📄 স্বপ্ন যখন পৌঁছে গেলো মঞ্জিলে
অন্য আর দশজনের চে' আমার 'উমরাহ সফরের অভিজ্ঞতা ভিন্ন কিছু নয়। ভ্রমণকাহিনী অথবা সফর অভিজ্ঞতা আমার নিজের কাছেই খুব একটা আকর্ষণের বিষয় নয়। উপরন্তু এখানে 'রিয়া' জনিত ব্যাপারে সংকোচ থাকায় এ বিষয়ে লেখার ইচ্ছে পোষণ করি নি। কিন্তু তখন থেকেই ক'জন প্রিয় মানুষ উপর্যুপরি অনুরোধ জানাচ্ছিলেন কিছু লেখার জন্যে। আব্বুও যখন বলছিলেন স্বপ্নরঙ্গিন দিনগুলোকে একটু ধরে রাখার জন্যে, আল্লাহর ওপর ভরসা করে কলম হাতে দিচ্ছি। এটা মক্কায় অবস্থানের দিনগুলো নিয়ে।
দিনক্ষণের হিসেব খুব একটা ভালোভাবে মনে নেই কোনো কোনো ক্ষেত্রে। সফরের প্রেক্ষাপট এর আগে একটি লেখায় লিখেছিলাম। আমরা রমাদানের দ্বাদশ দিনে বাংলাদেশ থেকে রওনা হয়েছিলাম। আমরা ছিলাম পাঁচজন: বড় ফুফু, ছোট আম্মু, আমি, নাশিত ও সামিত। শাহ আমানত বিমান বন্দর থেকে রাত বারোটায় ফ্লাইট। দাদা তখন ন্যাশনাল হসপিটালে ভর্তি ছিলেন। আমরা প্রথমে ওখানে গিয়ে দাদার দু'আ নিয়ে আসলাম।[১]
বিমানবন্দরে এসে পৌঁছলাম রাত দশটায়। লাইনে দাঁড়িয়ে প্রথমে বিমানের টিকেট সংগ্রহ করলাম। এরপর ইমিগ্রেশন। ইমিগ্রেশন অফিসার যথেষ্ট কড়া এবং তার চেহারা গোয়েন্দা-টাইপের। বিমানের কর্মকর্তার কাছে শুনলাম, বাংলাদেশ থেকে একটা উল্লেখযোগ্য-সংখ্যক মানুষ 'উমরাহ ভিসা নিয়ে যান, কিন্তু সময় শেষ হলে আর আসেন না। ওখানে প্রত্যন্ত কোনো অঞ্চলে গিয়ে গোপনে জীবিকা নির্বাহ করেন। এ জন্যে ইমিগ্রেশনে যথেষ্ট কড়াতড়ি লক্ষ্য করলাম 'উমরাহ যাত্রীদের ক্ষেত্রে। ইমিগ্রেশন শেষ করতে করতে সাড়ে এগারোটার কাছাকাছি।
'ইশার সালাত আদায় করে ইহরামের কাপড় পড়ছিলাম। এই অনুভূতিটা একেবারে ভিন্ন। সম্পূর্ণ আলাদা। আমার মতো কাষ্ঠকঠিন হৃদয়ের মানুষও তখন কী জানি ভেবে কেঁদে ফেলেছি। দুই টুকরো সাদা কাপড়ে জড়ানো 'আমি'কে দেখে কেবলই মনে হচ্ছিলো অনন্তের পথে একজন অসহায় যাত্রী ছাড়া আমি আর কিছুই নই! দু রাকাত সালাত আদায় করেই বিমানে উঠে পড়ার ডাক। আমরা আরো অনেক 'বায়তুল্লাহর মুসাফির' দের সাথে আল্লাহর নামে উঠে পড়লাম।
মুখে তখন শুধুই তালবিয়া। আমাদের সিট দুই সারিতে মিলিয়ে। প্রথম সারির দুটিতে আমি আর নাশিত। দ্বিতীয় সারিতে ছোট আম্মু, ফুফু আর সামিত। আমার পাশেই কাকতালীয়ভাবে সহযাত্রী হিসেবে পেলাম পাশের এলাকার পরিচিত একজন আঙ্কেলকে। যেতে যেতে বললাম, 'আমরা কিন্তু হাজ্ব করতে যাচ্ছি!' বড় ফুফু ধরতে পারলেন। বললেন, 'হ্যাঁ, রমাদানে 'উমরাহ করা তো হাজ্ব'র মতোই!' আমি বললাম, 'ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হোল, এই হাদিসের শেষে বলা হয়েছে, রমাদানে 'উমরাহ করা রাসূলুল্লাহ'র [ﷺ] সাথে হাজ্ব করার মতোই!!' ফুফু, ছোট আম্মু সহ পাশের 'উমরাহ যাত্রীদের মুখেও একটা তৃপ্তি ও গর্বের হাসি। আর আমিও হাসিটা উপহার দিতে পেরে আনন্দিত।
সাহরীপর্ব বিমানেই সেরে নিলাম। সৌদি আরবের স্থানীয় সময় ভোর চারটায় আমরা ল্যান্ড করলাম কিং আবদুল আজিজ এয়ারপোর্টে। এখানে ফজরের সালাত আদায় করলাম। এরপর ইমিগ্রেশন শেষ করে এয়ারপোর্ট থেকে বের হতে হতে সূর্য পূর্বাকাশে উঁকি দিচ্ছে। মু'আল্লিমের গাড়ি আমাদের মক্কা আল-মুকাররমার উদ্দেশ্যে নিয়ে চললো। ছোট আবুব, মেজো আবুব, বড় ফুপা আর ছোটাচ্চুর উপর্যুপরি ফোন এদিকে। মক্কায় গিয়ে আমাদের একটি হোটেলে নিয়ে যাওয়া হোল। কথা ছিলো, মক্কায় এসে ছোট আবুব আমাদের রিসিভ করবেন। কোনো কারণে মাদীনাহ থেকে রওনা হতে বিলম্ব হওয়ায় এখানে দেরিতে পৌঁছতে হোল তাকে। তখন বারোটার কাঁটা ছুঁই ছুঁই। আমরা এখান থেকে বায়তুল্লাহর কাছাকাছি আরেকটি হোটেলে চলে এলাম যোহরের আগেই। ততক্ষণে বড় ফুফাও এসে হাজির। মাদীনাহ থেকে মেজো আব্বু, মেজো আম্মুর অনবরত ফোন আর উৎকণ্ঠা। অল্প কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে সবাই মিলে ছুটলাম বায়তুল্লাহর দিকে, উদ্দেশ্য যোহরের জামা'আতে শরিক হওয়া।
সামিতকে আমি কাঁধে তুলে ফেলেছি, আর নাশিতকে বড় ফুফা। ফুফু, ছোট আম্মু আর ছোট আবুব আমাদের পেছন পেছন হাঁটছেন। উচুঁ! এই হাঁটা যেনো শেষ হতে চায় না কোনভাবেই! দীর্ঘ সফরে আমি খুবই ক্লান্তি অনুভব করছিলাম। তার ওপর এই গনগনে রৌদ্রে হাঁটা! তবুও, তবুও... এ যে প্রিয়তম মালিকের ঘরের উদ্দেশ্যে হাঁটা! এ যে আজন্ম লালিত স্বপ্নের বায়তুল্লাহকে দর্শনের জন্যে হাঁটা! এ যে প্রিয়তম প্রভুর সান্নিধ্য লাভের সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে হাঁটা! কিসের ক্লান্তি? কিসের অবসাদ? ভালো লাগা ও ভালোবাসার মিশ্র এক পবিত্র অনুভূতিতে ততক্ষণে চেহারায় জমে ওঠা ঘামের বিন্দুগুলোর সাথে দু ফোঁটা অশ্রু-ও মিশে গেছে।
আমরা হারামের কাছাকাছি পৌঁছুতেই ইক্বামাত শুনতে পেলাম। মাসজিদ আল-হারামের বাইরের অংশে ততক্ষণে সবাই কাতারবন্দী হয়েছেন। আমরাও ওখানে দাঁড়িয়ে গেলাম। আহ! এতো দীর্ঘ সময় নিয়ে রুকু' এবং সাজদা! খুশু' আর খুদ্বু'র অনিবার্য উপস্থিতি সালাতের প্রতিটি পর্বেই! সে আরেক অনন্য অনুভব! এই সালাতের তৃপ্তি আর স্বাদ একেবারে ভিন্ন। আমার এদিকে তর সইছে না একেবারেই। যোহরের সালাত শেষ করে প্রতীক্ষিত বায়তুল্লাহ দর্শনের জন্যে ব্যাকুলতা বেড়ে গেলো। ছোট আবুব আর ফুফাকে অনুসরণ করে আমরা ধীর পদক্ষেপে হাঁটছি। 'বাব ইসমা'ঈল' দিয়ে আমরা প্রবেশ করলাম হারামের অভ্যন্তরে। একটু হেঁটেই ডানে মোড় নিয়ে যেই না ধীরে ধীরে কালো গিলাফের ছবিটা স্পষ্ট হতে শুরু করেছে, আবেগ-উচ্ছ্বাস এবং প্রিয়তম প্রভুর প্রতি বিনয়াবনত কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা হৃদয়ে দোলা দিতে শুরু করলো। আহ! এ আমার প্রিয় বায়তুল্লাহ! এ আমার স্বপ্নের বায়তুল্লাহ! এ আমার চির আকাঙ্ক্ষা ও ভালোবাসার কা'বা!
কা'বার চত্ত্বরে কিছুক্ষণ বসলাম আমরা। মাথার উপর তখন দুপুরের সূর্যের প্রখর তাপ। তবুও রহমতের ঝরনাধারা এখানে অদৃশ্য কোনো প্রশান্তির আবেশে জড়িয়ে নিচ্ছে সব আল্লাহপ্রেমিককেই। এবার তাওয়াফের পালা। ছোট আবুব সামিতকে নিয়ে ছোট আম্মু আর ফুফুর সাথে। আমি নাশিতকে নিয়ে শুরু করলাম। প্রথম চক্করেই তাঁদের চে' আমরা অনেক এগিয়ে গেলাম। দ্বিতীয় চক্করে হারিয়েই ফেললাম। তবে তাওয়াফ শুরুর পূর্বেই ছোট আব্বু বলেছিলেন, শেষ করে কিং সাউদ গেইটে সবাই মিলিত হবো। তাই আমি নাশিতকে সাথে নিয়ে আমার মতোই তাওয়াফে মনোযোগী হলাম। সাদা আর কালো এখানে একাকার। নেককার আর পাপী এখানে একাকার। সব ভাষা, সব জাতি এখানে একাকার। সবার মুখেই এক আল্লাহর প্রশংসা, এক আল্লাহর তালবিয়া, এক আল্লাহর কাছেই হৃদয়ের সব আকুতি। কাতর কণ্ঠে এখানে কতো মানুষকে দেখেছি শ্রাবণের বারিধারার মতো অশ্রু বিসর্জন দিতে। যত পাষাণ হৃদয়-ই হোক, এ দৃশ্য দেখেও তো অন্তত তাঁর চোখ চিকচিক করে ওঠবে।
তাওয়াফের সময় খেয়াল করলাম, পিচ্চি-পাচ্চাদের দেখলে সবাই একটুখানি হেসে হাঁটতে হাঁটতেই হয় গাল টেনে দিচ্ছে, নয় মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। তীব্র গরম থাকায় এখানে তাওয়াফ করতে করতেই অনেকে ঠান্ডা পানি ছিটিয়ে দিচ্ছেন সবার চোখেমুখে অথবা মাথায়। এ রকম একজন গোটা তিনেক আঁজলা পানি নাশিতের মাথায় ঢেলে দিলো। ও কিছু বুঝতে না পেরে ভ্যাঁ করে কেঁদে দিলো। অনেকেই 'টেইক অফ টেইক অফ প্লিজ' বলে অনুচ্চ কণ্ঠে বলতে লাগলেন। আমি পড়ে গেলাম মহাবিপদে। আল্লাহকে ডাকছিলাম আর বলছিলাম, আল্লাহ ওর কান্না থামিয়ে দাও প্লিজ! আলহামদুলিল্লাহ, একটু পরেই ও নিজ থেকেই কান্না থামিয়ে দিলো। অতঃপর দুই ভাই মিলে সাত চক্কর তাওয়াফ শেষ করলাম এবং মাকামে ইবরাহীমের কাছেই দু রাকাত সালাত আদায় করে বাকীদের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম। তাঁদের সময় একটু বেশি-ই লাগলো।
তাওয়াফ শেষ হতে হতে আসরের আযান হয়ে গেলো। আমরা বায়তুল্লাহর একেবারে কাছেই সালাত আদায় করে নিলাম। এরপর কা'বার চত্ত্বরেই সবাই মিলে বসলাম। ছোট আব্বু বললেন, ইফতার ও মাগরিব সেরেই সা'য়ী করবেন। ইফতার পর্যন্ত এখানেই কুরআন তিলাওয়াত করলাম। বায়তুল্লাহর দিকে যতবার মুখ তুলে তাকাই, ততবার চোখটা ভিজে ওঠে। আমি কি যেনো বলতে গিয়ে আর বলতে পারি না। অভিযোগ আর চাওয়ার ঢেউ এসে বুকের ভেতরেই আবার হারিয়ে যায়। বললাম, 'আল্লাহ, হৃদয়ের সবগুলো অব্যক্ত অনুভূতিই তুমি জানো। তুমি আমার কাছ থেকে কবুল করে নাও।' দেশে কতজন যে নাম ধরে দু'আ করতে বলেছিলেন! আল্লাহর রাসূল [] নিজেও 'উমার [রা.]-এর কাছে দু'আ চেয়েছিলেন, যখন তিনি 'উমরাহর জন্যে রওনা হবার প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহর অনুমতি নিতে গিয়েছিলেন। [১] আমি একে একে সবার নামই স্মরণ করতে চেষ্টা করলাম। ইফতারের সময় ঘনিয়ে এসেছে। আকণ্ঠ তৃষ্ণা আমার। জমজমের শীতল পানি গলায় পড়তেই শুকনো বুকে এক পশলা প্রশান্তির বৃষ্টি ঝরে গেলো। মাগরিবের সালাত পড়ালেন প্রিয় মানুষ শাইখ আস-সুদাইস। এই অসাধারণ মানুষটির তিলাওয়াত শুনে কতোবার আবেগতাড়িত হয়েছিলাম! আর আজকে সরাসরি তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে, তাঁর কণ্ঠে তিলাওয়াত শুনে বায়তুল্লাহতে সালাত আদায় করছি- এ ভাগ্য ক জনের হয়? আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় হৃদয়-মন বিগলিত হয়ে যায় এমনিতেই।
মাগরিবের পর আমরা সাফা ও মারওয়া সা'য়ী করলাম। সা'য়ী শেষে চুল পুরো ফেলে দেওয়া (হালাক) অথবা কমিয়ে ফেলা (কাসর) – দুটোর একটি করতে হয়। মহিলাদের জন্যে দ্বিতীয়টি। ততক্ষণে ইশার আযান হয়ে গেছে, এ জন্যে আমি আর বাইরে আসতে পারলাম না। ওখানে লক্ষ করলাম, সা'য়ী শেষ করে কিছু মহিলা এক জায়গায় বসে আছেন। তাঁরা ফুফু আর ছোট আম্মুকে ডেকে তাঁদের সাথে থাকা ছোট একটা কাঁচি দিয়ে হিজাবের ভেতরেই একগুচ্ছ চুল কেটে নিয়ে এলেন। আমরা তারাওয়ীহ এবং ওয়িত্র শেষ করে হোটেলে ফিরলাম। রুমে প্রবেশের আগেই আমি পাশের সেলুনে গিয়ে চুল হালাک করলাম। ফুফা আর ছোট আব্বু ফলমূল, দুধ, জুস আর নানা খাবার জমিয়েও ক্ষান্ত হচ্ছেন না। জোর করে খাওয়াবেনই। একটু চোখ খুঁজে আসতেই ঘনিয়ে এলো সাহরীর সময়। আমরা হোটেলে সাহরী সেরে নিলাম।
ফাজরের সালাতে আমি আর ছোট আব্বু শরিক হলাম বায়তুল্লাহতেই। সালাত শেষে আমি কা'বা চত্বরেই রয়ে গেলাম, ছোট আব্বু দুপুরের আগে করে ছোট আম্মু আর ফুফুকে নিয়ে এলেন। ইশা ও তারাওয়ীহ'র পরে তাঁরা চলে গেলেন, আমাকে বহু অনুরোধ করলেন, কিন্তু কোনোভাবেই গেলাম না। কা'বা চত্বরে তখন আস্তে আস্তে ভীড় কমতে শুরু করে। কখন যে এতো বেশি ভালোবেসে ফেলেছি প্রিয় বায়তুল্লাহকে, বুঝতে পারি নি। এখানে আল্লাহর সাথে কথা বলা শেষ করে সাহরীর একটু আগে হোটেলে উপস্থিত হলাম। আবার ভোরেই বায়তুল্লাহ'র দিকে হাঁটা দেওয়া। মোটামুটি মক্কায় অবস্থানের দিনগুলোতে এটাই ছিলো আমার দৈনন্দিন বুটিন। মাঝে একবার ছোট আবুব বললেন মক্কার ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো ঘুরে আসার। আমরা একটি গাড়ি ভাড়া করে সাওর গুহা (যেখানে হিজরতের সময় প্রিয় নবীজি [সা.] ও আবু বাকর [রা.] অবস্থান নিয়েছিলেন), আরাফাত ময়দান, মাসজিদে নামিরাহ, জাবালে রাহমাত, মিনা ও মুজদালিফাহ, হেরা গুহা সহ আরো কিছু জায়গা ঘুরে এলাম।
হেরা গুহায় উঠার অনেক শখ জাগলো আমার, কিন্তু সবাই ভয় দেখালেন এই বলে যে এখানে উঠতে তিন ঘণ্টা লাগবে। কী আশ্চর্য! পাহাড়টা আমার অত বেশি উঁচুও মনে হচ্ছিলো না; তিন ঘণ্টা লাগবে কেনো? মেজো আম্মু আর ছোটাচ্চুও ফোন করে অভয় দিলেন, তুমি পারবা। হোটেলে ফিরেই বায়না ধরলাম, আমাকে যে করেই হোক হেরা গুহায় উঠা চাই। শেষমেশ ফুফা রাজি হলেন। অসুস্থ শরীর নিয়ে ফুফুরও ইচ্ছে হোল আমাদের সাথে শরিক হবার। আমরা তিনজন একটি গাড়ি ভাড়া করে চলে এলাম জাবালুন নূরের পাদদেশে। সময়টা দুপুরের পর। প্রখর রৌদ্র মাথার উপরে। তার ওপর রমাদানের দিন, ক্ষুৎ-পিপাসায় কাতর। ফুফা বললেন, এখানে তিনি বারো বছর থেকেও কোনদিন হেরা গুহায় যাবার সাহস করেন নি। আমাকে শেষবারের মতন ভেবে দেখতে বললেন। আমি নাছোড়বান্দা।
ফুফু-ফুফাকে বিদায় দিয়ে আল্লাহর নামে চড়া শুরু করলাম। মাঝপথে ইয়েমেনের একজন ভাইয়াকে পেলাম। তাঁর সাথে গল্প করতে করতে কতদূর গিয়েছি, এমন সময় হাঁপিয়ে উঠলাম। আধঘণ্টা পার হয়েছে ততক্ষণে, কিন্তু পাহাড়ের চূড়া অনেক দূরে বোঝা যাচ্ছে। কিছুক্ষণ এক জায়গায় বিশ্রাম নিয়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। আমাকেও উঠার জন্যে বললেন, কিন্তু আমার অবস্থা সঙ্গিন। আর পারছিলাম না। উনিও আমাকে ছাড়া যাবেন না। বাধ্য হয়ে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তাঁকে বললাম, আপনি চলুন, আমিও একটু পরে আসছি ইন শা-আল্লাহ। উনি পেছন ফিরে ফিরে হাঁটা শুরু করলেন। আহা, ভ্রাতৃত্ববোধ! মমত্ববোধ! এই অকৃত্রিম ভালোবাসার উৎস কোথায়? এই নিখাদ-নিঃস্বার্থ আন্তরিকতার শেকড় কোন্ গভীরে প্রোথিত, মানুষ তুমি জানো? জানার চেষ্টা করো?
আর কিছুক্ষণের মধ্যে দেখলাম আরেকজন ভাইয়া আসছেন। কাঁধে ট্রাভেলার ব্যাগ। বেশ সুঠাম দেহ। এসেই আমার পাশে বসলেন। পরিচয় পর্ব সেরে নিলাম। উনি পাঞ্জাব থেকে এসেছেন। আরবি ও ইংরেজি দুটোই ভালো পারেন। ব্যাগ থেকে একে একে তিন বোতল পানি বের করে আমার মাথা ভেজালেন, অযু করালেন, তারপর আবার মাথায় পানি ঢেলে নিজেও এক বোতল মাথায় ঢাললেন। তারপর আমার হাতে আরো দুই বোতল পানি ধরিয়ে দিলেন এবং আমাকে সাথে নিয়ে হাঁটা শুরু করলেন। ব্যাগে অন্তত আরো ছয়-সাত বোতল পানি আছে তাঁর, বোঝা যাচ্ছে। আমি হাঁটতে হাঁটতে তাঁর জন্যে সেই দু'আটি করলাম, যেই দু'আ আল-মুবাররাদ: برد الله من بردني
বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ এবং আন্তরিক আচরণ তাঁর। নানা গল্প করতে করতে দু জন মিলে প্রায় কাছাকাছি চলে আসলাম। ততক্ষণে এক ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। আবার খানিক জিরিয়ে নিয়ে আমরা শুরু করলাম। পথে কিছু বানরের দেখা পেলাম, ওদেরকে একটা বোতল ছুঁড়ে দিতেই মহা আনন্দে পানি খেতে লাগলো আর আমাদের পথ ছেড়ে দিলো। আল্লাহর সৃষ্টিবৈচিত্র্যের নিদর্শন এই বানরগুলো। তরুপল্লবহীন পাথুরে পাহাড়গুলোতে কী নিশ্চিন্তে দিনাতিপাত করে যাচ্ছে তারা! দু জনে ক্লান্তি ভুলতে কথার তুবড়ি ছুটিয়ে চলছি। কথা প্রসঙ্গে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন রাসূলুল্লাহ [☁] মানুষ কি-না। আমি তাঁকে একটি আরবি কবিতার শ্লোক শুনিয়ে দিলাম:
محمد بشر وليس كالبشر * بل هو ياقوط والناس كالحجر
[মুহাম্মাদ [☁] মানুষ ছিলেন, কিন্তু যেনতেন মানুষ নন। বরং (এটার উদাহরণ হোল,) মানুষেরা সবাই পাথর, কিন্তু তিনি ছিলেন পরশ পাথর!]
তাঁর বেশ পছন্দ হোল কবিতাটা। আরো কয়েকবার বলতে বললেন, যেন মুখস্থ হয়ে যায়। এক ঘণ্টা পঁচিশ মিনিটের মাথায় আমরা চূড়ায় এসে পৌঁছলাম। ভাবতে অবাক লাগছিলো, ওয়াহি নাযিলের আগে রাসূলুল্লাহ [☁] যখন এখানে অবস্থান করতেন, তখন খাদীযাহ [রা.] নিয়মিত-ই এই সুদীর্ঘ ঢালু পাহাড়ী পথ বেয়ে উঠতেন-নামতেন এবং রাসূলুল্লাহর [☁] জন্যে খাবার নিয়ে যেতেন। একজন নারী কতটুকু অকৃত্রিম ভালোবাসা অন্তরে লালন করলে এই ক্লেশাবহ পরিশ্রমের অগ্নিমুখে স্বচ্ছন্দ আনন্দের গোলাপ ফোটাতে পারেন, ভাবা যায়?
এসব ভাবতে ভাবতে চূড়ায় উঠতে পারার সগৌরব হাসি অস্তিত্বের জানান দিতে শুরু করেছে আমার ঘর্মাক্ত মুখাবয়বে। আলহামদুলিল্লাহ! এমন আনন্দ আর সাফল্যের গর্ব ইতোপূর্বে কখনোই অনুভূত হয় নি! হাজ্ব বা 'উমরাহর সাথে এর কোন সম্পৃক্ততা নেই, কিংবা এখানে এলে বিশেষ কোনো পুণ্যলাভের কথা-ও কুরআন বা সুন্নাহতে নেই। কিন্তু প্রিয় নবীজির [] প্রতি ভালোবাসা আর প্রথম ওয়াহি অবতীর্ণ হবার স্থানটুকু এক নজরে দেখার ঔৎসুক্য থেকে এখানে অনেকে প্রচন্ড কষ্ট স্বীকার করেও চলে আসেন। দু জন মিলে চূড়ায় উঠে খোঁজাখুঁজি শুরু করলাম। কিন্তু কোথায় সেই গুহা? ইতিউতি তাকাতে একজন বৃদ্ধ আসলেন। চূড়ায় ছোট্ট একটা বিশ্রামাগার আর কুলিং কর্নারের মত করে একটা দোকান দিয়েছেন দু জনে মিলে। তিনি জানালেন, অন্য পাশ দিয়ে আরেকটু নিচে নামতে হবে। পথটা নিজেই দেখিয়ে দিলেন। আমরা আরেকটু নেমে অবশেষে গুহায় এসে পৌঁছলাম।
এই সেই স্থান, যেখানে কুরআনের প্রথম বাণী নাযিল হয়েছিলো! এই সেই গুহা, যেখানে প্রিয় নবীজির [ ﷺ ] সময় কাটতো! আমি সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে এখন! সুবহানাল্লাহ! ততক্ষণে আসরের আযান হয়েছে। ভাইয়া আর আমি মিলে গুহার অভ্যন্তরেই আসরের সালাত জামা'আতে আদায় করলাম। আমাদের সাথে একজন ইন্দোনেশিয়ান তরুণ-ও যোগ দিলেন। আমরা আর কিছুক্ষণ বসে নেমে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছি, এমন সময় ফুফা ফোন দিয়ে বললেন, 'আমিও অর্ধেক চলে এসেছি! তুমি নেমো না।' বাব্বাহ! এতো ভীরু মানুষ হঠাৎ এমন সাহসী হলেন কিভাবে! যাই হোক, আমি কিছুদূর নামলাম তাঁকে স্বাগত জানাতে। আধঘণ্টার ব্যবধানে দু জনে একত্রিত হলাম। ততক্ষণে ফুফা হাঁপিয়ে উঠেছেন! দু জনে মিলে আবার উঠা শুরু। আমার যে কী অবস্থা তখন চলে যাচ্ছে, নিজেও টের পাই নি। ফুফা নিজ থেকেই বলছেন, 'ভাবলাম এই বয়সে আমাদের আব্বটা আব্বুটা সাহস করে উঠে গেলো! আমি অভাগা ক্যান পারবো না?'
আমরা নামতে নামতে সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়েছে। দ্রুত গাড়ি নিয়ে সোজা চলে এলাম বায়তুল্লাহতেই। এখানে ইফতার, মাগরিব, ইশা ও তারাওয়ীহ সেরে হোটেলে চলে এলাম।
মক্কায় অবস্থানের মেয়াদ শেষ হয়ে এলো আমাদের। এখানের শেষ তারাওয়ীহর তিলাওয়াতগুলো বড়ো বেশি মায়াবী মনে হচ্ছিলো। বারবার আবেগসিক্ত বিরহ-ব্যথায় কাতর হয়ে পড়ছিলাম। আহ! আবার কখন কুরআনের যাদুকরী এই সুর-লহরী, এই অপূর্ব ব্যঞ্জনাময় তিলাওয়াত উপভোগ করে করে প্রিয় বায়তুল্লাহকে সামনে রেখে প্রিয়তম মালিকের প্রতি সিজদাবনত হতে পারবো? ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু গন্ডদেশ বেয়ে পড়ে কাবার চত্বরে মিশে যাবার দৃশ্য দেখার এ অপার্থিব আনন্দ আর সুখানুভূতি থেকে তবে কি আমি বঞ্চতি হতে চলছি?
টিকাঃ
১ দাদার দ্বিতীয়বার আল্লাহর ঘরে যাওয়ার স্বপ্ন আর পূরণ হোল না, পরের বছর চলে গেছেন আল্লাহর কাছেই। আল্লাহ আমার দাদাকে রহম করুন, ক্ষমা করুন, জান্নাতের মেহমান বানিয়ে সম্মানিত করুন।
১ সহীহ আল-বুখারী: ১৭৩০
১ 'উমার [রা.] থেকে বর্ণিত। তিনি যখন 'উমরাহর ব্যাপারে রাসূলুল্লাহর [] অনুমতি নিতে গিয়েছিলেন, তখন রাসূলুল্লাহ [] বললেন: أي أخي أشركنا في دعائك ولا تنسنا "আমার ভাই! তোমার দু'আয় আমাদেরকে শরিক করবে, আমাদের কথা ভুলবে না।” [সুনান আত-তিরমিযী: ৩৫৬২[ هذا حديث حسن صحيح
📄 স্বপ্নের উড়াউড়ি, স্বপ্নের অবশেষ
মেজো আবুব, মেজো আম্মু আর ছোটাচ্চুর অপেক্ষার প্রহর কাটছিলো না মাদীনাতে। উপর্যুপরি ফোন তাঁদের। আমাদের পরিকল্পনা ছিলো মাসজিদ নাবাওয়িতে ই’তিকাফের। এ জন্যে রমাদানের অষ্টাদশ দিবসে মাদীনাতে মেজো আব্বুর বাসায় চলে এলাম। সুহাইমা আর সাহিম এই প্রথম তাদের বড়ো ভাইয়াকে দেখলো। ওরা সারাটি ক্ষণ কোনোভাবেই তাই আমার পাশ থেকে নড়তে চায় না। কী এক মায়ার জালে আটকে গেলাম সামান্য কিছুক্ষনেই! ও হ্যাঁ, বলাই হয় নি, আমাদের মক্কায় অবস্থানের দ্বিতীয় দিনেই মেজো আম্মুর কোলজুড়ে আল্লাহ আরেকজন মেহমান পাঠিয়ে দিয়েছেন। আমাদের সেই ভাইটার নাম রাখার দায়িত্ব পড়লো আমার উপরেই।
সন্ধ্যার পর ফুফা উহুদ পাহাড় ও প্রান্তর, শহীদদের কবর, মাসজিদে কুবা আর অন্যান্য বিখ্যাত জায়গাগুলো ঘুরিয়ে আনলেন। ঐদিন তারাবীহ আদায় করলাম মাসজিদে কুবাতেই। হিজরতের পর প্রিয় নবীজি [ﷺ] এখানে প্রথম জুমু'আহ আদায় করেছিলেন এবং ঐতিহাসিক খুতবাটি দিয়েছিলেন। ওয়িতরের মুনাজাতে সম্মানিত ইমাম ফিলিস্তিনের মজলুমদের জন্যে কান্নাজড়িত কণ্ঠে যখন আল্লাহর দরবারে আর্তনাদ করে উঠলেন, পুরো মাসজিদেই কান্নার রোল পড়ে গেলো।
মাসজিদ নাবাওয়ি মেজো আব্বুব্বর বাসা থেকে মাত্র পাঁচ মিনিটের পথ। পরদিন জুমু'আহর সালাত ওখানেই আদায় করলাম। হার্টবিট বেড়ে চলছিলো। সবুজ গম্বুজ কই? এখনো চোখে পড়ছে না কেনো? ক্রমে ক্রমে চোখের সামনে স্পষ্ট হতে লাগলো। আহ! প্রিয় নবীজি আমার! আমার প্রেরণা ও ভালোবাসার রাসূল এখানেই তো অন্তিম শয্যায়! মুখে আর বুকে কেবলই 'সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম'-এর অনুরণন। রাসুলপ্রেমের ঢেউ ছলকে উঠছিলো ভাবাবেগের সাগরে। পকেট থেকে বের করি দেশ থেকে লিখে নিয়ে আসা কবিতার কাগজ। সত্তর দশকের অত্যুজ্জ্বল কবিপ্রতিভা ও কাব্যতাত্ত্বিক আবিদ আজাদ-এর 'আমার রাসূল' কবিতাটা আমার ভীষণ প্রিয়। 'উমরাহর সময় ঝোঁক চাপলে আবৃত্তি করার সুবিধার্থে পকেটে রাখা কবিতাগুলোর মধ্যে এটিও ছিলো। সবুজ গম্বুজের পাশে এসে মনে হোল, এই কবিতাটা মনভরে আবৃত্তির এই বুঝি উপযুক্ত সময়!
“আমাকে গুঁড়ো গুঁড়ো করে মিশিয়ে দিলে না কেন আমার রাসূলের রোজার খেজুরে? কেন দাঁড় করিয়ে রাখলে না আমাকে সেই কিশোর রাখালের ক্লান্তি ও স্বপ্নের পাশে মরূদ্যানের দিক থেকে ছুটে আসা হাওয়ার মতো? তাঁর উদয় ও অস্তের সকল মেষ ও ভেড়ার ভিতর দিয়ে বয়ে যেতাম আমি উট ও কাফেলার ঘণ্টাধ্বনি হয়ে তাঁবুর বিয়াবানে। আরবের বুকের তাপ, জ্বর ও যন্ত্রণা শুষে নেওয়ার জন্যে আমাকেই পাঠালে না কেন ভোর ও মেঘের হাওদায়?..." [১]
মন ভরলো না। কবি সাহাবি হাসসান ইবন সাবিত [রা.]-এর লেখা রাসূলুল্লাহকে [] নিবেদিত এলিজি'রা আমার করা কাব্যানুবাদা থেকে কদ্দূর আবৃত্তি করে গেলাম। খুব ক্লান্ত ছিলাম। বসে পড়লাম। বসে বসেই বিড়বিড় করে আবৃত্তি করে গেলাম। নীরবে অশ্রুপাত হোল।
জুমু'আহর সালাতের পর ছোট আবুব আর ছোটাচ্চু মিলে আমাকে প্রতীক্ষিত সেই রাসূলের মাসজিদে ই'তিকাফের জন্যে জায়গা নিতে নিয়ে এলেন। বেশ সৌহার্দপূর্ণ একটি জায়গায় স্থান পেলাম। এখানে আরেক হৃদয়বিদারক অনুভূতি! ভাবা যায়! আমি এখন এমন এক জায়গায় এসে থিতু হয়েছি, যেটা একাধারে প্রিয় নবীজির মাসজিদ, প্রিয় নবীজির বিচারালয়, প্রিয় নবীজির শিক্ষালয়, প্রিয় নবীজির প্রশাসনিক দফতর একের ভেতরে সব! আমি সেই 'মাসজিদ নাবাওয়ী'তে অবস্থান করছি! আহ! সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম!
মাসজিদ নাবাওয়িতে অবস্থানের রুটিনটা মোটামুটি এ রকমই ছিলো - যোহরের সালাতের পর মাসজিদ লাইব্রেরিতে অধ্যয়ন। আসরের পর থেকে মাগরিব এবং মাগরিব থেকে 'ইশা আল-কুরআন হিফজ করা। তারাওয়ীহ এবং ওয়িতর শেষ হবার দু এক ঘণ্টার মধ্যেই আবার কিয়ামুল্লাইল। এ জন্যে ঘুমানোর সুযোগ নেই কারো। ততক্ষণ ব্যক্তিগত 'ইবাদাত, সালাত আর তিলাওয়াতে মগ্ন সবাই। সাহরী শেষ করেই ফাজরের সালাত। তারপর সালাতুশ শুরুকের জন্যে অপেক্ষা। সালাতুশ শুরুক্ত সারা হতেই মাসজিদের সব লাইট অফ হয়ে যেতো। সবাই ঘুমাতেন। কেউ এগারোটা, কেউ বারোটা পর্যন্ত। আবার অনেকে দু এক ঘণ্টা ঘুমিয়ে বাহির থেকে আলো আসতেই আল-কুরআন হাতে নিয়ে বসে যেতেন। নয়টা বা দশটার দিকে 'রাওদ্বাহ'তো। ভীড় কম থাকতো। আমি সুযোগ পেলে সে সময় প্রিয় নবীজিকে [] সালাম দিয়ে আসতাম।
লাইব্রেরিতে বেশ জ্ঞানপিপাসু কিছু তরুণের সাথে পরিচিত হলাম, অনুভূতি বিনিময়ে সুযোগ পেলাম। এরমধ্যে আমার চে' বয়সে ছোট একজন মিশরীয় কিশোরের দেখা পেলাম। ও আবার বড় হয়েছে সৌদি আরবে। ওকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি জানো 'Egypt' শব্দটা কোথা থেকে এসেছে? একটু অবাক হোল। আমি যখন বললাম, এটার উৎপত্তি 'أقباط' শব্দ থেকে; ও বেশ চমৎকৃত হোল এবং একটা ধন্যবাদ দিয়ে হাত টেনে নিয়ে চুমু খেল। লাইব্রেরিতে সে নিয়মিত-ই আসে, এ কারণে বই খোঁজার ক্ষেত্রে আমাকে বেগ পেতে হয় নি; সে-ই খুঁজে দিতো। মাসজিদের মধ্যে অনেকবার অনুচ্চ কিন্তু রাগত সুরে একজন আরেকজনের প্রতি সামান্য অজুহাতে অসহিষ্ণুতা প্রদর্শন করেছে- এ রকম যতজনকে দেখেছি, ছোটাচ্চু বললেন এরা মিশরীয়। সেখান থেকে আমার একটা ধারণা হয়েছে যে, মিশরীয় মানেই ঝগড়াটে ও রগচটা। কিন্তু এই ছেলেটাকে দেখার পরে কেউ-ই বিশ্বাস করতে চাইবে না, ঝগড়াটে লোকগুলো মিশরীয়। আসলে কিছু সংখ্যক মানুষকে দিয়ে একটি জাতি বা জাতিসত্তার সুরূপ বা প্রকৃতি বিচার করা বোকামী।
ই'তিকাফের সময়টাতে বেশ কিছু আলোকিত মানুষের সাথে পরিচিত হয়েছি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন তুরস্কের একজন আঙ্কেল, যিনি এখনো ভোলেন নি আমাকে। নাম তাঁর ইহসান কেররাহ। প্রথমদিনের পরিচয় থেকেই ইনি দেখা হলেই কপালে একটা চুমু খেতেন আর দু'আ করতেন এবং দু'আ চাইতেন। পাশে এসে একাধিকবার বলেছেন, 'তোমাকে সারাক্ষণ পড়তে দেখে ভালো লাগে বাবা!' আমার সমবয়সী তাঁর ছেলেও আমাদের সাথে ই'তিকাফে ছিলো। হাসিমুখ আর প্রাণোচ্ছল। সারাক্ষণ কাকে কুরআন এগিয়ে দেবে, ইফতার আর সাহরীতে কাকে একটু পানি পান করাবে, এই নিয়ে তার সারাক্ষণ উৎকণ্ঠা। কিন্তু প্রথমবারেই যখন সে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলো, আমি কুরআনের হাফিজ কি-না; আর আমি 'না' উত্তর দেওয়ায় সে বলেছিলো 'জা'আলাকাল্লাহু মিন হুফফাজিল কুরআন' (আল্লাহ তোমাকে কুরআনের হাফিজদের অন্তর্ভুক্ত করুন); তখন নিজের ওপর শক্ত অভিমান হচ্ছিলো। এখনো আল্লাহর কাছে বারবার চাই, যেনো তার দু'আটা কবুল হয়। সপ্তদশ রমাদানেই তিনি তুরস্কে ফিরে যান। যাবার সময় সাথে আনা দুটো বইও আমাকে গিফট করে যান। আমি যে জায়গায় অবস্থান নিচ্ছিলাম, সেখান থেকে তুলে এনে তাঁর জায়গায় আমার বালিশ আর ব্যাগটা নিয়ে এলেন। বললেন, 'ওদিকে ঘুমাবার সময় তোমার মাথায় সামনের সারি থেকে এই ভাইটার পা লেগে যায়, তুমি এখন থেকে আমার জায়গাতেই থাকলে খুশি হবো।' তাঁর দেখাদেখি আরেকজন ইয়ামেনী আঙ্কেলও একগুচ্ছ বই গিফট করলেন। কী আশ্চর্য! ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে! আর আমি বইপাগলাকে আল্লাহ কোথাও নিরাশ করেন না, বুঝছি!
এরই মাঝে পরিচিত হলাম দু জন সৌদি নাগরিকের সাথে। এই দুই ভাইয়া পরস্পর বন্ধু, দু জনেই প্রকৌশলী। ইয়ানবু'র অধিবাসী; প্রতি বছরই মাসজিদ নাবাওয়িতে তাঁরা মু'তাকিফ হন। চমৎকার এবং অসাধারণ তাঁদের ব্যবহার। ব্যক্তিগত তাক্বওয়া'র ব্যাপারে যথেষ্ট যত্নশীল। আমি কুরআন পড়তে গিয়ে একটি অপরিচিত শব্দ পেয়ে তাঁদের একজনকে (নাম তাঁর 'আয়াদ') অনুরোধ করেছিলাম এটার সমার্থক ইংরেজি শব্দ জানাতে। তিনি বেশ খানিকক্ষণ ভেবে বললেন, ইংরেজি মনে আসছে না, আরবি বলতে পারবেন। আমি তা-ই বলতে অনুরোধ করলাম। এবার বুঝলাম শব্দটা। [শব্দটা ছিলো نعاس, আর তিনি আমাকে কাছাকাছি প্রতিশব্দ বললেন نوم ]১
তাঁকে ধন্যবাদ দিলাম। জিজ্ঞেস করলেন, 'আরবি কিভাবে শিখেছো?' আমি বললাম, আমাদের মাদরাসায় আরবি সাহিত্যও পাঠ্য, ওখানে অনুশীলন করেছি। বললেন, মাশা-আল্লাহ বেশ ভালো পারো। আমি খানিকটা লজ্জিত হয়ে বললাম, 'আমি অল্প পারি' (عرفت قلیلا)। একটু হেসে আমাকে বুকে টেনে নিয়ে বললেন, 'না না, অনেক পারো তুমি। অনেক কি, চমৎকার পারো!' (الا! بل كثيرا بل ممتاز)!
এভাবে তাঁদের সাথে পরিচয়ের সূত্রপাত। তাঁর বিশুদ্ধ ও প্রমিত আরবি'র তুলনায় আমার ভাঙ্গা ভাঙ্গা আরবি বলা যে কত হাস্যকর, আমি নিজেই তা জানি। কিন্তু আমাকে একটুও বুঝতে না দিয়ে কত সুন্দর উৎসাহ দিয়ে গেলেন! এই মানুষগুলোকে না চাইতেও ভালোবেসে ফেলতে হয়!
যাবার সময় তিনি দারুসসালাম থেকে কুরআনের একটা সংক্ষিপ্ত তাফসির নিয়ে এসে গিফট করলেন! এটা ছোট আম্মুর পছন্দ হয়েছিলো, তাই তাঁকে দিয়ে দিয়েছি। ওখানে অবস্থানকালীন বেশ সুন্দর কিছু পুস্তিকা অনেকে বিতরণ করতো। কিন্তু এই জায়গায় যে পুস্তিকাটা দেওয়া হয়েছে, কিছুদূর গিয়ে দেখি আরেকটা। আবার বিশাল মাসজিদের মধ্যে সব পুস্তিকা সবাই পেতো না। আমার খুব লোভ জাগে। অনেকেই পুস্তিকাগুলো এক নজরে দেখে নিয়ে ফেলে রাখেন। প্রতিদিন তারওয়ীহ'র পরে পুরো মাসজিদ এক চক্কর ঘুরে এসে এই পুস্তিকাগুলো আমি সংগ্রহ করতাম আর ভাঁজ করে ব্যাগে ভরে নিতাম। এসব দেখে এই দু জন ভাইয়া বেশ মজা পেতেন। একদিন একটি পুস্তিকায় ইবন আল-কুয়্যিম [র.] লিখিত জান্নাত বিষয়ক সুন্দর একটি কবিতায় আমি কয়েকটি লাইন বুঝতে পারছিলাম না। তাঁরা দু জন মিলে বুঝিয়ে দিলেন। এবার আমাকে বললেন, এটাকে বাংলায় অনুবাদ করো তো! আমি যখনই বলা শুরু করলাম, অনুচ্চ স্বরে সে কি হাসি তাঁদের!
আরেকদিন হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, তোমার প্রিয় ঋতু কোনটি? বললাম শীত ঋতু। 'কেনো?' সেই হাদিসটা শোনালাম:
66 الشتاء ربيع المؤمن ، قصر نهاره فصام ، وطال ليله فقام
"শীত ঋতু হোল মু'মিনের বসন্তকাল। দিনগুলো ছোট হয়, ফলে সে (সহজে ও কম কষ্টে) সাওম রাখতে পারে। রাতগুলো দীর্ঘ হয়, ফলে সে (পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম সেরে যথেষ্ট সময় নিয়ে) সালাতে দাঁড়াতে পারে।"
বললেন, আমি ঠিক এই জবাবটাই চাচ্ছিলাম তোমার কাছে! আমাদেরও প্রিয় ঋতু শীত।
আমি এই ফাঁকে নিজ থেকে তাঁদের যখন জানালাম, বাংলাদেশে ছয়টি ঋতু; খুব অবাকই হলেন! বুঝলাম, তাঁদের এখানে যেহেতু চারটি ঋতু, স্বভাবতই ছয় ঋতুর কল্পনা বিস্ময়কর-ই ঠেকবে। নামগুলো বলতে বললেন। যেই বললাম 'গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত', আয়াদ ভাইয়া বললেন,
'আচ্ছা! তোমাদের বাংলাভাষাভাষী যে কারো সাথে কথা বললেই লক্ষ্য করলাম শ শ শ শ করে। কেনো? এই শা শা শু শু'র রহস্য কী? বাংলায় কি 'শীন' (ش) হরফটির ব্যবহার বেশি?'
! أنتم أهل الضاد ونحن أهل الشين 01011
দু জনে বেশ মজা পেলেন এই উত্তরে।
পাশেই পরিচিত হলাম আরেকজন দাদাভাইয়ের সাথে, যিনি পেশায় একজন চিকিৎসক। ইনি 'আল-ইত্তিফাক্ব মাআল ইখতিলাফ' (মতভিন্নতা রেখেই মতৈক্য) নিয়ে চমৎকার ভাবে আমাকে কিছুক্ষণ তাঁর অনুভূতি জানালেন। প্রায় সব মুসলিম দেশ-ই নাকি তিনি ঘুরেছেন, কেবল তাদের সংস্কৃতি ও পরিবেশের সাথে পরিচিত হবার জন্যে। বাংলাদেশেও এসেছিলেন ১৯৯৮ তে। আমাকে বললেন, 'উম্মাহর ঐক্যের জন্যে কাজ করো।' আমি দু'আ চাইলাম। তিনিও কপালে চুমু এঁকে দিলেন আর দু'আ করলেন।
সুদানের একজন আঙ্কেলের কথা ভুলবার নয়। আঙ্কেল তাঁর ছোট ভাই এবং ভাতিজা সহ মু'তাকিফ ছিলেন আমার কাছ থেকে মাত্র দুই গজ দূরেই। ভাতিজা (আমার সমবয়সী) স্থায়ীভাবে সৌদিতেই থাকে। ও বেশ চুপচাপ থাকে সব সময়। মাঝে মাঝে উদাস। তাঁরাও বেশ প্রাণবন্ত ও আন্তরিক ছিলেন। বেশ মজার ছিলো তাঁর ইংরেজি বলা। এই যেমন ধরুন, আমাকে তিনি বোঝাতে চাচ্ছেন 'তোমার চাচা কখন আসবেন আজকে?'- বলতেন, 'today what time coming your uncle? আবার ধরুন, বলতে চাচ্ছেন, 'আমি একটু বাথরুমে যাচ্ছি। তাড়াতাড়ি চলে আসছি। আমার জায়গাটা একটু দেখে রাখবে যেন কেউ না বসে।', বলতেন, 'Uncle, I go bathroom. I come quick. You see my place, no person not sit here.' আবার মাঝেমধ্যেই বলতেন, 'When I talk you English, do not mind uncle! I can not talk this language good'
এই কয়েকটা বাক্য আমার মোটামুটি মুখস্থই হয়ে গিয়েছিলো। আমি খুব সুন্দর হাসি দিয়ে তাঁকে স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করাতে এবং ভরসা দিতে চেষ্টা করতাম। মনের ভাব বোঝাতে পারাটা ভাষার প্রধান উদ্দেশ্য। তিনি যা বলতে চাচ্ছেন, সেটা যেহেতু আমি বুঝে নিতে পারছি, সমস্যা কোথায় আর? এভাবে বুঝিয়ে দিলে তিনি খুশি হতেন। বেশ বিনয়ী ছিলেন তিনি। সারাক্ষণ কুরআন তিলাওয়াতেই মগ্ন থাকতেন। যাবার সময় তাঁর দেশের ঠিকানা দিয়ে গেলেন আর আমন্ত্রণ জানালেন। আমিও বাংলাদেশে ঘুরে যাবার আমন্ত্রণ জানালাম তাঁকে।
ইংরেজি জনিত কারণে কর্তব্যরত পুলিশ বা স্বেচ্ছাসেবকদের কাছে কোনো ব্যাপারে সাহায্য চাইতে গেলে বিপত্তি পোহাতে হয়। কারণ, তাঁদের আঞ্চলিক আরবিগুলো যে কারো পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। আবার ইংরেজির প্রসঙ্গ আসলে প্রায়-ই সবাই মুখ বাঁকা করতেন, না হয় একটা দায়সারা হাসি দিয়ে 'দুঃখিত' বলতেন। একজন তরুণ পুলিশ একবার সাফ জানিয়ে দিলেন, 'Sorry! No Urdu! No English!' খেয়াল করলাম, উনি আরো অনেককেই এই একই বাক্যটা বলে যাচ্ছেন! হারামে শুধু একটা তরুণ স্বেচ্ছাসেবককে পেয়েছিলাম, যে কি না ভালো ইংরেজি বলতে পারতো। মাসজিদ নাবাওয়ির 'মাকতাবা সাওতিয়াহ'র কর্তব্যরত অফিসার- তিনিও মোটামুটি ভাবে ইংরেজি বলতেন। এর বাইরে পরিচিত হওয়া সৌদি নাগরিকদের অধিকাংশকেই ইংরেজিতে সম্পূর্ণ বেদখল হিসেবে পেলাম।
এইদিকটাতে কর্তৃপক্ষের একটু নজর দেওয়া প্রয়োজন। যেহেতু ইংরেজি সমসাময়িক বিশ্বের আন্তঃভাষিক সেতুবন্ধনে রূপ নিয়েছে, সেহেতু অন্তত দায়িত্বশীল পর্যায়ের আরবদের উচিৎ মোটামুটি ইংরেজি আয়ত্তে রাখা, যাতে আল্লাহর ঘরের মেহমানদের সেবা প্রদানে বিঘ্ন না ঘটে।
আয়াদ ভাইয়াকে বলছিলাম, আমি কথোপকথনের সময় আপনাদের অনেকের কথাগুলো কিছুই বুঝি না! উনি বললেন, 'বাদ দাও ওসব! আরবদের সাথে কথা বলতে পারাটা কি আরবি শেখার লক্ষ্য? ওসব লোকাল ভাষা তুমি দু এক মাস তাদের সাথে কথা বললে এমনিতেই পারবে।' ভরসা পেলাম তাঁর অভয় দেয়াতে। তবুও ঐ ক'দিনে মোটামুটি খানিকটা রপ্ত করতে পেরেছি স্থানীয় কথ্য ভাষার বহুল ব্যবহৃত পরিভাষাগুলো।
মাসজিদ নাবাওয়িতে ওয়িতরের সালাতে সম্মানিত ইমামের দু'আ ছিলো খুবই মর্মস্পর্শী। হৃদয়ের অভাব-অভিযোগ আল্লাহকে পেশ করার কতো চমৎকার আর আবেদনঘন নিবেদন ছিলো সেই দু'আগুলোতে! মনে হয় না এই আবেগঘন আর সর্বোচ্চ বিনয়পূর্ণ দু'আয় শরিক হয়ে না কেঁদে কেউ পেরেছে! ফিলিস্তিন এবং অন্যান্য মজলুমানের জন্যে দু'আয় তো পুরো মাসজিদ বোধ করি ভেঙ্গে পড়তো। অক্ষমতার অনুশোচনা আর ভ্রাতৃত্বের কষ্টানুভূতি সব মুসাল্লিকেই কুরে কুরে খেতো ইমামের সাথে সাথে।
২৯ রমাদান চাঁদ দেখা গেলো। বিদায়ের সময় সে কি আবেগঘন অনুভূতি সবার! একবার সেই যে জড়িয়ে ধরেন, আর কেউ-ই যেনো ছাড়তে চান না।' ডাক্তার দাদাভাইয়াটা অনেকক্ষণ ধরে দু'আ করলেন, শেষ বিদায়ের আগে দুই গালে হাত দিয়ে বললেন, 'be a knowledge leader my dear!' 'ইশার সালাতের পর চলে এলাম মেজো আব্বর বাসায়। সুহাইমা-সাহিমের আনন্দের শেষ নেই। মেজো আবুব বললেন, তোমার তো ঈদের কেনাকাটা হোল না। ফুফু বললেন, ও আর ওর আব্বু কোন ঈদেই তো নতুন কাপড় নেয় না। মেজো আব্বুব বললেন, এইবার অন্ত নাও ভাতিজা!
ছোট আব্বুকে বললেন আমাকে সাথে নিয়ে যেতে। সবার অনুরোধে গেলাম। একটা তোব, টুপি আর পাজামা নিয়ে চলে এলাম। পছন্দমত কোনো তোব-ই মেলাতে পারছিলাম না, শেষে কোনোরকম একটা নিয়েছি। বাসায় এসে মেজো আম্মু আমার পছন্দের উচ্ছ্বসিত তারিফ করলেন। এবার কিছুটা খচখচে অনুভূতি শেষ হোল। ওখানে ঈদের সালাত ফজরের অব্যবহিত পরই হয়ে যায়। মাসজিদ আন-নাবাওয়িতে জায়গা পেতে হলে রাত তিনটার আগেই চলে যেতে হবে। ছোটাচ্চু তাঁর গাড়িতে করে পালা করে সবাইকে দিয়ে আসলেন। বাসায় রেখে দিলেন আমাকে। আমাদের বের হতে একটু দেরি হোল। মাসজিদ নাবাওয়ীতে জায়গা পাওয়া যাবে না, এ জন্যে মাসজিদ আল-মীকাতেই (মাদীনাহ থেকে যাঁরা হাজ্ব বা 'উমরাহ করতে যান, তাঁদেরকে এখানেই ইহরাম পড়তে হয়) ঈদের সালাত আদায় করলাম।
এর আগে রাতেই আমরা পরিকল্পনা করেছি বদর যুদ্ধের স্থানটি পরিদর্শনে যাবার। সালাত শেষে বাসায় এসে সামান্য নাস্তা করেই আমি, ছোটাচ্চু আর মেজো আবুব চললাম বদরের প্রান্তরে। মাঝখানে গাড়িতে জুস ফেলে ছোটাচ্চু আমার জামাটা ইয়ে করে দিলেন আর কি! বদরের যুদ্ধক্ষেত্রটি প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। ড্রাইভার আঙ্কেল বললেন, এখানে এসে অনেকেই মাটি ধরে বিলাপ করতো, মাটি নিয়ে গায়েমুখে মাখতো। আবার অনেকে কিছু মাটি সাথে করে নিয়েও যেতো।
এই ধরনের শিরক থেকে বাঁচার জন্যে পুরো যুদ্ধক্ষেত্রটা দেয়াল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। তবে কয়েক জায়গায় সামান্য গলা উঁচু করলেই বেশ ভালোভাবে দেখা যায়। আমরা সাথে লাগোয়া একটি টিলায় দাঁড়িয়ে জায়গাটা দেখতে পেয়েছি। বদর! প্রেরণার বদর প্রান্তর! সাহীহ বুখারী'র কিতাবুল মাগাযী-তে যে বদর দেখেছি, সীরাত ইবন হিশামের পাতায় যে প্রান্তর-কে কল্পনা করেছি, আজ সে প্রান্তর আমার সামনে দাঁড়িয়ে। তাকবীর ধ্বনি গলা ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছিলো। বদর পরিদর্শন শেষেই ড্রাইভার আঙ্কেল বললেন, ইয়ানবু' সৈকত এখান থেকে খুবই কাছে। মেজো আবুব বললেন, 'তুমি তো লোভ জাগায় দিলে মিয়া! চলো তাইলে, ভাতিজাকে নিয়ে যাই!' আমরা সৈকতে এসে পৌঁছলাম। আরব সাগরের নান্দনিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্যে এই সৈকত খুবই চমৎকার করে সাজানো। আমাদের এখানে সমুদ্রসৈকত অনেক সময়ই নির্লজ্জতার প্রতিশব্দ হয়ে যায়। অস্তস্তিকর ও বিব্রতকর পরিস্থিতিরও সম্মুখীন হতে হয় অনেক শুদ্ধাচারী পর্যটককে। কিন্তু ওখানকার সৈকতের কী চমৎকার দৃশ্য! নারীদের মধ্যে যাঁরা সামান্য পানিতে নামছেন, পূর্ণ পর্দা বজায় রেখে নামছেন। এখানে ওখানে পিকনিক করতেও দেখা যাচ্ছে অনেককে। সাগরের মনোমুগ্ধকর ঢেউ আর নীল জলের বুকে দূর থেকে দেখা ফেনারাশি- সৌন্দর্যের অপার উৎসধারা উপভোগ করে এখানে কেউ সীমালংঘনে রত নেই, বরং সেই সৌন্দর্য ও নান্দনিকতার স্রষ্টার প্রতি যেন। কৃতজ্ঞচিত্ত হয়ে তাঁর সন্তুষ্টিকেই মূখ্যজ্ঞান করছেন। সৈকতের উপরিভাগে খেজুর গাছগুলোতে খেজুর পাকা শুরু হয়েছে, এবং কিছু ঝরেও পড়েছে। মজার বিষয় হোল, অনেকে পরিবার নিয়ে আসছেন, কিন্তু তাঁরা কেউ পানিতে নামেন না। সৈকতে গাড়ি চালিয়ে গাড়ির এক চাকা পানিতে আর অন্য চাকা পানির উপরে রেখেই তাদের আনন্দ! আবার পানি থেকে একটু উচুতে শামিয়ানা বিছিয়ে সবাই মিলে হাসি-খুশিতে ভোজন সেরে নিচ্ছেন। আমি আর ছোটাচ্চু পানিতে নেমে বেশ কদ্দূর গিয়ে ছবিটবি তুলে চলে আসলাম। বেশ কিছু তরুণ উদোম গায়ে একেবারে নীল জলের ওদিকে পৌঁছে যাচ্ছিলো। ড্রাইভার আঙ্কেল বললেন, ওরা খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। বিশাল সাগরের দিকে স্থিরনেত্রে তাকিয়ে থাকলে শূন্যতার অনুভব খুব সহজেই ভেতরে জায়গা করে নেয়। এই অসীম জলধির বুকে নিঃসঙ্গ ও নিভৃতচারী হয়ে অহোরাত্র মুখ গুঁজে থাকার সাধ জাগে। কোলরিজ-এর একটা কবিতা ছিলো অনেকটা এরকম-ই। মনে পড়ছে না ঠিক।[১]
আমরা সৈকত থেকে উঠে এসে বাঙালী রেস্তোঁরা খুঁজে বের করলাম। ওখান থেকে সরাসরি চলে আসলাম মাসজিদ নাবাওয়িতে। এখানে যোহরের সালাত আদায় করে ফিরলাম বাসায়।
ছোটাচ্চু মাঝে মাঝে বলা-কওয়া ছাড়া হুটহাট গাড়িতে তুলে পছন্দের জায়গাগুলো ঘুরিয়ে আনতেন। হরেকদেশী মানুষ আর তাঁদের সংস্কৃতির সাথে হাতে-কলমে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন। ছোটাচ্চু তার গাড়ি নিজেই বেশ ভালো ড্রাইভ করেন, আমাকেও ড্রাইভিংয়ের পয়লা সবক দিয়ে দিলেন! চাচ্চুদের মার্কেটে দুয়েকবার যাওয়া হয়েছিলো। অনেকগুলো জিনিসের নতুন আরবি নাম শেখা হোল এখানে।
হিজরতের পরে 'উসমান [রা.] মুসলমানদের পানি সমস্যা লাঘবের জন্যে যে কূপটি কিনে নিয়েছিলেন, এটা 'বীরে উসমান'[২] হিসেবে পরিচিত। আমি গুগল ম্যাপে সার্চ দিয়ে জানলাম, জায়গাটা আমাদের আশেপাশেই কোথাও। আমার দেখতে ভীষণ ইচ্ছে হোল। ড্রাইভার আঙ্কেলকে দেখালাম। উনি বললেন, খুঁজেটুজে দেখা যেতে পারে। ছোটাচ্চু, সাহিম আর আমাকে সহ নিয়ে আল্লাহর নামে বেরিয়ে পড়লেন। এবং খুব অল্প সময়েই আমরা কূপটির সন্ধান পেয়ে গেলাম, আলহামদুলিল্লাহ! জায়গাটা মেজো আব্বুর বাসা থেকে সর্বোচ্চ পনের মিনিটের দূরত্বে। সুবহানাল্লাহ, এই কূপ থেকে এখনো পাশের বিশাল খেজুর বাগানে পানির যোগান দেয়া হচ্ছে! কূপের পাশেই 'উসমান [রা.]'র বাসস্থানের ভগ্নাবশেষ দেখতে পেলাম। ছোটাচ্চু বললেন, 'এতদিন মাদীনাহ থেকেও এত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থানের সন্ধান পেলাম না! তোমাকে বিশেষ ধন্যবাদ দিতে হয়, তোমার কল্যাণে দুইটা অজানা ঐতিহাসিক স্থান চিনে ফেললাম, আলহামদুলিল্লাহ।'
সুযোগ হলেই আমরা মাসজিদ নাবাওয়িতে জামা'আতে শরিক হতাম। মেজো আবুব বেশ রাত করে বাসায় ফিরতেন। ফুফু আর আমার সাথে পুরনো দিনের গল্পের ঝুড়ি মেলে ধরতেন। স্মৃতিগুলো এত বেশি জীবন্ত তাঁর কাছে, মাশা-আল্লাহ! জীবনকে কতভাবে কিভাবে দেখতে হয়, সেই দর্শনও চমৎকৃত হবার মতো। আমার ক্যারিয়ার আর ভবিষ্যৎ নিয়েও বেশ গাইডলাইন দিয়ে গেছেন সুযোগ হলেই। মেজো আম্মু ঐ অসুস্থ শরীরেও আমাদের যত্ন-আত্তিতে যাতে কোনো ত্রুটি না হয়, সে ব্যাপারে তীক্ষ্ণ নজর রেখেছেন। মেজো আম্মু তো শুধু ভালো একজন বন্ধু-ই ছিলেন না, ছিলেন আমার শৈশবের শিক্ষিকা-ও।
ছোটাচ্চুর সেই এক কাজ, বাইরে গিয়ে একগাদা ফলমূল, জুস আর দুধ নিয়ে আসা। না খেয়েও রক্ষা নেই, জোর করে গিলিয়ে ছাড়েন। ছোট আবুব্ব হলেন গিয়ে নীরব দর্শক। না বাজালে উনি বাজতে চান না! আবার প্রয়োজনীয় বাজনার ক্ষেত্রে সচেতন! বিশেষত ভাতিজার সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে তাঁরও উৎকণ্ঠার কমতি নেই। সার্বক্ষণিক সব প্রয়োজনে পাশে ছিলো সুহাইমা আর সাহিম। এই দুই জান্নাতী প্রজাপতি আমার ভালোবাসার বাগানজুড়ে অনুক্ষণ উড়াউড়ি করেছে। কী এক মায়ার বাঁধনে আমাকে জড়িয়েছিলো জানি না, এখনো শূন্যতা অনুভব হয়। আমার তো দেয়ার মতো সেই একটাই আছে, সবার নামের অদ্যাক্ষর দিয়ে একটা করে কবিতা গিফট করে আসলাম।
আমি দেশ ত্যাগের আগেই একটা লিস্ট করে ফেলেছি বইয়ের। মেজো আবুব ছোটাচ্চুকে বললেন ড্রাইভার আঙ্কেলকে সাথে নিয়ে বইগুলো কিনে ফেলতে। দুই দিন বিভিন্ন লাইব্রেরি ঘুরে আমরা অধিকাংশ বই-ই পেয়ে গেলাম, আলহামদুলিল্লাহ। এর মধ্যে আবার হোল কী, আমি ভেবেছিলাম যে দারুসসালাম যেহেতু বিশ্বজুড়ে সমাদৃত প্রকাশনা সংস্থা, এখানে সবাই তার ঠিকানাটা বলতে পারবে। কিন্তু কেউ-ই বলতে পারলেন না। শেষমেশ মনে পড়লো রাহনুমাপু দারুসসালামের বইয়ের ভক্ত-পাঠিকা! অবশেষে তাঁর শরণাপন্ন হলাম। আপু বই থেকে তাদের মাদীনাহ অফিসের ঠিকানাটা টেক্সট করে দিলেন। যারপরনাই আনন্দিত হলাম। দারুণ ঔৎসুক্য নিয়ে খুঁজে বের করে ফেললাম। বেশ কিছু পছন্দের বই নেয়া হোল। মেজো আবুব একদিন আমি, সুহাইমা আর সাহিমকে নিয়ে বেরোলেন কেনাকাটা করতে। ওরা দু জনের পছন্দ হয়েছে এমন দুটো তোব কিনলাম। মধ্যখানে সময় করে আমরা মাদীনাহ ইউনিভার্সিটি ঘুরে আসলাম। ওখানে বেশ কিছু বাঙালি বড় ভাইয়ার সাথে কথা বললাম, পরিচিত হলাম। দু জন সম্মানিত শাইখের সাথে কথা বললাম। খুশি হলেন এবং দু'আ করলেন।
আমাদের ফিরতি ফ্লাইটের দিন ঘনিয়ে আসছে। কখন যে পঁচিশ দিন পূর্ণ হয়ে গেলো, টের-ই পেলাম না! ছয় তারিখ রাতে ফ্লাইট। আমরা প্রস্তুতি নিতে থাকলাম। সিদ্ধান্ত হোল, পাঁচ তারিখ রাতে মাদীনাহ থেকে রওনা হবো। এর মধ্যে আবার মেজো আম্মু হঠাৎ করে ধরে বসলেন, কিছু নিতে হবে। আমি আসন্ন বিদায়ের কথা ভেবে এমনিতে ভারাক্রান্ত। ছোটাচ্চু আর সুহাইমা এক প্রকার জোর করেই সাথে নিয়ে নিলো। আমি এক জোড়া জুতো, মোজা আর একটা টি-শার্ট নিলাম। ফুফা আর ছোটাচ্চু আমাদের ব্যাগ আর লাগেজগুলো ভালো করে বাঁধছিলেন।
হর্ষের প্রহরগুলো খুব দ্রুত ফুরিয়ে গেলো, বিষাদের কালো ছায়া ক্রমশ ঘিরতে শুরু করলো, যখন শেষবারের মতো প্রিয় নবীজিকে সালাম দিয়ে এলাম আর মাসজিদ নাবাওয়িতে শেষ সালাত আদায় করে ফিরলাম, রাহমাতের ফল্গুধারা থেকে ক্রমে ক্রমে নিজেকে শুধু বঞ্চিত মনে হতে শুরু করলো। সুহাইমা খুব করে বলছিলো, 'ভাইয়া! আর দুটো দিন পরে যাওয়া যায় না?' সাহিম বলছিলো, 'দুইদিন না হলেও একদিন থাকেন না ভাইয়া! প্লিজ!' আমার তখন বলার কিছু থাকে? কষ্টগুলো দলা পাকিয়ে নিজেই গিলে ফেললাম। নতুন বাবু সাহিলও বিড়বিড় করে তাকিয়ে থেকে মায়ার বাঁধনে আটকে ফেলেছিলো। মেজো আবুবু, মেজো আম্মু, ছোট আব্বু, ছোটাচ্চু – তাঁদেরও বিদায়ের একটা অপ্রস্তুত অনুভূতি। অবশেষে ভালোবাসার সবগুলো অধ্যায়ের সমাপ্তি টেনে আমরা পাঁচ তারিখ রাতে রওনা হলাম মক্কার উদ্দেশ্যে। গাড়ি পরবর্তী মোড়ে অদৃশ্য হবার আগ পর্যন্ত সুহাইমা ও সাহিম ঠাঁয় দাঁড়িয়ে ছিলো রাস্তায়। ওদের নির্বাক চাহনিকে ভুলে গিয়ে প্রিয় রাসূলের শহরকে আমরা বিদায় জানালাম।
বিদায় মাসজিদ কুবা, বিদায় মাসজিদ আন-নাবাওয়ি, বিদায় উহুদ, বিদায়, বিদায়!
বিদায় হে মাদীনাতুর রাসূল...
ছয় তারিখ ভোরে আমরা মক্কায় পৌঁছলাম। এখান থেকে রাতে এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা হবার কথা। এবার হোটেল পেলাম বায়তুল্লাহ থেকে একেবারে কাছে। আমরা শেষবারের মতন বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করলাম। এখন মানুষের ভীড় একদমই নেই। প্রাণভরে বায়তুল্লাহকে দেখতে পেলাম। হাতীমে কা'বার ভেতরে সালাত আদায়ের সুযোগ পাই নি গেলবার, এবার তাওয়াফকারীর সংখ্যা কম হওয়ায় পেয়ে গেলাম, আলহামদুলিল্লাহ। প্রিয় কা'বাকে শেষ বিদায় জানাবার অনুভূতি প্রকাশ কিভাবে করি? এ কেবল কা'বার মালিকই জানেন।
মালিক আমার! ইচ্ছা-অনিচ্ছায় সংঘটিত ভুলগুলো তুমি ক্ষমা করে দিয়ে আমাদের 'উমরাহ কবুল করে নাও। তৃষিত হৃদয়কে প্রশান্ত করতে আবার কখনো বায়তুল্লাহর দর্শন-সুধা পানের সুযোগ পাবো কি-না, জানি না। তোমার কা'বার আঙিনায় প্রস্তুত অশ্রুর ফোঁটাগুলো দিয়ে আমার ভুল-ভ্রান্তির অগ্নিতাপ নিভিয়ে দিও, মালিক!
টিকাঃ
১ হাজার বছরের বাংলা কবিতা, পৃ. ১০১
২ পূর্ণ এলিজি কবিতার জন্যে দ্রষ্টব্য: সীরাত ইবন কাসীর খ. ৪ পৃ. ৫৫৬; সীরাত ইবন হিশাম, খ. ২ পৃ. ৬৬৬
৩ 'এক মুঠো সবুজের স্বপ্ন'তে এই কাব্যানুবাদ গ্রন্থাশ্রিত হয়েছে।
৪ ছোট আবুব ও ছোটাচ্চু- এই দুই শব্দের ব্যাখ্যা দেই। চট্টগ্রাম অঞ্চলে চাচাদের আবুব সম্বোধনের রেওয়াজ আছে। আব্বুব্বরা ছয় ভাই। তো, আমরা যথাক্রমে (আমার) আবুব (অন্যদের কাছে 'বড়ো আব্ব'), মেজো আবুব, সেজো আবুব, ছোট আবুব- এভাবে নামকরণ করতে গিয়ে দু জন বাদ পড়ে গেলেন, এদিকে ধারাক্রম-বিশেষণ শেষ হয়ে গেছে। একজনকে তাঁর ইচ্ছানুযায়ী 'মিষ্টি আবুব' নামকরণ করা হোল। অন্যজনকে কী ডাকা যায়? মেজো আম্মুর পরামর্শ মোতাবেক আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, বিশেষণ যেহেতু পাওয়া যাচ্ছে না, বিশেষ্যকেই পরিবর্তন করা হোক; একদম ছোটোজনকে 'আবুব' না ডেকে 'ছোট চাচ্চু' বলা যেতে পারে। সেই 'ছোট চাচ্চু'র নজীবিয় সংস্করণ হচ্ছে 'ছোটাচ্চু'। আশা করি, পাঠকের সংশয় দূরীভূত হয়েছে।
১ অনেকেই 'রাওদ্বাহ' (/রওযা) বলতে রাসূলুল্লাহর [] কবর-কে মনে করেন। অথচ, কবর ও রাওদ্বাহ দুটো ভিন্ন। এক্ষেত্রে আমরা রাসূলুল্লাহর বক্তব্যটি খেয়াল করতে পারি: ما بين بيتي ومنبري روضة من رياض الجنة "আমার ঘর ও মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থানটুকু জান্নাতের বাগানসমূহের মধ্যে একটি বাগান (রাওদ্বাহ)।" [সাহীহ আল-বুখারী: ১১৩৭, সাহীহ মুসলিম: ৩৪৩৪।]
১ نعاس শব্দটি সূরা আল-আনফাল (৮)-এর ১১ নং আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে। نعاس এবং نوم শব্দ দুটি অর্থের দিক থেকে প্রায় কাছাকাছি হলেও এদের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। نعاس বলতে হালকা ও অগভীর ঘুম-কে নির্দেশ করা হয়, 'তন্দ্রাচ্ছন্নতা'-ও বলা যেতে পারে, যখন মানুষ পুরোপুরি অবচেতন হয় না, বরং অনুভূতি সজাগ থাকে। কিন্তু نوم বলতে বোঝানো হয় গভীর ঘুম, যা মানুষের চৈতন্য-কে পুরোপুরি সুপ্ত করে দেয়, মানুষটি মোটেও চিন্ময় থাকে না। অথবা এক কথায় এভাবেও বলা যেতে পারে, نوم হচ্ছে ঘুম, نعاس হচ্ছে ঘুম আসার পূর্বেকার (তন্দ্রাচ্ছন্ন) অবস্থা। [রূহুল মা'আনী, খ. ৭ পৃ. ২৮]
১ সুনান আল-বায়হাক্বী আল-কুবরা: ৮২৩৯
১ কবিতাটি ছিলো: "Alone, alone, all, all alone, Alone on a wide wide sea! And never a saint took pity on My soul in agony." [The Rime of the Ancient Mariner, Part IV]
২ : بئر
📄 বিয়ের কবিতা : জীবনের কবিতা
এক
ভালোবাসার মানুষগুলোর বিয়েতে দাওয়াত পাওয়ার পর আমি সশরীরে উপস্থিত হতে না পারলেও গিফটটা পাঠিয়ে দিতে চেষ্টা করি। আমার পক্ষ থেকে গিফট সব সময়-ই এক রকম, খুব সাধারণ: দুইজনের জন্যে দুইটা বই, আর দুইজনের প্রতি দু'আ ও ভালোবাসা জানিয়ে উভয়ের নামের অদ্যাক্ষর দিয়ে মিলিয়ে একটা কবিতা লিখে বাঁধাই করে দেই। এবার দুইটা গল্প বলি।
ক
যেই দিনটার কথা বলছি, তার পরেরদিন ছিলো ডাক্তারনি বুবুর বিয়ে। পরীক্ষার কারণে আমি ওয়ালিমায় উপস্থিত থাকতে পারছিলাম না। তবুও কবিতা লিখতে বসে গেলাম। মজার বিষয়, উভয়ের নামের সবগুলো বর্ণ মিলালে ১৪টা হয়। তার মানে একটা সনেট লিখে ফেলা যায় অনায়াসে! কিন্তু যথারীতি দ্বিধায় পড়ে গেলাম, কার নাম দিয়ে শুরু করবো, এই নিয়ে। আমি জানতে চাইলাম,
: বুবু, কার নামটা আগে দেবো?
: তোর ইচ্ছা!
: উঁহু! বলে দে প্লিজ।
: আচ্ছা, তোর ভাইয়ারটা আগে দে।
মোটামুটি নিকটাত্মীয় বলা যায়, এমন একজন ভাইয়ার বিয়ের দাওয়াত পেলাম। আমি যেহেতু অখন্ড অবসরে আছি, এমনিতেই কবিতা লিখে দিতাম একটা, কিন্তু ভাইয়াটা দাওয়াত দেয়ার সাথে সাথে স্মিত হেসে বললেন, 'একটা কবিতার আবদার রাখতে পারি তো!' তার মানে আমাকে দ্বিগুণ উৎসাহে কবিতা লিখতে হবে! যথারীতি বসে গেলাম। এবারও দ্বিধায় পড়লাম। আমার কবিতা লেখার স্টাইলটা বুঝিয়ে দিয়ে তাঁকেও জিজ্ঞেস করলাম। আলাপনটা প্রায় একই রকমের,
: ভাইয়া, কার নামটা আগে রাখবো?
: আপনার যেটা সুবিধা হয়।
: আপনি বললেই খুশি হবো ভাইয়া।
: তাহলে উনার নামটা আগে রাখো।
দুই
আমি আসলে দুটো গল্প শোনাতে চাই নি, দুটো বাক্য শোনাতে চেয়েছি:
'তোর ভাইয়ারটা আগে দে।'
'উনার নামটা আগে রাখো।'
তিন
খাতা-কলমের কবিতার ক্ষেত্রে এই দুটো বাক্য যেমন প্রোজ্জ্বল আভায় দীপ্যমান, জীবনের কবিতায় বাক্য দুটোর সার্থক প্রয়োগ কেমন স্বর্ণোজ্জ্বল দ্যুতি ছড়াতে পারে?
ভাবছিলাম, এই দুটো বাক্যের যে দর্শন, দুটো হৃদয়ের যুগল পথচলায় বিশ্বাস ও বিশুদ্ধতাকে অমলিন রাখার জন্যে এর চে' বেশি কিছু দরকার আছে কি না!
📄 পরীক্ষার গল্প
এক
পরীক্ষার হলে উপস্থিত হলেন। ইনভিজিলেটর আসলেন। নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা শুরু হোল। প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে আপনি এক দফা হেসে নিলেন। আপনার জানাশোনা বিষয়-আশয় থেকেই প্রশ্ন এসেছে। শতভাগ 'কমন'। হলের ভেতর কেউ ভ্রু কুঁচকাচ্ছে, কেউ মাথার চুল ছিঁড়ছে, আর কারো চোখ ছানাবড়া হয়ে আছে। বাকিরা যে যার মত লেখা শুরু করেছে। আপনি মোটামুটি আত্মবিশ্বাসী, আপনি এদের সবার চেয়ে ভালো উপস্থাপনা করতে পারবেন। ভাবতে ভাবতে আপনি খাতায় কিছুই লিখছেন না। পরীক্ষার নির্ধারিত সময় ধীরে ধীরে ফুরিয়ে এসেছে। আপনি আগাগোড়া সাদা খাতা জমা দিয়ে এলেন। ইনভিজিলেটর অবাক!
: কী ব্যাপার? তুমি কিচ্ছু লিখলে না? পুরোদস্তুর সাদা খাতা জমা দিয়ে যাচ্ছো!
: স্যার, আমার জ্ঞান, প্রশ্নকৃত বিষয় সম্পর্কিত সব প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গ - সব তো আমার মস্তিষ্কে জমা আছে! খাতায় লেখার কী দরকার?
পরীক্ষার দিন স্যার কিছু বললেন না। রেজাল্ট প্রকাশের দিন দেখলেন, আপনার নামটা কোথাও নেই! স্যার সেদিন আপনাকে একঝলক দেখে যখন 'বোকা ছেলে কোথাকার!' বলে ভর্ৎসনা করলেন, তখন আপনার বুক ভেঙ্গে গেল। এত্ত পড়ালেখা আর জানাশোনা সব অর্থহীন হয়ে গেল!
দুই
আপনি বিশ্বাস করেন, পৃথিবীটা আপনার জন্যে একটি পরীক্ষাক্ষেত্র, আখিরাতে সব পরীক্ষার্থীর রেজাল্ট প্রকাশ করা হবে।
আপনি এই পৃথিবীতে আল্লাহ্ তা'আলা প্রদত্ত সিলেবাস- আল-কুরআন এবং আস-সুন্নাহ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল। সাধ্যানুসারে জানার চেষ্টা করেন, পড়েন, লিখেন, ভাবেন অনেক কিছু। অথচ আপনার দৈনন্দিন জীবনে চলাফেরায়, উঠা-বসায়, কথা-বার্তায় কিংবা আচরণে একটু-ও প্রতিফলন ঘটে না তার। আপনি ঠিক সেই পরীক্ষার্থীর মতই দিব্যি বলে বেড়ান,
'ইসলাম তো আমার অন্তরেই আছে। বাইরে প্রকাশের কী হোল?'
তিন
আপনাকে দুটো সমীকরণ আবার দেখাই:
ক) আমার জ্ঞান তো আমার মস্তিষ্কে জমা আছে! খাতায় লেখার কী দরকার?
খ) ইসলাম তো আমার অন্তরেই আছে। বাইরে প্রকাশের কী হোল?
এবার একটু ভেবে দেখুন...
প্রথম ব্যক্তিটার মতো আপনার চূড়ান্ত রেজাল্ট প্রকাশিত হবার দিন আল্লাহ্র কাছে আপনিও ঠিক এভাবে বোকা হয়ে যাবেন না তো! আপনার জ্ঞান এবং প্রজ্ঞা সব অর্থহীন হয়ে যাবে না তো!?
চিন্তা করা দরকার না!?
চার
একটু চিন্তা করার কথা বলছি কেনো জানেন? কারণ, দ্বিতীয় পরীক্ষার রেজাল্টের পর আপনার চিন্তা করার অবকাশ-ই থাকবে না। কিংবা চিন্তা করলেও তা কোনো কাজে আসবে না।
প্রথমে উল্লিখিত পরীক্ষায়, মানে পার্থিব কোন পরীক্ষায় যদি আপনি অকৃতকার্য হন, তাহলে সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্বিতীয়বার কোমর বেঁধে পড়াশোনা করে আবারো পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ আছে। প্রথমবারের ব্যর্থতাকে দ্বিতীয়বার সফলতায় রূপান্তর করার ফুরসত আছে। কিন্তু কিয়ামাতের দিন রেজাল্ট পাবার পর আপনাকে সে সুযোগ দেয়া হবে না! আল-কুরআন কী বলছে শুনুন:
وَهُمْ يَصْطَرِخُونَ فِيهَا رَبَّnَا أَخْرِجْنَا نَعْمَلْ صَالِحًا غَيْرَ الَّذِي كُنَّا نَعْمَلُ أَوَلَمْ نُعَمِّرْكُمْ مَا يَتَذَكَّرُ فِيهِ مَنْ تَذَكَّرَ وَجَاءَكُمُ النَّذِيرُ فَذُوقُوا فَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ نَصِيرٍ
"সেখানে তারা আর্তচিৎকার করে বলবে, হে আমাদের রব্ব! আমাদেরকে এখান থেকে বের করুন। আমরা সৎকাজ করব, পূর্বে যা করতাম, তা করব না। (আল্লাহ বলবেন) আমি কি তোমাদেরকে এতটা সময় দেই নি, যাতে যা চিন্তা করার বিষয় তা চিন্তা করতে পারতে? উপরন্তু তোমাদের কাছে সতর্ককারীও আগমন করেছিল। অতএব (আযাবের স্বাদ) আস্বাদন কর। সীমালঙ্ঘনকারীদের জন্যে কোন সাহায্যকারী নেই।" [১]
তাহলে চলুন, সময় থাকতেই আমরা চিন্তা করি, সতর্ক হই, সচেষ্ট হই! অবহেলায়, অবচেতনে অকৃতকার্য হতভাগ্যদের কাতারে যেনো না পড়ি আমরা! চূড়ান্ত সাফল্যের আনন্দে যেনো আমরা এক চিলতে হাসির ঝিলিক ছড়িয়ে দিতে পারি, তার জন্যে আজ থেকে, এখন থেকেই মনোযোগী হই...!
টিকাঃ
১ সূরা ফাতির ৩৫:৩৭
এক
পরীক্ষার হলে উপস্থিত হলেন। ইনভিজিলেটর আসলেন। নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা শুরু হোল। প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে আপনি এক দফা হেসে নিলেন। আপনার জানাশোনা বিষয়-আশয় থেকেই প্রশ্ন এসেছে। শতভাগ 'কমন'। হলের ভেতর কেউ ভ্রু কুঁচকাচ্ছে, কেউ মাথার চুল ছিঁড়ছে, আর কারো চোখ ছানাবড়া হয়ে আছে। বাকিরা যে যার মত লেখা শুরু করেছে। আপনি মোটামুটি আত্মবিশ্বাসী, আপনি এদের সবার চেয়ে ভালো উপস্থাপনা করতে পারবেন। ভাবতে ভাবতে আপনি খাতায় কিছুই লিখছেন না। পরীক্ষার নির্ধারিত সময় ধীরে ধীরে ফুরিয়ে এসেছে। আপনি আগাগোড়া সাদা খাতা জমা দিয়ে এলেন। ইনভিজিলেটর অবাক!
: কী ব্যাপার? তুমি কিচ্ছু লিখলে না? পুরোদস্তুর সাদা খাতা জমা দিয়ে যাচ্ছো!
: স্যার, আমার জ্ঞান, প্রশ্নকৃত বিষয় সম্পর্কিত সব প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গ - সব তো আমার মস্তিষ্কে জমা আছে! খাতায় লেখার কী দরকার?
পরীক্ষার দিন স্যার কিছু বললেন না। রেজাল্ট প্রকাশের দিন দেখলেন, আপনার নামটা কোথাও নেই! স্যার সেদিন আপনাকে একঝলক দেখে যখন 'বোকা ছেলে কোথাকার!' বলে ভর্ৎসনা করলেন, তখন আপনার বুক ভেঙ্গে গেল। এত্ত পড়ালেখা আর জানাশোনা সব অর্থহীন হয়ে গেল!
দুই
আপনি বিশ্বাস করেন, পৃথিবীটা আপনার জন্যে একটি পরীক্ষাক্ষেত্র, আখিরাতে সব পরীক্ষার্থীর রেজাল্ট প্রকাশ করা হবে।
আপনি এই পৃথিবীতে আল্লাহ্ তা'আলা প্রদত্ত সিলেবাস- আল-কুরআন এবং আস-সুন্নাহ সম্পর্কে ওয়াকিফহাল। সাধ্যানুসারে জানার চেষ্টা করেন, পড়েন, লিখেন, ভাবেন অনেক কিছু। অথচ আপনার দৈনন্দিন জীবনে চলাফেরায়, উঠা-বসায়, কথা-বার্তায় কিংবা আচরণে একটু-ও প্রতিফলন ঘটে না তার। আপনি ঠিক সেই পরীক্ষার্থীর মতই দিব্যি বলে বেড়ান,
'ইসলাম তো আমার অন্তরেই আছে। বাইরে প্রকাশের কী হোল?'
তিন
আপনাকে দুটো সমীকরণ আবার দেখাই:
ক) আমার জ্ঞান তো আমার মস্তিষ্কে জমা আছে! খাতায় লেখার কী দরকার?
খ) ইসলাম তো আমার অন্তরেই আছে। বাইরে প্রকাশের কী হোল?
এবার একটু ভেবে দেখুন...
প্রথম ব্যক্তিটার মতো আপনার চূড়ান্ত রেজাল্ট প্রকাশিত হবার দিন আল্লাহ্র কাছে আপনিও ঠিক এভাবে বোকা হয়ে যাবেন না তো! আপনার জ্ঞান এবং প্রজ্ঞা সব অর্থহীন হয়ে যাবে না তো!?
চিন্তা করা দরকার না!?
চার
একটু চিন্তা করার কথা বলছি কেনো জানেন? কারণ, দ্বিতীয় পরীক্ষার রেজাল্টের পর আপনার চিন্তা করার অবকাশ-ই থাকবে না। কিংবা চিন্তা করলেও তা কোনো কাজে আসবে না।
প্রথমে উল্লিখিত পরীক্ষায়, মানে পার্থিব কোন পরীক্ষায় যদি আপনি অকৃতকার্য হন, তাহলে সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্বিতীয়বার কোমর বেঁধে পড়াশোনা করে আবারো পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ আছে। প্রথমবারের ব্যর্থতাকে দ্বিতীয়বার সফলতায় রূপান্তর করার ফুরসত আছে। কিন্তু কিয়ামাতের দিন রেজাল্ট পাবার পর আপনাকে সে সুযোগ দেয়া হবে না! আল-কুরআন কী বলছে শুনুন:
وَهُمْ يَصْطَرِخُونَ فِيهَا رَبَّnَا أَخْرِجْنَا نَعْمَلْ صَالِحًا غَيْرَ الَّذِي كُنَّا نَعْمَلُ أَوَلَمْ نُعَمِّرْكُمْ مَا يَتَذَكَّرُ فِيهِ مَنْ تَذَكَّرَ وَجَاءَكُمُ النَّذِيرُ فَذُوقُوا فَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ نَصِيرٍ
"সেখানে তারা আর্তচিৎকার করে বলবে, হে আমাদের রব্ব! আমাদেরকে এখান থেকে বের করুন। আমরা সৎকাজ করব, পূর্বে যা করতাম, তা করব না। (আল্লাহ বলবেন) আমি কি তোমাদেরকে এতটা সময় দেই নি, যাতে যা চিন্তা করার বিষয় তা চিন্তা করতে পারতে? উপরন্তু তোমাদের কাছে সতর্ককারীও আগমন করেছিল। অতএব (আযাবের স্বাদ) আস্বাদন কর। সীমালঙ্ঘনকারীদের জন্যে কোন সাহায্যকারী নেই।" [১]
তাহলে চলুন, সময় থাকতেই আমরা চিন্তা করি, সতর্ক হই, সচেষ্ট হই! অবহেলায়, অবচেতনে অকৃতকার্য হতভাগ্যদের কাতারে যেনো না পড়ি আমরা! চূড়ান্ত সাফল্যের আনন্দে যেনো আমরা এক চিলতে হাসির ঝিলিক ছড়িয়ে দিতে পারি, তার জন্যে আজ থেকে, এখন থেকেই মনোযোগী হই...!
টিকাঃ
১ সূরা ফাতির ৩৫:৩৭