📄 একদিন আসবে আলো
হোস্টেল থেকে খুব একটা বের হই না। আসরের পর মাঝে মাঝে ঝোঁকের বশে বেরিয়ে পড়ি। একাকী কদ্দূর হাঁটি। আনমনে। কয়েকটা ‘পথশিশু’কে সাথে নিয়ে পেঁয়াজু আর বেগুনি খাই। ওদের সাথে কথা বলি। ওদের স্বপ্নের রাজ্যে কল্পের ডানা মেলে উড়ি। মাথায় হাত রাখার পর তাদের সকৃতজ্ঞ হাসিতে ঝরে পড়া মুক্তোগুলো নিয়ে তৃপ্তির মালা গেঁথে নিজের গলায় ঝুলিয়ে আবার চলে আসি আপন নীড়ে।
আজকের দৃশ্যটা ভিন্ন ছিল। ছেলেটা বেশ চটপটে। কিন্তু ঝামেলা বাঁধালো একটা। ও কেনো জানি ভেবে নিয়েছে, আমার এই ক্ষুদ্র ভালোবাসা ওর জন্যে করুণার কিছু। এই ধরনের পরিস্থিতিকে সব সময়ই ভয় করি। খুব চেষ্টা করি কেউ যেন আমার প্রতি বেশি কৃতজ্ঞ না হয়ে যায়। ভালোবাসা পেয়ে হাসিমাখা মুখে একটা ‘পোজ’ দেবে, আরশের মালিক ছবিটা ক্লিক করে রাখবেন, তারপর সে আমাকে ভুলে যাবে – আমার কথা ও আচরণে এই দর্শনটা প্রয়োগ করার চেষ্টা করি। এই ছেলে পুরো ব্যতিক্রম। বয়সের তুলনায় চিন্তাশক্তি এবং বাগভঙ্গিতে পরিপক্বতার ছাপ। মায়াবী চাহনিতে ও আমাকে বেশ কিছু বলে ফেললো ইতোমধ্যে। দুই গালে হাত দিয়ে পাগল ছেলেটাকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, এ আমার করুণা নয়, এ তো তার প্রাপ্য অধিকার!
এই পরিস্থিতিগুলোতে ‘উমার ইবন আল-খাত্তাবকে [রা.] মনে পড়ে খুব। বায়তুলমাল থেকে তিনি নির্ধারিত অংশ বণ্টন করছিলেন সবার মাঝে। খুশিতে কয়েকজন বললো: জাযাকাল্লাহু খাইরান ইয়া আমীরুল মু’মিনীন。
'আমীরুল মু'মিনীন! আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।'
! ما بالهم نعطيهم حقهم ويظنونه مني منة عليه : ‘উমার বললেন
'কী অবস্থা এদের! আমি তাদের প্রাপ্য অধিকার তাদেরকে দিচ্ছি, আর তারা কি-না ভাবছে, এটা আমার করুণা![১]'
এই শিশুগুলোকে নিয়ে কত্তো স্বপ্ন আমার! কিন্তু সাধ ও সাধ্যের বড়ো বেশি ব্যবধান আমার।
খুব ভাবি, একদিন এরা নিজেদের অধিকার নিজেরা চিনে নেবে। কিন্তু কে চেনাবে ওদের? একজন 'উমার কি ফের আসবে পৃথিবীর বুকে?
ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসি। আনমনে হাঁটতে থাকি। চোখেমুখে ভালোলাগা ও ভালোবাসারা ঝিকিমিকি করছে। হাঁটতে হাঁটতে কখন যে মুখে গানের কলিটা চলে এসেছে টের-ই পাই নি: 'প্রভু তুমি বলেছো রাসূল দেবে না, বলো নি দেবে না ওমর...'
টিকাঃ
১ মাদীনাহর মাসজিদ কুবা-তে একদিন জুমু'আর খুতবায় সম্মানিত খতিব এই কথোপকথনটির কথা বলেছিলেন। আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্যসূত্র জানা নেই।
📄 বিড়ালওয়ালার গল্প
গল্পটা আবূ হুরায়রার। প্রিয়নবীজির [ﷺ] প্রিয় সাহাবী আবূ হুরায়রা। ইনি পিচ্চি ছেলে-মেয়েদের দেখলে আদর করে আগে কাছে টেনে নিতেন। তারপর গল্পের ছলে তাদেরকে শিখিয়ে দিতেন একটি দু'আ। ওরাও তখন বেশ আগ্রহ নিয়ে দু'আটি পড়তো। আবূ হুরায়রা মনে মনে খুশি হতেন।
কী সেই দু'আ?
‘আল্লাহুম্মাগফির লি-আবি হুরায়রা’
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِأَبِي هُرَيْرَةَ
মানে হোল: 'হে আল্লাহ! আপনি আবূ হুরায়রাকে ক্ষমা করুন।'
আবু হুরায়রা তখন তাদের সাথে সমস্বরে বলতেন: আ-মীন।
একই কাজ করতেন 'উমার ইবনুল খাত্তাব। ইনিও মিষ্টি ভাষায় ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের কাছে নিজের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনার দু'আ করতে আবদার জানাতেন একইভাবে। বলতেন, 'তোমরা তো কখনো পাপে জড়াও নি!!১]'
অবাকই হতে হয়, শুদ্ধতার শুভ্র চাদরে ঢাকা যাঁদের রাত ও দিনের প্রতিটি ক্ষণ- তাঁরা কতোটা না ব্যাকুল এবং উদগ্রীব ছিলেন নিজের ব্যাপারে! নিজের ভুল আর অসঙ্গতির জন্যে আল্লাহর কাছে অনুক্ষণ অনুতপ্ত হৃদয়ে ক্ষমার আকুতি তো জানাতেন-ই, এর বাইরেও তাঁদের ধ্যান আর চিন্তায় কেবলই ছিলো ক্ষমাপ্রাপ্তির অন্যান্য অনুষঙ্গ অনুসন্ধানের আবেগ ও আকুলতা! আল্লাহর কাছ থেকে ক্ষমা পাওয়ার জন্যে কত অভিনব (শারী'আহ-সমর্থিত) পদ্ধতি অবলম্বন করা যায়, তার সবই তাঁরা করেছেন।
এই যে দেখুন, কিছু পিচ্চি-পাচ্চাকে সামনে পেলেন তাঁরা। পেয়েই তাঁদের মনে প্রথমে কোন্ ভাবনার উদয় হোল? তাঁদের চিন্তায় আসলো, এই শিশুরা এখনো পাপ-কদর্যতার জটিল অঙ্ক কষে নি, আল্লাহর অবাধ্যতা করতে শেখে নি। এখনো পর্যন্ত নিষ্পাপ ও পরিশুদ্ধ হৃদয়ের অধিকারী এই ছোট্ট মানুষগুলো যদি আল্লাহর কাছে কোনো আবদার জানায়, আল্লাহ সেটা হয়তো বিশেষভাবে শুনবেন, এমন প্রণোদনা থেকেই তাঁরা শিশুদের মাধ্যমে ইস্তিগফারের দু'আ করিয়ে নিতেন।
আল্লাহর ক্ষমা পাবার জন্যে সেই ব্যাকুলতা কি আমাদের আছে? শুনলে অবাক হবেন, আল্লাহর রাসূল [ﷺ] দৈনিক একশোবার 'তাওবাহ' করতেন!! আমরা একশোদিনে একবার করি তো!? অথবচ তাওবাহর প্রয়োজনীয়তা, ক্ষমাপ্রার্থনার জরুরত আমাদেরই বেশি!
আল-হারাম লাইব্রেরিতে গল্পটা পড়েছি দেশে ফিরে আসার একদিন আগে। তাড়াতাড়ি গিয়ে মেজো আব্বুব্বর দুই জান্নাতী প্রজাপতি সুহাইমা এবং সাহিমকে পাশে বসিয়ে শিখিয়ে দিলাম বাক্যটা, আবূ হুরায়রার জায়গায় আমার নাম বসিয়ে। (আল্লাহুম্মাগফির লি-নাজীব)
ক'দিন আগে মেজো আম্মু ফোন করে জানিয়েছেন, ওরা ইতোমধ্যে এই দু'আ তাদের বাবা এবং মামণিকেও শিখিয়ে ছেড়েছে! এই অপার্থিব আনন্দের সত্যিই তুলনা নেই。
আপনি ইচ্ছে করলে আশেপাশের কাচ্চা-বাচ্চাদের সাথে নিয়ে বসুন। একটা ভালো চকলেট দিয়ে শূন্যস্থানে আপনার নাম বসিয়ে পড়িয়ে নিতে পারেন:
'আল্লাহুম্মাগফির লি-.........'
আল্লাহ আমাদের সবাইকে ক্ষমা করুন!
টিকাঃ
১ অনেকেই 'আবু হুরায়রা'র বাঙলায়ন করেন 'বিড়ালছানার পিতা' বলে, যা অযৌক্তিক ও অবাস্তব। আরবিতে أب শব্দটি শুধু 'পিতা' অর্থেই ব্যবহৃত হয় না, এই শব্দটি ক্ষেত্রবিশেষে 'মালিক', 'পথিকৃৎ', 'চাচা', 'দাদা' ইত্যাদি অর্থও দেয়। [দ্রষ্টব্য: আল-মু'জাম আল-ওয়াসীত্ব] স্থান-কাল-পাত্র ভেদে শব্দের উপযুক্ত অর্থটি বেছে নিতে হবে। যেমন: (أبو المال) আবুল মাল) এর অর্থ 'সম্পদের পিতা' নয়, বরং 'সম্পদশালী'। আবূ হুরায়রা (মূল নাম 'আবদুর রাহমান) বিড়ালছানা অত্যধিক পছন্দ করতেন এবং তাঁর জামার আস্তিনেও মাঝেমধ্যে বিড়ালছানার দেখা মিলত বলে রাসূলুল্লাহ [ﷺ] তাঁকে আবু হুরায়রা বলে সম্বোধন করেছেন, যার অর্থ হচ্ছে 'বিড়ালছানার মালিক'। অথবা প্রেক্ষিত বিচারে আরেকটু মানানসই অনুবাদ যদি করতে হয়, বলা যেতে পারে, 'বিড়ালওয়ালা'। কিন্তু 'বিড়ালছানার পিতা' অনুবাদটি অগ্রহণযোগ্য। والله أعلم
২ জামি'উল 'উলুম ওয়াল হিকام, খ. ৪২ পৃ. ১৭১।
১ প্রাগুক্ত।
২ সাহীহ মুসলিম: ৮৭০২
📄 খুনসুটির গল্প
দাম্পত্যজীবনে উভয়ের ভালোবাসার অনুভবকে অজস্রধার করার জন্যে খুনসুটির প্রয়োজন আছে। পারস্পরিক বোঝাপড়াকে একঘেঁয়েমির মরচে থেকে রক্ষা করার জন্যে মাঝেমধ্যে উপাদেয় বাক্যবিনিময় বেশ কাজে দেয়।
সর্বোত্তম আদর্শের মূর্ত প্রতীক রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দাম্পত্যজীবনও ছিলো প্রীতিময়, প্রাণোচ্ছল ও সবুজ-সজীব।
একবার নবীজি ﷺ ‘আয়িশার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা দিলেন। সেবার ‘আয়িশা বিজয়ী হলেন।
আরেকবার প্রতিযোগিতা দিয়ে ‘আয়িশাকে পেছনে ফেলে দিলেন এবং বললেন, ‘শোনো, এটা ঐদিনের প্রতিশোধ!’
এই গল্প সীরাতের পাতায় পড়েছি বেশিদিন হয় নি। গতকাল আমার এক (মিশরীয়) কবিতা-বন্ধু তাঁর ফেসবুকে ‘প্রোফাইল পিকচার’ পরিবর্তন করেছেন। আমি কিছু একটা লিখতে যাবো, তার আগেই দেখি তাঁর সহধর্মিণী ‘কমেন্ট’ লিখে বসে আছেন:
! أنت مثل القمر
(তুমি চাঁদের মতো!)
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই তিনি সেই ‘কমেন্ট’-এর ‘রিপ্লাই’ লিখলেন:
! القمر يأخذ منك نوره يا شمس
(চাঁদ তো তোমার কাছ থেকেই আলো নেয়, হে সূর্য)
📄 ফিরদাউসের ফুলবাগানে আমি হবো পাখি
এক : পাহাড় দেখেছেন নিশ্চয়-ই?
: জি!
: মস্ত পাহলোয়ান হিসেবে চার গ্রামে আপনার তো বেশ নামডাক আছে।
: হেহেহ জি!
: আচ্ছা ধরুন, আপনার মতো এরকম কয়েক শো পাহলোয়ান একসাথে হয়ে যদি পাহাড়টা ঠেলতে থাকেন, পাহাড় কি তার জায়গা থেকে এক ইঞ্চি নড়বে?
: দুনিয়ার কোন পাগলটা আছে, যে বলপ্রয়োগে পাহাড় সরাতে চাইবে?
: আছে রে ভাই! সেই গল্পই তো শোনাবো!
দুই
: এই নুড়িকণাগুলো যদি আপনাকে এখান থেকে সরাতে বলি, পারবেন?
: হাসালেন ভাই!
: মানে পারবেন, এই তো?
: মিয়াভাই হাসায়েন না আর! এইটা কি জিজ্ঞাসা করার বিষয়? নুড়ি পাথর সরাতে আমার মত পাহলোয়ানের কী দরকার? একটা ছোট বাচ্চা-ও এটা পারবে। তা বলেন, আপনি হঠাৎ এই প্রশ্ন করছেন কেনো?
: কাহিনী আছে! শোনাবো তো!
তিন
: পাহলোয়ান ভাই, একটা জিনিস ভাবছিলাম।
: কী মিয়াভাই?
: এই যে পাহাড়টা! এটা ছোট ছোট কিছু নুড়িপাথর, বালুকণা আর মাটি মিলে এত বড় হয়েছে, তাই না?
: হুমম।
: দেখেন, এই ছোটখাট পাথর আর মাটিকণা এখান থেকে আপনি অনায়াসেই সরাতে পারবেন। কিন্তু এরা জমতে জমতে যখন পাহাড়ের রূপ নেবে, তখন কিন্তু সরাতে পারবেন না!
: ঠিক বলছেন মিয়াভাই। ছোটবেলায় ইশকুলে মাস্টার মশাই পড়িয়েছিলেন:
“ছোট ছোট বালুকার কণা, বিন্দু বিন্দু জল
গড়ে তোলে মহাদেশ, সাগর অতল!"
: আরিব্বাস সে কথা-ই তো বলছিলাম। তা পাহলোয়ান ভাই, আমি আরেকটা কবিতা শোনাতে চাই আপনাকে।
: নিশ্চয় নিশ্চয়!
: আমার কবিতাটা কিন্তু আরবিতে। ইবনুল মু'তাজের লেখা। তাফসির ইবন কাসির- এর নাম শুনেছেন না? ঐটাতে পড়লাম।
: আমি তো আরবি বুঝি না মিয়াভাই!
: চিন্তা করিয়েন না। আমি কাব্যানুবাদ করে দেবো তো!
: বাব্বাহ! বলে ফেলেন তাইলে!
: শোনেন মন দিয়ে:
حَلَّ الذُّنُوبَ صَغِيرَهَا * وَكَبِيرَهَا ذَاكَ التَّقْى
اِدَالا تَحْقِرَنَّ صَغِيرَةً أَنْ "الجِبَالَ مِنَ الحَصى
ছোট হোক বড় হোক, পাপ ছেড়ে দাও
এরই নাম তাকওয়া, মনে গেঁথে নাও!
'ছোট পাপ' বলে কিছু অবহেলা নয়,
ছোট নুড়িকণা মিলেই পর্বত হয়!
চার
কবিতাটা শুনে পাহলোয়ান ভাই চিন্তায় পড়ে গেলেন। তাঁর চোখে কিছু আপন মানুষের চেহারা ভাসতে লাগলো, যাঁরা 'ছোটখাট পাপ' বলে অনেক বিষয়কেই তুচ্ছজ্ঞান করেন এবং অবলীলায় সেই গর্হিত কাজগুলো করে যান। অথচ তাঁরা খেয়াল করেন না, ছোট ছোট বালুকার কণা জমতে জমতে পাহাড় হয়! তাঁরা বুঝেন না, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলবিন্দু মিলে মহাসাগর হয়!
তাঁর মনে পড়ে, এরকম একজন ভাইকে যখন তিনি উপদেশ দিচ্ছিলেন, তখন ভাইটা জবাব দিয়েছিলেন, 'আরেহ! আল্লাহর রহমতে আমার ঈমান বেশ মজবুত আছে। এসব ছোটখাট বিষয় আমার ওপর বড় একটা প্রভাব ফেলবে না!'
পাহলোয়ান ভাই কিছু বলতে পারেন নি তাঁকে। কিন্তু এখন তাঁকে পুরো বিষয়টা বুঝিয়ে বলতে পারবেন। কী বলবেন? মনে মনে সাজাচ্ছিলেন কথাগুলো。
মিয়াভাই যখন আমাকে নুড়িপাথরগুলো সরাতে বললেন, তখন আমার হাসি পাচ্ছিলো। কিন্তু যখন পাহাড় সরাতে বললেন, তখন আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। এই নুড়িপাথরগুলো মিলেই যে পাহাড়ের সৃষ্টি, সেই পাহাড় কি না আমি সরানোর সাহস করছি না! আমার মত এত বড় পাহলোয়ান যেমন পাহাড়টা সরাতে অক্ষম, তেমনি তোমার মত শক্তিশালী ঈমানদার-ও ছোট ছোট পাপ থেকে সৃষ্ট পাহাড়টা সরাতে অক্ষম!
ভাইটা নিশ্চয়-ই বুঝবে। তারপর হয়তো তাকে প্রশ্ন করবে, 'তাহলে কী করা যায়?'
পাহলোয়ান ভাই সেটার উত্তর-ও রেডি করে রেখেছে, 'কিছু করতে হবে না। একটাই কাজ তোমার। ছোট পাপ বলে কোনো কিছুকে অবিরত ও চলমান হতে দেবে না। ছোট নুড়িপাথরটা যেমন অনায়াসে সরানো যায়, তোমার পাপটাও সেভাবে খুব সহজেই মুছে ফেলতে পারো। কিন্তু যদি অনবরত করতেই থাকো, তাহলে বিরাট পাহাড়ের আকার ধারণ করবে, তুমি বিপদে পড়ে যাবা!'
ভাইটার মুখে বোধের দ্যুতি ঔজ্জ্বল্য নিয়ে আসবে। নিজের ভুল বুঝতে পারবে। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে, পাহলোয়ান ভাইকে-ও কৃতজ্ঞতা ও দু'আ জানাবে! এসব ভাবতে ভাবতে পাহলোয়ান ভাইয়ের চোখেমুখে তৃপ্তির রেখা ফুটে ওঠে। মিয়াভাইকে সেই আনন্দে অংশীদার করে।
পাঁচ
পাহলোয়ান ভাইয়ের উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ আবার খলখল করে ওঠে :
: আচ্ছা মিয়াভাই, কবিতায় যে তাকওয়ার কথা শুনলাম, এটা নিয়ে কিছু বললেন না তো!
: হুমম! এই যে আমরা ছোট বড় সব পাপ থেকেই সরে আসবো বলে যে প্রতিজ্ঞা করছি, তাকওয়া সেই প্রাণনাকে বাড়ানোর-ই একটি উপাদান!
: বেশ মজার তো! ক্যামনে বলুন তো মিয়াভাই!
: আমার মুখে শুনবেন? নাকি গল্প বলবো একটা?
: তা আর বলতে হয়? গল্প-ই না হয় শোনান!
: একদিন 'উমার [রা.] উবাই ইবন কা'ব [রা.]-কে জিজ্ঞেস করলেন: 'তাকওয়া কী?' উবাই বললেন, 'আপনি কি এমন পথ দিয়ে হেঁটেছেন, যেটার দুপাশ কণ্টকাকীর্ণ?' 'উমার বললেন, 'হেঁটেছি বটে!' উবাই জিজ্ঞেস করলেন, 'তখন কী করেছেন আপনি?' 'উমার জবাব দিলেন, 'কাপড় গুটিয়ে খুব সাবধানে সন্তর্পণে হেঁটেছি।' উবাই বললেন, 'এটাই হচ্ছে তাক্বওয়া![১]'
ছয়
পাহলোয়ান ভাই তাঁর প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছেন। কত চমৎকারভাবে তাঁকে বোঝালেন মিয়াভাই!
এবার তো তার দায়িত্ব বেড়ে গেলো। সবাইকে তিনি বোঝাবেন। পৃথিবীর কণ্টকাকীর্ণ পথে আমরা যাঁরা জান্নাতের স্বপ্নচারী মুসাফির, তাঁদেরকে কত না সন্তর্পণে, সাবধানে হাঁটতে হবে! আবার ছোটখাট ভ্রান্তিবিলাস থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে কি আপ্রাণ চেষ্টা-ই না করতে হবে! নইলে যে পাহাড় জমে যাবে!
পাহলোয়ান ভাইয়ের ভাবান্তর দেখে মিয়াভাই হাসেন, আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হন। দুজনের চোখেমুখে স্বপ্নের লুকোচুরি! কদিন আগে নজীব নামের একটা পাগল তাঁদেরকে দোপদী ছড়া শুনিয়েছিলো। এবার সেটাই দুজনের মুখে গুণগুণ রবে গুঞ্জরিত হয়:
"বুকের খাতায় খুব যতনে একটা স্বপন আঁকি, ফিরদাউসের ফুল বাগানে আমি হবো পাখি।"
পাহলোয়ান ভাই খুব ভাবেন, কাজটা খুব কঠিন কিন্তু নয়! স্বপ্নের সাথে একটু সাহস আর ঈমানের রোশনাই জড়িয়ে নিলেই হয়! মিয়াভাই একমত হন। দুজন নতুন শপথে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। বদলে যাবার, বদলে দেবার অনুপ্রেরণায় সিক্ত হন।
আমি, আপনি, তুমি, তুই – আমরা কেন বঞ্চিত থাকবো বলেন? পাহলোয়ান ভাই আর মিয়াভাইয়ের মত আমরাও কি নিজেদের সাথে একটু কথা বলতে পারি না? নিশ্চয়ই পারি!
টিকাঃ
১ তাফসীর ইবন কাসীর, খ. ২ পৃ. ২১
১ প্রাগুক্ত