📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 নূহ (আ:)-এর উম্মতের মাঝে শিরক

📄 নূহ (আ:)-এর উম্মতের মাঝে শিরক


প্রথম মানব ও নাবী আদম (আ:) থেকে শুরু হওয়া আল্লাহ্র একত্বের মতাদর্শের মাঝে কিভাবে বহু-ঈশ্বরবাদের উন্মেষ ঘটল তা আমাদের শেষ নাবী ও রাসূল মুহাম্মাদ () স্পষ্টভাবে আমাদেরকে জানিয়েছেন। আদম (আ:) থেকে নূহ (আ:) পর্যন্ত দশ শতাব্দীর ব্যবধান ছিল। পূর্ববর্তীগণ কর্তৃক স্থাপিত মূর্তিকে পরিত্যাগ করে একমাত্র স্রষ্টার ইবাদাত করতে নূহ (আ:)-এর উম্মাতকে আহ্বান জানালে তারা কী জবাব দিয়েছিল সে সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা সূরা নূহ-এর ২৩ নং আয়াতে উল্লেখ করেছেন: 'আর তারা একে অপরকে বলেছিল, তোমাদের দেব-দেবীদের কক্ষনো পরিত্যাগ করো না, আর অবশ্যই পরিত্যাগ করো না ওয়াদ, সুআ'আকে, আর না 'ইয়াগুস, ইয়া'উক ও নাস্ত্রকে।' [সূরা নূহ (৭১): ২৩] এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনু 'আব্বাস বলেন, "যে প্রতিমার পূজা নূহ (আ:)-এর কওমের মাঝে চালু ছিল, পরবর্তী সময়ে তা কালক্রমে আরবদের মধ্যে প্রবিষ্ট হয়েছে। 'দুমাতুল-যান্দাল' নামক স্থানের 'কাল্ব' গোত্রের লোকদের দেবমূর্তি ছিল ওয়াদ', 'হুযাইল' গোত্র কর্তৃক সূওয়া'আ গৃহীত হয়েছিল দেবমূর্তি হিসেবে, ইয়াগৃছ দেবমূর্তিকে প্রথমে গ্রহণ করে 'মুরাদ' গোত্র অবশ্য পরে (মুরাদের শাখা গোত্র) বানী গাত্বিফের দেবমূর্তি হিসেবে এবং এটি কওমে সাবা'র নিকটবর্তী 'জাওফ' নামক এক স্থানে ছিল', দেবমূর্তি ইয়া'উকু গৃহীত হয় 'হামদান' গোত্র কর্তৃক এবং নাসৃর দেবমূর্তির পূজা করত 'যুলকালা' গোত্রের হিমইয়া উপগোত্রের লোকেরা। নূহ (আ:)-এর কওমের কিছু নেক লোকের নামও ছিল নাসর। আদম ও নূহ (আ:)-এর মধ্যবর্তী সময়কালের এই পাঁচজন ব্যক্তি খুব নেককার ও বুজুর্গ মানুষ ছিলেন। তাঁদের অনেক অনুসারী, ভক্ত ও মুরীদ ছিল, যারা তাঁদের সৎকর্মপরায়ণতা সম্পর্কে খুবই উচ্চ ধারণা পোষণ করত। তাঁরা সকলেই এক মাসের মধ্যে একে একে মৃত্যুবরণ করেন। ফলে স্বজনরা তাঁদের জন্য খুবই বেদনার্ত হল। তাঁদের মৃত্যুর পর ভক্ত অনুসারীরা সুদীর্ঘকাল পর্যন্ত তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আল্লাহ্ তা'আলার ইবাদাত ও বিধি-বিধানের প্রতি আনুগত্য অব্যাহত রাখে। কিছুদিন পর শয়তান তাদেরকে এ কথা বলে প্ররোচিত করল যে, 'তোমরা যেসব মহাপুরুষদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ইবাদাত করো, যদি তাঁদের বসার স্থানগুলোতে (বৈঠকশালা) এক একটি মূর্তি তৈরি করে সামনে রেখে দাও এবং তাঁদের নামে নামকরণ করো, তবে এ সব মূর্তি দেখে তোমরা আল্লাহর ইবাদাতের প্রতি অধিক আগ্রহী ও মনোযোগী হতে পারবে, তোমাদের ইবাদাত পূর্ণতা লাভ করবে এবং বিনয় ও একাগ্রতা অর্জিত হবে। তারা শয়তানের ধোঁকা বুঝতে না পেরে সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের স্মারক হিসেবে প্রতিকৃতি তৈরি করে জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে স্থাপন করল এবং উপাসনালয়ে আসা যাওয়ার সময় সে সব মূর্তির সাথে সাক্ষাত করে পুণ্যবানদের স্মৃতি জাগরিত করে ইবাদাতে বিশেষ পুলক অনুভব করতে লাগল। তবে তাঁদের প্রজন্মের কেউই এ মূর্তিগুলোর পূজা করেনি। এমতাবস্থায়ই তাদের সবাই একে একে দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণ করল এবং সম্পূর্ণ নতুন এক বংশধর তাদের স্থলাভিষিক্ত হল। এ নতুন প্রজন্মের লোকেরা ধীরে ধীরে মূর্তিগুলো স্থাপনের উদ্দেশ্য বিস্মৃত হয়ে গেল। এ সুযোগে শয়তান এসে তাদেরকে ওয়াসওয়াসা দিতে লাগল, 'তোমাদের পূর্ববর্তীগণ তো এঁদের শুধু মূর্তিই তৈরি করে রাখেন নি, বরং তারা তো অত্যন্ত ভক্তি শ্রদ্ধা সহকারে এঁদেরই ইবাদত করত। উপরন্তু তোমাদের পূর্বপুরুষদের স্রষ্টা ও উপাস্য হল এ সব মূর্তিই। তাছাড়া, এ মূর্তিগুলোকে ডাকার ফলেই তো তারা বৃষ্টি পেত।' এ নতুন প্রজন্মের লোকেরা শয়তানের প্রবঞ্চনার শিকারে পরিণত হল। ফলে বিভ্রান্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠল এবং মূর্তিপূজার শিকের সূচনা হল।' আর তাদের পরবর্তী বংশধরগণ মূর্তিপূজা অব্যাহত রাখল।
আমাদের পূর্ববর্তীদের তাওহীদপন্থী বিশ্বাসের অভ্যন্তরে কিভাবে মূর্তিপূজা ও বহু-ঈশ্বরবাদের অনুপ্রবেশ হয়েছিল তা রাসূল -এর সাহাবীর উপরোক্ত দু'টি ব্যাখ্যা দ্বারা সুস্পষ্টভাবে বোধগম্য হয়েছে। এ তথ্যটি স্বধর্ম স্খলনের মতাদর্শকেই দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে, পূর্ববর্তীগণের মূর্তিপূজার উৎসমূলকে প্রকাশ করে। উপরন্তু, কোন মানুষ বা প্রাণীকে মূর্তি বা চিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করাকে ইসলাম কেন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে তার ব্যাখ্যাও বিধৃত হয়েছে উপরোক্ত ব্যাখ্যায়।

টিকাঃ
১. আবু জা'ফর আল-বাক্তি থেকে 'ওয়াদ' সম্পর্কে একটি পৃথক বর্ণনা রয়েছে। তা হল, 'ইয়াযিদ ইবন আল-মুহাল্লাব এমন এক স্থানে নিহত হয়েছিলেন যেখানে সর্বপ্রথম গায়রুল্লাহর উপাসনা করা হয়েছিল। 'ওয়াদ' নামক ব্যক্তিটি ছিলেন তাঁদের মধ্যে প্রথম ও সর্বাধিক নেককার বুজুর্গ মানুষ। তিনি তাঁর জাতির নিকটে খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি মারা গেলে লোকেরা তাঁর প্রতি ভক্তিতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। এমনকি তাঁর তিরোধানের পর ব্যাবিলনের মানুষেরা তাঁর কবরের পার্শ্বে অবস্থান গ্রহণ করে তাঁর জন্য খুবই আহাজারী করত। ইবলীস তাদের এ অবস্থা দেখে সুবর্ণ সুযোগটি হাত ছাড়া হতে দেয় নি, তাই একজন মানুষের আকৃতি ধরে আগমন করে সে তাদেরকে প্ররোচিত করে বলল, 'এ ব্যক্তির জন্য তোমাদের যে কী দুঃখ ও বেদনা, আমি তা লক্ষ্য করেছি। আমি কি তোমাদের জন্য তাঁর প্রতিকৃতি নির্মাণ করে দেব যা তোমরা তোমাদের যৌথ মিলন কেন্দ্রসমূহে রেখে এর মাধ্যমে তাঁকে স্মরণ করবে? তারা এতে সম্মত হলে সে তাঁর অনুরূপ একটি মূর্তি তৈরি করে দিল। তারা এটিকে তাদের যৌথকেন্দ্রে রেখে তাঁকে স্মরণ করতে থাকে। তাদের স্মরণের এ অবস্থা দেখে শয়তান পুনরায় এসে বলল, 'আমি কি তোমাদের প্রত্যেকের গৃহে রাখার জন্য অনুরূপ মূর্তি তৈরি করে দেব? তারা এতেও সম্মত হলে সে প্রত্যেক গৃহবাসীর জন্য এর অনুরূপ মূর্তি তৈরি করে দেয়। তারা তা গ্রহণ করে এর মাধ্যমে তাঁকে স্মরণ করতে থাকে। তাদের সন্তানরা তাদের এ সকল কার্যকলাপ দেখতে থাকে। বংশবৃদ্ধি হয়ে যখন নতুন প্রজন্ম তাদের স্থান দখল করে নিল এবং তাঁকে স্মরণ করার মূল কারণ সম্পর্কে পরবর্তী প্রজন্মের লোকেরা অজ্ঞ রয়ে গেল, তখন তাদের দ্বিতীয় প্রজন্ম আল্লাহকে ব্যতীত এ মূর্তিরই উপাসনা করতে লাগল। ফলে 'ওয়াদ'-এর মূর্তিই হল পৃথিবীর সর্বপ্রথম মূর্তি, আল্লাহকে বাদ দিয়ে যার পূজা-অর্চনা ও উপাসনা শুরু হয়। অতএব, এ পৃথিবীর প্রাচীনতম শির্ক হল নেককার মানুষের কবর অথবা তাদের মূর্তিপূজা। যা আজও প্রায় সকল ধর্মীয় সমাজে চালু আছে এবং যা মুসলিম সমাজে স্থানপূজা, ছবি-প্রতিকৃতি, মিনার ও ভাষ্কর্য পূজায় রূপ নিয়েছে।” (ইবনু আবী হাতিম; ইবনু কাছীর, কাসাসুল আদিয়া, পৃ. ১১৫; জালালুদ্দীন আস-সুযুতী, আদ-দুররুল মানছুর, ৬/২৬৯)
২. অথবা ছাবা অথবা ইয়ামেনের প্রান্ত-সীমায় অবস্থিত মাযহাজ গোত্র।
৩. ইয়েমেনের হিমায়্যার গোত্রের রাজা [মুহাম্মাদ ইবনু মানযূর, লিসান আল-আরব, (বৈরুত: দার সাদির, নতুন সংস্করণ, ৮ম খণ্ড, ৩১৩ পৃ.]
৪. মুহাম্মাদ ইবনু ক্বায়িসের বর্ণনা। আত্ব-ত্ববারী।
৫. বুখারী, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ৪১৪-৪১৫ পৃ., হাদীস নং ৪৪২; তাবারী, তাফসীর, ২৯ খণ্ড, পৃ. ৯৮-৯৯; ইবনু কাসীর, সূরা নূহ। বুখারী মওকূফ সূত্রে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস হতে এটি বর্ণনা করেন। 'তাফসীর' অধ্যায় হাদীস নং ৪৯২০।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00