📘 শেষরাত্রির গল্পগুলো > 📄 আত্মকথন

📄 আত্মকথন


ব্যালকনিতে বসে আছি। আজকের সকালটা বুঝি একটু বেশিই সতেজ। কিছুটা হিম হিম ভাব, তার সাথে মৃদুমন্দ বাতাস, ডানদিকে আমগাছটাতে কয়েকটা চড়ুই'র কিচিরমিচর, সব মিলিয়ে বেশ ফুরফুরে অনুভব। আমি কুরআন পড়ছিলাম। সূরা কাহফ।

আম্মু আমার বুকশেলফ গুছিয়ে দিতে দিতে বলছিলেন, 'আরবি কবিতার বইগুলো বোধহয় অনেকদিন ধরো নি। এই তাকটা খুব পরিপাটি দেখা যাচ্ছে।' অনেক দিন যে ধরি নি, তা না, তবে একটা বিরতি কিন্তু দিয়েছি ঠিকই। আজকের 'টু-বি রেড লিস্টে' কোনো কবিতার বই ছিলো না আমার। তবু আম্মুর কথাটা মনে ধরলো, কুরআন পড়া শেষ করে 'উলয়া বিনত আল-মাহদী'র 'দীওয়ান' (কাব্যসঙ্কলন) হাতে নিলাম। তাঁর কবিতায় চোখ বুলাচ্ছি এই প্রথমবারের মতো। তাঁর একটি বিশেষ পরিচয়, তিনি আব্বাসীয় খলিফা আল-মাহদী'র কন্যা এবং হারুন-আর-রাশীদ-এর বোন। চমৎকার সব কবিতা! এতদিন কেন মনোযোগ দিলাম না, নিজেকে খুব বোকা মনে হোল। আব্বাসী যুগের প্রচলিত সাহিত্যধারার সাথে বিশাল একটা পার্থক্য আছে তাঁর কবিতায়! প্রতিপক্ষের নিন্দা-কুৎসা রটনা, বংশীয় অহঙ্কার ও কীর্তিগাঁথা রচনা, রাজস্তুতি ও স্তাবক-বন্দনা – এই ধারা থেকে তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত তো বটেই, আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সরল কাব্যিক রেখাতেও তিনি অবস্থান করেন নি, বোধের বাঁশিটা বাজিয়েছেন একেবারে স্বতন্ত্র অনুভূতির বটবৃক্ষের ছায়ায়। এই যেমন:

القلب مشتاق إلى ريب * يا رب ما هذا من العيب
قد تيمت قلبي فلم أستطع * إلا البكا يا عالم الغيب

আমি কাব্যানুবাদের চেষ্টা করেছি [মাত্রাবৃত্ত ছন্দে]:

আমার হৃদয় সন্দেহ আর সংশয়ে পড়ে যায় প্রভু!
এ কেমন বিব্রতকর দুঃসহ অনুভব!
আমার মনটা ওদিকেই ঝুঁকে যেতে যখনই চায়,
কান্না ছাড়া তো আমার কিচ্ছু করার থাকে না, রব!

কী সাংঘাতিক! আমি কবিতাটা পড়ছিলাম, মনে মনে কাব্যানুবাদ সাজাচ্ছিলাম, আর অবচেতনেই বিড়বিড় করে বলছিলাম, 'বোন রে! আমার কথাগুলো আপনি এত্ত আগেই বলে ফেললেন ক্যামনে!'
সংশয়ের আবর্তে ঘূর্ণায়মান মুসলিম তরুণদের অভিব্যক্তি গড়ের ওপর এমনই তো বোধহয়! এ নিয়ে আমার দর্শন আরও মজবুত হোল এই কবিতাটা থেকে। শাইত্বান যখন বিশ্বাসের সফেদ চাদরে দাগ ফেলতে চায়, তখন আল্লাহর কাছেই আমাদের অসহায়ত্বের স্বীকৃতি আর আশ্রয় প্রার্থনার বিনীত আকুতি পেশ করে অশ্রু নিবেদন করাটাই প্রশান্তির শেষ নিয়ামক। আল্লাহও তা-ই শিখিয়ে দিয়েছেন আল-কুরআনে:

رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ
"আমাদের রব্ব! আমাদেরকে পথ দেখানোর পর তুমি আমাদের হৃদয়গুলোকে পুনরায় বক্র করে দিও না! আর তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্যে রহমত দান করো। তুমি তো উদার-মহান দাতা!!"
'উলয়ার কবিতায় বিরতি দিলাম, কেনো জানি মনে হোল, এক বসাতেই সম্পূর্ণ ভালো লাগা শেষ করা ঠিক হবে না! সময়ে সময়ে প্রয়োজনানুসারে ভালো লাগাটাকে একদম নবীনতম অনুভূতির জালে ধরার লোভ থেকে আরেকটা বই ধরলাম।

'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারাক [রা.]-এর 'দীওয়ান' বেশ অনেকবার পড়েছি। কিন্তু অন্য আরো কিছু বইয়ের মতো এই বইটাও আমার কাছে বারবার পড়ার পরেও মনে হয় নতুন কিছু। আজকে একটা পঙক্তি খুব ভাবালো:

أرى أناسا بأدنى الدين قد قنعوا * ولا أراهم رضوا في العيش بالدون (১)

ষান্মাত্রিক মাত্রাবৃত্ত ছন্দে এটারও একটা কাব্যানুবাদ দাঁড়িয়ে গেলো মনে মনেই:

অনেককে দেখি দ্বীনের অল্প পালন করেই তুষ্ট রয়,
দুনিয়ার ভাগে অল্প পড়লে তারা-ই আবার রুষ্ট হয়!

আসলেই তো! দ্বীন পালনের ক্ষেত্রে আমাদের অমনোযোগিতা ও অবহেলা কিন্তু একটুও ভাবায় না আমাদেরকে। অবলীলায় এবং খুব স্বাভাবিক ভাবেই দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা ও আবেগ-অনুরাগের পরিচর্যা কমিয়ে দিচ্ছি আমরা। এই অবহেলা এবং ছাড় দেওয়ার মনোবৃত্তি কিন্তু বৈষয়িক কোনো ব্যাপারে সেভাবে ঘটে না! একেবারে ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনের জন্যে সঞ্চয় ও অর্জনে সামান্যতম ত্রুটিটুকুও পরাহত করতে আমরা যতটা সচেতন, চিরস্থায়ী ও চূড়ান্ত জীবনের জন্যে কিছু পাথেয় কুড়িয়ে নেওয়ার জন্যে আমরা কি ততটুকু সচেতন?

আমি নিজেকে প্রশ্ন করে যাচ্ছি...

আল্লাহ রহম করুন সেই আলোকিত কবিদের; যাঁরা আমাদের বিশ্বাস ও বিশুদ্ধ অনুভূতিগুলোকে সতেজ ও সজীব রাখার উপাদান রেখে গেছেন, যাঁরা আমাদেরকে নশ্বর পিছুটানের মরীচিকা ভুলে অবিনশ্বর স্বপ্নপুরীর জন্যে তৈরি হবার প্রণোদনা যোগান প্রতিনিয়তই।

ঠিক সে সময় আল-কুরআনের সেই আয়াত দুটো যেনো তীর হয়ে এসে বিঁধে গেলো বোধিবক্ষে:

بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَى
"বরং তোমরা পার্থিব জীবনকেই বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছো। অথচ আখিরাতের জীবন হোল উত্তম এবং স্থায়ী!!"

টিকাঃ
১ সূরা আলে 'ইমরান ৩:৮
১ দীওয়ান ইবনুল মুবারাক, পৃ. ৪৮
২ সূরা আল-আ'লা ৮৭:১৬, ১৭

📘 শেষরাত্রির গল্পগুলো > 📄 তিনটি ব্যামো: ত্রিফলা প্রতিষেধক

📄 তিনটি ব্যামো: ত্রিফলা প্রতিষেধক


ত্বালিবুল 'ইলম তথা 'Students of Knowledge' যাঁরা, তাঁরা সচরাচর যে তিনটি সমস্যার মুখোমুখি হন, সে সম্পর্কিত তিনটি কবিতা আমরা এখানে কাব্যানুবাদ করবো, বিইজনিল্লাহ। শেষ দুটোতে আক্ষরিক অনুবাদের বৃত্তে কেন্দ্রবিন্দু ঠিক রেখে ব্যাসার্ধ কিছুটা বাড়াতে হয়েছে, পাঠকের সহজাত বোধগম্যতার বৃত্তকে শিল্পিত করার জন্যে। তিনটি কবিতা-ই মাত্রাবৃত্ত ছন্দে অনূদিত।

(১) আমার স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে
এই একই সমস্যার ব্যাপারে ইমাম আশ-শাফি'ঈ [রা.] তাঁর উস্তায ওয়াকী'র কাছে প্রশ্ন করেছিলেন। তিনি যে সমাধান দিয়েছেন, সেটা কবিতা আকারেই বর্ণনা করছেন।[১]

شكوت إلى وكيع سوء حفظي
فأرشدني إلى ترك المعاصي
وأخبرني بأن العلم نور
ونور الله لا يهدى لعاص

"প্রিয় উস্তায ওয়াকী'র কাছে করলাম অভিযোগ-
আমার স্মরণশক্তি কমেছে, কিভাবে সারবে এ রোগ?
তিনি বললেন, 'তুমি পাপ ছাড়ো'
এরপর তিনি বললেন আরো-
বৎস! 'ইলম হলো এক 'নূর' আল্লাহ তা'আলার!
পাপীদের দেয়া হয় না কখনো এই নূর উপহার!”

(২) আলসেমি কাটিয়ে উঠতে পারি না
'ইলম অর্জনের পথে অলসতা মারাত্মক একটি বিষফোঁড়া। ছাত্রজীবনে এটার 'ইনফেকশন' একটু বেশিই ভয়াবহ হয়ে থাকে।

একজন ছাত্রের সুফলা স্বপ্নের মাঠে অহেতুক অলসতা একদম পাকা ধানে মই দেয়ার মতো। অথবা বাড়া ভাতে ছাই দেয়ার মতো। নানা সময় নানা অজুহাত দাঁড় করানো আলস্যের প্রাণ।

ইমাম আয-যাহাবী এ সংক্রান্ত সুন্দর একটি কবিতা নিয়ে এসেছেনা। :

إذا كنت تؤذى بحر المصيف
ويبس الخريف وبرد الشتا ؟
ويلهيك حسن زمان الربيع
فأخذك للعلم قل لي متى؟

“এসেছে গ্রীম; তুমি বলো, 'আহ! খরতাপে পুড়ে যাই!
এমন গরমে কিভাবে পড়ার ফুরসত বলো পাই?'
শীত ঋতু এলে বলো, 'আহা এই হিম শীতলের মাসে,
কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে কি পড়ার চিন্তা মাথায় আসে?'
শরৎ ঋতুর উদাসী পরশে তুমি হও ভুলোমনা,
পড়ার টেবিলে আনমনা হয়ে করে যাও কল্পনা।
বসন্ত এলো, বেশ! চারিদিকে রূপের মাধুরী দেখে-
প্রকৃতির প্রেমে পড়ে যাও তুমি পড়াশোনা সব রেখে।
এভাবেই যদি বন্ধু তোমার সারাটি বছর কাটে;
বলো তো তাহলে জ্ঞান আহরণে বসবে কখন পাঠে?”

(৩) পড়ার সময় নোট করার অভ্যাস না থাকা
কোনো গ্রন্থ অধ্যয়নের পরে, কোন জ্ঞানীর সংস্পর্শে নতুন কিছু জানার পরে, অথবা সহসা কোনো ভাবনার উন্মেষ নিজের ভেতরে অনুভূত হলে, আমাদের উচিৎ সেটা তখনই নোট করে নেয়া। নোট করার অভ্যাস না থাকলে অনেক জ্ঞাত ও সহজাত বিষয়ও আমাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। ইবনু 'উজাইবাহ তাঁর তাফসীরগ্রন্থে এরকম একটি কবিতা বর্ণনা করেছেন। কোনো বিষয়ে জানার পরে নোট করে নেয়া যে কত বেশি প্রয়োজন, এটা কবিতার প্রতিপাদ্য।

العلم صيد والكتابة قيده
قيد صيودك بالحبال الواثقة
فمن الحماقة أن تصيد غزالة
وتتركها بين الخلائق طالقة

“ধরো কোন এক শিকারী শিকার করতে গিয়েছে বনে
একটা হরিণ শিকার করলো অতীব সংগোপনে
শিকারী ভাবলো, পেয়েছি এবার পালায় কিভাবে দেখি!
এদিকে সুযোগে পালালো হরিণ; শিকারী অবাক, 'এ কি'!
অথচ শিকারী শিকার পেয়েই ভালো করে যদি বাঁধে-
অনেক আশার হরিণটা তার পালাতো কি আর সাধে?
তুমিও তেমনি জ্ঞানের শিকারী, জ্ঞানকে শিকার করে
লেখার বাঁধনে আটকিয়ে নাও মনের খাঁচায় ভরে
অন্যথা সেই জানা জিনিসটা পালিয়েই যদি যায়
শিকারীর মতো তুমিও করবে বৃথা শুধু হায় হায়!”

টিকাঃ
১. দীওয়ান শাফি'ঈ, পৃ. ৮
১ সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা, খ. ১৭ পৃ. ১০৬
১ আল-বাহর আল-মাদীদ, খ. ১ পৃ. ৩৬৯

📘 শেষরাত্রির গল্পগুলো > 📄 তিনি এক মজার শিক্ষক

📄 তিনি এক মজার শিক্ষক


প্রিয় নবীজি [] কেবল মজার মানুষই ছিলেন না, ছিলেন একজন সূক্ষ্ণ মনস্তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষক এবং দক্ষ শিক্ষক-ও! তাঁর অভিনব শিক্ষণ-পদ্ধতির একটি গল্প আমরা অনুবাদ করবো, আত-তাফসীর আত-তাবারী থেকে।[১] গল্পটি শোনার আগে আমাদের একটু জেনে রাখা প্রয়োজন, এটি কোন্ আয়াতের প্রেক্ষাপটে এসেছে। আয়াতটি হচ্ছে:

حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَى
"তোমরা সালাতসমূহের ব্যাপারে মনোযোগী হও, মধ্যবর্তী সালাতের ব্যাপারেও। [২]"

এখানে 'মধ্যবর্তী সালাত' (الصَّلَاةِ الْوُسْطَى) বলতে আল্লাহ কী বুঝিয়েছেন, সে ব্যাপারে বিভিন্ন মতামত আছে। তবে রাসূলুল্লাহর [] হাদিস এবং ইবন 'আব্বাস, 'আয়িশা, 'আলী ইবন আবি তালিব, আবূ হুরায়রা [রা.] প্রমুখ সাহাবীর বক্তব্যের ভিত্তিতে অধিকাংশ মুফাসসির মত দিয়েছেন যে, এখানে আসরের সালাতের কথা বলা হয়েছে। সাধারণ বোধ-বুদ্ধিতেও তা-ই মনে হয়। পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের মধ্যে আসরের অবস্থান একেবারে মাঝামাঝি।

এবার সরাসরি গল্পে চলে যাই। একজন সাহাবী[১] বলছেন:

আমি তখন ছোট কিশোর। আবূ বাকর ও 'উমার [রা.] আমাকে রাসূলুল্লাহ'র [] কাছে পাঠালেন 'মধ্যবর্তী সালাত' সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে।

অতঃপর নবীজি [] আমার কনিষ্ঠা আঙ্গুলটি ধরে বললেন: 'এটা হোল ফাজর'।

এরপর ঠিক তার পাশের আঙ্গুল ধরে বললেন: 'এটা হোল যোহর'।

এবার ধরলেন বৃদ্ধা আঙ্গুল, বললেন: 'এটা হোল মাগরিব'।

তারপর ঠিক তার পাশের আঙ্গুল ধরে বললেন: 'এটা হোল 'ইশা'!

এবার রাসূলুল্লাহ [] আমাকে বললেন: 'বল তো, তোমার কোন্ আঙ্গুলটা বাকী আছে?'

আমি বললাম: 'মধ্যমা আঙ্গুল'।

তারপর জিজ্ঞেস করলেন: 'বল তো, কোন্ সালাতটা বলা বাকী আছে?'

আমি বললাম: 'আসর'।

নবীজি [] বললেন: 'ঐ তো! ওটাই আসর!”

শিশুদের মন নিয়ে খেলা করার গুণটা আসলেই অনন্য! দেখুন, প্রিয় নবীজি [] এমনভাবে শিশুটিকে বোঝাচ্ছেন, যাতে তার হৃদয়ে উদ্দীষ্ট বিষয়টা একেবারে গেঁথে যায়। একটি বাক্যে বা কথায় 'আসর সালাত' বলে না দিয়ে আঙ্গুল ধরে ধরে বোঝালেন, আর শিশুটাও খুব চমৎকারভাবে এবং আনন্দের সাথে বুঝে নিতে পারলো। আরেকটা বিষয় লক্ষণীয়, তাঁর পাঠনের ধারাবাহিকতাও এমনভাবে গোছানো, যাতে শিশুটি নিজেই উত্তর বের করে আনতে পারে!

টিকাঃ
১ আত-তাফসীর আত-তাবারী, খ. ৫ পৃ. ১৯৬
২ সূরা আল-বাক্বারাহ ২:২৩৮
৩ তাফসীর তানতাওয়ী, খ. ১ পৃ. ৪৩৬
১ তাফসীরে নির্দিষ্ট কোনো নাম উল্লেখ করা হয় নি।

📘 শেষরাত্রির গল্পগুলো > 📄 একটি স্বপ্নের বেড়ে ওঠার গল্প

📄 একটি স্বপ্নের বেড়ে ওঠার গল্প


দু হাজার দশ সালের কোনো এক শুভদিনে অনলাইনে পরিচিত হয়েছিলাম প্রিয় মানুষ, প্রিয় শিল্পী মারুফ আল্লাম ভাইয়ার সাথে। আমি তখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। তখন বিভিন্ন অনলাইন ম্যাগাজিনের বেশ সমাদর ছিলো। আমার কাঁচা হাতের কিছু লেখা প্রকাশিত হয়েছিলো সেসব ম্যাগাজিনে। ভাইয়াও ওখানে লিখতেন নিয়মিত। আমার পঁচা সব লেখা সত্ত্বেও যে ক জন বিশাল হৃদয়ের মানুষ৷৷ উৎসাহ
"কাফনের কাপড়টাকে গায়ে জড়াবার আগে
ইহরাম গায়ে বাঁধার সুযোগ করে দিও
মরণের আগে একবার কাবার ধারে নিও...
বেশি কিছু চাই নি আমি, চেয়েছি কাবার ধারে
ঝরাব নয়ন-গলা পানি
মনের ধারে যুগে যুগে জমে থাকা পাপের সারি,
মুছে নেবো মনের যত গ্লানি..."

আমি নিজেও জানি না, কিভাবে সারাদিন এই গান মুখে লেগে থাকতো আমার।
আল্লাহর-ই ইচ্ছা, গানটা গাইতে গিয়েই সাধ ও স্বপ্নের সবগুলো রেখা আস্তে আস্তে সেই পবিত্র ভূমির কেন্দ্রবিন্দুতে গিয়ে মিলে যেতো! প্রিয়নবীজির [৪] প্রতি নিদারুণ ভালোবাসা তো আজন্ম লালন করে এসেছি, এবার সেই প্রেম-বৃক্ষটা ফুলে-ফলে আরো বেশি সতেজ-সজীব হতে শুরু করে। হাঁটতে-চলতে, ঘুরতে-ফিরতে আর উঠতে-বসতে কেবলই বায়তুল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ঝরাবার স্বপ্ন, প্রিয় নবীজিকে [] সব আবেগ-উচ্ছ্বাস মিশিয়ে একটি সালাম প্রদানের তীব্র আকাঙ্ক্ষা! সবুজ গম্বুজের পাশে দাঁড়িয়ে হৃদয়াবেগ উজাড় করে একটি কবিতা নিবেদনের অদম্য বাসনা! বদর আর উহুদের প্রান্তরে দাঁড়িয়ে বুক ভরে একটি তাকবীর ধ্বনি তোলার জন্যে আকুলতা! জাবালে নূরের সুউচ্চ শিখরে, হেরা গুহার সম্মুখে ইতিহাস রোমন্থন করতে করতে বিড়বিড় করে 'ইক্করা বিসমি রব্বিকাল্লাযী খালাক্ক' পড়ার ব্যাকুল অভিলাষ!

অবাক কান্ড, আমি আমার নিত্যদিনের দু'আয় কেবল এই গান গেয়েছি নীরবে। রাত্রির নিঝুম নিস্তব্ধতায় একা একা গেয়েছি আর অশ্রু ঝরিয়েছি অনুপম ভালো লাগায়।

দাদা-দাদুর মুখে গল্প শুনে শুনেই আশৈশব আমার চোখে ঘুম এসেছে। হাজ্ব থেকে ফিরে তাঁরা যখন প্রতিনিয়ত তাঁদের সফরের অভিজ্ঞতার কথাগুলো বলতেন, কেমন তন্ময় হয়ে শুনতাম। বায়তুল্লাহ যিয়ারাতের স্বপ্নফুল ওভাবেই পাঁপড়ি মেলতে শুরু করেছিলো। তারপর শুনলাম আব্বুর মুখে। প্রেমজ্বরে আক্রান্ত হলাম দারুণভাবে। স্বপ্নের থার্মোমিটারে ব্যাকুলতার পারদ খুব অস্থিরভাবে উঠানামা শুরু করেছিলো তখনই।
অষ্টম শ্রেণির শেষদিকে আব্বুর কাছ থেকে উপহার পেলাম (আব্বুও তাঁর এক ছাত্র থেকে উপহার পেয়েছেন) আবু তাহের মেসবাহ রচিত 'বায়তুল্লাহর মুসাফির'। আমার জীবনে পড়া সেরা বইগুলোর একটি। লেখকের আবেগ-অনুভূতির শতভাগ-ই পাঠকের শিরা-উপশিরায় সঞ্চারিত হতে পারে, এই সত্যটা আমি প্রথম আবিষ্কার করেছি 'বায়তুল্লাহর মুসাফির' পড়ে। এই বই আমার তৃষ্ণাকে আরো বহুগুণ বাড়িয়ে দিলো।


নবম শ্রেণিতে চলে এলাম ঢাকা। ভাইয়াকে সরাসরি দেখার সুযোগ হয়েছে ক্যাম্পাসে আয়োজিত 'নাতে রাসূল সন্ধ্যা'য়। আমার মুখে তখনো সেই গান কোনোভাবেই বিশ্রাম নিতে রাজি হয় নি। সবটুকু আবেগ আর অনুরাগ মিশিয়ে কাতর কণ্ঠে প্রিয়তম মালিককে বারবার হৃদয়ের আকুতি জানিয়েছি এই গান গেয়েই। আমি তখনো জানতাম না, আল্লাহ কতো তাড়াতাড়ি অধমের দু'আয় সাড়া দিচ্ছেন।

পরের বছর, যখন দশম শ্রেণিতে পড়ি, দাদা-দাদুর 'উমরাহ-তে যাবার কথা। দুজনে এর আগে হাজ্ব পালন করে এসেছেন। তবে এবারের উদ্যোগটা মেজো আব্বু এবং মেজো আম্মুর নেয়া। একজন অনেকদিন 'বাবা-মা'কে দেখেন না, আরেকজন 'মিস করেন' শ্বশুর-শাশুড়ী-কে। প্রবাস জীবনে বড়ো হওয়া আমাদের দুই ভাই-বোনও এখনো তাদের দাদা-দাদুকে দেখে নি। তাঁদের সঙ্গে প্রথম বায়তুল্লাহ যিয়ারতে যাচ্ছেন ছোট আম্মু, দুই পিচ্চি সহ। বাড়ির এই বিশাল একটি অংশের এমন সৌভাগ্যের খবরে আমি খুবই বিষণ্ণ হয়ে পড়লাম। আহা, আমিও যদি তাঁদের সাথী হতে পারতাম! বিষণ্ণতার প্রহরগুলো একেবারেই কাটছিলো না তখন। আল্লাহর হয়তো ভিন্ন পরিকল্পনা ছিলো, সে বছর তাঁরা কী যেন জটিলতায় ভিসা পান নি।

একদিন উদাসী বিকেলে লাইব্রেরিতে গন্তব্যহীন পড়াশোনায় মগ্ন ছিলাম। কিছুক্ষণ এই বই নেই, কিছুক্ষণ ওই বই। কোনোটাতেই স্থিরতা আসে না। সেলফে হঠাৎ একটা বইয়ের নামে চোখ আটকে গেলো: 'সৌরভের কাছে পরাজিত'। বের করে আনলাম। ছোটগল্পের বই। লেখক আল মাহমুদ। আল মাহমুদের কোনো গদ্য ইতোপূর্বে আমি পড়ি নি। 'সৌরভের কাছে পরাজিত' গল্পগ্রন্থ দিয়েই মূলত আবিষ্কার করেছিলাম, আল মাহমুদ গদ্য ও পদ্য দুদিকেই অনবদ্য। এই গল্পগ্রন্থের একটা গল্প আমাকে কাঁদিয়েছিলো। একটা গল্প আমি কদিন পরপর পড়তাম আর চোখ আর্দ্র করে আনতাম। গল্পের নাম 'একটি চুম্বনের জন্যে প্রার্থনা'। হাজের সময় হাজরে আসওয়াদ চুম্বনের রুদ্ধশ্বাস স্মৃতিকথাকে কী অনন্য শৈল্পিকতার ঠাসবুননে নির্মাণ করেছেন কবি! আমার উতরোল সিন্ধুতে জলোচ্ছ্বাস এনে দিলো সেই গল্পটা। সেই জলোচ্ছ্বাসে আমার সব বৈষয়িক সাধ-অভিলাষ ভেসে গেলো নিমেষেই।

গ্রীমের ছুটিতে গেলাম বাড়িতে। মাহমুদ স্যার তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে কক্সবাজার ট্যুরে যাবেন। খুব ইচ্ছে হোল আমাকেও সাথে নেবেন। নাহ! আমি তো কোনোভাবেই রাজি হই না। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি, আল্লাহর ঘর দেখার আগে ট্যুর-ফ্যুর সব বাদ। স্যার যথারীতি মান-অভিমানের দোলাচলে দুলতে শুরু করলেন। আমিও নির্বিকার। তবে আব্বর প্রচেষ্টায় তাঁর অভিমান ভাঙাতে পেরেছি শেষমেশ।

খ.
পুকুরের পূর্বপাড়টিতে যেখানে খড়ের স্তূপ, গাছ-গাছালির নিবিড় ছায়াঘেরা স্থানটি, গ্রীমের সময়টাতে ওখানে পেয়ারা গাছের নিচে দাদু সুযোগ হলেই চাটাই বিছিয়ে কুরআন পাঠ করতে বসেন। ঝিরিঝিরি বাতাসে গা এলিয়ে দাদুর পাশে বসে গল্প করতে বসে যেতাম আমিও।

ঢাকায় আসার পর আমার সেই সোনালী বিকেলগুলো খুব 'মিস' করেছি। এবার তাই দাদুকে একটু বেশি সময় দিতে টান অনুভব করলাম। এবার অবশ্য আমার ভালোবাসায় ভাগ বসানোর জন্যে নাতি-নাতনিদের সংখ্যা বেড়েছে। দাদী-নাতির গল্প বেশ জমেছে তখন। দাদাভাইও আছেন সাথে, একটা মোড়ায় বসে চিরাচরিত অভ্যাস মতো খুব মনোযোগ দিয়ে বাসি কোনো পত্রিকার উপ-সম্পাদকীয়তে চোখ বুলাচ্ছিলেন।

আহ! কতদিন পর দাদু আমার চুলে বিলি কাটছেন! আমাদের মধ্যকার কথোপকথনগুলো চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাতেই তুলে দেই। সঙ্গে প্রমিতানুবাদ।

অ নাতি, ছারর ফোঁয়ারে ন য ক্যা? হ ছাই! (নাতি, স্যারের সাথে যাস্ নি কেনো? বল্ তো!)

প্রথমে খুব অপ্রস্তুত হলাম। কী জবাব দেবো? দাদু নন শুধু, আমাদের পরিবারের সবাই-ই তখন স্যারের অনুরক্ত। সে এক আশ্চর্য শক্তি তাঁর, সবাইকে এত্তো এত্তো কাছে টেনে নিতে পারতেন! আমাকে কেনো এতো বেশি ভালোবাসা দিয়েছিলেন, জানি না। আমি আমতা আমতা করে খুলে বললাম হৃদয়ের অব্যক্ত অনুভূতিটা। আরো বললাম তাঁদের উমরাহ যাবার সংবাদে আমার মন খারাপের কথা। জানালাম এই গানের কথা, গানটা বুকে জড়িয়ে কান্নার কথা। দাদু তো অবাক! একেবারে থ মেরে চেয়ে রইলেন।
: এ হথা তইলে! আঁরে এথদিন ন উনালি ক্যা? (এ কথা তাহলে! আমাকে এতদিন শোনাস্ নি কেনো?)
: ব্যাজ্ঞনে আবার আঁসাআঁসি গরিবঅ আঁর ফলাই উইনলে, ইথাল্লাই। (সবাই আবার হাসাহাসি করতে পারে আমার পাগলামোর কথা শুনলে, সে জন্যে।)
: এন্নেকি ত! উগগা গান মেইনষরে এত উতালা বানাইত ফারে দে! আঁরে উনাইছ তোর বিয়াক। (তাই নাকি! একটা গান মানুষকে এত উতলা করতে পারে! আমাকে তোর সবকিছু শোনাবি।) দাদার দিকে তাকিয়ে,
: উইন্ননা তোঁয়ার নাতির হথা? (শুনেছো তোমার নাতির কথা?)
: উনিইইর! নোয়া হথা না? আঁরা অজত যেবশশতিয় ত হেন্দিল ইথে! (শুনছিইই! নতুন কথা নাকি? আমরা হাজ্বে যাবার সময়ও তো কেঁদেছিল সে!)

আমি কোন উত্তর দেই না। চুপ করে তখনো গানটা বিড়বিড় করছি।
রাতে খাবার সময় দাদা জিজ্ঞেস করলেন,
: তোর দাহেল ফরীক্কা হঁত্তে শ্যাষ অব? (তোর দাখিল পরীক্ষা কবে শেষ হবে?)
: এয়েদ্দে বছর মার্চত। (আগামী বছর মার্চে)
: অ এইচ্ছা। চিন্তা গইল্লাম দে, যেঙ্গরি অক তোরে লই যেয়ম দে আঁরা। (ও আচ্ছা। চিন্তা করলাম, যেভাবেই হোক, তোকে নিয়েই আমরা যাবো।)

আমি মোটেও ভাবি নি, দাদার এই আশাটা যে সত্যি হবে খুব তাড়াতাড়ি।
ছুটি শেষে ক্যাম্পাসে চলে আসলাম। আমার দু'আও থেমে নেই। এরই মধ্যে মেজো আব্বু একদিন ফোন করলেন আবু নাঈম স্যারের সেলফোনে। বুঝলাম এই অসময়ে ফোন আসাটা দাদুর কারসাজিতেই হয়েছে। আমাকে অবাক করে দিয়ে এবং মোহাবিষ্ট করে বললেন সামনের ছুটিতে শিগগির পাসপোর্ট করে ফেলতে। আব্বর সাথে কথা বলে মিষ্টি আব্বুকে সবকিছুর ব্যবস্থা করে দেয়ার জন্যে বললেন। মেজো আব্বুব খুব ভালোবাসতেন জানতাম। কিন্তু এত্তটুকু? এত্তবেশি? হয়তো আল্লাহর ইচ্ছা!

আমি তখন মাত্রাতিরিক্ত আনন্দে আত্মহারা। না, বেশি আবেগতাড়িত হওয়া যাবে না। সুস্থির হয়ে দু'রাকাত সালাত আদায় করলাম। এরই মধ্যে আমার পাগলামোর কাহিনী শুনে বড় ফুফু-ও অসাধারণ অনুপ্রাণিত হলেন, তাঁর সুপ্ত বাসনাটাও জেগে উঠলো হঠাৎ। এবং তিনিও অবশেষে আমাদের সাথী হতে মনস্থির করলেন। [মজার বিষয়, একইভাবে দুজন সহপাঠীও হঠাৎ করে আবেগতাড়িত হয়ে টাকা জমাতে শুরু করেছে, উরিব্বাস! আন্তরিক দু'আ করি, আল্লাহ তাদের ইচ্ছে কবুল করুন।]

গতবার রামাদানে আমাদের যাবার কথা ছিলো। আমরা আবেদন করবার আগ মুহূর্তে ভিসা দেওয়া বন্ধ। কিছুটা মন খারাপ হলেও খুব মর্মাহত হই নি, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখেছি। আব্বুব বললেন, রামাদানে যেহেতু জটিলতা দেখা যাচ্ছে, তার আগেই ব্যবস্থা হোক। যদিও আমার ই'তিকাফের স্বপ্নটা ভঙ্গ হবে, এই ভেবে মনে মনে খানিকটা বিষণ্ণ ছিলাম। এ সময় আবার দাদার অসুস্থতায় সেটাও হোল না। তবু তাওয়াক্কুল হারাই নি সর্বোত্তম পরিকল্পনাকারীর ওপর।

ইদানীং বেশ কিছু লেখকের হাজ্বস্মৃতির নোট চোখে পড়ছে বারবার। এগুলো পড়ে পড়ে আরো উতলা হয়ে উঠছি আমি।

আলহামদুলিল্লাহ, অবশেষে আল্লাহ কবুল করেছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে আমরা ইন শা-আল্লাহ জুমাবার রওনা দেবো।

গ.
এর মাঝে আরেকটি দুঃস্বপ্নের ঘানি এসে হাজির। খানিকটা বিষণ্ণতা অনুভব করছি: কারণ আমাকে সাথে নিয়ে 'উমরাহর সুপ্ন দেখা দাদা আর দাদু দুজন-ই এবার যেতে পারছেন না। দাদা হঠাৎ করে আবার অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তবু আমরা আল্লাহর সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়েছি। দাদু অনেকটাই অপ্রস্তুত এবং স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় হতচকিত। ভাবছিলাম আমি সান্তনা দেবো, কিন্তু আমাকেই উল্টো সান্তনা দিয়ে বললেন, 'তোমরাই যাও। হয়তো আল্লাহ এর মধ্যেই আমাদের কল্যাণ রেখেছেন।'

ঘ.
তোমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উপযুক্ত কোনো ভাষা এই অধমের নেই প্রভু! মহাকালের উর্ণজালে জড়িয়ে আমি কতোভাবে কতোবার তোমাকে ভুলেছি, ভুলছি। অথচ! অথচ সেই তুমি একটিবারের জন্যেও বিরাগভাজন হও নি তোমার ক্ষুদ্র বান্দাটির উপর। আমার শতো ভুল আর অসঙ্গতির বিরক্তিকর রোদ তোমার রহমের ছায়ায় বিলীন করে দিয়েছো বারবার।

অবনত মস্তকে কেবলই বারবার বলতে ইচ্ছে করছে, আমার সবটুকু ভালোবাসা, ভালো লাগা এবং হৃদয়াবেগ তোমার জন্যে নিবেদিত হোক, হে দ্বীন দুনিয়ার মালিক!

টিকাঃ
১ পাদটীকা লেখার সুযোগ যেহেতু পেয়েছি, এখানে কয়েকজনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ না করলে আমি নিজেকে অকৃতজ্ঞ মনে করবো। সর্বাগ্রে যে দুটো নাম আসবে, তাঁরা হলেন নূর আয়েশা সিদ্দীকা আপু (যিনি আমার কাছে 'গদ্যের জীবনানন্দ') এবং এনামুল হক স্বপন ভাইয়া। এই প্রবাসী লেখকদম্পতি লোহিত সাগরের ওপার থেকে ভালোবাসার ঢেউ তুলতেন আমার বঙ্গোপসাগরে। কয়েক বছর ধরে তাঁদের সাথে কোন যোগাযোগ নেই। যেখানেই থাকুন, আল্লাহ তাঁদের ভালো রাখুন। আমার কিশোরবেলার প্রথম মুগ্ধতা মাহমুদুল ইসলাম স্যারের নামটা এখানে শ্রদ্ধার সাথে স্মর্তব্য। রাবি'র ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক, খ্যাতিমান কবি ও গবেষক ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ আমার কবিসত্ত্বার প্রথম আবিষ্কারক। তাঁর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা আমাকে গদ্যের পাশাপাশি পদ্যে স্বচ্ছন্দ করেছে। আলজেরিয়ায় বাঙলাদেশ মিশনের সিনিয়র কর্মকর্তা শাহজাহান চাচ্চুর পুত্রবাৎসল্য আমাকে আজও মাঝেমাঝে ঘোরের মধ্যে ফেলে দেয়। কবি ও নির্মাতা হাসান আল-বান্না ভাইয়ার আন্তরিক অনুপ্রেরণাও কখনো ভুলবার নয়। তানযীমুল উম্মাহ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ড. আব্দুল্লাহ আল-মামুন স্যার, তানযীমুল উম্মাহর মূল ক্যাম্পাসের তৎকালীন প্রিন্সিপ্যাল আ খ ম মাসুম বিল্লাহ স্যার [বর্তমানে ফাউন্ডেশনের ডিরেক্টর], ভাইস প্রিন্সিপ্যাল আবু নাঈম স্যার [বর্তমানে 'আরবি শাখা'র প্রিন্সিপ্যাল], কো-অর্ডিনেটর মাশহুদুল আলম স্যার [বর্তমানে ইস্টার্ন ক্যাম্পাসের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল] এবং বিলাল হোসাইন নূরী স্যার (আমার ছন্দগুরু) [বর্তমানে মূল ক্যাম্পাসের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল]- এঁদের কাছে আমার লেখকজীবন বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। তাঁদের উৎসাহ (অনেক ক্ষেত্রে 'প্রশ্রয়') ও সহযোগিতার কারণেই তানযীমে কাটানো দুইটি বছর আমার কবিতাজীবনের সুর্ণালী অধ্যায়। আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী (সম্ভবত এখন
১ লেখাটি যখন লিখছি, তখন সাহিল ও সুবাইতার জন্ম হয় নি। এখন ওরা চার ভাই-বোন: সুহাইমা, সাহিম, সাহিল, ও সুবাইতা।
২ তখন ছোট আম্মুর কোলজুড়ে তাজরিবাহ আসে নি। এখন ওরাও তিন ভাই-বোন: নাশিত, সামিত ও তাজরিবাহ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00