📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 ভূতের ভয় লোকে কয়, এর পেছনে কিছুই নয়!

📄 ভূতের ভয় লোকে কয়, এর পেছনে কিছুই নয়!


আমাদের সম্ভবত সকলেরই ভূত নামক চরিত্রটির সঙ্গে পরিচয় হয় ছেলেবেলাতেই। মা ভূতের ভয় দেখিয়ে শিশুকে ঘুম পাড়ান বা খাবার খাওয়ান তারপর বড় হতে হতে শিশুর অনেক রকম ভূতের কাহিনী পড়া হয়ে যায়। এভাবে ভূতের একটা ভয়ার্ত চেহারা ছোট থেকে আঁকা হয়ে যায় শিশুমনে। আসলে কী কিছু আছে ভূত বলে! নেই তো বটেই। আবার কিন্তু আছেও। উত্তরটা একটু জটিল হয়ে গেল তো! আগেই তো বলা হল নেই। তবে আছেও ভূত। তাও আবার দু'রকমের। এ ভূতদ্বয় হল- মনের ভূত ও ভূত নামক শয়ত্বান-জ্বিন। গল্প-কাহিনী শুনে মনের মধ্যে কাল্পনিক ভূতের যে ছবি আঁকা হয়ে যায় সেটাই হল মনের ভূত। অর্থাৎ এক ভূত থাকে মনে আর এক ভূত হয় শয়ত্বান জ্বিন। এ দুই ভূতেরই নাগাল আমরা পেয়ে থাকি অনেকেই, অনেক সময়ই। তবে এ ভূত ক্ষতিকর নয় তেমন। সাময়িক ভয় দেখানোর জন্য বা ঠাট্টাচ্ছলে এ ভূতদ্বয়ের উপস্থিতি ঘটে। এ দুই ভূত যে একেবারে ক্ষতিমুক্ত তাও তো বলা যায় না। ছেলেবেলায় ভূত ভূত শুনতে শুনতে এক ভয়ঙ্কর রূপ গেঁথে যায় মনে। কুরআন ও সহীহ হাদীসের বিশুদ্ধ আক্বীদা তথা তাওহীদের প্রকৃত জ্ঞানের দ্বারা সেটা সরানোর ব্যবস্থা পরে না করা হলে ভূতের রূপটা মনে হয়ত অনেক সময়ই স্থায়ী হয়ে যেতে পারে।
এবার আমাদের আলোচিত ভূতের কথায় আসা যাক। আমরা অনেকের অস্বাভাবিক আচার-আচরণ দেখে বলি, ভূত ভর করেছে। অথবা বলি, ভূতে পেয়েছে। এটা আসলে এক ধরনের রোগ। মানসিক রোগ। তিন ধরনের রোগ হলে রোগীর আচার-ব্যবহারে অস্বাভাবিকতার প্রকাশ ঘটে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় এ রোগ তিনটিকে বলা হয়- হিস্টিরিয়া, সিজোফ্রেনিয়া ও ম্যানিয়াক ডিপ্রেসিভ। এ রোগগুলোতে শারীরিক কোন ক্ষতি হয় না। শরীরে কোন ত্রুটিও খুঁজে পাওয়া যাবে না। কষ্টটা হয় মনে। সবটাই মনের তৈরি। মনের মধ্যে তৈরি। মনে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। রোগী উন্মত্ত হয়ে হয়ে পড়ে। হয়ে পড়ে বিকারগ্রস্ত, স্মৃতি ও চিত্তভ্রংশ।
ছোটবেলার অতীত স্মৃতি, যা অবসরে মনে করা হয়েছে, হয়ত বেশ পরে সেটাই হিস্টিরিয়া রোগের জন্ম দেয়। এ সকল ঘটনা শৈশবে খুব দুঃখ, যন্ত্রণা, চাঞ্চল্য, ভয় বা আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তবে সেটা মনে চাপা পড়েছিল। এমন ঘটনাই পরবর্তীতে হিস্টিরিয়া রোগের রূপ নিতে পারে। হিস্টিরিয়া রোগী যে সকল অস্বাভাবিক কাজকর্ম করে তা করে ইচ্ছাকৃতভাবে। কিন্তু ইচ্ছার ব্যাপারে রোগী কিন্তু সচেতন নয়। সচেতন মনে হিপনোটাইজ করে চাকরের মতো রোগ সচেতনভাবে অস্বাভাবিক কার্যকলাপ করিয়ে নেয়। হিস্টিরিয়া রোগের উৎস জানতে হলে রোগীর অতীত জীবনের চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হবে। জেনে নিতে হবে, সে কখন কিভাবে কেন ভয়-ভীতি, দাবি-দাওয়া, অভাব-অভিযোগ বা টানাপোড়েনে (মানসিক ও পার্থিব) পতিত হয়েছিল। এটা বের করতে পারলেই তবে হিস্টিরিয়া রোগের চিকিৎসা তথা ভূতের ভয় দূর করা সহজ হয়ে যায়। হিস্টিরিয়া, সিজোফ্রেনিয়া ও ম্যানিয়াক ডিপ্রেসিভ রোগীর একটা সুবিধাজনক দিক হল, সে সকলের শাসন ও নিয়ন্ত্রণের ঊর্ধ্বে যেতে পারে। পরিবর্তে সে সহজে অভিভাবকের মনোযোগ, সহানুভূতি, ভালবাসা বা গুরুত্ব আদায় করতে পারে। এ কারণেই হয়ত স্বেচ্ছাচারের এক বিকৃত প্রকাশ ঘটে তার রোগের আলামতের মধ্য দিয়ে। আমাদের কথিত রোগ তিনটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় অশিক্ষিত বা অল্পশিক্ষিত পরিবারে। উচ্চশিক্ষিত বা আধুনিক পরিবারে এ রোগ দেখা যায় খুব কম। মূলত যে পরিবার ধর্মান্ধতা, গোঁড়ামী ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন; সেখানেই এ রোগ হয় বেশি। আর এর মধ্যে মেয়ে রোগীর সংখ্যাই হয় বেশি। সংসার মেনে বিভিন্ন চাপ, অধীনতা ও জবরদস্তি সইতে হয় সমাজের অসহায় মেয়েদের। সেজন্য মানসিক চাপ ও টানাপোড়েনে স্বাভাবিক মানসিকতা বিকল হয়ে অনেকেই বিকারগ্রস্ত মানসিক রোগীতে পরিণত হয়।
এ ধরনের ভূতের ভয় বা ভূতে পাওয়া একটা স্রেফ মানসিক ব্যাধি। মানসিক বৈকল্যই আসলে ভূতে ধরা বা জ্বিনে পাওয়া। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ ব্যাধি হল হিস্টিরিয়া বা স্কিটসোফ্রেনিয়া ও ম্যানিয়াক ডিপ্রেসান। এ রোগগুলোর ফলে মানুষের মস্তিষ্ককোষে নানা গোলমাল দেখা দেয়। কোষগুলো ঠিকমতো কাজ করে না। ফলে মানুষ মানসিক ভারসাম্যবস্থা হারিয়ে ফেলে অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে। আর এ রোগগুলো সাধারণ অজ্ঞ, অশিক্ষিত, দরিদ্র ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষের মধ্যে বেশি দেখা যায়। অমানুষিক মারধর ক'রে, ভয় দেখিয়ে, গরম তেলে ছ্যাঁকা দিয়ে বা তাবিজ-কবচ পরিয়ে এ রোগ সারানো যায় না। বিশ্বাসের জোরে দু'একটি ক্ষেত্রে কদাচিৎ এগুলোতে কাজ হলেও তা নিছক দুর্ঘটনা। নির্যাতন ক'রে বা ভয় দেখিয়ে কোনক্রমে রোগ সারানো গেলেও পরে তা অন্যরূপে ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে খুব বেশি। সেটা হতে পারে আরও বিপজ্জনক। মানসিক রোগ মানসিক চিকিৎসকের চিকিৎসাতেই সারাবার ব্যবস্থা নিতে হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00