📘 শেষরাত্রির গল্পগুলো > 📄 পিপাসার গল্প প্রথম সংস্করণ অথবা ঈর্ষার গল্প দ্বিতীয় সংস্করণ

📄 পিপাসার গল্প প্রথম সংস্করণ অথবা ঈর্ষার গল্প দ্বিতীয় সংস্করণ


'জাগো গো ভগিনী' শীর্ষক প্রবন্ধগল্পে আমি একটা গানের কথা বলেছিলাম। নাফিস এখন যে বয়সে উপনীত, ঠিক এই বয়সেই গানটা আমার প্রিয় ছিলো। গানটা আমি ওকে শিখিয়েছিলাম বেশ আগে। আজকে আমাকে শোনালো:
জন্ম যদি হত মোদের রাসূল পাকের কালে
আহা রাসূল পাকের দেশে
মোদের তিনি কাছে টেনে চুমু দিতেন গালে
আহা কতই ভালোবেসে..

বেশ অনেকদিন পর সেই পুরনো ব্যথাটা আবার অন্যরকম শূন্যতা নিয়ে হাজির হোল আমার কাছে। খুব শৈশবে গানটা অবলীলায় গেয়ে যেতাম, পড়ন্ত কৈশোরে গাইতে গাইতে তন্ময় হতাম, আর তারুণ্যে এসে গানটার বাণী নীরবে চোখ ভেজায়। অনেকদিন সেরকম অনুভূতি হয় নি আমার। নাফিসের মায়াবী কণ্ঠ আমাকে আবার উদাস করে দিয়েছে, চোখ ঈষৎ আর্দ্র হলেও কোনো ফোঁটা গড়ায় নি; তথাপি ভেতরে অপ্রাপ্তির নদে সর্বগ্রাসী বান ডেকেছে বরাবরের মতোই। তার সাথে যুক্ত হয়েছে প্রচণ্ড ঈর্ষাবোধ।

প্রিয়নবীজির [] সান্নিধ্যলাভে ধন্য সোনার মানুষগুলোর প্রতি ঈর্ষাবোধ আমার নতুন কিছু নয়। ইদানীং এই অনুভূতি ক্রমশ গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছে। আর হবেই না বা কেন?

আমি আমার নবীজিকে [ﷺ] কত্ত কত্ত ভালোবাসি! অথচ তাঁর মুখ থেকে একটিবারের জন্যে 'তোমাকেও ভালোবাসি' কথাটা শোনবার সৌভাগ্য কি আমার হয়? যে সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর সাহাবী মু'আজ ইবন জাবাল [রা.]-এর? আহ্! কে জানে কেমন নিশ্চেতন করা অনুভূতি তাঁর হয়েছিল, যখন নবীজি [ﷺ] মু'আজের দুই হাত ধরে বলেছিলেন :
“ يا معاذ والله إني لأحبّك والله إني لأحبك
"এই যে মু'আজ! আল্লাহর শপথ, আমি তোমাকে ভালোবাসি! আল্লাহর শপথ, আমি তোমাকে ভালোবাসি!”

একবার নয়! দুইবার বললেন ভালোবাসার কথা। কতো গভীর ভালোবাসা! কী নিদারুণ সৌভাগ্য তাঁর! মু'আজ, আপনাকে আমার ঈর্ষা হয়, খুব, খুউব!

তারপর... আল-কুরআনকে আমি কত না ভালোবাসি! একটা দিন কুরআনের সাথে কিছু সময় না কাটালে আমার চলেই না। কোনো কোনো দিন ঝোঁকের বশে পুরোটা দিনই তার সাথে কাটিয়ে ফেলি। কুরআনের জ্ঞান-সমুদ্রের সৈকতে নুড়িকণা কুড়াই কী গভীর আগ্রহ আর মমতা নিয়ে, একদিন সেই সমুদ্র অবগাহনের স্বপ্ন দেখি বলে। অথচ আমার এই ভালোবাসায় বারাকাহ'র দু'আ করার জন্যে আমার পাশে নবীজি নেই! 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস কী সৌভাগ্যবান! আল-কুরআনের অনুসন্ধিৎসু এই মানুষটা পেয়েছিলেন নবীজির আন্তরিক দু'আ :
“ اللهم علمه الكتاب
"আল্লাহ! একে তুমি কুরআনের জ্ঞানে প্রাজ্ঞ করো!"

আমার নামটাও তো আব্দুল্লাহ! কিন্তু আপনি সৌভাগ্যবান আব্দুল্লাহ! আমি তৃষ্ণার্ত আব্দুল্লাহ!

কুরআনের জ্ঞান চর্চার কথা বাদ দেই, কেবল কুরআন পাঠের কথা-ই না হয় ধরি। এই কাজ তো আমিও কত ভালোবাসা নিয়েই করি! আমার অপরিপক্ক ক্বিরাআত শুনে কত মানুষের দু'আ পেয়েছি। অথচ নবীজির [ﷺ] মুখ থেকে একটিবারের জন্যেও উৎসাহ পাই নি, পাই নি দু'আ। আবূ মূসা আল-আশ'আরীকে যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন :
“ لو رأيتني و أنا أستمع لقراءتك البارحة
“গতরাতে তোমার ক্বিরাআত যখন আমি মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম, তখন যদি আমাকে তুমি দেখতে!”

আবূ মূসার হৃদয়ে কী অনন্য দ্যোতনার হিন্দোল বয়েছিলো, কে জানে! আচ্ছা, আমি যদি সে সময় জন্ম নিতাম, মায়াভরা কণ্ঠে কুরআন পাঠ করতাম, আমাকেও কি নবীজি ﷺ এমন একটু ভালোবাসাপ্রাণিত উৎসাহ দিতেন না? আমার ক্বিরাআত না হয় সেরকম ভালো নয়, কিন্তু আমি যে তাঁর মুখ থেকে এমন একটা কথা শোনার জন্যে পাগলপ্রায়, এ কথা জানার পর নবীজি ﷺ কি সান্ত্বনার জন্যে হলেও আমাকে একটু ভালোবাসার জানান দিতেন না!? দিতেন, নিশ্চয়ই দিতেন! আমার নবীজি তোমাদের মতো না তো!

তারপর উবাই ইবন কা'ব-এর কথা-ই ধরি। এই মানুষটাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন বললেন:
إن الله أمرني أن أقرأ عليك سورة البينة
“আল্লাহ আমাকে আদেশ করেছেন, আমি যেন তোমাকে সূরাহ আল-বায়্যিনাহ পাঠ করে শোনাই।”

আনন্দে উদ্বেল হয়ে আবেগাপ্লুত উবাই বললেন :

الله ستماني لك
"আল্লাহ কি তবে আপনাকে আমার নামটি বলেছেন!?[৩]"

উবাই! রদ্বিয়াল্লাহু 'আনকা। আপনি কী সৌভাগ্য নিয়ে এসেছিলেন এই জমিনে? আল্লাহ আপনার নাম নিয়েছেন, নবীজি ﷺ আপনার জন্যে কুরআন পাঠ করছেন! আপনাকে আমি খুব বেশি ঈর্ষা করি!

কবিতার সাথে কত পথ হেঁটে এলাম আমি! এই নিষ্ফলা জমিনের বুকে উদয়াস্ত বিশুদ্ধতার চাষ করে গেছি। সে ফসল ফেরি করে বেড়াই তিলোত্তমা নগরীর বুকে। অথচ এখানেও আমি তৃষ্ণার্ত ভীষণ! হাসসান ইবন সাবিত-এর মত আমার নবীজি [ﷺ] থেকে একটু ভালোবাসা, একটু দু'আ আমার ভাগ্যে জোটে নি।

"اللهم أيده بروح القدس"
“হে আল্লাহ! তুমি হাসসানকে রুহুল কুদস (জিবরীল) এর মাধ্যমে সাহায্য করো!!”

হাসসান-কে ভালোবেসে তাঁর কবিতা আবৃত্তির জন্যে রাসূলুল্লাহ [ﷺ] নিজের পাশে একটি আবৃত্তিমঞ্চ গড়ে দিয়েছিলেন! সেসব চিন্তা করলে মাঝে মাঝে আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় পাওয়া পুরস্কার-ক্রেস্টগুলো, কবিতা লিখে পাওয়া ভালোবাসাগুলো, নিজের কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হবার আনন্দ ও গৌরব- সবকিছু অর্থহীন মনে হয়। আমি যদি সে সময় থাকতাম, আমাকে তেমন কোনো সুযোগ না দেওয়া হোক, তেমন মর্যাদা না দেওয়া হোক, অন্তত আমার কবিতা শুনে নবীজির [ﷺ] মুখ থেকে একটা অমিয় হাসি দেখার সৌভাগ্য তো পেতাম।

রাসূলের সান্নিধ্যলাভে ধন্য হে আলোর পাখিরা! রদ্বিয়াল্লাহু ‘আনকুম।

আমি তোমাদের ঈর্ষা করি বলে মনঃক্ষুণ্ণ হয়ো না। ঈর্ষার চেয়ে আমি তোমাদের ভালোবাসি বেশি।

তোমাদের সাথে, প্রিয়তম রাসূলের সাথে ফিরদাউসের বাগিচায় যেদিন দেখা হবে (ইন শা-আল্লাহ), সেদিনের আগ পর্যন্ত আমি তৃষ্ণার্ত-ই রবো।

টিকাঃ
১ সুনান আবু দাউদ: ১৫১৯
২ সাহীহ আল-বুখারী: ৭৫। মুসনাদ আহমাদ: ৩৩৭৯। আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, খ. ৮ পৃ. ৩২৭।
১ সাহীহ মুসলিম: ১৯৩
২ সাহীহ আল-বুখারী: ৩১৮৪। সাহীহ মুসলিম: ২৪৮৫। সুনান আন-নাসাঈ: ৭১৬।
৩ প্রাগুক্ত
১. সাহীহ আল-বুখারী: ৪৫৩। সাহীহ মুসলিম: ৯৯৯।

📘 শেষরাত্রির গল্পগুলো > 📄 গ্রন্থপরিচিতি

📄 গ্রন্থপরিচিতি


এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00