📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 শিরকের তাৎপর্য

📄 শিরকের তাৎপর্য


শিকের অর্থ শুধু এটা নয় যে, কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ বা তাঁর প্রতিপক্ষ মনে করা হবে। আরবের মুশরিকরাও কাউকে আল্লাহর সমান বা প্রতিপক্ষ মনে করত না। বরং শিৰ্কের প্রকৃত তাৎপর্য হল, যেসব বস্তু একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট, সেগুলোকে অন্য কারো জন্য করা, যেমন- অন্যকে সিজদা করা, অন্যের উদ্দেশ্যে মাথা নত করা, বিপদে অন্যকে আহ্বান করা, জীবিত পীর-খাজা-গাউস-কুতুবের কাছে সন্তান, রোগ নিরাময়, ব্যবসায়ে উন্নতি, বিপদ হতে পরিত্রাণ ও পারলৌকিক সুপারিশ ও মুক্তির প্রার্থনা করা, কাউকে আইন দাতা বিধান দাতা মনে করা অর্থাৎ হুকুম ও বিধান প্রবর্তনের ক্ষেত্রে অন্য কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করা এবং কুরআন-সুন্নাহ আইনের বিরোধী মানব রচিত সংবিধানের আনুগত্য করা, কাউকে গাউসূল আযম বা মহান ফরিয়াদ শ্রবণকারী ধারণা করা, ইবাদাতের সময় পীরের কল্পনা করা ইত্যাদি।
শির্ক হল জঘন্যতম গুনাহ। এটা এমন এক গুনাহ যার জন্য কোন ক্ষমা অবশিষ্ট নেই আল্লাহর নিকটে, যদিও তিনি অতীব ক্ষমাশীল ও দয়ালু।
﴿إِنَّ اللهَ لا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْماً عَظِيماً) (سورة النساء: ٤٨) 'নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। এ ব্যতীত অন্য সব, যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করল, বস্তুত সে আল্লাহর প্রতি অপবাদ আরোপ করল। [সূরা নিসা (৪): ৪৮]
অন্য আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاء وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالاً بَعِيدًا (سورة النساء: ١١٦) 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না, এছাড়া অন্য সব যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন এবং যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে শরীক করে, সে চরমভাবে গোমরাহীতে পতিত হল।' [সূরা নিসা (৪): ১১৬]
শির্ক মিশ্রিত যেকোন 'আমল ইসলামের দৃষ্টিতে মূল্যহীন এবং আল্লাহর নিকটে তা প্রত্যাখ্যাত। ফলে একজন মানুষের ঈমান, সারা জীবনের 'আমল বিফল হয়ে যেতে বাধ্য কেবলমাত্র শির্কী কর্মকাণ্ডের কারণে। মূলত শির্ক মানুষের ধ্যান-ধারণা, কর্ম ও অভ্যাসের মধ্যকার যেখানেই হোক, এটা এমন একটা বিষক্রিয়া যে, যদি কারো জীবনে কখনও একটি মাত্র শিকও সংঘটিত হয় এবং সে ব্যক্তি তা থেকে তাওবা করে মৃত্যুবরণ করতে না পারে, তাহলে কেবল এই একটিমাত্র শিকই তার ঈমান ও জীবনের যাবতীয় সৎকর্মকে নিষ্ফল করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট হবে। এ ধরনের লোকদের ঈমান ও 'আমলের পরিণতি সম্পর্কে মহান আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُمْ بِالْأَخْسَرِينَ أَعْمَالاً ، الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعاً (سورة الكهف: ١٠٤-١٠٣) "বল, 'আমি তোমাদেরকে কি সংবাদ দেব নিজেদের 'আমালের ক্ষেত্রে কারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত?' তারা সেসব লোক দুনিয়ার জীবনে যাদের চেষ্টা-সাধনা ব্যর্থ হয়ে গেছে আর তারা নিজেরা মনে করছে যে, তারা সৎকর্ম করছে।" [সূরা আল-কাহফ (১৮): ১০৩-১০৪]
﴿وَقَدِمْنَا إِلَى مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاءً مَنْثُورًا ) (سورة الفرقان (۲۳) 'আর আমি তাদের আমলের দিকে অগ্রসর হব, অতঃপর তা (তাওহীদ শূন্য হওয়ার কারণে) বিক্ষিপ্ত ধূলিকণার ন্যায় উড়িয়ে দিব।' [সূরা ফুরক্বান (২৫): ২৩]
কেবলমাত্র আল্লাহর তাওহীদের স্বীকৃতি দান, এর সংরক্ষণ, প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করার জন্যই তিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। ফলে এ পৃথিবীতে আগমনকারী প্রতিটি নবী বা রাসূল সর্বপ্রথম তাওহীদের দিকেই আহ্বান এবং শির্ক থেকে বেঁচে থাকার জন্য বারবার তাকিদ জানিয়েছিলেন।' তাওহীদের মর্মবাণী প্রচারের জন্য জীবনের সবচেয়ে বেশি সময় অতিবাহিত করেছেন তাওহীদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রচারক রাসূলুল্লাহ ()। এ বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এ সম্পর্কে খুব কমই গুরুত্বারোপ করা হয়। এমনকি ইসলামের অন্যান্য বিষয়ের তুলনায় এ বিষয়ে তেমন লেখালেখিও হয় না। ফলে, তাওহীদ সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকার জন্য তাওহীদ পরিপন্থী বিষয় তথা শির্ক আমাদের মুসলিম সমাজের প্রতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে। আর শির্ক এমনই ভয়াবহ ও জঘন্যতম পাপ যা থেকে বেঁচে থাকা প্রতিটি মানুষের আবশ্যিক কর্তব্য। শিরকের ব্যাপারে রাসূল মুহাম্মাদ ()-কে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
﴿وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ) (سورة الزمر: ٦٥) '(হে নবী) কিন্তু তোমার কাছে আর তোমাদের পূর্ববর্তীদের কাছে ওয়াহী করা হয়েছে যে, তুমি যদি (আল্লাহ্) শারীক স্থির কর, তাহলে তোমার কর্ম অবশ্য অবশ্যই নিস্ফল হয়ে যাবে, আর তুমি অবশ্য অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।' [সূরা আয-যুমার (৩৯): ৬৫]
﴿.. إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ... (سورة المائدة: (٧٢) 'যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে অংশীস্থাপন করে তার জন্য আল্লাহ অবশ্যই জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন আর তার আবাস হল জাহান্নাম।' [সূরা মায়িদাহ (৫): ৭২]
এ কারণে বান্দার ওপর সর্বপ্রথম অপরিহার্য বিষয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল তাওহীদের বিশুদ্ধ জ্ঞান অর্জন করা এবং নিজের ঈমান, আক্বীদা ও যাবতীয় 'আমল শিক মুক্ত রাখা, যাতে কোন 'আমল বরবাদ না হয়। তাওহীদের প্রকৃত জ্ঞান না থাকলে, কোন জ্ঞানই পরিপূর্ণ নয়। তাওহীদ বিহীন কোন 'আমলও গ্রহণীয় নয়। তাছাড়া, আল্লাহ্র দ্বীন তথা ইসলাম প্রতিষ্ঠার মূলকথাই হচ্ছে কালিমায়ে তাওহীদকে সঠিকভাবে হৃদয়ঙ্গম করা ও এর উপর মৃত্যু পর্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত থাকা। আর এর উপর সুপ্রতিষ্ঠিত থাকার দাবী হচ্ছে এ তাওহীদকে বিনষ্টকারী শির্ক নামের মহা অপরাধটি কী এবং সমাজে এটি কেন সংঘটিত হয়, সে সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান রাখা। তা না হলে যেকোন সময় শয়তানের খপ্পরে পড়ে যে কারো ঈমান ও জীবনের সৎকর্মের যাবতীয় সাধনা ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। এহেন গুরুতর পরিণতির হাত থেকে যেমন নিজেকে রক্ষা করা আবশ্যক, তেমনি এ থেকে অন্য সকল মুসলমানকেও রক্ষা করা আবশ্যক।

টিকাঃ
১. সূরা আন-নাহল, ৩৬ নং আয়াত।
২. শিরকের ভয়াবহতা সম্পর্কিত আয়াতগুলো হচ্ছে: ২/২১-২২, ৫১, ৫৪, ৫৭, ৫৯, ৯২, ১৬৫; ৪/৩৬, ১১৬; ৫/১৭, ৭২, ৭৩; ৬/১৯, ৪৫, ৮২, ৮৮, ১৩৬, ১৩৭, ১৩৮, ১৩৯, ১৪০, ১৫০, ১৫১; ৭/৫, ৩৩, ৩৭; ৯/৩, ২৮, ১১৩; ১০/১০৬-৭, ১২/৩৮, ৪০; ১৫/৯৬, ২২/৩১, ২৫/৬৮, ২৬/৭১, ৭৪; ৩১/১৩, ৪৭/১৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00