📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 সাহাবীদের প্রতি ভাল ধারণা রাখা এবং তাঁদের মর্যাদা বর্ণনা করা আবশ্যক।

📄 সাহাবীদের প্রতি ভাল ধারণা রাখা এবং তাঁদের মর্যাদা বর্ণনা করা আবশ্যক।


আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আক্বীদার মূলনীতি হলো, সাহাবীদের দোষ-ত্রুটি থেকে তারা তাদের অন্তর ও জবান পবিত্র রাখে।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আরো একটি মূলনীতি হলো, তারা রসূল এর সাহাবীদের প্রতি তাদের অন্তর ও জবান পবিত্র রাখে। অন্তর দিয়ে তাদেরকে ভালবাসে, তাদের প্রতি কোন প্রকার ঘৃণা রাখে না এবং জবান দিয়ে তাদের সমালোচনা ও কুৎসা রটনা করে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা তাঁর এ বাণীতে সাহাবীদের গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:
وَالَّذِينَ جَاءُوا مِن بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ
“এবং যারা এসব অগ্রবর্তী লোকদের পরে এসেছে, তারা বলে: হে আমাদের রব, আমাদেরকে এবং আমাদের সেই সব ভাইকে মাফ করে দাও, যারা আমাদের আগে ঈমান এনেছে। আর আমাদের মনে ঈমানদারদের জন্য কোন হিংসা-বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের রব, তুমি অত্যন্ত মেহেরবান ও দয়ালু" (সূরা হাশর ৫৯:১০)।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আরেকটি মূলনীতি হলো নাবী এর এই হাদীসের আনুগত্য করা। তিনি বলেন: لَا تَسُبُّوا أَحَدًا مِنْ أَصْحَابِي فَإِنْ أَحَدَكُمْ لَوْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا أَدْرَكَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلَا نَصِيفَهُ
"তোমরা আমার কোন সাহাবীকে গালি দিয়ো না। তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় সমপরিমাণ স্বর্ণও খরচ করে তাদের একজনের এক মুদ বা অর্ধ মুদ পরিমাণ দান করার সমানও ছাওয়াবও পাবে না”। ৭০
এই হাদীসের আনুগত্য করতে গিয়েই তারা তাদের অন্তর ও জবানকে সাহাবীদের জন্য পবিত্র রাখে।
ব্যাখ্যা: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকদের অন্যতম আক্বীদা হলো, তারা অন্তরকে সাহাবীদের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ এবং ঘৃণাবোধ পোষণ করা থেকে পবিত্র রাখে। তারা তাদের জবানকেও সাহাবীদেরকে দোষারোপ করা, লানত করা এবং গালি দেয়া থেকে মুক্ত রাখে। কেননা তাদের রয়েছে অনেক ফাযীলাত। তারা সবার আগে ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং নাবী ﷺ এর সাহাবী হয়ে ধন্য হয়েছেন। তাদের রয়েছে উম্মতের সমস্ত মুসলিমের উপর বিশেষ ফাযীলাত। কেননা তারাই নাবী থেকে সরাসরি ইসলামী শরীয়ত গ্রহণ করেছেন এবং তাদের পরবর্তীদের জন্য পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। তারা রাসূল ﷺ এর সাথে জেহাদ করেছেন এবং তারা তাকে সাহায্য করেছেন।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া ঐ সমস্ত রাফেযী এবং খারেজীদের প্রতিবাদ করার জন্যই এই অধ্যায় রচনা করেছেন, যারা সাহাবীদেরকে গali দেয়, তাদেরকে ঘৃণা করে এবং তাদের ফাযীলাতগুলোর স্বীকৃতি দেয়না। এই নিকৃষ্ট মাযহাবের সাথে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকদের সম্পর্কচ্ছেদ ঘোষণার বিষয়টিও শাইখুল ইসলাম অত্র অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তাদের নাবীর সাহাবীদের ব্যাপারে ঐরূপ ব্যবহারই করে, যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَالَّذِينَ جَاءُوا مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ
"যারা এসব অগ্রবর্তী লোকদের পরে এসেছে, তারা বলে, হে আমাদের রব! আমাদেরকে এবং আমাদের সেই সব ভাইকে মাফ করে দাও, যারা আমাদের আগে ঈমান এনেছে। আর আমাদের মনে ঈমানদারদের জন্য কোন হিংসা-বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের রব, তুমি অত্যন্ত মেহেরবান ও দয়ালু" (সূরা হাশর ৫৯:১০)।
অর্থাৎ যারা মুহাজির ও আনসারদের পরে আগমন করেছে। তারা উম্মতে ইসলামীয়ার ঐসব লোক, যারা কিয়ামত দিবস পর্যন্ত উত্তমভাবে সাহাবীদের অনুসরণ করবে। তারা কিয়ামত পর্যন্ত এই দু'আ করতে থাকবে যে, ﴾رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانَنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ “হে আমাদের রব, আমাদেরকে এবং আমাদের সেই সব ভাইকে মাফ করো, যারা আমাদের আগে ঈমান এনেছে। তারা নিজেদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং তাদের পূর্বে আগমনকারী মুহাজির ও আনসারদের জন্যও ক্ষমা প্রার্থনা করে। এখানে ভাই বলতে দ্বীনি ভাই উদ্দেশ্য এবং “غل” দ্বারা খেয়ানত, বিদ্বেষ, ঘৃণা এবং হিংসা উদ্দেশ্য। তারা আরো দু'আ করে যে, ﴾وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا﴿ “হে আমাদের রব! সেইসব মুমিনদের প্রতিও আমাদের অন্তরে কোন হিংসা ও ঘৃণাবোধ রেখো না, যারা আমাদের আগে ঈমান এনেছে"। সর্বপ্রথম সাহাবীগণই এই শ্রেণীর মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত হবে। কেননা তারাই সর্বোত্তম মুমিন এবং এখানে তাদের ব্যাপারেই আলোচনা চলছে।
ইমাম শাওকানী বলেন: যারা সকল সাহাবীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলো না এবং তাদের জন্য আল্লাহর রেজামন্দি কামনা করলো না তারা এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলার আদেশ অমান্য করলো। সেই সাথে যার অন্তরে সাহাবীদের প্রতি বিদ্বেষ পাওয়া যাবে, সে শয়তানের প্ররোচনার কবলে পড়েছে এবং সে আল্লাহর অলীদের ও আখেরী নাবীর উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ লোকদের সাথে দুশমনী করে আল্লাহ তা'আলার বিরাট নাফরমানীতে লিপ্ত হয়েছে। শুধু তাই নয়; বরং সে তার নিজের জন্য লাঞ্ছনার এমন দ্বার উন্মুক্ত করেছে, যা তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করে ছাড়বে। যদি না সে স্বীয় নফসকে সংশোধন করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার নিকট আশ্রয় গ্রহণ করে এবং তাঁর কাছেই ফরিয়াদ করে। আর সর্বোত্তম মানুষ এবং উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের প্রতি তার অন্তরের বিদ্বেষ টেনে বের না করে তা কোন ক্রমেই সম্ভব নয়। সাহাবীদের প্রতি কারো অন্তরের বিদ্বেষ যদি সীমা অতিক্রম করে তাদের কাউকে গালি দেয়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তাহলে সে শয়তানের রশিতে নিজেকে বেঁধে দিল এবং আল্লাহ তা'আলার ক্রোধ ও অসন্তুষ্টিতে পতিত হলো। এই কঠিন রোগে কেবল ঐ ব্যক্তিই আক্রান্ত হতে পারে, যে রাফেযীদের কোন উস্তাদ কিংবা উম্মতের সর্বোত্তম ব্যক্তিদের দুশমনের প্ররোচনার শিকার হয়েছে। তারাও এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে, যাদের সাথে শয়তান খেলতামাশায় লিপ্ত হয়েছে, তাদের জন্য হরেক রকম মিথ্যা রচনা করেছে, বানোয়াট কিচ্ছা তৈরী করেছে, নানা কুসংস্কার এবং অলীক কাহিনী রচনা করেছে। এগুলোর মাধ্যমে শয়তান তাদেরকে আল্লাহর ঐ কিতাব থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, যার সামনের দিক থেকে কিংবা পিছন দিক থেকে বাতিল আসতেই পারে না।
উপরোক্ত আয়াতে কারীমায় সাহাবীদের ফাযীলাত বর্ণিত হয়েছে। কেননা তারা ঈমান আনয়নে অগ্রণী ছিলেন। আয়াতে কারীমায় ঐসব আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের ফাযীলাতও বর্ণিত হয়েছে, যারা সাহাবীদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করে। যারা সাহাবীদের সাথে শত্রুতা পোষণ করে, তাদের নিন্দাও করা হয়েছে এখানে। আয়াতে কারীমায় সাহাবীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং তাদের জন্য আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি কামনা করাও শরীয়তের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাতে রাসূল এর সাহাবীদের প্রতি আহলে সুন্নাতের লোকদের অন্তর ও জবানসমূহ পবিত্র থাকার কথাও জানা যায়। তাদের কথা:
رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ
"হে আমাদের রব! আমাদেরকে এবং আমাদের সেই সব ভাইকে মাফ করে দাও, যারা আমাদের আগে ঈমান এনেছে। আর আমাদের মনে ঈমানদারদের জন্য কোন হিংসা-বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের রব, তুমি অত্যন্ত মেহেরবান ও দয়ালু" (সূরা হাশর ৫৯:১০)।
-এই কথার মধ্যে তাদের জবানের পরিশুদ্ধিতা পাওয়া যায়। তাদের কথা: ﴾وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا﴿ “হে আমাদের রব! সেইসব মুমিনদের প্রতিও আমাদের অন্তরে কোন হিংসা ও ঘৃণাবোধ রেখো না, যারা আমাদের আগে ঈমান এনেছে", -এই কথার মধ্যে তাদের অন্তরের পরিশুদ্ধিতার এবং পবিত্রতারও প্রমাণ পাওয়া যায়।
উপরোক্ত আয়াতে আরো দলীল পাওয়া যায় যে, সাহাবীদেরকে গালি দেয়া এবং তাদেরকে ঘৃণা করা হারাম। তাদেরকে গালি দেয়া কিংবা ঘৃণা করা মুসলিমদের কাজ হতে পারে না। যারা এটি করবে, তারা 'ফাই''এর সম্পদ থেকে কিছুই পাবে না।
وَطَاعَةُ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي قَوْلِهِ আনুগত্য করাও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আরেকটি মূলনীতি, তা করতে গিয়েই তারা তাদের অন্তর ও জবানকে সাহাবীদের জন্য পবিত্র রাখে:
অর্থাৎ আহলে সুন্নাতের লোকেরা সাহাবীদের প্রতি জবান এবং অন্তর পরিশুদ্ধ রেখে এবং তাদেরকে গালি দেয়া ও তাদের মর্যাদায় আঘাত করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে নাবী ﷺ এর আনুগত্য করে থাকেন। কেননা তিনি তাঁর সাহাবীদেরকে গালি দিতে নিষেধ করেছেন।
তিনি বলেছেন, لَا تَسْبُوا أَصْحَابِي "তোমরা আমার সাহাবীদেরকে গালি দিয়ো না"। أصحاب শব্দটি صاحب -এর বহুবচন। যেই মুসলিম নাবী ﷺ এর সাহচর্য লাভ করেছে, সেই সাহাবী। সুতরাং সাহাবী বলা হয়, ঐ মুসলিমকে, যে মুমিন অবস্থায় নাবীকে দেখেছে এবং ঈমানের উপর মৃত্যু বরণ করেছে।
فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ ঐ আল্লাহর শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে। তিনি এই কসমের দ্বারা পরের কথাটিকে শক্তিশালী করতে চেয়েছেন। রসূল ﷺ বলেন,
لَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا بَلَغَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلَا نَصِيفَهُ "তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় সমপরিমাণ স্বর্ণও খরচ করে, তাদের একজনের এক মুদ বা অর্ধ মুদ পরিমাণ দান করার সমান ছাওয়াবও পাবে না”। উহুদ মদীনার একটি সুপ্রসিদ্ধ পাহাড়ের নাম। অন্যান্য পাহাড় থেকে আলাদা থাকায় এটিকে উহুদ পাহাড় বলা হয়। ذهبا শব্দটি তামীয হিসাবে মানসুব হয়েছে। নাবী ﷺ এর 'সা'এর এক চতুর্থাংশকে মুদ বলা হয়। মুদ একটি পরিমাপ যন্ত্রের নাম। نصف কে نصيف ও বলা হয়। যেমন ثمين শব্দটি ঐ অর্থে ব্যবহৃত হয়। نصف ও نصیف উভয়ের অর্থই অর্ধেক। এমনি ثمين এবং ثمن উভয়েরই অর্থ মূল্যবান ও মূল্য।
হাদীসের সংক্ষিপ্ত অর্থ হলো, আল্লাহর রাস্তায় সাহাবী ছাড়া অন্যদের প্রচুর দান সাহাবীদের সামান্য দানের সমপরিমাণ হতে পারেনা। এর কারণ হলো ইসলামের প্রথম যুগে যখন মুসলিমদের সংখ্যা অল্প ছিল, ইসলামের সামনে প্রতিবন্ধক ছিল প্রচুর এবং দাওয়াত ছিল দুর্বল তখন সাহাবীদের অন্তরের ঈমান যত বড় ছিল, পরবর্তীতে আগমনকারী কারো পক্ষে তত বড় ঈমান অর্জন করা সম্ভব হবেনা।
মোটকথা হাদীস থেকে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে, তাতে সাহাবীদেরকে গালি দেয়া হারাম করা হয়েছে এবং অন্যদের উপরে তাদের ফাযীলাত বর্ণনা করা হয়েছে। হাদীস থেকে আরো প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে, আমলকারীর নিয়ত এবং যেই সময়ে আমলটি করা হয়েছে, সেই অনুপাতে আমলের ফাযীলাত কমবেশী হয়। (আল্লাহই অধিক অবগত আছেন)
এই হাদীস থেকে আরো প্রমাণ পাওয়া গেল, যে ব্যক্তি সাহাবীদেরকে ভালবাসলো এবং তাদের গুণাবলী বর্ণনা করলো, সে রসূল ﷺ এর আনুগত্য করলো। আর যে ব্যক্তি তাদেরকে গালি দিলো এবং ঘৃণা করলো, সে রসূল ﷺ এর বিরুদ্ধাচরণ করলো।

টিকাঃ
৭০. সহীহ বুখারী ৩৬৭৩, সহীহ মুসলিম ২৫৪১।
৭১. বিনা যুদ্ধে মুসলিমগণ কাফেরদের থেকে যে সম্পদ হাসিল করে, তাকে ফাই বলা হয়।

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 সাহাবীদের ফাযীলাত সম্পর্কে আহ্‌লুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের অবস্থান এবং তাদের ফাযীলতের তারতম্য

📄 সাহাবীদের ফাযীলাত সম্পর্কে আহ্‌লুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের অবস্থান এবং তাদের ফাযীলতের তারতম্য


সাহাবীদের ফাযীলাতে আল্লাহ তা'আলার কিতাব ও রসূলের সুন্নাতে এবং মুসলিমদের ঐকমত্যে সাহাবীদের যেসব ফাযীলাত এবং মর্যাদা বর্ণিত হয়েছে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তা কবুল করে নেন।
যারা বিজয় তথা হুদায়বিয়ার সন্ধির পূর্বে খরচ করেছেন এবং আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করেছেন তাদেরকে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা ঐসব লোকের উপর প্রাধান্য দেন, যারা উক্ত ঘটনার পরে খরচ করেছে এবং লড়াই করেছে। তারা মর্যাদার ক্ষেত্রে মুহাজিরদেরকে আনসারদের উপর প্রাধান্য দেন। তারা আরো বিশ্বাস করে, আল্লাহ তা'আলা বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ৩১৩ জন সাহাবীর ব্যাপারে বলেছেন: اعْمَلُوا مَا شِئْتُم، فَقَدْ غَفَرْتُ لَكُمْ “তোমরা যা ইচ্ছা করতে থাকো। আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছি"। ৭২
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা নাবী ﷺ এর সংবাদ অনুসারে আরো বিশ্বাস করে, যারা হুদায়বিয়ার দিন বৃক্ষের নীচে বাইআত করেছে, তাদের কেউ জাহান্নামে প্রবেশ করবে না।৭৩ শুধু তাই নয়; বরং আল্লাহ তা'আলা তাদের উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর উপর সন্তুষ্ট হয়েছে। তাদের সংখ্যা ছিল ১৪০০ জন। ৭৪
নাবী ﷺ যাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন তারা তাদেরকে জান্নাতবাসী বলে। যেমন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন সাহাবী, ছাবিত বিন কাইস বিন শাম্মাস এবং আরো যাদেরকে নাবী ﷺ জান্নাতী বলেছেন, তাদেরকেও তারা জান্নাতী বলে। ৭৫
আমীরুল মুমিনীন আলী বিন আবু তালেব এবং অন্যান্য সাহাবী থেকে মুতাওয়াতির সূত্রে মর্মে বর্ণিত হাদীসকে স্বীকৃতি দেয়। নাবী ﷺ তাতে বলেছেন, নাবীর পরে এই উম্মতের সর্বোত্তম ব্যক্তি হচ্ছে আবু বকর এ, অতঃপর উমার ইবনুল খাত্তাব। আবু বকর ও উমারের পরে তারা উছমান বিন আফফান কে তৃতীয় খলীফা এবং আলী কে চতুর্থ খলীফা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়। ৭৬ এ বিষয়ে একাধিক সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে এবং হুদায়বিয়ার দিন বাইআতের ক্ষেত্রে উছমান কে আলী এর উপর প্রাধান্য দেয়ার উপর সাহাবীদের ইজমা সংঘটিত হয়েছে। যদিও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের কতিপয় আলিম উছমান ও আলী এর মধ্যে কে অধিক উত্তম, এ ব্যাপারে মতভেদ করেছেন। তবে তাদের দুইজনের চেয়ে আবু বকর ও উমার উত্তম ছিলেন। এ বিষয়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের সকল আলেমের ইজমা সংঘটিত হয়েছে।
একদল আলেম উছমানকে প্রাধান্য দিয়ে নিরবতা পালন করেছে এবং আলী চতুর্থ খলীফা গণ্য করেছে।
আরেক দল আলিম আলী কে অগ্রাধিকার দিয়েছে। আরেক দল নিরেপক্ষতা অবলম্বন করেছে। কিন্তু আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকদের অধিকাংশের মতে উছমান কে আলী এর উপর প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।
ব্যাখ্যা: প্রথমে সকল সাহাবীর ফাযীলাত একসাথে বর্ণনা করার পর শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া এ অধ্যায়ে সাহাবীদের ফাযীলাতের তারতম্য বর্ণনা করেছেন এবং সে ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন।
তিনি বলেন: কুরআন, হাদীস এবং মুসলিমদের ইজমাতে সাহাবীদের যেসব ফাযীলাত এবং মর্যাদার স্তরভেদ এসেছে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তা মেনে নেয়। সাহাবীদের ফাযীলাত সাব্যস্ত করার জন্য উপরোক্ত তিনটি উৎসের দলীলই যথেষ্ট।
সকল সাহাবীই মর্যাদা ও ফাযীলাতের ক্ষেত্রে সমান নয়। বরং ইসলাম কবুল অগ্রণী হওয়া, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা, হিজরত করা এবং তাদের নাবী ও দ্বীনের হিফাযতের জন্য তারা যা করেছেন, সেই অনুপাতে তাদের ফাযীলাতের তারতম্য রয়েছে।
এ জন্যই শাইখুল ইসলাম বলেছেন: যারা বিজয় তথা হুদায়বিয়ার সন্ধির পূর্বে খরচ করেছে এবং আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করেছে তাদেরকে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা ঐসব লোকের উপর প্রাধান্য দেয়, যারা উক্ত ঘটনার পরে খরচ করেছে এবং লড়াই করেছে। কেননা আল্লাহ তা'আলা হুদায়বিয়ার ঘটনাকে মহান বিজয় বলে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ তা'আলা সূরা ফাতাহর ১নং আয়াতে বলেন:
إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِينًا
"হে নাবী, আমি তোমাকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি"।
প্রসিদ্ধ মতে এখানে সুস্পষ্ট বিজয় বলতে হুদায়বিয়ার সন্ধি উদ্দেশ্য। কেননা হুদায়বিয়ার সন্ধির পরপরই সূরা ফাতাহ নাযিল হয়েছে।
হুদায়বিয়া মক্কার নিকটস্থ একটি কূপের নাম। এই কূপের কাছে একটি বৃক্ষ ছিল। মক্কার মুশরেকরা যখন রাসূল ﷺ ও তাঁর সাহাবীদেরকে মক্কায় প্রবেশ করতে বাঁধা দিল, তখন এই বৃক্ষের ছায়াতলেই বায়আতুর্ রিযওয়ান সংঘটিত হয়।
তারা মৃত্যু পর্যন্ত যুদ্ধ করার উপর বাইআত গ্রহণ করে। এই বাইআতকে সুস্পষ্ট বিজয় বলার কারণ হলো এই বাইআতের কারণেই মুসলিমদের জন্য প্রচুর কল্যাণ বিজয় অর্জিত হয়েছে। এ বাইআতে যারা শরীক ছিল, অন্যদের উপর তাদের ফাযীলাতের দলীল হলো যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
لَا يَسْتَوِي مِنْكُمْ مَنْ أَنْفَقَ مِنْ قَبْلِ الْفَتْحِ وَقَاتَلَ أُوْلَئِكَ أَعْظَمُ دَرَجَةً مِنْ الَّذِينَ أَنْفَقُوا مِنْ بَعْدُ وَقَاتَلُوا )
"তোমাদের মধ্যে যে মক্কা বিজয়ের পূর্বে ব্যয় করেছে ও জেহাদ করেছে, সে সমান নয়। এরূপ লোকদের মর্যাদা বড় তাদের অপেক্ষা, যারা পরে ব্যয় করেছে ও জেহাদ করেছে” (সূরা হাদীদ ৫৭:১০)।
এ মুসলিমগণই হলো সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী মুহাজির ও আনসার। তাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنْ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ﴾
"যারা সর্বপ্রথম হিজরতকারী ও আনসারদের মাঝে অগ্রণী এবং যারা উত্তমভাবে তাদের অনুসরণ করেছে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারা তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে” (সূরা তাওবা ৯:১০০)।
শাইখুল ইসলাম বলেন: وَيُقَدِّمُونَ الْمُهَاجِرِينَ عَلَى الأَنْصَارِ তারা আনসারদের উপর মুহাজিরদেরকে প্রাধান্য দেয়:
অর্থাৎ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা আনসারদের উপর মুহাজিরদের ফাযীলাত সাব্যস্ত করে। المهاجرون শব্দটি المهاجر এর বহুবচন। এখানে মুহাজির বলতে ঐসব মুসলিম উদ্দেশ্য, যারা মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেছিল।
হিজরত শব্দের আভিধানিক অর্থ পরিত্যাগ করা। আর ইসলামী শরীয়াতের পরিভাষায় কুফরীর দেশ ছেড়ে ইসলামের দেশে চলে যাওয়াকে হিজরত বলা হয়।
আর আনসার বলতে মদীনার ঐসব মুসলিম বুঝায়, যারা রসূল ﷺ কে সাহায্য করেছিল। তারা ছিল আওস ও খাযরাজ গোত্রের লোক। নাবী ﷺ তাদেরকে এ নামে নামকরণ করেছেন।
ফাযীলাতের ক্ষেত্রে আনসারদের উপর মুহাজিরদের প্রাধান্যের দলীল হলো আল্লাহ তা'আলা কুরআনে আনসারদের পূর্বে মুহাজিরদেরকে উল্লেখ করেছেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন: ﴿وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنْ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنصَارِ﴾
"যারা সর্বপ্রথম হিজরতকারী ও আনসারদের মাঝে অগ্রণী" (সূরা তাওবা: ১০০)। আল্লাহ তা'আলা সূরা তাওবার ১১৭ নং আয়াতে আরো বলেন: لَقَد تَابَ اللَّهُ عَلَى النَّبِيِّ وَالْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنصَارِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ فِي سَاعَةِ الْعُسْرَةِ *
"আল্লাহ নাবীকে মাফ করে দিয়েছেন এবং অত্যন্ত কঠিন সময়ে যেসব মুহাজির ও আনসারগণ নাবীর আনুগত্য করেছে তাদেরকেও মাফ করে দিয়েছেন।"। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: لِلْفُقَرَاءِ الْمُهَاجِرِينَ الَّذِينَ أُخْرِجُوا مِنْ دِيارِهِمْ وَأَمْوَالِهِمْ يَبْتَغُونَ فَضْلًا مِنْ اللَّهِ وَرِضْوَانًا وَيَنْصُرُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُوْلَئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ وَالَّذِينَ تَبَوَّءُوا الدَّارَ وَالْإِيمَانَ مِنْ قَبْلِهِمْ يُحِبُّونَ مَنْ هَاجَرَ إِلَيْهِمْ وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ وَمَنْ يُوقَ شُحَّ نَفْسِهِ فَأُوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
"এ ধন-সম্পদ ঐসব ফকীর মুহাজিরদের জন্য, যাদেরকে তাদের বসত- ভিটা থেকে বহিস্কার করা হয়েছিল। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি লাভের আশা করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে সাহায্য করে। তারাই সত্যবাদী। আর যারা মুহাজিরদের আগমণের পূর্বে মদীনায় বসবাস করেছিল এবং বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, তারা মুহাজিরদেরকে ভালবাসে, মুহাজিরদেরকে যা দেয়া হয়েছে, তজ্জন্যে তারা অন্তরে ঈর্ষাপোষণ করে না এবং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়। যারা অন্তরের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম"। (সূরা হাশর: ৮-৯)
উপরের আয়াতগুলো একদিকে যেমন মুহাজির ও আনসারদের ফাযীলাত সাব্যস্ত করে, অন্যদিকে আনসারদের উপর মুহাজিরদের প্রাধান্য সাব্যস্ত করে। কেননা আল্লাহ তা'আলা আনসারদের আগে মুহাজিরদের কথা উল্লেখ করেছেন। আনসারদের উপর মুহাজিরদের প্রাধান্যের আরো কারণ হলো, তারা বিনিময়ের আশায় এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে সাহায্য করার জন্য নিজেদের দেশ ছেড়েছে, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির মায়া ত্যাগ করেছে। এসব কাজে তারা ছিলো সত্যনিষ্ঠ। আল্লাহ তা'আলা তাদের উপর সন্তুষ্ট থাকুন। আমীন
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা আরো বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তা'আলা বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ৩১৩ জন সাহাবীর ব্যাপারে বলেছেন: ﴾ اعْمَلُوا مَا شِئْتُم فَقَدْ غَفَرْتُ لَكُمْ “তোমরা যা ইচ্ছা করতে থাকো। আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছি":
যেমন সহীহ বুখারী ও মুসলিমে হাতেব বিন আবু বালতাআর ঘটনায় বিস্তারিত বিবরণ এসেছে।
মদীনা থেকে চার মারহালা (ষ্টেশন) দূরে অবস্থিত একটি গ্রামের নাম বদর। এই গ্রামের নিকট এমন একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়, যাতে আল্লাহ তা'আলা ইসলামকে সম্মানিত করেছেন। বদরের এই ঐতিহাসিক দিনকে ইয়াওমুল ফুরকান তথা সত্য-মিথ্যার মাঝে পার্থক্য করার দিন হিসাবেও নামকরণ করা হয়েছে।
তাদের সংখ্যা ছিল ৩১৩ জন। সহীহ বুখারীতে তাদের সংখ্যা এটিই বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদেরকে লক্ষ্য করে বলেছেন: তোমরা যা ইচ্ছা করতে থাকো। আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছি।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম তার 'ফাওয়ায়েদ' নামক কিতাবে বলেন: অনেক লোকের পক্ষে এই হাদীসের অর্থ বুঝা কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতঃপর তিনি এ বিষয়ে আলেমদের বক্তব্যগুলো উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন: এ বিষয়ে আমাদের ধারণা হলো, বাস্তবে আল্লাহই অধিক অবগত রয়েছেন-, এখানে আল্লাহ তা'আলা এমন একটি সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে কথাটি বলেছেন, যাদের ব্যাপারে তিনি অবগত রয়েছেন যে, তারা কখনো দ্বীন ছাড়বে না; বরং তারা ইসলামের উপর মরবে। কিন্তু অন্যরা যেমন গুনাহয় লিপ্ত হয়, তারাও কখনো সেরকম গুনাহয় লিপ্ত হতে পারে। তবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা তাদেরকে গুনাহর উপর অবিচল রাখবেন না; বরং তিনি তাদেরকে তাওবায়ে নাসুহা (খাঁটি তাওবা) এবং ক্ষমা প্রার্থনা করার তাওফীক দিবেন। সেই সাথে তিনি তাদেরকে এমন সৎ আমল করার তাওফীক দিবেন, যা তাদের গুনাহর চিহ্নগুলোকে সম্পূর্ণরূপে মিটিয়ে দিবে।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম আরো বলেন: অন্যদেরকে বাদ দিয়ে তাদের ব্যাপারে খাস করে এই কথা বলার কারণ হলো, তাদের দ্বারা গুনাহ হতে পারে। তবে তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া হবে। তারা এমন করবে, যদ্বারা তাদের ক্ষমা পাওয়া অসম্ভব নয়। এতে এটিও আবশ্যক হয় না যে, তারা মাগফিরাতের ওয়াদার উপর নির্ভর করে ফরয ইবাদাত বর্জন করবে। শরীয়াতের আদেশ পালন করা অব্যাহত রাখা ছাড়াই যদি মাগফিরাতের ওয়াদা অর্জিত হতো, তাহলে তারা মাগফিরাতের এই ওয়াদা পাওয়ার পর সলাত, হজ্জ, যাকাত, জিহাদ ইত্যাদি কিছুই করতেন না। সুতরাং ইবাদাত বর্জন করে ওয়াদার উপর নির্ভর করার ধারণা হতেই পারেনা। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিমের কথা এখানেই শেষ।
শাইখুল ইসলাম আরো বলেন: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা নাবী এর সংবাদ অনুসারে আরো বিশ্বাস করে, যারা হুদায়বিয়ার দিন বৃক্ষের নীচে বাইআত করেছে, তাদের কেউ জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। শুধু তাই নয়; বরং আল্লাহ তা'আলা তাদের উপর সন্তুষ্ট হয়ে গেছেন এবং তারাও আল্লাহর উপর সন্তুষ্ট হয়েছে। তাদের সংখ্যা ছিল ১৪০০ জন।
বাই'আতুর রিযওয়ানে অংশ গ্রহণকারীদের ব্যাপারে এই ওয়াদা করা হয়েছে। মুশরিকরা যখন নাবী কে মক্কায় প্রবেশ করতে বাধা দিয়েছিল, তখন হুদায়বিয়া নামক স্থানে এ বাই'আতটি সংঘটিত হয়েছিল। পূর্বে তা বর্ণনা করা হয়েছে। এ বাইআতে অংশগ্রহণকারী সাহাবীদের ব্যাপারে নাবী দু'টি বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন।
প্রথম বৈশিষ্ট্য: যারা হুদায়বিয়ার বৃক্ষের নীচে বাই'আত করেছে, তাদের কেউ জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। সহীহ সনদে জাবের হতে বর্ণিত হাদীসে এর দলীল রয়েছে। নাবী বলেন:
لَا يَدْخُلُ النَّارَ أَحَدٌ مِمَّنْ بَايَعَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ "হুদায়বিয়ার দিন বৃক্ষের নীচে যারা বাইআত করেছে তাদের কেউ জাহান্নামে প্রবেশ করবেনা"। ৭৭
দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য: আল্লাহ তা'আলা তাদের উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন। কুরআনে সুস্পষ্ট করেই এ কথা বলা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ "আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন যখন তারা বৃক্ষের নীচে তোমার কাছে বাইআত করছিলো" (সূরা ফাতাহ ৪৮:১৮)।
তাদের সংখ্যা ছিল ১৪০০ জন। বিশুদ্ধ বর্ণনার ভিত্তিতে এটিই ছিল তাদের সংখ্যা। আল্লাহ তা'আলাই অধিক অবগত আছেন।
নাবী ﷺ যাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন তারা তাদেরকে জান্নাতী বলে। যেমন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন সাহাবী, ছাবেত বিন কাইস বিন শাম্মাস এবং আরো অন্যান্য সাহাবী:
অর্থাৎ রসূল ﷺ যাকে জান্নাতী বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরাও তাকে জান্নাতী বলে সাক্ষ্য দেয়। আর তিনি যাকে জান্নাতের অধিবাসী বলে সাক্ষ্য দেননি, তারা তার জন্য জান্নাতের সাক্ষ্য প্রদান করে না। কেননা তাকে জান্নাতী বলে সাক্ষ্য দেয়া আল্লাহ তা'আলার উপর মিথ্যা রচনা করার শামিল। তবে তারা সৎ লোকদের জন্য মঙ্গল কামনা করে এবং অসৎ লোকদের উপর আযাবের আশঙ্কা করে। এটিই আক্বীদার অন্যতম একটি মূলনীতি।
জান্নাতের সুখবর প্রাপ্ত দশজন সাহাবীর নাম: তারা হলেন (১) আবু বকর ছিদ্দিক (২) উমার ইবনুল খাত্তাব (৩) উসমান বিন আফফান (৪) আলী বিন আবু তালিব (৫) আব্দুর রাহমান বিন আউফ (৬) যুবাইর ইবনুল আওয়াম (৭) সা'দ বিন আবু ওয়াক্কাস (৮) সাঈদ বিন যায়েদ (৯) আবু উবায়দাহ বিন যাররাহ এবং (১০) তালহা বিন উবাইদুল্লাহ। ৭৮
এ সমস্ত সাহাবীদের জন্য জান্নাতের ঘোষণা একাধিক সহীহ হাদীস দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে। ছাবিত ইবনে কাইসকেও নাবী জান্নাতী বলেছেন। সুস্পষ্টভাষী হওয়ার কারণে তাঁকে নাবী এর বক্তা বলে ডাকা হতো। তাঁর জন্য জান্নাতের সুসংবাদ সহীহ বুখারীর হাদীস দ্বারা সুসাব্যস্ত। ৭৯
উপরে যাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তাদেরকে ছাড়াও আরো কতিপয় সাহাবীকে নাবী জান্নাতী বলেছেন। যেমন উল্কাশা বিন মিহসান, আব্দুল্লাহ বিন সালাম এবং আরো অনেকেই।
তারা আমীরুল মুমিনীন আলী বিন আবু তালেব এবং অন্যান্য সাহাবী থেকে মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত হাদীসকে স্বীকৃতি দেয়। সেখানে বলা হয়েছে, নাবী এর পরে এই উম্মতের সর্বোত্তম ব্যক্তি হচ্ছে আবু বকর, অতঃপর উমার ইবনুল খাত্তাব:
অর্থাৎ নাবী এর পরে এ উম্মতের সর্বোত্তম ব্যক্তি আবু বকর অতঃপর উমার ইবনুল খাত্তাব হওয়ার ব্যাপারে মুতাওয়াতির সনদে আলী এবং অন্যান্য সাহাবী থেকে যেসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তা বিশ্বাস করে। কেননা মুতাওয়াতির সনদ সর্বাধিক শক্তিশালী। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা উছমান বিন আফফান কে খেলাফতের ধারাবাহিকতায় তৃতীয় খলীফা হিসাবে গণ্য করে এবং আলী কে গণ্য করে চতুর্থ স্থানে। আল্লাহ তা'আলা তাদের সকলের উপর সন্তুষ্ট থাকুন। আমীন।
আলী হতে মুতাওয়াতির সূত্রে বর্ণিত উপরোক্ত হাদীসে ঐসব রাফেযীদের প্রতিবাদ করা হয়েছে, যারা তাঁকে আবু বকর ও উমার এর চেয়ে উত্তম মনে করে এবং খিলাফতের স্তর পরিক্রমায় তাঁকে আবুবকর এবং উমার এর উপর প্রাধান্য দেয়। অতঃপর তারা তাদের খিলাফতের সমালোচনা করে। মূলতঃ এই আলোচনায় দু'টি মাসআলা রয়েছে।
প্রথম মাস'আলাটি হচ্ছে খিলাফত সম্পর্কে। আর দ্বিতীয় মাস'আলাটি হচ্ছে সাহাবীদের মর্যাদার তারতম্য সম্পর্কে।
খিলাফতের ব্যাপারে কথা হলো আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের ইজমা অনুসারে রসূল ﷺ এর পর আবু বকর হচ্ছেন সর্বপ্রথম খলীফা, অতঃপর উমার, অতঃপর উছমান, অতঃপর আলী। খলীফাদের এ স্তর পরিক্রমায় ঐকমত্য পোষণকারীদের মধ্যে সাহাবীগণও শামিল ছিলেন।
আর সাহাবীদের ফাযীলাতের তারতম্যের ব্যাপারে কথা হচ্ছে, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের ইজমা অনুসারে নাবী ﷺ এর পরে আবু বকর, অতঃপর উমার এ উম্মতের সর্বোত্তম ব্যক্তি। যেমন আলী হতে বর্ণিত মুতাওয়াতির হাদীসে এই কথা বর্ণিত হয়েছে।
উছমান ও আলী এর ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা মতভেদ করেছে। তাদের দুইজনের মধ্যে কে অধিক উত্তম? শাইখুল ইসলাম এখানে তিনটি মত উল্লেখ করেছেন।
(১) একদল আলেম উছমানকে প্রাধান্য দিয়ে নিরবতা পালন করেছে এবং আলী কে চতুর্থ খলীফা গণ্য করেছে।
(২) আরেক দল আলিম আলী কে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
(৩) আরেকদল নিরেপক্ষতা অবলম্বন করেছেন। এ হচ্ছে মতভেদের সারকথা। মর্যাদার ক্ষেত্রে উছমানকে আলীর উপর প্রাধান্য দেয়া, আলীকে উছমানের উপর প্রাধান্য দেয়া এবং তাদের দুইজনের একজনকে অন্যজনের উপর প্রাধান্য দেয়া থেকে বিরত থাকা।
তবে শাইখুল ইসলাম প্রথম মতকে প্রাধান্য দেয়ার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তা হলো একাধিক কারণে উছমানকে আলী এর উপর প্রাধান্য দেয়া।
(১) উছমান এর ফাযীলাত বর্ণনার হাদীসগুলো এ মতকেই সমর্থন করে।
(২) বাইআতুর রিযওয়ানের সময় উছমানের বাইআত আগে নেয়ার মাধ্যমে বুঝা যায় যে, উছমান আলীর চেয়ে উত্তম ছিলেন। সুতরাং ফাযীলাতের মধ্যে তাদের ধারাবাহিকতা খিলাফতের মধ্যে তাদের স্তরপরিক্রমা ও ধারাবাহিকতার মতই।
(৩) উছমানকে আলীর উপর প্রাধান্য দেয়াই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকদের মত হিসাবে স্থির হয়েছে। যেমন আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি যে, সাহাবীগণ উছমানকে বাইআতের ক্ষেত্রে প্রাধন্য দিয়েছেন।
আব্দুর রাহমান বিন আওফ একদা আলী কে উদ্দেশ্য করে বললেন: আমি লোকদের প্রতি খুব গভীরভাবে দৃষ্টি দিলাম। দেখলাম তারা আলীকে উছমানের উর্দ্ধে স্থান দেয়নি।
আবু আইয়্যুব বলেন: যে ব্যক্তি উছমানকে আলী এর উপর প্রাধান্য দিল না, সে মুহাজির এবং আনসারদেরকে অবজ্ঞা করলো। সুতরাং এটি প্রমাণ করে যে, উছমান আলী থেকে উত্তম। কেননা তারা পরস্পর পরামর্শ করে তাঁকে আলী এর উপর প্রাধান্য দিয়েছে। যারা উছমান এর কাছে বাইআত করেছে, তাদের মধ্যে আলীও শামিল ছিলেন। উছমান এর হুকুমে এবং তাঁর সামনেই আলী শরীয়তের হদ তথা দন্ডবিধি কায়েম করতেন।

টিকাঃ
৭২. সহীহ বুখারী ৩০০৭, সহীহ মুসলিম ২৪৯৪, তিরমিযী ৩৩০৫, আবু দাউদ ৪৬৫৪, দারিমী ২৮০৩।
৭৩. সহীহ: তিরমিযী ৩৮৬০, সহীহ মুসলিম ২৪৯৬।
৭৪. সহীহ বুখারী ৪১৫৪।
৭৫. সহীহ: ইবনে মাজাহ ১৩৩-১৩৪, আবু দাউদ ৪৬৪৮, তিরমিযী ৩৬৯৬।
৭৬. সহীহ: সহীহ বুখারী ৩৬৫৫।
৭৭. সহীহ: তিরমিযী ৩৮৬০, আবু দাউদ ৪৬৫৩, মুসনাদে আহমাদ ১৪৭৭৮।
৭৮. সহীহ: ইবনে মাজাহ ১৩৩-১৩৪, আবু দাউদ ৪৬৪৮, তিরমিযী ৩৬৯৬।
৭৯. সহীহ বুখারী ৩৬১৩, সহীহ মুসলিম ১১৯।

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 খিলাফতের ক্ষেত্রে আলী ও অন্য চার খলীফার উপর প্রাধান্য দেয়ার হুকুম।

📄 খিলাফতের ক্ষেত্রে আলী ও অন্য চার খলীফার উপর প্রাধান্য দেয়ার হুকুম।


উছমান ও আলীর মধ্যে কে অধিক উত্তম, যদিও এই মাস'আলাটি দ্বীনের ঐসব মূলনীতির অন্তর্ভুক্ত নয়, যাতে কেউ বিপরীত মত পোষণ করলে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অধিকাংশ লোকের মতানুসারে তাকে গোমরাহ বলা যাবে। কিন্তু খিলাফতের মাসা'আলায় যে কেউ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মাযহাবের বিপরীত মত পোষণ করবে, তাকে গোমরাহ বলা হবে। কেননা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা বিশ্বাস করে যে, রসূল ﷺ এর পরে খলীফা হলেন আবু বকর, অতঃপর উমার, অতঃপর উছমান, অতঃপর আলী ⚔️। সুতরাং যে ব্যক্তি এই সমস্ত খলীফার কারো খেলাফতের বিরোধিতা করবে, সে তার গৃহে পালিত গাধার চেয়েও বোকা বলে বিবেচিত হবে।
ব্যাখ্যা: শাইখুল ইসলাম এখানে দু'টি মাসআলার মধ্যে তুলনা করেছেন। একটি হলো সম্মান ও ফাযীলাতের ক্ষেত্রে আলীকে উছমানের উপর প্রাধান্য দেয়ার মাস'আলা এবং আরেকটি হলো খিলাফতের মাস'আলায় আলীকে অন্য খলীফাদের উপর প্রাধান্য দেয়া। যার ফলে বড় ধরণের কোন ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। সুতরাং শাইখ বর্ণনা করেছেন যে, ফাযীলাতের ক্ষেত্রে আলীকে উছমানের উপর প্রাধান্য দিলে গোমরাহ বলা হবে না। অর্থাৎ যে ব্যক্তি আলীকে উছমানের চেয়ে উত্তম বলল, তাকে গোমরাহ বলে হুকুম লাগানো যাবে না। কেননা আহলে সুন্নাতের লোকদের মধ্যে এ মাস'আলায় মতভেদ রয়েছে। যদিও প্রাধান্যযোগ্য মতে আলীর উপর উছমান এর উপর ফাযীলাত সাব্যস্ত। কিন্তু খিলাফতের মাস'আলায় গোমরাহ বলা হবে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি খিলাফতের মাস'আলায় আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মাযহাবের খেলাফ করবে এবং আলীকে উছমান বা তাঁর আগের কোন খলীফার উপর প্রাধান্য দিবে কিংবা তাঁকে ফাযীলাতের ক্ষেত্রে আবু বকর ও উমার এর উপর প্রাধান্য দিবে তার উপর গোমরাহীর হুকুম লাগানো হবে।
সুতরাং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা বিশ্বাস করে, রসূল ﷺ এর পরে আবু বকর সিদ্দীক হলেন প্রথম খলীফা। কেননা তাঁর রয়েছে অনেক ফাযীলাত এবং সৎকর্মে অগ্রগামিতা। নাবী তাঁকে সমস্ত সাহাবীর উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁর খেলাফতের বাইআতের উপর সাহাবীদের ইজমা হয়েছে।
অতঃপর আবু বকরের পরে উমার ইবনুল খাত্তাব হলেন দ্বিতীয় খলীফা। কেননা তাঁরও রয়েছে অনেক ফাযীলাত এবং সৎকর্মে অগ্রগামিতা। আবু বকর জীবিত থাকা কালেই তাঁকে পরবর্তী খেলাফতের দায়িত্বভার দিয়ে গেছেন। আবু বকর এর পরে তাঁর খেলাফতের উপর উম্মতের ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
অতঃপর উমারের পর খলীফা হলেন উছমান বিন আফফান। কেননা উমার এর পক্ষ হতে নিযুক্ত শুরা পরিষদ তাকেই খেলাফতের জন্য প্রাধান্য দিয়েছে এবং মুসলিম উম্মত তাঁর খেলাফতের উপর একমত হয়েছে। অতঃপর উছমান বিন আফফানের পরে খলীফা হলেন আলী। কেননা তাঁর রয়েছে অনেক ফাযীলাত। তাঁর খেলাফতের উপর তাঁর যুগের লোকদের ইজমা সংঘটিত হয়েছে।
এ হলেন চারজন খলীফা। ইরবায বিন সারিয়ার হাদীসে তাদের প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে। রসূল বলেন:
فَإِنَّهُ مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ بَعْدِي فَسَيَرَى اخْتِلَافًا كَثِيرًا ، فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِي وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الْمَهْدِيِّينَ الرَّاشِدِينَ، تَمَسَّكُوا بِهَا وَعَضُّوا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِدِ
"আমার পরে তোমাদের মধ্য থেকে যারা জীবিত থাকবে, তারা অনেক মতবিরোধ দেখতে পাবে। সুতরাং তোমরা আমার সুন্নাত এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবে এবং উহার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে"।৮০
এ জন্যই শাইখুল ইসলাম বলেছেন: যে ব্যক্তি এ চারজনের কারো খিলাফতের স্বীকৃতি দিবে না সে তার গৃহে পালিত গাধার চেয়েও অধিক নির্বোধ। কেননা এতে বিনা কারণে শরীয়াতের দলীল এবং ইজমার খেলাফ করা হবে। যেমন রাফেযীরা রসূল ﷺ এর পরে আলী বিন আবু তালিবকেই খিলাফাতের হকদার মনে করে।
আলীকে অন্য তিন খলীফার উপর প্রাধান্য দেয়ার মাস'আলায় শেষ কথা হলো,
(১) যারা খিলাফতের ক্ষেত্রে তাঁকে বাকী তিন খলীফার উপর প্রাধান্য দিলো, সে আহলে সুন্নাতের ঐকমত্যে গোমরাহ বলে গণ্য হবে।
(২) যারা তাকে ফাযীলাতের ক্ষেত্রে আবু বকর সিদ্দীক এবং উমারের উপর প্রাধান্য দিবে, তারাও গোমরাহ হবে।
(৩) যারা আলীকে উছমানের উপর ফাযীলাতের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দিবে, তাদেরকে গোমরাহ বলা হবে না। যদিও এটি প্রাধান্যযোগ্য মতের বিপরীত।

টিকাঃ
৮০. সহীহ: আবু দাউদ ৪৬০৭, তিরমিযী ২৬৭৬, দারিমী ৯৫, ইবনে মাজাহ ৪২।

📘 শারহুল আক্বীদাহ আল-ওয়াসিত্বীয়া > 📄 আহ্‌লুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের নিকট নাবী ﷺ এর পরিবারের মর্যাদা।

📄 আহ্‌লুস সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের নিকট নাবী ﷺ এর পরিবারের মর্যাদা।


আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত নাবী পরিবারের সকল সদস্যকে ভালবাসে, তাদের সাথে বন্ধুত্ব রাখে এবং তাদের ব্যাপারে রসূল এর ঐ অসীয়তকে হিফাযত করে, যা তিনি গাদীরে খুম্মের দিন করেছিলেন। তিনি সেদিন বলেছেন: أُذَكِّرُكُمُ اللَّهَ فِي أَهْلِ بَيْتِي
"আমি তোমরাদেরকে আমার আহলে বাইতের ব্যাপারে আল্লাহর আদেশ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি”।৮১ তাঁর চাচা আব্বাস যখন তাঁর নিকট অভিযোগ করলেন, কুরাইশদের কিছু লোক বনী হাশেমদের লোকদের সাথে দুর্ব্যবহার করছে, তখন তিনি বললেন:
وَالَّذِي نَفْسِي بَيَدِهِ؛ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحِبُّوكُمْ اللَّهِ وَلِقَرَابَتِي
সেই সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবেনা, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর জন্য এবং আমার সাথে আত্মীয়তার কারণে তোমাদেরকে ভালবাসবে।৮২ রসূল বলেন:
إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى بَنِي إِسْمَاعِيلَ، وَاصْطَفَى مِنْ بَنِي إِسْمَاعِيلَ كِنَانَةَ، وَاصْطَفَى مِنْ كِنَانَةَ قُرَيْشًا، وَاصْطَفَى مِنْ قُرَيْشٍ بَنِي هَاشِمٍ، وَاصْطَفَانِي مِنْ بَنِي هَاشِمٍ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা আদম সন্তানদের থেকে বনী ইসমাঈলকে বাছাই করে নিয়েছেন। ইসমাঈলের সন্তানদের থেকে বনী কেনানাকে নির্বাচন করেছেন। আর বনী কেননা থেকে কুরাইশকে বাছাই করে নিয়েছেন। কুরাইশ বংশ থেকে নির্বাচিত করেছেন বনী হাশেমকে। আর হাশেমের বংশ থেকে নির্বাচন করেছেন আমাকে"।৮৩
ব্যাখ্যা: শাইখুল ইসলাম এখানে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের নিকট আহলে বাইত তথা নাবী পরিবারের মর্যাদা বর্ণনা করেছেন। তারা রাসূল এর আহলে বাইতকে ভালবাসে। নাবী পরিবাবের ঐ সমস্ত সদস্য আহলে বাইতের মধ্যে শামিল, যাদের জন্য সাদকাহ গ্রহণ করা হারাম করা হয়েছে। তারা হলেন আলী, জা'ফর, আকীল, আব্বাস এবং তাদের পরিবারের সকল সদস্য। এমনি হারিছ বিন আব্দুল মুত্তালিবের সন্তানগণ, নাবী এর স্ত্রী এবং কন্যাগণও আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا
"আল্লাহ ইচ্ছা করেন তোমাদের নাবী পরিবার থেকে ময়লা দূর করতে এবং তোমাদের পুরোপুরি পাক-পবিত্র করে দিতে” (সূরা আহযাব ৩৩:৩৩)।
সুতরাং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা নাবী পরিবারের লোকদেরকে ভালবাসে এবং তাদেরকে সম্মান করে। কেননা তাদেরকে ভালবাসা ও সম্মান করা নাবী কে ভালবাসা ও সম্মান করার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা'আলা এবং রসূল তাদেরকে সম্মান করার আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
قُل لَّا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَى
"হে নাবী! এসব লোককে বলে দাও, এ কাজের জন্য আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাই না। তবে আত্মীয়তার ভালবাসা অবশ্যই চাই" (সূরা শুরা ৪২:২৩)।
সুন্নাতে এ বিষয়ে অনেক দলীল রয়েছে। এগুলো থেকে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমীয়া কিছু উল্লেখ করেছেন। তবে ভালবাসা পাওয়ার শর্ত হলো রসূল ﷺ এর আত্মীয়দের সালাফগণের ন্যায় সুন্নাতের অনুসারী হতে হবে এবং দ্বীনের উপর সুদৃঢ় থাকতে হবে। যেমন ছিলেন আব্বাস ও তাঁর সন্তানগণ এবং আলী ও তাঁর সন্তানগণ।
পক্ষান্তরে যারা রসূলের সুন্নাতের বিরোধিতা করবে এবং দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে না, তাদেরকে ভালবাসা নাজায়েয। যদিও সে আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত হয়।
ويتولونهم তাদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করে: অর্থাৎ তাদেরকে ভালবাসে। يتولون শব্দটি الولاء থেকে গৃহীত হয়েছে। الولاء শব্দের واو বর্ণে যবর দিয়ে পড়া হয়েছে। এর অর্থ হলো ভালবাসা। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা রসূল ﷺ এর অসীয়তকে হেফাযত করে: তারা সেই অসীয়ত অনুযায়ী আমল করে এবং তা বাস্তবায়ন করে। তিনি গাদীরে খুম্মের দিন বলেছেন: "আমি তোমাদেরকে আমার আহলে বাইতের ব্যাপারে আল্লাহর আদেশ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি”। বন্যার বা বৃষ্টির পানি যেখানে গিয়ে জমা হয়, তাকে غدیر )গাদীর) বলা হয়। বলা হয়ে থাকে যে, খুম্ম একজন ব্যক্তির নাম। তার দিকে সেই স্থানের পানিকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে غدیر خم 'খুস্মের জলাশয়'।
কেউ কেউ বলেছেন: বৃক্ষ দ্বারা আচ্ছাদিত একটি স্থানের নাম হলো খুম্ম। জলাশয়টিকে এই স্থানটির দিকে সম্বোধন করার কারণ হলো জলাশয়টি সেখানেই অবস্থিত ছিল। এই পুকুর বা জলাশয়টি মক্কা থেকে মদীনায় আসার রাস্তার পাশে (জুহফায়) অবস্থিত ছিল। বিদায় হজ্জ থেকে ফিরে আসার সময় নাবী এই জলাশয়ের পাশ দিয়ে অতিক্রম করেছিলেন এবং সেখানে ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই ভাষণের মধ্যে উপরোক্ত কথাটিও ছিল, যা শাইখুল ইসলাম উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ তিনি বলেছিলেন: আল্লাহ তা'আলা আমার আহলে বাইতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের এবং তাদের হক আদায় করার যে আদেশ দিয়েছেন, আমি তোমাদেরকে সেই আদেশ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।
وَقَالَ أَيْضًا لِلْعَبَّاسِ عَمَّهُ তিনি তাঁর চাচা আব্বাসকে বলেছিলেন: আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিব বিন হাশিম বিন আবদে মানাফ। তিনি একটি অপছন্দনীয় বিষয় দেখে নাবীকে অবগত করেছিলেন। তিনি জানালেন যে, কুরাইশদের কিছু লোক বনী হাশেমের লোকদের প্রতি দুর্ব্যবহার করছে।
الجفاء অর্থ হলো সদাচরণ পরিহার করা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা। নাবী তখন কসম করে বললেন: ঐ সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা পূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তারা আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্য এবং আমার সাথে আত্মীয়তার কারণে তোমাদেরকে ভালবাসবে। অর্থাৎ দুই কারণে আহলে বাইতের লোকদেরকে ভালবাসতে হবে।
(১) আহলে বাইতকে ভালবাসার মাধ্যমে তারা আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য অর্জন করবে। কেননা তারা আল্লাহর অলীদের অন্তর্ভুক্ত।
(২) তারা ছিলেন রসূলের আত্মীয়।
সুতরাং তাদের প্রতি ভালবাসা পোষণ করলে রসূল খুশী হবেন এবং এর মাধ্যমে তাঁর প্রতি সম্মানও প্রদর্শন করা হয়। বনী হাশেমের ফযীলতের বর্ণনা দিতে গিয়ে নাবী বলেন যে, তারা হলেন তাঁরই আত্মীয়। আল্লাহ তা'আলা বনী ইসমাঈল বিন ইবরাহীম খলীল আলাইহিস সাল্লামের বংশধর হতে উত্তম হিসাবে বাছাই করেছেন। আর ইসমাঈলের বংশধর থেকে বনী কেননাকে নির্বাচন করেছেন। কেননা একটি গোত্রের নাম। তাদের পূর্ব পুরুষ ছিল কেনানা বিন খুযাইমা। কেনানা থেকে বাছাই করেছেন কুরাইশকে। কুরাইশরা হলো মুযার বিন কেননার সন্তান। কুরাইশ থেকে আল্লাহ তা'আলা বনী হাশেমকে নির্বাচন করেছেন। এরা হলেন হাশেম বিন আব্দে মানাফের সন্তান। রসূল আরো বলেন, অতঃপর আল্লাহ তা'আলা আমাকে বনী হাশেম থেকে বাছাই করেছেন।
সুতরাং তিনি হলেন মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল মুত্তালিব বিন হাশেম বিন আব্দে মানাফ বিন কুসাই বিন কিলাব বিন মুররাহ বিন কা'ব বিন লুআই বিন গালেব বিন ফিহির বিন মালেক বিন নযর বিন কেনানা বিন খুযাইমা বিন মুদরেকা বিন ইলয়াস বিন মুযার বিন নায্যার বিন মাআদ বিন আদনান।
উপরোক্ত হাদীস থেকে দলীল পাওয়া গেল যে, আরবদের ফাযীলাত রয়েছে। আর কুরাইশ বংশ হলো অন্যান্য আরব গোত্র হতে উত্তম। বনী হাশেম কুরাইশদের মধ্যে সর্বোত্তম। রসূল বনী হাশেমের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান। সুতরাং তিনি ব্যক্তিগত দিক থেকে সর্বোত্তম আদম সন্তান এবং তাঁর বংশ মর্যাদাও সর্বশ্রেষ্ঠ। এই হাদীসের মধ্যে বনী হাশেমেরও ফাযীলাত সাব্যস্ত হয়েছে। রসূল এর আত্মীয়রাই হলো বনী হাশেম।

টিকাঃ
৮১. সহীহ মুসলিম ২৪০৮, সুনানে দারিমী ৩৩১৬, সহীহ ইবনে খুযাইমা ২৩৫৭।
৮২. সহীহ: তিরমিযী ৩৭৫৮, মুসনাদে আহমাদ।
৮৩. সহীহ মুসলিম ২২৭৬, তিরমিযী ৩৬০৫, মুসনাদে আহমাদ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00