📄 মানুষের ওপর জ্বিন-ভূতের আছর, হয় কুসংস্কার-কুফর ও শিরকের সাথে বাসর
জ্বিন-ভূতের আছর এবং এর চিকিৎসা অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটা মহা কুসংস্কার। এর পিছনে একটা ইতিহাস রয়েছে। আল্লাহ তা’আলা জ্বিন এবং ইনসানকে সৃষ্টি করেছেন তার ‘ইবাদত করার জন্য। দু’টোই জীব কিন্তু একটি শরীরী এবং অন্যটি অশরীরী। মানুষ শরীরী এবং জ্বিন অশরীরী। মানুষ দৃশ্যমান আর জ্বিন অদৃশ্যমান। কুরআনের মাধ্যমে এবং আমাদের রাসূল (ﷺ)-এর মাধ্যমে মুসলিমরা জ্বিনকে জেনেছে এবং বিশ্বাস করেছে। জ্বিনজাতি আমাদের কাছে অদৃশ্য (যেমন ফেরেশতারাও অদৃশ্য)। রোগজীবাণু আমরা খালি চোখে দেখি না কিন্তু অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে তাকালে তার অস্তিত্ব আমাদের কাছে ধরা পড়ে। কিন্তু জ্বিন কোন যন্ত্রের দ্বারা দৃশ্যমান হয় না। নাবী সুলায়মান (আ:) জ্বিনদের ওপরও রাজত্ব করেছেন। তাদের দিয়ে অনেক কাজ করিয়েছেন, অনেক অসাধ্যকে সাধন করেছেন। আমরা কুরআন ও সহীহ হাদীস থেকে এ সব বিষয়াদি জানতে পারি।’ কুরআনে জ্বিনজাতির কথা রয়েছে। কিন্তু সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নাবী ও রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ) জ্বিনদের ওপর রাজত্ব কায়েম করেছেন বা তাদের দিয়ে কিছু করিয়েছেন এমন কোন ঘটনা বা কাহিনী নেই। জীনদের সাথে রাসূল (ﷺ)-এর কথা হয়েছে, জ্বিনেরা এসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে- এ সব সংক্রান্ত হাদীস রয়েছে। শয়ত্বান-জ্বিন মানুষের দুশমন, তারা মানুষের ক্ষতি করে থাকে। তবে জ্বিনদের সাথে মানুষের দুনিয়ার কোন কিছু নিয়ে স্বার্থের দ্বন্দ্ব নেই। অতএব দুনিয়ার কোন বিষয় নিয়ে জ্বিন মানুষের শত্রু নয়। জ্বিন সংক্রান্ত কুরআন ও সহীহ হাদীসের বর্ণনার পাশাপাশি জাল ও যঈফ হাদীসের বর্ণনার প্রভাবে এবং শয়তানের ধোঁকায় অশরীরী জ্বিন নিয়ে মানুষ যে কত জল্পনা ও কল্পনার জাল বুনেছে তার ইয়ত্তা নেই। মানুষের কল্পনা শক্তি খুবই আশ্চর্যজনক, এর দ্বারা মানুষ বস্তু ও বাস্তবের দিকেও এগুতে পারে আবার অসম্ভবের দিকেও যেতে পারে। মানুষ জ্বিনকে তার কল্পনায় ধরতে চাইল। তার মনে হল জ্বিন খুব বিশাল আকারের হতে পারে, তার শক্তি মানুষের তুলনায় সর্বদিক দিয়ে বেশি, সে কোন মানুষকে এমনিতেই তুলে নিয়ে যেতে পারে, মানুষকে যেকোন সময় আঘাত করে আহত বা নিহত করতে পারে। এ জাতীয় নানা চিন্তা-ভাবনা মানুষ করতে লাগল। জ্বিন সম্পর্কিত ধারণা থেকেই মানুষ কল্পনায় আরো কিছু প্রাণীর আবিষ্কার করে ফেলল। যেমন- পরী, ভূত-পেত্নী, দেও- দৈত্য, দানব, অসূর ইত্যাদি। এ কল্পনাপ্রবণ মানুষগুলো হল বেশিরভাগ কবি- সাহিত্যিক। প্রথম দিকে কাব্য সাহিত্য ও গদ্য সাহিত্য রচনা করতেন যারা, তারা অবাস্তব বিষয় নিয়েই বেশি লিখতেন বা ভাবতেন। কাজেই তাদের রচনায় ঠাঁই পেত দেও, দৈত্য, দানব, পরী, জ্বিন, ভূত, পেত্নী প্রভৃতি অদৃশ্য ও অশরীরী প্রাণী। এদের নিয়ে লেখা বিষয়গুলো সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হতো। মানুষ এ সব শুনত তন্ময় হয়ে। গল্প শুনে শুনে মানুষ রোমাঞ্চিত হতো, পুলকিত হতো, ভয় পেত এবং চিন্তা-ভাবনায় পড়ে যেত। এমনটা আজও হয়। বংশ পরস্পরায় এ সব চলে আসছে। মানুষ এদের বিশ্বাস করল এবং কল্পনায় এদের ছবি আঁকলো। সাহিত্যে বর্ণিত ও লোকের মাঝে প্রচলিত ধারণাকে ধার করে নিল আরেকটি গোষ্ঠী। এরা হল শিল্পী, আঁকিয়ে বা চিত্রাংকণকারী। তারা যেভাবে ভূত, পরী, দৈত্য প্রভৃতি সম্পর্কে জ্ঞাত হল সেসব নিয়ে ছবি আঁকতে লাগল। এদের সম্পর্কিত কবি-সাহিত্যিকদের লেখা পড়ে ও শিল্পীদের আঁকা ছবি দেখে ছোট ছোট শিশুরা বেশি প্রভাবিত হল। সেই সাথে তারা পরিবারের প্রাচীন বা বয়স্ক সদস্যদের কাছ থেকে জ্বিন-পরী, দেও, দৈত্য, দানব, ভূত, পেত্নীদের নিয়ে নানা লোক-কাহিনী শুনতে লাগল। এদেরকে তারা বিশ্বাস করতে লাগল এবং ভয় পেতে থাকল। সেই বিশ্বাস ও ভয় বয়সকালেও তাদের মধ্যে থেকে যায়। কুরআন ও সহীহ হাদীসের শিক্ষা-দীক্ষা পেয়ে আমাদের মুসলিম সমাজের মানুষেরা আজও তাদের বিশ্বাসকে শানিত করার পাশাপাশি তাদের সন্তান-সন্ততিকে জন্মলগ্ন থেকেই তাওহীদের জ্ঞান অর্জন করতে সহায়তা করেনি। তাদের মাঝে বিশুদ্ধ বিশ্বাস সমৃদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গির প্রচণ্ড অভাব রয়েছে। আর এটা দেখা গেছে যে, শিশু-কিশোরদের মনে অবাস্তব অলৌকিক কেচ্ছা-কাহিনী খুবই প্রভাব বিস্তার করে। ভূতুড়ে গল্প, দৈত্য-দানবের কাহিনী, পরীর কেচ্ছা-কাহিনী শুনতে তারা খুবই ভালবাসে। সেই আদিকাল থেকেই শিশু-কিশোরদের মাঝে এ প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। অবাস্তব গাল-গল্পের প্রতি তাদের আকর্ষণ বেশি। সেসব তারা খুব আগ্রহ ও মনোযোগ সহকারে শোনে এবং পড়ে। আর এ সব নিয়ে বাজারেও আছে প্রচুর শিশুতোষ বই-পত্র।
জ্বিন-ভূতের আছর যাহোক, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে যে কেবল কবি-সাহিত্যিক আর চিত্র শিল্পীরাই পরী ও দেও-দানবের কাহিনী লুফে নিয়েছে তা-ই নয়, আরেকটি গোষ্ঠীও এ সব অলৌকিক ধ্যান-ধারণাকে কেড়ে নিয়েছে। তারা হচ্ছে তথাকথিত চিকিৎসক শ্রেণী। তারা জটিল ও দুর্বোধ্য রোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য জ্বিন-পরী, দেও, দৈত্য, দানব, ভূত, পেত্নী প্রভৃতির আশ্রয় নিল। এরা দেখল যে, জ্বিন-ভূত-পরী প্রভৃতি অশরীরী জীবগুলোকে মানুষ ভিন্নভাবে বিশ্বাস করে। মানুষের এ ধ্যান-ধারণা-বিশ্বাসকে তারা কাজে লাগাতে উঠে-পড়ে লাগল। মানসিক রোগের কোন ধারণা প্রথম দিকের চিকিৎসকদের ছিল না। মানসিক রোগের কারণ হিসেবে তারা জ্বিন-ভূতকে দায়ী করল। তাছাড়া, বাচ্চাদের নানা রোগ বিষয়েরও কারণ হিসেবে তারা দুষ্ট জ্বিন-ভূতের আছর বলতে লাগল। অশরীরী আত্মাগুলোর বাসস্থান হিসেবে চিহ্নিত করল পাহাড়, বন-বাদাড় প্রভৃতিকে। আর তারা যখন লোকালয়ে থাকে তখন নাকি তারা পুকুর পাড়ের বড় তালগাছ, তেঁতুলগাছ, রাস্তার ধারের বটগাছ, বেতবন, গাবগাছ, বাঁশঝাড়, কবরস্থান প্রভৃতিতে আশ্রয় নেয়। এদের চলাফেরার সময় হল ভোরবেলা, সন্ধ্যাবেলা, গভীর রাত্রি এবং ভর দুপুর। কবিরাজগণ প্রচার করল বাচ্চা এবং মহিলারা বিশেষকরে কিশোরী মেয়েরাই জ্বিন-ভূতের শিকার হয় বেশিরভাগ সময়ে। তারা কারণ হিসেবে দেখাল অসময়ে খারাপ জায়গায় চরাফেরা করা, জ্বিন-ভূত ইত্যাদির সামনে পড়া, সুন্দর বা সুন্দরী হওয়া, বেপর্দা চলাফেরা করা ইত্যাদি। কবিরাজরা প্রচার করল যে, জ্বিনেরা চেগ দিয়ে অর্থাৎ পা ফাঁক করে সামনে এসে দাঁড়ায়। হাত-পা-ঘাড় মটকে দেয়, পাগলা করে ফেলে, মানুষকে আঁচর দিয়ে আহত বা নিহত করে, গায়ে গরম বাতাস লাগিয়ে দেয়, বিকট চেহারা ধরে ভয় লাগায়, অদ্ভুত রকমের শব্দ করে, বাড়িতে ঢিল মারে, কাউকে ধরে নিয়ে যায়, বেহুঁশ করে ফেলে রেখে যায় ইত্যাদি ইত্যাদি। কবিরাজদের মতে, জ্বিন-ভূত মানুষের চেহারা ধরে, বিড়াল হয়, বুড়ীর বেশ ধরে, কিশোরী সাজে, বেশিরভাগ সময়ে সাদা কাপড়ে এসে হাজির হয়। তাদেরকে এই দেখা যায় আবার দেখা যায় না।
মানুষ বাগানে শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনিতে ভয় পায়, বাতাসের শো শো শব্দে ভয় পায়, ঘূর্ণিবায়ুর চক্করে পড়ে ভয় পায়, কালো বা সাদা বিড়াল দেখে ভয় পায়, পথ চলতে গিয়ে হঠাৎ গায়ে বাতাস লাগলে বা গরম হাওয়া লাগলে তাতে ভয় পায়, রাত্রে কোন বন্য প্রাণীর আওয়াজ শুনে ভয় পায়, সরিসৃপ জাতীয় কোন প্রাণীর সুড়ৎ করে সরে যাওয়ার আওয়াজ শুনে ভয় পায়, রাত্রি বেলায় কোন সাদা পোশাক পরিহিত মানব বা মানবী দেখে ভয় পায় প্রভৃতি নানা কারণে মানুষ ভয় পায়। অশরীরী আত্মাগুলোর ব্যাপারে মানুষের মনে যে বিশ্বাস, সেগুলো এ সব ক্ষেত্রে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে এবং সে মনে করে ওসব প্রাণীরা তার ওপর সওয়ার হয়েছে। এ রকম নানা ভয়জনিত কারণে এবং দৈহিক ও মানসিক বিভিন্ন জটিলতার কারণে মানুষ নানা দুর্বোধ্য রোগের শিকার হয়। এ সব রোগের শিকার তারাই বেশি হয়, যারা দুর্বল চিত্ত ঈমানের অধিকারী ও যাদের মধ্যে কুরআন ও সহীহ হাদীস নির্ভর চিন্তা-ভাবনার অভাব রয়েছে।
জ্বিন-ভূত বিতাড়নের নানা পদ্ধতি
কবিরাজরা এ সব রোগের নানা চিকিৎসা পদ্ধতি বের করেছে। যেমন পানি পড়া, তাগা বা রশি পড়া, পান পড়া, চিনি পড়া, বাড়ি-ঘর বন্ধ করা, জ্বিন-ভূতকে বোতলবন্দী করা, জ্বিন-ভূত চালান দেওয়া, তাবিজ-কবচ দেওয়া, দু’আ-দরূদ, যাদুমন্ত্র ইত্যাদি পড়ে রোগীর গায়ে ও পানিতে ফুঁ দেওয়া ইত্যাদি।
জ্বিন-ভূত সংক্রান্ত রোগ দেখা দিলে কবিরাজরা সেগুলোকে আলগা পাওয়া বা বাতাস লাগা বলে থাকে। আবার সোজা করেও বলে দেন ভূতে ধরেছে, জ্বিনে পেয়েছে, জ্বিন-ভূতের আছর হয়েছে। মেয়েদের জ্বিন-ভূতে ধরা রোগের চিকিৎসা হল এক ধরনের নারী নির্যাতন। কোন মেয়ে যখন কোন কারণে অস্বাভাবিক আচরণ করে তখন বলা হয় তাকে ভূতে ধরেছে। শুরু হয়ে যায় তাবিজ-কবজের পালা আর শিক্ক-কুফরযুক্ত ঝাড়-ফুঁক। কবিরাজ দিয়ে ভূত বা জ্বিন চালান দেওয়া হয়। এ ভূত চালান বড়ই জঘন্য। রোগীকে একটা বদ্ধ ঘরে অন্ধকারে রাখা হয়। তাকে মশারীর ভিতরে নেয়া হয়। মরিচ বা অন্য ঝাঁঝালো কিছু পোড়া দিয়ে ধোঁয়া করে রোগীর নাকে-চোখে লাগানো হয়। কাঁসার থালা-বাটি-বদনা পিটানো হয়, মুখে যাদুমন্ত্র পাঠ করা হয়। আর রোগীর কনিষ্ঠা আঙ্গুলে একটি জাত মরিচ বা গোল মরিচের গোটা রেখে আঙ্গুল বাঁকা করে তার উপর প্রচণ্ড চাপ দেওয়া হয়। রোগী চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। কবিরাজ মশাই প্রচণ্ড পিটাতে থাকে। রোগী আরও জোরে কাঁদতে থাকে। ঠিক ঐ সময়ে কবিরাজ তার চেলা-সাগরেদ দিয়ে একটি জঘন্য ঘটনা ঘটান। সেটাও তার পূর্ব পরিকল্পিত। যে ঘরে রোগী রেখে ভূত চালান দেওয়া হয়, সেই ঘরের চালে বা ঘরের পাশের গাছ-গাছড়ায় ঝাঁকানি দিতে থাকে। তখন মানুষ মনে করে জ্বিন-ভূত এসে হাজির হয়েছে। কবিরাজ মশাই অন্যান্যদেরকে বলতে থাকেন, ‘আপনারা কেউ কোনদিকে তাকাবেন না, কথা বলবেন না, নড়াচড়া করবেন না। কেউ কথা না শুনলে তার ক্ষতি হবে।’ তার এ সমস্ত কথায় উপস্থিত লোকেরা আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়ে। রোগী অত্যাচারে নানা আবোল-তাবোল বকতে শুরু করে। লোকজনকে বুঝানো হয় যে, আঘাতগুলো রোগীকে করা হয়নি। রোগীর গায়ে কোন বাড়ি পড়েনি। অথচ পরবর্তীতে যখন রোগীর গায়ের দিকে দৃষ্টিপাত করা হয় তখন তার সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখা দেয়। তাকে আঘাত করা হয় নানা আবোল-তাবোল বকার জন্য। রোগীর কথার কোন তাল থাকে না। কবিরাজ মশাই রোগীকে জেরা করতে শুরু করে। অত্যাচারের তীব্রতায় রোগীর কণ্ঠস্বর ও কথা বলার ধরণ পাল্টে যায়। কবিরাজ বা মৌলভী সাহেব এ অবস্থাকেই ভূতে বা জ্বিনে কথা বলছে বলে চালিয়ে দেন।’ রোগীকে জিজ্ঞাসা করা হয়, ‘তুই হিন্দু না মুসলিম? তোর কি নাম? তুই কোথায় থাকিস? তোরা ক’ভাই? একে ধরলি কেন? কবে থেকে এর সাথে আছিস? এ রোগী ছেড়ে যাবি কি-না বল?’ ভয় দেখিয়ে রোগীকে কবিরাজ সাহেব এ সব প্রশ্ন করতে থাকে। অত্যাচার থেকে রেহাই পাবার জন্য রোগী কবিরাজকে আপোষমূলক জবাব দিয়ে থাকে। যেমন, সে বলে, ‘আমি হিন্দু, আমরা তিন ভাই, ঐ তেঁতুল গাছটায় থাকি। আমি চলে যাব, আর আসব না, আমায় ছেড়ে দিন।’ ইত্যাদি নানা কিছু। তথাকথিত জ্বিন-ভূতের আছর করা ব্যক্তি থেকে জ্বিন-ভূত দূর করতে অনুসৃত বিভিন্ন ভ্রান্ত, কুসংস্কার, শিক্ক-কুফরযুক্ত পদ্ধতির মধ্যে একটি।
তবে, সাধারণত জ্বিন-ভূতে পাওয়া বা আছর করা ব্যক্তির ওপর থেকে জ্বিন- ভূতকে বিতাড়িত করতে সাধারণত তিন ধরনের পদ্ধতির অবলম্বন করা হয়:
১. প্রথমত, অন্য জ্বিনকে ডেকে এনে উপস্থিত জ্বিনকে বিতাড়িত করা যায়। এ পদ্ধতি ইসলামে নিষিদ্ধ। কারণ, জ্বিনকে ডাকতে প্রায়ই অপবিত্র তথা শির্কী- কুফরী ও অবৈধ কর্ম সম্পাদন করতে হয়। মূলত ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলোর বিরোধিতা করেই জ্বিনকে আহ্বান করতে হয়। এ পদ্ধতির মাধ্যমেই এক যাদুকর কর্তৃক নিক্ষিপ্ত যাদুমন্ত্রকে অন্য যাদুকর ধ্বংস করে থাকে।’
২. দ্বিতীয়ত, জ্বীনের সামনে বড় ধরনের শিৰ্কে লিপ্ত হয়ে তাকে বিতাড়ন করা যায়। যাদুকরের কুফরী ও শিকে সন্তুষ্ট হয়েও জ্বিন অসুস্থ ব্যক্তিকে ত্যাগ করতে পারে। এভাবে জ্বিন চলে যাওয়ার মাধ্যমে যাদুকরের ব্যবহৃত পদ্ধতিকে সে সঠিক বলে নিশ্চয়তা প্রদান করে। এ নিয়মেই খ্রিস্টান যাজকেরা যিশুকে ডেকে এবং ক্রশ ব্যবহার করে ভূত বিতাড়নের কাজ সমাধা করে। আর পৌত্তলিকদের প্রধান পুরোহিত বা ফক্বির বা ওঝাগণও তাদের মিথ্যা দেবতাদের নামে ভূত বিতাড়ন করে।
৩. তৃতীয়ত, কুরআন তিলাওয়াত এবং একমাত্র আল্লাহ্র আশ্রয় প্রার্থনা করে জ্বিনকে তাড়ানো যায়। এ আসমানী শব্দসমষ্টি এবং বিধানসমূহ জ্বীনে পাওয়া বা ভূতাবিষ্টের চারদিকের পরিবেশে পরিবর্তন ঘটাতে সাহায্য করে। তারপর, আদেশ বা আঘাতের দ্বারা জ্বিনকে তাড়ানো যায়। যে ব্যক্তি এ কর্ম সম্পাদন করবে তার ব্যক্তিগত ঈমান যদি মজবুত না হয় অথবা সৎকর্মের ভিত্তিতে আল্লাহ্র সঙ্গে ভাল সম্পর্ক না থাকে, তাহলে সে জ্বিন বিতাড়নের এ কর্মে সিদ্ধি লাভ করতে ব্যর্থ হওয়া অবশ্যম্ভাবী।
বৈধভাবে জ্বিন-ভূত বিতাড়নের উপায় সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নিম্নোক্ত দু’আসমূহ পাঠ করে আক্রান্ত ব্যক্তিকে ঝাড়- ফুঁক করা যায়:
﴿.. أَعُوْذُ بَكَلَمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ 'আ'উযু বিকালিমা-তিল্লা-হিত তা- ম্মাতি মিন শারি মা-খালাক্ব। তবে যাদু-টোনা ও জ্বিন-শয়তানের আক্রমণ থেকে নিরাপদে থাকতে দু’আটি যেকোন সময় বিশেষ করে রাত্রী বেলায় পাঠ করতে হয়।
﴿أَعُوْذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّاتِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَمَّاتٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لمَّاتِ বিকালিমা-তিল্লা-হিত তা-ম্মাতি মিন কুল্লি শায়ত্বা-নিন ওয়া হা-ম্মাতিন, ওয়ামিন কুল্লি ‘আয়নিন লা-ম্মাতিন।
﴿بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ "বিসমিল্লাহ-হিল্লাযী লা ইয়াযুররু মা’আসমিহী শাইউন ফিল আরদি ওয়ালা ফিসসামায়ি, ওয়াহুয়াস সামী’উল ‘আলীম। এ ছাড়া ফজর ও মাগরিবের সালাতের পরও তিনবার করে এ দু’আটি পাঠ করা যায়।
﴿أَذْهِبْ الْبَاسَ رَبُّ النَّاسِ وَاشْفَ أَنْتَ الشَّافِي لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ شِفَاءٌ لَا يُغَادِرُ سَقَمًا 'আযহিবিল বা’সা রাব্বান্নাসি ওয়াশফি আন্তাশ শা-ফী, লাশিফা-আ ইল্লা শিফা-উকা শিফা-আল লা ইউগা-দিরু সাক্বামা।
৫. সূরা বাক্বারার ২৮৫ ও ১৮৬ নং আয়াত। তাছাড়া, রাতের প্রথম অংশেও এ আয়াত দু’টি পাঠ করা যায়।
৬. বরইয়ের সাতটি সবুজ পাতা বেটে পাউডার বানিয়ে তা একটি পাত্রে রেখে তাতে গোসলের সমপরিমাণ পানি ঢেলে তার মধ্যে এ আয়াতগুলো পাঠ করবে: আয়াতুল কুরসী (সূরা বাক্বারার ২৫৫ নং আয়াত), সূরা কাফিরুন, ইখলাস, ফালাক্ব ও নাস তিন বার করে এবং যাদু সংক্রান্ত আয়াতসমূহ যেমন- সূরা আ’রাফের ১১৭ থেকে ১১৯ নং আয়াত, সূরা ইউনুসের ৭৯ খেবে ৮২ নং আয়াত এবং ত্বহা-এর ৬৫ থেকে ৬৯ নং আয়াত পাঠ করবে। এই আয়াতগুলো পাঠ করার পর উক্ত বরই পাতার পাউডার মিশানো পানিতে তিনিবার ফুঁক দিয়ে সে পানি পান করবে এবং বাকী পানি দ্বারা গোসল করবে।
জ্বিনে পাওয়া বা ভূতাবিষ্ট ব্যক্তিকে সুস্থ্য করা সম্পর্কে রাসূল (স) ও সাহাবী থেকে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এ বিষয় সংশ্লিষ্ট চারটি হাদীস নিম্নে উল্লেখ করা হল:
আব্দুল্লাহ ইবনু মাস’উদ -এর স্ত্রী যায়নাব বলেন, ‘ইবনু মাসউদ ( যখন বাড়িতে আসতেন তখন সাড়া দিয়ে আসতেন। ... একদিন তিনি এসে সাড়া দিলেন। তখন আমার ঘরে একজন বৃদ্ধা আমাকে ঝাড়ফুঁক করছিল। আমি বৃদ্ধাকে চৌকির নিচে লুকিয়ে রাখি। ইবনু মাসউদ আমার ঘরে ঢুকে আমার পাশে বসেন। এমতাবস্থায় তিনি আমার গলায় একটি সূতা দেখতে পান। তিনি বলেন, এ কিসের সূতা? আমি বললাম, এটা ফুঁক দেওয়া সূতা। যায়নাব বলেন, তখন তিনি সূতাটি ধরে ছিড়ে ফেলেন এবং বলেন, আব্দুল্লাহর পরিবারের শিক্ক করার কোন প্রয়োজন নেই। আমি রাসূলুল্লাহ-কে বলতে শুনেছি: ‘ঝাড়ফুঁক, তা’বীজ-কবচ এবং মিল- মহব্বতের তা’বীজ শির্ক।’ যায়নাব বলেন, তখন আমি আমার স্বামী ইবনু মাসউদকে বললাম, আপনি এ কথা কেন বলছেন? আল্লাহ্র কসম, আমার চক্ষু থেকে পানি পড়ত। আমি অমুক ইহুদীর কাছে যেতাম। সে যখন ঝেড়ে দিত, তখন চোখে আরাম বোধ করতাম। তখন ইবনু মাস’উদ বলেন, ‘এটা হল শয়তানের কর্ম। শয়তান নিজ হাতে তোমার চক্ষু খোঁচাতে থাকে।’ এরপর যখন (কুফরী ও শির্কযুক্ত) ফুঁক দেওয়া হয় তখন সে খোঁচানো বন্ধ করে। তোমার জন্য যথেষ্ট ছিল যে, রাসূলুল্লাহ যা বলতেন তা বলবে। তিনি বলতেন: ﴿أَذْهِبِ الْبَأْسِ رَبَّا النَّاسِ وَاشْفَ أَنْتَ الشَّافِي لاَ شَفَاءً إِلَّا شِفَالُكَ شِفَاءٌ لَا يُغَادِرُ سَقَمًا "আযহিবিল-বা’স রব্বান-নাস ওয়াশফি, আংতাশ-শা’ফী, লা শিফা-আ ইল্লা শিফাউক, শিফা আন লা ইউগহাদিরুহু সাক্বামা" অর্থ: অসুবিধা দূর করুন, হে মানুষের প্রতিপালক, সুস্থতা দান করুন, আপনিই একমাত্র শিফা বা সুস্থতা দানকারী, আপনার শিফা (সুস্থতা) ছাড়া আর কোন শিফা নেই, এমন (পরিপূর্ণ) শিফা বা সুস্থতা দান করুন যার পরে আর কোন অসুস্থতা অবশিষ্ট থাকবে না।’
ইয়ালা ইবনু মারাহ বলেন, "আমি একদিন রাসূল-এর সাথে ভ্রমণে বের হয়ে এক মহিলাকে তার বাচ্চাসহ রাস্তায় বসে থাকতে দেখলাম। মহিলাটি বলল, ‘হে আল্লাহর নাবী, এ শিশুটি অসুস্থ এবং আমাদেরকেও যন্ত্রণায় কাতর করে তুলেছে। আমি জানি না প্রতিদিন কতবার তাকে যাদু দ্বারা আক্রমণ করা হয়!’ রাসূল বললেন, ‘বাচ্চাটি আমার কাছে দাও।’ তাই মহিলাটি বাচ্চাটিকে উপরে উঠিয়ে রাসূল-এর নিকটে দিল। তারপর রাসূল বাচ্চাটিকে নিয়ে ঘোড়ার পিঠে তাঁর সম্মুখে বসালেন। এরপর বাচ্চার মুখ খুলে তিনবার মুখের ভিতরে ফুঁ দিয়ে বললেন, ‘বিসমিল্লাহ, আমি আল্লাহর একজন বান্দা, তাই চলে যাও, ওহে আল্লাহ্র শত্রু!’ তারপর বাচ্চাটি মহিলার কাছে ফেরত দিয়ে রাসূল বললেন, ‘ফিরতি পথে আবার এখানে আমাদের সাথে সাক্ষাত করবে এবং বাচ্চাটির অবস্থা সম্পর্কে জানাবে।’ তারপর আমরা চলে গেলাম এবং ফিরতি পথে আমরা মহিলাকে সেই জায়গাতেই তিনটি ভেড়াসহ দেখতে পেলাম। তাই রাসূল জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার বাচ্চা কেমন আছে?’ মহিলা উত্তর দিল, ‘তাঁর নামে শপথ করে বলছি যিনি আপনাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন, আপনি দু’আ করার পর থেকে তার কোন সমস্যা আমরা দেখতে পাইনি, তাই আমি এই ভেড়াগুলো আপনার জন্য নিয়ে এসেছি।’ রাসূল আমাকে বললেন, ‘ঘোড়া থেকে নামো এবং একটি ভেড়া গ্রহণ কর। আর বাকীগুলো তাকে ফেরত দাও।"
উম্মু আবান বিনতু আল-ওয়াযি বর্ণনা করেন, "আমাদের গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে আমার দাদা আল্লাহর রাসূল -এর সঙ্গে সাক্ষাত করতে যাওয়ার সময় তিনি তার এক ছেলেকেও সাথে নিয়ে যান, যে ছিল পাগল। আল্লাহ্র রাসূল -এর নিকটে পৌছে তিনি বললেন, ‘আমার একটি পাগল ছেলে রয়েছে, তাই আপনার দু’আ চাইতে আমি তাকে আমার সাথে নিয়ে এসেছি।’ রাসূল তাকে নিয়ে আসতে বললেন। ফলে তার ছেলের পরনে যে ভ্রমণের পোশাক ছিল তা পরিবর্তন করে রাসূল -এর কাছে নিয়ে আসলেন। রাসূল বললেন, ‘তাকে আমার কাছে নিয়ে এসে পিছন ফিরে দাঁড় করাও।’ তারপর রাসূল ওই ছেলেটির পরনের কাপড় শক্ত করে ধরে তার পিছে সজোরে আঘাত করতে শুরু করলেন। তাকে আঘাত করা অবস্থায় রাসূল বলছিলেন, ‘দূর হয়ে যা, আল্লাহর শত্রু! দূর হয়ে যা, আল্লাহর শত্রু!’ এরপর ছেলেটি এমনভাবে চারদিকে তাকাতে শুরু করল যেন সে সম্পূর্ণ সুস্থ। রাসূল তাকে তাঁর সম্মুখে বসালেন এবং কিছু পানি আনতে আদেশ করলেন। তারপর রাসূল পানি দিয়ে ছেলেটির মুখ ধুয়ে দিলেন এবং তার জন্য দু’আ করলেন। রাসূল -এর দু’আর পর উক্ত প্রতিনিধি দলের মধ্যে আর কেউই ওই ছেলের মতো সুস্থ ছিল না।
খারিজাহ ইবনু আছ-ছাল্ড বর্ণনা করেন যে, তার চাচা বলেছেন, "আল্লাহর রাসূল -এর সান্নিধ্য ত্যাগ করে যাওয়ার সময় এক বেদুইন গোত্রের সাথে আমাদের সাক্ষাত হল। তাদের মধ্যে থেকে কয়েকজন বলল, ‘আমাদেরকে জানানো হয়েছে যে, তোমরা ঐ ব্যক্তিটি (রাসূল মুহাম্মাদ) থেকে কিছু উত্তম জিনিস নিয়ে এসেছ। জ্বিনেপাওয়া ব্যক্তির জন্য তোমাদের নিকটে কি কোন ওষুধ বা মন্ত্র আছে?’ আমরা বললাম, হ্যাঁ। তাই তারা জ্বিনগ্রস্ত এক পাগলকে আনল। তিনদিন ধরে আমি প্রতি সকালে ও সন্ধ্যায় তার উপরে সূরা আল-ফাতিহা তিলাওয়াত করলাম। প্রতিবার পড়া শেষে আমি আমার মুখে লালা জমা করে তাকে থু থু মারতাম। অবশেষে সে এমনভাবে উঠে দাঁড়াল যেন শক্তিশালী কোন বন্ধন থেকে মুক্ত হল। তারপর বেদুইনরা পারিশ্রমিক হিসেবে একটি উপহার নিয়ে এলে আমি তাদেরকে বললাম, ‘আল্লাহর রাসূল -কে জিজ্ঞাসা করা ব্যতীত আমি এটি গ্রহণ করতে পারব না।’ আমি রাসূল -কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, ‘ওটা গ্রহণ করো। আমার জীবনের শপথ, মিথ্যা যাদুমন্ত্রের মাধ্যমে যে ব্যক্তি আয় করবে, সে নিজেই তার গুনাহের জন্য দায়ী। কিন্তু তুমি পারিশ্রমিক অর্জন করেছ সত্য আয়াতের মাধ্যমে।’
জ্বিন-শয়তানের আক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকার উপায় উপরে বর্ণিত দু’আ ও আয়াতসমূহ জ্বিন-শয়ত্বানের অনিষ্ট হতে নিজেকে নিরাপদ রাখার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অনুরূপভাবে কেউ জ্বিন, শয়ত্বান দ্বারা আক্রান্ত হলে তার জন্যও উপরোক্ত রূহানী চিকিৎসা যথেষ্ট বলেই প্রতীয়মান হয়। তবে তাদের ক্ষেত্রে যাদু সংক্রান্ত আয়াতগুলো পাঠ এবং বরই পাতার ব্যবহার করার কোন প্রয়োজন নেই। কারণ এগুলো শুধুমাত্র যাদু দ্বারা আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তাদের জন্য উপরোক্ত দু’আগুলো ও যিকরগুলোই যথেষ্ট। তাছাড়া প্রতিদিন সকাল বেলায় সাতটি করে খেজুর বিশেষ করে আজওয়া খেজুর ভক্ষণ করবে। এরূপ করলে বিষ ও যাদু কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। এটি অতি মূল্যবান এক প্রকার খেজুর। দেখতে একেবারেই কালো এবং অন্যান্য খেজুর অপেক্ষা ছোট। এটি সউদী আরবে পাওয়া যায়। মদীনা মুনাওয়ারায় অবশ্য এই খেজুর বেশি দেখা যায়। এ খেজুরের মূল্য সাধারণ খেজুর অপেক্ষা বেশি। অনেক আলেমে দ্বীন মনে করেন, শুধু আজওয়া খেজুরেই উক্ত প্রতিষেধক রয়েছে, অন্যান্য খেজুরে নেই।
এ ছাড়া কুরআনের আয়াতের নামে তথাকথিত সুলায়মানী নকশা, ইহুদীদের থেকে প্রাপ্ত বিদ্যা তথা কুরআনের আয়াতসমূহ সংখ্যায় লিপিবদ্ধ করা; যেমন, ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’-এর পরিবর্তে ৭৮৬ লেখা ইত্যাদি দিয়ে তা’বীজ-কবচ তৈরি করে ব্যবহার করা শারী’আতের দৃষ্টিতে বড় ধরনের পাপ ও নিকৃষ্ট বিদ’আত।
উল্লেখ্য, যাদু-টোনায় বা জ্বিন-শয়তান দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে ঔষধ-বড়ি মোটেই ফলপ্রসূ হয় না। কাজেই যাদু-টোনা বা জ্বিন-শয়ত্বান থেকে নিরাপদ থাকা বা এগুলো দ্বারা আক্রান্ত হলে তা থেকে আরোগ্য লাভ করার ক্ষেত্রে একমাত্র শারী’আত সম্মত ঝাড়-ফুঁকই বিকল্প চিকিৎসা। তবে সচরাচর দেখা যায়, উভয় প্রকার রোগী আরোগ্য লাভের জন্য এমন কিছু কাজ করে অথবা প্রচলিত কবীরাজদের অনেকেই ঐসব রোগের চিকিৎসা স্বরূপ এমন কিছু কাজ করে থাকে বা রোগী দ্বারা করিয়ে থাকে যা প্রকাশ্য শির্ক। যেমন- তারা আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যের নিকট তথা জ্বিন, ফিরিশতা, নাবী-রাসূল, ওলী-আওলিয়া, এমনকি হিন্দুদের দেব-দেবী প্রভৃতির নিকট সাহায্য ও আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকে, নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট তারিখে লাল বা কালো মোরগ জ্বিন-ভূতের নামে রোগীকে যবেহ করতে বলে কিংবা ৪/৫ কেজি মিষ্টি গায়রুল্লাহর নামে মানত হিসেবে প্রদান করতে বলে ইত্যাদি। এ সকল কর্মই শির্ক। অথচ কুরআন ও সহীহ হাদীস সম্মত চিকিৎসাই এ ক্ষেত্রে তাদের জন্য যথেষ্ট ছিল। এ সব শির্কী পন্থায় চিকিৎসা ফলপ্রসূ হলেও তা গ্রহণ করা শারী’আতে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ও হারাম। এভাবে চিকিৎসা নেওয়া মানেই নিজেকে কাফির, মুশরিক সাব্যস্ত করা।
শারী’আত সম্মত চিকিৎসা দ্বারা উপকৃত হতে হলে রোগী ও চিকিৎসক উভয়কে পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে হবে যে, এই চিকিৎসা পদ্ধতি যেহেতু কুরআন ও সহীহ হাদীস সম্মত কাজেই তার সুপ্রভাবও সুনিশ্চিত। বিশ্বাস ও আস্থাহীনভাবে শুধু পরীক্ষাস্বরূপ তা ব্যবহার করলে কোনই উপকারে আসবে না। মনে রাখতে হবে মহান আল্লাহ্ পূর্ণ কুরআনকেই ‘শিফা’ তথা আরোগ্য বলেছেন। এটা হল কুরআন সম্পর্কে আল্লাহ্র দ্ব্যর্থহীন বাণী। অতএব চাই এর প্রতি অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস। কুরআনের পরপরই নাবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর হাদীছের স্থান। এটাও এক প্রকার ওহী। সুতরাং সহীহ হাদীছে বর্ণিত ঝাড়-ফুঁকের দু’আসমূহেও পূর্ণ বিশ্বাস ও অবিচল আস্থা রাখতে হবে। এভাবে আস্থাশীল হয়ে কুরআন ও হাদীন সম্মত উক্ত চিকিৎসা গ্রহণ করলে অবশ্যই সুফল পাওয়া যাবে। তবে সর্বদা মনে রাখতে হবে যে, এ সব ঝাড়-ফুঁক আরোগ্য লাভের বৈধ উপায়-উপকরণ মাত্র, প্রকৃত আরোগ্য দানকারী হলেন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা।
টিকাঃ
১. জ্বীনজাতি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত হলেও মোটামুটি একটা স্পষ্ট ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে পূর্বের অধ্যায়ে।
২. তবে, সত্যিকারভাবেই যদি কারও ওপর জ্বিন আছর করে, তাহলে তার কণ্ঠস্বর এমনিতেই পরিবর্তন হতে পারে। এ বিষয়টির সত্যতা প্রমাণিত। এ ব্যাপারে বিস্তারিত দেখুন: ইবনু তাইমিয়া কর্তৃক লিখিত এবং ড. আবু আমীনাহ বিলাল ফিলিন্স কর্তৃক ইংরেজিতে অনূদিত, সম্পাদিত গ্রন্থ The Jinn (Demons), পৃষ্ঠা ১০৭-৯/
৩. জাবির বিন আব্দুল্লাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ-কে যাদু দ্বারা যাদু মুক্ত করা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘এটি শয়তানের কর্ম।’ (আহমাদ, ৩/২৯৪; আবু দাউদ, ১০/৩৪৬; আওনুল মা’বুদ, হা/৩৮৫০; হায়সামী বলেন, অত্র হাদীসটি আনাস থেকে ইমাম বাযযার ও তাবরানী স্বীয় আওসাত্ব গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন এবং এর বর্ণনাকারীগণ বুখারী বা মুসলিমের রাবী। দ্রঃ মাযমাউয যাওয়াইদ, ৫/১০৫; হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী বলেন, এই হাদীসটির সনদ হাসান। দ্রঃ ফাতহুল বারী, ১০/২৩৩; গৃহীত: আল্লামা ফাহাদ বিন যুইয়ান সুহায়মী, আহকামুর রুক্কা ওয়াত তামাইম, পৃ. ১৫০-১)
৪. সহীহ মুসলিম, হা/২৭০৮।
৫. বুখারী, হা/৩১২০।
৬. আহমাদ, হা/৪১৮, ৪৪৪, ৪৯৭; তিরমিযী, হা/৩৩১০, আবূ দাউদ, হা/৪৪২৫; ইবনু মাজাহ, হা/৩৮৫৯; হাদীস সহীহ।
৭. বুখারী, হা/৫৭৪৩; মুসলিম, হা/২১৯১; আহমাদ, হা/৫৩৩; আবূ দাউদ, হা/৩৩৮৫; তিরমিযী, হা/৩৪৮৮।
৮. বুখারী, হা/৩৭০৭, ৪৬২৪, ৪৬৫২, ৪৬৬৩; মুসলিম, হা/১৩৪০, ১৩৪১।
৯. বরই পাতা গুড়া করে তাতে পানি ঢেলে সে পানিতে আয়াতুল কুরসী পাঠ করার কথা ওয়াহাব ইবনু মুনাব্বিহ তাবিঈর কিতাবে লিখিত আছে বলে ইবনু বাত্তাল উল্লেখ করেছেন। দ্র: ফাৎহুল বারী, ১০/২৩২; আযওয়াউল বায়ান, ৪/৪৬৪; মাহমূদ খলীফা আল-জাসেম, যাদু ও বদ-নযর, পৃ. ৫৪। হাফিয ইবনু কাছীরও অনুরূপ কথা স্বীয় তাফসীরে উল্লেখ করেছেন। সউদী ‘আরবের সাবেক প্রধান মুফতী আল্লামা আব্দুল আযীয বিন বাযও অনুরূপ ফাৎওয়া দিয়েছেন। (মাযমূউল ফাতাওয়া, ৩/২৭৪-৮১) মিশরের অন্যতম সালাফী বিদ্বান শায়খ হামিদ ফক্বীহ তাঁর প্রতিবাদ করলে তিনি তার জবাব দিয়েছেন এবং বলিষ্ঠ কণ্ঠে তা বৈধ বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, এটি একটি চিকিৎসা পদ্ধতি। ডাক্তারগণ অনুরূপ বহু কিছু বলে থাকেন। যেমন, ওমুক ট্যাবলেট একসাথে দু’টি খেতে হবে, রাতে এই সংখ্যায় খেতে হবে, দিনে এই সংখ্যায় খেতে হবে ইত্যাদি। অতএব এটিকে অস্বীকার করার কোন যৌক্তিকতা নেই। (দ্র. হামিদ ফক্বীহ কর্তৃক তাহক্বীক কৃত এবং শায়খ ইবনু বায কর্তৃক সম্পাদিত ‘ফাতহুল মাজীদ’) ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ একজন তাবিঈ বিদ্বান এবং তাঁর এই ‘আমলটি কুরআন-হাদীস বিরোধী নয় হেতু ‘আমলটির বৈধতাকে ঐসমস্ত মুসলিম মনীষীগণ মেনে নিয়েছেন। এরপরও বিষয়টি যেহেতু ইজতিহাদ ভিত্তিক। অতএব কেউ তা মানতে বাধ্য নয়। কুরআনের আয়াত, ঝাড়-ফুঁক সংক্রান্ত নাবীর শিখানো দু’আ প্রভৃতি পড়ে পানিতে দম করার কথা সালাফী সালিহীন থেকে বর্ণিত হওয়ায় সউদী আরবের মান্যবর সাবেক প্রধান মুফতী আল্লামা আব্দুল আযীয বিন বায ও আল্লামা ইবনু উছায়মীন এটিকে বৈধ বলে মন্তব্য করেছেন। (দ্র: ফাতাওয়াল ইলাজ বিল কুরআন ওয়াস সুন্নাহ, পৃ. ৯-১০ এর বরাতে ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম, পৃ. ১৩৫২-১৩৫৩) এমনকি যাদুগ্রস্ত ব্যক্তিকে ঐ সমস্ত দু’আ পানিপাত্র বা কাগজে লিখে তা পানিতে মিশিয়ে সে পানি পান করতে কতিপয় সালাফী সালিহীন যেমন, ইবনু ‘আব্বাস, মুজাহিদ, আবু কিলাবাহ প্রমুখ থেকে বর্ণিত হওয়ায় সউদী আরবের স্থায়ী কমিটি তা বৈধ বলে মন্তব্য করেছেন। (দ্র: মাজাল্লাতুল বুহছিল ইসলামিয়্যাহ, সংখ্যা ২৭, পৃ. ৫১-৫২; ফাতাওয়া ওলামাইল বালাদিল হারাম, ১৩২৩-২৪) তবে এগুলো ইজতিহাদী বিষয় মাত্র, যা মানতে কেউই বাধ্য নয়। অবশ্য আমভাবে কুরআনের আয়াত ও হাদীস ভিত্তিক দু’আ দ্বারা ঝাড়-ফুঁক প্রমাণিত। মনে রাখা আবশ্যক যে, যাদু-টোনা চিকিৎসার সর্বোত্তম মাধ্যম হল যদি জানা যায় যে, ওমুক জায়গার যাদুর উপকরণ রাখা হয়েছে বা প্রোথিত হয়েছে, তবে তা বের করে ধ্বংস করে দেওয়া। এতেই সংশ্লিষ্ট যাদু-টোনার আছর ধ্বংস যাবে ইনশাআল্লাহ্। যেমনটি রাসূলুল্লাহ্-এর ক্ষেত্রে হয়েছিল। (বুখারী, ‘চিকিৎসা’ অধ্যায়, হা/৫৩২৪; মুসলিম, ‘সালাম’ অধ্যায়, হা/৪০৫৯)।
১০. মানুষের অসুস্থতা ও শয়তান-জ্বিনের প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে, পড়ুন: The Jinn and Human Sickness by Dr. Abu’l-Mundhir Khaleel ibn Ibraaheem Ameen (Darussalam Publication, Riyad, Saudi Arabia)।
১১. আহমাদ, আল-মুসনাদ, ১/৩৮১; হাকিম, আল-মুসতাদরাক, ৪/২৪১। আবু দাউদ কর্তৃক সংগৃহীত, সুনান আবী দাউদ, খণ্ড ৩, পৃ. ১০৮৯, হাদীস নং ৩৮৭৪। ইবনে মাজাহ ও ইবনে হিব্বান। শাইখ আলবানী এ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, সহীহ সুনান আবী দাউদ, খণ্ড ২, পৃ. ৭৩৬-৩৭, হাদীস নং ৩২৮৮। এ দু’আটি অবশ্য ‘আয়িশা ও আনাস কর্তৃকও বর্ণিত এবং বুখারী ও মুসলিম কর্তৃক সংগৃহীত। বুখারী, খণ্ড ৭, পৃ. ৪২৭-২৮, হাদীস নং ৫, ৬৩৮-৩৯; মুসলিম, খণ্ড ৩, পৃ. ১১৯৫, হাদীস নং ৫৪৩৪।
১২. এখানে ব্যবহৃত আরবী শব্দ হচ্ছে ‘নাফাছা’, যার অর্থ জিহ্বার অগ্রভাগকে দুই ঠোঁটের মাঝখানে রেখে ফুঁক দেওয়া। অতএব, এটা ফুঁক দেওয়া ও হালকাভাবে থু থু ফেলার মাঝামাঝি পর্যায়।
১৩. সুনান আবি দাউদ, ৩য় খণ্ড, ১০৯২ পৃ., হাদীস নং ৩৮৮৭।
১৪. আল্লামা ফাহাদ বিন যুইয়ান সুহায়মী, আহকামুর রুক্কা ওয়াত তামাইম, পৃ. ১৫০-১৫১; বিস্তারিত দ্রঃ মাজমুউল ফাতাওয়া ওয়াল মাক্বালাত মুতানাব্বিআহ, ৩/২৭৪-২৮১ এর বরাতে ফাতাওয়া ওলামাইল বালাদিল হারাম, পৃ. ১৫১২।
১৫. বুখারী, ‘খাাদ্য’ অধ্যায়, হা/৫২৫ এবং ‘চিকিৎসা’ অধ্যায়, হা/ ৫৩২৬-৭, ৫৩৩৪; মুসলিম, ‘পানীয়’ অধ্যায়, হা/৩৮১৪।
১৬. [সূরা হামীম সিজদা (৪১) : ৪৪; সূরা ইসরা (১৭) : ৮২]
📄 ভাগ্যগণনা-যাদুশস্ত্র ও অলৌকিকত্বের প্রভাব, সবই জ্বিন-শয়তানের স্বভাব
জ্বিনের ক্ষমতা সম্পর্কে কুরআন ও সহীহ হাদীছে বর্ণিত মৌলিক বিষয়সমূহ স্মরণ রাখলে ভাগ্য গণনাসহ সকল প্রকার অতিপ্রাকৃতিক তথা অলৌকিক ও যাদুসংক্রান্ত ঘটনাগুলো যে ধোঁকা বা ভেলকিবাজি নয় তা খুব সহজেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
১. ভাগ্য গণনায় জ্বিন-শয়তানের প্রভাব: মানুষের মধ্যে যেসব লোক অদৃশ্য ও ভবিষ্যত সম্বন্ধে জ্ঞানের অধিকারী বলে দাবী করে তারা বিভিন্ন নামে পরিচিত, যেমন- গণক, ভবিষ্যৎ-বক্তা, যাদুকর, ভবিষ্যৎদ্রষ্টা ব্যক্তি, জ্যোতিষী, হস্তরেখা বিশারদ প্রভৃতি। এ সব ভবিষ্যৎ-বক্তারা নানা পদ্ধতি ও মাধ্যম ব্যবহার করে তথ্যাবলী উপস্থাপন করার দাবী করে থাকে সে সব পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে: চায়ের পাতা পড়া, নানা প্রকার রেখা বা নকশা আঁকা, সংখ্যা লেখা, হাতের তালুর রেখা পড়া, রাশিচক্র খুঁটিয়ে দেখা, স্ফটিক বলের প্রতি স্থির দৃষ্টিপাত করা, হাড় দিয়ে খটর খটর বা ঝনঝন করানো, লাঠি ছোঁড়া ইত্যাদি। এখানে ভাগ্য গণনার নানাবিধ কলা-কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হবে। অদৃশ্য প্রকাশে ও ভবিষ্যদ্বাণী করতে সক্ষম হওয়ার দাবীদার জ্যোতিষীদেরকে প্রধানত দু’ভাগে বিভক্ত করা যায়:
১. সে সব জ্যোতিষী প্রথম শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত, প্রকৃতপক্ষে যাদের কোন সত্য জ্ঞান বা গুপ্ত রহস্য জানা নেই; বরং তারা তাদের খরিদ্দারদেরকে তাই বলে যা সাধারণত অধিকাংশ লোকের ক্ষেত্রে সচরাচর ঘটে থাকে। তারা প্রায় সময়ই অর্থহীন কিছু ধর্মীয় কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করার মাধ্যমে পূর্বপরিকল্পিত সাধারণ অনুমান প্রকাশ করে থাকে। কখনো কখনো তাদের কিছু অনুমান অতি সাধারণতার জন্য সত্য হয়ে যায়। অতিসামান্য যে কয়েকটি ভবিষ্যদ্বাণী সত্য বলে আত্মপ্রকাশ লাভ করে, অধিকাংশ মানুষের মধ্যে সেগুলো মনে রাখার প্রবণতা দেখা যায়; কিন্তু যেগুলো আদৌ সত্য বলে প্রকাশিত হয় না, তার বেশিরভাগই মানুষ খুব দ্রুত ভুলে যায়। আসলে প্রকৃত সত্য কথা হচ্ছে, কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যদি পুনরায় মনে না পড়ে, তাহলে কিছু দিন পরে সকল ভবিষ্যদ্বাণীর অর্ধেকই মানুষ অবচেতনভাবে ভুলে যায়। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিটি নতুন বৎসরের শুরুতে আসন্ন বছরে মানুষের জীবনে সংঘটিতব্য ঘটনা সম্পর্কে বিভিন্ন খ্যাতিমান জ্যোতিষীদের নানা রকম ভবিষ্যদ্বাণী প্রকাশ করা উত্তর আমেরিকায় একটা সাধারণ প্রথার রূপ পরিগ্রহ করেছে।’ ১৯৮০ সালে প্রচারিত ও প্রকাশিত বিভিন্ন প্রকার ভবিষ্যদ্বাণীর উপর পরিচালিত এক গবেষণা জরিপে দেখা যায়, সবচেয়ে নির্ভুল ভবিষ্যৎ-বক্তার ভবিষ্যৎদ্বাণীর মাত্র ২৪% সঠিক হয়েছিল!
২. যাদের সঙ্গে জ্বিনের সখ্যতা ও যোগাযোগ এবং বিভিন্ন ধরনের অপজ্ঞান রয়েছে, তারা এ দ্বিতীয় শ্রেণীর দলভুক্ত। এ দলটির গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি, কারণ এরা শিরকের মত বৃহত্তর ও জঘন্যতম গুনাহের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ কাজে জড়িতদের উপস্থাপিত তথ্যাবলী সাধারণত কিছুটা নির্ভুল হয়, যা মুসলিম ও অমুসলিম উভয়ের জন্য বড় ধরনের ফিৎনার কারণ।
জ্বিনদের সাথে যোগাযোগকারী মানুষকে অর্থাৎ জ্বিনদের সাহায্যে যেসব ভবিষ্যৎবক্তারা ভবিষ্যদ্বাণী করেন, তাদেরকে জ্বিনেরা অতিনিকট ভবিষ্যত সম্পর্কে জানাতে সক্ষম। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়- ভবিষ্যৎবক্তার নিকটে কেউ গমন করলে, উপস্থিত ব্যক্তিটি গণকের নিকটে আসার পূর্বে কী কী পরিকল্পনা তৈরি করেছিল তা গণকের জ্বিন আগত ব্যক্তির সাথী জ্বিনের (ক্বারীন)’ নিকট থেকে অবগত হয়। ফলে, আগত ব্যক্তিটি কী কী করবে বা কোথায় কোথায় যাবে তা জানাতে গণক সক্ষম হয়। আর এভাবেই, একজন প্রকৃত গণক বা ভবিষ্যদ্বক্তা আগন্তুক ব্যক্তির অতীত সম্পূর্ণভাবে জানতে পারে। সেই গণক সবিস্তারে বলতে সক্ষম হয়- আগন্তুকের পিতা-মাতার নাম, জন্মস্থান এবং ছোটবেলার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে।
গণক বলতে ভবিষ্যতদ্বক্তা ও জ্যোতিষীদের বুঝানো হয়েছে, গণক বিদ্যা এমন একটা পেশা যা ত’ওহীদের সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং গণক মুশরিক বলে বিবেচিত। কেননা, সে জ্বিনদের ব্যবহার করে থাকে এবং তাদের উপাসনা করে তাদের নৈকট্য লাভ করে এবং জ্বিন তাদেরকে ভবিষ্যত সম্পর্কে অবহিত করে। জ্বিনের উপাসনা ও তার নৈকট্য লাভ ছাড়া এটা আদৌ সম্ভব নয়। জাহিলিয়াতের যুগে মানুষ গণকদের নেতৃত্বে আস্থা রাখত এবং বিশ্বাস করত যে, তারা গায়েব সম্পর্কে যা পৃথিবীতে অথবা মানব সমাজে ঘটবে তার অবগত আছে। যার ফলে আরবরা গণকদের সম্মান করত ও তাদের প্রতি ভীত থাকত।
জ্বিনের সাথে যোগাযোগ রয়েছে এমন একজন সত্যিকারের ভবিষ্যৎবক্তার আলামত হচ্ছে যে, সে বিস্তারিতভাবে অতীতের বর্ণনা দিতে পারবে। কারণ, মুহূর্তের মধ্যেই বিশাল ব্যবধানের দূরত্ব অতিক্রম করা, গোপনীয় বিষয় বা ঘটনা, হারানো দ্রব্য, অদৃষ্ট ঘটনাবলী সম্পর্কে অনেক তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহ করা জ্বিনের সাধারণ একটি বৈশিষ্ট্য।
২. যাদুমন্ত্র ও অলৌকিক ঘটনায় জ্বিন-শয়তানের প্রভাব যাদু ভাষাগত দিক থেকে একটা ব্যাপক শব্দ। শয়তানের সহযোগিতায় ও তার ইবাদত ও নৈকট্য লাভের মাধ্যমে যাদুকর যা কিছু প্রয়োগ করে তার সবই যাদুর পর্যায়ভুক্ত। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান দ্বারা বা অন্য কোন বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বনে অতি- প্রাকৃত মাধ্যম বা শক্তিসমূহের নিকট প্রার্থনা করে অথবা সেগুলোকে আহ্বান করে আপাতদৃষ্টিতে প্রতীয়মান প্রাকৃতিক শক্তির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ঘটনাপ্রবাহকে প্রভাবিত করা অথবা প্রাকৃতিক শক্তির ভবিষ্যদৃষ্টিকে অর্জন করাকেই সাধারণত যাদু বলে অভিহিত করা হয়। তাছাড়া, নির্দিষ্ট কিছু ধর্মীয় আচার, পদ্ধতি ও কর্মের ব্যবহার দ্বারা মানুষ প্রাকৃতিক শক্তিকে বশীভূত করতে পারে- এ ধরনের বিশ্বাসকেও যাদু বলা হয়। চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী পাপাত্মা বা শয়তান অথবা দেবদূতের সহায়তা ব্যতীত অনুষ্ঠিত ‘ঐন্দ্রজালিক বা কুহকময় বা অপ্রাকৃত অনুষ্ঠান’, ‘ভেলকিবাজি’, ‘ভানুমতীর খেল’ বা ‘প্রাকৃতিক যাদু’ নামে পরিচিত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রাকৃতিক বস্তুর অধ্যয়ন পাশ্চাত্য সমাজে বর্তমানে আধুনিক ভৌত বা প্রকৃতি বিজ্ঞান হিসেবে প্রচারিত হয়েছে। ব্যক্তিগত বা বদ বা কুটিল উদ্দেশ্যে অলৌকিক শক্তি তথা পাপাত্মা বা শয়ত্বান বা দেবদূতকে আহ্বান করা বা সহায়তা গ্রহণ করা ও ব্যবহার করার প্রচেষ্টা হচ্ছে ভৌতবিজ্ঞানের সঙ্গে ‘অদৃশ্য যাদু’ বা ‘মায়াবিদ্যা’, ‘ইন্দ্রজাল’, ‘ডাইনিবিদ্য’, ‘ডাকিনীবিদ্যা’-এর পার্থক্যের মূল বিষয়। যাদু এবং এর চর্চাকারী ব্যক্তিদেরকে বুঝাতে সাধারণত ডাইনীবিদ্যা, ডাকিনীবিদ্যা, ভবিষ্যদ্বাণী এবং প্রেতসিদ্ধি নামক পরিভাষাসমূহ ব্যবহৃত হয়। ‘অপদেবতা’, ‘ভূত’, ‘দৈত্য’ বা ‘প্রেত’তাড়িত বা মন্ত্রচালিত নারীর যাদু চর্চাকে ডাইনীবিদ্যা বলা হতো। ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অতিপ্রাকৃতিক (অলৌকিক) দৃষ্টি অর্জনের প্রয়াসকে ভবিষ্যৎ-কথন বলা হয়। অন্যদিকে, প্রেতসিদ্ধি অথবা মৃতব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনও ভবিষৎ-কথনের পদ্ধতিসমূহের একটি।
আরবী (سحر) সিহর শব্দটি যেহেতু যাদুবিদ্যার বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার মধ্যে কোন পার্থক্য সৃষ্টি করে না, সুতরাং মায়াবিদ্যা, কুহক, ইন্দ্রজাল, ডাইনীবিদ্যা, ভবিষ্যৎ-কথন এবং প্রেতসিদ্ধিকে বুঝাতেও ‘সিহর’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়। মূলত, অদৃশ্য ও রহস্যময় শক্তি হতে ঘটা সবকিছুকে আরবীতে সিহর বলে বুঝানো হয়। উদাহরণস্বরূপ একটি হাদীছের কথা বলা যায়। হাদীসটিতে রাসূল বলেন, «إِنَّ مِنْ الْبَيَانِ لَسحُرًا» ‘নিশ্চয় কোন কোন কথা ও আলোচনার মধ্যে যাদু আছে।’ আর এভাবেই, একজন বাগ্মী ও প্রেরণাসঞ্চারকারী বক্তা সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্য বলে উপস্থাপন করতে পারে। সে কারণেই বাগ্মীতার একাংশকে রাসূল ? যাদু বলে অভিহিত করেছেন। শেষরাত্রের অন্ধকার যেহেতু তখনও অবশিষ্ট থাকে’ তাই সাওম পালন করার পূর্বে শেষ রাতের খাবারকে সাহুর’ (মূল সিহর হতে) বলা হয়।
যাদুর বাস্তবতা যাদুর মধ্যে যে বাস্তবতার অস্তিত্ব বিদ্যমান রয়েছে তা অস্বীকার করার প্রবণতা বর্তমানকালের মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মুর্ছারোগের মতো মানসিক বিকারগ্রস্ততা যাদুর প্রভাবে হয় বলে জনপ্রিয় সব গল্পসমূহে ব্যাখ্যা প্রদান করা হয় এবং এ কথাও বলা হয় যে, যারা যাদুতে বিশ্বাস করে তারাই এর দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়। যাদুর দ্বারা সম্পন্ন কর্মকে অক্ষিবিভ্রম ও কিছু কৌশলের সমষ্টি নির্ভর ধোঁকা বৈ কিছু নয় বলে প্রচার করা হয়েছে।
দুর্ভাগ্যকে দূরীভূত করে সৌভাগ্য আনয়নে যাদু ও কবচের প্রভাবকে ইসলাম দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখান করা সত্ত্বেও যাদুর কিছু অংশ ইসলাম বাস্তব বলে স্বীকার করে। তবে এ কথাটিও সত্য যে, আজকালকার যাদুর বেশিরভাগই জটিল কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে তৈরি করা চমকপ্রদ যান্ত্রিক বস্তু যা প্রদর্শন করা হয় কেবল দর্শকদেরকে ধোঁকা দিতে। কিন্তু কিছু লোক রয়েছে যারা ভাগ্য গণনার ক্ষেত্রে শয়তানদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে যাদুবিদ্যার চর্চা অব্যাহত রাখে। জ্বিন এবং জ্বিনদের শক্তি ও ক্ষমতার বিষয়ে আলোচনা করার পূর্বে কুরআন ও বিশুদ্ধ সুন্নাহ্ প্রমাণের আলোকে যাদুর বাস্তবতা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি ও সমর্থন বিষয়ে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। মানুষের নিকটে প্রেরিত আসমানী বিধান কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে সত্য ও মিথ্যার চূড়ান্ত মানদণ্ড নিহিত বিধায় মূল বিধানের প্রতি প্রথম পদক্ষেপেই অগ্রসর হওয়া আবশ্যক।
যাদু সম্পর্কে ইসলামের মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাখ্যা আল্লাহ্ তা’আলা কুরআনের নিম্নের আয়াতে বর্ণনা করেছেন:
﴿وَلَمَّا جَاءَهُمْ رَسُولٌ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ مُصَدِّقُ لِمَا مَعَهُمْ نَبَذَ فَرِيقٌ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ كِتَابَ اللَّهِ وَرَاءَ ظُهُورِهِمْ كَأَنَّهُمْ لَا يَعْلَمُونَ﴾ ﴿(سورة البقرة: ١٠١)﴾ ‘এবং যখন তাদের কাছে আল্লাহ্র পক্ষ হতে রসূল আসল যে এদের নিকট যে কিতাব রয়েছে, সেই কিতাবের সমর্থক, তখন যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল তাদের একদল আল্লাহ্র কিতাবকে পিঠের পিছনে ফেলে দিল, যেন তারা কিছুই জানে না।’ [সূরা আল-বাক্বারা (২): ১০১]
ইয়াহুদীদের প্রতি প্রেরিত নাবীদের সঙ্গে তাদের কপটতার বিষয়টি উল্লেখ করে আল্লাহ্ তা’আলা সেই মিথ্যা সম্পর্কে আমাদের নিকটে বর্ণনা করছেন যা নাবী সুলায়মান (আ:)-এর ব্যাপারে তারা উদ্ভাবন করেছিল: ﴿وَاتَّبَعُوا مَا تَتْلُوا الشَّيَاطِينُ عَلَى مُلْكِ سُلَيْمَانَ وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَانُ وَلَكِنَّ الشَّيَاطِينَ كَفَرُوا يُعَلِّمُونَ النَّاسَ السِّحْرَ وَمَا أُنْزِلَ عَلَى الْمَلَكَيْنِ بِبَابِلَ هَارُوتَ وَمَارُوتَ وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُولا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلا تَكْفُرْ فَيَتَعَلَّمُونَ مِنْهُمَا مَا يُفَرِّقُونَ بِهِ بَيْنَ الْمَرْءِ وَزَوْجِهِ وَمَا هُمْ بِضَارِّينَ بِهِ مِنْ أَحَدٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ وَيَتَعَلَّمُونَ مَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنْفَعُهُمْ وَلَقَدْ عَلِمُوا لَمَنِ اشْتَرَاهُ مَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ خَلَاقٍ وَلَبِئْسَ مَا شَرَوْا بِهِ أَنْفُسَهُمْ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ ﴾ (سورة البقرة: ١٠٢) ‘এবং সুলায়মানের রাজত্বকালে শয়ত্বানরা যা পাঠ করত, তারা তা অনুসরণ করত, মূলত সুলায়মান কুফরী করেনি বরং শয়ত্বানরাই কুফুরী করেছিল, তারা মানুষকে যাদু শিক্ষা দিত এবং যা বাবিলের দু’জন ফিরিশতা হারূত ও মারূতের উপর পৌঁছানো হয়েছিল এবং ফিরিশতাদ্বয় কাউকেও শিখাতো না যে পর্যন্ত না বলত, আমরা পরীক্ষা স্বরূপ, কাজেই তুমি কুফরী কর না, এতদসত্ত্বেও তারা উভয়ের নিকট হতে এমন জিনিস শিক্ষা করতো, যা দ্বারা তারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করতো, মূলত তারা তাদের এ কাজ দ্বারা আল্লাহ্ বিনা হুকুমে কারও ক্ষতি করতে পারত না, বস্তুত এরা এমন বিদ্যা শিখত, যা দ্বারা তাদের ক্ষতি সাধিত হতো আর এদের কোন উপকার হতো না এবং অবশ্যই তারা জানত যে, যে ব্যক্তি ঐ কাজ অবলম্বন করবে পরকালে তার কোনই অংশ থাকবে না, আর যার পরিবর্তে তারা স্বীয় আত্মাগুলোকে বিক্রয় করেছে, তা কতই না জঘন্য, যদি তারা জানত!’ [সূরা আল-বাক্বারা (২): ১০২]
‘কাবালা’ নামক একটি দুর্বোধ্য আধ্যাত্মিক পদ্ধতির মাধ্যমে চর্চা করা যাদুর সত্যতা প্রমাণের নিমিত্তে ইয়াহুদীরা তাদের যাদুচর্চার পন্থাটি নাবী সুলায়মান (আঃ)-এর নিকট থেকে দীক্ষা লাভ করেছিল বলে দাবী করত। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ যে বর্ণনা দিয়েছেন তার ‘মর্মার্থ’ বা ‘ব্যাখ্যা’ বা ‘সারাংশ’ হচ্ছে, আল্লাহর কিতাবকে পিছনে ফেলে দিয়ে এবং শেষ নাবীকে অস্বীকার করে ইয়াহুদীরা শয়ত্বানের শেখানো যাদুমন্ত্রের পদ্ধতিসমূহ আয়ত্ব করে। এ শয়ত্বানেরা কুফরী কর্ম করেছে যাদু শিখিয়ে। তারা জ্যোতিষশাস্ত্র নামক মায়াবিদ্যার এক কৌশলও শিখিয়েছে। ব্যাবিলনের জনগণের নিকটে পরীক্ষাস্বরূপ প্রেরিত হারূত ও মারূত নামক দুই ফিরিশতা তাদেরকে এ বিদ্যা শিক্ষাদান করেছিল। মায়াবিদ্যার কোন তত্ত্ব শিক্ষা দেবার পূর্বেই ফেশেতারা জনগণকে এ বিদ্যা শিখে কুফরী কর্ম সম্পন্ন না করতে সতর্ক করত, কিন্তু ফিরিশতাদের সতর্কবাণীর প্রতি তারা কোনই কর্ণপাত করেনি। মানুষের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি ও বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটানোর ব্যাপারে ফিরিশতাদের নিকট থেকে তত্ত্বাবলীর জ্ঞান এমন স্তর পর্যন্ত অর্জিত হয়েছিল যে, তারা মনে করত তাদের ইচ্ছামতো যাকে ইচ্ছা তাকে ক্ষতি করতে পারবে। কিন্তু আল্লাহ্ই একমাত্র সত্তা যিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন কে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আর কে হবে না। তবে অর্জিত এ জ্ঞান প্রকৃতপক্ষে তাদের কোনই কাজে আসেনি বরং তারা শুধু নিজেদের ক্ষতি বৃদ্ধি করেছিল। সত্যিকারের যাদুবিদ্যার চর্চা যেহেতু কুফরী তাই এ কর্ম সম্পাদনের ফলস্বরূপ জাহান্নামে তাদের অবস্থানকে নিশ্চিত করেছে।
যারা উক্ত কৌশলসমূহ আয়ত্ব করেছিল তারা এটা ভালভাবেই জানত যে, তারা অভিশপ্ত (লা’নত প্রাপ্ত)। কারণ, তাদের ধর্মগ্রন্থের বিধান অনুসারেও যাদুচর্চা নিষিদ্ধ ছিল। নিম্নের নিয়মগুলি এখনো তাওরাতে পাওয়া যায়: ‘তোমাদের মাবুদ আল্লাহ্ তোমাদের যে দেশ দিতে যাচ্ছেন সেখানে গিয়ে সেখানকার জাতিগুলো যেসব জঘন্য কাজ করে তোমরা তা করতে শিখবে না। তোমাদের মধ্যে যেন এমন কোন লোক না থাকে যে তার নিজের সন্তানকে আগুনে পুড়িয়ে কোরবানী করে, যে গোণাপড়া করে কিংবা মায়াবিদ্যা খাটায় কিংবা আলামত দেখে ভবিষ্যতের কথা বলে, যে যাদু করে, যে তন্ত্রমন্ত্র খাটায়, যে ভূতের মাধ্যম হয়, যে ভূতের সংগে সম্বন্ধ রাখে এবং যে মৃত লোকের সংগে যোগাযোগ রাখে। এই সব কাজ যে করে মাবুদ তাকে জঘন্য মনে করেন। এই সব জঘন্য কাজের জন্যই তোমাদের মাবুদ আল্লাহ্ ঐ সব জাতিকে তোমাদের সামনে থেকে তাড়িয়ে দেবেন।’
কিন্তু এ সব নির্দেশ অবতীর্ণ হওয়ার স্থানে তারা স্বশরীরে উপস্থিত ছিল না বলে ভান করে এ বিধানাবলীর প্রতি কর্ণপাতই করে না। তাওরাতে এটাও লেখা ছিল যে, কোন ব্যক্তি যাদু বা মায়াবিদ্যার কৌশলের আংশিক চর্চা করলেই সে জান্নাতের যে-কোন পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হবে এবং তাকে চিরদিন আগুনে থাকতে হবে। কিন্তু ইয়াহুদীরা উপরোক্ত বাক্যগুলো মূল তাওরাত থেকে বাদ দিয়ে যাদুমন্ত্রের বিভিন্ন কৌশল চর্চায় লিপ্ত রয়েছে।
তাদের এ শোচনীয় অবস্থার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপের জন্য আল্লাহ্ তা’আলা উক্ত পংক্তিগুলোর ইতি টানেন করুণাপ্রকাশক বাক্যাংশের মাধ্যমে। মৃত্যুপরবর্তী জীবনে শাস্তির ভয়াবহতা সম্পর্কে ইয়াহুদীদের কোন জ্ঞান থাকলে তারা ক্ষণস্থায়ী এ জীবনে কয়েকটি সস্তা কৌশল আয়ত্বের জন্য তাদের মহা মূল্যবান আত্মার ভবিষ্যত ধ্বংস করে দেয়ার ভয়ংকর পরিণাম উপলব্ধি করতে পারত।
আয়াতগুলোর এ বাকাংশ দ্বারাও যাদু নিষিদ্ধ (হারাম) হওয়ার বিধান সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়:
﴿... وَلَقَدْ عَلِمُوا لَمَنِ اشْتَرَاهُ مَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ خَلَاقٍ ... (سورة البقرة: ۱۰۲) ‘... যে ব্যক্তি ঐ কাজ অবলম্বন করবে পরকালে তার কোনই অংশ থাকবে না ...।’ (সূরা আল-বাক্বারা (২): ১০২]
একমাত্র কঠোরভাবে নিষিদ্ধ কর্মের শাস্তি হতে পারে জাহান্নামে চিরস্থায়ী বসবাস। উপরোক্ত আয়াত দ্বারা আবার এটাও প্রমাণিত হয় যে, যাদুকরই নয় বরং এদের পাশাপাশি যারা যাদুবিদ্যা অর্জনকারী ছাত্র ও যাদুবিদ্যা শিক্ষাদানকারী শিক্ষক উভয়ই কাফির। ‘যে ব্যক্তি ঐ কাজ অবলম্বন করবে’- এ বাক্যাংশটির সুগভীর তাৎপর্য রয়েছে। যাদু শিক্ষা দিয়ে যে অর্থ উপার্জন করে, যাদুবিদ্যা অর্জনের নিমিত্তে যে অর্থ ব্যয় করে অথবা যাদু সম্পর্কে যে জ্ঞানের অধিকারী- এরা সবাই এ বিধানের অধীন। তাছাড়া নিম্নবর্ণিত আয়াতে আল্লাহ্ তা’আলা যাদুকে কুফর বলে অভিহিত করে বলেন: ‘নিশ্চয়ই আমরা পরীক্ষা স্বরূপ, কাজেই তুমি কুফরী কর না।’ এবং ‘মূলত সুলায়মান কুফরী করেনি বরং শয়ত্বানরাই কুফুরী করেছিল।’ [সূরা আল-বাক্বারা (২): ১০২]
কিছু যাদুর যে বাস্তবতা রয়েছে তা পূর্বে বর্ণিত আয়াতটি থেকে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়। অধিকন্তু, রাসূল নিজেই যাদুর প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে কষ্ট ভোগ করেছিলেন- এ বিষয়টি বুখারী, মুসলিমসহ অন্যান্য হাদীসগ্রন্থে উল্লেখিত হাদীস দ্বারা জানা যায়:
"যায়িদ ইবনু আরকাম বর্ণনা করেন, লাবীব ইবনু আ’সাম নামে জনৈক ইয়াহুদী রাসূল-এর উপর যাদু করেছিল এবং তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাসূলের নিকটে মু’আওয়াযাতান (সূরা আল-ফালাক্ব এবং নাস) নিয়ে জিবরীল (জিবরাঈল) (আ:) আগমন করে সংবাদ দিলেন যে, জনৈক ইয়াহুদী যাদু করেছে এবং যে জিনিসে যাদু করা হয়েছে, তা অমুক কূপের মধ্যে আছে। তারপর সেই জিনিস কূপ থেকে উদ্ধার করে আনতে ‘আলী ইবনু আবি তালিবকে রাসূল পাঠালেন। ‘আলী তা নিয়ে ফিরে এলেন। তাতে কয়েকটি গ্রন্থি ছিল। রাসূল এক এক করে গ্রন্থি খুলতে এবং প্রতিটির সঙ্গে সূরা দু’টি থেকে একটি করে আয়াত পড়তে বললেন। তিনি গ্রন্থিগুলো খুলে দেয়ার সাথে সাথে রাসূল সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে শয্যা ত্যাগ করেন।’
আবু হুরাইরা থেকে নাসাঈতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, ‘যে ব্যক্তি গিরা লাগায় অতঃপর তাতে ফুঁক দেয় সে মূলত যাদু করে। আর যে ব্যক্তি যাদু করে সে মূলত শিক করে। আর যে ব্যক্তি কোন জিনিস (তাবীজ কবজ) লটকায় তাকে ঐ জিনিসের দিকেই সোপর্দ করা হয়। যে ব্যক্তি গিরা লাগায় অতপর তাতে ফুঁক দেয়, সে মূলত যাদু করে। ফুঁক দেওয়ার ব্যাখ্যা হচ্ছে, সে এমন কিছু পড়ে ফুঁক দেয়, যা দ্বারা সে শয়তানকে ব্যবহার করে ও কথাগুলো প্রয়োগের সময় সে জ্বিন উপস্থিত করে এবং সেই জ্বিন ফুঁকের মাধ্যমে উক্ত গিরাতে কাজ করে। যাদুকরের নিকট গিরা লাগানোর উপকার হচ্ছে, যতক্ষণ গিরা বলবৎ থাকবে ততক্ষণ যাদুও ক্রিয়াশীল থাকবে। গিরা কখনও স্পষ্ট পরিলক্ষিত হয় আবার কখনও অতি ছোট ছোট ও সূক্ষ্ণ হয়। প্রকৃতপক্ষে যাদুর বাস্তবতা হচ্ছে যাদুকে কার্যকর এবং ক্রিয়াশীল করতে হলে শয়তানকে ব্যবহার এবং তার নৈকট্য লাভ করতেই হয়। আর শুধুমাত্র তার নৈকট্য লাভের মাধ্যমেই জ্বিন-শয়তান যাদুকৃত ব্যক্তির শরীরে যাদুর ক্রিয়া শুরু করে। শয়তানের নৈকট্য লাভ ছাড়া কোন যাদুকরের পক্ষেই যাদুকর হওয়া সম্ভব নয়। যে যাদু করল সে শির্ক করল। যাদু মূলত শিকে আকবার তথা বড় শিক্ক-এর অন্যতম এবং তা তাওহীদের মূলনীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। সুতরাং যুক্তিসঙ্গত কারণেই আমরা বলব যে, যাদু শিক্ক-এর পর্যায়ভুক্ত। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, ‘(বলুন যে আমি পরিত্রাণ কামনা করছি) গিরা তথা বন্ধনে অধিক ফুঁ দান কারিনীদের অনিষ্ট হতে।’ নফাথাত শব্দটি نفاثة-এর বহুবচন এবং نفت/ نفاثة থেকে মুবালাগা তথা অতিমাত্রায় ফুঁ দান করার অর্থ বহন করে এবং তা দ্বারা নিঃসন্দেহে যাদুকারিনী বুঝানো হয়েছে এবং সরাসরি যাদুকারিনী না বলে অতিমাত্রায় ফুঁ দানকারিনী বলা হয়েছে। কেননা তারা অতি মাত্রায় ফুঁ দান করত এবং ঝাড় ফুঁক ও বিভিন্ন রকমের তন্ত্র-মন্ত্র দ্বারা ফুঁ দিত এবং সে ফুঁ এর মাধ্যমে জ্বিন সেই গিরা বন্ধনে কাজ করত যাতে যাদুকৃত ব্যক্তির শরীরের কিছু একটা থাকত অথবা এমন কিছু থাকত যার সাথে যাদুকৃত ব্যক্তির সম্পর্ক রয়েছে। এভাবে যাদু ক্রিয়াশীল হয়ে যায়।
এ পৃথিবীতে বসবাসরত প্রতিটি জাতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ রয়েছে, যারা কোন না কোন প্রকারের যাদু চর্চা করেছে- এ সম্পর্কে প্রমাণাদি পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির নিকটে সংগৃহীত রয়েছে। এ সব সাক্ষপ্রমাণের কতিপয় মিথ্যা হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে, কিন্তু এটা কোনক্রমেই সম্ভব নয় যে, যাদু এবং অতিপ্রাকৃতিক ঘটনাবলী সংক্রান্ত গল্প তৈরিতে পুরো মানবজাতি একত্রে সম্মত হয়েছে। অতিপ্রাকৃতিক ঘটনাবলীর দৃষ্টান্তসমূহের সাক্ষ্যপ্রমাণ নিয়ে সুগভীর চিন্তায় মগ্ন হলে অবশ্যই এগুলোর মধ্যে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত কিছু বাস্তবতার যোগসূত্রের সন্ধান মিলবে। জ্বিনের জগৎ সম্পর্কে পরিচিত নয় এমন লোকদের কাছে ‘ভূতুড়ে বাড়ি’, ‘প্রেত নামানোর আসর’, ‘ওঝার কাষ্ঠফলক’, ওয়েস্ট ইন্ডিজে বিশেষত হাইতিতে প্রচলিত ডাকিনীতন্ত্র’, ভূতে বা জ্বিনে পাওয়া বা ভূতাবিষ্ট, কেবল জিহ্বা দিয়ে কথা বলা, দেহকে শূন্যে ভাসমান রাখা ইত্যাদি বিষয়গুলো বিভ্রান্তিকর বলে মনে হতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় এ ঘটনাগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অভিপ্রকাশ রয়েছে। এমনকি মুসলিম বিশ্ব বিশেষত বিভিন্ন চরমপন্থী সুফীতন্ত্রের (মরমীবাদের) গুরুজন তথা সুফীবাদীরা এর অস্বাভাবিক প্রভাবে বিপদগ্রস্ত। তাদের অনেকেই দেহকে শূন্যে ভাসাতে, মুহূর্তের মধ্যেই বিশাল দূরত্বের পথ অতিক্রম করতে, কোন উৎস ব্যতিরেকে খাদ্য ও টাকা-পয়সা তৈরি করতে সক্ষম বলে মনে হয়। আর তাদের অজ্ঞ অনুসারী ও অন্ধ ভক্তরা এ সব যাদুর প্রহেলিকাকে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে অলৌকিক ঘটনা বা কারামত বলে বিশ্বাস করে। ফলে তথাকথিত এ সব ওলী-আওলিয়া, মুরশিদ, পীর-মাশাইখ, দরবেশদের উদ্দেশ্যে ভক্তরা তাদের সম্পদ ও জীবন অকাতরে বিলিয়ে দিতে দ্বিধাবোধ করে না। আশ্চর্য হওয়ার মতো এ ধরনের অনেক ঘটনার মূলে জ্বিন জগতের হস্তক্ষেপ থাকে, অথবা জ্বিনের গোপন ও দুষ্ট জগৎ লুকিয়ে রয়েছে।
জ্বিনের ক্ষমতা সম্পর্কে এ বইয়ে বর্ণিত মৌলিক বিষয়সমূহ স্মরণ রাখলে সকল প্রকার অতিপ্রাকৃতিক তথা অলৌকিক ও যাদুসংক্রান্ত ঘটনাগুলো যে ধোঁকা বা ভেলকিবাজি নয় তা খুব সহজেই ব্যাখ্যা করা যায়। যেমন, হঠাৎ হঠাৎ আলো জ্বলে উঠে ও নিভে যায়, দেয়াল থেকে ছবি পড়ে যায়, জিনিসপত্র বাতাসে উড়ে বেড়ায়, মেঝে ফেটে যায় ইত্যাদি ঘটনাগুলো সাধারণত একটি ভূতুড়ে বাড়ির ক্ষেত্রে ঘটে থাকে। অদৃশ্য অবস্থায় জ্বিনেরা জড় বা ভৌত উপাদান বা বস্তুর উপর সক্রিয় হয়ে উক্ত ঘটনাগুলোসহ আরও অন্যান্য অভূতপূর্ব ঘটনা সংঘটিত হতে সহায়তা করে। আধ্যাত্ম বৈঠকের বেলায়ও এ বিষয়টি উপরের ঘটনার অনুরূপ বলেই প্রতীয়মান হয়। আধ্যাত্ম বৈঠকে মৃতরা জীবিতদের সাথে যোগাযোগ করে ব’লে বাহ্যিকদৃষ্টিতে মনে হয়। মৃত আত্মীয়-স্বজনদের কণ্ঠস্বর যাদের নিকটে পরিচিত তারা মৃতদের জীবনে সংঘটিত নানা প্রকার ঘটনা সম্পর্কে তথাকথিত মৃত ব্যক্তির মুখ থেকে অনুরূপ কণ্ঠেই শুনতে পায়। মৃতব্যক্তিটির জীবিতাবস্থায় তার জন্য যে জ্বিনটি নিয়োজিত ছিল সর্বক্ষণ, সেই জ্বিনটিকে আহ্বান করে তাকে মাধ্যম করে এ কৃতিত্ব সুচারুরূপে সম্পাদন করা হয়। এ জ্বিনটিই মৃতের কণ্ঠস্বরকে হুবহু নকল করে মৃতব্যক্তির জীবনে সংঘটিত ঘটনাসমূহের সবিস্তার বর্ণনা পেশ করে। ওঝার কাষ্টফলককেও অনুরূপ উত্তর প্রদান করতে দেখা যায়। যথাযথ পরিবেশের ব্যবস্থা করলে জ্বিনের অদৃশ্য হস্তক্ষেপে বিস্ময়কর ফলাফল প্রকাশ পেতে পারে। যারা শূন্যে ভেসে বেড়াতে অথবা কোন জিনিসকে স্পর্শ না করেই উপরে উঠাতে বা নিচে নামাতে সক্ষম বলে মনে হয়- এগুলোতেও জ্বিনের অদৃশ্য হাত রয়েছে। কেউ কেউ মুহূর্তের মধ্যে বিশাল ব্যবধানের দূরত্ব অতিক্রম করতে অথবা একই সময়ে দু’টি স্থানে উপস্থিত থাকতে সক্ষম হয়- এটাও আদতে তাদের অদৃশ্য সঙ্গী কর্তৃক স্থানান্তরিত হয়।’ অনুরূপভাবে, যারা শূন্য থেকে খাদ্যদ্রব্য বা টাকা-পয়সা উপস্থিত করতে পারে তারাও অদৃশ্য ও দ্রুতগতির জ্বিনের সহায়তা নিয়ে এ সব কৃতিত্ব সম্পন্ন করে থাকে। এমনকি পুনর্জন্মগ্রহণের মত বিস্ময়কর ঘটনার প্রকাশেও জ্বিনদের হস্তক্ষেপ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সাত বৎসর বয়স্ক শান্তি দেবী নামে এক বালিকা তার পূর্ববর্তী জীবনে সংঘটিত ঘটনাবলীর সুস্পষ্ট ও নিখুঁত বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছিল।’ বালিকাটি তখন যেখানে বাস করত সে স্থান থেকে বহুদূরের অন্য একটি প্রদেশের মুতরা নামক একটি শহরে অবস্থিত তার বাড়ির পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়েছিল (যেখানে সে তার পূর্ববর্তী জীবনে বসবাস করত)। লোকজন বিষয়টির সত্যতা যাচাই করতে সেখানে গমন করলে, বালিকাটির বর্ণনানুপাতে একটি বাড়ি সে স্থানে এক সময় ছিল বলে সেখানকার স্থানীয় লোকেরা স্বীকার করেছিল। তাছাড়া তারা সেই বালিকার পূর্ববর্তী জীবনের কিছু ঘটনার সত্যতাও নিশ্চিত করেছিল। নিশ্চয়ই এ সকল তথ্যাবলী জ্বিনেরা বালিকাটির অবচেতন মনে প্রথিত করে দিয়েছিল। রাসূল এ বিষয়টিকে সমর্থন করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই মানুষ ঘুমন্তাবস্থায় যে স্বপ্ন দেখে তা তিন প্রকার: আর- রাহমান-এর (আল্লাহর) পক্ষ হতে, খারাপ স্বপ্ন শয়ত্বান হতে এবং অবচেতন স্বপ্ন।’
এতে কোনই সন্দেহ নেই যে, জ্বিন মানুষের দেহের পাশাপাশি মনের মধ্যেও প্রবেশ করার ক্ষমতা রাখে। জ্বিনের আছর বা জ্বিনে পাওয়া মানুষের ঘটনা অসংখ্য এবং প্রায়ই ঘটতে দেখা যায়। এ ঘটনা ক্ষণস্থায়ীও হতে পারে, এ ব্যাপারে উদাহরণ হিসেবে বহু খ্রিস্টান ও পৈাত্তলিকদের কথা বলা যায়, শারীরিক ও মানসিক বৈকল্যতার দরুন এরা অবচেতন হয়ে বিদেশী ভাষায় কথা বলতে শুরু করে। এমন দুর্বলতর অবস্থায় জ্বিন সহজেই তাদের শরীরে প্রবেশ করে প্রলাপ বকাতে পারে। তথাকথিত মুসলিম সুফীদের’ জিকিরের বৈঠকের সময়েও এ ধরনের ঘটনা ঘটার অনেক নজীর রয়েছে। আবার জ্বিনের এ আছর দীর্ঘস্থায়ীও হতে পারে। ফলে মানুষের ব্যক্তিগত অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়। জ্বিনে বা ভূতে পাওয়া অথবা ভূতগ্রস্ত ব্যক্তি কাণ্ডজ্ঞানহীন ব্যবহার করে অলৌকিক শক্তির প্রকাশ ঘটায় অথবা তাদেরকে মাধ্যম করে অনেক সময় নিয়মিতভাবে কথাবার্তা বলতে পারে।
মধ্যযুগে ভূত-প্রেত’ বিতাড়ন রেওয়াজের ব্যাপক প্রচলন ঘটে। ভূত-প্রেত বিতাড়ন সংক্রান্ত খ্রিস্টানদের এ প্রথার উৎপত্তি মূলত বাইবেলে। মন্ত্র দ্বারা যিশু ভূত- প্রেত দূর করেছেন- এ সংক্রান্ত অনেক বর্ণনা বাইবেলে দেখতে পাওয়া যায়। একটি বর্ণনা এ রকম যে, ‘যিশু ও তাঁর সহচরগণ গেরাসেনীদের এলাকায় গিয়ে ভূতে পাওয়া একজন লোকের সাক্ষাত পান। সেই ভূতগুলোকে তার মধ্য থেকে বের হয়ে যেতে আদেশ করলে তারা লোকটিকে ত্যাগ করল এবং নিকটবর্তী পাহাড়ের ঢালে চরে বেড়ানো শূকর পালের ভিতরে ঢুকে পড়ল। তাতে সেই শূকরের পাল পাহাড়ের ঢালু পার দিয়ে জোরে দৌড়ে গিয়ে পানিতে ডুবে মরল।” সত্তর ও আশির দশকের শেষের দিকে মুক্তি পাওয়া ‘The Exorcist’, ‘Rosemary’s Baby’ ইত্যাদি চলচ্চিত্রে এ ভূত-প্রেত বিতাড়ন সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড আলোচ্য বিষয় হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। অতিপ্রাকৃত তথা অলৌকিক যেকোন বিষয়কে প্রত্যাখ্যান করা যেহেতু বস্তুবাদী পশ্চিমাদের সাধারণ প্রবণতা, তাই ভূত-প্রেত বিতাড়নের কোন যৌক্তিক ভিত্তি পশ্চিমাদের নিকটে নেই এবং এটিকে তারা কুসংস্কার বলে গণ্য করে থাকে। এর প্রতিক্রিয়াস্বরূপ অন্ধকার ও মধ্যযুগে ব্যাপকভাবে ডাইনি খুঁজে বের করে আগুনে পোড়ানোর ঘটনা অহরহ ঘটতে দেখা গেছে। তথাপি, জ্বিনে পাওয়া বা ভূতগ্রস্ত বা ভূতাবিষ্ট ব্যক্তি থেকে জ্বিন বা ভূত বা প্রেতকে বিতাড়ন করতে এবং জ্বিনে পাওয়া বা ভূতগ্রস্ত বা ভূতাবিষ্ট ব্যক্তি থেকে উদ্ভূত রোগের চিকিৎসায় কুরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক বৈধ পদ্ধতি প্রয়োগ জায়েয।
পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষতার প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে বর্তমানে অনেক মুসলিম জ্বিনে পাওয়া বা ভূতাবিষ্ট হওয়াকে অস্বীকার করে। এমনকি অনেক মুসলিম এমনও রয়েছে যারা জ্বিনের অস্তিত্বকেও স্বীকার করে না। অথচ, কুরআন ও সুন্নাহতে এ ব্যাপারে হ্যাঁ-বাচক বর্ণনা ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। অনেক সহীহ হাদীস রয়েছে যা দ্বারা প্রমাণিত হয়, রাসূল লোকদেরকে জ্বিনের আছর থেকে মুক্ত করেছেন। তাছাড়া এমন হাদীছের সংখ্যাও কম নয় যেখানে আমরা দেখতে পাই, রাসূল-এর সাহাবীরাও তাঁর অনুমতি সাপেক্ষে লোকজনকে জ্বিনের আছর থেকে মুক্ত করেছেন।
টিকাঃ
১. মৃতের সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদানের জন্য বৈঠক বা প্রেততাত্ত্বিক গবেষণার সভা।
২. প্রেতচক্রের অধিবেশনে ব্যবহৃত অক্ষর ও অন্যান্য চিহ্ন সংবলিত কাঠফলক। এর প্রয়োগ বা বিশ্বাস বা এতে সিদ্ধ ব্যক্তি।
৩. তবে উপরে বর্ণিত সকল ঘটনার মূলে যে জ্বিন জগতের হাত রয়েছে এ কথা নিশ্চিতরূপে বলা যায় না। কেননা, আওলিয়াদের কারামত যেটাকে আমরা স্বীকার করি, সেখানেও তো মাঝে-মধ্যে এ ধরণের কোন ঘটনা ঘটে থাকে এবং ঘটতে পারে, তবে এ ক্ষেত্রে আমরা সে-সব ঘটনার পিছনেও জ্বিনের জগত সক্রিয় রয়েছে বলে ঘোষণা দিতে পারি না। এ ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে যে, অতি প্রাকৃত বা অস্বাভাবিক কোন ঘটনা ঘটতে পারে, তবে এ ক্ষেত্রে শুধু ঘটনার ধরন নয়, বরং আমাদেরকে দেখতে হবে যে ঘটনা কার মাধ্যমে ঘটেছে এবং কিভাবে বা কি পদ্ধতিতে ঘটেছে।
৪. এ সংক্রান্ত অসংখ্য ঘটনা সম্পর্কে জানতে Ibn Taymeeyah’s Essay on the Jinn-এর ৪৭-৫৯ পৃ. দেখুন।
৫. Colin Wilson, The Occult, (New York: Random House, 1971) 514-515 পৃ.
৬. আবু হুরায়রা কর্তৃক বর্ণিত। আবু দাউদ, সুনান আবি দাউদ, ৩য় খণ্ড, ১৩৯৫ পৃ., হাদীস নং ৫০০১; সিলসিলাহ আল-আহাদীস আছ-ছাহীহাহ, ৪র্থ খণ্ড, ৪৮৭ পৃ., হাদীস নং ১৮৭০।
৭. মুসলিমদের মধ্য থেকে উৎসরিত আধ্যাত্মবাদ।
৮. অনবরত আল্লাহর নাম বলা এবং অনেক সময় গান-বাদ্যের তালে তালে শরীর ঝাঁকিয়ে এমনকি নৃত্যের তালে তালে।
৯. ইছলামী পরিভাষায় ভূতপ্রেত ইত্যাদি কোন শব্দ নেই। কারণ, কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা এ কথা প্রমাণিত যে, জ্বীনদের মধ্যে কিছু সংখ্যক রয়েছে বিশ্বাসী তথা মু’মিন এবং কিছু সংখ্যক হচ্ছে অবিশ্বাসী বা কাফির, তন্মধ্যে অবিশ্বাসীদেরকে বিভিন্ন নামে নামকরণ করা হয়। তন্মধ্যে একটি নাম হচ্ছে ভূত বা প্রেত যা আমাদের সামাজিক পরিভাষায় প্রচলিত একটি নাম বা শব্দ।
১০. মথি ৮:২৮-৩৪, মার্ক ৫:১-২০ এবং লুক ৮: ২৬-৩৯।
📄 যত আছে গণক-জ্যোতিষ ও সাধু, করে তারা চর্চা জ্যোতিশাস্ত্র ও যাদু
নক্ষত্র ও গ্রহসংক্রান্ত গণনা অর্থাৎ জ্যোতিষশাস্ত্রের চর্চাকে পূর্ববর্তী মুসলিম পণ্ডিতেরা সামগ্রিকভাবে ‘তানযীম’ বলে অভিহিত করেন। এ বিষয়টির উপর ইসলামী বিধানকে বিশেষভাবে কার্যকর করতে তারা তানযীমকে তিনটি ভাগে শ্রেণীবিন্যাস করেছেন।
১. প্রথম শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত জ্যোতিষীরা এ বিশ্বাস পোষণ করে যে, সমগ্র বিশ্ব যেহেতু জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর প্রভাবে প্রভাবিত, তাই ভবিষ্যতে ঘটবে এমন সব ঘটনাসমূহ সংঘটিত হওয়ার পূর্বে জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে প্রকাশ করা সম্ভব।’ যতদূর জানা যায়, জ্যোতিষশাস্ত্র নামে পরিচিত এ চর্চার উদ্ভব হয় খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দে মেসোপটেমিয়ায়। গ্রীক সভ্যতার সময়কালে তা পূর্ণতা লাভ করে। ষষ্ঠ শতাব্দিতে মেসোপটেমিয়ার জ্যোতিষীদের উদ্ভাবিত পুরাতন পদ্ধতিগুলো ভারতে ও চীনে পৌছাতে সক্ষম হয়। তবে কেবল নক্ষত্রের মাধ্যমে ভবিষ্যত গণনার পদ্ধতির চর্চা চীনে ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। মেসোপটেমিয়াতে জ্যোতিষশাস্ত্রের মর্যাদা অনেক উঁচুস্তরে ছিল এবং ক্রমান্বয়ে তা রাজকীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এ প্রতিষ্ঠানের জ্যোতিষীরা আকাশে দৃশ্যমান নানা প্রতীকের বিশ্লেষণ করে রাজা ও রাজ্যের কল্যাণ-অকল্যাণ সংক্রান্ত শুভাশুভ সংকেতের ঘোষণা প্রদান করত। ‘জ্যোতিষ্কমণ্ডলী হল ক্ষমতাবান দেবতা’ - এ বিশ্বাস মেসোপটেমিয়ার মূল বিশ্বাস ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দিতে নক্ষত্ররূপী দেবতারা গ্রীসে পরিচিতি লাভ করলে এগুলো গ্রীসের গ্রহসংক্রান্ত গণনার উৎসে পরিণত হয়। ভবিষ্যত নির্ধারণের বিজ্ঞান হিসেবে জ্যোতিষশাস্ত্র শুধু গ্রীসের রাজকীয় প্রতিষ্ঠানের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ না থেকে তা ধন-সম্পদশালীদের নাগালেও চলে যায়।
ধর্ম, দর্শন এবং সমসাময়িক সমগ্র ইউরোপের পৌত্তলিকতার বিজ্ঞানের উপরে জ্যোতিষশাস্ত্র দুই সহস্রাধিক বর্ষব্যাপী প্রভাব বিস্তার করেছে। ইউরোপের ‘Dante’ এবং সেইন্ট ‘Thomas Aquinant’ উভয়ে পৃথকভাবে তাদের নিজস্ব দর্শনে জ্যোতিষশাস্ত্রের ‘কার্যকারণ’ মতবাদের প্রয়োগ করেন খ্রিষ্ট্রীয় ১৩ শতাব্দিতে। ইব্রাহিম (আব্রাহাম) (আ:)-এর উম্মাত সাবীয়রাও জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাস করত। এরা সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্রকে পূজা করত। তাছাড়া, এই সাবীয়রা গ্রহ-নক্ষত্র তথা জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর প্রতীক ছবি ও মূর্তি তৈরি করে বিশেষ বিশেষ জায়গায় সেগুলোকে স্থাপন করত। তারা বিশ্বাস করত যে, এগুলো জগৎ নিয়ন্ত্রণ করে, বিপদাপদ দূরীভূত করে, দু’আ কবুল করে, প্রয়োজন পূরণ করে। তারা আরো বিশ্বাস করত যে, এ সমস্ত গ্রহ-নক্ষত্র আল্লাহ্ ও সৃষ্টি জগতের মাঝে মধ্যস্থতাকারী এবং তাদেরকে দেওয়া হয়েছে পৃথিবী পরিচালনার দায়-দায়িত্ব। তারা এটাও বিশ্বাস করত যে, জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর আত্মা নেমে এসে এ সব মূর্তির মধ্যে অবস্থান করে তাদের সাথে যোগাযোগ করে মানুষের চাহিদা পূরণ করে। এ সব বিশ্বাসের ফলক্রমে তারা সে সব গ্রহ-নক্ষত্র, ফিরিশতা প্রভৃতির মূর্তির নিকটে গমন করে প্রার্থনা করত।’ তাওহীদ আর-রুবুবিয়্যাহ-কে সমূলে ধ্বংস করার কারণে এ সকল জ্যোতিষশাস্ত্রের চর্চাকে শিক হিসেবে গণ্য করা হয়। কেননা চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র ইত্যাদিকে সিজদাহ করা কিংবা ছবি, মূর্তি ও প্রতিমা ইত্যাদির নিকট প্রার্থনা করা তাওহীদ আর-রুবুবিয়্যাহ-তে শিরকের অন্তর্ভুক্ত। পক্ষান্তরে, যদি কেউ নক্ষত্রকে মঙ্গল-অমঙ্গল, শুভ-অশুভ ইত্যাদির পূর্বাভাষ বা প্রতীক ও আলামত হিসেবে বিশ্বাস করে, তাহলে তা হবে আল-আসমা ওয়াস সিফাত-তে শিকের অন্তর্ভুক্ত। মূলত, এ শাস্ত্রের চর্চাকারীরা একইসাথে শিরক ও কুফর চর্চায় লিপ্ত। কারণ, এ সব জ্যোতিষীরা সাধারণত ভবিষ্যতে ঘটবে এমন কিছু সম্পর্কে জানাতে সক্ষম বলে দাবী করে থাকে। কিন্তু ভবিষ্যতের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ্ই রাখেন। তারা নিজেদেরকে আল্লাহ্র কিছু গুণাবলীতে গুণান্বিত বলে মিথ্যা দাবী করে এবং যে ভাল-মন্দ ভাগ্য আল্লাহ্ তা’আলা সুনির্দিষ্ট করে রেখেছেন তা পরিবর্তন করার মিথ্যা আশ্বাস প্রদান করে। জ্যোতিষশাস্ত্র চর্চা হারাম বলে প্রমাণিত হয়েছে ইবনু ‘আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর বর্ণিত হাদীছের ভিত্তিতে। উক্ত হাদীছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘জ্যোতিষশাস্ত্রের কোন বিষয়ের জ্ঞান অর্জন করার অর্থ হচ্ছে যাদুবিদ্যার জ্ঞান লাভ করা। সুতরাং এভাবে কেউ যত জ্ঞান অর্জন করল, ততই তার গুনাহের পরিমাণ বাড়তে থাকল।’২
২. দ্বিতীয় শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত জ্যোতিষীদের দাবী এ রকম যে, ‘আল্লাহ্ তা’আলা ইচ্ছা করেছেন, জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর গতিবিধি এবং তাদের অবস্থানের ভিন্নতার মাধ্যমে ভবিষ্যতে সংঘটিতব্য জাগতিক ঘটনাবলী সম্পর্কে নির্দেশনা প্রদান করবেন।’ ব্যাবিলনের জ্যোতিষশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা ও চর্চাকারী মুসলিম জ্যোতিষীরা সাধারণত এ ধরনের বিশ্বাস পোষণ করত। জ্যোতিষশাস্ত্রের চর্চার প্রচলন মুসলিম রাজ্যে রাজকীয়ভাবে শুরু হয় উমাইয়া খিলাফাতের শেষ প্রান্তে এবং আব্বাসীয় খিলাফাতের সূচনাকালে খলিফার আসনে আসীন শাসকদের মাধ্যমে। একজন জ্যোতিষী নিয়োগ করা হতো এ জন্য যে, সে খলিফাকে দৈনন্দিন বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরামর্শ এবং আসন্ন বিপদ-আপদ সম্পর্কে সতর্কবাণী প্রদান করবে। জ্যোতিষশাস্ত্রের অন্তর্গত মৌলিক বিষয়গুলোকে মুসলিম জনগণ যেহেতু কুফর বলে গণ্য করত, তাই মুসলিমদের মাঝে জ্যোতিষশাস্ত্রের চর্চা করাকে তথাকথিত এ সব মুসলিম জ্যোতিষী ইসলামসম্মত বলে চালিয়ে দেয়ার নিমিত্তে একটা কৌশল প্রয়োগ করল। ফলে, জ্যোতিষশাস্ত্রের বিভিন্ন আলামত ও প্রতীক আল্লাহ্ ইচ্ছাশক্তি বলে প্রচার করা হল। যা হোক, জ্যোতিষশাস্ত্রের এ ধরনের চর্চাও হারাম এবং এর চর্চাকারীকে কাফির বলে গণ্য করা উচিত। কারণ, এ বিশ্বাস এবং মুশরিকদের বিশ্বাসের মধ্যে তেমন উল্লেখযোগ্য কোন পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় না। জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর উপর আল্লাহ্র ক্ষমতা আরোপিত হয়েছে এবং এদের বিভিন্ন অবস্থান ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হওয়ার দাবীদারেরা ভবিষ্যত জ্ঞানের অধিকারী বলে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে থাকে, অথচ ভবিষ্যতের ঘটনা সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহই পূর্ণ ওয়াকিবহাল। তবুও, পরবর্তীকালের কিছু সুবিধাবাদী মুসলিম পণ্ডিত আসমানী বিধানের যথাযথ প্রয়োগ সাধনে শিথিলতা প্রদর্শন করেন। অন্যদিকে, জ্যোতিষশাস্ত্রের বিষয়গুলো মুসলিমদের মাঝে বদ্ধমূল বিশ্বাসে পরিণত হওয়ার কারণে তৎকালীন তথাকথিত মুসলিম পণ্ডিতেরা এ ধরনের জ্যোতিষশাস্ত্রের চর্চাকে অনুমোদন করেন।
৩. তৃতীয় ও শেষ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত সে সব বিষয় যা নক্ষত্রের বিভিন্ন অবস্থান ও এর গতিবিধির উপর ভিত্তি করা সম্পর্কিত। এর দ্বারা নাবিক বা মরূভূমির পথিকেরা তাদের দিক নির্ণয় এবং কৃষকেরা তাদের শস্য রোপনের সময় নির্ধারণ ইত্যাদি করে থাকে।’ জ্যোতিষশাস্ত্রের অন্তর্ভুক্ত কেবল এ রূপটিই অনুমোদনযোগ্য (হালাল)। কারণ, এটি হালাল হওয়ার বিষয়টি কুরআন ও সহীহ সুন্নাহ দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত।
এ বিধানের মূল ভিত্তি কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত:
﴿وَهُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ النُّجُومَ لِتَهْتَدُوا بِهَا فِي ظُلُمَاتِ الْبَرِّ وَالْبَحْرِ ﴾ (سورة الأنعام: ٩٧) ‘তিনি তোমাদের জন্য নক্ষত্ররাজি সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা সেগুলোর সাহায্যে জলে স্থলে অন্ধকারে পথের দিশা লাভ করতে পার।’ [সূরা আল-আন’আম (৬): ৯৭]
ক্বাতাদাহ’ থেকে বুখারী বর্ণনা করেন, ‘দিক সম্পর্কে নির্দেশনা প্রদানের নিমিত্তে এবং শয়তানের প্রতি নিক্ষেপ করার জন্যই আল্লাহ্ তা’আলা নক্ষত্রমণ্ডলীকে সৃষ্টি করেছেন। অতএব, নক্ষত্রমণ্ডলীকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে তা ব্যতিরেকে যদি অন্য কিছু প্রত্যাশা করা হয় এগুলোর নিকট থেকে, তাহলে এর দ্বারা বুঝা যায় যে, তারা বড় ধরনের বিভ্রান্তিতে পতিত হয়েছে। ফলে, সে ব্যক্তি ভাগ্যহীন হয়ে পড়ে, কল্যাণের সঙ্গে তার জীবনের সাক্ষাত মেলে না এবং সে তার নিজের উপর এমন সব বিষয়কে আরোপ করে যে সম্পর্কে সে অজ্ঞ। নিশ্চয়ই এ কাজ যারা সম্পাদন করে তারা আল্লাহ্র আদেশ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। তারা নক্ষত্র সম্বন্ধে এমন ভবিষ্যদ্বাণী প্রদান করে। এ সব ব্যক্তি দাবী করে, এই এই নক্ষত্রের সময় বিয়ে করলে এটা ঘটবে, ওটা ঘটবে ইত্যাদি; এই এই নক্ষত্রের সময় কোন কাজ শুরু বা কোথাও যাত্রা বা ভ্রমণ করলে এটা-ওটার সম্মুখীন হবে ইত্যাদি। আমার জীবন অতিবাহিত হওয়ার সময়ে প্রতিটি নক্ষত্রের নীচে লাল, কাল, লম্বা, খাটো, কুৎসিত এবং সুদর্শন প্রাণীর জন্মলাভ হয়েছে। কিন্তু কোন নক্ষত্র, প্রাণী বা পাখি এরা কেউই অদৃশ্য সম্পর্কে অবগত নয়। আল্লাহ্ তা’আলা যদি কাউকে অদৃশ্যের জ্ঞান অর্জনের কৌশল শিক্ষা দিতেন, তাহলে আদম (আ:)-কেই শিক্ষা দিতেন। কারণ, তিনিই তাঁর নিজ হাত দ্বারা আদম (আ:)-কে সৃষ্টি করেছেন, ফিরিশতাদেরকে দিয়ে তাকে সিজদা করিয়েছেন এবং তাকে সকল বস্তুর নাম শিক্ষা দিয়েছেন।’
পূর্বে উল্লেখিত নক্ষত্র ব্যবহারের সীমারেখাকে ক্বাতাদাহ (রাহি.) নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন মূলত সূরা আল-আন’আমের ৯৭ নং আয়াতের ভিত্তিতে। এ সীমারেখা সম্পর্কে নিচের আয়াতেও বর্ণনা করা হয়েছে:
﴿وَلَقَدْ زَيَّنَّا السَّمَاءَ الدُّنْيَا بِمَصَابِيحَ وَجَعَلْنَاهَا رُجُوماً للشَّيَاطِين ... )) (سورة الملك: ٥) ‘আমি নিকটবর্তী আকাশকে প্রদীপমালা দিয়ে সুসজ্জিত করেছি আর শয়ত্বানকে তাড়িয়ে দেয়ার জন্য, এবং প্রস্তুত করে রেখেছি জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি...।’ [সূরা আল-মুল্ক (৬৭): ৫]
অতএব, আল্লাহ্ তা’আলা যে মানদণ্ড প্রদান করেছেন তার ভিত্তিতে বিচার বিশ্লেষণ করে বৈধ উপায়সমূহ ব্যতীত সকল প্রকার নক্ষত্র সংশ্লিষ্টতা থেকে বেঁচে থাকা প্রতিটি মুসলিমের আবশ্যিক দায়িত্ব।
মুসলিম জ্যোতিষীর খোঁড়া যুক্তি জ্যোতিষ শাস্ত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট মুসলিমরা তাদের এ চর্চাকে সমর্থন এবং এর বৈধতা প্রমাণের নিমিত্তে কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের অপব্যাখ্যা করার দুঃসাহস দেখিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সূরা আল-বুরূজকে ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়েছে, ‘রাশিচক্রের প্রতীক’-এর সূরা হিসেবে।’ শুধু তাই নয়, এ সূরাটির প্রথম আয়াতের অনুবাদ করা হয়েছে ‘রাশিচক্র প্রতীকের শপথ’। এটি নিশ্চয়ই ‘বুরূজ’ শব্দের ভুল ও ভ্রান্ত অনুবাদ। শব্দটির সত্যিকার অর্থ হচ্ছে ‘নক্ষত্রের আপেক্ষিক অবস্থান’। ‘রাশিচক্রের প্রতীক’ নয়। নক্ষত্রের আপেক্ষিক অবস্থান বুঝাতে প্রাচীন ব্যাবিলন এবং গ্রীকবাসীরা রাশিচক্রের প্রতীক হিসেবে কেবল কিছু প্রাণীর প্রতিরূপকে ব্যবহার করত। ফলে, নক্ষত্র পূজার পৌত্তলিক চর্চার সমর্থনে কোনক্রমেই এ সূরাকে ব্যবহার করা বৈধ নয়। কল্পিত চিত্রের সঙ্গে নক্ষত্রের আপেক্ষিক অবস্থানের কোন সম্পর্ক নেই। বরং সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে মহাশূন্যে নক্ষত্রের আপেক্ষিক অবস্থানের আমূল পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী।
পূর্ববর্তীকালে, জ্যোতিষশাস্ত্রকে সমর্থন করতে খলিফাদের দরবারে সূরা আন-নাহলের নিম্নোক্ত আয়াতটি ব্যবহৃত হতো:
﴿وَعَلَامَاتٍ وَبِالنَّجْمِ هُمْ يَهْتَدُونَ ) (سورة النحل: ١٦) ‘আর দিক-দিশা প্রদানকারী চিহ্নসমূহ; আর তারকারাজির সাহায্যেও তারা পথনির্দেশ লাভ করে।’ [সূরা আন্-নাহল (১৬): ১৬]
মুসলিম জ্যোতিষীরা দাবী করে, ‘এ আয়াতের অর্থ হল, নক্ষত্রমণ্ডলী অদৃশ্যকে প্রকাশ করার প্রতীক এবং এর মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান ব্যবহার করে ভবিষ্যত সম্পর্কে বিভিন্ন দিক নির্দেশনা প্রদান করা যেতে পারে।’ যা হোক, ‘তুরজুমান আল-কুরআন’ অর্থাৎ কুরআনের অর্থের অনুবাদক বলে ইবনে ‘আব্বাস -কে আল্লাহর রাসূল আখ্যায়িত করেছিলেন। অথচ, এ আয়াতে উল্লেখিত ‘প্রতীক’ দ্বারা সূর্যালোকের ‘পথচিহ্ন’ বা ‘বিশেষচিহ্ন’ বুঝানো হয়েছে বলে ইবনে ‘আব্বাস অভিমত ব্যক্ত করেছেন। ওগুলো কোনক্রমেই নক্ষত্রসম্বন্ধীয় নয়। তিনি আরও বলেন, ‘তারকারাজির সাহায্যে তারা পথনির্দেশ লাভ করে।’ এ শব্দসমষ্টির অর্থ হচ্ছে, সমুদ্র ও মরুভূমিতে রাত্রিকালে ভ্রমণাবস্থায় তারা নক্ষত্রমণ্ডলীর মাধ্যমে পথনির্দেশ প্রাপ্ত হয়। অন্যভাবে, এ আয়াতের অর্থ সূরা আল-আন’আম-এর ৯৮ নং আয়াতের অনুরূপ।
প্রকৃতপক্ষে, জ্যোতিষশাস্ত্র সংক্রান্ত অবাস্তব ও মিথ্যায় পরিপূর্ণ বিজ্ঞান অধ্যয়ন এবং এর প্রয়োগের সমর্থনে কুরআনের এই আয়াতসহ অন্যান্য আয়াতকে ব্যবহার করা সম্পূর্ণভাবে অবৈধ। ‘একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলাই ভবিষ্যতের জ্ঞান সংরক্ষণ করেন’, এ বিষয়টি কুরআনের অসংখ্য আয়াত দ্বারা প্রমাণিত, অথচ উপরোক্ত অপব্যাখ্যার মাধ্যমে এ মহাসত্যকে অস্বীকার করার চেষ্টা করা হয়েছে। তাছাড়া, জ্যোতিষশাস্ত্র এবং এ সংক্রান্ত সকল অবাস্তব ও মিথ্যা বিজ্ঞানের জ্ঞান আহরণ ও বিশ্বাস করতে সুস্পষ্টভাবে অনেক হাদীছে কঠোরভাবে নিষেধ করা সত্ত্বেও উক্ত সহীহ হাদীসগুলোর বিরোধীরূপে দাঁড়িয়েছে তথাকথিত ভ্রান্ত তাফসীরটি।
উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহর রাসূলের সাহাবী ইবনু ‘আব্বাস বর্ণনা করেন, ‘যে ব্যক্তি জ্যোতিষশাস্ত্রের একটি শাখার জ্ঞান অর্জন করল, সে যাদুবিদ্যার একটি শাখার জ্ঞান লাভ করল।’
আবু মাহযামও রাসূল থেকে বর্ণনা করেন, ‘আমার মৃত্যুর পর আমার উম্মতের জন্য আমি যা সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক বলে আশংকা করি তা হল: তাদের বিচারকদের নীতিহীনতা, নক্ষত্রের উপরে বিশ্বাস এবং আল্লাহ্ কর্তৃক সুনির্ধারিত ভাগ্যকে অস্বীকার করা।’
সুতরাং জ্যোতিষশাস্ত্রকে বিশ্বাস করা এবং এর চর্চা করার ভিত্তি ইসলামে নেই। যে ব্যক্তি কোন ভ্রান্ত মতবাদকে নিজের স্বপক্ষ সমর্থনের উদ্দেশ্যে বিকৃত করার দুঃসাহস প্রদর্শন করে, সে-ই- মূলত ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদেরকে অনুসরণ করে। কারণ, ইয়াহুদীরা স্বজ্ঞানে তাওরাতের বিভিন্ন বিষয়ের অর্থ বিকৃত করেছে।
টিকাঃ
১. তাইসীর আল-আযীয আল-হামীদ, ৪৪১ পৃ.। William D. Halsey (ed.), Collier’s Encyclopedia, (USA: Crowell-Collier Educational Corporation, 1970) vol. 3, p. 103.
২. তাইসীর আল-‘আযীয আল-হামীদ, ৪৪৫ পৃ.।
৩. তাইসীর আল-‘আযীয আল-হামীদ, ৪৪৭-৪৪৮ পৃ.।
৪. আল্লাহর রাসূল-এর সাহাবীদের ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম পণ্ডিত। (রাহিমাহুল্লাহ)
৫. আব্দুল্লাহ ইউসূফ ‘আলী, The Holy Quran, (ইংরেজি অনুবাদ, বৈরুত: দার আল-কুরআন আল-কারীম), ১৭১৪ পৃ.।
৬. তাইসীর আল-‘আযীয আল-হামীদ, ১৪৪ পৃ.।
৭. ইবনু জারীর আত্ব-ত্ববারি তাঁর তাফসীর ‘জামি’ আল-বায়্যানা’ন তা ‘ভীল আল-কুরআন, (মিশর: আল-হালাবি পাবলিশিং, ৩য় সংস্করণ, ১৯৬৮), ১৪তম খণ্ড, ৯১ পৃ.।
৮. আবু দাউদ, সুনান আবি দাউদ, ৩য় খণ্ড, ১০৯৫ পৃ., হাদীস নং ৩৯৮৬ এবং ইবনু মাজাহ।
৯. ইবনু ‘আসাকির কর্তৃক সংগৃহীত। আছ-ছুয়ূতী এ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। (তাইসীর আল-‘আযীয আল-হামীদ, ৪৪৫ পৃ.।) এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে সূরা আন-নিসা, ৪:৪৭, সূরা আল-মায়িদা, ৫:১৩ এবং ৫:৪১ দেখা যেতে পারে।
📄 রাশিচক্র-ভবিষ্যদ্বাণী ও যাদুমন্ত্রের ইসলামী বিধান, বিনষ্ট হবে না ঈমান থাকলে সাবধান
রাশিচক্র ও ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কে ইসলামী হুকুম: তাওহীদ বিরুদ্ধ শির্ক্বী ও কুফরী বিশ্বাস জড়িত থাকার কারণে ইসলাম ভবিষ্যৎ গণনার প্রতি কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছে। ভবিষ্যত গণনায় লিপ্তদেরকে এ নিষিদ্ধ চর্চা ত্যাগ করতে উপদেশ দান ছাড়াও ইসলাম তাদের সঙ্গে যেকোন ধরনের সম্পৃক্ততার বিরোধিতা করে। আর, জ্যোতিষশাস্ত্রের চর্চা শুধু হারামই নয়, বরং জ্যোতিষীর নিকটে গমন করা, তার দেয়া ভবিষ্যদ্বাণী শ্রবণ করা, এ সংক্রান্ত বইপত্র ক্রয় অথবা কারো ভাগ্য গণনা করাও সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ! জ্যোতিষশাস্ত্র প্রধানত ভবিষ্যদ্বাণী করার জন্য ব্যবহৃত হওয়ার কারণে এ শাস্ত্রের চর্চাকারীরা জ্যোতিষী বলে বিবেচিত হয়। ফলস্বরূপ, কোন ব্যক্তি ভাগ্য পরীক্ষা করতে চাইলে সে রাসূল ঘোষিত বিধানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
গণকের নিকটে গমন করা গণকের যেকোন ধরনের দর্শনের ব্যাপারে রাসূল সুস্পষ্টভাবে নীতি নির্ধারণ করেছেন। হাফসা থেকে সাফিয়া বর্ণনা করেন যে, রাসূল বলেন, ‘যদি কেউ কোন গণক, গাইবী বিষয়ের সংবাদদাতা বা ভবিষ্যবক্তার নিকট গমন ক’রে তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করে, তাহলে ৪০ দিন ও ৪০ রাত পর্যন্ত তার সলাত কবুল হবে না।’
এ হাদীছে বর্ণিত শাস্তি শুধু গণকের নিকটে গমন করে কৌতুহলবশত তাকে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার জন্য। এ নিষিদ্ধতা আরও সমর্থিত হয়েছে মু’আবিয়া ইবনে আল-হাকাম আস-সালামী বর্ণিত হাদীস দ্বারা। এ হাদীছে মু’আবিয়া বলেন, ‘হে আল্লাহ্র রাসূল! নিশ্চয়ই আমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক রয়েছে, যারা গণকের নিকটে যায়। রাসূল উত্তর দিলেন, তাদের কাছে যাবে না।’
গণকের বক্তব্যের সত্যতায় সন্দিহান হওয়ার পরেও কেউ তার নিকটে গমন করে কিছু জিজ্ঞাসা করলে সেজন্য শাস্তির বিধান সম্পর্কে হাদীছে বর্ণিত হয়েছে। আবার, জ্যোতিষসংক্রান্ত তথ্যের সত্যতা বা মিথ্যার ব্যাপারে কারও কোন সন্দেহ থাকলে, তাহলে আল্লাহর পাশাপাশি অন্যরাও অদৃশ্য ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জ্ঞান রাখে বলে সন্দিহান হয়। এ ধরনের সন্দেহ পোষণ করাও এক প্রকার শির্ক। ফলে, এ ধরনের কঠিন শাস্তির বিধান নির্দিষ্ট করা হয়েছে কেবল গণকের নিকট গমনের জন্য, কারণ ভবিষ্যদ্বাণী বিশ্বাস করার ক্ষেত্রে এটাই প্রথম পর্যায়। যদি কেউ ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তবতায় দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে গণকের নিকট গমন করে, আর গণকের কোন ভবিষ্যদ্বাণী সত্যরূপে পরিগণিত হয়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই সে গণকের গোঁড়া সমর্থক ও ভবিষ্যদ্বাণীর প্রতি উৎসাহী বিশ্বাসীতে পরিণত হবে।
গণকের প্রতি বিশ্বাস অদৃশ্য ও ভবিষ্যতে কী ঘটবে সে সম্বন্ধে গণক ওয়াকিবহাল এ বিশ্বাসে যদি কেউ গণকের নিকটে গমন করা কুফরী (অবিশ্বাসীদের) কাজ। একইভাবে কোন জ্যোতিষী কর্তৃক প্রদানকৃত হোক অথবা জ্যোতিষশাস্ত্রের কোন বই, পত্র-পত্রিকায় লিখিত হোক কেউ যদি তার জন্য প্রদত্ত রাশিচক্রের প্রতি বিশ্বাস রাখে, এর ওপর নির্ভর করে বা এ বিষয়ে শংকাগ্রস্ত হয়, তবে সে সরাসরি কুফরীতে লিপ্ত। কারণ, এ সম্পর্কে আবূ হুরায়রা এবং আল-হাছান উভয়ে বর্ণনা করেন যে, রাসূল বলেন, ‘যে কেউ গণকের নিকটে গমন করে তার কথায় বিশ্বাস করল, তাহলে সে মুহাম্মাদের উপর অবতীর্ণ বিষয়কে অবিশ্বাস করল।’
এ হাদীসটিতে পূর্বে বর্ণিত হাদীছের মতো গণক শব্দটি ব্যবহৃত হলেও, গণক ও জ্যোতিষী -এরা উভয়ই যেহেতু ভবিষ্যত সম্পর্কে জ্ঞান রাখে বলে নিজেদেরকে উপস্থাপন করে, তাই উক্ত হাদীসদ্বয় জ্যোতিষীদের জন্য তো বটেই বরং ভবিষ্যতের জ্ঞানের অধিকারী বলে দাবীদার সকল ব্যক্তির জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। জ্যোতিষশাস্ত্রের বিশেষজ্ঞরাও সাধারণ গণকের মতো আল্লাহ্ তাওহীদকে অস্বীকার করে। জ্যোতিষীদের দাবী, নক্ষত্র দ্বারা মানুষের ব্যক্তিত্ব নির্ধারিত হয় অর্থাৎ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সকল কর্মকাণ্ডের উপরে নক্ষত্রের বিশেষ প্রভাব রয়েছে এবং প্রত্যেকের জীবনে সংঘটিত বা সংঘটিতব্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী নক্ষত্রে লিপিবদ্ধ রয়েছে। আর সাধারণ গণকের দাবী এরূপ, কোন কাপের তলায় চায়ের পাতার গঠন অথবা হাতের তালুর রেখার মাধ্যমে অনুরূপ বিষয়াবলীর প্রকাশ ঘটে। মাধ্যম ব্যবহারের পদ্ধতির ভিন্নতা থাকলেও উভয়ক্ষেত্রেই তারা সৃষ্ট বস্তুর বাহ্যিক গঠন-বিন্যাসের বিচিত্রতায় অদৃশ্য প্রকাশ করার দাবী করে থাকে।
ইসলামের আক্বীদা-বিশ্বাস ও শিক্ষার সাথে জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাস ও রাশিচক্র পরীক্ষা করার সুস্পষ্ট বিরোধিতা রয়েছে। এ সব পথ খুঁজে বেড়ানো আত্মা আদতে সেই শূন্য আত্মার মতো যা প্রকৃত ঈমানের স্বাদ গ্রহণ করেনি। আল্লাহ্ কর্তৃক সুনির্ধারিত ভাগ্য থেকে রেহাই পাওয়ার ব্যর্থ প্রয়াস বৈ এ সব পথ আর কিছু নয়। অজ্ঞ লোকদের বিশ্বাস এ রকম যে, আগামীকাল কী ঘটবে তা জানতে পারলে, আজকেই তার জন্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করে সম্ভাব্য দুর্ঘটনাকে এড়িয়ে কল্যাণ নিশ্চিত করা যেতে পারে।
এ ধরনের বিশ্বাস দ্বারা অদৃশ্য ও ভবিষ্যৎ বিষয়াদি সম্পর্কে আল্লাহ্র জ্ঞান রাখার মতো গুণাবলীকে তাঁর সৃষ্টির প্রতি আরোপিত হয়। ফলস্বরূপ তাওহীদ আল-আসমা ওয়াস-সিফাত ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং তাওহীদের এ ক্ষেত্রে শিরকের সূচনা হয়। অর্থাৎ কেউ কোন জ্যোতিষী, গণক, রাশিবিদ, পীর, ফকীর, সাধু, দরবেশ ইত্যাদি গোপন জ্ঞানের দাবীদারকে সত্যই ‘গাইবী’ বা গোপন জ্ঞানের অধিকারী বলে বিশ্বাস করলে শিরক আকবার সংঘটিত হয়।
গণকদের লেখা বই, পত্র-পত্রিকা বা গবেষণা-পত্র পড়া এবং তাদের অনুষ্ঠান রেডিওতে শ্রবণ করা বা টিভিতে দেখা ইত্যাদির মধ্যে সাদৃশ্যতা বিরাজমান থাকায় এ সব কর্মকাণ্ড কুফরীর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত’; কারণ ভবিষ্যৎবক্তারা তাদের ভবিষ্যদ্বাণীর প্রচার ও প্রসারে বিংশ শতাব্দিতে এ মাধ্যমগুলোকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে। আল্লাহ্ তা’আলা পরিষ্কারভাবে কুরআনে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য কেউই অদৃশ্য সম্পর্কে জ্ঞান রাখে না, এমনকি রাসূলও না।
﴿ وَعِنْدَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ ... ﴾ (سورة المائدة: ٥٩) ‘সমস্ত গায়বের চাবিকাঠি তাঁর কাছে, তিনি ছাড়া আর কেউ তা জানে না...।’ [সূরা আল-মায়িদা (৬): ৫৯]
তারপর তিনি রাসূল ﷺ-কে বলেন,
﴿ قُلْ لَا أَمْلِكُ لِنَفْسِي نَفْعاً وَلَا ضَرَا إِلَّا مَا شَاءَ اللَّهُ وَلَوْ كُنْتُ أَعْلَمُ الْغَيْبَ لَاسْتَكْثَرْتُ مِنَ الْخَيْرِ وَمَا مَسَّنِيَ السُّوءُ... ﴾ (سورة الأعراف: ۱۸৮) ‘বল, আল্লাহ্ যা ইচ্ছে করেন তা ছাড়া আমার নিজের ভাল বা মন্দ করার কোন ক্ষমতা আমার নেই। আমি যদি অদৃশ্যের খবর জানতাম তাহলে নিজের জন্য অনেক বেশি ফায়দা হাসিল করে নিতাম, আর কোন প্রকার অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করত না...।’ [সূরা আল-আ’রাফ (৭): ১৮৮]
আল্লাহ্ তা’আলা আরও বলেন: ﴿قُلْ لا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ... (سورة النمل: (٦٥) ‘আকাশ ও পৃথিবীতে যারা আছে তারা কেউই অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখে না আল্লাহ্ ছাড়া...।’ [সূরা আন্-নামাল (২৭): ৬৫]
অতএব, ভবিষ্যৎবক্তা, গণক এবং অনুরূপ ব্যক্তি কর্তৃক ব্যবহৃত নানা রকম পন্থা বা পদ্ধতিসমূহ মুসলিমদের জন্য নিষিদ্ধ। হস্তরেখা গণনা, ভাগ্য গণনার মাধ্যম আই চিং, সাফল্যের বিস্কুট বা কেক ও চায়ের পাতার পাশাপাশি রাশিচক্র ও ‘Bio-rhythm’ নামক কম্পিউটার প্রোগ্রাম- এগুলোতে বিশ্বাস স্থাপনকারী লোকজনের দাবী অনুযায়ী, এ সব উপায়সমূহ তাদের ভবিষ্যৎ সংক্রান্ত তথ্যাদি জানাতে পারে। যা হোক, আল্লাহ্ তা’আলা নিশ্চিতরূপে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন যে, একমাত্র তিনিই অদৃশ্য ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন:
﴿إِنَّ اللهَ عِنْدَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ وَيُنَزِّلُ الْغَيْثَ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْأَرْحَامِ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَاذَا تَكْسِبُ غَداً وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوتُ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ ) (سورة لقمان: ٣٤) ‘কিয়ামাতের জ্ঞান কেবল আল্লাহ্র নিকটই আছে, তিনিই বৃষ্টি বর্ষণ করেন, জরায়ুতে কী আছে তা তিনিই জানেন। কেউ জানে না আগামীকাল সে কী অর্জন করবে, কেউ জানে না কোন্ জায়গায় সে মরবে। আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, সর্বাধিক অবহিত।’ [সূরা আল-লুকমান (৩১): ৩৪]
সে কারণেই সত্যিকারের মুসলিম হওয়ার দাবীদারেরা এ সকল ক্ষেত্র থেকে দূরে অবস্থান করতে নীতিগতভাবে বাধ্য। অতএব, রাশিচক্রের প্রতি বিশ্বাস না থাকলেও, রাশিচক্রের চিহ্নবিশিষ্ট আংটি, গলার হার (চেইন) ইত্যাদি অলংকার বা অন্যান্য কিছু ব্যবহার করা উচিত নয়। কুফর আগমনের সকল পথের শাখা-প্রশাখাকে সম্পূর্ণরূপে উৎখাত করতে হবে, যাতে ভ্রান্ত পথসমূহের কোন আলামতের লেশ মাত্র না থাকে। একমাত্র আল্লাহর তাওহীদে বিশ্বাসী মুসলিমের জন্য তার রাশিচক্রের প্রতীক সম্পর্কে অনুমান করা বা ‘আমার রাশি কী?’- এ ধরনের প্রশ্ন করা কখনো উচিত হবে না। সংবাদপত্র বা পত্রিকা-সাময়িকীতে প্রকাশিত রাশিচক্রের কলাম পড়া বা কাউকে পড়তে শ্রবণ করা কোন নর-নারীর জন্য উচিত নয়। আর কোন ব্যক্তি তার কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে জ্যোতিষশাস্ত্র সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণীর উপরে নির্ভরশীল হলে তাকে অবশ্যই আল্লাহ্র নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করে ইসলামের মূল বিশ্বাসের দিকে ফিরে এসে নিজের বিশ্বাসকে নবায়ন করতে হবে।
ফলে, মুসলিমদের অবশ্যই বই-পুস্তক, পত্রিকা, সংবাদপত্র ইত্যাদির পাশাপাশি সে সব লোকদের ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, যারা বিভিন্ন উপায়ে দাবী করে যে তারা ভবিষ্যৎ ও অদৃশ্য বিষয়ে জ্ঞান রাখেন। উদাহরণস্বরূপ, কোন মুসলিম আবহাওয়াবিদ কর্তৃক আগামীকালের বৃষ্টি, তুষারপাত বা আবহাওয়ার অন্যান্য অবস্থা সম্পর্কে প্রচার করার সময় ‘ইনশাআল্লাহ্’ (আল্লাহ্ যদি ইচ্ছা করেন) শব্দসমষ্টি যোগ করা উচিত। অনুরূপভাবে, কোন মুসলিম ডাক্তার যখন তার কোন রোগীকে জানায় যে, সে নয় মাসের মধ্যে অমুক দিনে একটি সন্তান প্রসব করবে- এ ক্ষেত্রেও ‘ইনশাআল্লাহ্’ বলতে সচেতন হওয়া উচিত। কারণ, এ ধরনের বর্ণনা শুধু ধারণাভিত্তিক পরিসংখ্যান বৈ আর কিছুই নয়।
যাদুমন্ত্র সম্পর্কে ইসলামী হুকুম: যাদুমন্ত্র চর্চা এবং এ বিষয়ে জ্ঞান অর্জনকে ইসলামে যেহেতু কুফর (অবিশ্বাস) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে, তাই যে ব্যক্তি যাদুমন্ত্র চর্চা করবে তার জন্য শারি’আতে (ইসলামী আইন) খুব কঠিন শাস্তির বিধান রয়েছে। যাদুমন্ত্র চর্চাকারী ব্যক্তি আটক হওয়ার পর সে যদি অনুতপ্ত হয়ে তওবা করে তা চর্চা থেকে ফিরে না আসে, তাহলে মৃত্যুদণ্ডই তার জন্য একমাত্র শাস্তি। এ আইনটি মূলত যুনদুব ইবনু কা’ব কর্তৃক বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হাদীস। উক্ত হাদীছে রাসূল বলেন, «حَدُّ السَّاحِرِ ضَرْبَةٌ بِالسَّيْفِ» ‘তরবারির আঘাতে হত্যা করাই যাদুকরের জন্য নির্ধারিত শাস্তি।’
রাসূল-এর মৃত্যুর পর মুসলিম জাতিকে পরিচালনাকারী খলিফাগণ ইসলামের এ বিধানকে খুব কঠোরভাবে প্রয়োগ করেন। বাজ্জালা ইবনু ‘আবদাহ বর্ণনা করেন, ‘মা, মেয়ে ও বোনদেরকে বিবাহকারী সকল জোরাষ্ট্রিয়ানদের বিবাহকে বাতিল করে দেয়ার আদেশসহ জায ইবনু মু’আবিয়া-এর নিকট প্রেরিত পত্রে খলীফা ‘উমার ইবনু আল-খাত্তাব রোম ও পারস্যের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনায় নিযুক্ত মুসলিম বাহিনীর নিকটে এই বলে আদেশ করেন যে, জোরাস্ট্রিয়ানদেরকে আহ্বল আল-কিতাবদের’ অন্তর্ভুক্ত করতে মুসলিম বাহিনীরা যেন জোরাস্ট্রিয়ানদের দেয়া খাবার খায় এবং সমস্ত জ্যোতিষ ও যাদুকরদের খতম করে দেয়। বাজ্জালা বলেন যে, উক্ত আদেশের ভিত্তিতে তিনি নিজেই একদিনে তিনটি যাদুকরকে হত্যা করেছিলেন।’
মুহাম্মাদ ইবনু ‘আব্দুর রাহমান বর্ণনা করেন, উম্মুল মু’মিনীন হাফসা-কে তাঁর কৃতদাসী যাদু করলে তিনি তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।’
আজ অবধি তাওরাতে এ শাস্তির বিষয়ে উল্লেখ দেখা যায়, যা দ্বারা ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের জন্য যাদুমন্ত্র নিষিদ্ধ করা হয়েছে: ‘যেসব পুরুষ বা স্ত্রীলোক প্রেতাত্মার মাধ্যম বা যাদুকর হয়, তাদের শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। পাথর ছুঁড়ে তাদেরকে হত্যা করতে হবে। নিজেদের মৃত্যুর জন্য তারা নিজেরাই দায়ী।’
প্রত্যেক মুসলমানদের প্রতি ওয়াজিব যে, তারা যাদুর সকল প্রকার থেকে সাবধান থাকবে এবং এ বিধান প্রচারে পরস্পরকে সহযোগিতা করবে এবং এ গর্হিত কাজের বিরোধীতা করবে, যেমন ইমামগণ বলেছেন যে, যখনই কোন যাদুকর কোন নগরীতে প্রবেশ করবে তখনই সেখানে অশান্তি, অত্যাচার সীমলংঘন এবং সন্ত্রাস বিরাজ করবে।
অভ্রান্ত ও নির্ভেজাল সত্যের অনুসারী খলিফাদের পর আইন-কানুন শিথিল হয়ে পড়ে। জ্যোতিষ ও যাদুকরদেরকে উমাইয়া খলিফারা তাদের এ সব নিষিদ্ধ কর্মের অনুমতি প্রদান করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং তাদেরকে রাজদরবারে সম্মানিত আসনে আসীন করা হয়েছিল। রাষ্ট্রীয়ভাবে এ আইন প্রয়োগ স্থগিত করার ফলে সে সময় বেঁচে থাকা কতিপয় সাহাবী নিজেরাই এ আইন প্রয়োগের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। আবু ‘উছমান ইবনু ‘আব্দুল মালিক আন-নাহদি বর্ণনা করেন, একটি লোককে খলিফা আল-ওয়ালিদ ইবনু ‘আবদিল-মালিক (শাসনকাল ৭০৫-৭১৫) তাঁর দরবারে নিয়োগ করেন যার কাজ ছিল যাদুর কৃতিত্ব প্রদর্শন করা। একদিন এ যাদুকরটি এক লোকের মাথা কেটে শরীর থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। তার এ কৃতিত্বে দর্শকরা হঠাৎ চমকিত হয়ে পড়লে সে আবার মাথাটি যথাস্থানে পুনঃসংযোগ করে সবাইকে আরও হতচকিত করে ফেলল। তারপর যে লোকটির মাথা কাটা হয়েছিল তাকে এমন দেখা গেল যেন তার মাথা কখনো কাটাই হয়নি। লোকজন বিস্মিত হয়ে বলল, ‘সুবহানাল্লাহ (মহাপবিত্র আল্লাহ্)! সে মৃতদের জীবন দিতে সক্ষম।’ আল-ওয়ালিদের দরবারে প্রচণ্ড হট্টগোল দেখে যুনদুব আল-আযদি নামে এক সাহাবী এগিয়ে এসে যাদুকরের কৃতিত্ব অবলোকন করলেন। তার পরদিন, আল-ওয়ালিদের দরবারে পিঠে তরবারি বেঁধে যুনদুব আবার প্রবেশ করলেন। যাদু প্রদর্শনের জন্য যাদুকরটি এগিয়ে আসলে যুনদুব তাঁর তরবারি খুলে নিয়ে দর্শকদের মধ্যে দিয়ে ছুটে গিয়ে যাদুকরের মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেললেন। তারপর বিস্ময়াহত দর্শকদের দিকে ফিরে বললেন, ‘সে যদি সত্যিই মৃতব্যক্তির প্রাণ ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হয়, তাহলে সে তার নিজের প্রাণ ফেরৎ আনুক।’ আল-ওয়ালিদ তাঁকে বন্দী করে কারাগারে নিক্ষেপ করেন।’
একমাত্র আল্লাহ্ জন্য নির্দিষ্ট গুণাবলীকে জ্যোতিষী বা যাদুকরের উপর আরোপ করার মাধ্যমে মানুষ যেন তাওহীদ আল-আসমা ওয়াস-সিফাত-এ শির্ক না করে, সে কারণেই জ্যোতিষী বা যাদুকরদের উপর ইসলামের আইন প্রয়োগে এ কঠোরতা। অধিকন্তু, কেবল ধর্মবিরোধী কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করেই নয়, বরং ডাকিনীবিদ্যা বা যাদুবিদ্যা চর্চাকারীরা অপরিসীম খ্যাতি অর্জন ও সমর্থকদেরকে আকর্ষণ করার উদ্দেশ্যে তারা প্রায়ই নিজেদেরকে অলৌকিক শক্তি ও স্রষ্টার গুণাবলীর অধিকারী বলে দাবী করে থাকে।
টিকাঃ
১. হাফসা কর্তৃক বর্ণিত। মুসলিম কর্তৃক সংগৃহীত, খণ্ড ৪, পৃ. ১২১১, হাদীস নং ৫৫৪০।
২. মুসলিম কর্তৃক সংগৃহীত, খণ্ড ৪, পৃ. ১২০৯, হাদীস নং ৫৫৩২।
৩. আবূ দাউদ কর্তৃক সংগৃহীত, সুনান আবি দাউদ, খণ্ড ৩, পৃ. ১০৯৫, হাদীস নং ৩৮৯৫; আহমাদ, আল-মুসনাদ, ২/৪২৯; বায়হাক্বী; আলবানী, সাহীহুত তারগীব, ৩/৯৭-৯৮।
৪. কেউ যদি গণকদের বিরোধিতা, মোকাবেলা তথা তাদের বিভ্রান্তিকে যথাযথভাবে প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে এগুলোর কিছু পড়ে বা শোনে এবং সে নিজে যদি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, গোপন বা গাইবী জ্ঞান ও ভাগ্য বা ভবিষ্যতের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর জন্য, অন্য কেউ তা জানে না বা জানতে পারে না অর্থাৎ সে যদি খাঁটি তাওহীদে অটল বিশ্বাসী হয়, তাহলে এমতাবস্থায় তা কুফ্রী বলে গণ্য হবে কি না- এ বিষয়ে সাল্ফে-সালেহীনদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে, তবে তাদের অধিকাংশের মত হচ্ছে যে, একমাত্র মোকাবেলা ও প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে নিতান্ত প্রয়োজনে ও প্রয়োজনানুপাতে তা পড়া বা জানা কুফরী বলে গণ্য হবে না, যদি সে নিজে খাঁটি তাওহীদে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী হয় এবং তার এ যৎসামান্য জানা শোনার একমাত্র উদ্দেশ্য হয় দ্বীন ইসলামের সংরক্ষণ। তবে এ উদ্দেশ্য ব্যতীত কৌতূহলবশত প্রশ্ন করা কঠিন পাপ ও শির্ক আসগর।
৫. ইমাম বুখারী, আত-তারীখুল কাবীর, ২/২২২; দারাকুতনী; বায়হাক্বী, ৮/১৩৬; ইবনু আসাকির, তারীখু দিমাশক, ৪/১৯/১,২; তিরমিযি, ‘দণ্ড’ অধ্যায়, হা/১৩৮০। তিনি হাদীসটিকে মারফুভাবে উল্লেখ করে মওকূফ হিসেবে বিশুদ্ধ বলেছেন। মূলত হাদীসটি যঈফ হলেও এ হাদীছের সমর্থনে আরও হাদীস থাকার কারণে এর সনদ হাসান (সহীহ হাদীছের কাছাকাছি) পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। (বিস্তারিত দেখুন: ছালেহ বিন আব্দুল্লাহ উছায়মিন প্রণীত কিতাবুত-তাওহীদের তাখরীজ ‘আদ-দুররুন নাযীদ’, (দারু ইবনু খুযায়মাহ), পৃ. ৮৭) উঁচু পর্যায়ের চারজন আইনবিদের মধ্যে তিনজনই (আহমাদ, আবু হানীফা এবং মালিক) এ অনুসারেই আইন প্রণয়ন করেছেন। চতুর্থ আইনবিদ আশ-শাফী’-এর আইন অনুসারে, একজন যাদুকরকে শুধু তখনই হত্যা করতে হবে যদি তার যাদুমন্ত্র কুফরের পর্যায়ে পৌঁছে। (তাইসীর আল-‘আযীয আল- হামীদ, ৩৯০-৩০১ পৃ. দেখুন)
৬. ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের মতো যারা অবতীর্ণ কিতাবের অনুসরণ করে। বর্ণনাটির এ অংশটুকু বুখারী, তিরমিযি এবং নাসাঈ কর্তৃক সংগৃহীত।
৭. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩১৫৬; সুনান আবী দাউদ, হাদীস নং ২৬৪৬, ৩০৪৩; মুসনাদ আহমাদ, ১/১৯০,১৯১; হা/১৫৬৯ এবং আল-বায়হাক্বী। উম্মুল মু’মিনীন হাফসা ছিলেন ‘রাসূল-এর স্ত্রী এবং ‘উমার -এর মেয়ে। মাসায়েলে আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ, মাস’আলা নং ১৫৪৩; মুওয়াত্তা ইমাম মালিক, ৩৪৪-৩৪৫ পৃ., হাদীস নং ১৫১১, ৮৭২; বায়হাক্বী, ৮/১৩৬। আছারটি সহীহ্। বিস্তারিত দ্র: আদ-দুররুন নাযীদ, পৃ. ৮৬।
৮. লেবীয়: ৪: ২০: ২৭
৯. ইমাম বুখারী তাঁর ইতিহাসগ্রন্থে সংগ্রহ করেছেন।