📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 আহ্‌লুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের নিকট নাবী ﷺ এর পবিত্র স্ত্রীগণের মর্যাদা।

📄 আহ্‌লুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের নিকট নাবী ﷺ এর পবিত্র স্ত্রীগণের মর্যাদা।


আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা নাবী এর স্ত্রী উম্মাহাতুল মুমিনদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে। তারা বিশ্বাস করে, আখিরাত দিবসেও তারা তাঁর স্ত্রীরূপেই পরিগণিত হবে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা বিশেষ করে রসূল এর স্ত্রী খাদীজা এর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে। কারণ খাদীজা ছিলেন তাঁর অধিকাংশ সন্তানের জননী, তাঁর প্রতি সর্বপ্রথম ঈমান আনয়নকারীনী এবং দ্বীনের দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে সর্বাত্মক সাহায্যকারীনী। সর্বোপরি খাদীজা এর ছিল রসূল এর নিকট সুউচ্চ মর্যাদা। সিদ্দীকাহ বিনতে সিদ্দীক আয়িশা সম্পর্কে নাবী বলেছেন:
فَضْلُ عَائِشَةَ عَلَى النِّسَاءِ كَفَضْلِ الشَّرِيدِ عَلَى سَائِرِ الطَّعَامِ “আয়িশা এর মর্যাদা সব নারীর উপর ঠিক সে রকমই, যেমন ছারীদ নামক খাবারের মর্যাদা সকল খাদ্যের উপর”।
ব্যাখ্যা: এ অংশে শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া নাবী এর পবিত্র স্ত্রীগণের ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকদের আক্বীদা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: তারা নাবী করীম এর স্ত্রীগণের প্রতি অন্তর দিয়ে গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে এবং তাদেরকে সম্মান করে। কেননা তারা হলেন শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের দিক থেকে এবং উম্মতের কারো জন্য তাদেরকে বিবাহ করা হারাম হওয়ার দিক থেকে জননী সমতুল্য। তবে বিবাহ ব্যতীত অন্যান্য হুকুম-আহকামের ক্ষেত্রে তাদের হুকুম অপরিচিত মহিলাদের মতই। অর্থাৎ তাদের সাথে নির্জনে একত্রিত হওয়া, তাদের দিকে দৃষ্টিপাত করা, ইত্যাদি সবই হারাম। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهَاتُهُمْ
"নাবী মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা অধিক ঘনিষ্ঠ এবং তাঁর স্ত্রীগণ তাদের মাতা” (সূরা আহযাব ৩৩:৬)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَمَا كَانَ لَكُمْ أَن تُؤْذُوا رَسُولَ اللَّهِ وَلَا أَن تَنكِحُوا أَزْوَاجَهُ مِن بَعْدِهِ أَبَدًا إِنْ ذَلِكُمْ كَانَ عِندَ اللَّهِ عَظِيمًا
"তোমাদের জন্য আল্লাহর রসূলকে কষ্ট দেয়া মোটেই জায়েয নয় এবং তাঁর পরে তাঁর স্ত্রীদেরকে বিবাহ করাও জায়েয নয়। এটা আল্লাহর দৃষ্টিতে বিরাট গুনাহ্” (সূরা আহযাব ৩৩:৫৩)। আল্লাহ তা'আলা একই আয়াতে আরো বলেন:
وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ
"তোমরা তাঁর পত্নীদের কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে।" (সূরা আহযাব ৩৩:৫৩)।
সুতরাং সম্মান পাওয়ার দিক থেকে তারা মুমিনদের জননী সমতুল্য। তবে মুমিনগণ আপন মাতার ন্যায় নাবী ﷺ এর স্ত্রীগণের জন্য মাহরাম নয়। অর্থাৎ নিজের মাতা, বোন, কন্যা এবং অনুরূপ মহিলার সাথে নির্জনে সাক্ষাৎ করা জায়েয, সেরকম নাবী ﷺ এর স্ত্রীদের সাথে নির্জনে মিলিত হওয়া জায়েয নয়।
নয়জন স্ত্রী জীবিত রেখে নাবী মৃত্যু বরণ করেছেন। তারা হলেন আয়িশা, হাফসা, যয়নব বিনতে জাহ্শ, উম্মে সালামা, সাফীয়া, মায়মুনা, উম্মে হাবীবা, সাওদা এবং জুআইরিয়া।
তিনি খাদীজাকে নবুওয়াতের পূর্বেই বিবাহ করেছিলেন। তিনি জীবিত থাকতে আর কাউকে বিবাহ করেননি। যায়নাব বিনতে খুযাইমাকে বিবাহ করার কিছু দিন পরেই যায়নাব মৃত্যু বরণ করেন। এরাই হলেন নাবী ﷺ এর ঐ সমস্ত স্ত্রী, যাদের সাথে তিনি ঘরসংসার করেছেন। তাদের সংখ্যা মোট ১১জন। আল্লাহ তাদের উপর সন্তুষ্ট হোন। আমীন।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা আরো বিশ্বাস করে যে, আখিরাত দিবসে নাবী ﷺ এর স্ত্রীগণ তাঁর স্ত্রীরূপেই থাকবে। এতে করে তাদের জন্য বিরাট সম্মান ও ফাযীলাত হাসিল হবে।
নাবী ﷺ এর স্ত্রী খাদীজার রয়েছে বিশেষ ফাযীলাত। তাঁর রয়েছে অনেক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য, মর্যাদা এবং ফাযীলাত। শাইখুল ইসলাম তা থেকে এখানে কয়েকটি উল্লেখ করেছেন।
(১) খাদীজা রসূল ﷺ এর অধিকাংশ সন্তানের মাতা। সুতরাং ইবরাহীম ব্যতীত তাঁর বাকীসব সন্তানই খাদীজার গর্ভ থেকে। ইবরাহীম ছিলেন মারিয়া কিবতীর গর্ভ থেকে।
(২) এক মতানুসারে খাদীজাই সর্বপ্রথম রসূল ﷺ এর প্রতি ঈমান আনয়ন করেন। শাইখুল ইসলাম এখানে এই মতটিই উল্লেখ করেছেন। অন্যমতে তিনি মহিলাদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন।
(৩) রসূল এর দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে খাদীজা ই সর্বপ্রথম সক্রীয়ভাবে সহযোগিতা ও সাহায্য করেছিলেন। তিনি ঠিক সেই সময়তেই নাবীকে সাহায্য করেছেন, যখন সাহায্যের খুব প্রয়োজন ছিল।
(৪) রসূল ﷺ এর নিকট খাদীজা এর ছিল উচ্চ মর্যাদা। তিনি খাদীজাকে খুব ভালবাসতেন, তাঁর কথা স্মরণ করতেন এবং তাঁর খুব প্রশংসা করতেন।
আর সিদ্দীকাহ বিনতে সিদ্দীক সম্পর্কে কথা এই যে, তিনি হলেন আয়িশা বিনতে আবু বকর। অত্যাধিক সত্যবাদীকে সিদ্দীক বলা হয়। নাবী আবু বকরকে এই উপাধী দিয়েছেন। আয়িশা এর রয়েছে অনেক ফাযীলাত। তার মধ্যে
(ক) তিনি ছিলেন নাবী ﷺ এর স্ত্রীদের মধ্যে তাঁর নিকট সর্বাধিক প্রিয়।
(খ) তাঁকে ছাড়া রসূল আর কোন কুমারী মহিলাকে বিবাহ করেননি।
(গ) আয়িশা এর সাথে একই চাদরের নীচে থাকা অবস্থায় নাবী এর উপর অহী নাযিল হতো।
(ঘ) মিথ্যুকরা তাঁর উপর যে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছিল, আল্লাহ তা'আলা নিজেই তাঁকে সেই মিথ্যা অপবাদ থেকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন।
(ঙ) তিনি হলেন মহিলাদের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী।
(চ) বিজ্ঞ সাহাবীগণ যখন কোন বিষয়ে সমস্যার সম্মুখীন হতেন, তখন তাঁর কাছে সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেন।
(ছ) রসূল তাঁর ঘরে এবং তাঁরই বুকের উপর মাথা রেখে মৃত্যু বরণ করেছেন।
(জ) নাবী কে তাঁর গৃহেই দাফন করা হয়েছে। এ ছাড়াও তাঁর আরো অনেক ফাযীলাত রয়েছে। আর শাইখুল ইসলাম এখানে তাঁর যেই ফাযীলাতটি উল্লেখ করেছেন, তা হলো নাবী বলেন: فَضْلَ عَائِشَةَ عَلَى النِّسَاءِ كَفَضْلِ الشَّرِيدِ عَلَى سَائِرِ الطَّعَامِ
"আয়িশা এর মর্যাদা সব নারীর উপর ঠিক সেরকমই, যেমন ছারীদ নামক খাবারের মর্যাদা অন্যসব খাদ্যের উপর"।৮৬
ছারীদ ছিল সে সময়ের সর্বোত্তম খাবার। কেননা তাতে থাকত গোশত ও রুটি। আটার রুটি সর্বোত্তম খাদ্য। আর গোশত হলো সর্বোত্তম সালন (তরকারী)। গোশত যেহেতু সর্বোৎকৃষ্ট তরকারী এবং আটা যেহেতু সর্বোত্তম খাদ্যদ্রব্য, আর ছারীদ যেহেতু এই উভয় প্রকার বস্তু দ্বারা তৈরী হয়, তাই ছারীদ সর্বোত্তম খাদ্যে পরিণত হয়েছে।

টিকাঃ
৮৪. সেকালে সারীদ ছিল আরবের সর্বোত্তম খাদ্য, যা রুটি ও মাংস দ্বারা তৈরী হত।
৮৫. সহীহ বুখারী ৩৪১১, সহীহ মুসলিম ২৪৩১, তিরমিযী ৩৮৮৭, নাসাঈ ৩৯৪৭, ইবনে মাজাহ ৩২৮০, সুনানে দারিমী ২১১৩।
৮৬. সহীহ বুখারী ৩৪১১, সহীহ মুসলিম ২৪৩১, তিরমিযী ৩৮৮৭, নাসাঈ ৩৯৪৭, ইবনে মাজাহ।

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 সাহাবী এবং আহলে বাইতের ব্যাপারে বিদআ‘তীরা যা বলে, আহ্‌লুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।

📄 সাহাবী এবং আহলে বাইতের ব্যাপারে বিদআ‘তীরা যা বলে, আহ্‌লুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।


আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আক্বীদা হলো, তারা ঐ সমস্ত রাফেযীর পথ পরিহার করে, যারা সাহাবীদেরকে ঘৃণা করে এবং তাদেরকে গালি দেয়। তারা ঐসব নাওয়াসেবদের সাথেও সম্পর্ক ছিন্ন করে, যারা কথা কিংবা আচরণের মাধ্যমে আহলে বাইতকে কষ্ট দেয়। সাহাবীদের পরস্পরের মধ্যে যে সমস্ত মতবিরোধ, ফিতনা এবং যুদ্ধ-বিগ্রহ সংঘটিত হয়েছে সে ব্যাপারে কথা বলা থেকে তারা বিরত থাকে।
তারা বলে যে, সাহাবীদের দোষ-ত্রুটি আলোচনায় যেসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোর কিছু মিথ্যা, কোনটিতে সংযোজন করা হয়েছে, কোনটি হতে কিছু অংশ বিয়োজন করা হয়েছে আবার কোনটিকে সঠিক স্থান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
সাহাবীদের দোষ-ত্রুটি বর্ণনার হাদীসগুলো থেকে যা সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তার ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অবস্থান হলো, তাতে তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত। কেননা তারা ইজতেহাদ করেছিলেন। সুতরাং ইজতেহাদ করতে গিয়ে হয় তারা সঠিক সিদ্বান্তে উপনীত হয়েছেন আর না হয় ভুল করেছেন। মূলতঃ ইজতেহাদের বিষয়টি এমন যে, মুজতাহিদগণ কখনো তাতে ভুল করে থাকে আবার কখনো তারা সঠিক সিদ্বান্তেও উপনীত হয়ে থাকে।
তা সত্ত্বেও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা এ বিশ্বাস করে না যে, প্রত্যেক সাহাবীই কাবীরা ও সগীরা গুনাহ হতে নিষ্পাপ; বরং তাদের দ্বারা গুনাহ হতে পারে। তবে ইসলাম গ্রহণে তাদের অগ্রগামিতাসহ এমনসব ফাযীলাত রয়েছে, যার দাবী এই যে, তাদের দ্বারা গুনাহ হয়ে থাকলেও তা ক্ষমাযোগ্য। এমনকি সাহাবীদের এমন গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে, যা পরবর্তীতে আগমনকারীদের বেলায় মাফ করা হবে না। কেননা তাদের রয়েছে এমন অনেক সৎ আমল, যা পরবর্তীদের জন্য অর্জন করা অসম্ভব। সুতরাং সাহাবীদের এই সৎকর্মগুলো তাদের দোষ-ত্রুটি মিটিয়ে দিবে।
নাবী থেকে সহীহ হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে, যে সাহাবীগণ ছিলেন সর্বোত্তম মানুষ"। তাদের পরবর্তী যুগের কোনো মুসলিম উহুদ পাহাড়ের সমপরিমাণ স্বর্ণ আল্লাহর রাস্তায় দান করলেও সে সাহাবীদের কারোর একমুষ্টি পরিমাণ খাদ্য দান করার সমান ছাওয়াব পাবে না।৯০
অতঃপর তাদের কারো দ্বারা ভুল-ত্রুটি হয়ে থাকলেও তা থেকে তিনি তাওবা করেছেন অথবা এমন সৎ আমল করেছেন, যা তার ভুল-ত্রুটিকে মিটিয়ে দিয়েছে অথবা সর্বাগ্রে ইসলাম গ্রহণ ও সৎকর্মে অগ্রগামী হওয়ার কারণে কিংবা নাবী ﷺ এর শাফাআতের দ্বারা তার সে ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দেয়া হবে। কেননা সাহাবীরাই নাবী এর শাফাআত পাওয়ার সর্বাধিক হকদার। অথবা দুনিয়াতে তাকে কোন মসীবতে ফেলা হয়েছে, যার কারণে উক্ত মুসীবত তার গুনাহর কাফফারা হয়ে গেছে।
সুতরাং তাদের দ্বারা নিশ্চিতরূপে সংঘটিত গুনাহর অবস্থা যদি এই হয়, তাহলে ঐসব ভুল-ত্রুটির কী অবস্থা হতে পারে, যাতে তারা ইজতেহাদ করেছিলেন? যদি তারা সেখানে হকে উপনীত হয়ে থাকেন, তাহলে তাদের জন্য রয়েছে দু'টি নেকী। আর ভুল করে থাকলে রয়েছে একটি নেকী। আর ভুল-ত্রুটি তো ক্ষমাযোগ্যই।
এখানে আরেকটি কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, তাদের কর্মসমূহ থেকে যে পরিমাণ কাজকে অপছন্দ করা হয়ে থাকে, তা অতি সামান্য ও নগণ্য। আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রসূলের প্রতি অগাধ বিশ্বাস, ভালবাসা, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ, হিজরত, দ্বীনের নুসরত (সাহায্য), উপকারী ইলম এবং সৎ আমলসহ তাদের আরো যেসব সুবিশাল ফাযীলাত ও সৎকর্ম রয়েছে, তা দ্বারা উহা আচ্ছাদিত হয়ে গেছে।
সুতরাং যে ব্যক্তি সজ্ঞানে ও জেনে-বুঝে সাহাবীদের পবিত্র জীবনীর প্রতি দৃষ্টি দিবে এবং আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে যেসব ফাযীলাত দান করেছেন, তার প্রতিও দৃষ্টিপাত করবে, সে নিশ্চিতভাবেই জানতে পারবে, তারাই নাবীদের পরে সর্বোত্তম মানুষ। অতীতে সাহাবীদের মত মর্যাদাবান ও ফযীলতের অধিকারী কেউ ছিল না। ভবিষ্যতেও তাদের মত ভাল লোক আর আসবে না। তারা মুসলিম জাতির সর্বোত্তম ব্যক্তি এবং আল্লাহর নিকট সর্বাধিক মর্যাদাশীল উম্মতের সর্বোৎকৃষ্ট মানব।
ব্যাখ্যা: শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া এই অংশে আহলে বাইত ও সাহাবীদের ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন।
প্রথমত: তাদের ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অবস্থান হলো ইফরাত (বাড়াবাড়ি) ও তাফরীত (অবহেলা ও শৈথিল্য) এবং সীমালঙ্ঘন ও কঠোরতার মাঝখানে। তারা উম্মতের সকল মুমিনকেই ভালবাসে। বিশেষ করে যেসব মুহাজির ও আনসার সর্বপ্রথম ইসলাম কবুল করেছে এবং যারা উত্তমভাবে তাদের অনুসরণ করেছে, তারা তাদের সবাইকে ভালবাসে। তারা আহলে বাইতের প্রতিও অন্তর দিয়ে গভীর ভালবাসা ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে।
তারা সাহাবীদের মর্যাদা, ফাযীলাত ও নৈতিক গুণাবলী সম্পর্কে অবগত রয়েছে। সেই সাথে আহলে বাইতের জন্য আল্লাহ তা'আলা যেসব হক নির্ধারণ করেছেন, তারা সেই হকগুলোও সংরক্ষণ করে।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা রাফেযীদের পথ বর্জন করে এবং তাদের সাথে কোন প্রকার সম্পর্ক রাখে না। কারণ তারা সাহাবীদেরকে গালি দেয়, তাদের সমালোচনা করে এবং আলী ও আহলে বাইতের ভালবাসায় সীমালংঘন করে।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা নাওয়াসেবদের সাথেও সম্পর্ক ছিন্ন করে। কেননা তারা আহলে বাইতের সাথে শত্রুতা পোষণ করে, তাদেরকে কাফের বলে এবং তাদের সম্মানে আঘাত করে। সাহাবী এবং আহলে বাইতের ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকদের মাযহাব পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মাযহাবের বিরোধী ও ভ্রান্ত মাযহাবগুলোর সাথে তুলনা করার জন্যই শাইখুল ইসলাম এখানে তা পুনরাবৃত্তি করেছেন।
দ্বিতীয়ত: ফিতনার সময় সাহাবীদের মধ্যে যেসব যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং মতভেদ সৃষ্টি হয়েছিল শাইখুল ইসলাম সেগুলোর ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। সাহাবীদের দিকে যেসব দোষ-ত্রুটি সম্বন্ধ করা হয় এবং তাদের নামে যেসব কুৎসা রটানো হয়, ইসলামের শত্রুরা সেগুলোকে সাহাবীদের বিরুদ্ধে আক্রমণের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেছে এবং তাদের সম্মান ও মর্যাদা নষ্ট করার সুযোগ খুঁজেছে। যেমন করেছে পরবর্তী যুগের কিছু আলিম এবং সমসাময়িক কতিপয় লেখক, যারা নিজেদেরকে রসূল ﷺ এর সাহাবীদের মধ্যে ফয়সালাকারী নিযুক্ত করেছে এবং বিনা দলীলে কারো পক্ষ নিয়ে তাকে হকপন্থী বলেছে আবার কারো বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে তাকে ভ্রান্ত বলেছে। বরং তারা কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং ঐসব মতলববাজ ও সুবিধাবাদীদের অন্ধ অনুসরণ করেই এরূপ করেছে, যারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে ও চক্রান্তে লিপ্ত। এর মাধ্যমে তারা মুসলিমদের গৌরবময় ইতিহাসের ব্যাপারে তাদেরকে সন্দিহান করে তুলতে চায় এবং তাদের সামনে সালাফে সালেহীনদের ঐসব লোকের চরিত্রকে কলঙ্কিত করে দিতে চায়, যারা ছিলেন এই উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। এ কাজের পিছনে তাদের সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা হলো ইসলামের বিশুদ্ধতা ও স্বচ্ছতায় আঘাত করা এবং মুসলিমদের ঐক্যে ফাটল ধরানো।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া এখানে অত্যন্ত সুন্দর ভাষায় সত্যকে প্রকাশ করেছেন এবং প্রকৃত ঘটনাকে খোলাসা করেছেন। তিনি সুস্পষ্ট করেই উল্লেখ করেছেন যে, সাহাবীদের দিকে যেসব কথা সম্বন্ধ করা হয় এবং তাদের মধ্যে যেসব অপ্রীতিকর ঘটনা (ফিতনা, দলাদলি ও যুদ্ধ-বিগ্রহ) হয়েছে, সে ব্যাপারে তিনি দু'টি কথার মধ্যে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মাযহাব খোলাসা করেছেন।
এক. তিনি বলেছেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা সাহাবীদের মধ্যে সংঘটিত বাদানুবাদ ও যুদ্ধ-বিগ্রহ সম্পর্কে নিরব থাকে। অর্থাৎ তারা সে ব্যাপারে ঘাটাঘাটি করে না এবং তাতে খোঁজাখুঁজিও করে না। কেননা তাতে বেশী খোঁজাখুঁজি ও ঘাটাঘাটি করতে গেলে রসূল এর সাহাবীদের প্রতি অন্তরে বিদ্বেষ ও হিংসা জন্ম নিতে পারে। আর সাহাবীদের প্রতি অন্তরে হিংসা রাখা বড় ধরণের গুনাহর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং নিরবতা পালন করা এবং সে বিষয়ে কথা না বলাই তা থেকে নিরাপদ থাকার একমাত্র পন্থা।
দুই. তাদের দোষ-ত্রুটি বর্ণনায় যেসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে, শাইখুল ইসলাম সেগুলোর জবাব দিয়েছেন। সাহাবীদের মর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে এবং তাদের শত্রুদের চক্রান্তকে প্রতিহত করার জন্যই তিনি তা করেছেন। শাইখুল ইসলামের জবাবগুলো সংক্ষিপ্তাকারে নিম্নে উল্লেখ করা হলো।
(১) যেসব হাদীসে তাদের দোষ-ত্রুটির কথা উল্লেখিত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে কিছু মিথ্যা ও বানোয়াট বর্ণনা রয়েছে। সাহাবীদের সুনাম নষ্ট করার জন্য তাদের দুশমনরা এসব হাদীস রচনা করেছে। যেমন করে থাকে রাফেযীরা। আল্লাহ তা'আলা তাদের চেহারা কালো করুন! সুতরাং তাদের মিথ্যা বর্ণনার প্রতি দৃষ্টি দেয়া যাবে না।
(২) এসব দোষ-ত্রুটি সম্বলিত বর্ণনার কোনটিতে সংযোজন করা রয়েছে, কোনটি হতে কিছু অংশ বিয়োজন করা হয়েছে আবার কোনটিকে সঠিক স্থান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে এগুলোর মধ্যে মিথ্যা প্রবেশ করেছে এবং বর্ণনাগুলো বিকৃত করা হয়েছে। তাই এগুলোর উপর নির্ভর করা যাবেনা। কেননা সাহাবীদের ফাযীলাত ও মর্যাদা সর্বজন বিদিত এবং তাদের ন্যায়পরায়ণতার বিষয়টি নিশ্চিতভাবে জ্ঞাত। সুতরাং বিকৃত ও সন্দিহান বিষয়ের পিছনে পড়ে নিশ্চিতভাবে জ্ঞাত বিষয়কে পরিত্যাগ করা যাবে না।
(৩) সাহাবীদের দোষ-ত্রুটি বর্ণনার হাদীসগুলো থেকে যা সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তার ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অবস্থান হলো, তাতে তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত। কেননা তারা ইজতেহাদ করেছিলেন। সুতরাং ইজতেহাদ করতে গিয়ে হয় তারা সঠিক সিদ্বান্তে উপনীত হয়েছেন আর না হয় ভুল করেছেন। মূলতঃ ইজতেহাদের বিষয়টি এমন যে, মুজতাহিদগণ কখনো ভুল করে থাকেন আবার কখনো সঠিক সিদ্বান্তেও উপনীত হয়ে থাকেন।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, সাহাবীদের যেসব ভুল-ভ্রান্তি হয়েছে, তা ছিল এমন ইজতেহাদী বিষয় সমূহে, যাতে মুজতাহিদ সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হলে দু'টি ছাওয়াব পায় এবং ভুল করলেও একটি নেকী পায়।
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আবু হুরায়রা ও আমর বিন আস হতে বর্ণিত হয়েছে, রসূল বলেছেন:
«إِذَا حَكَمَ الْحَاكِمُ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَصَابَ فَلَهُ أَجْرَانِ، وَإِذَا حَكَمَ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَخْطَأَ فَلَهُ أَجْرٌ». (بخارى: 7352)
"কোন বিচারক ইজতেহাদ করে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হলে তার জন্য দ্বিগুণ পুরস্কার রয়েছে। পক্ষান্তরে ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হলে তার জন্যও একটি পুরস্কার রয়েছে”। ৯১
(৪) সাহাবীগণ মানুষ ছিলেন। সুতরাং বনী আদমের অন্যান্য মানুষ দ্বারা যে ভুল-ত্রুটি হওয়া সম্ভব, তাদের দ্বারাও তা সংঘটিত হওয়া সম্ভব।
সুতরাং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা এ বিশ্বাস করে না যে, সাহাবীদের প্রত্যেকেই কাবীরা ও সগীরা গুনাহ থেকে নিষ্পাপ। বরং তাদের কারো কারো দ্বারা গুনাহর কাজ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তাদের দ্বারা কোন গুনাহ হয়ে থাকলেও গুনাহ মোচনের অনেক আমল রয়েছে। নিম্নে তা থেকে কিছু আমল বর্ণনা করা হলো:
(ক) ইসলাম গ্রহণে তাদের অগ্রগামীতাসহ এমনসব ফাযীলাত রয়েছে, যার দাবী হলো, তাদের দ্বারা গুনাহ হয়ে থাকলেও তা ক্ষমাযোগ্য। সুতরাং তাদের কারো দ্বারা যে ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়েছে, তাঁর অগণিত সৎ আমল থাকার কারণে সেই ত্রুটি-বিচ্যুতি মাফ হয়ে গেছে। যেমন এসেছে হাতেব বিন আবু বালতাআর ঘটনায়।
মক্কা বিজয়ের বছর তার পক্ষ হতে একটি ভুল হয়ে গিয়েছিল। তিনি যেহেতু বদরের যুদ্ধে শরীক ছিলেন, তাই তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। এমনকি সাহাবীদের এমন গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে, যা পরবর্তীতে আগমনকারীদের বেলায় মাফ করা হবে না। কেননা তাদের রয়েছে এমন অনেক সৎ আমল, যা পরবর্তীদের পক্ষে বাস্তবায়ন করা অসম্ভব। সুতরাং সাহাবীদের এ সৎকর্মগুলো তাদের দোষ-ত্রুটি মিটিয়ে দিবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ
"সৎ কাজ অবশ্যই গুনাহসমূহকে দূর করে দেয় (সূরা হুদ ১১:১১৪)।
(খ) অন্যদের তুলনায় সাহাবীদের সৎআমল বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফাযীলাতের ক্ষেত্রে কেউ সাহাবীদের সমপর্যায়ে পৌঁছতে পারবে না। রসূল এর হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে যে, সাহাবীগণই ছিলেন সর্বোত্তম মানুষ। তাদের পরবর্তী যুগের কোন মুসলিম উহুদ পাহাড়ের সমপরিমাণ স্বর্ণ আল্লাহর রাস্তায় দান করলেও সে সাহাবীদের কারোর একমুষ্টি পরিমাণ খাদ্য দান করার সমান ছাওয়াব পাবে না। বুখারী, মুসলিম এবং অন্যান্য মুহাদ্দিছগণ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
আবু হুরায়রা, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ এবং ইমরান বিন হুসাইন থেকে আরো বর্ণিত হয়েছে যে, রসূল ﷺ বলেছেন:
خَيْرُ القرون قَرْنِي ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ
"আমার উম্মতের মধ্যে আমার যুগের মানুষেরা সর্বোত্তম। অতঃপর তাদের পরবর্তী যুগের লোকেরা, অতঃপর পরবর্তী যুগের লোকেরা”। ৯৩
القرون শব্দটি القرن এর বহুবচন। القرن বলা হয় একই যুগের বা কাছাকাছি যুগের এমন একদল মানুষকে, যারা বিশেষ কোন লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য একটি কাজে অংশগ্রহণ করে। নির্দিষ্ট মেয়াদী একটি সময়কেও কারন বলা হয়।
(গ) তাদের কাছে গুনাহ মোচনের অনেক কাফ্ফারা এবং উপকরণ ও মাধ্যম রয়েছে, যা অন্যদের কাছে নেই। তাদের কারো দ্বারা ভুল-ত্রুটি হয়ে থাকলেও তা থেকে তিনি তাওবা করেছেন অথবা এমন সৎ আমল করেছেন, যা তার ভুল-ত্রুটিকে মিটিয়ে দিয়েছে অথবা সর্বাগ্রে ইসলাম গ্রহণ ও সৎকর্মে অগ্রগামী হওয়ার কারণে তার সেই গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ গুনাহটি করার পূর্বে সে যত সৎ আমল করেছে, সেগুলোর তুলনায় গুনাহটি খুব নগণ্য হওয়ার কারণে তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। কিংবা নাবী ﷺ এর শাফাআতের দ্বারা তার সে ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। অথবা দুনিয়াতে তাকে কোন মসীবতে ফেলা হয়েছে, যার কারণে উক্ত মসীবত তার গুনাহর কাফফারা হয়ে গেছে। অর্থাৎ তাকে পরীক্ষা ও মুসীবতে ফেলা হয়েছে। অতঃপর সেই গুনাহ উক্ত মুসীবতে ফেলে কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে, নাবী ﷺ বলেন:
«مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ، وَلَا هَمَّ وَلَا حُزْنٍ، وَلَا أَذًى وَلَا غَمٌ، حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا، إِلَّا كَفْرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ»
"মুসলিম কোন ক্লান্তি, কষ্ট, উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, নির্যাতন ও বিষণ্ণতার শিকার হলে, এমনকি কাঁটাবিদ্ধ হলেও এর বদলে আল্লাহ্ তা'আলা তার গুনাহ্ মাফ করে দেন"। ১৪ ইমাম বুখারী ও মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
সুতরাং মুসীবতে আক্রান্ত হওয়ার কারণে সাধারণ মুমিনদের গুনাহ মাফ হলে সাহাবীগণ তাতে পতিত হয়ে ক্ষমা পাওয়ার আরো বেশী হকদার হবেন।
সুতরাং সাহাবীদের দ্বারা যেসব ভুল-ত্রুটি নিশ্চিতভাবেই হয়েছে, তার ব্যাপারটি যদি এমন হয় যে, সৎকাজ থাকার কারণে তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে, তাহলে ঐসব গুনাহ কেন ক্ষমা করা হবে না, যাতে তারা মুজতাহিদ ছিলেন।
শরীয়াতের হুকুম জানার জন্য শ্রম ব্যয় করাকে الاجتهاد বলা হয়। মুজতাহিদগণ যদি ইজতেহাদ করতে গিয়ে সঠিক সিদ্বান্তে উপনীত হতে পারেন, তাহলে তাদের দু'টি নেকী হবে আর ভুলের মধ্যে পড়ে গেলে একটি নেকী হবে। আর মুজতাহিদের ভুল ক্ষমা করে দেয়া হবে। যেমন একটু পূর্বে এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
সুতরাং সাহাবীদের থেকে যে সামান্য পরিমাণ ভুল-ত্রুটি হয়েছে, তাতে দু'টি অবস্থার একটি অবস্থা হতে পারে।
(১) হতে পারে সাহাবী ইজতেহাদ করতে গিয়ে ভুলটি করে ফেলেছেন। তাতে তিনি বিনিময় প্রাপ্ত হবেন এবং তার ভুলটি মাফ করে দেয়া হবে।
(২) এও হতে পারে যে, গুনাহটি ইজতেহাদে ভুল করার কারণে হয়নি; এমনিতেই হয়েছে। কিন্তু তার কাছে এত বিশাল পরিমাণ আমলে সালেহ, অগণিত ফাযীলাত এবং সৎকাজে অগ্রগামিতা রয়েছে, যা তার গুনাহর কাফফারা হয়ে গেছে এবং গুনাহকে মিটিয়ে দিয়েছে।
মোট কথা, সাহাবীদের দ্বারা যে সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়েছে, তা তাদের বিশাল বিশাল সৎকাজের তুলনায় খুবই কম। পূর্বে যদিও তা বর্ণনা করা হয়েছে, তারপরও এখানে সংক্ষিপ্তাকারে তাদের ফাযীলাত ও সৎকর্মগুলো পুনরাবৃত্তি করা হলো:
(১) আল্লাহ তা'আলা এবং তাঁর রসূলের প্রতি ছিল তাদের অগাধ বিশ্বাস। এটি ছিল তাদের সর্বোত্তম আমল।
(২) তারা আল্লাহ তা'আলার কালেমাকে সুউচ্চ আসনে আসীন করার জন্য আল্লাহর রাস্তায় সর্বোত্তম জিহাদ করেছেন। আর ইসলামের সর্বোচ্চ চূড়া হলো এই জিহাদ।
(৩) তারা আল্লাহর রাস্তায় হিজরত করেছেন। এটিও ইসলামের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল।
(৪) তারা আল্লাহর দ্বীনের সাহায্য করেছেন। আল্লাহ তা'আলা তাদের ব্যাপারে বলেছেন:
وَيَنصُرُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُولَئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ
"আর প্রস্তুত থাকে আল্লাহ ও তার রসূলকে সাহায্য সহযোগিতা করার জন্য। এরাই হলো সত্যবাদী" (সূরা হাশর ৫৯:৮)।
(৫) তাদের রয়েছে উপকারী ইলম এবং সৎআমল।
(৬) তারা নাবীদের পরে আল্লাহ তা'আলার সর্বশ্রেষ্ঠ বান্দা। উম্মতে মুহাম্মাদী হলো সর্বোত্তম উম্মত। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ
"তোমরাই সর্বোত্তম জাতি, তোমাদেরকে পাঠানো হয়েছে মানুষের জন্য" (সূরা আল ইমরান ৩:১১০)।
আর সাহাবীগণ হলেন এই উম্মতের সর্বোত্তম মানুষ।
রসূল বলেন:
خَيْرُكُمْ قَرْنِي، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম মানুষ হলেন আমার যুগের লোকগণ, অতঃপর পরবর্তীগণ। ৯৫
(৭) সাহাবীগণ হলেন শ্রেষ্ঠতম উম্মতের মধ্য হতে বাছাইকৃত এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট সর্বাধিক সম্মানিত ব্যক্তি। যেমন ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল বর্ণনা করেন, নাবী বলেছেন:
أَنْتُمْ تُوَفَونَ سَبْعِينَ أُمَّةٍ أَنْتُمْ خَيْرُهَا وَأَكْرَمُهَا عَلَى اللَّه "তোমাদের দ্বারা বড় বড় উম্মতের সংখ্যা সত্তরে পরিণত হয়েছে। তোমরা তাদের মধ্যে সর্বোত্তম এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার নিকট সবচেয়ে সম্মানিত"। ৯৬ ইমাম তিরমিযী, ইবনে মাজাহ ও হাকিম তার মুস্তাদরকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।

টিকাঃ
৮৭. শিয়াদের একটি উপদলকে রাফেযী বলা হয়। তাদেরকে জা'ফারীয়া হিসাবেও নামকরণ করা হয়। বর্ণিত হয়েছে যে, শিয়াদের একটি দল যায়েদ বিন আলী বিন হুসাইন বিন আলীর কাছে এসে আবু বকর এবং উমারের প্রশংসা বর্জন করার আহবান জানালো। কিন্তু তিনি তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করার কারণে তারা বলল: إذا ترفضك অর্থাৎ তাহলে আমরাই আপনাকে বর্জন করলাম। এখান থেকেই তাদেরকে রাফেযী বলা হয়। এদের অন্যতম আকীদাহ হলো, তারা আহলে বাইত ছাড়া বাকী সাহাবীদেরকে ঘৃণা করে, গালি দেয় এবং তাদেরকে কাফের বলে।
৮৮. নাওয়াসেবরা রাফেযীদের বিপরীত। শব্দের অর্থ হলো শত্রুতা পোষণ করা। তারা যেহেতু আহলে বাইতের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে, তাই তাদেরকে নাওয়াসেব বলা হয়।
৮৯. সহীহ বুখারী ৩৬৫০।
৯০ সহীহ বুখারী ৩৬৭৩, সহীহ মুসলিম ২৫৪০-৪১।
৯১. সহীহ বুখারী ৭৩৫২, সহীহ মুসলিম ১৭১৬।
৯২. সহীহ বুখারী ৩৬৭৩, সহীহ মুসলিম ২৫৪০-৪১।
৯৩. সহীহ বুখারী ২৬৫১-৫২, ৩৬৫০-৫১, সহীহ মুসলিম ২৫৩৩-৩৪।
৯৪. সহীহ বুখারী ৫৬৪১।
৯৫ সহীহ বুখারী ২৬৫১-৫২, ৩৬৫০-৫১, সহীহ মুসলিম ২৫৩৩-৩৪।
৯৬. হাসান: মুসনাদে আহমাদ ২০০১৫। ইমাম তিরমিযী ৩০০১, ইবনে মাজাহ ৪২৮৮ এবং হাকেম তাঁর কিতাব মুস্তাদরেকে (৬৯৮৭) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 কারামাতে আওলীয়ার ব্যাপারে আহ্‌লুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের মাযহাব।

📄 কারামাতে আওলীয়ার ব্যাপারে আহ্‌লুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের মাযহাব।


আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আক্বীদার অন্যতম মূলনীতি হলো অলীদের কারামাত এবং আল্লাহ তা'আলা তাঁর অলীদের নিকট অলৌকিক ও স্বাভাবিক নিয়মের বহির্ভূত যে সমস্ত ঘটনা প্রকাশ করেন, তারা তাতে বিশ্বাস করে। আল্লাহ তা'আলা তাঁর অলীদের নিকট বিভিন্ন প্রকার জ্ঞান ও কাশফ থেকে যা প্রকাশ করেন এবং তাঁর ক্ষমতা ও প্রভাব থেকে তাদের মাধ্যমে যা কিছু প্রকাশ করেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তাতে বিশ্বাস করে।
পূর্বের জাতিসমূহের মধ্যে যেসব কারামাত সংঘটিত হয়েছে, আল্লাহ তা'আলা কুরআনের সূরা কাহাফে এবং অন্যান্য সূরায় যেসব কারামাতের কথা বর্ণনা করেছেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তাতে বিশ্বাস করে।
সেই সাথে এই উম্মতের প্রথম যুগে সাহাবী, তাবেয়ী এবং পরবর্তীতে আগমনকারী উম্মতের সকল ফির্কার লোকদের মধ্যে প্রকাশিত যেসব কারামাতের কথা সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তাতেও বিশ্বাস করে। তারা আরো বিশ্বাস করে যে, এ উম্মতের মধ্যে কিয়ামত পর্যন্ত কারামাত প্রকাশ অব্যাহত থাকবে।
ব্যাখ্যা: كرامات শব্দটি كرامة শব্দের বহুবচন। আল্লাহ তা'আলা তাঁর অলীদের হাতে অলৌকিক ও অসাধারণ যে সমস্ত ঘটনা প্রকাশ করেন, তারা তাতে বিশ্বাস করে। সুতরাং প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে যা সংঘটিত হয়, তাই কারামত। অর্থাৎ মানুষের নিকট পরিচিত ও চিরাচরিত নিয়মের ব্যতিক্রম যা সংঘটিত হয়, তাই কারামত। أولياء শব্দটি ولي শব্দের বহুবচন। প্রত্যেক মুমিন মুত্তাকীই আল্লাহর অলী। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ ﴾ "মনে রেখো যে, আল্লাহর অলীদের কোন ভয় নেই। আর তারা বিষন্নও হবে না। তারা হচ্ছে সেই সমস্ত লোক যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়ার পথ অবলম্বন করেছে” (সূরা ইউনূস: ৬২-৬৩)
الولاء শব্দ থেকে অলী শব্দটি নির্গত হয়েছে। আর الولاء অর্থ ভালবাসা অর্জন করা ও নৈকট্য হাসিল করা। সুতরাং আল্লাহ তা'আলার পছন্দ এবং মর্জি মোতাবেক কাজ করে তাঁর নৈকট্য হাসিলের মাধ্যমে যে মুমিন মুত্তাকী আল্লাহর সাথে বন্ধুত্ব করেছে, সেই আল্লাহর অলী।
অলীদের কারামাত সত্য। আল্লাহ তা'আলার কিতাব, রসূলের সুন্নাত এবং সাহাবী ও তাবেয়ীদের থেকে মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত হাদীস দ্বারা অলীদের কারামত সত্য বলে প্রমাণিত। অলীদের কারামতের ব্যাপারে লোকেরা তিনভাগে বিভক্ত হয়েছে।
প্রথম প্রকার: বিদ'আতীদের একটি দল অলীদের কারামত অস্বীকার করে। যেমন মুতাযেলা, জাহমিয়া এবং আশায়েরাদের কিছু লোক কারামত অস্বীকার করে। তাদের দলীল হলো অলীদের হাতে যদি কারামত প্রকাশিত হওয়া জায়েয হয়, তাহলে যাদুকরের সাথে অলীর অবস্থা মিলে যাবে এবং নাবীদের থেকে অলীদেরকে পার্থক্য করা অসম্ভব হবে। কেননা মুজেযার মাধ্যমেই নাবী এবং অন্যদের মধ্যে পার্থক্য করা হয়। সাধারণ ও চিরাচরিত প্রথার বাইরে যা বের হয়, তার নামই মুজেযা।
দ্বিতীয় প্রকার: সুফী তরীকার লোকেরা এবং কবর পূজারীরা কারামত সাব্যস্ত করতে গিয়ে সীমালংঘন করে থাকে। তারা মানুষের সাথে মিথ্যা বলে এবং তাদেরকে শয়তানের তেলেসমাতি দেখায়। যেমন আগুনে ঝাপ দেয়া, নিজেদের শরীরে অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা, বিষাক্ত সাপ ধরে ফেলা ইত্যাদি। এমনি কবর পূজারীদের আরো অনেক কাজ-কর্মকে তারা কারামত নাম দিয়ে থাকে।
তৃতীয় প্রকার: শাইখুল ইসলাম তৃতীয় আরেক প্রকার লোকদের কথা এখানে উল্লেখ করেছেন। তারা হলো আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত। তারা অলীদের কারামতে বিশ্বাস করে এবং কুরআন সুন্নাহর দলীল মোতাবেক উহাকে সাব্যস্ত করে। নাবীদের সাথে অন্যদের সাদৃশ্য ঠেকানোর দোহাই দিয়ে যারা কারামত অস্বীকার করে, তাদের জবাবে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা বলে থাকে যে, নাবীদের মাঝে এবং অন্যদের মধ্যে কারামত ছাড়াও আরো অনেক বিষয়ে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। অলী কখনো নবুওয়াতের দাবী করে না। যদি নবুওয়াতের দাবী করে, তাহলে সে অলী হওয়ার যোগ্যতা হারিয়ে নবুওয়াতের মিথ্যা দাবীদারে পরিণত হয়; সে তখন আর অলী থাকে না। আল্লাহ তা'আলার অন্যতম রীতি হলো, তিনি নবুওয়াতের দাবীদারকে অপদস্ত করেন। যেমন অপদস্ত হয়েছিল মুসাইলামা কায্যাব এবং অন্যরা।
আর যারা কারামত সাব্যস্ত করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি ও সীমালংঘন করে এবং ভেলকিবাজ ও মিথ্যুকদের জন্যও তা সাব্যস্ত করে তাদের জবাবে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা বলে যে, আসলে তারা আল্লাহর অলী নয়; বরং শয়তানের অলী। তাদের হাতে যা কিছু সংঘটিত হয়, তা হয়ত মিথ্যা ও ধোঁকাকাবাজি অথবা তাদের জন্য এবং অন্যদের জন্য ফিতনা স্বরূপ। অথবা তিনি তাদেরকে অবকাশ দিয়ে ধীরে ধীর পাকড়াও করবেন। এই বিষয়ে শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া রহি. এর একটি মূল্যবান কিতাব রয়েছে। কিতাবটির নাম: الفرقان بين أولياء الرحمن وأولياء الشيطان (আল্লাহর অলী এবং শয়তানের অলীদের মধ্যে পার্থক্য)।
আল্লাহ তা'আলা অলীদের হাতে বিভিন্ন প্রকার ইলম ও কাশফ্ট থেকে যা প্রকাশ করেন এবং তাঁর ক্ষমতা ও প্রভাব থেকে তাদের মাধ্যমে যা কিছু প্রকাশ করেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তাতেও বিশ্বাস করে: এখানে শাইখুল ইসলাম ইঙ্গিত করেছেন যে, কারামতের কিছু অংশ ইলম ও কাশফের অন্তর্ভুক্ত। যেমন অলীগণ এমন কিছু শুনলেন যা অন্যরা শুনলোনা কিংবা তারা এমন কিছু দেখলেন, যা অন্যরা দেখেনি। এটি জাগ্রত অবস্থায় হতে পারে কিংবা ঘুমের ঘোরে স্বপ্নের মাধ্যমেও হতে পারে। অথবা অলীগণ এমন কিছু জানতে পারলেন, যা অন্যরা জানতে পারলনা। আবার কারামতের কিছু অংশ কুদরত ও ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
প্রথম প্রকারের উদাহরণ হলো, যেমন উমার এর উক্তি يَا سَارِيَةُ الجبل হে সারিয়া! পাহাড়ে আশ্রয় নাও।১৭ এ কথা বলার সময় তিনি মদীনার মিম্বারে দাঁড়িয়ে জুম'আর খুতবা দিচ্ছিলেন। আর সারিয়া ছিল পূর্বের কোন একটি অঞ্চলে। আবু বকর বলেছিলেন যে, তাঁর স্ত্রীর পেটে কন্যা সন্তান রয়েছে। ১৯১৮ উমার তাঁর সন্তানদের থেকে কে কে ন্যায়পরায়ণ হবে, তা আগেই বলে দিয়েছিলেন। মুসা ও খিযির এর ঘটনায় রয়েছে যে, খিযির যে ছেলেটিকে হত্যা করেছিলেন, তার অবস্থা তিনি জানতে পেরেছিলেন।
দ্বিতীয় প্রকার কারামতের উদাহরণ: আর কারামতের যেই প্রকার হলো ক্ষমতা ও প্রভাবের অন্তর্ভুক্ত, তার উদাহরণ হলো যেমন ঐ ব্যক্তির ঘটনা, যার নিকট কিতাবের জ্ঞান ছিল এবং চোখের পলকে বিলকীসের আরশ সুলায়মান এর সামনে হাযির করেছিলেন, আসহাবে কাহাফের ঘটনা। মারইয়াম এর ঘটনা, খালেদ বিন ওয়ালীদ এর ঘটনা, তিনি যখন বিষ পান করলেন, তখন তাঁর কোন ক্ষতি হয়নি।
শাইখুল ইসলাম বলেন: পূর্বের জাতিসমূহের মধ্যে যেসব কারামত সংঘটিত হয়েছে, আল্লাহ তা'আলা কুরআনের সূরা কাহাফে এবং অন্যান্য সূরায় যেসব কারামতের কথা বর্ণনা করেছেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তাতে বিশ্বাস করে। সেই সাথে এই উম্মতের প্রথম যুগে সাহাবী, তাবেয়ী এবং পরবর্তীতে আগমনকারী ফির্কার লোকদের মধ্যে প্রকাশিত যেসব কারামতের কথা সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তাতেও বিশ্বাস করে।
এখানে শাইখুল ইসলাম ঐসব কারামতের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন, যা অতীতে প্রকাশিত হয়েছে এবং কুরআনুল কারীম ও অন্যান্য গ্রন্থে সহীহভাবে তা বর্ণিত হয়েছে। পূর্ববর্তী জাতির কারামতগুলো থেকে কুরআনুল কারীমে যা উল্লেখ করা হয়েছে, তার মধ্যে স্বামী ছাড়াই মারইয়ামের গর্ভধারণ করা, সূরা কাফের আসহাবে কাহাফের ঘটনা, মুসার সাথে খিযির আলাইহিস সালামের ঘটনা এবং যুল কারনাইনের ঘটনা অন্যতম।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা এই উম্মতের প্রথম যুগের লোকদের থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত কারামতগুলোর প্রতি বিশ্বাস করে। তাদের প্রথমে রয়েছেন সাহাবী ও তাবেঈগণ। যেমন উমার বিন খাত্তাব (রাঃ) মদীনার মিম্বার থেকে সারিয়াকে দেখতে পেলেন। তিনি ছিলেন মদীনার মিম্বারের উপর দাঁড়ানো। আর সারিয়া ও তাঁর বাহিনী ছিল ইরাকের নাহাওয়ান্দে যুদ্ধরত। তিনি সেনাপতি সারিয়াকে "ইয়া সারিয়াতা আল-জাবাল" বলে ডাক দিলেন। সারিয়া এই ডাক শুনতে পেল এবং উমারের দিক নির্দেশনা পেয়ে উপকৃত হলো। মুসলিম বাহিনী শত্রুদের চক্রান্ত থেকে বেঁচে গেল।
তারা আরো বিশ্বাস করে যে, এই উম্মতের মধ্যে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত কারামত প্রকাশিত হওয়া অব্যাহত থাকবে। অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলার বেলায়াত পাওয়ার শর্তসমূহ পাওয়া গেলে এই উম্মতের লোকদের মধ্যে কিয়ামত দিবস পর্যন্ত কারামত প্রকাশিত হতেই থাকবে।

টিকাঃ
৯৭. সিলসিলাহ সহীহাহ ১১১০।
৯৮. মুয়াত্তা মালিক ৪০, বিচার সম্পর্কিত অধ্যায়।

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 আহ্‌লুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের বৈশিষ্ট্য, কেনই বা তাদেরকে আহ্‌লুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত বলা হয়?

📄 আহ্‌লুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের বৈশিষ্ট্য, কেনই বা তাদেরকে আহ্‌লুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত বলা হয়?


অতঃপর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অন্যতম তরীকা হলো তারা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে রাসূল ﷺ এর সুন্নাতের অনুসরণ করে, সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী মুহাজির ও আনসারদের পথে চলে এবং রসূল এর ঐ অসীয়ত মেনে চলে, যেখানে তিনি বলেছেন, عَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِينَ الْمَهْدِيِّينَ مِنْ بَعْدِي ، تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِدِ وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ
তোমরা আমার সুন্নাত ও আমার পরবর্তীতে হেদায়াতপ্রাপ্ত খেলাফায়ে রাশেদীনের পথ ধরে চলবে। তোমরা উহাকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবে এবং উহার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। সাবধান! তোমরা দ্বীনের মধ্যে নতুন বিষয়াদি উদ্ভাবন করা থেকে দূরে থাকবে। কেননা দ্বীনের মধ্যে প্রত্যেক নতুন রীতিই ভ্রষ্টতা। ৯৯
তারা জানে যে, সর্বাধিক সত্য কথা হলো আল্লাহর কালাম এবং সর্বোত্তম হেদায়াত হচ্ছে মুহাম্মাদ এর হেদায়াত。
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা আল্লাহর কালামকে সকল প্রকার মানুষের কালামের উপর প্রাধান্য দেয় এবং মুহাম্মাদ এর হেদায়াতকে মানুষের সকল মতাদর্শের উপর অগ্রাধিকার দেয়। এ জন্যই তাদেরকে আহলুল কিতাব ওয়াস্ সুন্নাহ হিসাবে নামকরণ করা হয়েছে। তাদেরকে আহলুল জামা'আতও বলা হয়। কেননা জামা'আত অর্থ হলো ঐক্যবদ্ধ থাকা। ১০০ এর বিপরীত হলো ফির্কাবন্দী হওয়া বা দলাদলি করা। যদিও জামা'আত শব্দটি ঐক্যবদ্ধ একদল মানুষের পরিচয় সূচক নামে পরিণত হয়েছে।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের তৃতীয় মূলনীতি হলো ইজমা। ইলম অর্জন এবং দ্বীন পালনের ক্ষেত্রে এ ইজমার উপর নির্ভর করা হয়।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা এ তিনটি মূলনীতির মাধ্যমে মানুষের দ্বীন সম্পর্কিত প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সমস্ত কথা ও আমল ওজন করে থাকে। উম্মতের সালাফে সালেহীনের ইজমাই কেবল দ্বীনের মূলনীতি হিসাবে গণ্য। কেননা তাদের পরে প্রচুর মতভেদ হয়েছে এবং উম্মত দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
ব্যাখ্যা: পূর্বের অধ্যায়সমূহে আক্বীদার মাসআলাগুলোতে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের তরীকা আলোচনা করার পর এই অধ্যায় এবং পরবর্তী অধ্যায়গুলোতে শাইখুল ইসলাম দ্বীনের সমস্ত মূলনীতি এবং শাখা-প্রশাখাগুলোর ক্ষেত্রে তাদের তরীকা বর্ণনা করেছেন। সেই সাথে আহলে সুন্নাতের লোকদের ঐসব বৈশিষ্ট্যও বর্ণনা করেছেন, যার মাধ্যমে তারা বিদ'আতী এবং কুরআন-সুন্নাহর বিরোধিতাকারীদের থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়েছে। সুতরাং তাদের বৈশিষ্ট্যগুলো হচ্ছে:
(১) প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে নাবী ﷺ এর আদর্শের অনুসরণ করা: অর্থাৎ তারা প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে নাবী ﷺ এর তারীকা অবলম্বন করে এবং তাঁর মানহাজের (নিয়ম- পদ্ধতি) উপরেই চলে। এতে করে তারা ঐসব মুনাফেক থেকে আলাদা হয়ে যায়, যারা শুধু প্রকাশ্যভাবে রসূল ﷺ এর অনুসরণ করে থাকে; তারা গোপনে তাঁর অনুসরণ করে না।
রসূল ﷺ এর সুন্নাতকে আছার বলা হয়। আছার দ্বারা বাহ্যিক আছার তথা তাঁর বাহ্যিক স্মৃতি ও রেখে যাওয়া জিনিসগুলো উদ্দেশ্য নয়। যেমন রসূল ﷺ এর বসার স্থানসমূহ, তাঁর ঘুমানোর স্থানসমূহ ইত্যাদি। এগুলো খুঁজে বেড়ানো হলে শির্কে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যেমন অবস্থা হয়েছিল পূর্বের জাতিসমূহের। [সুতরাং নাবী ﷺ থেকে যেই কথা, কাজ অথবা সমর্থন বর্ণিত হয়েছে, তাকেই সুন্নাত বলা হয়।]
(২) সর্বপ্রথম ইসলাম কবুলকারী মুহাজির ও আনসারদের পথ অবলম্বন করা: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আরেকটি বৈশিষ্ট হলো তারা ইসলামের প্রথম যুগের এবং সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী আনসার ও মুহাজিরদের পথেই চলে।
কেননা আল্লাহ তা'আলা বিশেষভাবে তাদেরকে দ্বীনের জ্ঞান ও বোধশক্তি দিয়েছিলেন। তারা কুরআন নাযিল হওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন এবং রসূল এর পবিত্র জবানীতে ইহার ব্যাখ্যা শ্রবণ করেছেন। তারা রসূল থেকে সরাসরি শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। সুতরাং তারা সত্যের সর্বাধিক নিকটবর্তী এবং রসূল এর পরে তারাই সর্বাধিক অনুসরণীয়। সুতরাং রসূলের পরে অনুসরণের দিক থেকে তাদের স্থান দ্বিতীয় স্তরে।
ফলে দ্বীনের কোন মাস'আলায় নাবী থেকে দলীল না পাওয়া গেলে সাহাবীদের কথাই ঐ বিষয়ে প্রমাণ হিসাবে গণ্য হবে এবং তার অনুসরণ করা আবশ্যক হবে। কেননা তাদের পথ হলো সর্বাধিক নিরাপদ, সর্বাধিক জ্ঞান সম্পন্ন, অত্যাধিক সুস্পষ্ট এবং খুব মজবুত।
পরবর্তী যুগের কতিপয় লোকের ন্যায় এই কথা বলা ঠিক হবে না যে, সালাফদের পথ সর্বাধিক নিরাপদ হলেও পরবর্তীদের পথ সর্বাধিক প্রজ্ঞাপূর্ণ এবং সুদৃঢ়। এতে করে তারা সালাফদের পথ পরিহার করে খালাফ তথা পরবর্তীদের পথেই চলে।
(৩) রসূল এর অসীয়ত মেনে চলা: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তারা রসূল এর সেই অসীয়ত মেনে চলে যেখানে তিনি বলেছেন,
عَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الْمَهْدِيِّينَ الرَّاشِدِينَ من بعدي تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِدِ، وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُور . فَإِنَّ كُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ» رواه الإمام أحمد وأبو داود والترمذي وابن ماجه. وقال الترمذي: حسن صحيح.
"তোমরা আমার সুন্নাত এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবে এবং উহার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। তোমরা দ্বীনের মাঝে নতুন বিষয় আবিষ্কার করা থেকে বিরত থাকবে, কেননা প্রত্যেক বিদআতের পরিণাম গোমরাহী"।১০১
এখানে শাইখের উদ্দেশ্য হলো এই কথা বর্ণনা করা যে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী ও সৎকর্মে অগ্রগামী সকল আনসার ও মুহাজিরদের পথ অনুসরণ করার সাথে সাথে বিশেষভাবে খোলাফায়ে রাশেদীনেরও অনুসরণ করে থাকে। কেননা এ হাদীসে নাবী ﷺ নির্দিষ্টভাবে খোলাফায়ে রাশেদীনের অনুসরণ করার আদেশ দিয়েছেন। এখানে তিনি তাঁর সুন্নাতকে খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতের সাথে মিলিয়ে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং বুঝা গেল, খোলাফায়ে রাশেদীন বা তাদের কারো একজনের সুন্নাত পরিত্যাগ করা যাবে না।
والخلفاء الراشدون খোলাফায়ে রাশেদীন বলতে চারজন খলীফা উদ্দেশ্য। আবু বকর, উমার, উছমান ও আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুম। তাদেরকে রাশেদীন তথা সুপথগামী বলার কারণ হলো তারা সত্যকে চিনতে পেরেছেন এবং সেই অনুযায়ী আমল করেছেন।
যে ব্যক্তি সত্যকে চিনতে পেরেছে এবং অনুসরণ করেছে, সেই রাশেদ বা সুপথপ্রাপ্ত। এর বিপরীত হলো, পথভ্রষ্ট। অর্থাৎ সত্যের সন্ধান পেয়েছে, কিন্তু সে আনুযায়ী আমল করেনি, সেই হলো পথভ্রষ্ট।
المهديين হেদায়াতপ্রাপ্ত: অর্থাৎ যাদেরকে আল্লাহ তা'আলা সত্যের দিকে হেদায়াত করেছেন। تمسكوا بها তোমরা উহাকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করবে। وعضوا عليها بالنواجذ অর্থাৎ এখানে রাসূল ﷺ এর সুন্নাত এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে শক্তভাবে ধারণ করার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। মাড়ির শেষপ্রান্তের দাঁতগুলোকে আযরাস বলা হয়।
محدثات الأمور নতুন বিষয়সমূহ: অর্থাৎ তোমরা সকল প্রকার বিদআত পরিহার করবে। فَإِنْ كُلِّ بَدْعَةٍ ضَلَالَةٌ কেননা প্রত্যেক বিদআতই গোমরাহী।
البدعة বিদ'আত শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ماليس له مثال سابق "যার কোন পূর্ব নুমনা নেই"।
আর শরীয়তের পরিভাষায় বিদআতের পরিচয় হলো, যার পক্ষে শরীয়াতের দলীল নেই। সুতরাং যে ব্যক্তি নতুন কিছু তৈরী করে দ্বীনের দিকে সম্বন্ধ করবে, যার পক্ষে কোন দলীল নেই, তাই বিদআত ও গোমরাহী। চাই তা আক্বীদার ক্ষেত্রে হোক কিংবা কথা ও কাজের মধ্যে হোক।
(৪) আল্লাহর কিতাব এবং রসূলের সুন্নাতের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করা: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআতের চতুর্থ বৈশিষ্ট্য হলো, তারা আল্লাহর কিতাব এবং রসূলের সুন্নাতের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করে, দলীল উপস্থাপন করার সময় মানুষের কথা ও কর্মের উপর এ দু'টিকে প্রাধান্য দেয় এবং তার অনুসরণ করে। কেননা তারা বিশ্বাস করে যে, আল্লাহর কালামই হলো সর্বাধিক সত্য।
আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ قِيلًا "আল্লাহর কথার চেয়ে অধিক সত্য আর কার কথা হতে পারে"? (সূরা নিসা ৪:১২২)
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: وَمَنْ أَصْدَقُ مِنَ اللَّهِ حَدِيثًا “আল্লাহর কথার চেয়ে অধিক সত্যবাদী আর কে হতে পারে? (সূরা নিসা ৪:৮৭)
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা বিশ্বাস করে যে, মুহাম্মাদ এর হেদায়াত হলো সর্বোত্তম হেদায়াত।
الهدي শব্দের 'হা' বর্ণে যবর ও 'দাল' বর্ণে সাকীন দিয়ে পড়া হয়েছে। এর অর্থ হলো পন্থা, পথ, জীবন পদ্ধতি। الهدى শব্দটির هاء বর্ণে পেশ এবং دال বর্ণে যবর দিয়ে পড়াও জায়েয আছে। তখন অর্থ হবে রাস্তা দেখানো বা সঠিক পথ প্রদর্শন করা।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা মানুষের কথার উপর আল্লাহ তা'আলার কালামকে প্রাধান্য দেয়। অর্থাৎ তারা আল্লাহর কালামকে প্রাধান্য দেয় এবং উহাকেই গ্রহণ করে। মানুষের কথা আল্লাহর কালামের বিরোধী হলে তারা মানুষদের কথা বাদ দিয়ে আল্লাহর কথাকেই গ্রহণ করে। তাদের মর্যাদা ও পদবী যত বড়ই হোক না কেন। রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা আলিম-ইমাম অথবা ইবাদাতকারী, যেই হন না কেন, আল্লাহর কথার মোকাবেলায় তারা কারো কথা গ্রহণ করে না।
সেই সাথে তারা মুহাম্মাদ ﷺ এর হেদায়াতকে সকল মানুষের মত ও পথের উপর প্রাধান্য দেয়। অর্থাৎ তারা তাঁর সুন্নাত, জীবন চরিত, শিক্ষা ও উপদেশকে মানুষের আচরণের উপর প্রাধান্য দেয়।
সেই সাথে মানুষের পদমর্যাদা যত বড়ই হোক না কেন। বিশেষ করে যখন সেই মানুষের আচরণ রসূল ﷺ এর সুন্নাতের সাথে সাংঘর্ষিক হবে। আল্লাহ তা'আলার এই বাণীর উপর আমল করতে গিয়েই তারা তা করেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالْرَّسُولِ )
হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ্ আনুগত্য করো, আনুগত্য করো রসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা শাসক (কর্তৃত্বশীল ও বিদ্বান) তাদেরও। তারপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়ে যাও, তাহলে তা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও (সূরা নিসা: ৫৯)।
وَلِهَذَا سُمُّوا أَهْلَ الْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ ওয়াস্ সুন্নাত হিসাবে নামকরণ করা হয়েছে: আল্লাহর কিতাবকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করার কারণে, মানুষের কথা ও আচরণের উপর উহাকে প্রাধান্য দেয়ার কারণে এবং আল্লাহর রসূলের হেদায়াতকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করার কারণে ও সমস্ত মানুষের আচরণের উপর উহাকে প্রাধান্য দেয়ার কারণে তাদেরকে আহলুল কিতাব ওয়াস্ সুন্নাত বলা হয়।
এ কারণেই তাদেরকে এই সম্মানজনক উপাধী দেয়া হয়েছে। এই সম্মানজনক উপাধী থেকে বুঝা যায়, যারা কুরআন ও সুন্নাহর পথ থেকে সরে গিয়ে পথভ্রষ্ট মুতাযেলা, খারেজী, রাফেযী এবং অন্যান্য গোমরাহ লোকদের মতামতকে বা উহার অংশ বিশেষকে সমর্থন করে, তারা ব্যতীত শুধু আহলে সুন্নাত ওয়াল জামআতের লোকেরাই আল্লাহর কিতাব ও রসূলের সুন্নাতের অনুসরণের বিশেষণে বিশেষিত।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকদেরকে যেমন আহলুল কিতাব ওয়াস্ সুন্নাত বলা হয় তেমনি আহলুল জামা'আতও বলা হয়।
الجماعة শব্দটি (الفرقة) (ফির্কাবন্দী, বিভেদ ও দলাদলি) শব্দের বিপরীত।
আল্লাহর কিতাব ও রসূলের সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরলে ঐক্য ও সংহতি তৈরি হয়। আল্লাহ তা'আলা মুসলিমদেরকে জামা'আতবদ্ধ থাকার আদেশ দিয়ে বলেন:
(وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا )
"তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রুজ্জুকে মজবুতভাবে আকঁড়ে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না" (সূরা আল ইমরান: ১০৩)।
সুতরাং এখানে জামা'আত বলতে হকের উপর ঐক্যবদ্ধ লোকদেরকে বুঝায়।
(৫) আল্লাহর কিতাব ও রসূলের সুন্নাত থেকে দলীল গ্রহণ করা: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, তারা সম্মিলিতভাবে আল্লাহর কিতাব ও রসূলের সুন্নাত থেকে দলীল গ্রহণ করে, হকের উপর ঐক্যবদ্ধ থাকে এবং কল্যাণ ও তাকওয়ার কাজে পরস্পর সহযোগিতা করে। এর ফলেই ইসলামী শরীয়তে তৃতীয় মূলনীতি ইজমার উৎপত্তি হয়েছে। দ্বীনি ইলম অর্জন ও আমলের ক্ষেত্রে এই তৃতীয় মূলনীতি ইজমাকে দলীল হিসাবে গ্রহণ করা হয়ে থাকে।
الأجماع هو اتفاق علماء )الجمع هو اتفاق علماء ) 2016 1099 2018 العصر على أمر ديني দ্বীনের কোন বিষয়ে একই যুগের আলেমদের ঐক্যমত পোষণ করাকে ইজমা বলা হয়। ইজমা একটি অকাট্য দলীল। ইহার উপর আমল করা জরুরী। ইজমার স্থান যেহেতু আল্লাহর কিতাব ও রসূলের সুন্নাতের পরে, তাই ইহাকে তৃতীয় মূলনীতি বলা হয়।
(৬) আল্লাহর কিতাব, রসূলের সুন্নাত এবং আলেমদের ইজমা দ্বারা মানুষের কথাসমূহকে যাচাই করা: আহলে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা এই তিনটি মূলনীতির মাধ্যমে মানুষের দ্বীন সম্পর্কিত প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সমস্ত কথা ও আমল ওজন করে থাকে। তারা এই তিনটি মূলনীতিকে হক ও বাতিলের মাঝে এবং হেদায়াত ও গোমরাহীর মাঝে পার্থক্য করার মানদন্ড হিসাবে নির্ধারণ করে। সুতরাং তাদের থেকে আক্বীদা কিংবা আমল সম্পর্কিত যেসব কথা, কাজ ও আচরণ প্রকাশিত হয়, সেগুলোকে তারা এই দাড়িপাল্লায় রেখে ওজন করে। দ্বীন সম্পর্কিত সকল বিষয়ই তারা এই তুলাদন্ডের সাহায্যে যাচাই করে। যেমন সলাত, সিয়াম, হাজ্জ, যাকাত এবং অন্যান্য আচার-ব্যবহার। আর জাগতিক যেসব বিষয়ের সাথে দ্বীনের কোন সম্পর্ক নেই, যেমন মানুষের সাধারণ অভ্যাসসমূহ এবং দুনিয়াবী বিষয়াবলী, সেগুলোর ব্যাপারে মূলনীতি হলো ঐ সমস্ত কিছুই বৈধ।
অতঃপর যেই ইজমাকে দ্বীনী বিষয়ে দলীল গ্রহণের ক্ষেত্রে মূলনীতি হিসাবে ধরা হবে, শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া উহার স্বরূপ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: বাস্তবে যেসব বিষয়ে ইজমা সংঘটিত হয়েছে, উহা দ্বারা কেবল ঐসব বিষয় উদ্দেশ্য, যার উপর ছিলেন উম্মতের সালাফে সালেহীনগণ। অর্থাৎ সালাফে সালেহীনদের ইজমাই কেবল দ্বীনের মূলনীতি হিসাবে গণ্য। কেননা তারা ছিলেন আরব উপদ্বীপের হিজায অঞ্চলের একস্থানে একত্রিত অবস্থায়। তাদের সকলকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং দ্বীনী বিষয়ে তাদের সকলের মতামত জানা সম্ভব ছিল। তাদের পরে প্রচুর মতভেদ হয়েছে এবং উম্মত দলে দলে ভিবক্ত হয়ে পড়েছে। সুতরাং সালাফে সালেহীনের পরে দুই কারণে ইজমাকে নিয়ন্ত্রিণ ও সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়।
(ক) সালাফে সালেহীনের যুগের পরে ইখতেলাফ এত বেশী হয়েছে যে, আলিমদের সকল কথা আয়ত্তে আনয়ন ও সংরক্ষণ করা অসম্ভব।
(খ) ইসলামী বিজয় অভিযানের পর মুসলিম জাতির আলিমগণ পৃথিবীর সর্বত্র এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছেন যে, কোন বিষয় তাদের প্রত্যেকের কাছে পৌঁছা এবং তাদের সকলের পক্ষে উহা অবগত হওয়া সম্ভব ছিল না। দৃঢ়তার সাথে ইহা বলা সম্ভব নয় যে, তারা সকলেই উক্ত বিষয়ে এক ও অভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন।
একটি সতর্কতা: শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া দ্বীনের মূলনীতি তিনটিকেই উল্লেখ করেছেন।
চতুর্থ মূলনীতি কিয়াস উল্লেখ করেননি। কেননা কিয়াস শরীয়াতের মূলনীতি হওয়ার ব্যাপারে আলিমদের মতভেদ রয়েছে। যেমন মতভেদ রয়েছে দ্বীনের অন্যান্য মূলনীতির ব্যাপারে। এ বিষয়ে উসূলে ফিকাহর কিতাবসমূহে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। বিস্তারিত জানতে চাইলে সেগুলো পড়তে হবে। ১০২

টিকাঃ
৯৯. সহীহ: আবু দাউদ ৪৬০৭, তিরমিযী ২৬৭৬, দারিমী ৯৫, ইবনে মাজাহ ৪২।
১০০. তাদেরকে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত বলার কারণ হলো, তারা আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাতের উপর ঐক্যবদ্ধ থাকে এবং দলে দলে বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন হয় না। তাদের সংখ্যা কম হলেও তারা একটি জামা'আত। মূলতঃ জামাআত বলতে হকের উপর এক্যবদ্ধ লোকদেরকে বুঝায়। সংখ্যা কম হোক বা বেশী হোক, তাতে কিছু যায় আসেনা। সংখ্যা বেশী হলেও যারা আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাত থেকে দূরে তাদেরকে শরীয়তের পরিভাষায় জামাআত বলা হয়না।
১০১. সহীহ: আবু দাউদ ৪৬০৭, তিরমিযী ২৬৭৬, দারিমী ৯৫, ইবনে মাজাহ ৪২।
১০২. মূলতঃ আকীদাহ বিষয়ে মূলনীতি উক্ত তিনটিই মাত্র। কিয়াস দ্বারা আকীদাহ সাব্যস্ত হয় না। তাই এখানে চতুর্থটির উল্লেখ করা হয়নি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00