📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 মানুষের শিরক দ্বারা সংক্রামিত হওয়ার পর্যায়ক্রম

📄 মানুষের শিরক দ্বারা সংক্রামিত হওয়ার পর্যায়ক্রম


আমাদের সমাজে অতি সূক্ষ্ম পর্যায়ে শির্ক সংক্রমিত হয় যা অনেক সচেতন ব্যক্তিই সহজে উপলব্ধি করতে পারে না। সমাজের বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে আজ এতদসংক্রান্ত শিক্বমূলক কার্যক্রম ব্যাপক মাত্রায় পরিলক্ষিত হচ্ছে, উদাহরণস্বরূপ আমাদের মুসলিম সমাজে শিকের উৎপত্তি কিভাবে হল, উদাহরণস্বরূপ তা সংক্ষিপ্তভাবে নিম্নে উল্লেখিত হচ্ছে:
১. আল্লাহ্র আইন না মানা সংক্রান্ত শিক: আমাদের দেশে মানুষের মনগড়া আইন চালু আছে। আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা না করলে বোঝা যায় যে, মানুষের তৈরি চালু আইনকে মন থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। এ সব আইন বৈধ মনে করা যে শির্ক অনেকেই তা বুঝে না। যারা এ সব অবৈধ আইনকে উৎখাত করে আল্লাহ্র আইন তথা কুরআন ও সহীহ হাদীসের আইন চালু করার চেষ্টা করে তারা শিরক থেকে বেঁচে গেল। ইসলামের তাওহীদী আক্বীদায় আল্লাহর একত্বের অনন্যতা স্বীকৃত যেমন বিশ্বসৃষ্টি, 'লালন-পালন, রিযিক দান এবং দু'আ ও ইবাদত পাবার অধিকার প্রভৃতির ক্ষেত্রে, অনুরূপভাবে মানুষের বাস্তব জীবনের সর্বস্তরে ও সর্বক্ষেত্রে নিরংকুশভাবে আনুগত্য করে চলতে হবে কেবল এক আল্লাহকেই। মানুষের নিকট এ আনুগত্য পাবার একমাত্র অধিকার হচ্ছে আল্লাহর, আল্লাহ ব্যতীত আর কারোই এ অধিকার নেই, যেমন সমগ্র বিশ্বলোক, বিশ্বলোকের অণু-পরমাণু পর্যন্ত আনুগত্য করে চলেছে এক আল্লাহর। উপরন্তু, নিখিল জগতের সবকিছুর ওপর যেমন আল্লাহর বিধান চলে এক আল্লাহর তেমনি মানুষের জীবনেও সর্বদিক ও বিভাগে আইন জারী করার নিরংকুশ অধিকারও একমাত্র আল্লাহর। আল্লাহর সৃষ্ট এ মানুষের ওপর আল্লাহর ছাড়া আর কারোরই আইন জারী করার অধিকার নেই। মানুষও পারে না আল্লাহ ছাড়া আর কারো আইন মেনে নিতে ও পালন করতে। করলে তা হবে সম্পূর্ণরূপে অনধিকার চর্চা, অন্যায় এবং অনাচার; তা হবে সুস্পষ্টরূপে শির্ক।
বস্তুত মানুষের জন্য আইন-বিধান আল্লাহই রচনা করবেন, মানুষ তার জীবনের সকল দিক ও বিভাগে কেবল তাঁরই দেয়া আইন পালন করে চলবে। তাঁর দেয়া আইন-বিধানের বিপরীত কোন কাজ কিছুতেই করবে না। কেননা, মানুষের ওপর হুকুম করার অন্য কথায় আইন দেয়ার ও জারী করার অধিকার তো আল্লাহ ছাড়া আর কারোই নেই, থাকতে পারে না। এ বিষয়ে মূল কথা হল, আমরা কাকে এ অধিকার দিচ্ছি যে, সে আমাদের জন্য আইন রচনা করবে, আর আমরা তা পালন করব, করতে প্রস্তুত হব, আর কাকে এ অধিকার দিচ্ছি না। যদি আমরা একমাত্র আল্লাহকে এ অধিকার দেই, তাহলে আল্লাহর তাওহীদ বিশ্বাস পূর্ণ হল, আর যদি অন্য কাউকে কাউকে, কোন ব্যক্তিকে, কোন প্রতিষ্ঠানকে এ অধিকার দেই বা অধিকার আছে বলে মনে করি, তাহলে প্রকৃতপক্ষে সে-ই হল আমাদের আল্লাহ, আর আমরা তার বান্দা-দাস। কিন্তু এ শেষোক্ত অবস্থা নিঃসন্দেহে শিক্ক-এর অবস্থা।
নির্দেশ দান, হস্তক্ষেপকরণ, ইচ্ছা করা ও মালিকানা বা নিরংকুশ কর্তৃত্ব এ সবকিছুই একমাত্র আল্লাহর জন্য। তিনি তাঁর বান্দাদের চূড়ান্তভ বে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তারা এক আল্লাহ ছাড়া আর কারোরই ইবাদাত-বন্দেগী বা দাসত্ব করবে না। মূলত, যার হুকুম পালন করা হয়, কার্যত তারই দাসত্ব করা হয়। আর কারো হুকুম আইন, আদেশ-নিষেধ, হালাল-হারাম পালন করা, মেনে নেয়া ও অনুসরণ করাই হচ্ছে শরীয়াতের পরিভাষায় ইবাদাত। কাজেই এ ব্যাপারে আল্লাহকেই একমাত্র আইনদাতা বলে মেনে নেয়া তাওহীদেরই আক্বীদা এবং আমল। আর এ দিক দিয়ে অপর কাউকে এ অধিকার দিলে তা হবে সুস্পষ্ট শির্ক। রাসূল (ﷺ)-এর পরে খুলাফায়ে রাশেদীনের আমলেও মুসলিমদের আক্বীদা ও আমল ছিল এ রকমই।
কিন্তু উত্তরকালে মুসলিম সমাজে তাওহীদের এ মৌলিক ভাবধারা- যাকে আমাদের ভাষায় বলতে পারি, তাওহীদ আক্বীদার রাজনৈতিক তাৎপর্য স্তিমিত হয়ে আসে। শেষ পর্যন্ত এমন একদিনও আসে, যখন মুসলিমরা দ্বীন-ইসলাম ধর্ম ও রাজনীতিকে দুই বিচ্ছিন্ন ও পরস্পর সম্পর্কহীন বিষয় বলে মনে করতে শুরু করে এবং এ মনোভাবের ফলে ধর্মের ক্ষেত্রে ধর্মীয় নেতাদের কর্তৃত্ব মেনে নেয়। কেবল আল্লাহর হুকুমই নয়, সেই সঙ্গে ধর্মনেতা তথা পীর সাহেবের হুকুম পালন করাও দরকারী বলে মনে করে। জীবনের বৃহত্তম দিক- রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক কাজকর্মকে ইসলামের আওতার বাইরে বলে মনে করে। সেখানে মেনে নেয়া হয় রাজনীতিক ও শাসকদের বিধান। সলাতের ইমামতি ধার্মিক লোকেই করবে বলে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু সমাজ, রাষ্ট্র ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ফাসিকু-ফাজির তথা ইসলামের দুশমনদের নেতৃত্ব স্বীকার করে নিতেও এতটুকু দ্বিধাবোধ করা না। শুধু তাই নয়, ব্যক্তিগত জীবনে যারা ধর্মকে খুব গুরুত্ব সহকারে পালন করে, পালন করা দরকার মনে করে, তারাই যখন রাজনীতি করতে নামে, তখন সেখানে করে চরম গায়র-ইসলামী রাজনীতি, চরম শরীয়াত বিরোধী সামাজিকতা এবং সুস্পষ্ট হারাম উপায়ে লেনদেন ও ব্যবসা-বাণিজ্য। কেননা, এ সবের ক্ষেত্রে তারা আল্লাহকে হুকুম দেয়ার অধিকার দিতে রাজি হয় না, আল্লাহর হুকুম এ ক্ষেত্রেও মেনে চলতে হবে তা মনে করতে পারে না। ধর্ম ও রাজনীতি কিংবা ধর্ম ও অর্থনীতি ইত্যাদিকে বিচ্ছিন্ন ও পরস্পর সম্পর্কহীন মনে করাই হল আধুনিক সেকিউলারিজমের মূল কথা এবং ইসলামের তাওহীদী আক্বীদার সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দিকে এটা হল এক মারাত্মক বিভ্রান্তি। এ পর্যায়ে এসে সমাজের ধার্মিক লোকেরা আল্লাহকে পাবার জন্য পীর ধরা ফরয বলে প্রচার করে। আর অপর শ্রেণীর লোকেরা রাজতন্ত্র, বাদশাহী ও ডিকটেটরী শাসন ব্যবস্থা পর্যন্ত ইসলামসম্মত মনে করতে শুরু করে। ফাসিকু-ফাজির নেতা, রাজা-বাদশাহ ও ডিকটেটরকে বাস্তব জীবনে আইন-শাসনের ক্ষেত্রে ঠিক আল্লাহর স্থানে বসিয়ে দেয়। মুসলিমদের বাস্তব আনুগত্যের ক্ষেত্রে ধর্মীয় দিক দিয়ে আলিম ও পীরকে এবং জাগতিক ব্যাপারে রাজা-বাদশাহ, রাজনৈতিক নেতা ও ডিকটেটরকে আল্লাহর সমতুল্য করে তুলেছে। আল্লাহ যেমন মানুষের ওপর নিজস্ব আইন-বিধান জারি করেন, তেমনি ধর্মনেতা বা পীর-বুযুর্গ এবং রাজা-বাদশাহ ও রাষ্ট্রকর্তাদেরও নিজেদের মর্জীমতো আইন-বিধান জারী করার অধিকার আছে বলে মনে করেছে। ইসলামী ধর্ম ব্যবস্থায় এবং বৈষয়িক সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এমনিভাবেই এক মহা বিদআতের অনুপ্রবেশ সম্ভব হয়েছে। আর তারই ফলে আল্লাহর একচ্ছত্র তাওহীদী ধর্মে ধর্মনেতার তথা পীর-বুযুর্গ লোকদের এবং রাজনীতি ও সমাজ সংস্থায় সমাজকর্মী, সমাজনেতা, রাজনীতিক, অর্থনীতিবিদদের নিরংকুশ কর্তৃত্ব স্বীকার করে শিরকের এক অতি বড় বিদআত দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। পরবর্তীকালে ক্রমশ এমন একদিন এসে পড়ে, যখন রাজা বাদশাহ ও রাষ্ট্রকর্তাদের রচিত আইন-বিধান পালন করাকে আল্লাহর আইন পালনের মতোই কর্তব্য বলে মনে করতে থাকে। আর তাদের নাফরমানীকে আল্লাহর নাফরমানীর মতোই গুনাহের কাজ বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। অথচ, মুসলিমদের অবশ্য পালনীয় কাজ ছিল, এরূপ একজন ইমাম বা খলীফা নিয়োগ করা সেই দ্বীন-ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ, যে দ্বীন হল মুসলিমদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকসহ সামগ্রিক জীবনের ভিত্তি।
২. আল্লাহকে রিযিকদাতা, পালনকর্তা ও রক্ষাকর্তা হিসেবে না মানা সংক্রান্ত শিরক:
এ কথা কেবল মুসলিমদেরই নয়, পৃথিবীর কারোরই অজানা থাকার কথা নয় যে, ইসলামের মূল আক্বীদাই হচ্ছে তাওহীদ। তাওহীদ মানে আল্লাহর একত্ব। আল্লাহর এ একত্ব সার্বিক, পূর্ণাঙ্গ এবং সর্বাত্মক। এ দৃষ্টিকোণ থেকে আল্লাহ শুধু সৃষ্টিকর্তাই নন, তিনি একমাত্র পালনকর্তা, মালিক, রিযিকদাতা, রক্ষাকর্তা ও আইন-বিধানদাতাও। অতএব মানুষ ভয় করবে কেবল আল্লাহকে, ইবাদাত-বন্দেগী ও দাসত্ব করবে একমাত্র আল্লাহর। সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা ও লালন-পালনকারী হিসেবে মানবে একমাত্র আল্লাহকে। এ সব দিক দিয়ে তিনিই একমাত্র ইলাহ। তিনি ছাড়া কেউ ইলাহ নেই, কেউ ইলাহ নয়, কেউ মাবুদ হতে পারে না এবং তিনিই একমাত্র রব, তিনি ছাড়া লালন-পালনকারী ও ক্রমবিকাশ দাতা, রক্ষাকর্তা ও প্রয়োজনপূরণকারী আর কেউ নেই। মাবুদ একমাত্র তিনিই। তিনি ছাড়া আর কেউ মানুষের ইবাদাত-বন্দেগী ও আনুগত্য পাবার অধিকারী নয়। সংক্ষেপে বলা যায়, রব হওয়ার দিক দিয়েও তিনি এক, একক, অনন্য আর ইলাহ হওয়ার দিক দিয়েও তিনি এক, লা-শরীক। রবুবিয়‍্যাতের দিক দিয়েও আল্লাহ এক, উলুহিয়্যাতের দিক দিয়েও তিনি এক। এর কোন একটি দিক দিয়েও তাঁর শরীক কেউ নেই, জুড়ি নেই কেউ, সমতুল্য কেউ নেই।
ইসলামে এ তাওহীদী আক্বীদা কুরআন থেকে প্রমাণিত, প্রমাণিত সহীহ হাদীস থেকেও। রাসূল (ﷺ) সর্বশেষ নাবী ও রাসূল হিসেবে এ আক্বীদাই-ই পেশ করেছেন বিশ্ববাসীদের সামনে। দাওয়াত দিয়েছেন মৌলিক আক্বীদা হিসেবে এ তাওহীদকে গ্রহণ করার। যাঁরা সেদিন ইসলাম কবুল করেছিলেন, তাঁরা সকলে তাওহীদের এ ধারণার প্রতি ঈমান এনেই হয়েছিলেন মুসলিম। অতএব রাসূল (ﷺ)-এর সাহাবীরাও ছিলেন এ আক্বীদায় বিশ্বাসী। এ ব্যাপারে তাঁরা কখনও দুর্বলতা দেখাননি, এ ক্ষেত্রে কারো সাথে তাঁরা রাজী হননি কোনরূপ আপোষ বা সমঝোতা করতে। অতএব এটাই হচ্ছে সুন্নাতের তাওহীদ।
কিন্তু ইসলামের এ সুন্নাতী আক্বীদায় বর্তমানে দেখা দিয়েছে নানা শির্ক ও বিদআত। মুসলিম সমাজে আল্লাহকে এক ও অনন্য বলে সাধারণভাবে শিকার করা হয় বটে। কিন্তু কার্যত দেখা যায়, আল্লাহর উলুহিয়‍্যাতী তাওহীদের প্রতি যদিও বিশ্বাস রয়েছে; কিন্তু তার রবুবিয়‍্যাতের তাওহীদ স্বীকার করা হচ্ছে না। মুখে স্বীকার করা হলেও কার্যত অস্বীকার করা হচ্ছে। বরং এ ক্ষেত্রে অন্য শক্তিকে শরীক করা হচ্ছে। আর এটাই হচ্ছে শির্ক। শব্দগত আক্বীদা হিসেবে যদিও আল্লাহকে-ই রিযিকদাতা, জীবনদাতা, মৃত্যুদাতা, সৃষ্টিকর্তা, প্রভাবশালী, কর্তৃত্বসম্পন্ন, বিশ্ব ব্যবস্থাপক এবং রব বলে স্বীকার করা হয়; কিন্তু এ শ্রেণীর লোকেরাই মৃত বুযুর্গ লোকদের নিকট থেকে কোন কিছু পেতে আশা পোষণ করে। বিপদে পড়লে তাদের নিকটই নিষ্কৃতি চায়, উন্নতি তাদের নিকট থেকেই চায় লাভ করতে। মনে করে, এরা অলৌকিকভাবে মানুষের দু'আ শুনতে ও কবুল করতে পারে, সাহায্য করতে পারে, ফয়েজ দিতে পারে। ভাল-মন্দ করাতে ও ঘটাতে পারে। এ উদ্দেশ্যে তাদের সন্তোষ কামনা করে। আর তাদের সন্তোষ বিধানের জন্যই তাদের উদ্দেশ্যে মানত মানে, পশু যবাই করে, সিজদায় মাথা লুটিয়ে দেয়, নিজেদের ধন-সম্পদের একটা অংশ তাদের জন্য ব্যয় করা কর্তব্য মনে করে। ধীরে ধীরে কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে দেশ-দেশান্তর সফর করা হয়। এক নির্দিষ্ট দিনে ও সময়ে চারিদিক থেকে ভক্তেরা এসে জমায়েত হয়। ঠিক যেমন মুশরিক জাতিগুলো গমন করে তাদের জাতীয় তীর্থভূমে।
ইসলামের তাওহীদী আক্বীদার দৃষ্টিতে আল্লাহ ছাড়া আর কারো নিকট আর কাউকে সম্বোধন করে দু'আ করা সুস্পষ্ট শির্ক।
৩. ওলী-আওলিয়া, দরবেশ ও বুযুর্গদের প্রতি ধারণাপোষণ সংক্রান্ত শির্ক: জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-দর্শন ও প্রযুক্তির স্বর্ণ শিখরে আরোহন করেও আধুনিক সমাজে অনেক বিজ্ঞজনই এমন ধারণা পোষণ করে যে, এ পৃথিবীতে অনেক সম্মানিত ওলী, দরবেশ, কুতুব, সালেহ মনীষী আছেন, যারা মানব সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশেষ ইলাহী শক্তি ও ক্ষমতার অধিকারী। তাঁরা মানুষের জীবনে উন্নতি-অবনতি, সুখ-দুঃখ, জয়-পরাজয় ও লাভ-ক্ষতি ইত্যাদি বিষয়ে উক্ত ক্ষমতা ব্যবহার করেন। এ ক্ষেত্রে অনেক কঠিন সমস্যা ও সংকটময় মুহূর্তে তাঁদেরকে সাহায্য-সমাধানের মুক্তিদাতা মনে করে স্রষ্টার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস পান। এ ছাড়া, আমাদের সমাজে এটা লক্ষ্যণীয় বিষয় যে, তথাকথিত জীবিত ওলী-সাধকদের চেয়ে মৃত ওলী ও দরবেশগণ অধিক রূপান্তর শক্তিতে মহিমান্বিত। তাই আমরা অগাধ মানসিক শ্রদ্ধা ও দৃঢ় বিশ্বাস ধারণপূর্বক তাঁদের মাযারে গমন করি এবং তাঁদের নাম ধরে সরাসরি অসিলা করে দু'আ কামনা করি। এ ধরনের কাজ ও বিশ্বাস নিঃসন্দেহে শিকের অন্তর্ভূক্ত। কঠিন সমস্যা, রোগ-ব্যাধি, মামলা-মোকদ্দমা ইত্যাদি অসুবিধায় পতিত হলে প্রচুর আহারীয় সামগ্রী, কালো টাকার বান্ডিল এবং অনেক নযর-মানত নিয়ে তাদের মাযারে গমন করি, অধিকন্তু তাদেরকে দু'আ ও মুক্তিদূত মনে করি। ইসলামী অনুশাসনের তোয়াক্কা না করে প্রবৃত্তিগতভাবে এমন ভক্তি ও শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়, যা প্রকাশ্য শিক। অবশ্য এ ধরনের ক্রিয়াকলাপের পশ্চাতে তারা যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, আওলিয়া, মাশায়িখ ও সালেহীন মনীষীগণ যেহেতু আল্লাহর বিধানের তত্ত্ব ও অন্ত র্নিহিত আধ্যাত্মিকতা প্রসঙ্গে সাধনা করেন, সেহেতু তাদেরকে কদমবুছি, এমনকি কৃতজ্ঞতামূলক সিজদা করাতে কোন দোষ নেই। বরং এটা পালনযোগ্য শিষ্টতাও বটে। মূলত এ সবের মাধ্যমে সর্বসাধারণের মাঝে শিক্ক ও বিদ'আত সংঘটিত হয়। লোকদের নিয়ে বাড়াবাড়ি করার কারণেই মূলত এ পৃথিবীতে সর্বপ্রথম শিকের সূচনা হয়েছিল। তাদের যা মর্যাদা তার চাইতে বেশী তাদেরকে সম্মান করা হয়েছিল, আর এ ধরনের ক্রিয়াকলাপই শির্কের চোরা গলির দরজা উম্মুক্ত করে।
সুন্নাহ ও শিক্ সংক্রান্ত কাম্য শিক্ষা না থাকার কারণে সমাজে আজ এ জটিলতা বিদ্যমান। সুতরাং আমাদের শরীয়ত, সুন্নাহ ও শিক সম্পর্কে প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণের বিষয়টি অত্যাবশ্যক বলে মনে করতে হবে।

📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 আল্লাহর আইন না মানা সংক্রান্ত শিরক

📄 আল্লাহর আইন না মানা সংক্রান্ত শিরক


আমাদের দেশে মানুষের মনগড়া আইন চালু আছে। আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা না করলে বোঝা যায় যে, মানুষের তৈরি চালু আইনকে মন থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। এ সব আইন বৈধ মনে করা যে শির্ক অনেকেই তা বুঝে না। যারা এ সব অবৈধ আইনকে উৎখাত করে আল্লাহ্র আইন তথা কুরআন ও সহীহ হাদীসের আইন চালু করার চেষ্টা করে তারা শিরক থেকে বেঁচে গেল। ইসলামের তাওহীদী আক্বীদায় আল্লাহর একত্বের অনন্যতা স্বীকৃত যেমন বিশ্বসৃষ্টি, ‘লালন-পালন, রিযিক দান এবং দু’আ ও ইবাদত পাবার অধিকার প্রভৃতির ক্ষেত্রে, অনুরূপভাবে মানুষের বাস্তব জীবনের সর্বস্তরে ও সর্বক্ষেত্রে নিরংকুশভাবে আনুগত্য করে চলতে হবে কেবল এক আল্লাহকেই। মানুষের নিকট এ আনুগত্য পাবার একমাত্র অধিকার হচ্ছে আল্লাহর, আল্লাহ ব্যতীত আর কারোই এ অধিকার নেই, যেমন সমগ্র বিশ্বলোক, বিশ্বলোকের অণু-পরমাণু পর্যন্ত আনুগত্য করে চলেছে এক আল্লাহর। উপরন্তু, নিখিল জগতের সবকিছুর ওপর যেমন আল্লাহর বিধান চলে এক আল্লাহর তেমনি মানুষের জীবনেও সর্বদিক ও বিভাগে আইন জারী করার নিরংকুশ অধিকারও একমাত্র আল্লাহর। আল্লাহর সৃষ্ট এ মানুষের ওপর আল্লাহর ছাড়া আর কারোরই আইন জারী করার অধিকার নেই। মানুষও পারে না আল্লাহ ছাড়া আর কারো আইন মেনে নিতে ও পালন করতে। করলে তা হবে সম্পূর্ণরূপে অনধিকার চর্চা, অন্যায় এবং অনাচার; তা হবে সুস্পষ্টরূপে শির্ক।
বস্তুত মানুষের জন্য আইন-বিধান আল্লাহই রচনা করবেন, মানুষ তার জীবনের সকল দিক ও বিভাগে কেবল তাঁরই দেয়া আইন পালন করে চলবে। তাঁর দেয়া আইন-বিধানের বিপরীত কোন কাজ কিছুতেই করবে না। কেননা, মানুষের ওপর হুকুম করার অন্য কথায় আইন দেয়ার ও জারী করার অধিকার তো আল্লাহ ছাড়া আর কারোই নেই, থাকতে পারে না। এ বিষয়ে মূল কথা হল, আমরা কাকে এ অধিকার দিচ্ছি যে, সে আমাদের জন্য আইন রচনা করবে, আর আমরা তা পালন করব, করতে প্রস্তুত হব, আর কাকে এ অধিকার দিচ্ছি না। যদি আমরা একমাত্র আল্লাহকে এ অধিকার দেই, তাহলে আল্লাহর তাওহীদ বিশ্বাস পূর্ণ হল, আর যদি অন্য কাউকে কাউকে, কোন ব্যক্তিকে, কোন প্রতিষ্ঠানকে এ অধিকার দেই বা অধিকার আছে বলে মনে করি, তাহলে প্রকৃতপক্ষে সে-ই হল আমাদের আল্লাহ, আর আমরা তার বান্দা-দাস। কিন্তু এ শেষোক্ত অবস্থা নিঃসন্দেহে শিক্ক-এর অবস্থা।
নির্দেশ দান, হস্তক্ষেপকরণ, ইচ্ছা করা ও মালিকানা বা নিরংকুশ কর্তৃত্ব এ সবকিছুই একমাত্র আল্লাহর জন্য। তিনি তাঁর বান্দাদের চূড়ান্তভ বে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তারা এক আল্লাহ ছাড়া আর কারোরই ইবাদাত-বন্দেগী বা দাসত্ব করবে না। মূলত, যার হুকুম পালন করা হয়, কার্যত তারই দাসত্ব করা হয়। আর কারো হুকুম আইন, আদেশ-নিষেধ, হালাল-হারাম পালন করা, মেনে নেয়া ও অনুসরণ করাই হচ্ছে শরীয়াতের পরিভাষায় ইবাদাত। কাজেই এ ব্যাপারে আল্লাহকেই একমাত্র আইনদাতা বলে মেনে নেয়া তাওহীদেরই আক্বীদা এবং আমল। আর এ দিক দিয়ে অপর কাউকে এ অধিকার দিলে তা হবে সুস্পষ্ট শির্ক। রাসূল (ﷺ)-এর পরে খুলাফায়ে রাশেদীনের আমলেও মুসলিমদের আক্বীদা ও আমল ছিল এ রকমই।
কিন্তু উত্তরকালে মুসলিম সমাজে তাওহীদের এ মৌলিক ভাবধারা- যাকে আমাদের ভাষায় বলতে পারি, তাওহীদ আক্বীদার রাজনৈতিক তাৎপর্য স্তিমিত হয়ে আসে। শেষ পর্যন্ত এমন একদিনও আসে, যখন মুসলিমরা দ্বীন-ইসলাম ধর্ম ও রাজনীতিকে দুই বিচ্ছিন্ন ও পরস্পর সম্পর্কহীন বিষয় বলে মনে করতে শুরু করে এবং এ মনোভাবের ফলে ধর্মের ক্ষেত্রে ধর্মীয় নেতাদের কর্তৃত্ব মেনে নেয়। কেবল আল্লাহর হুকুমই নয়, সেই সঙ্গে ধর্মনেতা তথা পীর সাহেবের হুকুম পালন করাও দরকারী বলে মনে করে। জীবনের বৃহত্তম দিক- রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক কাজকর্মকে ইসলামের আওতার বাইরে বলে মনে করে। সেখানে মেনে নেয়া হয় রাজনীতিক ও শাসকদের বিধান। সলাতের ইমামতি ধার্মিক লোকেই করবে বলে গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু সমাজ, রাষ্ট্র ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ফাসিকু-ফাজির তথা ইসলামের দুশমনদের নেতৃত্ব স্বীকার করে নিতেও এতটুকু দ্বিধাবোধ করা হয় না। শুধু তাই নয়, ব্যক্তিগত জীবনে যারা ধর্মকে খুব গুরুত্ব সহকারে পালন করে, পালন করা দরকার মনে করে, তারাই যখন রাজনীতি করতে নামে, তখন সেখানে করে চরম গায়র-ইসলামী রাজনীতি, চরম শরীয়াত বিরোধী সামাজিকতা এবং সুস্পষ্ট হারাম উপায়ে লেনদেন ও ব্যবসা-বাণিজ্য। কেননা, এ সবের ক্ষেত্রে তারা আল্লাহকে হুকুম দেয়ার অধিকার দিতে রাজি হয় না, আল্লাহর হুকুম এ ক্ষেত্রেও মেনে চলতে হবে তা মনে করতে পারে না। ধর্ম ও রাজনীতি কিংবা ধর্ম ও অর্থনীতি ইত্যাদিকে বিচ্ছিন্ন ও পরস্পর সম্পর্কহীন মনে করাই হল আধুনিক সেকিউলারিজমের মূল কথা এবং ইসলামের তাওহীদী আক্বীদার সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দিকে এটা হল এক মারাত্মক বিভ্রান্তি। এ পর্যায়ে এসে সমাজের ধার্মিক লোকেরা আল্লাহকে পাবার জন্য পীর ধরা ফরয বলে প্রচার করে। আর অপর শ্রেণীর লোকেরা রাজতন্ত্র, বাদশাহী ও ডিকটেটরী শাসন ব্যবস্থা পর্যন্ত ইসলামসম্মত মনে করতে শুরু করে। ফাসিকু-ফাজির নেতা, রাজা-বাদশাহ ও ডিকটেটরকে বাস্তব জীবনে আইন-শাসনের ক্ষেত্রে ঠিক আল্লাহর স্থানে বসিয়ে দেয়। মুসলিমদের বাস্তব আনুগত্যের ক্ষেত্রে ধর্মীয় দিক দিয়ে আলিম ও পীরকে এবং জাগতিক ব্যাপারে রাজা-বাদশাহ, রাজনৈতিক নেতা ও ডিকটেটরকে আল্লাহর সমতুল্য করে তুলেছে। আল্লাহ যেমন মানুষের ওপর নিজস্ব আইন-বিধান জারি করেন, তেমনি ধর্মনেতা বা পীর-বুযুর্গ এবং রাজা-বাদশাহ ও রাষ্ট্রকর্তাদেরও নিজেদের মর্জীমতো আইন-বিধান জারী করার অধিকার আছে বলে মনে করেছে। ইসলামী ধর্ম ব্যবস্থায় এবং বৈষয়িক সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এমনিভাবেই এক মহা বিদআতের অনুপ্রবেশ সম্ভব হয়েছে। আর তারই ফলে আল্লাহর একচ্ছত্র তাওহীদী ধর্মে ধর্মনেতার তথা পীর-বুযুর্গ লোকদের এবং রাজনীতি ও সমাজ সংস্থায় সমাজকর্মী, সমাজনেতা, রাজনীতিক, অর্থনীতিবিদদের নিরংকুশ কর্তৃত্ব স্বীকার করে শিরকের এক অতি বড় বিদআত দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। পরবর্তীকালে ক্রমশ এমন একদিন এসে পড়ে, যখন রাজা বাদশাহ ও রাষ্ট্রকর্তাদের রচিত আইন-বিধান পালন করাকে আল্লাহর আইন পালনের মতোই কর্তব্য বলে মনে করতে থাকে। আর তাদের নাফরমানীকে আল্লাহর নাফরমানীর মতোই গুনাহের কাজ বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। অথচ, মুসলিমদের অবশ্য পালনীয় কাজ ছিল, এরূপ একজন ইমাম বা খলীফা নিয়োগ করা সেই দ্বীন-ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ, যে দ্বীন হল মুসলিমদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকসহ সামগ্রিক জীবনের ভিত্তি।

📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 আল্লাহকে বিচ্ছিন্নদাতা, পালনকর্তা ও রক্ষাকর্তা হিসেবে না মানা সংক্রান্ত শিরক

📄 আল্লাহকে বিচ্ছিন্নদাতা, পালনকর্তা ও রক্ষাকর্তা হিসেবে না মানা সংক্রান্ত শিরক


এ কথা কেবল মুসলিমদেরই নয়, পৃথিবীর কারোরই অজানা থাকার কথা নয় যে, ইসলামের মূল আক্বীদাই হচ্ছে তাওহীদ। তাওহীদ মানে আল্লাহর একত্ব। আল্লাহর এ একত্ব সার্বিক, পূর্ণাঙ্গ এবং সর্বাত্মক। এ দৃষ্টিকোণ থেকে আল্লাহ শুধু সৃষ্টিকর্তাই নন, তিনি একমাত্র পালনকর্তা, মালিক, রিযিকদাতা, রক্ষাকর্তা ও আইন-বিধানদাতাও। অতএব মানুষ ভয় করবে কেবল আল্লাহকে, ইবাদাত-বন্দেগী ও দাসত্ব করবে একমাত্র আল্লাহর। সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা ও লালন-পালনকারী হিসেবে মানবে একমাত্র আল্লাহকে। এ সব দিক দিয়ে তিনিই একমাত্র ইলাহ। তিনি ছাড়া কেউ ইলাহ নেই, কেউ ইলাহ নয়, কেউ মাবুদ হতে পারে না এবং তিনিই একমাত্র রব, তিনি ছাড়া লালন-পালনকারী ও ক্রমবিকাশ দাতা, রক্ষাকর্তা ও প্রয়োজনপূরণকারী আর কেউ নেই। মাবুদ একমাত্র তিনিই। তিনি ছাড়া আর কেউ মানুষের ইবাদাত-বন্দেগী ও আনুগত্য পাবার অধিকারী নয়। সংক্ষেপে বলা যায়, রব হওয়ার দিক দিয়েও তিনি এক, একক, অনন্য আর ইলাহ হওয়ার দিক দিয়েও তিনি এক, লা-শরীক। রবুবিয়‍্যাতের দিক দিয়েও আল্লাহ এক, উলুহিয়্যাতের দিক দিয়েও তিনি এক। এর কোন একটি দিক দিয়েও তাঁর শরীক কেউ নেই, জুড়ি নেই কেউ, সমতুল্য কেউ নেই।
ইসলামে এ তাওহীদী আক্বীদা কুরআন থেকে প্রমাণিত, প্রমাণিত সহীহ হাদীস থেকেও। রাসূল (ﷺ) সর্বশেষ নাবী ও রাসূল হিসেবে এ আক্বীদাই-ই পেশ করেছেন বিশ্ববাসীদের সামনে। দাওয়াত দিয়েছেন মৌলিক আক্বীদা হিসেবে এ তাওহীদকে গ্রহণ করার। যাঁরা সেদিন ইসলাম কবুল করেছিলেন, তাঁরা সকলে তাওহীদের এ ধারণার প্রতি ঈমান এনেই হয়েছিলেন মুসলিম। অতএব রাসূল (ﷺ)-এর সাহাবীরাও ছিলেন এ আক্বীদায় বিশ্বাসী। এ ব্যাপারে তাঁরা কখনও দুর্বলতা দেখাননি, এ ক্ষেত্রে কারো সাথে তাঁরা রাজী হননি কোনরূপ আপোষ বা সমঝোতা করতে। অতএব এটাই হচ্ছে সুন্নাতের তাওহীদ।
কিন্তু ইসলামের এ সুন্নাতী আক্বীদায় বর্তমানে দেখা দিয়েছে নানা শির্ক ও বিদআত। মুসলিম সমাজে আল্লাহকে এক ও অনন্য বলে সাধারণভাবে শিকার করা হয় বটে। কিন্তু কার্যত দেখা যায়, আল্লাহর উলুহিয়‍্যাতী তাওহীদের প্রতি যদিও বিশ্বাস রয়েছে; কিন্তু তার রবুবিয়‍্যাতের তাওহীদ স্বীকার করা হচ্ছে না। মুখে স্বীকার করা হলেও কার্যত অস্বীকার করা হচ্ছে। বরং এ ক্ষেত্রে অন্য শক্তিকে শরীক করা হচ্ছে। আর এটাই হচ্ছে শির্ক। শব্দগত আক্বীদা হিসেবে যদিও আল্লাহকে-ই রিযিকদাতা, জীবনদাতা, মৃত্যুদাতা, সৃষ্টিকর্তা, প্রভাবশালী, কর্তৃত্বসম্পন্ন, বিশ্ব ব্যবস্থাপক এবং রব বলে স্বীকার করা হয়; কিন্তু এ শ্রেণীর লোকেরাই মৃত বুযুর্গ লোকদের নিকট থেকে কোন কিছু পেতে আশা পোষণ করে। বিপদে পড়লে তাদের নিকটই নিষ্কৃতি চায়, উন্নতি তাদের নিকট থেকেই চায় লাভ করতে। মনে করে, এরা অলৌকিকভাবে মানুষের দু’আ শুনতে ও কবুল করতে পারে, সাহায্য করতে পারে, ফয়েজ দিতে পারে। ভাল-মন্দ করাতে ও ঘটাতে পারে। এ উদ্দেশ্যে তাদের সন্তোষ কামনা করে। আর তাদের সন্তোষ বিধানের জন্যই তাদের উদ্দেশ্যে মানত মানে, পশু যবাই করে, সিজদায় মাথা লুটিয়ে দেয়, নিজেদের ধন-সম্পদের একটা অংশ তাদের জন্য ব্যয় করা কর্তব্য মনে করে। ধীরে ধীরে কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে দেশ-দেশান্তর সফর করা হয়। এক নির্দিষ্ট দিনে ও সময়ে চারিদিক থেকে ভক্তেরা এসে জমায়েত হয়। ঠিক যেমন মুশরিক জাতিগুলো গমন করে তাদের জাতীয় তীর্থভূমে।
ইসলামের তাওহীদী আক্বীদার দৃষ্টিতে আল্লাহ ছাড়া আর কারো নিকট আর কাউকে সম্বোধন করে দু’আ করা সুস্পষ্ট শির্ক।

📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 ওলী-আউলিয়া, দরবেশ ও বুযুর্গদের প্রতি ধারণা পোষণ সংক্রান্ত শিরক

📄 ওলী-আউলিয়া, দরবেশ ও বুযুর্গদের প্রতি ধারণা পোষণ সংক্রান্ত শিরক


জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-দর্শন ও প্রযুক্তির স্বর্ণ শিখরে আরোহন করেও আধুনিক সমাজে অনেক বিজ্ঞজনই এমন ধারণা পোষণ করে যে, এ পৃথিবীতে অনেক সম্মানিত ওলী, দরবেশ, কুতুব, সালেহ মনীষী আছেন, যারা মানব সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশেষ ইলাহী শক্তি ও ক্ষমতার অধিকারী। তাঁরা মানুষের জীবনে উন্নতি-অবনতি, সুখ-দুঃখ, জয়-পরাজয় ও লাভ-ক্ষতি ইত্যাদি বিষয়ে উক্ত ক্ষমতা ব্যবহার করেন। এ ক্ষেত্রে অনেক কঠিন সমস্যা ও সংকটময় মুহূর্তে তাঁদেরকে সাহায্য-সমাধানের মুক্তিদাতা মনে করে স্রষ্টার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস পান। এ ছাড়া, আমাদের সমাজে এটা লক্ষ্যণীয় বিষয় যে, তথাকথিত জীবিত ওলী-সাধকদের চেয়ে মৃত ওলী ও দরবেশগণ অধিক রূপান্তর শক্তিতে মহিমান্বিত। তাই আমরা অগাধ মানসিক শ্রদ্ধা ও দৃঢ় বিশ্বাস ধারণপূর্বক তাঁদের মাযারে গমন করি এবং তাঁদের নাম ধরে সরাসরি অসিলা করে দু’আ কামনা করি। এ ধরনের কাজ ও বিশ্বাস নিঃসন্দেহে শিকের অন্তর্ভূক্ত। কঠিন সমস্যা, রোগ-ব্যাধি, মামলা-মোকদ্দমা ইত্যাদি অসুবিধায় পতিত হলে প্রচুর আহারীয় সামগ্রী, কালো টাকার বান্ডিল এবং অনেক নযর-মানত নিয়ে তাদের মাযারে গমন করি, অধিকন্তু তাদেরকে দু’আ ও মুক্তিদূত মনে করি। ইসলামী অনুশাসনের তোয়াক্কা না করে প্রবৃত্তিগতভাবে এমন ভক্তি ও শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়, যা প্রকাশ্য শিক। অবশ্য এ ধরনের ক্রিয়াকলাপের পশ্চাতে তারা যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, আওলিয়া, মাশায়িখ ও সালেহীন মনীষীগণ যেহেতু আল্লাহর বিধানের তত্ত্ব ও অন্ত র্নিহিত আধ্যাত্মিকতা প্রসঙ্গে সাধনা করেন, সেহেতু তাদেরকে কদমবুছি, এমনকি কৃতজ্ঞতামূলক সিজদা করাতে কোন দোষ নেই। বরং এটা পালনযোগ্য শিষ্টতাও বটে। মূলত এ সবের মাধ্যমে সর্বসাধারণের মাঝে শিক্ক ও বিদ’আত সংঘটিত হয়। লোকদের নিয়ে বাড়াবাড়ি করার কারণেই মূলত এ পৃথিবীতে সর্বপ্রথম শিকের সূচনা হয়েছিল। তাদের যা মর্যাদা তার চাইতে বেশী তাদেরকে সম্মান করা হয়েছিল, আর এ ধরনের ক্রিয়াকলাপই শির্কের চোরা গলির দরজা উম্মুক্ত করে।
সুন্নাহ ও শিক্ সংক্রান্ত কাম্য শিক্ষা না থাকার কারণে সমাজে আজ এ জটিলতা বিদ্যমান। সুতরাং আমাদের শরীয়ত, সুন্নাহ ও শিক সম্পর্কে প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণের বিষয়টি অত্যাবশ্যক বলে মনে করতে হবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00