📄 তিনটি ব্যামো: ত্রিফলা প্রতিষেধক
ত্বালিবুল 'ইলম তথা 'Students of Knowledge' যাঁরা, তাঁরা সচরাচর যে তিনটি সমস্যার মুখোমুখি হন, সে সম্পর্কিত তিনটি কবিতা আমরা এখানে কাব্যানুবাদ করবো, বিইজনিল্লাহ। শেষ দুটোতে আক্ষরিক অনুবাদের বৃত্তে কেন্দ্রবিন্দু ঠিক রেখে ব্যাসার্ধ কিছুটা বাড়াতে হয়েছে, পাঠকের সহজাত বোধগম্যতার বৃত্তকে শিল্পিত করার জন্যে। তিনটি কবিতা-ই মাত্রাবৃত্ত ছন্দে অনূদিত।
(১) আমার স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে
এই একই সমস্যার ব্যাপারে ইমাম আশ-শাফি'ঈ [রা.] তাঁর উস্তায ওয়াকী'র কাছে প্রশ্ন করেছিলেন। তিনি যে সমাধান দিয়েছেন, সেটা কবিতা আকারেই বর্ণনা করছেন।[১]
شكوت إلى وكيع سوء حفظي
فأرشدني إلى ترك المعاصي
وأخبرني بأن العلم نور
ونور الله لا يهدى لعاص
"প্রিয় উস্তায ওয়াকী'র কাছে করলাম অভিযোগ-
আমার স্মরণশক্তি কমেছে, কিভাবে সারবে এ রোগ?
তিনি বললেন, 'তুমি পাপ ছাড়ো'
এরপর তিনি বললেন আরো-
বৎস! 'ইলম হলো এক 'নূর' আল্লাহ তা'আলার!
পাপীদের দেয়া হয় না কখনো এই নূর উপহার!”
(২) আলসেমি কাটিয়ে উঠতে পারি না
'ইলম অর্জনের পথে অলসতা মারাত্মক একটি বিষফোঁড়া। ছাত্রজীবনে এটার 'ইনফেকশন' একটু বেশিই ভয়াবহ হয়ে থাকে।
একজন ছাত্রের সুফলা স্বপ্নের মাঠে অহেতুক অলসতা একদম পাকা ধানে মই দেয়ার মতো। অথবা বাড়া ভাতে ছাই দেয়ার মতো। নানা সময় নানা অজুহাত দাঁড় করানো আলস্যের প্রাণ।
ইমাম আয-যাহাবী এ সংক্রান্ত সুন্দর একটি কবিতা নিয়ে এসেছেনা। :
إذا كنت تؤذى بحر المصيف
ويبس الخريف وبرد الشتا ؟
ويلهيك حسن زمان الربيع
فأخذك للعلم قل لي متى؟
“এসেছে গ্রীম; তুমি বলো, 'আহ! খরতাপে পুড়ে যাই!
এমন গরমে কিভাবে পড়ার ফুরসত বলো পাই?'
শীত ঋতু এলে বলো, 'আহা এই হিম শীতলের মাসে,
কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে কি পড়ার চিন্তা মাথায় আসে?'
শরৎ ঋতুর উদাসী পরশে তুমি হও ভুলোমনা,
পড়ার টেবিলে আনমনা হয়ে করে যাও কল্পনা।
বসন্ত এলো, বেশ! চারিদিকে রূপের মাধুরী দেখে-
প্রকৃতির প্রেমে পড়ে যাও তুমি পড়াশোনা সব রেখে।
এভাবেই যদি বন্ধু তোমার সারাটি বছর কাটে;
বলো তো তাহলে জ্ঞান আহরণে বসবে কখন পাঠে?”
(৩) পড়ার সময় নোট করার অভ্যাস না থাকা
কোনো গ্রন্থ অধ্যয়নের পরে, কোন জ্ঞানীর সংস্পর্শে নতুন কিছু জানার পরে, অথবা সহসা কোনো ভাবনার উন্মেষ নিজের ভেতরে অনুভূত হলে, আমাদের উচিৎ সেটা তখনই নোট করে নেয়া। নোট করার অভ্যাস না থাকলে অনেক জ্ঞাত ও সহজাত বিষয়ও আমাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। ইবনু 'উজাইবাহ তাঁর তাফসীরগ্রন্থে এরকম একটি কবিতা বর্ণনা করেছেন। কোনো বিষয়ে জানার পরে নোট করে নেয়া যে কত বেশি প্রয়োজন, এটা কবিতার প্রতিপাদ্য।
العلم صيد والكتابة قيده
قيد صيودك بالحبال الواثقة
فمن الحماقة أن تصيد غزالة
وتتركها بين الخلائق طالقة
“ধরো কোন এক শিকারী শিকার করতে গিয়েছে বনে
একটা হরিণ শিকার করলো অতীব সংগোপনে
শিকারী ভাবলো, পেয়েছি এবার পালায় কিভাবে দেখি!
এদিকে সুযোগে পালালো হরিণ; শিকারী অবাক, 'এ কি'!
অথচ শিকারী শিকার পেয়েই ভালো করে যদি বাঁধে-
অনেক আশার হরিণটা তার পালাতো কি আর সাধে?
তুমিও তেমনি জ্ঞানের শিকারী, জ্ঞানকে শিকার করে
লেখার বাঁধনে আটকিয়ে নাও মনের খাঁচায় ভরে
অন্যথা সেই জানা জিনিসটা পালিয়েই যদি যায়
শিকারীর মতো তুমিও করবে বৃথা শুধু হায় হায়!”
টিকাঃ
১. দীওয়ান শাফি'ঈ, পৃ. ৮
১ সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা, খ. ১৭ পৃ. ১০৬
১ আল-বাহর আল-মাদীদ, খ. ১ পৃ. ৩৬৯
📄 তিনি এক মজার শিক্ষক
প্রিয় নবীজি [] কেবল মজার মানুষই ছিলেন না, ছিলেন একজন সূক্ষ্ণ মনস্তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষক এবং দক্ষ শিক্ষক-ও! তাঁর অভিনব শিক্ষণ-পদ্ধতির একটি গল্প আমরা অনুবাদ করবো, আত-তাফসীর আত-তাবারী থেকে।[১] গল্পটি শোনার আগে আমাদের একটু জেনে রাখা প্রয়োজন, এটি কোন্ আয়াতের প্রেক্ষাপটে এসেছে। আয়াতটি হচ্ছে:
حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَى
"তোমরা সালাতসমূহের ব্যাপারে মনোযোগী হও, মধ্যবর্তী সালাতের ব্যাপারেও। [২]"
এখানে 'মধ্যবর্তী সালাত' (الصَّلَاةِ الْوُسْطَى) বলতে আল্লাহ কী বুঝিয়েছেন, সে ব্যাপারে বিভিন্ন মতামত আছে। তবে রাসূলুল্লাহর [] হাদিস এবং ইবন 'আব্বাস, 'আয়িশা, 'আলী ইবন আবি তালিব, আবূ হুরায়রা [রা.] প্রমুখ সাহাবীর বক্তব্যের ভিত্তিতে অধিকাংশ মুফাসসির মত দিয়েছেন যে, এখানে আসরের সালাতের কথা বলা হয়েছে। সাধারণ বোধ-বুদ্ধিতেও তা-ই মনে হয়। পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের মধ্যে আসরের অবস্থান একেবারে মাঝামাঝি।
এবার সরাসরি গল্পে চলে যাই। একজন সাহাবী[১] বলছেন:
আমি তখন ছোট কিশোর। আবূ বাকর ও 'উমার [রা.] আমাকে রাসূলুল্লাহ'র [] কাছে পাঠালেন 'মধ্যবর্তী সালাত' সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে।
অতঃপর নবীজি [] আমার কনিষ্ঠা আঙ্গুলটি ধরে বললেন: 'এটা হোল ফাজর'।
এরপর ঠিক তার পাশের আঙ্গুল ধরে বললেন: 'এটা হোল যোহর'।
এবার ধরলেন বৃদ্ধা আঙ্গুল, বললেন: 'এটা হোল মাগরিব'।
তারপর ঠিক তার পাশের আঙ্গুল ধরে বললেন: 'এটা হোল 'ইশা'!
এবার রাসূলুল্লাহ [] আমাকে বললেন: 'বল তো, তোমার কোন্ আঙ্গুলটা বাকী আছে?'
আমি বললাম: 'মধ্যমা আঙ্গুল'।
তারপর জিজ্ঞেস করলেন: 'বল তো, কোন্ সালাতটা বলা বাকী আছে?'
আমি বললাম: 'আসর'।
নবীজি [] বললেন: 'ঐ তো! ওটাই আসর!”
শিশুদের মন নিয়ে খেলা করার গুণটা আসলেই অনন্য! দেখুন, প্রিয় নবীজি [] এমনভাবে শিশুটিকে বোঝাচ্ছেন, যাতে তার হৃদয়ে উদ্দীষ্ট বিষয়টা একেবারে গেঁথে যায়। একটি বাক্যে বা কথায় 'আসর সালাত' বলে না দিয়ে আঙ্গুল ধরে ধরে বোঝালেন, আর শিশুটাও খুব চমৎকারভাবে এবং আনন্দের সাথে বুঝে নিতে পারলো। আরেকটা বিষয় লক্ষণীয়, তাঁর পাঠনের ধারাবাহিকতাও এমনভাবে গোছানো, যাতে শিশুটি নিজেই উত্তর বের করে আনতে পারে!
টিকাঃ
১ আত-তাফসীর আত-তাবারী, খ. ৫ পৃ. ১৯৬
২ সূরা আল-বাক্বারাহ ২:২৩৮
৩ তাফসীর তানতাওয়ী, খ. ১ পৃ. ৪৩৬
১ তাফসীরে নির্দিষ্ট কোনো নাম উল্লেখ করা হয় নি।
📄 একটি স্বপ্নের বেড়ে ওঠার গল্প
দু হাজার দশ সালের কোনো এক শুভদিনে অনলাইনে পরিচিত হয়েছিলাম প্রিয় মানুষ, প্রিয় শিল্পী মারুফ আল্লাম ভাইয়ার সাথে। আমি তখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। তখন বিভিন্ন অনলাইন ম্যাগাজিনের বেশ সমাদর ছিলো। আমার কাঁচা হাতের কিছু লেখা প্রকাশিত হয়েছিলো সেসব ম্যাগাজিনে। ভাইয়াও ওখানে লিখতেন নিয়মিত। আমার পঁচা সব লেখা সত্ত্বেও যে ক জন বিশাল হৃদয়ের মানুষ৷৷ উৎসাহ
"কাফনের কাপড়টাকে গায়ে জড়াবার আগে
ইহরাম গায়ে বাঁধার সুযোগ করে দিও
মরণের আগে একবার কাবার ধারে নিও...
বেশি কিছু চাই নি আমি, চেয়েছি কাবার ধারে
ঝরাব নয়ন-গলা পানি
মনের ধারে যুগে যুগে জমে থাকা পাপের সারি,
মুছে নেবো মনের যত গ্লানি..."
আমি নিজেও জানি না, কিভাবে সারাদিন এই গান মুখে লেগে থাকতো আমার।
আল্লাহর-ই ইচ্ছা, গানটা গাইতে গিয়েই সাধ ও স্বপ্নের সবগুলো রেখা আস্তে আস্তে সেই পবিত্র ভূমির কেন্দ্রবিন্দুতে গিয়ে মিলে যেতো! প্রিয়নবীজির [৪] প্রতি নিদারুণ ভালোবাসা তো আজন্ম লালন করে এসেছি, এবার সেই প্রেম-বৃক্ষটা ফুলে-ফলে আরো বেশি সতেজ-সজীব হতে শুরু করে। হাঁটতে-চলতে, ঘুরতে-ফিরতে আর উঠতে-বসতে কেবলই বায়তুল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ঝরাবার স্বপ্ন, প্রিয় নবীজিকে [] সব আবেগ-উচ্ছ্বাস মিশিয়ে একটি সালাম প্রদানের তীব্র আকাঙ্ক্ষা! সবুজ গম্বুজের পাশে দাঁড়িয়ে হৃদয়াবেগ উজাড় করে একটি কবিতা নিবেদনের অদম্য বাসনা! বদর আর উহুদের প্রান্তরে দাঁড়িয়ে বুক ভরে একটি তাকবীর ধ্বনি তোলার জন্যে আকুলতা! জাবালে নূরের সুউচ্চ শিখরে, হেরা গুহার সম্মুখে ইতিহাস রোমন্থন করতে করতে বিড়বিড় করে 'ইক্করা বিসমি রব্বিকাল্লাযী খালাক্ক' পড়ার ব্যাকুল অভিলাষ!
অবাক কান্ড, আমি আমার নিত্যদিনের দু'আয় কেবল এই গান গেয়েছি নীরবে। রাত্রির নিঝুম নিস্তব্ধতায় একা একা গেয়েছি আর অশ্রু ঝরিয়েছি অনুপম ভালো লাগায়।
দাদা-দাদুর মুখে গল্প শুনে শুনেই আশৈশব আমার চোখে ঘুম এসেছে। হাজ্ব থেকে ফিরে তাঁরা যখন প্রতিনিয়ত তাঁদের সফরের অভিজ্ঞতার কথাগুলো বলতেন, কেমন তন্ময় হয়ে শুনতাম। বায়তুল্লাহ যিয়ারাতের স্বপ্নফুল ওভাবেই পাঁপড়ি মেলতে শুরু করেছিলো। তারপর শুনলাম আব্বুর মুখে। প্রেমজ্বরে আক্রান্ত হলাম দারুণভাবে। স্বপ্নের থার্মোমিটারে ব্যাকুলতার পারদ খুব অস্থিরভাবে উঠানামা শুরু করেছিলো তখনই।
অষ্টম শ্রেণির শেষদিকে আব্বুর কাছ থেকে উপহার পেলাম (আব্বুও তাঁর এক ছাত্র থেকে উপহার পেয়েছেন) আবু তাহের মেসবাহ রচিত 'বায়তুল্লাহর মুসাফির'। আমার জীবনে পড়া সেরা বইগুলোর একটি। লেখকের আবেগ-অনুভূতির শতভাগ-ই পাঠকের শিরা-উপশিরায় সঞ্চারিত হতে পারে, এই সত্যটা আমি প্রথম আবিষ্কার করেছি 'বায়তুল্লাহর মুসাফির' পড়ে। এই বই আমার তৃষ্ণাকে আরো বহুগুণ বাড়িয়ে দিলো।
ক
নবম শ্রেণিতে চলে এলাম ঢাকা। ভাইয়াকে সরাসরি দেখার সুযোগ হয়েছে ক্যাম্পাসে আয়োজিত 'নাতে রাসূল সন্ধ্যা'য়। আমার মুখে তখনো সেই গান কোনোভাবেই বিশ্রাম নিতে রাজি হয় নি। সবটুকু আবেগ আর অনুরাগ মিশিয়ে কাতর কণ্ঠে প্রিয়তম মালিককে বারবার হৃদয়ের আকুতি জানিয়েছি এই গান গেয়েই। আমি তখনো জানতাম না, আল্লাহ কতো তাড়াতাড়ি অধমের দু'আয় সাড়া দিচ্ছেন।
পরের বছর, যখন দশম শ্রেণিতে পড়ি, দাদা-দাদুর 'উমরাহ-তে যাবার কথা। দুজনে এর আগে হাজ্ব পালন করে এসেছেন। তবে এবারের উদ্যোগটা মেজো আব্বু এবং মেজো আম্মুর নেয়া। একজন অনেকদিন 'বাবা-মা'কে দেখেন না, আরেকজন 'মিস করেন' শ্বশুর-শাশুড়ী-কে। প্রবাস জীবনে বড়ো হওয়া আমাদের দুই ভাই-বোনও এখনো তাদের দাদা-দাদুকে দেখে নি। তাঁদের সঙ্গে প্রথম বায়তুল্লাহ যিয়ারতে যাচ্ছেন ছোট আম্মু, দুই পিচ্চি সহ। বাড়ির এই বিশাল একটি অংশের এমন সৌভাগ্যের খবরে আমি খুবই বিষণ্ণ হয়ে পড়লাম। আহা, আমিও যদি তাঁদের সাথী হতে পারতাম! বিষণ্ণতার প্রহরগুলো একেবারেই কাটছিলো না তখন। আল্লাহর হয়তো ভিন্ন পরিকল্পনা ছিলো, সে বছর তাঁরা কী যেন জটিলতায় ভিসা পান নি।
একদিন উদাসী বিকেলে লাইব্রেরিতে গন্তব্যহীন পড়াশোনায় মগ্ন ছিলাম। কিছুক্ষণ এই বই নেই, কিছুক্ষণ ওই বই। কোনোটাতেই স্থিরতা আসে না। সেলফে হঠাৎ একটা বইয়ের নামে চোখ আটকে গেলো: 'সৌরভের কাছে পরাজিত'। বের করে আনলাম। ছোটগল্পের বই। লেখক আল মাহমুদ। আল মাহমুদের কোনো গদ্য ইতোপূর্বে আমি পড়ি নি। 'সৌরভের কাছে পরাজিত' গল্পগ্রন্থ দিয়েই মূলত আবিষ্কার করেছিলাম, আল মাহমুদ গদ্য ও পদ্য দুদিকেই অনবদ্য। এই গল্পগ্রন্থের একটা গল্প আমাকে কাঁদিয়েছিলো। একটা গল্প আমি কদিন পরপর পড়তাম আর চোখ আর্দ্র করে আনতাম। গল্পের নাম 'একটি চুম্বনের জন্যে প্রার্থনা'। হাজের সময় হাজরে আসওয়াদ চুম্বনের রুদ্ধশ্বাস স্মৃতিকথাকে কী অনন্য শৈল্পিকতার ঠাসবুননে নির্মাণ করেছেন কবি! আমার উতরোল সিন্ধুতে জলোচ্ছ্বাস এনে দিলো সেই গল্পটা। সেই জলোচ্ছ্বাসে আমার সব বৈষয়িক সাধ-অভিলাষ ভেসে গেলো নিমেষেই।
গ্রীমের ছুটিতে গেলাম বাড়িতে। মাহমুদ স্যার তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে কক্সবাজার ট্যুরে যাবেন। খুব ইচ্ছে হোল আমাকেও সাথে নেবেন। নাহ! আমি তো কোনোভাবেই রাজি হই না। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি, আল্লাহর ঘর দেখার আগে ট্যুর-ফ্যুর সব বাদ। স্যার যথারীতি মান-অভিমানের দোলাচলে দুলতে শুরু করলেন। আমিও নির্বিকার। তবে আব্বর প্রচেষ্টায় তাঁর অভিমান ভাঙাতে পেরেছি শেষমেশ।
খ.
পুকুরের পূর্বপাড়টিতে যেখানে খড়ের স্তূপ, গাছ-গাছালির নিবিড় ছায়াঘেরা স্থানটি, গ্রীমের সময়টাতে ওখানে পেয়ারা গাছের নিচে দাদু সুযোগ হলেই চাটাই বিছিয়ে কুরআন পাঠ করতে বসেন। ঝিরিঝিরি বাতাসে গা এলিয়ে দাদুর পাশে বসে গল্প করতে বসে যেতাম আমিও।
ঢাকায় আসার পর আমার সেই সোনালী বিকেলগুলো খুব 'মিস' করেছি। এবার তাই দাদুকে একটু বেশি সময় দিতে টান অনুভব করলাম। এবার অবশ্য আমার ভালোবাসায় ভাগ বসানোর জন্যে নাতি-নাতনিদের সংখ্যা বেড়েছে। দাদী-নাতির গল্প বেশ জমেছে তখন। দাদাভাইও আছেন সাথে, একটা মোড়ায় বসে চিরাচরিত অভ্যাস মতো খুব মনোযোগ দিয়ে বাসি কোনো পত্রিকার উপ-সম্পাদকীয়তে চোখ বুলাচ্ছিলেন।
আহ! কতদিন পর দাদু আমার চুলে বিলি কাটছেন! আমাদের মধ্যকার কথোপকথনগুলো চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাতেই তুলে দেই। সঙ্গে প্রমিতানুবাদ।
অ নাতি, ছারর ফোঁয়ারে ন য ক্যা? হ ছাই! (নাতি, স্যারের সাথে যাস্ নি কেনো? বল্ তো!)
প্রথমে খুব অপ্রস্তুত হলাম। কী জবাব দেবো? দাদু নন শুধু, আমাদের পরিবারের সবাই-ই তখন স্যারের অনুরক্ত। সে এক আশ্চর্য শক্তি তাঁর, সবাইকে এত্তো এত্তো কাছে টেনে নিতে পারতেন! আমাকে কেনো এতো বেশি ভালোবাসা দিয়েছিলেন, জানি না। আমি আমতা আমতা করে খুলে বললাম হৃদয়ের অব্যক্ত অনুভূতিটা। আরো বললাম তাঁদের উমরাহ যাবার সংবাদে আমার মন খারাপের কথা। জানালাম এই গানের কথা, গানটা বুকে জড়িয়ে কান্নার কথা। দাদু তো অবাক! একেবারে থ মেরে চেয়ে রইলেন।
: এ হথা তইলে! আঁরে এথদিন ন উনালি ক্যা? (এ কথা তাহলে! আমাকে এতদিন শোনাস্ নি কেনো?)
: ব্যাজ্ঞনে আবার আঁসাআঁসি গরিবঅ আঁর ফলাই উইনলে, ইথাল্লাই। (সবাই আবার হাসাহাসি করতে পারে আমার পাগলামোর কথা শুনলে, সে জন্যে।)
: এন্নেকি ত! উগগা গান মেইনষরে এত উতালা বানাইত ফারে দে! আঁরে উনাইছ তোর বিয়াক। (তাই নাকি! একটা গান মানুষকে এত উতলা করতে পারে! আমাকে তোর সবকিছু শোনাবি।) দাদার দিকে তাকিয়ে,
: উইন্ননা তোঁয়ার নাতির হথা? (শুনেছো তোমার নাতির কথা?)
: উনিইইর! নোয়া হথা না? আঁরা অজত যেবশশতিয় ত হেন্দিল ইথে! (শুনছিইই! নতুন কথা নাকি? আমরা হাজ্বে যাবার সময়ও তো কেঁদেছিল সে!)
আমি কোন উত্তর দেই না। চুপ করে তখনো গানটা বিড়বিড় করছি।
রাতে খাবার সময় দাদা জিজ্ঞেস করলেন,
: তোর দাহেল ফরীক্কা হঁত্তে শ্যাষ অব? (তোর দাখিল পরীক্ষা কবে শেষ হবে?)
: এয়েদ্দে বছর মার্চত। (আগামী বছর মার্চে)
: অ এইচ্ছা। চিন্তা গইল্লাম দে, যেঙ্গরি অক তোরে লই যেয়ম দে আঁরা। (ও আচ্ছা। চিন্তা করলাম, যেভাবেই হোক, তোকে নিয়েই আমরা যাবো।)
আমি মোটেও ভাবি নি, দাদার এই আশাটা যে সত্যি হবে খুব তাড়াতাড়ি।
ছুটি শেষে ক্যাম্পাসে চলে আসলাম। আমার দু'আও থেমে নেই। এরই মধ্যে মেজো আব্বু একদিন ফোন করলেন আবু নাঈম স্যারের সেলফোনে। বুঝলাম এই অসময়ে ফোন আসাটা দাদুর কারসাজিতেই হয়েছে। আমাকে অবাক করে দিয়ে এবং মোহাবিষ্ট করে বললেন সামনের ছুটিতে শিগগির পাসপোর্ট করে ফেলতে। আব্বর সাথে কথা বলে মিষ্টি আব্বুকে সবকিছুর ব্যবস্থা করে দেয়ার জন্যে বললেন। মেজো আব্বুব খুব ভালোবাসতেন জানতাম। কিন্তু এত্তটুকু? এত্তবেশি? হয়তো আল্লাহর ইচ্ছা!
আমি তখন মাত্রাতিরিক্ত আনন্দে আত্মহারা। না, বেশি আবেগতাড়িত হওয়া যাবে না। সুস্থির হয়ে দু'রাকাত সালাত আদায় করলাম। এরই মধ্যে আমার পাগলামোর কাহিনী শুনে বড় ফুফু-ও অসাধারণ অনুপ্রাণিত হলেন, তাঁর সুপ্ত বাসনাটাও জেগে উঠলো হঠাৎ। এবং তিনিও অবশেষে আমাদের সাথী হতে মনস্থির করলেন। [মজার বিষয়, একইভাবে দুজন সহপাঠীও হঠাৎ করে আবেগতাড়িত হয়ে টাকা জমাতে শুরু করেছে, উরিব্বাস! আন্তরিক দু'আ করি, আল্লাহ তাদের ইচ্ছে কবুল করুন।]
গতবার রামাদানে আমাদের যাবার কথা ছিলো। আমরা আবেদন করবার আগ মুহূর্তে ভিসা দেওয়া বন্ধ। কিছুটা মন খারাপ হলেও খুব মর্মাহত হই নি, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখেছি। আব্বুব বললেন, রামাদানে যেহেতু জটিলতা দেখা যাচ্ছে, তার আগেই ব্যবস্থা হোক। যদিও আমার ই'তিকাফের স্বপ্নটা ভঙ্গ হবে, এই ভেবে মনে মনে খানিকটা বিষণ্ণ ছিলাম। এ সময় আবার দাদার অসুস্থতায় সেটাও হোল না। তবু তাওয়াক্কুল হারাই নি সর্বোত্তম পরিকল্পনাকারীর ওপর।
ইদানীং বেশ কিছু লেখকের হাজ্বস্মৃতির নোট চোখে পড়ছে বারবার। এগুলো পড়ে পড়ে আরো উতলা হয়ে উঠছি আমি।
আলহামদুলিল্লাহ, অবশেষে আল্লাহ কবুল করেছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে আমরা ইন শা-আল্লাহ জুমাবার রওনা দেবো।
গ.
এর মাঝে আরেকটি দুঃস্বপ্নের ঘানি এসে হাজির। খানিকটা বিষণ্ণতা অনুভব করছি: কারণ আমাকে সাথে নিয়ে 'উমরাহর সুপ্ন দেখা দাদা আর দাদু দুজন-ই এবার যেতে পারছেন না। দাদা হঠাৎ করে আবার অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তবু আমরা আল্লাহর সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়েছি। দাদু অনেকটাই অপ্রস্তুত এবং স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় হতচকিত। ভাবছিলাম আমি সান্তনা দেবো, কিন্তু আমাকেই উল্টো সান্তনা দিয়ে বললেন, 'তোমরাই যাও। হয়তো আল্লাহ এর মধ্যেই আমাদের কল্যাণ রেখেছেন।'
ঘ.
তোমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উপযুক্ত কোনো ভাষা এই অধমের নেই প্রভু! মহাকালের উর্ণজালে জড়িয়ে আমি কতোভাবে কতোবার তোমাকে ভুলেছি, ভুলছি। অথচ! অথচ সেই তুমি একটিবারের জন্যেও বিরাগভাজন হও নি তোমার ক্ষুদ্র বান্দাটির উপর। আমার শতো ভুল আর অসঙ্গতির বিরক্তিকর রোদ তোমার রহমের ছায়ায় বিলীন করে দিয়েছো বারবার।
অবনত মস্তকে কেবলই বারবার বলতে ইচ্ছে করছে, আমার সবটুকু ভালোবাসা, ভালো লাগা এবং হৃদয়াবেগ তোমার জন্যে নিবেদিত হোক, হে দ্বীন দুনিয়ার মালিক!
টিকাঃ
১ পাদটীকা লেখার সুযোগ যেহেতু পেয়েছি, এখানে কয়েকজনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ না করলে আমি নিজেকে অকৃতজ্ঞ মনে করবো। সর্বাগ্রে যে দুটো নাম আসবে, তাঁরা হলেন নূর আয়েশা সিদ্দীকা আপু (যিনি আমার কাছে 'গদ্যের জীবনানন্দ') এবং এনামুল হক স্বপন ভাইয়া। এই প্রবাসী লেখকদম্পতি লোহিত সাগরের ওপার থেকে ভালোবাসার ঢেউ তুলতেন আমার বঙ্গোপসাগরে। কয়েক বছর ধরে তাঁদের সাথে কোন যোগাযোগ নেই। যেখানেই থাকুন, আল্লাহ তাঁদের ভালো রাখুন। আমার কিশোরবেলার প্রথম মুগ্ধতা মাহমুদুল ইসলাম স্যারের নামটা এখানে শ্রদ্ধার সাথে স্মর্তব্য। রাবি'র ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক, খ্যাতিমান কবি ও গবেষক ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ আমার কবিসত্ত্বার প্রথম আবিষ্কারক। তাঁর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা আমাকে গদ্যের পাশাপাশি পদ্যে স্বচ্ছন্দ করেছে। আলজেরিয়ায় বাঙলাদেশ মিশনের সিনিয়র কর্মকর্তা শাহজাহান চাচ্চুর পুত্রবাৎসল্য আমাকে আজও মাঝেমাঝে ঘোরের মধ্যে ফেলে দেয়। কবি ও নির্মাতা হাসান আল-বান্না ভাইয়ার আন্তরিক অনুপ্রেরণাও কখনো ভুলবার নয়। তানযীমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ড. আব্দুল্লাহ আল-মামুন স্যার, তানযীমুল উম্মাহর মূল ক্যাম্পাসের তৎকালীন প্রিন্সিপ্যাল আ খ ম মাসুম বিল্লাহ স্যার [বর্তমানে ফাউন্ডেশনের ডিরেক্টর], ভাইস প্রিন্সিপ্যাল আবু নাঈম স্যার [বর্তমানে 'আরবি শাখা'র প্রিন্সিপ্যাল], কো-অর্ডিনেটর মাশহুদুল আলম স্যার [বর্তমানে ইস্টার্ন ক্যাম্পাসের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল] এবং বিলাল হোসাইন নূরী স্যার (আমার ছন্দগুরু) [বর্তমানে মূল ক্যাম্পাসের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল]- এঁদের কাছে আমার লেখকজীবন বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। তাঁদের উৎসাহ (অনেক ক্ষেত্রে 'প্রশ্রয়') ও সহযোগিতার কারণেই তানযীমে কাটানো দুইটি বছর আমার কবিতাজীবনের সুর্ণালী অধ্যায়। আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী (সম্ভবত এখন
১ লেখাটি যখন লিখছি, তখন সাহিল ও সুবাইতার জন্ম হয় নি। এখন ওরা চার ভাই-বোন: সুহাইমা, সাহিম, সাহিল, ও সুবাইতা।
২ তখন ছোট আম্মুর কোলজুড়ে তাজরিবাহ আসে নি। এখন ওরাও তিন ভাই-বোন: নাশিত, সামিত ও তাজরিবাহ।
📄 স্বপ্ন যখন পৌঁছে গেলো মঞ্জিলে
অন্য আর দশজনের চে' আমার 'উমরাহ সফরের অভিজ্ঞতা ভিন্ন কিছু নয়। ভ্রমণকাহিনী অথবা সফর অভিজ্ঞতা আমার নিজের কাছেই খুব একটা আকর্ষণের বিষয় নয়। উপরন্তু এখানে 'রিয়া' জনিত ব্যাপারে সংকোচ থাকায় এ বিষয়ে লেখার ইচ্ছে পোষণ করি নি। কিন্তু তখন থেকেই ক'জন প্রিয় মানুষ উপর্যুপরি অনুরোধ জানাচ্ছিলেন কিছু লেখার জন্যে। আব্বুও যখন বলছিলেন স্বপ্নরঙ্গিন দিনগুলোকে একটু ধরে রাখার জন্যে, আল্লাহর ওপর ভরসা করে কলম হাতে দিচ্ছি। এটা মক্কায় অবস্থানের দিনগুলো নিয়ে।
দিনক্ষণের হিসেব খুব একটা ভালোভাবে মনে নেই কোনো কোনো ক্ষেত্রে। সফরের প্রেক্ষাপট এর আগে একটি লেখায় লিখেছিলাম। আমরা রমাদানের দ্বাদশ দিনে বাংলাদেশ থেকে রওনা হয়েছিলাম। আমরা ছিলাম পাঁচজন: বড় ফুফু, ছোট আম্মু, আমি, নাশিত ও সামিত। শাহ আমানত বিমান বন্দর থেকে রাত বারোটায় ফ্লাইট। দাদা তখন ন্যাশনাল হসপিটালে ভর্তি ছিলেন। আমরা প্রথমে ওখানে গিয়ে দাদার দু'আ নিয়ে আসলাম।[১]
বিমানবন্দরে এসে পৌঁছলাম রাত দশটায়। লাইনে দাঁড়িয়ে প্রথমে বিমানের টিকেট সংগ্রহ করলাম। এরপর ইমিগ্রেশন। ইমিগ্রেশন অফিসার যথেষ্ট কড়া এবং তার চেহারা গোয়েন্দা-টাইপের। বিমানের কর্মকর্তার কাছে শুনলাম, বাংলাদেশ থেকে একটা উল্লেখযোগ্য-সংখ্যক মানুষ 'উমরাহ ভিসা নিয়ে যান, কিন্তু সময় শেষ হলে আর আসেন না। ওখানে প্রত্যন্ত কোনো অঞ্চলে গিয়ে গোপনে জীবিকা নির্বাহ করেন। এ জন্যে ইমিগ্রেশনে যথেষ্ট কড়াতড়ি লক্ষ্য করলাম 'উমরাহ যাত্রীদের ক্ষেত্রে। ইমিগ্রেশন শেষ করতে করতে সাড়ে এগারোটার কাছাকাছি।
'ইশার সালাত আদায় করে ইহরামের কাপড় পড়ছিলাম। এই অনুভূতিটা একেবারে ভিন্ন। সম্পূর্ণ আলাদা। আমার মতো কাষ্ঠকঠিন হৃদয়ের মানুষও তখন কী জানি ভেবে কেঁদে ফেলেছি। দুই টুকরো সাদা কাপড়ে জড়ানো 'আমি'কে দেখে কেবলই মনে হচ্ছিলো অনন্তের পথে একজন অসহায় যাত্রী ছাড়া আমি আর কিছুই নই! দু রাকাত সালাত আদায় করেই বিমানে উঠে পড়ার ডাক। আমরা আরো অনেক 'বায়তুল্লাহর মুসাফির' দের সাথে আল্লাহর নামে উঠে পড়লাম।
মুখে তখন শুধুই তালবিয়া। আমাদের সিট দুই সারিতে মিলিয়ে। প্রথম সারির দুটিতে আমি আর নাশিত। দ্বিতীয় সারিতে ছোট আম্মু, ফুফু আর সামিত। আমার পাশেই কাকতালীয়ভাবে সহযাত্রী হিসেবে পেলাম পাশের এলাকার পরিচিত একজন আঙ্কেলকে। যেতে যেতে বললাম, 'আমরা কিন্তু হাজ্ব করতে যাচ্ছি!' বড় ফুফু ধরতে পারলেন। বললেন, 'হ্যাঁ, রমাদানে 'উমরাহ করা তো হাজ্ব'র মতোই!' আমি বললাম, 'ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হোল, এই হাদিসের শেষে বলা হয়েছে, রমাদানে 'উমরাহ করা রাসূলুল্লাহ'র [ﷺ] সাথে হাজ্ব করার মতোই!!' ফুফু, ছোট আম্মু সহ পাশের 'উমরাহ যাত্রীদের মুখেও একটা তৃপ্তি ও গর্বের হাসি। আর আমিও হাসিটা উপহার দিতে পেরে আনন্দিত।
সাহরীপর্ব বিমানেই সেরে নিলাম। সৌদি আরবের স্থানীয় সময় ভোর চারটায় আমরা ল্যান্ড করলাম কিং আবদুল আজিজ এয়ারপোর্টে। এখানে ফজরের সালাত আদায় করলাম। এরপর ইমিগ্রেশন শেষ করে এয়ারপোর্ট থেকে বের হতে হতে সূর্য পূর্বাকাশে উঁকি দিচ্ছে। মু'আল্লিমের গাড়ি আমাদের মক্কা আল-মুকাররমার উদ্দেশ্যে নিয়ে চললো। ছোট আবুব, মেজো আবুব, বড় ফুপা আর ছোটাচ্চুর উপর্যুপরি ফোন এদিকে। মক্কায় গিয়ে আমাদের একটি হোটেলে নিয়ে যাওয়া হোল। কথা ছিলো, মক্কায় এসে ছোট আবুব আমাদের রিসিভ করবেন। কোনো কারণে মাদীনাহ থেকে রওনা হতে বিলম্ব হওয়ায় এখানে দেরিতে পৌঁছতে হোল তাকে। তখন বারোটার কাঁটা ছুঁই ছুঁই। আমরা এখান থেকে বায়তুল্লাহর কাছাকাছি আরেকটি হোটেলে চলে এলাম যোহরের আগেই। ততক্ষণে বড় ফুফাও এসে হাজির। মাদীনাহ থেকে মেজো আব্বু, মেজো আম্মুর অনবরত ফোন আর উৎকণ্ঠা। অল্প কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে সবাই মিলে ছুটলাম বায়তুল্লাহর দিকে, উদ্দেশ্য যোহরের জামা'আতে শরিক হওয়া।
সামিতকে আমি কাঁধে তুলে ফেলেছি, আর নাশিতকে বড় ফুফা। ফুফু, ছোট আম্মু আর ছোট আবুব আমাদের পেছন পেছন হাঁটছেন। উচুঁ! এই হাঁটা যেনো শেষ হতে চায় না কোনভাবেই! দীর্ঘ সফরে আমি খুবই ক্লান্তি অনুভব করছিলাম। তার ওপর এই গনগনে রৌদ্রে হাঁটা! তবুও, তবুও... এ যে প্রিয়তম মালিকের ঘরের উদ্দেশ্যে হাঁটা! এ যে আজন্ম লালিত স্বপ্নের বায়তুল্লাহকে দর্শনের জন্যে হাঁটা! এ যে প্রিয়তম প্রভুর সান্নিধ্য লাভের সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে হাঁটা! কিসের ক্লান্তি? কিসের অবসাদ? ভালো লাগা ও ভালোবাসার মিশ্র এক পবিত্র অনুভূতিতে ততক্ষণে চেহারায় জমে ওঠা ঘামের বিন্দুগুলোর সাথে দু ফোঁটা অশ্রু-ও মিশে গেছে।
আমরা হারামের কাছাকাছি পৌঁছুতেই ইক্বামাত শুনতে পেলাম। মাসজিদ আল-হারামের বাইরের অংশে ততক্ষণে সবাই কাতারবন্দী হয়েছেন। আমরাও ওখানে দাঁড়িয়ে গেলাম। আহ! এতো দীর্ঘ সময় নিয়ে রুকু' এবং সাজদা! খুশু' আর খুদ্বু'র অনিবার্য উপস্থিতি সালাতের প্রতিটি পর্বেই! সে আরেক অনন্য অনুভব! এই সালাতের তৃপ্তি আর স্বাদ একেবারে ভিন্ন। আমার এদিকে তর সইছে না একেবারেই। যোহরের সালাত শেষ করে প্রতীক্ষিত বায়তুল্লাহ দর্শনের জন্যে ব্যাকুলতা বেড়ে গেলো। ছোট আবুব আর ফুফাকে অনুসরণ করে আমরা ধীর পদক্ষেপে হাঁটছি। 'বাব ইসমা'ঈল' দিয়ে আমরা প্রবেশ করলাম হারামের অভ্যন্তরে। একটু হেঁটেই ডানে মোড় নিয়ে যেই না ধীরে ধীরে কালো গিলাফের ছবিটা স্পষ্ট হতে শুরু করেছে, আবেগ-উচ্ছ্বাস এবং প্রিয়তম প্রভুর প্রতি বিনয়াবনত কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা হৃদয়ে দোলা দিতে শুরু করলো। আহ! এ আমার প্রিয় বায়তুল্লাহ! এ আমার স্বপ্নের বায়তুল্লাহ! এ আমার চির আকাঙ্ক্ষা ও ভালোবাসার কা'বা!
কা'বার চত্ত্বরে কিছুক্ষণ বসলাম আমরা। মাথার উপর তখন দুপুরের সূর্যের প্রখর তাপ। তবুও রহমতের ঝরনাধারা এখানে অদৃশ্য কোনো প্রশান্তির আবেশে জড়িয়ে নিচ্ছে সব আল্লাহপ্রেমিককেই। এবার তাওয়াফের পালা। ছোট আবুব সামিতকে নিয়ে ছোট আম্মু আর ফুফুর সাথে। আমি নাশিতকে নিয়ে শুরু করলাম। প্রথম চক্করেই তাঁদের চে' আমরা অনেক এগিয়ে গেলাম। দ্বিতীয় চক্করে হারিয়েই ফেললাম। তবে তাওয়াফ শুরুর পূর্বেই ছোট আব্বু বলেছিলেন, শেষ করে কিং সাউদ গেইটে সবাই মিলিত হবো। তাই আমি নাশিতকে সাথে নিয়ে আমার মতোই তাওয়াফে মনোযোগী হলাম। সাদা আর কালো এখানে একাকার। নেককার আর পাপী এখানে একাকার। সব ভাষা, সব জাতি এখানে একাকার। সবার মুখেই এক আল্লাহর প্রশংসা, এক আল্লাহর তালবিয়া, এক আল্লাহর কাছেই হৃদয়ের সব আকুতি। কাতর কণ্ঠে এখানে কতো মানুষকে দেখেছি শ্রাবণের বারিধারার মতো অশ্রু বিসর্জন দিতে। যত পাষাণ হৃদয়-ই হোক, এ দৃশ্য দেখেও তো অন্তত তাঁর চোখ চিকচিক করে ওঠবে।
তাওয়াফের সময় খেয়াল করলাম, পিচ্চি-পাচ্চাদের দেখলে সবাই একটুখানি হেসে হাঁটতে হাঁটতেই হয় গাল টেনে দিচ্ছে, নয় মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। তীব্র গরম থাকায় এখানে তাওয়াফ করতে করতেই অনেকে ঠান্ডা পানি ছিটিয়ে দিচ্ছেন সবার চোখেমুখে অথবা মাথায়। এ রকম একজন গোটা তিনেক আঁজলা পানি নাশিতের মাথায় ঢেলে দিলো। ও কিছু বুঝতে না পেরে ভ্যাঁ করে কেঁদে দিলো। অনেকেই 'টেইক অফ টেইক অফ প্লিজ' বলে অনুচ্চ কণ্ঠে বলতে লাগলেন। আমি পড়ে গেলাম মহাবিপদে। আল্লাহকে ডাকছিলাম আর বলছিলাম, আল্লাহ ওর কান্না থামিয়ে দাও প্লিজ! আলহামদুলিল্লাহ, একটু পরেই ও নিজ থেকেই কান্না থামিয়ে দিলো। অতঃপর দুই ভাই মিলে সাত চক্কর তাওয়াফ শেষ করলাম এবং মাকামে ইবরাহীমের কাছেই দু রাকাত সালাত আদায় করে বাকীদের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম। তাঁদের সময় একটু বেশি-ই লাগলো।
তাওয়াফ শেষ হতে হতে আসরের আযান হয়ে গেলো। আমরা বায়তুল্লাহর একেবারে কাছেই সালাত আদায় করে নিলাম। এরপর কা'বার চত্ত্বরেই সবাই মিলে বসলাম। ছোট আব্বু বললেন, ইফতার ও মাগরিব সেরেই সা'য়ী করবেন। ইফতার পর্যন্ত এখানেই কুরআন তিলাওয়াত করলাম। বায়তুল্লাহর দিকে যতবার মুখ তুলে তাকাই, ততবার চোখটা ভিজে ওঠে। আমি কি যেনো বলতে গিয়ে আর বলতে পারি না। অভিযোগ আর চাওয়ার ঢেউ এসে বুকের ভেতরেই আবার হারিয়ে যায়। বললাম, 'আল্লাহ, হৃদয়ের সবগুলো অব্যক্ত অনুভূতিই তুমি জানো। তুমি আমার কাছ থেকে কবুল করে নাও।' দেশে কতজন যে নাম ধরে দু'আ করতে বলেছিলেন! আল্লাহর রাসূল [] নিজেও 'উমার [রা.]-এর কাছে দু'আ চেয়েছিলেন, যখন তিনি 'উমরাহর জন্যে রওনা হবার প্রাক্কালে রাসূলুল্লাহর অনুমতি নিতে গিয়েছিলেন। [১] আমি একে একে সবার নামই স্মরণ করতে চেষ্টা করলাম। ইফতারের সময় ঘনিয়ে এসেছে। আকণ্ঠ তৃষ্ণা আমার। জমজমের শীতল পানি গলায় পড়তেই শুকনো বুকে এক পশলা প্রশান্তির বৃষ্টি ঝরে গেলো। মাগরিবের সালাত পড়ালেন প্রিয় মানুষ শাইখ আস-সুদাইস। এই অসাধারণ মানুষটির তিলাওয়াত শুনে কতোবার আবেগতাড়িত হয়েছিলাম! আর আজকে সরাসরি তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে, তাঁর কণ্ঠে তিলাওয়াত শুনে বায়তুল্লাহতে সালাত আদায় করছি- এ ভাগ্য ক জনের হয়? আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় হৃদয়-মন বিগলিত হয়ে যায় এমনিতেই।
মাগরিবের পর আমরা সাফা ও মারওয়া সা'য়ী করলাম। সা'য়ী শেষে চুল পুরো ফেলে দেওয়া (হালাক) অথবা কমিয়ে ফেলা (কাসর) – দুটোর একটি করতে হয়। মহিলাদের জন্যে দ্বিতীয়টি। ততক্ষণে ইশার আযান হয়ে গেছে, এ জন্যে আমি আর বাইরে আসতে পারলাম না। ওখানে লক্ষ করলাম, সা'য়ী শেষ করে কিছু মহিলা এক জায়গায় বসে আছেন। তাঁরা ফুফু আর ছোট আম্মুকে ডেকে তাঁদের সাথে থাকা ছোট একটা কাঁচি দিয়ে হিজাবের ভেতরেই একগুচ্ছ চুল কেটে নিয়ে এলেন। আমরা তারাওয়ীহ এবং ওয়িত্র শেষ করে হোটেলে ফিরলাম। রুমে প্রবেশের আগেই আমি পাশের সেলুনে গিয়ে চুল হালাک করলাম। ফুফা আর ছোট আব্বু ফলমূল, দুধ, জুস আর নানা খাবার জমিয়েও ক্ষান্ত হচ্ছেন না। জোর করে খাওয়াবেনই। একটু চোখ খুঁজে আসতেই ঘনিয়ে এলো সাহরীর সময়। আমরা হোটেলে সাহরী সেরে নিলাম।
ফাজরের সালাতে আমি আর ছোট আব্বু শরিক হলাম বায়তুল্লাহতেই। সালাত শেষে আমি কা'বা চত্বরেই রয়ে গেলাম, ছোট আব্বু দুপুরের আগে করে ছোট আম্মু আর ফুফুকে নিয়ে এলেন। ইশা ও তারাওয়ীহ'র পরে তাঁরা চলে গেলেন, আমাকে বহু অনুরোধ করলেন, কিন্তু কোনোভাবেই গেলাম না। কা'বা চত্বরে তখন আস্তে আস্তে ভীড় কমতে শুরু করে। কখন যে এতো বেশি ভালোবেসে ফেলেছি প্রিয় বায়তুল্লাহকে, বুঝতে পারি নি। এখানে আল্লাহর সাথে কথা বলা শেষ করে সাহরীর একটু আগে হোটেলে উপস্থিত হলাম। আবার ভোরেই বায়তুল্লাহ'র দিকে হাঁটা দেওয়া। মোটামুটি মক্কায় অবস্থানের দিনগুলোতে এটাই ছিলো আমার দৈনন্দিন বুটিন। মাঝে একবার ছোট আবুব বললেন মক্কার ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো ঘুরে আসার। আমরা একটি গাড়ি ভাড়া করে সাওর গুহা (যেখানে হিজরতের সময় প্রিয় নবীজি [সা.] ও আবু বাকর [রা.] অবস্থান নিয়েছিলেন), আরাফাত ময়দান, মাসজিদে নামিরাহ, জাবালে রাহমাত, মিনা ও মুজদালিফাহ, হেরা গুহা সহ আরো কিছু জায়গা ঘুরে এলাম।
হেরা গুহায় উঠার অনেক শখ জাগলো আমার, কিন্তু সবাই ভয় দেখালেন এই বলে যে এখানে উঠতে তিন ঘণ্টা লাগবে। কী আশ্চর্য! পাহাড়টা আমার অত বেশি উঁচুও মনে হচ্ছিলো না; তিন ঘণ্টা লাগবে কেনো? মেজো আম্মু আর ছোটাচ্চুও ফোন করে অভয় দিলেন, তুমি পারবা। হোটেলে ফিরেই বায়না ধরলাম, আমাকে যে করেই হোক হেরা গুহায় উঠা চাই। শেষমেশ ফুফা রাজি হলেন। অসুস্থ শরীর নিয়ে ফুফুরও ইচ্ছে হোল আমাদের সাথে শরিক হবার। আমরা তিনজন একটি গাড়ি ভাড়া করে চলে এলাম জাবালুন নূরের পাদদেশে। সময়টা দুপুরের পর। প্রখর রৌদ্র মাথার উপরে। তার ওপর রমাদানের দিন, ক্ষুৎ-পিপাসায় কাতর। ফুফা বললেন, এখানে তিনি বারো বছর থেকেও কোনদিন হেরা গুহায় যাবার সাহস করেন নি। আমাকে শেষবারের মতন ভেবে দেখতে বললেন। আমি নাছোড়বান্দা।
ফুফু-ফুফাকে বিদায় দিয়ে আল্লাহর নামে চড়া শুরু করলাম। মাঝপথে ইয়েমেনের একজন ভাইয়াকে পেলাম। তাঁর সাথে গল্প করতে করতে কতদূর গিয়েছি, এমন সময় হাঁপিয়ে উঠলাম। আধঘণ্টা পার হয়েছে ততক্ষণে, কিন্তু পাহাড়ের চূড়া অনেক দূরে বোঝা যাচ্ছে। কিছুক্ষণ এক জায়গায় বিশ্রাম নিয়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। আমাকেও উঠার জন্যে বললেন, কিন্তু আমার অবস্থা সঙ্গিন। আর পারছিলাম না। উনিও আমাকে ছাড়া যাবেন না। বাধ্য হয়ে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তাঁকে বললাম, আপনি চলুন, আমিও একটু পরে আসছি ইন শা-আল্লাহ। উনি পেছন ফিরে ফিরে হাঁটা শুরু করলেন। আহা, ভ্রাতৃত্ববোধ! মমত্ববোধ! এই অকৃত্রিম ভালোবাসার উৎস কোথায়? এই নিখাদ-নিঃস্বার্থ আন্তরিকতার শেকড় কোন্ গভীরে প্রোথিত, মানুষ তুমি জানো? জানার চেষ্টা করো?
আর কিছুক্ষণের মধ্যে দেখলাম আরেকজন ভাইয়া আসছেন। কাঁধে ট্রাভেলার ব্যাগ। বেশ সুঠাম দেহ। এসেই আমার পাশে বসলেন। পরিচয় পর্ব সেরে নিলাম। উনি পাঞ্জাব থেকে এসেছেন। আরবি ও ইংরেজি দুটোই ভালো পারেন। ব্যাগ থেকে একে একে তিন বোতল পানি বের করে আমার মাথা ভেজালেন, অযু করালেন, তারপর আবার মাথায় পানি ঢেলে নিজেও এক বোতল মাথায় ঢাললেন। তারপর আমার হাতে আরো দুই বোতল পানি ধরিয়ে দিলেন এবং আমাকে সাথে নিয়ে হাঁটা শুরু করলেন। ব্যাগে অন্তত আরো ছয়-সাত বোতল পানি আছে তাঁর, বোঝা যাচ্ছে। আমি হাঁটতে হাঁটতে তাঁর জন্যে সেই দু'আটি করলাম, যেই দু'আ আল-মুবাররাদ: برد الله من بردني
বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ এবং আন্তরিক আচরণ তাঁর। নানা গল্প করতে করতে দু জন মিলে প্রায় কাছাকাছি চলে আসলাম। ততক্ষণে এক ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। আবার খানিক জিরিয়ে নিয়ে আমরা শুরু করলাম। পথে কিছু বানরের দেখা পেলাম, ওদেরকে একটা বোতল ছুঁড়ে দিতেই মহা আনন্দে পানি খেতে লাগলো আর আমাদের পথ ছেড়ে দিলো। আল্লাহর সৃষ্টিবৈচিত্র্যের নিদর্শন এই বানরগুলো। তরুপল্লবহীন পাথুরে পাহাড়গুলোতে কী নিশ্চিন্তে দিনাতিপাত করে যাচ্ছে তারা! দু জনে ক্লান্তি ভুলতে কথার তুবড়ি ছুটিয়ে চলছি। কথা প্রসঙ্গে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন রাসূলুল্লাহ [☁] মানুষ কি-না। আমি তাঁকে একটি আরবি কবিতার শ্লোক শুনিয়ে দিলাম:
محمد بشر وليس كالبشر * بل هو ياقوط والناس كالحجر
[মুহাম্মাদ [☁] মানুষ ছিলেন, কিন্তু যেনতেন মানুষ নন। বরং (এটার উদাহরণ হোল,) মানুষেরা সবাই পাথর, কিন্তু তিনি ছিলেন পরশ পাথর!]
তাঁর বেশ পছন্দ হোল কবিতাটা। আরো কয়েকবার বলতে বললেন, যেন মুখস্থ হয়ে যায়। এক ঘণ্টা পঁচিশ মিনিটের মাথায় আমরা চূড়ায় এসে পৌঁছলাম। ভাবতে অবাক লাগছিলো, ওয়াহি নাযিলের আগে রাসূলুল্লাহ [☁] যখন এখানে অবস্থান করতেন, তখন খাদীযাহ [রা.] নিয়মিত-ই এই সুদীর্ঘ ঢালু পাহাড়ী পথ বেয়ে উঠতেন-নামতেন এবং রাসূলুল্লাহর [☁] জন্যে খাবার নিয়ে যেতেন। একজন নারী কতটুকু অকৃত্রিম ভালোবাসা অন্তরে লালন করলে এই ক্লেশাবহ পরিশ্রমের অগ্নিমুখে স্বচ্ছন্দ আনন্দের গোলাপ ফোটাতে পারেন, ভাবা যায়?
এসব ভাবতে ভাবতে চূড়ায় উঠতে পারার সগৌরব হাসি অস্তিত্বের জানান দিতে শুরু করেছে আমার ঘর্মাক্ত মুখাবয়বে। আলহামদুলিল্লাহ! এমন আনন্দ আর সাফল্যের গর্ব ইতোপূর্বে কখনোই অনুভূত হয় নি! হাজ্ব বা 'উমরাহর সাথে এর কোন সম্পৃক্ততা নেই, কিংবা এখানে এলে বিশেষ কোনো পুণ্যলাভের কথা-ও কুরআন বা সুন্নাহতে নেই। কিন্তু প্রিয় নবীজির [] প্রতি ভালোবাসা আর প্রথম ওয়াহি অবতীর্ণ হবার স্থানটুকু এক নজরে দেখার ঔৎসুক্য থেকে এখানে অনেকে প্রচন্ড কষ্ট স্বীকার করেও চলে আসেন। দু জন মিলে চূড়ায় উঠে খোঁজাখুঁজি শুরু করলাম। কিন্তু কোথায় সেই গুহা? ইতিউতি তাকাতে একজন বৃদ্ধ আসলেন। চূড়ায় ছোট্ট একটা বিশ্রামাগার আর কুলিং কর্নারের মত করে একটা দোকান দিয়েছেন দু জনে মিলে। তিনি জানালেন, অন্য পাশ দিয়ে আরেকটু নিচে নামতে হবে। পথটা নিজেই দেখিয়ে দিলেন। আমরা আরেকটু নেমে অবশেষে গুহায় এসে পৌঁছলাম।
এই সেই স্থান, যেখানে কুরআনের প্রথম বাণী নাযিল হয়েছিলো! এই সেই গুহা, যেখানে প্রিয় নবীজির [ ﷺ ] সময় কাটতো! আমি সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে এখন! সুবহানাল্লাহ! ততক্ষণে আসরের আযান হয়েছে। ভাইয়া আর আমি মিলে গুহার অভ্যন্তরেই আসরের সালাত জামা'আতে আদায় করলাম। আমাদের সাথে একজন ইন্দোনেশিয়ান তরুণ-ও যোগ দিলেন। আমরা আর কিছুক্ষণ বসে নেমে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছি, এমন সময় ফুফা ফোন দিয়ে বললেন, 'আমিও অর্ধেক চলে এসেছি! তুমি নেমো না।' বাব্বাহ! এতো ভীরু মানুষ হঠাৎ এমন সাহসী হলেন কিভাবে! যাই হোক, আমি কিছুদূর নামলাম তাঁকে স্বাগত জানাতে। আধঘণ্টার ব্যবধানে দু জনে একত্রিত হলাম। ততক্ষণে ফুফা হাঁপিয়ে উঠেছেন! দু জনে মিলে আবার উঠা শুরু। আমার যে কী অবস্থা তখন চলে যাচ্ছে, নিজেও টের পাই নি। ফুফা নিজ থেকেই বলছেন, 'ভাবলাম এই বয়সে আমাদের আব্বটা আব্বুটা সাহস করে উঠে গেলো! আমি অভাগা ক্যান পারবো না?'
আমরা নামতে নামতে সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়েছে। দ্রুত গাড়ি নিয়ে সোজা চলে এলাম বায়তুল্লাহতেই। এখানে ইফতার, মাগরিব, ইশা ও তারাওয়ীহ সেরে হোটেলে চলে এলাম।
মক্কায় অবস্থানের মেয়াদ শেষ হয়ে এলো আমাদের। এখানের শেষ তারাওয়ীহর তিলাওয়াতগুলো বড়ো বেশি মায়াবী মনে হচ্ছিলো। বারবার আবেগসিক্ত বিরহ-ব্যথায় কাতর হয়ে পড়ছিলাম। আহ! আবার কখন কুরআনের যাদুকরী এই সুর-লহরী, এই অপূর্ব ব্যঞ্জনাময় তিলাওয়াত উপভোগ করে করে প্রিয় বায়তুল্লাহকে সামনে রেখে প্রিয়তম মালিকের প্রতি সিজদাবনত হতে পারবো? ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু গন্ডদেশ বেয়ে পড়ে কাবার চত্বরে মিশে যাবার দৃশ্য দেখার এ অপার্থিব আনন্দ আর সুখানুভূতি থেকে তবে কি আমি বঞ্চতি হতে চলছি?
টিকাঃ
১ দাদার দ্বিতীয়বার আল্লাহর ঘরে যাওয়ার স্বপ্ন আর পূরণ হোল না, পরের বছর চলে গেছেন আল্লাহর কাছেই। আল্লাহ আমার দাদাকে রহম করুন, ক্ষমা করুন, জান্নাতের মেহমান বানিয়ে সম্মানিত করুন।
১ সহীহ আল-বুখারী: ১৭৩০
১ 'উমার [রা.] থেকে বর্ণিত। তিনি যখন 'উমরাহর ব্যাপারে রাসূলুল্লাহর [] অনুমতি নিতে গিয়েছিলেন, তখন রাসূলুল্লাহ [] বললেন: أي أخي أشركنا في دعائك ولا تنسنا "আমার ভাই! তোমার দু'আয় আমাদেরকে শরিক করবে, আমাদের কথা ভুলবে না।” [সুনান আত-তিরমিযী: ৩৫৬২[ هذا حديث حسن صحيح