📄 তাকদীর ও শারীয়াত পরস্পর বিরোধী ও সাংঘর্ষিক নয় এবং পাপাচারে নির্ধারণ করা এবং সেগুলোকে অপছন্দ ও ঘৃণা করাও পরস্পর বিরোধী ও সাংঘর্ষিক নয়।
উহা সত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলা বান্দাদেরকে তাঁর এবং তাঁর রাসূলদের আনুগত্য করার আদেশ দিয়েছেন। সেই সাথে তিনি তাঁর আদেশ অমান্য করতে এবং পাপাচারে লিপ্ত হতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা মুত্তাকী, সৎকর্মশীল এবং ইনসাফকারীদেরকে ভালবাসেন। যারা ঈমান আনয়ন করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে তিনি তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন। তিনি কাফেরদেরকে ভালবাসেন না এবং ফাসেক সম্প্রদায়ের প্রতি মোটেই সন্তুষ্ট হন না। তিনি অশ্লীলতার আদেশ করেন না, তাঁর বান্দাদের কুফরী করাকে পছন্দ করেন না এবং ভূপৃষ্ঠে বিপর্যয় সৃষ্টি করাকে ভালবাসেন না।
ব্যাখ্যা: শাইখুল ইসলাম যখন তাকদীরের চারটি স্তর যথাক্রমে: ইলম, লিখা, ইচ্ছা করা ও সৃষ্টি করা, এই চারটি বিষয় সাব্যস্ত করলেন এবং আরো সাব্যস্ত করলেন যে, সৃষ্টিজগতে যা কিছু সৃষ্টি ও সংঘটিত হয়েছে, হচ্ছে ও হবে, আল্লাহ তা'আলা উহা সম্পর্কে পূর্ণ অবগত রয়েছেন, তিনি তা আগেই লিখে রেখেছেন, উহা সৃষ্টি করতে চেয়েছেন ও ইচ্ছা করেছেন এবং তিনি উহা সৃষ্টি করেছেন, পূর্বোক্ত বক্তব্যে ইহা সাব্যস্ত করার পর এখানে বর্ণনা করছেন যে, উক্ত বিষয়গুলোর মধ্যে এবং আল্লাহ তা'আলা যে তাঁর বান্দাদেরকে আনুগত্যের আদেশ দিয়েছেন এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করেছেন, তাঁর মধ্যে কোন বৈপরিত্য, পারস্পরিক বিরোধ ও সংঘর্ষ নেই। পাপাচার সংঘটিত হওয়ার নির্ধারণ করা এবং উহাকে ঘৃণা করার মধ্যে কোন পারস্পরিক সংঘর্ষ, বিরোধ ও বৈপরিত্য নেই।
শাইখুল ইসলামের উক্তি: ومع ذلك উহা সত্ত্বেও: অর্থাৎ সকল বস্তু সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার অবগতি, সবকিছু নির্ধারণ, সবকিছু লিখা এবং সৃষ্টি করার ইচ্ছা করা ও সৃষ্টি করা সত্ত্বেও তিনি তাঁর বান্দাদেরকে তাঁর ও তাঁর রাসূলদের আনুগত্য করার হুকুম করেছেন এবং তাঁর নাফরমানি করতে নিষেধ করেছেন। যেমন আল্লাহর কিতাব রাসূলের সুন্নাহতে এ বিষয়ে বহু দীলল রয়েছে। এগুলোতে তিনি তাঁর আনুগত্য করার আদেশ এবং তাঁর আদেশ-নিষেধের (শরীয়তের) বিরোধীতা করতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা শরীয়ত ও হুকুম-আহকাম প্রেরণ করেছেন এবং সবকিছু সৃষ্টি ও নির্ধারণ করেছেন। এগুলোর মাঝে কোন প্রকার পারস্পরিক সংঘর্ষ, অসংগতি ও বিরোধ নেই। যেমন ধারণা করে থাকে ঐ সমস্ত গোমরাহ সম্প্রদায়, যারা শরীয়তকে তাকদীরের বিপরীত মনে করে।
শাইখুল ইসলাম এ বিষয়ে তাঁর লিখিত অন্যতম একটি রেসালা 'তাদমুরিয়াতে' বলেন: গোমরাহ ফির্কার লোকেরা তাকদীরের বিষয়ে তিন শ্রেণীতে বিভক্ত। অগ্নিপূজক, মুশরিক এবং ইবলীসের দল।
ক) مجوسية অগ্নিপূজক: যারা আল্লাহ তা'আলার তাকদীরকে অস্বীকার করে, তারা এই উম্মতের মাজুসী। যদিও তারা আল্লাহর আদেশ ও নিষেধে বিশ্বাস করে। এই দলের সীমালংঘনকারীরা আল্লাহ তা'আলার ইলম ও ইলম অনুযায়ী সবকিছু লিখে রাখাকে অস্বীকার করেছে। আর মধ্যমপন্থীরা ইলম ও লিখাকে স্বীকার করলেও তারা এই কথা স্বীকার করে না যে, সবকিছুর উপর রয়েছে আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা, সবকিছুই আল্লাহর সৃষ্টি এবং কুদরতের অধীন। এরাই হলো মুতাযেলা এবং যারা তাদের অনুসরণ করে থাকে।
)খ( মুশরিক: আর যারা তাকদীর ও আল্লাহ তা'আলার ফয়সালায় বিশ্বাসী, কিন্তু শরীয়তের আদেশ ও নিষেধকে অস্বীকার করেছে, তারা হলো মুশরিক। আল্লাহ তা'আলা বলেন: سَيَقُولُ الَّذِينَ أَشْرَكُوا لَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا أَشْرَكْنَا وَلَا آبَاؤُنَا وَلَا حَرَّمْنَا مِن شَيْءٍ كَذَلِكَ كَذَّبَ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ حَتَّى ذَاقُوا بَأْسَنَا قُلْ هَلْ عِندَكُم مِّنْ عِلْمٍ فَتُخْرِجُوهُ لَنَا إِن تَتَّبِعُونَ إِلَّا الظَّنَّ وَإِنْ أَنتُمْ إِلَّا تَخْرُصُونَ
"এ মুশরিকরা নিশ্চয়ই বলবে, আল্লাহ যদি চাইতেন তাহলে আমরা শির্ক করতাম না, আমাদের বাপ-দাদারাও শির্ক করতো না। আর আমরা কোন জিনিসকে হারামও গণ্য করতাম না। এ ধরনের উদ্ভট কথা তৈরী করে এদের পূর্ববর্তী লোকেরাও সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। তারা অবশেষে আমার আযাবের স্বাদ গ্রহণ করেছে। এদেরকে বলে দাও, তোমাদের কাছে কোন জ্ঞান আছে কি? থাকলে আমার কাছে পেশ করো। তোমরা তো নিছক ধারণার অনুসরণ করে চলছো। শুধু আন্দাজ করা ব্যতীত তোমাদের কাছে আর কিছুই নেই" (সূরা আন'আম ১৪৮)।
যারা তাকদীর দিয়ে দলীল পেশ করে শরীয়তের আদেশ-নিষেধ বাতিল করে দেয়, তারা এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত।
গ) ইবলীসের দল: এ বিষয়ে তৃতীয় দলটি হচ্ছে ইবলীসের দল। তারা তাকদীর ও শরীয়াত উভয়কেই স্বীকার করে নিয়েছে। কিন্তু তারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার শরীয়াত ও তাকদীরকে পরস্পর সাংঘর্ষিক ও বিরোধী মনে করেছে। এর মাধ্যমে তারা হিকমত ও আদালতে ইলাহীয়ার মধ্যে আপত্তি করেছে। যেমন তাদের প্রথম উস্তাদ ইবলীস থেকে উহা উল্লেখ করা হয়েছে।
মোটকথা আহলে বাতিলরা নিজেদের পক্ষ হতে বানিয়ে উপরোক্ত কথা বলে থাকে। হেদায়াতপ্রাপ্ত এবং সফলকাম লোকেরা তাকদীরের প্রতি বিশ্বাস করে এবং শরীয়তকেও বিশ্বাস করে। তারা বিশ্বাস করে আল্লাহ তা'আলা প্রত্যেক জিনিসের স্রষ্টা, প্রত্যেক জিনিসের প্রভু ও মালিক। তিনি যা ইচ্ছা করেন, তাই হয়। তিনি যা ইচ্ছা করেন না, তা কখনো হয়না এবং তিনি প্রত্যেক জিনিসের উপর ক্ষমতাবান। ইলমের মাধ্যমে তিনি সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে রয়েছেন এবং প্রত্যেক জিনিসকে একটি সুস্পষ্ট কিতাবে লিখে সংরক্ষিত করে রেখেছেন।
وَهُوَ سُبْحَانَهُ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ وَالْمُحْسِنِينَ وَالْمُقْسِطِينَ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা মুত্তাকী, সৎকর্মশীল এবং ইনসাফ কারীদেরকে ভালবাসেন: অর্থাৎ যে ব্যক্তি প্রশংসনীয় গুণে গুণান্বিত হয়, যেমন তাকওয়া, সৎকর্ম ন্যায়বিচার-ইনসাফ ইত্যাদি ভাল গুণে বিশেষিত হয়, তাকে ভালোবাসেন।
وَيَرْضَى عَنِ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে আল্লাহ তা'আলা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন: যেমন অনেক আয়াতে সংবাদ দেয়া হয়েছে যে, যারা ঈমান আনয়ন করে এবং সৎ আমল করে তিনি তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হন ও তাদেরকে ভালবাসেন।
وَلَا يُحِبُّ الْكَافِرِينَ وَلَا يَرْضَى عَنِ الْقَوْمِ الْفَاسِقِينَ ভালোবাসেন না এবং ফাসেক সম্প্রদায়ের প্রতি মোটেই সন্তুষ্ট হন না: অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা যেসব স্বভাব ও বৈশিষ্টকে ঘৃণা করেন; যেমন কুফরী, পাপাচার এবং অন্যান্য নিকৃষ্ট স্বভাব, যারা এ জাতীয় স্বভাব ও বৈশিষ্ট দ্বারা বিশেষিত হয়, তিনি তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হন না।
وَلَا يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ তিনি অশ্লীলতার আদেশ করেন না: অশ্লীলতা বলতে ঐসব গুনাহ ও পাপের কথা ও কাজ বুঝায়, যা অত্যন্ত নিকৃষ্ট ও ঘৃণিত।
وَلَا يَرْضَى لِعِبَادِهِ الْكُفْرَ وَلَا يُحِبُّ الْفَسَادَ পছন্দ করেন না এবং ভূপৃষ্ঠে বিপর্যয় সৃষ্টি করাকে ভালবাসেন না: কেননা কুফরী ও ফাসাদ অত্যন্ত নিকৃষ্ট কাজ এবং তাতে রয়েছে দেশ ও জাতির জন্য অনেক ক্ষতি।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া উপরোক্ত বক্তব্য দ্বারা ঐসব লোকদের প্রতিবাদ করতে চেয়েছেন, যারা মনে করে আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছা ও ভালবাসা পরস্পর সম্পৃক্ত এবং ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সুতরাং আল্লাহ তা'আলা যখন কোন জিনিসের ইচ্ছা করেন তখন উহাকে ভালবাসেন বলেই উহার ইচ্ছা করেন এবং কোন জিনিসকে যখন ভালবাসেন তখন উহার অর্থ এই যে, তিনি উহার ইচ্ছা পোষণ করেন। এই কথা একদম বাতিল।
সঠিক কথা হলো আল্লাহ তা'আলার الإرادة (ইচ্ছা) এবং المحبة (ভালবাসা) পরস্পর সম্পৃক্ত নয়। অর্থাৎ আল্লাহর সৃষ্টিগত ইচ্ছা ও তাঁর ভালোবাসা পরস্পর সম্পৃক্ত এবং ওতপ্রোতভাবে জড়িত নয়। এ দু'টির একটি অন্যটিকে আবশ্যক করেনা। আল্লাহ তা'আলা কখনো এমন জিনিসের ইচ্ছা করেন, যা তিনি পছন্দ করেন না এবং এমন জিনিস পছন্দ করেন, যা সংঘটিত করার ইচ্ছা করেন না।
প্রথমটির উদাহরণ হলো যেমন ইবলীস ও তার সৈনিকদেরকে সৃষ্টি করার ইচ্ছা করা এবং আল্লাহ তা'আলার ঐ ব্যাপক ইচ্ছা, যা রয়েছে সৃষ্টিজগতের কিছু কিছু জিনিসের মধ্যে। যদিও তিনি উহাকে ঘৃণা করেন এবং অপছন্দ করেন।
আর দ্বিতীয়টির উদাহরণ হলো, যেমন তিনি কাফেরদের ঈমান আনয়ন করাকে ভালবাসেন এবং তাদের থেকে আনুগত্যের কাজ সংঘটিত হওয়া পছন্দ করেন, কিন্তু তিনি তাদের থেকে উহা বাস্তবায়ন হওয়ার ইচ্ছা করেননি। তিনি যদি ইচ্ছা করতেন, তাহলে অবশ্যই তাদের দ্বারা উহা বাস্তবায়ন হতো।
📄 আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার পক্ষ হতে তাকদীর নির্ধারণ করা (বান্দাদের কর্ম সৃষ্টি হওয়া) এবং প্রকৃতপক্ষে বান্দাদের কাজ-কর্ম তাদের প্রতি সম্বন্ধ করার মধ্যে পারষ্পারিক কোন বিরোধ নেই। বান্দাই নিজস্ব ইচ্ছা ও এখতিয়ার দ্বারা তাদের কাজ-কর্ম সম্পাদন করে থাকে।
বান্দারা প্রকৃতপক্ষেই তাদের কাজগুলো সম্পাদন করে। আল্লাহ তা'আলা বান্দাদের স্রষ্টা এবং তিনি তাদের কাজগুলোরও স্রষ্টা। বান্দাই মুমিন হয়, কাফির হয়, সৎকর্মশীল হয়, পাপাচারী হয়, মুসল্লী হয় এবং সিয়াম পালনকারী হয়। বান্দাদের কাজ-কর্ম করার নিজস্ব ক্ষমতা রয়েছে। রয়েছে তাদের ইচ্ছা। আর আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, তাদের ক্ষমতা এবং ইচ্ছারও স্রষ্টা তিনিই। যেমন আল্লাহ তা'আলা সূরা তাকভীরের ২৮-২৯ নং আয়াতে বলেছেন:
إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ لِّلْعَالَمِينَ لِمَن شَاءَ مِنكُمْ أَن يَسْتَقِيمَ وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَن يَشَاءَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ
"এটা সমস্ত সৃষ্টিজগতের জন্য একটা উপদেশ মাত্র। তোমাদের মধ্য থেকে এমন ব্যক্তির জন্য, যে সত্য সরল পথে চলতে চায়। আর তোমরা ইচ্ছা করলেই সত্য সরল পথে চলতে পারবে না, যতক্ষণ না আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তোমাদেরকে সরল পথে চালানোর ইচ্ছা করেন"।
তাকদীরের এই স্তরকে কাদারীয়াদের অধিকাংশ ফির্কাই অস্বীকার করেছে। এই জন্যই নাবী তাদেরকে এই উম্মতের মাজুসী তথা অগ্নিপূজক হিসাবে নামকরণ করেছেন।
ঐদিকে তাকদীর সাব্যস্ত করতে গিয়ে আরেক দল লোক (জাবরীয়া সম্প্রদায়) খুব বাড়াবাড়ি ও কড়াকড়ি করে ফেলেছে। এমনকি কাজ-কর্ম করার জন্য বান্দার কোন শক্তি, ইচ্ছা ও এখতিয়ার থাকার কথাকে তারা সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে থাকে। শুধু তাই নয়; আল্লাহ তা'আলার ক্রিয়া- কর্ম এবং তাঁর হুকুম-আহকামের মধ্যে যেসব হিকমত এবং কল্যাণ রয়েছে তারা সেগুলোও অস্বীকার করে।
ব্যাখ্যা: শাইখুল ইসলাম তাঁর এই বক্তব্যের মাধ্যমে বর্ণনা করতে চাচ্ছেন যে, পূর্বোক্ত সকল স্তরসহ তাকদীর সাব্যস্ত করার মধ্যে এবং বান্দারাই যে তাদের এখতিয়ার দ্বারা কর্ম সম্পাদন করে এবং তারা যে তাদের ইচ্ছাতেই আমল করে, এর মধ্যে কোন বৈপরিত্য, পারস্পরিক সংঘর্ষ এবং বিরোধ নেই।
এই অংশের মাধ্যমে শাইখুল ইসলামের উদ্দেশ্য হলো ঐসব লোকের প্রতিবাদ করা, যারা বলে, যদি এটি সাব্যস্ত করা হয় যে, আল্লাহ তা'আলা বান্দার কাজ-কর্ম সৃষ্টি করেন এবং বান্দারাও তাদের নিজস্ব ইচ্ছা দ্বারা কাজ-কর্ম করে, তাহলে উভয় কথার মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্ধ পরিলক্ষিত হয়। এই পারস্পরিক দ্বন্ধের ধারণা থেকেই বাতিলপন্থীদের একটি দল তাকদীর (আল্লাহর ইচ্ছা, শক্তি, ক্ষমতা, সৃষ্টি করা, সবকিছুর উপর তাঁর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি) সাব্যস্ত করতে গিয়ে মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি ও কড়াকড়ি করেছে। এমনকি বান্দার উপর থেকে কাজ-কর্ম করার ক্ষমতা এবং এখতিয়ারকে সম্পূর্ণরূপে তুলে নিয়েছে!!
বাতিলদের আরেকটি দল বান্দাদের কাজ-কর্ম এবং এখতিয়ার সাব্যস্ত করতে গিয়ে মারাত্মক সীমালংঘন করে ফেলেছে। এমনকি তারা বান্দাদেরকেই তাদের নিজস্ব কাজ-কর্মের স্রষ্টা হিসাবে নির্ধারণ করেছে। তারা আরো বলেছে যে, বান্দাদের কর্মের সাথে আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছার কোন সম্পর্ক নেই এবং বান্দাদের কাজ-কর্মের উপর আল্লাহর কোন ক্ষমতাও নেই!!
উপরে পরস্পর বিপরীতমুখী যে দু'টি গোমরাহ দলের আলোচনা করা হলো, তাদের প্রথম দলটিকে বলা হয় জাবরীয়া। কেননা তারা বলে বান্দা থেকে যা প্রকাশিত হয় কিংবা সে যেই কাজ ও নড়াচড়া করে, তাতে সে মাজবুর (বাধ্যগত)। তাতে তার কোন নিজস্ব এখতিয়ার, ইচ্ছা ও স্বাধীনতা নেই। আর দ্বিতীয় দলকে বলা হয় কাদারীয়া। কারণ তারা তাকদীর তথা আল্লাহর সৃষ্টি ও নির্ধারণকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে!!
সুতরাং শাইখের উক্তি: বান্দারা প্রকৃতপক্ষেই তাদের কাজগুলো সম্পাদন করে, -এর মাধ্যমে তিনি জাবরীয়াদের প্রতিবাদ করেছেন। কেননা তারা বলে, বান্দারা প্রকৃতপক্ষে কোন কাজই করে না। শুধু রূপকার্থে তাদের প্রতি কর্মসমূহের নিসবত (সম্বন্ধ) করা হয়েছে!!!
আর শাইখের কথা, وَاللَّهُ خَالْقُهم وخالق أَفْعَالَهُمْ আল্লাহ তা'আলা বান্দাদের স্রষ্টা এবং তিনি তাদের কাজগুলোরও স্রষ্টা: এর মাধ্যমে তিনি দ্বিতীয় ফির্কা তথা তাকদীরকে অস্বীকারকারী কাদারীয়া সম্প্রদায়ের প্রতিবাদ করেছেন। কেননা তারা বলে থাকে, আল্লাহ তা'আলা বান্দাদের কর্মসমূহ সৃষ্টি করেন না; বরং বান্দারা আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ও নির্ধারণ ছাড়াই নিজেদের কর্মগুলো নিজেরাই সৃষ্টি করে!!
বান্দাই মুমিন হয়, কাফির হয়, সৎকর্মশীল হয়, পাপাচারী হয়, সলাত আদায়কারী হয় এবং সিয়ামপালনকারী হয়। বান্দাদের কাজ-কর্ম করার নিজস্ব ক্ষমতা রয়েছে, রয়েছে তাদের ইচ্ছা: এতে জাবরীয়াদের প্রতিবাদ করা হয়েছে। অর্থাৎ বান্দারা উপরোক্ত আমলসমূহে মাজবুর (বাধ্যগত) নয়। কেননা তাই যদি হতো তাহলে তাদেরকে উপরোক্ত বিশেষণগুলো দ্বারা বিশেষিত করা হতো না। কেননা মাজবুরের কাজকে তার দিকে নিসবত (সম্বোধন) করা হয় না, তা দ্বারা তাকে বিশেষিতও করা হয় না৬৭ এবং মাজবুর (বাধ্যের) দ্বারা যা হয়, তাতে সে ছাওয়াবের হকদার হয় না কিংবা শাস্তিরও যোগ্য বিবেচ্য হয় না।
وَهَذِهِ الدَّرَجَةُ مِنَ الْقَدَرِ يُكَذِّبُ بِهَا عَامَّةُ الْقَدَرِيَّةِ কাদারীয়াদের অধিকাংশ ফির্কাই অস্বীকার করে: এই স্তর বলতে আল্লাহ তা'আলার সার্বিক ও সার্বজনীন ইচ্ছা, প্রত্যেক জিনিসই তাঁর ইচ্ছাতেই হওয়া এবং সবকিছুই তাঁর সৃষ্টি, এই কথা বুঝায়। এই স্তরে ইহাও রয়েছে যে, বান্দারা প্রকৃতপক্ষেই তাদের কর্মসমূহ সম্পাদন করে। আল্লাহ তা'আলা বান্দাদের স্রষ্টা এবং তিনি তাদের কর্মেরও স্রষ্টা। কাদারীয়ারা তাকদীরের এই স্তরকে অস্বীকার করে। তাদের ধারণা মতে বান্দাই তার নিজের কর্ম সৃষ্টি করে। এতে আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছার প্রয়োজন পড়ে না। এদেরকে নাবী এই উম্মতের মাজুসী বলে নামকরণ করেছেন। কেননা এই মাস'আলাতে অগ্নিপূজকদের সাথে তাদের সাদৃশ্য রয়েছে। অগ্নিপূজকরা দু'টি স্রষ্টা সাব্যস্ত করে। তারা নূর বা আলোকে ন্যায় ও কল্যাণের স্রষ্টা মনে করে এবং অন্ধকারকে অন্যায় ও অকল্যাণের স্রষ্টা মনে করে। সুতরাং তারা বলে কল্যাণ নূরের সৃষ্টি আর অকল্যাণ অন্ধকারের সৃষ্টি। এর মাধ্যমে তারা দুই স্রষ্টায় বিশ্বাসী হয়েছে।
কাদারীয়ারাও অগ্নিপূজকদের মতই। কেননা তারা আল্লাহর সাথে অন্যকেও স্রষ্টা সাব্যস্ত করেছে। তারা মনে করে, আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ব্যতীত বান্দারাই তাদের কর্ম সৃষ্টি করে থাকে। শুধু তাই নয়; তারা মনে করে বান্দারা নিজস্ব ও সতন্ত্র ক্ষমতা বলেই তাদের কর্ম সৃষ্টি করে।
নাবী তাদেরকে এই উম্মতের অগ্নিপূজক বলেছেন,-এই কথা এক বাক্যে সহীহ সূত্রে প্রমাণিত নয়। কেননা নাবী এর যামানা পার হয়ে যাওয়ার পর তাদের উৎপত্তি হয়েছে। তাদের নিন্দায় যা বর্ণনা করা হয়, তার অধিকাংশই সাহাবীদের উপর মাওকুফ। অর্থাৎ এগুলোর সহীহ সনদ শুধু সাহাবীগণ পর্যন্তই পৌঁছে।
সুতরাং প্রথম দল অর্থাৎ কাদারীয়ারা বান্দার কর্ম সাব্যস্ত করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। এমনকি বান্দার কর্ম থেকে আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছাকে বের করে ফেলেছে। আর জাবরীয়ারা বান্দাদের কর্মকে একদম অস্বীকার করেছে। এমনকি কাজ-কর্ম করার উপর বান্দাদের কোন ক্ষমতা ও এখতিয়ার থাকাকেই অস্বীকার করেছে।
وَيُخْرِجُونَ عَنْ أَفْعَالِ اللَّهِ وَأَحْكَامِهِ حِكَمَهَا
وَمَصَالِحَهَا আল্লাহ তা'আলার ক্রিয়া-কর্ম এবং তাঁর হুকুম-আহকামের মধ্যে যেসব হিকমত এবং কল্যাণ রয়েছে তারা সেগুলোও অস্বীকার করে: حكم শব্দটি حكمة এর বহুবচন। আর مصاح শব্দটি مصلحة এর বহুবচন। অর্থাৎ জাবরীরা যখন বান্দার কাজ-কর্ম থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছে এবং কাজ-কর্ম করার উপর বান্দার ক্ষমতা এবং এখতিয়ার থাকাকেও অস্বীকার করেছে, তখন এর মাধ্যমে তারা শরীয়াতের আদেশ ও নিষেধের মধ্যে যেই হিকমত, ছাওয়াব ও শাস্তি রয়েছে, তাও অস্বীকার করে ফেলেছে।
তারা বলেছে, আল্লাহ তা'আলা বান্দাদেরকে এমন কাজের ছাওয়াব দেন, যা তাদের কর্মের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং এমন কর্মের কারণে তিনি তাদেরকে শাস্তি দেন, যা তাদের কর্মের মধ্যে শামিল নয়। আল্লাহ তা'আলা বান্দাদেরকে এমন কাজের আদেশ করেন, যা করতে বান্দারা সক্ষম নয়। সুতরাং তারা আল্লাহ তা'আলাকে যুলুম এবং নিরর্থক কাজ করার অপবাদ দিয়েছে। আল্লাহ তা'আলা তাদের অপবাদের অনেক উর্ধ্বে।
টিকাঃ
৬৭. সুতরাং যাকে জোর করে বিষ পান করানো হয়, তার ব্যাপারে এটি বলা হয় না যে, অমুক ব্যক্তি বিষ পান করেছে; বরং বলা হয় বল প্রয়োগ করে বিষ পান করিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে। মানুষ তাকে দোষরোপ করে না। ঐদিকে যে নিজ ইচ্ছায় হাতে বিষ নিয়ে তা পান করে এবং নিজের জান বের করে দেয়, তাকে মানুষ দোষারোপ করে। সহীহ হাদীছে তাকে জাহান্নামী বলা হয়েছে।
এমনি বাতাস যাকে ছাদের উপর থেকে ফেলে দেয়, সে মারা গেলেও কেউ তাকে দোষারোপ করেনা; বরং তার জন্য আফসোস করে এবং দু'আ করে। অনিচ্ছায় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে কেউ মৃত্যু বরণ করলে তাকে শহীদ বলা হয়। পক্ষান্তরে স্ব-ইচ্ছায় কেউ ছাদের উপর থেকে লাফ দিয়ে পড়ে মৃত্যু বরণ করলে কিংবা গাড়ির নিচে নিজেকে ঢুকিয়ে দিয়ে আত্মহত্যা করলে কোন মানুষ তাকে ভালবাসে না।
এমনি বান্দা নিজ ইচ্ছাতে নামায পড়ে বলে তাকে নামাযী বলা হয়, সে নিজেই ঈমান আনয়ন করে বলেই তাকে মুমিন বলা হয় এবং সে নিজেই রোজা রাখে বলেই তাকে রোযাদার বলা হয়। অনুরূপ যে চুরি করে তাকে চোর বলা হয়, কিন্তু যার পকেটে টাকা ঢুকিয়ে দিয়ে চোর সাব্যস্ত করা হয়, তাকে কেউ চোর বলে না।
সুতরাং কোন কাজ মানুষের ইচ্ছাতে হয় আর কোন কাজ তাদের অনিচ্ছায় হয়, মানুষেরা তাদের বোধশক্তি দ্বারাই বুঝে ফেলে। তাদের ফয়সালাও হয় তার আলোকেই। ইসলামী শরীয়ত মানুষের উপর এমন আকীদাহ, বিশ্বাস ও আমল চাপিয়ে দেয়নি, যা মানুষের স্বাধীন বোধশক্তি উপলব্ধি করতে অক্ষম।
মোট কথা, তাকদীর দিয়ে দলীল পেশ করে পাপাচারে লিপ্ত হয়ে শরীয়তের সীমা লংঘন করে এই কথা বলা ঠিক নয় যে, আমার নিজস্ব ইচ্ছায় নামায ত্যাগ করিনা, মদপান করিনা কিংবা পাপাচারে লিপ্ত হইনা; বরং তাকদীরে লিখা আছে, তাই আমার দ্বারা এগুলো হচ্ছে এবং আমি এগুলো করতে বাধ্য। হে আল্লাহ! আমাদেরকে তুমি হেদায়াতের পথ দেখাও। আমীন
📄 ঈমানের হাকীকত বা পরিচয় এবং কবীরা গুনাহয় লিপ্ত ব্যক্তির হুকুম।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের অন্যতম মূলনীতি হলো দ্বীন ও ঈমান হচ্ছে স্বীকারোক্তি এবং আমলের নাম। অন্তরের স্বীকারোক্তি ও জবানের ঘোষণা; আর অন্তরের আমল, জবানের আমল এবং অঙ্গ-প্রতঙ্গের আমলকে ঈমান বলা হয়। সৎকাজের মাধ্যমে ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং পাপ কাজের কারণে তা কমে যায়।
উহা সত্ত্বেও অর্থাৎ সাধারণ পাপকাজ এবং কাবীরা গুনাহয় লিপ্ত হওয়ার কারণে ঈমান কমে গেলেও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা কাবীরা গুনাহয় লিপ্ত আহলে কিবলার কাউকে কাফের বলেন না। যেমন বলে থাকে খারেজী সম্প্রদায়ের লোকেরা। বরং পাপাচারে লিপ্ত হলেও ঈমানের বন্ধন ও ভ্রাতৃত্ব ঠিকই থাকে। যেমন কিসাসের আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বলেন:
فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٌ فَاتَّبَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ
"তবে কোন হত্যাকারীর জন্য যদি তার ভাইয়ের পক্ষ হতে কিছু মাফ করে দেয়া হয়, তাহলে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী রক্তপণ দানের ব্যবস্থা নেওয়া উচিৎ (সূরা বাকারা: ১৭৮)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
وَإِن طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا فَإِن بَغَتْ إِحْدَاهُمَا عَلَى الْأُخْرَى فَقَاتِلُوا الَّتِي تَبْغِي حَتَّى تَفِيءَ إِلَى أَمْرِ اللَّهِ فَإِن فَاءَتْ فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا بِالْعَدْلِ وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ
"ঈমানদারদের মধ্যকার দু'টি দল যদি পরস্পর লড়াই করে, তাহলে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। তারপরও যদি দু'দলের কোন একটি অপরটির বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করে তাহলে যে দল বাড়াবাড়ি করে তার বিরুদ্ধে লড়াই করো। যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে। তারা যদি ফিরে আসে তাহলে তাদের মাঝে ন্যায় বিচারের সাথে মীমাংসা করে দাও এবং ইনসাফ করো। আল্লাহ ইনসাফকারীদের ভালবাসেন। মুমিনরা তো পরস্পর ভাই-ভাই। অতএব, তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও (সূরা হুজুরাত: ৯-১০)।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা মুসলিম মিল্লাতের কোন ফাসিক ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে সম্পূর্ণরূপে বের করে দেয় না এবং মৃত্যুর পর তারা তাকে চিরস্থায়ী জাহান্নামীও মনে করে না। যেমন বলে থাকে মুতাযিলারা। ফাসিকের মধ্যে মূল ঈমান বজায় থাকবে এবং তার জন্য 'মুমিন' নামও ঠিক থাকবে। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةٌ “একজন মুমিনকে গোলামী থেকে মুক্ত করতে হবে” (সূরা নিসা: ৯২)।
তবে কাবীরা গুনাহয় লিপ্ত মুমিন পূর্ণ ঈমানদার বলে গণ্য হবে না। পূর্ণ মুমিন হবে তারাই যাদের কথা আল্লাহ তা'আলা নিম্নের আয়াতে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إيمَانًا "যারা ঈমানদার, তারা এমন যে, যখন আল্লাহর নাম নেয়া হয় তখন তাদের অন্তর ভীত হয়। আর যখন তাদের সামনে আল্লাহর আয়াত পাঠ করা হয়, তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায় (সূরা আনফাল ৮:২)। রসূল বলেন:
«لا يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ ولا يسرق السارق حين يسرق وهو مؤمِن وَلَا يَشْرَبُ الْخَمْرَ حِينَ يَشْرَبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَالتَّوْبَةُ مَعْرُوضَةٌ بَعْدُ ولا ينتهب نهبة ذات شرف يرفع الناس إليه أبصارهم حين ينتهبها وهو مؤمن» "যেনাকারী যখন যেনা করে তখন সে মুমিন থাকে না, চোর যখন চুরি করে তখন সে মুমিন থাকে না। একই অবস্থা মদ পানকারীর। সে মদ পান করা অবস্থায় মুমিন থাকে না। এর পরও তার জন্যে তাওবার দরজা উন্মুক্ত থাকে। এমন কোন ভদ্র লোক ছিনতাই করতে পারেনা, যার দিকে মানুষ দৃষ্টি উঁচু করে তাকিয়ে দেখে। সে যখন ছিনতাই করে, তখন সে ঈমানদার থাকে না”। ৬৮
উপরোক্ত গুনাহসমূহে লিপ্ত ব্যক্তিদের ব্যাপারে আমরা বলবো, তারা ত্রুটিপূর্ণ মুমিন অথবা বলবো, তার মধ্যে ঈমান থাকার কারণে সে মুমিন এবং কাবীরা গুনাহ থাকার কারণে সে ফাসিক। সুতরাং তাদেরকে পূর্ণ ঈমানদার বলা যাবে না এবং মুমিন নাম তার থেকে একেবারে ছিনিয়েও নেয়া হবে না।
ব্যাখ্যা: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মূলনীতি বলতে এখানে ঐসব মূলনীতি উদ্দেশ্য, যার উপর তাদের আক্বীদার ভিত্তি গঠিত। الدين শব্দের আভিধানিক অর্থ অবনত হওয়া ও বশীভূত হওয়া। আর শরীয়াতের পরিভাষায় هو ما أمر الله به আল্লাহ তা'আলা যা আদেশ করেছেন, তাই দ্বীন।
الإيمان শব্দের আভিধানিক অর্থ التصديق )সত্যায়ন করা)। আর শরীয়াতের পরিভাষায় ঈমানের সংজ্ঞা শাইখুল ইসলাম নিজেই উল্লেখ করেছেন। উহা হলো: قَوْلٌ وَعَمَلٌ স্বীকারোক্তি এবং আমলের নাম। قَوْلُ الْقَلْبِ وَالنِّسَانِ. وَعَمَلُ الْقَلْبِ وَالنِّسَانِ وَالْجَوَارِحِ
"অন্তরের স্বীকারোক্তি ও জবানের ঘোষণা, আর অন্তরের আমল (বিশ্বাস), জবানের আমল (স্বীকারোক্তি) এবং অঙ্গ-প্রতঙ্গের আমলকে ঈমান বলা হয়।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আলিমদের নিকট এটিই হলো ঈমানের সংজ্ঞা। উহা হচ্ছে স্বীকারোক্তি ও আমলের সমষ্টিগত নাম। স্বীকারোক্তি দুই প্রকার।
(১) অন্তরের স্বীকারোক্তি। উহা হলো অন্তরের বিশ্বাস।
(২) জবানের স্বীকারোক্তি। আর উহা হচ্ছে জবান দিয়ে ইসলামের কালেমা উচ্চারণ করা।
আমল দুই প্রকার।
(১) অন্তরের আমল। নিয়ত এবং ইখলাসকে অন্তরের আমল বলা হয়।
(২) অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল। যেমন সলাত, হাজ্জ, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ইত্যাদি।
অন্তরের স্বীকারোক্তি এবং অন্তরের আমলসমূহের মধ্যে পার্থক্য হলো, অন্তরের আমল বলতে সেই আক্বীদা উদ্দেশ্য, যা অন্তর স্বীকার করে নেয় এবং বিশ্বাস করে। আর অন্তরের আমলসমূহ দ্বারা অন্তরের সেই নড়াচড়া ও স্পন্দন উদ্দেশ্য, যা আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রাসূল ভালবাসেন এবং পছন্দ করেন। অন্তরের নড়াচড়া ও স্পন্দন বলতে ভাল কাজের প্রতি হৃদয়ের টান, ঝোক, ভালবাসা, সুদৃঢ় ইচ্ছা, খারাপ কাজের প্রতি অন্তরের ঘৃণা এবং তা বর্জনের প্রতি দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করাকে বুঝায়। অন্তরের কাজ থেকেই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজ এবং জবানের উক্তিসমূহের উৎপত্তি হয়। এই কারণেই জবানের কথাসমূহ এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমলসমূহকে ঈমানের মধ্যে গণ্য করা হয়।
ঈমানের সংজ্ঞায় বিভিন্ন ফির্কার অভিমত:
(১) আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মতে অন্তরের বিশ্বাস, জবানের স্বীকারোক্তি এবং অঙ্গ-প্রতঙ্গের আমলকে ঈমান বলা হয়।
(২) মুরজিয়াদের মতে শুধু অন্তরের বিশ্বাস এবং জবানের স্বীকারোক্তিকেই ঈমান বলা হয়।
(৩) কাররামীয়াদের মতে শুধু জবানের স্বীকারোক্তিকেই ঈমান বলা হয়।
(৪) জাবরীয়াদের মতে অন্তর দিয়ে শুধু স্বীকার করা কিংবা শুধু অন্তরের মারেফতকেই ঈমান বলা হয়।
(৫) মুতাযিলাদের মতে অন্তরের বিশ্বাস, জবানের স্বীকারোক্তি এবং অঙ্গ-প্রতঙ্গের আমলকে ঈমান বলা হয়।
ঈমানের সংজ্ঞায় মুতাযেলা এবং আহলে সুন্নাতের মধ্যে পার্থক্য হলো মুতাযেলাদের মতে কবীরা গুনাহয় লিপ্ত ব্যক্তি থেকে ঈমানকে সম্পূর্ণরূপে ছিনিয়ে নেয়া হয় এবং সে জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে। কিন্তু আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মতে কবীরা গুনাহয় লিপ্ত ব্যক্তির নিকট থেকে ঈমানকে সম্পূর্ণরূপে ছিনিয়ে নেয়া হয় না; বরং তাকে ত্রুটিপূর্ণ মুমিন হিসাবে গণ্য করা হয়। মৃত্যুর পর সে জাহান্নামে গেলেও সে তথায় চিরকাল থাকবেনা।
ঈমানের সংজ্ঞায় উপরোক্ত সব কথাই বাতিল। একমাত্র আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের কথাই সঠিক। তাদের কথার স্বপক্ষে অনেক দলীল রয়েছে।
وَأَنَّ الإِيمَانَ يَزِيدُ بِالطَّاعَةِ وَيَنْقُصُ بِالْمَعْصِيَةِ সৎকাজের মাধ্যমে ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং পাপাচারের কারণে ঈমান কমে যায়:
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আরেকটি মূলনীতি হলো ঈমানের তারতম্য হয়। কখনো বাড়ে আবার কখনো কমে যায়। আনুগত্যের আমল ঈমানকে বাড়িয়ে দেয় এবং পাপাচার ও গুনাহর কারণে ঈমান কমে। কুরআন ও সুন্নাহর অনেক দলীল এই কথাকে সমর্থন করে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ
"যারা ঈমানদার, তারা এমন যে, যখন আল্লাহর নাম নেয়া হয় তখন তাদের অন্তর ভীত হয়। আর যখন তাদের সামনে আল্লাহর আয়াত পাঠ করা হয়, তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা স্বীয় প্রভুর প্রতি ভরসা করে”। (সূরা আনফাল ৮:২) আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন:
لِيَزْدَادُوا إِيْمَانًا مَعَ إِيْمَانِهِمْ ﴾
"যাতে তাদের ঈমান আরো বৃদ্ধি পায় (সূরা ফাতাহ ৪৮:৪) এ ছাড়াও আরো অনেক দলীল রয়েছে।
وَهُمْ مَعَ ذَلِكَ لا يُكَفِّرُونَ أَهْلَ الْقِبْلَةِ بِمُطْلَقِ الْمَعَاصِي وَالْكَبَائِرِ كَمَا يَفْعَلُهُ الْخَوَارَجُ
উহা সত্ত্বেও অর্থাৎ সাধারণ পাপকাজ এবং কাবীরা গুনাহতে লিপ্ত হওয়ার কারণে ঈমান কমে গেলেও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা কাবীরা গুনাহয় লিপ্ত আহলে কিবলার কাউকে কাফের বলে না। যেমন করে থাকে খারেজীরা:
অর্থাৎ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা যদিও মনে করে যে, আমল ঈমানের মধ্যে শামিল এবং তা সৎ আমলের মাধ্যমে বৃদ্ধি পায় এবং পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার কারণে কমে যায়, তথাপিও তারা শির্ক ও কুফরী ব্যতীত অন্যান্য পাপাচারে লিপ্ত এমন কোন মানুষকে কাফের বলেনা, যে ইসলামের দাবী করে এবং কিবলামুখী হয়ে সলাত পড়ে। যেমন বলে থাকে খারেজীরা। তারা বলে, যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কবীরা গুনাহয় লিপ্ত হবে সে কাফের এবং আখেরাতে সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে। জাহান্নাম থেকে সে কখনো বের হবেনা।
সুতরাং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা মনে করে পাপাচারে লিপ্ত হলেও ঈমানী ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ঠিক থাকে। সুতরাং কাবীরা গুনাহয় লিপ্ত ব্যক্তি আমাদেরই ঈমানী ভাই। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া কিসাসের আয়াতে আল্লাহ তা'আলার বাণী দ্বারা উক্ত কথার উপর দলীল গ্রহণ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
فَمَنْ عُفِيَ لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْءٌ فَاتَّبَاعٌ بِالْمَعْرُوفِ
তবে কোন হত্যাকারীর জন্য যদি তার ভাইয়ের পক্ষ হতে কিছু মাফ করে দেয়া হয়, তাহলে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী রক্তপণ আদায়ের ব্যবস্থা করা উচিত (সূরা বাকারা ২:১৭৮)
আয়াতের তাৎপর্য হলো আঘাতকারীকে যদি আহত ব্যক্তি মাফ করে দেয় কিংবা নিহত ব্যক্তির ওয়ারিছগণ ক্ষমা করে দেয় এবং কিসাসের বদলে রক্তপন নিতে রাজী হয়, তাহলে মালের হকদারের উচিৎ কঠোরতা পরিহার করে ন্যায়ভাবে উহা তলব করা। অর্থ পরিশোধের দায়ভার যাদের উপর বর্তাবে তাদেরও উচিৎ হবে কোন প্রকার বাহানা ব্যতীত হকদারদের নিকট হক বুঝিয়ে দেয়া। উক্ত আয়াত থেকে এভাবে দলীল গ্রহণ করা যেতে পারে যে, হত্যা করা কাবীরা গুনাহ হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলা হত্যাকারীকে নিহত ব্যক্তির ভাই বলে উল্লেখ করেছেন। এতে বুঝা গেল, হত্যা করার পরও হত্যাকারীর সাথে ঈমানের ভিত্তিতে ইসলামী ভ্রাতৃত্বের বন্ধন অবশিষ্ট থাকে।
শাইখুল ইসলাম আল্লাহ তা'আলার এই বাণী দ্বারা আরো দলীল গ্রহণ করেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা (সূরা হুজুরাত ৪৯:৯) বলেন:
وَإِن طَائِفَتَانِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمْ
"ঈমানদারদের মধ্যকার দু'টি দল যদি পরস্পর লড়াই করে, তাহলে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। উপরোক্ত আয়াতে কারীমা দু'টি দ্বারা এভাবে দলীল গ্রহণ করা যেতে পারে যে, তাদের মধ্যে পারস্পরিক যুদ্ধ-বিগ্রহ ও সীমালংঘন বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ তা'আলা তাদেরকে মুমিন হিসাবেই নামকরণ করেছেন। সেই সাথে তাদেরকে আল্লাহ তা'আলা মুমিনদের ভাই হিসাবেই উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ
"অতএব, তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও" (সূরা হুজুরাত ৪৯:১০)।
আয়াতের সংক্ষিপ্ত অর্থ হলো যখন মুসলিমদের দুই দল পরস্পর লড়াই শুরু করবে, তখন অন্যান্য মুসলিমদের উচিৎ তাদের মধ্যে মীমাংসার চেষ্টা করা এবং আল্লাহ তা'আলার হুকুম মেনে নেয়ার আহবান জানানো। মীমাংসার উদ্যোগ গ্রহণ করার পরও যদি দুইদলের একদল অন্যদলের উপর যুলুম করে এবং মীমাংসার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে মুসলিমদের উপর আবশ্যক হলো এই বিদ্রোহী দলের বিরুদ্ধে লড়াই করে আল্লাহর হুকুম ও ফয়সালা মানতে বাধ্য করা। অতঃপর বিদ্রোহী দল যদি সীমালংঘন ও বিদ্রোহ পরিহার করে আল্লাহর হুকুমের দিকে চলে আসে এবং আল্লাহর কিতাব ও ফয়সালা মেনে নিতে রাজী হয়, তাহলে মুসলিমদের উচিৎ, মীমাংসা ও ফয়সালা করার সময় উভয় দলের মধ্যে ইনসাফ করা। তারা আল্লাহ তা'আলার হুকুম মোতাবেক ফয়সালা করার জন্য সঠিক রায়ের অনুসন্ধান করবে এবং বল প্রয়োগ করে সীমালংঘনকারী যালেম দলকে ফিরিয়ে আনবে। যাতে যুলুম থেকে তারা ফিরে আসে এবং অন্য দলের জন্য যেই হক তাদের উপর রয়েছে, তা পরিশোধ করে।
অতঃপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা বিশেষভাবে বিবাদরত দুই দলের মধ্যে ইনসাফের ভিত্তিতে মীমাংসা করার আদেশ দেয়ার পর সমস্ত মুসলিমকেই তাদের সকল বিষয়ে ন্যায়নীতি অবলম্বন করার আদেশ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَأَقْسِطُوا إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
"তোমরা ইনসাফ করো। কেননা আল্লাহ তা'আলা ইনসাফকারীদেরকে ভালবাসেন” (সূরা হুজুরাত ৪৯:৯)। আল্লাহ তা'আলা আরো বলেন: إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই (সূরা হুজুরাত ৪৯:১০)।
এটি একটি স্বতন্ত্র বাক্য। পূর্বের বাক্যে বিবাদরত দুই দলের মধ্যে মীমাংসা করার যেই আদেশ দেয়া হয়েছে, এই বাক্যে উহাকেই সাব্যস্ত করা হয়েছে। এই আয়াতের অর্থ হলো মুসলিমগণ মাত্র একটি বিষয়ের দিকেই ফিরে যাবে। সেটি হচ্ছে ঈমান। সুতরাং তারা সকলেই দ্বীনী ভাই। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও (সূরা হুজুরাত ৪৯:১০)।
অর্থাৎ বিবাদ ও সংগ্রামরত প্রত্যেক দুই মুসলিমের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। এখানে দুইজনকে খাস করার মাধ্যমে সাব্যস্ত করা হয়েছে যে, দুইয়ের অধিক মুসলিম লড়াইয়ে লিপ্ত হলে তাদের মধ্যে মীমাংসা করার আরো বেশী প্রয়োজন পড়বে।
আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَاتَّقُوا اللَّهَ তোমরা তোমাদের সকল বিষয়েই আল্লাহকে ভয় করো। যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করার কারণে لَّعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ আল্লাহর রহমতপ্রাপ্ত হতে পারো।
وَلَا يَسْلُبُونَ الْفَاسِقَ الْمِلِّيَّ اسْمَ الْإِيمَانِ بِالْكُلِّيَّةِ وَلَا يُخَلِّدُونَهُ فِي النَّارِ كَمَا تَقُولُ الْمُعْتَزِلَةُ : তারা মুসলিম মিল্লাতের কোন ফাসেক ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে সম্পূর্ণরূপে বের করে দেয় না এবং মৃত্যুর পর তারা তাকে চিরস্থায়ী জাহান্নামীও মনে করে না। যেমন মনে করে থাকে মুতাযিলারা:
অর্থাৎ আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের মূলনীতির অন্তর্ভুক্ত হলো তারা মুসলিম মিল্লাতের কোন ফাসেক ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে সম্পূর্ণরূপে বের করে দেয় না এবং মৃত্যুর পর তারা তাকে চিরস্থায়ী জাহান্নামীও মনে করে না। যেমন বলে থাকে মুতাযেলারা।
الفسق শব্দের অর্থ হলো আল্লাহর আনুগত্য বর্জন করা। তবে এখানে ফাসিক বলতে উদ্দেশ্য হলো যে মুসলিম হারাম মনে করেও কাবীরা গুনাহয় লিপ্ত হয়। যেমন মদ পান করা, যেনা করা, চুরি করা ইত্যাদি।
যে ব্যক্তি মিল্লাতে ইসলামীয়ার উপর রয়েছে এবং কাফিরে পরিণত হওয়ার মত কোন গুনাহয় লিপ্ত হয় না তাকে الفاسق الملي বলা হয়। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা মিল্লাতের অন্তর্ভুক্ত কোন লোক কুফরী ব্যতীত অন্য গুনাহয় লিপ্ত হলে তাকে ইসলামের বন্ধন থেকে খারিজ করে দেয় না এবং দুনিয়ায় জীবিত থাকা অবস্থায় তার উপর কুফরীর হুকুমও লাগায় না। যেমন খারেজীরা তাকে দুনিয়ার হুকুমে কাফের বলে থাকে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তাকে মৃত্যুর পর চিরকাল জাহান্নামীও মনে করে না। অর্থাৎ আখেরাতে তার উপর চিরকাল জাহান্নামী হওয়ার হুকুম লাগায় না এবং জাহান্নামে প্রবেশ করলেও সে চিরকাল জাহান্নামেই থাকবে বলে বিশ্বাস করে না। যেমন বলে থাকে মুতাযেলা এবং খারেজী সম্প্রদায়ের লোকেরা।
তবে মুতাযেলারা কাবীরা গুনাহয় লিপ্ত ফাসেকের জন্য মুসলিম কিংবা কাফের কোন নামই ব্যবহার করে না; বরং তাদের মতে সে ঈমান ও কুফরীর মধ্যবর্তী একটি স্তরে অবস্থান করে। তাদের মতে দুনিয়ার জীবনে কাবীরা গুনাহয় লিপ্ত মুসলিম উল্লেখিত হুকুমের মধ্যে থাকবে। তবে আখিরাতের হুকুমে খারেজীদের মতানুযায়ী তারা তাকে চিরস্থায়ী জাহান্নামী মনে করে থাকে। তাদের এই মাযহাব বাতিল। কুরআন ও হাদীসের একাধিক দলীল তাদের কথাকে বাতিল বলে সাব্যস্ত করে। কিছু দলীল পূর্বে অতিক্রান্ত হয়েছে। আর বাকী দলীলগুলো সামনে আসছে।
অতঃপর কুরআন ও সুন্নাহর একাধিক দলীলের আলোকে মুসলিম মিল্লাতের ফাসেক লোকের জন্য যেই হুকুম প্রযোজ্য, শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া এখানে উহা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন: ফাসেক সাধারণত: ঈমানের মধ্যেই থাকবে। কেননা ঈমানকে কামেল (পূর্ণ) ঈমান এবং নাকেস (অপূর্ণ) ঈমান, এই দুইভাগে বিভক্ত করা যায়। তাই ফাসেক পূর্ণ মুমিন নয়; কিন্তু সে ঈমান থেকে সম্পূর্ণরূপে বের হয়ে যায় না। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُّؤْمِنَةٌ .
"আর যে ব্যক্তি ভুলবশত কোন মুমিনকে হত্যা করে তার কাফ্ফারা হিসেবে একজন মুমিনকে গোলামী থেকে মুক্ত করে দিতে হবে" (সূরা নিসা ৪:৯২)।
দাসমুক্তির জন্য যেখানে ঈমান শর্ত করা হয়েছে, যেমন যিহার ও হত্যার কাফফারা, সেখানে আযাদকৃত দাস যদি ফাসেকও হয়, তাহলে সকল আলিমের মতে সেই ফাসেক দাস মুক্ত করা যথেষ্ঠ হবে। কেননা আয়াতের সাধারণ অর্থ থেকে ইহাই বুঝা যায়। যদিও আযাদকৃত গোলাম পূর্ণ ঈমানদার না হয়। কেননা দাসমুক্ত করার সময় দাসের মধ্যে পূর্ণ ঈমান থাকা জরুরী নয়।
শাইখুল ইসলাম বলেন: সাধারণভাবে ঈমান বলতে যখন পূর্ণ ঈমান উদ্দেশ্য হবে, তখন ইসলামী মিল্লাতের ফাসেক লোক সেই পূর্ণ ঈমানের মধ্যে শামিল হবে না। যেমন আল্লাহ তা'আলার এই বাণীতে পূর্ণ মুমিনের বর্ণনা এসেছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ ﴾
"যারা ঈমানদার, তারা এমন যে, যখন আল্লাহর নাম নেয়া হয় তখন তাদের অন্তর ভীত হয়" (সূরা আনফাল ৮:২)।
এই আয়াতে কারীমায় ঈমান বলতে ঈমানে কামেল (পূর্ণ ঈমান উদ্দেশ্য)। ফাসেক এই প্রকার মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত হবে না। কারণ তার ঈমান ত্রুটিপূর্ণ। এই আয়াতের তাফসীরের প্রতি লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাই যে, এখানে إِنَّ শব্দটি সীমাবদ্ধ করার অর্থ প্রদান করে। বাক্যের মধ্যে إِنَّمَا -এর পরে যে বিশেষ্য উল্লেখ থাকে, إِنَّ অব্যয় দ্বারা বাক্যের হুকুমকে শুধু তার জন্যই খাস করা হয় এবং অন্যদের থেকে উহা অস্বীকার করা হয়।
الْمُؤْمِنُونَ মুমিনগণ: অর্থাৎ পূর্ণ ঈমানদার তো তারাই, যাদের বৈশিষ্ট হলো, إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ "যখন আল্লাহর যিকির করা হয়” অর্থাৎ তাঁর বড়ত্ব, ক্ষমতা এবং পাপীদেরকে যা দিয়ে তিনি ভীতি প্রদর্শন করেছেন, তা উল্লেখ করা হয় وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ তখন তাদের অন্তর ভীত-সন্ত্রস্ত হয়।
وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ “আর যখন তাদের নিকট আল্লাহর আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করা হয়", অর্থাৎ যখন আল্লাহ তা'আলার নাযিলকৃত আয়াতগুলো পাঠ করা হয় কিংবা তাঁর সৃষ্টিগত নিদর্শনসমূহ উল্লেখ করা হয়, زَادَتْهُمْ إِيمَانًا তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ তা'আলার আয়াত ও নিদর্শন পাঠ করার কারণে তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়।
وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ “তারা স্বীয় প্রভুর প্রতি ভরসা করে”: অর্থাৎ তারা তাদের সকল বিষয় আল্লাহ তা'আলার নিকট সোপর্দ করে; অন্য কারো নিকট নয়। অতঃপর শাইখুল ইসলাম হাদীস থেকে এমন একটি দলীল পেশ করেছেন, যা প্রমাণ করে, মুসলিম মিল্লাতের ফাসিক ব্যক্তি পূর্ণ ঈমানদারদের মধ্যে গণ্য হবে না। রসূল বলেন:
لا يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ ولا يسرق السارق حين يسرق وهو مؤمن وَلَا يَشْرَبُ الْخَمْرَ حِينَ يَشْرَبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَالتَّوْبَةُ مَعْرُوضَةٌ بَعْدُ وَلَا يَنْتَهِبُ نَهْبَةً ذَاتَ شَرَفِ يَرْفَعُ النَّاسُ إِلَيْهِ فِيهَا أَبْصَارَهُمْ حِينَ يَنْتَهِبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ»
যেনাকারী যখন যেনা করে তখন সে মুমিন থাকে না, চোর যখন চুরি করে তখন সে মুমিন থাকে না। একই অবস্থা মদ পানকারীর। সে মদ পান করা অবস্থায় মুমিন থাকে না। এরপরও তার জন্য তাওবার দরজা উন্মুক্ত থাকে। যে ব্যক্তি এমন কোনো মূল্যবান বস্তু ছিনতাই করে, যার দিকে মানুষ দৃষ্টি উঁচু করে দেখে, সে যখন তা ছিনতাই করে, তখন সে ঈমানদার থাকে না। ৬৯
অর্থাৎ পূর্ণ ঈমানদার থাকে না। সুতরাং এখানে যেনাকারী, চোর এবং মদ্যপায়ী থেকে যেই ঈমানকে নফী করা হয়েছে, তা দ্বারা ঈমানের পূর্ণতা উদ্দেশ্য; মূল ঈমান উদ্দেশ্য নয়। কেননা ব্যভিচারী, চোর এবং মদ্যপায়ী মৃত ব্যক্তির ওয়ারিছ হওয়ার ব্যাপারে ইজমা সংঘটিত হয়েছে। সুতরাং হাদীসটি প্রমাণ করে যে, এই সমস্ত লোক যখন পাপাচারে লিপ্ত হয়, তখন তাদের থেকে ঈমানের পূর্ণরূপ বিলুপ্ত হয়ে যায়; পুরোটাই বিলুপ্ত হয়না। কুরআন ও হাদীসের অনেক দলীল প্রমাণ করে যে, উপরোক্ত গুনাহসমূহে লিপ্ত হওয়ার কারণে তারা মুরতাদ হয়ে যায়না। সুতরাং জানা গেল, এই হাদীসে যেই ঈমানকে নফী করা হয়েছে, তা দ্বারা ঈমানের পূর্ণতা উদ্দেশ্য; মূল ঈমান উদ্দেশ্য নয়।
ولا ينتهب نهبة ذات شرف ছিনতাই করতে পারে না, যার দিকে মানুষ দৃষ্টি উঁচু করে তাকিয়ে দেখে। সে যখন ছিনতাই করে, ছিনতাই করার সময় সে মুমিন থাকে না: النهبة শব্দটির নুন বর্ণে পেশ দিয়ে পড়া হয়েছে। ছিনিয়ে নেয়া বস্তুকে নুহবাহ বলা হয়। শক্তি প্রয়োগ করে এবং জবরদখল করে মাল আত্মসাৎ করাকে النهب বলা হয়। ذات شرف বলতে দামী জিনিস উদ্দেশ্য। কেউ কেউ বলেছেন, এখানে ذات شرف দ্বারা এমন উঁচু মানের জিনিস উদ্দেশ্য, যার দিকে লোকেরা তাকিয়ে থাকে এবং চোখ তুলে চেয়ে দেখে।
অতঃপর শাইখুল ইসলাম পূর্বোল্লেখিত আলোচনার ফলাফল উল্লেখ করেছেন এবং তা থেকে মুসলিম মিল্লাতের ফাসেক লোকের আসল হুকুম বের করেছেন। তিনি বলেছেন: আমরা বলি, সে হচ্ছে ত্রুটিপূর্ণ ঈমানদার অথবা তার মধ্যে যেহেতু ঈমান রয়েছে সে কারণে সে মুমিন এবং যেহেতু কবীরা গুনাহ রয়েছে, তাই সে ফাসেক। এটিই হচ্ছে ইনসাফপূর্ণ হুকুম। এতে যেসব দলীল তাকে ঈমান থেকে খারিজ করে দিয়েছে যেমন রাসূল বলেন: "যেনাকারী যখন যেনা করে তখন সে মুমিন থাকে না.......এবং যেসব দলীল তার জন্য ঈমান সাব্যস্ত করেছে, যেমন পূর্বোক্ত কিসাসের আয়াত এবং বিদ্রোহীদের হুকুম সম্পর্কিত আয়াত, এই উভয় প্রকার দলীলের মধ্যে সমন্বয় হয়ে গেছে। এর উপর ভিত্তি করেই বলা যায় مطلق المؤمن অর্থাৎ ত্রুটিযুক্ত ঈমান থেকে তাকে খারিজ করে দিয়ে মুতাযিলা ও খারিজীদের মত তাকে ঈমান থেকে সম্পূর্ণভাবে বহিস্কারও করে দেয়া যাবে না। আল্লাহই অধিক অবগত রয়েছেন। এখানে বিশেষভাবে স্মরণ রাখা দরকার যে, الإيمان المطلق বলতে কামেল (পূর্ণ) ঈমান উদ্দেশ্য এবং مطلق الإيمان বলতে ত্রুটিযুক্ত ঈমান উদ্দেশ্য।
টিকাঃ
৬৮. সহীহ বুখারী ২৪৭৫, সহীহ মুসলিম ৫৭, ইবনে মাজাহ ৩৯৩৬, আবু দাউদ ৪৬৮৯, তিরমিযী ২৬২৫।
৬৯ সহীহ বুখারী ২৪৭৫, সহীহ মুসলিম ৫৭, ইবনে মাজাহ ৩৯৩৬, আবু দাউদ ৪৬৮৯, তিরমিযী ২৬২৫।
📄 সাহাবীদের প্রতি ভাল ধারণা রাখা এবং তাঁদের মর্যাদা বর্ণনা করা আবশ্যক।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আক্বীদার মূলনীতি হলো, সাহাবীদের দোষ-ত্রুটি থেকে তারা তাদের অন্তর ও জবান পবিত্র রাখে।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আরো একটি মূলনীতি হলো, তারা রসূল এর সাহাবীদের প্রতি তাদের অন্তর ও জবান পবিত্র রাখে। অন্তর দিয়ে তাদেরকে ভালবাসে, তাদের প্রতি কোন প্রকার ঘৃণা রাখে না এবং জবান দিয়ে তাদের সমালোচনা ও কুৎসা রটনা করে না। যেমন আল্লাহ তা'আলা তাঁর এ বাণীতে সাহাবীদের গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:
وَالَّذِينَ جَاءُوا مِن بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَّحِيمٌ
“এবং যারা এসব অগ্রবর্তী লোকদের পরে এসেছে, তারা বলে: হে আমাদের রব, আমাদেরকে এবং আমাদের সেই সব ভাইকে মাফ করে দাও, যারা আমাদের আগে ঈমান এনেছে। আর আমাদের মনে ঈমানদারদের জন্য কোন হিংসা-বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের রব, তুমি অত্যন্ত মেহেরবান ও দয়ালু" (সূরা হাশর ৫৯:১০)।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আরেকটি মূলনীতি হলো নাবী এর এই হাদীসের আনুগত্য করা। তিনি বলেন: لَا تَسُبُّوا أَحَدًا مِنْ أَصْحَابِي فَإِنْ أَحَدَكُمْ لَوْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا أَدْرَكَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلَا نَصِيفَهُ
"তোমরা আমার কোন সাহাবীকে গালি দিয়ো না। তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় সমপরিমাণ স্বর্ণও খরচ করে তাদের একজনের এক মুদ বা অর্ধ মুদ পরিমাণ দান করার সমানও ছাওয়াবও পাবে না”। ৭০
এই হাদীসের আনুগত্য করতে গিয়েই তারা তাদের অন্তর ও জবানকে সাহাবীদের জন্য পবিত্র রাখে।
ব্যাখ্যা: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকদের অন্যতম আক্বীদা হলো, তারা অন্তরকে সাহাবীদের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ এবং ঘৃণাবোধ পোষণ করা থেকে পবিত্র রাখে। তারা তাদের জবানকেও সাহাবীদেরকে দোষারোপ করা, লানত করা এবং গালি দেয়া থেকে মুক্ত রাখে। কেননা তাদের রয়েছে অনেক ফাযীলাত। তারা সবার আগে ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং নাবী ﷺ এর সাহাবী হয়ে ধন্য হয়েছেন। তাদের রয়েছে উম্মতের সমস্ত মুসলিমের উপর বিশেষ ফাযীলাত। কেননা তারাই নাবী থেকে সরাসরি ইসলামী শরীয়ত গ্রহণ করেছেন এবং তাদের পরবর্তীদের জন্য পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। তারা রাসূল ﷺ এর সাথে জেহাদ করেছেন এবং তারা তাকে সাহায্য করেছেন।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া ঐ সমস্ত রাফেযী এবং খারেজীদের প্রতিবাদ করার জন্যই এই অধ্যায় রচনা করেছেন, যারা সাহাবীদেরকে গali দেয়, তাদেরকে ঘৃণা করে এবং তাদের ফাযীলাতগুলোর স্বীকৃতি দেয়না। এই নিকৃষ্ট মাযহাবের সাথে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকদের সম্পর্কচ্ছেদ ঘোষণার বিষয়টিও শাইখুল ইসলাম অত্র অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের লোকেরা তাদের নাবীর সাহাবীদের ব্যাপারে ঐরূপ ব্যবহারই করে, যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন:
وَالَّذِينَ جَاءُوا مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ
"যারা এসব অগ্রবর্তী লোকদের পরে এসেছে, তারা বলে, হে আমাদের রব! আমাদেরকে এবং আমাদের সেই সব ভাইকে মাফ করে দাও, যারা আমাদের আগে ঈমান এনেছে। আর আমাদের মনে ঈমানদারদের জন্য কোন হিংসা-বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের রব, তুমি অত্যন্ত মেহেরবান ও দয়ালু" (সূরা হাশর ৫৯:১০)।
অর্থাৎ যারা মুহাজির ও আনসারদের পরে আগমন করেছে। তারা উম্মতে ইসলামীয়ার ঐসব লোক, যারা কিয়ামত দিবস পর্যন্ত উত্তমভাবে সাহাবীদের অনুসরণ করবে। তারা কিয়ামত পর্যন্ত এই দু'আ করতে থাকবে যে, ﴾رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانَنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ “হে আমাদের রব, আমাদেরকে এবং আমাদের সেই সব ভাইকে মাফ করো, যারা আমাদের আগে ঈমান এনেছে। তারা নিজেদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং তাদের পূর্বে আগমনকারী মুহাজির ও আনসারদের জন্যও ক্ষমা প্রার্থনা করে। এখানে ভাই বলতে দ্বীনি ভাই উদ্দেশ্য এবং “غل” দ্বারা খেয়ানত, বিদ্বেষ, ঘৃণা এবং হিংসা উদ্দেশ্য। তারা আরো দু'আ করে যে, ﴾وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا﴿ “হে আমাদের রব! সেইসব মুমিনদের প্রতিও আমাদের অন্তরে কোন হিংসা ও ঘৃণাবোধ রেখো না, যারা আমাদের আগে ঈমান এনেছে"। সর্বপ্রথম সাহাবীগণই এই শ্রেণীর মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত হবে। কেননা তারাই সর্বোত্তম মুমিন এবং এখানে তাদের ব্যাপারেই আলোচনা চলছে।
ইমাম শাওকানী বলেন: যারা সকল সাহাবীর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করলো না এবং তাদের জন্য আল্লাহর রেজামন্দি কামনা করলো না তারা এই আয়াতে আল্লাহ তা'আলার আদেশ অমান্য করলো। সেই সাথে যার অন্তরে সাহাবীদের প্রতি বিদ্বেষ পাওয়া যাবে, সে শয়তানের প্ররোচনার কবলে পড়েছে এবং সে আল্লাহর অলীদের ও আখেরী নাবীর উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ লোকদের সাথে দুশমনী করে আল্লাহ তা'আলার বিরাট নাফরমানীতে লিপ্ত হয়েছে। শুধু তাই নয়; বরং সে তার নিজের জন্য লাঞ্ছনার এমন দ্বার উন্মুক্ত করেছে, যা তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করে ছাড়বে। যদি না সে স্বীয় নফসকে সংশোধন করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার নিকট আশ্রয় গ্রহণ করে এবং তাঁর কাছেই ফরিয়াদ করে। আর সর্বোত্তম মানুষ এবং উম্মতের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিদের প্রতি তার অন্তরের বিদ্বেষ টেনে বের না করে তা কোন ক্রমেই সম্ভব নয়। সাহাবীদের প্রতি কারো অন্তরের বিদ্বেষ যদি সীমা অতিক্রম করে তাদের কাউকে গালি দেয়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়, তাহলে সে শয়তানের রশিতে নিজেকে বেঁধে দিল এবং আল্লাহ তা'আলার ক্রোধ ও অসন্তুষ্টিতে পতিত হলো। এই কঠিন রোগে কেবল ঐ ব্যক্তিই আক্রান্ত হতে পারে, যে রাফেযীদের কোন উস্তাদ কিংবা উম্মতের সর্বোত্তম ব্যক্তিদের দুশমনের প্ররোচনার শিকার হয়েছে। তারাও এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে, যাদের সাথে শয়তান খেলতামাশায় লিপ্ত হয়েছে, তাদের জন্য হরেক রকম মিথ্যা রচনা করেছে, বানোয়াট কিচ্ছা তৈরী করেছে, নানা কুসংস্কার এবং অলীক কাহিনী রচনা করেছে। এগুলোর মাধ্যমে শয়তান তাদেরকে আল্লাহর ঐ কিতাব থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, যার সামনের দিক থেকে কিংবা পিছন দিক থেকে বাতিল আসতেই পারে না।
উপরোক্ত আয়াতে কারীমায় সাহাবীদের ফাযীলাত বর্ণিত হয়েছে। কেননা তারা ঈমান আনয়নে অগ্রণী ছিলেন। আয়াতে কারীমায় ঐসব আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের ফাযীলাতও বর্ণিত হয়েছে, যারা সাহাবীদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করে। যারা সাহাবীদের সাথে শত্রুতা পোষণ করে, তাদের নিন্দাও করা হয়েছে এখানে। আয়াতে কারীমায় সাহাবীদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং তাদের জন্য আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি কামনা করাও শরীয়তের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাতে রাসূল এর সাহাবীদের প্রতি আহলে সুন্নাতের লোকদের অন্তর ও জবানসমূহ পবিত্র থাকার কথাও জানা যায়। তাদের কথা:
رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ
"হে আমাদের রব! আমাদেরকে এবং আমাদের সেই সব ভাইকে মাফ করে দাও, যারা আমাদের আগে ঈমান এনেছে। আর আমাদের মনে ঈমানদারদের জন্য কোন হিংসা-বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের রব, তুমি অত্যন্ত মেহেরবান ও দয়ালু" (সূরা হাশর ৫৯:১০)।
-এই কথার মধ্যে তাদের জবানের পরিশুদ্ধিতা পাওয়া যায়। তাদের কথা: ﴾وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِّلَّذِينَ آمَنُوا﴿ “হে আমাদের রব! সেইসব মুমিনদের প্রতিও আমাদের অন্তরে কোন হিংসা ও ঘৃণাবোধ রেখো না, যারা আমাদের আগে ঈমান এনেছে", -এই কথার মধ্যে তাদের অন্তরের পরিশুদ্ধিতার এবং পবিত্রতারও প্রমাণ পাওয়া যায়।
উপরোক্ত আয়াতে আরো দলীল পাওয়া যায় যে, সাহাবীদেরকে গালি দেয়া এবং তাদেরকে ঘৃণা করা হারাম। তাদেরকে গালি দেয়া কিংবা ঘৃণা করা মুসলিমদের কাজ হতে পারে না। যারা এটি করবে, তারা 'ফাই''এর সম্পদ থেকে কিছুই পাবে না।
وَطَاعَةُ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي قَوْلِهِ আনুগত্য করাও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের আরেকটি মূলনীতি, তা করতে গিয়েই তারা তাদের অন্তর ও জবানকে সাহাবীদের জন্য পবিত্র রাখে:
অর্থাৎ আহলে সুন্নাতের লোকেরা সাহাবীদের প্রতি জবান এবং অন্তর পরিশুদ্ধ রেখে এবং তাদেরকে গালি দেয়া ও তাদের মর্যাদায় আঘাত করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে নাবী ﷺ এর আনুগত্য করে থাকেন। কেননা তিনি তাঁর সাহাবীদেরকে গালি দিতে নিষেধ করেছেন।
তিনি বলেছেন, لَا تَسْبُوا أَصْحَابِي "তোমরা আমার সাহাবীদেরকে গালি দিয়ো না"। أصحاب শব্দটি صاحب -এর বহুবচন। যেই মুসলিম নাবী ﷺ এর সাহচর্য লাভ করেছে, সেই সাহাবী। সুতরাং সাহাবী বলা হয়, ঐ মুসলিমকে, যে মুমিন অবস্থায় নাবীকে দেখেছে এবং ঈমানের উপর মৃত্যু বরণ করেছে।
فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ ঐ আল্লাহর শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে। তিনি এই কসমের দ্বারা পরের কথাটিকে শক্তিশালী করতে চেয়েছেন। রসূল ﷺ বলেন,
لَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ أَنْفَقَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا مَا بَلَغَ مُدَّ أَحَدِهِمْ وَلَا نَصِيفَهُ "তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় সমপরিমাণ স্বর্ণও খরচ করে, তাদের একজনের এক মুদ বা অর্ধ মুদ পরিমাণ দান করার সমান ছাওয়াবও পাবে না”। উহুদ মদীনার একটি সুপ্রসিদ্ধ পাহাড়ের নাম। অন্যান্য পাহাড় থেকে আলাদা থাকায় এটিকে উহুদ পাহাড় বলা হয়। ذهبا শব্দটি তামীয হিসাবে মানসুব হয়েছে। নাবী ﷺ এর 'সা'এর এক চতুর্থাংশকে মুদ বলা হয়। মুদ একটি পরিমাপ যন্ত্রের নাম। نصف কে نصيف ও বলা হয়। যেমন ثمين শব্দটি ঐ অর্থে ব্যবহৃত হয়। نصف ও نصیف উভয়ের অর্থই অর্ধেক। এমনি ثمين এবং ثمن উভয়েরই অর্থ মূল্যবান ও মূল্য।
হাদীসের সংক্ষিপ্ত অর্থ হলো, আল্লাহর রাস্তায় সাহাবী ছাড়া অন্যদের প্রচুর দান সাহাবীদের সামান্য দানের সমপরিমাণ হতে পারেনা। এর কারণ হলো ইসলামের প্রথম যুগে যখন মুসলিমদের সংখ্যা অল্প ছিল, ইসলামের সামনে প্রতিবন্ধক ছিল প্রচুর এবং দাওয়াত ছিল দুর্বল তখন সাহাবীদের অন্তরের ঈমান যত বড় ছিল, পরবর্তীতে আগমনকারী কারো পক্ষে তত বড় ঈমান অর্জন করা সম্ভব হবেনা।
মোটকথা হাদীস থেকে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে, তাতে সাহাবীদেরকে গালি দেয়া হারাম করা হয়েছে এবং অন্যদের উপরে তাদের ফাযীলাত বর্ণনা করা হয়েছে। হাদীস থেকে আরো প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে, আমলকারীর নিয়ত এবং যেই সময়ে আমলটি করা হয়েছে, সেই অনুপাতে আমলের ফাযীলাত কমবেশী হয়। (আল্লাহই অধিক অবগত আছেন)
এই হাদীস থেকে আরো প্রমাণ পাওয়া গেল, যে ব্যক্তি সাহাবীদেরকে ভালবাসলো এবং তাদের গুণাবলী বর্ণনা করলো, সে রসূল ﷺ এর আনুগত্য করলো। আর যে ব্যক্তি তাদেরকে গালি দিলো এবং ঘৃণা করলো, সে রসূল ﷺ এর বিরুদ্ধাচরণ করলো।
টিকাঃ
৭০. সহীহ বুখারী ৩৬৭৩, সহীহ মুসলিম ২৫৪১।
৭১. বিনা যুদ্ধে মুসলিমগণ কাফেরদের থেকে যে সম্পদ হাসিল করে, তাকে ফাই বলা হয়।