📘 শেষরাত্রির গল্পগুলো > 📄 জাগো গো ভগিনী

📄 জাগো গো ভগিনী


আম্মু একবার প্রসঙ্গক্রমে বলেছিলেন, 'আমার ছেলে পাগল হলেও মাথা ঠিক আছে।' কথাটা একেবারে অস্বীকার করবার মতো নয়। মাঝে মাঝে মাথায় যে বিচিত্র ঝোঁক হঠাৎ চাপে, তাতে আম্মুর মন্তব্য ঠিক না হয়ে যাবে কই?

ডায়েরিতে ভালোবাসার মানুষদের একটা তালিকা আছে আমার কাছে। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য-সংখ্যক মানুষের সাথে আমার কখনো সাক্ষাত হয় নি, কিংবা কথাও হয় নি! অনেককে তো জানানোই হয় নি ভালোবাসার কথা। তালিকায় মাঝে মাঝে সংযোজন হয়, তবে বিয়োজনের কোন 'অপশন' খোলা নেই এখানে।

একবার মাথায় আসলো কী, আমার ঈর্ষার মানুষদেরও একটা তালিকা হওয়া প্রয়োজন। যেই ভাবা সেই কাজ। তখন দশম শ্রেণিতে পড়ি। ডায়েরিতে একটা পাতার উপর সাইন পেন দিয়ে শিরোনাম লিখলাম: 'আমি যাঁদের ঈর্ষা করি'। ইতিহাস ক্লাসে স্যার সীরাতের ওপর আলোচনা করছিলেন। বেশ কিছুক্ষণ অতিবাহিত হবার পর আমি খুব তাড়াতাড়ি ডায়েরি খুলে সেই পাতার শুরুতে লিখে ফেললাম:
১। খাদীজা বিনতু খুয়াইলিদ [রা.]

সামনের সারিতেই ছিলাম আমি। স্যার এদিকে খেয়াল করে কিছুটা অপ্রস্তুত হলেন। এতক্ষণ যে খাতায় নোট করছিলাম, সেটা বাদ দিয়ে হঠাৎ ডায়েরি খুলতে দেখে স্যার মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলেন, 'দেখতে পারি কবি সাহেব?' আমি এগিয়ে দিলাম। স্যার পড়ে শোনালেন:
আমি যাঁদের ঈর্ষা করি
১। খাদীজা বিনতু খুয়াইলিদ [রা.]

কেনো এই ঈর্ষা?
বলছি!
তার আগে একটু গল্প করি। জীবনের গল্প। সত্য গল্প।

তখন ক্লাস থ্রি-তে পড়ি আমি। আবুব্বরের স্বপ্নের স্কুল 'আল-ইহসান একাডেমি' তখন ফুল্ল-ফুলেল হতে শুরু করেছে। চারপাশের জগৎটাকে কিভাবে দেখতে হয়, শেখাতে শুরু করেছেন আবুব। বিকেল বেলা বাড়ির ছাদে আবুব, আমি আর রুবাইয়া - তিনজনের আড্ডা হতো। পিঁয়াজ-তেলে মুড়ি ভাজা নিয়ে এসে আম্মুও যোগ দিতেন মাঝেমধ্যে। আড্ডা বলতে আব্বর গল্প বলা, সাথে নিয়ে আসা নতুন কোনো ম্যাগাজিন বা বইয়ের চমকপ্রদ অংশটা আমাদের পড়ে শোনানো- এই তো। দুয়েকটা বাড়ি ছাড়া তেমন কোথাও টিভি ছিলো না। মোবাইল ফোন আগমনের কথাবার্তা আশেপাশে শোনা যাচ্ছিলো, তবে আমাদের বাড়িতে আসে নি তখনো। অবসর কাটানোর জন্যে বই ছাড়া অন্য কোন উপায়-উপকরণের সাথে আমাদের তখনো পরিচয় ঘটে নি। কত চমৎকার ছিলো আমাদের সেই সুনির্মল-সুবিমল বিকেলগুলো!

যা-ই হোক, সেই আসরে একটু একটু করে প্রিয় নবীজিকে [] জানতে শুরু করেছি। জন্মের আগে বাবা হারানো, খুব শৈশবে প্রিয়তমা মায়ের বিদায়, তারপর দাদা-কে হারানো, একে একে চাচা-ও! আবুব যখন এসব গল্প আমাদের শোনাতেন, তখন ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু গন্ডদেশ বেয়ে গড়িয়ে যেতো আপনাতেই। প্রিয় নবীজির [*] প্রতি অন্য রকম ভালোবাসার অঙ্কুরোদগম হচ্ছিলো হৃদয়ে। টেপরেকর্ডারে আমাদের খুব গান শোনার বাতিক ছিলো। আমি আর রুবাইয়া কতবার টাকা জমিয়ে সেই ফিতাওয়ালা ক্যাসেটগুলো কিনেছি! ক্যাসেটের দুই দিকে কলম ঢুকিয়ে ফিতা ঘোরানোর স্মৃতিগুলো সহসা ভুলে যাবার মত নয়! তখন আশেপাশে সব পিচ্চিদের কাছে প্রিয় ছিলো শিশুশিল্পী হাসনা হেনা আফরিনের গান। সাইফুল্লাহ মানছুরকেও শোনা হতো প্রচুর। এরই মধ্যে ছোটাচ্চু নিয়ে এলেন নতুন এক অ্যালবাম। খুব আগ্রহ ভরে শুনলাম সবাই মিলে। ছোটদের কণ্ঠে গাওয়া একটা গানা কিভাবে যেন বুকের অনেক গভীরে বিঁধে গেলো:

জন্ম যদি হতো মোদের রাসূল পাকের কালে
আহা, রাসূল পাকের দেশে!
মোদের তিনি কাছে টেনে চুমু দিতেন গালে
আহা, কতই ভালোবেসে!

গুণগুণ করে সারাদিন শুধু এই গান গেয়েছি গভীর অনুরাগে। নামটা ঠিক স্মরণ নেই, তখন কী যেন একটা মাসিক পত্রিকায় সিরিজ লেখা চলছিলো: 'মহানবীর [] বাড়িতে একদিন'। আব্বু আমাকে সাথে নিয়ে পড়তেন সেই লেখাগুলো।
রাসূলুল্লাহর [] সুন্নাহর সাথে একটা নিবিড় সম্পর্ক তৈরি করে দিতে আব্বুর ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে থাকবে জীবনে। পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে আগে সালাম দেয়া, মুচকি হাসা, হাঁচির জবাব দেওয়া- এরকম অনেক চমৎকার অভ্যাসগুলোতে অভ্যস্ত হয়েছি তাঁর হাত ধরে। খাবারের ক্ষেত্রেও তা-ই। পানি পাত্রে দেখে নিয়ে তিনবারে বসে খাওয়া, পেটভর্তি করে খাবার না খাওয়া- শৈশব থেকে এসব সুন্নাহ'র সাথে পথচলা শুরু হয়েছিলো, আলহামদুলিল্লাহ। একদিন প্রিয় নবীজির পোষাকের প্রসঙ্গ এলো। আমি তখন কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়ি, প্রচলিত পোষাক পরিধানেই অভ্যস্ত। নবীজির [] পোষাকের কথা জানার পর খুব শখ করে আব্বকে আবদার করলাম লম্বা জামা বানিয়ে দিতে।

সব ঠিক আছে, বিপত্তি অন্য জায়গায়। আমার যে দাড়ি নেই! কী হবে এখন? রুবাইয়ার সাথে গোপনে পরামর্শ করে স্থির করলাম, কলম দিয়ে মুখে দাড়ি আঁকা হবে! ব্যস, যেমন ভাবা তেমন কাজ; আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভালোভাবে দাঁড়ি আঁকা হলো। স্কুলে তো সবাই হেসে কুটি কুটি! আমার এমন পাগলামোতে দুজন মানুষ হাসতে হাসতেই উৎসাহ যুগিয়ে যেতেন- শামসুল ইসলাম স্যার এবং তাজুল ইসলাম স্যার। বাড়িতেও একই অবস্থা, কারো হাসি থামে না। ব্যতিক্রম আম্মু আর দাদা। আব্বু প্রাণ খুলে হাসেন। ভালোবাসার পরিমাণটা মধ্যে একবার এতোই বেড়েছিলো, যখন শুনলাম প্রিয়নবীজি [] জুতো সেলাই করেছেন, আমিও একবার সেলাই করেছি নিজ হাতে! আব্বু অবশ্য পরে বুঝিয়ে দিয়েছেন, আমাদের জন্যে কোন্ কোন্ সুন্নাহ অবশ্যপালনীয়, কোনটা পালন করা ঐচ্ছিক এবং কোনটা পালন করতে প্রিয়নবী [] নিজেই নিষেধ করেছেন।

এসবের মধ্য দিয়ে ক্রমান্বয়ে জীবনের 'রোল মডেল' হিসেবে রাসূলুল্লাহকে গ্রহণ করার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাতে আমি প্রশিক্ষণ পেয়েছি শৈশবে, লিল্লাহিল হামদ। সেই যে আমার ভালোবাসা, ভালো লাগা আর আবেগ-অনুরাগের পাত্র বানিয়েছি চর্মচোখে না দেখা এই প্রিয় মানুষটিকে, একটু বড় হয়ে যেখানে যা পেয়েছি সীরাত বিষয়ে, বুকে জড়িয়ে নিয়েছি পরম মমতায়।

আমার সীরাত পাঠের একটা দিক হোল, রাসূলুল্লাহর [] জীবনের কোনো অংশের সাথে কোনোভাবে জড়িত সৌভাগ্যবান মানুষগুলোর প্রতি ক্রমশ দুর্বলতা অনুভব করি এবং ভালোবাসা মিশ্রিত একটা অস্ফূট ঈর্ষা জেগে ওঠে। আর আমার গুনগুন করে গাওয়া গানটা বারবার তাড়া কওে ফেরে মন-মুকুরে: 'জন্ম যদি হতো মোদের...'!

ক্লাসে সীরাত আলোচনার সময় খাদীজাহ'র [রা.] প্রসঙ্গটা এভাবে হৃদয়তন্ত্রীতে এসে বাজছিলো। প্রথম ওয়াহি অবতরণের ঘটনায় প্রিয় নবীজি কতটা অপ্রস্তুত এবং শঙ্কিত হয়েছিলেন, আমরা তো জানি-ই। চিন্তা করুন, খাদীজা কত সুন্দর ভাবে তাঁকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন! ভরসা এবং অভয় দিয়েছিলেন! আপনি ভাবতে পারবেন না, রাসূলুল্লাহ [] এমনকি সে সময় প্রাণনাশেরও আশঙ্কা করেছিলেন [বুখারী]। কিন্তু কী যাদু ছিলো এই রমণীর কথায়, কেমন নিশ্চেতন করা অনুভবের সহযোগ ছিলো তাঁর ভরসায়, যে কথা ও ভরসার পাখায় ভর করে আল্লাহপ্রদত্ত দায়িত্ব নিশ্চিন্ত মনে কাঁধে তুলে নেওয়ার আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলেন রাসূলুল্লাহ []?

শুধু তা-ই নয়, নিজের সঞ্চিত সমস্ত বৈভব নবুওয়তি মিশনের জন্যে চোখ বন্ধ করেই বিলিয়ে দিলেন! কতটুকু প্রশস্ত হৃদয়ের অধিকারী হলে মানুষ এমনটি পারে, বলুন? সবচে' বড়ো কথা, ঘোর তমসার বুক চিরে যেই মশালটি উন্মেষের অপেক্ষায় ছিলো, দমকা হাওয়ায় সেই মশালটিকে প্রথম শক্ত হাতে ধরেছিলেন এই সাহসী রমণী-ই! তাঁকে না করে আর কাকে ঈর্ষা করবো আমি?

আমার ঈর্ষার তালিকায় দু নম্বরে ছিলেন আবূ বাকর আস-সিদ্দীক [রা.]। কতটুকু দুর্বিনীত প্রত্যয়ের অধিকারী হলে বিনীত বিশ্বাসে এভাবে কেউ মস্তক অবনত করতে পারে, ভেবে দেখেছেন? হিজরতের সেই সময়টার কথা ভাবুন! সাওর গুহার অনিশ্চিত রাত্রিগুলো! ভাবা যায়? প্রিয়নবীর [] ভালোবাসায় বিষাক্ত নাগিনীর দংশন নীরবেই সয়ে যাওয়া! আহ! শুধু কি আমিই ঈর্ষা করি? 'উমার রা.-ও কিন্তু তাঁকে ঈর্ষা করতেন। ঐ যে, এক তাঁবুতে সুজনহারা বৃদ্ধার সেবা করতে দুজনের প্রতিযোগিতা! জানেন-ই তো!

সাওর গুহার বিপদসংকুল সময়গুলোতে আরেকটি গল্প আমরা জানি। চারিদিকে শত্রুর আনাগোনা। শত্রু আবার কী? রক্ত-পিপাসার নেশায় উন্মত্ত হিংস্র হায়েনা যেন! শিকার পেলে যে কি না এক্ষুণি ঝাঁপিয়ে পড়বে জান্তব উল্লাসে। তার ওপর আবার গোপন নজরদারি। চিন্তা করুন, সেই কঠিন থেকে কঠিনতর সময়গুলোতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নবীজি [] এবং আবু বাকর কে খাবার পৌঁছিয়ে দিতেন একজন নারী! বাইরের পরিস্থিতিও তাঁদেরকে কৌশলে জানিয়ে দিতেন তিনি। শুধু কি তা-ই? রাসুলুল্লাহ এবং আবু বাকরের অবস্থান সম্পর্কে তাঁকে আবু জাহেলের মতো বীভৎস ভয়ঙ্কর নরপশু জিজ্ঞাসাবাদ করলেও তিনি মুখের উপর সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, 'আল্লাহর কসম! আমি জানি না!' নির্দয় আবু জাহেলের হাতে তিনি প্রহৃতা হলেন, তবু মুখ খোলেন নি। কে তিনি?

ঠিক ধরেছেন, তিনি আসমা বিনতু আবি বাকর [রা.]! ইনি আমার ঈর্ষার তালিকায় তৃতীয়।

মদিনায় আগমনের পর ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা হেলেদুলে প্রিয়নবীজিকে [] স্বাগত জানাচ্ছিলো। গলা ছেড়ে গাইতে থাকে: তালা'আল বাদরু 'আলাইনা...। আহ, আমি যদি থাকতাম মদিনার সেই কিশোরদের দলে!

তারপর... তারপর... সবার মনেই সুপ্ত বাসনা, নবীজি [] যদি আমার বাড়িতে আতিথেয়তা গ্রহণ করতেন! নিজেকে ধন্য করার জন্যে সবাই উৎসুক। সেই প্রতীক্ষারও কত পবিত্র অনুভূতি! অবশেষে কী হোল? সেই সৌভাগ্যের অধিকারী হলেন সাহাবী আবু আইয়ুব আল-আনসারী [রা.]। কত না ভাগ্যবান তিনি! না, শুধু তিনি নন, তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীও রাসূলকে নিজেদের ঘরে অতিথি হিসেবে পেয়ে যারপরনাই উদ্বেল হয়েছিলেন। প্রিয়নবীজির [] ইচ্ছে অনুযায়ী তাঁকে নিচতলায় শোয়ার ব্যবস্থা করে তাঁরা দুজন দোতলায় শুয়েছিলেন। মজার বিষয় হোল, তাঁরা কিন্তু একরত্তি ঘুমোতে পারেন নি রাত্রে। কেন? দুজনেই খুব অস্বস্তিতে ছিলেন, ভাবছিলেন, প্রিয়নবীকে নিচ তলায় রেখে তাঁদের এখানে অবস্থান করাটা তাঁর শানে কোন গোস্তাকি হচ্ছে না তো! আরেকবার ভাবলেন, দুজনের অবস্থানটা ঠিক বরাবর রাসূলের মাথার উপরেই হচ্ছে না তো! এ জন্যে বারবার বিছানাটা এদিক ওদিক করেছেন। এরই মধ্যে ঘটে গেল আরেক ব্যাপার, এই অস্বস্তিকর সময়ে অস্থিরতায় তাদের পানির কলসটা হঠাৎ হেলে পড়লো। আর যায় কই, সব পানি গড়িয়ে যেতে লাগলো। দুজন তো ভয়ে, শঙ্কায় আরো অস্থির হয়ে উঠলেন! কী আর করবেন, নিজেদের কম্বলটাই পানির উপর দিয়ে দিলেন, যাতে কম্বল পানি চুষে নেয় এবং গড়িয়ে নিচ তলায় না যায়; ওখানে যে প্রিয়নবী শুয়ে আছেন! আহারে, পুরো রাত তাঁরা ঠক্ ঠক্ করে কাঁপলেন। সকালে এই ব্যাপার রাসূলুল্লাহ [ﷺ] শুনতে পেলেন এবং সেদিন থেকে তিনি তাদের নিচতলায় পাঠিয়ে দিয়ে নিজে দোতলায় অবস্থান গ্রহণ করলেন।

গল্প তো শুনে ফেলেছেন! ব্যাপার হোল, আমার ঈর্ষার তালিকায় চতুর্থ এবং পঞ্চম হলেন ইনারা দুজন!

সেই হিজরতের সময়কারই আরেকটি চমৎকার গল্প বলি।

প্রিয়নবীকে পেয়ে সবার মনেই খুশির জোয়ার। কে কী গিফট করবেন রাসূলকে, কূল-কিনারা পাচ্ছেন না। আবেগঘন আনন্দের সময় যা হয় আর কি! কেউ তাঁকে কবিতা নিবেদন করছেন, কেউ তাঁর নিজ বাগান থেকে খেজুরের থোকা নিয়ে আসছেন... এই এই আরো কত কী!

কিন্তু একজনের নিবেদন ছিল একেবারেই ব্যতিক্রম! তাঁর সাধ্যে এমন কিছু ছিলো না, যা তিনি প্রিয়তম রাসূলকে নিবেদন করবেন। অবশেষে নিজের কিশোর পুত্রকেই প্রিয়নবীর [ﷺ] কাছে পেশ করলেন। পুত্রও যারপরনাই খুশি হয়ে রাসূলের [ﷺ] ছায়ায় নিজেকে ধন্য মনে করলেন! বলুন, এর চে' বড়ো আন্তরিক নিবেদন আর কী হতে পারে?
কে তিনি? তিনি ধন্য রমণী গুমাইছা বিনত মিলহান [রা.]। আর কে সেই ভাগ্যবান কিশোর? তিনি আনাস ইবন মালিক [রা.]।

অতঃপর তালিকার ষষ্ঠ ও সপ্তম অবস্থানে থাকা দুজন ভাগ্যবতী ও ভাগ্যবানের সাথে আপনারা পরিচিত হলেন।

এবারের গল্প শুনে তো আপনি নিজেই ঈর্ষায় জ্বলে পুড়ে মরে যেতে চাইবেন!

চোখ বন্ধ করে কল্পনা করুন তো, রক্তে-মাংসে গড়া একজন মানুষের কাছে স্বয়ং জিবরীল [আ.] এসে সালাম পৌঁছাবেন; তিনি কী দুর্দান্ত সৌভাগ্যের অধিকারী! পৃথিবীতে তো বটেই, জান্নাতেও রাসূলুল্লাহর [ﷺ] সাহচর্যের সুসংবাদ পেয়েছেন আল্লাহর কাছ থেকেই!

আপনি ভাবছেন, ইনি মানুষ না অন্য কিছু!?

হুমম! তিনি হলেন 'আয়িশা বিনত আবি বাকর [রা.]। আক্ষরিক অর্থেই একজন Polymath ছিলেন তিনি। কবিতা ও কাব্যতত্ত্বে অগাধ পান্ডিত্য তাঁর। চিকিৎসাবিদ্যায় ছিলেন পারদর্শী। ভাষার বিশুদ্ধ উচ্চারণের ব্যাপারে কানাকড়ি পরিমাণ ছাড় দিতেন না তিনি। হাদিসশাস্ত্রেও তাঁর অবদান অনবদ্য। সাহাবী আবূ মূসা আল-আশ'আরীর [রা.] স্বীকৃতি শুনুন, 'আমাদের কোনো হাদিসের ব্যাপারে যদি কোনো সন্দেহ হত, তখন 'আয়িশাকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হতে পারতাম।'

মাদরাসার ছাত্ররা জানেন 'ইলমুল ফারায়িদ্ব (ইসলামী উত্তরাধিকার বণ্টন নীতি) কত জটিল এবং সূক্ষ্ণ বিষয়। বিষয়টা যদি কারো কাছে কঠিন মনে হয়, চিন্তিত হবেন না, সাহাবীরাও [রা.] কিন্তু মাঝে মাঝে সমস্যায় পড়ে যেতেন এই বিষয়টিতে। তখন তাঁরা কী করতেন জানেন? 'আয়িশার [রা.] কাছে চলে আসতেন সমাধানের জন্যে!

সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারীদের মধ্যে তো আছেন-ই তিনি (মোট ২২১০টি)।
জীবনের অন্তিম সময়ে প্রিয়নবীকে [ﷺ] আগলে রেখেছিলেন তিনি। তাঁর সান্নিধ্যেই প্রিয়নবী আল্লাহর কাছে চলে গিয়েছেন। তাঁর কক্ষেই প্রিয়নবী-কে [ﷺ] সমাহিত করা হয়েছে। কত না সৌভাগ্যবতী তিনি! তিনি আমার অষ্টম ঈর্ষা।

আচ্ছা বলুন তো, প্রিয়নবীকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করার ক্ষেত্রে তাঁর চে' বেশি কে পারঙ্গম? রাসূলের এমনই কাছের মানুষটিই তো ভালো বলতে পারবেন, কেমন ছিলেন তিনি! আবার প্রিয়নবীর চরিত্র, স্বভাব ইত্যাদির সাথে কার বেশি মিল আছে, সেটাও অন্যদের চে' নিশ্চয় তিনি ভালো বলতে পারবেন! তাই না?

তবে শুনুন তাঁর কথা: 'আমি কথাবার্তা, আচার-আচরণে রাসূলের [ﷺ] সাথে সাদৃশ্যময় ফাতিমার চে' আর কাউকে দেখি নি। এমনকি তাঁর হাঁটা-চলাও ছিলো রাসূলের হাঁটা চলার মত। [বুখারী]

কখনো কোনো পুরুষ সাহাবীর ব্যাপারে এমনটি শুনেছেন আপনারা কেউ? ভগিনীগণ গর্ব করতে পারেন এটা নিয়ে! আর হ্যাঁ, চুপিসারে বলে রাখি, নবীজির [ﷺ] ভাষ্যমতে জান্নাতে আপনাদের মধ্যমণি হবেন কিন্তু ফাতিমা [রা.]! প্রিয়নবী এতোটাই ভালোবাসতেন তাঁকে, কখনো কোনো সফর থেকে ফিরলে প্রথমেই মসজিদে ঢুকে দু রাকাত সালাত আদায় করতেন, এরপর ফাতিমার গৃহে গিয়ে তাঁর খোঁজ-খবর নিতেন, তারপর উম্মাহাতুল মুমিনীনদের খোঁজ নিতেন।

ঈর্ষা রে ঈর্ষা! কী আর করা, তালিকার নয় নম্বরে তাঁকে নিয়ে নিলাম।

আমরা শেষ পর্যায়ে এসে পড়লাম। দশম ঈর্ষার কথা বলবো। এবার একটু পেছন ফিরে তাকাই। আপনাদের মনে আছে, মাক্কী জীবনের সেই আগুনঝরা দিনগুলোর কথা? সেই রক্তপিচ্ছিল পথের যাত্রীদের তেজোদ্দীপ্ত ঈমান! কল্পনা করতে পারেন? একজন স্বাধীন মানুষ যেখানে ঈমানের ঘোষণা দেয়ার সাথে সাথেই পাশবিক নির্যাতন আর লাঞ্ছনার যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হতেন, সেখানে একজন ক্রীতদাসী কতটুকু ঈমানের জোর হলে কালিমার দৃপ্ত উচ্চারণের সাহস করতে পারেন? ভেবেছেন কখনো?

বলছিলাম আম্মার [রা.]-এর স্নেহময়ী জননী সুমাইয়ার [রা.] কথা। চিন্তা করুন, অমানুষিক নির্যাতনের মুখে এই মহিলা যদি একটিবার শুধু বলতেন, 'আমি দ্বীন ত্যাগ করলাম', তাহলেই নিষ্কৃতি পেতেন। কিন্তু এই একটি বাক্য উচ্চারণ করা তাঁর কাছে পাশবিক নিষ্পেষণ সহ্য করার চেয়েও বেশি ভয়ানক কঠিন মনে হয়েছিল! নরপিশাচ আবু জাহল নির্মম ভাবে বল্লমের আঘাতে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আমাদের বোনটিকে শহীদ করেছিলো! গ্রহণযোগ্য ইতিহাসগ্রন্থ সমূহের অন্যতম 'তাবাকাত ইবন সাদ'-এর ভাষ্যমতে, দ্বীনের জন্যে এটিই ছিল ইতিহাসের প্রথম আত্মত্যাগ।

লক্ষ্য করেছেন নিশ্চয়ই, আপনাদের জানাশোনা অনেক সাহাবীর কথা-ই এখানে আসে নি, তাই না? আমার অধ্যয়নবিচ্ছিন্নতার কারণে একেক জায়গায় একেকজনের কথা লিপিবদ্ধ করেছি। কখনো কখনো এমন হয়েছে, কোনো কোনো সাহাবীর জীবনকাহিনী খুব ছুঁয়ে গেছে আমাকে, কিন্তু ঐ সময়টাতে লেখার সুযোগ করে নিতে পারি নি। তবে এই দশজনের কথা একটি ডায়েরিতেই লিখেছিলাম। আমার ঈর্ষাপ্রবণতার যখন সূচনালগ্ন, তখন এঁদের সাথে আমার পরিচয়। তাই সেই ডায়েরির দশটা নাম আমার কাছে অত্যুজ্জ্বল অনুক্ষণ। এই যে তাঁদের দশজনকে নিয়ে এতক্ষণ গল্প করলাম, তার কারণ হচ্ছে, আজকে হঠাৎ করে ডায়েরিটা উল্টাতে উল্টাতে আবিষ্কার করলাম, এখানে পুরুষ সাহাবী ও নারী সাহাবীর অনুপাত হচ্ছে ৩:৭। কী আশ্চর্য, আমার ঈর্ষার প্রথম তালিকায় প্রথম দশজনের সাতজন-ই নারী সাহাবী! খুব উৎফুল্লচিত্তে ছোটবোনকে দেখালাম। অনেকক্ষণ ধরে গল্প করলাম আমাদের মুগ্ধতা ও অনুপ্রেরণার এই মানুষগুলোকে নিয়ে। সদ্য-আবিষ্কৃত অনুপাতটা ওকে দেখিয়ে সহসা-ই আমার মুখ থেকে উচ্চারিত হল আপনাতেই: ‘জাগো গো ভগিনী!’ সেই শব্দবন্ধ দিয়েই এই প্রবন্ধগল্পের শিরোনাম বাছাই করলাম। এই বইয়ের নারী পাঠকদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, সম্ভব হলে লেখাটা আরেকবার পড়বেন, জেগে ওঠার বিশুদ্ধ প্রাণনায় প্রাণিত হবেন।

টিকাঃ
১ গানটির গীতিকার ও সুরকার আবুল আলা মাসুম

📘 শেষরাত্রির গল্পগুলো > 📄 আমি নিষ্পাপ হতে চাই

📄 আমি নিষ্পাপ হতে চাই


ইশশ! সেই নিষ্পাপ শৈশবে যদি একটু ফিরে যেতে পারতাম! দুধেল সাদা শৈশব! শুভ্র-সফেদ শৈশব! পঙ্কিলতাহীন শৈশব! পবিত্রতার আবেশ জড়ানো শৈশব!

কে না চায়, নিজের সব ভুল-ভ্রান্তিকে পেছনে ফেলে অনাবিল স্নিগ্ধতায় ভরপুর সেই শৈশবে ফিরে যেতে?

এই যে আমরা, তারুণ্যের উচ্ছ্বলতায় ভরপুর জীবন যাদের, পথ চলতে চলতে হঠাৎ করেই ইচ্ছে হয়, সব মায়া-মরীচিকার জটিল অঙ্ক বাদ দিয়ে আলোয় আলোয় ভরা সরল-ঋজু দিনগুলো আরেকবার আপন করে পেতে!

বিশ্বাসী হৃদয় এই বাসনায় উদগ্রীব থাকে একটু বেশি-ই। এই বাসনার সাথে জড়িয়ে আছে মহাসমুদ্ররূপী মহাকালের ঠিক মাঝখানে হাবুডুবু খাওয়ার গ্লানি থেকে পরিত্রাণ পাবার সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা।

তারুণ্য বা বার্ধক্যকে পেছনে ফেলে শৈশব ফিরে পাওয়া আদৌ সম্ভব নয়, তবুও এই কল্পনার জগতে পরিভ্রমণের সময় নিজেকে বিশুদ্ধতার সফেদ উত্তরীয়তে জড়াবার যে স্বপ্ন লুকিয়ে থাকে অন্তরে, সেই স্বপ্নের মুখে একটু আলোর ঝলক দেয়ার জন্যে আমাদের এবারের আসর। আসর শুরু করার আগে আমরা এই ধরনের ভাবনা-পরিবাহী একটি কবিতার সাথে পরিচিত হয়ে যাই।

ইংরেজি সাহিত্যে মেটাফিজিক্যাল ধারার কবিদের একজন হেনরি ভন (Henry Vaughan); তাঁর বিখ্যাত The Retreat[১] কবিতাটি আমরা এখানে কাব্যানুবাদের চেষ্টা করেছি, প্রবহমান মাত্রাবৃত্ত ছন্দে।

কত না স্নিগ্ধ ছিলো পেছনের ফেলে আসা দিন সব!
ফেরেশতাদের মতো আলোকিত ছিলো সেই শৈশব!
হয় নি যখন এই পৃথিবীকে গভীর দেখা,
এবং ধরার জীবনে নিজের নামটি লেখা;
সস্তা এসব তত্ত্বীয় প্যাঁচ আমার যখন হয় নি শেখা-
তখন আমার শুভ্র ভাবনা জুড়ে ছিল এক অপার্থিব সৌরভ!

আমার প্রভুর ভালোবাসা থেকে আসি নি তখনো অনেক দূরে,
ওখানে দাঁড়িয়ে দেখতে পেতাম তাঁর আলোটাকে দৃষ্টি জুড়ে,
ঘণ্টাখানেক সময় ধরেই আমার আত্মা এক নিমেশে-
মিশে যেতো সেই স্বর্ণালী মেঘ কিংবা পুষ্পরাজির দেশে!
কিছু অনন্ত ছায়া-ই মূলত আসত এসব খুব সাধারণ জ্যোতির বেশে!

তখন আমার ভাষায় ছিলো না রুক্ষ-কঠিন ছাপ,
আমার হৃদয়ে সরব হয় নি তখনও কোনো পাপ!
এমন কলুষ স্বভাব ছিলো না, ইন্দ্রিয়কে যা দিয়ে প্ররোচিত করা যায়
অনুক্ষণ পাপের কাছেই নিয়ে।
বরং আমার দেহ-মনে শুধু অনুভব হতো সেই-
অনন্ত থেকে আসা উজ্জ্বল জ্যোতির দীপ্তিকেই!

জানি না এখন কিভাবে যে আমি এতদূর যাবো ফিরে!
সেই সে পুরনো পথে-প্রান্তরে হাঁটতে আবার ধীরে!
যেখানে ছিলাম ভাসুর আমি প্রাণে আর প্রাণনায়,
প্রথম সোনালি শৈশব রেখে এসেছি যেখানে হায়,
দেখতো শহর আলোর মনন তাল-তমালের ছায়!

কিন্তু আমার আত্মা এখানে কাটিয়েছে আহা অনেক কাল!
হয়ে গেছে তাই উন্মাদ-সম, চলতে গেলেই টালমাটাল!
মানুষেরা নাকি সামনে যেতেই স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজে পায়
কিন্তু আমার হৃদয়টা আজ কেবল পেছনে ফিরে যেতে শুধু চায়!

আরেকবার পড়ুন তো! আমাদের অব্যক্ত অনুভূতিগুলো কী অপূর্ব ব্যঞ্জনায় ব্যক্ত করেছেন কবি! তাই না?
চলুন, এবার আমরা আমাদের সেই স্বপ্নিল পথে হাঁটা শুরু করবো। খুব কঠিন কিছু ভাবছেন? আরে নাআআ, একদম সহজ, দেখুন না!
আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন, হ্যাঁ!

এই পথে হাঁটতে গিয়ে পথিকদের কাছ থেকে আমরা কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হবো-
> আমি কিভাবে পাপ-পঙ্কিলতামুক্ত হবো? নিষ্পাপ হওয়া কি সম্ভব?
> আমার এত্ত এত্ত পাপ! আল্লাহ ক্ষমা করবেন তো!?
> আমি বারবার ফিরে আসি, কিন্তু নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারি না। পাপে জড়িয়ে যাই!

এই তিনটি মৌলিক প্রশ্ন / সংশয় / জড়তা- যাই বলুন- এগুলো আমাদের স্বপ্নিল পথে হাঁটার সামনে কাঁটা হয়ে থাকে। আমরা এই কাঁটাগুলো একটি একটি করে তুলে ফেলতে চাই। চলুন তাহলে... বুকে হিম্মত রেখে সন্তর্পণে শুরু হোক যাত্রা!

আমি কিভাবে পাপ-পঙ্কিলতামুক্ত হবো? নিষ্পাপ হওয়া কি সম্ভব?

আমরা অত থিওলজিক্যাল কথাবার্তায় যেয়ে কী করবো? চলুন, গল্প করতে করতে এগিয়ে যাই!


ছোটভাই নাফিস অনেকক্ষণ ধরে পেন্সিল দিয়ে কি জানি আঁকছিলো খাতায়। আঁকা শেষ হবার পর বোধহয় ওর মনঃপুত হয় নি, অঙ্কিত দৃশ্যের প্রতি একরাশ বিরক্তি ঝরিয়ে সে রাবার দিয়ে মুছে ফেললো, পুরো পৃষ্ঠাটাই পুনরায় সাদা হয়ে গেলো। চাচ্চু আর আমি গপ্পো করছিলাম, দুইজনেই কথা থামিয়ে ওর কান্ডকারখানা দেখছিলাম। চাচ্চু যথারীতি ভাবুক হয়ে ওঠলেন,
আচ্ছা, নজীব! আমাদের জীবনটাও এমন হলে কেমন হতো! জীবনের ভুলগুলো যদি এক নিমেষেই মুছে ফেলা যেতো! কিংবা জীবনের কোনো একটা অধ্যায়কে যদি ঠিক এভাবেই দৃশ্যপট থেকে আড়াল করে দিয়ে ধবধবে সাদা করে দেয়া যেতো! আহ! সেরকম একটা রাবার থাকলেই হতো!
কম্পোজে আমার হাত মোটামুটি দ্রুত চলে। বেশ কিছুক্ষণ ধরেই এম এস ওয়ার্ডে একটা প্রবন্ধের ফরম্যাট খসড়া করছিলাম। কিন্তু প্রতিবারই পরিবর্তন-পরিবর্ধন করার পরও মনে ধরছিলো না। রুমমেট খুব মনোযোগ দিয়ে আমার টাইপিং দেখছিলো। সবার জানার কথা, লেখার সময় Ctrl+Z প্রেস করলে বর্তমান অবস্থা থেকে পুরনো অবস্থায় ফিরে যাওয়া যায়, যেটাকে কম্পিউটারের পরিভাষায় আমরা 'undo' বলে থাকি। রুমমেট একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলছিলো,
জীবনে যদি একবার একটা Ctrl+Z অপশন পাইতাম, নতুন করে জীবনটারে সাজাইতাম! আমার পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য একটা Ctrl+Z অপশন থাকতো যদি...!


আমরা যাঁরা নিষ্পাপ হতে চাই, আমরা তো ঠিক এমনটাই কল্পনা করি, নাকি? আপনিও কি সেরকম একটা রাবার খুঁজছেন? অথবা একটা Ctrl+Z অপশন খুঁজে বেড়াচ্ছেন? চিন্তার কারণ নেই, আমিই খুঁজে দিচ্ছি আপনাকে। সেই রাবার অথবা Ctrl+Z অপশন-এর আল্লাহ প্রদত্ত নাম হচ্ছে: 'আত-তাওবাহ'!
: কী বলছেন!? রাবার কিংবা Ctrl+Z অপশন এর মতো তাওবাহ কি আমাকে একেবারে সাফ-সুতরো করে দিতে পারবে? আমার এত্ত এত্ত পাপ আর ভুল-ভ্রান্তিকে কিভাবে মুছে দেবে?
: বুঝছি, আপনি তাহলে আশ্বস্ত হতে পারছেন না! এই নিন, আপনার জন্যে এক্কেবারে প্রিয়নবীজি [] থেকেই আশ্বাসবাণী নিয়ে এলাম:
"পাপ থেকে তাওবাহকারী ব্যক্তি সেই ব্যক্তির মতোই, যার কোন পাপ-ই নেই!!১।"

: চাচ্চু, রাবার পেয়ে গেছেন? ঝটপট মুছে ফেলেন তাইলে!
: ভাইয়া, Ctrl+Z অপশন পেয়েছো!? তাইলে তাড়াতাড়ি প্রেস করো!
চাচ্চু রাবার নিয়ে মেতে ওঠলেন। ভাইয়াটা সেই শবু প্রেস করে ফেললো।
আপনি পেরেছেন তো? না পারলে জলদি সেরে ফেলুন!

একটা কাঁটা সরে গেলো, আলহামদুলিল্লাহ। এবার আরেকটি কাঁটার সাথে বোঝাপড়া করবো আমরা। সেই কাঁটাটি হচ্ছে, তাওবাহ করার ক্ষেত্রে একটা সংশয় আপনাকে এসে বারবার খোঁচাতে থাকবে,

আমার এত্ত এত্ত পাপ! আল্লাহ ক্ষমা করবেন তো!

এই সংশয় অমূলক কিছু নয়। তবে একইসাথে, এই সংশয় কিন্তু একেবারেই বালির বাঁধ! কেনো জানেন? উত্তরটা আল্লাহর কাছ থেকেই শুনে নেই:

قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ

"আপনি বলে দিন যে, (আল্লাহ বলেন) আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর যুলম করেছো, তোমরা আল্লাহ তা'আলার রহমত হতে নিরাশ হয়ো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ (অতীতের) সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করবেন; নিশ্চয়ই তিনি বড়ই ক্ষমাশীল, দয়ালু।১৯”

গভীর অনুভূতি দিয়ে একটু অনুভব করতে চেষ্টা করুন। এটা আমার নিজস্ব কোনো সান্ত্বনা নয়, বরং স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা কর্তৃক নিশ্চিত সত্য প্রতিশ্রুতি!
আপনার হতাশ হবার সুযোগ থাকে আর?
এবার একটা গল্প শোনাই।
বানানো গল্প নয়, আমরা নবীজির []-এর কাছ থেকেই গল্পটা শুনবো:
“তোমাদের পূর্বেকার জাতির একটি লোক নিরানব্বই জনকে হত্যা করে, এরপর সে সবচেয়ে বড় একজন জ্ঞানী লোকের (‘আলিমের) খোঁজ করে, তখন তাকে একজন ইবাদতগুজার ব্যক্তির কথা বলা হয়। সে তাকে গিয়ে বলে, আমি নিরানব্বই জন মানুষকে খুন করেছি, আমার তাওবাহ হবে? তিনি বললেন: না। অতঃপর তাকে হত্যা করে সে একশো জন লোক পূর্ণ করলো। অতঃপর সে একজন বিজ্ঞ ব্যক্তির খোঁজ করলে আরেকজন ‘আলিমের খোঁজ দেয়া হয়। সে তাঁকে গিয়ে বলে, আমি একশোজন লোক হত্যা করেছি, আমার কি তাওবা করার সুযোগ আছে? তিনি বললেন: ‘হ্যাঁ, আছে। কে তোমার ও তাওবার মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে?’ তুমি অমুক স্থানে যাও, সেখানে কিছু মানুষ রয়েছে যারা আল্লাহর ইবাদত করে, তুমি তাদের সাথে গিয়ে আল্লাহর ইবাদত কর। আর তুমি তোমার এলাকায় ফিরে যেও না। কেননা তোমার এলাকাটা খুব খারাপ। সে তখন যাত্রা শুরু করে। অর্ধেক পথ অতিক্রম করার সময় তার মৃত্যু এসে উপস্থিত হয়। অতঃপর তার ব্যাপারে রহমত ও আযাবের ফেরেশতারা বিবাদে লিপ্ত হন। রহমতের ফেরেশতারা বলেন: সে তাওবা করে আল্লাহর পানে ছুটে এসেছে। পক্ষান্তরে আযাবের ফেরেশতারা বলেন: সে কখনো কোনো ভালো কাজই করে নি। অতঃপর সেখানে মানুষের বেশে একজন ফেরেশতা আসেন। তারা তাকে বিচারক মানেন। তিনি বলেন: তোমরা দুদিকটা মেপে দেখ। সে যেদিকে অধিক নিকটবর্তী হবে, তাকে সেদিকের বলে ধরে নেয়া হবে। অতঃপর মেপে দেখা গেল যে, সে যেদিকে যাচ্ছিল সে দিকটাই নিকটে। এর ফলে তাকে রহমতের ফেরেশতারা নিয়ে যায়।”
এবার আমাকে বলুন, আপনার যাপিত জীবনে সঞ্চিত পাপগুলো কি এই লোকটার চেয়েও বেশি ভয়ানক? পরিমাণে অধিক?
একশোটা লোক হত্যা করার মত বিশাল পাপের বোঝা আপনার কাঁধে বর্তমান? এতো বড়ো ও অকল্পনীয় পাপের বোঝা নিয়েও কেউ যদি আল্লাহর অপরিসীম করুণার ছায়ায় জায়গা করে নিতে পারে, আমি বা আপনি কেন পারবো না? হাদিসের গল্পে দেখলেন তো! আল্লাহ্ কত বেশি করুণার আধার, চিন্তা করা যায়! বান্দাহকে ক্ষমা করার জন্যে কত বেশি উদগ্রীব, ভাবা যায়!

শুধু কি তা-ই? তাওবাহ করার পর আল্লাহ্ আপনার সমস্ত পাপকে পুণ্যে 'কনভার্ট' করে দেবেন! এই যে, আল্লাহ বলছেন:

وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَنُونَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ يَلْقَ أَثَامًا . يُضَاعَفْ لَهُ الْعَذَابُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَيَخْلُدْ فِيهِ مُهَانًا . إِلَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُولَئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا
"আর যারা আল্লাহর সাথে অন্য কোন মা'বুদের ইবাদত করে না এবং আল্লাহ যাকে (হত্যা করা) হারাম করে দিয়েছেন, তাকে হত্যা করে না শরীয়ত সম্মত কারণ ব্যতীত, এবং তারা ব্যভিচার করে না। আর যে ব্যক্তি এরূপ কাজ করবে, তাকে শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। কিয়ামাতের দিন তার শাস্তি বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং সে তাতে অনন্তকাল লাঞ্ছিত অবস্থায় থাকবে। কিন্তু যারা তাওবা করবে এবং ঈমান আনবে আর নেক কাজ করতে থাকবে, আল্লাহ তাদের পাপসমূহকে পুণ্যে পরিবর্তন করে দেবেন। আর আল্লাহ বড়ই করুণাময়।১৯”

এত্ত বড় সুযোগ কি হাতছাড়া করা যায়, আপনিই বলুন?

তাহলে আর দেরি কেন?

সব দ্বিধা-সংশয় ঝেড়ে ফেলে এক্ষুণি দুই হাত সঁপে দিন প্রিয়তম প্রভুর কাছে। অশ্রুর ফোঁটা নিবেদন করুন গভীর অনুরাগে।

দুইটি কাঁটার তো হিল্লে হোল! এবার আপনার মনে আরেকটা সংশয়ের আগমন:

তাওবাহ তো করেছি। প্রায়-ই করি। কিন্তু নিজেকে যে ধরে রাখতে পারি না!
একদমই চিন্তা করবেন না। আপনি ইতোমধ্যে দুটো স্তর পার হয়ে এসেছেন। এবারের স্তর পার হওয়ার চ্যালেঞ্জ আরো সোজা, ইন শা-আল্লাহ!

কিভাবে?
চলুন একজন ভাইয়ার গল্প বলি। তিনি বলছিলেন,
এইবার শেষ! নিজেকে এবার শক্ত করে শাসালাম, কোনভাবেই আর পাপে জড়ানো যাবে না। তাওবাহ করলাম, কয়দিন ভালো মতোই কাটলো। নাহ, শেষমেষ কিভাবে যে পাপটাতে আবার জড়িয়ে গেলাম! এমনটা প্রায়-ই হচ্ছে, ভাই! আমি মনে-প্রাণে চাই এই অবস্থা থেকে উদ্ধার পেতে। কিছু একটা বল ভাই!

আপনার এই সমস্যাটা যদি আমি একটু ব্যাখ্যা করে বলি, তাহলে দাঁড়ায়:

আপনি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার অবাধ্যতাকে খুবই গর্হিত এবং নিন্দনীয় কাজ মনে করেন। আপনার প্রিয়তম স্রষ্টা কর্তৃক নিষিদ্ধ কোনো বিষয়কে আপন করে নিতে আপনার মন সায় দেয় না। তবুও লক্ষ্যে-অলক্ষ্যে, সময়ে-অসময়ে আপনি তাতে জড়িয়ে পড়ছেন। তার জন্যে আবার প্রচণ্ড অনুশোচনাও হচ্ছে। তাওবাহ করে ফিরে আসার পর আপনার প্রতিজ্ঞা নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে; যার কারণে আবারো পুরনো পথেই হাঁটছেন। তারপর আবারও অনুশোচনায় পুড়ছেন!

মোটামুটি এই অস্বস্তিকর চক্র থেকে এখন আপনি মুক্তি পেতে চান। ঠিক ধরেছি না?

আপনার কিন্তু হতাশ হবার কিচ্ছু নেই!
আরেহ, আপনি নিজেই জানেন না, স্বয়ং আল্লাহ আপনাকে নিশ্চিন্ত থাকতে বলেছেন! বিশ্বাস হয় না?

বুঝেছি, আপনাকে চাক্ষুষ দেখাতে হবে আর কি! দেখুন, আল্লাহ আপনার জন্যে কী বলছেন:

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ
"নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন।"
চাট্টিখানি কথা?
খুব গভীরভাবে খেয়াল করে দেখুন, আল্লাহ আপনাকে ভালোবাসেন!
চোখ বন্ধ করে আবার কল্পনায় আনুন, আল্লাহ আপনাকে ভালোবাসেন!
হ্যাঁ, ভালোবাসেন! স্বয়ং আল্লাহ! আরশের মালিক! জ্বী, আপনাকেই!

এই যে পাপে জড়িয়ে যাবার পরই আপনি ফিরে আসছেন, আল্লাহ এ জন্যে আপনাকে ভালবাসেন।

তাওবাহ করার পর যখন আপনার প্রতিজ্ঞা নড়বড়ে হয়ে যায়, চোখ বন্ধ করে নিজেকে একটু স্মরণ করিয়ে দিন,
হে আমার আত্মা!
তুমি চেনো নিজেকে?
তোমাকে যে আল্লাহ ভালোবাসেন!
তুমি এই পবিত্র ভালোবাসার অমর্যাদা কিভাবে করবে?
তুমি অভিশপ্ত শাইত্বানকে সন্তুষ্ট করতে আরশের মালিকের ভালোবাসাকে পায়ে ঠেলে দিতে পারো না!
তুমি আমার প্রিয়তম স্রষ্টার ভালোবাসায় অবিশ্বাস ও অবাধ্যতার কালো ছাপ ফেলতে পারো না!
না, তুমি অত নীচ হও নি, হে প্রিয় আত্মা!
তোমার প্রভুর ভালোবাসাকে জলাঞ্জলি দিয়ে কোন্ মুখে তাঁর সামনে দাঁড়াবে, বলো?
দেখুন তো, এরপর চোখটা ছলছল করে ওঠে কি না! অনুভব করলে দেখবেন, চোখের এই জল আপনার হৃদয়ের কালিমা-মলিন পঙ্কিলতাকে ধুয়ে মুছে শুভ্র করে দিয়েছে কখন, আপনিই টের পান নি!
এবার বলুন, আপনার কি কোনো সুযোগ থাকে আর? পাপে জড়াবার? আল্লাহর অবাধ্যতার? নাফসের গোলামির?
খুব সাধারণ, সাদামাটা ও সহজ সমাধান, যদি আপনি আন্তরিকভাবে প্রয়োগ করতে পারেন।
একইসাথে, আপনি আপনার প্রিয়তম প্রভুর একটি মর্মভেদী আহŹানকে স্মরণ রাখতে পারেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحًا
“মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবাহ করো, আন্তরিক তাওবাহ!!”

এই যে আমরা বললাম, ‘আন্তরিক তাওবাহ’- এটা ঠিক কী রকম? এই অনুবাদ মূল আরবি শব্দবন্ধ ‘তাওবাতান নাসূহা’কে পুরোপুরি বিম্বিত করে নি, এই শব্দবন্ধের যথার্থ আবেদন কী, জানতে হলে আমাদেরকে যেতে হবে তাফসীরকারদের কাছে। দেখে আসি, তাঁরা কী বলেন। ‘তাফসীর শাওকানী’ আমাদের জানাচ্ছে, ‘তাওবাতান নাসূহা’ বলা হয় এমন তাওবাহ-কে, যে তাওবাহটি তাওবাহকারীকে প্রণোদনা যোগায় পূর্বেকার পাপের দিকে ফিরে না যেতে।[২]

আয়াতটা আবার পড়ুন। কথাটা কিন্তু আল্লাহর! বলা হচ্ছে আপনাকে লক্ষ করে! আপনার প্রিয়তম প্রভুর কথা আপনি রাখবেন না, এমনটা কী হয়, বলুন? কথাটা রাখতে হলে কী করা চাই? কিচ্ছু করতে হবে না, আজকের তাওবাহটাকেই ‘তাওবাতান নাসূহা’ করে ফেলতে হবে। ব্যস, আপনার কাজ শেষ!

এবার আপনার খুব পরিচিত একটি দু'আকে পুনর্বার স্মরণ করিয়ে দেই। আপনার মনোবল বৃদ্ধি করা, অটল থাকার স্পৃহা জাগ্রত রাখা এবং মানসিক সুস্থিরতার জন্যে আল্লাহর কাছে চাওয়া চাই অনবরত! প্রিয়নবীজি-ও [ ] তা-ই করতেন। তাঁর প্রিয় দু'আগুলোর মধ্যে একটি ছিলো এটি, যা আপনিও জানেন, কিন্তু ততবেশি গুরুত্ব দিয়ে কখনো ভাবেন নি। যদি মুখস্থ না থাকে, তবে আমার বিশ্বাস, দুই মিনিটের বেশি আপনার লাগবে না এটাকে 'ঠোঁটস্থ' করে ফেলতে! চলুন দেখি, কী সেই দু'আ!

اللَّهُمَّ مُصَرِّفَ القُلُوبِ صَرِّفْ قُلُوبَنا على طاعَتِكَ
“হে আল্লাহ! হে অন্তরসমূহ পরিবর্তনকারী! আমাদের হৃদয়গুলো তোমার আনুগত্যের ওপর অবিচল রাখো!”

আপনি আপনার প্রিয়তম প্রভুকে ভালোবাসেন। তাঁর অবাধ্য না হবার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করেন। আবার মাঝে মাঝে সুযোগ হলেই তাঁর কাছে আবেগভরা কণ্ঠে আবদার জানান, যেনো আপনার এই প্রচেষ্টায় তিনি সহায় হন, বারাকাহ ঢেলে দেন।
ব্যস, আপনার দিনগুলো আপনার প্রভুর সাথে অকৃত্রিম ভালোবাসা ও ভালো লাগায় কেটে যাবে। এই ভালোবাসায় চিড় ধরাতে পারবে না কেউ। কেউ-ই না!

যখন আল্লাহ আপনাকে ভালোবাসছেন, আপনিও তাঁর ভালোবাসার মূল্য দিচ্ছেন, তাঁর কাছে চাচ্ছেন, তিনিও অকাতরে ঢেলে দিচ্ছেন- বুঝতেই পারছেন, কী গভীর প্রীতির বন্ধনে আপনাকে জড়িয়ে নিয়েছেন আপনারই প্রভু! এই বন্ধন ছিন্ন করে কে?

চোখ বন্ধ করে দেখুন, দ্বীনের পথে আপনার অবিচল পথযাত্রার এই আনন্দকে আরো কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিতে আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেশতাগণ চলে এসেছেন ইতোমধ্যে! তাঁরা আপনার জন্যে জান্নাতের সুসংবাদ নিয়ে এসেছেন! এই দেখুন, কুরআন বলছে:

إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ
"নিশ্চয় যাঁরা বলে, আমাদের রব্ব আল্লাহ এবং তার ওপরেই অটল অবিচল থাকে, তাঁদের প্রতি ফেরেশতাগণ অবতীর্ণ হন এই বার্তা নিয়ে: তোমরা ভয় করো না, দুশ্চিন্তা করো না, তোমাদের জন্যে প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ নাও!”

এবার 'আলহামদুলিল্লাহ' বলে একটি মুচকি হাসি দিয়ে ফেলুন দেখি! অতঃপর নিজের সাথে কথা বলা শুরু করুন...!
তিনটি ধাপ আপনি পার হয়ে এসেছেন। আপনি কিভাবে সেই সুপ্নিল পথে সফলভাবে হেঁটে যাবেন, সেসবকিছু জেনে ফেললেন। এবার একটা সিরিয়াস কথা আপনার জন্যে!
সেটা শুনবার আগে চলুন একটা সুন্দর গান শুনে ফেলি। গানটির গীতিকার আব্দুল্লাহ মাহমুদ নজীব, সুরারোপ করেছেন আবুল আলা মাসুম এবং কণ্ঠ দিয়েছেন মারুফ আল্লাম।

শুনেছি তোমার দয়ার পাথার নেই তার কোন কূল
সে পাথারে হোক বিলীন আমার জীবনের যত ভুল ॥

তোমার পাথার থেকে সবটুকু না-ই যদি দাও আমায়,
এক ফোঁটা জল দাও না ঝরিয়ে আমার আমলনামায়!
সেই জলে প্রভু বুকের কালিমা ধুয়ে মুছে হোক সাফ-
পোড়া হৃদয়ের গ্লানি ভুলে আমি হতে চাই নিষ্পাপ।
আমার হৃদয়-কাননে ফোটাও ফিরদাউসের ফুল ॥

প্রতিটি ক্ষণেই আমি তো কেবল পাপই করেছি জমা
তুমিই বলেছো না হতে হতাশ, চাইতে তোমার ক্ষমা!
ডাকলে তোমায় সাড়া দেবে তুমি- কোরানে দিয়েছো বলে;
বুকে নিয়ে সেই আশা দুই চোখে দুফোঁটা অশ্রু গলে।
তোমার ওয়াদা রাখবে তুমি-ই, তুমি যে প্রভু অতুল ॥

শোনা শেষ? একটা হাসি দেন তাইলে!

চলেন, এবার 'সিরিয়াস' কথাটা বলে ফেলি। কথাটা আমার নয়, বিশ শতকের অন্যতম স্মরণীয় মণীষী আশ-শা'রাওয়ী [র.]-এর। তিনি তাঁর তাফসিরগ্রন্থের একটা স্থানে খুব চিন্তা জাগানিয়া কথা বলেছেন:
"আপনার কাছে তীক্ষ্ণ ধারালো তরবারি থেকে কী লাভ, যদি সেই তরবারি দিয়ে আঘাত করার মতো শক্ত হাত আপনার না থাকে?"
এবার আপনার কাছে আসি।
ধরুন, এই যে পাপ-পঙ্কিলতা-কদর্যতা, এ-সবকিছুই আপনার দুশমন। আপনি এতক্ষণ ধরে যা জানলেন, সেগুলো তরবারি, এই শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ার জন্যে। কিন্তু... তরবারি পেয়ে যদি আপনি বসে থাকেন, আঘাত করার মতো শক্ত হাতের অধিকারী না হোন, তাহলে কিন্তু এই তরবারি কিছুতেই কাজে দেবে না! 'মাইন্ড ইট!'

শক্ত হাত মানে আপনার সুদৃঢ় ও সুসংহত একটি হৃদয়, যেটা সর্বক্ষণ পাপের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকবে, পাপের মুখোমুখি হলেই তার সাথে তাওবাহ'র তরবারি দিয়ে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে লড়বে।

আপনার সেই শক্তিমত্তা অর্জনের জন্যে চাই অনুভব-অনুভূতির জমিনে দৃঢ়তার চাষ করা। সেই জমিনকে উর্বর করার জন্যে তাফসির ইবন কাসিরে উল্লিখিত এই কবিতা দিতে পারে সারের যোগান:

تصل الذنوب إلى الذنوب وترتجي * درج الجنان ونيل فوز العابد
أنسيت ربك حين أخرج آدما * منها إلى الدنيا بذنب واحد

আমরা কাব্যানুবাদ করে ফেলি:

আমলনামায় হাজারও পাপ জমিয়ে চলেছো প্রতি ক্ষণে ক্ষণে,
'আবিদ এবং জান্নাতী হবো'- এমন স্বপ্ন দেখছো তবু?
আচ্ছা, তুমি কি ভুলেই গিয়েছো সেই জান্নাত থেকেই প্রভু-
আদমকে বের করে দিয়েছেন একটি মাত্র পাপের কারণে?

খুব স্পষ্ট বার্তা!

জান্নাত থেকে আদম [আ.]-কে আল্লাহ্ তা'আলা বের করে দিয়েছিলেন শুধু একটি অবাধ্যতার কারণে। আমরা একটি দুটি নয়, অসংখ্য পাপ সাথে নিয়ে সেই জান্নাতেই যাবার স্বপ্ন দেখছি!

পাপের মুখোমুখি হলেই আপনি নিজেকে এই কবিতাটা দিয়ে 'রিমাইন্ডার' দেবেন। নিজের সাথে কথা বলবেন। বেশ, ইন শা-আল্লাহ্ আপনি উদ্দীষ্ট শক্তিমত্তা অর্জন করবেন খুব সহজেই!

তাহলে, আমরা শত্রুকে চিনলাম। তরবারি হাতে পেলাম। তরবারি দিয়ে আঘাত করার মতো শক্তিমত্তাও অর্জন করলাম।

এবার? এবার আর কী? লড়াই শুরু হোক... পাপের বিরুদ্ধে, পঙ্কিলতার বিরুদ্ধে, কদর্যতার বিরুদ্ধে। এই লড়াইয়ের একটি শ্লোগান, একটি ইশতেহার... 'আমি নিষ্পাপ হতে চাই!'

টিকাঃ
১ Poems of Henry Vaughan, Vol. 1, P. 59-60.
১ সুনান ইবন মাজাহ: ৪২৫০; সুনান আল-কুবরা (বায়হাক্বী): ২১০৭০
১ সূরা আয-যুমার ৩৯:৫৩.
১. সহীহ মুসলিম: ২৭৬৬
১ সূরা আল-ফুরকান ২৫:৬৮-৭০
১ সূরা আল-বাক্বারাহ ২:২২২
১ সূরা আত-তাহরীম ৬৬:৮
২ তাফসীর শাওকানী, খ. ৭ পৃ. ২৫৭
১ সাহীহ মুসলিম: ২৬৫৪
২ সূরা ফুসসিলাত ৪১:৩০
১ তাফসীর ইবন কাসীর: খ. ১ পৃ. ২৭৬

📘 শেষরাত্রির গল্পগুলো > 📄 বিষমাখা পুষ্প

📄 বিষমাখা পুষ্প


খুব মনে পড়ে, শুক্লপক্ষের রাতে বাড়ির ছাদে চাটাই বিছিয়ে দাদাভাই আমাদের গল্প শোনাতেন। শ্রোতা বলতে তখন আমি, রুবাইয়া এবং নাসিম - তিন ভাই-বোন।

হাজী মুহম্মদ মুহসীনের কথা ক্লাসে প্রথম শোনার পর বাড়িতে সবাইকে খুব উৎসাহ নিয়ে শোনাতে লাগলাম। ঐ বয়সটা এমনই, নতুন কিছু শেখার পরে বা নতুন কোনো বিষয় জানার পরে সেটা চারদিকে রাষ্ট্র করে বেড়াতে না পারলে দুই দন্ড স্বস্তি পাওয়া যায় না। দাদাভাই সে সময় আমার মুখে হাজী মুহসীনের কথা শুনে একদিন ছাদের ওপর বসে খুব সুন্দর করে আরেকজন দানবীরের গল্প শুনিয়েছিলেন: হাতেম তায়ী। তাঁর শেষ পরিণতি শুনে তো কতোবার কেঁদে বুক ভাসিয়েছি! তখন থেকে আমি আর রুবাইয়া একটা অঘোষিত প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছিলাম মুহসীন এবং হাতেম তায়ী হবার জন্যে! যত বড় হয়েছি, এই দুটো মানুষের প্রতি ঈর্ষার পরিমাণটাও বেড়েছে ক্রমশ। সেই ঈর্ষা জড়ানো ভালোবাসা থেকেই ফররুখ আহমদের সার্থক কাব্যনাট্য 'নৌফেল ও হাতেম' এক বসাতে শেষ করেছিলাম! সম্প্রতি তাফসীর কুরতুবীতে হাতেম তায়ীর উদ্ধৃত কবিতা দেখে আবিষ্কার করলাম, এই মহানুভব মানুষটির ছিলো বিস্ময়কর কাব্যপ্রতিভা! মনে মনে খুব খুশি হলাম তাঁর আরেকটা গুণের পরিচয় পেয়ে। আল্লাহর কী ইচ্ছা, আরবি কবিতার বই ঘাঁটতে গিয়ে হঠাৎ পেয়ে গেলাম তাঁর কাব্য সংকলন 'দিওয়ান হাতিম আত-তায়ী'! এ যে মেঘ না চাইতেই জল! প্রাচীন সাহিত্য; যথেষ্ট মনোযোগ এবং পরিশ্রম দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে হয়েছে। এই কাব্যসংকলনে হাতিম আত-তায়ীর বিশুদ্ধ মননের পরিচয় পেয়ে ইচ্ছে জাগলো তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত জানার। নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন সূত্র থেকে হাতিম আত-তায়ী সম্পর্কিত যেসব জানা-অজানা বিষয় নজরে এসেছে, সেগুলোকে সাজিয়েই 'বিষমাখা পুষ্প'র গল্পের আসর বসলো আজ।

পরিচয়

পুরো নাম: হাতিম ইবন 'আব্দিল্লাহ ইবন সা'দ ইবন আল-হাশরাজ ইবন ইমরাইল-ক্বায়স ইবন 'আদী। কন্যার নামানুসারে তিনি 'আবু সুফানাহ' (সুফানাহর পিতা) বলে পরিচিত ছিলেন। তাঁর পুত্র 'আদী ইবন হাতিম রাসূলুল্লাহর [ ] সাহাবীদের [রা.] একজন।[১] ইতিহাসে 'আদী বিখ্যাত হয়েছেন সমঝোতার প্রস্তাব নিয়ে 'আলী [রা.] কর্তৃক মু'আওয়িয়াহ [রা.]-এর নিকট প্রেরিত হয়ে।
পন্ডিতগণ বলে থাকেন, তায়ী বংশ থেকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে তিনজন অতুলনীয় ব্যক্তির আবির্ভাব হয়েছে: দানশীলতায় হাতিম আত-তায়ী, দুনিয়াবিমুখ একান্ত 'ইবাদাতে দাউদ ইবন নাসীর আত-তায়ী এবং কবিতার ক্ষেত্রে আবু তাম্মাম।[২]

দ্বীন

ইসলামের অভ্যুদয়ের পূর্বেই হাতিম আত-তায়ী মারা যান। রাসূলুল্লাহ'র [৬] বয়স যখন আট বছর (৫৭৮ ঈসায়ী), তখন তাঁর দাদা 'আব্দুল মুত্তালিব মারা যান এবং একই বছরে মারা যান হাতিম আত-তায়ী।[৪] তিনি ছিলেন খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী (নাসারা)। আল্লাহর বিচার, তাক্বদীর এবং অন্যান্য ঐশী নির্দেশাবলীতে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন।[৫]
আরেকটি মতানুসারে, হিজরী অষ্টম সনে তিনি মারা যান।[৭] এ বছরের যুলহিজ্জাহ মাসে মারিয়াহ কিবতিয়াহ'র গর্ভে রাসূলুল্লাহর [১] সন্তান ইবরাহীম জন্মগ্রহণ করেন।[২]

হাতিমের অনন্য বদান্যতা ও দানশীলতার গল্প
হাতিম আত-তায়ীর দানশীলতা ও পরোপকারিতার ব্যাপারে সকল ঐতিহাসিক একমত। আমরা এতদসংক্রান্ত দুটো বর্ণনা এখানে উল্লেখ করবো।

১. হাতিম আত-তায়ীর স্ত্রী নাওয়ারকে একবার হাতিম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হোল। তিনি বললেন:
"তাঁর প্রত্যেকটি কাজই ছিলো বিস্ময়কর। একবার আমাদের দুর্ভিক্ষ আক্রান্ত করলো। জমিন রুক্ষতায় ফেটে পড়লো এবং আকাশও হয়ে গেলো ধূসরিত। দুগ্ধদানকারীনি মায়েরা সন্তানদেরকে দুধ পান করানো থেকে সরে আসতে বাধ্য হন। উটগুলো অতিশয় কৃশকায় হয়ে পড়ে। সে সময় শীতের এক প্রখর রাতের অর্ধপ্রহরে আমাদের সন্তানগুলো ক্ষুধায় কান্না জুড়ে দেয়: আব্দুল্লাহ, 'আদ্দী এবং সুফানাহ। আল্লাহর শপথ, আমাদের এমন কিছু ছিলো না, যা দিয়ে তাদের সান্ত্বনা দেবো। হাতিম একজন সন্তানের দিকে এগিয়ে এসে কোলে তুলে নেন। আমি এক কন্যাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম। আল্লাহর শপথ, রাত্রির একটি অংশ অতিবাহিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের কান্না থামে নি। এরপর আমরা আঁশযুক্ত সিরীয় চাদর দ্বারা বিছানা পেতে দিলাম। আমরা সন্তানদের ঘুম পাড়িয়ে দিলাম। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম, হাতিমও অন্য পাশে ঘুমিয়ে পড়লেন আর সন্তানরা ছিলো আমাদের মাঝে। হাতিম অতঃপর আমার দিকে এগিয়ে আসলেন এবং সান্ত্বনা দিতে লাগলেন, যাতে আমি ঘুমিয়ে পড়ি। আমি তাঁর উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে ঘুমের ভান ধরলাম। হাতিম বললেন, 'কী হোল? ঘুমিয়ে পড়েছো?' আমি নীরব থাকলাম। তিনি বললেন, 'আমার মনে হচ্ছে, সে ঘুমিয়ে গেছে।' অথচ আমার চোখে কোনো ঘুম ছিলো না। যখন রাত প্রায় শেষ হয়ে এলো, তারকারাজি নিবু নিবু হয়ে এলো এবং সমস্ত প্রকৃতি-ও নিঝুম-নিস্তব্ধতায় নিমগ্ন হলো; তখন তাঁবুর এক প্রান্ত হঠাৎ উঁচু হতে দেখা গেলো। হাতিম বললেন, 'কে রে?' অতঃপর আগন্তুক চলে গেলো। ইতোমধ্যে রাত প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। হাতিম [পুনরায়] জিজ্ঞেস করলেন, 'এটা কে?' [একজন মহিলা] বললেন, 'আমি আপনার প্রতিবেশীনি অমুক, হে 'আদীর পিতা! আমি আপনাকে ছাড়া কাউকে ভরসা ও সাহায্যের আশ্রয়স্থল মনে করি নি। আমি ক্ষুধার যন্ত্রণায় নেকড়ে বাঘের মতো আর্তনাদ করতে থাকা কিছু শিশুর পক্ষ থেকে আপনার কাছে এলাম।' হাতিম বললেন, 'তাদেরকে আমার কাছে নিয়ে এসো।' নাওয়ার বললেন, আমি লাফিয়ে উঠলাম এবং বললাম, 'আপনি কী করলেন? ঘুমিয়ে পড়ুন! আল্লাহর কসম, আপনার সন্তানগুলো বিলাপ করছে আর তাদেরকে বুঝ দেয়ার মতো কিছু পেলেন না; অথচ এই মহিলা এবং তার সন্তানদের কিভাবে নিবৃত্ত করবেন?' হাতিম বললেন, 'থামো, আল্লাহর শপথ, আমি তোমাকেও তৃপ্ত করবো ইনশা-আল্লাহ।' নাওয়ার বলেন, মহিলাটি দুই সন্তান কোলে এবং দুই পাশে চারজন সন্তানসহ আসছিলেন, মনে হচ্ছিলো যেনো কিছু বাচ্চা নিয়ে উটপাখি আসছে। হাতিম তার ঘোড়ার দিকে এগিয়ে এলেন এবং বর্শা দিয়ে গলায় আঘাত করলেন। অতঃপর চুলা জ্বালিয়ে দিলেন। এবার ছুরি নিয়ে এসে চামড়া তুলে ফেললেন এবং ছুরিটা মহিলাকে ফিরিয়ে দিলেন। বললেন, তোমার সন্তানদের পাঠাও। মহিলা পাঠিয়ে দিলেন। হাতিম বললেন, এই মৃত জন্তু থেকে শুধু কি তোমরাই খাবে, ছড়িয়ে থাকা আরো অসংখ্য ক্ষুধার্তকে ছাড়া? হাতিম বেরিয়ে পড়লেন, অতঃপর লোকেরা সবাই দলে দলে আসতে লাগলো। হাতিম একটা কাপড় জড়িয়ে এক পাশে শুয়ে থাকলেন আর আমাদের দেখতে লাগলেন। আল্লাহর কসম, তিনি একটা ক্ষুদ্র অংশও সেখান থেকে গ্রহণ করলেন না; অথচ তিনিই [ক্ষুধার তীব্রতায়] সবার চেয়ে বেশি মুখাপেক্ষী ছিলেন [খাওয়ার জন্য]। এরই মধ্যে সকাল হয়ে এলো, দেখা গেলো কিছু হাড়গোড় ছাড়া খাদ্যের কোন কিছু আর অবশিষ্ট নেই।”

২. ওয়াদ্দাহ ইবন মা'বাদ আত-তায়ী বর্ণনা করেন,
"হাতিম আত-তায়ী নু'মান ইবন মুনজিরা এর নিকট আগমন করলে নু'মান তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করেন এবং কাছে টেনে নেন। আসার সময় তাকে কিছু উপঢৌকন প্রদান করেন; নগরীর মূল্যবান বস্তু ছাড়াও এর মধ্যে ছিলো স্বর্ণ ও রৌপ্য বোঝাই দুটি বাহন। হাতিম আত-তায়ী তাঁর সম্প্রদায়ের নিকট আগমন করলে তায়ী বংশের বেদুঈন গরীবরা তাঁকে ঘিরে ধরে এবং বলে, ওহে হাতিম! তুমি বাদশাহর কাছ থেকে এসেছো সম্পদ নিয়ে আর আমরা আমাদের পরিজনদের কাছ থেকে এসেছি দারিদ্র্য নিয়ে। হাতিম বলেন, 'আসো আসো! আমার সামনে যা কিছু আছে সব নাও!’ এই বলে তিনি তাদেরকে বণ্টন করে দিতে লাগলেন। অতঃপর তারা সবাই নু'মান কর্তৃক প্রেরিত উপঢৌকনাদির উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিলো। এরই মধ্যে হাতিমের দাসী তুরাইফা এগিয়ে এসে তাঁকে বললেন, ‘আল্লাহকে ভয় করুন! নিজের জন্যও কিছু জমা রাখুন! এসব লোকেরা তো কোনো স্বর্ণমুদ্রা, রৌপ্যমুদ্রা আর অবশিষ্ট রাখলো না। আর না অবশিষ্ট রাখলো কোন বকরী অথবা উষ্ট্র।’ হাতিম আত-তায়ী তখন আবৃত্তি করে বললেন:
قالت طريفة ما تبقى دراهمنا ... وما بنا سرف فيها ولا خرق
إن يفن ما عندنا فالله يرزقنا ... ممن سوانا ولسنا نحن نرتزق
ما يألف الدرهم الكاري خرقتنا ... إلا يمر علينا ثم ينطلق
إنا إذا اجتمعت يوماً دراهمنا ... ظلت إلى سبل المعروف تستبق [3]
[তুরাইফা বলছে, আমাদের কোনো স্বর্ণমুদ্রা অবশিষ্ট থাকবে না। আমরা তো কোনো অপচয়ও করি নি, অনর্থক খরচও করি নি। আমাদের নিকট যা আছে তা যদি শেষ হয়ে যায়, তাহলে আল্লাহ-ই আমাদের দান করবেন অন্যদের কাছ থেকে। (আল্লাহ ব্যতীত) আমরা নিজেরা নিজেদের দান করতে সক্ষম নই। 'কার' অঞ্চলের স্বর্ণমুদ্রা আমাদের ঝাঁপিতে জমা হয় কেবল এইভাবে যে, সেটা ঝাঁপি অতিক্রম করেই বণ্টিত হয়ে যায়। যখনই কোনোদিন আমাদের স্বর্ণমুদ্রা জমা হবে, কল্যাণের পথে সেটা অগ্রগামী হতে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে।]

হাতিম নিরহংকার ছিলেন
আবু বাকর ইবন 'আইয়াশ বর্ণনা করেছেন: হাতিম আত-তায়ীকে জিজ্ঞেস করা হোল, আরবে আপনার চেয়ে দানশীল আর কেউ আছে কি? তিনি বললেন, প্রত্যেক আরবই আমার চেয়ে বেশি দানশীল।[২]

হাতিম প্রদর্শনেচ্ছু ছিলেন
হাতিম আত-তায়ীর অনুপম দানশীলতা এবং মহানুভবতা সত্যিই বিস্ময়ের উদ্রেক করে। আর তাঁর দানের মহাকাব্যিক উপাখ্যান ভালোবাসা ও ভালো লাগার অনন্য উপাদান। কিন্তু নিদারুণ হতাশ হলাম, যখন জানতে পেরেছি, তাঁর এই পরোপকার আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ছিলো না। বরং কেবল খ্যাতি ও প্রশংসার জন্যেই উদারহস্তে দান করেছিলেন। একটু খটকা লেগে গেলো, তবে শেষমেশ তাঁর সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ []-এর অভিমত জানতে পেরে অনেক কষ্টে নিশ্চিত হলাম।
'আদী [রা.] প্রিয়নবীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন: 'হে আল্লাহর রাসূল! আমার বাবা রক্তের বন্ধন অটুট রেখেছিলেন, অতিথির যত্ন নিয়েছিলেন এবং এই এই ভালো কাজ করেছিলেন।' রাসূল [] বললেন, 'তোমার বাবা যা চেয়েছিলেনা, তা তো পেয়ে গেছেন।'

হাতিম-এর জীবন থেকে আমরা কী শিক্ষাটি পেলাম?

সামগ্রিক বিচারে আমরা হাতিম আত-তায়ীকে মহানুভবতার সুরভিত পুষ্প হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। কিন্তু এ পুষ্পের সুবাসিত মদিরায় হৃদয় মাতানো যায় না, কারণ তার পাপড়িগুলো লৌকিকতার বিষে মাখা। নিয়‍্যাত পরিশুদ্ধ করার সীমাহীন গুরুত্বের কথাটা আমাদের আরও একবার স্মরণ করিয়ে দেয় হাতিম আত-তায়ীর জীবনাচার। কেবল কল্যাণ ও পুণ্যের পথে নিবেদিত হওয়া-ই যে চূড়ান্ত সার্থকতা নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিখাদ উদ্দেশ্যই সফলতার পূর্বশর্ত;- হাতিম আত-তায়ী থেকে আমরা এ শিক্ষাই নিতে পারি।

আমাদের পূর্ববর্তী সালাফ আস-সালিহুন নিয়‍্যাত শুদ্ধ করার প্রতি এতোটাই গুরুত্বারোপ করতেন যে, অনেকেই তাঁদের লিখিত গ্রন্থের শুরুতে 'হাদীসুননিয়্যাহ' উল্লেখ করে দিতেন )0( حديث النية বা 'নিয়‍্যাতের হাদীস' বলতে বোঝায় আমাদের সকলের কাছে পরিচিত (সাহীহ আল-বুখারীতে সর্বাগ্রে উল্লিখিত) হাদীসটি:
'উমার ইবন আল-খাত্তাব [রা.] থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ [] ইরশাদ করেছেন:
"নিশ্চয়ই প্রতিটি কাজ নিয়্যাত অনুযায়ীই গৃহীত হয়। আর প্রত্যেক ব্যক্তি তাই-ই পায়, যা সে নিয়্যাত করে। সুতরাং যার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূল [ﷺ]-এর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হবে, তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্যেই পরিগণিত হবে। আর যার হিজরত দুনিয়া লাভের বা কোনো নারীকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যে হবে, তার হিজরত সে উদ্দেশ্যেই পরিগণিত হবে, যে উদ্দেশ্যে সে হিজরত করেছে।"
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মক্কা থেকে মদিনা-তে হিজরতের সময় মুমিনদের সবাই আল্লাহর নির্দেশ পালনের জন্যে এই ত্যাগ-কুরবানির নজরানা পেশ করলেও এক ব্যক্তি হিজরত করেছিলো মদিনার একজন রমণীকে বিবাহ করার জন্যে।
আ'মাশ [রা.] বলেন: "আমাদের মধ্যে এক লোক ছিলো, যে উম্মু কাইস নাম্নী মহিলাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়, কিন্তু মহিলা তাকে বিয়ে করতে অসম্মত হয়, এমনকি মদিনাতে হিজরত করে চলে আসে। এরপর লোকটি (ও) মদিনাতে হিজরত করে এবং (অবশেষে) তাকে বিয়ে করে। আমরা সেই লোকটির নাম দিয়েছিলাম (উম্মু ক্বাইসের মুহাজির)।
তার নিয়্যাত যেহেতু পরিশুদ্ধ ছিলো না, সে কারণেই এই দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়ার কষ্ট, শত্রুর হাতে বন্দী হবার ঝুঁকি গ্রহণ — এতো ত্যাগ তার জন্যে কোন পুণ্য বয়ে আনলো না। একইভাবে, হাতিম আত-তায়ীর বদান্যতা, অকাতরে বিলিয়ে দেওয়ার মত হৃদয়ের প্রাশস্ত্য, আত্মত্যাগের মহাকাব্যিক দৃষ্টান্ত—কোনকিছুই চূড়ান্ত হিসেবের খাতায় একটি শূন্য বৈ কিছু বয়ে নিয়ে আসে নি।

নিয়্যাত পরিশুদ্ধ থাকলে স্বল্প 'আমালই মুক্তির কারণ হতে পারে, আবার বিপরীতে অধিক আমলও অর্থহীন হয়ে যেতে পারে। রাসূলুল্লাহ [ﷺ] মু'আজ ইবন জাবাল [রা.]-কে ইয়ামানে প্রেরণের প্রাক্কালে উপদেশ দিচ্ছিলেন,
أخلص دينك يكفيك العمل القليل
"তোমার দ্বীনকে একনিষ্ঠ করো। অল্প 'আমালই তোমার জন্য যথেষ্ট হবে”।[১]

টিকাঃ
১ সূরা আন'আম (৬) এর ১১৮ নং আয়াতের তাফসীর। [তাফসীর কুরতুবী, খ. ৭ পৃ. ৭২]
১ আল-মুফাসসাল ফী তারিখিল 'আরাব ক্বাবলাল ইসলাম, খ. ১৮ পৃ. ৩৭৮
২ আল-ওয়াফী বিল ওয়াফায়াত, খ. ৪ পৃ. ৮৬
৩ আল-মুফাসসাল, খ. ৭ পৃ. ২২১
৪ মুহাম্মাদ রাসূলুল্লাহ, খ. ১ পৃ. ৩৩
৫ আল-মুফাসসাল, খ. ১১ পৃ. ১৫৪
৬ আল-উনাস আল-জালীল, খ. ১ পৃ. ২১১
১ এক বছর দশ মাস বয়সে তিনি মারা যান। [সীরাত ইবন কাসীর, খ. ১ পৃ. ১০৪]
২ আল-উনাস আল-জালীল, খ. ১ পৃ. ২১১
১ আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, খ. ১ পৃ. ২২৮
২ হীরা রাজ্যের অধিপতি।
১ মুখতাসার তারীখ দিমাশক, খ. ২ পৃ. ৩০৯
২ আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, খ. ১ পৃ. ২৩০
১ অর্থাৎ, 'দানের প্রশংসা'। এই ব্যখ্যাটি আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ-তে এসেছে। খ. ১ পৃ. ২২৭।
২ মুসনাদ আহমাদ: ১৯৩৯৩
৩ 'উমার [রা.] থেকেও এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা পাওয়া যায়: “যে ব্যক্তি কোনো গ্রন্থ রচনার ইচ্ছে পোষণ করে, সে যেন الأعمال بالنيات )হাদিসটি) দ্বারা তা শুরু করে।” [জামি' আল-'উলুম ওয়াল হিকাম, খ. ১ পৃ. ৫৯]
১. সাহীহ আল-বুখারী: ০১; সাহীহ মুসলিম: ৫০৩৬।
২. ফাতহুল বারী, খ. ১ পৃ. ১৩
১. আল-মুসতাদরাক: ৭৮৪৪। হাকিম বলেছেন: হাদিসটি সনদের দিক থেকে সাহীহ। ইমাম বায়হাক্বীর শু'আবুল ঈমান গ্রন্থে কিছুটা শাব্দিক ভিন্নতা সহ হাদিসটি এসেছে )أخلص دينك يكفيك القليل من العمل( এই বর্ণনায় হাদিসটি মুরসাল।

📘 শেষরাত্রির গল্পগুলো > 📄 আত্মকথন

📄 আত্মকথন


ব্যালকনিতে বসে আছি। আজকের সকালটা বুঝি একটু বেশিই সতেজ। কিছুটা হিম হিম ভাব, তার সাথে মৃদুমন্দ বাতাস, ডানদিকে আমগাছটাতে কয়েকটা চড়ুই'র কিচিরমিচর, সব মিলিয়ে বেশ ফুরফুরে অনুভব। আমি কুরআন পড়ছিলাম। সূরা কাহফ।

আম্মু আমার বুকশেলফ গুছিয়ে দিতে দিতে বলছিলেন, 'আরবি কবিতার বইগুলো বোধহয় অনেকদিন ধরো নি। এই তাকটা খুব পরিপাটি দেখা যাচ্ছে।' অনেক দিন যে ধরি নি, তা না, তবে একটা বিরতি কিন্তু দিয়েছি ঠিকই। আজকের 'টু-বি রেড লিস্টে' কোনো কবিতার বই ছিলো না আমার। তবু আম্মুর কথাটা মনে ধরলো, কুরআন পড়া শেষ করে 'উলয়া বিনত আল-মাহদী'র 'দীওয়ান' (কাব্যসঙ্কলন) হাতে নিলাম। তাঁর কবিতায় চোখ বুলাচ্ছি এই প্রথমবারের মতো। তাঁর একটি বিশেষ পরিচয়, তিনি আব্বাসীয় খলিফা আল-মাহদী'র কন্যা এবং হারুন-আর-রাশীদ-এর বোন। চমৎকার সব কবিতা! এতদিন কেন মনোযোগ দিলাম না, নিজেকে খুব বোকা মনে হোল। আব্বাসী যুগের প্রচলিত সাহিত্যধারার সাথে বিশাল একটা পার্থক্য আছে তাঁর কবিতায়! প্রতিপক্ষের নিন্দা-কুৎসা রটনা, বংশীয় অহঙ্কার ও কীর্তিগাঁথা রচনা, রাজস্তুতি ও স্তাবক-বন্দনা – এই ধারা থেকে তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত তো বটেই, আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সরল কাব্যিক রেখাতেও তিনি অবস্থান করেন নি, বোধের বাঁশিটা বাজিয়েছেন একেবারে স্বতন্ত্র অনুভূতির বটবৃক্ষের ছায়ায়। এই যেমন:

القلب مشتاق إلى ريب * يا رب ما هذا من العيب
قد تيمت قلبي فلم أستطع * إلا البكا يا عالم الغيب

আমি কাব্যানুবাদের চেষ্টা করেছি [মাত্রাবৃত্ত ছন্দে]:

আমার হৃদয় সন্দেহ আর সংশয়ে পড়ে যায় প্রভু!
এ কেমন বিব্রতকর দুঃসহ অনুভব!
আমার মনটা ওদিকেই ঝুঁকে যেতে যখনই চায়,
কান্না ছাড়া তো আমার কিচ্ছু করার থাকে না, রব!

কী সাংঘাতিক! আমি কবিতাটা পড়ছিলাম, মনে মনে কাব্যানুবাদ সাজাচ্ছিলাম, আর অবচেতনেই বিড়বিড় করে বলছিলাম, 'বোন রে! আমার কথাগুলো আপনি এত্ত আগেই বলে ফেললেন ক্যামনে!'
সংশয়ের আবর্তে ঘূর্ণায়মান মুসলিম তরুণদের অভিব্যক্তি গড়ের ওপর এমনই তো বোধহয়! এ নিয়ে আমার দর্শন আরও মজবুত হোল এই কবিতাটা থেকে। শাইত্বান যখন বিশ্বাসের সফেদ চাদরে দাগ ফেলতে চায়, তখন আল্লাহর কাছেই আমাদের অসহায়ত্বের স্বীকৃতি আর আশ্রয় প্রার্থনার বিনীত আকুতি পেশ করে অশ্রু নিবেদন করাটাই প্রশান্তির শেষ নিয়ামক। আল্লাহও তা-ই শিখিয়ে দিয়েছেন আল-কুরআনে:

رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ
"আমাদের রব্ব! আমাদেরকে পথ দেখানোর পর তুমি আমাদের হৃদয়গুলোকে পুনরায় বক্র করে দিও না! আর তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্যে রহমত দান করো। তুমি তো উদার-মহান দাতা!!"
'উলয়ার কবিতায় বিরতি দিলাম, কেনো জানি মনে হোল, এক বসাতেই সম্পূর্ণ ভালো লাগা শেষ করা ঠিক হবে না! সময়ে সময়ে প্রয়োজনানুসারে ভালো লাগাটাকে একদম নবীনতম অনুভূতির জালে ধরার লোভ থেকে আরেকটা বই ধরলাম।

'আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারাক [রা.]-এর 'দীওয়ান' বেশ অনেকবার পড়েছি। কিন্তু অন্য আরো কিছু বইয়ের মতো এই বইটাও আমার কাছে বারবার পড়ার পরেও মনে হয় নতুন কিছু। আজকে একটা পঙক্তি খুব ভাবালো:

أرى أناسا بأدنى الدين قد قنعوا * ولا أراهم رضوا في العيش بالدون (১)

ষান্মাত্রিক মাত্রাবৃত্ত ছন্দে এটারও একটা কাব্যানুবাদ দাঁড়িয়ে গেলো মনে মনেই:

অনেককে দেখি দ্বীনের অল্প পালন করেই তুষ্ট রয়,
দুনিয়ার ভাগে অল্প পড়লে তারা-ই আবার রুষ্ট হয়!

আসলেই তো! দ্বীন পালনের ক্ষেত্রে আমাদের অমনোযোগিতা ও অবহেলা কিন্তু একটুও ভাবায় না আমাদেরকে। অবলীলায় এবং খুব স্বাভাবিক ভাবেই দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা ও আবেগ-অনুরাগের পরিচর্যা কমিয়ে দিচ্ছি আমরা। এই অবহেলা এবং ছাড় দেওয়ার মনোবৃত্তি কিন্তু বৈষয়িক কোনো ব্যাপারে সেভাবে ঘটে না! একেবারে ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনের জন্যে সঞ্চয় ও অর্জনে সামান্যতম ত্রুটিটুকুও পরাহত করতে আমরা যতটা সচেতন, চিরস্থায়ী ও চূড়ান্ত জীবনের জন্যে কিছু পাথেয় কুড়িয়ে নেওয়ার জন্যে আমরা কি ততটুকু সচেতন?

আমি নিজেকে প্রশ্ন করে যাচ্ছি...

আল্লাহ রহম করুন সেই আলোকিত কবিদের; যাঁরা আমাদের বিশ্বাস ও বিশুদ্ধ অনুভূতিগুলোকে সতেজ ও সজীব রাখার উপাদান রেখে গেছেন, যাঁরা আমাদেরকে নশ্বর পিছুটানের মরীচিকা ভুলে অবিনশ্বর স্বপ্নপুরীর জন্যে তৈরি হবার প্রণোদনা যোগান প্রতিনিয়তই।

ঠিক সে সময় আল-কুরআনের সেই আয়াত দুটো যেনো তীর হয়ে এসে বিঁধে গেলো বোধিবক্ষে:

بَلْ تُؤْثِرُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَالْآخِرَةُ خَيْرٌ وَأَبْقَى
"বরং তোমরা পার্থিব জীবনকেই বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছো। অথচ আখিরাতের জীবন হোল উত্তম এবং স্থায়ী!!"

টিকাঃ
১ সূরা আলে 'ইমরান ৩:৮
১ দীওয়ান ইবনুল মুবারাক, পৃ. ৪৮
২ সূরা আল-আ'লা ৮৭:১৬, ১৭

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00