📄 কারামাতে আওলীয়ার ব্যাপারে আহ্লুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের মাযহাব।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আক্বীদার অন্যতম মূলনীতি হলো অলীদের কারামাত এবং আল্লাহ তা'আলা তাঁর অলীদের নিকট অলৌকিক ও স্বাভাবিক নিয়মের বহির্ভূত যে সমস্ত ঘটনা প্রকাশ করেন, তারা তাতে বিশ্বাস করে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর অলীদের নিকট বিভিন্ন প্রকার জ্ঞান ও কাশফ থেকে যা প্রকাশ করেন এবং তাঁর ক্ষমতা ও প্রভাব থেকে তাদের মাধ্যমে যা কিছু প্রকাশ করেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তাতে বিশ্বাস করে।
পূর্বের জাতিসমূহের মধ্যে যেসব কারামাত সংঘটিত হয়েছে, আল্লাহ তা'আলা কুরআনের সূরা কাহাফে এবং অন্যান্য সূরায় যেসব কারামাতের কথা বর্ণনা করেছেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তাতে বিশ্বাস করে।
সেই সাথে এই উম্মতের প্রথম যুগে সাহাবী, তাবেয়ী এবং পরবর্তীতে আগমনকারী উম্মতের সকল ফির্কার লোকদের মধ্যে প্রকাশিত যেসব কারামাতের কথা সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তাতেও বিশ্বাস করে। তারা আরো বিশ্বাস করে যে, এ উম্মতের মধ্যে কিয়ামত পর্যন্ত কারামাত প্রকাশ অব্যাহত থাকবে।
ব্যাখ্যা: كرامات শব্দটি كرامة শব্দের বহুবচন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর অলীদের হাতে অলৌকিক ও অসাধারণ যে সমস্ত ঘটনা প্রকাশ করেন, তারা তাতে বিশ্বাস করে। সুতরাং প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে যা সংঘটিত হয়, তাই কারামত। অর্থাৎ মানুষের নিকট পরিচিত ও চিরাচরিত নিয়মের ব্যতিক্রম যা সংঘটিত হয়, তাই কারামত। أولياء শব্দটি ولي শব্দের বহুবচন। প্রত্যেক মুমিন মুত্তাকীই আল্লাহর অলী। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ ﴾ "মনে রেখো যে, আল্লাহর অলীদের কোন ভয় নেই। আর তারা বিষন্নও হবে না। তারা হচ্ছে সেই সমস্ত লোক যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়ার পথ অবলম্বন করেছে” (সূরা ইউনূস: ৬২-৬৩)
الولاء শব্দ থেকে অলী শব্দটি নির্গত হয়েছে। আর الولاء অর্থ ভালবাসা অর্জন করা ও নৈকট্য হাসিল করা। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার পছন্দ এবং মর্জি মোতাবেক কাজ করে তাঁর নৈকট্য হাসিলের মাধ্যমে যে মুমিন মুত্তাকী আল্লাহর সাথে বন্ধুত্ব করেছে, সেই আল্লাহর অলী।
অলীদের কারামাত সত্য। আল্লাহ তা'আলার কিতাব, রসূলের সুন্নাত এবং সাহাবী ও তাবেয়ীদের থেকে মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত হাদীস দ্বারা অলীদের কারামত সত্য বলে প্রমাণিত। অলীদের কারামতের ব্যাপারে লোকেরা তিনভাগে বিভক্ত হয়েছে।
প্রথম প্রকার: বিদ'আতীদের একটি দল অলীদের কারামত অস্বীকার করে। যেমন মুতাযেলা, জাহমিয়া এবং আশায়েরাদের কিছু লোক কারামত অস্বীকার করে। তাদের দলীল হলো অলীদের হাতে যদি কারামত প্রকাশিত হওয়া জায়েয হয়, তাহলে যাদুকরের সাথে অলীর অবস্থা মিলে যাবে এবং নাবীদের থেকে অলীদেরকে পার্থক্য করা অসম্ভব হবে। কেননা মুজেযার মাধ্যমেই নাবী এবং অন্যদের মধ্যে পার্থক্য করা হয়। সাধারণ ও চিরাচরিত প্রথার বাইরে যা বের হয়, তার নামই মুজেযা।
দ্বিতীয় প্রকার: সুফী তরীকার লোকেরা এবং কবর পূজারীরা কারামত সাব্যস্ত করতে গিয়ে সীমালংঘন করে থাকে। তারা মানুষের সাথে মিথ্যা বলে এবং তাদেরকে শয়তানের তেলেসমাতি দেখায়। যেমন আগুনে ঝাপ দেয়া, নিজেদের শরীরে অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা, বিষাক্ত সাপ ধরে ফেলা ইত্যাদি। এমনি কবর পূজারীদের আরো অনেক কাজ-কর্মকে তারা কারামত নাম দিয়ে থাকে।
তৃতীয় প্রকার: শাইখুল ইসলাম তৃতীয় আরেক প্রকার লোকদের কথা এখানে উল্লেখ করেছেন। তারা হলো আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত। তারা অলীদের কারামতে বিশ্বাস করে এবং কুরআন সুন্নাহর দলীল মোতাবেক উহাকে সাব্যস্ত করে। নাবীদের সাথে অন্যদের সাদৃশ্য ঠেকানোর দোহাই দিয়ে যারা কারামত অস্বীকার করে, তাদের জবাবে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা বলে থাকে যে, নাবীদের মাঝে এবং অন্যদের মধ্যে কারামত ছাড়াও আরো অনেক বিষয়ে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। অলী কখনো নবুওয়াতের দাবী করে না। যদি নবুওয়াতের দাবী করে, তাহলে সে অলী হওয়ার যোগ্যতা হারিয়ে নবুওয়াতের মিথ্যা দাবীদারে পরিণত হয়; সে তখন আর অলী থাকে না। আল্লাহ তা'আলার অন্যতম রীতি হলো, তিনি নবুওয়াতের দাবীদারকে অপদস্ত করেন। যেমন অপদস্ত হয়েছিল মুসাইলামা কায্যাব এবং অন্যরা।
আর যারা কারামত সাব্যস্ত করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘন করে এবং ভেলকিবাজ ও মিথ্যুকদের জন্যও তা সাব্যস্ত করে তাদের জবাবে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা বলে যে, আসলে তারা আল্লাহর অলী নয়; বরং শয়তানের অলী। তাদের হাতে যা কিছু সংঘটিত হয়, তা হয়ত মিথ্যা ও ধোঁকাকাবাজি অথবা তাদের জন্য এবং অন্যদের জন্য ফিতনা স্বরূপ। অথবা তিনি তাদেরকে অবকাশ দিয়ে ধীরে ধীর পাকড়াও করবেন। এই বিষয়ে শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া রহি. এর একটি মূল্যবান কিতাব রয়েছে। কিতাবটির নাম: الفرقان بين أولياء الرحمن وأولياء الشيطان (আল্লাহর অলী এবং শয়তানের অলীদের মধ্যে পার্থক্য)।
আল্লাহ তা'আলা অলীদের হাতে বিভিন্ন প্রকার ইলম ও কাশফ্ট থেকে যা প্রকাশ করেন এবং তাঁর ক্ষমতা ও প্রভাব থেকে তাদের মাধ্যমে যা কিছু প্রকাশ করেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তাতেও বিশ্বাস করে: এখানে শাইখুল ইসলাম ইঙ্গিত করেছেন যে, কারামতের কিছু অংশ ইলম ও কাশফের অন্তর্ভুক্ত। যেমন অলীগণ এমন কিছু শুনলেন যা অন্যরা শুনলোনা কিংবা তারা এমন কিছু দেখলেন, যা অন্যরা দেখেনি। এটি জাগ্রত অবস্থায় হতে পারে কিংবা ঘুমের ঘোরে স্বপ্নের মাধ্যমেও হতে পারে। অথবা অলীগণ এমন কিছু জানতে পারলেন, যা অন্যরা জানতে পারলনা। আবার কারামতের কিছু অংশ কুদরত ও ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
প্রথম প্রকারের উদাহরণ হলো, যেমন উমার এর উক্তি يَا سَارِيَةُ الجبل হে সারিয়া! পাহাড়ে আশ্রয় নাও।১৭ এ কথা বলার সময় তিনি মদীনার মিম্বারে দাঁড়িয়ে জুম'আর খুতবা দিচ্ছিলেন। আর সারিয়া ছিল পূর্বের কোন একটি অঞ্চলে। আবু বকর বলেছিলেন যে, তাঁর স্ত্রীর পেটে কন্যা সন্তান রয়েছে। ১৯১৮ উমার তাঁর সন্তানদের থেকে কে কে ন্যায়পরায়ণ হবে, তা আগেই বলে দিয়েছিলেন। মুসা ও খিযির এর ঘটনায় রয়েছে যে, খিযির যে ছেলেটিকে হত্যা করেছিলেন, তার অবস্থা তিনি জানতে পেরেছিলেন।
দ্বিতীয় প্রকার কারামতের উদাহরণ: আর কারামতের যেই প্রকার হলো ক্ষমতা ও প্রভাবের অন্তর্ভুক্ত, তার উদাহরণ হলো যেমন ঐ ব্যক্তির ঘটনা, যার নিকট কিতাবের জ্ঞান ছিল এবং চোখের পলকে বিলকীসের আরশ সুলায়মান এর সামনে হাযির করেছিলেন, আসহাবে কাহাফের ঘটনা। মারইয়াম এর ঘটনা, খালেদ বিন ওয়ালীদ এর ঘটনা, তিনি যখন বিষ পান করলেন, তখন তাঁর কোন ক্ষতি হয়নি।
শাইখুল ইসলাম বলেন: পূর্বের জাতিসমূহের মধ্যে যেসব কারামত সংঘটিত হয়েছে, আল্লাহ তা'আলা কুরআনের সূরা কাহাফে এবং অন্যান্য সূরায় যেসব কারামতের কথা বর্ণনা করেছেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তাতে বিশ্বাস করে। সেই সাথে এই উম্মতের প্রথম যুগে সাহাবী, তাবেয়ী এবং পরবর্তীতে আগমনকারী ফির্কার লোকদের মধ্যে প্রকাশিত যেসব কারামতের কথা সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তাতেও বিশ্বাস করে।
এখানে শাইখুল ইসলাম ঐসব কারামতের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন, যা অতীতে প্রকাশিত হয়েছে এবং কুরআনুল কারীম ও অন্যান্য গ্রন্থে সহীহভাবে তা বর্ণিত হয়েছে। পূর্ববর্তী জাতির কারামতগুলো থেকে কুরআনুল কারীমে যা উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্যে স্বামী ছাড়াই মারইয়ামের গর্ভধারণ করা, সূরা কাফের আসহাবে কাহাফের ঘটনা, মুসার সাথে খিযির আলাইহিস সালামের ঘটনা এবং যুল কারনাইনের ঘটনা অন্যতম।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা এই উম্মতের প্রথম যুগের লোকদের থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত কারামতগুলোর প্রতি বিশ্বাস করে। তাদের প্রথমে রয়েছেন সাহাবী ও তাবেঈগণ। যেমন উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) মদীনার মিম্বার থেকে সারিয়াকে দেখতে পেলেন। তিনি ছিলেন মদীনার মিম্বারের উপর দাঁড়ানো। আর সারিয়া ও তাঁর বাহিনী ছিল ইরাকের নাহাওয়ান্দে যুদ্ধরত। তিনি সেনাপতি সারিয়াকে "ইয়া সারিয়াতা আল-জাবাল" বলে ডাক দিলেন। সারিয়া এই ডাক শুনতে পেল এবং উমারের দিক নির্দেশনা পেয়ে উপকৃত হলো। মুসলিম বাহিনী শত্রুদের চক্রান্ত থেকে বেঁচে গেল।
তারা আরো বিশ্বাস করে যে, এই উম্মতের মধ্যে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত কারামত প্রকাশিত হওয়া অব্যাহত থাকবে। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার বেলায়াত পাওয়ার শর্তসমূহ পাওয়া গেলে এই উম্মতের লোকদের মধ্যে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত কারামত প্রকাশিত হতেই থাকবে।
টিকাঃ
৯৭. সিলসিলাহ সহীহাহ ১১১০।
৯৮. মুয়াত্তা মালিক ৪০, বিচার সম্পর্কিত অধ্যায়।
📄 আহ্লুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের বৈশিষ্ট্য, কেনই বা তাদেরকে আহ্লুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত বলা হয়?
অতঃপর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অন্যতম তরীকা হলো তারা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে রাসূল ﷺ এর সুন্নাতের অনুসরণ করে, সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী মুহাজির ও আনসারদের পথে চলে এবং রসূল এর ঐ অসীয়ত মেনে চলে, যেখানে তিনি বলেছেন, عَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ مِنْ بَعْدِي ، تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِدِ وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ
তোমরা আমার সুন্নাত ও আমার পরবর্তীতে হেদায়াতপ্রাপ্ত খেলাফায়ে রাশেদীনের পথ ধরে চলবে। তোমরা উহাকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবে এবং উহার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। সাবধান! তোমরা দ্বীনের মধ্যে নতুন বিষয়াদি উদ্ভাবন করা থেকে দূরে থাকবে। কেননা দ্বীনের মধ্যে প্রত্যেক নতুন রীতিই ভ্রষ্টতা। ৯৯
তারা জানে যে, সর্বাধিক সত্য কথা হলো আল্লাহর কালাম এবং সর্বোত্তম হেদায়াত হচ্ছে মুহাম্মাদ এর হেদায়াত。
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা আল্লাহর কালামকে সকল প্রকার মানুষের কালামের উপর প্রাধান্য দেয় এবং মুহাম্মাদ এর হেদায়াতকে মানুষের সকল মতাদর্শের উপর অগ্রাধিকার দেয়। এ জন্যই তাদেরকে আহলুল কিতাব ওয়াস্ সুন্নাহ হিসাবে নামকরণ করা হয়েছে। তাদেরকে আহলুল জামা'আতও বলা হয়। কেননা জামা'আত অর্থ হলো ঐক্যবদ্ধ থাকা। ১০০ এর বিপরীত হলো ফির্কাবন্দী হওয়া বা দলাদলি করা। যদিও জামা'আত শব্দটি ঐক্যবদ্ধ একদল মানুষের পরিচয় সূচক নামে পরিণত হয়েছে।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের তৃতীয় মূলনীতি হলো ইজমা। ইলম অর্জন এবং দ্বীন পালনের ক্ষেত্রে এ ইজমার উপর নির্ভর করা হয়।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা এ তিনটি মূলনীতির মাধ্যমে মানুষের দ্বীন সম্পর্কিত প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সমস্ত কথা ও আমল ওজন করে থাকে। উম্মতের সালাফে সালেহীনের ইজমাই কেবল দ্বীনের মূলনীতি হিসাবে গণ্য। কেননা তাদের পরে প্রচুর মতভেদ হয়েছে এবং উম্মত দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
ব্যাখ্যা: পূর্বের অধ্যায়সমূহে আক্বীদার মাসআলাগুলোতে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের তরীকা আলোচনা করার পর এই অধ্যায় এবং পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে শাইখুল ইসলাম দ্বীনের সমস্ত মূলনীতি এবং শাখা-প্রশাখাগুলোর ক্ষেত্রে তাদের তরীকা বর্ণনা করেছেন। সেই সাথে আহলে সুন্নাতের লোকদের ঐসব বৈশিষ্ট্যও বর্ণনা করেছেন, যার মাধ্যমে তারা বিদ'আতী এবং কুরআন-সুন্নাহর বিরোধিতাকারীদের থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়েছে। সুতরাং তাদের বৈশিষ্ট্যগুলো হচ্ছে:
(১) প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে নাবী ﷺ এর আদর্শের অনুসরণ করা: অর্থাৎ তারা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে নাবী ﷺ এর তারীকা অবলম্বন করে এবং তাঁর মানহাজের (নিয়ম- পদ্ধতি) উপরেই চলে। এতে করে তারা ঐসব মুনাফেক থেকে আলাদা হয়ে যায়, যারা শুধু প্রকাশ্যভাবে রসূল ﷺ এর অনুসরণ করে থাকে; তারা গোপনে তাঁর অনুসরণ করে না।
রসূল ﷺ এর সুন্নাতকে আছার বলা হয়। আছার দ্বারা বাহ্যিক আছার তথা তাঁর বাহ্যিক স্মৃতি ও রেখে যাওয়া জিনিসগুলো উদ্দেশ্য নয়। যেমন রসূল ﷺ এর বসার স্থানসমূহ, তাঁর ঘুমানোর স্থানসমূহ ইত্যাদি। এগুলো খুঁজে বেড়ানো হলে শির্কে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যেমন অবস্থা হয়েছিল পূর্বের জাতিসমূহের। [সুতরাং নাবী ﷺ থেকে যেই কথা, কাজ অথবা সমর্থন বর্ণিত হয়েছে, তাকেই সুন্নাত বলা হয়।]
(২) সর্বপ্রথম ইসলাম কবুলকারী মুহাজির ও আনসারদের পথ অবলম্বন করা: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আরেকটি বৈশিষ্ট হলো তারা ইসলামের প্রথম যুগের এবং সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী আনসার ও মুহাজিরদের পথেই চলে।
কেননা আল্লাহ তা'আলা বিশেষভাবে তাদেরকে দ্বীনের জ্ঞান ও বোধশক্তি দিয়েছিলেন। তারা কুরআন নাযিল হওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন এবং রসূল এর পবিত্র জবানীতে ইহার ব্যাখ্যা শ্রবণ করেছেন। তারা রসূল থেকে সরাসরি শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। সুতরাং তারা সত্যের সর্বাধিক নিকটবর্তী এবং রসূল এর পরে তারাই সর্বাধিক অনুসরণীয়। সুতরাং রসূলের পরে অনুসরণের দিক থেকে তাদের স্থান দ্বিতীয় স্তরে।
ফলে দ্বীনের কোন মাস'আলায় নাবী থেকে দলীল না পাওয়া গেলে সাহাবীদের কথাই ঐ বিষয়ে প্রমাণ হিসাবে গণ্য হবে এবং তার অনুসরণ করা আবশ্যক হবে। কেননা তাদের পথ হলো সর্বাধিক নিরাপদ, সর্বাধিক জ্ঞান সম্পন্ন, অত্যাধিক সুস্পষ্ট এবং খুব মজবুত।
পরবর্তী যুগের কতিপয় লোকের ন্যায় এই কথা বলা ঠিক হবে না যে, সালাফদের পথ সর্বাধিক নিরাপদ হলেও পরবর্তীদের পথ সর্বাধিক প্রজ্ঞাপূর্ণ এবং সুদৃঢ়। এতে করে তারা সালাফদের পথ পরিহার করে খালাফ তথা পরবর্তীদের পথেই চলে।
(৩) রসূল এর অসীয়ত মেনে চলা: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তারা রসূল এর সেই অসীয়ত মেনে চলে যেখানে তিনি বলেছেন,
عَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الْمَهْدِيِّينَ الرَّاشِدِينَ من بعدي تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِدِ، وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُور . فَإِنَّ كُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ» رواه الإمام أحمد وأبو داود والترمذي وابن ماجه. وقال الترمذي: حسن صحيح.
"তোমরা আমার সুন্নাত এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবে এবং উহার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। তোমরা দ্বীনের মাঝে নতুন বিষয় আবিষ্কার করা থেকে বিরত থাকবে, কেননা প্রত্যেক বিদআতের পরিণাম গোমরাহী"।১০১
এখানে শাইখের উদ্দেশ্য হলো এই কথা বর্ণনা করা যে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী ও সৎকর্মে অগ্রগামী সকল আনসার ও মুহাজিরদের পথ অনুসরণ করার সাথে সাথে বিশেষভাবে খোলাফায়ে রাশেদীনেরও অনুসরণ করে থাকে। কেননা এ হাদীসে নাবী ﷺ নির্দিষ্টভাবে খোলাফায়ে রাশেদীনের অনুসরণ করার আদেশ দিয়েছেন। এখানে তিনি তাঁর সুন্নাতকে খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতের সাথে মিলিয়ে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং বুঝা গেল, খোলাফায়ে রাশেদীন বা তাদের কারো একজনের সুন্নাত পরিত্যাগ করা যাবে না।
والخلفاء الراشدون খোলাফায়ে রাশেদীন বলতে চারজন খলীফা উদ্দেশ্য। আবু বকর, উমার, উছমান ও আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুম। তাদেরকে রাশেদীন তথা সুপথগামী বলার কারণ হলো তারা সত্যকে চিনতে পেরেছেন এবং সেই অনুযায়ী আমল করেছেন।
যে ব্যক্তি সত্যকে চিনতে পেরেছে এবং অনুসরণ করেছে, সেই রাশেদ বা সুপথপ্রাপ্ত। এর বিপরীত হলো, পথভ্রষ্ট। অর্থাৎ সত্যের সন্ধান পেয়েছে, কিন্তু সে আনুযায়ী আমল করেনি, সেই হলো পথভ্রষ্ট।
المهديين হেদায়াতপ্রাপ্ত: অর্থাৎ যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা সত্যের দিকে হেদায়াত করেছেন। تمسكوا بها তোমরা উহাকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করবে। وعضوا عليها بالنواجذ অর্থাৎ এখানে রাসূল ﷺ এর সুন্নাত এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে শক্তভাবে ধারণ করার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। মাড়ির শেষপ্রান্তের দাঁতগুলোকে আযরাস বলা হয়।
محدثات الأمور নতুন বিষয়সমূহ: অর্থাৎ তোমরা সকল প্রকার বিদআত পরিহার করবে। فَإِنْ كُلِّ بَدْعَةٍ ضَلَالَةٌ কেননা প্রত্যেক বিদআতই গোমরাহী।
البدعة বিদ'আত শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ماليس له مثال سابق "যার কোন পূর্ব নুমনা নেই"।
আর শরীয়তের পরিভাষায় বিদআতের পরিচয় হলো, যার পক্ষে শরীয়াতের দলীল নেই। সুতরাং যে ব্যক্তি নতুন কিছু তৈরী করে দ্বীনের দিকে সম্বন্ধ করবে, যার পক্ষে কোন দলীল নেই, তাই বিদআত ও গোমরাহী। চাই তা আক্বীদার ক্ষেত্রে হোক কিংবা কথা ও কাজের মধ্যে হোক।
(৪) আল্লাহর কিতাব এবং রসূলের সুন্নাতের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করা: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআতের চতুর্থ বৈশিষ্ট্য হলো, তারা আল্লাহর কিতাব এবং রসূলের সুন্নাতের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করে, দলীল উপস্থাপন করার সময় মানুষের কথা ও কর্মের উপর এ দু'টিকে প্রাধান্য দেয় এবং তার অনুসরণ করে। কেননা তারা বিশ্বাস করে যে, আল্লাহর কালামই হলো সর্বাধিক সত্য।
আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ قِيلًا "আল্লাহর কথার চেয়ে অধিক সত্য আর কার কথা হতে পারে"? (সূরা নিসা ৪:১২২)
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ حَدِيثًا “আল্লাহর কথার চেয়ে অধিক সত্যবাদী আর কে হতে পারে? (সূরা নিসা ৪:৮৭)
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা বিশ্বাস করে যে, মুহাম্মাদ এর হেদায়াত হলো সর্বোত্তম হেদায়াত।
الهدي শব্দের 'হা' বর্ণে যবর ও 'দাল' বর্ণে সাকীন দিয়ে পড়া হয়েছে। এর অর্থ হলো পন্থা, পথ, জীবন পদ্ধতি। الهدى শব্দটির هاء বর্ণে পেশ এবং دال বর্ণে যবর দিয়ে পড়াও জায়েয আছে। তখন অর্থ হবে রাস্তা দেখানো বা সঠিক পথ প্রদর্শন করা।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা মানুষের কথার উপর আল্লাহ তা'আলার কালামকে প্রাধান্য দেয়। অর্থাৎ তারা আল্লাহর কালামকে প্রাধান্য দেয় এবং উহাকেই গ্রহণ করে। মানুষের কথা আল্লাহর কালামের বিরোধী হলে তারা মানুষদের কথা বাদ দিয়ে আল্লাহর কথাকেই গ্রহণ করে। তাদের মর্যাদা ও পদবী যত বড়ই হোক না কেন। রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা আলিম-ইমাম অথবা ইবাদাতকারী, যেই হন না কেন, আল্লাহর কথার মোকাবেলায় তারা কারো কথা গ্রহণ করে না।
সেই সাথে তারা মুহাম্মাদ ﷺ এর হেদায়াতকে সকল মানুষের মত ও পথের উপর প্রাধান্য দেয়। অর্থাৎ তারা তাঁর সুন্নাত, জীবন চরিত, শিক্ষা ও উপদেশকে মানুষের আচরণের উপর প্রাধান্য দেয়।
সেই সাথে মানুষের পদমর্যাদা যত বড়ই হোক না কেন। বিশেষ করে যখন সেই মানুষের আচরণ রসূল ﷺ এর সুন্নাতের সাথে সাংঘর্ষিক হবে। আল্লাহ তা'আলার এই বাণীর উপর আমল করতে গিয়েই তারা তা করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالْرَّسُولِ )
হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ্ আনুগত্য করো, আনুগত্য করো রসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা শাসক (কর্তৃত্বশীল ও বিদ্বান) তাদেরও। তারপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়ে যাও, তাহলে তা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও (সূরা নিসা: ৫৯)।
وَلِهَذَا سُمُّوا أَهْلَ الْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ ওয়াস্ সুন্নাত হিসাবে নামকরণ করা হয়েছে: আল্লাহর কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করার কারণে, মানুষের কথা ও আচরণের উপর উহাকে প্রাধান্য দেয়ার কারণে এবং আল্লাহর রসূলের হেদায়াতকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করার কারণে ও সমস্ত মানুষের আচরণের উপর উহাকে প্রাধান্য দেয়ার কারণে তাদেরকে আহলুল কিতাব ওয়াস্ সুন্নাত বলা হয়।
এ কারণেই তাদেরকে এই সম্মানজনক উপাধী দেয়া হয়েছে। এই সম্মানজনক উপাধী থেকে বুঝা যায়, যারা কুরআন ও সুন্নাহর পথ থেকে সরে গিয়ে পথভ্রষ্ট মুতাযেলা, খারেজী, রাফেযী এবং অন্যান্য গোমরাহ লোকদের মতামতকে বা উহার অংশ বিশেষকে সমর্থন করে, তারা ব্যতীত শুধু আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআতের লোকেরাই আল্লাহর কিতাব ও রসূলের সুন্নাতের অনুসরণের বিশেষণে বিশেষিত।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকদেরকে যেমন আহলুল কিতাব ওয়াস্ সুন্নাত বলা হয় তেমনি আহলুল জামা'আতও বলা হয়।
الجماعة শব্দটি (الفرقة) (ফির্কাবন্দী, বিভেদ ও দলাদলি) শব্দের বিপরীত।
আল্লাহর কিতাব ও রসূলের সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরলে ঐক্য ও সংহতি তৈরি হয়। আল্লাহ তা'আলা মুসলিমদেরকে জামা'আতবদ্ধ থাকার আদেশ দিয়ে বলেন:
(وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا )
"তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রুজ্জুকে মজবুতভাবে আকঁড়ে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না" (সূরা আল ইমরান: ১০৩)।
সুতরাং এখানে জামা'আত বলতে হকের উপর ঐক্যবদ্ধ লোকদেরকে বুঝায়।
(৫) আল্লাহর কিতাব ও রসূলের সুন্নাত থেকে দলীল গ্রহণ করা: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, তারা সম্মিলিতভাবে আল্লাহর কিতাব ও রসূলের সুন্নাত থেকে দলীল গ্রহণ করে, হকের উপর ঐক্যবদ্ধ থাকে এবং কল্যাণ ও তাকওয়ার কাজে পরস্পর সহযোগিতা করে। এর ফলেই ইসলামী শরীয়তে তৃতীয় মূলনীতি ইজমার উৎপত্তি হয়েছে। দ্বীনি ইলম অর্জন ও আমলের ক্ষেত্রে এই তৃতীয় মূলনীতি ইজমাকে দলীল হিসাবে গ্রহণ করা হয়ে থাকে।
الأجماع هو اتفاق علماء )الجمع هو اتفاق علماء ) 2016 1099 2018 العصر على أمر ديني দ্বীনের কোন বিষয়ে একই যুগের আলেমদের ঐক্যমত পোষণ করাকে ইজমা বলা হয়। ইজমা একটি অকাট্য দলীল। ইহার উপর আমল করা জরুরী। ইজমার স্থান যেহেতু আল্লাহর কিতাব ও রসূলের সুন্নাতের পরে, তাই ইহাকে তৃতীয় মূলনীতি বলা হয়।
(৬) আল্লাহর কিতাব, রসূলের সুন্নাত এবং আলেমদের ইজমা দ্বারা মানুষের কথাসমূহকে যাচাই করা: আহলে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা এই তিনটি মূলনীতির মাধ্যমে মানুষের দ্বীন সম্পর্কিত প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সমস্ত কথা ও আমল ওজন করে থাকে। তারা এই তিনটি মূলনীতিকে হক ও বাতিলের মাঝে এবং হেদায়াত ও গোমরাহীর মাঝে পার্থক্য করার মানদন্ড হিসাবে নির্ধারণ করে। সুতরাং তাদের থেকে আক্বীদা কিংবা আমল সম্পর্কিত যেসব কথা, কাজ ও আচরণ প্রকাশিত হয়, সেগুলোকে তারা এই দাড়িপাল্লায় রেখে ওজন করে। দ্বীন সম্পর্কিত সকল বিষয়ই তারা এই তুলাদন্ডের সাহায্যে যাচাই করে। যেমন সলাত, সিয়াম, হাজ্জ, যাকাত এবং অন্যান্য আচার-ব্যবহার। আর জাগতিক যেসব বিষয়ের সাথে দ্বীনের কোন সম্পর্ক নেই, যেমন মানুষের সাধারণ অভ্যাসসমূহ এবং দুনিয়াবী বিষয়াবলী, সেগুলোর ব্যাপারে মূলনীতি হলো ঐ সমস্ত কিছুই বৈধ।
অতঃপর যেই ইজমাকে দ্বীনী বিষয়ে দলীল গ্রহণের ক্ষেত্রে মূলনীতি হিসাবে ধরা হবে, শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া উহার স্বরূপ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: বাস্তবে যেসব বিষয়ে ইজমা সংঘটিত হয়েছে, উহা দ্বারা কেবল ঐসব বিষয় উদ্দেশ্য, যার উপর ছিলেন উম্মতের সালাফে সালেহীনগণ। অর্থাৎ সালাফে সালেহীনদের ইজমাই কেবল দ্বীনের মূলনীতি হিসাবে গণ্য। কেননা তারা ছিলেন আরব উপদ্বীপের হিজায অঞ্চলের একস্থানে একত্রিত অবস্থায়। তাদের সকলকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং দ্বীনী বিষয়ে তাদের সকলের মতামত জানা সম্ভব ছিল। তাদের পরে প্রচুর মতভেদ হয়েছে এবং উম্মত দলে দলে ভিবক্ত হয়ে পড়েছে। সুতরাং সালাফে সালেহীনের পরে দুই কারণে ইজমাকে নিয়ন্ত্রিণ ও সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়।
(ক) সালাফে সালেহীনের যুগের পরে ইখতেলাফ এত বেশী হয়েছে যে, আলিমদের সকল কথা আয়ত্তে আনয়ন ও সংরক্ষণ করা অসম্ভব।
(খ) ইসলামী বিজয় অভিযানের পর মুসলিম জাতির আলিমগণ পৃথিবীর সর্বত্র এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছেন যে, কোন বিষয় তাদের প্রত্যেকের কাছে পৌঁছা এবং তাদের সকলের পক্ষে উহা অবগত হওয়া সম্ভব ছিল না। দৃঢ়তার সাথে ইহা বলা সম্ভব নয় যে, তারা সকলেই উক্ত বিষয়ে এক ও অভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন।
একটি সতর্কতা: শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া দ্বীনের মূলনীতি তিনটিকেই উল্লেখ করেছেন।
চতুর্থ মূলনীতি কিয়াস উল্লেখ করেননি। কেননা কিয়াস শরীয়াতের মূলনীতি হওয়ার ব্যাপারে আলিমদের মতভেদ রয়েছে। যেমন মতভেদ রয়েছে দ্বীনের অন্যান্য মূলনীতির ব্যাপারে। এ বিষয়ে উসূলে ফিকাহর কিতাবসমূহে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। বিস্তারিত জানতে চাইলে সেগুলো পড়তে হবে। ১০২
টিকাঃ
৯৯. সহীহ: আবু দাউদ ৪৬০৭, তিরমিযী ২৬৭৬, দারিমী ৯৫, ইবনে মাজাহ ৪২।
১০০. তাদেরকে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত বলার কারণ হলো, তারা আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাতের উপর ঐক্যবদ্ধ থাকে এবং দলে দলে বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন হয় না। তাদের সংখ্যা কম হলেও তারা একটি জামা'আত। মূলতঃ জামাআত বলতে হকের উপর এক্যবদ্ধ লোকদেরকে বুঝায়। সংখ্যা কম হোক বা বেশী হোক, তাতে কিছু যায় আসেনা। সংখ্যা বেশী হলেও যারা আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাত থেকে দূরে তাদেরকে শরীয়তের পরিভাষায় জামাআত বলা হয়না।
১০১. সহীহ: আবু দাউদ ৪৬০৭, তিরমিযী ২৬৭৬, দারিমী ৯৫, ইবনে মাজাহ ৪২।
১০২. মূলতঃ আকীদাহ বিষয়ে মূলনীতি উক্ত তিনটিই মাত্র। কিয়াস দ্বারা আকীদাহ সাব্যস্ত হয় না। তাই এখানে চতুর্থটির উল্লেখ করা হয়নি।
📄 আক্বীদা‘র বিষয়গুলোর পরিপূরক হিসাবে আহ্লুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত যেসব সুমহান চারিত্রিক গুণাবলী এবং সৎকাজ করে থাকে, সে ব্যাপারে এ অনুচ্ছেদ।
পূর্বে যেসব মূলনীতির কথা আলোচনা করা হলো, তা বাস্তবায়ন করার সাথে সাথে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা সৎ কাজের আদেশ দেয়, শরীয়াতের অপরিহার্য দাবী মোতাবেক অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করে এবং শাসক গোষ্ঠির সাথেই হজ্জ পালন করে, জিহাদ করে, জুমু'আ ও ঈদের সলাত আদায় করে। এটিকে তারা আবশ্যক মনে করে। শাসক গোষ্ঠি ন্যায়পরায়ন হোক কিংবা যালেম ও পাপাচারী হোক, -উভয় অবস্থাতেই তারা উপরোক্ত কাজগুলো তাদের সাথেই সম্পাদন করে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা জামা'আতের সাথে সলাত আদায়ের প্রতি বিশেষ যত্নবান থাকে, উম্মতের সকল শ্রেণীর মানুষকে নসীহত করাকে ইবাদাত ও দ্বীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে। তারা এই হাদীস দু'টির মর্মার্থ বাস্তবায়ন করাকে আক্বীদার অংশ মনে করে, যাতে নাবী ﷺ বলেছেন:
«إِنَّ الْمُؤْمِنَ لِلْمُؤْمِنِ كَالْبُنْيَانِ يَشُدُّ بَعْضُهُ بَعْضًا وَشَبَّكَ أَصَابِعَهُ
"এক মুমিন অপর মুমিনের জন্য প্রাচীর সদৃশ। তারা একে অপরকে শক্তিশালী করে। এই বলে নাবী ﷺ এক হাতের আঙ্গুল অপর হাতের আঙ্গুলের ফাঁকা দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দিলেন"। ১০০ তিনি আরো বলেন:
تَرَى الْمُؤْمِنِينَ فِي تَرَاحُمِهِمْ وَتَوَادِّهِمْ، وَتَعَاطُفِهِمْ كَمَثَلِ الْجَسَدِ إِذَا اشْتَكَى عُضْوٌ تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ جَسَدِهِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى» (বুখারী: 6011)
"পরস্পরের প্রতি দয়া-মায়া ও ভালবাসা প্রদর্শনে এবং পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার ক্ষেত্রে তুমি ঈমানদারদেরকে একটি দেহের মত দেখতে পাবে। দেহের কোন অঙ্গ অসুস্থ হলে গোটা দেহ অনিদ্রা এবং জ্বরে তার শরীক হয়ে যায়”। ১০৪
সেই সাথে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা বালা-মুসীবত ও বিপদাপদের সময় সবর করা, সুখ-শান্তির সময় আল্লাহ তা'আলার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং তাকদীরের তিক্ত বিষয়গুলো সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেয়ার উপদেশ প্রদান করে।
ব্যাখ্যা: এই অধ্যায়টি পূর্বের অধ্যায়ের পরিপূরক স্বরূপ। এতে শাইখুল ইসলাম আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের ঐসব বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী বর্ণনা করেছেন, যা তাদের আক্বীদার বিষয়গুলোকে পূর্ণতা দান করে। শাইখুল ইসলাম বলেন: অতঃপর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা এই মূলনীতিগুলোর সাথে অর্থাৎ ইতিপূর্বে যেসব মূলনীতি অতিক্রান্ত হলো, তারা সেগুলো সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা এবং সে অনুযায়ী আমল করার সাথে সাথে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী অর্জন করে, যা তাদের আক্বীদার মৌলিক বিষয় না হলেও আক্বীদার বিষয়গুলোকে পূর্ণতা দান করে। সেগুলো তাদের গৃহীত আক্বীদা'র ফলাফলও বটে।
সুতরাং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা সৎ কাজের আদেশ দেয় এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করে। আল্লাহ তা'আলা তাদের এই বৈশিষ্ট্য কুরআনে উল্লেখ করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন:
﴿كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ ﴾
"তোমরাই সর্বোত্তম জাতি। তোমাদেরকে প্রেরণ করা হয়েছে মানুষের হেদায়াত ও সংস্কার সাধনের জন্য। তোমরা উত্তম কাজের আদেশ করবে ও অন্যায় কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখবে" (সূরা আল ইমরান ৩:১১০)
ঈমান ও সৎ আমল সম্পর্কিত যেসব কথা ও কাজ আল্লাহ তা'আলা পছন্দ করেন, তাই উত্তম কাজ বলে বিবেচিত। আর আল্লাহ তা'আলা যা অপছন্দ করেন এবং যা থেকে তিনি নিষেধ করেন, তাই অপছন্দীয় কাজ বলে বিবেচিত। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা শরীয়াতের দাবী মোতাবেক অর্থাৎ শক্তি ও ক্ষমতা থাকা বা না থাকার ভিত্তিতে এবং সৎ কাজের আদেশ ও অন্যায় কাজ হতে বারণ করতে গেলে কল্যাণ অর্জিত হওয়া বা না হওয়ার বিষয়টি সামনে রেখে প্রথমে শক্তি প্রয়োগ করে, শক্তি না থাকলে জবানের মাধ্যমে অন্যায়ের প্রতিবাদ করে, তাও না থাকলে অন্তর দিয়ে অন্যায়ের অপসারণ কামনা করে ও আল্লাহর নিকট অন্যায়ে লিপ্তদের হেদায়াতের জন্য দু'আ করে। মুতাযেলারা এ বিষয়ে শরীয়াতের দাবী ও বাধ্যবাধকতা মানে না। তারা মনে করে সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ বলতে শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাকেই বুঝায়।
শাসক গোষ্ঠি ন্যায়পরায়ণ কিংবা ফাসেক যাই হোক না কেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তাদের সাথেই হাজ্জ পালন, জিহাদ, জুমু'আ ও ঈদাইনের সলাত সম্পন্ন করে। মুসলিমদের শাসকদের অধীনে থেকে দ্বীনের এ নিদর্শন বা অনুষ্ঠানগুলো পালন করাকে তারা আক্বীদার অংশ মনে করে। শাসকরা যদি সৎ ও ন্যায়পরায়ণ হয় এবং দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে অথবা তারা যদি এমন পাপাচারী হয়, যা তাদেরকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না, তাহলেও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা শাসকদের অনুগত থাকে এবং তাদের সাথেই উপরোক্ত কাজগুলো সম্পাদন করে।
ফাসেক ও পাপাচারী শাসকদের সাথে ঐ কাজগুলো করার পিছনে মুসলিমদের উদ্দেশ্য হলো ঐক্য ঠিক রাখা এবং দলাদলি ও ফির্কাবন্দী থেকে দূরে থাকা। আর ফাসেক শাসক নিজের পাপাচারের কারণে শাসন ক্ষমতা থেকে নেমে যাবে না এবং তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে না। কেননা তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে গেলে মানুষের হক নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা এবং প্রচুর রক্তপাত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন: অতীতে যেসব ফির্কা শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে, তাদের বিদ্রোহের কারণে যে পরিমাণ লাভ হয়েছে, তার চেয়ে ক্ষতিই হয়েছে অনেক বেশী।
সুতরাং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা এ বিষয়ে ঐসব খারেজী, মুতাযেলা, শিয়া এবং বিদ'আতীদের থেকে আলাদা, যারা মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই ও বিদ্রোহ করাকে বৈধ মনে করে। বিশেষ করে যখন তারা শাসকদেরকে এমন কিছু করতে দেখে, যা যুলুম কিংবা যুলুম বলে ধারণা করা হয়। তারা এই বিদ্রোহকে সৎকাজের আদেশ এবং অন্যায় কাজের নিষেধের অন্তর্ভুক্ত মনে করে।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা জামা'আতের সাথে সলাত আদায়ের প্রতি বিশেষ যত্নবান থাকে: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা ফরয সলাত জামা'আতের সাথে আদায় করার জন্য মসজিদে উপস্থিত হওয়ার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়। চাই তা জুমু'আর সলাতের জামা'আত হোক বা ওয়াকতীয়া সলাতের জামা'আত হোক। কেননা জুমু'আ ও জামা'আত ইসলামের বৃহৎ নিদর্শনসমূহের অন্যতম এবং তাতে রয়েছে আল্লাহ ও আল্লাহর রসূলের আনুগত্য। তারা ঐসব শিয়াদের মত করে না, যারা নিষ্পাপ ইমাম ছাড়া অন্য কারো সাথে সলাত পড়াকে বৈধ মনে করে না। তারা মুনাফেকদের থেকেও ভিন্ন, যারা জামা'আতের সাথে সলাত আদায় করা থেকে পিছিয়ে থাকে। জামা'আতের সাথে সলাত আদায়ের অনেক ফাযীলাত রয়েছে, জামাআতে শরীক হওয়ার আদেশ এসেছে এবং তা থেকে পিছিয়ে থাকতে নিষেধ করা হয়েছে। এটি যেহেতু জামা'আতের সাথে সলাত আদায়ের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোচনার স্থান নয়, তাই বিষয়টি ছেড়ে দেয়া হলো।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা উম্মতে মুহাম্মাদীর লোকদেরকে নসীহত করাকে ইবাদাত ও দ্বীনের অংশ মনে করে। النصح শব্দের মূল অর্থ আন্তরিকতা, খাঁটিত্ব বিশুদ্ধতা ইত্যাদি। আর শরীয়াতের পরিভাষায়: هي إرادة الخير للمنصوح له وإرشاده إلى مصالحه অর্থাৎ দানকৃত ব্যক্তির শুভ কামনা করা এবং তার উপকার সাধনকারী বিষয়দির দিকে পথ নির্দেশ দেয়াকে নসীহত বলা হয়। সুতরাং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা উম্মতের জন্য শুভ কামনা করে এবং যাতে তাদের কল্যাণ রয়েছে, উহার প্রতি নির্দেশনা প্রদান করে। ১০৫
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, তারা কল্যাণের কাজে পরস্পর সহযোগিতা করে এবং তাদের কেউ আহত হলে কিংবা আঘাতপ্রাপ্ত হলে তার ব্যথায় ব্যথিত হয়। সুতরাং তারা এই হাদীসের মর্মার্থে বিশ্বাস করে এবং তা বাস্তবায়ন করে। রসূল বলেছেন:
إِنَّ الْمُؤْمِنَ لِلْمُؤْمِن كَالْبُنْيَانِ يَشُدُّ بَعْضُهُ بَعْضًا وَشَبَّكَ أَصَابِعَهُ এক মুমিন অপর মুমিনের জন্য এমন প্রাচীর সদৃশ, যার এক অংশ অন্য অংশকে শক্তিশালী করে। এই বলে নাবী ﷺ এক হাতের আঙ্গুল অপর হাতের আঙ্গুলের ফাঁকা দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দিলেন। ১০৬ তিনি আরো বলেন:
﴿تَرَى الْمُؤْمِنِينَ فِي تَرَاحُمِهِمْ وَتَوَادِّهِمْ، وَتَعَاطُفِهِمْ كَمَثَلِ الْجَسَدِ إِذَا اشْتَكَى عُضْو تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ جَسَدِهِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى﴾ (বুখারী: 6011)
"পরস্পরের প্রতি দয়া-মায়া ও ভালবাসা প্রদর্শনে এবং পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার ক্ষেত্রে তুমি মুমিনদেরকে একটি দেহের মত দেখতে পাবে। দেহের কোন অঙ্গ অসুস্থ হলে গোটা দেহ অনিদ্রা এবং জ্বরে তার শরীক হয়ে যায়"।১০৭
উপরের হাদীস দু'টি দেখিয়ে দিচ্ছে যে, মুসলিমদের পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতা কেমন হওয়া উচিৎ। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা এই হাদীস দু'টির দাবী অনুযায়ী আমল করে।
এক মুমিনের সাথে অন্য মুমিনের সম্পর্ক এবং মুমিনদের দৃষ্টান্ত: এখানে ঈমান বলতে পূর্ণ ঈমান উদ্দেশ্য। অর্থাৎ একজন পূর্ণ মুমিনের সাথে অন্য একজন পূর্ণ মুমিনের পারস্পরিক সম্পর্ক হলো, যেমন একটি মজবুত প্রাচীর, যার এক অংশ অন্য অংশের সাথে মজবুতভাবে যুক্ত ও লাগানো। মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিৎ তা সহজভাবে বুঝানোর উদ্দেশ্যে এই দৃষ্টান্ত পেশ করা হয়েছে।
যার এক অংশ অন্য অংশের সাথে মজবুতভাবে যুক্ত: এই বাক্যে মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্কের ধরণ বর্ণনা করা হয়েছে।
وشبك بين أصابعه তিনি হাতের আঙ্গুলসমূহকে জালের মত বানালেন: এটি হলো মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্কের আরেকটি দৃষ্টান্ত। এ কথা বুঝোনোর উদ্দেশ্যে এই উদাহরণটি পেশ করা হয়েছে। তারা সকলেই একটি মাত্র দেহের মত হবে। অর্থাৎ একটি শরীরের সমস্ত অঙ্গ যেমন পরস্পর জড়িত এবং আরাম ও কষ্ট অনুভব করার মধ্যে যেমন শরীরের সবগুলো অঙ্গই শরীক হয়, ঠিক তেমনি সমস্ত মুমিন মিলে একটি দেহের মতই। তাদের একজনের সুখ-শান্তি সকলেরই সুখ-শান্তি এবং একজনের দুঃখ-বেদনা সকলেরই দুঃখ-বেদনা।
তারা পরস্পরকে ভালবাসার ক্ষেত্রে এবং পরস্পরের প্রতি মায়া-মমতা প্রদর্শনে একই দেহের মত। দেহের কোন অঙ্গ যখন অসুস্থ হয় এবং ব্যথা অনুভব করে তখন এক অঙ্গের ব্যথায় অন্য অঙ্গ শরীক হয়। অর্থাৎ শরীরের সকল অঙ্গই ব্যথিত হয়। সেই ব্যথার কারণে শরীরের উত্তাপ বৃদ্ধি পায় এবং অনিদ্রায় রাত কাটাতে হয়। এমনি কোন মুসলিম যদি ব্যথিত হয়, তখন বিশ্বের সমস্ত মুসলিম সেই ব্যথায় শরীক হবে, এটিই ঈমানের দাবী।
এই হাদীসে মুসলিমদের পারস্পরিক বন্ধনের স্বরূপ তুলে ধরা হলেও তাতে মূলত আদেশ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ শরীরের এক অংশ ব্যথিত হলে সমস্ত শরীরেই যেমন সেই ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে, মুমিনদের অবস্থাও ঠিক একই দেহের মত হওয়া উচিৎ। তাদের কেউ কোন মসীবতে আক্রান্ত হলে সকলেরই তার সাথে ব্যথিত হওয়া উচিৎ এবং তার সেই মসীবত অপসারণের জন্য সকলে মিলে চেষ্টা করা উচিৎ। এখানে বিষয়টিকে সহজভাবে পেশ করার জন্য উপমা প্রদান করা হয়েছে এবং মুসলিমদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের তাৎপর্যকে দৃশ্যমান চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আরেকটি বৈশিষ্ট হলো, তারা বিপদাপদ ও মসীবতের সময় দৃঢ়পদ থাকে এবং মসীবতের সময় পরস্পরকে সবর করার উপদেশ দেয়।
الصبر শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো আটকিয়ে রাখা, বাধা দেয়া। এখানে সবর অর্থ হলো মুসীবতের সময় নফসকে অস্থিরতা প্রকাশ করা হতে বিরত রাখা, অভিযোগ ও বিরক্তি প্রকাশ করা হতে জবানকে আটকিয়ে রাখা এবং গালে চপেটাঘাত করা ও বুকের দিক থেকে শরীরের জামা ছিড়ে ফেলা থেকে হাতকে ব্যাহত করা।
البلاء অর্থ হলো মুসীবত ও কঠিন অবস্থায় ফেলে পরীক্ষা করা।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আরেকটি বৈশিষ্ট হলো নেয়ামত ও সুখ-শান্তিতে থাকার সময় তারা আল্লাহ তা'আলার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে।
الشكر বলা হয় এমন কাজকে, যা নেয়ামত প্রদান করার কারণে নেয়ামত প্রদানকারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনার্থে করা হয়। আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাকে যেই নেয়ামত দান করেছেন, তা আল্লাহর আনুগত্যমূলক কাজে ব্যয় করার নামই الشكر (কৃতজ্ঞতা)। প্রচুর ও ব্যাপক নেয়ামতকে বলা হয় الرخاء (স্বাচ্ছন্দ্য)।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আরেকটি বৈশিষ্ট হলো, তারা তাকদীরের তিক্ত ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে। الرضا (সন্তুষ্ট থাকা) السخط (অসন্তুষ্টি ও বিরক্তি প্রকাশ) করার বিপরীত। القضاء শব্দের আভিধানিক অর্থ হুকুম করা, ফয়সালা করা। সকল সৃষ্টি এবং উহার আসল অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলার ইলম ও সে অনুযায়ী তা সৃষ্টি করার ইচ্ছা করাকেই শরীয়াতের পরিভাষায় القضاء বলা হয়। তাকদীরের তিক্ত বিষয় দ্বারা ঐসব অপছন্দনীয় বিষয় উদ্দেশ্য, যা বান্দার উপর আপতিত হয়। যেমন রোগ-ব্যাধি, দারিদ্র, মানুষের কষ্ট, গরম, ঠান্ডা এবং নানা রকম ব্যথা-বেদনা।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন:
وَيَدْعُونَ إِلَى مَكَارِمِ الْأَخْلَاقِ وَمَحَاسِنِ الْأَعْمَالِ وَيَعْتَقِدُونَ مَعْنَى قَوْلِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا وَيَنْدُبُونَ إِلَى أَنْ تَصِلَ مَنْ قَطَعَكَ وَتُعْطِيَ مَنْ حَرَمَكَ وَتَعْفُوَ عَمَّنْ ظَلَمَكَ وَيَأْمُرُونَ بِرِّ الْوَالِدَيْنِ وَصِلَةِ الْأَرْحَامِ وَحُسْنِ الْجَوَارِ وَالْإِحْسَانِ إِلَى الْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَالرِّفْقِ بِالْمَمْلُوكِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْفَحْرِ وَالْخُيَلَاءِ وَالْبَغْيِ وَالِاسْتِطَالَةِ عَلَى الْخَلْقِ بِحَقِّ أَوْ بِغَيْرِ حَقٍّ وَيَأْمُرُونَ بِمَعَالِي الْأَخْلَاقِ وَيَنْهَوْنَ عَنْ سَفْسَافِهَا وَكُلُّ مَا يَقُولُونَهُ وَيَفْعَلُونَهُ مِنْ هَذَا وَغَيْرِهِ فَإِنَّمَا هُمْ فِيهِ مُتَّبِعُونَ لِلْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা উত্তম চরিত্র, সুমহান আচরণ এবং সৎ আমলের প্রতি আহবান করে। তারা নাবী এর এই বাণীর মর্মার্থকেও বিশ্বাস এবং বাস্তবায়ন করে। রসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا "ঐ ব্যক্তিই পূর্ণ ঈমানদার, যার চরিত্র উত্তম"।১০৮
যে ব্যক্তি তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তার সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখার আহবান জানায়, যে তোমাকে বঞ্চিত করে, তাকে দান করার আদেশ করে এবং যে তোমার উপর যুলুম করে, তাকে ক্ষমা করে দেয়ার উপদেশ দেয়।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার, আত্মীয়তার বন্ধন ঠিক রাখা এবং প্রতিবেশীর সাথে উত্তম ব্যবহার, ইয়াতীমদের প্রতি, মিসকীনদের প্রতি দয়া করার উপদেশ দেয়, মুসাফিরদের প্রতি অনুগ্রহ করার আদেশ করে এবং দাস-দাসী ও অধিনস্তদের প্রতি কোমল ব্যবহার করার আহবান জানায়। একই সাথে তারা গর্ব, দাম্ভিকতা, অহংকার, যুলুম এবং ন্যায়ভাবে কিংবা অন্যায়ভাবে নিজেকে বড় মনে করা ও অন্যকে ছোট মনে করা হতে নিষেধ করে। তারা সুমহান চারিত্রিক গুণাবলী অর্জন করার আদেশ করে এবং মন্দ স্বভাব বর্জন করার আহবান জানায়। মোটকথা, উপরোক্ত বিষয়গুলো এবং অন্যান্য বিষয় থেকে তারা যা বলে ও বাস্তবায়ন করে, তাতে আল্লাহর কিতাব ও রসূলের সুন্নাতের অনুসরণ করে।
ব্যাখ্যা: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা উত্তম চরিত্র গঠনের উপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করে। তারা নিজেরা উত্তম চারিত্রিক গুণাবলী অর্জন করে, অন্যদেরকেও তা অর্জনের প্রতি উৎসাহ দেয় এবং সুন্দরতম চারিত্রিক গুণাবলীর প্রতি মানুষকে আহবান জানায়। الأخلاق শব্দটি خلق -এর বহুবচন। خلق শব্দের خاء ও لام বর্ণে পেশ দিয়ে পড়া হলে উহা দ্বারা উদ্দেশ্য হবে মানুষের অভ্যন্তরীন গুণাবলী।
আর যদি خاء বর্ণে যবর এবং لام বর্ণে সাকীন দিয়ে পড়া হয়, তাহলে উহা দ্বারা বাহ্যিক গঠন ও আকৃতি উদ্দেশ্য হবে। বাহ্যিক আকৃতি বলতে মানুষের প্রকাশ্য স্বভাব-চরিত্র উদ্দেশ্য। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা সর্বোত্তম কাজ যেমন ভদ্রতা, বীরত্ব, সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা ইত্যাদি মহৎ গুণাবলীর প্রতি আহবান জানায়। তারা রসূল ﷺ এর এ বাণীর প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং উক্ত বাণীর দাবী অনুযায়ী আমল করে, যেখানে তিনি বলেছেন:
أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا "ঐ ব্যক্তিই পূর্ণ ঈমানদার, যার চরিত্র উত্তম"।১০৯
ইমাম আহমাদ ও তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম তিরমিযী ইহাকে হাসান সহীহ বলেছেন। সর্বোত্তম চরিত্র বলতে কোমল, নরম ও সুন্দরতম চরিত্র উদ্দেশ্য।
সুতরাং এ হাদীসে সুন্দরতম চরিত্রে চরিত্রবাণ হওয়ার প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। এ হাদীস থেকে আরো জানা গেল যে, বান্দাদের আমলসমূহ ঈমানের মধ্যে গণ্য। আরো জানা গেল, ঈমান বৃদ্ধি পায়।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা একদিকে যেমন মানুষের সাথে সর্বোত্তম আচরণ করার আহবান জানায়, হকদারদের হক আদায় করার আদেশ করে, অপর দিকে এর বিপরীত বিষয়গুলো যেমন অহংকার, দাম্ভিকতা ও যুলুম করা হতে সতর্ক করে।
সুতরাং যে ব্যক্তি তোমার সাথে সম্পর্ক চ্ছিন্ন করে এবং দুর্ব্যবহার করে তারা তোমাকে ঐ ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখা ও সদ্ব্যবহার করার আহবান জানায়, যে তোমাকে মাহরুম করে, তোমাকে ঐ ব্যক্তির জন্য খরচ করা, তাকে উপঢৌকন এবং অন্যান্য বস্তু দান করার আহবান জানায়। কেননা ইহাই প্রকৃত ইহসান ও ভদ্রতার পরিচয়।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তোমাকে আরো আহবান জানায় যে, তোমার উপর যে ব্যক্তি যুলুম করেছে, তুমি তাকে ক্ষমা করে দিবে। অর্থাৎ তোমার জান-মাল ও মান-সম্মানের কোন ক্ষতি করলেও তুমি তাকে ক্ষমা করে দিবে। কেননা তাকে ক্ষমা করে দেয়ার মাধ্যমে তুমি তার ভালবাসা অর্জন করতে পারবে, আল্লাহ তা'আলার কাছে এর বিনিময় পাবে।
بر الوالدين পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করা: আল্লাহ তা'আলা কুরআনে হকদারদের হকসমূহ আদায় করার যেই আদেশ করেছেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা সেই হকগুলো আদায় করার আদেশ করে। যেমন পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করা, পাপাচারের আদেশ ব্যতীত তাদের অন্যান্য আদেশ পালন করা এবং কথা ও কাজের মাধ্যমে তাদের প্রতি অনুগ্রহ ও দয়া প্রদর্শন করা।
صلة الأرحام আত্মীয়তার সম্পর্ক ঠিক রাখা: তারা আত্মীয়তার সম্পর্ক ঠিক রাখার অর্থাৎ নিকটাত্মীয়দের প্রতি সুন্দরতম আচরণ করার আহবান জানায়। الأرحام শব্দটি رحم শব্দের বহুবচন। যার সাথে আপনার আত্মীয়তার বন্ধন রয়েছে, সেই আপনার رحم (নিকটাত্মীয়)।
حسن الجوار প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার: যারা আপনার আশপাশে বসবাস করে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তাদের প্রতি উত্তম ব্যবহার করা এবং তাদেরকে কোন প্রকার কষ্ট না দেয়ার আহবার জানায়।
وَالْإِحْسَانِ إِلَى الْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيل ইয়াতীমদের প্রতি, মিসকীনদের প্রতি এবং মুসাফিরদের প্রতি অনুগ্রহ করা: اليتامى শব্দটি يتيم -এর বহুবচন। আভিধানিক অর্থে অনাথ শিশুকে ইয়াতীম বলা হয়। আর ইসলামের পরিভাষায় প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পূর্বেই যেই শিশুর পিতা মারা যান, তাকে ইয়াতীম বলা হয়। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা ইয়াতীমের প্রতি ইহসান করার আহবান জানায়। ইয়াতীমদের খোঁজ-খবর নেয়া, তাদের ধন-সম্পদের দেখা-শোনা করা এবং তাদের প্রতি দয়া করাই হলো তাদের প্রতি অনুগ্রহ করার নামান্তর।
মিসকীনদের প্রতি দয়া করাও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকদের অন্যতম বৈশিষ্ট। مساكين শব্দটি مسكين শব্দের বহুবচন। মিসকীন বলা হয় সেই অভাবী লোককে, দারিদ্র এবং অভাব যাকে দুর্বল করে ফেলেছে। তাদেরকে দান-খয়রাত করা এবং কোমল ব্যবহারের মাধ্যমেই তাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে হবে।
মুসাফিরের প্রতি সদ্ব্যবহর করা ও তার হক আদায় করাও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অন্যতম বৈশিষ্ট। যেই মুসাফিরের পথের সম্বল শেষ হয়ে গেছে কিংবা তার টাকা-পয়সা হারিয়ে গেছে অথবা চুরি হয়ে গেছে, তাকেই কেবল সাহায্য করা আবশ্যক। ১১০ কেউ কেউ বলেছেন: কুরআনের যেই আয়াতে মুসাফিরের হক আদায় করতে বলা হয়েছে, সেখানে মুসাফির বলতে মেহমান উদ্দেশ্য।
الرفق بالمملوك দাস-দাসী ও অধিনস্তদের প্রতি কোমল ব্যবহার করা:
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা দাস-দাসী ও অধিনস্তদের প্রতি সদাচরণ করার আহবান জানায়। চতুস্পদ জন্তুও অধিনস্তদের মধ্যে গণ্য। সুতরাং জীব-জন্তুর প্রতিও ইহসান করতে হবে এবং তাদের অধিকার পুরোপুরি দিতে হবে। الرفق ضد العنف অর্থাৎ কঠোরতার বিপরীত ব্যবহারই হলো কোমল ব্যবহার অর্থাৎ নম্রতা।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা গর্ব, অহংকার এবং যুলুম করতে নিষেধ করে। বংশমর্যাদা এবং আভিজাত্য নিয়ে বড়াই করার নাম গর্ব। الخيلاء শব্দের বর্ণে পেশ দিয়ে পড়া হয়েছে। ইহার অর্থ হলো অহংকার ও দাম্ভিকতা। মানুসের জান-মাল ও মান-সম্মানের উপর আক্রমণ করাকে البغي বলা হয়।
الاستطالة على الخلق ন্যায়ভাবে কিংবা অন্যায়ভাবে নিজেকে বড় মনে করা ও অন্যকে ছোট মনে করা হতে নিষেধ করা: অর্থাৎ মানুষের উপর নিজের বড়ত্ব প্রকাশ করা, মানুষকে তিরস্কার করা এবং তাদের মান-সম্মানে আঘাত করা হতে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা নিষেধ করে। সেটি ন্যায় সংগতভাবেই হোক আর অন্যায়ভাবেই হোক। ন্যায় সংগতভাবে নিজের বড়ত্ব প্রকাশ করা হলে তা অহংকার ও দাম্ভিকতা বলে গণ্য হবে। আর অন্যায়ভাবে হলে তা যুলুম হিসাবে গণ্য হবে। দুই অবস্থার কোন অবস্থাতেই নিজের বড়ত্ব প্রকাশ করা জায়েয নেই।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা মানুষকে সুমহান ও সুউচ্চ চারিত্রিক গুণাবলীর দিকে আহবান জানায় এবং নিকৃষ্ট ও ঘৃণীত স্বভাব-চরিত্র হতে তাদেরকে নিষেধ করে। প্রত্যেক জিনিসের নিকৃষ্ট ও ঘৃণিত অংশকে السفساف বলা হয়। এটি সুমহান ও সুউচ্চ চারিত্রিক গুণাবলীর বিপরীত। চালনি দিয়ে আটা চালার সময় আটা থেকে যা উড়ে যায় এবং শুকনো যমীন চাষ করার সময় যে ধুলা উড়ে উহাকে سفساف বলা হয়।
উপরোক্ত বিষয়গুলো থেকে তারা যা বলে ও বাস্তবায়ন করে, তাতে তারা আল্লাহর কিতাব ও রসূলের সুন্নাতের অনুসরণ করে: অর্থাৎ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা উপরোক্ত বিষয়গুলো থেকে যা কিছু বলে ও বাস্তবায়ন করে এবং পূর্বোক্ত বিষয়সমূহ থেকে যা কিছুর আদেশ করে ও যা থেকে নিষেধ করে, সেগুলো তাদের প্রভুর কিতাব কুরআনুল কারীম ও তাদের নাবীর পবিত্র সুন্নাত থেকেই নিয়েছে। চাই তা এ সংক্ষিপ্ত পুস্তকে উল্লেখিত বিষয়সমূহের অন্তর্ভুক্ত হোক কিংবা এর বাইরে যা রয়েছে তার অন্তর্ভুক্ত হোক। তারা নিজেদের পক্ষ হতে তাদের আক্বীদা তৈরী করেনি এবং এ বিষয়ে তারা অন্যদের তাকলীদও করেনি। উপরোক্ত বিষয়গুলো উল্লেখ করে আল্লাহ তা'আলা সূরা নিসার ৩৬ নং আয়াতে বলেন:
وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَن كَانَ مُخْتَالًا فَخُورًا
"আর তোমরা সবাই আল্লাহর বন্দেগী করো, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করো না, পিতা-মাতার সাথে ভালো ব্যবহার করো, নিকট আত্মীয় ও ইয়াতীম-মিসকীনদের সাথে সদ্ব্যবহার করো। আত্মীয় প্রতিবেশী, অনাত্মীয় প্রতিবেশী, পার্শ্বসাথী, মুসাফির এবং তোমাদের মালিকানাধীন বাদী ও গোলামদের প্রতি সদয় ব্যবহার করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ দাম্ভিক ও অহঙ্কারীকে পছন্দ করেন না" (সূরা নিসা ৪:৩৬)।
এ অর্থে অনেক হাদীস রয়েছে। সেগুলো থেকে শাইখ কিছু হাদীস উপরে উল্লেখ করেছেন।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া বলেন:
وَطَرِيقَتُهُمْ هِيَ دِينُ الإِسْلَامِ الَّذِي بَعَثَ اللَّهُ بِهِ مُحَمَّدًا صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ لَكِنْ لَمَّا أَخْبَرَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ أَنْ أُمَّتَهُ سَتَفْتَرِقُ عَلَى ثَلَاثٍ وَسَبْعِينَ فِرْقَةً؛ كُلُّهَا فِي النَّار؛ إِلَّا وَاحِدَةً، وَهِيَ الْجَمَاعَةُ. وَفِي حَدِيثٍ عَنْهُ أَنَّهُ قَالَ: ﴿هُمْ مَنْ كَانَ عَلَى مِثْلِ مَا أَنَا عَلَيْهِ الْيَومَ وَأَصْحَابِي صَارَ الْمُتَمَسِّكُونَ بِالْإِسْلَامِ الْمَحْضِ الْخَالِصِ عَنِ الشَّوْبِ هُمْ أَهْلُ السُّنَّةِ وَالْجَمَاعَةِ وَفِيهِمُ الصِّدِّيقُونَ، وَالشُّهَدَاءِ، وَالصَّالِحُونَ، وَمِنْهُمُ أَعْلامُ الْهُدَى، وَمَصَابِيحُ الدُّجَى أُولُو الْمَنَاقِبِ الْمَأْثُورَةِ، وَالْفَضَائِلِ الْمَذْكُورَةِ وَفِيهِمُ الأَبْدَالُ وَفِيهِمُ أَئِمَّةُ الدِّينِ الَّذِينَ أَجْمَعَ الْمُسْلِمُونَ عَلَى هِدَايَتِهِمْ وَدِرَايَتِهِمْ، وَهُمُ الطَّائِفَةُ الْمَنْصُورَةُ الَّذِينَ قَالَ فِيهِمُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ: "لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي عَلَى الْحَقِّ مَنْصُورَةً، لَا يَضُرُّهُم مَنْ خَالَفَهُمْ، وَلَا مَنْ خَذَلَهُمْ؛ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ نَسْأَلُ اللهُ أَنْ يَجْعَلَنَا مِنْهُمْ وَأَنْ لَا يُزِيعَ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَانَا، وَأَنْ يَهَبَ لَنَا مِن لَّدُنْهُ رَحْمَةً إِنَّهُ هُوَ الوَهَّابُ وَاللَّهُ أَعْلَمُ وَصَلَّى اللَّهُ عَلَى مُحَمَّدٍ وَآلِهِ وَصَحْبِهِ وَسَلَّمَ تَسْلِيمًا كَثِيرًا
আর ইসলামের পথ হলো আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকদের একমাত্র তরীকা, যা দিয়ে আল্লাহ তা'আলা তাঁর নাবী মুহাম্মাদ ﷺ-কে প্রেরণ করেছেন। কিন্তু তিনি যেহেতু সংবাদ দিয়েছেন, তাঁর উম্মত ৭৩ দলে বিভক্ত হবে, একটি দল ব্যতীত সবগুলো দলই জাহান্নামে যাবে, আর সেটি হলো জামা'আত এবং অন্য এক হাদীসে তিনি যেহেতু বলেছেন:
«هُمْ مَنْ كَانَ عَلَى مِثْلِ مَا أَنَا عَلَيْهِ الْيَومَ وَأَصْحَابِي»
"আজ আমি এবং আমার সাহাবীগণ যেই তরীকার উপর রয়েছি, যারা সেই পথেই চলবে তারাই হলো নাজাত প্রাপ্ত।”১১১ তাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরাই কেবল ভেজালমুক্ত খাঁটি ইসলামের ধারক।
বলে গণ্য হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে সিদ্দীকগণ, শহীদগণ এবং সৎকর্মশীলগণ। এই উম্মতের মধ্যে রয়েছে এমন সব ব্যক্তি, যারা হেদায়াতের নিদর্শন, আধাঁরের প্রদীপ, হাদীসে বর্ণিত কৃতিত্ব, মহৎগুণাবলী এবং প্রচুর ফাযীলাতের অধিকারী। তাদের মধ্যে আরো রয়েছে আবদাল (অলী-আওলীয়া) এবং দ্বীনের এমনসব ইমাম, যাদের হেদায়াতের উপর মুসলিমদের ইজমা সংঘটিত হয়েছে। তারাই হলো আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্ত সেই দল, যাদের ব্যাপারে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
«لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي عَلَى الْحَقِّ مَنْصُورَةً لَا يَضُرُّهُم مَنْ خَالَفَهُمْ وَلَا مَنْ خَذَلَهُمْ؛ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةِ»
"আমার উম্মতের একটি দল সবসময় হকের উপর বিজয়ী থাকবে। যেসব লোক তাদের বিরোধীতা করবে কিংবা তাদেরকে পরিত্যাগ করবে তারা কিয়ামত পর্যন্ত সেই দলটির কোন ক্ষতি করতে পারবে না”। ১১২
আমরা আল্লাহর কাছে দু'আ করি তিনি যেন আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভূক্ত করেন, আমাদেরকে হেদায়াত করার পর তিনি যেন আমাদের অন্তরকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে না দেন এবং আমাদেরকে যেন তাঁর বিশেষ রহমত দ্বারা আচ্ছাদিত করেন। তিনিই মহান দাতা। হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ , তাঁর পরিবার এবং তাঁর সাথীদের উপর অগণিত সালাত ও সালাম বর্ষণ করো! আমীন
ব্যাখ্যা: শাইখুল ইসলাম আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের বৈশিষ্টগুলো বর্ণনার শেষ পর্যায়ে এসে বলেন: তাদের সর্বোচ্চ বৈশিষ্ট হলো, তারা দ্বীন ইসলামের পথেই চলে। এ ইসলামই তাদের মাযহাব এবং আল্লাহ তা'আলার সান্নিধ্যে পৌঁছার এটিই তাদের একমাত্র পথ। এ উম্মতের মধ্যে যেই মতভেদ ও দলাদলি হবে বলে নাবী সংবাদ দিয়েছে, সেই দলাদলির সময় আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরাই সঠিক ইসলামের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। তাই তারা দলাদলিরত ফির্কাগুলোর মধ্য হতে নাজাতপ্রাপ্ত ফির্কায় পরিণত হয়েছে। নাবী ﷺ এবং তাঁর সাহাবী যে তরীকার উপর ছিলেন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা সেই তরীকার উপরই প্রতিষ্ঠিত। এ পথ নির্ভেজাল ও খাঁটি ইসলামের পথ ব্যতীত অন্য কিছু নয়। এ পথের অনুসরণ করার কারণেই তারা 'আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত' নামক সম্মানজনক পদবী লাভ করেছে। তাদের মধ্যেই রয়েছে সিদ্দীকগণ অর্থাৎ অতিশয় সত্যবাদী ও সত্যের অনুসরণকারী, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতে গিয়ে শহীদগণ এবং প্রচুর সৎকর্ম সম্পাদনকারী মহৎ ব্যক্তিবর্গ।
وَمِنْهُمُ أَعْلَامُ الْهُدَى এমন সবব্যক্তি, যারা হেদায়াতের নিদর্শন: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকদের মধ্যে রয়েছে এমনসব আলেম, যারা ইলম ও আমলের প্রতিটি প্রশংসিত বৈশিষ্ট ও গুণাবলীর দ্বারা বিশেষিত।
তাদের মধ্যে রয়েছে আবদাল। আবদাল বলতে অলীগণ এবং আবেদগণ উদ্দেশ্য। তাদেরকে আবদাল বলার কারণ সম্পর্কে একাধিক মত পাওয়া যায়। أبدال শব্দটি بدل শব্দের বহুবচন। এই উম্মতের একজন অলী ও আবেদ মারা গেলে তার বদলে আরেকজন আগমন করে। অলীগণের একজন যেহেতু অন্যজনের বদলে আগমন করে, তাই তাদেরকে আবদাল বলা হয়। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল ؒ থেকে এক বর্ণনায় এসেছে, মুহাদ্দিছগণই হলেন আবদাল। তাদের মধ্যে রয়েছে দ্বীনের ইমামগণ। তারা ছিলেন ইলম ও আমলের ক্ষেত্রে অনুসরণীয়। যেমন সুপ্রসিদ্ধ চার মাযহাবের চারজন সম্মানিত ইমাম এবং অন্যান্য ইমামগণ। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরাই সেই দল, যাদের কথা হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে। নাবী ﷺ বলেন:
لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي...
"আমার উম্মতের একটি দল সবসময় হকের উপর বিজয়ী থাকবে"। ১১৩
ইমাম বুখারী ও মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। অতঃপর শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া আল্লাহর কাছে দু'আ করা এবং নাবী এর উপর সলাত ও সালাম পেশ করার মাধ্যমে এ বরকতময় কিতাবটি সমাপ্ত করেছেন। এভাবে কোন কাজ শেষ করাকেই সর্বোত্তম পরিসমাপ্তি বলা হয়।
والحمد لله رب العالمين وصلى الله على نبينا محمد وعلى آله وصحبه وسلم
টিকাঃ
১০০. সহীহ বুখারী ৪৮১, মুসলিম ২৫৮৫, সহীহ ইবনে হিব্বান ২৩১, সুনানুর কুবরা বাইহাকী ১১৫১১।
১০৪. সহীহ বুখারী ৬০১১, সহীহ মুসলিম ২৫৮৬।
১০৫. রসূল বলেন: الدِّينُ النَّصِيحَةُ قُلْنَا لِمَنْ؟ قَالَ: لِلَّهِ وَلِكِتَابِهِ وَلِرَسُولِهِ وَلِأَئِمَّةِ الْمُسْلِمِينَ وَ عَامَّتِهِمْ "দ্বীন হলো নসীহত বা নসীহত দ্বীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সাহাবীগণ বলেন: আমরা জিজ্ঞেস করলাম, কার জন্য নসীহত? তিনি বললেন: আল্লাহ তাআলা, তাঁর কিতাব, তাঁর রাসূল, মুসলিমদের শাসক এবং সাধারণ মুসলিমদের জন্য"। (সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং-৮২)
আল্লাহ তাআলার জন্য নসীহতের অর্থ কী:
আল্লাহ তাআলার জন্য নসীহতের অর্থ হল, সত্যিকার ভাবে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা, আল্ কুরআন এবং রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর মাধ্যমে তিনি যে সংবাদ দিয়েছেন তা সত্য বলে মেনে নেয়া। নিষ্ঠার সাথে এককভাবে তাঁর এবাদত করা, তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করা। তিনি যেসব বিষয়ের আদেশ দিয়েছেন সেগুলো বাস্তবায়ন করা, নিষিদ্ধ বিষয় থেকে দূরে থাকা, তিনি যা ভালবাসেন তা ভালবাসা এবং তাঁর অপছন্দনীয় জিনিসকে অপছন্দ করা। মুমিন বান্দাদের সাথে বন্ধুত্ব রাখা আর কাফের, মুশরিক ও মুনাফিকদের থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করা। যে ব্যক্তি উক্ত বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করল সে স্বীয় প্রভুর জন্য নসীহত আদায় করল। পবিত্র কুরআন থেকে এই হাদীছের সমর্থনে নিম্নের আয়াতটি সাক্ষ্য হিসেবে প্রযোজ্য: لَيْسَ عَلَى الضُّعَفَاءِ وَلَا عَلَى الْمَرْضَى وَلَا عَلَى الَّذِينَ لَا يَجِدُوْنَ مَا يُنْفِقُوْنَ حَرَجٌ إِذَا نَصَحُوا لِلَّهِ وَلِرَسُوْلِهِ)
"দুর্বল, রুগ্ন, ব্যয়ভার বহনে অসমর্থ লোকদের জন্য কোন অপরাধ নেই, যখন তারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের জন্য কল্যাণ কামনা করবে এবং তাদের সাথে মনের দিক থেকে পবিত্র হবে।” (সূরা তাওবা: ৯১)
আল্লাহর কিতাবের নসীহত:
এ কথার অর্থ হলো, কুরআনের প্রতি ঈমান রাখা। যেমন ঈমান রেখেছিলেন সালাফে সালেহীন তথা সাহাবা, তাবেঈন ও তাবে তাবেঈনগণ। ইমাম তাহাবী বলেন: আল্-কুরআন নিঃসন্দেহে আল্লাহর কালাম। তা আল্লাহর নিকট থেকেই এসেছে। অহী আকারে তিনি উহা অবতীর্ণ করেছেন। মুমিনগণ সত্য হিসেবে উহা বিশ্বাস করে এবং দৃঢ় আস্থা রাখে যে আঙ্কুরআন সৃষ্টি জগতের ন্যায় আল্লাহর সৃষ্ট নয় বরং উহা প্রকৃতই আল্লাহর কালাম সুতরাং উহা শুনে কেউ যদি ধারণা করে যে উহা মানুষের কথা তাহলে সে কুফরী করল। এ ধরণের লোকদেরকে আল্লাহ্ তায়া'লা দুষ্কৃতিকারী ও পাপাচারী বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং তাদেরকে "সাকার” নামক জাহান্নামের ভয় দেখিয়েছেন। তিনি বলেন: إِنْ هَذَا إِلاَّ قَوْلُ الْبَشَرِ سَأَصْلِيهِ যে এ কথা বলে ইহা মানুষের কথা বৈ কিছু নয়, তাকে অচিরেই আমি "সাকার” নামক জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। (শরহুল আকীদাহ আত্ তাহাবীয়া)
এই আয়াত থেকে আমরা জানতে পারলাম যে, আল্-কুরআন নিঃসন্দেহে মানুষের স্রষ্টার বাণী, উহা মানুষের কথার সাথে কোন ভাবেই সাদৃশ্যপূর্ণ নয়। পবিত্র কুরআনের বিশুদ্ধ তেলাওয়াত বা পঠনও তার জন্য কল্যাণ কামনার অন্তর্গত। আল্লাহ তাআলা বলেন: وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيلًا “এবং কুরআন তেলাওয়াত করো তারতীল সহকারে সুবিন্যস্তভাবে”। (সূরা মুযাম্মিল: ৪) এমনিভাবে মুসলিমদেরকে উহা শিক্ষাদান করাও মঙ্গল কামনার অন্তর্গত। মহানাবী বলেন: خيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ "তোমাদের মাঝে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে নিজে কুরআন শিখে এবং তা অন্যকে শিখায়"। (সহীহ বুখারী, হাদীছ নং- ৪৬৩৯)
রাসূলুল্লাহ এর জন্য নসীহত:
আল্লাহ তাআলার বাণী: إِذَا نَصَحُوا لِلَّهِ وَرَسُولِهِ ইমাম কুরতুবী (রহ:) স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন: আল্লাহর রাসূলের জন্য নসীহতের অর্থ হলো তাঁর নবুওয়াতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা, তাঁর আদেশ ও নিষেধের আনুগত্য করা, তাঁর বন্ধুকে বন্ধু এবং শত্রুকে শত্রু ভাবা, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করা, তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে ভালবাসা, তাঁর সুন্নাতের তাযীম করা, তাঁর ইনতিকালের পর তাঁর সুন্নাতের লালন করা, গভীর জ্ঞানলাভের জন্য উহার গবেষণা করা, প্রচার-প্রসার এবং উহার প্রতি মানুষকে দাওয়াত দেয়া এবং তাঁর মহান চরিত্রে চরিত্রবান হতে সচেষ্ট থাকা। {(তাফসীরে কুরতুবী, (৮/২২৭)}
মুসলিম শাসকদের জন্য নসীহত: মুসলিম শাসকদের মঙ্গল কামনা প্রসঙ্গে হাফেজ ইবনে হাজার বলেন, শাসকদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে তাদেরকে সহযোগিতা করা, উদাসীনতার মুহূর্তে সতর্ক করা, ভুল-ত্রুটির মুহূর্তে বিদ্রোহ না করে তা সংশোধন করার ব্যবস্থা করা। তাদের সাথে ঐক্যবদ্ধ থাকা, বিশৃংখলা সৃষ্টিকারীদেরকে তাদের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা। তাদের জন্য সর্বোত্তম কল্যাণ কামনা হলো, সুন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে অন্যায় ও যুলুমের পথ থেকে তাদেরকে বাধা দান করা। {(ফতহুলবারী, ১/১৩৮)}
সাধারণ মুসলিমদের জন্য কল্যাণ কামনা: এ প্রসঙ্গে ইমাম নববী বলেন: তাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতের মঙ্গলজনক বিষয়ে নির্দেশনা দান, দ্বীনের অজানা বিষয়ে জ্ঞান দান করা এবং এ ব্যাপারে কথা ও কাজে তাদেরকে সহযোগিতা করা। তাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি গোপন রাখা এবং তা সংশোধন করার ব্যবস্থা করা। ক্ষতি এবং কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা তথা তাদের হিতসাধন করার চেষ্টা করা। দয়া ও নিষ্টার সাথে তাদেরকে ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায় থেকে নিষেধ করা। সকলের প্রতি সহনশীল হওয়া। বড়দের শ্রদ্ধা ও ছোটদের প্রতি দয়া করা। উত্তম পরামর্শ ও উপদেশ দেয়া, ধোঁকা ও হিংসা-বিদ্বেষ পরিত্যাগ করা। নিজের অপছন্দনীয় বস্তু তাদের জন্য অপছন্দ করা। তাদের ধন-সম্পদ ও ইজ্জতের হেফাযত করা। মোটকথা সার্বিক দিক থেকে সাধারণ মুসলিমদেরকে সহযোগিতা করা।
এখানে বিশেষভাবে স্মরণ রাখা দরকার যে, কল্যাণকামিতা শুধু মুসলিমদের সাথেই সীমিত নয়, বরং অমুসলিমদের জন্যও তা অপরিহার্য। কেননা রাসূলুল্লাহ্ তাঁর জাতির কল্যাণ কামনা করেছেন তথা তাদেরকে শির্ক ও মূর্তি পূজার অন্ধকার থেকে তাওহীদের আলোর দিকে নিয়ে আসার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন।
১০৬. সহীহ বুখারী ৪৮১, মুসলিম ২৫৮৫, সহীহ ইবনে হিব্বান ২৩১।
১০৭. সহীহ বুখারী ৬০১১, সহীহ মুসলিম ২৫৮৬।
১০৮. সহীহ: আবু দাউদ ৪৬৮২, তিরমিযী ১১৬২, দারিমী ২৮৩৪, মুসনাদে আহমাদ ১০৮১৭।
১০৯. সহীহ: আবু দাউদ ৪৬৮২, তিরমিযী ১১৬২, দারিমী ২৮৩৪, মুসনাদে আহমাদ ১০৮১৭।
১১০. সুতরাং যেই মুসাফিরের কাছে টাকা-পয়সা এবং অন্যান্য সম্পদ রয়েছে, তার জন্য সাদাকাহ ও মানুষের অন্যান্য অনুগ্রহ গ্রহণ করা জায়েয নেই।
১১১. হাসান: তিরমিযী ২৬৪১, অধ্যায়: কিতাবুল ঈমান।
১১২. সহীহ বুখারী ৭৩১২, সহীহ মুসলিম ১৯২৫, ইবনে মাজাহ ৬, তিরমিযী ২১৯২।
১১৩. সহীহ: সহীহ মুসলিম ১৫৬, ইবনে মাজাহ ৬, আবু দাউদ ২৪৮৪, তিরমিযী ২১৯২।