📘 শেষরাত্রির গল্পগুলো > 📄 খুনসুটির গল্প

📄 খুনসুটির গল্প


দাম্পত্যজীবনে উভয়ের ভালোবাসার অনুভবকে অজস্রধার করার জন্যে খুনসুটির প্রয়োজন আছে। পারস্পরিক বোঝাপড়াকে একঘেঁয়েমির মরচে থেকে রক্ষা করার জন্যে মাঝেমধ্যে উপাদেয় বাক্যবিনিময় বেশ কাজে দেয়।

সর্বোত্তম আদর্শের মূর্ত প্রতীক রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দাম্পত্যজীবনও ছিলো প্রীতিময়, প্রাণোচ্ছল ও সবুজ-সজীব।

একবার নবীজি ﷺ ‘আয়িশার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা দিলেন। সেবার ‘আয়িশা বিজয়ী হলেন।

আরেকবার প্রতিযোগিতা দিয়ে ‘আয়িশাকে পেছনে ফেলে দিলেন এবং বললেন, ‘শোনো, এটা ঐদিনের প্রতিশোধ!’

এই গল্প সীরাতের পাতায় পড়েছি বেশিদিন হয় নি। গতকাল আমার এক (মিশরীয়) কবিতা-বন্ধু তাঁর ফেসবুকে ‘প্রোফাইল পিকচার’ পরিবর্তন করেছেন। আমি কিছু একটা লিখতে যাবো, তার আগেই দেখি তাঁর সহধর্মিণী ‘কমেন্ট’ লিখে বসে আছেন:

! أنت مثل القمر
(তুমি চাঁদের মতো!)

মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই তিনি সেই ‘কমেন্ট’-এর ‘রিপ্লাই’ লিখলেন:

! القمر يأخذ منك نوره يا شمس
(চাঁদ তো তোমার কাছ থেকেই আলো নেয়, হে সূর্য)

📘 শেষরাত্রির গল্পগুলো > 📄 ফিরদাউসের ফুলবাগানে আমি হবো পাখি

📄 ফিরদাউসের ফুলবাগানে আমি হবো পাখি


এক : পাহাড় দেখেছেন নিশ্চয়-ই?
: জি!
: মস্ত পাহলোয়ান হিসেবে চার গ্রামে আপনার তো বেশ নামডাক আছে।
: হেহেহ জি!
: আচ্ছা ধরুন, আপনার মতো এরকম কয়েক শো পাহলোয়ান একসাথে হয়ে যদি পাহাড়টা ঠেলতে থাকেন, পাহাড় কি তার জায়গা থেকে এক ইঞ্চি নড়বে?
: দুনিয়ার কোন পাগলটা আছে, যে বলপ্রয়োগে পাহাড় সরাতে চাইবে?
: আছে রে ভাই! সেই গল্পই তো শোনাবো!

দুই
: এই নুড়িকণাগুলো যদি আপনাকে এখান থেকে সরাতে বলি, পারবেন?
: হাসালেন ভাই!
: মানে পারবেন, এই তো?
: মিয়াভাই হাসায়েন না আর! এইটা কি জিজ্ঞাসা করার বিষয়? নুড়ি পাথর সরাতে আমার মত পাহলোয়ানের কী দরকার? একটা ছোট বাচ্চা-ও এটা পারবে। তা বলেন, আপনি হঠাৎ এই প্রশ্ন করছেন কেনো?
: কাহিনী আছে! শোনাবো তো!

তিন
: পাহলোয়ান ভাই, একটা জিনিস ভাবছিলাম।
: কী মিয়াভাই?
: এই যে পাহাড়টা! এটা ছোট ছোট কিছু নুড়িপাথর, বালুকণা আর মাটি মিলে এত বড় হয়েছে, তাই না?
: হুমম।
: দেখেন, এই ছোটখাট পাথর আর মাটিকণা এখান থেকে আপনি অনায়াসেই সরাতে পারবেন। কিন্তু এরা জমতে জমতে যখন পাহাড়ের রূপ নেবে, তখন কিন্তু সরাতে পারবেন না!
: ঠিক বলছেন মিয়াভাই। ছোটবেলায় ইশকুলে মাস্টার মশাই পড়িয়েছিলেন:
“ছোট ছোট বালুকার কণা, বিন্দু বিন্দু জল
গড়ে তোলে মহাদেশ, সাগর অতল!"
: আরিব্বাস সে কথা-ই তো বলছিলাম। তা পাহলোয়ান ভাই, আমি আরেকটা কবিতা শোনাতে চাই আপনাকে।
: নিশ্চয় নিশ্চয়!
: আমার কবিতাটা কিন্তু আরবিতে। ইবনুল মু'তাজের লেখা। তাফসির ইবন কাসির- এর নাম শুনেছেন না? ঐটাতে পড়লাম।
: আমি তো আরবি বুঝি না মিয়াভাই!
: চিন্তা করিয়েন না। আমি কাব্যানুবাদ করে দেবো তো!
: বাব্বাহ! বলে ফেলেন তাইলে!
: শোনেন মন দিয়ে:
حَلَّ الذُّنُوبَ صَغِيرَهَا * وَكَبِيرَهَا ذَاكَ التَّقْى
اِدَالا تَحْقِرَنَّ صَغِيرَةً أَنْ "الجِبَالَ مِنَ الحَصى

ছোট হোক বড় হোক, পাপ ছেড়ে দাও
এরই নাম তাকওয়া, মনে গেঁথে নাও!
'ছোট পাপ' বলে কিছু অবহেলা নয়,
ছোট নুড়িকণা মিলেই পর্বত হয়!

চার
কবিতাটা শুনে পাহলোয়ান ভাই চিন্তায় পড়ে গেলেন। তাঁর চোখে কিছু আপন মানুষের চেহারা ভাসতে লাগলো, যাঁরা 'ছোটখাট পাপ' বলে অনেক বিষয়কেই তুচ্ছজ্ঞান করেন এবং অবলীলায় সেই গর্হিত কাজগুলো করে যান। অথচ তাঁরা খেয়াল করেন না, ছোট ছোট বালুকার কণা জমতে জমতে পাহাড় হয়! তাঁরা বুঝেন না, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলবিন্দু মিলে মহাসাগর হয়!

তাঁর মনে পড়ে, এরকম একজন ভাইকে যখন তিনি উপদেশ দিচ্ছিলেন, তখন ভাইটা জবাব দিয়েছিলেন, 'আরেহ! আল্লাহর রহমতে আমার ঈমান বেশ মজবুত আছে। এসব ছোটখাট বিষয় আমার ওপর বড় একটা প্রভাব ফেলবে না!'

পাহলোয়ান ভাই কিছু বলতে পারেন নি তাঁকে। কিন্তু এখন তাঁকে পুরো বিষয়টা বুঝিয়ে বলতে পারবেন। কী বলবেন? মনে মনে সাজাচ্ছিলেন কথাগুলো。
মিয়াভাই যখন আমাকে নুড়িপাথরগুলো সরাতে বললেন, তখন আমার হাসি পাচ্ছিলো। কিন্তু যখন পাহাড় সরাতে বললেন, তখন আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। এই নুড়িপাথরগুলো মিলেই যে পাহাড়ের সৃষ্টি, সেই পাহাড় কি না আমি সরানোর সাহস করছি না! আমার মত এত বড় পাহলোয়ান যেমন পাহাড়টা সরাতে অক্ষম, তেমনি তোমার মত শক্তিশালী ঈমানদার-ও ছোট ছোট পাপ থেকে সৃষ্ট পাহাড়টা সরাতে অক্ষম!

ভাইটা নিশ্চয়-ই বুঝবে। তারপর হয়তো তাকে প্রশ্ন করবে, 'তাহলে কী করা যায়?'
পাহলোয়ান ভাই সেটার উত্তর-ও রেডি করে রেখেছে, 'কিছু করতে হবে না। একটাই কাজ তোমার। ছোট পাপ বলে কোনো কিছুকে অবিরত ও চলমান হতে দেবে না। ছোট নুড়িপাথরটা যেমন অনায়াসে সরানো যায়, তোমার পাপটাও সেভাবে খুব সহজেই মুছে ফেলতে পারো। কিন্তু যদি অনবরত করতেই থাকো, তাহলে বিরাট পাহাড়ের আকার ধারণ করবে, তুমি বিপদে পড়ে যাবা!'

ভাইটার মুখে বোধের দ্যুতি ঔজ্জ্বল্য নিয়ে আসবে। নিজের ভুল বুঝতে পারবে। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে, পাহলোয়ান ভাইকে-ও কৃতজ্ঞতা ও দু'আ জানাবে! এসব ভাবতে ভাবতে পাহলোয়ান ভাইয়ের চোখেমুখে তৃপ্তির রেখা ফুটে ওঠে। মিয়াভাইকে সেই আনন্দে অংশীদার করে।

পাঁচ
পাহলোয়ান ভাইয়ের উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ আবার খলখল করে ওঠে :
: আচ্ছা মিয়াভাই, কবিতায় যে তাকওয়ার কথা শুনলাম, এটা নিয়ে কিছু বললেন না তো!
: হুমম! এই যে আমরা ছোট বড় সব পাপ থেকেই সরে আসবো বলে যে প্রতিজ্ঞা করছি, তাকওয়া সেই প্রাণনাকে বাড়ানোর-ই একটি উপাদান!
: বেশ মজার তো! ক্যামনে বলুন তো মিয়াভাই!
: আমার মুখে শুনবেন? নাকি গল্প বলবো একটা?
: তা আর বলতে হয়? গল্প-ই না হয় শোনান!
: একদিন 'উমার [রা.] উবাই ইবন কা'ব [রা.]-কে জিজ্ঞেস করলেন: 'তাকওয়া কী?' উবাই বললেন, 'আপনি কি এমন পথ দিয়ে হেঁটেছেন, যেটার দুপাশ কণ্টকাকীর্ণ?' 'উমার বললেন, 'হেঁটেছি বটে!' উবাই জিজ্ঞেস করলেন, 'তখন কী করেছেন আপনি?' 'উমার জবাব দিলেন, 'কাপড় গুটিয়ে খুব সাবধানে সন্তর্পণে হেঁটেছি।' উবাই বললেন, 'এটাই হচ্ছে তাক্বওয়া![১]'

ছয়
পাহলোয়ান ভাই তাঁর প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছেন। কত চমৎকারভাবে তাঁকে বোঝালেন মিয়াভাই!
এবার তো তার দায়িত্ব বেড়ে গেলো। সবাইকে তিনি বোঝাবেন। পৃথিবীর কণ্টকাকীর্ণ পথে আমরা যাঁরা জান্নাতের স্বপ্নচারী মুসাফির, তাঁদেরকে কত না সন্তর্পণে, সাবধানে হাঁটতে হবে! আবার ছোটখাট ভ্রান্তিবিলাস থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে কি আপ্রাণ চেষ্টা-ই না করতে হবে! নইলে যে পাহাড় জমে যাবে!
পাহলোয়ান ভাইয়ের ভাবান্তর দেখে মিয়াভাই হাসেন, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হন। দুজনের চোখেমুখে স্বপ্নের লুকোচুরি! কদিন আগে নজীব নামের একটা পাগল তাঁদেরকে দোপদী ছড়া শুনিয়েছিলো। এবার সেটাই দুজনের মুখে গুণগুণ রবে গুঞ্জরিত হয়:
"বুকের খাতায় খুব যতনে একটা স্বপন আঁকি, ফিরদাউসের ফুল বাগানে আমি হবো পাখি।"
পাহলোয়ান ভাই খুব ভাবেন, কাজটা খুব কঠিন কিন্তু নয়! স্বপ্নের সাথে একটু সাহস আর ঈমানের রোশনাই জড়িয়ে নিলেই হয়! মিয়াভাই একমত হন। দুজন নতুন শপথে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। বদলে যাবার, বদলে দেবার অনুপ্রেরণায় সিক্ত হন।

আমি, আপনি, তুমি, তুই – আমরা কেন বঞ্চিত থাকবো বলেন? পাহলোয়ান ভাই আর মিয়াভাইয়ের মত আমরাও কি নিজেদের সাথে একটু কথা বলতে পারি না? নিশ্চয়ই পারি!

টিকাঃ
১ তাফসীর ইবন কাসীর, খ. ২ পৃ. ২১
১ প্রাগুক্ত

📘 শেষরাত্রির গল্পগুলো > 📄 একঝাঁক পাখি এবং অনন্য আল-কুরআন

📄 একঝাঁক পাখি এবং অনন্য আল-কুরআন


একঝাঁক পাখি আকাশে উড়ে যেতে দেখেছেন নিশ্চয়ই! খেয়াল করে দেখবেন, উড়তে উড়তে এক সময় হঠাৎ করেই কিন্তু তাদের পাখা স্থির হয়ে যায়। কিন্তু সেটা ক্ষণস্থায়ী। কিছু সময় পাখা ওভাবে স্থির রেখে এরপর আবার পূর্ণোদ্যমে উড়তে শুরু করে।

এবার আল-কুরআনের মজার ভাষাশৈলী লক্ষ্য করুন।

প্রথমত দুটো বিষয় একটু মাথায় রাখুন:
» পাখির ডানা মেলে উড়ে যাওয়াটা চলমান থাকে।
» ডানা স্থির করে রাখাটা সামান্য সময়ের জন্যে, অস্থায়ী।

এবার আরবি ব্যাকরণের দুটি অনুসিদ্ধান্ত দেখুন:
» আরবিতে فعل (ফে'ল তথা ক্রিয়া) গুলো حدوث (সাময়িক সংঘটিত হওয়া) অর্থে ব্যবহৃত হয়।
» আর اسم (ইসম; যেমন: فاعل তথা কর্তা, مفعول তথা কর্মকারক ইত্যাদি) গুলো আসে প্রবহমানতা অর্থে, অর্থাৎ চলমান প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে।

'ক্লিয়ার?'

এখন আসুন আল-কুরআনের একটি আয়াতের দিকে:
أَوَلَمْ يَرَوْا إِلَى الطَّيْرِ فَوْقَهُمْ صَافَّاتٍ وَيَقْبِضْنَ
“তারা কি তাদের উপরে পাখির দিকে তাকায় না? (যারা) উড়ন্ত এবং ডানা সংকোচন করে।”

খেয়াল করে দেখুন:
صَافَّاتٍ শব্দটি একটি ইসম। অর্থ: উড়ন্ত। [ক্রিয়া ব্যবহার করে 'উড়ে' বলা হয়নি]
يَقْبِضْنَ শব্দটি একটি ফে'ল। অর্থ: ডানা সঙ্কোচন করে। [ইসম ব্যবহার করে 'সঙ্কোচনকারী' বলা হয় নি।]

সাধারণত, ভাষালঙ্কারের দাবী হোল, একইসাথে দুই ধরনের শব্দ ব্যবহার না করা। পাশাপাশি ভিন্ন দুটি প্রকৃতির শব্দ সাধারণ দৃষ্টিতে বেমানান। আপাতত মনে হতে পারে, এখানে দুটিই ইসম অথবা দুটিই ফে'ল আসলে আরো শ্রুতিমধুর হতো। যেমন:
- যারা উড়ে যায় এবং ডানা সংকোচন করে।
অথবা,
- যারা উড়ন্ত এবং ডানা সংকোচনকারী।

কিন্তু বলা হোল: "যারা উড়ন্ত এবং ডানা সংকোচন করে।" একটি বিশেষ্য, আরেকটি ক্রিয়া। আমাদের আগের সমীকরণ দুটির দিকে এবার তাকান। রহস্যটা বুঝতে পারলেন?

পাখিদের উড়াটা যেহেতু প্রবহমান থাকে, এজন্যে উড়া অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে ইসম। আর ডানা সংকোচন করাটা যেহেতু অস্থায়ী ও অকস্মাৎ ঘটে থাকে, এ জন্যে সে অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে ফে'ল।

কত সূক্ষ্ম শব্দচয়ন! মহাজ্ঞানী আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার শব্দ চয়ন এতটাই বাস্তবসম্মত! আল-কুরআনের এই অনন্য ভাষাশৈলী আমাকে বারবার প্রভুর প্রতি বিনীত মস্তককে আরো বেশি নুইয়ে দেয়।

টিকাঃ
১ সূরা আল-মুলক ৬৭:১৯

📘 শেষরাত্রির গল্পগুলো > 📄 সপ্তাহান্তের দিনলিপি

📄 সপ্তাহান্তের দিনলিপি


'উইকেন্ড' নামে একটা কিছু আমার জীবনে ছিলো। ছোটভাইকে ঢাকায় আনার পর সেটা তাকে দিয়ে দিয়েছি।

ওদের এই বয়সটা সম্ভাবনার। জীবনের ‘টার্নিং পয়েন্ট’, আক্ষরিক অর্থেই। পরিচর্যার প্রয়োজন হয়, সহমর্মিতার দরকার হয়। বড়োদের ইতিবাচক সঙ্গ ও প্রীতিযাচক সাহচর্য হয়ে ওঠে অনিবার্য। হোস্টেল থেকে আনলাম আমার কাছে। ঘুরতে বেরোতে মনস্থির করলাম। বইয়ে যেসব বিখ্যাত স্থান ও স্থাপনার কথা পড়ে এসেছে সেগুলো দেখার ইচ্ছে আছে তার।

আমার হাতে নাসিমের হাত। আমি শক্ত করে ধরে থাকি। আমি পাগলটা যে একেবারে অকাজের না, আমি যে এই মুহূর্তে তার নির্ভরতা, আমাকে ওর ‘বড়ো ভাইয়া’ বলাটাও যে একদম অর্থহীন না, এই কথা ওর ভেতর গেঁথে দেওয়া দরকার বলে মনে হচ্ছিলো। গ্রামীণ সবুজতা পেছনে ফেলে এই নাগরিক কোলাহলে যেন নিজেকে একা না ভাবতে পারে, সেজন্যে এই প্রচেষ্টা। পিঠে ও কাঁধে হাত রাখি। মাথাটা একটু বুকে মিশাই। আল্লাহকে খুব করে বলি, আমার ভাইবোনগুলো এই সরোবরে একেকটা চলিষ্ণু পাথর হোক, কালজ জলজ শ্যাওলা যার গায়ে জমে থাকার সুযোগ পায় না। ওকে ছুঁয়ে দেওয়ার পর আমার অন্তর আজকেও সেই কথাটাই বলছিলো নীরবে।

দৈহিক গড়নে সে সহপাঠীদের তুলনায় ক্ষীণকায় রয়ে গেছে। ভেতরের সত্ত্বাটাও এখনো পুরোপুরি জাগে নি। ও এখন কোন্ পৃথিবীর বাসিন্দা, পুরোপুরি ঠাওর করতে পারে নি। সবকিছু মানিয়ে নিতে যে বেগ پোহাতে হয়, আধো আধো অনুযোগে সে কথা প্রকাশিত হয়। আমি তাকে অভয় দেই। ক্ষীণকায় বলে নিজেকে দুর্বল না ভাবার জন্যে প্রাণিত করি। একটু মজা করেই বোঝাতে চেষ্টা করি: উনিশ শতকে প্রচণ্ড দুর্বল অর্থনীতির জন্যে যেই চীন-কে ‘সিক ম্যান অব এশিয়া’ (এশিয়ার রোগাপটকা ব্যক্তি) বলা হতো, সেই চীন এখন উপহাসকারীদের অর্থনীতির ওপরেই ছড়ি ঘোরায়। যেই তুরস্ক-কে ‘সিক ম্যান অব ইউরোপ’ বলা হতো, সেই রাষ্ট্রটির অগ্রগতি এখন বিশ্ব-অর্থনীতির সরফরাজদের তাক লাগিয়ে দেয়। আরো নানা কথা-উপকথায় মেওয়া ফললো। ওর মুখে এক চিলতে হাসি আসি আসি করে। আর আমার মুখে হাসি এসেই পড়ে। প্রশান্তির হাসি।

আব্বুম্মু'র কথা আমি নিজেই তুলি। পিচ্চি-পাচ্চাদের গপ্পো-ও করে যাই কিছুক্ষণ। ও খানিকটা সময় উদাস হয়ে যায়। এই উদাস হওয়াটা আমার প্রতীক্ষিত ছিলো। সদ্য শৈশব পার হওয়া একটা কিশোর মধ্যবিত্ত পরিবারের সংগ্রামী জীবনাচারের মধ্যে বেড়ে উঠেও ঠিক বুঝবে না কতটুকু রক্ত পানি করে আব্বুরা এই লড়াইয়ে মগ্ন থাকেন। কিংবা উদয়াস্ত খাটুনিতে সংসার কিভাবে আম্মু আগলে রাখেন, সেটাও তার উপলব্ধির আয়নায় পূর্ণরূপে বিম্বিত হওয়ার কথা নয়। আমিও সেদিকে ওর নজর কাড়তে চাই নি। আমি শুধু বুঝিয়ে দিতে চেয়েছি, নাড়িছেঁড়া ধন সুদূর বিয়াবানে পাঠিয়ে আব্বুম্মু ঠিক কী স্বপ্নটা আঁকেন মনের খাতায়। জঠরে ধারণের সময় থেকে ছোট্ট জীবনের এই প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছাতে আমার আম্মু কত ব্যথা পেয়েছেন, শৈশব থেকে তারুণ্য অবধি আমাকে ছায়া দিতে কত রোদ আব্বু সয়েছেন, আমি সেসবকিছু আনমনে ভাবি, পুরোটা না বুঝলেও যৎকিঞ্চিৎ বুঝি। আর তাতেই আমি অশ্রুসজল হই। আমার ভেতরে কেউ একজন বলে, এই ঋণ শোধ না করে পৃথিবী থেকে বিদায় হয়ো না নজীব! আমি সবসময় এমন কোনো উপায়ের সন্ধানে ছিলাম, যেটা সাধ্যের মধ্যেই সর্বোচ্চ ঋণ পরিশোধ বলে প্রতীয়মান হবে আমার কাছে। একদিন হাদিসে জানলাম:
“من قرأ القرآن ، وعمل بما فيه ألبس والده يوم القيامة تاجا ضوءه أحسن من ضوء الشمس
যে কুরআন পাঠ করবে, কুরআনের বার্তা অনুযায়ী আমল করবে, কিয়ামতের দিন তার বাবা-মাকে একটি মুকুট পরিয়ে দেওয়া হবে, যার দীপ্তি হবে সূর্যালোকের চেয়েও উজ্জ্বল।১৯
হাদিসটা আমাকে অনেকক্ষণ ভাবিয়েছিলো। এই ভাবনা থেকেই আমার প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নিয়েছিলাম। আমার ভেতরে উপলব্ধি জেগেছিলো যে, আমার কাজের কারণে যদি আল্লাহ আমার আব্বুম্মু-কে সম্মানিত করেন, সন্তান হিসেবে তাঁদের জন্যে এরচেয়ে বড়ো উপহার আর কী দিতে পারি আমি? কুরআনের সাথে আমার নিবিড় ভালোবাসার কারণে যদি আব্বুম্মুকে চূড়ান্ত হিসেবের দিন মুকুট পরিয়ে দেওয়া হয়, ঋণ পরিশোধের এর চে’ উত্তম কোন পন্থা আর কী হতে পারে?

অবশ্য এটা ঠিক, তাঁদের ঋণ অপরিশোধ্য। এই কথাটা এক সময় আবেগের ছিলো, কিন্তু এখন উপলব্ধির। আমার পক্ষে সম্ভব নয়, তাঁদের ঋণ পরিশোধ করে দেওয়া। তবে এতকিছু ভাবছি কেন? এই গোলক ধাঁধা থেকে বাঁচালেন সুধীন দত্ত। তাঁর কোনো এক লেখায় একদিন পড়লাম, "ঋণ পরিশোধের চেষ্টা এ নয়, ঋণ স্বীকারের দুঃসাহস মাত্র!”

আমিও মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, এ আমার ঋণ স্বীকারের দুঃসাহস।

ছোটভাইকে বোঝাই সেসব উপলব্ধির কথা। কুরআন পড়তে জানো মানে একটা সিঁড়ি তুমি অতিক্রম করে ফেলেছো। এবার সেখান থেকে শিক্ষা নিতে পারার মত জ্ঞান অর্জন করা চাই, চাই সেই প্রত্যাদেশ জীবনে প্রয়োগের মত যোগ্যতা। আল্লাহর ইচ্ছায় তোমার নিজের জীবন তো ফুল্ল-ফুলেল হবেই, আব্বুম্মু-ও তোমার কৃতিত্বের হাসিতে হাসবেন। সেই হাসিতে মুক্তো ঝরবে। সেই মুক্তো দিয়ে মালা গাঁথা হবে। আমরা সব ভাইবোন সেই মালা পরবো। জান্নাতে হাসিখুশির ফোয়ারা বইয়ে দেওয়া একটা উদ্যানে আবার সবাই একত্রিত হবো।

আমার ভাইকে সেই স্বপ্নে তাড়িত করতে চেয়েছি। সেই স্বপ্নে নির্ঘুম হয়ে যাবার নেশা জাগাতে চেয়েছি। কাবার রব্ব! তুমি আমার অব্যক্ত ভাবাবেগের পূর্ণতা দাও।

হাঁটতে হাঁটতে আরো কথা বলি। ওর কাছ থেকেও শুনি। নিজে ভাবনার খোরাক পাই ওর কথা থেকে। শিশু-কিশোরদের সরল জীবনোপলব্ধি, নিষ্পাপ চাহনির সহজ অভিব্যক্তির কাছে সবারই উচিৎ সময় করে একটু হাঁটুগেড়ে বসা।

আমি বলতে বলতে আরো কিছু যোগ করি। এই যে আব্বুম্মুর প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ, এই বোধটাই পৃথিবীকে সুন্দর রাখে। শিক্ষকের প্রতি একজন ছাত্র কৃতজ্ঞ থাকে তাঁর জ্ঞান-প্রতীতির জন্যে। জীবনের পরিণত পর্যায়ে এসে ইচ্ছে করে শৈশবের শিক্ষকদের কাছে ছুটে যেতে। কৃতজ্ঞতাবোধ মানুষে মানুষে মানবিক বন্ধন সংহত করে। আবার এই কৃতজ্ঞতাবোধ মানুষকে আল্লাহর কাছাকাছি করে। যাপিত জীবনে তাঁর যে অজস্র নেয়ামত আমরা ভোগ করে চলছি, আদিগন্ত করুণার আকাশে নিশ্চিন্ত বিহঙ্গ হয়ে উড়ছি, আমাদের অনিঃশেষ পাপগুলো নিমেষের পরিতাপে মুছে দিচ্ছেন, এজন্যে অবনত মস্তক বারবার সমর্পিত হওয়া কি উচিৎ নয়?

আমি ধরতে পারি, ওর ভাবনার সায়রে ঢেউ খেলতে শুরু করেছে। আমি উচ্ছ্বসিত হই। বিশ্বাসের সৌরভে বিমোহিত হবার আনন্দের চেয়ে বিশ্বাসের ফুল প্রস্ফুটিত হতে দেখার আনন্দ কোনো অংশে কম নয়।

নিজের সাথে কথা বলেও আমি এই অনুভবটাই বারবার আবিষ্কার করি মন-মুকুরে। জীবনের যা কিছু আরব্ধ, যা কিছু আরাধ্য, সবকিছু ঐ একজনের উদ্দেশ্যে নিবেদন। করার মধ্যেই তো হৃদয়ের প্রশান্তি! পথ চলতে চলতে আযান শোনা যায়। নিকটস্থ মাসজিদে ঢুকে পড়ি দুই ভাই। নির্ধারিত ইমাম সম্ভবত আজ নেই, মুয়াজ্জিনের অনুরোধে ইমামের জায়গায় আমি দাঁড়ালাম। প্রথম রাকাতে যখন "কুল ইন্না সালাতী ওয়া নুসুকী ওয়া মাহয়ায়া ওয়া মামাতী লিল্লাহি রাব্বিল 'আলামীন' পড়ছিলাম, তখন বুক ভারী হয়ে আসতে চায়। কত ওজনদার কথা উচ্চারণ করছি মুখে! এই উচ্চারণকে যাপিত জীবনে সঞ্চারণ করতে পারি কতটুকু? আত্মজিজ্ঞাসু অন্তর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলে নিরন্তর। নিজের কাছে। আমার কাছে।

টিকাঃ
১ আল-মুসতাদরাক: ২৩৩১ / هذا حديث صحيح الإسناد
১ কুরআনের আয়াত : قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ "আপনি বলুন: আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন এবং আমার মরণ বিশ্বজগতের রব্ব আল্লাহর জন্যে নিবেদিত।" [সূরা আল-আন'আম ৬:১৬২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00