিষ্যদ্বাণীর অর্ধেকই মানুষ অবচেতনভাবে ভুলে যায়। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিটি নতুন বৎসরের শুরুতে আসন্ন বছরে মানুষের জীবনে সংঘটিতব্য ঘটনা সম্পর্কে বিভিন্ন খ্যাতিমান জ্যোতিষীদের নানা রকম ভবিষ্যদ্বাণী প্রকাশ করা উত্তর আমেরিকায় একটা সাধারণ প্রথার রূপ পরিগ্রহ করেছে।’ ১৯৮০ সালে প্রচারিত ও প্রকাশিত বিভিন্ন প্রকার ভবিষ্যদ্বাণীর উপর পরিচালিত এক গবেষণা জরিপে দেখা যায়, সবচেয়ে নির্ভুল ভবিষ্যৎ-বক্তার ভবিষ্যৎদ্বাণীর মাত্র ২৪% সঠিক হয়েছিল!
২. যাদের সঙ্গে জ্বিনের সখ্যতা ও যোগাযোগ এবং বিভিন্ন ধরনের অপজ্ঞান রয়েছে, তারা এ দ্বিতীয় শ্রেণীর দলভুক্ত। এ দলটির গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি, কারণ এরা শিরকের মত বৃহত্তর ও জঘন্যতম গুনাহের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ কাজে জড়িতদের উপস্থাপিত তথ্যাবলী সাধারণত কিছুটা নির্ভুল হয়, যা মুসলিম ও অমুসলিম উভয়ের জন্য বড় ধরনের ফিৎনার কারণ।
জ্বিনদের সাথে যোগাযোগকারী মানুষকে অর্থাৎ জ্বিনদের সাহায্যে যেসব ভবিষ্যৎবক্তারা ভবিষ্যদ্বাণী করেন, তাদেরকে জ্বিনেরা অতিনিকট ভবিষ্যত সম্পর্কে জানাতে সক্ষম। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়- ভবিষ্যৎবক্তার নিকটে কেউ গমন করলে, উপস্থিত ব্যক্তিটি গণকের নিকটে আসার পূর্বে কী কী পরিকল্পনা তৈরি করেছিল তা গণকের জ্বিন আগত ব্যক্তির সাথী জ্বিনের (ক্বারীন)’ নিকট থেকে অবগত হয়। ফলে, আগত ব্যক্তিটি কী কী করবে বা কোথায় কোথায় যাবে তা জানাতে গণক সক্ষম হয়। আর এভাবেই, একজন প্রকৃত গণক বা ভবিষ্যদ্বক্তা আগন্তুক ব্যক্তির অতীত সম্পূর্ণভাবে জানতে পারে। সেই গণক সবিস্তারে বলতে সক্ষম হয়- আগন্তুকের পিতা-মাতার নাম, জন্মস্থান এবং ছোটবেলার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে।
গণক বলতে ভবিষ্যতদ্বক্তা ও জ্যোতিষীদের বুঝানো হয়েছে, গণক বিদ্যা এমন একটা পেশা যা ত’ওহীদের সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং গণক মুশরিক বলে বিবেচিত। কেননা, সে জ্বিনদের ব্যবহার করে থাকে এবং তাদের উপাসনা করে তাদের নৈকট্য লাভ করে এবং জ্বিন তাদেরকে ভবিষ্যত সম্পর্কে অবহিত করে। জ্বিনের উপাসনা ও তার নৈকট্য লাভ ছাড়া এটা আদৌ সম্ভব নয়। জাহিলিয়াতের যুগে মানুষ গণকদের নেতৃত্বে আস্থা রাখত এবং বিশ্বাস করত যে, তারা গায়েব সম্পর্কে যা পৃথিবীতে অথবা মানব সমাজে ঘটবে তার অবগত আছে। যার ফলে আরবরা গণকদের সম্মান করত ও তাদের প্রতি ভীত থাকত।
জ্বিনের সাথে যোগাযোগ রয়েছে এমন একজন সত্যিকারের ভবিষ্যৎবক্তার আলামত হচ্ছে যে, সে বিস্তারিতভাবে অতীতের বর্ণনা দিতে পারবে। কারণ, মুহূর্তের মধ্যেই বিশাল ব্যবধানের দূরত্ব অতিক্রম করা, গোপনীয় বিষয় বা ঘটনা, হারানো দ্রব্য, অদৃষ্ট ঘটনাবলী সম্পর্কে অনেক তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ করা জ্বিনের সাধারণ একটি বৈশিষ্ট্য।
২. যাদুমন্ত্র ও অলৌকিক ঘটনায় জ্বিন-শয়তানের প্রভাব যাদু ভাষাগত দিক থেকে একটা ব্যাপক শব্দ। শয়তানের সহযোগিতায় ও তার ইবাদত ও নৈকট্য লাভের মাধ্যমে যাদুকর যা কিছু প্রয়োগ করে তার সবই যাদুর পর্যায়ভুক্ত। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান দ্বারা বা অন্য কোন বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বনে অতি- প্রাকৃত মাধ্যম বা শক্তিসমূহের নিকট প্রার্থনা করে অথবা সেগুলোকে আহ্বান করে আপাতদৃষ্টিতে প্রতীয়মান প্রাকৃতিক শক্তির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ঘটনাপ্রবাহকে প্রভাবিত করা অথবা প্রাকৃতিক শক্তির ভবিষ্যদৃষ্টিকে অর্জন করাকেই সাধারণত যাদু বলে অভিহিত করা হয়। তাছাড়া, নির্দিষ্ট কিছু ধর্মীয় আচার, পদ্ধতি ও কর্মের ব্যবহার দ্বারা মানুষ প্রাকৃতিক শক্তিকে বশীভূত করতে পারে- এ ধরনের বিশ্বাসকেও যাদু বলা হয়। চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী পাপাত্মা বা শয়তান অথবা দেবদূতের সহায়তা ব্যতীত অনুষ্ঠিত ‘ঐন্দ্রজালিক বা কুহকময় বা অপ্রাকৃত অনুষ্ঠান’, ‘ভেলকিবাজি’, ‘ভানুমতীর খেল’ বা ‘প্রাকৃতিক যাদু’ নামে পরিচিত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রাকৃতিক বস্তুর অধ্যয়ন পাশ্চাত্য সমাজে বর্তমানে আধুনিক ভৌত বা প্রকৃতি বিজ্ঞান হিসেবে প্রচারিত হয়েছে। ব্যক্তিগত বা বদ বা কুটিল উদ্দেশ্যে অলৌকিক শক্তি তথা পাপাত্মা বা শয়ত্বান বা দেবদূতকে আহ্বান করা বা সহায়তা গ্রহণ করা ও ব্যবহার করার প্রচেষ্টা হচ্ছে ভৌতবিজ্ঞানের সঙ্গে ‘অদৃশ্য যাদু’ বা ‘মায়াবিদ্যা’, ‘ইন্দ্রজাল’, ‘ডাইনিবিদ্য’, ‘ডাকিনীবিদ্যা’-এর পার্থক্যের মূল বিষয়। যাদু এবং এর চর্চাকারী ব্যক্তিদেরকে বুঝাতে সাধারণত ডাইনীবিদ্যা, ডাকিনীবিদ্যা, ভবিষ্যদ্বাণী এবং প্রেতসিদ্ধি নামক পরিভাষাসমূহ ব্যবহৃত হয়। ‘অপদেবতা’, ‘ভূত’, ‘দৈত্য’ বা ‘প্রেত’তাড়িত বা মন্ত্রচালিত নারীর যাদু চর্চাকে ডাইনীবিদ্যা বলা হতো। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অতিপ্রাকৃতিক (অলৌকিক) দৃষ্টি অর্জনের প্রয়াসকে ভবিষ্যৎ-কথন বলা হয়। অন্যদিকে, প্রেতসিদ্ধি অথবা মৃতব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনও ভবিষৎ-কথনের পদ্ধতিসমূহের একটি।
আরবী (سحر) সিহর শব্দটি যেহেতু যাদুবিদ্যার বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার মধ্যে কোন পার্থক্য সৃষ্টি করে না, সুতরাং মায়াবিদ্যা, কুহক, ইন্দ্রজাল, ডাইনীবিদ্যা, ভবিষ্যৎ-কথন এবং প্রেতসিদ্ধিকে বুঝাতেও ‘সিহর’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। মূলত, অদৃশ্য ও রহস্যময় শক্তি হতে ঘটা সবকিছুকে আরবীতে সিহর বলে বুঝানো হয়। উদাহরণস্বরূপ একটি হাদীছের কথা বলা যায়। হাদীসটিতে রাসূল বলেন, «إِنَّ مِنْ الْبَيَانِ لَسحُرًا» ‘নিশ্চয় কোন কোন কথা ও আলোচনার মধ্যে যাদু আছে।’ আর এভাবেই, একজন বাগ্মী ও প্রেরণাসঞ্চারকারী বক্তা সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য বলে উপস্থাপন করতে পারে। সে কারণেই বাগ্মীতার একাংশকে রাসূল ? যাদু বলে অভিহিত করেছেন। শেষরাত্রের অন্ধকার যেহেতু তখনও অবশিষ্ট থাকে’ তাই সাওম পালন করার পূর্বে শেষ রাতের খাবারকে সাহুর’ (মূল সিহর হতে) বলা হয়।
যাদুর বাস্তবতা যাদুর মধ্যে যে বাস্তবতার অস্তিত্ব বিদ্যমান রয়েছে তা অস্বীকার করার প্রবণতা বর্তমানকালের মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মুর্ছারোগের মতো মানসিক বিকারগ্রস্ততা যাদুর প্রভাবে হয় বলে জনপ্রিয় সব গল্পসমূহে ব্যাখ্যা প্রদান করা হয় এবং এ কথাও বলা হয় যে, যারা যাদুতে বিশ্বাস করে তারাই এর দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়। যাদুর দ্বারা সম্পন্ন কর্মকে অক্ষিবিভ্রম ও কিছু কৌশলের সমষ্টি নির্ভর ধোঁকা বৈ কিছু নয় বলে প্রচার করা হয়েছে।
দুর্ভাগ্যকে দূরীভূত করে সৌভাগ্য আনয়নে যাদু ও কবচের প্রভাবকে ইসলাম দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখান করা সত্ত্বেও যাদুর কিছু অংশ ইসলাম বাস্তব বলে স্বীকার করে। তবে এ কথাটিও সত্য যে, আজকালকার যাদুর বেশিরভাগই জটিল কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে তৈরি করা চমকপ্রদ যান্ত্রিক বস্তু যা প্রদর্শন করা হয় কেবল দর্শকদেরকে ধোঁকা দিতে। কিন্তু কিছু লোক রয়েছে যারা ভাগ্য গণনার ক্ষেত্রে শয়তানদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে যাদুবিদ্যার চর্চা অব্যাহত রাখে। জ্বিন এবং জ্বিনদের শক্তি ও ক্ষমতার বিষয়ে আলোচনা করার পূর্বে কুরআন ও বিশুদ্ধ সুন্নাহ্ প্রমাণের আলোকে যাদুর বাস্তবতা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি ও সমর্থন বিষয়ে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। মানুষের নিকটে প্রেরিত আসমানী বিধান কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে সত্য ও মিথ্যার চূড়ান্ত মানদণ্ড নিহিত বিধায় মূল বিধানের প্রতি প্রথম পদক্ষেপেই অগ্রসর হওয়া আবশ্যক।
যাদু সম্পর্কে ইসলামের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাখ্যা আল্লাহ্ তা’আলা কুরআনের নিম্নের আয়াতে বর্ণনা করেছেন:
﴿وَلَمَّا جَاءَهُمْ رَسُولٌ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ مُصَدِّقُ لِمَا مَعَهُمْ نَبَذَ فَرِيقٌ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ كِتَابَ اللَّهِ وَرَاءَ ظُهُورِهِمْ كَأَنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ﴾ ﴿(سورة البقرة: ١٠١)﴾ ‘এবং যখন তাদের কাছে আল্লাহ্র পক্ষ হতে রসূল আসল যে এদের নিকট যে কিতাব রয়েছে, সেই কিতাবের সমর্থক, তখন যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল তাদের একদল আল্লাহ্র কিতাবকে পিঠের পিছনে ফেলে দিল, যেন তারা কিছুই জানে না।’ [সূরা আল-বাক্বারা (২): ১০১]
ইয়াহুদীদের প্রতি প্রেরিত নাবীদের সঙ্গে তাদের কপটতার বিষয়টি উল্লেখ করে আল্লাহ্ তা’আলা সেই মিথ্যা সম্পর্কে আমাদের নিকটে বর্ণনা করছেন যা নাবী সুলায়মান (আ:)-এর ব্যাপারে তারা উদ্ভাবন করেছিল: ﴿وَاتَّبَعُوا مَا تَتْلُوا الشَّيَاطِينُ عَلَى مُلْكِ سُلَيْمَانَ وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَانُ وَلَكِنَّ الشَّيَاطِينَ كَفَرُوا يُعَلِّمُونَ النَّاسَ السِّحْرَ وَمَا أُنْزِلَ عَلَى الْمَلَكَيْنِ بِبَابِلَ هَارُوتَ وَمَارُوتَ وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُولا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلا تَكْفُرْ فَيَتَعَلَّمُونَ مِنْهُمَا مَا يُفَرِّقُونَ بِهِ بَيْنَ الْمَرْءِ وَزَوْجِهِ وَمَا هُمْ بِضَارِّينَ بِهِ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ وَيَتَعَلَّمُونَ مَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنْفَعُهُمْ وَلَقَدْ عَلِمُوا لَمَنِ اشْتَرَاهُ مَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ خَلَاقٍ وَلَبِئْسَ مَا شَرَوْا بِهِ أَنْفُسَهُمْ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ ﴾ (سورة البقرة: ١٠٢) ‘এবং সুলায়মানের রাজত্বকালে শয়ত্বানরা যা পাঠ করত, তারা তা অনুসরণ করত, মূলত সুলায়মান কুফরী করেনি বরং শয়ত্বানরাই কুফুরী করেছিল, তারা মানুষকে যাদু শিক্ষা দিত এবং যা বাবিলের দু’জন ফিরিশতা হারূত ও মারূতের উপর পৌঁছানো হয়েছিল এবং ফিরিশতাদ্বয় কাউকেও শিখাতো না যে পর্যন্ত না বলত, আমরা পরীক্ষা স্বরূপ, কাজেই তুমি কুফরী কর না, এতদসত্ত্বেও তারা উভয়ের নিকট হতে এমন জিনিস শিক্ষা করতো, যা দ্বারা তারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করতো, মূলত তারা তাদের এ কাজ দ্বারা আল্লাহ্ বিনা হুকুমে কারও ক্ষতি করতে পারত না, বস্তুত এরা এমন বিদ্যা শিখত, যা দ্বারা তাদের ক্ষতি সাধিত হতো আর এদের কোন উপকার হতো না এবং অবশ্যই তারা জানত যে, যে ব্যক্তি ঐ কাজ অবলম্বন করবে পরকালে তার কোনই অংশ থাকবে না, আর যার পরিবর্তে তারা স্বীয় আত্মাগুলোকে বিক্রয় করেছে, তা কতই না জঘন্য, যদি তারা জানত!’ [সূরা আল-বাক্বারা (২): ১০২]
‘কাবালা’ নামক একটি দুর্বোধ্য আধ্যাত্মিক পদ্ধতির মাধ্যমে চর্চা করা যাদুর সত্যতা প্রমাণের নিমিত্তে ইয়াহুদীরা তাদের যাদুচর্চার পন্থাটি নাবী সুলায়মান (আঃ)-এর নিকট থেকে দীক্ষা লাভ করেছিল বলে দাবী করত। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ যে বর্ণনা দিয়েছেন তার ‘মর্মার্থ’ বা ‘ব্যাখ্যা’ বা ‘সারাংশ’ হচ্ছে, আল্লাহর কিতাবকে পিছনে ফেলে দিয়ে এবং শেষ নাবীকে অস্বীকার করে ইয়াহুদীরা শয়ত্বানের শেখানো যাদুমন্ত্রের পদ্ধতিসমূহ আয়ত্ব করে। এ শয়ত্বানেরা কুফরী কর্ম করেছে যাদু শিখিয়ে। তারা জ্যোতিষশাস্ত্র নামক মায়াবিদ্যার এক কৌশলও শিখিয়েছে। ব্যাবিলনের জনগণের নিকটে পরীক্ষাস্বরূপ প্রেরিত হারূত ও মারূত নামক দুই ফিরিশতা তাদেরকে এ বিদ্যা শিক্ষাদান করেছিল। মায়াবিদ্যার কোন তত্ত্ব শিক্ষা দেবার পূর্বেই ফেশেতারা জনগণকে এ বিদ্যা শিখে কুফরী কর্ম সম্পন্ন না করতে সতর্ক করত, কিন্তু ফিরিশতাদের সতর্কবাণীর প্রতি তারা কোনই কর্ণপাত করেনি। মানুষের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি ও বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটানোর ব্যাপারে ফিরিশতাদের নিকট থেকে তত্ত্বাবলীর জ্ঞান এমন স্তর পর্যন্ত অর্জিত হয়েছিল যে, তারা মনে করত তাদের ইচ্ছামতো যাকে ইচ্ছা তাকে ক্ষতি করতে পারবে। কিন্তু আল্লাহ্ই একমাত্র সত্তা যিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন কে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আর কে হবে না। তবে অর্জিত এ জ্ঞান প্রকৃতপক্ষে তাদের কোনই কাজে আসেনি বরং তারা শুধু নিজেদের ক্ষতি বৃদ্ধি করেছিল। সত্যিকারের যাদুবিদ্যার চর্চা যেহেতু কুফরী তাই এ কর্ম সম্পাদনের ফলস্বরূপ জাহান্নামে তাদের অবস্থানকে নিশ্চিত করেছে।
যারা উক্ত কৌশলসমূহ আয়ত্ব করেছিল তারা এটা ভালভাবেই জানত যে, তারা অভিশপ্ত (লা’নত প্রাপ্ত)। কারণ, তাদের ধর্মগ্রন্থের বিধান অনুসারেও যাদুচর্চা নিষিদ্ধ ছিল। নিম্নের নিয়মগুলি এখনো তাওরাতে পাওয়া যায়: ‘তোমাদের মাবুদ আল্লাহ্ তোমাদের যে দেশ দিতে যাচ্ছেন সেখানে গিয়ে সেখানকার জাতিগুলো যেসব জঘন্য কাজ করে তোমরা তা করতে শিখবে না। তোমাদের মধ্যে যেন এমন কোন লোক না থাকে যে তার নিজের সন্তানকে আগুনে পুড়িয়ে কোরবানী করে, যে গোণাপড়া করে কিংবা মায়াবিদ্যা খাটায় কিংবা আলামত দেখে ভবিষ্যতের কথা বলে, যে যাদু করে, যে তন্ত্রমন্ত্র খাটায়, যে ভূতের মাধ্যম হয়, যে ভূতের সংগে সম্বন্ধ রাখে এবং যে মৃত লোকের সংগে যোগাযোগ রাখে। এই সব কাজ যে করে মাবুদ তাকে জঘন্য মনে করেন। এই সব জঘন্য কাজের জন্যই তোমাদের মাবুদ আল্লাহ্ ঐ সব জাতিকে তোমাদের সামনে থেকে তাড়িয়ে দেবেন।’
কিন্তু এ সব নির্দেশ অবতীর্ণ হওয়ার স্থানে তারা স্বশরীরে উপস্থিত ছিল না বলে ভান করে এ বিধানাবলীর প্রতি কর্ণপাতই করে না। তাওরাতে এটাও লেখা ছিল যে, কোন ব্যক্তি যাদু বা মায়াবিদ্যার কৌশলের আংশিক চর্চা করলেই সে জান্নাতের যে-কোন পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হবে এবং তাকে চিরদিন আগুনে থাকতে হবে। কিন্তু ইয়াহুদীরা উপরোক্ত বাক্যগুলো মূল তাওরাত থেকে বাদ দিয়ে যাদুমন্ত্রের বিভিন্ন কৌশল চর্চায় লিপ্ত রয়েছে।
তাদের এ শোচনীয় অবস্থার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপের জন্য আল্লাহ্ তা’আলা উক্ত পংক্তিগুলোর ইতি টানেন করুণাপ্রকাশক বাক্যাংশের মাধ্যমে। মৃত্যুপরবর্তী জীবনে শাস্তির ভয়াবহতা সম্পর্কে ইয়াহুদীদের কোন জ্ঞান থাকলে তারা ক্ষণস্থায়ী এ জীবনে কয়েকটি সস্তা কৌশল আয়ত্বের জন্য তাদের মহা মূল্যবান আত্মার ভবিষ্যত ধ্বংস করে দেয়ার ভয়ংকর পরিণাম উপলব্ধি করতে পারত।
আয়াতগুলোর এ বাকাংশ দ্বারাও যাদু নিষিদ্ধ (হারাম) হওয়ার বিধান সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়:
﴿... وَلَقَدْ عَلِمُوا لَمَنِ اشْتَرَاهُ مَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ خَلَاقٍ ... (سورة البقرة: ۱۰۲) ‘... যে ব্যক্তি ঐ কাজ অবলম্বন করবে পরকালে তার কোনই অংশ থাকবে না ...।’ (সূরা আল-বাক্বারা (২): ১০২]
একমাত্র কঠোরভাবে নিষিদ্ধ কর্মের শাস্তি হতে পারে জাহান্নামে চিরস্থায়ী বসবাস। উপরোক্ত আয়াত দ্বারা আবার এটাও প্রমাণিত হয় যে, যাদুকরই নয় বরং এদের পাশাপাশি যারা যাদুবিদ্যা অর্জনকারী ছাত্র ও যাদুবিদ্যা শিক্ষাদানকারী শিক্ষক উভয়ই কাফির। ‘যে ব্যক্তি ঐ কাজ অবলম্বন করবে’- এ বাক্যাংশটির সুগভীর তাৎপর্য রয়েছে। যাদু শিক্ষা দিয়ে যে অর্থ উপার্জন করে, যাদুবিদ্যা অর্জনের নিমিত্তে যে অর্থ ব্যয় করে অথবা যাদু সম্পর্কে যে জ্ঞানের অধিকারী- এরা সবাই এ বিধানের অধীন। তাছাড়া নিম্নবর্ণিত আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলা যাদুকে কুফর বলে অভিহিত করে বলেন: ‘নিশ্চয়ই আমরা পরীক্ষা স্বরূপ, কাজেই তুমি কুফরী কর না।’ এবং ‘মূলত সুলায়মান কুফরী করেনি বরং শয়ত্বানরাই কুফুরী করেছিল।’ [সূরা আল-বাক্বারা (২): ১০২]
কিছু যাদুর যে বাস্তবতা রয়েছে তা পূর্বে বর্ণিত আয়াতটি থেকে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়। অধিকন্তু, রাসূল নিজেই যাদুর প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে কষ্ট ভোগ করেছিলেন- এ বিষয়টি বুখারী, মুসলিমসহ অন্যান্য হাদীসগ্রন্থে উল্লেখিত হাদীস দ্বারা জানা যায়:
"যায়িদ ইবনু আরকাম বর্ণনা করেন, লাবীব ইবনু আ’সাম নামে জনৈক ইয়াহুদী রাসূল-এর উপর যাদু করেছিল এবং তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাসূলের নিকটে মু’আওয়াযাতান (সূরা আল-ফালাক্ব এবং নাস) নিয়ে জিবরীল (জিবরাঈল) (আ:) আগমন করে সংবাদ দিলেন যে, জনৈক ইয়াহুদী যাদু করেছে এবং যে জিনিসে যাদু করা হয়েছে, তা অমুক কূপের মধ্যে আছে। তারপর সেই জিনিস কূপ থেকে উদ্ধার করে আনতে ‘আলী ইবনু আবি তালিবকে রাসূল পাঠালেন। ‘আলী তা নিয়ে ফিরে এলেন। তাতে কয়েকটি গ্রন্থি ছিল। রাসূল এক এক করে গ্রন্থি খুলতে এবং প্রতিটির সঙ্গে সূরা দু’টি থেকে একটি করে আয়াত পড়তে বললেন। তিনি গ্রন্থিগুলো খুলে দেয়ার সাথে সাথে রাসূল সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে শয্যা ত্যাগ করেন।’
আবু হুরাইরা থেকে নাসাঈতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, ‘যে ব্যক্তি গিরা লাগায় অতঃপর তাতে ফুঁক দেয় সে মূলত যাদু করে। আর যে ব্যক্তি যাদু করে সে মূলত শিক করে। আর যে ব্যক্তি কোন জিনিস (তাবীজ কবজ) লটকায় তাকে ঐ জিনিসের দিকেই সোপর্দ করা হয়। যে ব্যক্তি গিরা লাগায় অতপর তাতে ফুঁক দেয়, সে মূলত যাদু করে। ফুঁক দেওয়ার ব্যাখ্যা হচ্ছে, সে এমন কিছু পড়ে ফুঁক দেয়, যা দ্বারা সে শয়তানকে ব্যবহার করে ও কথাগুলো প্রয়োগের সময় সে জ্বিন উপস্থিত করে এবং সেই জ্বিন ফুঁকের মাধ্যমে উক্ত গিরাতে কাজ করে। যাদুকরের নিকট গিরা লাগানোর উপকার হচ্ছে, যতক্ষণ গিরা বলবৎ থাকবে ততক্ষণ যাদুও ক্রিয়াশীল থাকবে। গিরা কখনও স্পষ্ট পরিলক্ষিত হয় আবার কখনও অতি ছোট ছোট ও সূক্ষ্ণ হয়। প্রকৃতপক্ষে যাদুর বাস্তবতা হচ্ছে যাদুকে কার্যকর এবং ক্রিয়াশীল করতে হলে শয়তানকে ব্যবহার এবং তার নৈকট্য লাভ করতেই হয়। আর শুধুমাত্র তার নৈকট্য লাভের মাধ্যমেই জ্বিন-শয়তান যাদুকৃত ব্যক্তির শরীরে যাদুর ক্রিয়া শুরু করে। শয়তানের নৈকট্য লাভ ছাড়া কোন যাদুকরের পক্ষেই যাদুকর হওয়া সম্ভব নয়। যে যাদু করল সে শির্ক করল। যাদু মূলত শিকে আকবার তথা বড় শিক্ক-এর অন্যতম এবং তা তাওহীদের মূলনীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। সুতরাং যুক্তিসঙ্গত কারণেই আমরা বলব যে, যাদু শিক্ক-এর পর্যায়ভুক্ত। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, ‘(বলুন যে আমি পরিত্রাণ কামনা করছি) গিরা তথা বন্ধনে অধিক ফুঁ দান কারিনীদের অনিষ্ট হতে।’ নফাথাত শব্দটি نفاثة-এর বহুবচন এবং نفت/ نفاثة থেকে মুবালাগা তথা অতিমাত্রায় ফুঁ দান করার অর্থ বহন করে এবং তা দ্বারা নিঃসন্দেহে যাদুকারিনী বুঝানো হয়েছে এবং সরাসরি যাদুকারিনী না বলে অতিমাত্রায় ফুঁ দানকারিনী বলা হয়েছে। কেননা তারা অতি মাত্রায় ফুঁ দান করত এবং ঝাড় ফুঁক ও বিভিন্ন রকমের তন্ত্র-মন্ত্র দ্বারা ফুঁ দিত এবং সে ফুঁ এর মাধ্যমে জ্বিন সেই গিরা বন্ধনে কাজ করত যাতে যাদুকৃত ব্যক্তির শরীরের কিছু একটা থাকত অথবা এমন কিছু থাকত যার সাথে যাদুকৃত ব্যক্তির সম্পর্ক রয়েছে। এভাবে যাদু ক্রিয়াশীল হয়ে যায়।
এ পৃথিবীতে বসবাসরত প্রতিটি জাতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ রয়েছে, যারা কোন না কোন প্রকারের যাদু চর্চা করেছে- এ সম্পর্কে প্রমাণাদি পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির নিকটে সংগৃহীত রয়েছে। এ সব সাক্ষপ্রমাণের কতিপয় মিথ্যা হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে, কিন্তু এটা কোনক্রমেই সম্ভব নয় যে, যাদু এবং অতিপ্রাকৃতিক ঘটনাবলী সংক্রান্ত গল্প তৈরিতে পুরো মানবজাতি একত্রে সম্মত হয়েছে। অতিপ্রাকৃতিক ঘটনাবলীর দৃষ্টান্তসমূহের সাক্ষ্যপ্রমাণ নিয়ে সুগভীর চিন্তায় মগ্ন হলে অবশ্যই এগুলোর মধ্যে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত কিছু বাস্তবতার যোগসূত্রের সন্ধান মিলবে। জ্বিনের জগৎ সম্পর্কে পরিচিত নয় এমন লোকদের কাছে ‘ভূতুড়ে বাড়ি’, ‘প্রেত নামানোর আসর’, ‘ওঝার কাষ্ঠফলক’, ওয়েস্ট ইন্ডিজে বিশেষত হাইতিতে প্রচলিত ডাকিনীতন্ত্র’, ভূতে বা জ্বিনে পাওয়া বা ভূতাবিষ্ট, কেবল জিহ্বা দিয়ে কথা বলা, দেহকে শূন্যে ভাসমান রাখা ইত্যাদি বিষয়গুলো বিভ্রান্তিকর বলে মনে হতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় এ ঘটনাগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অভিপ্রকাশ রয়েছে। এমনকি মুসলিম বিশ্ব বিশেষত বিভিন্ন চরমপন্থী সুফীতন্ত্রের (মরমীবাদের) গুরুজন তথা সুফীবাদীরা এর অস্বাভাবিক প্রভাবে বিপদগ্রস্ত। তাদের অনেকেই দেহকে শূন্যে ভাসাতে, মুহূর্তের মধ্যেই বিশাল দূরত্বের পথ অতিক্রম করতে, কোন উৎস ব্যতিরেকে খাদ্য ও টাকা-পয়সা তৈরি করতে সক্ষম বলে মনে হয়। আর তাদের অজ্ঞ অনুসারী ও অন্ধ ভক্তরা এ সব যাদুর প্রহেলিকাকে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে অলৌকিক ঘটনা বা কারামত বলে বিশ্বাস করে। ফলে তথাকথিত এ সব ওলী-আওলিয়া, মুরশিদ, পীর-মাশাইখ, দরবেশদের উদ্দেশ্যে ভক্তরা তাদের সম্পদ ও জীবন অকাতরে বিলিয়ে দিতে দ্বিধাবোধ করে না। আশ্চর্য হওয়ার মতো এ ধরনের অনেক ঘটনার মূলে জ্বিন জগতের হস্তক্ষেপ থাকে, অথবা জ্বিনের গোপন ও দুষ্ট জগৎ লুকিয়ে রয়েছে।
জ্বিনের ক্ষমতা সম্পর্কে এ বইয়ে বর্ণিত মৌলিক বিষয়সমূহ স্মরণ রাখলে সকল প্রকার অতিপ্রাকৃতিক তথা অলৌকিক ও যাদুসংক্রান্ত ঘটনাগুলো যে ধোঁকা বা ভেলকিবাজি নয় তা খুব সহজেই ব্যাখ্যা করা যায়। যেমন, হঠাৎ হঠাৎ আলো জ্বলে উঠে ও নিভে যায়, দেয়াল থেকে ছবি পড়ে যায়, জিনিসপত্র বাতাসে উড়ে বেড়ায়, মেঝে ফেটে যায় ইত্যাদি ঘটনাগুলো সাধারণত একটি ভূতুড়ে বাড়ির ক্ষেত্রে ঘটে থাকে। অদৃশ্য অবস্থায় জ্বিনেরা জড় বা ভৌত উপাদান বা বস্তুর উপর সক্রিয় হয়ে উক্ত ঘটনাগুলোসহ আরও অন্যান্য অভূতপূর্ব ঘটনা সংঘটিত হতে সহায়তা করে। আধ্যাত্ম বৈঠকের বেলায়ও এ বিষয়টি উপরের ঘটনার অনুরূপ বলেই প্রতীয়মান হয়। আধ্যাত্ম বৈঠকে মৃতরা জীবিতদের সাথে যোগাযোগ করে ব’লে বাহ্যিকদৃষ্টিতে মনে হয়। মৃত আত্মীয়-স্বজনদের কণ্ঠস্বর যাদের নিকটে পরিচিত তারা মৃতদের জীবনে সংঘটিত নানা প্রকার ঘটনা সম্পর্কে তথাকথিত মৃত ব্যক্তির মুখ থেকে অনুরূপ কণ্ঠেই শুনতে পায়। মৃতব্যক্তিটির জীবিতাবস্থায় তার জন্য যে জ্বিনটি নিয়োজিত ছিল সর্বক্ষণ, সেই জ্বিনটিকে আহ্বান করে তাকে মাধ্যম করে এ কৃতিত্ব সুচারুরূপে সম্পাদন করা হয়। এ জ্বিনটিই মৃতের কণ্ঠস্বরকে হুবহু নকল করে মৃতব্যক্তির জীবনে সংঘটিত ঘটনাসমূহের সবিস্তার বর্ণনা পেশ করে। ওঝার কাষ্টফলককেও অনুরূপ উত্তর প্রদান করতে দেখা যায়। যথাযথ পরিবেশের ব্যবস্থা করলে জ্বিনের অদৃশ্য হস্তক্ষেপে বিস্ময়কর ফলাফল প্রকাশ পেতে পারে। যারা শূন্যে ভেসে বেড়াতে অথবা কোন জিনিসকে স্পর্শ না করেই উপরে উঠাতে বা নিচে নামাতে সক্ষম বলে মনে হয়- এগুলোতেও জ্বিনের অদৃশ্য হাত রয়েছে। কেউ কেউ মুহূর্তের মধ্যে বিশাল ব্যবধানের দূরত্ব অতিক্রম করতে অথবা একই সময়ে দু’টি স্থানে উপস্থিত থাকতে সক্ষম হয়- এটাও আদতে তাদের অদৃশ্য সঙ্গী কর্তৃক স্থানান্তরিত হয়।’ অনুরূপভাবে, যারা শূন্য থেকে খাদ্যদ্রব্য বা টাকা-পয়সা উপস্থিত করতে পারে তারাও অদৃশ্য ও দ্রুতগতির জ্বিনের সহায়তা নিয়ে এ সব কৃতিত্ব সম্পন্ন করে থাকে। এমনকি পুনর্জন্মগ্রহণের মত বিস্ময়কর ঘটনার প্রকাশেও জ্বিনদের হস্তক্ষেপ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সাত বৎসর বয়স্ক শান্তি দেবী নামে এক বালিকা তার পূর্ববর্তী জীবনে সংঘটিত ঘটনাবলীর সুস্পষ্ট ও নিখুঁত বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছিল।’ বালিকাটি তখন যেখানে বাস করত সে স্থান থেকে বহুদূরের অন্য একটি প্রদেশের মুতরা নামক একটি শহরে অবস্থিত তার বাড়ির পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়েছিল (যেখানে সে তার পূর্ববর্তী জীবনে বসবাস করত)। লোকজন বিষয়টির সত্যতা যাচাই করতে সেখানে গমন করলে, বালিকাটির বর্ণনানুপাতে একটি বাড়ি সে স্থানে এক সময় ছিল বলে সেখানকার স্থানীয় লোকেরা স্বীকার করেছিল। তাছাড়া তারা সেই বালিকার পূর্ববর্তী জীবনের কিছু ঘটনার সত্যতাও নিশ্চিত করেছিল। নিশ্চয়ই এ সকল তথ্যাবলী জ্বিনেরা বালিকাটির অবচেতন মনে প্রথিত করে দিয়েছিল। রাসূল এ বিষয়টিকে সমর্থন করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই মানুষ ঘুমন্তাবস্থায় যে স্বপ্ন দেখে তা তিন প্রকার: আর- রাহমান-এর (আল্লাহর) পক্ষ হতে, খারাপ স্বপ্ন শয়ত্বান হতে এবং অবচেতন স্বপ্ন।’
এতে কোনই সন্দেহ নেই যে, জ্বিন মানুষের দেহের পাশাপাশি মনের মধ্যেও প্রবেশ করার ক্ষমতা রাখে। জ্বিনের আছর বা জ্বিনে পাওয়া মানুষের ঘটনা অসংখ্য এবং প্রায়ই ঘটতে দেখা যায়। এ ঘটনা ক্ষণস্থায়ীও হতে পারে, এ ব্যাপারে উদাহরণ হিসেবে বহু খ্রিস্টান ও পৈাত্তলিকদের কথা বলা যায়, শারীরিক ও মানসিক বৈকল্যতার দরুন এরা অবচেতন হয়ে বিদেশী ভাষায় কথা বলতে শুরু করে। এমন দুর্বলতর অবস্থায় জ্বিন সহজেই তাদের শরীরে প্রবেশ করে প্রলাপ বকাতে পারে। তথাকথিত মুসলিম সুফীদের’ জিকিরের বৈঠকের সময়েও এ ধরনের ঘটনা ঘটার অনেক নজীর রয়েছে। আবার জ্বিনের এ আছর দীর্ঘস্থায়ীও হতে পারে। ফলে মানুষের ব্যক্তিগত অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়। জ্বিনে বা ভূতে পাওয়া অথবা ভূতগ্রস্ত ব্যক্তি কাণ্ডজ্ঞানহীন ব্যবহার করে অলৌকিক শক্তির প্রকাশ ঘটায় অথবা তাদেরকে মাধ্যম করে অনেক সময় নিয়মিতভাবে কথাবার্তা বলতে পারে।
মধ্যযুগে ভূত-প্রেত’ বিতাড়ন রেওয়াজের ব্যাপক প্রচলন ঘটে। ভূত-প্রেত বিতাড়ন সংক্রান্ত খ্রিস্টানদের এ প্রথার উৎপত্তি মূলত বাইবেলে। মন্ত্র দ্বারা যিশু ভূত- প্রেত দূর করেছেন- এ সংক্রান্ত অনেক বর্ণনা বাইবেলে দেখতে পাওয়া যায়। একটি বর্ণনা এ রকম যে, ‘যিশু ও তাঁর সহচরগণ গেরাসেনীদের এলাকায় গিয়ে ভূতে পাওয়া একজন লোকের সাক্ষাত পান। সেই ভূতগুলোকে তার মধ্য থেকে বের হয়ে যেতে আদেশ করলে তারা লোকটিকে ত্যাগ করল এবং নিকটবর্তী পাহাড়ের ঢালে চরে বেড়ানো শূকর পালের ভিতরে ঢুকে পড়ল। তাতে সেই শূকরের পাল পাহাড়ের ঢালু পার দিয়ে জোরে দৌড়ে গিয়ে পানিতে ডুবে মরল।” সত্তর ও আশির দশকের শেষের দিকে মুক্তি পাওয়া ‘The Exorcist’, ‘Rosemary’s Baby’ ইত্যাদি চলচ্চিত্রে এ ভূত-প্রেত বিতাড়ন সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড আলোচ্য বিষয় হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। অতিপ্রাকৃত তথা অলৌকিক যেকোন বিষয়কে প্রত্যাখ্যান করা যেহেতু বস্তুবাদী পশ্চিমাদের সাধারণ প্রবণতা, তাই ভূত-প্রেত বিতাড়নের কোন যৌক্তিক ভিত্তি পশ্চিমাদের নিকটে নেই এবং এটিকে তারা কুসংস্কার বলে গণ্য করে থাকে। এর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ অন্ধকার ও মধ্যযুগে ব্যাপকভাবে ডাইনি খুঁজে বের করে আগুনে পোড়ানোর ঘটনা অহরহ ঘটতে দেখা গেছে। তথাপি, জ্বিনে পাওয়া বা ভূতগ্রস্ত বা ভূতাবিষ্ট ব্যক্তি থেকে জ্বিন বা ভূত বা প্রেতকে বিতাড়ন করতে এবং জ্বিনে পাওয়া বা ভূতগ্রস্ত বা ভূতাবিষ্ট ব্যক্তি থেকে উদ্ভূত রোগের চিকিৎসায় কুরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক বৈধ পদ্ধতি প্রয়োগ জায়েয।
পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষতার প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে বর্তমানে অনেক মুসলিম জ্বিনে পাওয়া বা ভূতাবিষ্ট হওয়াকে অস্বীকার করে। এমনকি অনেক মুসলিম এমনও রয়েছে যারা জ্বিনের অস্তিত্বকেও স্বীকার করে না। অথচ, কুরআন ও সুন্নাহতে এ ব্যাপারে হ্যাঁ-বাচক বর্ণনা ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। অনেক সহীহ হাদীস রয়েছে যা দ্বারা প্রমাণিত হয়, রাসূল লোকদেরকে জ্বিনের আছর থেকে মুক্ত করেছেন। তাছাড়া এমন হাদীছের সংখ্যাও কম নয় যেখানে আমরা দেখতে পাই, রাসূল-এর সাহাবীরাও তাঁর অনুমতি সাপেক্ষে লোকজনকে জ্বিনের আছর থেকে মুক্ত করেছেন।
টিকাঃ
১. মৃতের সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদানের জন্য বৈঠক বা প্রেততাত্ত্বিক গবেষণার সভা।
২. প্রেতচক্রের অধিবেশনে ব্যবহৃত অক্ষর ও অন্যান্য চিহ্ন সংবলিত কাঠফলক। এর প্রয়োগ বা বিশ্বাস বা এতে সিদ্ধ ব্যক্তি।
৩. তবে উপরে বর্ণিত সকল ঘটনার মূলে যে জ্বিন জগতের হাত রয়েছে এ কথা নিশ্চিতরূপে বলা যায় না। কেননা, আওলিয়াদের কারামত যেটাকে আমরা স্বীকার করি, সেখানেও তো মাঝে-মধ্যে এ ধরণের কোন ঘটনা ঘটে থাকে এবং ঘটতে পারে, তবে এ ক্ষেত্রে আমরা সে-সব ঘটনার পিছনেও জ্বিনের জগত সক্রিয় রয়েছে বলে ঘোষণা দিতে পারি না। এ ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে যে, অতি প্রাকৃত বা অস্বাভাবিক কোন ঘটনা ঘটতে পারে, তবে এ ক্ষেত্রে শুধু ঘটনার ধরন নয়, বরং আমাদেরকে দেখতে হবে যে ঘটনা কার মাধ্যমে ঘটেছে এবং কিভাবে বা কি পদ্ধতিতে ঘটেছে।
৪. এ সংক্রান্ত অসংখ্য ঘটনা সম্পর্কে জানতে Ibn Taymeeyah’s Essay on the Jinn-এর ৪৭-৫৯ পৃ. দেখুন।
৫. Colin Wilson, The Occult, (New York: Random House, 1971) 514-515 পৃ.
৬. আবু হুরায়রা কর্তৃক বর্ণিত। আবু দাউদ, সুনান আবি দাউদ, ৩য় খণ্ড, ১৩৯৫ পৃ., হাদীস নং ৫০০১; সিলসিলাহ আল-আহাদীস আছ-ছাহীহাহ, ৪র্থ খণ্ড, ৪৮৭ পৃ., হাদীস নং ১৮৭০।
৭. মুসলিমদের মধ্য থেকে উৎসরিত আধ্যাত্মবাদ।
৮. অনবরত আল্লাহর নাম বলা এবং অনেক সময় গান-বাদ্যের তালে তালে শরীর ঝাঁকিয়ে এমনকি নৃত্যের তালে তালে।
৯. ইছলামী পরিভাষায় ভূতপ্রেত ইত্যাদি কোন শব্দ নেই। কারণ, কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা এ কথা প্রমাণিত যে, জ্বীনদের মধ্যে কিছু সংখ্যক রয়েছে বিশ্বাসী তথা মু’মিন এবং কিছু সংখ্যক হচ্ছে অবিশ্বাসী বা কাফির, তন্মধ্যে অবিশ্বাসীদেরকে বিভিন্ন নামে নামকরণ করা হয়। তন্মধ্যে একটি নাম হচ্ছে ভূত বা প্রেত যা আমাদের সামাজিক পরিভাষায় প্রচলিত একটি নাম বা শব্দ।
১০. মথি ৮:২৮-৩৪, মার্ক ৫:১-২০ এবং লুক ৮: ২৬-৩৯।
📄 যত আছে গণক-জ্যোতিষ ও সাধু, করে তারা চর্চা জ্যোতিশাস্ত্র ও যাদু
নক্ষত্র ও গ্রহসংক্রান্ত গণনা অর্থাৎ জ্যোতিষশাস্ত্রের চর্চাকে পূর্ববর্তী মুসলিম পণ্ডিতেরা সামগ্রিকভাবে ‘তানযীম’ বলে অভিহিত করেন। এ বিষয়টির উপর ইসলামী বিধানকে বিশেষভাবে কার্যকর করতে তারা তানযীমকে তিনটি ভাগে শ্রেণীবিন্যাস করেছেন।
১. প্রথম শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত জ্যোতিষীরা এ বিশ্বাস পোষণ করে যে, সমগ্র বিশ্ব যেহেতু জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর প্রভাবে প্রভাবিত, তাই ভবিষ্যতে ঘটবে এমন সব ঘটনাসমূহ সংঘটিত হওয়ার পূর্বে জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে প্রকাশ করা সম্ভব।’ যতদূর জানা যায়, জ্যোতিষশাস্ত্র নামে পরিচিত এ চর্চার উদ্ভব হয় খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দে মেসোপটেমিয়ায়। গ্রীক সভ্যতার সময়কালে তা পূর্ণতা লাভ করে। ষষ্ঠ শতাব্দিতে মেসোপটেমিয়ার জ্যোতিষীদের উদ্ভাবিত পুরাতন পদ্ধতিগুলো ভারতে ও চীনে পৌছাতে সক্ষম হয়। তবে কেবল নক্ষত্রের মাধ্যমে ভবিষ্যত গণনার পদ্ধতির চর্চা চীনে ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। মেসোপটেমিয়াতে জ্যোতিষশাস্ত্রের মর্যাদা অনেক উঁচুস্তরে ছিল এবং ক্রমান্বয়ে তা রাজকীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এ প্রতিষ্ঠানের জ্যোতিষীরা আকাশে দৃশ্যমান নানা প্রতীকের বিশ্লেষণ করে রাজা ও রাজ্যের কল্যাণ-অকল্যাণ সংক্রান্ত শুভাশুভ সংকেতের ঘোষণা প্রদান করত। ‘জ্যোতিষ্কমণ্ডলী হল ক্ষমতাবান দেবতা’ - এ বিশ্বাস মেসোপটেমিয়ার মূল বিশ্বাস ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দিতে নক্ষত্ররূপী দেবতারা গ্রীসে পরিচিতি লাভ করলে এগুলো গ্রীসের গ্রহসংক্রান্ত গণনার উৎসে পরিণত হয়। ভবিষ্যত নির্ধারণের বিজ্ঞান হিসেবে জ্যোতিষশাস্ত্র শুধু গ্রীসের রাজকীয় প্রতিষ্ঠানের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ না থেকে তা ধন-সম্পদশালীদের নাগালেও চলে যায়।
ধর্ম, দর্শন এবং সমসাময়িক সমগ্র ইউরোপের পৌত্তলিকতার বিজ্ঞানের উপরে জ্যোতিষশাস্ত্র দুই সহস্রাধিক বর্ষব্যাপী প্রভাব বিস্তার করেছে। ইউরোপের ‘Dante’ এবং সেইন্ট ‘Thomas Aquinant’ উভয়ে পৃথকভাবে তাদের নিজস্ব দর্শনে জ্যোতিষশাস্ত্রের ‘কার্যকারণ’ মতবাদের প্রয়োগ করেন খ্রিষ্ট্রীয় ১৩ শতাব্দিতে। ইব্রাহিম (আব্রাহাম) (আ:)-এর উম্মাত সাবীয়রাও জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাস করত। এরা সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্রকে পূজা করত। তাছাড়া, এই সাবীয়রা গ্রহ-নক্ষত্র তথা জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর প্রতীক ছবি ও মূর্তি তৈরি করে বিশেষ বিশেষ জায়গায় সেগুলোকে স্থাপন করত। তারা বিশ্বাস করত যে, এগুলো জগৎ নিয়ন্ত্রণ করে, বিপদাপদ দূরীভূত করে, দু’আ কবুল করে, প্রয়োজন পূরণ করে। তারা আরো বিশ্বাস করত যে, এ সমস্ত গ্রহ-নক্ষত্র আল্লাহ্ ও সৃষ্টি জগতের মাঝে মধ্যস্থতাকারী এবং তাদেরকে দেওয়া হয়েছে পৃথিবী পরিচালনার দায়-দায়িত্ব। তারা এটাও বিশ্বাস করত যে, জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর আত্মা নেমে এসে এ সব মূর্তির মধ্যে অবস্থান করে তাদের সাথে যোগাযোগ করে মানুষের চাহিদা পূরণ করে। এ সব বিশ্বাসের ফলক্রমে তারা সে সব গ্রহ-নক্ষত্র, ফিরিশতা প্রভৃতির মূর্তির নিকটে গমন করে প্রার্থনা করত।’ তাওহীদ আর-রুবুবিয়্যাহ-কে সমূলে ধ্বংস করার কারণে এ সকল জ্যোতিষশাস্ত্রের চর্চাকে শিক হিসেবে গণ্য করা হয়। কেননা চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র ইত্যাদিকে সিজদাহ করা কিংবা ছবি, মূর্তি ও প্রতিমা ইত্যাদির নিকট প্রার্থনা করা তাওহীদ আর-রুবুবিয়্যাহ-তে শিরকের অন্তর্ভুক্ত। পক্ষান্তরে, যদি কেউ নক্ষত্রকে মঙ্গল-অমঙ্গল, শুভ-অশুভ ইত্যাদির পূর্বাভাষ বা প্রতীক ও আলামত হিসেবে বিশ্বাস করে, তাহলে তা হবে আল-আসমা ওয়াস সিফাত-তে শিকের অন্তর্ভুক্ত। মূলত, এ শাস্ত্রের চর্চাকারীরা একইসাথে শিরক ও কুফর চর্চায় লিপ্ত। কারণ, এ সব জ্যোতিষীরা সাধারণত ভবিষ্যতে ঘটবে এমন কিছু সম্পর্কে জানাতে সক্ষম বলে দাবী করে থাকে। কিন্তু ভবিষ্যতের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ্ই রাখেন। তারা নিজেদেরকে আল্লাহ্র কিছু গুণাবলীতে গুণান্বিত বলে মিথ্যা দাবী করে এবং যে ভাল-মন্দ ভাগ্য আল্লাহ্ তা’আলা সুনির্দিষ্ট করে রেখেছেন তা পরিবর্তন করার মিথ্যা আশ্বাস প্রদান করে। জ্যোতিষশাস্ত্র চর্চা হারাম বলে প্রমাণিত হয়েছে ইবনু ‘আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর বর্ণিত হাদীছের ভিত্তিতে। উক্ত হাদীছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘জ্যোতিষশাস্ত্রের কোন বিষয়ের জ্ঞান অর্জন করার অর্থ হচ্ছে যাদুবিদ্যার জ্ঞান লাভ করা। সুতরাং এভাবে কেউ যত জ্ঞান অর্জন করল, ততই তার গুনাহের পরিমাণ বাড়তে থাকল।’২
২. দ্বিতীয় শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত জ্যোতিষীদের দাবী এ রকম যে, ‘আল্লাহ্ তা’আলা ইচ্ছা করেছেন, জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর গতিবিধি এবং তাদের অবস্থানের ভিন্নতার মাধ্যমে ভবিষ্যতে সংঘটিতব্য জাগতিক ঘটনাবলী সম্পর্কে নির্দেশনা প্রদান করবেন।’ ব্যাবিলনের জ্যোতিষশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা ও চর্চাকারী মুসলিম জ্যোতিষীরা সাধারণত এ ধরনের বিশ্বাস পোষণ করত। জ্যোতিষশাস্ত্রের চর্চার প্রচলন মুসলিম রাজ্যে রাজকীয়ভাবে শুরু হয় উমাইয়া খিলাফাতের শেষ প্রান্তে এবং আব্বাসীয় খিলাফাতের সূচনাকালে খলিফার আসনে আসীন শাসকদের মাধ্যমে। একজন জ্যোতিষী নিয়োগ করা হতো এ জন্য যে, সে খলিফাকে দৈনন্দিন বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরামর্শ এবং আসন্ন বিপদ-আপদ সম্পর্কে সতর্কবাণী প্রদান করবে। জ্যোতিষশাস্ত্রের অন্তর্গত মৌলিক বিষয়গুলোকে মুসলিম জনগণ যেহেতু কুফর বলে গণ্য করত, তাই মুসলিমদের মাঝে জ্যোতিষশাস্ত্রের চর্চা করাকে তথাকথিত এ সব মুসলিম জ্যোতিষী ইসলামসম্মত বলে চালিয়ে দেয়ার নিমিত্তে একটা কৌশল প্রয়োগ করল। ফলে, জ্যোতিষশাস্ত্রের বিভিন্ন আলামত ও প্রতীক আল্লাহ্ ইচ্ছাশক্তি বলে প্রচার করা হল। যা হোক, জ্যোতিষশাস্ত্রের এ ধরনের চর্চাও হারাম এবং এর চর্চাকারীকে কাফির বলে গণ্য করা উচিত। কারণ, এ বিশ্বাস এবং মুশরিকদের বিশ্বাসের মধ্যে তেমন উল্লেখযোগ্য কোন পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় না। জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর উপর আল্লাহ্র ক্ষমতা আরোপিত হয়েছে এবং এদের বিভিন্ন অবস্থান ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হওয়ার দাবীদারেরা ভবিষ্যত জ্ঞানের অধিকারী বলে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে থাকে, অথচ ভবিষ্যতের ঘটনা সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহই পূর্ণ ওয়াকিবহাল। তবুও, পরবর্তীকালের কিছু সুবিধাবাদী মুসলিম পণ্ডিত আসমানী বিধানের যথাযথ প্রয়োগ সাধনে শিথিলতা প্রদর্শন করেন। অন্যদিকে, জ্যোতিষশাস্ত্রের বিষয়গুলো মুসলিমদের মাঝে বদ্ধমূল বিশ্বাসে পরিণত হওয়ার কারণে তৎকালীন তথাকথিত মুসলিম পণ্ডিতেরা এ ধরনের জ্যোতিষশাস্ত্রের চর্চাকে অনুমোদন করেন।
৩. তৃতীয় ও শেষ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত সে সব বিষয় যা নক্ষত্রের বিভিন্ন অবস্থান ও এর গতিবিধির উপর ভিত্তি করা সম্পর্কিত। এর দ্বারা নাবিক বা মরূভূমির পথিকেরা তাদের দিক নির্ণয় এবং কৃষকেরা তাদের শস্য রোপনের সময় নির্ধারণ ইত্যাদি করে থাকে।’ জ্যোতিষশাস্ত্রের অন্তর্ভুক্ত কেবল এ রূপটিই অনুমোদনযোগ্য (হালাল)। কারণ, এটি হালাল হওয়ার বিষয়টি কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত।
এ বিধানের মূল ভিত্তি কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত:
﴿وَهُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ النُّجُومَ لِتَهْتَدُوا بِهَا فِي ظُلُمَاتِ الْبَرِّ وَالْبَحْرِ ﴾ (سورة الأنعام: ٩٧) ‘তিনি তোমাদের জন্য নক্ষত্ররাজি সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা সেগুলোর সাহায্যে জলে স্থলে অন্ধকারে পথের দিশা লাভ করতে পার।’ [সূরা আল-আন’আম (৬): ৯৭]
ক্বাতাদাহ’ থেকে বুখারী বর্ণনা করেন, ‘দিক সম্পর্কে নির্দেশনা প্রদানের নিমিত্তে এবং শয়তানের প্রতি নিক্ষেপ করার জন্যই আল্লাহ্ তা’আলা নক্ষত্রমণ্ডলীকে সৃষ্টি করেছেন। অতএব, নক্ষত্রমণ্ডলীকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে তা ব্যতিরেকে যদি অন্য কিছু প্রত্যাশা করা হয় এগুলোর নিকট থেকে, তাহলে এর দ্বারা বুঝা যায় যে, তারা বড় ধরনের বিভ্রান্তিতে পতিত হয়েছে। ফলে, সে ব্যক্তি ভাগ্যহীন হয়ে পড়ে, কল্যাণের সঙ্গে তার জীবনের সাক্ষাত মেলে না এবং সে তার নিজের উপর এমন সব বিষয়কে আরোপ করে যে সম্পর্কে সে অজ্ঞ। নিশ্চয়ই এ কাজ যারা সম্পাদন করে তারা আল্লাহ্র আদেশ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। তারা নক্ষত্র সম্বন্ধে এমন ভবিষ্যদ্বাণী প্রদান করে। এ সব ব্যক্তি দাবী করে, এই এই নক্ষত্রের সময় বিয়ে করলে এটা ঘটবে, ওটা ঘটবে ইত্যাদি; এই এই নক্ষত্রের সময় কোন কাজ শুরু বা কোথাও যাত্রা বা ভ্রমণ করলে এটা-ওটার সম্মুখীন হবে ইত্যাদি। আমার জীবন অতিবাহিত হওয়ার সময়ে প্রতিটি নক্ষত্রের নীচে লাল, কাল, লম্বা, খাটো, কুৎসিত এবং সুদর্শন প্রাণীর জন্মলাভ হয়েছে। কিন্তু কোন নক্ষত্র, প্রাণী বা পাখি এরা কেউই অদৃশ্য সম্পর্কে অবগত নয়। আল্লাহ্ তা’আলা যদি কাউকে অদৃশ্যের জ্ঞান অর্জনের কৌশল শিক্ষা দিতেন, তাহলে আদম (আ:)-কেই শিক্ষা দিতেন। কারণ, তিনিই তাঁর নিজ হাত দ্বারা আদম (আ:)-কে সৃষ্টি করেছেন, ফিরিশতাদেরকে দিয়ে তাকে সিজদা করিয়েছেন এবং তাকে সকল বস্তুর নাম শিক্ষা দিয়েছেন।’
পূর্বে উল্লেখিত নক্ষত্র ব্যবহারের সীমারেখাকে ক্বাতাদাহ (রাহি.) নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন মূলত সূরা আল-আন’আমের ৯৭ নং আয়াতের ভিত্তিতে। এ সীমারেখা সম্পর্কে নিচের আয়াতেও বর্ণনা করা হয়েছে:
﴿وَلَقَدْ زَيَّنَّا السَّمَاءَ الدُّنْيَا بِمَصَابِيحَ وَجَعَلْنَاهَا رُجُوماً للشَّيَاطِين ... )) (سورة الملك: ٥) ‘আমি নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা দিয়ে সুসজ্জিত করেছি আর শয়ত্বানকে তাড়িয়ে দেয়ার জন্য, এবং প্রস্তুত করে রেখেছি জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি...।’ [সূরা আল-মুল্ক (৬৭): ৫]
অতএব, আল্লাহ্ তা’আলা যে মানদণ্ড প্রদান করেছেন তার ভিত্তিতে বিচার বিশ্লেষণ করে বৈধ উপায়সমূহ ব্যতীত সকল প্রকার নক্ষত্র সংশ্লিষ্টতা থেকে বেঁচে থাকা প্রতিটি মুসলিমের আবশ্যিক দায়িত্ব।
মুসলিম জ্যোতিষীর খোঁড়া যুক্তি জ্যোতিষ শাস্ত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট মুসলিমরা তাদের এ চর্চাকে সমর্থন এবং এর বৈধতা প্রমাণের নিমিত্তে কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের অপব্যাখ্যা করার দুঃসাহস দেখিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সূরা আল-বুরূজকে ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়েছে, ‘রাশিচক্রের প্রতীক’-এর সূরা হিসেবে।’ শুধু তাই নয়, এ সূরাটির প্রথম আয়াতের অনুবাদ করা হয়েছে ‘রাশিচক্র প্রতীকের শপথ’। এটি নিশ্চয়ই ‘বুরূজ’ শব্দের ভুল ও ভ্রান্ত অনুবাদ। শব্দটির সত্যিকার অর্থ হচ্ছে ‘নক্ষত্রের আপেক্ষিক অবস্থান’। ‘রাশিচক্রের প্রতীক’ নয়। নক্ষত্রের আপেক্ষিক অবস্থান বুঝাতে প্রাচীন ব্যাবিলন এবং গ্রীকবাসীরা রাশিচক্রের প্রতীক হিসেবে কেবল কিছু প্রাণীর প্রতিরূপকে ব্যবহার করত। ফলে, নক্ষত্র পূজার পৌত্তলিক চর্চার সমর্থনে কোনক্রমেই এ সূরাকে ব্যবহার করা বৈধ নয়। কল্পিত চিত্রের সঙ্গে নক্ষত্রের আপেক্ষিক অবস্থানের কোন সম্পর্ক নেই। বরং সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে মহাশূন্যে নক্ষত্রের আপেক্ষিক অবস্থানের আমূল পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী।
পূর্ববর্তীকালে, জ্যোতিষশাস্ত্রকে সমর্থন করতে খলিফাদের দরবারে সূরা আন-নাহলের নিম্নোক্ত আয়াতটি ব্যবহৃত হতো:
﴿وَعَلَامَاتٍ وَبِالنَّجْمِ هُمْ يَهْتَدُونَ ) (سورة النحل: ١٦) ‘আর দিক-দিশা প্রদানকারী চিহ্নসমূহ; আর তারকারাজির সাহায্যেও তারা পথনির্দেশ লাভ করে।’ [সূরা আন্-নাহল (১৬): ১৬]
মুসলিম জ্যোতিষীরা দাবী করে, ‘এ আয়াতের অর্থ হল, নক্ষত্রমণ্ডলী অদৃশ্যকে প্রকাশ করার প্রতীক এবং এর মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান ব্যবহার করে ভবিষ্যত সম্পর্কে বিভিন্ন দিক নির্দেশনা প্রদান করা যেতে পারে।’ যা হোক, ‘তুরজুমান আল-কুরআন’ অর্থাৎ কুরআনের অর্থের অনুবাদক বলে ইবনে ‘আব্বাস -কে আল্লাহর রাসূল আখ্যায়িত করেছিলেন। অথচ, এ আয়াতে উল্লেখিত ‘প্রতীক’ দ্বারা সূর্যালোকের ‘পথচিহ্ন’ বা ‘বিশেষচিহ্ন’ বুঝানো হয়েছে বলে ইবনে ‘আব্বাস অভিমত ব্যক্ত করেছেন। ওগুলো কোনক্রমেই নক্ষত্রসম্বন্ধীয় নয়। তিনি আরও বলেন, ‘তারকারাজির সাহায্যে তারা পথনির্দেশ লাভ করে।’ এ শব্দসমষ্টির অর্থ হচ্ছে, সমুদ্র ও মরুভূমিতে রাত্রিকালে ভ্রমণাবস্থায় তারা নক্ষত্রমণ্ডলীর মাধ্যমে পথনির্দেশ প্রাপ্ত হয়। অন্যভাবে, এ আয়াতের অর্থ সূরা আল-আন’আম-এর ৯৮ নং আয়াতের অনুরূপ।
প্রকৃতপক্ষে, জ্যোতিষশাস্ত্র সংক্রান্ত অবাস্তব ও মিথ্যায় পরিপূর্ণ বিজ্ঞান অধ্যয়ন এবং এর প্রয়োগের সমর্থনে কুরআনের এই আয়াতসহ অন্যান্য আয়াতকে ব্যবহার করা সম্পূর্ণভাবে অবৈধ। ‘একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই ভবিষ্যতের জ্ঞান সংরক্ষণ করেন’, এ বিষয়টি কুরআনের অসংখ্য আয়াত দ্বারা প্রমাণিত, অথচ উপরোক্ত অপব্যাখ্যার মাধ্যমে এ মহাসত্যকে অস্বীকার করার চেষ্টা করা হয়েছে। তাছাড়া, জ্যোতিষশাস্ত্র এবং এ সংক্রান্ত সকল অবাস্তব ও মিথ্যা বিজ্ঞানের জ্ঞান আহরণ ও বিশ্বাস করতে সুস্পষ্টভাবে অনেক হাদীছে কঠোরভাবে নিষেধ করা সত্ত্বেও উক্ত সহীহ হাদীসগুলোর বিরোধীরূপে দাঁড়িয়েছে তথাকথিত ভ্রান্ত তাফসীরটি।
উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহর রাসূলের সাহাবী ইবনু ‘আব্বাস বর্ণনা করেন, ‘যে ব্যক্তি জ্যোতিষশাস্ত্রের একটি শাখার জ্ঞান অর্জন করল, সে যাদুবিদ্যার একটি শাখার জ্ঞান লাভ করল।’
আবু মাহযামও রাসূল থেকে বর্ণনা করেন, ‘আমার মৃত্যুর পর আমার উম্মতের জন্য আমি যা সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক বলে আশংকা করি তা হল: তাদের বিচারকদের নীতিহীনতা, নক্ষত্রের উপরে বিশ্বাস এবং আল্লাহ্ কর্তৃক সুনির্ধারিত ভাগ্যকে অস্বীকার করা।’
সুতরাং জ্যোতিষশাস্ত্রকে বিশ্বাস করা এবং এর চর্চা করার ভিত্তি ইসলামে নেই। যে ব্যক্তি কোন ভ্রান্ত মতবাদকে নিজের স্বপক্ষ সমর্থনের উদ্দেশ্যে বিকৃত করার দুঃসাহস প্রদর্শন করে, সে-ই- মূলত ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদেরকে অনুসরণ করে। কারণ, ইয়াহুদীরা স্বজ্ঞানে তাওরাতের বিভিন্ন বিষয়ের অর্থ বিকৃত করেছে।
টিকাঃ
১. তাইসীর আল-আযীয আল-হামীদ, ৪৪১ পৃ.। William D. Halsey (ed.), Collier’s Encyclopedia, (USA: Crowell-Collier Educational Corporation, 1970) vol. 3, p. 103.
২. তাইসীর আল-‘আযীয আল-হামীদ, ৪৪৫ পৃ.।
৩. তাইসীর আল-‘আযীয আল-হামীদ, ৪৪৭-৪৪৮ পৃ.।
৪. আল্লাহর রাসূল-এর সাহাবীদের ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম পণ্ডিত। (রাহিমাহুল্লাহ)
৫. আব্দুল্লাহ ইউসূফ ‘আলী, The Holy Quran, (ইংরেজি অনুবাদ, বৈরুত: দার আল-কুরআন আল-কারীম), ১৭১৪ পৃ.।
৬. তাইসীর আল-‘আযীয আল-হামীদ, ১৪৪ পৃ.।
৭. ইবনু জারীর আত্ব-ত্ববারি তাঁর তাফসীর ‘জামি’ আল-বায়্যানা’ন তা ‘ভীল আল-কুরআন, (মিশর: আল-হালাবি পাবলিশিং, ৩য় সংস্করণ, ১৯৬৮), ১৪তম খণ্ড, ৯১ পৃ.।
৮. আবু দাউদ, সুনান আবি দাউদ, ৩য় খণ্ড, ১০৯৫ পৃ., হাদীস নং ৩৯৮৬ এবং ইবনু মাজাহ।
৯. ইবনু ‘আসাকির কর্তৃক সংগৃহীত। আছ-ছুয়ূতী এ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। (তাইসীর আল-‘আযীয আল-হামীদ, ৪৪৫ পৃ.।) এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে সূরা আন-নিসা, ৪:৪৭, সূরা আল-মায়িদা, ৫:১৩ এবং ৫:৪১ দেখা যেতে পারে।
📄 রাশিচক্র-ভবিষ্যদ্বাণী ও যাদুমন্ত্রের ইসলামী বিধান, বিনষ্ট হবে না ঈমান থাকলে সাবধান
রাশিচক্র ও ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কে ইসলামী হুকুম: তাওহীদ বিরুদ্ধ শির্ক্বী ও কুফরী বিশ্বাস জড়িত থাকার কারণে ইসলাম ভবিষ্যৎ গণনার প্রতি কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে। ভবিষ্যত গণনায় লিপ্তদেরকে এ নিষিদ্ধ চর্চা ত্যাগ করতে উপদেশ দান ছাড়াও ইসলাম তাদের সঙ্গে যেকোন ধরনের সম্পৃক্ততার বিরোধিতা করে। আর, জ্যোতিষশাস্ত্রের চর্চা শুধু হারামই নয়, বরং জ্যোতিষীর নিকটে গমন করা, তার দেয়া ভবিষ্যদ্বাণী শ্রবণ করা, এ সংক্রান্ত বইপত্র ক্রয় অথবা কারো ভাগ্য গণনা করাও সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ! জ্যোতিষশাস্ত্র প্রধানত ভবিষ্যদ্বাণী করার জন্য ব্যবহৃত হওয়ার কারণে এ শাস্ত্রের চর্চাকারীরা জ্যোতিষী বলে বিবেচিত হয়। ফলস্বরূপ, কোন ব্যক্তি ভাগ্য পরীক্ষা করতে চাইলে সে রাসূল ঘোষিত বিধানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
গণকের নিকটে গমন করা গণকের যেকোন ধরনের দর্শনের ব্যাপারে রাসূল সুস্পষ্টভাবে নীতি নির্ধারণ করেছেন। হাফসা থেকে সাফিয়া বর্ণনা করেন যে, রাসূল বলেন, ‘যদি কেউ কোন গণক, গাইবী বিষয়ের সংবাদদাতা বা ভবিষ্যবক্তার নিকট গমন ক’রে তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করে, তাহলে ৪০ দিন ও ৪০ রাত পর্যন্ত তার সলাত কবুল হবে না।’
এ হাদীছে বর্ণিত শাস্তি শুধু গণকের নিকটে গমন করে কৌতুহলবশত তাকে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার জন্য। এ নিষিদ্ধতা আরও সমর্থিত হয়েছে মু’আবিয়া ইবনে আল-হাকাম আস-সালামী বর্ণিত হাদীস দ্বারা। এ হাদীছে মু’আবিয়া বলেন, ‘হে আল্লাহ্র রাসূল! নিশ্চয়ই আমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক রয়েছে, যারা গণকের নিকটে যায়। রাসূল উত্তর দিলেন, তাদের কাছে যাবে না।’
গণকের বক্তব্যের সত্যতায় সন্দিহান হওয়ার পরেও কেউ তার নিকটে গমন করে কিছু জিজ্ঞাসা করলে সেজন্য শাস্তির বিধান সম্পর্কে হাদীছে বর্ণিত হয়েছে। আবার, জ্যোতিষসংক্রান্ত তথ্যের সত্যতা বা মিথ্যার ব্যাপারে কারও কোন সন্দেহ থাকলে, তাহলে আল্লাহর পাশাপাশি অন্যরাও অদৃশ্য ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জ্ঞান রাখে বলে সন্দিহান হয়। এ ধরনের সন্দেহ পোষণ করাও এক প্রকার শির্ক। ফলে, এ ধরনের কঠিন শাস্তির বিধান নির্দিষ্ট করা হয়েছে কেবল গণকের নিকট গমনের জন্য, কারণ ভবিষ্যদ্বাণী বিশ্বাস করার ক্ষেত্রে এটাই প্রথম পর্যায়। যদি কেউ ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তবতায় দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে গণকের নিকট গমন করে, আর গণকের কোন ভবিষ্যদ্বাণী সত্যরূপে পরিগণিত হয়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই সে গণকের গোঁড়া সমর্থক ও ভবিষ্যদ্বাণীর প্রতি উৎসাহী বিশ্বাসীতে পরিণত হবে।
গণকের প্রতি বিশ্বাস অদৃশ্য ও ভবিষ্যতে কী ঘটবে সে সম্বন্ধে গণক ওয়াকিবহাল এ বিশ্বাসে যদি কেউ গণকের নিকটে গমন করা কুফরী (অবিশ্বাসীদের) কাজ। একইভাবে কোন জ্যোতিষী কর্তৃক প্রদানকৃত হোক অথবা জ্যোতিষশাস্ত্রের কোন বই, পত্র-পত্রিকায় লিখিত হোক কেউ যদি তার জন্য প্রদত্ত রাশিচক্রের প্রতি বিশ্বাস রাখে, এর ওপর নির্ভর করে বা এ বিষয়ে শংকাগ্রস্ত হয়, তবে সে সরাসরি কুফরীতে লিপ্ত। কারণ, এ সম্পর্কে আবূ হুরায়রা এবং আল-হাছান উভয়ে বর্ণনা করেন যে, রাসূল বলেন, ‘যে কেউ গণকের নিকটে গমন করে তার কথায় বিশ্বাস করল, তাহলে সে মুহাম্মাদের উপর অবতীর্ণ বিষয়কে অবিশ্বাস করল।’
এ হাদীসটিতে পূর্বে বর্ণিত হাদীছের মতো গণক শব্দটি ব্যবহৃত হলেও, গণক ও জ্যোতিষী -এরা উভয়ই যেহেতু ভবিষ্যত সম্পর্কে জ্ঞান রাখে বলে নিজেদেরকে উপস্থাপন করে, তাই উক্ত হাদীসদ্বয় জ্যোতিষীদের জন্য তো বটেই বরং ভবিষ্যতের জ্ঞানের অধিকারী বলে দাবীদার সকল ব্যক্তির জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। জ্যোতিষশাস্ত্রের বিশেষজ্ঞরাও সাধারণ গণকের মতো আল্লাহ্ তাওহীদকে অস্বীকার করে। জ্যোতিষীদের দাবী, নক্ষত্র দ্বারা মানুষের ব্যক্তিত্ব নির্ধারিত হয় অর্থাৎ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সকল কর্মকাণ্ডের উপরে নক্ষত্রের বিশেষ প্রভাব রয়েছে এবং প্রত্যেকের জীবনে সংঘটিত বা সংঘটিতব্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী নক্ষত্রে লিপিবদ্ধ রয়েছে। আর সাধারণ গণকের দাবী এরূপ, কোন কাপের তলায় চায়ের পাতার গঠন অথবা হাতের তালুর রেখার মাধ্যমে অনুরূপ বিষয়াবলীর প্রকাশ ঘটে। মাধ্যম ব্যবহারের পদ্ধতির ভিন্নতা থাকলেও উভয়ক্ষেত্রেই তারা সৃষ্ট বস্তুর বাহ্যিক গঠন-বিন্যাসের বিচিত্রতায় অদৃশ্য প্রকাশ করার দাবী করে থাকে।
ইসলামের আক্বীদা-বিশ্বাস ও শিক্ষার সাথে জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাস ও রাশিচক্র পরীক্ষা করার সুস্পষ্ট বিরোধিতা রয়েছে। এ সব পথ খুঁজে বেড়ানো আত্মা আদতে সেই শূন্য আত্মার মতো যা প্রকৃত ঈমানের স্বাদ গ্রহণ করেনি। আল্লাহ্ কর্তৃক সুনির্ধারিত ভাগ্য থেকে রেহাই পাওয়ার ব্যর্থ প্রয়াস বৈ এ সব পথ আর কিছু নয়। অজ্ঞ লোকদের বিশ্বাস এ রকম যে, আগামীকাল কী ঘটবে তা জানতে পারলে, আজকেই তার জন্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করে সম্ভাব্য দুর্ঘটনাকে এড়িয়ে কল্যাণ নিশ্চিত করা যেতে পারে।
এ ধরনের বিশ্বাস দ্বারা অদৃশ্য ও ভবিষ্যৎ বিষয়াদি সম্পর্কে আল্লাহ্র জ্ঞান রাখার মতো গুণাবলীকে তাঁর সৃষ্টির প্রতি আরোপিত হয়। ফলস্বরূপ তাওহীদ আল-আসমা ওয়াস-সিফাত ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং তাওহীদের এ ক্ষেত্রে শিরকের সূচনা হয়। অর্থাৎ কেউ কোন জ্যোতিষী, গণক, রাশিবিদ, পীর, ফকীর, সাধু, দরবেশ ইত্যাদি গোপন জ্ঞানের দাবীদারকে সত্যই ‘গাইবী’ বা গোপন জ্ঞানের অধিকারী বলে বিশ্বাস করলে শিরক আকবার সংঘটিত হয়।
গণকদের লেখা বই, পত্র-পত্রিকা বা গবেষণা-পত্র পড়া এবং তাদের অনুষ্ঠান রেডিওতে শ্রবণ করা বা টিভিতে দেখা ইত্যাদির মধ্যে সাদৃশ্যতা বিরাজমান থাকায় এ সব কর্মকাণ্ড কুফরীর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত’; কারণ ভবিষ্যৎবক্তারা তাদের ভবিষ্যদ্বাণীর প্রচার ও প্রসারে বিংশ শতাব্দিতে এ মাধ্যমগুলোকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে। আল্লাহ্ তা’আলা পরিষ্কারভাবে কুরআনে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য কেউই অদৃশ্য সম্পর্কে জ্ঞান রাখে না, এমনকি রাসূলও না।
﴿ وَعِنْدَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ ... ﴾ (سورة المائدة: ٥٩) ‘সমস্ত গায়বের চাবিকাঠি তাঁর কাছে, তিনি ছাড়া আর কেউ তা জানে না...।’ [সূরা আল-মায়িদা (৬): ৫৯]
তারপর তিনি রাসূল ﷺ-কে বলেন,
﴿ قُلْ لَا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعاً وَلَا ضَرَا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ وَلَوْ كُنْتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَاسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ وَمَا مَسَّنِيَ السُّوءُ... ﴾ (سورة الأعراف: ۱۸৮) ‘বল, আল্লাহ্ যা ইচ্ছে করেন তা ছাড়া আমার নিজের ভাল বা মন্দ করার কোন ক্ষমতা আমার নেই। আমি যদি অদৃশ্যের খবর জানতাম তাহলে নিজের জন্য অনেক বেশি ফায়দা হাসিল করে নিতাম, আর কোন প্রকার অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করত না...।’ [সূরা আল-আ’রাফ (৭): ১৮৮]
আল্লাহ্ তা’আলা আরও বলেন: ﴿قُلْ لا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ... (سورة النمل: (٦٥) ‘আকাশ ও পৃথিবীতে যারা আছে তারা কেউই অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখে না আল্লাহ্ ছাড়া...।’ [সূরা আন্-নামাল (২৭): ৬৫]
অতএব, ভবিষ্যৎবক্তা, গণক এবং অনুরূপ ব্যক্তি কর্তৃক ব্যবহৃত নানা রকম পন্থা বা পদ্ধতিসমূহ মুসলিমদের জন্য নিষিদ্ধ। হস্তরেখা গণনা, ভাগ্য গণনার মাধ্যম আই চিং, সাফল্যের বিস্কুট বা কেক ও চায়ের পাতার পাশাপাশি রাশিচক্র ও ‘Bio-rhythm’ নামক কম্পিউটার প্রোগ্রাম- এগুলোতে বিশ্বাস স্থাপনকারী লোকজনের দাবী অনুযায়ী, এ সব উপায়সমূহ তাদের ভবিষ্যৎ সংক্রান্ত তথ্যাদি জানাতে পারে। যা হোক, আল্লাহ্ তা’আলা নিশ্চিতরূপে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, একমাত্র তিনিই অদৃশ্য ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন:
﴿إِنَّ اللهَ عِنْدَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَاذَا تَكْسِبُ غَداً وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوتُ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ ) (سورة لقمان: ٣٤) ‘কিয়ামাতের জ্ঞান কেবল আল্লাহ্র নিকটই আছে, তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন, জরায়ুতে কী আছে তা তিনিই জানেন। কেউ জানে না আগামীকাল সে কী অর্জন করবে, কেউ জানে না কোন্ জায়গায় সে মরবে। আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, সর্বাধিক অবহিত।’ [সূরা আল-লুকমান (৩১): ৩৪]
সে কারণেই সত্যিকারের মুসলিম হওয়ার দাবীদারেরা এ সকল ক্ষেত্র থেকে দূরে অবস্থান করতে নীতিগতভাবে বাধ্য। অতএব, রাশিচক্রের প্রতি বিশ্বাস না থাকলেও, রাশিচক্রের চিহ্নবিশিষ্ট আংটি, গলার হার (চেইন) ইত্যাদি অলংকার বা অন্যান্য কিছু ব্যবহার করা উচিত নয়। কুফর আগমনের সকল পথের শাখা-প্রশাখাকে সম্পূর্ণরূপে উৎখাত করতে হবে, যাতে ভ্রান্ত পথসমূহের কোন আলামতের লেশ মাত্র না থাকে। একমাত্র আল্লাহর তাওহীদে বিশ্বাসী মুসলিমের জন্য তার রাশিচক্রের প্রতীক সম্পর্কে অনুমান করা বা ‘আমার রাশি কী?’- এ ধরনের প্রশ্ন করা কখনো উচিত হবে না। সংবাদপত্র বা পত্রিকা-সাময়িকীতে প্রকাশিত রাশিচক্রের কলাম পড়া বা কাউকে পড়তে শ্রবণ করা কোন নর-নারীর জন্য উচিত নয়। আর কোন ব্যক্তি তার কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে জ্যোতিষশাস্ত্র সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণীর উপরে নির্ভরশীল হলে তাকে অবশ্যই আল্লাহ্র নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করে ইসলামের মূল বিশ্বাসের দিকে ফিরে এসে নিজের বিশ্বাসকে নবায়ন করতে হবে।
ফলে, মুসলিমদের অবশ্যই বই-পুস্তক, পত্রিকা, সংবাদপত্র ইত্যাদির পাশাপাশি সে সব লোকদের ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, যারা বিভিন্ন উপায়ে দাবী করে যে তারা ভবিষ্যৎ ও অদৃশ্য বিষয়ে জ্ঞান রাখেন। উদাহরণস্বরূপ, কোন মুসলিম আবহাওয়াবিদ কর্তৃক আগামীকালের বৃষ্টি, তুষারপাত বা আবহাওয়ার অন্যান্য অবস্থা সম্পর্কে প্রচার করার সময় ‘ইনশাআল্লাহ্’ (আল্লাহ্ যদি ইচ্ছা করেন) শব্দসমষ্টি যোগ করা উচিত। অনুরূপভাবে, কোন মুসলিম ডাক্তার যখন তার কোন রোগীকে জানায় যে, সে নয় মাসের মধ্যে অমুক দিনে একটি সন্তান প্রসব করবে- এ ক্ষেত্রেও ‘ইনশাআল্লাহ্’ বলতে সচেতন হওয়া উচিত। কারণ, এ ধরনের বর্ণনা শুধু ধারণাভিত্তিক পরিসংখ্যান বৈ আর কিছুই নয়।
যাদুমন্ত্র সম্পর্কে ইসলামী হুকুম: যাদুমন্ত্র চর্চা এবং এ বিষয়ে জ্ঞান অর্জনকে ইসলামে যেহেতু কুফর (অবিশ্বাস) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে, তাই যে ব্যক্তি যাদুমন্ত্র চর্চা করবে তার জন্য শারি’আতে (ইসলামী আইন) খুব কঠিন শাস্তির বিধান রয়েছে। যাদুমন্ত্র চর্চাকারী ব্যক্তি আটক হওয়ার পর সে যদি অনুতপ্ত হয়ে তওবা করে তা চর্চা থেকে ফিরে না আসে, তাহলে মৃত্যুদণ্ডই তার জন্য একমাত্র শাস্তি। এ আইনটি মূলত যুনদুব ইবনু কা’ব কর্তৃক বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হাদীস। উক্ত হাদীছে রাসূল বলেন, «حَدُّ السَّاحِرِ ضَرْبَةٌ بِالسَّيْفِ» ‘তরবারির আঘাতে হত্যা করাই যাদুকরের জন্য নির্ধারিত শাস্তি।’
রাসূল-এর মৃত্যুর পর মুসলিম জাতিকে পরিচালনাকারী খলিফাগণ ইসলামের এ বিধানকে খুব কঠোরভাবে প্রয়োগ করেন। বাজ্জালা ইবনু ‘আবদাহ বর্ণনা করেন, ‘মা, মেয়ে ও বোনদেরকে বিবাহকারী সকল জোরাষ্ট্রিয়ানদের বিবাহকে বাতিল করে দেয়ার আদেশসহ জায ইবনু মু’আবিয়া-এর নিকট প্রেরিত পত্রে খলীফা ‘উমার ইবনু আল-খাত্তাব রোম ও পারস্যের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনায় নিযুক্ত মুসলিম বাহিনীর নিকটে এই বলে আদেশ করেন যে, জোরাস্ট্রিয়ানদেরকে আহ্বল আল-কিতাবদের’ অন্তর্ভুক্ত করতে মুসলিম বাহিনীরা যেন জোরাস্ট্রিয়ানদের দেয়া খাবার খায় এবং সমস্ত জ্যোতিষ ও যাদুকরদের খতম করে দেয়। বাজ্জালা বলেন যে, উক্ত আদেশের ভিত্তিতে তিনি নিজেই একদিনে তিনটি যাদুকরকে হত্যা করেছিলেন।’
মুহাম্মাদ ইবনু ‘আব্দুর রাহমান বর্ণনা করেন, উম্মুল মু’মিনীন হাফসা-কে তাঁর কৃতদাসী যাদু করলে তিনি তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।’
আজ অবধি তাওরাতে এ শাস্তির বিষয়ে উল্লেখ দেখা যায়, যা দ্বারা ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের জন্য যাদুমন্ত্র নিষিদ্ধ করা হয়েছে: ‘যেসব পুরুষ বা স্ত্রীলোক প্রেতাত্মার মাধ্যম বা যাদুকর হয়, তাদের শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। পাথর ছুঁড়ে তাদেরকে হত্যা করতে হবে। নিজেদের মৃত্যুর জন্য তারা নিজেরাই দায়ী।’
প্রত্যেক মুসলমানদের প্রতি ওয়াজিব যে, তারা যাদুর সকল প্রকার থেকে সাবধান থাকবে এবং এ বিধান প্রচারে পরস্পরকে সহযোগিতা করবে এবং এ গর্হিত কাজের বিরোধীতা করবে, যেমন ইমামগণ বলেছেন যে, যখনই কোন যাদুকর কোন নগরীতে প্রবেশ করবে তখনই সেখানে অশান্তি, অত্যাচার সীমলংঘন এবং সন্ত্রাস বিরাজ করবে।
অভ্রান্ত ও নির্ভেজাল সত্যের অনুসারী খলিফাদের পর আইন-কানুন শিথিল হয়ে পড়ে। জ্যোতিষ ও যাদুকরদেরকে উমাইয়া খলিফারা তাদের এ সব নিষিদ্ধ কর্মের অনুমতি প্রদান করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং তাদেরকে রাজদরবারে সম্মানিত আসনে আসীন করা হয়েছিল। রাষ্ট্রীয়ভাবে এ আইন প্রয়োগ স্থগিত করার ফলে সে সময় বেঁচে থাকা কতিপয় সাহাবী নিজেরাই এ আইন প্রয়োগের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। আবু ‘উছমান ইবনু ‘আব্দুল মালিক আন-নাহদি বর্ণনা করেন, একটি লোককে খলিফা আল-ওয়ালিদ ইবনু ‘আবদিল-মালিক (শাসনকাল ৭০৫-৭১৫) তাঁর দরবারে নিয়োগ করেন যার কাজ ছিল যাদুর কৃতিত্ব প্রদর্শন করা। একদিন এ যাদুকরটি এক লোকের মাথা কেটে শরীর থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। তার এ কৃতিত্বে দর্শকরা হঠাৎ চমকিত হয়ে পড়লে সে আবার মাথাটি যথাস্থানে পুনঃসংযোগ করে সবাইকে আরও হতচকিত করে ফেলল। তারপর যে লোকটির মাথা কাটা হয়েছিল তাকে এমন দেখা গেল যেন তার মাথা কখনো কাটাই হয়নি। লোকজন বিস্মিত হয়ে বলল, ‘সুবহানাল্লাহ (মহাপবিত্র আল্লাহ্)! সে মৃতদের জীবন দিতে সক্ষম।’ আল-ওয়ালিদের দরবারে প্রচণ্ড হট্টগোল দেখে যুনদুব আল-আযদি নামে এক সাহাবী এগিয়ে এসে যাদুকরের কৃতিত্ব অবলোকন করলেন। তার পরদিন, আল-ওয়ালিদের দরবারে পিঠে তরবারি বেঁধে যুনদুব আবার প্রবেশ করলেন। যাদু প্রদর্শনের জন্য যাদুকরটি এগিয়ে আসলে যুনদুব তাঁর তরবারি খুলে নিয়ে দর্শকদের মধ্যে দিয়ে ছুটে গিয়ে যাদুকরের মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেললেন। তারপর বিস্ময়াহত দর্শকদের দিকে ফিরে বললেন, ‘সে যদি সত্যিই মৃতব্যক্তির প্রাণ ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হয়, তাহলে সে তার নিজের প্রাণ ফেরৎ আনুক।’ আল-ওয়ালিদ তাঁকে বন্দী করে কারাগারে নিক্ষেপ করেন।’
একমাত্র আল্লাহ্ জন্য নির্দিষ্ট গুণাবলীকে জ্যোতিষী বা যাদুকরের উপর আরোপ করার মাধ্যমে মানুষ যেন তাওহীদ আল-আসমা ওয়াস-সিফাত-এ শির্ক না করে, সে কারণেই জ্যোতিষী বা যাদুকরদের উপর ইসলামের আইন প্রয়োগে এ কঠোরতা। অধিকন্তু, কেবল ধর্মবিরোধী কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করেই নয়, বরং ডাকিনীবিদ্যা বা যাদুবিদ্যা চর্চাকারীরা অপরিসীম খ্যাতি অর্জন ও সমর্থকদেরকে আকর্ষণ করার উদ্দেশ্যে তারা প্রায়ই নিজেদেরকে অলৌকিক শক্তি ও স্রষ্টার গুণাবলীর অধিকারী বলে দাবী করে থাকে।
টিকাঃ
১. হাফসা কর্তৃক বর্ণিত। মুসলিম কর্তৃক সংগৃহীত, খণ্ড ৪, পৃ. ১২১১, হাদীস নং ৫৫৪০।
২. মুসলিম কর্তৃক সংগৃহীত, খণ্ড ৪, পৃ. ১২০৯, হাদীস নং ৫৫৩২।
৩. আবূ দাউদ কর্তৃক সংগৃহীত, সুনান আবি দাউদ, খণ্ড ৩, পৃ. ১০৯৫, হাদীস নং ৩৮৯৫; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২/৪২৯; বায়হাক্বী; আলবানী, সাহীহুত তারগীব, ৩/৯৭-৯৮।
৪. কেউ যদি গণকদের বিরোধিতা, মোকাবেলা তথা তাদের বিভ্রান্তিকে যথাযথভাবে প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে এগুলোর কিছু পড়ে বা শোনে এবং সে নিজে যদি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, গোপন বা গাইবী জ্ঞান ও ভাগ্য বা ভবিষ্যতের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর জন্য, অন্য কেউ তা জানে না বা জানতে পারে না অর্থাৎ সে যদি খাঁটি তাওহীদে অটল বিশ্বাসী হয়, তাহলে এমতাবস্থায় তা কুফ্রী বলে গণ্য হবে কি না- এ বিষয়ে সাল্ফে-সালেহীনদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে, তবে তাদের অধিকাংশের মত হচ্ছে যে, একমাত্র মোকাবেলা ও প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে নিতান্ত প্রয়োজনে ও প্রয়োজনানুপাতে তা পড়া বা জানা কুফরী বলে গণ্য হবে না, যদি সে নিজে খাঁটি তাওহীদে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী হয় এবং তার এ যৎসামান্য জানা শোনার একমাত্র উদ্দেশ্য হয় দ্বীন ইসলামের সংরক্ষণ। তবে এ উদ্দেশ্য ব্যতীত কৌতূহলবশত প্রশ্ন করা কঠিন পাপ ও শির্ক আসগর।
৫. ইমাম বুখারী, আত-তারীখুল কাবীর, ২/২২২; দারাকুতনী; বায়হাক্বী, ৮/১৩৬; ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশক, ৪/১৯/১,২; তিরমিযি, ‘দণ্ড’ অধ্যায়, হা/১৩৮০। তিনি হাদীসটিকে মারফুভাবে উল্লেখ করে মওকূফ হিসেবে বিশুদ্ধ বলেছেন। মূলত হাদীসটি যঈফ হলেও এ হাদীছের সমর্থনে আরও হাদীস থাকার কারণে এর সনদ হাসান (সহীহ হাদীছের কাছাকাছি) পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। (বিস্তারিত দেখুন: ছালেহ বিন আব্দুল্লাহ উছায়মিন প্রণীত কিতাবুত-তাওহীদের তাখরীজ ‘আদ-দুররুন নাযীদ’, (দারু ইবনু খুযায়মাহ), পৃ. ৮৭) উঁচু পর্যায়ের চারজন আইনবিদের মধ্যে তিনজনই (আহমাদ, আবু হানীফা এবং মালিক) এ অনুসারেই আইন প্রণয়ন করেছেন। চতুর্থ আইনবিদ আশ-শাফী’-এর আইন অনুসারে, একজন যাদুকরকে শুধু তখনই হত্যা করতে হবে যদি তার যাদুমন্ত্র কুফরের পর্যায়ে পৌঁছে। (তাইসীর আল-‘আযীয আল- হামীদ, ৩৯০-৩০১ পৃ. দেখুন)
৬. ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের মতো যারা অবতীর্ণ কিতাবের অনুসরণ করে। বর্ণনাটির এ অংশটুকু বুখারী, তিরমিযি এবং নাসাঈ কর্তৃক সংগৃহীত।
৭. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩১৫৬; সুনান আবী দাউদ, হাদীস নং ২৬৪৬, ৩০৪৩; মুসনাদ আহমাদ, ১/১৯০,১৯১; হা/১৫৬৯ এবং আল-বায়হাক্বী। উম্মুল মু’মিনীন হাফসা ছিলেন ‘রাসূল-এর স্ত্রী এবং ‘উমার -এর মেয়ে। মাসায়েলে আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ, মাস’আলা নং ১৫৪৩; মুওয়াত্তা ইমাম মালিক, ৩৪৪-৩৪৫ পৃ., হাদীস নং ১৫১১, ৮৭২; বায়হাক্বী, ৮/১৩৬। আছারটি সহীহ্। বিস্তারিত দ্র: আদ-দুররুন নাযীদ, পৃ. ৮৬।
৮. লেবীয়: ৪: ২০: ২৭
৯. ইমাম বুখারী তাঁর ইতিহাসগ্রন্থে সংগ্রহ করেছেন।
📄 করলে শুভ-অশুভ আলামতে বিশ্বাস; বিলম্বে হবে ঈমান, হবে সর্বনাশ
বাহ্যিক দৃষ্টিতে কোন বস্তু, স্থান, শব্দ বা সংকেতকে পছন্দ করা বা না করা মানুষের মানবীয় স্বভাব। এটা দোষের কিছু নয়, তবে ভালকে নিশ্চিতভাবে ভাল বা কল্যাণকর এবং মন্দ বা অকল্যাণকর বলে জানতে হলে কিংবা তাতে বিশ্বাস বা পছন্দ বা অপছন্দ করতে হলে শরী'য়াতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন। যেমন, শরী'য়াত কর্তৃক যদি কোন কিছুর ভাল-মন্দ, কল্যাণ ও অকল্যাণ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোন 'আলামত' বা 'সংকেত' বর্ণিত থাকে তাহলে অবশ্যই তা বিশ্বাস করতে হবে। তাওহীদের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে শুভ-অশুভ আলামতে বিশ্বাস করা স্পষ্টভাবে শিকের পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। ইবনু মাস'উদ বর্ণিত হাদীস দ্বারা এ বিধানটি আরও দৃঢ়ভাবে প্রমাণিত হয়। এ হাদীসে রাসূল (স) বলেন, 'অশুভ বা অযাত্রা বিশ্বাস করা বা নির্ণয়ের চেষ্টা করা শির্ক, অশুভ বা অযাত্রা বিশ্বাস করা বা নির্ণয়ের চেষ্টা করা শির্ক, অশুভ বা অযাত্রা বিশ্বাস করা বা নির্ণয়ের চেষ্টা করা শির্ক।'
পাখি ও প্রাণীর চলাচলের গতিপথকে প্রাক-ইসলামি যুগে বসবাসকারী আরব দেশের লোকেরা সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যের আলামত বলে গণ্য করত এবং তাদের জীবনের পরিকল্পনা গ্রহণের প্রক্রিয়া এ সব আলামতকে ঘিরেই কেন্দ্রীভূত ছিল। পাখি ও প্রাণীর চলাচলের গতিপথের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা শুভ বা অশুভ আলামত নির্ধারণের চর্চাকে আরবীতে 'তিয়ারা' (উড়াল দেয়া) বলা হতো। যেমন, কোথাও যাবার উদ্দেশ্যে কোন ব্যক্তি যাত্রা শুরু করলে যদি একটি পাখি তার উপর দিয়ে উড়ে বামে চলে যেত, তাহলে সে ভাবত যে তার দুর্ভাগ্য অবশ্যম্ভাবী; ফলে সে পুনরায় ঘরে ফিরে যেত। ইসলাম এ ধরনের সকল কুপ্রথাকে বাত্বিল করেছে, কারণ এগুলো তাওহীদ আল-'ইবাদাত ও তাওহীদ আল-আসমা ওয়াস-সিফাত এর ভিত্তিমূল ধ্বংস করে দেয়।
১. 'নির্ভরশীলতা' (তাওয়াক্কুল) নামক 'ইবাদাতকে আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য দিকে পরিচালিত করে।
২. আসন্ন সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের ভবিষ্যদ্বাণী করার ও আল্লাহ্ কর্তৃক নির্ধারিত ভাগ্য এড়িয়ে যাবার ক্ষমতা মানুষ বা অন্য কোন সৃষ্টির উপরে আরোপ করে।
রাসূলের ()-এর নাতি আল-হুসাইন কর্তৃক বর্ণিত হাদীছের উপর ভিত্তি করেই তিয়ারার নিষিদ্ধতা প্রতিষ্ঠিত। তিনি বর্ণনা করেন যে, রাসূল () বলেছেন, 'যে ব্যক্তি শুভাশুভ নির্ণয় করে অথবা যে ব্যক্তির জন্য শুভাশুভ নির্ণয় করা হয়, সে আমাদের দলভুক্ত (আমার উম্মাত) নয়।'
এখানে 'আমাদের' বলতে ইসলামের জাতি তথা মুসলিম জাতিকে বুঝানো হয়েছে। সুতরাং 'শুভাশুভ নির্ণয়' এমন ধরনের কাজ যা কাউকে ইসলাম থেকে বহিস্কার করে দেয়। মু'আবিয়া ইবনে আল-হাকাম বর্ণিত অন্য একটি হাদীছে রাসূল () অশুভ আলামত-এর প্রভাবকে বাতিল বলে আখ্যা দিয়েছেন।
"রাসূল ()-কে মু'আবিয়া বলেন, 'আমাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন রয়েছে যারা পাখির শুভ-অশুভ আলামতকে অনুসরণ করে।' রাসূল () প্রত্যুত্তরে বললেন, 'এ সবই তোমাদের নিজেদের তৈরি, অতএব এগুলো যেন তোমাদেরকে না থামিয়ে দেয়।"
অর্থাৎ এ শুভ-অশুভ আলামতগুলো যেহেতু মানুষের কল্পিত ও বানানো তথা অবাস্তব ধারণা, অতএব তোমরা যা করতে চাও তা করতে এটা যেন বাধা প্রদান না করে। এভাবেই আল্লাহ্র রাসূল() পরিস্কারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, মহামান্বিত আল্লাহ্ তা'আলা পাখিদের গতিপথকে কোনকিছুর আলামত হিসেবে তৈরি করেননি। এমনকি, পাখির উড্ডয়নের ফলেই ঘটনা সংঘটিত হয়, এ প্রাক- ইসলামী ধ্যান-ধারণার সাথে কোন ঘটনার কিছু মিল বাহ্যিকভাবে দৃষ্টমান হলেও এদের উড্ডয়নের গতিপথের কারণে কোন প্রকার সফলতা বা দুর্দশার সৃষ্টি হয় না।
পাখির আলামতের উপরে বিশ্বাস স্থাপন সম্পর্কে রাসূল ()-এর সাহাবীরা নিজেদের এবং তাঁদের অনুসারীদের মধ্যে যখনই কেউ ইতিবাচক বিষয়ের আলোচনার অবতারণা করেছেন, তৎক্ষণাৎই তা কঠোরভাবে বাত্বিল বলে ঘোষিত হয়েছে। যেমন, ইকরামাহ বলেন, 'একদিন আমরা যখন ইবনে 'আব্বাসের সাথে বসেছিলাম তখন একটি পাখি উগ্র শব্দ করতে করতে আমাদের উপর দিয়ে উড়ে গেল। এ সময় দলের মধ্যে থেকে একজন অকস্মাৎ চিৎকার করে বলল, 'শুভ! শুভ!'। ইবনে 'আব্বাস তাকে কঠোরভাবে তিরস্কার করে বললেন, এটাতে শুভ বা অশুভ বলতে কিছুই নেই।' একইভাবে, তাবিঈরাও (সাহাবীদের অনুসারী বা ছাত্রগণ) তৃতীয় প্রজন্মের মুসলিম ছাত্রগণ তথা তাঁদের নিজেদের কর্তৃক প্রকাশিত (কথায়, লেখায় ও আচরণে) শুভাশুভ সংক্রান্ত সকল ধরনের বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, তাউছ যখন তাঁর এক বন্ধুর সাথে ভ্রমণে বের হয়েছিলেন তখন একটি কাক উগ্র চিৎকার করে উড়ে গেলে তাঁর বন্ধু বলল, শুভ! তাউছ প্রত্যুত্তরে বলেন, এটার মধ্যে তুমি কী শুভ দেখলে? তুমি আর আমার সাথে ভ্রমণ করো না।'
প্রাচীনকালে আরবের জনগণ যেখানে পাখির গতিবিধি হতে শুভ-অশুভ আলামত গ্রহণ করেছে, সেখানে অন্যান্য জাতি এটা গ্রহণ করেছে ভিন্ন ধরনের উৎসমূল হতে। কিন্তু, এ ক্ষেত্রে তারা সকলে অভিন্ন মূলনীতির অনুসারী। এ শুভ-অশুভ আলামতের উৎসমূলের প্রতি দৃষ্টিপাত করলে দেখা যাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শির্কই স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়ে ওঠে। নিম্নবর্ণিত শুভ-অশুভ আলামতগুলো আমাদের বর্তমান সমাজে ব্যাপকভাৱে প্রচলিত বিশুদ্ধ আক্বীদা বিরুদ্ধ অসংখ্য শুভ-অশুভ আলামত থেকে হাতেগোনা কয়েকটি। এগুলোকে শুনতে বাহ্যত কুসংস্কারের মতোই মনে হয়। কিন্তু এ সব ক্ষেত্রেও বস্তুর উপকার ও অপকারের ধারণা থাকায় মানুষের মনের অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তা শির্কে আকবার বা শির্কে আসগারে পরিণত হতে পারে।
ইসলাম ও কুসংস্কার: ইসলাম এবং কুসংস্কার পরস্পর বিরুদ্ধভাবাপন্ন। ধর্মীয় চিন্তার ক্ষেত্রে যেখানে ইসলাম নেই, সেখানে অবশ্যই কুসংস্কার আছে। আর যেখানে পরিপূর্ণরূপে ইসলাম আছে সেখানে কুসংস্কার নেই। কুসংস্কারাচ্ছন্ন আরবদের সংস্কারের জন্যই ইসলামের আবির্ভাব। বস্তুনিষ্ঠ-চিন্তা-চেতনা ও বৈজ্ঞানিক ধ্যান-ধারণার বিস্তার করেছে ইসলাম। ইসলামের পরশ পেয়েই কুসংস্কারাচ্ছন্ন আরব জাহিলরা সংস্কৃত হয়ে বিশুদ্ধ ইসলামের পতাকাতলে সমবেত হয়েছে। ঘুচে গেছে তাদের সামাজিক ও ধর্মীয় বিশ্বাসের যাবতীয় কুয়াশাচ্ছন্ন বিভ্রান্ত অন্ধকার। তারা পথ দেখেছে সত্য ও বাস্তবের এবং যুক্তি ও বিজ্ঞানের। ইসলামের উজ্জ্বল আলোয় তারা নিজেরা যেমন আলোকিত হয়েছে তেমনি সারা জগতকেও আলোকিত করেছে। ইসলামের আলো এসে পড়েছে আমাদের বাংলাদেশেও। কিন্তু এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের পর থেকে আজ পর্যন্ত মুসলিম জনগণ কুসংস্কার মুক্ত হতে পারেনি। অজস্র কুসংস্কার নিয়েই বাংলাদেশী মুসলিমদের জীবন। কুসংস্কার ভিন্ন যেন তাদের কোন গতি নেই। নিম্নে সংক্ষিপ্তভাবে হলেও বাঙ্গালী মুসলিমদের জীবনাচরণ থেকে নেয়া কিছু শিকযুক্ত কুসংস্কারের তালিকা দেয়া হল:
বাংলাদেশের মুসলিমদের মধ্যে রোগ-ব্যাধি নিয়ে নানা কুসংস্কার বিদ্যমান রয়েছে। সব সমাজেই রোগ-শোক নিয়ে হয়তো কিছু না কিছু কুসংস্কার থাকে কিন্তু আমাদের দেশে এর প্রভাব যেন একটু বেশি রয়েছে। এখানকার মুসলিমরা রোগের কার্যকারণ বা রোগ উৎপত্তির মূল কারণ খুঁজতে যায় না। প্রকৃত বিষয়ের প্রতি মনোযোগ না দিয়ে তারা সম্পূর্ণ আলাদা দৃষ্টিকোণ থেকে রোগের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে থাকে। স্বাভাবিক চিকিৎসার জন্য যা প্রয়োজন তা না করে অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের আবর্তে থেকে তারা এমন সব আচরণ করে যা সত্যিই হাস্যকর বলেই প্রতীয়মান হয়। হাতে গোনা দু'-চারটি নমুনা এখানে তুলে ধরা হল: ১. সন্তান বিকলাঙ্গ হয়ে জন্ম হওয়ার ভয়ে স্ত্রী গর্ভবতী থাকাবস্থায় গরু বা ছাগল যবাই করা থেকে বিরত থাকা। ২. জময কলা খেলে জোড়া বাচ্চা হবে বলে ধারণা করা। ৩. পেট ব্যথা হলে তা নিবারিত হওয়ার আশায় বিরিয়ানী রান্না করে তিন রাস্তার মাথায় একটি পাত্রের মাঝে কিছু খাবার রেখে আসা।
বিবাহ মানব সমাজের একটি অতি প্রাচীনতম প্রথা প্রতিষ্ঠান। কালে কালে এ বিবাহকে ঘিরে গড়ে উঠেছে নানাবিধ ধ্যান-ধারণা, রীতি-নীতি ও সংস্কার। আয় মুসলিমদের পবিত্র বিয়ে আজ বিধর্মীদের নানা শিরকযুক্ত কুসংস্কারে ভরে গেছে। বিবাহ ও নারীদেরকে নিয়ে প্রচলিত কুসংস্কারের কিছু নমুনা তুলে ধরা হল: ১. বাংলা বর্ষ পঞ্জিকার বর্ণনানুযায়ী, সপ্তাহের শনিবার, মঙ্গলবার ও আমাবস্যার দিনকে অশুভ মনে করে এ দিনগুলোতে কোন ভ্রমণ না করা এবং তাতে কোন বিবাহ অনুষ্ঠান না করা। ২. অনেকেই পৌষ মাসে বিয়ে করে না। এ মাসের বিয়েতে নাকি মা-বাবার অমঙ্গল হয়। পৌষ মাসকে মনে করা হয় পোড়া মাস। তাই এ মাসে বিয়ে হলে নাকি সুখ-সম্পদ সব পুড়ে যায়। ৩. অনেকেই জন্মগ্রহণের মাসে বিয়ে করে না, তাতে নাকি অমঙ্গল হয়। ৪. বিয়ের দিন বৃষ্টি হলে নাকি কনের বাবার অমঙ্গল হয় আর বরের বাবার মঙ্গল হয় এবং এটা নববধূর জন্য একটা সুলক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত হয়। বিয়েতে বৃষ্টি হলে নাকি মেয়ে বাপের সব রস (ধন) নিয়ে যায় স্বামীর ঘরে। পোড়া খাবার খেলেই নাকি বিয়েতে বৃষ্টি হয়। সে কারণে কুমারী কন্যাকে বাবা-মা পোড়া খাবার খেতে দেন না। ৫. দাম্পত্য সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য কেউ কেউ বরের বাড়ী প্রবেশ করার আগেই সেই বাড়ীর চৌকাঠে রশি বেঁধে দিয়ে আসে। এ কাজ করলে নাকি স্বামী-স্ত্রীর বিবাহ-বন্ধন দীর্ঘদীন অটুট থাকে। ৬. অনেকে গর্ভবতী নারীকে ভরদুপুরে ও সন্ধ্যায় ঘরের বের হতে দেয় না। তাদের মতে, ঐ সময়ে বাইরে গেলে অকল্যাণ হয়। গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে যেতে পারে। কিংবা হতে পারে নানা ধরনের অসুখ-বিসুখ। কিংবা ধরতে পারে জ্বিন-ভূতে। ৭. বন্ধ্যা মেয়েলোক দেখলে নানা অকল্যাণ হয়, এমন অদ্ভুত ধারণা আমাদের অনেকের আছে। আমরা মনে করি, তাতে আমাদের যাত্রা শুভ হয় না বা কার্যসিদ্ধি হয় না। অনেকে বন্ধ্যা মেয়েলোকের কোলে নিজের সন্তান দিতে চায় না। কারণ তাতে সন্তানের অমঙ্গল হতে পারে, এ ধরনের আশংকা তারা করে। আবার বন্ধ্যা নারীকে অন্য কোন নারীর বিয়ের দিন দেখতে দেয় না এ ভয়ে যে, ঐ নারীটিও বন্ধ্যা হয়ে যেতে পারে।
৮. নবজাতকের সম্পর্কে মুসলিমদের কুসংস্কার রয়েছে। সন্তান গর্ভে এলে, জন্মকালীন সময়ে অথবা জন্মের কিছুদিনের মধ্যেই যদি ঘটনাক্রমে কারও কোন রকম ধনপ্রাপ্তি ঘটে, তখন বলা হয়, 'এই মেয়ে বা ছেলে লক্ষ্মী।' লক্ষ্মী হল হিন্দুদের ধন বা সৌভাগ্যের দেবী। ধন দেখে মুসলিমগণ ভাবে হিন্দুদের দেবী লক্ষ্মী তাদের প্রিয় সন্তানের প্রতিমূর্তিতে এসে হাজির হয়েছে। আর এ সব অবস্থায় দুর্ভাগ্যক্রমে যদি কোন ক্ষতি হয়, তাহলে বলা হয়, 'এই ছেলে বা মেয়ে অলক্ষ্মী।' এ জাতীয় চিন্তা-ভাবনা নতুন বউ নিয়েও হয়ে থাকে। 'স্ত্রী-ভাগ্যে ধন'- কথাটার প্রচলন এ কুসংস্কার থেকেই হয়েছে।
কোন শস্য বা ফলফলাদির গাছ রোপনের সাথে জড়িত রয়েছে নানা কুসংস্কার এবং এ সকল শিরকযুক্ত কুসংস্কারগুলো আমাদের গ্রামীণ জীবনের সাথে মিশে আছে। নিম্নে এ সবের কিছু নমুনা উল্লেখ করা হল:
১. সোমবার ও শুক্রবার ব্যতীত অন্যান্য দিনসমূহে কৃষিকাজ আরম্ভ করলে ভাল ফলন হয় না বলে মনে করা।
২. কলার চারা রোপণের পূর্বে ঘরের আঙ্গিনা অতিক্রম করলে কলার ফলন ভাল হয় বলে মনে করা।
৩. কলার চারা রোপণের মুহূর্তে রোপণকারীর মাথায় বেশি ছেলে-মেয়ে হাত রাখলে কলার ফলন ভাল হয় অর্থাৎ কলার কাঁদিতে বেশি কলা হয় বলে ধারণা করা।
৪. কোন কলাগাছের কাঁদি সঠিকভাবে বের না হলে গর্ভবর্তী মহিলার সন্তান প্রসবের সময় সমস্যা হবার আশঙ্কায় তাকে সে কাঁদির কলা খেতে না দেয়া।
৫. কাঁচা মরিচের চারা লাগিয়ে হাতের দ্বারা আগুনের তাপ নেওয়া এ বিশ্বাসের ভিত্তিতে যে, এতে কাঁচা মরিচ অধিক ঝাল হবে।
৬. হালুয়া বা মিষ্টি খেয়ে কুমড়ার বীজ বপন করলে এতে কুমড়ায় মিষ্টি বেশি হয় বলে ধারণা করা।
অনেকে ঘর থেকে বাইরে যাত্রা করার সময় নানা ধরনের কুসংস্কার মেনে চলে। নিম্নে তার কিছু নমুনা তুলে ধরা হল:
১. যাত্রা পথে পিছন থেকে কেউ ডাকলে খারাপ মনে করা।
২. যাত্রার সময় বিজাতি হিন্দু, খ্রিষ্টান ইত্যাদির মুখ দর্শন করলে অমঙ্গল হয়।
৩. যাত্রার সময় কারও বাসীমুখ দেখলে অযাত্রা লাগে।
৪. যাত্রাকালে কিছুতে হোঁচট খেলে অমঙ্গল হয়। আপনজনেরা তখন যেতে দেয় না। একটু দাঁড়াতে বলে এবং তারপর কিছুক্ষণ বসে যেতে বলে।
৫. যাত্রা পথে ঝাঁডু দেখলে বা মেথর দেখলে, কাল বা খালি কলসি দেখলে, কাক বা অন্য কিছু ডাকলে, কিংবা বিড়াল দেখলে অশুভ আলামত বলে ধারণা করা।
৬. যাত্রার মুহূর্তে কেউ কারো সামনে হাঁচি দিলে কাজ হবে না- এ ধরনের বিশ্বাস করা।
৭. ভ্রমণের সময় রাস্তায় কোন বিধবা মহিলার সাথে সাক্ষাৎ হলে বিপদের ভয়ে ভ্রমণ বাতিল করা।
৮. ভ্রমণের প্রাক্কালে গাভি বা কুকুর হাঁচি দিলে এতে দুর্ঘটনায় পতিত হওয়ার আশঙ্কা করবা বা নির্ঘাত মৃত্যু ঘটার সম্ভাবনা থাকে বলে বিশ্বাস করা।
৯. যাত্রাকালে কুকুর ডানদিক দিয়ে গেলে মঙ্গল হয় এবং বাঁ-দিক দিয়ে গেলে অমঙ্গল হয়।
১০. ভ্রমণের প্রাক্কালে বাড়ীর পিছনের দরজা দিয়ে বের হওয়াকে অশুভ বলে মনে করা।
১১. কোন ভাল কাজের উদ্দেশ্যে বের হলে অকল্যাণ হতে পারে এ ভয়ে পিছনের দিকে ফিরে না তাকানো।
১২. কোথাও যাওয়ার সময় শিয়াল বা বনবিড়াল ডান দিক হতে বামে গেলে যাত্রা অশুভ, আর বাম দিক হতে ডান দিকে গেলে যাত্রা অশুভ বলে মনে করা।
১৩. ভ্রমণের সময়ে বা অন্য সময় পেঁচা দেখলে বা এর আওয়াজ শুনলে এটাকে অশুভ মনে করা, ঘর-বাড়ি বিরান হয়ে যাবে বলে ধারণা করা।
* দিন ও রাতের বিভিন্ন মুহূর্ত বা সময় নিয়েও আমাদের সমাজ রয়েছে নানা বিভ্রান্তি তে, যার কিছু নমুনা উল্লেখ করা হল:
১. সুর্যোদয়ের পূর্বে গৃহবধু ঘুম থেকে উঠে ঘরবাড়ি ঝাড়ু দিয়ে ও বাসি হাড়ি বাসন পরিষ্কার করে ঘরে পানি ছিটিয়ে দিলে ঘরে ভাগ্য লক্ষ্মীর আগমন ঘটে বলে বিশ্বাস করা।
২. সকাল বেলা দোকান খোলার পর প্রথমেই বাকীতে কিছু বিক্রি করলে সারা দিন বাকি বা ফাঁকি যাবে বলে ধারণা করা।
৩. আসরের পর ঘর ঝাড়ু দেয়াকে খারাপ মনে করা।
৪. সন্ধ্যার আগে উঠান ও ঘর ঝাড় না দিলে সংসারে সবসময় দেনা লেগেই থাকে বলে বিশ্বাস করা।
৫. সন্ধ্যার সময় ঢেকিতে ধান ভানলে গৃহের শান্তি চলে যায়, শিকায় ভাতের হাড়ি-পাতিল ঝুলিয়ে রাখলে সংসারে ঝগড়া-বিবাদ লেগে থাকে বলে ধারণা করা।
৬. সন্ধ্যা বা রাত্রিতে লেন-দেন করলে অমঙ্গল হয়।
৭. সন্ধ্যার আগে উঠোন এবং ঘর ঝাড়ু দিলে সবসময় ঋণী থাকতে হয়।
৮. সন্ধ্যার আগে উঠোন এবং ঘর ঝাড়ু দিলে সবসময় ঋণী থাকতে হয়।
৯. রাতের বেলা কাউকে টাকা দিলে এতে ভাগ্য খারাপ হবে বলে মনে করা।
১০. রাতের বেলা ঘরের চালে বসে পেঁচা ডাকলে এতে বিপদের আশঙ্কাবোধ করা।
১১. গভীর রাতে পেঁচা বা ভর দুপুরে কাক ডাকলে বিপদের আশংকা করা।
১২. রাতের বেলা ঘর হতে বাইরে কুলি ফেললে কিংবা কোন উচ্ছিষ্ট বা এঁটো পানি নিক্ষেপ করলে ঘর-ভিটা শূন্য হয়ে যাবে বলে মনে করা।
১৩. রাত্রিকালে একা একা ভ্রমণ করলে অন্তর কঠিন হয়ে যায়।
১৪. রাত্রে আয়না দেখলে রোগ (কঠিন পীড়া) হয়।
১৫. রাতের বেলা ঝাড়ু দিলে আয় উন্নতি হয় না।
১৬. রাতে নখ কাটা ঠিক নয়।
১৭. চন্দ্রগ্রহণ বা সূর্যগ্রহণের সময় যদি কোন গর্ভবতী স্ত্রীলোক কোন কিছু কাটাকাটি করে তাহলে তার সন্তানের অঙ্গহানি ঘটে।
১৮. রাতে হাত-পায়ের আঙ্গুল ফুটালে দুর্ভাবনা বা দুশ্চিন্তায় পড়তে হয় বলে মনে করা।
১৯. খাওয়ার পর বাসনপত্র ইত্যাদি না ধুলে মানুষ ধন হারায়।
আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ সময় ও দিনক্ষণের ভালমন্দে বিশ্বাসী। দিন ও মাস সংক্রান্ত কুসংস্কারগুলো হল:
১. শুক্র ও রবিবারে পশ্চিম দিকে যাত্রা করলে ক্ষতি হবে।
২. শনি ও মঙ্গলবার ঝাটা বাঁধলে সংসারে অকল্যাণ ঘটে।
৩. শনি ও মঙ্গলবারে বিয়ে করা বিয়ে করা অশুভ।
৪. রবিবার ও বৃহস্পতিবারে বাঁশ কাটলে তা বাঁশঝাড়ের জন্য অশুভ বলে বিশ্বাস করা।
৫. সোমবার দিন কেউ মারা গেলে তার জোড়া মেলাবার জন্য একটি পশু জবাই করে দিতে হয়।
৬. সোম ও বুধবারে গোলা হতে ধান বের করা যায় না।
৭. জন্মদিনে বিবাহ করলে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক মধুর হয় না।
৮. মুহাক্রম, কার্তিক প্রভৃতি মাসে বিয়েশাদী করা অশুভ।
৯. বৈশাখ মাসের প্রথম দিনে দোকানে মাল বাকী বিক্রি করাকে অশুভ মনে করা।
১০. আষাঢ় মাসের সাড়ে সাত দিন হলে আমাবতী বলে মান্য করতে হয় ও চাষাবাদ করা যায় না।
১১. মুসলিম গৃহস্থগণের অনেকেই পৌষ মাসে তাদের ধানের গোলায় হাত দেয় না, কারণ তাদের বিশ্বাস ঐ সময়ে গোলা থেকে ধান সরালে নাকি ধন-সম্পদ ফুরিয়ে যায়।
১২. নতুন বউকে ভাদ্র মাসে শ্বশুর বাড়ীতে রাখা হয় না (কারণ নতুন বছরের পা ভাদ্র মাসে শ্বশুর-শ্বাশুড়ীর জন্য দেখা অকল্যাণকর)।
১৩. ভাদ্র ও পৌষ মাসে মেয়ে লোকের সওয়ারী পাঠানো যায় না।
১৪. আশ্বিন মাস যাবার দিন মুটে বানিয়ে গরুকে গা ধৌত করা শুভ বলে মনে করা ও 'গো ফাল্গুন' বলে মান্য করা।
১৫. নববর্ষ এলে প্রথমদিন অনেকে ভাল খাবার খায়। তাদের ধারণা, পহেলা নববর্ষের প্রথম দিন যদি ভাল খাবার খায়, তাহলে সারা বৎসরই ভাল খেতে পারবে। অন্যথায় সারা বৎসরই খারাপ খেতে হবে।
• পশু-পাখির সাথে সম্পৃক্ত কুসংস্কার:
১. কুকুর কাঁদলে রোগ বা মাহামারী আসবে বলে মনে করা।
২. পৃথিবী একটা ষাড়ের শিং-এর উপর রয়েছে, যখনই এটা শিং নাড়া দেয় তখনই ভূমিকম্প হয় বলে বিশ্বাস করা।
৩. কোন বিশেষ পাখি বা কাক ডাকলে এটাকে কোন মেহমান আগমনের পূর্বাভাস বলে মনে করা।
৪. কাক ডাকলে কেউ মারা যাবে বলে বিশ্বাস করা।
৫. চড়ুই পাখিকে বালুতে গোসল করতে দেখলে বৃষ্টি হবে বলে মনে করা।
৬. কোন প্রাণী বা কোন প্রাণীর ডাককে শুভ বা অশুভ বলে ধারণা করা।
৭. শিয়াল বা বনবিড়ালের ডাক শুনে বাজারের দর কম-বেশি হয় বলে বিশ্বাস করা।
৮. টিকটিকি ডাকলে 'সত্য সত্য' বলে মাটিতে টোকা দেয়া।
৯. মাকড়সা গায়ে উঠলে নতুন পোশাক প্রাপ্তি ঘটে।
১০. পিঁপড়ার মাটি দ্বারা স্তনে প্রলেপ দিলে স্তনের বাত সেরে যায়।
১১. জোনাকী পোকা খাওয়ালে রাতকানা রোগ ভাল হয়।
১২. ঘরে মাকড়সার জাল থাকলে মানুষ গরীব হয়।
১৩. উকুন পেয়ে জীবিত ছেড়ে দিলে স্বাস্থ্য নষ্ট হয়। লক্ষ্মী-অলক্ষ্মী সম্পর্কিত কুসংস্কার:
১. কোন মহিলার প্রথম সন্তান মারা গেলে ঐ মহিলাকে অলক্ষ্মী ভেবে অন্য কোন মহিলার বিয়ের আসর দেখতে যেতে না দেয়া এ কারণে যে, ঐ মহিলার কারণে এ নারীরও প্রথম সন্তান মারা যাবে।
২. লক্ষ্মী হারানোর আশংঙ্কায় বাসী (অর্থাৎ সকাল বেলা চুলা ঝাড়ু দেয়ার আগেই) চুলার ছাই কাউকে নিতে না দেওয়া।
৩. বাড়ির খাদ্যদ্রব্যের লক্ষ্মী চলে যাওয়া এবং মৃত আপনজনদের রূহের উপর পানি পড়ে যাওয়ার ভয়ে রাতের বেলা ঘরের অব্যবহৃত পানি বাইরে নিক্ষেপ না করা।
৪. গালে হাত দিয়ে বসলে ঘরে/পরিবারে অলক্ষ্মী আসে বলে ধারণা করা।
৫. বড় গ্রাসে খানা খেলে লক্ষ্মী ভয় পেয়ে যায় বলে মনে করা।
৬. ঘরের চালা হতে খড় নিয়ে খেলাল করলে অলক্ষ্মী আসে বলে ধারণা করা।
৭. অনেকেই হিন্দুদের মতো লক্ষ্মী-অলক্ষ্মীতে বিশ্বাস করে, কোন ব্যক্তি বা তার কোন কাজের সাথে সৌভাগ্য কিংবা দুর্ভাগ্যের সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা। এ জন্য বিয়ে বাড়িতে দেবী লক্ষ্মীর পায়ের আলপনা আঁকে যেন এই পায়ের ছাপে পা ফেলে ঘরে লক্ষ্মী আসে।
৮. ভাঙা বাসনে খাওয়া-দাওয়া করলে অলক্ষ্মী ঘরে আসে।
৯. ভাঙ্গা হাড়িতে রান্না করলে এবং ভাঙ্গা বাসনে খেলে অলক্ষ্মী আসার কারণে তাড়াতাড়ি সংসার ধ্বংস হয়ে যাবে বলে ধারণা করা।
১০. ঘরের বেড়ায়/দেয়ালে কিংবা দরজার সামনে পানের পিক ফেললে ঘরে অলক্ষ্মী এসে বাসা বাঁধে বলে ধারণা করা।
১১. ঘর ঝাড়ু দিয়ে ঘরের দরজায় ময়লা ফেললে, ঘরের দরজায় কুলি ফেললে ঘরের লক্ষ্মী চলে যায় ও সংসারে বিশৃংখলা হয় বলে ধারণা করা।
১২. সরাসরি চুলার থেকে খেলে বা ঘরের দরজায় বসে খেলে লক্ষ্মী চলে যাবে বলে বিশ্বাস করা।
মানুষের অভাব-দারিদ্রতা বা সম্পদ, টাকা-পয়সা হারানোর কারণ সম্পর্কিত আরও কিছু কুসংস্কার:
১. খাওয়ার পর মাথায় হাত ঘষলে আয় কমে যায়।
২. দাঁত দিয়ে নখ কাটলে উন্নতি করা যায় না।
৩. ছেঁড়া জামা-কাপড় গায়ে রেখে সেলাই করলে টাকা হারায়।
৪. খাওয়ার পর পরনের কাপড় দিয়ে মুখ মুছলে অভাব দূর হয় না।
৫. গবাদি পশুকে লাথি মারলে জীবনে অমঙ্গল হয়।
৬. রাতের বেলা এঁটো পানি বা উচ্ছিষ্ট বাইরে ফেললে দারিদ্রতা আসে।
৭. হেঁটে হেঁটে দাঁত মাজলে সম্পদ চলে যায়।
৮. গামছায় বেঁধে বাজারের সওদা আনলে অভাব চিরকাল থেকে যায়।
৯. ঘরের বেড়ায় কিংবা দরজার সামনে পানের পিক ফেললে অভাব দেখা দেয়।
১০. কুলায় লাথি মারলে ক্ষেতের ফসল কমে যায়।
১১. বরকত লাভের উদ্দেশ্যে নতুন বউয়ের পিতার বাড়ী থেকে শাড়ীর আঁচলে বেঁধে কিছু চাউল এনে তা স্বামীর বাড়ীর গুদামে ছিটিয়ে দেয়া।
১২. কোন ঘরে মাকড়সার জাল বেশি হলে ঐ ঘরের মালিক ঋণগ্রস্ত হয়ে যাবে বলে ধারণা করা।
১৩. ভোঁতা দা, কাস্তে ও যন্ত্রপাতি দ্বারা কাজ করলে সবসময় দেনা লেগে থাকে বলে মনে করা।
১৪. জামা-কাপড় গায়ে পরা অবস্থায় সেলাই করলে টাকা খোয়া যাবে বলে বিশ্বাস করা।
১৫. নাক ও কপালে ফোঁড়া হলে নাকি ধন আসে।
১৬. কপালের উপর হাত রেখে শুলে বা ঘুমালে নাকি অমঙ্গল হয়।
১৭. স্বামীর নাম মুখে নিলে অমঙ্গল হয়।
১৮. ছেঁড়া কাপড় ঘরে রাখলে সম্পদ হারিয়ে যায়।
১৯. ভাঙা পাতিলে রান্না করলে মানুষ গরীব হয়ে যায়।
২০. ঘরের সামনে কুলি ফেললে অমঙ্গল হয়।
২১. ঘর ঝাড়ু দিয়ে আবর্জনা ঘরে রেখে দিলে সম্পদ হারায়। গরীব হওয়ার আরও কিছু কারণ সম্পর্কিত কুসংস্কার:
১. হাত না ধুয়ে খাওয়া-দাওয়া করলে।
২. ফুঁ দিয়ে বাতি নিভালে।
৩. ভাঙা চিরুনী দিয়ে মাথা আঁচড়ালে।
৪. সন্ধ্যায় ঘরে আলো না জ্বালালে।
৫. ঘরের দরজায় হেলান দিয়ে বসলে।
৬. হাঁটতে হাঁটতে দাঁত খেলাল করলে।
৭. হেঁটে হেঁটে খাদ্য খেলে মানুষ গরীব হয়।
৮. বুধবার ও রবিবার রাত্রে স্ত্রী সহবাস করলে।
৯. পুকুরে প্রস্রাব করলে।
১০. উলঙ্গ হয়ে গোসল করলে।
১১. খালি মাথায় আহার করলে।
১২. বিনা দাওয়াতে কারও বাড়ীতে আহার করলে।
১৩. কাপড় দ্বারা দাঁত পরিস্কার করলে।
১৪. খারাপ কথা বলে সম্মানী লোকের মান নষ্ট করলে।
১৫. পরিবারের স্ত্রীলোককে বেপর্দায় রাখলে।
১৬. ফলবান বৃক্ষের নিচে পায়খানা-প্রস্রাব করলে। আরও কিছু কুসংস্কার:
১. নবজাতকের মুখে বা দেহের অন্যত্র চর্মরোগ জাতীয় গোটাগাটি হলে এ সবকে মানুষ মুখ দোষের গোটা বলে। আসলে বাচ্চাদের নানা রকম চর্মরোগ হয়। তবে এ সব কারও চোখের দৃষ্টি বা মুখদোষের কারণে হয় না। গ্রীষ্মকালে এ সব অসুখ বেশি দেখা দেয়। হাম ইত্যাদি জাতের অসুখ বাচ্চাদের হয়েই থাকে। টিকা দিলে আল্লাহর ইচ্ছায় আর সে-সব না। যেসব বাচ্চার চেহারা সুন্দর ও স্বাস্থ্য ভাল থাকে সে সব বাচ্চার মায়েরা মুখ দোষ বা অশুভদৃষ্টি থেকে বাচ্চা রক্ষা করার জন্য কপালের পাশে মাথায় একটি বড় কাজলের ফোঁটা দিয়ে রাখে। প্রশ্ন ওঠে, মুখদোষ বা দৃষ্টিদোষ কি কেবল ছোটদের লাগে? সেটা তো বড়দেরও লাগতে পারে। তাহলে বাচ্চার মা'কেই আগে লাগাতে হয় ফোঁটা। কারণ, তার দিকেই তো মানুষ বেশি আগ্রহ নিয়ে তাকাবে। আবার অনেকেই অন্যদের দৃষ্টির আড়াল করে রাখে বাচ্চাদের।
২. মাথা ব্যাথা হলে সূর্যকে সালাম জানালে নাকি তা সেরে যায়। সূর্যকে নমস্কার জানায় হিন্দুরা। তারা সূর্যকে দেবতা মনে করে এবং সূর্য দেবতা উদয়ের দিকে মুখ করে উপাসনা করে। এ কারণে সূর্যকে নমস্কার জানালে হয়ত হিন্দুদের মাথা ব্যাথা, পেট ব্যাথা, কোমর ব্যাথা প্রভৃতি ভাল হতে পারে। কিন্তু মুসলমানের তাতে কোনটাই হবে না।
৩. অনেকেই পেটের পীড়ায় অমলিশ সেবন করে। পেটে আম বেড়ে গেলে বা আমাশয় দেখা দিলে অমলিশ যায়। লতার নামে এবং অসুখের নামে কিছুটা মিল থাকায় এ ব্যবস্থা। আবার ফুলা রোগে অর্থাৎ শরীরে পানি জমে গেলে পানিতে জন্মানো ঠোঁয়াশ লতা সেবন করা হয়। ঠোঁয়াশ লতা বেশ ফোলা ফোলা। ভিতরটা ফাঁপা। এ জন্যই ফুলা রোগে ফুলা ঠোঁয়াশের ব্যবহার।
৪. কুকুরে কামড় দিলে কাঁসার থালা পড়া দেওয়া হয়। এটা মন্ত্র পড়ে আক্রান্ত রোগীর পিঠে ঘষা হয়। যদি থালা পিঠে আটকায় বুঝা যায় বিষ আছে আর যদি থালা গড়িয়ে পড়ে যায় তাহলে ধরা হয় আর বিষ নেই। পাগলা কুকুরের কামড়ে মানুষের মৃত্যু হয় আর এ ভয়ঙ্কর বিষয়টির এমন উদ্ভট চিকিৎসা সত্যিই বিপজ্জনক।
৫. অনেকেই গরু বা মহিষের মাথার খুলি কিংবা চোঁয়াল ঘরের কোণায় বা ঘরের চালে ঝুলিয়ে রাখে। তাদের বিশ্বাস, এর ফলে বাড়িতে জ্বিন, ভূত, পেত্নী প্রভৃতির আছর হবে না। মুসলিমদের মধ্যে এমন একটা ধারণা রয়েছে যে, ভূত-প্রেতের মধ্যে অনেকেই হিন্দু আর এ হিন্দু ভূতেরা মুসলিমদের ওপর আছর করে। তাই তারা হিন্দু ভূতগুলোকে বাড়ি থেকে দূরে রাখার জন্য ঘরের কোণে বা চালে গরুর হাড় ইত্যাদি ঝুলিয়ে রাখে। জ্বিনেরা গরু বা মহিষের হাড় দেখে পালাবে এ বিশ্বাস ঠিক নয়। কারণ, পশুর হাড় জ্বিন জাতির খাদ্যদ্রব্য হিসেবে নির্ধারিত। তাই মানুষের টাঙ্গানো হাড় জ্বিনদের খাবারের স্থায়ী উৎসে পরিণত হয়েছে। সুতরাং জ্বিন তার খাবার সংগ্রহের জন্য ঐসব বাড়ি ঘরে আসবেই।
৬. হিন্দুধর্মে দেখা যায় যে, তারা দেবতার ভোগ দেয় আর মুসলিমরা দেয় পেত্নীর ভোগ। কোন মানত বা রোগমুক্তির প্রত্যাশায় মানুষ কিছু খাবার সাধারণত দু-তিন রকম খাবার একত্রে পুকুরের পানিতে ভাসিয়ে দেয় অথবা কলাপাতায় করে তিনমুখো (তে-মাথা) পথের মোড়ে রেখে আসে সন্ধ্যাবেলায়। কারণ তাদের বিশ্বাস, পেত্নীরা রাতে আসে আর সেই খাদ্য যদি পেত্নী খায় তাহলে পেত্নীর দ্বারা যেসব অসুখ হয় ভোগ দেয়ার বদৌলতে সেসব অসুখ সেরে যাবে। অর্থাৎ পেত্নীকে ঘুষ। ঘুষ বাংলাদেশী মুসলিমরা খায়, তাহলে পেত্নীরা খাবে না কেন? ঘুষ তো মূলত পেত্নীর খাদ্য। ঘুষখোর মুসলিম এক ধরনের পেত্নী। যাহোক মুসলিমদের দেয়া ভোগ খেয়ে ফেলে কুকুর, বিড়াল, শিয়াল ও অন্যান্য নিশাচর পাখিরা। এরাই তো মুসলিমদের না দেখা পেত্নী। কেউ কেউ বিপদ থেকে উদ্ধার পেলে ফুল, ঝাড়ুর শলা, ডিম, চাউল-ভাঁজা প্রভৃতি একত্র করে পুকুরে ফেলে দেয়।
৭. কেউ খাবার খেতে দেখলে পেটের পীড়া হয়- এ ধারণা যেমন অনেকের আছে, তেমনি অনেকের আবার এমন ধারণাও আছে যে, খাবার প্রস্তুতকালে বা মাছ-মাংস কাঁচা অবস্থায় অন্য কেউ দেখলে তার স্বাদ কমে যায়।
৮. কারও কারও সন্তান হলে পরে মারা যায়। সন্তান হয়ে যাতে মারা না যায় সেজন্য জানের সদকা হিসেবে তারা অদ্ভুত ব্যবস্থা নেয়। যেমন- তারা ছেলে সন্তান হলে কান ফুঁড়িয়ে দেয়, আল্লাহর ওয়াস্তে গরু ছেড়ে দেয়, সন্তানের বাজে নাম রাখে; যেমন- হেঁজা, মরা, হাঁইড়গা (ষাঁড় অর্থে) প্রভৃতি। তাদের ধারণা, এ সব করলে সন্তান আর ছোট বেলায় মারা যাবে না।
৯. এ দেশের প্রায় সকল ব্যবসায়ীরাই দিনের প্রথম বিক্রিটা বাকিতে দেয় না। তাদের বিশ্বাস, এতে কুফা লাগে (বিপদ দেখা দেওয়া) অর্থাৎ সারাদিন আর নগদে বিক্রি হবে না কেবল বাকিই দিতে হবে। অনেকেই প্রথম বিক্রির নগদ টাকা কপালে ও বুকে ঠেকিয়ে তবেই ক্যাশ বাক্সে রাখে। হিন্দুরা এমনটা করে থাকে। তারা 'টাকা-দেবতা'-কে প্রণাম করে। টাকা-দেবতা বলে আলাদা কোন দেবতা নেই কিন্তু ধনের দেবী হল লক্ষ্মী। টাকাকে তারা লক্ষ্মী মনে করেই প্রণাম করে। আবার হিন্দুরা সকাল-সন্ধ্যা পূজা করে। সকালের পূজা হল 'প্রাতঃআহ্নিক' এবং সন্ধ্যার পূজা হল 'সান্ধ্য-আহ্নিক'। হিন্দু ব্যবসায়ীরা সকালে দোকান খুলতে গিয়ে পানি ছিটায়, ধূপ পোড়ায়, আগরবাতি জ্বালায়। সন্ধ্যায়ও সেসব করে। মুসলিমরাও এখন তাদের দেখাদেখি আগরবাতি পোড়ায় ও ধূপ জ্বালায়। কারণ তাদের ধারণা, এ সব করলে তাদের ব্যবসা ভাল হবে।
১০. এ দেশে কিছু ব্যবসায়ী আছে যারা রাত্রে সূঁই বিক্রি করে না। আবার কিছু কিছু ব্যবসায়ী রাত্রে সূঁই বললে বিক্রি করে না কিন্তু 'বিন্দা' বা এ জাতীয় অন্য কিছু বলে সুঁইয়ের ইংগিত করলে তখন বিক্রি করে।
১১. এ দেশের অনেকেরই এমন ধারণা রয়েছে যে, চৈত্রমাসে শেষদিন পর্যন্ত আমের মধ্যে একপ্রকার বিষ থাকে। ঐ সময়ে আম খেলে পেটের পীড়া হয়। চৈত্র সংক্রান্তিতে হিন্দুরা শেষ রজনীতে যে পূজা করে ও সংগীত গায় তাতে নাকি আমের ঐ বিষ কেটে যায় এবং পহেলা বৈশাখ থেকে তারা আম খেতে থাকে নির্ভয়ে।
১২. মালামাল চুরি গেলে লোকে চোর ধরার জন্য ও মালামাল, উদ্ধারের জন্য নানারকম তদবীর করে। এর মধ্যে রয়েছে পান পড়া, চিনি পড়া, বাটি চালান, বাঁশ চালান প্রভৃতি। আর এগুলো করাতে হয় তুলা রাশির লোকদের দিয়ে অন্যথায় বাটি ঘুরবে না, বাঁশ ছুটবে না, আয়নায় চোর দেখা যাবে না। আসলে এ সবই ভণ্ড ওঝাদের ভেল্কিবাজি মাত্র। এর মতো মিথ্যে আর কিছু নেই।
১৩. কারও কারও এমন বিশ্বাস আছে যে, অমুক ব্যক্তি যদি ফলনশীল কোন ফলগাছ বা সব্জী বাগানের প্রতি নজর দেয় এবং বলে, 'গাছটা তো ভাল ফল দিয়েছে, কিংবা ফসল ভাল হয়েছে', তাহলে ঐ ফল বা ফসল নষ্ট হয়ে যায়। কলাগাছ হলে সেটা ভেঙে যায়, নারিকেল গাছ হলে ডাব ঝরে যায় প্রভৃতি নানাভাবে চাষাবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ জাতীয় বিশ্বাস খুবই অবৈজ্ঞানিক ও শিকড়যুক্ত। এটাকে বলা হয় নজর লাগা বা মুখ লাগা। এ আপদ থেকে রেহাই পেতে মানুষ ক্ষেতে বা গাছে ঝাড়ু বা চুন দেয়া কালো পাতিল ঝুলিয়ে দেয়। কাউকে অপমান করার জন্য আমরা বলি- 'তোর মুখে ঝাঁটা মারি অথবা তোর মুখে চুন-কালি দেব।' যে ব্যক্তির মুখ দোষ রয়েছে তাকে অপদস্ত করার জন্যই ঐসব ভাষার এমন প্রতীকী প্রয়োগ করা হয়। 'মুখ-দোষ' থাকা মানুষকে কোন কিছু ছুঁড়ে দিতে বলা হয়, কেননা মানুষের বিশ্বাস ছুঁড়ে দিলে আর ঐ বস্তু নষ্ট হবে না।
১৪. আমাদের দেশে বৃষ্টিপাতের মওসুমে যদি কখনও একনাগাড়ে অনেকদিন বৃষ্টিপাত হতে থাকে তখন মানুষ বলে, 'গাজী মিয়ার বিয়া লাগছে।' এ প্রবাদ পুরুষ গাজী মিয়া তার মায়ের নির্দেশে বিয়ের জন্য যাত্রা করে কিন্তু বৃষ্টি আরম্ভ হয়ে যায়, ফলে তার আর বিয়ের জন্য যাত্রা করা হয় না। এভাবে তার বিয়ের আয়োজন চলছে অনন্তকাল ধরে। বিয়ের পর্ব আর শেষ হয় না। আবার দেখা যায় কার্তিক মাসে যখন হিন্দুদের দূর্গা পূজা ইত্যাদি আরম্ভ হয় তখন পূজাকালীন বা পূজার আগে-পরে বৃষ্টি হলে মানুষ বলে, 'দূর্গাপূজা আসলে বৃষ্টি হয়।' অর্থাৎ গাজী মিয়ার বিয়ে এবং দূর্গাপূজা ইত্যাদি বৃষ্টির কারণ। বৃষ্টিপাত হওয়ার পর তাকে আল্লাহ ভিন্ন অন্য কিছুর সাথে মিলালে মূলত শিৱৰ্ক করা হয়।
১৫. কোন কোন মুসলিমের এমন ধারণা রয়েছে যে, দিঘী, ব্রীজ প্রভৃতি নাকি বলি চায়। কোন ব্রীজ তৈরির সময় কিংবা তৈরি করার পর যদি কেউ পড়ে মরে যায় বা কোন দুর্ঘটনার কারণে মারা যায় তখন আমরা বলি, 'এ ব্রীজ বলি চায়, দু'-চারজন মরবেই। প্রত্যেক বৎসর মারা যাবে।' আবার দিঘী কাটতে কেউ কোনভাবে মারা গেলে বা পানিতে ডুবে মরলে আমরা বলি, 'এ দিঘী বলি চায়।' এ বলীর ধারণাটি এসেছে হিন্দুদের থেকে। তাদের কালীদেবী প্রাণ বলী চায়। তাই হিন্দুরা প্রাণ বলি দেয়। বলীর ধারণা এ দেশের মুসলিমদের জন্য এক জঘন্য কুসংস্কার।
১৬. অনেকের ধারণা কানে কচু, নাভিতে তৈল আর পেটে তিতা দিলে রোগমুক্ত থাকা যায়। এটা একটা কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধারণা।
১৭. যাদের সন্তান হয় না তাদের বিশ্বাস, তাবিজ-কবজ বা পীরের দরগায় নিয়াত-মানত করলে সন্তান হবে।
১৮. কারও কারও মধ্যে এমন বিশ্বাস আছে যে, অমুকের কাছ থেকে কোন ফল বা সজীর বীজ নিলে তা থেকে ভাল ফলন হয় না। ঘরের কোণে চড়ুই পাখি বাসা তৈরি করলে আমাদের ধারণা হয় যে, ধন-সম্পদ আগমনের আলামত দেখা যাচ্ছে। তাই এগুলোকে আমরা সুখের পায়রা বা সৌভাগ্যের প্রতীক বলে থাকি।
১৯. অনেকেই রাত্রি বেলায় বিল-ঝিলে আগুন দেখে মনে করে এগুলো পেত্নীর আগুন। তাদের ধারণা, পেত্নী মাছ শিকার করে। এরা রাত্রে বাড়ি আসতে ভয় পায়। তাদের ধারণা, পেত্নীরা মাছ-মাংসের লোভে তাদের পিছু নিবে। তাই তারা রাত্রে কোন জায়গা থেকে মাছ-মাংস নিয়ে বাড়ি এলেও তা আগুনে সেঁকিয়ে তবেই ঘরে তোলে। 'আলগা' বা ভূত-পেত্নীর আছর থেকে এভাবেই তারা মাছ-মাংস রক্ষা করে।
২০. মানুষ নতুন বাড়ি করে কিংবা বাসা বদল করে। কেউ যদি কখনও নতুন বাসা বা বাড়িতে উঠে রোগাক্রান্ত হয় তখন দোষ হয় নতুন বাসা বা বাড়ীর মানুষ বলে ফেলে- এ বাসা বা বাড়িটা খারাপ অথবা এ বাড়িটা ভাল না। কিংবা বলে, 'জায়গাটা খারাপ।' যার যা মনে আসে বলে ফেলে। কেননা অসুখটা বাসা স্থানান্তরের পরে হয়েছে।
২১. ছেলে-মেয়েরা কোন রাস্তা অতিক্রম করে এসে যদি রোগাক্রান্ত হয়, তাহলে মানুষ বলে, 'ঐ পথটা খারাপ, রাস্তার মোড়টা খারাপ, অথবা, রাস্তার পাশের তালগাছ/বটগাছ/গাবগাছ বা তেঁতুলগাছটা খারাপ। এগুলোতে 'আলগা' থাকে। অর্থাৎ সে-সব জ্বিন-ভূতের বাসা-বাড়ী। বস্তুত, রোগের কারণ কিন্তু পথ বা গাছ নয়। অসুখের কারণ হল বাইরের আবহাওয়া, ভক্ষণ করা খাবার বা বাচ্চারা নানা কারণে ভয় পেয়ে থাকে এবং এরপর যদি জ্বর আসে তখন 'আলগা' ইত্যাদির দোষটা বেশি পড়ে। সন্তান এসে যদি ভয় পাওয়ার কথা বলে তখন বুকে থু-থু ছিটিয়ে দেয়া হয়, লবণ খাওয়ানো হয় কিংবা রসুন পুড়ে সেবন করানো হয় ইত্যাদি ইত্যাদি।
২২. আঙ্গুল দ্বারা খেলা করলে স্মরণশক্তি কমে।
২৩. মৃত ব্যক্তির কবরের উপর লিখিত স্মৃতিফলকের প্রতি তাকালে স্বাস্থ্যহানি ঘটে।
২৪. গোসলখানায় বসে থাকলে মানুষ দুর্বল হয়।
২৫. পশমী কাপড় পরিধান করলে মানুষ মোটা হয়।
২৬. গোলাপ পানি দ্বারা চুল ধৌত করলে বার্ধক্য বাড়ে।
২৭. পাথর দ্বারা খেলা করলে মানুষ নির্মম হয়।
২৮. দাঁড়িয়ে পায়জামা পরলে হৃদয় কঠিন হয়ে যায়।
২৯. বৈশাখ মাসে বিয়ে হারাম বা দোষণীয় বা অমঙ্গলজনক।
৩০. চৈত্রমাসে ঝাঁটা বাঁধা হয় না, কেননা তাতে অমঙ্গল হয়।
৩১. খাটো, চুলছোট, মোটা এবং হাতলম্বা মেয়ে বিয়ে করলে অমঙ্গল হয়।
৩২. আকীকার গোশত সন্তানের পিতা-মাতা খেলে অমঙ্গল হয়।
৩৩. মেয়েদের কালো কাপড়ের পায়জামা ও ছায়া পরা ভাল নয়।
৩৪. কোবানীর পশুর রক্ত গায়ে মাখা এবং কাপড়ে মেখে দরজায় দরজায় ছোপ দেওয়া আর এটা দিয়ে তাবিজ দেয়া মঙ্গলজনক।
৩৫. মেয়েরা মাথার মাঝামাঝি না করে ডানে বা বামে সিঁথি করলে তাদের স্বামীরা পুলসিরাত পাড়ি দিতে পারবে না।
৩৬. স্বামী মারা গেলে স্ত্রী ৪০দি যাবৎ রান্না করে না, কারণ তাদের বিশ্বাস ঐ সময় রান্না করলে স্বামীর কবরে আযাব হবে।
৩৭. হাতের তালু চুলকালে অর্থ-কড়ি আসবে বলে মনে করা।
৩৮. চোখ লাফালে বিপদ আসবে বলে ধারণা করা।
৩৯. বাম চক্ষু ফরকিলে বা স্পন্দিত হলে সেটা দুর্ভাগ্য ডেকে আনে আর ডান চক্ষু স্পন্দিত হলে সৌভাগ্য দেখা দেয়।
৪০. এক চিরুনীতে দু'জন চুল আঁচড়ালে ঐ দু'জনের মধে ঝগড়া লাগবে বলে বিশ্বাস করা।
৪১. ব্যবসায়ে লোকসান হওয়ার ভয়ে বেলা ডুবার পর চিটাগুড়, সুঁই ও হলুদ বিক্রি থেকে বিরত থাকা।
৪২. পৃথিবীকে একটা ব্যক্তি বা ফেরেশতা কাঁধের উপর নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, যখনই সে কাঁধ পরিবর্তন করে তখনই ভূমিকম্প হয় বলে ধারণা করা।
৪৩. নতুন পোশাক পরিধান করার পর হাঁচি আসলে এটাকে অশুভ বলে মনে করা।
৪৪. জিহ্বায় বা ঠোঁটে কামড় লাগলে কেউ তাকে গালি দিচ্ছে বা স্মরণ করছে বলে বিশ্বাস করা।
৪৫. কোন লোকের আলোচনা চলছে, ইতোমধ্যে বা কিছুক্ষণ পরে সে এসে পড়লে এটাকে তার দীর্ঘজীবী হওয়ার আলামত বলে মনে করা।
৪৬. কোন বাড়িতে বাচ্চা মারা গেলে সে বাড়িতে গেলে নিজের বাচ্চাও মারা যাবে বলে বিশ্বাস করা।
৪৭. পরীক্ষায় শূন্য পাওয়ার ভয়ে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার পূর্বে ডিম খাওয়া থেকে বিরত থাকা।
৪৮. ঝাড়ুর আঘাত লাগলে শরীর শুকিয়ে যাবে বা জ্বর আসবে বলে মনে করা।
৪৯. চিরুনী মাটিতে পড়লে বা বিড়ালের মুখ মোছা দেখলে অতিথি আসবে বলে মনে করা।
৫০. ঝাড়ু উল্টো করে রাখা ঠিক নয় বলে ধারণা করা।
৫১. ভাঙা চিরুনী দ্বারা মাথা আঁচরালে বুদ্ধি লোপ পায়।
৫২. ভাঙা আয়না দিয়ে মুখ দেখলে খারাপ হয়।
৫৩. ভাঙ্গা আয়নায় মুখ দেখলে মনে শয়তানী বুদ্ধির উদ্রেক হয় বলে মনে করা।
৫৪. ভাঙ্গা চিরুনী দ্বারা মাথা আঁচড়ালে বুদ্ধি লোপ পায় বলে ধারণা করা।
৫৫. ভাঙ্গা ছাতা ব্যবহার করলে বিবেক লোপ পায়, গামছা বা গেঞ্জি সেলাই করে ব্যবহার করলে সম্মান নষ্ট হবে বলে ধারণা করা।
৫৬. ঘরের বেড়া ও খুটিতে কিংবা কোন গাছে পান খাওয়া চুন মুছলে ঘরে অশান্তি আসবে বলে বিশ্বাস করা।
৫৭. গোসল করে ভিজা কাপড় নিংড়ানো পানি পায়ে ফেললে স্ত্রী মারা যাবে বলে ধারণা করা।
৫৮. মাথার বালিশ পা দিয়ে সরালে বুদ্ধি বিগড়ে যায় বলে মনে করা।
৫৯. পানির কলসী ঢেকে না রাখলে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর মুহাব্বত চলে যায় বলে বিশ্বাস করা।
৬০. মাতা-পিতা ঘুমন্ত ছেলে-মেয়ের বিছানায় বসে খাদ্য খেলে সন্তানের অমঙ্গল হয় বলে মনে করা।
৬১. ঘুমন্ত ছেলে-মেয়ে কোলে নিয়ে খানা খেলে অকালে সন্তান মারা যায় বলে বিশ্বাস করা।
৬২. মেয়েদের নাকফুল হারালে স্বামীর অকল্যাণ হয় বলে বিশ্বাস করা।
৬৩. বিবাহিত নারী তার নাকফুল এমনিতেই খুলে রাখলে স্বামীর হায়াত কমে যায় বলে ধারণা করা।
৬৪. ঘুমন্ত ছেলেমেয়ে কোমরের দিকে দৃষ্টিপাত করলে অকালে স্বামী মারা যায়।
৬৫. গোসল করে ভিজা কাপড় নিংড়ানো পানি পায়ে ফেললে স্ত্রী হারাতে হয়।
৬৬. পায়খানায় বসে ঘন ঘন থুথু ফেললে দাঁতে অসুখ হয় এবং অকালে দাঁত পড়ে যায়।
৬৭. জোনাকি পোকা হাতে নিলে পেটের পীড়া হয়।
৬৮. জামা উল্টা গায়ে দিলে ফিরনী খাওয়ার ভাগ্য হয়।
৬৯. ঝাটা জোরে মাটিতে পিটালে বংশের ক্ষতি হয়।
৭০. বাড়ির প্রবেশ পথে পা ধুলে সংসার ধ্বংস হয়ে যায়
অতএব, সকল মুসলিমকে এ ধরনের বিশ্বাস হতে উদ্ভূত অনুভূতিকে পরিহার করতে বিশেষভাবে যত্নশীল হতে হবে। এ ক্ষেত্রে অজ্ঞাতসারে যদি কেউ কোন কাজে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে যা এ প্রকৃতির বিশ্বাসের সাথে সংশ্লিষ্ট, তাহলে অবশ্যই আল্লাহ্র নিকটে এর থেকে পরিত্রাণ চেয়ে নিম্নের দু'আ দ্বারা আকুল প্রার্থনা জ্ঞাপন করা উচিত:
আল্লাহুম্মা লা খায়রা ইল্লা খায়রুকা ওয়া লা ত্বাইরা ইল্লা ত্বাইরুক ওয়া লা ইলাহা গাইরুকা।
অর্থ: হে আল্লাহ্, আপনার কল্যাণ ব্যতীত কোন কল্যাণ নেই এবং আপনার দেয়া শুভাশুভত্ব ব্যতীত কোন শুভ বা অশুভ নেই এবং আপনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই।'
শুভ-অশুভ আলামত বিষয়ে বেশি রকমের বাড়াবাড়ি করা নিরর্থক। বৃহৎ শিরকের উৎসমূলে পরিণত হওয়ার আশংকায় ইসলাম এ ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্বারোপ করে। মূর্তি, মানুষ, তারা, সূর্য ইত্যাদি পূজার উৎপত্তি হঠাৎ করে হয়নি। এ ধরনের পৌত্তলিকতার চর্চা দীর্ঘকালব্যাপী ক্রমান্বয়ে বিকাশমান হয়েছে। বৃহৎ শিরকের শিকড় যত বিস্তার লাভ করে, আল্লাহ্র একত্বের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ক্রমশ বিলুপ্ত হতে থাকে। এভাবে, শয়তানের কুমন্ত্রণার বীজ অঙ্কুরিত হয়ে মুসলিমদের বিশ্বাসের ভিত্তিমূল ধ্বংস করার পূর্বেই তা সমূলে উৎখাত করতে ইসলাম সর্বদা মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পথ প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রচেষ্টা চালায়।
টিকাঃ
১. এ ধরণের বিশ্বাসের ফলস্বরূপ বাংলাদেশের অনেক এলাকা যেখানে বাঁশের হাট রয়েছে, সেসব হাটগুলো সাধারণত রবিবার ও বৃহস্পতিবার ছাড়া অন্য দিনগুলোতে হয়।
২. যে মুসলিম চড়ুই পাখির বাসায় ধন খোঁজে তার তো গরীব হবারই কথা (!?), কেননা ধন রয়েছে ভূ-গর্ভের খনিতে, কল-কারখানায়, ভূপৃষ্ঠের মাটিতে, সাগর বক্ষে ইত্যাদিতে।
৩. রাত্রে বিলের পানিতে যে আগুন দেখা যায়, তা পেত্নীর আগুন নয়। পানির তলদেশে মাটিতে ফসফরাস থাকে, তা বুদবুদের আকারে বের হয়ে পানির ওপরে উঠে বায়ুমণ্ডলের সাথে মিশ্রণের ফলে জ্বলে ওঠে। আর এটাকেই মানুষ মনে করে পেত্নীর আগুন।
৪. মানুষের কিছু অসুখ বা রোগ আছে যা যেকোন স্থানেই হতে পারে; যেমন- বহুমুত্র, টিউমার, ক্যান্সার, প্রেসার, হৃদরোগ প্রভৃতি। আবার কিছু রোগ আছে যা মানুষের ত্রুটিপূর্ণ চলাফেরা এবং পারিপার্শ্বিকতার সংযোগে হয়ে থাকে; যেমন- সর্দি, কাশি, চুলকানি, ডায়রিয়া, আমাশয়, ম্যালেরিয়া প্রভৃতি। কিন্তু এ জাতীয় রোগ তো পুরনো বাসা-বাড়িতেও হতে পারে। এগুলো খাদ্য ও পরিবেশ বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন না করার কারণেই হয়। নতুন বাড়ি বা বাসার দোষে হয় না।
৫. এ প্রসঙ্গে এক গল্প বলা যায়- এক ছেলে পথে ভয় পেয়ে সে কথা বাড়ী এসে তার মা'কে বলল। মা তার সন্তানের ভয় পাওয়ার কথা শুনেই কুরআন ও সহীহ হাদীসের দু'আ ব্যবহার করা ছাড়া অন্যান্য প্রাথমিক তদবীর শেষে রসুন পোড়া দিল। চুলার আগুনে রসুন বেশ আওয়াজে ফেটে উঠল। ছেলেটি কাছেই বসা ছিল। রসুন কাটার আওয়াজ শুনে সে তার মা'কে বলল, 'মা আমি আবার ডরাইছি।' ভয় সারানোর জন্য রসুন পোড়া দেয়া হল, সেটাই ফেটে আবার ভয় লাগল। এখন কিসে এ ভয়ের চিকিৎসা হবে মা পড়ে গেল সেই ভাবনায়।
৬. আহমাদ, ২/২২০; হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ, ৫/১০৫; আলবানী, সিলসিলাতুস সহীহাহ, হাদীস নং ১০৬৫; আত্ব-ত্ববারানী। হাদীসটির সনদ সহীহ।