📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 খিলাফতের ক্ষেত্রে আলী ও অন্য চার খলীফার উপর প্রাধান্য দেয়ার হুকুম।

📄 খিলাফতের ক্ষেত্রে আলী ও অন্য চার খলীফার উপর প্রাধান্য দেয়ার হুকুম।


উছমান ও আলীর মধ্যে কে অধিক উত্তম, যদিও এই মাস'আলাটি দ্বীনের ঐসব মূলনীতির অন্তর্ভুক্ত নয়, যাতে কেউ বিপরীত মত পোষণ করলে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অধিকাংশ লোকের মতানুসারে তাকে গোমরাহ বলা যাবে। কিন্তু খিলাফতের মাসা'আলায় যে কেউ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মাযহাবের বিপরীত মত পোষণ করবে, তাকে গোমরাহ বলা হবে। কেননা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা বিশ্বাস করে যে, রসূল ﷺ এর পরে খলীফা হলেন আবু বকর, অতঃপর উমার, অতঃপর উছমান, অতঃপর আলী ⚔️। সুতরাং যে ব্যক্তি এই সমস্ত খলীফার কারো খেলাফতের বিরোধিতা করবে, সে তার গৃহে পালিত গাধার চেয়েও বোকা বলে বিবেচিত হবে।
ব্যাখ্যা: শাইখুল ইসলাম এখানে দু'টি মাসআলার মধ্যে তুলনা করেছেন। একটি হলো সম্মান ও ফাযীলাতের ক্ষেত্রে আলীকে উছমানের উপর প্রাধান্য দেয়ার মাস'আলা এবং আরেকটি হলো খিলাফতের মাস'আলায় আলীকে অন্য খলীফাদের উপর প্রাধান্য দেয়া। যার ফলে বড় ধরণের কোন ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। সুতরাং শাইখ বর্ণনা করেছেন যে, ফাযীলাতের ক্ষেত্রে আলীকে উছমানের উপর প্রাধান্য দিলে গোমরাহ বলা হবে না। অর্থাৎ যে ব্যক্তি আলীকে উছমানের চেয়ে উত্তম বলল, তাকে গোমরাহ বলে হুকুম লাগানো যাবে না। কেননা আহলে সুন্নাতের লোকদের মধ্যে এ মাস'আলায় মতভেদ রয়েছে। যদিও প্রাধান্যযোগ্য মতে আলীর উপর উছমান এর উপর ফাযীলাত সাব্যস্ত। কিন্তু খিলাফতের মাস'আলায় গোমরাহ বলা হবে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি খিলাফতের মাস'আলায় আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মাযহাবের খেলাফ করবে এবং আলীকে উছমান বা তাঁর আগের কোন খলীফার উপর প্রাধান্য দিবে কিংবা তাঁকে ফাযীলাতের ক্ষেত্রে আবু বকর ও উমার এর উপর প্রাধান্য দিবে তার উপর গোমরাহীর হুকুম লাগানো হবে।
সুতরাং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা বিশ্বাস করে, রসূল ﷺ এর পরে আবু বকর সিদ্দীক হলেন প্রথম খলীফা। কেননা তাঁর রয়েছে অনেক ফাযীলাত এবং সৎকর্মে অগ্রগামিতা। নাবী তাঁকে সমস্ত সাহাবীর উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁর খেলাফতের বাইআতের উপর সাহাবীদের ইজমা হয়েছে।
অতঃপর আবু বকরের পরে উমার ইবনুল খাত্তাব হলেন দ্বিতীয় খলীফা। কেননা তাঁরও রয়েছে অনেক ফাযীলাত এবং সৎকর্মে অগ্রগামিতা। আবু বকর জীবিত থাকা কালেই তাঁকে পরবর্তী খেলাফতের দায়িত্বভার দিয়ে গেছেন। আবু বকর এর পরে তাঁর খেলাফতের উপর উম্মতের ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
অতঃপর উমারের পর খলীফা হলেন উছমান বিন আফফান। কেননা উমার এর পক্ষ হতে নিযুক্ত শুরা পরিষদ তাকেই খেলাফতের জন্য প্রাধান্য দিয়েছে এবং মুসলিম উম্মত তাঁর খেলাফতের উপর একমত হয়েছে। অতঃপর উছমান বিন আফফানের পরে খলীফা হলেন আলী। কেননা তাঁর রয়েছে অনেক ফাযীলাত। তাঁর খেলাফতের উপর তাঁর যুগের লোকদের ইজমা সংঘটিত হয়েছে।
এ হলেন চারজন খলীফা। ইরবায বিন সারিয়ার হাদীসে তাদের প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে। রসূল বলেন:
فَإِنَّهُ مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ بَعْدِي فَسَيَرَى اخْتِلَافًا كَثِيرًا ، فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الْمَهْدِيِّينَ الرَّاشِدِينَ، تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِدِ
"আমার পরে তোমাদের মধ্য থেকে যারা জীবিত থাকবে, তারা অনেক মতবিরোধ দেখতে পাবে। সুতরাং তোমরা আমার সুন্নাত এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবে এবং উহার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে"।৮০
এ জন্যই শাইখুল ইসলাম বলেছেন: যে ব্যক্তি এ চারজনের কারো খিলাফতের স্বীকৃতি দিবে না সে তার গৃহে পালিত গাধার চেয়েও অধিক নির্বোধ। কেননা এতে বিনা কারণে শরীয়াতের দলীল এবং ইজমার খেলাফ করা হবে। যেমন রাফেযীরা রসূল ﷺ এর পরে আলী বিন আবু তালিবকেই খিলাফাতের হকদার মনে করে।
আলীকে অন্য তিন খলীফার উপর প্রাধান্য দেয়ার মাস'আলায় শেষ কথা হলো,
(১) যারা খিলাফতের ক্ষেত্রে তাঁকে বাকী তিন খলীফার উপর প্রাধান্য দিলো, সে আহলে সুন্নাতের ঐকমত্যে গোমরাহ বলে গণ্য হবে।
(২) যারা তাকে ফাযীলাতের ক্ষেত্রে আবু বকর সিদ্দীক এবং উমারের উপর প্রাধান্য দিবে, তারাও গোমরাহ হবে।
(৩) যারা আলীকে উছমানের উপর ফাযীলাতের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিবে, তাদেরকে গোমরাহ বলা হবে না। যদিও এটি প্রাধান্যযোগ্য মতের বিপরীত।

টিকাঃ
৮০. সহীহ: আবু দাউদ ৪৬০৭, তিরমিযী ২৬৭৬, দারিমী ৯৫, ইবনে মাজাহ ৪২।

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 আহ্‌লুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের নিকট নাবী ﷺ এর পরিবারের মর্যাদা।

📄 আহ্‌লুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের নিকট নাবী ﷺ এর পরিবারের মর্যাদা।


আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত নাবী পরিবারের সকল সদস্যকে ভালবাসে, তাদের সাথে বন্ধুত্ব রাখে এবং তাদের ব্যাপারে রসূল এর ঐ অসীয়তকে হিফাযত করে, যা তিনি গাদীরে খুম্মের দিন করেছিলেন। তিনি সেদিন বলেছেন: أُذَكِّرُكُمُ اللَّهَ فِي أَهْلِ بَيْتِي
"আমি তোমরাদেরকে আমার আহলে বাইতের ব্যাপারে আল্লাহর আদেশ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি”।৮১ তাঁর চাচা আব্বাস যখন তাঁর নিকট অভিযোগ করলেন, কুরাইশদের কিছু লোক বনী হাশেমদের লোকদের সাথে দুর্ব্যবহার করছে, তখন তিনি বললেন:
وَالَّذِي نَفْسِي بَيَدِهِ؛ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحِبُّوكُمْ اللَّهِ وَلِقَرَابَتِي
সেই সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবেনা, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর জন্য এবং আমার সাথে আত্মীয়তার কারণে তোমাদেরকে ভালবাসবে।৮২ রসূল বলেন:
إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى بَنِي إِسْمَاعِيلَ، وَاصْطَفَى مِنْ بَنِي إِسْمَاعِيلَ كِنَانَةَ، وَاصْطَفَى مِنْ كِنَانَةَ قُرَيْشًا، وَاصْطَفَى مِنْ قُرَيْشٍ بَنِي هَاشِمٍ، وَاصْطَفَانِي مِنْ بَنِي هَاشِمٍ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা আদম সন্তানদের থেকে বনী ইসমাঈলকে বাছাই করে নিয়েছেন। ইসমাঈলের সন্তানদের থেকে বনী কেনানাকে নির্বাচন করেছেন। আর বনী কেননা থেকে কুরাইশকে বাছাই করে নিয়েছেন। কুরাইশ বংশ থেকে নির্বাচিত করেছেন বনী হাশেমকে। আর হাশেমের বংশ থেকে নির্বাচন করেছেন আমাকে"।৮৩
ব্যাখ্যা: শাইখুল ইসলাম এখানে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের নিকট আহলে বাইত তথা নাবী পরিবারের মর্যাদা বর্ণনা করেছেন। তারা রাসূল এর আহলে বাইতকে ভালবাসে। নাবী পরিবাবের ঐ সমস্ত সদস্য আহলে বাইতের মধ্যে শামিল, যাদের জন্য সাদকাহ গ্রহণ করা হারাম করা হয়েছে। তারা হলেন আলী, জা'ফর, আকীল, আব্বাস এবং তাদের পরিবারের সকল সদস্য। এমনি হারিছ বিন আব্দুল মুত্তালিবের সন্তানগণ, নাবী এর স্ত্রী এবং কন্যাগণও আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا
"আল্লাহ ইচ্ছা করেন তোমাদের নাবী পরিবার থেকে ময়লা দূর করতে এবং তোমাদের পুরোপুরি পাক-পবিত্র করে দিতে” (সূরা আহযাব ৩৩:৩৩)।
সুতরাং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা নাবী পরিবারের লোকদেরকে ভালবাসে এবং তাদেরকে সম্মান করে। কেননা তাদেরকে ভালবাসা ও সম্মান করা নাবী কে ভালবাসা ও সম্মান করার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা'আলা এবং রসূল তাদেরকে সম্মান করার আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
قُل لَّا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَى
"হে নাবী! এসব লোককে বলে দাও, এ কাজের জন্য আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না। তবে আত্মীয়তার ভালবাসা অবশ্যই চাই" (সূরা শুরা ৪২:২৩)।
সুন্নাতে এ বিষয়ে অনেক দলীল রয়েছে। এগুলো থেকে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমীয়া কিছু উল্লেখ করেছেন। তবে ভালবাসা পাওয়ার শর্ত হলো রসূল ﷺ এর আত্মীয়দের সালাফগণের ন্যায় সুন্নাতের অনুসারী হতে হবে এবং দ্বীনের উপর সুদৃঢ় থাকতে হবে। যেমন ছিলেন আব্বাস ও তাঁর সন্তানগণ এবং আলী ও তাঁর সন্তানগণ।
পক্ষান্তরে যারা রসূলের সুন্নাতের বিরোধিতা করবে এবং দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে না, তাদেরকে ভালবাসা নাজায়েয। যদিও সে আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত হয়।
ويتولونهم তাদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করে: অর্থাৎ তাদেরকে ভালবাসে। يتولون শব্দটি الولاء থেকে গৃহীত হয়েছে। الولاء শব্দের واو বর্ণে যবর দিয়ে পড়া হয়েছে। এর অর্থ হলো ভালবাসা। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা রসূল ﷺ এর অসীয়তকে হেফাযত করে: তারা সেই অসীয়ত অনুযায়ী আমল করে এবং তা বাস্তবায়ন করে। তিনি গাদীরে খুম্মের দিন বলেছেন: "আমি তোমাদেরকে আমার আহলে বাইতের ব্যাপারে আল্লাহর আদেশ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি”। বন্যার বা বৃষ্টির পানি যেখানে গিয়ে জমা হয়, তাকে غدیر )গাদীর) বলা হয়। বলা হয়ে থাকে যে, খুম্ম একজন ব্যক্তির নাম। তার দিকে সেই স্থানের পানিকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে غدیر خم 'খুস্মের জলাশয়'।
কেউ কেউ বলেছেন: বৃক্ষ দ্বারা আচ্ছাদিত একটি স্থানের নাম হলো খুম্ম। জলাশয়টিকে এই স্থানটির দিকে সম্বোধন করার কারণ হলো জলাশয়টি সেখানেই অবস্থিত ছিল। এই পুকুর বা জলাশয়টি মক্কা থেকে মদীনায় আসার রাস্তার পাশে (জুহফায়) অবস্থিত ছিল। বিদায় হজ্জ থেকে ফিরে আসার সময় নাবী এই জলাশয়ের পাশ দিয়ে অতিক্রম করেছিলেন এবং সেখানে ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই ভাষণের মধ্যে উপরোক্ত কথাটিও ছিল, যা শাইখুল ইসলাম উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ তিনি বলেছিলেন: আল্লাহ তা'আলা আমার আহলে বাইতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের এবং তাদের হক আদায় করার যে আদেশ দিয়েছেন, আমি তোমাদেরকে সেই আদেশ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।
وَقَالَ أَيْضًا لِلْعَبَّاسِ عَمَّهُ তিনি তাঁর চাচা আব্বাসকে বলেছিলেন: আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব বিন হাশিম বিন আবদে মানাফ। তিনি একটি অপছন্দনীয় বিষয় দেখে নাবীকে অবগত করেছিলেন। তিনি জানালেন যে, কুরাইশদের কিছু লোক বনী হাশেমের লোকদের প্রতি দুর্ব্যবহার করছে।
الجفاء অর্থ হলো সদাচরণ পরিহার করা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা। নাবী তখন কসম করে বললেন: ঐ সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা পূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তারা আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্য এবং আমার সাথে আত্মীয়তার কারণে তোমাদেরকে ভালবাসবে। অর্থাৎ দুই কারণে আহলে বাইতের লোকদেরকে ভালবাসতে হবে।
(১) আহলে বাইতকে ভালবাসার মাধ্যমে তারা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য অর্জন করবে। কেননা তারা আল্লাহর অলীদের অন্তর্ভুক্ত।
(২) তারা ছিলেন রসূলের আত্মীয়।
সুতরাং তাদের প্রতি ভালবাসা পোষণ করলে রসূল খুশী হবেন এবং এর মাধ্যমে তাঁর প্রতি সম্মানও প্রদর্শন করা হয়। বনী হাশেমের ফযীলতের বর্ণনা দিতে গিয়ে নাবী বলেন যে, তারা হলেন তাঁরই আত্মীয়। আল্লাহ তা'আলা বনী ইসমাঈল বিন ইবরাহীম খলীল আলাইহিস সাল্লামের বংশধর হতে উত্তম হিসাবে বাছাই করেছেন। আর ইসমাঈলের বংশধর থেকে বনী কেননাকে নির্বাচন করেছেন। কেননা একটি গোত্রের নাম। তাদের পূর্ব পুরুষ ছিল কেনানা বিন খুযাইমা। কেনানা থেকে বাছাই করেছেন কুরাইশকে। কুরাইশরা হলো মুযার বিন কেননার সন্তান। কুরাইশ থেকে আল্লাহ তা'আলা বনী হাশেমকে নির্বাচন করেছেন। এরা হলেন হাশেম বিন আব্দে মানাফের সন্তান। রসূল আরো বলেন, অতঃপর আল্লাহ তা'আলা আমাকে বনী হাশেম থেকে বাছাই করেছেন।
সুতরাং তিনি হলেন মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল মুত্তালিব বিন হাশেম বিন আব্দে মানাফ বিন কুসাই বিন কিলাব বিন মুররাহ বিন কা'ব বিন লুআই বিন গালেব বিন ফিহির বিন মালেক বিন নযর বিন কেনানা বিন খুযাইমা বিন মুদরেকা বিন ইলয়াস বিন মুযার বিন নায্যার বিন মাআদ বিন আদনান।
উপরোক্ত হাদীস থেকে দলীল পাওয়া গেল যে, আরবদের ফাযীলাত রয়েছে। আর কুরাইশ বংশ হলো অন্যান্য আরব গোত্র হতে উত্তম। বনী হাশেম কুরাইশদের মধ্যে সর্বোত্তম। রসূল বনী হাশেমের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান। সুতরাং তিনি ব্যক্তিগত দিক থেকে সর্বোত্তম আদম সন্তান এবং তাঁর বংশ মর্যাদাও সর্বশ্রেষ্ঠ। এই হাদীসের মধ্যে বনী হাশেমেরও ফাযীলাত সাব্যস্ত হয়েছে। রসূল এর আত্মীয়রাই হলো বনী হাশেম।

টিকাঃ
৮১. সহীহ মুসলিম ২৪০৮, সুনানে দারিমী ৩৩১৬, সহীহ ইবনে খুযাইমা ২৩৫৭।
৮২. সহীহ: তিরমিযী ৩৭৫৮, মুসনাদে আহমাদ।
৮৩. সহীহ মুসলিম ২২৭৬, তিরমিযী ৩৬০৫, মুসনাদে আহমাদ।

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 আহ্‌লুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের নিকট নাবী ﷺ এর পবিত্র স্ত্রীগণের মর্যাদা।

📄 আহ্‌লুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের নিকট নাবী ﷺ এর পবিত্র স্ত্রীগণের মর্যাদা।


আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা নাবী এর স্ত্রী উম্মাহাতুল মুমিনদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে। তারা বিশ্বাস করে, আখিরাত দিবসেও তারা তাঁর স্ত্রীরূপেই পরিগণিত হবে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা বিশেষ করে রসূল এর স্ত্রী খাদীজা এর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে। কারণ খাদীজা ছিলেন তাঁর অধিকাংশ সন্তানের জননী, তাঁর প্রতি সর্বপ্রথম ঈমান আনয়নকারীনী এবং দ্বীনের দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে সর্বাত্মক সাহায্যকারীনী। সর্বোপরি খাদীজা এর ছিল রসূল এর নিকট সুউচ্চ মর্যাদা। সিদ্দীকাহ বিনতে সিদ্দীক আয়িশা সম্পর্কে নাবী বলেছেন:
فَضْلُ عَائِشَةَ عَلَى النِّسَاءِ كَفَضْلِ الشَّرِيدِ عَلَى سَائِرِ الطَّعَامِ “আয়িশা এর মর্যাদা সব নারীর উপর ঠিক সে রকমই, যেমন ছারীদ নামক খাবারের মর্যাদা সকল খাদ্যের উপর”।
ব্যাখ্যা: এ অংশে শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া নাবী এর পবিত্র স্ত্রীগণের ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকদের আক্বীদা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: তারা নাবী করীম এর স্ত্রীগণের প্রতি অন্তর দিয়ে গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে এবং তাদেরকে সম্মান করে। কেননা তারা হলেন শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের দিক থেকে এবং উম্মতের কারো জন্য তাদেরকে বিবাহ করা হারাম হওয়ার দিক থেকে জননী সমতুল্য। তবে বিবাহ ব্যতীত অন্যান্য হুকুম-আহকামের ক্ষেত্রে তাদের হুকুম অপরিচিত মহিলাদের মতই। অর্থাৎ তাদের সাথে নির্জনে একত্রিত হওয়া, তাদের দিকে দৃষ্টিপাত করা, ইত্যাদি সবই হারাম। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
النَّبِيُّ أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهَاتُهُمْ
"নাবী মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের অপেক্ষা অধিক ঘনিষ্ঠ এবং তাঁর স্ত্রীগণ তাদের মাতা” (সূরা আহযাব ৩৩:৬)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَمَا كَانَ لَكُمْ أَن تُؤْذُوا رَسُولَ اللَّهِ وَلَا أَن تَنكِحُوا أَزْوَاجَهُ مِن بَعْدِهِ أَبَدًا إِنْ ذَلِكُمْ كَانَ عِندَ اللَّهِ عَظِيمًا
"তোমাদের জন্য আল্লাহর রসূলকে কষ্ট দেয়া মোটেই জায়েয নয় এবং তাঁর পরে তাঁর স্ত্রীদেরকে বিবাহ করাও জায়েয নয়। এটা আল্লাহর দৃষ্টিতে বিরাট গুনাহ্” (সূরা আহযাব ৩৩:৫৩)। আল্লাহ তা'আলা একই আয়াতে আরো বলেন:
وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ
"তোমরা তাঁর পত্নীদের কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে।" (সূরা আহযাব ৩৩:৫৩)।
সুতরাং সম্মান পাওয়ার দিক থেকে তারা মুমিনদের জননী সমতুল্য। তবে মুমিনগণ আপন মাতার ন্যায় নাবী ﷺ এর স্ত্রীগণের জন্য মাহরাম নয়। অর্থাৎ নিজের মাতা, বোন, কন্যা এবং অনুরূপ মহিলার সাথে নির্জনে সাক্ষাৎ করা জায়েয, সেরকম নাবী ﷺ এর স্ত্রীদের সাথে নির্জনে মিলিত হওয়া জায়েয নয়।
নয়জন স্ত্রী জীবিত রেখে নাবী মৃত্যু বরণ করেছেন। তারা হলেন আয়িশা, হাফসা, যয়নব বিনতে জাহ্শ, উম্মে সালামা, সাফীয়া, মায়মুনা, উম্মে হাবীবা, সাওদা এবং জুআইরিয়া।
তিনি খাদীজাকে নবুওয়াতের পূর্বেই বিবাহ করেছিলেন। তিনি জীবিত থাকতে আর কাউকে বিবাহ করেননি। যায়নাব বিনতে খুযাইমাকে বিবাহ করার কিছু দিন পরেই যায়নাব মৃত্যু বরণ করেন। এরাই হলেন নাবী ﷺ এর ঐ সমস্ত স্ত্রী, যাদের সাথে তিনি ঘরসংসার করেছেন। তাদের সংখ্যা মোট ১১জন। আল্লাহ তাদের উপর সন্তুষ্ট হোন। আমীন।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা আরো বিশ্বাস করে যে, আখিরাত দিবসে নাবী ﷺ এর স্ত্রীগণ তাঁর স্ত্রীরূপেই থাকবে। এতে করে তাদের জন্য বিরাট সম্মান ও ফাযীলাত হাসিল হবে।
নাবী ﷺ এর স্ত্রী খাদীজার রয়েছে বিশেষ ফাযীলাত। তাঁর রয়েছে অনেক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য, মর্যাদা এবং ফাযীলাত। শাইখুল ইসলাম তা থেকে এখানে কয়েকটি উল্লেখ করেছেন।
(১) খাদীজা রসূল ﷺ এর অধিকাংশ সন্তানের মাতা। সুতরাং ইবরাহীম ব্যতীত তাঁর বাকীসব সন্তানই খাদীজার গর্ভ থেকে। ইবরাহীম ছিলেন মারিয়া কিবতীর গর্ভ থেকে।
(২) এক মতানুসারে খাদীজাই সর্বপ্রথম রসূল ﷺ এর প্রতি ঈমান আনয়ন করেন। শাইখুল ইসলাম এখানে এই মতটিই উল্লেখ করেছেন। অন্যমতে তিনি মহিলাদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন।
(৩) রসূল এর দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে খাদীজা ই সর্বপ্রথম সক্রীয়ভাবে সহযোগিতা ও সাহায্য করেছিলেন। তিনি ঠিক সেই সময়তেই নাবীকে সাহায্য করেছেন, যখন সাহায্যের খুব প্রয়োজন ছিল।
(৪) রসূল ﷺ এর নিকট খাদীজা এর ছিল উচ্চ মর্যাদা। তিনি খাদীজাকে খুব ভালবাসতেন, তাঁর কথা স্মরণ করতেন এবং তাঁর খুব প্রশংসা করতেন।
আর সিদ্দীকাহ বিনতে সিদ্দীক সম্পর্কে কথা এই যে, তিনি হলেন আয়িশা বিনতে আবু বকর। অত্যাধিক সত্যবাদীকে সিদ্দীক বলা হয়। নাবী আবু বকরকে এই উপাধী দিয়েছেন। আয়িশা এর রয়েছে অনেক ফাযীলাত। তার মধ্যে
(ক) তিনি ছিলেন নাবী ﷺ এর স্ত্রীদের মধ্যে তাঁর নিকট সর্বাধিক প্রিয়।
(খ) তাঁকে ছাড়া রসূল আর কোন কুমারী মহিলাকে বিবাহ করেননি।
(গ) আয়িশা এর সাথে একই চাদরের নীচে থাকা অবস্থায় নাবী এর উপর অহী নাযিল হতো।
(ঘ) মিথ্যুকরা তাঁর উপর যে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছিল, আল্লাহ তা'আলা নিজেই তাঁকে সেই মিথ্যা অপবাদ থেকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন।
(ঙ) তিনি হলেন মহিলাদের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী।
(চ) বিজ্ঞ সাহাবীগণ যখন কোন বিষয়ে সমস্যার সম্মুখীন হতেন, তখন তাঁর কাছে সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেন।
(ছ) রসূল তাঁর ঘরে এবং তাঁরই বুকের উপর মাথা রেখে মৃত্যু বরণ করেছেন।
(জ) নাবী কে তাঁর গৃহেই দাফন করা হয়েছে। এ ছাড়াও তাঁর আরো অনেক ফাযীলাত রয়েছে। আর শাইখুল ইসলাম এখানে তাঁর যেই ফাযীলাতটি উল্লেখ করেছেন, তা হলো নাবী বলেন: فَضْلَ عَائِشَةَ عَلَى النِّسَاءِ كَفَضْلِ الشَّرِيدِ عَلَى سَائِرِ الطَّعَامِ
"আয়িশা এর মর্যাদা সব নারীর উপর ঠিক সেরকমই, যেমন ছারীদ নামক খাবারের মর্যাদা অন্যসব খাদ্যের উপর"।৮৬
ছারীদ ছিল সে সময়ের সর্বোত্তম খাবার। কেননা তাতে থাকত গোশত ও রুটি। আটার রুটি সর্বোত্তম খাদ্য। আর গোশত হলো সর্বোত্তম সালন (তরকারী)। গোশত যেহেতু সর্বোৎকৃষ্ট তরকারী এবং আটা যেহেতু সর্বোত্তম খাদ্যদ্রব্য, আর ছারীদ যেহেতু এই উভয় প্রকার বস্তু দ্বারা তৈরী হয়, তাই ছারীদ সর্বোত্তম খাদ্যে পরিণত হয়েছে।

টিকাঃ
৮৪. সেকালে সারীদ ছিল আরবের সর্বোত্তম খাদ্য, যা রুটি ও মাংস দ্বারা তৈরী হত।
৮৫. সহীহ বুখারী ৩৪১১, সহীহ মুসলিম ২৪৩১, তিরমিযী ৩৮৮৭, নাসাঈ ৩৯৪৭, ইবনে মাজাহ ৩২৮০, সুনানে দারিমী ২১১৩।
৮৬. সহীহ বুখারী ৩৪১১, সহীহ মুসলিম ২৪৩১, তিরমিযী ৩৮৮৭, নাসাঈ ৩৯৪৭, ইবনে মাজাহ।

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 সাহাবী এবং আহলে বাইতের ব্যাপারে বিদআ‘তীরা যা বলে, আহ্‌লুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।

📄 সাহাবী এবং আহলে বাইতের ব্যাপারে বিদআ‘তীরা যা বলে, আহ্‌লুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত তা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।


আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আক্বীদা হলো, তারা ঐ সমস্ত রাফেযীর পথ পরিহার করে, যারা সাহাবীদেরকে ঘৃণা করে এবং তাদেরকে গালি দেয়। তারা ঐসব নাওয়াসেবদের সাথেও সম্পর্ক ছিন্ন করে, যারা কথা কিংবা আচরণের মাধ্যমে আহলে বাইতকে কষ্ট দেয়। সাহাবীদের পরস্পরের মধ্যে যে সমস্ত মতবিরোধ, ফিতনা এবং যুদ্ধ-বিগ্রহ সংঘটিত হয়েছে সে ব্যাপারে কথা বলা থেকে তারা বিরত থাকে।
তারা বলে যে, সাহাবীদের দোষ-ত্রুটি আলোচনায় যেসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোর কিছু মিথ্যা, কোনটিতে সংযোজন করা হয়েছে, কোনটি হতে কিছু অংশ বিয়োজন করা হয়েছে আবার কোনটিকে সঠিক স্থান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
সাহাবীদের দোষ-ত্রুটি বর্ণনার হাদীসগুলো থেকে যা সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তার ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অবস্থান হলো, তাতে তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত। কেননা তারা ইজতেহাদ করেছিলেন। সুতরাং ইজতেহাদ করতে গিয়ে হয় তারা সঠিক সিদ্বান্তে উপনীত হয়েছেন আর না হয় ভুল করেছেন। মূলতঃ ইজতেহাদের বিষয়টি এমন যে, মুজতাহিদগণ কখনো তাতে ভুল করে থাকে আবার কখনো তারা সঠিক সিদ্বান্তেও উপনীত হয়ে থাকে।
তা সত্ত্বেও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা এ বিশ্বাস করে না যে, প্রত্যেক সাহাবীই কাবীরা ও সগীরা গুনাহ হতে নিষ্পাপ; বরং তাদের দ্বারা গুনাহ হতে পারে। তবে ইসলাম গ্রহণে তাদের অগ্রগামিতাসহ এমনসব ফাযীলাত রয়েছে, যার দাবী এই যে, তাদের দ্বারা গুনাহ হয়ে থাকলেও তা ক্ষমাযোগ্য। এমনকি সাহাবীদের এমন গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে, যা পরবর্তীতে আগমনকারীদের বেলায় মাফ করা হবে না। কেননা তাদের রয়েছে এমন অনেক সৎ আমল, যা পরবর্তীদের জন্য অর্জন করা অসম্ভব। সুতরাং সাহাবীদের এই সৎকর্মগুলো তাদের দোষ-ত্রুটি মিটিয়ে দিবে।
নাবী থেকে সহীহ হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে, যে সাহাবীগণ ছিলেন সর্বোত্তম মানুষ"। তাদের পরবর্তী যুগের কোনো মুসলিম উহুদ পাহাড়ের সমপরিমাণ স্বর্ণ আল্লাহর রাস্তায় দান করলেও সে সাহাবীদের কারোর একমুষ্টি পরিমাণ খাদ্য দান করার সমান ছাওয়াব পাবে না।৯০
অতঃপর তাদের কারো দ্বারা ভুল-ত্রুটি হয়ে থাকলেও তা থেকে তিনি তাওবা করেছেন অথবা এমন সৎ আমল করেছেন, যা তার ভুল-ত্রুটিকে মিটিয়ে দিয়েছে অথবা সর্বাগ্রে ইসলাম গ্রহণ ও সৎকর্মে অগ্রগামী হওয়ার কারণে কিংবা নাবী ﷺ এর শাফাআতের দ্বারা তার সে ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দেয়া হবে। কেননা সাহাবীরাই নাবী এর শাফাআত পাওয়ার সর্বাধিক হকদার। অথবা দুনিয়াতে তাকে কোন মসীবতে ফেলা হয়েছে, যার কারণে উক্ত মুসীবত তার গুনাহর কাফফারা হয়ে গেছে।
সুতরাং তাদের দ্বারা নিশ্চিতরূপে সংঘটিত গুনাহর অবস্থা যদি এই হয়, তাহলে ঐসব ভুল-ত্রুটির কী অবস্থা হতে পারে, যাতে তারা ইজতেহাদ করেছিলেন? যদি তারা সেখানে হকে উপনীত হয়ে থাকেন, তাহলে তাদের জন্য রয়েছে দু'টি নেকী। আর ভুল করে থাকলে রয়েছে একটি নেকী। আর ভুল-ত্রুটি তো ক্ষমাযোগ্যই।
এখানে আরেকটি কথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, তাদের কর্মসমূহ থেকে যে পরিমাণ কাজকে অপছন্দ করা হয়ে থাকে, তা অতি সামান্য ও নগণ্য। আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রসূলের প্রতি অগাধ বিশ্বাস, ভালবাসা, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ, হিজরত, দ্বীনের নুসরত (সাহায্য), উপকারী ইলম এবং সৎ আমলসহ তাদের আরো যেসব সুবিশাল ফাযীলাত ও সৎকর্ম রয়েছে, তা দ্বারা উহা আচ্ছাদিত হয়ে গেছে।
সুতরাং যে ব্যক্তি সজ্ঞানে ও জেনে-বুঝে সাহাবীদের পবিত্র জীবনীর প্রতি দৃষ্টি দিবে এবং আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে যেসব ফাযীলাত দান করেছেন, তার প্রতিও দৃষ্টিপাত করবে, সে নিশ্চিতভাবেই জানতে পারবে, তারাই নাবীদের পরে সর্বোত্তম মানুষ। অতীতে সাহাবীদের মত মর্যাদাবান ও ফযীলতের অধিকারী কেউ ছিল না। ভবিষ্যতেও তাদের মত ভাল লোক আর আসবে না। তারা মুসলিম জাতির সর্বোত্তম ব্যক্তি এবং আল্লাহর নিকট সর্বাধিক মর্যাদাশীল উম্মতের সর্বোৎকৃষ্ট মানব।
ব্যাখ্যা: শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া এই অংশে আহলে বাইত ও সাহাবীদের ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন।
প্রথমত: তাদের ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অবস্থান হলো ইফরাত (বাড়াবাড়ি) ও তাফরীত (অবহেলা ও শৈথিল্য) এবং সীমালঙ্ঘন ও কঠোরতার মাঝখানে। তারা উম্মতের সকল মুমিনকেই ভালবাসে। বিশেষ করে যেসব মুহাজির ও আনসার সর্বপ্রথম ইসলাম কবুল করেছে এবং যারা উত্তমভাবে তাদের অনুসরণ করেছে, তারা তাদের সবাইকে ভালবাসে। তারা আহলে বাইতের প্রতিও অন্তর দিয়ে গভীর ভালবাসা ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে।
তারা সাহাবীদের মর্যাদা, ফাযীলাত ও নৈতিক গুণাবলী সম্পর্কে অবগত রয়েছে। সেই সাথে আহলে বাইতের জন্য আল্লাহ তা'আলা যেসব হক নির্ধারণ করেছেন, তারা সেই হকগুলোও সংরক্ষণ করে।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা রাফেযীদের পথ বর্জন করে এবং তাদের সাথে কোন প্রকার সম্পর্ক রাখে না। কারণ তারা সাহাবীদেরকে গালি দেয়, তাদের সমালোচনা করে এবং আলী ও আহলে বাইতের ভালবাসায় সীমালংঘন করে।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা নাওয়াসেবদের সাথেও সম্পর্ক ছিন্ন করে। কেননা তারা আহলে বাইতের সাথে শত্রুতা পোষণ করে, তাদেরকে কাফের বলে এবং তাদের সম্মানে আঘাত করে। সাহাবী এবং আহলে বাইতের ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকদের মাযহাব পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মাযহাবের বিরোধী ও ভ্রান্ত মাযহাবগুলোর সাথে তুলনা করার জন্যই শাইখুল ইসলাম এখানে তা পুনরাবৃত্তি করেছেন।
দ্বিতীয়ত: ফিতনার সময় সাহাবীদের মধ্যে যেসব যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং মতভেদ সৃষ্টি হয়েছিল শাইখুল ইসলাম সেগুলোর ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। সাহাবীদের দিকে যেসব দোষ-ত্রুটি সম্বন্ধ করা হয় এবং তাদের নামে যেসব কুৎসা রটানো হয়, ইসলামের শত্রুরা সেগুলোকে সাহাবীদের বিরুদ্ধে আক্রমণের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেছে এবং তাদের সম্মান ও মর্যাদা নষ্ট করার সুযোগ খুঁজেছে। যেমন করেছে পরবর্তী যুগের কিছু আলিম এবং সমসাময়িক কতিপয় লেখক, যারা নিজেদেরকে রসূল ﷺ এর সাহাবীদের মধ্যে ফয়সালাকারী নিযুক্ত করেছে এবং বিনা দলীলে কারো পক্ষ নিয়ে তাকে হকপন্থী বলেছে আবার কারো বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে তাকে ভ্রান্ত বলেছে। বরং তারা কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং ঐসব মতলববাজ ও সুবিধাবাদীদের অন্ধ অনুসরণ করেই এরূপ করেছে, যারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে ও চক্রান্তে লিপ্ত। এর মাধ্যমে তারা মুসলিমদের গৌরবময় ইতিহাসের ব্যাপারে তাদেরকে সন্দিহান করে তুলতে চায় এবং তাদের সামনে সালাফে সালেহীনদের ঐসব লোকের চরিত্রকে কলঙ্কিত করে দিতে চায়, যারা ছিলেন এই উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। এ কাজের পিছনে তাদের সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা হলো ইসলামের বিশুদ্ধতা ও স্বচ্ছতায় আঘাত করা এবং মুসলিমদের ঐক্যে ফাটল ধরানো।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া এখানে অত্যন্ত সুন্দর ভাষায় সত্যকে প্রকাশ করেছেন এবং প্রকৃত ঘটনাকে খোলাসা করেছেন। তিনি সুস্পষ্ট করেই উল্লেখ করেছেন যে, সাহাবীদের দিকে যেসব কথা সম্বন্ধ করা হয় এবং তাদের মধ্যে যেসব অপ্রীতিকর ঘটনা (ফিতনা, দলাদলি ও যুদ্ধ-বিগ্রহ) হয়েছে, সে ব্যাপারে তিনি দু'টি কথার মধ্যে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মাযহাব খোলাসা করেছেন।
এক. তিনি বলেছেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা সাহাবীদের মধ্যে সংঘটিত বাদানুবাদ ও যুদ্ধ-বিগ্রহ সম্পর্কে নিরব থাকে। অর্থাৎ তারা সে ব্যাপারে ঘাটাঘাটি করে না এবং তাতে খোঁজাখুঁজিও করে না। কেননা তাতে বেশী খোঁজাখুঁজি ও ঘাটাঘাটি করতে গেলে রসূল এর সাহাবীদের প্রতি অন্তরে বিদ্বেষ ও হিংসা জন্ম নিতে পারে। আর সাহাবীদের প্রতি অন্তরে হিংসা রাখা বড় ধরণের গুনাহর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং নিরবতা পালন করা এবং সে বিষয়ে কথা না বলাই তা থেকে নিরাপদ থাকার একমাত্র পন্থা।
দুই. তাদের দোষ-ত্রুটি বর্ণনায় যেসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে, শাইখুল ইসলাম সেগুলোর জবাব দিয়েছেন। সাহাবীদের মর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে এবং তাদের শত্রুদের চক্রান্তকে প্রতিহত করার জন্যই তিনি তা করেছেন। শাইখুল ইসলামের জবাবগুলো সংক্ষিপ্তাকারে নিম্নে উল্লেখ করা হলো।
(১) যেসব হাদীসে তাদের দোষ-ত্রুটির কথা উল্লেখিত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে কিছু মিথ্যা ও বানোয়াট বর্ণনা রয়েছে। সাহাবীদের সুনাম নষ্ট করার জন্য তাদের দুশমনরা এসব হাদীস রচনা করেছে। যেমন করে থাকে রাফেযীরা। আল্লাহ তা'আলা তাদের চেহারা কালো করুন! সুতরাং তাদের মিথ্যা বর্ণনার প্রতি দৃষ্টি দেয়া যাবে না।
(২) এসব দোষ-ত্রুটি সম্বলিত বর্ণনার কোনটিতে সংযোজন করা রয়েছে, কোনটি হতে কিছু অংশ বিয়োজন করা হয়েছে আবার কোনটিকে সঠিক স্থান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে এগুলোর মধ্যে মিথ্যা প্রবেশ করেছে এবং বর্ণনাগুলো বিকৃত করা হয়েছে। তাই এগুলোর উপর নির্ভর করা যাবেনা। কেননা সাহাবীদের ফাযীলাত ও মর্যাদা সর্বজন বিদিত এবং তাদের ন্যায়পরায়ণতার বিষয়টি নিশ্চিতভাবে জ্ঞাত। সুতরাং বিকৃত ও সন্দিহান বিষয়ের পিছনে পড়ে নিশ্চিতভাবে জ্ঞাত বিষয়কে পরিত্যাগ করা যাবে না।
(৩) সাহাবীদের দোষ-ত্রুটি বর্ণনার হাদীসগুলো থেকে যা সহীহ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, তার ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অবস্থান হলো, তাতে তারা ক্ষমাপ্রাপ্ত। কেননা তারা ইজতেহাদ করেছিলেন। সুতরাং ইজতেহাদ করতে গিয়ে হয় তারা সঠিক সিদ্বান্তে উপনীত হয়েছেন আর না হয় ভুল করেছেন। মূলতঃ ইজতেহাদের বিষয়টি এমন যে, মুজতাহিদগণ কখনো ভুল করে থাকেন আবার কখনো সঠিক সিদ্বান্তেও উপনীত হয়ে থাকেন।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, সাহাবীদের যেসব ভুল-ভ্রান্তি হয়েছে, তা ছিল এমন ইজতেহাদী বিষয় সমূহে, যাতে মুজতাহিদ সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হলে দু'টি ছাওয়াব পায় এবং ভুল করলেও একটি নেকী পায়।
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আবু হুরায়রা ও আমর বিন আস হতে বর্ণিত হয়েছে, রসূল বলেছেন:
«إِذَا حَكَمَ الْحَاكِمُ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَصَابَ فَلَهُ أَجْرَانِ، وَإِذَا حَكَمَ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَخْطَأَ فَلَهُ أَجْرٌ». (بخارى: 7352)
"কোন বিচারক ইজতেহাদ করে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হলে তার জন্য দ্বিগুণ পুরস্কার রয়েছে। পক্ষান্তরে ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হলে তার জন্যও একটি পুরস্কার রয়েছে”। ৯১
(৪) সাহাবীগণ মানুষ ছিলেন। সুতরাং বনী আদমের অন্যান্য মানুষ দ্বারা যে ভুল-ত্রুটি হওয়া সম্ভব, তাদের দ্বারাও তা সংঘটিত হওয়া সম্ভব।
সুতরাং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা এ বিশ্বাস করে না যে, সাহাবীদের প্রত্যেকেই কাবীরা ও সগীরা গুনাহ থেকে নিষ্পাপ। বরং তাদের কারো কারো দ্বারা গুনাহর কাজ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তাদের দ্বারা কোন গুনাহ হয়ে থাকলেও গুনাহ মোচনের অনেক আমল রয়েছে। নিম্নে তা থেকে কিছু আমল বর্ণনা করা হলো:
(ক) ইসলাম গ্রহণে তাদের অগ্রগামীতাসহ এমনসব ফাযীলাত রয়েছে, যার দাবী হলো, তাদের দ্বারা গুনাহ হয়ে থাকলেও তা ক্ষমাযোগ্য। সুতরাং তাদের কারো দ্বারা যে ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়েছে, তাঁর অগণিত সৎ আমল থাকার কারণে সেই ত্রুটি-বিচ্যুতি মাফ হয়ে গেছে। যেমন এসেছে হাতেব বিন আবু বালতাআর ঘটনায়।
মক্কা বিজয়ের বছর তার পক্ষ হতে একটি ভুল হয়ে গিয়েছিল। তিনি যেহেতু বদরের যুদ্ধে শরীক ছিলেন, তাই তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। এমনকি সাহাবীদের এমন গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে, যা পরবর্তীতে আগমনকারীদের বেলায় মাফ করা হবে না। কেননা তাদের রয়েছে এমন অনেক সৎ আমল, যা পরবর্তীদের পক্ষে বাস্তবায়ন করা অসম্ভব। সুতরাং সাহাবীদের এ সৎকর্মগুলো তাদের দোষ-ত্রুটি মিটিয়ে দিবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنَّ الْحَسَنَاتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّئَاتِ
"সৎ কাজ অবশ্যই গুনাহসমূহকে দূর করে দেয় (সূরা হুদ ১১:১১৪)।
(খ) অন্যদের তুলনায় সাহাবীদের সৎআমল বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফাযীলাতের ক্ষেত্রে কেউ সাহাবীদের সমপর্যায়ে পৌঁছতে পারবে না। রসূল এর হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে যে, সাহাবীগণই ছিলেন সর্বোত্তম মানুষ। তাদের পরবর্তী যুগের কোন মুসলিম উহুদ পাহাড়ের সমপরিমাণ স্বর্ণ আল্লাহর রাস্তায় দান করলেও সে সাহাবীদের কারোর একমুষ্টি পরিমাণ খাদ্য দান করার সমান ছাওয়াব পাবে না। বুখারী, মুসলিম এবং অন্যান্য মুহাদ্দিছগণ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
আবু হুরায়রা, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ এবং ইমরান বিন হুসাইন থেকে আরো বর্ণিত হয়েছে যে, রসূল ﷺ বলেছেন:
خَيْرُ القرون قَرْنِي ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ
"আমার উম্মতের মধ্যে আমার যুগের মানুষেরা সর্বোত্তম। অতঃপর তাদের পরবর্তী যুগের লোকেরা, অতঃপর পরবর্তী যুগের লোকেরা”। ৯৩
القرون শব্দটি القرن এর বহুবচন। القرن বলা হয় একই যুগের বা কাছাকাছি যুগের এমন একদল মানুষকে, যারা বিশেষ কোন লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য একটি কাজে অংশগ্রহণ করে। নির্দিষ্ট মেয়াদী একটি সময়কেও কারন বলা হয়।
(গ) তাদের কাছে গুনাহ মোচনের অনেক কাফ্ফারা এবং উপকরণ ও মাধ্যম রয়েছে, যা অন্যদের কাছে নেই। তাদের কারো দ্বারা ভুল-ত্রুটি হয়ে থাকলেও তা থেকে তিনি তাওবা করেছেন অথবা এমন সৎ আমল করেছেন, যা তার ভুল-ত্রুটিকে মিটিয়ে দিয়েছে অথবা সর্বাগ্রে ইসলাম গ্রহণ ও সৎকর্মে অগ্রগামী হওয়ার কারণে তার সেই গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ গুনাহটি করার পূর্বে সে যত সৎ আমল করেছে, সেগুলোর তুলনায় গুনাহটি খুব নগণ্য হওয়ার কারণে তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। কিংবা নাবী ﷺ এর শাফাআতের দ্বারা তার সে ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। অথবা দুনিয়াতে তাকে কোন মসীবতে ফেলা হয়েছে, যার কারণে উক্ত মসীবত তার গুনাহর কাফফারা হয়ে গেছে। অর্থাৎ তাকে পরীক্ষা ও মুসীবতে ফেলা হয়েছে। অতঃপর সেই গুনাহ উক্ত মুসীবতে ফেলে কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। যেমন সহীহ হাদীসে এসেছে, নাবী ﷺ বলেন:
«مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ، وَلَا هَمَّ وَلَا حُزْنٍ، وَلَا أَذًى وَلَا غَمٌ، حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا، إِلَّا كَفْرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ»
"মুসলিম কোন ক্লান্তি, কষ্ট, উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, নির্যাতন ও বিষণ্ণতার শিকার হলে, এমনকি কাঁটাবিদ্ধ হলেও এর বদলে আল্লাহ্ তা'আলা তার গুনাহ্ মাফ করে দেন"। ১৪ ইমাম বুখারী ও মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।
সুতরাং মুসীবতে আক্রান্ত হওয়ার কারণে সাধারণ মুমিনদের গুনাহ মাফ হলে সাহাবীগণ তাতে পতিত হয়ে ক্ষমা পাওয়ার আরো বেশী হকদার হবেন।
সুতরাং সাহাবীদের দ্বারা যেসব ভুল-ত্রুটি নিশ্চিতভাবেই হয়েছে, তার ব্যাপারটি যদি এমন হয় যে, সৎকাজ থাকার কারণে তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে, তাহলে ঐসব গুনাহ কেন ক্ষমা করা হবে না, যাতে তারা মুজতাহিদ ছিলেন।
শরীয়াতের হুকুম জানার জন্য শ্রম ব্যয় করাকে الاجتهاد বলা হয়। মুজতাহিদগণ যদি ইজতেহাদ করতে গিয়ে সঠিক সিদ্বান্তে উপনীত হতে পারেন, তাহলে তাদের দু'টি নেকী হবে আর ভুলের মধ্যে পড়ে গেলে একটি নেকী হবে। আর মুজতাহিদের ভুল ক্ষমা করে দেয়া হবে। যেমন একটু পূর্বে এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
সুতরাং সাহাবীদের থেকে যে সামান্য পরিমাণ ভুল-ত্রুটি হয়েছে, তাতে দু'টি অবস্থার একটি অবস্থা হতে পারে।
(১) হতে পারে সাহাবী ইজতেহাদ করতে গিয়ে ভুলটি করে ফেলেছেন। তাতে তিনি বিনিময় প্রাপ্ত হবেন এবং তার ভুলটি মাফ করে দেয়া হবে।
(২) এও হতে পারে যে, গুনাহটি ইজতেহাদে ভুল করার কারণে হয়নি; এমনিতেই হয়েছে। কিন্তু তার কাছে এত বিশাল পরিমাণ আমলে সালেহ, অগণিত ফাযীলাত এবং সৎকাজে অগ্রগামিতা রয়েছে, যা তার গুনাহর কাফফারা হয়ে গেছে এবং গুনাহকে মিটিয়ে দিয়েছে।
মোট কথা, সাহাবীদের দ্বারা যে সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়েছে, তা তাদের বিশাল বিশাল সৎকাজের তুলনায় খুবই কম। পূর্বে যদিও তা বর্ণনা করা হয়েছে, তারপরও এখানে সংক্ষিপ্তাকারে তাদের ফাযীলাত ও সৎকর্মগুলো পুনরাবৃত্তি করা হলো:
(১) আল্লাহ তা'আলা এবং তাঁর রসূলের প্রতি ছিল তাদের অগাধ বিশ্বাস। এটি ছিল তাদের সর্বোত্তম আমল।
(২) তারা আল্লাহ তা'আলার কালেমাকে সুউচ্চ আসনে আসীন করার জন্য আল্লাহর রাস্তায় সর্বোত্তম জিহাদ করেছেন। আর ইসলামের সর্বোচ্চ চূড়া হলো এই জিহাদ।
(৩) তারা আল্লাহর রাস্তায় হিজরত করেছেন। এটিও ইসলামের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমল।
(৪) তারা আল্লাহর দ্বীনের সাহায্য করেছেন। আল্লাহ তা'আলা তাদের ব্যাপারে বলেছেন:
وَيَنصُرُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُولَئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ
"আর প্রস্তুত থাকে আল্লাহ ও তার রসূলকে সাহায্য সহযোগিতা করার জন্য। এরাই হলো সত্যবাদী" (সূরা হাশর ৫৯:৮)।
(৫) তাদের রয়েছে উপকারী ইলম এবং সৎআমল।
(৬) তারা নাবীদের পরে আল্লাহ তা'আলার সর্বশ্রেষ্ঠ বান্দা। উম্মতে মুহাম্মাদী হলো সর্বোত্তম উম্মত। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ
"তোমরাই সর্বোত্তম জাতি, তোমাদেরকে পাঠানো হয়েছে মানুষের জন্য" (সূরা আল ইমরান ৩:১১০)।
আর সাহাবীগণ হলেন এই উম্মতের সর্বোত্তম মানুষ।
রসূল বলেন:
خَيْرُكُمْ قَرْنِي، ثُمَّ الَّذِينَ يَلُونَهُمْ তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম মানুষ হলেন আমার যুগের লোকগণ, অতঃপর পরবর্তীগণ। ৯৫
(৭) সাহাবীগণ হলেন শ্রেষ্ঠতম উম্মতের মধ্য হতে বাছাইকৃত এবং আল্লাহ তা'আলার নিকট সর্বাধিক সম্মানিত ব্যক্তি। যেমন ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল বর্ণনা করেন, নাবী বলেছেন:
أَنْتُمْ تُوَفَونَ سَبْعِينَ أُمَّةٍ أَنْتُمْ خَيْرُهَا وَأَكْرَمُهَا عَلَى اللَّه "তোমাদের দ্বারা বড় বড় উম্মতের সংখ্যা সত্তরে পরিণত হয়েছে। তোমরা তাদের মধ্যে সর্বোত্তম এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার নিকট সবচেয়ে সম্মানিত"। ৯৬ ইমাম তিরমিযী, ইবনে মাজাহ ও হাকিম তার মুস্তাদরকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।

টিকাঃ
৮৭. শিয়াদের একটি উপদলকে রাফেযী বলা হয়। তাদেরকে জা'ফারীয়া হিসাবেও নামকরণ করা হয়। বর্ণিত হয়েছে যে, শিয়াদের একটি দল যায়েদ বিন আলী বিন হুসাইন বিন আলীর কাছে এসে আবু বকর এবং উমারের প্রশংসা বর্জন করার আহবান জানালো। কিন্তু তিনি তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করার কারণে তারা বলল: إذا ترفضك অর্থাৎ তাহলে আমরাই আপনাকে বর্জন করলাম। এখান থেকেই তাদেরকে রাফেযী বলা হয়। এদের অন্যতম আকীদাহ হলো, তারা আহলে বাইত ছাড়া বাকী সাহাবীদেরকে ঘৃণা করে, গালি দেয় এবং তাদেরকে কাফের বলে।
৮৮. নাওয়াসেবরা রাফেযীদের বিপরীত। শব্দের অর্থ হলো শত্রুতা পোষণ করা। তারা যেহেতু আহলে বাইতের প্রতি শত্রুতা পোষণ করে, তাই তাদেরকে নাওয়াসেব বলা হয়।
৮৯. সহীহ বুখারী ৩৬৫০।
৯০ সহীহ বুখারী ৩৬৭৩, সহীহ মুসলিম ২৫৪০-৪১।
৯১. সহীহ বুখারী ৭৩৫২, সহীহ মুসলিম ১৭১৬।
৯২. সহীহ বুখারী ৩৬৭৩, সহীহ মুসলিম ২৫৪০-৪১।
৯৩. সহীহ বুখারী ২৬৫১-৫২, ৩৬৫০-৫১, সহীহ মুসলিম ২৫৩৩-৩৪।
৯৪. সহীহ বুখারী ৫৬৪১।
৯৫ সহীহ বুখারী ২৬৫১-৫২, ৩৬৫০-৫১, সহীহ মুসলিম ২৫৩৩-৩৪।
৯৬. হাসান: মুসনাদে আহমাদ ২০০১৫। ইমাম তিরমিযী ৩০০১, ইবনে মাজাহ ৪২৮৮ এবং হাকেম তাঁর কিতাব মুস্তাদরেকে (৬৯৮৭) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00