📄 আমার আত্মা মরে গেছে
আত্মা মরে যাওয়া। ঈমানের জোর কমে আসা। 'আমালের ঘাটতি। নাফসের সাথে পেরে না ওঠা।
এই কাছাকাছি অনুভূতি-নির্দেশক বাক্যগুলোর সাথে আমরা কমবেশি পরিচিত। একজন মু'মিনের হৃদয়ে যখনই এই ভাবনাটা জাগ্রত হয়, তখন অজানা অস্থিরতা কাজ করে।
'আমি আগের মত নাফসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না কেন?'
'আমার আত্মা আগের মত প্রশান্ত নয় কেন?'
'আমার স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ 'আমালের সোনালি দিনগুলো কোথায় হারিয়ে গেল?'
'আমি এত চাচ্ছি, হৃদয়টা সজীব-সতেজ রাখতে পারছি না কেন?'
'আহা! আমি 'ইবাদাতে তৃপ্তি ও আন্তরিকতা হারিয়ে ফেললাম কিভাবে?'
অনুভূতিটা অনেকটাই Philip James Bailey'র সে কথার মতই:
I cannot love as I have loved,
And yet I know not why;
It is the one great woe of life
To feel all feelings die। [১]
চলুন, কাব্যানুবাদ করে ফেলি:
আগের মতন ভালোবাসতে যে পারছি না আমি হায়!
কেন যে এমন হচ্ছে, কারণ জানি না এখনো তার।
জীবনে আমার এর চেয়ে বড় বিষাদ কি হয় আর?
হৃদয়ের সব অনুভূতি বুঝি মরে গেছে অবেলায়!
হুমম... ঠিক?
মিলে গেলো?
কারণ জানেন না, এই তো?
উমম... না, আপনাকে জানা চাই-ই! না জানলে পরিত্রাণ পাবেন কী করে বলুন?
দেখুন, 'আব্দুল্লাহ ইবন আল-মুবারাক [র.] কী বলছেন:
رأيت الذنوب تميت القلوب
ويتبعها الذل إدمانها
وترك الذنوب حياة القلوب
وخير لنفسك عصيانها [১]
আমরা এটাকেও কাব্যানুবাদের চেষ্টা করি:
আমি দেখলাম, পাপের থাবায় অন্তর হয় মরা;
আত্মগ্লানিও পিছু পিছু তার এসে পড়ে ঠিক তখন।
হৃদয় সজীব হবে তুমি পাপ ছাড়তে পারবে যখন,
তোমার জন্যে কল্যাণ হবে পাপকে দমন করা।
কিসসা খতম!
কাজে নেমে পড়ুন তাইলে!
টিকাঃ
১ Festus: A Poem, Page 186
১ জামি' বায়ান আল-'ইলম: ৭২২
📄 রোজনামচার দ্বিতীয় পাঠ
চট্টগ্রাম শহরে যাচ্ছি মাইক্রোবাসে চড়ে। আবুব এবং ছোট আবুব সামনের সারিতে, আর আমি ঠিক তার পেছনের সারিতে। আমার পাশে একটি বাচ্চা সহ মাঝবয়সী হিন্দু দম্পতি।
বাচ্চাটা বারবার কেঁদে উঠছিলো, মা তাতে বিরক্ত হচ্ছিলেন। ওদিকে বাচ্চার বাবা অসুস্থ, বোঝা যাচ্ছে। জিজ্ঞেস করে জানলাম, তাঁরা চিকিৎসার জন্যে যাচ্ছেন। বাম পাশ থেকে যথাক্রমে আমি, বাচ্চার বাবা এবং তারপর বাচ্চা কোলে নিয়ে বাচ্চার মা। আমার ঠিক পেছনে মাদরাসা-পড়ুয়া একজন বড়ো ভাইয়া।
এর মধ্যে হঠাৎ করেই বাচ্চার মা হেল্পারের কাছে পলিথিন চাইলেন। পলিথিন হাতে আসার পর পরই বাচ্চার বাবা বমি করা শুরু করলেন। উনি স্বামীর বুকে হাত রাখতেই বাচ্চাটা আবারও কেঁদে ওঠলো। মহিলা যথেষ্ট বিরক্ত এবং অপ্রস্তুত। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বাচ্চাটার ওপর অনেকক্ষণ রাগ ঝাড়লেন।
ইতোমধ্যে লোকটা তাঁর স্ত্রীর কাঁধে মাথা রেখে চোখ বুজে থাকলেন। কিছুক্ষণ যেতে না যেতে বাচ্চাটা আবার গলা ফাটিয়ে কান্না শুরু করেছে আর এরই মধ্যে বাচ্চার বাবা আবার বমি করতে শুরু করেছে। মহিলা তো কান্না করবে করবে অবস্থা। আমার করুণা হচ্ছিলো তাঁদের এই অবস্থায়। লোকটার পেছন দিকেই হাত বাড়িয়ে দিয়ে আমি মা-কে বললাম, 'আপনি ওনাকে দেখুন, বাচ্চাটা আমার কোলে দিন প্লিজ'। আমার পোষাকের দিকে চেয়ে তাঁরা একটু অপ্রস্তুত-ই হলেন। দেবেন কি দেবেন না এরকম একটা ভাব। কিছুটা সংকোচ কাজ করছে বুঝলাম। আমার দিকে ফিরে চাইতেই উনি মাথায় কাপড় টেনে দিলেন। আবার বললাম,
'আপনি চিন্তা করবেন না, বাচ্চাকে আমি দেখছি, আপনি ওনাকে দেখুন!'
এবার অনেকটা নিরুপায় হয়েই দিয়ে দিলেন। আশ্চর্য! আমি কোলে নিতেই বাচ্চাটা শান্ত! ডাগর ডাগর চোখে আমাকে দেখছে! দুইজনের তো খুশির অন্ত নেই! দৃশ্য দেখে বাবাকে মনে হচ্ছে অর্ধেক সুস্থ-ই হয়ে গেছেন! শহরে পৌঁছতে মিনিট বিশেক বাকি। লোকটা তাঁর স্ত্রীর কাঁধেই মাথা রেখে ঝিমুচ্ছেন। মহিলা আমাকে চট্টগ্রামের ভাষায় বললেন, 'দাও বাবা! কান্না তো থামছে।' এবার লোকটা সোজা হয়ে নিজেই আমার কাছ থেকে বাচ্চাটাকে নিয়ে মাকে পাস করে দিলেন। মহিলা চট্টগ্রামের ভাষায় চাপা কণ্ঠে বললেন, 'আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখুক বাপজান!'
এবার পেছনের সারির ভাইয়াটা আমাকে ডাকলেন। গলা উঁচিয়ে বাম পাশ দিয়ে আমার কানের কাছে এসে আস্তে আস্তে বললেন (চট্টগ্রামের ভাষায়), 'ভাইজান, ওরা তো অমুসলমান। আপনি ওদের বাচ্চা নিলেন কেনো?' প্রশ্ন করার ঢঙটা আমার কাছে যথেষ্ট পরিচিত, কিন্তু ঐ মুহূর্তটাতে একটু রাগ হচ্ছিলো তাঁর উপর। মনে মনে বলছি, একজন মানুষ, তার উপর একজন মুসলিম এত্ত অমানবিক হয় কিভাবে? তবুও তার দিকে কোণাকুণি ফিরে হাসলাম। স্বাভাবিক হয়ে বললাম, 'ভাইয়া, কাজটা করতে রাসূলুল্লাহ [] আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন।' উত্তরটা বোধহয় ভাইয়ার পছন্দ হয় নি মোটেও। ভ্রু কুঁচকে বললেন, 'দলিল ছাড়া কথা বলা আমি পছন্দ করি না।'
আমি আবারও ইচ্ছার বিরুদ্ধে মুচকি হাসলাম। এতক্ষণে আমার ধারণা সত্যি হোল। কারণ, আমি আগের উত্তরটা দেওয়ার আগে 'প্র্যাকটিক্যাল দাওয়াহর ফিকহ' নিয়ে কিছু বলতে চাচ্ছিলাম। উনি যেহেতু প্রশ্নের ক্ষেত্রে স্পর্শকাতর, বুঝলাম প্যাঁচ লাগবে। সুতরাং সরাসরি হাদিসের টেক্সটকেই 'স্ট্যান্ড পয়েন্ট' ধরলাম। দলিল শুনতে চাওয়ায় আমি তাই পরক্ষণেই কিছুটা হাল্কা বোধ করলাম। হাদিসটা মুখস্থই ছিলো (রাওয়ীর নাম তখন মুখস্থ ছিলো না)। তাঁকে শোনালাম:
عن عبد الله بن عمرو بن العاص ، أن رسول الله صلى الله عليه وسلم ، قال : الراحمون يرحمهم الرحمن ، ارحموا من في الأرض يرحمكم من في السماء
'আব্দুল্লাহ ইবন 'আমর ইবন আল-'আস থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ [] বলেছেন: 'দয়াশীলদেরকে দয়াময় (আল্লাহ) দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীতে যারা আছে, তাঁদের প্রতি দয়া করো; তাহলে আসমানে যিনি আছেন, তিনি তোমাদের দয়া করবেন।
হাদিসটা ভাইয়ার পরিচিত ছিলো, পড়ার সময় অর্ধেক যেতে না যেতেই আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, 'এইখানে কোথায় আছে যে একটা হিন্দু ছেলেকে কোলে নিতে হবে?'
আমি তাঁর 'কমন সেন্স'র অভাবে নিজেই কষ্ট পাচ্ছিলাম। খুব সংক্ষেপে বোঝাতে চাইলাম, দেখুন ভাইয়া, হাদিসের শব্দগুলো হচ্ছে ارحموا من في الأرض ]তােমরা পৃথিবীতে যারা আছে, তাঁদের প্রতি দয়া করো; (এক কথায় পৃথিবীবাসী)], এখন আমাকে বলুন, পৃথিবীতে কি শুধু মুসলমানই থাকে, না অন্য ধর্মের লোকও থাকে? এই হাদিস তো আমাকে বলছে স্বাভাবিক অবস্থায় বিপদে আপতিত যে কোন মানুষের পাশেই দাঁড়াতে! যদি শুধু মুসলমানের প্রতিই দয়া করার কথা বলা হতো, তাহলে নবীজি 'মুসলিমদের দয়া করো' বলতেন, 'পৃথিবীতে যারা আছে' বলে সব মানুষকেই, উপরন্তু সব সৃষ্টজীবকে অন্তর্ভূক্ত করতেন না।
যতটুকু স্পর্শকাতর ভেবেছিলাম তাঁর প্রশ্নে, এবার দেখলাম তেমনটি নয়। মা শা-আল্লাহ, তিনি বুঝতে পারলেন এবং সুন্দর ভাবেই মেনে নিলেন।
এখান থেকে আরেকটা বিষয় আমার কাছে প্রত্যক্ষভাবে পষ্ট হোল, দাওয়াহর ফিকহ কেবল অমুসলিম অথবা অনুশীলনবিমুখ মুসলিমদের জন্যেই নয়; অনুশীলনরত (practicing) কারো বদ্ধমূল ধারণার বিপরীতে কোন মত উপস্থাপন করা কিংবা ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রেও ঠান্ডা মাথায় সহনশীল ও প্রাজ্ঞ আচরণের প্রয়োজন।
টিকাঃ
১ সুনান আত-তিরমিযী: ১৯৮৯
📄 একদিন আসবে আলো
হোস্টেল থেকে খুব একটা বের হই না। আসরের পর মাঝে মাঝে ঝোঁকের বশে বেরিয়ে পড়ি। একাকী কদ্দূর হাঁটি। আনমনে। কয়েকটা ‘পথশিশু’কে সাথে নিয়ে পেঁয়াজু আর বেগুনি খাই। ওদের সাথে কথা বলি। ওদের স্বপ্নের রাজ্যে কল্পের ডানা মেলে উড়ি। মাথায় হাত রাখার পর তাদের সকৃতজ্ঞ হাসিতে ঝরে পড়া মুক্তোগুলো নিয়ে তৃপ্তির মালা গেঁথে নিজের গলায় ঝুলিয়ে আবার চলে আসি আপন নীড়ে।
আজকের দৃশ্যটা ভিন্ন ছিল। ছেলেটা বেশ চটপটে। কিন্তু ঝামেলা বাঁধালো একটা। ও কেনো জানি ভেবে নিয়েছে, আমার এই ক্ষুদ্র ভালোবাসা ওর জন্যে করুণার কিছু। এই ধরনের পরিস্থিতিকে সব সময়ই ভয় করি। খুব চেষ্টা করি কেউ যেন আমার প্রতি বেশি কৃতজ্ঞ না হয়ে যায়। ভালোবাসা পেয়ে হাসিমাখা মুখে একটা ‘পোজ’ দেবে, আরশের মালিক ছবিটা ক্লিক করে রাখবেন, তারপর সে আমাকে ভুলে যাবে – আমার কথা ও আচরণে এই দর্শনটা প্রয়োগ করার চেষ্টা করি। এই ছেলে পুরো ব্যতিক্রম। বয়সের তুলনায় চিন্তাশক্তি এবং বাগভঙ্গিতে পরিপক্বতার ছাপ। মায়াবী চাহনিতে ও আমাকে বেশ কিছু বলে ফেললো ইতোমধ্যে। দুই গালে হাত দিয়ে পাগল ছেলেটাকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, এ আমার করুণা নয়, এ তো তার প্রাপ্য অধিকার!
এই পরিস্থিতিগুলোতে ‘উমার ইবন আল-খাত্তাবকে [রা.] মনে পড়ে খুব। বায়তুলমাল থেকে তিনি নির্ধারিত অংশ বণ্টন করছিলেন সবার মাঝে। খুশিতে কয়েকজন বললো: জাযাকাল্লাহু খাইরান ইয়া আমীরুল মু’মিনীন。
'আমীরুল মু'মিনীন! আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।'
! ما بالهم نعطيهم حقهم ويظنونه مني منة عليه : ‘উমার বললেন
'কী অবস্থা এদের! আমি তাদের প্রাপ্য অধিকার তাদেরকে দিচ্ছি, আর তারা কি-না ভাবছে, এটা আমার করুণা![১]'
এই শিশুগুলোকে নিয়ে কত্তো স্বপ্ন আমার! কিন্তু সাধ ও সাধ্যের বড়ো বেশি ব্যবধান আমার।
খুব ভাবি, একদিন এরা নিজেদের অধিকার নিজেরা চিনে নেবে। কিন্তু কে চেনাবে ওদের? একজন 'উমার কি ফের আসবে পৃথিবীর বুকে?
ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসি। আনমনে হাঁটতে থাকি। চোখেমুখে ভালোলাগা ও ভালোবাসারা ঝিকিমিকি করছে। হাঁটতে হাঁটতে কখন যে মুখে গানের কলিটা চলে এসেছে টের-ই পাই নি: 'প্রভু তুমি বলেছো রাসূল দেবে না, বলো নি দেবে না ওমর...'
টিকাঃ
১ মাদীনাহর মাসজিদ কুবা-তে একদিন জুমু'আর খুতবায় সম্মানিত খতিব এই কথোপকথনটির কথা বলেছিলেন। আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্যসূত্র জানা নেই।
📄 বিড়ালওয়ালার গল্প
গল্পটা আবূ হুরায়রার। প্রিয়নবীজির [ﷺ] প্রিয় সাহাবী আবূ হুরায়রা। ইনি পিচ্চি ছেলে-মেয়েদের দেখলে আদর করে আগে কাছে টেনে নিতেন। তারপর গল্পের ছলে তাদেরকে শিখিয়ে দিতেন একটি দু'আ। ওরাও তখন বেশ আগ্রহ নিয়ে দু'আটি পড়তো। আবূ হুরায়রা মনে মনে খুশি হতেন।
কী সেই দু'আ?
‘আল্লাহুম্মাগফির লি-আবি হুরায়রা’
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِأَبِي هُرَيْرَةَ
মানে হোল: 'হে আল্লাহ! আপনি আবূ হুরায়রাকে ক্ষমা করুন।'
আবু হুরায়রা তখন তাদের সাথে সমস্বরে বলতেন: আ-মীন।
একই কাজ করতেন 'উমার ইবনুল খাত্তাব। ইনিও মিষ্টি ভাষায় ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের কাছে নিজের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনার দু'আ করতে আবদার জানাতেন একইভাবে। বলতেন, 'তোমরা তো কখনো পাপে জড়াও নি!!১]'
অবাকই হতে হয়, শুদ্ধতার শুভ্র চাদরে ঢাকা যাঁদের রাত ও দিনের প্রতিটি ক্ষণ- তাঁরা কতোটা না ব্যাকুল এবং উদগ্রীব ছিলেন নিজের ব্যাপারে! নিজের ভুল আর অসঙ্গতির জন্যে আল্লাহর কাছে অনুক্ষণ অনুতপ্ত হৃদয়ে ক্ষমার আকুতি তো জানাতেন-ই, এর বাইরেও তাঁদের ধ্যান আর চিন্তায় কেবলই ছিলো ক্ষমাপ্রাপ্তির অন্যান্য অনুষঙ্গ অনুসন্ধানের আবেগ ও আকুলতা! আল্লাহর কাছ থেকে ক্ষমা পাওয়ার জন্যে কত অভিনব (শারী'আহ-সমর্থিত) পদ্ধতি অবলম্বন করা যায়, তার সবই তাঁরা করেছেন।
এই যে দেখুন, কিছু পিচ্চি-পাচ্চাকে সামনে পেলেন তাঁরা। পেয়েই তাঁদের মনে প্রথমে কোন্ ভাবনার উদয় হোল? তাঁদের চিন্তায় আসলো, এই শিশুরা এখনো পাপ-কদর্যতার জটিল অঙ্ক কষে নি, আল্লাহর অবাধ্যতা করতে শেখে নি। এখনো পর্যন্ত নিষ্পাপ ও পরিশুদ্ধ হৃদয়ের অধিকারী এই ছোট্ট মানুষগুলো যদি আল্লাহর কাছে কোনো আবদার জানায়, আল্লাহ সেটা হয়তো বিশেষভাবে শুনবেন, এমন প্রণোদনা থেকেই তাঁরা শিশুদের মাধ্যমে ইস্তিগফারের দু'আ করিয়ে নিতেন।
আল্লাহর ক্ষমা পাবার জন্যে সেই ব্যাকুলতা কি আমাদের আছে? শুনলে অবাক হবেন, আল্লাহর রাসূল [ﷺ] দৈনিক একশোবার 'তাওবাহ' করতেন!! আমরা একশোদিনে একবার করি তো!? অথবচ তাওবাহর প্রয়োজনীয়তা, ক্ষমাপ্রার্থনার জরুরত আমাদেরই বেশি!
আল-হারাম লাইব্রেরিতে গল্পটা পড়েছি দেশে ফিরে আসার একদিন আগে। তাড়াতাড়ি গিয়ে মেজো আব্বুব্বর দুই জান্নাতী প্রজাপতি সুহাইমা এবং সাহিমকে পাশে বসিয়ে শিখিয়ে দিলাম বাক্যটা, আবূ হুরায়রার জায়গায় আমার নাম বসিয়ে। (আল্লাহুম্মাগফির লি-নাজীব)
ক'দিন আগে মেজো আম্মু ফোন করে জানিয়েছেন, ওরা ইতোমধ্যে এই দু'আ তাদের বাবা এবং মামণিকেও শিখিয়ে ছেড়েছে! এই অপার্থিব আনন্দের সত্যিই তুলনা নেই。
আপনি ইচ্ছে করলে আশেপাশের কাচ্চা-বাচ্চাদের সাথে নিয়ে বসুন। একটা ভালো চকলেট দিয়ে শূন্যস্থানে আপনার নাম বসিয়ে পড়িয়ে নিতে পারেন:
'আল্লাহুম্মাগফির লি-.........'
আল্লাহ আমাদের সবাইকে ক্ষমা করুন!
টিকাঃ
১ অনেকেই 'আবু হুরায়রা'র বাঙলায়ন করেন 'বিড়ালছানার পিতা' বলে, যা অযৌক্তিক ও অবাস্তব। আরবিতে أب শব্দটি শুধু 'পিতা' অর্থেই ব্যবহৃত হয় না, এই শব্দটি ক্ষেত্রবিশেষে 'মালিক', 'পথিকৃৎ', 'চাচা', 'দাদা' ইত্যাদি অর্থও দেয়। [দ্রষ্টব্য: আল-মু'জাম আল-ওয়াসীত্ব] স্থান-কাল-পাত্র ভেদে শব্দের উপযুক্ত অর্থটি বেছে নিতে হবে। যেমন: (أبو المال) আবুল মাল) এর অর্থ 'সম্পদের পিতা' নয়, বরং 'সম্পদশালী'। আবূ হুরায়রা (মূল নাম 'আবদুর রাহমান) বিড়ালছানা অত্যধিক পছন্দ করতেন এবং তাঁর জামার আস্তিনেও মাঝেমধ্যে বিড়ালছানার দেখা মিলত বলে রাসূলুল্লাহ [ﷺ] তাঁকে আবু হুরায়রা বলে সম্বোধন করেছেন, যার অর্থ হচ্ছে 'বিড়ালছানার মালিক'। অথবা প্রেক্ষিত বিচারে আরেকটু মানানসই অনুবাদ যদি করতে হয়, বলা যেতে পারে, 'বিড়ালওয়ালা'। কিন্তু 'বিড়ালছানার পিতা' অনুবাদটি অগ্রহণযোগ্য। والله أعلم
২ জামি'উল 'উলুম ওয়াল হিকام, খ. ৪২ পৃ. ১৭১।
১ প্রাগুক্ত।
২ সাহীহ মুসলিম: ৮৭০২