📄 বিষমাখা পুষ্প
খুব মনে পড়ে, শুক্লপক্ষের রাতে বাড়ির ছাদে চাটাই বিছিয়ে দাদাভাই আমাদের গল্প শোনাতেন। শ্রোতা বলতে তখন আমি, রুবাইয়া এবং নাসিম - তিন ভাই-বোন।
হাজী মুহম্মদ মুহসীনের কথা ক্লাসে প্রথম শোনার পর বাড়িতে সবাইকে খুব উৎসাহ নিয়ে শোনাতে লাগলাম। ঐ বয়সটা এমনই, নতুন কিছু শেখার পরে বা নতুন কোনো বিষয় জানার পরে সেটা চারদিকে রাষ্ট্র করে বেড়াতে না পারলে দুই দন্ড স্বস্তি পাওয়া যায় না। দাদাভাই সে সময় আমার মুখে হাজী মুহসীনের কথা শুনে একদিন ছাদের ওপর বসে খুব সুন্দর করে আরেকজন দানবীরের গল্প শুনিয়েছিলেন: হাতেম তায়ী। তাঁর শেষ পরিণতি শুনে তো কতোবার কেঁদে বুক ভাসিয়েছি! তখন থেকে আমি আর রুবাইয়া একটা অঘোষিত প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছিলাম মুহসীন এবং হাতেম তায়ী হবার জন্যে! যত বড় হয়েছি, এই দুটো মানুষের প্রতি ঈর্ষার পরিমাণটাও বেড়েছে ক্রমশ। সেই ঈর্ষা জড়ানো ভালোবাসা থেকেই ফররুখ আহমদের সার্থক কাব্যনাট্য 'নৌফেল ও হাতেম' এক বসাতে শেষ করেছিলাম! সম্প্রতি তাফসীর কুরতুবীতে হাতেম তায়ীর উদ্ধৃত কবিতা দেখে আবিষ্কার করলাম, এই মহানুভব মানুষটির ছিলো বিস্ময়কর কাব্যপ্রতিভা! মনে মনে খুব খুশি হলাম তাঁর আরেকটা গুণের পরিচয় পেয়ে। আল্লাহর কী ইচ্ছা, আরবি কবিতার বই ঘাঁটতে গিয়ে হঠাৎ পেয়ে গেলাম তাঁর কাব্য সংকলন 'দিওয়ান হাতিম আত-তায়ী'! এ যে মেঘ না চাইতেই জল! প্রাচীন সাহিত্য; যথেষ্ট মনোযোগ এবং পরিশ্রম দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে হয়েছে। এই কাব্যসংকলনে হাতিম আত-তায়ীর বিশুদ্ধ মননের পরিচয় পেয়ে ইচ্ছে জাগলো তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত জানার। নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন সূত্র থেকে হাতিম আত-তায়ী সম্পর্কিত যেসব জানা-অজানা বিষয় নজরে এসেছে, সেগুলোকে সাজিয়েই 'বিষমাখা পুষ্প'র গল্পের আসর বসলো আজ।
পরিচয়
পুরো নাম: হাতিম ইবন 'আব্দিল্লাহ ইবন সা'দ ইবন আল-হাশরাজ ইবন ইমরাইল-ক্বায়স ইবন 'আদী। কন্যার নামানুসারে তিনি 'আবু সুফানাহ' (সুফানাহর পিতা) বলে পরিচিত ছিলেন। তাঁর পুত্র 'আদী ইবন হাতিম রাসূলুল্লাহর [ ] সাহাবীদের [রা.] একজন।[১] ইতিহাসে 'আদী বিখ্যাত হয়েছেন সমঝোতার প্রস্তাব নিয়ে 'আলী [রা.] কর্তৃক মু'আওয়িয়াহ [রা.]-এর নিকট প্রেরিত হয়ে।
পন্ডিতগণ বলে থাকেন, তায়ী বংশ থেকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে তিনজন অতুলনীয় ব্যক্তির আবির্ভাব হয়েছে: দানশীলতায় হাতিম আত-তায়ী, দুনিয়াবিমুখ একান্ত 'ইবাদাতে দাউদ ইবন নাসীর আত-তায়ী এবং কবিতার ক্ষেত্রে আবু তাম্মাম।[২]
দ্বীন
ইসলামের অভ্যুদয়ের পূর্বেই হাতিম আত-তায়ী মারা যান। রাসূলুল্লাহ'র [৬] বয়স যখন আট বছর (৫৭৮ ঈসায়ী), তখন তাঁর দাদা 'আব্দুল মুত্তালিব মারা যান এবং একই বছরে মারা যান হাতিম আত-তায়ী।[৪] তিনি ছিলেন খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী (নাসারা)। আল্লাহর বিচার, তাক্বদীর এবং অন্যান্য ঐশী নির্দেশাবলীতে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন।[৫]
আরেকটি মতানুসারে, হিজরী অষ্টম সনে তিনি মারা যান।[৭] এ বছরের যুলহিজ্জাহ মাসে মারিয়াহ কিবতিয়াহ'র গর্ভে রাসূলুল্লাহর [১] সন্তান ইবরাহীম জন্মগ্রহণ করেন।[২]
হাতিমের অনন্য বদান্যতা ও দানশীলতার গল্প
হাতিম আত-তায়ীর দানশীলতা ও পরোপকারিতার ব্যাপারে সকল ঐতিহাসিক একমত। আমরা এতদসংক্রান্ত দুটো বর্ণনা এখানে উল্লেখ করবো।
১. হাতিম আত-তায়ীর স্ত্রী নাওয়ারকে একবার হাতিম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হোল। তিনি বললেন:
"তাঁর প্রত্যেকটি কাজই ছিলো বিস্ময়কর। একবার আমাদের দুর্ভিক্ষ আক্রান্ত করলো। জমিন রুক্ষতায় ফেটে পড়লো এবং আকাশও হয়ে গেলো ধূসরিত। দুগ্ধদানকারীনি মায়েরা সন্তানদেরকে দুধ পান করানো থেকে সরে আসতে বাধ্য হন। উটগুলো অতিশয় কৃশকায় হয়ে পড়ে। সে সময় শীতের এক প্রখর রাতের অর্ধপ্রহরে আমাদের সন্তানগুলো ক্ষুধায় কান্না জুড়ে দেয়: আব্দুল্লাহ, 'আদ্দী এবং সুফানাহ। আল্লাহর শপথ, আমাদের এমন কিছু ছিলো না, যা দিয়ে তাদের সান্ত্বনা দেবো। হাতিম একজন সন্তানের দিকে এগিয়ে এসে কোলে তুলে নেন। আমি এক কন্যাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম। আল্লাহর শপথ, রাত্রির একটি অংশ অতিবাহিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের কান্না থামে নি। এরপর আমরা আঁশযুক্ত সিরীয় চাদর দ্বারা বিছানা পেতে দিলাম। আমরা সন্তানদের ঘুম পাড়িয়ে দিলাম। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম, হাতিমও অন্য পাশে ঘুমিয়ে পড়লেন আর সন্তানরা ছিলো আমাদের মাঝে। হাতিম অতঃপর আমার দিকে এগিয়ে আসলেন এবং সান্ত্বনা দিতে লাগলেন, যাতে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। আমি তাঁর উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে ঘুমের ভান ধরলাম। হাতিম বললেন, 'কী হোল? ঘুমিয়ে পড়েছো?' আমি নীরব থাকলাম। তিনি বললেন, 'আমার মনে হচ্ছে, সে ঘুমিয়ে গেছে।' অথচ আমার চোখে কোনো ঘুম ছিলো না। যখন রাত প্রায় শেষ হয়ে এলো, তারকারাজি নিবু নিবু হয়ে এলো এবং সমস্ত প্রকৃতি-ও নিঝুম-নিস্তব্ধতায় নিমগ্ন হলো; তখন তাঁবুর এক প্রান্ত হঠাৎ উঁচু হতে দেখা গেলো। হাতিম বললেন, 'কে রে?' অতঃপর আগন্তুক চলে গেলো। ইতোমধ্যে রাত প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। হাতিম [পুনরায়] জিজ্ঞেস করলেন, 'এটা কে?' [একজন মহিলা] বললেন, 'আমি আপনার প্রতিবেশীনি অমুক, হে 'আদীর পিতা! আমি আপনাকে ছাড়া কাউকে ভরসা ও সাহায্যের আশ্রয়স্থল মনে করি নি। আমি ক্ষুধার যন্ত্রণায় নেকড়ে বাঘের মতো আর্তনাদ করতে থাকা কিছু শিশুর পক্ষ থেকে আপনার কাছে এলাম।' হাতিম বললেন, 'তাদেরকে আমার কাছে নিয়ে এসো।' নাওয়ার বললেন, আমি লাফিয়ে উঠলাম এবং বললাম, 'আপনি কী করলেন? ঘুমিয়ে পড়ুন! আল্লাহর কসম, আপনার সন্তানগুলো বিলাপ করছে আর তাদেরকে বুঝ দেয়ার মতো কিছু পেলেন না; অথচ এই মহিলা এবং তার সন্তানদের কিভাবে নিবৃত্ত করবেন?' হাতিম বললেন, 'থামো, আল্লাহর শপথ, আমি তোমাকেও তৃপ্ত করবো ইনশা-আল্লাহ।' নাওয়ার বলেন, মহিলাটি দুই সন্তান কোলে এবং দুই পাশে চারজন সন্তানসহ আসছিলেন, মনে হচ্ছিলো যেনো কিছু বাচ্চা নিয়ে উটপাখি আসছে। হাতিম তার ঘোড়ার দিকে এগিয়ে এলেন এবং বর্শা দিয়ে গলায় আঘাত করলেন। অতঃপর চুলা জ্বালিয়ে দিলেন। এবার ছুরি নিয়ে এসে চামড়া তুলে ফেললেন এবং ছুরিটা মহিলাকে ফিরিয়ে দিলেন। বললেন, তোমার সন্তানদের পাঠাও। মহিলা পাঠিয়ে দিলেন। হাতিম বললেন, এই মৃত জন্তু থেকে শুধু কি তোমরাই খাবে, ছড়িয়ে থাকা আরো অসংখ্য ক্ষুধার্তকে ছাড়া? হাতিম বেরিয়ে পড়লেন, অতঃপর লোকেরা সবাই দলে দলে আসতে লাগলো। হাতিম একটা কাপড় জড়িয়ে এক পাশে শুয়ে থাকলেন আর আমাদের দেখতে লাগলেন। আল্লাহর কসম, তিনি একটা ক্ষুদ্র অংশও সেখান থেকে গ্রহণ করলেন না; অথচ তিনিই [ক্ষুধার তীব্রতায়] সবার চেয়ে বেশি মুখাপেক্ষী ছিলেন [খাওয়ার জন্য]। এরই মধ্যে সকাল হয়ে এলো, দেখা গেলো কিছু হাড়গোড় ছাড়া খাদ্যের কোন কিছু আর অবশিষ্ট নেই।”
২. ওয়াদ্দাহ ইবন মা'বাদ আত-তায়ী বর্ণনা করেন,
"হাতিম আত-তায়ী নু'মান ইবন মুনজিরা এর নিকট আগমন করলে নু'মান তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করেন এবং কাছে টেনে নেন। আসার সময় তাকে কিছু উপঢৌকন প্রদান করেন; নগরীর মূল্যবান বস্তু ছাড়াও এর মধ্যে ছিলো স্বর্ণ ও রৌপ্য বোঝাই দুটি বাহন। হাতিম আত-তায়ী তাঁর সম্প্রদায়ের নিকট আগমন করলে তায়ী বংশের বেদুঈন গরীবরা তাঁকে ঘিরে ধরে এবং বলে, ওহে হাতিম! তুমি বাদশাহর কাছ থেকে এসেছো সম্পদ নিয়ে আর আমরা আমাদের পরিজনদের কাছ থেকে এসেছি দারিদ্র্য নিয়ে। হাতিম বলেন, 'আসো আসো! আমার সামনে যা কিছু আছে সব নাও!’ এই বলে তিনি তাদেরকে বণ্টন করে দিতে লাগলেন। অতঃপর তারা সবাই নু'মান কর্তৃক প্রেরিত উপঢৌকনাদির উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিলো। এরই মধ্যে হাতিমের দাসী তুরাইফা এগিয়ে এসে তাঁকে বললেন, ‘আল্লাহকে ভয় করুন! নিজের জন্যও কিছু জমা রাখুন! এসব লোকেরা তো কোনো স্বর্ণমুদ্রা, রৌপ্যমুদ্রা আর অবশিষ্ট রাখলো না। আর না অবশিষ্ট রাখলো কোন বকরী অথবা উষ্ট্র।’ হাতিম আত-তায়ী তখন আবৃত্তি করে বললেন:
قالت طريفة ما تبقى دراهمنا ... وما بنا سرف فيها ولا خرق
إن يفن ما عندنا فالله يرزقنا ... ممن سوانا ولسنا نحن نرتزق
ما يألف الدرهم الكاري خرقتنا ... إلا يمر علينا ثم ينطلق
إنا إذا اجتمعت يوماً دراهمنا ... ظلت إلى سبل المعروف تستبق [3]
[তুরাইফা বলছে, আমাদের কোনো স্বর্ণমুদ্রা অবশিষ্ট থাকবে না। আমরা তো কোনো অপচয়ও করি নি, অনর্থক খরচও করি নি। আমাদের নিকট যা আছে তা যদি শেষ হয়ে যায়, তাহলে আল্লাহ-ই আমাদের দান করবেন অন্যদের কাছ থেকে। (আল্লাহ ব্যতীত) আমরা নিজেরা নিজেদের দান করতে সক্ষম নই। 'কার' অঞ্চলের স্বর্ণমুদ্রা আমাদের ঝাঁপিতে জমা হয় কেবল এইভাবে যে, সেটা ঝাঁপি অতিক্রম করেই বণ্টিত হয়ে যায়। যখনই কোনোদিন আমাদের স্বর্ণমুদ্রা জমা হবে, কল্যাণের পথে সেটা অগ্রগামী হতে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে।]
হাতিম নিরহংকার ছিলেন
আবু বাকর ইবন 'আইয়াশ বর্ণনা করেছেন: হাতিম আত-তায়ীকে জিজ্ঞেস করা হোল, আরবে আপনার চেয়ে দানশীল আর কেউ আছে কি? তিনি বললেন, প্রত্যেক আরবই আমার চেয়ে বেশি দানশীল।[২]
হাতিম প্রদর্শনেচ্ছু ছিলেন
হাতিম আত-তায়ীর অনুপম দানশীলতা এবং মহানুভবতা সত্যিই বিস্ময়ের উদ্রেক করে। আর তাঁর দানের মহাকাব্যিক উপাখ্যান ভালোবাসা ও ভালো লাগার অনন্য উপাদান। কিন্তু নিদারুণ হতাশ হলাম, যখন জানতে পেরেছি, তাঁর এই পরোপকার আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ছিলো না। বরং কেবল খ্যাতি ও প্রশংসার জন্যেই উদারহস্তে দান করেছিলেন। একটু খটকা লেগে গেলো, তবে শেষমেশ তাঁর সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ []-এর অভিমত জানতে পেরে অনেক কষ্টে নিশ্চিত হলাম।
'আদী [রা.] প্রিয়নবীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন: 'হে আল্লাহর রাসূল! আমার বাবা রক্তের বন্ধন অটুট রেখেছিলেন, অতিথির যত্ন নিয়েছিলেন এবং এই এই ভালো কাজ করেছিলেন।' রাসূল [] বললেন, 'তোমার বাবা যা চেয়েছিলেনা, তা তো পেয়ে গেছেন।'
হাতিম-এর জীবন থেকে আমরা কী শিক্ষাটি পেলাম?
সামগ্রিক বিচারে আমরা হাতিম আত-তায়ীকে মহানুভবতার সুরভিত পুষ্প হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। কিন্তু এ পুষ্পের সুবাসিত মদিরায় হৃদয় মাতানো যায় না, কারণ তার পাপড়িগুলো লৌকিকতার বিষে মাখা। নিয়্যাত পরিশুদ্ধ করার সীমাহীন গুরুত্বের কথাটা আমাদের আরও একবার স্মরণ করিয়ে দেয় হাতিম আত-তায়ীর জীবনাচার। কেবল কল্যাণ ও পুণ্যের পথে নিবেদিত হওয়া-ই যে চূড়ান্ত সার্থকতা নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিখাদ উদ্দেশ্যই সফলতার পূর্বশর্ত;- হাতিম আত-তায়ী থেকে আমরা এ শিক্ষাই নিতে পারি।
আমাদের পূর্ববর্তী সালাফ আস-সালিহুন নিয়্যাত শুদ্ধ করার প্রতি এতোটাই গুরুত্বারোপ করতেন যে, অনেকেই তাঁদের লিখিত গ্রন্থের শুরুতে 'হাদীসুননিয়্যাহ' উল্লেখ করে দিতেন )0( حديث النية বা 'নিয়্যাতের হাদীস' বলতে বোঝায় আমাদের সকলের কাছে পরিচিত (সাহীহ আল-বুখারীতে সর্বাগ্রে উল্লিখিত) হাদীসটি:
'উমার ইবন আল-খাত্তাব [রা.] থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ [] ইরশাদ করেছেন:
"নিশ্চয়ই প্রতিটি কাজ নিয়্যাত অনুযায়ীই গৃহীত হয়। আর প্রত্যেক ব্যক্তি তাই-ই পায়, যা সে নিয়্যাত করে। সুতরাং যার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূল [ﷺ]-এর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হবে, তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্যেই পরিগণিত হবে। আর যার হিজরত দুনিয়া লাভের বা কোনো নারীকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যে হবে, তার হিজরত সে উদ্দেশ্যেই পরিগণিত হবে, যে উদ্দেশ্যে সে হিজরত করেছে।"
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মক্কা থেকে মদিনা-তে হিজরতের সময় মুমিনদের সবাই আল্লাহর নির্দেশ পালনের জন্যে এই ত্যাগ-কুরবানির নজরানা পেশ করলেও এক ব্যক্তি হিজরত করেছিলো মদিনার একজন রমণীকে বিবাহ করার জন্যে।
আ'মাশ [রা.] বলেন: "আমাদের মধ্যে এক লোক ছিলো, যে উম্মু কাইস নাম্নী মহিলাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, কিন্তু মহিলা তাকে বিয়ে করতে অসম্মত হয়, এমনকি মদিনাতে হিজরত করে চলে আসে। এরপর লোকটি (ও) মদিনাতে হিজরত করে এবং (অবশেষে) তাকে বিয়ে করে। আমরা সেই লোকটির নাম দিয়েছিলাম (উম্মু ক্বাইসের মুহাজির)।
তার নিয়্যাত যেহেতু পরিশুদ্ধ ছিলো না, সে কারণেই এই দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়ার কষ্ট, শত্রুর হাতে বন্দী হবার ঝুঁকি গ্রহণ — এতো ত্যাগ তার জন্যে কোন পুণ্য বয়ে আনলো না। একইভাবে, হাতিম আত-তায়ীর বদান্যতা, অকাতরে বিলিয়ে দেওয়ার মত হৃদয়ের প্রাশস্ত্য, আত্মত্যাগের মহাকাব্যিক দৃষ্টান্ত—কোনকিছুই চূড়ান্ত হিসেবের খাতায় একটি শূন্য বৈ কিছু বয়ে নিয়ে আসে নি।
নিয়্যাত পরিশুদ্ধ থাকলে স্বল্প 'আমালই মুক্তির কারণ হতে পারে, আবার বিপরীতে অধিক আমলও অর্থহীন হয়ে যেতে পারে। রাসূলুল্লাহ [ﷺ] মু'আজ ইবন জাবাল [রা.]-কে ইয়ামানে প্রেরণের প্রাক্কালে উপদেশ দিচ্ছিলেন,
أخلص دينك يكفيك العمل القليل
"তোমার দ্বীনকে একনিষ্ঠ করো। অল্প 'আমালই তোমার জন্য যথেষ্ট হবে”।[১]
টিকাঃ
১ সূরা আন'আম (৬) এর ১১৮ নং আয়াতের তাফসীর। [তাফসীর কুরতুবী, খ. ৭ পৃ. ৭২]
১ আল-মুফাসসাল ফী তারিখিল 'আরাব ক্বাবলাল ইসলাম, খ. ১৮ পৃ. ৩৭৮
২ আল-ওয়াফী বিল ওয়াফায়াত, খ. ৪ পৃ. ৮৬
৩ আল-মুফাসসাল, খ. ৭ পৃ. ২২১
৪ মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ, খ. ১ পৃ. ৩৩
৫ আল-মুফাসসাল, খ. ১১ পৃ. ১৫৪
৬ আল-উনাস আল-জালীল, খ. ১ পৃ. ২১১
১ এক বছর দশ মাস বয়সে তিনি মারা যান। [সীরাত ইবন কাসীর, খ. ১ পৃ. ১০৪]
২ আল-উনাস আল-জালীল, খ. ১ পৃ. ২১১
১ আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, খ. ১ পৃ. ২২৮
২ হীরা রাজ্যের অধিপতি।
১ মুখতাসার তারীখ দিমাশক, খ. ২ পৃ. ৩০৯
২ আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, খ. ১ পৃ. ২৩০
১ অর্থাৎ, 'দানের প্রশংসা'। এই ব্যখ্যাটি আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ-তে এসেছে। খ. ১ পৃ. ২২৭।
২ মুসনাদ আহমাদ: ১৯৩৯৩
৩ 'উমার [রা.] থেকেও এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা পাওয়া যায়: “যে ব্যক্তি কোনো গ্রন্থ রচনার ইচ্ছে পোষণ করে, সে যেন الأعمال بالنيات )হাদিসটি) দ্বারা তা শুরু করে।” [জামি' আল-'উলুম ওয়াল হিকাম, খ. ১ পৃ. ৫৯]
১. সাহীহ আল-বুখারী: ০১; সাহীহ মুসলিম: ৫০৩৬।
২. ফাতহুল বারী, খ. ১ পৃ. ১৩
১. আল-মুসতাদরাক: ৭৮৪৪। হাকিম বলেছেন: হাদিসটি সনদের দিক থেকে সাহীহ। ইমাম বায়হাক্বীর শু'আবুল ঈমান গ্রন্থে কিছুটা শাব্দিক ভিন্নতা সহ হাদিসটি এসেছে )أخلص دينك يكفيك القليل من العمل( এই বর্ণনায় হাদিসটি মুরসাল।
📄 আত্মকথন
ব্যালকনিতে বসে আছি। আজকের সকালটা বুঝি একটু বেশিই সতেজ। কিছুটা হিম হিম ভাব, তার সাথে মৃদুমন্দ বাতাস, ডানদিকে আমগাছটাতে কয়েকটা চড়ুই'র কিচিরমিচর, সব মিলিয়ে বেশ ফুরফুরে অনুভব। আমি কুরআন পড়ছিলাম। সূরা কাহফ।
আম্মু আমার বুকশেলফ গুছিয়ে দিতে দিতে বলছিলেন, 'আরবি কবিতার বইগুলো বোধহয় অনেকদিন ধরো নি। এই তাকটা খুব পরিপাটি দেখা যাচ্ছে।' অনেক দিন যে ধরি নি, তা না, তবে একটা বিরতি কিন্তু দিয়েছি ঠিকই। আজকের 'টু-বি রেড লিস্টে' কোনো কবিতার বই ছিলো না আমার। তবু আম্মুর কথাটা মনে ধরলো, কুরআন পড়া শেষ করে 'উলয়া বিনত আল-মাহদী'র 'দীওয়ান' (কাব্যসঙ্কলন) হাতে নিলাম। তাঁর কবিতায় চোখ বুলাচ্ছি এই প্রথমবারের মতো। তাঁর একটি বিশেষ পরিচয়, তিনি আব্বাসীয় খলিফা আল-মাহদী'র কন্যা এবং হারুন-আর-রাশীদ-এর বোন। চমৎকার সব কবিতা! এতদিন কেন মনোযোগ দিলাম না, নিজেকে খুব বোকা মনে হোল। আব্বাসী যুগের প্রচলিত সাহিত্যধারার সাথে বিশাল একটা পার্থক্য আছে তাঁর কবিতায়! প্রতিপক্ষের নিন্দা-কুৎসা রটনা, বংশীয় অহঙ্কার ও কীর্তিগাঁথা রচনা, রাজস্তুতি ও স্তাবক-বন্দনা – এই ধারা থেকে তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত তো বটেই, আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সরল কাব্যিক রেখাতেও তিনি অবস্থান করেন নি, বোধের বাঁশিটা বাজিয়েছেন একেবারে স্বতন্ত্র অনুভূতির বটবৃক্ষের ছায়ায়। এই যেমন:
القلب مشتاق إلى ريب * يا رب ما هذا من العيب
قد تيمت قلبي فلم أستطع * إلا البكا يا عالم الغيب
আমি কাব্যানুবাদের চেষ্টা করেছি [মাত্রাবৃত্ত ছন্দে]:
আমার হৃদয় সন্দেহ আর সংশয়ে পড়ে যায় প্রভু!
এ কেমন বিব্রতকর দুঃসহ অনুভব!
আমার মনটা ওদিকেই ঝুঁকে যেতে যখনই চায়,
কান্না ছাড়া তো আমার কিচ্ছু করার থাকে না, রব!
কী সাংঘাতিক! আমি কবিতাটা পড়ছিলাম, মনে মনে কাব্যানুবাদ সাজাচ্ছিলাম, আর অবচেতনেই বিড়বিড় করে বলছিলাম, 'বোন রে! আমার কথাগুলো আপনি এত্ত আগেই বলে ফেললেন ক্যামনে!'
সংশয়ের আবর্তে ঘূর্ণায়মান মুসলিম তরুণদের অভিব্যক্তি গড়ের ওপর এমনই তো বোধহয়! এ নিয়ে আমার দর্শন আরও মজবুত হোল এই কবিতাটা থেকে। শাইত্বান যখন বিশ্বাসের সফেদ চাদরে দাগ ফেলতে চায়, তখন আল্লাহর কাছেই আমাদের অসহায়ত্বের স্বীকৃতি আর আশ্রয় প্রার্থনার বিনীত আকুতি পেশ করে অশ্রু নিবেদন করাটাই প্রশান্তির শেষ নিয়ামক। আল্লাহও তা-ই শিখিয়ে দিয়েছেন আল-কুরআনে:
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ
"আমাদের রব্ব! আমাদেরকে পথ দেখানোর পর তুমি আমাদের হৃদয়গুলোকে পুনরায় বক্র করে দিও না! আর তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্যে রহমত দান করো। তুমি তো উদার-মহান দাতা!!"
'উলয়ার কবিতায় বিরতি দিলাম, কেনো জানি মনে হোল, এক বসাতেই সম্পূর্ণ ভালো লাগা শেষ করা ঠিক হবে না! সময়ে সময়ে প্রয়োজনানুসারে ভালো লাগাটাকে একদম নবীনতম অনুভূতির জালে ধরার লোভ থেকে আরেকটা বই ধরলাম।
'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারাক [রা.]-এর 'দীওয়ান' বেশ অনেকবার পড়েছি। কিন্তু অন্য আরো কিছু বইয়ের মতো এই বইটাও আমার কাছে বারবার পড়ার পরেও মনে হয় নতুন কিছু। আজকে একটা পঙক্তি খুব ভাবালো:
أرى أناسا بأدنى الدين قد قنعوا * ولا أراهم رضوا في العيش بالدون (১)
ষান্মাত্রিক মাত্রাবৃত্ত ছন্দে এটারও একটা কাব্যানুবাদ দাঁড়িয়ে গেলো মনে মনেই:
অনেককে দেখি দ্বীনের অল্প পালন করেই তুষ্ট রয়,
দুনিয়ার ভাগে অল্প পড়লে তারা-ই আবার রুষ্ট হয়!
আসলেই তো! দ্বীন পালনের ক্ষেত্রে আমাদের অমনোযোগিতা ও অবহেলা কিন্তু একটুও ভাবায় না আমাদেরকে। অবলীলায় এবং খুব স্বাভাবিক ভাবেই দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা ও আবেগ-অনুরাগের পরিচর্যা কমিয়ে দিচ্ছি আমরা। এই অবহেলা এবং ছাড় দেওয়ার মনোবৃত্তি কিন্তু বৈষয়িক কোনো ব্যাপারে সেভাবে ঘটে না! একেবারে ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনের জন্যে সঞ্চয় ও অর্জনে সামান্যতম ত্রুটিটুকুও পরাহত করতে আমরা যতটা সচেতন, চিরস্থায়ী ও চূড়ান্ত জীবনের জন্যে কিছু পাথেয় কুড়িয়ে নেওয়ার জন্যে আমরা কি ততটুকু সচেতন?
আমি নিজেকে প্রশ্ন করে যাচ্ছি...
আল্লাহ রহম করুন সেই আলোকিত কবিদের; যাঁরা আমাদের বিশ্বাস ও বিশুদ্ধ অনুভূতিগুলোকে সতেজ ও সজীব রাখার উপাদান রেখে গেছেন, যাঁরা আমাদেরকে নশ্বর পিছুটানের মরীচিকা ভুলে অবিনশ্বর স্বপ্নপুরীর জন্যে তৈরি হবার প্রণোদনা যোগান প্রতিনিয়তই।
ঠিক সে সময় আল-কুরআনের সেই আয়াত দুটো যেনো তীর হয়ে এসে বিঁধে গেলো বোধিবক্ষে:
بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَى
"বরং তোমরা পার্থিব জীবনকেই বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছো। অথচ আখিরাতের জীবন হোল উত্তম এবং স্থায়ী!!"
টিকাঃ
১ সূরা আলে 'ইমরান ৩:৮
১ দীওয়ান ইবনুল মুবারাক, পৃ. ৪৮
২ সূরা আল-আ'লা ৮৭:১৬, ১৭
📄 তিনটি ব্যামো: ত্রিফলা প্রতিষেধক
ত্বালিবুল 'ইলম তথা 'Students of Knowledge' যাঁরা, তাঁরা সচরাচর যে তিনটি সমস্যার মুখোমুখি হন, সে সম্পর্কিত তিনটি কবিতা আমরা এখানে কাব্যানুবাদ করবো, বিইজনিল্লাহ। শেষ দুটোতে আক্ষরিক অনুবাদের বৃত্তে কেন্দ্রবিন্দু ঠিক রেখে ব্যাসার্ধ কিছুটা বাড়াতে হয়েছে, পাঠকের সহজাত বোধগম্যতার বৃত্তকে শিল্পিত করার জন্যে। তিনটি কবিতা-ই মাত্রাবৃত্ত ছন্দে অনূদিত।
(১) আমার স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে
এই একই সমস্যার ব্যাপারে ইমাম আশ-শাফি'ঈ [রা.] তাঁর উস্তায ওয়াকী'র কাছে প্রশ্ন করেছিলেন। তিনি যে সমাধান দিয়েছেন, সেটা কবিতা আকারেই বর্ণনা করছেন।[১]
شكوت إلى وكيع سوء حفظي
فأرشدني إلى ترك المعاصي
وأخبرني بأن العلم نور
ونور الله لا يهدى لعاص
"প্রিয় উস্তায ওয়াকী'র কাছে করলাম অভিযোগ-
আমার স্মরণশক্তি কমেছে, কিভাবে সারবে এ রোগ?
তিনি বললেন, 'তুমি পাপ ছাড়ো'
এরপর তিনি বললেন আরো-
বৎস! 'ইলম হলো এক 'নূর' আল্লাহ তা'আলার!
পাপীদের দেয়া হয় না কখনো এই নূর উপহার!”
(২) আলসেমি কাটিয়ে উঠতে পারি না
'ইলম অর্জনের পথে অলসতা মারাত্মক একটি বিষফোঁড়া। ছাত্রজীবনে এটার 'ইনফেকশন' একটু বেশিই ভয়াবহ হয়ে থাকে।
একজন ছাত্রের সুফলা স্বপ্নের মাঠে অহেতুক অলসতা একদম পাকা ধানে মই দেয়ার মতো। অথবা বাড়া ভাতে ছাই দেয়ার মতো। নানা সময় নানা অজুহাত দাঁড় করানো আলস্যের প্রাণ।
ইমাম আয-যাহাবী এ সংক্রান্ত সুন্দর একটি কবিতা নিয়ে এসেছেনা। :
إذا كنت تؤذى بحر المصيف
ويبس الخريف وبرد الشتا ؟
ويلهيك حسن زمان الربيع
فأخذك للعلم قل لي متى؟
“এসেছে গ্রীম; তুমি বলো, 'আহ! খরতাপে পুড়ে যাই!
এমন গরমে কিভাবে পড়ার ফুরসত বলো পাই?'
শীত ঋতু এলে বলো, 'আহা এই হিম শীতলের মাসে,
কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে কি পড়ার চিন্তা মাথায় আসে?'
শরৎ ঋতুর উদাসী পরশে তুমি হও ভুলোমনা,
পড়ার টেবিলে আনমনা হয়ে করে যাও কল্পনা।
বসন্ত এলো, বেশ! চারিদিকে রূপের মাধুরী দেখে-
প্রকৃতির প্রেমে পড়ে যাও তুমি পড়াশোনা সব রেখে।
এভাবেই যদি বন্ধু তোমার সারাটি বছর কাটে;
বলো তো তাহলে জ্ঞান আহরণে বসবে কখন পাঠে?”
(৩) পড়ার সময় নোট করার অভ্যাস না থাকা
কোনো গ্রন্থ অধ্যয়নের পরে, কোন জ্ঞানীর সংস্পর্শে নতুন কিছু জানার পরে, অথবা সহসা কোনো ভাবনার উন্মেষ নিজের ভেতরে অনুভূত হলে, আমাদের উচিৎ সেটা তখনই নোট করে নেয়া। নোট করার অভ্যাস না থাকলে অনেক জ্ঞাত ও সহজাত বিষয়ও আমাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। ইবনু 'উজাইবাহ তাঁর তাফসীরগ্রন্থে এরকম একটি কবিতা বর্ণনা করেছেন। কোনো বিষয়ে জানার পরে নোট করে নেয়া যে কত বেশি প্রয়োজন, এটা কবিতার প্রতিপাদ্য।
العلم صيد والكتابة قيده
قيد صيودك بالحبال الواثقة
فمن الحماقة أن تصيد غزالة
وتتركها بين الخلائق طالقة
“ধরো কোন এক শিকারী শিকার করতে গিয়েছে বনে
একটা হরিণ শিকার করলো অতীব সংগোপনে
শিকারী ভাবলো, পেয়েছি এবার পালায় কিভাবে দেখি!
এদিকে সুযোগে পালালো হরিণ; শিকারী অবাক, 'এ কি'!
অথচ শিকারী শিকার পেয়েই ভালো করে যদি বাঁধে-
অনেক আশার হরিণটা তার পালাতো কি আর সাধে?
তুমিও তেমনি জ্ঞানের শিকারী, জ্ঞানকে শিকার করে
লেখার বাঁধনে আটকিয়ে নাও মনের খাঁচায় ভরে
অন্যথা সেই জানা জিনিসটা পালিয়েই যদি যায়
শিকারীর মতো তুমিও করবে বৃথা শুধু হায় হায়!”
টিকাঃ
১. দীওয়ান শাফি'ঈ, পৃ. ৮
১ সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা, খ. ১৭ পৃ. ১০৬
১ আল-বাহর আল-মাদীদ, খ. ১ পৃ. ৩৬৯
📄 তিনি এক মজার শিক্ষক
প্রিয় নবীজি [] কেবল মজার মানুষই ছিলেন না, ছিলেন একজন সূক্ষ্ণ মনস্তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষক এবং দক্ষ শিক্ষক-ও! তাঁর অভিনব শিক্ষণ-পদ্ধতির একটি গল্প আমরা অনুবাদ করবো, আত-তাফসীর আত-তাবারী থেকে।[১] গল্পটি শোনার আগে আমাদের একটু জেনে রাখা প্রয়োজন, এটি কোন্ আয়াতের প্রেক্ষাপটে এসেছে। আয়াতটি হচ্ছে:
حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَى
"তোমরা সালাতসমূহের ব্যাপারে মনোযোগী হও, মধ্যবর্তী সালাতের ব্যাপারেও। [২]"
এখানে 'মধ্যবর্তী সালাত' (الصَّلَاةِ الْوُسْطَى) বলতে আল্লাহ কী বুঝিয়েছেন, সে ব্যাপারে বিভিন্ন মতামত আছে। তবে রাসূলুল্লাহর [] হাদিস এবং ইবন 'আব্বাস, 'আয়িশা, 'আলী ইবন আবি তালিব, আবূ হুরায়রা [রা.] প্রমুখ সাহাবীর বক্তব্যের ভিত্তিতে অধিকাংশ মুফাসসির মত দিয়েছেন যে, এখানে আসরের সালাতের কথা বলা হয়েছে। সাধারণ বোধ-বুদ্ধিতেও তা-ই মনে হয়। পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের মধ্যে আসরের অবস্থান একেবারে মাঝামাঝি।
এবার সরাসরি গল্পে চলে যাই। একজন সাহাবী[১] বলছেন:
আমি তখন ছোট কিশোর। আবূ বাকর ও 'উমার [রা.] আমাকে রাসূলুল্লাহ'র [] কাছে পাঠালেন 'মধ্যবর্তী সালাত' সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে।
অতঃপর নবীজি [] আমার কনিষ্ঠা আঙ্গুলটি ধরে বললেন: 'এটা হোল ফাজর'।
এরপর ঠিক তার পাশের আঙ্গুল ধরে বললেন: 'এটা হোল যোহর'।
এবার ধরলেন বৃদ্ধা আঙ্গুল, বললেন: 'এটা হোল মাগরিব'।
তারপর ঠিক তার পাশের আঙ্গুল ধরে বললেন: 'এটা হোল 'ইশা'!
এবার রাসূলুল্লাহ [] আমাকে বললেন: 'বল তো, তোমার কোন্ আঙ্গুলটা বাকী আছে?'
আমি বললাম: 'মধ্যমা আঙ্গুল'।
তারপর জিজ্ঞেস করলেন: 'বল তো, কোন্ সালাতটা বলা বাকী আছে?'
আমি বললাম: 'আসর'।
নবীজি [] বললেন: 'ঐ তো! ওটাই আসর!”
শিশুদের মন নিয়ে খেলা করার গুণটা আসলেই অনন্য! দেখুন, প্রিয় নবীজি [] এমনভাবে শিশুটিকে বোঝাচ্ছেন, যাতে তার হৃদয়ে উদ্দীষ্ট বিষয়টা একেবারে গেঁথে যায়। একটি বাক্যে বা কথায় 'আসর সালাত' বলে না দিয়ে আঙ্গুল ধরে ধরে বোঝালেন, আর শিশুটাও খুব চমৎকারভাবে এবং আনন্দের সাথে বুঝে নিতে পারলো। আরেকটা বিষয় লক্ষণীয়, তাঁর পাঠনের ধারাবাহিকতাও এমনভাবে গোছানো, যাতে শিশুটি নিজেই উত্তর বের করে আনতে পারে!
টিকাঃ
১ আত-তাফসীর আত-তাবারী, খ. ৫ পৃ. ১৯৬
২ সূরা আল-বাক্বারাহ ২:২৩৮
৩ তাফসীর তানতাওয়ী, খ. ১ পৃ. ৪৩৬
১ তাফসীরে নির্দিষ্ট কোনো নাম উল্লেখ করা হয় নি।