📄 ঈসা (আ.)-এর উম্মতের মাঝে শিরক
ঈসা (আ:)-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়ার পর তাঁর উম্মতের মাঝে শিকের প্রবর্তন ঘটে। ‘বুলিস’ নামক জনৈক ধোঁকাবাজ, প্রতারক ঈসা (আ:)-এর ওপর বাহ্যিক ঈমান আনার নাম করে খ্রিস্টান ধর্মে ত্রিত্ববাদ, ক্রুশের পূজাসহ বিভিন্ন মূর্তিপূজার প্রচলন ঘটায়।
একত্ববাদী ইয়াহুদী ধর্ম হতে বহু-ঈশ্বরবাদী খ্রিস্টান ধর্মের ঐতিহাসিক উৎপত্তি হচ্ছে মূলধর্ম থেকে বিচ্যুত হওয়ার এক অন্যতম প্রমাণ। যিশু [ঈসা (আ)। কর্তৃক প্রদর্শিত স্রষ্টার একত্বকে ধ্বংসের মাধ্যমে দ্বিত্ববাদের উত্থান ঘটানো হল। দ্বিত্ববাদ অনুযায়ী যিশু [ঈসা (আ)। স্বয়ং স্রষ্টা ছিলেন না, বরং তাঁর সৃষ্ট পুত্র ছিলেন। অ্যানাক্সাগৌরাস থেকে এরিস্টোটল পর্যন্ত প্রচারিত গ্রীক মতাদর্শে গ্রীকরা যিশুকে [ঈসা (আ:)-কে ‘লৌগাস’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তারপর রোমানদের মধ্যে এ দ্বিত্ববাদের অধঃপতন ঘটে। ফলে ত্রিত্ববাদের উন্মেষ ঘটে। এমনকি ত্রিত্ববাদকে তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুমোদন করে। অবশেষে রোমান ক্যাথলিক গির্জায় সম্পূর্ণরূপে ত্রিত্ববাদের চর্চা চালু হয়। এ ক্ষেত্রে যিশুর [ঈসা (আ:)] মা মেরি [মারিয়াম (আ:)] এবং তথাকথিত অন্যান্য অনেক সন্তদেরকে মানুষ ও স্রষ্টার মাঝে মধ্যস্থতাকারী বলে দাবী করা হয়। শুধু তাই নয়, মানুষের নিরাপত্তা বিধানের ক্ষমতাও এদের উপরে অর্পণ করা হয়।
নাবী যিশু [ঈসা (আ:)] কর্তৃক প্রদত্ত শিক্ষানুসারে আদি খ্রিষ্টধর্ম স্রষ্টার একত্বে বিশ্বাসী ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে গ্রীক ও রোমানদের মতাদর্শের প্রভাবে তা সম্পূর্ণরূপে বিকৃত হয়ে যায়। এর ফলে মূর্তি তৈরির জন্য সবাই ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ল। সাধারণ যুদ্ধ বা ধর্মযুদ্ধে নিহতদের, বিভিন্ন পর্যায়ের ধর্মযাজক (সন্ত), ধর্ম সংস্কারক, মেরি (মারিয়াম), যিশু [ঈসা (আ:)] এবং এমনকি স্বয়ং স্রষ্টার মূর্তি তৈরি করা হল।
টিকাঃ
১. এ দার্শনিকদের মতানুসারে, মহাবিশ্বের নিয়ন্ত্রণকারী অশরীরী আত্মা হল নাউস এবং লৌগাস হল নাউস-এর দৈহিক প্রকাশ। (Dictionary of Philosophy and Religions, ৩১৪ পৃ.।)
২. ক্যাপ্পাডোসিয়ানরা ত্রিত্ববাদের পূর্ণাঙ্গ মৌলিক সূত্রের প্রণয়ন করেন এবং কন্সট্যান্টিনোপলের রোমান কাউন্সিল কর্তৃক ৩৮১ খ্রিস্টাব্দে তা অনুমোদিত হয়। এ ত্রিত্ববাদ অনুযায়ী স্রষ্টা মাত্র একজন হলেও স্রষ্টা মূলত পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা- এ তিনজনের মাধ্যমে স্রষ্টার প্রকাশ ঘটে। (Dictionary of Philosophy and Religions, ৫৮৬ পৃ.।)
৩. ঈশ্বরে (স্রষ্টায়) বিশ্বাসের নিদর্শন হিসেবে মূর্তি নির্মাণে নিসিয়ার দ্বিতীয় কাউন্সিল (৭৮৭ খ্রিষ্টাব্দ) সরকারিভাবে অনুমোদন করেছিল। তাদের ধারণা মতে, স্বর্গীয় Logus (অর্থ ‘শব্দ’) যেহেতু সম্পূর্ণরূপে মানবীয় রূপে আবির্ভূত হয়েছিল, তাই তাঁকে যেকোন রূপে রূপায়িত করা যায়। (Dictionary of Religions, ১৫৯ পৃ.)
📄 আরব জাহানে শিরক
ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, মুহাম্মাদ (সা:)-এর রাসূল হয়ে প্রেরিত হওয়ার প্রাক্কালে আরব দ্বীপের অধিবাসীদের অধিকাংশ লোকেরাই ‘আরবুল ‘আরিবাহ ও ‘আরবুল মুসতা’রিবা-এর অধঃস্তন বংশধর ছিল। মক্কা নগরী ও এর পার্শ্ববর্তী স্থানসমূহে আল-‘আরাবুল মুসতা’রিবা’দের বসবাস ছিল। তবে আল-‘আরাবুল ‘আরিবাহ’রাই হল সেখানে অভিবাসনকারী। এদের প্রথম পুরুষ যিনি এ দ্বীপে অভিবাসন গ্রহণ করেন, তিনি হলেন ইসমাঈল (আ:)। তাঁকে আমাদের আদি পিতা ইব্রাহীম (আ:) তাঁর মাতাসহ ছোট বেলায় কা’বা শরীফের পার্শ্বে আল্লাহ্র আদেশে রেখে গিয়েছিলেন।
ইসমাঈল (আ:) বড় হয়ে জনগণকে তাঁর পিতা ইব্রাহীম (আ:)-এর দ্বীনের প্রতি আহ্বান জানান। ফলে সে সময়ের অধিকাংশ লোকেরাই তাঁর অনুসারী হয়ে মহান আল্লাহর উলুহিয়্যাত ও রুবুবিয়্যাতে সম্পূর্ণরূপে তাওহীদে বিশ্বাসী হয়ে যায়। যুগের আবর্তনে যখন তাদের মধ্যে কয়েক প্রজন্ম অতিক্রান্ত হয়ে যায় এবং দীর্ঘদিন যাবৎ ধর্ম সম্পর্কে তারা নতুন করে কোন শিক্ষা পায়নি, তখন তারা ধর্মের অনেক বিষয়াদি ধীরে ধীরে ভুলতে থাকে। এক পর্যায়ে তাদের মাঝে শুধু তাওহীদী বিশ্বাস এবং ইব্রাহীম (আ:)-এর স্মৃতি বিজড়িত কিছু ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান ও নিদর্শনাদি ব্যতীত আর কিছুই অবশিষ্ট থাকেনি। অবশেষে তারা তাওহীদী বিশ্বাস থেকেও বিচ্যুত হয়ে মূর্তি পূজা করার ফলে মুশরিকে পরিণত হয়। তাদের মাঝে প্রতিমা পূজার মাধ্যমে শির্কী কর্মকাণ্ডের সূচনা হয় কা’বা শরীফের সম্মানে এর পার্শ্ব থেকে সংগৃহীত পাথরের চার পার্শ্বে ত্বাওয়াফ করার মাধ্যমে, যা তারা মক্কা থেকে দূর-দূরান্তে হিজরত করার সময় সাথে করে নিয়ে অবতরণ স্থলের এক পার্শ্বে স্থাপন করত। তাদের মাঝে ইব্রাহীম ও ইসমাঈল (আ:)-এর ধর্মের কিছু বিষয়াদী যেমন- কা’বা শরীফের সম্মান করা, এর ত্বাওয়াফ, তজ্জ ও ‘উমরা করা, সাফা ও মারওয়াহ পর্বতদ্বয়ে সা’য়ী করা, আরাফা ও মুযদালিফায় অবস্থান গ্রহণ করা, আল্লাহ্র সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে উট ও বকরী কুরবানী বা উৎসর্গ করা... ইত্যাদি কর্ম প্রচলিত ছিল। যদিও এ সব ক্ষেত্রে তারা নিজ থেকে কিছু বিষয়াদী সংযোজন ও বিয়োজন করেছিল যা মূল ধর্মীয় কর্মের অন্তর্ভূক্ত ছিল না।
এরপর তাদের ধর্মীয় অবস্থার আরো অবনতি ঘটে। তাদের মাঝে মূর্তি পূজার মাধ্যমে শিক্বী কর্মকাণ্ড শুরু হয় রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর রিসালাত লাঝের প্রায় ৩০০ বছর পূর্বে খুযা’আহ গোত্র প্রধান ও মান্যবর ব্যক্তিত্ব ‘আমর ইবন লুহাই-এর মাধ্যমে। ঐতিহাসিক ইবন হিশামের বর্ণনা মতে, ‘আমর ইবন লুহাই কোন উপলক্ষ্যে মক্কা থেকে সিরিয়া গমন করে সেখানকার লোকদেরকে কতিপয় মূর্তির পূজা করতে দেখে বলে, ‘এ মৃতিগুলো কী, যাদের আপনারা উপাসনা করছেন?’ উত্তরে লোকেরা বলল, ‘এদের কাছে বৃষ্টি চাইলে এরা আমাদেরকে বৃষ্টি দান করে, সাহায্য চাইলে তারা আমাদের সাহায্য করে। এ কথা শুনে ‘আমর ইবন লুহাই বলল, ‘এদের মধ্য থেকে একটি মৃতি আমাকে দান করুন, আমি সেটাকে আরব দেশে নিয়ে যাব, ফলে আরবরা এর উপাসনা করবে।’ এতে লোকেরা তাকে ‘হুবল’ নামের একটি মূর্তি দান করে। তারপর সে তা নিয়ে মক্কায় আগমন করে এবং তা কা’বা শরীফের নিকটতম এক স্থানে সম্মানের সাথে স্থাপন করার পর আরব জনগণকে এর উপাসনা ও সম্মান করার জন্য নির্দেশ করে।
এ ‘আমর ইবন লুহাই ছিল জ্বিন সাধক। সে তার অনুগত জ্বিনের পরামর্শ অনুযায়ী নূহ (আ:)-এ জাতির উপাস্য সেই মূর্তিগুলো জিদ্দা এলাকা থেকে মাটি খনন করে বের করে নিয়ে আসে। সেগুলোকে নূহ (আ:)-এর সময়কার প্রলয়ঙ্করী বন্যা ও তুফান এ অঞ্চলে বয়ে নিয়ে এসেছিল। ধীরে ধীরে বন্যার পানি নেমে যাবার সময় এগুলো জিদ্দা এলাকার চরাঞ্চলে আটকা পড়েছিল এবং পরবর্তীতে তা বালুর নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিল। ‘আমর ইবন লুহাই তার অনুগত জ্বিনের পরামর্শে এগুলোকে বের করে নিয়ে এসে হজ্জের মৌসুমে আরব জনগণকে এগুলোর উপাসনা করার প্রতি আহ্বান জানায়। লোকেরা এতে তার আনুগত্য স্বীকার করলে সে বিভিন্ন গোত্রের মাঝে তা বন্টন করে দেয়। সে অনুযায়ী ‘ওয়াদ’ নামের মূর্তিটি ছিল দাওমাতুল জানদাল এলাকার ‘কালব’ গোত্রের নিকট, সুয়া’ নামের মূর্তিটি ছিল ‘হুজায়েল’ গোত্রের নিকট, ‘ইয়াগুছ’ নামের মূর্তিটি ছিল হামাদন গোত্রের নিকট।
উপরোক্ত পাঁচটি মূর্তির পাশাপাশি আরব জনপদে আরো অসংখ্য মূর্তি ছিল। আরবের লোকেরা ছোট-বড় বিভিন্ন রকমের মূর্তিদেরকে আল্লাহ তা’আলার রুবুবিয়্যাত ও উলুহিয়্যাতের বৈশিষ্ট্যে সমকক্ষ বানিয়ে নিয়েছিল। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি মৃতি হচ্ছে লাত, উয্যা, মানাত, ইয়াসাফ, নায়েলাহ, জুল খাসাসাহ, জুল কাফীল ইত্যাদি। এ ছাড়া কা’বার বাইরে ৩৬০টি মূর্তি স্থাপিত ছিল। বিভিন্ন মূর্তির উপাসনা বা পূজা করার পাশাপাশি আরবের জনগণ নানা রকম পাথর, গৃহ, ফেরেশতা, জ্বিন ও গাছের উপাসনায় লিপ্ত হয়েছিল।
আরবরা যে সকল শির্কে নিমজ্জিত ছিল তা নিম্নরূপ:
জ্ঞানগত শিরক:
১. তাদের ভাগ্য জানার জন্য গণক ও জ্যোতিষীদের নিকট গমন করা,
২. দেবতারা আল্লাহর নিকটবর্তী করে দিতে সক্ষম বলে মনে করা,
৩. আউলিয়া নামের দেবতাদেরকে শাফা’আতকারী মনে করা,
৪. দেবতার নিকট থেকে ভাগ্য যাচাই করা,
৫. পৃথিবীর ঘটনা প্রবাহে নক্ষত্রের প্রভাবে বিশ্বাস করা,
৬. ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদেরকে প্রতিপালকের বৈশিষ্ট্য দান করা,
৭. কোন কোন রোগ নিজ থেকে সংক্রমিত হয় বলে বিশ্বাস করা,
উপাসনাগত শিরক:
১. চন্দ্র ও সূর্যকে সিজদা করা,
২. দেবতাদের যিয়ারত করতে দূর-দূরান্তে গমন করা,
৩. দেবতাদের চারপার্শ্বে প্রদক্ষিণ করা,
৪. বরকত হাসিলের জন্য দেবতাদের গায়ে হাত বুলানো,
অন্তরের ইবাদতগত শিরক:
১. দেবতাদের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা,
২. দেবতাদের অনিষ্টের গোপন ভয় করা,
৩. বিপদে দেবতাদের শরণাপন্ন হওয়া,
৪. বিপদে দেবতাদেরকে আশ্রয়স্থল হিসেবে মনে করা,
৫. দেবতাদের উপর ভরসা করা।
অভ্যাসগত শিরক:
১. দেব-দেবীদের নামে শপথ করা,
২. দেব-দেবীদের নামে সন্তানাদির নাম রাখা,
৩. দেব-দেবীদের নিকট সন্তানের জন্য কল্যাণ কামনা করা,
৪. আল্লাহ্র প্রতি মিথ্যারোপ করে কোন বস্তু হালাল বা হারাম করা,
৫. শিরকযুক্ত কথার মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক দেয়া,
৬. শিশুদের তা’বিজ পরানো,
৭. শিশুদের গলায় ঝিনুকের মুক্তা ঝুলিয়ে রাখা,
৮. রোগ নিরাময়ের জন্য ধাতব দ্রব্য নির্মিত বালা ব্যবহার করা,
৯. মূর্তি ও প্রতিমার স্থলে মেলা বসানো,
১০. নাবী ও অলিদের কবরে মসজিদ নির্মাণ করা,
১১. পাখি উড়িয়ে ভাগ্য পরীক্ষা করা,
১২. উপত্যকার জ্বিনের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা,
১৩. বরই গাছ দ্বারা বরকত গ্রহণ করা।
📄 উম্মতে মুহাম্মদীয়ীর মাঝে শিরক
খালেস তাওহীদের দাবীদার এবং তাওহীদের ভিত্তির ওপর যাদের জাতীয়তা প্রতিষ্ঠিত সে সব মুসলিমদের নিকটে এটা অবিসংবাদিত কথা যে, স্থান ও পাত্র পরিবর্তন দ্বারা কখনো বস্তুর মূল তত্ত্বের বিবর্তন হয় না। মুশরিকদের মধ্যে যেসব বস্তু শিক, আহলে কিতাবদের মধ্যে এবং মুনাফিকদের মধ্যে যা কিছু শির্ক, সেই বস্তুই যদি মুসলিমেদের মধ্যে পাওয়া যায়, তা কখনো তাওহীদ হবে না, বরং শিক্কই থাকবে। মলমূত্র যদিও স্বর্ণ-রৌপ্যের নির্মিত সুন্দরতম পাত্রে রাখা হয়, উভয় স্থানেই তা অপবিত্র। স্থান ও পাত্র পরিবর্তনের ফলে তার মূল গুণ ও বৈশিষ্ট্যের মধ্যে কোনই পার্থক্য হয় না। অবশ্য কিছু ক্ষেত্রে অবস্থার পরিবর্তনের ফলে তার হুকুম অবশ্যই পরিবর্তন হয়।
মুসলিমদের অবস্থা যদি পর্যালোচনা করা হয় এবং প্রকৃত সত্যকে স্বীকৃতি দিতে কোনরূপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয়, তবে আমাদের অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, প্রাচীন আরবীয় জাহিলিয়াত হতে আরম্ভ করে মুনাফিকদের পর্যন্ত শিরকের যতগুলো শ্রেণী রয়েছে, তার প্রায় সবটুকুই মুসলিমদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। বিবর্তন শুধু রূপরেখায় এসেছে, আসল বস্তুতে নয়। জাহেলী আরবে জ্বিনদের পূজা, নক্ষত্ররাজীর পূজা, পূর্বপুরুষদের পূজা, আলিম-উলামা-পীর-পুরোহিত ও ধর্ম যাজকদের পূজা, জিবত পূজা, তাগুতের পূজা, জাতি পূজা ও শিকের সহায়তা, মুনাফিকদের তাগুত পূজা, আমিত্বের পূজা, স্বার্থের পূজা ইত্যাদি সব কিছুর মধ্যে এমন কোন পূজা নেই, যা বর্তমান মুসলিম সমাজে পাওয়া যাবে না।
বহু মুসলিম রয়েছে যারা যাদু বিদ্যা, ভাগ্য গণনা বিদ্যা ইত্যাদি অভিশপ্ত শির্কী কাজের মধ্যে লিপ্ত রয়েছে। তারা তাবীজ-তুমার, যাদু-টোটকা, সোলায়মানী তেলেসমাতি ইত্যাদি শিরককে জীবিকা অর্জনের পেশা বানিয়ে নিয়েছে।
জ্বিন বশীভূত করা ও শয়তানী আমল-আক্বীদার ইলমই তাদের কাছে আসল ইলম। জ্বিন-বশীভূত করার জন্য তারা নানারূপ কঠোর যোগসাধনা করে, চিল্লায় বসে ও নযর-নিয়ায, শিন্নি ও মান্নত করে। আর জ্বিন-ভূত ইত্যাদিকে গায়েবী ইলম লাভের মাধ্যম ভেবে থাকে। তাদেরকে ক্ষতিকারক ও উপকারকারক ভাবতেও ত্রুটি করে না। বহু অবস্থায় তাদের দোহাই দেয় এবং তাদের সাথে সম্পর্কের দরুন অনেক বৈধ বস্তুকেও অবৈধ করে নেয় এবং অবৈধকেও বৈধ করে।
বর্তমান যুগের তাবীজগুলো সাধারণত মুশরিকী ও দুর্বোধ্য ভাষায় লিখিত। কুরআনের আয়াত অবলম্বনের তাবীজ লিখা হলে তাও হয় আয়াতগুলো তাহরীফ ও রদ-বদল করা অবস্থায়।
অনেক মুসলিম যারা ইলমুল আসমায়া (আল্লাহর নামসমূহের জ্ঞান) ও কালিমার খাসিয়াতসমূহের আলোচনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এ জ্ঞানকে ইয়াহুদীরা যেরূপ অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য ব্যবহার করত, একইভাবে তারাও অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ব্যবহার করে, এমনকি কিছু যালেম লোক স্বয়ং কুরআনকে বেগানা নর-নারীর প্রেম-ভালবাসা, শত্রুতা বশীকরণ, বিচ্ছেদ ইত্যাদি কাজের দফতর বানিয়ে নিয়েছে।
বস্তুত মানুষ সর্বদা আনুষ্ঠানিকতা প্রিয় এবং অদৃশ্য সত্তার চেয়ে দৃশ্যমান বস্তুর প্রতি অধিকতর আসক্ত। ফলে নূহ (আ:)-এর যুগ থেকেই অদৃশ্য আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের অসীলা কল্পনা করে নিজেদের হাতে গড়া দৃশ্যমান মূর্তিসমূহের পূজ-অর্চনা চলে আসছে। অবশেষে আল্লাহকে ও তাঁর বিধানকে ভুলে গিয়ে মানুষ মূর্তিকে ও নিজেদের মনগড়া বিধানকে মুখ্য গণ্য করেছে। মক্কার মুশরিকরাও শেষনাবীর কাছে তাদের মূর্তিপূজাকে আল্লাহর নৈকট্যের অসীলা বলে অজুহাত দিয়েছিল। তাদের এ অজুহাত অগ্রাহ্য হয় এবং তাদের রক্ত হালাল গণ্য হয়। বদর, ওহুদ, খন্দক প্রভৃতি যুদ্ধসহ পরবর্তীকালের সকল জিহাদ মূলত এ শিরকের বিরুদ্ধেই পরিচালিত হয়।
কিন্তু দুর্ভাগ্য সে স্থান আজ দখল করেছে মুসলিমদের মধ্যে কবর পূজা, ছবি-মূর্তি ও প্রতিকৃতি পূজা, স্মৃতিসৌধ ও শহীদ মিনার ও বেদী পূজা, শিখা ও আগুন পূজা ইত্যাদি। বস্তুত এগুলো স্পষ্ট শির্ক, যা থেকে নাবীগণ যুগে যুগে মানুষকে সাবধান বাণীর দ্বারা জন্য ধমকানোর পর তাদের হুঁশ ফিরল এবং তাঁরা বিরত হল।
সক্ষেপে বর্তমানের মুসলিম জনসাধারণের সামগ্রিক ধর্মীয় অবস্থা সম্পর্কে এখানে উল্লেখিত হল। উম্মাতে মুহাম্মাদীর মধ্যে বিদ্যমান শির্ক সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জানানোর উদ্দেশ্যে আমাদের বাস্তব জীবনে ও সমাজে প্রচলিত নানা ধরনের শির্ক সম্পর্কে পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে আলোচনা করা হবে।
খালেস তাওহীদের দাবীদার এবং তাওহীদের ভিত্তির ওপর যাদের জাতীয়তা প্রতিষ্ঠিত সে সব মুসলিমদের নিকটে এটা অবিসংবাদিত কথা যে, স্থান ও পাত্র পরিবর্তন দ্বারা কখনো বস্তুর মূল তত্ত্বের বিবর্তন হয় না। মুশরিকদের মধ্যে যেসব বস্তু শিক, আহলে কিতাবদের মধ্যে এবং মুনাফিকদের মধ্যে যা কিছু শির্ক, সেই বস্তুই যদি মুসলিমেদের মধ্যে পাওয়া যায়, তা কখনো তাওহীদ হবে না, বরং শিক্কই থাকবে। মলমূত্র যদিও স্বর্ণ-রৌপ্যের নির্মিত সুন্দরতম পাত্রে রাখা হয়, উভয় স্থানেই তা অপবিত্র। স্থান ও পাত্র পরিবর্তনের ফলে তার মূল গুণ ও বৈশিষ্ট্যের মধ্যে কোনই পার্থক্য হয় না। অবশ্য কিছু ক্ষেত্রে অবস্থার পরিবর্তনের ফলে তার হুকুম অবশ্যই পরিবর্তন হয়।
মুসলিমদের অবস্থা যদি পর্যালোচনা করা হয় এবং প্রকৃত সত্যকে স্বীকৃতি দিতে কোনরূপ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয়, তবে আমাদের অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, প্রাচীন আরবীয় জাহিলিয়াত হতে আরম্ভ করে মুনাফিকদের পর্যন্ত শিরকের যতগুলো শ্রেণী রয়েছে, তার প্রায় সবটুকুই মুসলিমদের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। বিবর্তন শুধু রূপরেখায় এসেছে, আসল বস্তুতে নয়। জাহেলী আরবে জ্বিনদের পূজা, নক্ষত্ররাজীর পূজা, পূর্বপুরুষদের পূজা, আলিম-উলামা-পীর-পুরোহিত ও ধর্ম যাজকদের পূজা, জিবত পূজা, তাগুতের পূজা, জাতি পূজা ও শিকের সহায়তা, মুনাফিকদের তাগুত পূজা, আমিত্বের পূজা, স্বার্থের পূজা ইত্যাদি সব কিছুর মধ্যে এমন কোন পূজা নেই, যা বর্তমান মুসলিম সমাজে পাওয়া যাবে না।
বহু মুসলিম রয়েছে যারা যাদু বিদ্যা, ভাগ্য গণনা বিদ্যা ইত্যাদি অভিশপ্ত শির্কী কাজের মধ্যে লিপ্ত রয়েছে। তারা তাবীজ-তুমার, যাদু-টোটকা, সোলায়মানী তেলেসমাতি ইত্যাদি শিরককে জীবিকা অর্জনের পেশা বানিয়ে নিয়েছে।
জ্বিন বশীভূত করা ও শয়তানী আমল-আক্বীদার ইলমই তাদের কাছে আসল ইলম। জ্বিন-বশীভূত করার জন্য তারা নানারূপ কঠোর যোগসাধনা করে, চিল্লায় বসে ও নযর-নিয়ায, শিন্নি ও মান্নত করে। আর জ্বিন-ভূত ইত্যাদিকে গায়েবী ইলম লাভের মাধ্যম ভেবে থাকে। তাদেরকে ক্ষতিকারক ও উপকারকারক ভাবতেও ত্রুটি করে না। বহু অবস্থায় তাদের দোহাই দেয় এবং তাদের সাথে সম্পর্কের দরুন অনেক বৈধ বস্তুকেও অবৈধ করে নেয় এবং অবৈধকেও বৈধ করে।
বর্তমান যুগের তাবীজগুলো সাধারণত মুশরিকী ও দুর্বোধ্য ভাষায় লিখিত। কুরআনের আয়াত অবলম্বনের তাবীজ লিখা হলে তাও হয় আয়াতগুলো তাহরীফ ও রদ-বদল করা অবস্থায়।
অনেক মুসলিম যারা ইলমুল আসমায়া (আল্লাহর নামসমূহের জ্ঞান) ও কালিমার খাসিয়াতসমূহের আলোচনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এ জ্ঞানকে ইয়াহুদীরা যেরূপ অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য ব্যবহার করত, একইভাবে তারাও অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ব্যবহার করে, এমনকি কিছু যালেম লোক স্বয়ং কুরআনকে বেগানা নর-নারীর প্রেম-ভালবাসা, শত্রুতা বশীকরণ, বিচ্ছেদ ইত্যাদি কাজের দফতর বানিয়ে নিয়েছে।
বস্তুত মানুষ সর্বদা আনুষ্ঠানিকতা প্রিয় এবং অদৃশ্য সত্তার চেয়ে দৃশ্যমান বস্তুর প্রতি অধিকতর আসক্ত। ফলে নূহ (আ:)-এর যুগ থেকেই অদৃশ্য আল্লাহর নৈকট্য হাসিলের অসীলা কল্পনা করে নিজেদের হাতে গড়া দৃশ্যমান মূর্তিসমূহের পূজ-অর্চনা চলে আসছে। অবশেষে আল্লাহকে ও তাঁর বিধানকে ভুলে গিয়ে মানুষ মূর্তিকে ও নিজেদের মনগড়া বিধানকে মুখ্য গণ্য করেছে। মক্কার মুশরিকরাও শেষনাবীর কাছে তাদের মূর্তিপূজাকে আল্লাহর নৈকট্যের অসীলা বলে অজুহাত দিয়েছিল। তাদের এ অজুহাত অগ্রাহ্য হয় এবং তাদের রক্ত হালাল গণ্য হয়। বদর, ওহুদ, খন্দক প্রভৃতি যুদ্ধসহ পরবর্তীকালের সকল জিহাদ মূলত এ শিরকের বিরুদ্ধেই পরিচালিত হয়।
কিন্তু দুর্ভাগ্য সে স্থান আজ দখল করেছে মুসলিমদের মধ্যে কবর পূজা, ছবি-মূর্তি ও প্রতিকৃতি পূজা, স্মৃতিসৌধ ও শহীদ মিনার ও বেদী পূজা, শিখা ও আগুন পূজা ইত্যাদি। বস্তুত এগুলো স্পষ্ট শির্ক, যা থেকে নাবীগণ যুগে যুগে মানুষকে সাবধান বাণীর দ্বারা জন্য ধমকানোর পর তাদের হুঁশ ফিরল এবং তাঁরা বিরত হল।
সক্ষেপে বর্তমানের মুসলিম জনসাধারণের সামগ্রিক ধর্মীয় অবস্থা সম্পর্কে এখানে উল্লেখিত হল। উম্মাতে মুহাম্মাদীর মধ্যে বিদ্যমান শির্ক সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জানানোর উদ্দেশ্যে আমাদের বাস্তব জীবনে ও সমাজে প্রচলিত নানা ধরনের শির্ক সম্পর্কে পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে আলোচনা করা হবে।