📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 আল্লাহকে বিচ্ছিন্নদাতা, পালনকর্তা ও রক্ষাকর্তা হিসেবে না মানা সংক্রান্ত শিরক

📄 আল্লাহকে বিচ্ছিন্নদাতা, পালনকর্তা ও রক্ষাকর্তা হিসেবে না মানা সংক্রান্ত শিরক


এ কথা কেবল মুসলিমদেরই নয়, পৃথিবীর কারোরই অজানা থাকার কথা নয় যে, ইসলামের মূল আক্বীদাই হচ্ছে তাওহীদ। তাওহীদ মানে আল্লাহর একত্ব। আল্লাহর এ একত্ব সার্বিক, পূর্ণাঙ্গ এবং সর্বাত্মক। এ দৃষ্টিকোণ থেকে আল্লাহ শুধু সৃষ্টিকর্তাই নন, তিনি একমাত্র পালনকর্তা, মালিক, রিযিকদাতা, রক্ষাকর্তা ও আইন-বিধানদাতাও। অতএব মানুষ ভয় করবে কেবল আল্লাহকে, ইবাদাত-বন্দেগী ও দাসত্ব করবে একমাত্র আল্লাহর। সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা ও লালন-পালনকারী হিসেবে মানবে একমাত্র আল্লাহকে। এ সব দিক দিয়ে তিনিই একমাত্র ইলাহ। তিনি ছাড়া কেউ ইলাহ নেই, কেউ ইলাহ নয়, কেউ মাবুদ হতে পারে না এবং তিনিই একমাত্র রব, তিনি ছাড়া লালন-পালনকারী ও ক্রমবিকাশ দাতা, রক্ষাকর্তা ও প্রয়োজনপূরণকারী আর কেউ নেই। মাবুদ একমাত্র তিনিই। তিনি ছাড়া আর কেউ মানুষের ইবাদাত-বন্দেগী ও আনুগত্য পাবার অধিকারী নয়। সংক্ষেপে বলা যায়, রব হওয়ার দিক দিয়েও তিনি এক, একক, অনন্য আর ইলাহ হওয়ার দিক দিয়েও তিনি এক, লা-শরীক। রবুবিয়‍্যাতের দিক দিয়েও আল্লাহ এক, উলুহিয়্যাতের দিক দিয়েও তিনি এক। এর কোন একটি দিক দিয়েও তাঁর শরীক কেউ নেই, জুড়ি নেই কেউ, সমতুল্য কেউ নেই।
ইসলামে এ তাওহীদী আক্বীদা কুরআন থেকে প্রমাণিত, প্রমাণিত সহীহ হাদীস থেকেও। রাসূল (ﷺ) সর্বশেষ নাবী ও রাসূল হিসেবে এ আক্বীদাই-ই পেশ করেছেন বিশ্ববাসীদের সামনে। দাওয়াত দিয়েছেন মৌলিক আক্বীদা হিসেবে এ তাওহীদকে গ্রহণ করার। যাঁরা সেদিন ইসলাম কবুল করেছিলেন, তাঁরা সকলে তাওহীদের এ ধারণার প্রতি ঈমান এনেই হয়েছিলেন মুসলিম। অতএব রাসূল (ﷺ)-এর সাহাবীরাও ছিলেন এ আক্বীদায় বিশ্বাসী। এ ব্যাপারে তাঁরা কখনও দুর্বলতা দেখাননি, এ ক্ষেত্রে কারো সাথে তাঁরা রাজী হননি কোনরূপ আপোষ বা সমঝোতা করতে। অতএব এটাই হচ্ছে সুন্নাতের তাওহীদ।
কিন্তু ইসলামের এ সুন্নাতী আক্বীদায় বর্তমানে দেখা দিয়েছে নানা শির্ক ও বিদআত। মুসলিম সমাজে আল্লাহকে এক ও অনন্য বলে সাধারণভাবে শিকার করা হয় বটে। কিন্তু কার্যত দেখা যায়, আল্লাহর উলুহিয়‍্যাতী তাওহীদের প্রতি যদিও বিশ্বাস রয়েছে; কিন্তু তার রবুবিয়‍্যাতের তাওহীদ স্বীকার করা হচ্ছে না। মুখে স্বীকার করা হলেও কার্যত অস্বীকার করা হচ্ছে। বরং এ ক্ষেত্রে অন্য শক্তিকে শরীক করা হচ্ছে। আর এটাই হচ্ছে শির্ক। শব্দগত আক্বীদা হিসেবে যদিও আল্লাহকে-ই রিযিকদাতা, জীবনদাতা, মৃত্যুদাতা, সৃষ্টিকর্তা, প্রভাবশালী, কর্তৃত্বসম্পন্ন, বিশ্ব ব্যবস্থাপক এবং রব বলে স্বীকার করা হয়; কিন্তু এ শ্রেণীর লোকেরাই মৃত বুযুর্গ লোকদের নিকট থেকে কোন কিছু পেতে আশা পোষণ করে। বিপদে পড়লে তাদের নিকটই নিষ্কৃতি চায়, উন্নতি তাদের নিকট থেকেই চায় লাভ করতে। মনে করে, এরা অলৌকিকভাবে মানুষের দু’আ শুনতে ও কবুল করতে পারে, সাহায্য করতে পারে, ফয়েজ দিতে পারে। ভাল-মন্দ করাতে ও ঘটাতে পারে। এ উদ্দেশ্যে তাদের সন্তোষ কামনা করে। আর তাদের সন্তোষ বিধানের জন্যই তাদের উদ্দেশ্যে মানত মানে, পশু যবাই করে, সিজদায় মাথা লুটিয়ে দেয়, নিজেদের ধন-সম্পদের একটা অংশ তাদের জন্য ব্যয় করা কর্তব্য মনে করে। ধীরে ধীরে কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে দেশ-দেশান্তর সফর করা হয়। এক নির্দিষ্ট দিনে ও সময়ে চারিদিক থেকে ভক্তেরা এসে জমায়েত হয়। ঠিক যেমন মুশরিক জাতিগুলো গমন করে তাদের জাতীয় তীর্থভূমে।
ইসলামের তাওহীদী আক্বীদার দৃষ্টিতে আল্লাহ ছাড়া আর কারো নিকট আর কাউকে সম্বোধন করে দু’আ করা সুস্পষ্ট শির্ক।

📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 ওলী-আউলিয়া, দরবেশ ও বুযুর্গদের প্রতি ধারণা পোষণ সংক্রান্ত শিরক

📄 ওলী-আউলিয়া, দরবেশ ও বুযুর্গদের প্রতি ধারণা পোষণ সংক্রান্ত শিরক


জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-দর্শন ও প্রযুক্তির স্বর্ণ শিখরে আরোহন করেও আধুনিক সমাজে অনেক বিজ্ঞজনই এমন ধারণা পোষণ করে যে, এ পৃথিবীতে অনেক সম্মানিত ওলী, দরবেশ, কুতুব, সালেহ মনীষী আছেন, যারা মানব সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশেষ ইলাহী শক্তি ও ক্ষমতার অধিকারী। তাঁরা মানুষের জীবনে উন্নতি-অবনতি, সুখ-দুঃখ, জয়-পরাজয় ও লাভ-ক্ষতি ইত্যাদি বিষয়ে উক্ত ক্ষমতা ব্যবহার করেন। এ ক্ষেত্রে অনেক কঠিন সমস্যা ও সংকটময় মুহূর্তে তাঁদেরকে সাহায্য-সমাধানের মুক্তিদাতা মনে করে স্রষ্টার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস পান। এ ছাড়া, আমাদের সমাজে এটা লক্ষ্যণীয় বিষয় যে, তথাকথিত জীবিত ওলী-সাধকদের চেয়ে মৃত ওলী ও দরবেশগণ অধিক রূপান্তর শক্তিতে মহিমান্বিত। তাই আমরা অগাধ মানসিক শ্রদ্ধা ও দৃঢ় বিশ্বাস ধারণপূর্বক তাঁদের মাযারে গমন করি এবং তাঁদের নাম ধরে সরাসরি অসিলা করে দু’আ কামনা করি। এ ধরনের কাজ ও বিশ্বাস নিঃসন্দেহে শিকের অন্তর্ভূক্ত। কঠিন সমস্যা, রোগ-ব্যাধি, মামলা-মোকদ্দমা ইত্যাদি অসুবিধায় পতিত হলে প্রচুর আহারীয় সামগ্রী, কালো টাকার বান্ডিল এবং অনেক নযর-মানত নিয়ে তাদের মাযারে গমন করি, অধিকন্তু তাদেরকে দু’আ ও মুক্তিদূত মনে করি। ইসলামী অনুশাসনের তোয়াক্কা না করে প্রবৃত্তিগতভাবে এমন ভক্তি ও শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়, যা প্রকাশ্য শিক। অবশ্য এ ধরনের ক্রিয়াকলাপের পশ্চাতে তারা যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, আওলিয়া, মাশায়িখ ও সালেহীন মনীষীগণ যেহেতু আল্লাহর বিধানের তত্ত্ব ও অন্ত র্নিহিত আধ্যাত্মিকতা প্রসঙ্গে সাধনা করেন, সেহেতু তাদেরকে কদমবুছি, এমনকি কৃতজ্ঞতামূলক সিজদা করাতে কোন দোষ নেই। বরং এটা পালনযোগ্য শিষ্টতাও বটে। মূলত এ সবের মাধ্যমে সর্বসাধারণের মাঝে শিক্ক ও বিদ’আত সংঘটিত হয়। লোকদের নিয়ে বাড়াবাড়ি করার কারণেই মূলত এ পৃথিবীতে সর্বপ্রথম শিকের সূচনা হয়েছিল। তাদের যা মর্যাদা তার চাইতে বেশী তাদেরকে সম্মান করা হয়েছিল, আর এ ধরনের ক্রিয়াকলাপই শির্কের চোরা গলির দরজা উম্মুক্ত করে।
সুন্নাহ ও শিক্ সংক্রান্ত কাম্য শিক্ষা না থাকার কারণে সমাজে আজ এ জটিলতা বিদ্যমান। সুতরাং আমাদের শরীয়ত, সুন্নাহ ও শিক সম্পর্কে প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণের বিষয়টি অত্যাবশ্যক বলে মনে করতে হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00