📘 শেষরাত্রির গল্পগুলো > 📄 একঝাঁক পাখি এবং অনন্য আল-কুরআন

📄 একঝাঁক পাখি এবং অনন্য আল-কুরআন


একঝাঁক পাখি আকাশে উড়ে যেতে দেখেছেন নিশ্চয়ই! খেয়াল করে দেখবেন, উড়তে উড়তে এক সময় হঠাৎ করেই কিন্তু তাদের পাখা স্থির হয়ে যায়। কিন্তু সেটা ক্ষণস্থায়ী। কিছু সময় পাখা ওভাবে স্থির রেখে এরপর আবার পূর্ণোদ্যমে উড়তে শুরু করে।

এবার আল-কুরআনের মজার ভাষাশৈলী লক্ষ্য করুন।

প্রথমত দুটো বিষয় একটু মাথায় রাখুন:
» পাখির ডানা মেলে উড়ে যাওয়াটা চলমান থাকে।
» ডানা স্থির করে রাখাটা সামান্য সময়ের জন্যে, অস্থায়ী।

এবার আরবি ব্যাকরণের দুটি অনুসিদ্ধান্ত দেখুন:
» আরবিতে فعل (ফে'ল তথা ক্রিয়া) গুলো حدوث (সাময়িক সংঘটিত হওয়া) অর্থে ব্যবহৃত হয়।
» আর اسم (ইসম; যেমন: فاعل তথা কর্তা, مفعول তথা কর্মকারক ইত্যাদি) গুলো আসে প্রবহমানতা অর্থে, অর্থাৎ চলমান প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে।

'ক্লিয়ার?'

এখন আসুন আল-কুরআনের একটি আয়াতের দিকে:
أَوَلَمْ يَرَوْا إِلَى الطَّيْرِ فَوْقَهُمْ صَافَّاتٍ وَيَقْبِضْنَ
“তারা কি তাদের উপরে পাখির দিকে তাকায় না? (যারা) উড়ন্ত এবং ডানা সংকোচন করে।”

খেয়াল করে দেখুন:
صَافَّاتٍ শব্দটি একটি ইসম। অর্থ: উড়ন্ত। [ক্রিয়া ব্যবহার করে 'উড়ে' বলা হয়নি]
يَقْبِضْنَ শব্দটি একটি ফে'ল। অর্থ: ডানা সঙ্কোচন করে। [ইসম ব্যবহার করে 'সঙ্কোচনকারী' বলা হয় নি।]

সাধারণত, ভাষালঙ্কারের দাবী হোল, একইসাথে দুই ধরনের শব্দ ব্যবহার না করা। পাশাপাশি ভিন্ন দুটি প্রকৃতির শব্দ সাধারণ দৃষ্টিতে বেমানান। আপাতত মনে হতে পারে, এখানে দুটিই ইসম অথবা দুটিই ফে'ল আসলে আরো শ্রুতিমধুর হতো। যেমন:
- যারা উড়ে যায় এবং ডানা সংকোচন করে।
অথবা,
- যারা উড়ন্ত এবং ডানা সংকোচনকারী।

কিন্তু বলা হোল: "যারা উড়ন্ত এবং ডানা সংকোচন করে।" একটি বিশেষ্য, আরেকটি ক্রিয়া। আমাদের আগের সমীকরণ দুটির দিকে এবার তাকান। রহস্যটা বুঝতে পারলেন?

পাখিদের উড়াটা যেহেতু প্রবহমান থাকে, এজন্যে উড়া অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে ইসম। আর ডানা সংকোচন করাটা যেহেতু অস্থায়ী ও অকস্মাৎ ঘটে থাকে, এ জন্যে সে অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে ফে'ল।

কত সূক্ষ্ম শব্দচয়ন! মহাজ্ঞানী আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার শব্দ চয়ন এতটাই বাস্তবসম্মত! আল-কুরআনের এই অনন্য ভাষাশৈলী আমাকে বারবার প্রভুর প্রতি বিনীত মস্তককে আরো বেশি নুইয়ে দেয়।

টিকাঃ
১ সূরা আল-মুলক ৬৭:১৯

📘 শেষরাত্রির গল্পগুলো > 📄 সপ্তাহান্তের দিনলিপি

📄 সপ্তাহান্তের দিনলিপি


'উইকেন্ড' নামে একটা কিছু আমার জীবনে ছিলো। ছোটভাইকে ঢাকায় আনার পর সেটা তাকে দিয়ে দিয়েছি।

ওদের এই বয়সটা সম্ভাবনার। জীবনের ‘টার্নিং পয়েন্ট’, আক্ষরিক অর্থেই। পরিচর্যার প্রয়োজন হয়, সহমর্মিতার দরকার হয়। বড়োদের ইতিবাচক সঙ্গ ও প্রীতিযাচক সাহচর্য হয়ে ওঠে অনিবার্য। হোস্টেল থেকে আনলাম আমার কাছে। ঘুরতে বেরোতে মনস্থির করলাম। বইয়ে যেসব বিখ্যাত স্থান ও স্থাপনার কথা পড়ে এসেছে সেগুলো দেখার ইচ্ছে আছে তার।

আমার হাতে নাসিমের হাত। আমি শক্ত করে ধরে থাকি। আমি পাগলটা যে একেবারে অকাজের না, আমি যে এই মুহূর্তে তার নির্ভরতা, আমাকে ওর ‘বড়ো ভাইয়া’ বলাটাও যে একদম অর্থহীন না, এই কথা ওর ভেতর গেঁথে দেওয়া দরকার বলে মনে হচ্ছিলো। গ্রামীণ সবুজতা পেছনে ফেলে এই নাগরিক কোলাহলে যেন নিজেকে একা না ভাবতে পারে, সেজন্যে এই প্রচেষ্টা। পিঠে ও কাঁধে হাত রাখি। মাথাটা একটু বুকে মিশাই। আল্লাহকে খুব করে বলি, আমার ভাইবোনগুলো এই সরোবরে একেকটা চলিষ্ণু পাথর হোক, কালজ জলজ শ্যাওলা যার গায়ে জমে থাকার সুযোগ পায় না। ওকে ছুঁয়ে দেওয়ার পর আমার অন্তর আজকেও সেই কথাটাই বলছিলো নীরবে।

দৈহিক গড়নে সে সহপাঠীদের তুলনায় ক্ষীণকায় রয়ে গেছে। ভেতরের সত্ত্বাটাও এখনো পুরোপুরি জাগে নি। ও এখন কোন্ পৃথিবীর বাসিন্দা, পুরোপুরি ঠাওর করতে পারে নি। সবকিছু মানিয়ে নিতে যে বেগ پোহাতে হয়, আধো আধো অনুযোগে সে কথা প্রকাশিত হয়। আমি তাকে অভয় দেই। ক্ষীণকায় বলে নিজেকে দুর্বল না ভাবার জন্যে প্রাণিত করি। একটু মজা করেই বোঝাতে চেষ্টা করি: উনিশ শতকে প্রচণ্ড দুর্বল অর্থনীতির জন্যে যেই চীন-কে ‘সিক ম্যান অব এশিয়া’ (এশিয়ার রোগাপটকা ব্যক্তি) বলা হতো, সেই চীন এখন উপহাসকারীদের অর্থনীতির ওপরেই ছড়ি ঘোরায়। যেই তুরস্ক-কে ‘সিক ম্যান অব ইউরোপ’ বলা হতো, সেই রাষ্ট্রটির অগ্রগতি এখন বিশ্ব-অর্থনীতির সরফরাজদের তাক লাগিয়ে দেয়। আরো নানা কথা-উপকথায় মেওয়া ফললো। ওর মুখে এক চিলতে হাসি আসি আসি করে। আর আমার মুখে হাসি এসেই পড়ে। প্রশান্তির হাসি।

আব্বুম্মু'র কথা আমি নিজেই তুলি। পিচ্চি-পাচ্চাদের গপ্পো-ও করে যাই কিছুক্ষণ। ও খানিকটা সময় উদাস হয়ে যায়। এই উদাস হওয়াটা আমার প্রতীক্ষিত ছিলো। সদ্য শৈশব পার হওয়া একটা কিশোর মধ্যবিত্ত পরিবারের সংগ্রামী জীবনাচারের মধ্যে বেড়ে উঠেও ঠিক বুঝবে না কতটুকু রক্ত পানি করে আব্বুরা এই লড়াইয়ে মগ্ন থাকেন। কিংবা উদয়াস্ত খাটুনিতে সংসার কিভাবে আম্মু আগলে রাখেন, সেটাও তার উপলব্ধির আয়নায় পূর্ণরূপে বিম্বিত হওয়ার কথা নয়। আমিও সেদিকে ওর নজর কাড়তে চাই নি। আমি শুধু বুঝিয়ে দিতে চেয়েছি, নাড়িছেঁড়া ধন সুদূর বিয়াবানে পাঠিয়ে আব্বুম্মু ঠিক কী স্বপ্নটা আঁকেন মনের খাতায়। জঠরে ধারণের সময় থেকে ছোট্ট জীবনের এই প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছাতে আমার আম্মু কত ব্যথা পেয়েছেন, শৈশব থেকে তারুণ্য অবধি আমাকে ছায়া দিতে কত রোদ আব্বু সয়েছেন, আমি সেসবকিছু আনমনে ভাবি, পুরোটা না বুঝলেও যৎকিঞ্চিৎ বুঝি। আর তাতেই আমি অশ্রুসজল হই। আমার ভেতরে কেউ একজন বলে, এই ঋণ শোধ না করে পৃথিবী থেকে বিদায় হয়ো না নজীব! আমি সবসময় এমন কোনো উপায়ের সন্ধানে ছিলাম, যেটা সাধ্যের মধ্যেই সর্বোচ্চ ঋণ পরিশোধ বলে প্রতীয়মান হবে আমার কাছে। একদিন হাদিসে জানলাম:
“من قرأ القرآن ، وعمل بما فيه ألبس والده يوم القيامة تاجا ضوءه أحسن من ضوء الشمس
যে কুরআন পাঠ করবে, কুরআনের বার্তা অনুযায়ী আমল করবে, কিয়ামতের দিন তার বাবা-মাকে একটি মুকুট পরিয়ে দেওয়া হবে, যার দীপ্তি হবে সূর্যালোকের চেয়েও উজ্জ্বল।১৯
হাদিসটা আমাকে অনেকক্ষণ ভাবিয়েছিলো। এই ভাবনা থেকেই আমার প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নিয়েছিলাম। আমার ভেতরে উপলব্ধি জেগেছিলো যে, আমার কাজের কারণে যদি আল্লাহ আমার আব্বুম্মু-কে সম্মানিত করেন, সন্তান হিসেবে তাঁদের জন্যে এরচেয়ে বড়ো উপহার আর কী দিতে পারি আমি? কুরআনের সাথে আমার নিবিড় ভালোবাসার কারণে যদি আব্বুম্মুকে চূড়ান্ত হিসেবের দিন মুকুট পরিয়ে দেওয়া হয়, ঋণ পরিশোধের এর চে’ উত্তম কোন পন্থা আর কী হতে পারে?

অবশ্য এটা ঠিক, তাঁদের ঋণ অপরিশোধ্য। এই কথাটা এক সময় আবেগের ছিলো, কিন্তু এখন উপলব্ধির। আমার পক্ষে সম্ভব নয়, তাঁদের ঋণ পরিশোধ করে দেওয়া। তবে এতকিছু ভাবছি কেন? এই গোলক ধাঁধা থেকে বাঁচালেন সুধীন দত্ত। তাঁর কোনো এক লেখায় একদিন পড়লাম, "ঋণ পরিশোধের চেষ্টা এ নয়, ঋণ স্বীকারের দুঃসাহস মাত্র!”

আমিও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, এ আমার ঋণ স্বীকারের দুঃসাহস।

ছোটভাইকে বোঝাই সেসব উপলব্ধির কথা। কুরআন পড়তে জানো মানে একটা সিঁড়ি তুমি অতিক্রম করে ফেলেছো। এবার সেখান থেকে শিক্ষা নিতে পারার মত জ্ঞান অর্জন করা চাই, চাই সেই প্রত্যাদেশ জীবনে প্রয়োগের মত যোগ্যতা। আল্লাহর ইচ্ছায় তোমার নিজের জীবন তো ফুল্ল-ফুলেল হবেই, আব্বুম্মু-ও তোমার কৃতিত্বের হাসিতে হাসবেন। সেই হাসিতে মুক্তো ঝরবে। সেই মুক্তো দিয়ে মালা গাঁথা হবে। আমরা সব ভাইবোন সেই মালা পরবো। জান্নাতে হাসিখুশির ফোয়ারা বইয়ে দেওয়া একটা উদ্যানে আবার সবাই একত্রিত হবো।

আমার ভাইকে সেই স্বপ্নে তাড়িত করতে চেয়েছি। সেই স্বপ্নে নির্ঘুম হয়ে যাবার নেশা জাগাতে চেয়েছি। কাবার রব্ব! তুমি আমার অব্যক্ত ভাবাবেগের পূর্ণতা দাও।

হাঁটতে হাঁটতে আরো কথা বলি। ওর কাছ থেকেও শুনি। নিজে ভাবনার খোরাক পাই ওর কথা থেকে। শিশু-কিশোরদের সরল জীবনোপলব্ধি, নিষ্পাপ চাহনির সহজ অভিব্যক্তির কাছে সবারই উচিৎ সময় করে একটু হাঁটুগেড়ে বসা।

আমি বলতে বলতে আরো কিছু যোগ করি। এই যে আব্বুম্মুর প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ, এই বোধটাই পৃথিবীকে সুন্দর রাখে। শিক্ষকের প্রতি একজন ছাত্র কৃতজ্ঞ থাকে তাঁর জ্ঞান-প্রতীতির জন্যে। জীবনের পরিণত পর্যায়ে এসে ইচ্ছে করে শৈশবের শিক্ষকদের কাছে ছুটে যেতে। কৃতজ্ঞতাবোধ মানুষে মানুষে মানবিক বন্ধন সংহত করে। আবার এই কৃতজ্ঞতাবোধ মানুষকে আল্লাহর কাছাকাছি করে। যাপিত জীবনে তাঁর যে অজস্র নেয়ামত আমরা ভোগ করে চলছি, আদিগন্ত করুণার আকাশে নিশ্চিন্ত বিহঙ্গ হয়ে উড়ছি, আমাদের অনিঃশেষ পাপগুলো নিমেষের পরিতাপে মুছে দিচ্ছেন, এজন্যে অবনত মস্তক বারবার সমর্পিত হওয়া কি উচিৎ নয়?

আমি ধরতে পারি, ওর ভাবনার সায়রে ঢেউ খেলতে শুরু করেছে। আমি উচ্ছ্বসিত হই। বিশ্বাসের সৌরভে বিমোহিত হবার আনন্দের চেয়ে বিশ্বাসের ফুল প্রস্ফুটিত হতে দেখার আনন্দ কোনো অংশে কম নয়।

নিজের সাথে কথা বলেও আমি এই অনুভবটাই বারবার আবিষ্কার করি মন-মুকুরে। জীবনের যা কিছু আরব্ধ, যা কিছু আরাধ্য, সবকিছু ঐ একজনের উদ্দেশ্যে নিবেদন। করার মধ্যেই তো হৃদয়ের প্রশান্তি! পথ চলতে চলতে আযান শোনা যায়। নিকটস্থ মাসজিদে ঢুকে পড়ি দুই ভাই। নির্ধারিত ইমাম সম্ভবত আজ নেই, মুয়াজ্জিনের অনুরোধে ইমামের জায়গায় আমি দাঁড়ালাম। প্রথম রাকাতে যখন "কুল ইন্না সালাতী ওয়া নুসুকী ওয়া মাহয়ায়া ওয়া মামাতী লিল্লাহি রাব্বিল 'আলামীন' পড়ছিলাম, তখন বুক ভারী হয়ে আসতে চায়। কত ওজনদার কথা উচ্চারণ করছি মুখে! এই উচ্চারণকে যাপিত জীবনে সঞ্চারণ করতে পারি কতটুকু? আত্মজিজ্ঞাসু অন্তর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলে নিরন্তর। নিজের কাছে। আমার কাছে।

টিকাঃ
১ আল-মুসতাদরাক: ২৩৩১ / هذا حديث صحيح الإسناد
১ কুরআনের আয়াত : قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ "আপনি বলুন: আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন এবং আমার মরণ বিশ্বজগতের রব্ব আল্লাহর জন্যে নিবেদিত।" [সূরা আল-আন'আম ৬:১৬২

📘 শেষরাত্রির গল্পগুলো > 📄 পিপাসার গল্প প্রথম সংস্করণ অথবা ঈর্ষার গল্প দ্বিতীয় সংস্করণ

📄 পিপাসার গল্প প্রথম সংস্করণ অথবা ঈর্ষার গল্প দ্বিতীয় সংস্করণ


'জাগো গো ভগিনী' শীর্ষক প্রবন্ধগল্পে আমি একটা গানের কথা বলেছিলাম। নাফিস এখন যে বয়সে উপনীত, ঠিক এই বয়সেই গানটা আমার প্রিয় ছিলো। গানটা আমি ওকে শিখিয়েছিলাম বেশ আগে। আজকে আমাকে শোনালো:
জন্ম যদি হত মোদের রাসূল পাকের কালে
আহা রাসূল পাকের দেশে
মোদের তিনি কাছে টেনে চুমু দিতেন গালে
আহা কতই ভালোবেসে..

বেশ অনেকদিন পর সেই পুরনো ব্যথাটা আবার অন্যরকম শূন্যতা নিয়ে হাজির হোল আমার কাছে। খুব শৈশবে গানটা অবলীলায় গেয়ে যেতাম, পড়ন্ত কৈশোরে গাইতে গাইতে তন্ময় হতাম, আর তারুণ্যে এসে গানটার বাণী নীরবে চোখ ভেজায়। অনেকদিন সেরকম অনুভূতি হয় নি আমার। নাফিসের মায়াবী কণ্ঠ আমাকে আবার উদাস করে দিয়েছে, চোখ ঈষৎ আর্দ্র হলেও কোনো ফোঁটা গড়ায় নি; তথাপি ভেতরে অপ্রাপ্তির নদে সর্বগ্রাসী বান ডেকেছে বরাবরের মতোই। তার সাথে যুক্ত হয়েছে প্রচণ্ড ঈর্ষাবোধ।

প্রিয়নবীজির [] সান্নিধ্যলাভে ধন্য সোনার মানুষগুলোর প্রতি ঈর্ষাবোধ আমার নতুন কিছু নয়। ইদানীং এই অনুভূতি ক্রমশ গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছে। আর হবেই না বা কেন?

আমি আমার নবীজিকে [ﷺ] কত্ত কত্ত ভালোবাসি! অথচ তাঁর মুখ থেকে একটিবারের জন্যে 'তোমাকেও ভালোবাসি' কথাটা শোনবার সৌভাগ্য কি আমার হয়? যে সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর সাহাবী মু'আজ ইবন জাবাল [রা.]-এর? আহ্! কে জানে কেমন নিশ্চেতন করা অনুভূতি তাঁর হয়েছিল, যখন নবীজি [ﷺ] মু'আজের দুই হাত ধরে বলেছিলেন :
“ يا معاذ والله إني لأحبّك والله إني لأحبك
"এই যে মু'আজ! আল্লাহর শপথ, আমি তোমাকে ভালোবাসি! আল্লাহর শপথ, আমি তোমাকে ভালোবাসি!”

একবার নয়! দুইবার বললেন ভালোবাসার কথা। কতো গভীর ভালোবাসা! কী নিদারুণ সৌভাগ্য তাঁর! মু'আজ, আপনাকে আমার ঈর্ষা হয়, খুব, খুউব!

তারপর... আল-কুরআনকে আমি কত না ভালোবাসি! একটা দিন কুরআনের সাথে কিছু সময় না কাটালে আমার চলেই না। কোনো কোনো দিন ঝোঁকের বশে পুরোটা দিনই তার সাথে কাটিয়ে ফেলি। কুরআনের জ্ঞান-সমুদ্রের সৈকতে নুড়িকণা কুড়াই কী গভীর আগ্রহ আর মমতা নিয়ে, একদিন সেই সমুদ্র অবগাহনের স্বপ্ন দেখি বলে। অথচ আমার এই ভালোবাসায় বারাকাহ'র দু'আ করার জন্যে আমার পাশে নবীজি নেই! 'আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস কী সৌভাগ্যবান! আল-কুরআনের অনুসন্ধিৎসু এই মানুষটা পেয়েছিলেন নবীজির আন্তরিক দু'আ :
“ اللهم علمه الكتاب
"আল্লাহ! একে তুমি কুরআনের জ্ঞানে প্রাজ্ঞ করো!"

আমার নামটাও তো আব্দুল্লাহ! কিন্তু আপনি সৌভাগ্যবান আব্দুল্লাহ! আমি তৃষ্ণার্ত আব্দুল্লাহ!

কুরআনের জ্ঞান চর্চার কথা বাদ দেই, কেবল কুরআন পাঠের কথা-ই না হয় ধরি। এই কাজ তো আমিও কত ভালোবাসা নিয়েই করি! আমার অপরিপক্ক ক্বিরাআত শুনে কত মানুষের দু'আ পেয়েছি। অথচ নবীজির [ﷺ] মুখ থেকে একটিবারের জন্যেও উৎসাহ পাই নি, পাই নি দু'আ। আবূ মূসা আল-আশ'আরীকে যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন :
“ لو رأيتني و أنا أستمع لقراءتك البارحة
“গতরাতে তোমার ক্বিরাআত যখন আমি মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম, তখন যদি আমাকে তুমি দেখতে!”

আবূ মূসার হৃদয়ে কী অনন্য দ্যোতনার হিন্দোল বয়েছিলো, কে জানে! আচ্ছা, আমি যদি সে সময় জন্ম নিতাম, মায়াভরা কণ্ঠে কুরআন পাঠ করতাম, আমাকেও কি নবীজি ﷺ এমন একটু ভালোবাসাপ্রাণিত উৎসাহ দিতেন না? আমার ক্বিরাআত না হয় সেরকম ভালো নয়, কিন্তু আমি যে তাঁর মুখ থেকে এমন একটা কথা শোনার জন্যে পাগলপ্রায়, এ কথা জানার পর নবীজি ﷺ কি সান্ত্বনার জন্যে হলেও আমাকে একটু ভালোবাসার জানান দিতেন না!? দিতেন, নিশ্চয়ই দিতেন! আমার নবীজি তোমাদের মতো না তো!

তারপর উবাই ইবন কা'ব-এর কথা-ই ধরি। এই মানুষটাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন বললেন:
إن الله أمرني أن أقرأ عليك سورة البينة
“আল্লাহ আমাকে আদেশ করেছেন, আমি যেন তোমাকে সূরাহ আল-বায়্যিনাহ পাঠ করে শোনাই।”

আনন্দে উদ্বেল হয়ে আবেগাপ্লুত উবাই বললেন :

الله ستماني لك
"আল্লাহ কি তবে আপনাকে আমার নামটি বলেছেন!?[৩]"

উবাই! রদ্বিয়াল্লাহু 'আনকা। আপনি কী সৌভাগ্য নিয়ে এসেছিলেন এই জমিনে? আল্লাহ আপনার নাম নিয়েছেন, নবীজি ﷺ আপনার জন্যে কুরআন পাঠ করছেন! আপনাকে আমি খুব বেশি ঈর্ষা করি!

কবিতার সাথে কত পথ হেঁটে এলাম আমি! এই নিষ্ফলা জমিনের বুকে উদয়াস্ত বিশুদ্ধতার চাষ করে গেছি। সে ফসল ফেরি করে বেড়াই তিলোত্তমা নগরীর বুকে। অথচ এখানেও আমি তৃষ্ণার্ত ভীষণ! হাসসান ইবন সাবিত-এর মত আমার নবীজি [ﷺ] থেকে একটু ভালোবাসা, একটু দু'আ আমার ভাগ্যে জোটে নি।

"اللهم أيده بروح القدس"
“হে আল্লাহ! তুমি হাসসানকে রুহুল কুদস (জিবরীল) এর মাধ্যমে সাহায্য করো!!”

হাসসান-কে ভালোবেসে তাঁর কবিতা আবৃত্তির জন্যে রাসূলুল্লাহ [ﷺ] নিজের পাশে একটি আবৃত্তিমঞ্চ গড়ে দিয়েছিলেন! সেসব চিন্তা করলে মাঝে মাঝে আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় পাওয়া পুরস্কার-ক্রেস্টগুলো, কবিতা লিখে পাওয়া ভালোবাসাগুলো, নিজের কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হবার আনন্দ ও গৌরব- সবকিছু অর্থহীন মনে হয়। আমি যদি সে সময় থাকতাম, আমাকে তেমন কোনো সুযোগ না দেওয়া হোক, তেমন মর্যাদা না দেওয়া হোক, অন্তত আমার কবিতা শুনে নবীজির [ﷺ] মুখ থেকে একটা অমিয় হাসি দেখার সৌভাগ্য তো পেতাম।

রাসূলের সান্নিধ্যলাভে ধন্য হে আলোর পাখিরা! রদ্বিয়াল্লাহু ‘আনকুম।

আমি তোমাদের ঈর্ষা করি বলে মনঃক্ষুণ্ণ হয়ো না। ঈর্ষার চেয়ে আমি তোমাদের ভালোবাসি বেশি।

তোমাদের সাথে, প্রিয়তম রাসূলের সাথে ফিরদাউসের বাগিচায় যেদিন দেখা হবে (ইন শা-আল্লাহ), সেদিনের আগ পর্যন্ত আমি তৃষ্ণার্ত-ই রবো।

টিকাঃ
১ সুনান আবু দাউদ: ১৫১৯
২ সাহীহ আল-বুখারী: ৭৫। মুসনাদ আহমাদ: ৩৩৭৯। আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, খ. ৮ পৃ. ৩২৭।
১ সাহীহ মুসলিম: ১৯৩
২ সাহীহ আল-বুখারী: ৩১৮৪। সাহীহ মুসলিম: ২৪৮৫। সুনান আন-নাসাঈ: ৭১৬।
৩ প্রাগুক্ত
১. সাহীহ আল-বুখারী: ৪৫৩। সাহীহ মুসলিম: ৯৯৯।

📘 শেষরাত্রির গল্পগুলো > 📄 গ্রন্থপরিচিতি

📄 গ্রন্থপরিচিতি


এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00